Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Sunday, February 26, 2012

জীবনের জন্য বই

by মোহাম্মদ আসিফ

একবার সৈয়দ শামসুল হককে একটা সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মানব জীবনে ও সমাজে শিল্প-সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা কি। উনি তখন উত্তরে যা বলেছিলেন তা অনেকটা এরকম যে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছু ব্যবহার করি যা শিল্প-সাহিত্যের অবদান। এই যে চমৎকার সব ডিজাইনের বাহারী জানালার পর্দা, সুন্দর সুন্দর বিছানার বেড কভার এসব চিত্র শিল্পীরা আকেঁ, সময়ের বিবর্তে এগুলো একসময় বাজারে চলে আসে, আমাদের নিত্য ব্যবহার্য হয়ে যায়। সাহিত্যের বেলায়ও সেরকম। এই যে আমরা গুছিয়ে কথা বলি, সুন্দর শব্দ চয়ন করি, ভাষার অলংকরণ করে নিজেদের ভাব, মতামত প্রকাশ করি। পণ্যের প্রচারে, বিজ্ঞাপনে মনকাড়া সংলাপ ব্যবহার করা হয়– এসবই সৃজনশীল সাহিত্যের চর্চা ও পাঠের পরোক্ষ প্রকাশ ও ব্যবহার।

আমাদের ব্যাক্তিগত ও সমাজ জীবনে শিল্প-সাহিত্যের প্রয়োজনীতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লেখাটি শুরু করার কারণ হচ্ছে লেখালেখি সৃজনশীল কাজের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সঠিকভাবে, কার্যকর উপায়ে আমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছেনা। টেলিভিশনে মাঝে মাঝে সাহিত্য আলাচনার অনুষ্ঠানে বই পড়া নিয়ে কথাবর্তা হয়। সরকারের মুখপাত্র সরকারী টেলিভিশনে এসব অনুষ্ঠানে সাহিত্য চর্চা ও পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা যতটা না করা হয় তার চেয়ে বেশী এই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠান কর্তাব্যক্তিরা কে কী করছেন সেসব প্রসঙ্গই মুখ্য হয়ে ওঠে। “বই পড়ুন”, “বই উপহার দিন” জাতীয় সরকারের গৎবাধা বাণী এইসব নিরস, অকার্যকর আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসে। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আর কম্পিউটারের দৌরাত্মে যেখানে ক্রমে বইয়ের পাঠক ও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে, সেখানে এগুলোর সাথে বইয়ের কোনরকম তুলনা না করে বরং বই যে এগুলোর পরিপূরক নয় মানুষকে তা বোঝানো দরকার। বিজ্ঞানের গবেষণা থেকেই আমরা জানি যে মানুষের মস্তিষ্কে বিপুল জ্ঞানের ভান্ডার যা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সেই জ্ঞানের প্রস্ফুটন ঘটাতে হয়। চোখের সামনে মেলে ধরা একটি বই একজন মানুষকে কল্পনা ও চিন্তার যে বিশাল জগতে নিয়ে যেতে পারে, তাকে দিতে পারে অনাবিল আনন্দ অনুভব, নিজেকে, অন্য মানুষকে ও সমাজকে নিয়ে ভাববার উপায়। এ কাজটি টেলিভিশন অথবা কম্পিউটার পারে না। কারণ এগুলোতে মানুষের সামনে তার কল্পনা ও চিন্তা জগতের সর্বোচ্চ সম্ভব ব্যবহার করে ফেলা হয় শব্দ, সুর, ছবি, প্রতিবিম্ব ও জীবন্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে সেখানে মানুষের চিন্তা করার, কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ কোথায়। কাজেই বই টেলিভিশন অথবা কম্পিউটারের বিকল্প নয়।

বই শুধু কাগজের উপর মুদ্রিত শব্দ বাক্যের ঝুড়ি নয়। বই হচ্ছে মানুষের কল্পনা ও চিন্তার বিশুদ্ধ প্রকাশ। অন্য সকল মাধ্যম হল অনেক তত্ব, তথ্য ও বিষয়ের সংমিশ্রন, কিন্তু বই হচ্ছে একক ও অকৃত্রিম। অন্য সব জ্ঞান অর্জনের ও আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম যদি হয় এ্যালোপ্যাথী তবে বই হলো হোমিওপ্যাথী, খাঁটি ও নির্জল। ধরা যাক কেউ “ভালবাসা” ব্যাপারটি কী সেটা বুঝতে চায়, তবে জানার ও বোঝার অনেক মাধ্যম আছে। কিন্তু শুধু কোন একটি ভাল বই বা একজন ভাল লেখক ভালবাসার যথার্থ বিশ্লেষণ করতে পারেন। যেমন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার একটা প্রবন্ধে তিনি ভালবাসা বিষয়ে লিখেছেন, “প্রেম সম্পর্কিত যে কোন তুচ্ছ বিষয়ও অসাধারণ হয়ে ওঠে। এই অসাধারণ হয়ে ওঠার ক্ষমতাটি প্রতিটি ব্যাক্তির ভেতর লুকিয়ে থাকে। এবং সেটিই তার ‘সত্য পরিচয়’। এই সত্যটি অন্যজন আবিস্কার করে, যে ভালবাসে। প্রত্যক্ষকে অতিক্রম করে কোন একজনের ভেতরের পূর্ণতাকে স্পর্শ করার ক্ষমতাই হল ভালবাসা। যে ভালবাসে, অপরজনের ঐ পূর্ণতাকে অনুভব করতে পারে বলেই ভালবাসে। নিজেকে অতিক্রম করে সেখানে মিলতে পারাতে তার অসীম তৃপ্তি এব কোন তত্ব নয়, অনুভবের ঐ তৃপ্তিটাই তার কাছে পরম সত্য, সে তা বুঝাতে পারুক, আর নাই পারুক। কিন্তু ধন্য হয় সে, যে ভালবাসা পায় আর তুচ্ছ অস্তিত্বে সে স্বার্থকতার স্বাদ পায় সেখানেই।” কবি গুরুর ভালবাসা সম্পর্কিত এই সহজ সাধারণ অথচ গভীর অর্থময় বিশ্লেষণ যে কোন শিক্ষিত মানুষকে ভালবাসার গুঢ়ার্থ বুঝতে সাহায্য করবে, তার অনুভবকে, চিন্তার জগৎকে নাড়া দেবে যা অন্য কোন মাধ্যম পারবেনা।

আমাদের সমাজে পরিবারে, বাড়িতে বই পড়ার অভ্যেস এখন আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন টেলিভিশন, সিডি, ডিভিডি, কম্পিউটার, মোবাইল এগুলো বাড়িতে বইয়ের স্থান দখল করে নিয়েছে। ক্যাবল টিভির চ্যানেলগুলোতে একের পর এক রঙচঙে অনুষ্ঠান সব বয়সের মানুষের অবসর কেড়ে নেয়। টেলিভিশন সত্যিই যেন এক যাদুর বাক্স, আমাদের অবসর সন্ধ্যাগুলোয় প্রতিদিন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত বাঁশি বাজিয়ে নেশাচ্ছন্ন করে রাখে। এই চরম নেশা থেকে মানুষকে বইয়ের মুখাপেক্ষী করানো সহজ নয়। সৈয়দ মুজতবা আলী’র যুগেও বই পড়ার ব্যাপারে নানান কারণে মানুষের অনাগ্রহ ছিল। তিনি মজা করে লিখে মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে তাদের অনাগ্রহগুলো দেখিয়েছেন এবং সেই সাথে জানিয়েছেন বই পড়ার নানা উপকারের কথা। এখন তিনি বেচেঁ থাকলে নিশ্চয়ই বাবা মাদের বিদ্রুপ করে লিখতেন যে তারা ছেলেমেয়েদের বিদেশী চকোলেট, ফাস্টফুড আর মোবাইল খরচের জন্যে হাজার হাজার টাকা নিয়মিত ব্যয় করলেও, একশ দু’শ টাকার বই কেনার জন্যে উৎসাহিত করেন না।

বিশ্বায়ন ও বাণিজ্যিকীকরনের এই যুগে সৃষ্টিশীল সাহিত্যও এখন পন্য বনে যাচ্ছে। বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানী বা দেশীয় ব্যবসায়ীরা এখন নিয়ন্ত্রন ও প্রভাবিত করে আমাদের শিল্প, সাহিত্য, আমাদের সুকুমার কলা। ঈদ সংখ্যার ম্যাগাজিনে উপন্যাসের প্রচ্ছদে কিংবা লেখার পাতায় পাতায় তেল কিংবা সাবানের বিজ্ঞাপন দেখে এখন আর অবাক হইনা। মাঝে মাঝে বিভ্রম হয় বিজ্ঞাপনের কোন ক্যাপশানও লেখাটির প্রচ্ছদের অংশ কিনা। সাহিত্যকর্ম, সে কবিতা, গল্প বা উপন্যাস যাই হোক না কেন, তা মানুষের চরিত্রের বিচিত্রতা, জগতের বহুমাত্রিক জটিলতা, তার সময় ও সমাজের মূল্যবোধকে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করে। বিখ্যাত কবি ও সাধক জালালুদ্দিন রুমী তার একটি কবিতায় লিখেছিলেন :

“I am so small I can barely be seen
How can this great love be inside me?
Look at your eyes, they are small
But they see enormous things.”

বই হলো রুমীর চোখের মত, অতিা ক্ষুদ্র অথচ চারপাশের সবকিছুকে বৃহদাকারে দেখতে পায়।

বলা হয় সাহিত্য সমাজ বদলের হাতিয়ার। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কথাটি অবশ্যই সত্যি। তাই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে বেশী বেশী বই পড়া হলে আমরা আমাদের মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে পারবো।

original post

read more

Wednesday, February 8, 2012

মুরাকামি, দ্বিতীয় চাঁদ ও লাগাশ

by শিবব্রত বর্মন

সায়েন্স ফিকশন লেখকদের মধ্যে নিজের নবুয়তি ক্ষমতা নিয়ে বড়াই করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
কিছুদিন আগে গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটা বড় লেখা লিখে অশীতিপর ব্রায়ান অ্যালডিস একপ্রকার উল্লাসই প্রকাশ করেছেন। তার উল্লাসের উপলক্ষ্য সিগনাস নক্ষত্রপুঞ্জে আবিষ্কৃত একটি নতুন গ্রহ, যেটি প্রায় পৃথিবীরই মতো দেখতে। অ্যালডিস তার হেলিকনিয়া স্প্রিং (১৯৮৪) উপন্যাসে ঠিক এই জায়গাটিতেই একটি গ্রহ থাকার কথা বলেছিলেন। এমনকি গ্রহটি সম্পর্কে তিনি যে-যে বিবরণ দিয়েছিলেন, সেগুলোও নাকি নবাবিস্কৃত গ্রহটির সঙ্গে অনেকখানি মিলে যাচ্ছে। ব্রায়ান অ্যালডিসের উপন্যাসে গ্রহটির নাম হেলিকনিয়া। বিচিত্র পরিবেশ সেটির। ৫ হাজার বছরে সেটি একবার নিজের সূর্যকে ঘুরে আসে। সে কারণে গ্রহটিতে আড়াই হাজার বছর ধরে গ্রীষ্মকাল, আড়াই হাজার বছর ধরে শীত। এরকম আবহাওয়ায় গাছপালা, পশুপাখির চেহারা, স্বভাবচরিত্র কেমন হবে, তার বিস্তারিত যুক্তিপূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেছেন অ্যালডিস। অ্যালডিসের গ্রহটির আবার দুটি সূর্য। একটি ছোট সূর্যকে ঘিরে ঘোরে হেলিকনিয়া। আর সেই ছোট সূর্যটি আবার হেলিকনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ৫ হাজার বছরে প্রদক্ষিণ করে আরেকটি বড় নক্ষত্র।

এই বিবরণের সঙ্গে নাসার আবিষ্কৃত নতুন গ্রহটির মিল খুব বেশি দেখি না। সেখানে দুটি সূর্য নেই, বার্ষিক গতিও ৫ হাজার বছর নয়। অ্যালডিসের হেলিকনিয়ার সঙ্গে এই সত্যিকার গ্রহটির মিল একটি জায়গায় - এটির প্রাপ্তিস্থান। সেটা একটা ইত্তেফাক বটে, আর এতে চমকও জাগে। তবে লেখকদের বিশেষ করে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের গর্ব করার বিষয়বস্তু হওয়া উচিৎ তাদের কল্পনাশক্তির জোর। ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা কোনো লেখকসুলভ গুণ বলে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। সেটা শুধু পলিটিক্যাল কলামিস্টদের আত্মতৃপ্তির জন্যে বরাদ্দ থাকলে ভালো দেখায়।
অনেক সায়েন্স ফিকশন লেখককে পরবর্তীকালের বড় বড় আবিষ্কারের পথ প্রদর্শক হিসেবে ক্রেডিট দেওয়া হয়ে থাকে। তবে সেটা নিছক বাহাবামাত্র। আর্থার সি ক্লার্ক অয়্যারলেস ওয়ার্ল্ড পত্রিকায় তার সেই বিখ্যাত প্রবন্ধটি না লিখলেও আমরা জিও-স্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট পেতাম, সন্দেহ নেই। এমন মনে করার কোনো কারণ নেই যে, জুল ভার্নের ফ্রম আর্থ টু দ্য মুন বইয়ের সঙ্গে মানুষের চন্দ্রাভিযানের কোনো সম্পর্ক আছে। আসিমভের রোবোটবিদ্যার তিন সূত্রের কাছে এখনকার রোবোটিক্সের ঋণস্বীকার করারও কিছু নেই। প্রযুক্তিবিদরা তাদের আবিষ্কারকে বাড়তি মহিমা দেওয়ার জন্যেই পপুলার ফিকশনের মধ্যে সেগুলোর প্রতিধ্বনি খোঁজেন।

লেখকদের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রসঙ্গটি তুললাম কয়েকদিন আগে পত্রিকার পাতায় একটি খবর দেখে। ওই খবরে বলা হয়েছে, আমাদের পৃথিবীর আসলে একটি নয়, দুটি চাঁদ। সবসময়ই দুটি চাঁদ ছিলো। কথাটা একটু টুইস্ট করে বলা। আসল ঘটনা হচ্ছে, ২০০৬ সালে আকাশে একটা ছোট বস্তুকণা ধরা পড়েছিল। সেটা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ধরে নিয়েছিলেন, কোনো পরিত্যক্ত রকেট-ফকেট হবে। কিন্তু সম্প্রতি টের পাওয়া গেছে, ওটা আসলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে আটকে পড়া কোনো গ্রহাণু। ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত সেটা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে। তো, এরকম গ্রহাণু অহরহই ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর চারপাশ দিয়ে। আর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের ফাঁদে আটকা পড়ে সেগুলো কিছুদিনের জন্যে অস্থায়ী উপগ্রহ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ফলে খোঁজ নিলে প্রায় সবসময়ই পৃথিবীর একটা সেকেন্ড মুন পাওয়া যাবে।

এটুকু খবর পড়ে আমার মধ্যে একটু মুচকি হাসি ছড়িয়ে পড়লো। কেননা মাত্র কিছুদিন আগেই বেরিয়েছে জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির নতুন উপন্যাস ওয়ান-কিউ-এইট্টিফোর। ওই উপন্যাসের একটি চরিত্র এমন এক গুপ্ত পৃথিবীতে বসবাস করে (আমাদের এই পরিচিত পৃথিবীই) যেটির দুটি চাঁদ। মুরাকামি নিশ্চয়ই নাসার বিজ্ঞানীদের এই দ্বিচন্দ্রকথায় পুলকিত বোধ করবেন। আশাহি শিম্বন পত্রিকার কলামে উল্লাস প্রকাশ করাও বিচিত্র নয়।

তবে আমার মনে হয়, একটা বাঁকা হাসির রেখা উঁকি দিয়েই মিলিয়ে যাবে মুরাকামির ঠোঁটে। এভাবে একটা করে উৎকল্পনা বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসতে শুরু করলে মুরাকামিকেই আঁতকে উঠতে হবে। কেননা তাহলে আকাশ থেকে মাছবৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে যে কোনো দিন (কাফকা অন দ্য শোর), বা তোকিওর রাস্তায় মার্জারশ্রেণী শুরু করে দিতে পারে মানুষের সঙ্গে কথপোকথন। মুরাকামির উপন্যাসগুলোর পাতায় পাতায় এরকম ফ্যান্টাসির ছড়াছড়ি। পশ্চিমের জানরো-রাইটিংঙে অনুরক্ত (রেইমন্ড চ্যান্ডলার অনুবাদ করেছেন জাপানি ভাষায়) মুরাকামি একাধিক উপন্যাসে সায়েন্স ফিকশনের খোলস ব্যবহার করেছেন। তবে নিজেকে “হার্ড-বয়েল্ড এসএফ রাইটার” বলতে তিনি রাজি হবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে।

সায়েন্স ফিকশন লেখকদের কাজটা কী? বাস্তবতার কোনোরকম বিশ্লেষণ, বা প্রতীকায়ন কস্মিণকালেও নয়। ভবিষ্যদ্বাণী তো নয়ই। আমার মতে, সায়েন্স ফিকশন লেখকদের কাজ আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার আর কী কী প্রকারভেদ হতে পারতো তা দেখানো। আমরা এরকম না হয়ে আর কী কী রকম হতে পারতাম, এটা দেখতে পাওয়া, অনুধাবন করা কম জরুরি নয়। কেননা এটা চিন্তার স্টেরিওটাইপ থেকে বেরিয়ে আসার একটা ভালো উপায়। বাস্তবতাকে আরো গভীরভাবে অনুধাবনের পার্সেউসীয় পন্থা। আর এ পথের একমাত্র জ্বালানি নির্ভেজাল কল্পনাশক্তি।

অবশ্য বিকল্প বাস্তবতা অনুমানের পেছনেই শুধু কল্পনাশক্তির প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের এই বাস্তব জগৎটাই যে আসলে কতোখানি উৎকাল্পনিক, সেটা অনুভব করার জন্যেও বেশ জোরালো কল্পনাশক্তি প্রয়োজন। খুব কম লোকই এটা অনুধাবন করতে রাজি হবে যে, আমরা ইতিমধ্যে একটি সায়েন্স ফিকশনালাইজড পৃথিবীতে বসবাস করছি, যেটির একটি চাঁদ ও একটি মাত্র সূর্য। আমাদের হাতে ধরা টিভি আর এসির রিমোট কন্ট্রোলার, থি-জি স্মার্ট ফোন আর বুকের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া পেসমেকারের গল্প যদি -ধরা যাক-১৮৬০ সালে শোনানো হতো সুন্দরবনের দাপুটে জলসদ্যুদের পিছু ধাওয়াকারী খুলনা মহকুমার জাঁদরেল ডেপুটি কালেকটরটিকে (যিনি পরবর্তীকালে কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের লেখক হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠবেন), প্রবল ধীশক্তিসম্পন্ন এই আমলাটির পক্ষেও এ-সবকিছু ‘সম্ভব’ বলে মেনে নেওয়া কঠিন হতো।

