Showing posts with label গদ্য. Show all posts
Showing posts with label গদ্য. Show all posts

Thursday, April 12, 2012

খানিক ছফানামা

by কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর |
জুলাই ২০১০ ৯:২৫ অপরাহ্ন

আহমদ ছফার প্রতি একধরনের মোহাবিচ্ছিন্নতা যে কখন থেকে আমার শুরু হয়েছিল তা নির্ণয় করা অনেকটাই দুঃসাধ্য। আমার এ কথকতার শুরুতেই বলে নিতে চাই, দীর্ঘদিন তার প্রতি ছিল আমার দারুণ মোহগ্রস্ততা। তা হয়ত প্রায় একই রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে হতে পারে, তার সৃজনকৃত মুগ্ধতার সমান্তরাল কোনো আকাঙ্ক্ষা থেকেও হতে পারে, নাকি বিকল্প ভাষাগত কোনো চৈতন্য থেকে আমার বোধে এল তা এই মুহূর্তে নির্ণয় করা মুশকিলই। তার লেখালেখির অনুভব থেকে চিন্তা করলে আমি একধরনের প্রেমে পড়ি তার গ্রন্থ বঙ্কিমচন্দ্র: শতবর্র্ষের ফেরারী পাঠ করে। বঙ্কিমকে যে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে একেবারে মুক্তচিন্তার সমাজতাত্ত্বিক চৈতন্য থেকে এভাবেও দেখা যায় তা আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়ের ব্যাপার। আমি এর প্রতি এতই আকর্ষণ বোধ করি যে তার এ গ্রন্থটি নিয়ে রীতিমতো একটা লেখাই নির্মাণ করে ফেলি এবং তা স্থানীয় দৈনিক আজাদীর সাময়িকীতে ছাপতেও দিই।

এ লেখাটি যখন বের হয় তখন ছফা তখন নবউত্থান পর্বের (!) কর্ণধার। আমি সেইসময় গ্রন্থসংগ্রহের নিমিত্তে আজিজ সুপার মার্কেটে যাই। আমি তখন চাইলেই বিকালে তথায় তার সাথে দেখাও করতে পারতাম। কিন্তু ব্যক্তিগত নির্লিপ্ততার জায়গায় নিজেকে সঁপে দিয়ে আর সেখানে গেলাম না। এ ব্যাপারে আমার সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমি আমার ভালো লাগা থেকে একটি কিছু লিখে ফেলেছি, তা আবার নিজ উদ্যোগে তাকে তা জানাব কেন?! কিন্তু তাতে এটাই হল যে, এ লোকটির সাথে আমার আর সরাসরি দেখা হল না।

যাই হোক, ছফা বিষয়ে আমার আরও একটা আগ্রহের কারণ হচ্ছে, আবদুর রাজ্জাক বিষয়ে তার অতি আগ্রহ, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, বাঙালী মুসলমান সম্পর্কে কিছু নতুন কথাবার্তা বলা, স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালানো, তার বলার ভিতরে নিজস্ব রাগ-জেদ-চৈতন্য লালনের চেষ্টা, কথাসাহিত্য চর্চায় তার একধরনের ব্যাকুলতা, ফাউস্ট অনুবাদকরণ।

বাঙালী মুসলমানের মন পড়তে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে তিনি আসলে কোন্ বাঙালির মননকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন, তা তার প্রবন্ধে স্পষ্ট হয়নি। তার দেখার বাঙালিত্বে কি তিনি নিজেও আছেন? একটা সময়ে মনে হয়েছে তিনি নিজেকেও তার দেখা বাঙালিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেননি। তার সৃষ্ট বাঙালির মনের গভীরে একধরনের সংস্কার আছে। তার দেখা মুসলমান কখনও পবিত্রতা দেখতে ভুল করেন না। এরা সঠিক দিশা পাচ্ছে না। এই মুসলমান সমাজ সংস্কারের প্রতি ব্যাকুলতা প্রকাশ করে, তারা তাদের মননে একধরনের আদিমতা জারি রাখে। তার সৃষ্ট ‌’বাঙালী মুসলমানের মন’-এ কখনও ভাববাদী প্রাবল্যমুখর প্রবণতাকে দেখেন না, তার সৃষ্ট বা দেখাতে সমস্যা শুধু একটাই, এই মুসলমানগণ যথার্থ শিক্ষিত-সংস্কারমুক্ত মুসলমান হতে পারেনি। এবং তিনি চাইতেন মুসলমানদের মননের যথোচিত সাধন-ভজন করে মহান কিছু কার্য সিদ্ধি করা যায় কিনা। তিনি এও বিশ্বাস করতেন, এই কাজটি আমাদের দেশের ভাষাভিত্তিক বুর্জোয়া দলটি করতে পারবে না; কারণ তারা মুসলমানদেরকে দেশজ অনুসঙ্গ থেকে বিচার করতে জানে না।

তাই তো তিনি একধরনের সাধনায় নামেন, শেষজীবনে তিনি লিবিয়ার অনুসরণে ইসলামি সমাজবাদ কায়েম করতে চান, ইসলামি নানাবিধ জলসায় গমন করেন, ওয়াজ মাহফিলের প্রতিও অনুরক্ত হতে থাকেন। এখানে একটা প্রশ্ন রাখা যায়; যে রাগ, গোস্বা, অভিমান থেকে আবুল ফজল কর্তৃক সরকারি প্রাপ্তিযোগে প্রয়োজিত সিরাত মাহফিলে যোগদান কল্পে ইসলামি কার্যকলাপের নমুনা দেখে তিনি অতিশয় বিস্মিত হন, এবং স্বল্পসময়ের ভিতর ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ (আসলে এটির শিরোনাম হতে পারত, বাঙালী শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমানের মন) লিখে ফেলেন। ছফা যে মনোবেদনা নিয়ে এটি সৃজন করেন, একই কার্যবিধিতে তিনি নিজেও কি একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েননি? আসলে তার মনোভাবের বড়ো শক্তি হচ্ছে তার তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতা বা মনোপীড়াই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। যার ফলে মাণিকের পদ্মানদীর মাঝি’র হোসেন মিয়া, যিনি হয়ত-বা যান্ত্রিক সমাজবাদের ধারক, বেয়াদব পুঁজির পূজারি, অপব্যবসার অংশীদার, কুবেরের মতো সরল-সোজা মানুষটাকে চোর-পুলিশের ধাঁধায় ফেলে ময়নাদ্বীপে পাচার করার মেইন হোতা, সেই তিনিই ছফার দৃষ্টিতে হয়ে পড়েন নব্য মেঘনাদ! তার কারণ ছফার কাছে মনে হয়, হোসেন মিয়া মুক্তচিন্তার ধারক! অথচ একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, হোসেন মিয়ার যাবতীয় কর্মে আছে শ্রেণীস্বার্থের নিবিড় লালন। শ্রেণীদ্বন্দ্ব বা শ্রেণীর পূজারিদেরকে সেইভাবে চিনতে চান না বলেই ছফা ‘৭২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে থাকেন খুবই উৎফুল্ল।

আসলে ছফাকে পাঠ করার জায়গাটাই তার মুগ্ধতা বা বিমোহিত ভাবকে আমাদের মনে রাখা খুবই দরকার। এটা আমাদের চৈতন্য বিকাশের একটা দায়ও বটে।

original post

read more

কর্ণফুলীর ধারে

by আহমদ ছফার

sofa_43.jpg
আহমদ ছফা

ভূমিকা / নূরুল আনোয়ার

আহমদ ছফার লেখা কেউ ছাপতে চাইত না, সেই কষ্টের কথা আমরা কম বেশি জানি। তিনি পত্রপত্রিকায় কবিতা পাঠালে ছাপার অযোগ্য বিবেচনা করে সম্পাদক সাহেবেরা তা দলামোচড়া করে ময়লার ঝুঁড়িতে ফেলে দিতেন। কবিতা লিখেন অথচ কোন পত্রিকা ছাপে না এটা বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে প্রচার পেয়ে গিয়েছিল। ব্যাপারটি তাঁকে এক রকম লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। লজ্জা থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় তিনি একদিন সংবাদ পত্রিকার অফিসে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন সন্তোষ দাশগুপ্ত। আহমদ ছফা তাঁর লেখা কবিতা সন্তোষবাবুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন পত্রিকায় ছাপার জন্য। সন্তোষবাবু কবিতায় আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে প্রশ্ন তুললেন, বাবা আছে?

আহমদ ছফার জবাব, নাই।

ভাই আছে?

আহমদ ছফার জবাব, আছে।

আহমদ ছফা জানতে চাইলেন, এসব জানার কারণ কী।

সন্তোষবাবু বললেন, চিঠি দেব যেন সহসা তোমাকে বিয়ে করায়। কবিতার নামে যারা মিনি বিড়ালের মত সঙ্গী খোঁজে তাদের ওষুধ বিয়ে করা।

আহমদ ছফা এসমস্ত কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি সন্তোষবাবুর ওপর ক্ষেপে গিয়ে পুরো অফিসটা মাথায় তুলে ফেলেছিলেন। সন্তোষবাবু যা ইচ্ছে বলে যাবেন আর আহমদ ছফা ছেড়ে দেবেন তা কী করে হয়? যাহোক, অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ঝগড়া তাঁদের মধ্যে চলছিল। এমন সময় পাশের ঘর থেকে রণেশ দাশগুপ্ত বেরিয়ে এসে তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আহমদ ছফাকে টেনে নিয়ে গিয়ে তাঁর ঘরে বসিয়েছিলেন। রণেশবাবুকে আহমদ ছফা চিনতেন না। রণেশবাবুও না। তিনি আহমদ ছফাকে সতর্ক করে দিলেন সন্তোষবাবু পাগল কিসিমের লোক। সুতরাং তাঁর কথায় যেন কিছু মনে না করেন। রণেশবাবুর কথা শুনছিলেন বটে, কিন্তু আহমদ ছফা মনে মনে ঠিক করেছিলেন সন্তোষবাবু বেরুলেই পিটাবেন। এজন তিনি একটা চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষাও করছিলেন। যে কারণেই হোক সেদিন সন্তোষবাবুর গায়ে হাত তোলার মত অপকর্মটি তিনি করেননি। পরবর্তীতে আহমদ ছফা সন্তোষবাবুকে গুরু হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।

যাহোক, রণেশবাবু কথা দিয়েছিলেন তাঁর কবিতা পত্রিকায় ছাপা হবে। তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। ‘সংবাদ’ পত্রিকায় একনাগাড়ে আহমদ ছফার চার চারটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। তারপর রণেশবাবু তাঁকে বলে যেতে থাকলেন, তুমি তো কৃষক সমিতি নিয়ে কাজ করেছ, ওসবের ওপর গদ্যে কিছু লিখ না কেন?

আহমদ ছফার ধারণা হয়েছিল কবিতার নামে যে অখাদ্য তিনি লিখে চলেছেন তা ছাপতে রনেশবাবু রাজি নন। তিনি প্রশ্ন তুললেন, আমার কবিতা কি ছাপার অযোগ্য?

রণেশবাবু বললেন, তা হবে কেন? যারা কবিতা লিখে তারা তো গদ্যে লিখতে পারে না। তোমার অভিজ্ঞতা আছে, যদি লেখার হাত থাকে ইচ্ছে করলে কাজে লাগাতে পার।

রণেশবাবুর পরামর্শ আহমদ ছফার মনে ধরেছিল। তিনি কানুনগোপাড়া আশুতোষ কলেজে অধ্যয়নের সময় রেললাইন উপড়ে ফেলার কারণে পুলিশের নজরে এসেছিলেন। ফলে তাঁকে এলাকা ছেড়ে গহীন অরণ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। প্রায় দু’ বছর তিনি ওসব এলাকায় ছিলেন। ওখানে থেকে তিনি কিছু দুর্লভ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। চন্দ্রঘোনা কাগজের কলের জন্য একমাত্র কাঁচামাল ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঁশ। এই বাঁশ সংগ্রহ করা মোটেই সহজ ছিল না। পাহাড়ি দুর্গম পথ কেটে কেটে এসব বাঁশ সংগ্রহ করা হত। কিন্তু এই বাঁশ সংগ্রহের জন্য শ্রমিক যোগাড় করা ছিল কঠিন কাজ। ঠিকাদারদের দালালেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে লোভ দেখিয়ে শ্রমিকদের ধরে আনত। কোন রকমে শ্রমিক নিয়ে আসতে পারলেই তারা তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে কাজ আদায় করত। তাদের তেমন একটা মজুরিও দেয়া হত না। এসব কা-কারখানা আহমদ ছফার কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তিনি মনে মনে স্থির করেছিলেন এই শ্রমিক নির্যাতনের ওপর একটি লেখা লিখবেন। সে রাতেই তিনি লেখাটিতে হাত দিলেন। লেখাটির নাম দিয়েছিলেন ‘কর্ণফুলীর ধারে’। লেখাটির প্রথম কিস্তি লিখে যখন রণেশ দাশগুপ্তের হাতে এনে দিলেন তিনি বললেন, বেশ তো হচ্ছে, লিখে যাও।

ওই সপ্তাহে লেখাটি সংবাদের উপসম্পাদকীয়তে ছাপা হয়ে গেল। তখন সংবাদের আর্থিক অবস্থা তত ভাল ছিল না। সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতনও ঠিকমত দেয়া যেত না। লেখাটি ছাপা হলে আহমদ ছফা রণেশবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি লেখাটি পুরোটা শেষ করার জন্য তাগাদা দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাঁকে চা খেতে দিয়ে ক্যাশিয়ার আইয়ুব সাহেবের কানে কানে কী যেন বললেন। আইয়ুব সাহেব আহমদ ছফাকে পঁচিশটি টাকা এনে দিলেন। রণেশবাবু তখনও সামনে বসা। তিনি হেসে বললেন, তোমার লেখার যৎসামান্য সম্মানী।

একটা লেখা লিখে এত টাকা পাবেন আহমদ ছফা ভাবতেই পারেননি। তাঁর মতে, ওই সময় ওই টাকা দিয়ে একটা বড়সড়ো খাসি কিনতে পাওয়া যেত।

আহমদ ছফা টাকার লোভে লোভে লেখাটি লিখে যেতে থাকলেন। প্রতিটি কিস্তি ছাপার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পঁচিশ টাকা দিয়ে দেয়া হত। ঘাপলা বাঁধল তখনই যখন তিনি ষষ্ঠ কিস্তি শেষ করলেন। আইয়ুব সাহেব বলে বসলেন তাঁকে আর টাকা দেয়া যাবে না। আহমদ ছফা গেলেন ক্ষেপে। তিনি ধরে নিলেন অল্প বয়সী বলে আইয়ুব সাহেব তাঁর টাকাটা মেরে দিচ্ছেন। যখন তিনি টাকার জন্য চাপাচাপি আরম্ভ করলেন আইয়ুব সাহেব বললেন, আপনাকে টাকা দেব কোত্থেকে। রণেশদার বেতনের টাকাটা আপনাকে সম্মানী হিসেবে দিয়েছি। তিনি এক শ’ পঁচিশ টাকা বেতন পান। পাঁচ কিস্তিতে সব টাকা আপনাকে দিয়ে দিয়েছি। এখন আর অবশিষ্ট নেই। কথাটা শোনার পর আহমদ ছফা লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি লেখাটা আর লিখেননি। রণেশ দাশগুপ্তের এই উদারতার কথা তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন।

‘কর্ণফুলীর ধারে’ লেখাটির বিশেষত্ব হল এটি আহমদ ছফার প্রথম প্রবন্ধ। সংবাদ পত্রিকায় উনিশ শ’ পঁয়ষট্টি সালের দশ জুন এটি ছাপা হয়েছিল। লেখাটি সম্প্রতি বাংলা একাডেমী পত্রিকা লাইব্রেরী থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রথমে ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তুলে প্রিন্ট করে আবার মূল কপির সঙ্গে মিলিয়ে লেখাটি উদ্ধার করা হয়েছে। পত্রিকাগুলি অনেক পুরনো ও জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ফটোকপি করা যায় নি।

আমরা ধরে নিয়ে ছিলাম এ লেখা আর কোনদিন খুঁজে পাব না। ভাগ্য আমাদের নিরাশ করেনি। আশা করছি, আগামী একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিতব্য আহমদ ছফা রচনাবলির ‘উত্তরখণ্ডে’ তা অন্তর্ভুক্ত হবে। ২৮ জুলাই আহমদ ছফার নবম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর এই মৃত্যুবার্ষিকীকে সামনে রেখে লেখাটি পাঠকদের উৎসর্গ করা হল।


