মহাজ্ঞানীরা সময়কে একেকটা ভাগে বিভক্ত করেছেন। চব্বিশ ঘন্টায় এক দিন। ষাট মিনিটে এক ঘন্টা। মিনিটের ক্ষুদ্রতম ভাগ সেকেন্ড। কিছুদিন আগে মিনিটই সময়ের ধর্তব্য ক্ষুদ্রতম ভাগ হিসেবে গণ্য হত। আর এখন ‘সেকেন্ড’ সময়ের এক মূল্যবান অংশ। এক সেকেন্ডেই যে আমরা তাবৎ কাজ করে ফেলতে পারছি। অদূর ভবিষ্যতে এক সেকেন্ডেরও ক্ষুদ্রতম ভাগের হিসেবেই হয়তো আমরা চলবো। যেমন ভাবে চলেন সময়ের গতি দানব উসাইন বোল্ট, টাইসন গে’রা। তবে, এক সেকেন্ডে আমরা যে এত্ত এত্ত কাজ করে ফেলছি, তাতে এর ক্ষুদ্রতম ভাগও এখন আমাদের কাছে সময়ের দাবি! সেকেন্ডের ভেতরে আমরা কী কী করছি তার একটা ফিরিস্তি না দিলে বোধ হয় কথাটা আপনাদের মালুম হবে না।
“শান্তিু রুম”- এ যাওয়ার তাগিদা অনুভব করছেন! জরুরি মুহূর্তে গিয়ে দেখলেন কেউ একজন ভেতরে জায়গা দখল করে আছেন! টোকা দিতে তিনি বললেন, ‘এক সেকেন্ড!’ অথচ এই এক সেকেন্ডই আপনার কাছে যেন অনন্তকাল অপেক্ষার সম!
বউয়ের ঠেলা খেয়ে বাজারে গেছেন তার প্রিয় মাছটি কেনার আশায়। গিয়ে দেখলেন তার পছন্দের মাছটি মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে অন্য কেউ কিনে নিয়ে যাচ্ছে! মাছ না কিনে বাসায় ফিরলে কি হবে সেটা হয়তো আপনি হাড়ে হাড়েই জানেন!
কোনো এক বন্ধু সকালবেলায় এসে বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে আপনাকে ডাকাডাকি করছে। কোথায় নিদিষ্ট সময়ে উপস্থিত থাকার শিডিউলটা আগেই ঠিক করা ছিল। অনেক্ষণ পরে আপনি তাকে আশ্বস্ত করতে বললেন, ‘দাঁড়া, এক সেকেন্ড!’ অথচ আপনি তখনও বিছিানায় শোয়া অবস্থায়! বেড টি, বাথরুম, নান্তা, দাঁত ব্রাশ- তাহলে দেখুন এক সেকেন্ডে প্রতিদিন সকালে আপনি কত্ত কাজ করে ফেলছেন!!
স্টুডিওগুলোতে লেখা থাকে এক মিনিটে ছবি তোলা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো তাও সেকেন্ডে চলে আসবে। লেখা হবে ‘এখানে এক সেকেন্ডে আর্জেন্ট ছবি তোলা হয়!’
মোবাইল কোম্পানীগুলোর এক সেকেন্ড পালস অফারে আমরা সবাই-ই কম-বেশি মজে গেছি। আগে দোকানে একমিনিট এক সেকেন্ড সময় হলেও দুই মিনিটের টাকা রাখা হত। পাবলিকও নির্বাক্যে তা মেনে নিত। কিন্তু এখন যেহেতু সময়টাই এক সেকেন্ডের সুতরাং হয়তো এ নিয়ে অনেকেই বসচা করবেন। অবশ্য কিপ্টেরা এর থেকে এখনই ফায়দা আদায় করে নিতে পারছে। কিন্তু অনেকের পক্ষেই এক সেকেন্ডে কাজ হাসিল করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষত্রে আমরা চ্যাট কিংবা ম্যাসেজ লিখতে যে সংক্ষেপিত ভাষা ব্যবহার করি, তা প্রয়োগ করতে পারি। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই আমরা দেখতে পাব ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেলেছে- ‘এখানে মোবাইলে এক সেকেন্ডে’র কথা বলা শেখানো হয়!’ আসলে এটার দরকারও আছে। আমরা যদি ‘আমি লাভ ইউ’ এটাকে সংক্ষেপিত করে ‘আলু’ বলি কিংবা ‘আমি তোমাকে ঘৃণা করি’ কথাটিকে ‘আঘু’-এভাবে বলি তাহলেই কিন্তু এক সেকেন্ডের প্রকৃত সুবিধা পাওয়া সম্ভব!!!
সময় নিয়ে প্রেমিক স¤প্রদায়গণ বরাবরই সমস্যায় পড়েন। এক মিনিট লেট হলেই প্রিয় মানুষটির রাগ ভাঙাতে হিমসিম খেতে হয় তাকে। এক সেকেন্ডের যুগে জরুরি কাজ থাকলেও প্রেম বাঁচাতে সে তো এক সেকেন্ডও লেট করার সুযোগ পাবে না। যদিও তার মনের মানুষটি প্রায়ই অকারণেও ঘন্টাখানেক দেরী করে ফেলে!!! অবশ্য ওটা কোনো কালেই দোষের কিছু নয় বলেই গণ্য হয়ে আসছে!
আমার এক পরিচিত নাট্য পরিচালককে সেদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি যে এত বছর ধরে নাটক পরিচালনা করে আসছেন, তা এমন কয়েকটা নাটকের কথা বলেন-যা কয়েক বছর আগেই প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু সেটার কথা এখনও পাবলিক মনে রেখেছে?’
‘কয়েক বছর কিরে, পাবলিক তো আমগো নাাটক অহন এক সেকেন্ডও মনে রাহে না।’ সত্যিই এখন যেহারে মানহীন নাটক বানানো হচ্ছে তাতে এক সেকেন্ড মনে রাখাই বিশেষ কিছু। ভবিষ্যতে হয়তো সেটাও রাখা যাবে না!
ওয়াটার ল্যু’র যুদ্ধে নেপোলিয়ানের সেনাপতির যুদ্ধক্ষেত্রে আসতে মাত্র পাঁচ মিনিট দেরী হওয়াতে নেপোলিয়ানকে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। এখন ‘এক সেকেন্ড’ -এর যুগ। এক সেকেন্ড দেরী করলেই আমরাও নানান ক্ষেত্রে পরাজিত হব। সুতরাং এক সেকেন্ডকে আর অবহেলা না করে এখনই এর জয়গান গাইতে শুরু করুন।
পরিশেষে এক সেকেন্ডের (আসলেই এক সেকেন্ডের কিনা সেটা পাঠকই আন্দাজ করে নিন!) কৌতুক বলে এক সেকেন্ড নিয়ে আপনাদের এক সেকেন্ড (!) নষ্ট করে পড়া এই লেখাটির যবনিকাপাত করছি-
পরীক্ষার হলে। সময় শেষ হবার সাথে সাথেই শিক্ষক খাতা তুলতে শুরু করলেন। এক ছাত্রের তখন লেখা শেষ করতে অনেক খানি বাকী। টিভি বিজ্ঞাপনের মত সেও স্যারকে বললো, ‘স্যার এক সেকেন্ড!”
‘এক সেকেন্ড নয়, তোমাকে আমি তিন সেকেন্ডই সময় দিলাম। তার মধ্যেই দাও!!!’, সহাস্যে বলে স্যার পাশেই দাঁড়িয়েই রইলেন!

original post