আমার কাছে অ্যালডিসের হেলিকনিয়া স্প্রিং উপন্যাসটির চেয়ে বরং তার হটহাউস উপন্যাসটি বেশি কৌতুহলদ্দীপক। হটহাউস আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটিরই কাহিনি। পটভূমি এমন এক দূর ভবিষ্যত, যখন পৃথিবীর আহ্নিক গতি ফুরিয়ে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে থেমে গেছে আমাদের এই গ্রহ। এখন সেটার একটা পিঠ সার্বক্ষণিক সূর্যের দিকে মুখ করা। সেখানে চিরদিবস। আরেকটা অংশে চিররাত্রি। এরকম এক বিভক্ত চরাচর পুরোটাই চলে গেছে বৃক্ষদের দখলে। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে শুধু বৃক্ষেরই জয়জয়কার। শুধু তারাই টিকে গেছে। গুটিকয় পতঙ্গ ছাড়া বাকি সব প্রাণিপ্রজাতি বিলুপ্ত। পৃথিবীর প্রায় পুরোটা জুড়ে ছড়ানো এক অন্তহীন বৃষ্টিবন। শুধু তাই নয়, বিবর্তনের রাস্তায় ধীরে ধীরে গাছেদের মধ্যে স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ দেখা দিতে শুরু করেছে, অনেকের মধ্যে চোখ নামক একটি ইন্দ্রিয় কেবল বিকশিত হচ্ছে। পৃথিবীর যে-পাশটায় অনন্ত দিন, সেপাশটায় এক সুবিশাল বটগাছ নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে। ঝুরি নামিয়ে নামিয়ে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেকটা দখল করে বসে আছেন একটাই বটবৃক্ষ। তার ছায়ায় মানব প্রজাতির শেষ কয়েকটি বংশধর বিলুপ্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
কল্পনাটির মধ্যে কোথাও একটা জীবনানন্দীয় বিষন্নতা আছে।

তবে সবচেয়ে উদ্ভট আর বিচিত্র গ্রহজীবনের কল্পনা বোধ হয় বেরিয়ে এসেছে আসিমভের মাথা থেকে। গ্রহটির নাম লাগাশ। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প “নাইটফল”-এর পটভূমি এই লাগাশ গ্রহ। এটির অবস্থান এমন এক নক্ষত্রপুঞ্জে, সেখানে ছয়টি সূর্য। যেকোনো সময় আকাশে দুই থেকে তিনটি সূর্য উপস্থিত। পশ্চিমে যখন একটি অস্ত যাচ্ছে, তখন মধ্যগগনে হয়তো একটি গনগন করছে, আবার তখনই হয়তো পূবাকাশে উঁকি দিচ্ছে আরেকটি। এর ফলাফল : লাগাশ গ্রহে কখনও রাত নামে না। অন্ধকার বলে কোনোকিছুর ধারণাই তাদের মধ্যে তৈরী হয়নি। নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশ তারা কখনও দেখেনি। চিরকাল এমনটা থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু হয়েছে কি, প্রতি দু’হাজার বছর পর পর এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত আসে, যখন আকাশে একটিমাত্র সূর্যের অস্তিত্ব থাকে (বাকিগুলো উল্টোদিকে), আর তখন সেই একটিমাত্র সূর্যে গ্রহণ হয়। এর ফলাফল : খুব অল্প সময়ের জন্য রাত নেমে আসে লাগাশ গ্রহে। দু’হাজার বছরে প্রথম রাত নামা। তাও অল্প কয়েক দণ্ডের জন্য। কিন্তু এই ঘনায়মান অন্ধকার, আকাশে একে একে জেগে ওঠা নক্ষত্র, এই অপরিচিত পরিবেশ পাগল করে দেয় গ্রহের বাসিন্দাদের। তারা দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু করে আর আলোর জন্য সামনে যা কিছু পায় সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমেষে পুরো সভ্যতা আর তার পুঞ্জিভূত স্মৃতি (বইপত্র, দলিল-দস্তাবেজ) নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। লাগাশ গ্রহে সভ্যতার ইতি ঘটে, আবার শূন্য থেকে যাত্রা শুরু হয় সবকিছুর - অনন্ত দিবসের অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত আরেকটি সভ্যতা। এবং এই সর্বনাশের, এই বিপর্যয়ের কোনো স্মৃতি, কোনো রেকর্ড থাকে না কোথাও। ফলে লাগাশের সভ্যতা দুই হাজার বছরের একটি বৃত্তে ক্রমাগত ঘুরছে। অনন্তকাল ধরে।

আমি এবার লাগাশ গ্রহের একটি ছোট প্যাশটিশ লিখি :
এমন একটি গ্রহের কথা কল্পনা করা যাক, যেটির ছয়টি সূর্য। গ্রহবাসীদের যৌথ স্মৃতিশক্তির স্থায়িত্ব ৫ বছর। প্রতি ৫ বছর পর পর তারা ভুলে যায়, আগের ৫ বছরের স্মৃতি। এই গ্রহে টানা দিন। এক অনন্ত দিনের রাজ্যে বসবাস। কারো কল্পনায় রাত বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই। রাতের আকাশে জেগে ওঠা নক্ষত্রও দেখেনি কেউ। কিন্তু প্রতি ৫ বছরে গ্রহণজনিত কারণে অল্প সময়ের জন্য রাত নামে। প্রতিবার এই রাত নামা আর নক্ষত্রের জেগে ওঠাকে এক ভয়ঙ্কর ধ্বংসের আগমনবার্তা হিসেবে প্রচার করতে থাকে সেখানকার একটি ডুমসডে কাল্ট, যেটির আনুষ্ঠানিক নাম- সিভিল সোসাইটি। তারা একটি গণভীতি ছড়িয়ে দেয়। মানুষ এলোমেলো ছুটোছুটি করতে শুরু করে। আগুন ধরিয়ে দেয় যা কিছু দাহ্য তার মধ্যে। গ্রহণ শেষ হয়ে যায় বটে, কিন্তু ৫ বছরের স্মৃতিও মুছে গেছে।

নাহ, লাগাশের চেয়ে আমাদের দুই চন্দ্রবিশিষ্ট এই পৃথিবীর নক্ষত্রখচিত রাতই অনেক মোহনীয়।
শেষ করি হারুকি মুরাকামির একটি প্রিয় গান দিয়ে। ফ্রাংক সিনাত্রার গাওয়া এ গানটির নাম ইটস অনলি এ পেপার মুন:

It’s only a paper moon
Sailin’ over a cardboard sea
But it wouldn’t be make-believe
If you believe in me.

Yes, it’s only a canvas sky
Hanging over a muslin tree
But it wouldn’t be make-believe
If you believe in me.

Without your love
It’s a honky-tonk parade
Without your love
It’s a melody played in a penny arcade.

It’s a Barnum and Bailey world
Just as phony as it can be
But it wouldn’t be make-believe
If you believe in me.

(Link : http://www.youtube.com/watch?v=Xnc8lBhucJU)

original post

read more

Tuesday, January 24, 2012

ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা

by রুমি আলম
বলা যায় স্বাধীনতার প্রায় দুই যুগ পরে এরশাদের পতনের পর থেকেই দেশে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও অপ্রয়োজনীয়তা বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এইসময়ে ছাত্রসংগঠনের নেতা কর্মীদের সামনে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন সংগ্রামের স্বাভাবিক চরিত্র না থাকায় কিছু কিছু অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা, জিয়াউর রহমান অবৈধ পথে ক্ষমতায় এসেই জাতীয় রাজনীতি এবং ছাত্ররাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা দিয়ে রাজনীতির চিরচেনা সেই ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল নীতির রাজা লালন করাই রাজনীতি এই অহংকারকে ভয়ংকর ও কুতসিত চরিত্রদান করেন। কাকতালীয়ভাবে ’৯১ এর নির্বাচনেও বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের চরিত্রে কালিমা লেপনের যে অপচেষ্টা জিয়াউর রহমান করেছিলেন, তারই হাতে গড়া দলের নেতা কর্মীরা মহাউদ্দ্যমে এবার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যেন জিয়াউর রহমানের সেই অসমাপ্ত কাজই করতে শুরু করেছিলেন। তখনও একবার আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ছাত্রদের হাতে বইখাতা তুলে দিয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছাত্রলীগ তথা ছাত্ররাজনীতিকেই রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যে বিষবাষ্প রাজনীতির মাঠে ছড়ানো হয়েছিল তা সংগঠনকে খুব সহজে স্পর্শ না করতে পারলেও ব্যক্তির পর্যায়ে খুব সহজেই পৌঁছে গিয়েছিল।


এমনই একপর্যায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার কথা বললে তথাকথিত সুশীলের খুব প্রশংসাও কুড়ান। এইধরনের সুশীলেরা কখনই ছাত্ররাজনীতির অতীত ভুমিকা, থাকার প্রয়োজনীয়তা এবং কিভাবে থাকা উচিত সেগুলোর বিষয়ে কোন পরামর্শ দেন না। তাঁদের সোজা কথা ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সুশীলদের একটি অংশ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বা বেসামরিক আমলা, একটি অংশ ব্যবসায়ী, একটি অংশ ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতি করে হালে পানি না পেয়ে এখন এনজিও ব্যক্তিত্ব, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষক। তারা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার জন্য দৃশ্যমান যেসব যুক্তিগুলো দেখান, সেগুলো ছাত্রসংগঠনগুলো একটু সুনজর ও সাংগঠনিক কার্যপরিধি বৃদ্ধি করলেই সমাধান সম্ভব। কিন্তু খেয়াল করবেন, এই সুশীল মশায়রা কখনই সমাধানের কথা বলবেন না। একেবারে বন্ধই করতে হবে। কেন? কারন, পাকিআমল থেকেই সামরিক শাসন আমাদের শোষণ করছে বারবার। স্বাধীনতা পেলেও পাকি আশীর্বাদপুষ্ট জলপাই রঙা বাহিনী বারবার আমাদের ভাগ্যের শিকে ছিড়েছে। রাজনৈতিক দলকে জনগণের সামনে বিবস্ত্ররুপে উপস্থাপন করে বারবার ধোঁকা দিচ্ছে। আর এই তথাকথিত সুশীল ভদ্রলোকেরা সবসময় হাঁটুতে বুদ্ধিওয়ালা জলপাই বাহিনীর মগজে গোবররুপে স্থিত হয়েছে। ফলাফল যা হবার তাই হয়েছে। শেষরক্ষা কারো হয়নি।


আর এই শেষরক্ষা না হওয়ার পিছনে কারন হল ছাত্রনেতা, ছাত্ররাজনীতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও ছাত্ররাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে যারা জাতীয় নেতা হয়েছেন তাঁরাই। এই সুশীলদের সামনে শত্রু তাই ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররাজনীতি থাকলে দেশে দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতা তৈরী হবে, এটা তাঁরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনা।


বাস্তবতা হচ্ছে, কিছুকাল যাবত দেশে যেভাবে ছাত্ররাজনীতি চলছে এভাবে চলা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটা শুধু সুশীলদের কথা না, যারা একসময় ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁরা, এমনকি এদেশের আমজনতাও চায়, পরিবর্তন আসুক। সমস্যা তৈরি হয়েছে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে। মাথায় ব্যথা তাই বলে মাথা ফেলে দিলে চলবে না, চিকিৎসা করে সুস্থ করতে হবে।


ব্রিটিশ ভারতবর্ষে যখন ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তন হয় তখন যেভাবে সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মপরিচালনা করা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরে আগের সংগঠন যেমন প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে আবার জন্ম নেয়া নতুন সংগঠনও ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ মাইলফলক। রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতিগত শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাজপথেও এই সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। জিন্নার নেতৃত্বাধীন যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পকিস্তান স্বাধীন হলো, সেই মুসলিম লীগের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য বিরোধীদল হিসেবে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয় সমগ্র পাকিস্তানেই ছাত্ররাই প্রথম একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। তারপর ধীরে ধীরে অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে এবং কালের আবর্তে অনেকে হারিয়েও গেছে। যেমন ছাত্ররাজনীতি অনেক নেতা তৈরী করলেও সময়ের সাথে অনেকেই পথ চলেন নি বা পারেন নি।


প্রায় এক যুগ ছাত্ররাজনীতির একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছাত্ররাজনীতির কল্যানকর ও গৌরবের বিষয়গুলোর যেমন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি তেমনি ছাত্ররাজনীতির বিপথগামিতায় অনিশ্চিত বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের হতাশায় নিমজ্জিত হই। আর খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলেই মনে করি, ছাত্ররাজনীতির নীতিগত ও কর্মগত পরিবর্তন সময়ের দাবী। ব্যক্তি যদি বিকৃত রুচির পরিচায়ক হন, তাহলে সংগঠনের খুব বেশী কিছু করার নেই। তারপরও কিছু নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ করে রাখলে অনেকাংশেই সুফল আসে। যখন এদেশে ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তন হয়, তখন যেভাবে পরিচালিত হয়েছে এখনো সেভাবেই ঐতিহ্য ধরে রেখে পরিচালিত হতে হবে তার কোন যৌক্তিকতা নেই। বহমান হোক চেতনায় সমুজ্জল ঐতিহ্য, পরিচালনায় আসুক নতুনত্ব। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাববার। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহনযোগ্য হিসেবে ছাত্ররাজনীতিকে উপস্থাপন করার।


ইতিহাস বলে, ছাত্র সংগঠন শুরু থেকে অন্য কোন জাতীয় সংগঠনের অঙ্গসংগঠন ছিলনা। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমানবলে অঙ্গসংগঠন হতে বাধ্য করে। এর পরে বিগত ১/১১ এর পরবর্তী সরকার আবার জাতীয় সংগঠনকে নির্বাচন কমিশনের আইনের ছকে বেঁধে ছাত্রসংগঠনকে অঙ্গরূপে অস্বীকার করতে বাধ্য করে। যা এখনও বহাল আছে। এবং এই আইন বাতিলের প্রয়োজনীয়তা ছাত্রসংগঠনগুলো এখনো অনুভব করেনি। অথবা প্রয়োজন নেই।
‘৭১পূর্ববর্তী সময়ে পড়ালেখার চেয়ে জরুরী ছিল অস্ত্র চালনা শিক্ষা, দেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে জরুরী ছিল স্বাধীন দেশ অর্জন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জরুরী হয়েছে দেশ গঠন এবং সেজন্য উচ্চশিক্ষায় নিজেকে গড়া। আর এই নিজেকে গড়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তার প্রতিবাদ এবং সফলতা অর্জনই এখন ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত। কিন্তু যেহেতু আমাদের জাতীয় রাজনীতির চরিত্রে পরিবর্তন খুব ধীর গতির তাই ছাত্রসংগঠন এর ক্ষেত্রেও রাতারাতি পরিবর্তন অসম্ভব। তদুপরি নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার বিষয়টি ছাত্রসংগঠনের নিজেদেরকেই বুঝতে হবে ও সেইমতো কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এই সংগঠনটিই সবচেয়ে প্রাচীন। তাই এর পর যত ছাত্রসংগঠনের জন্ম হয়েছে কেউ স্বীকার না করলেও সত্যি যে, সকল সংগঠনই কোন না কোনভাবেই ছাত্রলীগকে অনুসরন করেছে। তাই অদুর ভবিষ্যতেও যাতে অন্যান্য সংগঠন ছাত্রলীগকে অনুসরন করে নিজেদের পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারে সেই ঐতিহাসিক ভুমিকায় ছাত্রলীগকেই অবতীর্ণ হতে হবে। নিকট অতীতে ছাত্রদের হাতে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নেতা নির্বাচনের জন্য ২৯ বছর বয়স নির্ধারিত করা হয়েছে। যা সকলের কাছেই গ্রহযোগ্যতা পেয়েছে। ইতিহাসে সাক্ষ্য দেয়, এই সংগঠনটি একসময় প্রতিবছরই সম্মেলনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করত এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলন করতে ব্যর্থ হলে আপনা আপনিই আগের কমিটি ভেঙ্গে যেত এবং যথাযথ গঠনতান্ত্রিক নিয়মে পূর্ব নির্ধারিত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কাছে সম্মেলন আয়োজনের জন্য সর্বময় দ্বায়িত্ব ন্যস্ত হতো। এমন নিয়মের কড়াকড়ি ফিরিয়ে আনা উচিত। বামধারার চর্চারত অনেক সংগঠনই নিয়মিত সম্মেলন করে।


কিন্তু যেহেতু তাঁদের ভাত্রিপ্রতিম মুরুব্বী সংগঠনগুলো এদেশে এখনো জনগণের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্ব পালনে যেতে পারেনি, সমালোচনার গন্ডীতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তাই তাঁদের কর্মকাণ্ডকে জনগন এখনও আপনরুপে গ্রহন করেনি এবং দৃশ্যমানও নয়। দেশে আরও একটি বৃহৎ ছাত্রসংগঠন রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজো পর্যন্ত তাঁদের একটি গঠনতন্ত্র তৈরী করতে পারেনি। যদিও তাঁদের ভাত্রিপ্রতিম সংগঠন বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় একাধিকবার অধিষ্ঠিত হয়েছে। ’৯০ এর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল প্রায় সকল সংগঠনের ভিতরে গ্রুপিং-দ্বন্ধ দারুনভাবে প্রকাশিত থাকায় ছাত্রদল ডাকসুতে জয়লাভ করে এবং স্বাভাবিকভাবেই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের সাথে মিলিত হয়ে আন্দোলনে অংশ নেয়। এছাড়া এই সংগঠনটি ছাত্ররাজনীতিকে কলংক ব্যতিরেকে অন্য কোন উপহার আদৌ দিতে পারেনি। তবে হ্যাঁ, কথা আসতে পারে যে, তাঁদের সংগঠনের নেতারাও এমপি, মন্ত্রী হচ্ছে, জনগন ভোট দেয়। কিন্তু এদেশের সচেতন মহল জানে, এমপি বা মন্ত্রী হলেই দেশপ্রেমিক গনমানুষের নেতা হওয়া যায় না। তাই পরিবর্তনের ধারায় ছাত্রলীগকেই অগ্রনী হিসেবে দেখতে এবং ভবিষ্যতের দেশ পরিচালনার ভার গ্রহন করার জন্য জাতীয় নেতা তৈরি করার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করতে ছাত্রলীগের যেকোন ভুমিকা জনগন সাধুবাদ জানাবে বলেই বিশ্বাস করি।


একসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল চিঠির মাধ্যমে রাস্তাঘাট ছিল দুর্গম এখন মুঠোফোন, ইন্টারনেট এবং রাস্তাঘাটও অনেক উন্নত। আগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ছিল অপ্রতুল এখন প্রতি থানা বা উপজেলায় একাধিকতো বটেই অনেক ইউনিয়নেও কলেজ স্থাপিত হয়েছে। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এবং অনেক পরেও আওয়ামীলীগ বা অন্য কোন সংগঠনের থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যক্রম ছিলনা। সেসময়ে ৬দফা, ’৭০ এর নির্বাচন, ’৬৯ এর ছাত্রগন অভ্যুথান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহনের উদ্দেশে জনগনকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে গ্রামে গঞ্জে সংগঠনের পরিধি বৃদ্ধি করতে হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রয়োজনই সফলতার মাধ্যমে তার বর্তমান চেহারা হারিয়ে নতুন প্রয়োজনরুপে দৃশ্যমান হয়। তেমনি সেসময় যেভাবে সংগঠনের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেগুলোর অনেকগুলোই সফলতার মাধ্যমে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে, কিন্তু বর্তমানে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।