কর্ণফুলীর ধারে

কর্ণফুলীর আরেক নাম সোনাছড়ি। স্থানীয় লোকেরা বলে কর্ণফুলীর বুকে ফি বছর শুধু পলিমাটির সোনা নয়, বাঁশ, কাঠ, ছন, বেত, তরিতরকারি আরও রকমারি সোনা ভেসে ভেসে দূর-দূরান্তের দেশ হতে বিদেশে চলে যায়। বারবার হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে মালের যেমন কদর বাড়ে, তেমনি বাড়ে মুনাফার অঙ্ক। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবটুকু ছোট-বড় পাহাড়ে পর্বতে ঘেরা। এসব পাহাড়ে মগ-চাকমা এবং অন্যান্য আদিবাসীরা ‘জুম’ চাষ করে। সমতল ভূমিতে রোপণ করে ধান, সর্ষে, কচু ইত্যাদি। এছাড়া সমগ্র-পার্বত্য অঞ্চল বাঁশ, গাছ, ছন, বেত আরও কত বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ।

প্রায় এক যুগ হতে চলল সরকারি কর্তৃপক্ষ বনজ সম্পদের সদ্ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় করা এবং জনসাধারণের জীবিকার মান উন্নয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার চন্দ্রঘোনায় কাগজের মিল স্থাপন করেন, যে কাগজের কলকে সরকারি নথিপত্রে এবং স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজের কল বলা হয়ে থাকে। কাগজের কলে বাঁশ পেষাই করে নানারকমের যান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নানা রকম কাগজ বানানো হয়। এখন কথা হল এশিয়ার বৃহত্তম পেপার মিলের উদরপূর্তির জন্য যে পদ্ধতিতে বাঁশ আমদানি করা হয়—তাই নিয়ে। পদ্ধতিটা রয়ে গিয়েছে অতীতের অন্ধকার গর্ভে। মিলের অন্তত তিরিশ চল্লিশ মাইলের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য বাঁশের বন নেই। গভীর পার্বত্য অঞ্চল—পাহাড়ি পথে মিলের থেকে যে সব এলকার দূরত্ব এক শ’ মাইলেরও বেশি অনেক সময় প্রতিবেশী দেশের বর্ডারের কাছাকাছি সেসব অঞ্চলেই নিবিড় বাঁশের বন। একেকটা বাঁশ ইয়া মোটা—আশি, এক শ’ ফুট লম্বা। পাটের বনের চেয়েও বাঁশের বন ঘন। বাঁশের পাতার আড়াল দিয়ে রাতের কুয়াশা মাটিতে পড়ে না, সকাল নয়টা-দশটার আগে ঠিক মত সূর্য দেখা যায় না। পাহাড়িয়া জন্তু, হাতি, ভালুক এমনকি বানরও এসব বাঁশবনে বাস করতে পারে না। চারদিকে শুধু বাঁশ-বাঁশ আর বাঁশ।

মিল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বাঁশের ঠিকাদারেরা কুলি দিয়ে বাঁশ কাটায়। বাঁশ কাটাবার সময় আগাগোড়া দুদিকে ফেলে দিয়ে শুধু মাঝের অংশটুকুই নিয়ে থাকে। এতে করে একটি বাঁশের তিন-ভাগের দুভাগ অপচয় হয়। একটা কাঁচা বাঁশের দুদিকে দুটো পুরনো বাঁশ না থাকলে ঝড়ের সময় সবগুলো বাঁশের আগা ভেঙে যায়। ঠিকাদার এবং মিলের কর্মচারীদের কর্তব্যের অবহেলার দরুন অনেক বাঁশের বন ইতোমধ্যেই আগা ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। সে যা হোক, কুলিরা বাঁশ কেটে আঁটি বেঁধে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে হাজার হিসেবে জমা করে। এসব কাটা বাঁশকে নিকটবর্তী ছড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে ছোট ছোট ছড়ার তীর পর্যন্ত রাস্তা কাটা হয়।

এ রাস্তা তৈরির কন্ট্রাক্টর যারা তারা প্রায় সকলেই স্থানীয় লোক নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেসব অঞ্চলে পার্বত্য অধিবাসী মগ মুরংয়েরাও কোনদিন যায়নি ওসব জায়গায় মাটি কাটার জন্য কিভাবে কুলি সংগ্রহ করে এবং কুলিদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করে তাই-ই আমার বলার বিষয়। তার আগে বাঁশ কিভাবে চন্দ্রঘোনায় গিয়ে পৌঁছে সে বিবরণটুকু দিচ্ছি।

একেকটা রাস্তার দূরত্ব ত্রিশ-চল্লিশ মাইল এবং সময়ে সময়ে আরও বেশি হয়ে থাকে। কন্ট্রাক্টারেরা এক মাইল আধ মাইল করে রাস্তার কন্ট্রাক্ট নেয় এবং কুলিদের দিয়ে রাত দিন অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে দু’তিন মাসের মধ্যে রাস্তা করে ফেলে। রাস্তা করার সময় মাঝে মাঝে বৃত্তাকার টার্নিংও কুলিদের দিয়ে তৈরি করায়। ওইসব টার্নিংয়ে লুপ লাইন বসিয়ে প্রায় আধ মাইল স্থানের কাটা বাঁশ এক জায়গায় জড়ো করা হয়। এভাবে সমস্ত টার্নিংগুলোতে কাটা বাঁশ জড়ো করা হলে পরে ছয় চাকা বিশিষ্ট ট্রাকগুলো কাটা রাস্তার উপর দিয়ে বাঁশ নিয়ে যায় নিকটবর্তী ছড়ির কাছাকাছি। ঠিকাদারের মাইনে করা মজুরেরা প্রতি বাঁশের আগায় দুটো ফুটো করে ফুটোর মধ্য দিয়ে একটি বাঁশের চাঁদা ফালি ঢুকিয়ে দিয়ে চালি বা ভেলা বাঁধে। তারপর এসব ভেলা ছড়ির জলে ভাসিয়ে ভাসিয়ে মজুরেরা কর্ণফুলীতে নিয়ে যায়। কর্ণফুলীর বুকে ভাসতে ভাসতে যখন কাপ্তাই বাঁধের কাছে ভেলাগুলো পৌঁছে তখন আবার ভেলা খুলে ফেলা হয়। আঁটি বেঁধে ট্রাকে তোলা হয়। ট্রাকে করে বাঁধ অতিক্রম করার পর নদীর জলে নামিয়ে আবার ভেলা বাধবার পালা। এই ভেলা ভেসে ভেসে চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের কাছে এলে ঠিকাদারেরা মিল কর্তৃপক্ষের কাছে অপেক্ষাকৃত বেশি লাভে বাঁশ বিক্রি করে দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে ঘরে চলে যায়। ভেলা খুলে আবার আঁটি বেঁধে দুটো লোহার হুক লাগিয়ে ঘূর্ণায়মান লুপ লাইনে আঁটি আঁটি বাঁশ তুলে দেওয়া হয়। চোখের পলকে বাঁশের আঁটিগুলো পেষণ-যন্ত্রের উদরে চলে যায়, তারপর এ-কল, সে-কল এমনি হাজারও মেশিন ঘুরে আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে আসছে গাঁইট গাঁইট তৈরি কাগজ।

এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন। সবসময় ঠিকাদারদের বাঁশের চালান চলছে এবং সে সঙ্গে রাস্তাও কাটা হচ্ছে। এ বছর একদিকে রাস্তা কাটলে পর বছর আরেকদিকে, যেদিকে বাঁশের বন আরও নিবিড়, সেদিকেই রাস্তা কাটা হয়, পাহাড়িয়া ভূমির উর্বরতা শক্তি খুবই বেশি, কাটা রাস্তা তিন মাসের মধ্যেই ঝোপ-ঝাড়-আগাছা ইত্যাদিতে ঢেকে যায়। দু’তিন বছর পর আগের পাহাড়ে বাঁশ কাটলেও আবার রাস্তা বানাতে হয়। ঠিকাদারেরা ছুটে আসে এবং ধাপ্পাবাজদের দিয়ে কি জঘন্য পদ্ধতিতে দূরদূরান্ত থেকে মজুরদের ভুলিয়ে এনে আধমরা করে ছেড়ে দেয়। এই মজুরদের অনেকে পরিবার পরিজনের মুখও দেখতে পায় না; পাহাড়িয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে কি নিদারুণ দুঃখে ওখানেই প্রাণ হারায় সেকথা এর পরে বলব।


ঠিকাদারদের যারা কুলি সংগ্রহ করে দেয় তাদেরকে স্থায়ী পরিভাষায় ‘মাঝি’ বলা হয়ে থাকে। কুলি যোগাড় করার পূর্বে ঠিকাদার এবং এসব মাঝি অথবা কুলি চালানীদের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুসারে প্রত্যেক কুলির প্রত্যেক রোজের যা মাইনে তার থেকে চার আনা করে পায়। ঠিকাদারেরা এসব আড়কাঠিদেরকে আগাম টাকা দিয়ে দেয় কুলি সংগ্রহ করার জন্যে।

ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাঝিরা কুলি সংগ্রহের জন্য কোন গ্রামে যায় না। কেন গ্রামে যায় না তা পরে বলব। তারা টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসে এবং মাদারবাড়ি, নালাপাড়া ইত্যাদি অঞ্চলের সস্তা আট-দশটা ঝুপড়ি ঘর ভাড়া করে রেখে দেয় এবং ওসব ঘরে সব সময় ঢালাও চাটাইয়ের বিছানা পেতে রাখে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। ওসব ঘরে দিনে এক আধবার ঠিকাদার বা ঠিকাদারের লোক এসে ঘরে খবর নিয়ে যায়, কতজন যোগাড় হল।

মাঝি বা আড়কাঠিরও আবার অনেক চর আছে। তারা সারাদিন সারা শহর চষে বেড়ায়। সুবিধা মত কোন মানুষ পেলেই এসব ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে আসে। চার-পাঁচজন অথবা আরও বেশি লোককে এক সঙ্গে তারা কখনও কাজের কথা বলে না। ওভাবে কুলি সংগ্রহ করতে গেলে বেশ একটু ঝুঁকি নিয়ে হয়। তাই তারা একলা মানুষকেই সব সময় প্রলুব্ধ করে বেশি।

চট্টগ্রাম শহর এদেশের শ্রেষ্ঠ বন্দর হওয়ায় কাজের আশায় আশেপাশের কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং আরও কিছু জেলার লোকেরা কাজ-কর্মের অনুসন্ধানে আসে। যারা কাজের অনুসন্ধানে একজন অথবা দুজন এমনিভাবে আসে তারা গাঁয়ের সরল মানুষ। অনেকে আগে কর্মব্যস্ত শহর কি জিনিস তা কোনদিন দেখেনি। সকলের তো আর চেনাজানা মানুষ শহরে থাকে না। গাড়ি থেকে কাঁথা বালিশ বগলে, জুড়ি কোদাল কাঁধে এসব মানুষ হঠাৎ যানবাহন, গাড়ি-ঘোড়া, লোক-লস্কর দেখে একদম হতবুদ্ধি হয়ে যায়। আগের অভ্যাস না থাকায় রাস্তায় ঠিকমত চলতে পারে না। মোটরকার ইত্যাদি যানবাহনের দুর্ঘটনার ভয়ে খুবই সন্তর্পণে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটে। আড়কাঠির চেলারা তখন এসব মানুষের অনুসরণ করে। তাদের সঙ্গে একেবারে দরদী বন্ধুর মত ব্যবহার করে। রাস্তা চিনিয়ে দেয়। পকেট থেকে বিড়ি বের করে খেতে দেয়। এমনকি চা-নাস্তাও খাওয়ায়। লোকগুলোর মন কৃতজ্ঞতায় যখন ভরে ওঠে তখনই সুযোগ বুঝে কন্ট্রাক্টরের গুণপনা বর্ণনা করে। অনুরোধ করে, “চলুন না আমাদের কন্ট্রাক্টর সাহেবের সঙ্গে। তিনি খুবই পরহেজগার মানুষ, পাঁচবেলা নিয়মিত নামাজ-পড়েন, কারও হকের পয়সা কখনও মাটি করেন না।” তাদের পরোপকার বৃত্তি এবং ঠিকাদারের মাহাত্ম্যে মোহিত হয়ে ঝুপড়ি ঘরগুলোতে উঠে আসে। আড়কাঠিরা তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বলে, আপনাদের কোনও চিন্তা নেই। এখানে খান আর ঘুমান, কন্ট্রাক্টর সাহেব খুবই দয়ালু লোক। তিনি আপনার গাঁট থেকে আপনাদের খাওয়া-পরার বন্দোবস্ত করেছেন।

শুধু গাঁয়ের লোক কেন অনেক শহর চেনা মানুষও দালালদের প্রলোভনে মুগ্ধ হয়ে এসব ঝুপড়ি ঘরে এসে ওঠে। কেমন করে ভাই বলছি। কোন ফ্যাক্টরি, মিল অথবা দোকানের কর্মচারীরা যখন চাকুরি হারায় অনেকের গাঁটে তখন দেশে ফিরে যাবার পয়সা থাকে না। অনেকে আবার শহরের চাকচিক্য ছেড়ে গ্রামে যাওয়াটা মনের দিক থেকে অনুমোদনও করতে পারে না। অথচ তাদের খাবার পয়সা নেই। এসব চাকুরিহারা লোকগুলোর প্রতি ওরা নজর রাখে। চাটগাঁ শহরের লালদীঘির পাড়, জিয়া পার্ক, স্টেডিয়াম, রেলওয়ে স্টেশন, সদরঘাট ইত্যাদি অঞ্চলে অন্নহীন-বস্ত্রহীন অনেক মানুষ দিনরাতে ক্ষুধিত কুকুরের মত ঘুরে বেড়ায়। দালালেরা অগ্রণী হয়ে এসব মানুষের সঙ্গে আলাপ জমায়। দুঃখে নানারকম সহানুভূতি, সান্ত্বনার বাণী উচ্চারণ করে, পানটা বিড়িটা খেতে দেয়। ওসব অভুক্তের মনের অবস্থা এমন তারা একবেলার ভাতের বিনিময়ে যে কোন কাজ করতে রাজি। এভাবে দিনে দিনে বর্ণিত স্থানগুলো হতে নতুন নতুন কাজের মানুষ ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে আসে। তবে তাদের একটা নিয়ম হল, পঞ্চাশের উপরে যাদের বয়স, যারা কঠোর পরিশ্রম করতে পারে না অথবা যারা খুবই দুর্বল তাদেরকে দালালেরা প্রলুব্ধ করে না।

এছাড়া আরও আছে, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিয়েছে এমনি অনেকে মা-বাপের ওপর রাগ করে টাকা-পয়সা চুরি করে শহরে চলে আসে। শহরে এসে অবিবেচকের মত দু’হাতে খরচ করে সব টাকা উড়িয়ে উপোষ করে থাকে। কি খাবে, ঘুমাবে কোথায় ইত্যাদি নানা সমস্যার জর্জরিত অবস্থায় দু’চোখে যখন অন্ধকার দেখে তখনই ওদের সামনে হাজির হয় দালালেরা। মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে আসে। এদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক হাইস্কুলেরর নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্রও আমি দেখেছি। স্কুলের নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্ররা সাধারণত একটু কল্পনাপ্রবণ হয়ে থাকে। অ্যাডভেঞ্চার বা অভিযানের নেশা তাদের এমনভাবে পেয়ে বসে যে, কোন একটা ছুতো পেলেই শিক্ষক অথবা অভিভাবকের সঙ্গে ঝগড়া করে অথবা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে কিছু টাকা পয়সা নিয়ে শহরে চলে আসে। শহরে এসে তারা সে একই অবস্থার সম্মুখীন হয়। তখন দালালেরা তাদের কাছে এসে কেরানি, পিওন ইত্যাদি চাকুরির লোভ দেখিয়ে প্রলুব্ধ করে ঝুপড়িতে নিয়ে যায়। দিনের পর দিন মানুষ বাড়ে, মোটা চাল আর ডাটা জাতীয় তরকারি রান্না করা হয় দু’বেলা। অভুক্তেরা খেতে পেয়ে একটু তাজা হয়ে ওঠে। মজুরেরা কাজ পেয়েছে একথা ভেবে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

এতেই শেষ নয়। ওরা ছোট ছোট ছেলেদেরকেও ফাঁদে ফেলে। সুশ্রী, ফর্সা চেহারার ফুটফুটে সুন্দর ছেলেরা যখন অসহায়ভাবে চলমান পথের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন দালালেরা এসে একান্ত আত্মীয়জনের মত পিঠে হাত বুলিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। অনেক গৃহপালানো ছেলে কেঁদে কেঁদে তাদের মা-বাপের কথা বর্ণনা করে। দালালেরা আশ্বাস দেয় তাদেরকে তাদের বাপ-মায়ের কাছে পৌঁছে দেবে বলে। এটা সেটা কিনে দিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। তারপর তারা ছেলেদেরকে নির্জন ঘরে নিয়ে রাখে। সাধারণ কুলিরা তো তখনও কিছু জানতে পারে না।

কাপ্তাইয়েরও এক শ’ দেড় শ’ মাইল ওপরে যেখানে সত্যিকার অর্থে বাঘ-ভালুকও যায় না সেসব নারী-বিবর্জিত অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে কিভাবে তাদের পাশবিক বৃতি চরিতার্থ করে সে কথা যথাসময়ে বলব।

মাস পনের দিনের মধ্যেই ঝুপড়িগুলো ভরে ওঠে মানুষে। যাওয়ার আগের দিন কুলিদের কার পেছনে কত খরচ হল তা আড়কাঠি এবং ঠিকাদারের লোকেরা গোপনে হিসেব করে লিখে রাখে।

তারপর এসব মানুষদেরকে ঠিকাদারের হাতে তুলে দেয় আড়কাঠিরা। ঠিকাদার সব কিছু বুঝে নিয়ে এক সকালে সকলকে নিয় লঞ্চে উঠে। কর্ণফুলীর জলে ঢেউ তুলে লঞ্চ উজানের দিকে ছুটে যায় সিটি বাজিয়ে।

লঞ্চ সেদিনই সন্ধ্যায় কাপ্তাই এসে পৌঁছে। কাপ্তাইঘাটে লঞ্চ থামলে পরে ঠিকাদারের মানুষেরা তাদের আনা মানুষের দিকে কড়া নজর রাখে, যাতে কেউ ফাঁকি দিয়ে নেমে যেতে না পারে। সব যাত্রী নামবার পর গুণে গুণে তারা এসব মানুষদের নামায়। কাজটি এত সতর্কতার সঙ্গে করে যে, কুলিদের কেউ টেরও পায় না। কাপ্তাইয়ের সস্তা কোন হোটেলে কিছু নাস্তা ইত্যাদি খাইয়ে তাদেরকে নিয়ে যায় সামনের পাহাড়ের উপরের পথ দিয়ে।

কেউ কেউ ঠিকাদারের মানুষদেরকে প্রশ্ন করে কাপ্তাই তো এসে গেলাম। এখন আবার কোথায় যেতে হবে? ওরা শুধু বলে, আরে মিয়ারা, চল - আসল কথা জানতে দেয় না। ওই দিনই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সকলে কাপ্তাইয়ের প্রায় দু’মাইল ওপরে রাইংখং বাজারে এসে পৌঁছে। টাউটেরা আসল কথা ভুলাবার জন্য তাদেরকে গান গাইতে বলে। নিজেরা নানা কেচ্ছা কাহিনীর অবতারণা করে। পাহাড় দেখেনি দলের অনেকে। একদিকে পাহাড় এবং অন্যদিকে যন্ত্রের কর্মব্যস্ততা ইত্যাদি দেখে অনেকেরই প্রাণ আপনা-আপনি আনন্দে নেচে ওঠে। গলা দিয়ে হঠাৎ নতুন কিছু দেখার আনন্দে গান বেরিয়ে আসে। যুবকেরা এই মগ-চাকমার আজব দেশের তরুণীদের গল্প করতে করতে মৌজ করে পথ চলে। রাইংখং রাজার থেকে যে হাঁটা দিয়েছে, একটু পরেই ক্ষুধায় তাদের পেট চিন চিন করে ওঠে। আর বিজলীবাতি নেই। পাহাড়গুলো উঁচু হতে উঁচুতর হচ্ছে। দু’পাশে নিবিড় বন। সরু পথে হাঁটতে তাদের গা ভয়ে ছম ছম করে, বুকে আশঙ্কা দোলা দিয়ে যায়, যাচ্ছি কোথায়? এরকম একটা ভয়ে সবাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

স্টেডিয়াম, সদরঘাটের সে দরদি বন্ধুদের ডেকে বলে, ও ভাই, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? ঠিকাদারের ভাড়াটে টাউটেরা নানারকম তালবাহানা করে আসল কথা এড়িয়ে যায়, এভাবে পাহাড়ের পাশ দিয়ে, সমতল ভূমির উপর দিয়ে, চাকমা পল্লীর ধার ঘেঁষে প্রায় ঘণ্টা তিনেক হেঁটে সকলে ধুল্যাছড়িতে এসে পৌঁছায়। ধুল্যাছড়ি হল রিজার্ভ ফরেস্টের যাত্রাপথের প্রথম বিরাম স্থল, ওখানে কতকগুলো হোটেল আছে। দোকানপাটও কিছু আছে। হোটেলগুলোও অনেকটা মাচানঘরের মত। এখানে এসে সকলে ভাত খায় এবং সে রাতের মত ঘুমায়।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভীতি বিস্ফারিত চোখে সমতল ভূমির মানুষগুলো চেয়ে দেখে চারদিকে পাহাড় ঘেরা থমথমে পরিবেশ, কোন মানুষজন নেই তেমন। তাদের মুখের ভাষা মুখেই আটকে যায়। কেউ কেউ অস্ফূট চিৎকার করে ওঠে, ‘আল্লাহ কোন দেশে আইলাম গো।’

ধুল্যাছড়ি থেকে যাত্রা শুরু করে পরের দিন। পাহাড়িয়া পথে প্রায় দশ মাইল হেঁটে বিলাইছড়ি বাজারে এসে পৌঁছে। মানুষদের চোখে মুখে তখন যে উদ্বেগ এবং বেদনা আমি দেখেছি - জীবনে তা কোনদিন ভুলব না। তবু তারা অনভ্যস্ত পায়ে পাহাড়িয়া বন্ধুর পথে হোঁচট খেতে খেতে সামনে এগিয়ে যায়।

বিলাইছড়ি বাজারটা অপেক্ষাকৃত জনবহুল স্থান। এখানে যে বাজার তা কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা এবং রাঙ্গামাটি বাদ দিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র। চাকমা, মগ এবং অন্যান্য আদিবাসীরা এ বাজারে কার্পাস, সর্ষে ইত্যাদি এবং আরও অনেক কিছু বিক্রয় করতে আনে। সেজন্য চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ীদের ভীড় এই বাজারে।

বিলাইছড়ি খালে গোসল করে লোকগুলো হোটেলে এসে ভাত খায়, পেটে ক্ষুধা সকলের। তবু কারও মুখে ভাত রোচে না। সকলের চোখে আতঙ্কের আভাস। অচিন চাকমা তরুণীদের উদ্দেশ্যে হাসি-ঠাট্টা করা যুবকেরাও চিন্তার ভারে নুইয়ে পড়ে। ঠিকাদারের লোকেরা আর কতকগুলো লোকের সঙ্গে গলাগলি করে। এসব লোকদের ভাষা এরা বুঝতে পারে না। কারণ ওরা এ দেশের অধিবাসী নয়। এরা ঠিকাদারদের আগের লোকগুলোসহ চাকমা পাড়া থেকে বাংলা মদ আনিয়ে পান করে। সারারাতই মাতলামি করে।

সে রাতে প্রায় চারটের সময় সকলে যাত্রা শুরু করে। বুকের বল দমে গেছে মানুষদের। কোন অদৃশ্য শৃঙ্খল দিয়ে তাদেরকে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেন। এবারে জনমানুষের আনাগোনা একেবারে নেই। বিলাইছড়ির কাছাকাছি স্থানসমূহে মগ, মুরং, চাকমা, টিপরাদের বসতি শেষ।

বিলাইছড়ি, ধুল্যাছড়ি এসব জায়গায় বর্তমানে কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার ফলে পানির তলায় ডুবে গেছে; কিন্তু আমার যা বলবার বিষয়, মানে কুলিদের ওপর নির্যাতন এখনো সমানে চলছে।

রিজার্ভড এরিয়া শুরু হয়েছে। পাহাড়ের উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। পথ চলার কষ্ট আগের চেয়ে দু’গুণ কি তিন গুণ বেড়ে গেছে। ঠিকাদারদের লোকদের সঙ্গে গলাগলি করা মানুষগুলো বন্দুক কাঁধে আগে পিছে চলেছে, কারও কারও হাতে চিকন পাহাড়িয়া বেতের ছড়ি। বয়সে যারা কচি সমান তালে হাঁটতে পারছে না ইতোমধ্যে শপাং শপাং তাদের পিঠে আঘাত করতে শুরু করেছে। দলের আর আর সকলে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে; হ্যাঁ সত্যি তারা ফাঁদে পড়েছে। সবকিছু দেখে, সব অনুভব করতে পেরে কারও কারও চোখ ফেটে ক’ফোটা পানি নিরবে দু’গ-ে গড়িয়ে পড়ে। কিছু বলে না। নিজেদেরকে ভাগ্যের হাতে সপে দিয়ে পথ চলে নিরবে।

একেকটা পাহাড় আধ মাইল এক মাইল উঁচু। সে সব উঁচু পাহাড়ের ধার দিয়ে বয়ে গেছে সরু পায়ে চলার পথ, ছড়ি থেকে ঝোপঝাড়, বাঁশের বন, কাঁটাবন ইত্যাদি ঠেলে চড়াইয়ে উঠতে উঠতে সকলের বুকের রক্ত পয়মাল হয়ে যায়। প্রতিবাদ করার উপায় নেই।

ছড়ির দেশ পার্বত্য চট্টগ্রাম। মৌসুমি বর্ষার শোষিত জল পাহাড় চুঁইয়ে চুঁইয়ে সারা বছরই নির্গত হয়। এই পাহাড় চোঁয়ানো জলে আরও পাহাড় চোঁয়ানো জল মিশে ক্ষীণ স্রোত বয়ে যায়। এমনি পাঁচ সাত, আট দশটা এমনকি আরও বেশি মিলিত হয়ে রচনা করে ছড়ি। এসব ছড়ি নিচের দিকে নেমে এসেছে এবং শেষ গতিতে কর্ণফুলীর বুকে মিশে গেছে।

এভাবে ছড়ির পর ছড়ি পেছনে পড়ে থাকে। তারা এগুতে থাকে সামনে। পিয়াসায় ছাতি ফেটে যায়। ছড়ির জলে তৃষ্ণা মেটায়, পুরোদিন চলার পর তারা আদি পথে এসে একটা বড় গাছের নিচে রাত্রি যাপন করে। পোটলা-পোটলি খুলে কিছু খেয়ে নেয়।

পরের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শরু হয় আবার পথ চলা। কত কষ্ঠ যে এ পথ চলায় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। একেকটা উঁচু পাহাড়ে উঠতে গেলে আট দশবার প্রস্রাব করতে হয়। শরীরে ঘামও আর থাকে না বেরুবার। পাহাড়িয়া অঞ্চলে যাবার জন্যে কেউ পথ কেটে রাখেনি। এসব অঞ্চলে আদিবাসীরাও আসেনি আগে। পায়ে চলার পথও সে কারণে সৃষ্টি হয়নি। কোন কোন সময়ে পথের সামনে পড়ে দুর্ভেদ্য বন, তাও অতিক্রম করতে হয়। গা এবং গায়ের বিভিন্ন স্থান বন্য কাঁটার কামড়ে ছিঁড়ে যায়। দরদরিয়ে রক্ত ছোটে। সময় কই লক্ষ করবে। একটু গাফলতি দেখলেই পশাং শপাং কয়েক বেতের বাড়ি পিঠে পড়বে। আগের দরদি বন্ধুদের মুখের আদল তখন কসাইয়ের মুখের মত দেখায়। তাদের মুখের ক্রুর হাসি কেমন শানিত অথচ কত নিষ্ঠুর।

এভাবে শুক্কুরছড়ি, যমুনাছড়ি, ভাইবইন ছড়ি, চড়া চড়ির ওড়া ছড়ি, ফারোয়া ছড়ি ইত্যাদি শত শত ছড়ি পেরিয়ে সন্ধ্যা সাত-আটটার সময় বর্ডারের কাছাকাছি কর্মস্থলে এসে পৌঁছে—ঠিকাদারদের লোকেরা এসে সে সদরঘাটের মানুষদের সঙ্গে মোলাকাত করে। আর সব মানুষ পরস্পরের দিকে বোবা দৃষ্টি মেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক নিস্পন্দ। চারদিকে পাহাড়ে বাঁশের বন।

বাঁশবনে পৌঁছে প্রথম রাতে কুলিরা কোন রকমে কাটায়। পরদিন সকালে ঠিকাদারের লোকদের চিৎকারে ঘুমভাঙা চোখ মেলে তারা চমকে ওঠে। একি দুঃস্বপ্ন দেখছে? কোথায় এল তারা? চারদিকে জঙ্গল। জঙ্গলের বাঁশের পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে না আকাশের উদারতা, বাঁশের ঘন বনের কোন ওপারে দিগন্তের রোদ ঝলসানো সোনালি রেখা, চারদিকে বিশাল নিবিড় ভয়ঙ্কর নিশ্চুপ আদিম অরণ্য। সৃষ্টির আদি থেকে প্রকৃতির আপন খেয়ালে বাড়ছে। দৃষ্টির অগম্য দূরে তারা ফেলে এসেছে ঘরবাড়ি পরিচিত পরিবেশ। চোখের সামনে সবকিছু ভেসে ওঠে। কিসে যেন কি হয়ে গেল। তখন চোখে পানিও নেই। আছে শুধু বনের নিশ্ছিদ্র আদিম ভয়াল পরিবেশ। সে পরিবেশের মাঝখানে তারা। সামনে যমদূতের মত দণ্ডায়মান ঠিকাদারের ভাড়াটে চেলাচামুণ্ডার দল।

সারা শরীর পুঁজে পুষ্ট ফোঁড়ার মত ব্যথাভারে জর্জরিত। এপাশ ওপাশ ফেরার শক্তি কারও নেই। তবু একটা জিজ্ঞাসা সকলের মুখে, এলাম কোথায়?

সেকথার উত্তর কেউ দেয় না। হুকুম করে কন্ট্রাক্টরের চেলারা, সকলে উঠে পড়। সমতল ভূমির মানুষ একে ত পাহাড়িয়া অঞ্চলের উঁচু-নিচু পথে হাঁটার অভ্যেস কারও নেই, তদুপরি এই যে দুর্গম পর্বতমালা, একে অতিক্রম করে অতীতে কদাচিৎ মগ-মুরংয়েরাও এসেছে কিনা সন্দেহ। হালের কাজে, মাঠের কাজে যারা অভিজ্ঞ তাদের কথা না হয় বাদ দেয়া যায়, কিন্তু যারা দোকানে কাজ করেছে, শহরে কাটিয়েছে অথবা যারা মা-বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে স্কুলের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বুকিয়ে এসেছে, তাদের অবস্থা?—সেকি বলা যায়, না কলম দিয়ে লেখা যায়?