এখন প্রতিটি ওয়ার্ড/ ইউনিয়নে মুরুব্বী সংগঠনের পাশাপাশি যুবসংগঠন, স্বেচ্ছাসেবকসংগঠন, কৃষকসংগঠন এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও শ্রমিকসংগঠনও তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। আরও রয়েছে নানারকম পরিষদ/ফোরাম ও সাংস্কৃতিকসংগঠন। এহেন পরিস্থিতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোকেও ভাবতে হবে ওয়ার্ড/ ইউনিয়ন/পৌরসভা/ থানা/ উপজেলা/ জেলা/ মহানগর প্রভৃতি শাখা থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। মোদ্দাকথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছাত্রসংগঠনের কোন শাখা থাকাটা বর্তমান সময়ে অযৌক্তিক। ছাত্ররাই যেহেতু ছাত্ররাজনীতি করবে ও নেতৃত্ব দিবে তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কারা নেতৃত্ব দিবে? সকলেইতো কোন না কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র তাহলে যে যেখানে পড়ালেখা করে সেখানেই নেতৃত্ব দিবে।


বর্তমান বাস্তবতায় উপলব্ধিগত বিষয় হলো, এখন যেহেতু দেশ গঠনই আমাদের সকলের প্রধানতম দ্বায়িত্ব, তাই ন্যুনতম ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। ক্লাস নাইন থেকে ‘রাজনীতি শিক্ষা’ নামক অবাধ্যতামুলক কোন শিক্ষাকার্যক্রম পাঠ্য করা যেতে পারে। তাতে করে আমাদের রাজনীতির মৌল বিষয়গুলো, ঘটনার অববাহিকায় ব্যক্তির ভুমিকা ও রাজনীতির আদর্শিক প্রয়োজনীয়তার মতো মৌলিক সত্যাসত্য উদ্ঘাটনে পাঠক ব্রতী হবে এবং নিজেই স্বিদ্ধান্ত নিতে পারবে।


এতে করে ছাত্রসংসদ চালু করা সম্ভব হবে। নতুন ছাত্রবান্ধব ছাত্রনেতা তৈরী হবে। জাতীয় সংগঠনের নেতারা ছাত্রসংগঠনে পকেটের কর্মীকে নেতা বানানোর জন্য অর্থলগ্নি করবেনা, সাবেক নেতারাও আশীর্বাদপুষ্টকে মদদ দিয়ে অন্যায় কর্মে লিপ্ত করবে না। টেন্ডারবাজিতে ছাত্রনেতা/ কর্মীদের ব্যবহার কমবে। টাকার বিনিময়ে পদ বেচাকেনার পথ রুদ্ধ হবে। নির্মম বাস্তবতা হলো, ছাত্রসংগঠনগুলো তাঁদের বিভিন্ন শাখা কমিটিগুলোকে কখনোই গ্রুপিং এ উসকে দেয় না, এধরনের কুকর্মে সেখানকার স্থানীয় মুরুব্বী সংগঠনের নেতারা ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে থাকেন। সোজা কথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কোন ছাত্র সংগঠন না থাকাই বাঞ্ছনীয়। এমনকি গঠনতন্ত্রের সংশোধনী এনে ছাত্র সংগঠনের কোন নেতা বা কর্মীর জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন প্রার্থীকে সমর্থন করে প্রচার প্রচারনায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা উচিত। যারা যে জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের ভাত্রিপ্রতিম তাঁরা মনোনয়ন নির্ধারিত হলেই কেবল নির্বাচনী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করার সাংগঠনিক বিধান থাকা বাঞ্ছনীয়।


এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দ্বায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মে ছাত্রসংগঠন যেহেতু কোন মুরুব্বী সংগঠনের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়। তাই যেকোন জাতীয় সংগঠন আদর্শিকভাবে তাঁদের অনুসারী ছাত্রসংগঠনের আইনগতভাবে অভিবাবক নয়। তাহলে ছাত্রসংগঠনের কি সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না? অবশ্যই থাকা উচিত। স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো কর্তৃপক্ষই দ্বায়ীত্বশীল অবিভাবক। কিন্তু সংগঠনের চরিত্র যখন জাতীয় রুপ ধারণ করবে তখন অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রনালয় অথবা ইউজিসি কেই দ্বায়িত্ব নিতে হবে। কারন ছাত্রসংগঠনগুলো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও তাঁদের সরকারের সাথে বিভিন্ন দাবীদাওয়া বা প্রয়োজন নিয়ে কথা বলবে।

তাছাড়াও সরকারে উচিত ছাত্ররাজনীতির কথা বলার সীমানা নির্ধারণ। এক্ষেত্রে হয়ত কণ্ঠ রোধের কথা উত্থাপিত হবে। তাহলে কী সবসময় দেশের বা বাইরের যেকোন বিষয়ে যখন তখন সভা-সমাবেশ করে নিজেদের ব্যস্ত রাখবে? মোটকথা এক্ষেত্রেও একটা যুতসই নির্দেশনা ছাত্রসংগঠনগুলোর নিজেদের যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য থাকা প্রয়োজন।


এদেশের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ও সচেতন মহল জানে, কারা কি উদ্দেশ্যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা কলুষিত করার পাঁয়তারা করছে। পূর্ব পাকিস্তান থাকাকালীন সময়ের আইয়ুবের মার্শাল ‘ল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে কিছুকাল আগের তত্বাবধায়কের আড়ালে বাস করা ভয়ংকর ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠন ও ছাত্ররাই সর্ব প্রথম আন্দোলন ও প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সেজন্য সুশীলের আড়ালে বাস করা একধরনের কুশীল ও মিডিয়ার অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুযোগে একশ্রেনীর মিডিয়াও চায়না এদেশে ছাত্ররাজনীতির অমসৃণ পিচঢালা পথ বেয়ে দেশপ্রেমিক জননেতা তৈরী হোক। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা মহাশয়রাও তাঁদের ভবিষ্যতে এমপি, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হওয়ার সুপ্ত বাসনার তাড়নায় তাঁরাও চায়না গনমানুষের ভাগ্য গড়ার যোগ্য কারিগর গড়ে উঠুক।


দুঃখজনক হলেও সত্যি, ’৯০ এর আগে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হতো। কিন্তু জনতার ভোট প্রদানের মাধ্যমে ফিরে আসা গণতন্ত্রের শুরু থেকেই সেটা অন্ধকার গুহায় স্থায়ীত্ব লাভ করেছে এক অদৃশ্য কারনে। যে দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল তাঁরা সেসময় ক্ষমতায়ন না হলে দল হিসেবে তাঁদের অস্তিত্ব এবং বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা আজ ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন উচ্চতায় দেখা যেত। সেই ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলটির অরাজনৈতিক আচরনের কারনে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এদেশে বেড়ে উঠতে পারেনি। অপরদিকে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রভৃতি পেশাজীবী এবং তাঁদের বিভিন্ন সংগঠন সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে।


আরো একটি সংস্থা যারা পাকিস্তান ঘরানায় এখনো এদেশের সকল কিছুতে বামহাত দিয়ে থাকে তাঁদেরও সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকে ছাত্ররাজনীতিকে ধ্বংস ও বিতর্কিত করার লক্ষ্যে। উপরোক্ত সকল অশুভ শক্তির এক অদৃশ্য বন্ধনে অভিনব কায়দায় চলছে ছাত্ররাজনীতিকে ধবংসের নীলনকশা। এবং তারই ধারাবাহিকতায় জনগণের ভাগ্য গড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত মূলধারার জাতীয় রাজনৈতিক দলেও সাবেক ছাত্রনেতাদের প্রভাব ক্রমশ অস্তমিত। এই দুরভিসন্ধির ফাঁদ থেকে দেশকে রক্ষা করার সময়োপযোগী স্বিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনগুলোকেই নিতে হবে।


ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আমাদের জাতীয় জীবনে ’৪৭ এর পর থেকে ছাত্রসংগঠনগুলোই কখনো অহিংস পদ্ধতিগত আন্দোলন-প্রতিবাদ আবার কখনো সশস্ত্র বিপ্লবী ভুমিকায় আবির্ভূত হয়ে জাতীয় রাজনীতিকে কখনো মত ও পথ দেখিয়েছে আবার কখনো নিজেরাই নেতৃত্ব দিয়ে নায়কোচিত বীরের সম্মানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন যা মূলত ’৪৮ থেকেই শুরু হয়েছিল এটার নেতৃত্বের পুরোভাগে ছাত্ররাই ছিল। ’৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতি যখন দ্বিধান্বিত ও অনৈক্যে স্থিত তখন ছাত্রসংগঠনগুলোই নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে জাতীয় রাজনীতিকে পথ দেখিয়েছে।


’৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ‘ল জারী করার পরেও ছাত্রসংগঠনগুলোই প্রথম প্রতিবাদ করেছিল। ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন নিজেদের জাতীয় প্রয়োজনে ছাত্রসংগঠনগুলোই নেতৃত্ব দিয়েছে। ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আওয়ামীলীগের মুসলিম লীগ পন্থীরা যখন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে পাশ মার্ক দেয়নি বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগ নেতাদের উপর আস্থা হারিয়ে ছাত্রসংগঠন তথা ছাত্রলীগকেই দেশব্যপী জনমত গড়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত সফলতার সহিত ছাত্রলীগ জনগণের আস্থা অর্জন করেছিল, যদিও বাম ছাত্রসংগঠনগুলো ৬ দফাকে সিআইএ/’র এর ষড়যন্ত্র বলে কুতসা রটালেও পরবর্তীতে ছাত্রসংগঠনগুলো ৬ দফার সমন্বয়ে তাঁদের ১১ দফা নিয়ে মাঠে নামে এবং যার ধারাবাহিকতায় ’৬৯ এর গনঅভ্যুথান ঘটে। যার পুরো নেতৃত্ব ছাত্রসংগঠনগুলোই দেয়। ’



এর নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতি যখন নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দ্বিধান্বিত তখনো ছাত্রসংগঠনগুলোই নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং সারাদেশব্যপী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রচার প্রচারনায় অংশ নিয়ে জয়লাভ নিশ্চিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি সর্বপ্রথম ছাত্রসংগঠনগুলোই গ্রহন করেছিল। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশেও ’৭৫ পরবর্তী সময়ে পাকি সামরিক কায়দায় রাজনীতিকে কলুষিত করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধেও ছাত্রসংগঠনগুলোই প্রথম প্রতিবাদ করে।


এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যখন মত ও পথের ভিন্নতায় বিভক্ত তখনো ছাত্রসংগঠনগুলোই একতাবদ্ধ হয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথকে ত্বরান্বিত করেছে। ছোট বড় অনেক সফলতা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিকট অতীতে ২০০৮ এর আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা তীব্র প্রতিবাদেও যখন এদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, মিডিয়া এমনকি অনেক রাজনৈতিক দলও উচ্চ কণ্ঠে কথা বলতে পারেন নি, তখন ছাত্রসংগঠনগুলোই সাধারন ছাত্রদের সাথে নিয়ে তথাকথিত সেনাসমর্থিত সরকারে ভিত কাঁপিয়ে দেয় যার ধারাবাহিকতায় আজ আবার গণতন্ত্র পুনর্বহাল হয়েছে।


যে ছাত্ররাজনীতির শত লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রক্তের আলপনায় এত উচ্চ সফলতার অতীত নির্মিত হয়েছে, সেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়া অথবা কলুষিত হওয়া জাতির জীবনে অভিশাপ স্বরুপ। আর সেজন্যই ছাত্র রাজনীতির সকল সফল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অনেক আদিপাঠ নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তাই ছাত্রলীগেরই দ্বায়িত্ব সময়ের সাথে নিজেদের যোগ্যতার পরিশীলিত প্রকাশে সুন্দর আগামী নির্মাণে এবং দেশের নেতৃত্বভার গ্রহনের উপযোগী নেতা তৈরি ও জাতিকে সকল ক্রান্তিকালে পথ দেখানোর ভুমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।


বর্তমানে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহন করে ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান অথবা ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেরাই সময়পোযোগী স্বিদ্ধান্ত গ্রহন করে দুষ্কৃতিকারী দের দুরভিসন্ধিমূলক দেশকে বিরাজনীতিকরনের অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে পারাই হবে সময়ের সাহসী প্রতিবাদ।
original post
read more

Wednesday, January 4, 2012

সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনো–আইনস্টাইন কি তবে ভুল ছিলেন?

by অভিজিৎ রায়

ea1945.jpg
১৯৪৫-এ সাগরতীরে আলবার্ট আইনস্টাইন

বিজ্ঞানে কোনো কিছুই স্থির নয়। সেজন্যই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে–এটিতে ভুল প্রমাণের সুযোগ থাকতে হবে, যেটাকে আমরা বলি ‘বাতিল-যোগ্যতা বা ফলসিফায়াবিলিটি। সোজা কথায়, ‘scientific theories must be falsifiable’, না হলে সেটি তত্ত্ব হয়ে ওঠে না[১]। নতুন নতুন পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের সাপেক্ষে বিজ্ঞানের পুরনো তত্ত্ব বাতিল কিংবা বদলে ফেলার দৃষ্টান্ত বিজ্ঞানে আছে বহু। পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের সাথে মেলেনি বলেই টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক তত্ত্ব বাতিল হয়ে গিয়েছিলো, কোপার্নিকাস আর গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণের ধাক্কায়। অতীতে ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব, ফ্লোগিস্টন তত্ত্ব, ইথার তত্ত্ব, ল্যামার্কের তত্ত্ব, প্যাঞ্জিয়াম তত্ত্ব, আলো চলাচলের জন্য নিউটনের কর্পাস্কুলার তত্ত্ব সবই একসময় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমরা পেরেছি পুরাতনকে বর্জন করে নতুন ‘আলোকেরই ঝর্নাধারায়’ নিজেদের সিক্ত করতে। সেজন্যই কিন্তু বিজ্ঞান ‘ডায়নামিক’, ধর্ম কিংবা ডগমার মত স্থবির কিছু নয়। বিজ্ঞানে কোনো কিছুই পাথরে খোদাই করে লেখা হয়নি, লেখা হয় না। বিজ্ঞানে ‘হিরো’ আছে, কিন্তু নেই কোনো প্রফেট বা পয়গম্বর। আর এই হিরোদের অবদান নিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হয় বিজ্ঞানের জগতে– তা তিনি নিউটনই হোন, ডারউইনই হোন কিংবা হোন না তিনি জগদ্বিখ্যাত প্রতিভা আলবার্ট আইনস্টাইন।

—————————————————————–
এখন আপনার বেগ যদি আলোর বেগকে অতিক্রম করে যায়, মানে আপনি আলোর চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণ করতে থাকলে নানা ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপার স্যাপার ঘটতে থাকবে। আপনার জন্য সময়ের চাকা সামনে না চলে পেছনের দিকে চলতে থাকবে, আপনার ভর অসীমতার স্তর পার হয়ে, হয়ে যাবে কাল্পনিক, এবং আপনার দৈর্ঘ্য হয়ে যাবে ঋণাত্মক।
—————————————————————-

কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানের কিছু কিছু তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ দিয়ে এতোটাই সমর্থিত হয়ে ওঠে যে, সেই তত্ত্বের উপর আস্থা প্রকাশ করে যান বিজ্ঞানীরা অনেকটাই নির্ভয়ে। এমনি একটি আস্থা ছিল আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে পাওয়া অনুসিদ্ধান্তগুলোকে ঘিরে। ১৯০৫ সালের পর থেকে একটি ব্যাপারে পদার্থবিদরা নিশ্চিত ছিলেন–আলোর গতি এক সেকেণ্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল (বা ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার), আর আলোর চেয়ে বেশি বেগে কোনো পদার্থের পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। আলোর চেয়ে বেশি বেগে কারো পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব না– এটি বিজ্ঞানীদের কাছে আস্থার প্রতীক; হয়ে উঠেছিলো অনেকটা আগামীকাল পূর্বদিকে সূর্য ওঠার মতোই ধ্রুব সত্য। অবশ্য এই ধরনের আস্থার কারণও সহজেই বোধগম্য। আমাদের আধুনিক টেকনোলজি– জিপিএস, ট্রানজিস্টর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সহ যে অবদানগুলোর প্রতি নির্ভয়ে অহর্নিশি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি–সেগুলো আইনস্টাইনের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই নির্মিত। তার চেয়েও বড় কথা সার্নের এই ফলাফলের আগে কোনো পরীক্ষালব্ধ ফলাফলই আইনস্টাইনের তত্ত্বকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি। আইনস্টাইন তার তত্ত্ব দেবার পর আক্ষরিক অর্থেই অন্ততঃ হাজার খানেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে তার তত্ত্বকে ঘিরে। প্রতিবারই এটি অতি সফলভাবে বাধা বিপত্তি আর সংশয়ের দেওয়ালকে অতিক্রম করতে পেরেছে[২]।

pic_1_cngs_layout_opera_experiment.jpg
ছবি ১– সার্ন এবং গ্রান সাসো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অপেরা প্রকল্পের রেখচিত্র (ছবির কৃতজ্ঞতা: T. Adam et al. OPERA collaboration, Measurement of the neutrino velocity with the OPERA detector in the CNGS beam, 22 September, 2011.)