তবু এসব প্রাণহীন মানুষকে উঠতে হয়। জঙ্গলের আড়ালে পায়খানা-প্রস্রাব করে জলের সন্ধান করে। কিন্তু জল কোথায়? পাহাড়ের গা চুঁইয়ে চুঁইয়ে জলের মত একজাতীয় রঙিন তরল পদার্থ বেরিয়ে আসছে। তাই দিয়ে চাল ধোয়া, কাপড় ধোয়া, পায়খানা-প্রস্রাবের জল শৌচ এবং পানীয় জল, এ অবস্থা দেখে কাউকে কাউকে হেসে উঠতে দেখেছি। কারণ কাঁদবার শক্তি তারা হারিয়ে ফেলেছে। প্রেতের হাসির মত সে হাসি। কত বিবর্ণ, কত করুণ, কত বেদনা মাখা মানব সন্তানের জীবনীরসের সে নিদারুণ অভিব্যক্তি।

রহস্যময়ী বনভূমি অনেক কিছুই আদি থেকে লোক চোখের আড়াল করে রেখেছে। রহস্যের পর রহস্য। লোকগুলোর চোখে ভাষা ফোটে না, কপালে বলিরেখা পড়ে না, চেতনা তাদের মরে গেছে। মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে তারা যেন ঠিকাদারের মানুষদের হুকুম আদেশ নিরবে পালন করে যাচ্ছে।

এরপর তাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে ঘরগুলোতে থাকতে হবে তা দেখিয়ে দেওয়া হয়। পাহাড়ের থলিতে এসব ঘর বেঁধে রাখা হয়েছে। বাঁশের মাচান ঘর। চারধারে বাঁশ দিয়ে ঢাকা ওপরে বাঁশপাতার ছাউনি, শীতের দিনে বনের হিমেল হাওয়া বর্শার ফলার মত সারা শরীরে এসে বিঁধে। বর্ষায় বৃষ্টির ছাঁট অবাধে ঘরে ঢুকে ঘরের মানুষদের আড়ষ্ট করে ফেলে। ফাগুনে বনভূমি আগুন। বঙ্গোপসাগরের অতল প্রশান্তিমাখা সুশীতল দখিনা হাওয়া এ বনের রাজ্যে প্রবেশ করে না। একেকটা ঘরে ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন মানুষকে থাকতে হয় গাদাগাদি করে। এপাশ থেকে ওপাশে ফেরা যায় না। মানুষগুলো কিছু বলতে পারে না। বলার যে সাহস তা ফুরিয়ে গেছে। অনুভূতি তাদের গাছের মরা ডালের মত শুকিয়ে গেছে। বেঁচে থাকবার আশা-ভরসা, জীবনের স্বাদ-আহ্লাদ ঝুপড়ি ঘরের ক’বেলা ডাঁটার তরকারি দিয়ে মোটা চালের ভাতের বদলে সদরঘাটের দয়াল বন্ধুদের কাছে বিক্রি করেছে। এখন সামনে যা আসে, নির্বিবাদে তাই-ই মেনে নিতে হবে। বিরতি দিলে চলবে না।

থাকার ঘর দেখার পালা শেষ হয়। সে মাচান ঘরে নিজেদের কাঁথা-বালিশ রেখে দেয়, মৃতকল্প এসব মানুষ! বনের এ নিঃসীম রাজ্যেও নিজের একটু অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কি আকুল আগ্রহ! ঠিকাদারের মানুষেরা তাদেরকে তারপর রান্না-বান্নার সাজ সরঞ্জাম দেখিয়ে দেয়। দু’চারটে হাড়ি পাতিল, একজনের জন্য এক একটা মাটির সানকি ঠিকাদারের তরফ থেকে বরাদ্দ করা। ঠিকাদারের নিজস্ব স্টোর বা দোকান আছে। তাতে নৌকায় করে বিলাইছড়ি বা আরও দূরের রাঙ্গামাটি বাজার হতে চাল ডাল মরিচ ইত্যাদি নৌকা যোগে এনে জড়ো করে রাখে। স্টোর থেকে বাকিতে সব কিছু নিতে হয়। নতুন মানুষেরাও চাল, ডাল এনে মাটিতে গর্ত করে আগুন জ্বালিয়ে ভাত চড়িয়ে দেয়। ভাত পাক হয়ে গেলে মাড়-ফেনসহ ক্ষুধার তাড়নায় গোগ্রাসে খেয়ে নেয়। খাওয়ার পর মুখ-হাত ধুয়ে যেই একটু ঘুমাতে যাবে অমনি এসে হাজির ঠিকাদারের লোকেরা।

মিয়ারা চল সকলের কাজ দেখে আসবে। অবিশ্রান্তভাবে ত্রিশ চল্লিশ ঘণ্টা ধরে মানুষগুলো তাদের ছেড়ে যাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর দিকেও ভাল করে নজর রাখতে পারেনি। ওদের কথার জবাব দেবার ভাষা কারও মুখে যোগায় না। শুধু মরা মাছের চোখের মত দৃষ্টি হুকুম দাতাদের আজরাঈলের মত চোখ-মুখের দিকে নিঃশব্দে বাড়িয়ে ধরে। ব্যথা জর্জরিত শরীর নিয়েও ওদের উঠতে হয়। নিস্তেজ অনিচ্ছুক পাগুলো ছেঁচড়িয়ে ছেঁচড়িয়ে হুকুমদাতাদের অনুসরণ করে।

সাইট বা কর্মস্থলের দূরত্ব বাসা থেকে এক মাইল, আধ মাইল। সময় বিশেষে আরও বেশি হয়ে থাকে। কেউ মাটি কাটছে, কেউ বাঁশ কাটছে, কেউ কেউ বাঁশ গাছের গোড়া তুলছে, যারা শক্ত সবল তাদের কারও হাতে ছেনি মার্তুল, কারও হাতে শাবল গাঁইতি, পাহাড় যেখানে পাথুরে সেখানে আঘাতের পর আঘাত করছে। আঘাতের চোটে পাথর ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ফুলকিতে ফুলকিতে ঠিকরানো আগুন। ঘামে সারা শরীর ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। পিছে ফেরা তো দূরের কথা–একজনের সঙ্গে আরেকজন একটু কথা বলবে তার উপায়ও নেই। ঠিকাদারের এ-দেশীয় ও-দেশীয় চরদের হাতের চিকন কোরক বেত সশব্দে আঁছড়ে পড়ছে পিঠে। সূর্য ওঠার আগে ওরা কাজে গিয়েছে। বারোটার সময় এসে ডালের পানি আর সে ফেনশুদ্ধ ভাত খেয়ে একটার সময় আবার যেতে হয়েছে। সূর্য ঠিক ডুবে গেলে তাদের ছুটি হবে। রিজার্ভ ফরেস্টের কুলিদের কাজ করবার সময় হল। এদিকে সূর্য ওদিকে আকাশে তারা ওঠা এর মাঝখানে শুধু খাবার সময়টুকু ছাড়া সব সময় কাজ করতেই হবে।

নতুন মানুষদের দেখে পুরান মানুষেরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, কিছু বলে না তাদের কেবল নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে রিজার্ভ ফরেস্টে বল-বীর্য স্বাস্থ্য বলি দিতে এরাও এসেছে।

সাইট দেখান হল। সেদিনই ঠিকাদারের লোকেরা তাদেরকে গাঁইতি, কোদাল, শাবল, কুড়াল দেখিয়ে বলে যে যেটা চালাতে পারবে সেটা নিয়ে তাড়াতাড়ি হাতল লাগাও। ওরা ইতস্তত করে। তখন ঠিকাদারের লোকই বাঁটোয়ারা করে দেয়, যারা অপেক্ষাকৃত সবল তাদের হাতে শাবল অথবা ছেনি, মার্তুল, তার চেয়ে যারা দুর্বল তাদেরকে গাঁইতি, কুড়াল এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলদেরকে কোদাল দেয়া হয়।

যাদেরকে কেরানি, পিওন ইত্যাদির চাকুরি দেবে বলে এনেছে তারা যখন সে কথা বলে তখন মুখ ভ্যাংচিয়ে নানারকম টিপ্পনী কাটে যমদূতের মত লোকগুলো। স্কুল পালান ছেলেরা তাদের হাতে পায়ে ধরে বলে আমরা বাপের বাড়িতে শুধু লেখাপড়া করেছি। এসব কাজ কোনদিন করিনি। কে শোনে কার কথা।

কিশোরদের ঠিকাদারদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেন পাঠায় তা কারও অজানা নয়। তবু আমি এদের দৈনন্দিন জীবন বর্ণনা করার সময় এই নারী বিবর্জিত রিজার্ভড ফরেস্টের সে বীভৎস দিকটিও ইঙ্গিত বর্ণনা করব—শালীনতার মধ্য দিয়ে যত কম কথায় পারা যায়।

ওসব মানুষেরা কোদাল, কুড়াল, গাঁইতি, শাবলে হাতল লাগিয়ে নিয়ে সেদিন সন্ধ্যার মত রান্না করে খেয়ে ঘুমাতে যায়। সামনে যে জীবনের সংকেত তারা দেখতে পেয়েছে তারই তড়াসে অথবা যে ক্লান্তি তাদের শরীরের রোমে রোমে বাসা বেঁধেছে তারই চাপে, মোটা মুলি বাঁশের মাচানে খাঁচাবদ্ধ মুরগির মত ঘুমিয়ে পড়ে।


সূর্য না দেখা ভোরে ঠিকাদারদের মানুষদের ডাকে কুলিরা ঘুম থেকে উঠে সকলে প্রাতঃক্রিয়াদি সেরে নেয়। দু’ একজন শুকনো বাঁশ জোগাড় করে আগুন জ্বালায়। আর দু’ একজন পাহাড়ের পাথর-চোঁয়া বরফের মত ঠাণ্ডা জল ভরে। আগেই বলেছি, এ জলেই তাদের শৌচ, রান্না-বান্না, ধোঁওয়া-মোছা সবকিছু করতে হয়।

মশুর ডালের পানি আর ফেন-মাখা ভাত খেয়ে ওদেরকে সাইট-এ ছুটতে হয়। সেদিনকার মত কাজ শুরু হয়। পাহাড়ের পাথুরে অঙ্গ গাঁইতির আঘাতে আঘাতে মসৃণ করবার শিক্ষা তাদের কই? বিরাট বিরাট শত শত গাছের গোড়া উৎপাটন করার কাজও দেয়া হয়েছে তাদের। কাউকে কাউকে পাথরে সুড়ঙ্গ করে বারুদ দিয়ে পাথর ফাটানোর কাজ শিখাবার জন্য নেওয়া হয়েছে। স্কুলের যেসব ছাত্র কেরানি-পিওন বনবার আশায় এসেছে রিজার্ভড ফরেস্টে, তাদের প্রতি একটু করুণা করা হয়। তার মানে অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমের কাজ তারা করে। একটা চটের বস্তার দু’দিকে দুটো ডাণ্ডা লাগিয়ে মাটিভর্তি বস্তাগুলো পাহাড়ের পাশে পাশে ঢেলে দেয়। দুপুর বারটা বাজলে তারা ডেরায় এসে সেই মশুর ডালের পানি আর ফেন মাখা ভাত খেয়ে আবার কাজে যায়। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে তাদের ছুটি।

এভাবেই কাজ চলে প্রতিদিন। মানুষগুলো অতীষ্ট হয় ওঠে। পালাবার কথা তাদের মনে আসে, কিন্তু কেমন করে পালাবে? সারারাত বন্দুক নিয়ে কুলিদের বাসা পাহারা দেয় ঠিকাদারের লোক। আর তাছাড়া এ বিশাল দুরধিগম্য অরণ্যের ওপাশে মানুষের বাসভূমি কোথায় তা কেমন করে খুঁজে নেবে? মানুষগুলো তো এক একজন এক এক জায়গার, বাঙলায় কথা বললেও ভাষার বিভিন্নতার জন্য একজন আরেক জনের সঙ্গে মন খুলে আলাপ করতে পারে না। ঠিকাদারের লোকেরা সব সময় তাদের ভেতর এ বিদ্বেষ জাগিয়ে রাখে। এসব ছাড়াও তাদের পালাতে হলে যে রাস্তা কাটছে সে রাস্তা বেয়েই ছড়িতে নামতে হবে। বিভিন্ন ঠিকাদারেরা এক আধমাইল ভাগাভাগী করে রাস্তার কন্ট্রাক্ট নেয়। রাতের বেলা রাস্তার উপরেও পাহারা বসায়। এক ঠিকাদারের লোক দুয়েকজন পাহারাদারকে ফাঁকি দিতে পারলেও একজন না একজনের হাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ধরা পড়লে আবার ঠিকাদারদের কাছে পাঠান হয়। কাজ করলে তবু ক’দিন বাঁচার আশা আছে। কিন্তু পালান মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। তবু মুক্তি পিয়াসী মানুষকে আমি পালিয়ে যেতে দেখেছি। ধরা তারা পড়েছে, শাস্তিও পেয়েছে।

দেখেছি কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মজলিশপুর গ্রামের মফিজ উদ্দিনকে পালিয়ে যেতে। সে চারজন প্রহরীকে ফাঁকি দিতে পেরেছিল। কিন্তু পঞ্চম জনের হাতে ধরা পড়ে আবার তাকে ঠিকাদারের বাথানে আসতে হয়েছিল। কত যে মেরেছিল ওকে। জোয়ান মানুষের তাজা রক্ত পিচকারির মত ছুটেছিল বেতের ছড়ির আঘাতে। উঃ! গত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও আমি দেখিছি। এদের তুলনায় ওরা আরও নৃশংস। আরও পিশাচ, এতে শেষ নেই, ঠিকাদার বিচার করে রায় দিল, মফিজুদ্দিনকে একটি বিরাট তেরপাল দিয়ে বেঁধে বস্তার মত করে মাচান ঘরের তলায় রাখা হবে প্রতি রাতে। শুধু নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য নাক-মুখ খোলা রাখা হবে। তাই-ই তারা করেছিল মফিজুদ্দিনকে। রাতে তেরপাল জড়িয়ে মাচান ঘরের তলায় রাখত আর দিনের বেলায় কিছু খাইয়ে কাজে নিয়ে যেত। এভাবে একমাস কেটেছে মফিজুদ্দিনের। তারপর একদিন যখন মফিজুদ্দিনের সারা গায়ে বিষাক্ত ঘা হল তখনই তাকে মাচান ঘরে শুতে দেয়া হয়েছিল। সেই সংক্রামক ঘায়ে আক্রান্ত হয়েছিল আরও অনেকে। আমি শুনেছি, আরও আগে নাকি পালাবার অপরাধে একজনের হাত পা গাছের সঙ্গে বেঁধে সারা গায়ে পেরেক মেরে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটা আমাকে যে লোকটি বলছিল সে ঠিকাদারের এক বিশ্বস্ত লোক।

রিজার্ভড ফরেস্টে ফেরারি আসামিদের আড্ডা পাহাড়িয়া দুর্গম পথে কাপ্তাই হতে প্রায় দেড় শ’ দু’শ’ মাইল ওপরে। পুলিশের কি সাধ্য ওদের নাগাল পায়। এদেরই কেউ কেউ ঠিকাদারদের দক্ষিণ হস্ত। বছরের পর বছর এরা রিজার্ভেই থাকে। ঠিকাদারের তরফ থেকে ওদের জন্য সব রকমের সুখ-সুবিধার ব্যবস্থাও করা হয় ঘিয়ে ভাজা রুটি খেতে দেওয়া হয়। সকাল-বিকেল দু’বেলা চা খেতে পায়। রাতের বেলা তুলার বালিশে, লেপের ওমের তলে ঘুমোয়। ভুলিয়ে আনা কিশোরদেরকে প্রতিরাতে পালা করে এদের সঙ্গে ঘুমাতে হয়। এসব ব্যাপার রিজার্ভে অহরহ ঘটছে। ছেলেদের করুণ আর্তচিৎকারে কুলিরাও ঘুমোতে পারে না। কিন্তু কি করবে তারা? করবার কি আছে তাদের? এসব বিকৃত রুচির মানুষদের বীভৎস আচরণে রাজি না হলে অরণ্যের হাড় কাঁপানো শীতে তাদেরকে হাত-পা বেঁধে উদোম গায়ে বসিয়ে রাখা হয়।

সব দেখে শুনে একবার আমি ঠিকাদারদের একজনকে বলেছিলাম, তোমরা এভাবে মানুষের উপর এবং বিশেষ করে তোমাদের নিজ সন্তানের মত ওই ছেলেদের ওপর এমনভাবে অত্যাচার কর কেন? এটা কি এমনি যাবে মনে কর? এর কি কোন প্রতিকার নেই? ঠিকাদার আমার কথা শুনে যে জবাব দিয়েছিল তার মানে—‘আমরা জঙ্গলকে মঙ্গল বানাচ্ছি। তোমার বয়স অল্প সেজন্য বুঝবে না। আমরা জঙ্গলকে মঙ্গল বানাচ্ছি, তা করতে হলে জীবন যৌবনের কিছু অপচয় অবশ্যই হবে।’

এই-ই তো রিজার্ভড ফরেস্ট। দিনে দিনে মানুষগুলোর হাড়গুলো স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। মাসে একবারও গোসল করতে পারে না। গোসল করার পানি কই? পানির জন্য যেতে হয় বনপথে চার-পাঁচ মাইল। ঠিকাদারের জোরসে কাজ চলছে। সুতরাং তারা গোসল করবে কেন সময় নষ্ট করে? কাপড়ে চুলে একজাতীয় সাদা উকুন বাসা বাধে। রোদের তাতে ওসব উকুনের কামড় হয়ে ওঠে তীব্র। হাত পেছনে নিয়ে চুলকাবার সুযোগও পায় না। অমনি কয়েক বেত পিঠের ওপর সশব্দে আছড়ে পড়ে। ঠোঁটগুলো শীতের সময় কুষ্ঠরোগীর মত কেটে ফেটে ছিঁড়ে যায়। সারা শরীর পিচের মত নিকষ কাল হয়ে যায়। মুখম-লের মাংস চেপে বসে যায়, নরকঙ্কালের মত দেখায় ওসব মুখের আদল। মরণের ওপারের কোন প্রেতপুরীতে যেন হাওয়ার ঘায়ে এদিক থেকে ওদিকে হেলে যাচ্ছে। হাঁটতে পারে না। শরীরের রক্ত-মাংস-বল-বীর্য সব ঠিকাদারেরা শুষে নিয়েও তাদের নিষ্কৃতি দেয় না। সাইটের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ কঙ্কাল দিয়েই তারা মাটি কাটায়, পাথর কাটায়, গাছের গোড়া উপড়ায়, বারুদ দিয়ে বিরাট পাথুরে পাহাড় ফাটিয়ে মাঝখানে রাস্তা তৈরি করে। কিসের আশায়? কিসের নেশায়?


দিনে রাতে, রাতে দিনে সময় বয়ে যায়, কি বার, কোন মাস, সেকথা কি আর মনে আছে কুলিদের? ঠিকাদারের কাজ শেষ করতেই হবে, যেমন করেই হোক।

প্রতিদিন সকালে জীবিত কঙ্কালগুলো সার বেঁধে মাটি কাঁটতে যায়। পাহাড়ের ধারে ধারে রাস্তা বাঁধার কাজ এগিয়ে চলে। কুলিদের বুকের রক্তঝরা মেহনতে রাস্তার কাজ এগিয়ে যায় তরতরিয়ে। ঠিকাদারের মুখে ধূর্ত শেয়ালের মত কেচকে হাসি ফোটে। কুলিরা হিসেব করে আর কত বাকি মরণের। হাঁ, কুলিরা ওখানে মারা যায়। রাত্রিতে মশার কামড় খেয়ে কম্প দিয়ে জ্বর আসে গায়ে। বাদুড়ের মত বিরাট বিরাট মশার কামড় খেয়ে যে জ্বরে তারা পড়ে অনেক সময়, তাতেই হৃৎপি-ের ধুকধুক কাঁপুনিটুকু স্তব্ধ করে দিয়ে যায়। এমনি বেঘোরে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেখেছি সন্দ্বীপের আউয়ালকে। উনিশ বছরের ডবকা ছেলে, কালীনাগের মত কাল গায়ের রং, এক মাথা কাল চুল। দাঁতগুলো ধুতরা ফুলের মত সাদা। শ্যামলা মুখের পেলব পেলব ভাবটুকু ছিল মায়াময়। মারা গেল। বেচারি একখানা কাফনও পায়নি। মাটির গর্ত করে তাকে সেখানে চিরদিনের মত শুইয়ে আবার উপরে মাটি চাপা দিয়েছে তার সাথীরা।

যারা মরে তারা বেঁচে যায়। অমানুষিক অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু যারা বেচে থাকে? তাদের অবস্থা? সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যা দিন গড়ায়, আর এগিয়ে চলে রাস্তা বাঁধার কাজ। গতরের বলবীর্য শুষে নিয়ে পাহাড়ের কোল বেয়ে কাল নাগিনীর মত এঁকে-বেঁকে সামনের দিয়ে বয়ে যায়।

রাস্তা তৈরি হলে ঠিকাদারেরা লাখ লাখ টাকা পাবে। কিন্তু কুলিরা পাবে কি? আর কুলিরা কি খেয়েই বা এ রাস্তা বেঁধে যায়? আগেই তো বলেছি। ওরা ফেনমাখা ভাত খায়, আর খায় মশুর ডালের পানি। টমেটো, আলু ইত্যাদি তরি-তরকারিও ঠিকাদারেরা অনেক সময় বিলাইছড়ি বাজার থেকে কিনে নৌকায় করে এনে স্টোরে মজুদ করে রাখে। কুলিরা স্টোর থেকে বাকিতে চাল-ডালের সঙ্গে তরিতরকারিও খরিদ করে।

সে আরেক কথা। বিলাইছড়ি বাজারের কেনাদরের পাঁচগুণ দাম আদায় করে নেওয়া হয় তাদের কাছ থেকে। টমেটোর দাম নেয় কুলিদের কাছ থেকে এক টাকা চার আনা, কুলিরা কিছুই জানতে পায় না, ঠিকাদারের কেরানি খাতায় হিসেব করে রাখে। সব জিনিসের দাম এরকমই দ্বিগুণ, তিন গুণ, চার গুণ হয়ে থাকে। কুলিরা জানে না কিছু। যা লাগে দৈনিক স্টোর থেকে আনে। রান্না করে খেয়ে কোন রকমে হাড়সর্বস্ব শরীরগুলোকে সচল রাখে। পঁচিশ টাকা যে চালের মণ বিলাইছড়ি বাজারে, কুলিদের কাছে বাকি বিক্রি করার সময় তার দাম চল্লিশ টাকা, ছয় আনা সের আলুর দর এক টাকা দেড় টাকা, এমনি করে টাকার হিসেবে খাতা ভর্তি হয়।

রিজার্ভড্্ ফরেস্টের নির্বান্ধব অরণ্য। রাতে মশার কামড়। দিনে পোকা-মাকড়, অসহ্য হয়ে ওঠে দিন দিনে। একটু ধোঁয়া না হলে তাদের চলবে কেন? সেজন্য তারা স্টোর থেকে বিড়ি ম্যাচ খরিদ করে। চার আনা দামের বিড়ি প্যাকেটে নেট বার আনা লাভ করে। এক একজন মানুষের দৈনিক এক এক প্যাকেট বিড়ির প্রয়োজন হয়।

হাড়ভাঙা পরিশ্রম কোদালে পা কেটে যায়, আঙুল ছেঁচে যায়। বারুদের আগুনে ফাটানো পাথরের পাহাড়ে হরহামেশা পাগুলো গুরুতরভাবে জখম হয়, এভাবে জখম হয়ে পড়ে থাকলে কন্ট্রাক্টরের রাস্তা তৈরি হবে না। সেকথা তারা বেশ ভাল ভাবে জানে। এজন্য প্রত্যেক কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে একজন ইনজেকশন ফুঁরতে পারার মত হাতুড়ে ডাক্তার থাকে। আর থাকে নানাজাতীয় কিছু মিকশ্চার এবং ট্যাবলেট। এসব আহতদের প্রাথমিক শুশ্রুষার পরে আর বসে থাকতে দেয়া হয় না। দু’আনা দামের একটা ট্যাবলেট কেউ খেলে পরে ঠিকাদারের কেরানি তার নামে ডাক্তার খরচ লিখে রাখে এক টাকা। হরদম চোট লাগছে কুলিদের হাতে গায়ে আর ডাক্তার খরচও বেড়েই চলছে। এতেই শেষ নয়, যারা একটু সুস্থ সবল তাদেরকে কন্ট্রাক্টরের চেলারা তাস জুয়া ইত্যাদি শেখায়। নগদ টাকা ধার হাওলাত দেয়। খেলায় হারলে ক’বছর রিজার্ভে থাকবে তাই নিয়ে বাজি ধরে। নতুন লোকেরা খেলায় হেরে যায় এবং রিজার্ভে থাকতেও বাধ্য হয়।

যারা এভাবে কাজ করে তাদের দৈনিক দেড় সের পরিমাণ চালের ভাত না হলে পেট ভরে না। সে অনুপাতে তরকারিরও প্রয়োজন। সারাদিন পাহাড় পাথর কেটে বাসায় বাসায় এলে পরে তখন তাদের দু’একটা ট্যাবলেটেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কুলিরা কিছুই জানে না, শুধু ঠিকাদারের স্টোর হতে প্রয়োজনের সময় কেরানিকে দিয়ে লিখিয়ে যা লাগে তাই নেয়। ঠিকাদারের হাতুড়ে ডাক্তারকে রোগির শরীরে ইনজেকশনের বিনিময়ে ডিস্টিল ওয়াটার ইনজেক্ট করে দিতে দেখেছি। এক একটা পেনিসিলিন ইনজেকশন যেগুলোর দাম বড়জোর এক টাকা কিংবা বার আনা সে রকম একটা ইনজেকশনের খরচ লিখে রাখে রোগির নামে কমসে কম চার পাঁচ টাকা।

এমনি করে সুখে-দুঃখে সাইটের কাজ শেষ হয়ে আসে। ঠিকাদার কর্তৃপক্ষের কর্মচারীকে কাজ বুঝিয়ে দেয়। কুলিরা হাড় জিরজিরে শরীরখানা নিয়ে হলেও দেশে যেতে পারবে ভেবে মনে মনে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

তারপর বলে হিসেব নিকেশের পালা। ঠিকাদার মিথ্যা কথা বলে না। ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদেরকে যে হিসেবে রোজকার মাইনে দেওয়া কথা ছিল তাই দেয়। দিনে চার টাকা ধরে। সর্বমোট কোন কুলি যদি চারমাস কাজ করে সে ঠিকাদারের কাছে পাওনা হবে চারশ’ আশি টাকা। এরপরে ঠিকাদার নিজের পাওনার হিসেব করে। চালের দাম কাটে প্রতি মণ চল্লিশ টাকা করে। ডালের দাম কাটে সের আড়াই টাকা। বিড়ির দাম এক টাকা প্যাকেট। এছাড়া তেল, হলুদ, তরিতরকারি সবগুলোতে ইচ্ছামত দাম ধরে। হিসেবের পরে দেখা যায়, ঠিকাদারের কাছেই প্রত্যেক বিশ পঁচিশ টাকার বাকিদার হয়ে পড়েছে। ঠিকাদার দুর্বল অক্ষমদের অনেক সময় পথ ভাড়া দিয়ে দেয় দয়া করে। কি বিচিত্র দয়া! তারপরে শক্ত সবলদেরকে নিয়ে নতুন সাইটে লাগিয়ে দেয় কাজে। কুলির আড়কাঠিদেরকে প্রতিরোজ মাথা কিছু চার আনা করে কমিশন বুঝিয়ে দেয় ঠিকাদার। ঠিকাদার লাখ টাকা পেলে আড়কাঠি পায় হাজার টাকা। আবার তারা শহরে এসে বসে। ভাই বন্ধু ডেকে মানুষকে ভুলিয়ে আবার ঝুপড়ি ঘরে তোলে। আবার চালান দেয় লঞ্চে করে কর্ণফুলীর উজানে—যেখানে বন্য জন্তুরা বাস করে না, মগ মুরংয়েরা যায় না সেই নিভৃতিতে। মানুষগুলো কি হারিয়ে আসে সেকথা পূর্বোক্ত অধ্যায়গুলোতে খুবই সংক্ষেপে বলতে চেষ্টা করেছি।

সর্বশেষে দেশের মানুষের চোখের সামনে আমরা শুধু একটি প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই—তাহল আর কতকাল চলবে এ বীভৎস অত্যাচার? আর কতকাল?

original post



read more

সাহিত্যে সেন্টিমেন্টালিজম

by রশীদ করীম


লেখক যখন পাঠক, কিংবা অপর একজন লেখকের অভিমত প্রার্থী হন, তখন অভিমতের আনুকূল্যই প্রত্যাশা করেন—বিরূপ-মত নয়। অর্থাৎ উক্তি বলতে তাঁরা সদুক্তিই বোঝেন, কটূক্তির অবকাশ অস্বীকার করেন। তাই যখন সমালোচক লেখককে বাধিত করতে পারেন না, তখন লেখক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। লেখকের এই উষ্মা যদি বা স্বাভাবিক হয়, কিন্তু কদাপি শোভন বা সঙ্গত নয়।

কোন কোন লেখক সমালোচনা শুনে এতই বিচলিত হয়ে পড়েন যে, তৎক্ষণাৎ তাঁর শব্দযন্ত্র বিভিন্ন আর বিচিত্র সঙ্কীর্তন শুরু করে দেয়। সমালোচকের মস্তক উদ্দেশ করে ইষ্টক হয়তো নিক্ষিপ্ত হয় না, কিন্তু যেসব সপ্রেম আশীর্বচন ঝরে পড়ে, বলা বাহুল্য, তা শিরোধার্য করবার মতো বস্তু নয়।
—————————————————————–

আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন।

—————————————————————–
ভরসার কথা কেবল এই যে বাক্যবাণে অস্থি বিধ্বস্ত বা চূর্ণ হয় না, বিশেষ করে, যে বাক্যের মর্মে যুক্তি নেই তা কখনই লক্ষ্যভেদ করতে পারে না। হাঁসের গায়ের পানির মতোই তা ঝেড়ে ফেলা সম্ভব।

কোন সাহিত্য সৃষ্টিকে সকলেই একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন, এমন কোন কথা নেই। দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন এমন কি বিপরীত হলেও, দুটির একটি ঠিক এবং অপরটি ঠিক নয়, যুক্তিশাস্ত্রের এ বিধান সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে গ্রাহ্য নয়। বস্তুত দুটি ভঙ্গিই সমান সত্য বা সমান অসত্য হতে পারে। কারণ সাহিত্য অতি বর্ণাঢ্য ও বহু ব্যঞ্জনাময় এক বস্তু।
—————————————————————–


কোমলতা, অন্তর্মুখিতা আর চিন্ময়তা যদি বাংলা সহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়; তাহলে সেই দিক দিয়ে ইংরাজি সাহিত্যও বাংলার দোসর। এবং অন্তত আমার মতে সে কারণে ইংরাজি বা বাংলা কোন সাহিত্যই দুষ্ট হয়নি, বরঞ্চ সমৃদ্ধ হয়েছে।

—————————————————————–
আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন। সেন্টিমেন্টালিজম সম্বন্ধে এঁদের ধারণাও আমার কাছে শাস্ত্রসম্মত মনে হয় নি। তাই সেন্টিমেন্টালিজম-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁরা যে সব উদ্ধৃতি উপস্থিত করেছেন সাহিত্য হিসাবে সেগুলোর উৎকর্ষে ইতর বিশেষ আছে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো অন্তত সেন্টিমেন্টালিজম-এর নজির নয়।

প্রথমে, এবং প্রধানত, আবুল হোসেনের প্রবন্ধের কথাই ধরা যাক। আবুল হোসেন বলছেন: “ইংরেজের মন যেখানে বাস্তবমুখী, সত্যানুসন্ধিৎসু, ব্যঙ্গনিপুণ, তত্ত্ব ও তথ্যে উজ্জ্বল, এক কথার জীবনধর্মী, বাঙালী লেখকের মন সেদিকে অল্পই আকৃষ্ট হয়েছে।”

একটু দম নিয়ে আবুল হোসেন পুনশ্চ যোগ করেছেন: “ফরাসীরা যে-দৃশ্য দেখে আঃ উঃ করবে, চিৎকার করবে, ইংরাজরা তাকে ‘মন্দ নয়’ বলে হয়ত একটু ঘাড় বাঁকাবে।”

অর্থাৎ আবুল হোসেন বোধ করি বলতে চান, ইংরেজদের মনের মধ্যে একটি দাড়ি-পাল্লা লম্বমান আছে, তারই নিক্তিতে ওজন হবার পর ইংরেজদের যে হৃদয়াবেগ প্রকাশ পায়, তার মধ্যে হৃদয়ও নেই আবেগও নেই। ইংরেজরা বণিকের জাত, নেপোলিয়নের সেই কুখ্যাত উক্তিই এই ধারণার পেছনে কাজ করছে।

কিন্তু বাঙালী আর ফরাসীর অভিমত যাই হোক, একজন খাস ইংরাজ তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কি বলেন, এবার তাই শোনা যাক্। লর্ড ডেভিড সিসিল ইংলণ্ডে ডিকেন্সের অপ্রতিহত জনপ্রিয়তা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন:
“So that in every country, every walk of life Dickens strikes a responsive chord in the hearts of mankind. And especially in England. The English, the kindly, individualistic, illogical sentimental English, are more than any other people touched by impulsive benevolence: Instructive good nature set a value on homely satisfactions. More than any other people they are repelled by the ruthless and impersonal–in thought, or religion, or administration, or economics—Nor have they much perception of those purely intellectual values that Dickens’ view of life overlooks.”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইংরাজ সম্পর্কে আবুল হোসেনের ধারণার সঙ্গে লর্ড ডেভিডের ধারণার ঐক্য নেই।

ইংরাজি সাহিত্যে ভাবাবেগের অভাব আছে আবুল হোসেন এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ কথাও বলেছেন। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি স্মরণীয়। জীবনস্মৃতির ভগ্ন হৃদয় অধ্যায়ে কবি বলছেন:
“তখনকার দিনে আমাদের সাহিত্যদেবতা ছিলেন, শেকসপীয়র, মিলটন, বায়রণ। ইহাদের লেখার ভিতরকার যে জিনিসটা আমাদিগকে খুব করিয়া নাড়া দিয়াছে, সেটা হৃদয়াবেগের প্রবলতা। এই হৃদয়াবেগের প্রবলতাটা ইংরেজদের লোক ব্যবহারে চাপা থাকে কিন্তু তাহার সাহিত্যে ইহার আধিপত্য যেন সেই পরিমাণে বেশী। হৃদয়াবেগকে একান্ত আতিশয্যে লইয়া গিয়া তাহাকে একটা বিষম অগ্নিকাণ্ডে শেষ করা, এই সাহিত্যের একটা বিশষ স্বভাব। অন্ততঃ সেই দুর্দাম উদ্দীপনাকেই আমরা ইংরেজি সাহিত্যের সার বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলাম। রোমিও জুলিয়েটের প্রেমোন্মাদ, লিয়রের অক্ষম পরিতাপের বিক্ষোভ, ওথেলোর ঈর্ষানলের প্রলয় দাবদাহ, এই সমস্তেরই মধ্যে যে একটি অতিশয়তা আছে তাহাই তাঁহাদের মনের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার করিত।”