আমাদের গাড়ির কিংবা আইফোনের জিপিএস সিস্টেমের কথাই ধরা যাক। এই জিপিএস সিস্টেমের বদৌলতে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান এমনকি কয়েক ফুটের পরিসীমায়ও আমরা এখন সূক্ষ্মভাবে বলে দিতে সক্ষম। অথচ জিপিএস ঠিকমতো কাজই করতো না যদি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা থেকে পাওয়া ‘সংশোধনীগুলো’ গোনায় না নেওয়া হত। আমাদের মতো আমজনতার কথা না হয় বাদ দেই, আমেরিকার পেন্টাগনের জেনারেলদেরও নাকি এখন পদার্থবিদদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত ‘আপেক্ষিকতার সবক’ নিতে হচ্ছে, কারণ শত্রুদের অবস্থান স্যাটেলাইট কিংবা জিপিএসের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার জন্য এ ছাড়া গতি নেই[৩]। তারা বুঝতে পেরেছেন বেগ বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর উপরে অবস্থিত জিপিএস-এর ঘড়ির সময় বদলে যায় খাপে খাপ মতো আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের গণনা অনুসরণ করে।

কাজেই আইনস্টাইনকে বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডল থেকে হটানো ‘মামার হাতের মোয়া’ টাইপের কোনো সহজ ব্যাপার নয়। তারপরেও, আইনস্টাইনকে ভুল প্রমাণ করার প্রচেষ্টা অতীতে বৈজ্ঞানিকভাবে যেমন হয়েছে, ঠিক তেমনি হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও। আইনস্টাইন আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রদান করার পর, ব্যাপারটা ‘মার্ক্সিজমের সাথে সংগতিপূর্ণ’ মনে না করায় ‘সোভিয়েত এনসাইক্লোপিডিয়া’ প্রকাশ করা হয় রিলেটিভিটিকে ‘নস্যাৎ’ করে। রাশিয়ার একজন বিখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক তার তখনকার লেখায় বলেছিলেন[৪]–‘‘Einstein’s theory of relativity cannot be considered accepted since it was not accepted by the proletariats’’. আবার অন্যদিকে নাৎসি জার্মানি থেকে আইনস্টাইনের সমালোচনা করে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছিলো ১৯৩০ সালে ‘একশ জন বিশেষজ্ঞের আপেক্ষিকতাকে অস্বীকার’ (100 Authorities Denounce Relativity) শিরোনামে। আইনস্টাইন সেটা জানতে পেরে বলেছিলেন, কোনো তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করতে একশ জন বিশেষজ্ঞের অভিমত’ লাগে না, কেবল একটিমাত্র পরীক্ষালব্ধ প্রমাণই কিন্তু যথেষ্ট[৫]।

বলা বাহুল্য, আইনস্টাইন কথিত এ ধরনের পরীক্ষালব্ধ প্রমাণের হদিস কখনোই পাওয়া যায়নি। উমম্ … যায়নি বললাম বটে, তবে সঠিকভাবে বললে বলা উচিৎ– যায়নি , কেবলমাত্র অতি সাম্প্রতিক সময়ের একটি পরীক্ষা ছাড়া। সুইজারল্যান্ডের জগদ্বিখ্যাত সার্ন ল্যাবে তাদের নিউট্রিনো উৎপাদক যন্ত্র দিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। এর মধ্যে একটি প্রজেক্টের নাম ছিল “অপেরা” [OPERA (Oscillating Project with Emulsion-tRacking Apparatus)]। সেই প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা সেখানে তাদের যন্ত্রের মাধ্যমে নিউট্রিনো (এগুলো এক অদ্ভুতুরে কণা যারা সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের বস্তুকেও অবলীলায় ভেদ করে যেতে পারে) প্রক্ষিপ্ত করছিলেন। এই প্রজেক্টের আরেকটি অংশ ছিল আবার ইটালিতে। সেখানে মাটির প্রায় ১৪০০ মিটার গভীরে গ্রান সাসো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বসে আরেকদল বিজ্ঞানী সার্ন থেকে ছুঁড়ে দেয়া নিউট্রিনো বিমগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টায় ছিলেন। প্রায় ৭৩০ কিলোমিটার (প্রায় ৪৫৪ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছুনো প্রায় ১৫০০০ নিউট্রিনোগুলোকে তাদের সংবেদনশীল ডিটেক্টর যন্ত্র দিয়ে মেপে দেখলেন সেগুলো আলোর চেয়ে তাড়াতাড়ি এসে পৌঁছুচ্ছে। কিন্তু কতটা তাড়াতাড়ি? সে প্রায় আলোর গতির তুলনায় ৬০ ন্যানো-সেকেন্ড মানে এক সেকেণ্ডের ৬০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ কম সময়ে।

হুঁ… এক সেকেন্ডের ৬০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ সময়! এটা একটা বিষয় হল? এই সময় কম লাগলো না বেশি লাগলো তা নিয়ে আমাদের মত ছা-পোষা মানুষদের হয়তো কিছু যায় আসে না, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীদের আক্ষরিক অর্থেই মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম হল এই খবরটা পেয়ে। কারণ খবরটা সত্য হলে, মানে কোনো কণা আলোর চেয়ে একচুল বেশি বেগে গেলে আইনস্টাইনের তত্ত্বের মূল ভিত্তিটাই ধ্বসে পড়ে! আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব অনুযায়ী, আপনার বেগ যত বাড়তে থাকবে, তত আপনার জন্য সময় ‘ধীরে’ চলবে, আপনার ভর বাড়তে থাকবে, আর দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত হতে থাকবে (বলা নিষ্প্রয়োজন যে, প্রতিটি অনুসিদ্ধান্তই কিন্তু ল্যাবে পরীক্ষা করে যাচাই করা হয়েছে)। এখন আপনার বেগ যদি আলোর বেগকে অতিক্রম করে যায়, মানে আপনি আলোর চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণ করতে থাকলে নানা ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপার স্যাপার ঘটতে থাকবে। আপনার জন্য সময়ের চাকা সামনে না চলে পেছনের দিকে চলতে থাকবে, আপনার ভর অসীমতার স্তর পার হয়ে, হয়ে যাবে কাল্পনিক, এবং আপনার দৈর্ঘ্য হয়ে যাবে ঋণাত্মক[৬]। সাদা চোখে এ ব্যাপারগুলো যুক্তি বহির্ভূত কেবল নয়, হাস্যকরও। সেজন্যই আইনস্টাইনের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছিল কোনো বস্তুকণার পক্ষেই আলোর গতিবেগকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

এই ফলাফলে সার্নের বিজ্ঞানীরা এতোটাই অবাক হয়েছিলেন যে, তারা প্রায় ছয় মাস ধরে বারবার নিজেদের পরীক্ষার ভুল বের করার চেষ্টা করেছেন। কেননা, তারা জানতেন যে, এই ফলাফল প্রকাশ পেলে অপদস্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু বার বার করে সবকিছু দেখে শুনেও কোনো ভুল না পেয়ে অবশেষে তাঁরা এই ফলাফল প্রকাশ করে দেন[৭], [৮]। কিন্তু তারা তাদের গবেষণাপত্রে এই ফলাফলের কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তাদের পাওয়া ফলাফল কেবল তারা সততার সাথে বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে পেশ করেছেন, এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের পরীক্ষাটি পুনর্বার করার আহবান জানিয়েছেন। তারা মনে করেছেন বিজ্ঞানীদের সমবেত প্রচেষ্টাই ভবিষ্যতে এই অস্বাভাবিকতার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে সমর্থ হবে। এ প্রসঙ্গে শোনা যাক প্রকল্পের সাথে যুক্ত প্রোফেসর এন্টনিয়ো এরিডিটাটোর বক্তব্য–


ইউটিউব ভিডিওতে এন্টনিয়ো এরিডিটাটোর বক্তব্য

সম্প্রতি সার্নের ২য় আরেকটি পরীক্ষাতেও একই ফলাফল পাওয়া গেছে[৯]। এই অবিশ্বাস্য ফলাফল প্রকাশের পর সাধারণ মিডিয়ায় তো বটেই এমনকি খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের মধ্যেও নানাদিক থেকে নানা রকম সাড়া পড়ে গেল সাথে সাথেই। কেউ কেউ মহা উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। কারণ এর মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন দ্বার উন্মোচনের আভাস মিললো, আর নতুন দ্বার উন্মোচন মানেই নতুন নতুন গবেষকদের জন্য নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির সম্ভাবনা। আরেকদল বিজ্ঞানীদের মধ্যে আবার বয়ে গেল ভয়ের শীতল স্রোত। কারণ গবেষণার ফলাফল সত্য হলে পুরো পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিটাই নতুন করে সাজাতে হবে। প্রতিটি পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লিখতে হবে। প্রতিটি পরীক্ষণ নতুন করে রি-ক্যালিব্রেট করতে হবে।

শুধু যন্ত্রপাতি নয়, পুরো মহাবিশ্বের চেহারাটাই যাবে আমূল বদলে। পৃথিবী থেকে নক্ষত্ররাজি আর নিহারিকার দূরত্ব থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের বয়স (যা আমরা ১৩.৭ বিলিয়ন বলে জানি) পর্যন্ত সব কিছুই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়বে। এমনকি মহাবিশ্বের প্রসারণ, মহা বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহবর সহ সবকিছুই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, করতে হবে পুনঃ পরীক্ষণ।

নানা সমস্যা হবে নিউক্লিয়-পদার্থবিদদের জন্যও, কারণ তাদের অর্জিত এতোদিনকার জ্ঞান হয়ে পড়বে অপাঙ্ক্তেয়। এখন একজন স্কুলের বাচ্চাও আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত সমীকরণটির কথা জানে –E=mc2। তারা জানে সামান্য পরিমাণ ভর থেকে কী বিপুল শক্তি আহরণ করা যায়। কারণ এখানে c বা আলোর বেগের বর্গ করলে যে বিশাল সংখ্যাটা পাওয়া যায় সেটার সাথেই প্রদত্ত ভরকে গুণ করতে হয়। এখন আলোর বেগ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে তবে, পুরো নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানই ঢেলে সাজাতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র, পারমাণবিক চিকিৎসা, রেডিও অ্যাকটিভ ডেটিং–সব কিছুই হয়ে যাবে প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণ নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরের মধ্যে ঘটা সকল রাসায়নিক বিক্রিয়াই মূলতঃ আইনস্টাইনের ভর শক্তির এই বিখ্যাত সমীকরণের উপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। এপ্রসঙ্গে বিখ্যাত পদার্থবিদ মিচিও কাকুর উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য[১০] –

‘ … এতকিছুও যদি আপনার কাছে খারাপ বলে না মনে হয়, তবে শুনে রাখুন–এর মানে দাঁড়াবে পদার্থবিজ্ঞানের মূলনীতিগুলোই সংকটাপন্ন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দুটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে– একটি হল আপেক্ষিকতা অন্যটি হল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কাজেই পদার্থবিজ্ঞানের অর্ধেকটাই নতুন ধারণা দিয়ে বদলাতে হবে। আমার নিজের ক্ষেত্র–স্ট্রিং তত্ত্বও এর ব্যতিক্রম নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজেরই সমস্ত তত্ত্বকে পরিসংশোধন করতে হবে, কেননা স্ট্রিং-তত্ত্ব একদম শুরু থেকেই আপেক্ষিকতার উপর নির্ভর করে রচিত।’

মিচিও কাকুর নিজস্ব অভিমত হল, সার্নের এই ফলাফল আসলে একটি ‘ফলস অ্যালার্ম’। এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিজ্ঞানীদের পরীক্ষার মধ্যে কোথাও না কোথাও কিছু ত্রুটি লুকিয়ে আছে, যা সাদা চোখে ধরা পড়ছে না। সামনের পরীক্ষায় পড়বে। একটি সেমিনারে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন তা হয়তো পাঠকদের আগ্রহ জাগাবে–


ইউটিউব ভিডিওতে মিচিও কাকুর বক্তব্য

একই ধরনের সংশয়ী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়েইনবার্গ, মার্টিন রিস এবং লরেন্স ক্রাউস সহ অনেক বিজ্ঞানীই। তাদের মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে[১১] (অনলাইনে তা পড়া যাবে এখান থেকে)। যেমন, অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস গবেষণার ফলাফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে খুব স্পষ্টভাবেই বলেন–

‘এটা আসলে লজ্জাজনক। কোনো পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো গবেষণা-নিবন্ধ দাখিল করা অযৌক্তিক কিছু নয়, কিন্তু এমন একটি ফলাফলের উপর প্রেস-কনফারেন্স করা –যেটা ভুল হবার সম্ভাবনাই আসলে বেশি, এমনকি পেপারটি কোথাও রেফার করার আগেই– খুবই দুর্ভাগ্যজনক–শুধু সার্নের জন্যই নয়, বিজ্ঞানের জন্যও। ভুল প্রমাণিত হলে সবাই তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। নিউট্রিনো পরীক্ষা এমনিতেই খুব কঠিন। বিভাজনের সীমায় নিয়মানুগ ত্রুটি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। অধিকন্তু, মনে হচ্ছে পরীক্ষাটি লোরেন্সের বিবর্তভেদমান (Lorentz invariance) কে লঙ্ঘন করে যা ‘হার্ট অব ফিজিক্স’ হিসেবে স্বীকৃত। কাজেই এই ফলাফলের প্রতি সংশয়বাদী হবার পেছনে যথেষ্ট কারণই আছে। সংশয়বাদী হবার পেছনে আর বড় একটি কারণ হচ্ছে ১৯৮৭ সালের সুপারনোভা (SN 1987A) থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের সাথে এর অসঙ্গতি…।’

লরেন্স ক্রাউস অবশ্য ভুল কিছু বলেননি। আলোর বেগের চাইতে বেশি বেগ সম্পন্ন মানে ‘সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনো’ দেখবার ব্যাপারটি এর আগেও মিডিয়ায় এসেছিল। যেমন, ১৯৮৭ আলে সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা দেখেন নিউট্রিনোগুলো আলোর তিন ঘণ্টা আগে পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে। আলোক কণার আগে এসে পৌঁছানোর কারণে পর্যবেক্ষকদের অনেকে এগুলোকে প্রাথমিকভাবে ‘সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনো’ মনে করলেও পরবর্তীকালে সেই দাবি যে ভুল তা বোঝা গেছে। কারণ সুপারনোভার কার্যপ্রণালী ভালোভাবে অধ্যয়ন করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, নিউট্রিনো প্রক্ষিপ্ত হয়েছিলো নক্ষত্রের অন্তঃস্থল বিধ্বস্ত হবার সাথে সাথেই। তার যাত্রাপথ শুরু হয়েছিলো আলোর কণা উদ্ভূত হবার তিন ঘণ্টা আগেই। যতক্ষণ না অভিঘাতী তরঙ্গ (shock wave) প্রত্যাঘাত করতে পেরেছিলো, ততক্ষণ আলোর কণা তৈরি হতে পারেনি। ‘সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনো’ হবার কারণে নয়, বরং আলোর কণা যাত্রা করার তিন ঘণ্টা আগে নিউট্রিনোগুলো যাত্রা করার কারণেই সেগুলো তিন ঘণ্টা আগে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিলো। আরও বড় ব্যাপার হল, যদি সার্নের এই ফলাফল সত্য হয়, তবে নিউট্রিনোর গতিবেগ আলোর চেয়ে প্রায় ৭.১৪গুণ বেশি। এই মান ধরে হিসেব করলে ১৯৮৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি তারিখে সুপারনোভা থেকে যে নিউট্রিনোগুলোর দেখা পাওয়া গেছে সেগুলো পৃথিবীতে আসার কথা ছিল তার থেকে চার বছর আগে[১২]। কিন্তু এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। চার বছর আগে (মানে ১৯৮২ সালের শেষ দিক থেকে শুরু করে ১৯৮৩ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত) কোনো নিউট্রিনোই পাওয়া যায়নি।

অসঙ্গতি আছে আরও অনেক ক্ষেত্রেই। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী সেলডন গ্ল্যাশো এবং অ্যান্ড্রু কোহেন তাদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে নিউট্রিনো ভ্রমণ করলে ‘চেরেনকভ এফেক্ট’ (vacuum Cherenkov effects)-এর কারণে সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনোগুলো ইলেকট্রন এবং পজিট্রন বিকিরণ করে শক্তি ক্ষয় করে ফেলার কথা। কিন্তু এমন কোনো কিছুই সার্নের ফলাফলে পাওয়া যায়নি[১৩]। এই ব্যাপারটি সার্নের ফলাফলের প্রতি একটি শক্তিশালী চ্যালেন্জ্ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারপরেও কোনো কোনো তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী আবার এই ঘটনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির করতে প্রয়াসী হয়েছেন। যেমন, লন্ডনের কিংস কলেজের পদার্থবিদ গিয়াকোমো ক্যাক্কিয়াপাগ্লিয়া ধারণা করেন, নিউট্রিনোগুলো স্ট্রিং তত্ত্ব বর্ণিত অতিরিক্ত মাত্রার ফোঁকর গলে ডিটেক্টরে পৌঁছেছে, সেজন্যই সম্ভবতঃ নিউট্রিনোগুলোর কোনো শক্তি-ক্ষয় ঘটেনি[১৪]।

কিন্তু এই সব অতিরিক্ত মাত্রা ফাত্রা এনে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস দেখে অন্য বিজ্ঞানীরা আবার ভুরু কুঁচকেছেন। বিজ্ঞানী এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক প্রয়াত কার্ল স্যাগান প্রায়ই বলতেন, ভং চং করলে হবে না– ‘অসাধারণ দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য অসাধারণ প্রমাণ লাগবে।’ অতিরিক্ত মাত্রার ফোঁকর গলে ডিটেক্টরে পৌঁছেছে বললেই তো হল না, এর পেছনে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে কই? বলা বাহুল্য, এমন কোনো প্রমাণই কিন্তু পাওয়া যায়নি। তাই অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের সন্দেহের তীর এখনো মূলতঃ সার্নের পরীক্ষায় পাওয়া অস্বাভাবিক ফলাফলের দিকেই। আর পরীক্ষায় অসতর্কতার কারণে ভুল সিদ্ধান্তে যাওয়ার উদাহরণ কিন্তু আমাদের অল্প হলেও আছে। যেমন, ১৯৬০ সালে একদল পদার্থবিদ আলোক রশ্মির উপর মাধ্যাকর্ষণের ছোট খাট প্রভাব পরিমাপ করতে বসেছিলেন। তাদের একটি পরীক্ষার ফলাফলে পাওয়া গেল যে, আলোর বেগ পরিবর্তনশীল–দিন আর রাতে ওঠানামা করে! অনুসন্ধান করে দেখা গেলো তাদের পরীক্ষণ-যন্ত্র যেহেতু ল্যাবের বাইরে স্থাপন করা হয়েছিলো, এর সেন্সর দিনের আলো এবং আনুষঙ্গিক তাপমাত্রা দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলো, তাই এই অস্বাভাবিক ফল। সার্নের পরীক্ষাতেও এই ধরনের অসতর্ক ভুল লুকিয়ে থাকতে পারে। সেটার সম্ভাবনাই বেশি।

জানা গেছে শিকাগোর বাইরে ফার্মি ল্যাবের বিজ্ঞানীরাও সার্ন–গ্রান সাসো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এই ‘অপেরা পরীক্ষা’টি পুনরায় নিজেরা করবেন। এর ফলাফলও আমরা জানবো শিগগিরই। এভাবে আরও কয়েক দফা পুনঃ পরীক্ষণ চলবে, চলবে ক্রস-চেকিং। বিজ্ঞান এভাবেই কাজ করে। কিন্তু আসলেই যদি সার্নের এই ‘অপেরা পরীক্ষায়’ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো ভুল না পাওয়া যায়? অর্থাৎ, সার্নের ফলাফল যদি সত্য হিসেবে বেরিয়ে আসে, তবে? তাহলেই যে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে তা নয়, অন্ততঃ অনেক বিজ্ঞানীই তা মনে করেন না। পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ভিক্টর স্টেঙ্গর সম্প্রতি একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাখ্যা হাজির করেছেন–আইনস্টাইনের তত্ত্ব লঙ্ঘন না করেই কীভাবে পুরো ব্যাপারটির একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব। ভিক্টর স্টেঙ্গর সংশয়বাদী পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে সুবিদিত এবং সম্প্রতি গড দ্য ফেইল্ড হাইপোথিসিস সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় বইয়ের প্রণেতা। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে অধ্যাপক স্টেঙ্গর নিউট্রিনো নিয়ে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে একাডেমিয়ায় কাজ করেছেন। কাজেই সার্নের এই নিউট্রিনো পরীক্ষার ব্যাপারে তার অভিমত অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে। এ বিষয়ে ভিক্টর স্টেঙ্গর যে প্রবন্ধটি লিখেছেন তা থেকে আমি দু চার কথা আলোচনায় আনব। তার প্রবন্ধটি হাফিংটন পোস্টের ব্লগে দেওয়া হয়েছে দুই ভাগে–প্রথম পর্বটি আছে এখানে এবং দ্বিতীয়টি এখানে। অন্য অনেক বিজ্ঞানীদের মতো ভিক্টর স্টেঙ্গরও মনে করেন, সার্নের এই পরীক্ষার মধ্যে কোথাও না কোথাও ঘাপলা আছে, এবং তা হয়ত সামনে বেরিয়ে আসবে, সেজন্যই তিনি প্রবন্ধটির প্রথমেই বলে নিয়েছেন–

‘পৃথিবী থেকে ১৬৮, ০০০ আলোকবর্ষ দূরে এক জায়গায় এক সুপারনোভা বিস্ফোরণের কথা আমরা জানি। এটাকে প্রথম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিলো ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দৃশ্যমান আলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর তিন ঘণ্টা আগে বেশ কিছু সংখ্যক নিউট্রিনোর পৃথিবীতে পৌঁছুনোর ব্যাপারটি শনাক্ত করা হয়েছিল তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভূ-গর্ভস্থ ডিটেক্টরের সাহায্যে। সার্নের এই পরীক্ষার ফলাফল যদি সঠিক হয় তবে তাদের আসা উচিৎ ছিল ১৯৮২ সালে। কাজেই আমি যদি বাজি খেলতাম, তবে বলতাম এই প্রভাব একটা সময় পর চলে যেতে বাধ্য, কারণ এমন এক ভুল পরীক্ষাটির ভিতর লুকিয়ে আছে যা এখনো কারো চোখে পড়েনি।’

ভিক্টর স্টেঙ্গর তার প্রবন্ধটিতে আরো যা বলেছেন তা হল, আইনস্টাইনের তত্ত্ব আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলমান কণার অস্তিত্ব কখনোই বাতিল করে দেয় না, বরং তাদের জন্যও এক ধরনের সীমা বেঁধে দেয় যে, তারা কখনোই আলোর সমান বা তার চেয়ে কম বেগে চলতে পারবে না। তাদের চলতে হবে আলোর চেয়ে বেশি বেগে সব সময়ই (অনেকটা নিচের ছবির মতো)। এধরনের কণার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব আবিষ্কৃত না হলেও গণিতের মাধ্যমে এ কণাকে প্রকাশ করা হয়েছে অনেক আগেই। এদের আমরা ট্যাকিয়ন নামে চিনি।

pic_2_tachyon.jpg
ছবি ২– আইনস্টাইনের তত্ত্ব আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলমান কণার অস্তিত্ব কখনোই বাতিল করে দেয় না, কেবল একটি সীমা বেঁধে দেয়। সেজন্যই ট্যাকিয়ন কণাকে বাস্তবে না পাওয়া গেলেও গণিতের মাধ্যমে এ কণাকে প্রকাশ করা হয়েছে অনেক আগেই (ছবির কৃতজ্ঞতা: Faster than the light: Philosophical and Theological Implication, Victor Stenger)।

ভিক্টর স্টেঙ্গরের অভিমত অনুযায়ী, আলোর চেয়ে গতিসম্পন্ন কণার বাস্তব অস্তিত্ব থাকলে তা কার্য-কারণ বা ‘Cause and Effect’-এর উপর প্রভাব ফেলবে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার উপর নয়[১৫]। কার্য কারণের ব্যাপারটি আমাদের কাছে এতটাই স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে হয় যে, আমরা এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করি না। ভাবি যে, ব্যাপারটা হয়তো সব সময়ের জন্যই কিংবা সর্বত্রই একই রকমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যাপারটা তো তা নাও হতে পারে।

‘ব্যাপারটা যে সেরকম নাও হতে পারে’– মানে, আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলোই সবসময় স্বতঃসিদ্ধ নাও হতে পারে–ঠিক এই অভিমতটাই প্রায় একশ বছর আগে যৌক্তিকভাবে উত্থাপন করেছিলেন দার্শনিক ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬)। আমাদের অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে কোনো একটি ঘটনা ঘটার পূর্বে আরেকটি ঘটনা ঘটলে, তার মানে সব সময় এই নয় যে, প্রথম ঘটনাটি দ্বিতীয় ঘটনার কারণ। অন্ততঃ সবক্ষেত্রে তা নয়।

রসায়নের জগতে আমরা এমন অনেক বিক্রিয়ার সাথেই পরিচিত যে বিক্রিয়াগুলোকে সামনে থেকে পেছনে চালানো যায়, কিংবা পেছন থেকে সামনে। দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা থেকে কোনটা ঘটছে। আমরা সেগুলোকে অভিহিত করি পরাবর্তী (Reversible) বিক্রিয়া বলে। যেমন, কার্বন পরমাণু আর অক্সিজেন অণু বিক্রিয়া করে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড এবং শক্তি পাই। উল্টোভাবে কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে শক্তি যোগ করেও আমরা কার্বন পরমাণু এবং অক্সিজেন অণু পেতে পারি।

pic_3_chemistry_reaction.jpg
ছবি ৩– রসায়নের জগতে আমরা এমন অনেক বিক্রিয়ার সাথেই পরিচিত যে বিক্রিয়াগুলোকে সামনে থেকে পেছনে চালানো যায়, কিংবা পেছন থেকে সামনে (ছবির কৃতজ্ঞতা: Faster than the light: Philosophical and Theological Implication, Victor Stenger)।

এ ধরনের ব্যাপার শুধু রসায়নেই নয়, পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সত্য হতে পারে। যেমন, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যান একবার বলেছিলেন, কোনো এন্টি-ইলেকট্রন কণিকার (পজিট্রন) সময়ের সাথে সাথে সামনে অগ্রসর হওয়া আর কোনো ইলেকট্রনের সময়ের বিপরীত দিকে চলার মাঝে কারো পক্ষে পার্থক্য করা অসম্ভব ব্যাপারই হবে।

pic_4_cause_a_or_b.jpg
ছবি ৪– অধ্যাপক ভিক্টর স্টেঙ্গরের অভিমত অনুযায়ী, আলোর চেয়ে গতিসম্পন্ন কণার বাস্তব অস্তিত্ব থাকলে তা কার্য-কারণ বা ‘Cause and Effect’ এর উপর প্রভাব ফেলবে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার উপর নয় (ছবির কৃতজ্ঞতা: Faster than the light: Philosophical and Theological Implication, Victor Stenger)।

এবারে মূল বিষয়ে আসা যাক। ধরা যাক উপরের ছবিতে কোনো পার্থিব বস্তু কণা পয়েন্ট A থেকে পয়েন্ট B-এর দিকে যাচ্ছে। যাত্রাপথটিকে লাল দিয়ে দেখানো হয়েছে। আর ট্যাকিয়নের গতিপথকে দেখানো হয়েছে সবুজ দিয়ে। লাল দাগের বাঁ দিকে ট্যাকিয়ন যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ সে বস্তুটিকে A থেকে B এর দিকে যেতে থাকবে সত্যি, কিন্তু ওই লাল দাগকে অতিক্রম করে গেলে ট্যাকিয়ন বস্তুকণাটিকে উলটো দিকে যেতে দেখবে, অর্থাৎ এর যাত্রাপথ তখন তার চোখে হবে–B থেকে A এর দিকে। আমি বিস্তৃত ব্যাখ্যায় এখানে যাচ্ছি না, পাঠকেরা ব্যাখ্যা পেতে চাইলে সরাসরি অধ্যাপক স্টেঙ্গরের প্রবন্ধের ২য় পর্বটি পড়ে নিতে পারেন[১৬]। কাজেই কার্যকারণ কিংবা আদি কারণের ব্যাপারগুলো (অন্ততঃ ট্যাকিয়নের কাছে) আর সেভাবে সত্য থাকছে না।

অবশ্য কার্যকারণকে প্রশ্নবিদ্ধ না করেও সুপারলুমিন্যাল নিউট্রিনোর অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সেটা করেছেন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী শন ক্যারল তার একটি ব্লগ-প্রবন্ধে[১৭]। তিনিও সার্নের এই ফলাফলে সংশয় প্রকাশ করেছেন, কারণ সার্নের ফলাফল সত্য হলে Supernova 1987A তে দেখতে পাওয়া নিউট্রিনোগুলো বছর খানেক আগেই দেখতে পাবার কথা ছিল। তবে একটি প্রয়োজনীয় ব্যাপার তিনি উল্লেখ করেছেন SN 87A এর ক্ষেত্রে নিউট্রিনোগুলো ছিল ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউয়ন নিউট্রিনো নয়, ফলে তাদের শক্তিস্তর তুলনামূলক-ভাবে অনেক কম ছিল। আর যদি সার্নের পরীক্ষার ফলাফল সত্য হয়, তবে সেটকেও বিজ্ঞানের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব কিছু হবে না। ইতোমধ্যেই কীভাবে লোরেন্স ইনভ্যারিয়েন্স লঙ্ঘন করে নিউট্রিনো আলোর বেগের পরিসীমা অতিক্রম করতে পারে, তা নিয়ে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পেপার প্রকাশিত হয়েছে[১৮], আরও বেশ কিছু রিভিউ পেপার ইতোমধ্যেই জমা পড়েছে[১৯]। উইকিতেও এ নিয়ে আলাদা পাতা আছে।

যাহোক, সার্ন এবং গ্রান সাসো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অপেরা প্রকল্প নতুনভাবে বিজ্ঞানের অমিত শক্তিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। এটা বোধ হয় বলে দেওয়ার দরকার নেই যে, বিজ্ঞানে তত্ত্বের ভাঙাচোরা চলে নিয়ত, হয় পুরনো তত্ত্বের পতন, কিংবা নতুন তত্ত্বের উত্থান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়মাল্য যায় বিজ্ঞানের গলাতেই। বিজ্ঞানে কোনো কিছুই পাথরে খোদাই করে লেখা নয়। বরং বিজ্ঞান নির্দয়ভাবে সংশয়ের তীর হানতে থাকে সর্বক্ষণ তা যে রথী মহারথীর তত্ত্বই হোক না কেন। বিজ্ঞানের এই সংশয়, এই পরিবর্তনশীলতাই বিজ্ঞানের এগিয়ে চলার শক্তি। অনেকেই সেটার মর্ম না বুঝে একে ধর্মবিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের মতোই এক ধরনের বিশ্বাস বলে মনে করেন। এটি সত্য নয়। গার্ডিয়ান পত্রিকায় ২৮ শে সেপ্টেম্বর একটি ব্যতিক্রমী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘Faster than light story highlights the difference between science and religion’ শিরোনামে। সেখানে লেখক স্পষ্ট করেছেন, বিজ্ঞান কখনোই কোনো কিছুকে ‘বিশ্বাস’ করে বসে থাকে না, বরং পুনঃ পুনঃ পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত ‘জ্ঞান’-এর আলোয় নিজেকে আলোকিত করে এগিয়ে যেতে চায়। বিজ্ঞান স্থবির নয়, প্রগতিশীল। আজ আইনস্টাইনের তত্ত্বের ভুল পাওয়া গেলে সেই তত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হতে সময় লাগবে না। প্রাচীন কালের কোনো পয়গম্বরের কিংবা দেবদূতের বাণীর মতো আঁকড়ে ধরে ফুল চন্দন যোগে পুজো চলতে থাকবে না নিঃসন্দেহে। বিজ্ঞানে ‘পবিত্র তত্ত্ব’ বলে কিছু নেই। এখনে ‘একশ জন বিশেষজ্ঞের’ অভিমতের মূল্য নগণ্য। বরং নিগূঢ় এবং নির্ভুল পরীক্ষণ, এবং সেই পরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল, যা আবার অন্যদের দ্বারা পুনঃ-পরীক্ষিত এবং সমর্থিত হবে–সেটাই ‘বিজ্ঞানের রায়’ বলে বিবেচিত। তাই আমাদের আস্থা থাকবে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রক্রিয়ার প্রতি, সেখান থেকে পাওয়া নির্মোহ রায়ের উপরেই।

original post
read more

হরমুজ প্রনালী কি এবং কেন গুরুত্বপুর্ন

by অনিক আহসান

দক্ষিন পশ্চিম এশিয়ার পারস্য উপসাগরীয় এলাকা সব সময়ই ভু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারনে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাস্ট্র ও কর্পোরেট বানিজ্য সংস্থাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন ।ঐ অঞ্চলের তেল বানিজ্যের উপর সমগ্র বিশ্বের ধনী গরিব নির্বিশেষে দেশগুলির ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। যার কারনে মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলি দীর্ঘ দিন থেকে ঐ অঞ্চলের তাদের নৌ বিমান ও উভচর বাহিনীগুলিকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পড় থেকে বিভিন্ন নামে মোতায়েন করে রেখেছে। এই অঞ্চলের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৫ সালের ১ জুলাই মার্কিন ন্যাভাল কমান্ড প্রায় ৪৮ বছর পরে তাদের ৫ম নৌবহরকে পুনরায় সক্রিয় করে।এর ঘাঁটি বাহারাইনের মানামা বন্দর।

(ছবিঃ বিশ্বে মার্কিন নৌ বহরের অবস্থান সমুহ)


পারস্য উপসাগর,লোহিত সাগর এবং আরব সাগরে মার্কিন সামরিক ও ভু কৌশলগত উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই নৌ বহরের কাজ।
আর সমগ্র পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন জল পরিবহন রুটের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রনালী।

কি এই হরমুজ প্রনালীঃ





ঐতিহাসিকদের মতে এর নামকরন পার্সী শব্দ “ওরমুজ” থেকে আগত।যার অর্থ খেজুর বিথী।স্থানীয় ভাবে একে অনেকের মতে প্রাচীন পারস্যের প্রধান দেবতা আহুর-মাজাদা আর এক নাম হরমজ সাথে এর নাম করনের মিল রয়েছে।

যে ৬০০ কিমি সাগরের জল পারস্য ও আরব উপদ্বীপকে বিভক্ত করেছে তার সবচেয়ে সঙ্কীর্ন অংশটির নাম হরমুজ প্রনালী। এইটি একটি সরু চ্যানেল বা প্রনালী যা পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরে হয়ে বহিবিশ্বে জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহার হয়। এইটি সার্বিক ভাবে ৫৪ কিলোমিটার আর সবচেয়ে সরু অংশ ২ কিমি প্রশস্ত।এর একপ্রান্তে ইরানের দক্ষিন পশ্চিম উপকুল বন্দর আব্বাস অন্যপাশে ওমান,আরব আমিরাত, সৌদি,আরব।


সামরিক পরিভাষায় এ ধরনে ভুখন্ড বা জল খন্ডকে চোক পয়েন্ট” বলে।এরকম চোক পয়েন্টের সুবিধা নিয়েই উইলিয়াম ওয়ালেস ইংরেজদের বিরুদ্ধে আর গ্রীকরা পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করেছিলো।একটি চোক পয়েন্টের অবস্থাঙ্গত সুবিধার কারনে দুর্বল আর অল্পসংখ্যক শক্তি দিয়ে বিশাল কোন বাহিনীকে রুখে দেয়া যায়।দুই পাহারের মধ্যবর্তি সরু ভুখন্ডকে যেমন উপত্যাকা বলে স্ট্রেইট হল সেইরকম একটা অঞ্চল যা কেবল ভুখন্ডের বদলে পানিতে অবস্থান করে।

সহজ ভাষায় পারস্য উপসাগরের উপকুলের কোন দেশ থেকে বানিজ্যিক বা পরিবহন বা তেলবাহি কোন জাহাজ চালিয়ে বহির্বিশ্বে যেতে হলে হারমুজ প্রনালী ব্যাভার করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।




কেন এই হরমুজ প্রনালী এতো গুরুত্বপুর্ন?

বিশ্বের ব্যবসা বানিজ্য ও পরিবহনের একটা বিশাল অংশ এখনো জলপথে পরিচালিত হয়ে থাকে।পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির নৌ পথে আমদানি রপ্তানী বৈদেশিক বানিজ্য এই হরমুজ প্রনালীর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এই প্রনালী দিয়ে দিনে ১৪ টি তেল বাহি সুপার ত্যাংকার ১৫.৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাতায়ত করতে পারে। যার কারনে ভু কৌশল গত কারনে এই হরমুজ প্রনালীর নিয়ন্ত্রন অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন।বিশ্বের মোট তেল বানিজ্যের ৪০% ভাগ তেল এই হরমুজ প্রনালী দিয়ে বাহিত হয়। বাহারাইন,ইরাক,কুয়েত,কাতার,সৌদি আরব,ইউএই ও ইরান মিলে বিশ্বের ৩০% এর বেশি তেল পাদন করে। এবং বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের ৫৭ % মজুদ (৭১৫ বিবি) এইদেশগুলিতে রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলে বিশ্বের ৪৫% গ্যাসেরমজুদ রয়েছে।




এই এলাকায় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানী গুলির সিংহভাগ শেয়ার মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলির হয়ায় ঐসব দেশের অর্থনীতি কোন না কোন ভাবে ঐ তেল উত্তলন ও বিপননের সাথে জড়িত।
বিশাল বিশাল সুপার ত্যাংকার গুলির কোনটা তেল নিইয়ে পুর্ব দিকে জাপান চীন ভারত এবং পশ্চিম দিকে ইয়েমেনের উপকুল ধরে লোহিত সাগর ও সুয়েজ পখাল হয়ে ইউপরে যাত্রা করে। আর এই এলাকায় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানী গুলির সিংহভাগ শেয়ার মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলির হয়ায় ঐসব দেশের অর্থনীতি কোন না কোন ভাবে ঐ তেল উত্তলন ও বিপননের সাথে জড়িত।
একমাত্র বিকল্প হিসাবে সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে পুর্ব থেকে পশ্চিম দিকে আড়াআরি ভাবে হাজার কিমি পাইপ লাইন টেনে লোহিত সাগর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যা ব্য্যবহুল ও অনেক সময় সাপেক্ষ।
হরমুজ প্রনালীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইরাকের সাথে ইরানের দীর্ঘ সমস্যা ছিলো।১৯৮৮ সালের ১৪ এপ্রিল ইরানি মাইনের আঘাতে একটি মার্কিন ফ্রীগেট ডুবে গেলে ১৮ এপ্রিল ইরাকী আর কুয়েতি তেল পরিবহন নিরাপদ রাখাকে কেন্দ্র করে মার্কিন-ইরান একদিনের সংক্ষিপ্ত নৌ যুদ্ধ হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই মার্কিনীরা একটি ইরানী পরিবন বিমান ভুপাতিত করে।