অতএব, আমরা এটাও দেখতে পাচ্ছি যে ইংরাজি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য আর লক্ষণ সম্পর্কেও দ্বিমতের অবকাশ আছে। কোমলতা, অন্তর্মুখিতা আর চিন্ময়তা যদি বাংলা সহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়; তাহলে সেই দিক দিয়ে ইংরাজি সাহিত্যও বাংলার দোসর। এবং অন্তত আমার মতে সে কারণে ইংরাজি বা বাংলা কোন সাহিত্যই দুষ্ট হয়নি, বরঞ্চ সমৃদ্ধ হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের বর্ষামঙ্গল কবিতাটিতে বক্তব্যের স্বল্পতা ও ধ্বনির বাহুল্য আছে বলে, এবং নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটির অর্থ আবুল হোসেনের বোধগম্য নয় বলে, দুটিকেই তিনি সেন্টিমেন্টালিজম-এ দুষ্ট বলে নাকচ করেছেন। প্রথমত বর্ষামঙ্গল নাকচ করবার মতো কবিতা নিশ্চয়ই নয়; দ্বিতীয়ত বক্তব্যের স্বল্পতা ও ধ্বনির বাহুল্যের অপরাধ যতই থাক, সে অপরাধ সেন্টিমেন্টালিজম-এর নয়। বিদ্রোহী কবিতাটি অন্তত আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়নি, এবং কবিতার শেষ দুটি ছত্র সম্বন্ধে আবুল হোসেন আপত্তি করলেও, সেগুলো আমার কাছে সুসম্পৃক্ত বলেই মনে হয়েছে এবং সমগ্র কবিতাটি বুঝবার পক্ষে সহায়ক বলেই মনে হয়েছে। সে যাই হোক, দুরাহতাও সেন্টিমেন্টালিজম-এর লক্ষণ নয়। বাঙালী সেন্টিমেন্টালিজম-এর চারিত্র্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবুল হোসেন বলেছেন: “মনে করুন সন্ধ্যেয় আপনি ওষুধ কিনতে বেরিয়েছেন। বাড়িতে ছেলের অসুখ। রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে, ফিনকি দিয়ে জ্যোৎস্না ছুটছে—আপনি ছেলের অসুখের কথা ভুলে গেলেন, ওষুধ কেনা মাথায় উঠল।”

আবুল হোসেন বর্ণিত চন্দ্রাহত ব্যক্তিটির দৃষ্টান্তে আমরা নিজেরাই বজ্রাহত হয়ে গেছি। প্রতিপাদ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে hypothetical case-এর উত্থাপন সমালোচনা সাহিত্য গ্রাহ্য বটে কিন্তু mental case সম্পর্কেও কি এই কথা খাটে?

এই ধরনের চরিত্র কেবল ননসেন্স লিটারেচারেই শোভা পায়। ননসেন্স লিটারেচারের উল্লেখে সুকুমার রায়ের কথা মনে পড়ে গেল। দর্জির ফিতে থেকে সব রকম চিহ্ন মুছে গেছে, কোনমতে একটুখানি লেগে আছে—সাত ইঞ্চি। দর্জি মাপ নিচ্ছে: কোমর সাত ইঞ্চি, ছাতি সাত ইঞ্চি, হাতা সাত ইঞ্চি, লম্বা সাত ইঞ্চি।

ঠিক স্মরণ নেই, ফিতেয় সাত ইঞ্চির চিহ্নটাই অবশিষ্ট ছিল, কিংবা অন্য কোন এক বিশেষ চিহ্ন। তবে একটিমাত্র চিহ্নই অবশিষ্ট ছিল।

আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও সাহিত্য জরিপ করতে বসে সবখানে সেণ্টিমেন্টালিজম-ই দেখেছেন।

সেন্টিমেন্টালিজম-এর সংজ্ঞা কি এখানে তার আলোচনা প্রয়োজন। পুনরায় লর্ড ডেভিড সিসিল-এর স্মরণ নেয়া যাক। তিনি বলছেন: Pathos can be most powerful of all the weapons in the novelists, arsenal. But it is…dangerous to handle. The reader must feel convinced that the story inevitably demands that a direct attack be made on his tender feeling. It he once suspects that his emotions are being exploited, his tears made to flow by a cold-blooded machination on the part of the author, he will be nauseated instead of being touched…… He tries to wring an extra tear from the situation: he never lets it speak for itself.

লেখক যখন জনপ্রিয়তা কিংবা পসারের লোভে পাঠকের করুণার উদ্রেক করেন তখনই তিনি ভাবালুতার আশ্রয় নিচ্ছেন। অর্থাৎ পাঠকের চিত্তজয় করবার জন্যে তার তূণে যতগুলো বাণ আছে, সেগুলোর মধ্যে সবচাইতে অব্যর্থ হচ্ছে সেন্টিমেন্টালিজম। কিন্তু লর্ড ডেভিড এ কথাও বলছেন, পাঠক যদি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করে যে তার কোমলতার অন্যায় সুযোগ নেয়া হচ্ছে, তাহলেই সে বেঁকে বসবে—সমস্ত ব্যাপারটাই তার কাছে ন্যক্কারজনক মনে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে: বেঁকেই যদি বসবে, তাহলে লেখক সে অস্ত্র প্রয়োগ করবেন কেন? কিন্তু টম ভিক আর হ্যারি বেঁকে বসে না, বরঞ্চ হাহুতাশ করে কাঁদতে বসে। বেঁকে বসেন Oscar Wilde তাই তিনি বলতে পারেন: “Little Nell-এর মৃত্যু দেখে হাস্য-সংবরণ করতে পারবে না কেউ—অবশ্য তার হৃদয় যদি পাষাণ না হয়।” ডিকেন্স অবশ্য আশা করেছিলেন, পাষাণ হৃদয় না হলে, সে কাঁদতে বসবে।

কিন্তু এই সংজ্ঞার অর্থ এ নয় যে, লেখক যেখানেই কোমলবৃত্তিগুলোর খেলা দেখবে, যেখানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছটা দেখবে, যেখানেই সহৃদয় সংবেদনশীলতার সিক্ততা দেখবে, সেখান থেকেই সভয়ে পিছপা হবে। অথচ আবুল হোসেন আর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই জিগিরই তুলেছেন। তাহলে তাঁদের কাছে কি সেই রকম জগৎই কাম্য Aldous Huxley A Brave New World-এ যার দুঃস্বপ্ন দেখেছেন?

আবুল হোসেনের প্রবন্ধে কতগুলো স্ববিরোধিতাও চোখে পড়ে। একটি দৃষ্টান্ত দিই।

আবুল হোসেন এক স্থানে বলছেন:
“কথাটা শুনতে যতই খারাপ লাগুক অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত সত্তর-পঁচাত্তর বছর ধরে আমরা যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছি তার সবটাই সমসাময়িক হিন্দু সমাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত।”

এই প্রসঙ্গে আবুল হোসেন মীর মোশারফ হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু একটু পর তিনিই বলছেন:
“আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি সেই মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল ইসলামের লেখায় গত একশ’ বছরে যেসব বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই তা ‘একান্ত-ভাবেই’ ইংরেজের কাছে শেখা।”

এখন আমার প্রশ্ন: নজরুল ইসলাম একাধারে সবটাই হিন্দু সমাজের দ্বারা এবং ‘একান্ত-ভাবেই’ ইংরেজ দ্বারা কি করে দীক্ষিত হতে পারেন।

তথ্যের দিক দিয়েও কথা দুটির একটিও অন্তত ‘সবটাই’ এবং ‘একান্ত-ভাবে’ ঠিক নয়।

আবুল হোসেন আরও বলছেন: “আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যে ইংরেজের জয়-জয়কার সে রোমান্টিক ভিকটোরিয়ান যুগের ইংরেজ।” বোধ করি আবুল হোসেন এই বলতে চান, বাংলা সাহিত্য বুদ্ধিনির্ভর হলো না, হৃদয়সর্বস্ব হয়ে থাকল। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের নামোল্লেখ করেছেন। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখ পশ্চিম বঙ্গের কবি এবং আমাদের নিজের আবুল হোসেনের কাব্য-প্রচেষ্টাই কি আবুল হোসেনের উক্তির যাথার্থ্য অপ্রমাণ করছে না?

তা’ছাড়া খেলার মাঠ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার মতো ঘটনা এদেশেরই একক অভিজ্ঞতা নয়। ইংলন্ডের ফুটবল মাঠে, আমেরিকার বেসবল ময়দানে এবং ওয়েস্ট ইণ্ডিজে ক্রিকেট পিচেও হামেশাই রক্তারক্তি হয়। আবুল হোসেন বলেছেন—“সদরঘাটে চায়ের কাপে তুফান ওঠে প্রতিদিন।” চায়ের কাপে তুফান ওঠা এই expression-টাই আমরা ইংরাজের কাছে শিখেছি; সুতরাং অনিবার্য উপসংহার এই দাঁড়ায় যে উক্ত ঘটনা ইংরাজের চায়ের টেবিলেও হামেশাই ঘটে।

নজরুল আর শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে আবুল হোসেন বলছেন: দুজনেরই সাফল্যের মূলমন্ত্র একই হৃদয়াবেগ।

শরৎচন্দ্র অবশ্যই সেন্টিমেন্টাল শিল্পী। কিন্তু তাঁর সাফল্যের মূলমন্ত্র কেবল তাই কি? সাহিত্যিক উৎকর্ষের দিক দিয়ে কোন কোন বিষয়ে কি তিনি চরমোৎকর্ষের পরিচয় দেননি? তাঁর মতো সংলাপ কি আর কেউ লিখতে পেরেছেন? তা ছাড়া বাল্য আর কৈশোরের যে ছবি আমরা শরৎ সাহিত্যে দেখতে পাই, একমাত্র ডিকেন্স ছাড়া অন্তত ইংরাজি সাহিত্যে তার তুলনা নেই। দেবদাস সেন্টিমেন্টাল এ-কারণে নয় যে, এই সোনার চাঁদ ছেলেটির কাছে চন্দ্রমুখীর প্রেম, বন্ধুর প্রীতি প্রভৃতি মিছে হয়ে গেছে, সত্য কেবল পার্বতীর প্রেম। দেবদাস যদি পার্বতীকে ভুলে, আই-সি-এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, একটি রাঙা টুকটুকে বউ ঘরে নিয়ে আসত তাহলে হয়তো সমাজের প্রভূত কল্যাণ হতো, কিন্তু সাহিত্যের সমূহ ক্ষতি হতো। জীবনের সত্য আর সাহিত্যের সত্য এক পদার্থ নয়।

দেবদাস তখনই সেন্টিমেন্টাল যখন শরৎচন্দ্র বলছেন: “মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে-সময়ে যেন একটি স্নেহ-করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে—যেন একটিও করুণাদ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”—এইখানেই শরৎচন্দ্র tries to wring an extra tear from the situation.

Balzac-এর Father Goriot-এর Goriot চরিত্র মনে পড়ছে। কন্যাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে Goriot জীবনপণ করল, মান-অপমান বোধ ভুলে গেল, এবং বন্ধুর প্রীতিও ‘কিছু নয়’ হয়ে গেল, শেষ পর্যন্ত এই বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করল। তাও কিনা নিতান্তই অপদার্থ ও কৃতঘ্ন কন্যাদের জন্যে। কিন্তু Father Goriot বিশ্ব সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে স্বীকৃত—সেন্টিমেন্টাল বলে ধিকৃত নয়। তাহলে কি এই বুঝব, কন্যার জন্যে প্রাণ দিতে পায়, কিন্তু প্রেয়সীর জন্যে নয়!

কোন একটি হৃদয়াবেগ sentimentalism হলো কি না, তার মাপকাঠি হচ্ছে, convincing হলো কি না। একই হৃদয়াবেগ বিভিন্ন কবির হাতে পড়ে কবিকর্মের গুণাগুণের দরুন কখন মহৎ সাহিত্য এবং কখন বা কেবল সেন্টিমেন্টালিজমই হয়। এই প্রশ্নের সঙ্গে সাহিত্যিকের ক্ষমতা-অক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত—যে কথা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধের উপসংহারে বলেছেন। কোন একটি বিশেষ হৃদয়াবেগ তার অন্তর্নিহিত ত্রুটির দরুন সেন্টিমেন্টালিজম হয় না—লেখকের treatment-এর ত্রুটির দরুনই হয়। উপন্যাসের সমগ্র পরিবেশের সঙ্গে, চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যদি কোন হৃদয়াবেগ সম্পর্ক শূন্য হয় তাহলেই সেই আবেগ সেন্টিমেন্টালিজম। একটি দৃষ্টান্ত উপস্থিত করলে আমার বক্তব্য পরিষ্কার হবে।

যীশু খ্রিষ্ট যখন বলেছিলেন, তোমার একটি গালে যদি কেউ চড় মারে অপরটিও এগিয়ে দিও, তখন তাঁর উক্তি সেন্টিমেন্টালিজম হয়নি। বরঞ্চ মহাপুরুষের মহৎ বাণীর মর্যাদাই লাভ করেছিল। কিন্তু আমি যদি সেই একই বাণী প্রদান করি তাহলে তা হাস্যোদ্রেকই করবে। কারণ আমার জীবনের পূর্বঘটনার সঙ্গে এই মহৎ সঙ্কল্পের কোন মিল নেই, এবং আমি এ নিশ্চয়তাও দিতে পারি, পরবর্তী ঘটনার সঙ্গেও থাকবে না। সুতরাং আমার মুখে এ ধরনের কথা convincing শোনাবে না—false শোনাবে।

সুতরাং সেন্টিমেন্টলিজম-এর জন্যে হৃদয়াবেগের উপর দোষারোপ করা সমীচীন হবে না—লেখকের অক্ষমতাকে দায়ী করাই সঙ্গত হবে।

বাংলা সাহিত্যে হৃদয়বৃত্তির প্রাধান্য বেশী তাতে অবশ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই কারণে হৃদয়বৃত্তির সাহিত্য সৎ সাহিত্য হয়নি এ ধারণা ঠিক নয়। যে সব রচনা সাহিত্য হয়নি, তার কারণ ভিন্ন। শরৎচন্দ্র বা ডিকেন্স তাঁদের স্বাভাবিক প্রবণতার লাগাম টেনে ধরলে শেষ পর্যন্ত কোন রকম সাহিত্যই সৃষ্টি করতে পারতেন কি না সন্দেহ। শরৎচন্দ্র বা ডিকেন্স কেউই intellectual চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেনি—অর্থাৎ সৃষ্টি সার্থক হয়নি। সুতরাং ভাবাবেগপূর্ণ চরিত্র সৃষ্টি থেকে তাঁরা বিরত হলে সাহিত্যের লোকসানই হতো।

তা ছাড়া প্রতি দেশেরই ভূ-প্রকৃতি অনুসারে সেই দেশের নরনারীর চরিত্র গড়ে ওঠে অন্তত প্রভাবান্বিত হয়। সুতরাং আমরা সবাই যদি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ইংরাজদের আচরণ অনুকরণ করতে চেষ্টা করি সেটাও convincing বা কল্যাণকর কিছুই হবে না। বিভিন্ন দেশের লোকচরিত্রে তার দেশীয় বৈচিত্র্য থাকবেই। গোটা দুনিয়াটাকে একই ছাঁচে ঢেলে সাজাবার চেষ্টা কোন দিক দিয়েই সার্থক হতে পারে না।

আর একটি কথাও মনে রাখবার যোগ্য: কোন মানুষই একটি বিশেষ আদর্শ বা নীতির সরল রেখা ধরে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অগ্রসর হয় না—তা যদি হতো তাহলে মানুষের আচরণ সম্বন্ধে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হতো। কিন্তু মানুষ সবার উপরে মানুষ—কোন একটি logic-এর ক্রীড়নক নয়—কোনকালেই হওয়া বাঞ্ছনীয় হবে না। মানুষের আচরণ চিরকালই বহুলাংশে unpredictable থাকবে।

Somerset Maugham বলেছেন, মানুষের আচরণে সঙ্গতি সামঞ্জস্য সব সময় আশা করা যায় না। সেই কারণেই তার নিজের বক্তব্যে ও চিন্তায় সব সময় ঐক্য থাকে না। Somerset Maugham আরও বলেছেন: The intellect is such a pliable and various weapon that man, provided with it, is practically bereft of all others; but it is a weapon of no great efficiency against instinct. সেই কারণেই Maugham আধুনিক কবিতা সম্পর্কে কিছুটা অসহিষ্ণু। তিনি বলেছেন: “Modern poets should be content with less cleverness if only they had more feeling. They make little songs not from great sorrows but from the sober pleasures of a good education.”