ইরানি নৌ মহড়ার কিছু ছবি
















original post
read more

Tuesday, December 6, 2011

THE HARRY POTTER SERIES-কি আছে এতে?জানতে চাইলে পড়তে পারেন।

by সুব্রত ৪৩৯

আমরা জানি যে পৃথিবীতে ফিকশন নামের একটি বিশেষ ধরনের সাহিত্য রয়েছে।এই ফিকশন বা কল্পকাহিনী আমাদের সবার কাছে হয়তো সমানভাবে গ্রহনযোগ্যতা পায় না,তাছাড়া অনেকেরই এটি নিয়ে মিশ্র মতামত রয়েছে।অন্যান্য ধরনের উপন্যাস বা গল্পে শুধুমাত্র চরিত্র ও প্লট নিয়ে চিন্তা করলেই চলে কিন্তু ফিকশনে এগুলোর বাইরেও একটা ভিন্নজগত্‍ তৈরী করতে হয়।শুধুমাত্র কাগজ আর কলম দিয়ে একটি ভিন্ন জগত্‍ তৈরী করে এর মধ্যে প্রান সন্ঞ্চার করা কোনমতেই সহজ কাজ হতে পারে না।এরকম একটি বিশ্বখ্যাত সাহিত্য হল HARRY POTTER সিরিজ।হ্যাঁ,এর স্রষ্টা জে.কে.রাউলিং পাঠকদেরকে শুধুমাত্র একটি ভিন্ন জগত্‍ই উপহার দেননি,দিয়েছেন এতে বাস্তবতার কঠোর সত্যকেও,ভালোবাসার বন্ধনটাও এতে বিশেষভাবে বর্ননা করা হয়েছে।শুরুতেই হ্যারী পটার নিয়ে দুইটি ভুল ধারনা ভাঙিয়ে দিই,প্রথমটি হলো হ্যারী পটার কখোনই শুধুমাত্র বাচ্চাদের বই নয়।বরং এটি এরকম একটি উপন্যাস যেটা বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও পড়তে পারে।আর হ্যারী পটারকে যারা অবস্তাব বলে দূরে ঠেলে দেয় তাদেরকে বলছি-হ্যারী পটার অবস্তাব নয় বরং বাস্তবতার চাইতে বেশি কিছু যা আমাদের মনোজগতের সুগভীর স্থানে ঘোরাফেরা করে।হ্যারী পটার সিরিজের কাহিনীটা হয়তো অনেকেরই জানা আর যাদের জানা নেই তারা উইকিপিডিয়া থেকে জেনে আসতে পারেন,তাই এখানে আর উল্লেখ করছি না।হ্যারী পটার সিরিজে মোট সাতটি খন্ড রয়েছে যার প্রত্যেকটিতে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক কাহিনী এবং গোটা সিরিজটিরও একটি মূল কাহিনী ও কতগুলো উপ কাহিনী রয়েছে।আর মূলকাহিনীর সাথে খন্ডগুলোর মৌলিক কাহিনীগুলোর সম্পর্কস্থাপনের জায়গায়টিতেই রাউলিং তার মেধার সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছেন।প্রত্যেকটি খন্ডেরই একটি প্রত্যক্ষ সমাপ্তি রয়েছে কিন্তু পরোক্ষভাবে কাহিনীর গভীর একটা টান থেকে যায়,যা কিনা পরবর্তী খন্ডটা পড়ার জন্য পাঠকের চরম কৌতূহল সৃষ্টি করে।এমন যাদুকরী ক্ষমতা পৃথিবীর কয়টা বইয়ের রয়েছে?পৃথিবীর কোটি কোটি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মতো কঠিন কাজটি অতি সহজেই করে দেখিয়েছেন রাউলিং।তাও আবার কোন প্রকার যৌনতা ছাড়াই,যা কিনা অনেক লেখক তার বইকে বেষ্টসেলার করার জন্য ব্যাবহার করে,যেমন ধরতে পারেন TWILIGHT সিরিজ।আমি কখোনই রোমন্স কিংবা যৌনতাকে খারাপ চোখে দেখি না কারন মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে এগুলো অন্যতম। কিন্তু কিশোর কিংবা তরুনদের কাছে টানার জন্য এর থেকে ভালো ঔষধ বোধহয় আর পৃথিবীতে নেই।কিন্তু রাউলিং এসব কিছুর ধার না ধরেই প্রচুর টিনেজার পাঠক পেয়েছেন।যারা কি না এখন আধুনিক প্রযুক্তির কারনে বইয়ের কাছে পর্যন্ত যায় না।হ্যারী পটারে কেবলমাত্র কল্পদুনিয়াটকে নিয়েই আলোচনা করা হয়নি,এর পাশাপাশি বাস্তব দুনিয়ার সাথে এর সম্পর্ক বর্ননা করা হয়েছে।তাছাড়া হ্যারী পটারকে একটি পূর্নাঙ্গ সামাজিক উপন্যাস বললেও ভুল হবে না।রাউলিং তার শক্তিশালী চরিত্রগুলো মাধ্যমে বর্নবাদের প্রতিবাদ করেছেন।তবে একটু ভিন্ন ভাবে,তিনি সরাসরি কালো সাদার বিরোধটি ফুটিয়ে তুলেননি।তিনি তার উইজার্ড জগতের বর্নবাদ অর্থ্যাত্‍ ব্লাড স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বাস্তব জগতের বর্নবাদকে ফুটিয়ে তুলেছেন।তাছাড়া বন্ধুত্ব,ভালোবাসা,সহমর্মিতা,সহযোগিতা,ঘৃনা,ভয়,লজ্জা,হিংসা,মৃত্যুকে হ্যারী পটার সিরিজে গভীরভাবে বর্ননা করা হয়েছে।এবার আসি সিরিজটির চরিত্রগুলোর কাছে।সিরিজটিতে অসংখ্য চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে।এর প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হল-হ্যারী,রন, হার্মায়েনী,স্নেইপ,ডাম্বলডোর, ভোল্ডেমর্ট এবং আরো অনেকে।এর মধ্য প্রধান তিন চরিত্র হল HARRY,RON ও HERMIONE.তবে সিরিজটি মূলত অন্য দুইটি চরিত্রের উপর ভর করে এগিয়েছে,তারা হলেন DUMBLEDURE এবং SNAPE.হ্যারী চরিত্রটিকে মূলত গতানুগতিক ধারা অনুযায়ী তৈরী করা হয় নি।হ্যারীর সাহসিকতার পাশাপাশি আমরা তার মধ্যে দেখতে পাই নিয়ম ভাঙার প্রবনতা ।একজন সাধারন স্কুলবালকের আদলেই তৈরী করা হয়েছে অনন্যসাধারন এই বিশ্বমাতানো চরিত্রটিকে।স্কুলের পড়াশুনায় মধ্যম মানের কিন্তু জাদুবিদ্যায় পারদর্শী হ্যারীকে দেখলে কি পাশের বাড়ির চন্ঞ্চল ছেলেটির প্রতিমূর্তি চোখের সামনে ভেসে উঠে না।আর হ্যারী চরিত্রটির এই বাস্তব ও ঘনিষ্ট আবেদনটাই একে করেছে বিশ্বখ্যাত।রাউলিং শুধুমাত্র হ্যারীকে নয় সিরিজের প্রতিটি চরিত্রগুলোর মাঝে এরকম আবেদনময়তা তৈরী করেছেন।রন চরিত্রটি কিছুটা বোকা টাইপের কিন্তু এর মাঝে একটি সহজ সরল বন্ধুর আবহ ফুটে উঠে।আর হার্মায়েনী চরিত্রটি বুদ্ধিমত্তা আর মননশীলতার প্রতীক।সত্যি কথা বলতে কি রাউলিং তার ভালো চরিত্রগুলোর মাঝেও হালকা রাগ, হিংসা,ঘৃনা,দিয়েছেন।আর এ কারনেই চরিত্রগুলোকে এত সজীব ও বাস্তব মনে হয়।যেকোন গোয়েন্দা উপন্যাসের তুলনায় হ্যারী পটারে রহস্যের পরিমান কোন অংশে কম নয়।অর্থ্যাত্‍ এটিকে রহস্য উপন্যাসও বলা চলে।আর স্নেইপ চরিত্রটি মনে হয় পৃথিবীর সর্বকালের সেরা রহস্যময় চরিত্র।আর হ্যারী পটার সিরিজে হাস্য রসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।আর ফ্রেড জর্জের কথাগুলো শুনে হাসবে না এরকম লোক পৃথিবীতে বোধহয় খুব কমই আছে।আপনারা যারা হ্যারী পটার পড়েছেন তারা বোধহয় একটা বিষয় লক্ষ্য করে থাকবেন যে হ্যারী পটার পড়া শুরু করলে সহজে উঠা যায় না।এর পিছনেও একটি রহস্য আছে।আপনারা নিশ্চয়ই ছোটগল্প নামক এক ধরনের বিশেষধরনের সাহিত্যের নাম শুনেছেন,যেমন রবিঠাকুরের ছুটি,পোষ্টমাষ্টার ইত্যাদি।এইধরনের সাহিত্যের একটি বৈশিষ্ট হল এটি শেষ করার পড় বাকিটুকু জানবার চরম ইচ্ছা জাগে আর হ্যারী পটারের প্রতিটি অধ্যায়ই ছোটগল্পের আদলে তৈরী করা হয়েছে।আর সেকারনেই একটি অধ্যার শেষ করার পর আমরা বাকিটুকু জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকি।তাছাড়া হ্যারী পটারে মৌলিকভাবে চিন্তা করার অসংখ্য উপাদান রয়েছে যেমন ব্রুম,কুইডিচ,পোর্ট কী আরো কত কি।আরেকটা বিষয় হলো হ্যারী পটার পড়তে হলে কল্পনাশক্তি থাকতে হয় এবং এটা কল্পনাশক্তি বিকাশও ঘটায়।আপনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি আইনস্টাইনের সেই কথাটি,IMAGINATION IS MORE IMPORTANT THAN KNOWLEDGE.
উপরের কথাগুলো আমি লিখেছি একজন হ্যারীপটারভক্ত হিসেবে নয় একজন সত্যিকারের বইপ্রেমিক হিসেবে।তাই যদি এখনও না পড়ে থাকেন তাহলে একবার পরখ করে দেখতে পারেন যে হ্যারী পটার কি মাপের সাহিত্য।
original post
read more

Tuesday, November 29, 2011

“আমিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক” : কমরেড কিষানজী

by রািকবুল আলম
সন্দেহাতীতভাবে ভারত সরকারের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের তালিকায় তার অবস্থান দুই নম্বরে (এই তালিকার ১ নম্বর নাম কমরেড গণপতি), তিনি সিপিআই (মাওবাদী)’এর পলিট ব্যুরোর সদস্য ও সামরিক শাখার প্রধান কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও, ওরফে ‘প্রহলাদ’, ওরফে ‘বিমল’, ওরফে ‘রামজী’, ওরফে ‘কিষানজী’ (৫৭)। তাঁর বেড়ে উঠা অন্ধ্রপ্রদেশে গান্ধী ও রবি ঠাকুরের বই পড়ে। কিন্তু বিশ্বের মুক্তির ইতিহাস অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পর এক পর্যায়ে তিনি বিপ্লবাকাঙ্খায় অরণ্যে আত্মগোপন করেন। তাঁর জন্ম ১৯৫৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের করিমনগর জেলার পেদপল্লী গ্রামে (উঃ তেলেঙ্গনা)। ১৯৮০ সালে কান্দাপালি সিথামাইয়াহ নামের এক স্কুল শিক্ষকের নেতৃত্বে “পিপলস্ ওয়ার গ্রুপ” (পিডব্লিউজি) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অন্যতম সহযোগী ছিলেন কিষানজী। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ‘পিডব্লিউজি’ এবং ‘মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়া’ একীভুত হয়ে গঠিত হয় ‘সিপিআই (মাওবাদী)’। ১৯৮২ সালে সার্চ অপারেশন চলার সময়ে পুলিশ তাঁর পেদপল্লী গ্রামের বাড়ীটি ভেঙ্গে দেয়। তিনি আত্মগোপনে চলে যান, এরপরে আর মায়ের সাথে দেখা করতে আসেননি; তবে তেলেগু পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তাঁর মা’কে লিখতেন। কিষানজী’র স্ত্রী সুজাতাও মাওবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত। তিনি দান্তেওয়াড়া এলাকার মাওবাদী কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করেন। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়’এর নক্সাল এলাকায় ২০ বছর জড়িত থাকার পর তাকে পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়া হয়। লালগড় পুলিশ ক্যাম্প থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কিষানজী’র একটি গুপ্ত আশ্রয়স্থল থাকা সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী (র’, সিআরপিএফ, বিএসএফ, পুলিশ, সেনাবাহিনী) তাঁকে খুঁজে না পাওয়ার মূলে ছিল জনগণের সাথে তাঁর একাত্মতা। তিনি প্রতিদিন ১৫টি সংবাদপত্র পড়তেন, সেই সাথে তার পার্টির প্রকাশনাগুলোর সাথে যুক্ত থাকতেন। তিনি ছিলের সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির সামরিক শাখার প্রধান। মুখের ছবি তুলতে না দিলেও তিনি সাংবাদিকদের সাথে মন খুলেই কথা বলতেন। ৩৭ বছর যাবৎ একই মতাদর্শে অটুট থেকে নিপীড়িতদের মুক্তির সংগ্রামে আমৃত্যু লড়ে যান এই বিপ্লবী।

২৪ নভেম্বর ২০১১ ছিল এক কালো দিন, সেদিন ‘ভুয়া সংঘর্ষ’ (ফেক এনকাউন্টার) দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক সিআরপিএফ দ্বারা হত্যা করা হয় কমরেড কিষানজী’কে। বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারের শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া চলছিল মাওবাদীদের সাথে। ২৩ তারিখে কিষানজী এমনই এক গোপন সভায় হাজির হলে তাকে ধোঁকা দিয়ে আটক করা হয় এবং অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার পর ২৪ নভেম্বর ২০১১ তারিখ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে এক ভুয়া এনকাউন্টারের নাটক সাজানো হয়।

ধিক্কার জানাই ভারত রাষ্ট্রকে বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য…

শহীদ কমরেড কিষানজী’র প্রতি রইলো আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। কিষানজী শুধু কোন একক ব্যক্তি নন; তিনি এমনই এক সত্ত্বা, যা বিদ্যমান সকল মুক্তিকামী মানুষের মাঝে। তাই কিষানজী’দের মৃত্যু নাই, তারা চিরঞ্জীব। তিনি বেঁচে থাকবেন, গণমানুষের মুক্তির নেশায়, লড়াই-সংগ্রামে।

লাল সালাম, কমরেড…..

——————————————
(২০০৯ সালের নভেম্বরে “তেহেলকা ডট কম”এ প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও ওরফে ‘কিষানজী’ কথা বলেন সশস্ত্র সংগ্রাম, শান্তি আলোচনা, দলের অর্থায়নের উৎস, ভারতের প্রথাগত গণতন্ত্র ও জনগণতন্ত্রের পার্থক্য এবং সিপিআই (মাওবাদী)’এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তুষা মিত্তাল।) মধ্যরাত্রিতে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির উদ্ধৃতাংশ:

প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনি কিভাবে সিপিআই (মাওবাদী) দলে যোগ দিলেন?
কমরেড কিষানজী: আমি অন্ধ্র প্রদেশের করিম-নগরে জন্মগ্রহণ করি। ১৯৭৩ সালে গণিতে স্নাতক ডিগ্রীর পর আমাকে আইনের মাধ্যমে অভিযুক্ত দেখিয়ে হায়দ্রাবাদে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’ (Telangana Sangarsh Samiti)’এর সাথে আমার সংযুক্তি থেকে; এখানে উল্লেখ্য যে, ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’ পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্যের দাবী জানাচ্ছিল সেসময়ে। ১৯৭৫ সালের জরুরী অবস্থার মধ্যেই আমি অন্ধ্র প্রদেশে ‘রেডিক্যাল স্টুডেন্টস মুভমেন্ট’ (Radical Students Union (RSU))’এর কাজ শুরু করি। এরপরে আমি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে আত্মগোপনে চলে যায়। সেসময়ে বেশ কিছু বিষয়ে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম; এর মাঝে কিছু বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ, যেমন: লেখক ভারাভারা রাও (যিনি বিপ্লবী লেখক সংঘ, Revolutionary Writers Association’এর প্রতিষ্ঠাতা), তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক আবহ এবং একটি প্রগতিশীল পরিবেশ, যে পরিবেশে আমার বেড়ে উঠা।


আমার বাবা ছিলেন একজন গণতন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযোদ্ধা [*তিনি ১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন]। তিনি রাজ্য কংগ্রেস পার্টির সহসভাপতিও ছিলেন। আমরা বর্ণে ব্রাহ্মণ হলেও আমাদের পরিবার বর্ণ বিশ্বাস করতো না। যখন আমি সিপিআই (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) দলে যোগদান করি, আমার বাবা কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন। তখন তিনি একথা বলেন যে, ‘এক ছাদের নিচে দুই ধারার রাজনীতি বেঁচে থাকতে পারে না।’ তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামে নয়। ১৯৭৭ সালে জরুরী অবস্থা শেষ হবার পর আমি সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেই। ৬০ হাজারেরও বেশী কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দেন, এই কৃষক আন্দোলন পরবর্তীতে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: গৃহমন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) সিপিআই (মাওবাদী)’এর সাথে বন অধিকার, জমি অধিগ্রহণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল SEZs(Special Economic Zones)’এর মতো বিষয়গুলোতে কথা বলতে আগ্রহী। আপনারা তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন কেন? তিনি শুধুমাত্র আপনাদের সহিংসতা স্থগিত রাখার কথাই বলেছেন।

কমরেড কিষানজী:সরকার তার বাহিনী প্রত্যাহার করলে আমরা আলাপের জন্য প্রস্তুত। সহিংসতা আমাদের কর্মসূচীর অংশ নয়। আমাদের এই সহিংসতা কেবলই আত্মরক্ষার জন্য। সরকারী বাহিনী আমাদের লোকদের প্রতিদিন আক্রমণ করছে। বাস্তারে গত মাসে কোবরা বাহিনী ১৮জন নিরপরাধ আদিবাসী এবং ১২জন মাওবাদীকে হত্যা করেছে। ছত্তিশগড়ে উন্নয়ন খাতে যারা আমাদের সহায়তা করতো, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করুন; সহিংসতাও বন্ধ হয়ে যাবে। সম্প্রতি, ছত্তিশগড়ে পুলিশের ডিজিপি একটা সন্ত্রাসী সংগঠন ‘সালওয়া জুডুম’এর ৬,০০০ বিশেষ পুলিশ সদস্যদের নিজেদের গৌরব বলে তকমা লাগিয়েছেন। অথচ, তারা বছর বছর ধরে আদিবাসীদের ধর্ষণ, হত্যা, লুটের সাথে জড়িত। ‘সালওয়া জুডুম’এর অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সরকার নিজের মনগড়া কথা বলে যেতে পারে, তবে আমরা তা বিশ্বাস করিনা। তারা কিভাবে এই কর্মপন্থার পরিবর্তন ঘটাবে, যখন তাদের অধিকারে কিছুই নাই? সবই তো যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বব্যাংকের এখতিয়ারে!

প্রশ্ন: কোন পরিস্থিতিতে আপনারা সহিংসতা কমাবেন?

কমরেড কিষানজী: প্রধানমন্ত্রীকে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সেই সাথে এই সব অঞ্চলে মোতায়েন করা সৈন্যদের প্রত্যাহার করতে হবে। এই সেনাবাহিনী নতুন কিছু না, আমরা গত ২০বছর যাবৎ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছি। সকল বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সেনা প্রত্যাহারের জন্য যা সময় লাগে নিন, কিন্তু এসেময়ে যেন আমাদের উপর পুলিশী হামলা না হয়, তা নিশ্চিত করুন। যদি সরকার তাতে রাজী থাকে, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে কোন সহিংসতা হবে না। আমরা পূর্বের ন্যায় গ্রামাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

প্রশ্ন: এতে সম্মত হওয়ার পূর্বে আপনারা কি রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, এক মাসের জন্য আপনারা আক্রমণ করবেন না?

কমরেড কিষানজী: আমরা এবিষয়টা নিয়ে চিন্তা করবো। এবিষয়ে আমাকে দলের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু এমন কী নিশ্চয়তা আছে যে, তাদের তরফ থেকে এই এক মাসে কোন সহিংসতা হবে না? তাই সরকারের তরফেই এই ঘোষণা আসতে হবে এবং প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এটা জনগণের জন্য শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী হবে না। অন্ধ্র প্রদেশের দিকে তাকান। তারা আলোচনা শুরু করলো, আবার সেই আলোচনা ভেঙ্গেও দিল। আমাদের একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অন্ধ্রের রাজ্য সচিবের সাথে দেখা করতে গেলেন; পরবর্তীতে, সরকারের সাথে আলাপ করার দুঃসাহসের অভিযোগে (!) পুলিশ উনাকে গুলি করে হত্যা করে।

প্রশ্ন: যদি সত্যিই আপনারা গণমানুষের কর্মসূচী নিয়ে কাজ করেন, তাহলে সাথে অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার লক্ষ্য কি ‘আদিবাসী কল্যাণ’, নাকি ‘রাজনৈতিক শক্তি’?

কমরেড কিষানজী: রাজনৈতিক শক্তি। আদিবাসী কল্যাণকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া আমরা কিছুই অর্জন করতে পারব না। একটি সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কেউ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। আদিবাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকার ফলেই তারা শোষিত এবং এই শোষণ তাদেরকে সবচেয়ে অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়াদের চরমে পৌঁছে দিয়েছে। নিজের সম্পদের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই। তাসত্ত্বেও, আমাদের মতাদর্শ অস্ত্রের উপর স্থিত না। আমরা অস্ত্রকে দ্বিতীয় অবস্থানে স্থান দেই। অন্ধ্রে আমরা একারণেই এক বড় ক্ষতির সম্মুখীন হই।

প্রশ্ন: সরকার বলছে আগে সহিংসতা থামান, আপনারা বলছেন আগে সেনা প্রত্যাহার করুন। এই বুদ্ধিবৃত্তিশূণ্য চক্রে আদিবাসী সমাজ, আপনারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে দাবি করেন, তারা সর্বাধিক কষ্টকর অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে।

কমরেড কিষানজী: আচ্ছা, তাহলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আনা হোক। অন্ধ্র প্রদেশ হোক, পশ্চিমবঙ্গ বা মহারাষ্ট্র, আমরা কখনোই সহিংসতা শুরু করিনি। প্রথম আক্রমণ সবসময় সরকার পক্ষ থেকেই আসে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম [ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদী)]’এর সন্ত্রাসীরা তাদের দলের সাথে যুক্ত নয় এমন কাউকেই গ্রামে প্রবেশ করতে দেয় না (*তৎকালীন সময়ে সিপিএম ছিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল)। পুলিশ ১৯৯৮ সাল থেকে লালগড় এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে আছে। এমতাবস্থায়, আলুর মূল্যবৃদ্ধি অথবা বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য কিভাবে আমরা চাপ দিতে পারি? এজন্য এমন কোন মঞ্চ আমাদের নাই। যখন পশ্চিমবঙ্গে সর্বনিম্ন মজুরি দেওয়ার কথা প্রতিদিন ৮৫ টাকা, অথচ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে ২২ টাকা করে; আমরা দাবী জানালাম ২৫ টাকা করার। মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল যখন পাণ্ডবদের দাবী অনুযায়ী কৌরভরা পাঁচটি গ্রাম তাদের দিতে অস্বীকার করে, তখন। রাষ্ট্রও আমাদের ৩ টাকা মজুরী বৃদ্ধিকে অগ্রাহ্য করলো। এখানে আমরা পাণ্ডব, আর তারা কৌরভ।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন সহিংসতা আপনাদের কর্মসূচী নয়, কিন্তু আপনারা গত চার বছরে প্রায় ৯০০ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই এসেছে গরীব আদিবাসী পরিবার থেকে। এমনকি যদি সেটি অপরপক্ষের সহিংসতার কাউন্টারও হয়ে থাকে, এর মধ্য দিয়ে গণ-মানুষের পক্ষের এই লক্ষ্যে কিভাবে এগুনো সম্ভব?

কমরেড কিষানজী: আমাদের যুদ্ধ পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আমরা পুলিশের সাথে হতাহতের সংখ্যা কমাতে চাই। বাংলায়, অনেক পুলিশ পরিবার আসলে আমাদের সাথে সহমর্মী। সেখানে গত ২৮ বছরে ক্ষমতাসীন সিপিএম প্রায় ৫১ হাজার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হ্যাঁ, আমরা গত সাত মাসে ৫২ জন সিপিএম সদস্যকে হত্যা করেছি। আর তা কিন্তু সিপিএম ও পুলিশের পশুর ন্যায় বর্বর আচরণের ফলেই করতে হয়েছে।

প্রশ্ন: সিপিআই (মাওবাদী) কিভাবে গঠিত হলো? আপনাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কী কী অভিযোগ রয়েছে?

কমরেড কিষানজী: সেখানে কোন চাঁদাবাজী হয়নি। আমরা কর্পোরেট এবং বড় বুর্জোয়াদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করেছি, এটি কর্পোরেট সেক্টর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে তহবিল সংগ্রহে অর্থায়ন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। আমাদের একটি ষাণ্মাসিক নিরীক্ষা হয়। একটা পয়সাও নষ্ট হয় না। গ্রামবাসীরাও স্বেচ্ছায় প্রতি বছর তাদের দুই দিনের আয় পার্টি তহবিলে অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকেন। গাদচিরলি’তে দুই দিনের বাঁশ কাটা থেকে আমরা ২৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। বাস্তারে টেন্ডু পাতা সংগ্রহ থেকে আমরা প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। এছাড়াও, কৃষকেরা ১০০০ কুইন্টাল ধান অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকে।

প্রশ্ন: যদি কৃষক এই অনুদান দিতে রাজি না হয়?

কমরেড কিষানজী: এমনটা কখনোই হবে না।

প্রশ্ন: এর কারণ কি ভয়?

কমরেড কিষানজী: কখনোই না। তারা আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমরা যে উন্নয়ন কর্মকান্ডের উদ্যোগ নিয়েছি, তার জন্য একটা পয়সাও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে দাবী করিনি।

প্রশ্ন: মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় আপনারা কী কী উন্নয়ন করেছেন? ছত্তিসগড় এবং ঝাড়খন্ডের আদিবাসীদের জীবন-ধারা কিভাবে উন্নত হয়েছে?

কমরেড কিষানজী: আমরা মানুষকে রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, তাদেরকে ধনীদের জীবন-যাত্রা ও তারা (আদিবাসীরা) কী কী সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সে সম্পর্কে অবগত করেছি। এসব এলাকায় ১টাকায় ১০০০ টেন্ডু পাতা বিক্রি হতো। আমরা মহারাষ্ট্রের ৩টি জেলা, অন্ধ্র প্রদেশের ৫টি জেলা এবং সমগ্র বাস্তার এলাকায় এই দাম বাড়িয়ে প্রতি টেন্ডু পাতার দাম ৫০ পয়সা করেছি। প্রতি বান্ডেল বাঁশ ৫০ পয়সায় বিক্রি হতো। এখন যার দাম ৫৫ টাকা। আমদের এই অর্জন এসেছে রাষ্ট্রের নির্মম প্রতিরোধ ও নিষ্ঠুর চেহারাটার সাক্ষাৎ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র গাদচিরলি’তেই তারা আমাদের ৬০ জনকে হত্যা করে, আর আমরা মারি ৫ জনকে।

এছাড়াও সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি প্রায় প্রতিদিনই ১২০০টি গ্রামে স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। বাস্তারে আমাদের বেশকিছু সৈনিক রয়েছেন, যারা দক্ষ ডাক্তার, তারা এপ্রোন পরেন এবং জঙ্গলে ধাত্রীর কাজ করে থাকেন। শুধুমাত্র বাস্তারেই আমাদের এমন ৫০টি ভ্রাম্যমান স্বাস্থ্য দল এবং ১০০টি ভ্রাম্যমান হাসপাতাল আছে। গ্রামবাসীরা নির্দিষ্ট অসুস্থতার জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের যান; যেমন: জ্বরের জন্য যাবে ইসা’র কাছে, আবার ডাইরিয়ার জন্য যাবে রামু’র কাছে, ইত্যাদি। এই অঞ্চলে মানুষ এতো বেশী অসুস্থ হয় যে কখনো কখনো লাশ উঠানোর মানুষেরও স্বল্পতা দেখা দেয়। আমরা মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ডাক্তারদের কাছে ঔষধ সরবরাহ করে থাকি। সরকার জানে না যে, এই ঔষধ কিন্তু সরকারী হাসপাতাল থেকেই আসে।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র যদি নক্সাল অধ্যুষিত এলাকায় সিভিল প্রশাসন পাঠায়, আপনারা কি তার অনুমতি দিবেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা স্বাগত জানাব। আমরা চাই শিক্ষক ও ডাক্তারেরা এখানে আসুক। লালগড়ের জনগণ যুগ-যুগ ধরে সেখানে একটি হাসপাতালের দাবী জানাচ্ছে। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি। যখন জনগণ নিজেদের চেষ্টায় একটা হাসপাতাল গড়ে তুললো, সরকার এটিকে সেনা-ছাউনিতে রূপান্তর করলো।

প্রশ্ন: আপনাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কি? তিনটি সুস্পষ্ট লক্ষ্যের কথা বলুন।

কমরেড কিষানজী: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং তারপর সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঋণের কোন প্রয়োজন নাই। যুগ-যুগ ধরে আমরা বিদেশী ঋণের টাকা শোধ করে আসছি, আর যেহেতু এখানে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ক্রমবর্দ্ধমান তাই অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এটা কখনোই পরিশোধিত হবে না। আর এটাই চায় বিশ্বব্যাংক। আমাদের এমন এক অর্থনীতি প্রয়োজন, যা দুইটি বিষয়ের উপর কাজ করবে- কৃষি এবং শিল্প। প্রথমত, আদিবাসীরা জমি চায়। জমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র তাদের শোষণ করেই যাবে। শ্রমের ভিত্তিতে শতকরা হারে জনগণকে শস্য বরাদ্দ দিতে হবে। আমরা শিল্পের বিরোধী নই; শিল্প ছাড়া উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিল্পটি ভারতের জন্য সহায়ক, নাকি আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংকের সহায়ক। বড় বাঁধ, বড় শিল্পের বদলে আমরা ছোট শিল্প, বিশেষত যা কৃষির উপর নির্ভরশীল, এমন শিল্পকে উন্নীত করার পক্ষপাতী। তৃতীয় লক্ষ্য হলো, টাটা থেকে আম্বানী পর্যন্ত সকল বড় কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করা, সকল স্মারক চুক্তি (MOU) বাতিল করা, তাদের সকল সম্পদকে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা ও এর মালিকদের জেলে প্রেরণ করা। অবশ্যই, নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকবেন।

প্রশ্ন: কিন্তু বিশ্বে কমিউনিস্ট সরকারগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা যে ব্যবস্থাকে উৎখাত করেছিল শোষণের অভিযোগে, ক্ষমতায় এসে তারা নিজেরাও সেরকমই হয়ে যায়। মাওবাদী শাসন ব্যবস্থারই এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব যেখানে বল প্রয়োগ হয়েছে এবং মত পার্থক্য সহ্য করা হয়নি। কিভাবে তা মানুষের স্বার্থে হতে পারে?
কমরেড কিষানজী: এই সব পুঁজিবাদীদের দ্বারা ছড়ানো গল্প। গ্রামের মানুষেরা বিনা চিকিৎসায় মরছে, অথচ ডাক্তারেরা সব শহরে থাকতে চায়। আমাদের সব প্রকৌশলীরা জাপানের মতো উন্নত দেশে, অথবা আইটি নিয়ে কাজে আগ্রহী। তারা জনগণের সম্পদ ব্যবহার করেই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তারা আমাদের দেশের জন্য কী করেছেন? রাষ্ট্র আপনাকে ডাক্তার হওয়ার জন্য জোর দিতে পারে না। কিন্তু যদি আপনি তা হয়ে যান, তাহলে আপনাকে জোর দেওয়া উচিৎ (রাষ্ট্র কর্তৃক) নিজের দক্ষতা অনুযায়ী দুই বছর গ্রামে সেবা দেওয়ার জন্য। রাষ্ট্র কতটা শোষক, তা নির্ভর করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় কারা আসীন তার উপর।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চাই। যদি সেখানে কোন গণতন্ত্র না থাকে, তাহলে গ্রামবাসীদের বলুন আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য আরেকটি বিপ্লবের সূচনা করতে। একটি প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ইতিমধ্যে বাস্তারে আমাদের একটি বিকল্প জনগণতান্ত্রিক সরকার আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচিত করি, যা বিপ্লবী জনগণের কমিটি নামে পরিচিত। জনগণ হাত উঁচিয়ে ভোট দেন। সেখানে একজন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কল্যাণ, কৃষি, আইন-শৃঙ্খলা, জনসংযোগ ইত্যাদি বিভাগ রয়েছে। এই ব্যবস্থা বর্তমানে ভারতের প্রায় ৪০টি জেলায় বিদ্যমান। ‘মাওবাদীরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না’ বলে যে একটা ধারণা আছে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুল।

বর্তমানে ভারতে যা বর্তমান, তা হলো আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র। এটি প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। তা মমতা হোক, সিপিএম হোক, আর কংগ্রেস পার্টি, সবগুলোই স্বৈরতান্ত্রিক। আমরা তাদের আসল চেহারাটা সবার সামনে উন্মোচনের জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ১৪ জন আদিবাসী নারীকে মুক্তির জন্য আলোচনা করেছি; বিশ্ববাসী দেখুক, তাদের এই জেলে কাদের আটকে রাখা হয়।

প্রশ্ন: আপনি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে ইতিমধ্যে বিদ্যমান গণতন্ত্রকে পরিহার করছেন কেন? নেপালে তো মাওবাদীরা নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে।

কমরেড কিষানজী: নতুন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য পুরোনোটিকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। নেপালে মাওবাদীরা সমঝোতা করেছে (*এরই ফল স্বরূপ বর্তমানে নেপালে মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বে আসীন দুই দালাল, প্রচণ্ড আর ভট্টরাই)। ১৮০ জন এমপি (সংসদ সদস্য) গুরুতর অপরাধের আসামী, ৩ শতাধিক এমপি কোটিপতি। এর নামই কি নির্বাচন? আপনি কি জানেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই উত্তর প্রদেশে একটি ঘাঁটিতে অনুশীলন শুরু করেছে? তারা স্বদম্ভে বলছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোন স্থানে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এই স্পর্ধা কে অনুমোদন দেয়? আমি তো নয়। আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। আমিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

প্রশ্ন: ভারতকে আপনি কেমন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান? একটি আদর্শ ব্যবস্থা বাছাই করুন।

কমরেড কিষানজী: আমাদের প্রথম আদর্শ ব্যবস্থা হলো প্যারিস, যা ভেঙ্গে গেছে। এরপর রাশিয়া ধ্বসে পড়লো, আর তখনই জ্বলে উঠলো গণচীন। কিন্তু মাও পরবর্তী সময়ে সেটিরও পতন হয়। এখন বিশ্বের কোনোখানেই জনগণের হাতে সত্যিকারের ক্ষমতা নাই। সর্বত্রই শ্রমিকেরা এজন্য সংগ্রাম করছে। তাই কোন আদর্শ ব্যবস্থা বিদ্যমান নাই।

প্রশ্ন: যখন কমিউনিজম অন্যত্র ফলপ্রসু হয়নি, তখন ভারতে তা কিভাবে কাজ করবে? চীনে বর্তমানে মাও’এর তত্ত্বকে ভ্রান্তিমূলক আখ্যা দেওয়া হয়। নেপালে ইতিমধ্যে মাওবাদীদের বিদেশী বিনিয়োগ খোঁজছেন।

কমরেড কিষানজী: নেপালে মাওবাদীরা যা করছেন, তা ভুল। এই পথ অনুসরণ করার মানে হলো আরেকটি বুদ্ধদেব বাবু ["মার্কসিস্ট" পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী] তৈরী করা। আমরা তাদের নিকট আবেদন জানিয়েছি পুরোনো পন্থায় ফিরে আসার জন্য। যেখানেই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম শিকড় গজিয়ে উঠে, সেখানেই সাম্রাজ্যবাদ তা স্বমূলে উপড়ে ফেলতে চায়। অবশ্যই, লেনিন, মাও, প্রচণ্ড – সবারই কিছু দুর্বলতা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ের পর লেনিন এবং স্তালিন আমলাতন্ত্রের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেন। তারা জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করেন। তাদের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে। পুঁজিবাদও কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছে। আপনি কিভাবে বলবেন যে পুঁজিবাদই সফল হয়েছে? সমাজতন্ত্রই মুক্তির শুধুমাত্র পথ।

প্রশ্ন: কিন্তু ক্ষমতায় গেলে আপনারাও কী নেপালের মাওবাদীদের মতো বা সিপিএম’এর মতো বিভ্রান্ত হতে পারেন না?

কমরেড কিষানজী: যদি আমরা পরিবর্তিত হই, তাহলে জনগণ আমাদের বিরুদ্ধেই আরেক বিপ্লবের (ক্রান্তিকারী আন্দোলন)সূচনা করবে। শাসক যেই হোক না কেন, যদি সে শোষকে পরিণত হয় তাহলে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য উঠে দাঁড়াবেই। তাদের ‘একজন কিষানজী’, ‘একজন প্রচণ্ড’ বা ‘একজন স্তালিন’এর উপর অন্ধ বিশ্বাস থাকা উচিৎ নয়। যদি কোনো নেতা বা পার্টি তাদের নিজস্ব মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তাদের উপরে আস্থার সমাপ্তি ঘটিয়ে আবারো বিদ্রোহ করতে হবে। জনগণের এই পরম্পরা জিইয়ে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি কি কখনও কোন ব্যক্তিগত দ্বিধার সম্মুখীন হয়েছেন? সহিংসতাই কি একমাত্র পথ রাষ্ট্রের উপর চাপ বৃদ্ধি করার?

কমরেড কিষানজী: আমার বিশ্বাস আমরা সঠিক কাজটিই করার চেষ্টা করছি। আমরা একটা ন্যায়ের যুদ্ধ করে যাচ্ছি। হ্যাঁ, পথ চলতে ভুল হতেই পারে। কিন্তু তা রাষ্ট্রের মতো নয়, আমরা ভুল করলে তা স্বীকার করতেও জানি। ফ্রান্সিস ইন্ডুয়ার’কে হত্যা করাটা ছিল একটি ভুল, আমরা এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। লালগড়ে আমরা একটা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। সেখানে আমরা সম্প্রতি শুধুই উন্নয়নের জন্য সরকারকে (লিখিতভাবে) দাবী জানিয়েছি এবং সরকারকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। আমরা ৩০০টি গভীর নলকূপ এবং ৫০টি অস্থায়ী হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়াও আমরা ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআই, এমনকি সিপিএম’এর মতো বাম দলগুলোর সাথেও আলোচনা করেছি। আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীদের সাথেও যোগাযোগ করেছি। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আমি নিজে কথা বলেছি।

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রীর অফিস এগুলো ময়লার ঝুড়িতে ফেলেছে।

কমরেড কিষানজী: আমি মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আমি তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করতে বলেছি এবং বলেছি যে, আমরা আমাদের উন্নয়ন চাহিদা চিঠির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। তিনি জানালেন যে, তিনি তার দল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চিদাম্বরম দ্বারা চাপে আছেন।

প্রশ্ন: পুলিশ কেন আপনাকে ধরতে সক্ষম হচ্ছে না?

কমরেড কিষানজী: আটটি রাজ্যে দিন নেই, রাত নেই, আমাকে ধরার জন্য অভিযান চলতেই থাকে। তাদের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আমার অবস্থান ২ নম্বরে। পুলিশ যেন আমার কাছে পৌছাতে না পারে, সেজন্য বাংলার ১৬০০ গ্রামের মানুষ রাতে পাহাড়া দেয়। আমি এখন যেখানে আছি, সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে একটা ক্যাম্পে ৫০০ পুলিশ রয়েছে। বাংলার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। পুলিশ আমাকে ধরার আগে তাদের মারতে হবে।

প্রশ্ন: স্বরাষ্ট্র সচিব সম্প্রতি আপনাদের অস্ত্র দেওয়ার জন্য চীনকে উদ্দিষ্ট করেছেন। এটা কি সত্য?