এত করে Maugham-এর কথা বলা হলো কারণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর কথা বলেছেন। তা’ছাড়া সাহিত্যে যেমন T. S. Eliot-এর স্থান আছে তেমনি Wordsworth, Shelley-রও আসন আছে। T. S Eliot-এর কবিতার রসাস্বাদনের জন্যে Wordsworth, Shelley-কে অপাংক্তেয় ভাবার কোন প্রয়োজন নেই।

original post



read more

পথে, প্রদেশে (পর্ব ১)

by মাসুদ খান |

বাংলা প্রাণের দেশ, বাংলা গানের দেশ, মায়া ও প্রেমের দেশ, বাংলা যেন এক জাদুবাস্তবের দেশ…

যে দেশে উজান বেয়ে চলে, প্রেমে, ভাটির ভাসান
স্রেফ ভালোবাসাবাসি দিয়ে যেইদেশে বহু মুশকিল আসান!
যে দেশে সুজন দেখে করলে প্রেম, মরলেও বাঁচাতে পারে তারে
সত্যি-সত্যিই, এবং বারে বারে!

অরূপ রূপের সেই দেশে উড়ে চলো মন
ঘুরে ঘুরে বেড়াই এ-মনপবনের জাদু-উড়াননৌকায়
দূর-দূরান্তের নানা জেলায় জেলায়…

অরূপ রূপের সেই দেশের ছোট্ট একটি জাদুবাস্তব শহর বগুড়া — যেখানে কেবলই মিলে-মিলে যায় রোদ ও কুয়াশা, মিলে-মিলে যেতে চায় স্বপ্ন ও বাস্তব। একাকার হতে চায় প্রাপ্তি আর বাসনা…সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে টালমাটাল দাঁড়িয়ে থাকে বগুড়ার ল্যান্ডস্কেপ, এর পথঘাট, বাহন-বিপণী, আড়ত-ইমারত! এখানকার মানুষ ও কবিকুল হাঁটেন স্বপ্নসম্ভব পথে। ঘুরে বেড়ান কুয়াশাসম্ভব মাঠে ও প্রান্তরে! অবাক-করা এক শহর! বেশ কিছুকাল আমিও ছিলাম সেই স্বপ্নশহরে। এক অর্থে বগুড়া আমারও শহর…আসলে প্রত্যেকেরই থাকে একটি করে শহর, মনের মতো, স্বপ্নময় শহর — যেখানে উপশহরের আধো-আলো-আঁধারি-জড়ানো কোনো বিষাদমাখা বারান্দা থেকে দেখতে পাওয়া যায় শহরের কোনো নার্সিং হোমের শুশ্রুষাময় আলো…।

সেই স্বপ্নশহরে আমার, আমাদের যাপন ও উদ্যাপনের আলো-আঁধার দিয়ে রচিত এই সন্ধ্যাভাষ্য।

* * *

জিন্সের প্যান্ট। নীল টি-শার্ট। শার্টের পিছনে লেখা ‘অ্যান্ড মাইল্‌স টু গো বিফোর আই স্লিপ…অ্যান্ড মাইলস্ টু গো বিফোর আই স্লিপ…’। শার্টে কুয়াশা। নীলচে-নীলচে। প্যান্টে কুয়াশা। কাঁধ বেয়ে নেমে আসা লম্বা-লম্বা চুল। চুলেও কুয়াশা। এই হালকা-হালকা শীতের গোধূলিবেলায় ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে ওই যে এক কিশোর কবি। নিরুদ্দেশ পথিকের মতো। নির্জন গোহাইল রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছে দক্ষিণে। ঘুমিয়ে পড়বার আগ-পর্যন্ত কবিকে পেরুতে হবে মাইল-মাইল পথ। কবি বায়েজিদ মাহবুব। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি তার ওই মাথানিচু হেঁটে যাওয়া, অনেকদূর পর্যন্ত। একসময় আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যান কবি আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।

এক বিখ্যাত তরুণ, বজলুল করিম বাহার, কবি, চিরসবুজের চিরবসন্তের দেশ থেকে আসা অজর অক্ষর ঝলমলে বসন্তবাহার! রাগ মিয়া-কি-মল্লার, রাগ অনন্ত-ভাটিয়ার…পা-থেকে-মাথা-পর্যন্ত কবি, নখ-থেকে-লিঙ্গ-পর্যন্ত কবি — বিস্ময়কর এক তরুণ…মানুষের চোখেমুখে যে এত আলো ও বিজলিচমকানি থাকে, থাকতে পারে…মানুষ যে কখনো কখনো এতটা শিশু আর এতটা কবি হয়ে ওঠে, উঠতে পারে — আমরা দেখিনি কখনো…আর তার সেই বিখ্যাত শৈশববোধ — শৈশবে, জ্যোৎস্নারাতে, দূর ভুটানের পাহাড় থেকে স্বপ্নের মতো নেমে আসত সব নীলগাই। নেমে আসত বাঘ, বাঘদাস (ডিম পাড়ে হাঁসে/ খায় বাঘদাসে) আর ভুটান মুলুকের ভুটিয়ারা। দলে দলে। এই ধানজুড়ি, এই কইগাড়ি, এই বৃন্দাবনপাড়া, এই দত্তবাড়ি, এই নামাজগড়, মালতিনগর…আর আমরা সত্যি-সত্যি একদিন দেখলাম, ম্যান্ডোলিন-এর দোতলায় দাঁড়িয়ে, লাফিয়ে ওঠার ভঙ্গিতে একদম ফ্রিজ করে দেওয়া সেই তীরবিদ্ধ পাথরিত ঘোড়ার পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, বাহার, ফখরুল-পাগলা, শিবলী, আদিত্য, পাগলা-রাইসু আর আমি…(আমি আর আমার বউ তখন কবি ব্রাত্য রাইসুকে প্রীতিবশত কখনো পাগলা-রাইসু কখনো রাইসু-পাগলা বলতাম, সামনে নয় আড়ালে! আর ফখরুলকে তো পাড়াসুদ্ধ সবাই পাগলা কবিই বলত! তো সেই সময় কবি সাজ্জাদ শরিফ, রাজু আলাউদ্দিন, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির এঁরা ক-দিনের জন্য বেড়াতে এসেছিল আমাদের সেই বৃন্দাবনের বাড়িতে, আদিত্য তো এসেছিল সারাপথ নাঙ্গা পায়ে, গিয়েছিলও তাই) তো আমরা সত্যি-সত্যিই দেখলাম, রাত দশটা বাজতে না বাজতেই উডবার্ন লাইব্রেরির পার্ক থেকে বেরিয়ে গোহাইল রোড ধরে আসছে চকচকে সব ডোরাকাটা বাঘ, সাতমাথার দিকে। একটা, দুইটা, তারও পরে আরো একটা, হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে। আর পেছনে পেছনে সত্যিই একটা বাঘদাস, একটা নয় ঠিক, দুইটা। সাতমাথার সেই ছোট্ট গোল আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে এক বেরসিক ট্রফিক পুলিশ তার নির্বিকার হাতের সংকেতে থামিয়ে দিচ্ছে তাদের। আর বাঘ ও বাঘদাসগুলোও সব কেমন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পড়ছে সুশীল বালকের মতো। অবাক কাণ্ড!

সপ্তপদী। কেউ বলে, সাতমাথা। সাতটা পথ এসে মিশেছে এখানে। ছোট্ট গোল ট্রফিক আইল্যান্ড। ফুলছড়ি ঘাট থেকে ট্রেন এসে থেমেছে বগুড়া স্টেশনে। যাত্রীরা আসছে খরগোশের মতো ব্যস্তসমস্ত হয়ে রিকশায়, পায়ে হেঁটে…। শহরের বাসগুলো ট্রাকগুলো সারাদিন কোথায়-কোথায় দৌঁড়ে বেড়িয়েছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। এখন সব বাড়ি ফিরছে নিরীহ কিশোরের মতো নানা দিক থেকে, নানা দেশ থেকে। সাতমাথা আর রেলস্টেশনের মাঝামাঝি জায়গাটায় তাদের আস্তানা। বাহার ভাই বলছেন, অনেকটা প্রফেটিক ভঙ্গিতে, দেখবেন, বাঘগুলা যেই সাতমাথা পার হয়ে এদিকটায় আসবে, অমনি বদলে গিয়ে হয়ে যাবে একেকটা নতুন-নতুন ট্রাক। দেখবেন তা-ই হবে। আর কী অবাক কাণ্ড! সত্যি-সত্যি শহরের এই নতুন অংশের দিকে আসতে আসতে রূপান্তর হচ্ছে বাঘদের! বাঘের চোখ দুটো বদলে যাচ্ছে একজোড়া জ্বলজ্বলে হেডলাইটে। ধেয়ে চলা পা-চারটি ওই যে আস্তে-আস্তে গোলাকার হয়ে বদলে যাচ্ছে চাকায়! হুঙ্কার রূপান্তরিত হচ্ছে হর্নের আওয়াজে। আর বাঘের ডোরাকাটা তেলচকচকে শরীর হয়ে যাচ্ছে ট্রাকের পেইন্ট-করা স্ট্রাইপ-অলা চকচকে বডি। শহরের এই নতুন অংশের চোখধাঁধানো আলো পিছলে পড়ছে বডি থেকে।

আজ রাতে বাহার ভাই যা-যা বলছেন, ঠিক তা-ই তা-ই হচ্ছে। নেকড়েমতো একটা প্রাণী, লম্বামুখো, হুসহুস করে ছুটে আসছে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, শেরপুর রোড ধরে। সাতমাথার ওই গোলচত্বর পার হয়ে এসেই হয়ে যাচ্ছে টেম্পো। হুড়ুৎ করে দ্রুত বাঁক নিয়ে চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দিকে, নিজস্ব ডেরায়।

আপনি যদি কখনো বগুড়ায় আসেন, দেখবেন, এখানে এরকমই হয়।

চম্পক। গার্ডেন রেস্তোরাঁ। আলোজ্বলা গোল-গোল ছাতার নিচে গোল-গোল টেবিল। নানান বাহারি গাছ। ফুলগাছ। শহরের সব আলো নিভে যাবার পর সেখানে আপন তেজেই আলোকিত হয়ে থাকে উদ্ভিদগুলো। আজ তারা সেজেছে খুব করে। খোঁপা করেছে, নানা রকমের বাহারি খোঁপা-টপনট, পনি টেইল…কানে পরেছে দুল, ঝুমকা, রূপলঙ্কা…।

সপ্তপদী থেকে আকবরিয়া মার্কেট, সারাক্ষণ উৎসব-উৎসব আমেজ। রাস্তার দুধারে ভিখারি বণিতা কবি প্রেমিক উন্মাদ ফলবিক্রেতা ওষুধবিক্রেতা গন্ধবণিক রেস্তোরাঁ প্রেক্ষাগৃহ, হরেক রঙের প্রথা, রিচুয়াল, নানান যজ্ঞ লেগেই আছে। মহাধুমধাম।

একজন লোক। খুবসম্ভব কোনো ওষুধ কোম্পানির সেল্স্ রিপ্রেজেনটেটিভ। নতুন এসেছেন এ শহরে। হয়তো দূরের কোনো শহর থেকে। হাতে ব্যাগ। সন্ধ্যার পর শ্যামলী-তে আহার সেরে বাইরে এসে আরাম করে পান চিবাচ্ছেন। তাম্বুলরসে রঞ্জিত তার মন ও মুখ। চোখেমুখে ফুর্তি-ফুর্তি ভাব। লম্বা জাহাজের মতো এক সিনেমা হল। উত্তরা হল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী বালকের মতো সিনেমার বড় বড় পোস্টার দেখছেন। দেখছেন তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিক। হাসি-হাসি মুখ। যেন সর্ব-অঙ্গ দিয়ে বোধ করছেন পুলক ও পবিত্রতা। আমাদের শিবলী, কবি শিবলী মোকতাদির, হঠাৎ কোত্থেকে এসে জানা-নাই-শোনা-নাই আচমকা কী-কী যেন বলছে লোকটাকে, মিটিমিটি হেসে হেসে — জানেন, জানেন, খবর শুনছেন, নানান দেশ থেকে, গাইবান্ধা সিলেট রংপুর রাজশাহী বগুড়া বাঁকুড়া ব্রেমেন বাস্তিল বীরভূম থেকে সব কবি-সাহিত্যিকরা আইসা বলা-নাই-কওয়া-নাই পথিকের বাসায় উঠতেছে। আরে পথিক মানে…চিনলেন না! ওই যে, কামরুল হুদা পথিক, গল্পকার পথিক, গল্পকার চিনলেন না? গল্প করে যে…গল্পকার…উপপদ তৎপুরুষ, আরে তৎপুরুষ বুঝলেন না? তাহার পুরুষ…তৎপুরুষ, ষষ্ঠী তৎপুরুষ… যাঃ শালার তৎপুরুষ তো দেখতেছি নিজেই এক তৎপুরুষ সমাস! আসলে কী জানেন, বাংলা এক আজব ভাষা, এক মজার ভাষা…এই ধরেন সমাস, ধরেন-ধরেন, ধরেন না! …ধরছেন তো! ‘দুই গু-য়ের সমাহার’…বলেন তো কী? আহ্হা! পারলেন না…(আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বাজিয়ে গুনগুন করে গাইতে থাকে) ‘উল্লুকেরও থাকিতে নয়ন…’ এটুকু গাওয়ামাত্র লোকটা বেশ ঘাবড়ে যায়, ভাবে, তাকেই বোধহয় উল্লুক বলছে…তো শিবলী গাইতে গাইতেই ইশারায় লোকটাকে আশ্বস্ত করে, বলে, ‘না-না আপনাকে না, এটা তো গান, এমনি-এমনিই গাই আর কি!’ বলেই ফের শুরু করে দেয় — “উল্লুকেরও থাকিতে নয়ন/ না দ্যাখে সে রবিরও কিরণ/ কী কবো দুঃখেরো কথা… সে-জন ভাব জানে না-হা/ সে-জন মানিক চেনে না/ যে-জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনা-দেনা/ খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা, সে-জন সোনা চেনে না// ’ এতখানি গাইবার পরও তার ওপর লোকটার পুরাপুরি একিন আসে নাই দেখে শিবলী আরেকটা গান শুরু করে — “তোর নামের ভরসা ক’রে তরী দিলাম ছেড়ে…/ একবার হাইল ধরিয়া বইসো গুরু ভাঙা তরীর ’পরে রে/ অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে…” তো, দুই গু-য়ের সমাহার…দ্বিগু…আচ্ছা দ্যাখেন তো কী কীর্তি! দ্বিগু নিজেই দ্বিগু সমাস… হাঃ হাঃ হাঃ কী তামশা!…আবার দ্যাখেন, কর্মধারয়…ব্যাসবাক্য কী?… কর্ম যে ধারয়… কর্মধারয়… (ঠিক হইতেছে তো!)… হাহ্, কর্মধারয় নিজেই এক কর্মধারয়… আবার ধরেন বহুব্রীহি…বহু ব্রীহি আছে যাহার…নিজেই বহুব্রীহি সমাস…! আবার দ্যাখেন, অব্যয়-অব্যয় ভাব…অব্যয়ীভাব! আর যেন কী আছে? তৎপুরুষ। ও হো…তৎপুরুষ তো আগেই বললাম। তো দেখলেন তো, কী তামশা! সব ফকফকা! আর যেন কী! ও, দ্বন্দ্ব…দ্বন্দ্ব সমাস…এইবার দ্বন্দ্বে এসে পড়লাম তো বেশ ধন্দে! “মোরে কূলে রাইখা বারেবার/ না যাইও গাঙ্গেতে আর// সাথে সাথে নিয়ো তুমি নৌকাতে/ নাও বাইয়ো না মাঝি বিষম দইরাতে// কলোকলো ছলোছলো নদী করে টলোমলো/ ঢেউ ভাঙে ঝড়-তুফানে রে…/ নাও বাইয়ো না মাঝি বিষম দইরাতে//” তো যা বলতেছিলাম, সেই পথিক, গল্পকার পথিক, লিটল ম্যাগ স¤পাদক পথিক। ইদানীং খালি সায়েন্স ফিকশন ছাপাইতে চায় তার লিটল ম্যাগে…খালি বলে সাই-ফিক, সাই-ফিক… অবশ্য কবিতাও ছাপাইব…তো, তার বাসাটা তো এক্কেরে থইথই করতেছে, একদম ভর্তি দেশী-বিদেশী কবিসাহিত্যিক দিয়া! মাটির মসজিদের পাশে বাসা। জানেন, চা বানাতে বানাতে ভাবি একেবারে হিমশিম খাইতেছে! (ফের দুলে-দুলে গাইতে থাকে…) “পিরিত যতন, পিরিত রতন, পিরিত গলার হার/ পিরিত কাঞ্চন পাইল যে-জন, পিরিত কাঞ্চন পাইল যে-জন, সফল জনম তারো রে/ দুনিয়া পিরিতের বাজার//।” শেষে শুধু গান আর গানেরই জোয়ার… লোকটাও গুনগুন করে তাল দিতে থাকে আস্তে আস্তে –