কমরেড কিষানজী: তিনি আমাদের মতাদর্শ সম্পর্কে একদমই কিছু জানেন না। যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রু সম্পর্কে জানতে হয়। আমাদের অবস্থান চীন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিপরীত। আমি ভেবেছিলাম চিদাম্বরম এবং পিল্লাই আমার প্রতিযোগী, কিন্তু আমার শত্রু এতো নিন্ম-মানের হবে তা কখনোই বুঝতে পারিনি। তারা কেবল হাওয়াতেই তরবারী ঘোরাবেন। বিজয় আমাদেরই হবে।

প্রশ্ন: লষ্কর-ই-তৈয়বা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? আপনি কি তাদের যুদ্ধ সমর্থন করেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা তাদের কিছু দাবী সমর্থন করি, কিন্তু তাদের পদ্ধতি ভুল এবং জনবিরুদ্ধ। তাদেরকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাদ দিতে হবে, কারণ তা কোন লক্ষ্যের দিকে সহায়ক নয়। শুধুমাত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
original post
read more

Thursday, November 24, 2011

যে আবিষ্কারগুলো কেড়ে নিয়েছিল আবিষ্কারকদের প্রাণ

by দৈনিক কপি-পেষ্ট

প্রত্যেক আবিষ্কারকই তার আবিষ্কার নিয়ে গর্ববোধ করেন। আবিষ্কারক মাত্রই তার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পৃথিবীতে এমন বেশ কয়েকজন আবিষ্কারক রয়েছেন যারা প্রাণ হারিয়েছেন নিজের আবিষ্কারের হাতে। হতভাগ্য এমন কিছু উদ্ভাবক সম্পর্কে ইন্টারনেট অবলম্বনে জানাচ্ছি আমি বি,আর,তৌহিদ।

হেনরি উইনস্টেনলি

১৬৪৪ সালের ৩১ মার্চ এসেক্সে জন্ম নেয়া হেনরি উইনস্টেনলি ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার। যিনি প্রথম এডিস্টোন বাতিঘর নির্মাণ করেন। নিজের তৈরি এই বাতিঘর নিয়ে ভদ্রলোক খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং প্রচণ্ড ঝড়েও এই বাতিঘর ধ্বংস হবে না বলে অহঙ্কার করতেন। ১৭০৩ সালের ২৭ নভেম্বর, দিনটি ছিল মেঘলা। বড়সড় একটি ঝড় সাগর থেকে ধেয়ে আসছে দেখে হেনরি সবাইকে বললেন, তিনি তার নির্মিত বাতিঘরে সে রাত থাকবেন এবং প্রমাণ করে দেবেন, এই ঝড় তার বাতিঘরের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। সে রাতে হেনরি তার ৫ সহকারীকে নিয়ে বাতিঘরে থাকার সময় প্রচণ্ড ঝড়ে বাতিঘরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং সবাই মৃত্যুবরণ করে।


আলেকজান্ডার বগডেনভ

১৮৭৩ সালের ২২ আগস্ট পোল্যান্ডে জন্ম নেন বিখ্যাত রাশিয়ান চিকিত্সক, দার্শনিক ও কল্পবিজ্ঞান লেখক আলেকজান্ডার বগডেনভ। ১৯২৪ সালের দিকে তিনি বিশ্বাস করতে লাগলেন অল্পবয়স্ক কারও দেহ থেকে রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে রক্ত গ্রহীতা দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারেন। তিনি এ বিষয়ে পরীক্ষা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার এই পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অনেক বিখ্যাত লোকও অংশ নেন। এমনকি লেনিনের বোনও। এই করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে তিনি একসময় যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী এক ছাত্রের রক্ত তার শরীরে প্রবেশ করান। এরপর জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে তিনি খুব দ্রুত মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তার বেশ কয়েকজন সহকারী মন্তব্য করেছিলেন, ওই পরীক্ষায় তিনি অনেকটা সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

ক্যারেল সোজেক

১৯৪৭ সালে চেকোশ্লোভিয়াতে জন্ম নেয়া সোজেক ছিলেন একজন স্টান্টম্যান। তিনি উপর থেকে গড়িয়ে পড়ার জন্য এক ধরনের ক্যাপসুল তৈরি করেন। এই ক্যাপসুলে করে নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে গড়িয়ে পড়ে সবাইকে চমকে দেন তিনি। কারণ হালকা ছেঁড়া-কাটা ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি তার।

এর কিছুদিন পর ১৯ জানুয়ারি ১৯৮৫-তে তিনি টেক্সাসের হিউস্টোন অ্যাস্ট্রোডোমে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ১৮০ ফুট উপর থেকে নিচে রাখা জলপাত্রে গড়িয়ে পড়ার সময় তার তৈরি ক্যাপসুলে সমস্যা দেখা দেয়। ক্যাপসুলের স্পিল্গন্টারের আঘাতে ভয়াবহভাবে ক্ষতবিক্ষত হন সোজেক এবং মারা যান এর পরদিন।


ফ্রানত্জ রিচাল্ট
ফ্রান্সে বসবাসকারী ফ্রানত্জ একজন অস্ট্রীয় দর্জি ছিলেন। ভদ্রলোক একটি ওভারকোটের নকশা করেছিলেন যা একই সঙ্গে প্যারাসুটের কাজ করবে। প্রাথমিক অবস্থায় ডামি ব্যবহার করে বহুতল ভবনের উপর থেকে পরীক্ষা চালিয়ে তিনি সফল হন। এরপর তার এই অদ্ভুত পোশাক আরও পরিমার্জিত করে তিনি নিজে আইফেল টাওয়ার থেকে লাফিয়ে তার তৈরি ওভারকোট কাম প্যারাসুটের পরীক্ষা করতে চেষ্টা চালান। বন্ধুদের বারণ ও পুলিশি বাধা পেরিয়ে অবশেষে ১৯১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আইফেল টাওয়ার থেকে ওভারকোটটি পরে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

কিন্তু ওভারকোটটি প্যারাসুটের মতো কাজ করেনি এবং নিচে বরফে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরদিনই মারা যান ভদ্রলোক।

অটো লিলিনথাল

লিলিনথালকে এভিয়েশনের অগ্রদূত বলা হয়। গ্লাইডারের (ইঞ্জিনবিহীন বিমান) আধুনিকায়ন ও উড্ডয়নে তিনি এত পারদর্শী ছিলেন যে লোকে তাকে গ্লাইডার কিং বলেই বেশি ডাকত।

৯ আগস্ট ১৮৯৬ সালে নিজের তৈরি একটি গ্লাইডারে করে ওড়ার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ১৭ মিটার উপর থেকে নিচে পড়ে যান তিনি। মেরুদণ্ড ভেঙে মারা যান ওইদিনই।


উইলিয়াম বুলক

১৮১৩ সালে আমেরিকায় জন্ম নেয়া বুলক রোটারি প্রিন্টিং প্রেস তৈরি করেন ১৮৬৩ সালে। যন্ত্রটি মুদ্রণশিল্পে বিপ্লব এনে দেয় এর কার্যকারিতা এবং দ্রুতগতিতে মুদ্রণ সুবিধার জন্য। ১৮৬৭ সালে ভদ্রলোক তার নিজের আবিষ্কৃত একটি মেশিন মেরামত করার চেষ্টা করেন। এসময় পা দিয়ে একটি পুলিকে লাথি দিয়ে বসানোর চেষ্টা করার সময় তার পা মারাত্মকভাবে কেটে যায়। কয়েকদিনের ভেতর স্থানটিতে পচন ধরলে অপারেশন করানোর সময় তার মৃত্যু ঘটে।

জে. জি. প্যারি টমাস

ওয়েলসের বাসিন্দা টমাস একজন ইঞ্জিনিয়ার ও মোটর-রেসিং ড্রাইভার ছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি ১৭০ মাইল ঘণ্টায় গাড়ি চালিয়ে রেকর্ড গড়েন। কিন্তু বছর খানেক পরই তার প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যালকম ক্যাম্পবেল তার রেকর্ড ভেঙে দেন। টমাস এবার তার গাড়িকে নতুন করে সাজান। তিনি চেইন ও গিয়ার সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন এনে তার রেসিং কারকে আরও দ্রুতগতির করে তোলেন। ১৯২৭ সালের ৩ মার্চ রেকর্ড ভেঙে দেয়ার জন্য রেসে নামেন তিনি। কিন্তু তার নিজের ডিজাইনে করা চেইন ভেঙে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। মাথায় শক্ত আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।

টমাস মিজলি
বিখ্যাত আমেরিকান কেমিস্ট মিজলি লেডেড পেট্রল এবং সিএফসি আবিষ্কার করেন। দীর্ঘসময় রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং লেড পয়জনে আক্রান্ত হয়ে এক সময় তার মধ্যে পোলিও’র লক্ষণ দেখা দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই তার শরীর অবশ হয়ে পড়ে।

এই অবস্থাতেও তার আবিষ্কারের নেশা কাটেনি। নিজে অন্যের সাহায্য ছাড়াই চলাফেরা করার জন্য নিজ বিছানায় এক ধরনের কপিকল তৈরি করেন। কিন্তু কপিকলটির রশি তার গলায় ফাঁস লাগলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান ভদ্রলোক।

মেরি কুরি

বিখ্যাত কেমিস্ট মেরি কুরি দুবার নোবেল জেতেন তার আবিষ্কারের জন্য। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তার মৃত্যুর পেছনেও জড়িয়ে আছে তার আবিষ্কার। কুরি রেডিয়াম ও পোলনিয়াম আবিষ্কার করেন। তেজস্ক্রিয়তা তত্ত্ব ও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ পৃথকীকরণ কৌশল তার গবেষণার ফসল। দিনরাত ল্যাবরেটরিতে তেজস্ক্রিয় দ্রব্য নিয়ে অসতর্ক অবস্থায় গবেষণা করতেন বলে তেজস্ক্রিয়তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগতে শুরু করেন তিনি। রক্তস্বল্পতাসহ নানা সমস্যায় ভুগে অবশেষে ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই মারা যান কুরি।

কুপার পিপস কোল

১৮১৯ সালে ব্রিটেনে জন্ম নেয়া কোল ছিলেন রাজকীয় নৌবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। তখনকার সময় যুদ্ধজাহাজগুলোতে কামান রাখার মঞ্চগুলো ঘূর্ণায়মান ছিল না। যার ফলে যুদ্ধের সময় কামান ব্যবহার সুবিধাজনক ছিল না। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় কোল প্রথম ঘূর্ণায়মান টারিট আবিষ্কার করেন এবং পরে নিজ নামে পেটেম্লট নেন।
যুদ্ধের পর কোল তার নিজ জাহাজে এটি স্থাপন করেন এবং অযথা আরও বেশকিছু ভারি সরঞ্জাম দিয়ে জাহাজ সাজান। কোল যে নকশা এঁকেছিলেন, তৈরির সময় তার লোকেরা তা ঠিকমত অনুসরণ না করায় জাহাজ যথেষ্ট ভারি হয়ে যায়। ১৮৭০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সময় ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়ে ভারি এই জাহাজ উল্টে ক্যাপ্টেন তার ৫০০ নাবিকসহ মারা যান।
original post
read more

Wednesday, November 23, 2011

সামাজিক যোগাযোগ >>>>> যেন হেয় না করে নারীকে ;););)




হঠাৎ রাস্তায় আপিস অঞ্চলে
হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে বন্ধু কী খবর বল!
কতদিন দেখা হয়নি!
একুশ শতকের এক দশক পেরিয়ে এই ‘কী খবর বল’ কথাটাই বলা হয় ফেসবুকে।
পুরোনো বন্ধুকে নতুন করে পাওয়া। নতুন নতুন বন্ধু খুঁজে পাওয়া। ভালো-মন্দ, আনন্দ-বেদনার মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া—আপাত এটাই তো ফেসবুক। সামাজিক যোগাযোগের এই ওয়েবসাইট তুমুল জনপ্রিয় গোটা দুনিয়ায়। বাংলাদেশেই এ মুহূর্তে ২১ লাখের বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। এত যে জনপ্রিয়তা, সে কারণেই ফেসবুক শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের গণ্ডিতে আর আবদ্ধ নেই। সামাজিক, রাজনৈতিন আন্দোলন বা জনমত গড়ে তোলার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে অনলাইনের এই মাধ্যমটি। ফেসবুকের এমন ব্যবহারই সবার কাম্য।
আবার যে কথা খোলা ময়দানে বলা যাচ্ছে না, কিন্তু তা দেশ-সমাজ ও সংস্কৃতির সংস্কারে বা উন্নতিতে প্রয়োজন—সে বিষয়ে সহজেই ব্লগে একটি লেখা সম্ভব। চাইলেই নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করা সম্ভব। অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ, ব্লগ—এ বিষয়গুলো আমাদের দেশে নতুনই বলা যায়। তবে এসবের অপব্যবহারও ইদানীং দেখা যায়। সাম্প্রতিক কালে দেখা গেছে, একটি মেয়ের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে ছবি সরিয়ে ফেসবুকে ও ব্লগে প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর তাতে নানা ধরনের অরুচিকর মন্তব্য লেখা হয়েছে। কয়েকজন ব্লগার এর ওপর ভিত্তি করে এমন সব ব্লগ লিখেছে, যা রীতিমতো তাদের বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বললেন, ‘হঠাৎ একদিন দেখলাম, আমার ছবিতে অশ্লীল শব্দ ট্যাগ করা। লজ্জায় মাথা নুয়ে এল। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলাম।’
নাদিয়া (ছদ্মনাম) বললেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও আমার ফেসবুকের ওয়ালে দেখা যায়। এসবের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। ব্লগগুলোতে মাঝেমধ্যে এমন সব ভাষা ব্যবহার করা হয়, যা রুচির পরিচয় দেয় না। এসব দেখলে মনে হয় না ভালো কিছু লিখি। আর স্বভাবতই মানুষের এসব পড়ার প্রতি আকর্ষণ বেশি। নারীসংক্রান্ত কিছু হলে তো কথাই নেই, অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন এসব মন্তব্য করলেই সমাজ শুদ্ধ হবে। এতে যে আরেকজনকে হেয় করা হচ্ছে, সেটি তারা ভাবে না। তাৎক্ষণিক একটা বিকৃত উল্লাসে তারা মেতে ওঠে। ভাবে, এই নারীকে হেয় করতে পারলেই সমাজের নারীকুলকে উদ্ধার করা সম্ভব।’
দেশের স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন সেরিন (ছদ্মনাম)। পাশাপাশি শখের মডেলিংও করেন। বললেন, ‘এক বন্ধুর কাছে ফটোসেশন করেছিলাম। ছবিগুলো তার ফেসবুকের অ্যালবামেই ছিল। সেখান থেকে কে বা কারা বেশ কয়েকটি পর্নোসাইটে আমার ছবি দিয়ে দেয়। এরপর কী হয়েছিল, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হচ্ছে, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তারা। শখের মডেলিং বন্ধ হয়ে গেল। বাসা থেকে সবকিছুতে নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। মরে যেতে ইচ্ছে হলো আমার। এ কেমন সমাজে বাস করছি।
‘কিন্তু মেয়ে দেখলেই এমন করতে হবে কেন? এর কি সত্যিই কোনো সমাধান নেই?’
এ বিষয়ে রায়ানস আর্কাইভস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী আহমেদ হাসান বলেন, ‘ব্লগ, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আমরা যা দেখি, তা আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। অনেক সময় মুখোশের আড়ালে আসল মানুষটা বেরিয়ে আসে। স্বচ্ছভাবে তাকে দেখতে পাওয়া যায়। সমাজের বৈকল্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। অনেকে মেয়েদের ছবি বিকৃত করে। বিভিন্ন পর্নোসাইটে তার অনুমতি ছাড়া ছবি দিয়ে দেয়। এসব বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ। আবার কোনো মেয়েকে কেন্দ্র করে কিছু ঘটলে সব পুরুষ সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মানুষ হিসেবে তাকে দেখে না। এটা নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার যে প্রবণতা, এটি তার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ। ওয়েব প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মুক্ত বিচরণভূমি। ফলে যাঁরা শুদ্ধচিন্তা করেন এবং প্রগতিশীল, তাঁদের দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠা। অনলাইনে তৈরি হওয়া এই সমাজকেও শুদ্ধ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে বিশিষ্টজনদের। তাঁদের ব্লগসাইটে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই এই বিকৃত মানসিকতার লোকেরা অবদমিত হবে।
‘মুক্তচিন্তার প্রকাশের মাধ্যম হলেও অন্যকে হেয় করবে, এমন কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না। কর্তৃপক্ষকে যথাযথ সঞ্চালক বা মডারেটরের মাধ্যমে এসব ব্লগ বিবেচনায় নিতে হবে। এ ছাড়া ফেসবুকে নিজের মডারেটর নিজেকেই হতে হবে। যাতে ওয়ালে কোনো আজেবাজে লেখা না থাকে। অন্যরা দেখতে না পায়। কারও এ ধরনের প্রবণতা থাকলে শুরুতে সতর্ক করে দিতে পারেন। তাতে কাজ না হলে বন্ধুতালিকা থেকে বাতিল করে দেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, শুধু ভার্চুয়াল জগতে নয়, বাস্তব জীবনেও এসব পুরুষের বিকৃত মানসিকতার শিকার হন নারীরা। নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ থাকবে। এটি খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা নারীর জন্য লাঞ্ছনার শামিল হয়। যেসব পুরুষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বা নিপীড়ক হিসেবে নারীকে হেনস্তা করে, তাদের কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। তবে পরিবার থেকেই এর শুরু হতে হবে। এর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। দেখতে হবে, এসব সামাজিক যোগাযোগের সাইটে কোন পর্যায়ে গেলে তা নারীর নির্যাতন হয়। যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে হবে, সে সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। অন্য কোনো নির্যাতন বা হুমকির সম্মুখীন হলে থানায় গিয়ে জিডি করা যায়। কিন্তু এসব মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হলে জিডি করার কোনো নিয়ম আছে কি না, তা জনগণকে জানাতে হবে। সাইবার ক্রাইম নিয়ে আইন থাকলেও সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তেমন সচেতনতা নেই। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আইন হলেও এর যেন কোনো অপব্যবহার না হয়। নারীকে অপদস্থ করে তারা আনন্দ পায়। এটা কোনো কোনো পুরুষের নৈতিক অবক্ষয়ের আরেকটি প্রকাশ। মনে রাখতে হবে, এর মাধ্যমে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। তবে আইনের সঠিক ব্যবহার হলে শাস্তির ভয় থাকে।
পাইল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেডের মাহমুদুল হাসান বলেন, এই সমস্যা এক দিনে সমাধান করা যাবে না। মানুষের মানসিকতা, মূল্যবোধ ও আচার আচরণ সংযত করতে হবে। পরিবার থেকে যদি এসব শিখে আসে, তাহলে তার পক্ষে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। সেখানেই নারীকে সম্মান দিতে শেখাতে হবে।
অন্যকে শ্রদ্ধা করার বিষয়টি শেখানো যাবে না। এ নিয়ে ফেসবুক ব্লগে ইতিবাচক পোস্ট লিখতে হবে। এ ধরনের জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। এ ছাড়া অনলাইন মানববন্ধন করা যেতে পারে। এতে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটবে।

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site