“ক্যালন মাছের ত্যালন-ত্যালন, তেইল্যা মাছের গোসা/ নতুন মাইয়ার বুড়া জামাই, নতুন মাইয়ার বুড়া জামাই/ নিত্যই করে গোস্‌সা গো/ দুনিয়া পিরিতের বাজার…// (ফের…) কই মজে কইয়ের ত্যালে, মাগুর মজে ঝোলে/ রসিক মরে প্রেমের জ্বালায়, রসিক মরে প্রেমের জ্বালায়/ ফড়িং মরে ফান্দে গো// রঙ্গের নাও রঙ্গের বৈঠা…/”

আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, শিবলী অনর্গল বলে যাচ্ছে আর তুড়ি বাজাতে বাজাতে গুনগুন করে গাইছে, আর অচেনা লোকটা শিশুর বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে সব শুনছেন। কোনো অপ্রস্তুত ভাব নেই। খুব খুশি-খুশি লাগছে তাকে।

লোকটার কাছে সবকিছু অপূর্ব-অপূর্ব লাগছে! ওই জাহাজের মতো লম্বা সিনেমা হল — তার সাতরঙা পোস্টার, সাতরঙা হোর্ডিং, অচেনা এক শিবলীর কাছ থেকে আচমকা অপ্রত্যাশিত সব তথ্যপ্রাপ্তি, স-ব, সবকিছু… দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, শুনছেন, আর মিটিমিটি হাসছেন।

আকবরিয়া মার্কেট। পড়ুয়া। বইয়ের দোকান। কবি শোয়েব শাহরিয়ারের। সন্ধ্যা হয়ে আসছে তখন। শহরের নানান জায়গা থেকে তরুণ কবিরা, ছোট কাগজের স¤পাদকেরা, কবি-যশোপ্রার্থীরা ধীরে ধীরে এসে জড়ো হচ্ছে পড়ুয়া-র সামনে। আড্ডা হচ্ছে তুমুল, কখনো পড়ুয়া-র সামনে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই, কখনো শ্যামলী-তে, কখনো আকবরিয়া-য়, কখনো এশিয়া-য়, মিষ্টির দোকানে, মিষ্টি খুব পছন্দ কবিদের, কখনোবা তৃষা-য়। আকবরিয়া এলাকাটা যেন শহরের হৃৎপিণ্ড, এই ছোট্ট স্বপ্নসম্ভব শহরের! আ স্মল বিউটিফুল হার্ট দ্যাট অলওয়েজ থ্রব্স্!

আজ বৃহস্পতিবার। ওই যে এক দীর্ঘকায় ছিপছিপে তরুণ। কবি মাহমুদ হোসেন পিন্টু। কী এক অচেনা নেশায়, অজানা আকর্ষণে তিব্বতি ছোরার মতো দুধারে বাতাস কেটে কেটে হনহন করে হেঁটে আসছে পড়ুয়া-র সান্ধ্য আড্ডার দিকে। যেন একরকম ছুটেই আসছে! কাঠের আসবাবের দোকান তাদের। বনানী ফার্নিসার্স। এখন সন্ধ্যা বৃহ¯পতিবারের। কাল বন্ধ। কাল ছুটি। পড়ুয়া-র বাঁশির সুর কানে এসে বাজছে, মন একেবারে উন্মন হয়ে আছে! প্রাণ পিপাসিত হয়ে আছে ওই সান্ধ্য আড্ডার জন্য। “তরল্লা বাঁশেরো বাঁশি ছিদ্র গোটা ছয়/ বাঁশি কতই কথা কয়/ আমার নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি রহনো না যায়/ প্রাণসখী রে, ওই শোন কদম্বতলায় বংশী বাজায় কে//” সন্ধ্যা হয়ে আসছে আর তার সেই কাঠের ছোট্ট অরণ্যে, বিচিত্র সাইজ-করা সব কাষ্ঠখণ্ডে, বার্নিশবিহীন অসমাপ্ত আসবাবের কাঠামোতে গজিয়ে উঠছে ঝলমলে পাতা ও পল্লব। প্রাণ পাগল হয়ে যায়! সন্ধ্যায় তড়িঘড়ি শ্রমিকদের সপ্তাহের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে, হিসাবনিকাশ সেরেই দে ছুট…।

আরো একজন। বিপরীত দিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন পড়ুয়া-র দিকে। সরকার আশরাফ। কথাকার। নিসর্গ-র সম্পাদক। চেহারাটা বেশ রাফ অ্যান্ড টাফ। প্রেস থেকে এলেন। পায়ে ধুলা, চুলেও ধুলা উড়ছে। লিটল ম্যাগাজিন তার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা…।

কবি ফখরুল আহসানের সঙ্গে রিকশায় চলেছি। রিকশা চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। দুপুরের রোদের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ঠনঠনিয়া, কানছগাড়ি, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলা…। রাস্তার ধারে এক ছোকরা নাপিত টুল ও চেয়ার পেতে, আয়না খাটিয়ে বসে পড়েছে দিব্যি। টেকোমাথা এক খদ্দের। মাথায় অল্প কিছু চুল অবশিষ্ট। টাক থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে আলো। চকচকে করছে তাই। নাপিত ছোকরা খুব কায়দা করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চুল ছেঁটে দিচ্ছে। খালি গায়ে নেয়াপাতি ভুড়ি ভাসিয়ে আয়েশে চোখ বুজে চেয়ারে বসে আছেন টেকোমাথা। কী মজা! কী আমোদ আকাশে বাতাসে ও রোদে! কী আনন্দ আলোর বিদ্যুচ্চুম্বক ঢেউয়ে, ফড়িঙের পাখার কাঁপনে, লাউডগার লিকলিকে জিহ্বায়, আকর্ষিকায়, বাতাসের গুলতানিতে! শ্রুতি ছুঁয়ে যাচ্ছে শ্রুতি, হৃদিতে মিশছে হৃদি, শ্রবণে শ্রবণ…। এই তো হচ্ছে যোগাযোগ, একদম সরাসরি, সোজা ও সহজ! নাপিতের পাশে রাখা রেডিওতে গান বাজছে। গানের ঝলক বেতার থেকে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে তারে। ইলেকট্রিকের তার। তারে প্রতিহত হয়ে কানে এসে লাগছে গানের সুর, ফুটে উঠছে কলি “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…।”

রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস।

মফিজ পাগলার মোড়। সাঁৎ করে একটি রিকশা আড়াআড়ি পার হয়ে গেল। আরোহী দুজন তরুণী। চালকের চোখেমুখে স্ফূর্তি, অনির্বচনীয়। গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যাচ্ছে, ওই সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…।”

জলেশ্বরীতলা। পথের পাশে ছোট্ট একটি মুদিদোকান। দোকানিটা খুব সরল-সোজা। অনেক কজন খরিদ্দার এসেছে দোকানে। দোকানি একটু হিমশিম খাচ্ছে হয়তো-বা। বিরক্ত-বিরক্ত ভাব। একপর্যায়ে সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে, যেন এক তুড়িতে বিশ্বের তাবৎ বাণিজ্যনীতির গালে চটকনা মেরে বলে উঠল, “আর কারো দোকান দ্যাখো-না, খালি আমার দোকানে আইসা ভিড় করো!” রিকশায় এক চক্কর দিয়ে যখন আবার যাচ্ছিলাম সেই দোকানের সামনে দিয়ে, দেখলাম এক আশ্চর্য ব্যাপার, বিরসবদন ওই লোকটিই কিনা দোকানদারি ছেড়ে বাইরে এসে কাঁধে একটি শিশুকে তুলে নেচে নেচে গাইছে, অবাক, সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…।”

রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। বর্ষাশেষের উদাস-উদাস দুপুর। পাশে শীর্ণকায়া করতোয়া। নিচু ভল্যুমে মাইক বাজিয়ে উজান বেয়ে চলেছে পালতোলা একটি নৌকা, বনভোজে যাচ্ছে বোধহয়। কিন্তু বন কই? মাইক তো কখনো এত নিচু স্বরে বাজে না! যা হোক তবুও পাল উড়ছে, নৌকা চলছে, মাইক বাজছে… ভেসে আসছে সেই একই গান, একই কলি ‘‘নদীর নাম সই অঞ্জনা…”। কিন্তু নদীর নাম তো করতোয়া, তীরে খঞ্জনা পাখির জোড়া হয়তো এখনো নাচে কিন্তু জল নিতে আসা কাউকে দেখলাম না, যে কিনা সইদের বলবে, “পাখি তো আর কিছু রাখিবে না বাকি…”।

একজন বৃদ্ধমতো মানুষ। অবসরে যাওয়া শিক্ষক হয়তো-বা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। নাতিকে নিয়ে এসেছেন মাছ ধরতে। বড়শি ফেলে বসে আছেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে। স্মিতমুখ নাতি দাদুকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। দাদু কিছু তার জবাব দিচ্ছেন, কিছু দিচ্ছেন না। বড়শিতে মাছ ধরছেন — চেলা, নলা, পুঁটি, টেংরা, বউমাছ…। মাছ ধরে ধরে পেছনে রাখছেন বিছিয়ে রাখা গামছায়। ফাৎনার দিকে নিরঙ্কুশ মনোযোগ দাদু ও নাতির। এদিকে তিনটি টিট্টিভ পাখি পেছন থেকে এসে একটি একটি করে মাছ মুখে পুরে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। গিলে ফেলছে টপাটপ। কিন্তু টেংরাকে তারা বাগে আনতে পারেছে না কিছুতেই।

মাছ তো সব খেয়ে গেল টিট্টিভে। নাতির চোখ ছলোছলো। পায়জামার ধুলো ঝেড়ে দাদু ও নাতি উঠে এবার হেঁটে যাচ্ছে নদীর কিনার ধরে। হাত নেড়ে নেড়ে দাদু নাতিকে কী কী যেন বলছেন, বোঝাচ্ছেন। হয়তো ধৈর্যধারণের কথা, হয়তো আগামী স্বপ্নের কথা… আগামীকালে, আরো আরো আগামীকালে তারা আবারও বসবে ছিপ ফেলে, অসীম ধীবরধৈর্যে, আর অনেক অনেক মাছ পাবে তারা, বড়শিতে।

সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, কবি ফারুক সিদ্দিকী। পাকাচুল, কিন্তু নিরলস। টানা চল্লিশ বছর ধরে বিপ্রতীক বের করছেন। নবীন কবিরা মজা করে বলে ‘বীরপ্রতীক’। তাঁর বাড়ির নাম “কে-লজ”। সূত্রাপুর, বগুড়া। বিশাল জায়গা জুড়ে অদ্ভুত এক বাড়ি। স্পিলবার্গের ছবির শ্যুটিং লোকেশনের যেন এক অতীত সংস্করণ।

আগে সূত্রাপুর, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলা, মফিজ পাগলার মোড় — পুরো এলাকাটা ছিল জঙ্গলে ভরা। প্রাণবৈচিত্র্যে উপচানো। বাহার ভাই যে বলেন সাতমাথার দিকে বাঘ আসত, বাঘদাস আসত, নীলগাই নামত, তা তো আসত এই ফারুক ভাইয়ের পরগণা থেকে। হঠাৎ-হঠাৎ ফারুক ভাই বাঘ আর বাঘদাস পাঠাতেন আর বাহার ভাই কেবলই বিস্মিত হতেন আর জীবজানোয়ারদের যাতায়াত কন্ট্রোল করতে হিমশিম খেতো ট্রাফিক পুলিশ।

ফারুক ভাইয়ের পরগণায় এখন আর বাঘ নাই, বাঘদাসও নাই। অরণ্যও নাই। পরিষ্কার। কালে কালে গজিয়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, জেগে উঠেছে পাকা রাস্তা। তবে তাঁর হাবেলি যেখানটায়, শুধু ওই জায়গাটুকুতে কিছুটা অরণ্য এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। ইটকাঠলোহাপাথরের বিশাল মরুভূমির মধ্যে ছোট্ট একটি মরূদ্যান। কালের চাবুকে পাতা ঝরে, প্রাণ-প্রাণী-প্রকৃতিতে ধস নামে, অতঃপর বৃক্ষের বীজ থেকে, প্রাণী ও মানুষের বীজ থেকে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন অঙ্কুর, নতুন পাতা, নতুন পাখি, নতুন প্রাণ, নতুন মানুষ। যে বৃদ্ধা বাঘিনী জরা ও অনশনে জীর্ণা হতে হতে অরণ্যের ওই যে ওখানে নেতিয়ে পড়ে মরে গিয়েছিল, ঠিক ওখানটাতেই পড়ে আছে সে। লোম-লাবণ্য সব উবে গেছে হাওয়ায়, চামড়া-মাংস সব পচে ধুয়ে ফুরিয়ে গেছে একেবারে, এখন মাটির ওপর জেগে আছে শুধু হাড়ের কাঠামো। অবিকৃতপ্রায়। ময়লা জমেছে, শ্যাওলা ধরেছে মাত্র।

ফারুক ভাইয়ের বনে বিচিত্র গাছগাছালি। হঠাৎ একটি খেজুর গাছ। গুনা দিয়ে মাটির কলসি বেঁধে লাগানো হয়েছিল গাছে। পরে গাছিয়াল লোকটির কী জানি কী মনে হয়েছিল, কোনোদিন আর কলসি নামাতে যায়নি সে। কলসিতে রস জমেছে, উপচে পড়েছে, শুকিয়ে গেছে, পিঁপড়ায় বোলতায় খেয়েছে। তারপর মাটির মৌচাকের মতো ছোট ছোট টিবি গড়েছে বোলতারা ঝুলন্ত ওই কলসির ওপরেই।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়েছে বোলতাদের। টিবি ঝরে গিয়ে গজিয়েছে নতুন ঢিবি, ওই কলসিরই গায়ে। যে-সময় গাছটি কলসি বেঁধে নিয়েছিল গলায়, সে-সময় সে ছিল তরুণ। পরে কলসিকে অনেকদূর পেছনে ফেলে বেড়ে উঠেছিল তরতরিয়ে। আরো পরে বাজ পড়েছিল মাথায় একদিন। বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছিল গাছটির। মরেও দাঁড়িয়ে আছে সটান। সারা গায়ে কাঠঠোকরার খোঁড়ল। আর তরুণ বয়সের গলায়-বাঁধা কলসি এখন কোমরে। লোহার সরু গুনাটি পর্যন্ত শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেছে।

আমরা — মানে ফারুক ভাই, বাহার ভাই, কথাকার সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, সরকার আশরাফ, কামরুল হুদা পথিক, রোহন রহমান, কবি মঈন চৌধুরী, শোয়েব শাহরিয়ার, সাজ্জাদ শরিফ, রাজু আলাউদ্দিন, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির, আবদুল্লাহ ইকবাল, শেখ ফিরোজ, ফখরুল আহসান, মাহমুদ হোসেন, সৈয়দ মাহবুব, শামীম কবীর, বায়েজিদ মাহবুব, শিবলী মোকতাদির, আশিক সারোয়ার, আমি — সে-এক বিশাল অভিযাত্রীবাহিনী, ঢুকে পড়লাম সেই অরণ্যের ভিতর। মনে হলো অন্তত আশি বছর কোনো জনমানুষের পা পড়েনি এখানে। আশি বছরের অগেকার সময় তার গন্ধ হাওয়া স্মৃতি আমেজ উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ধরল আমাদের। এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি! সময় যেন থমকে রয়েছে, আবার ঠিক থমকেও নেই। আসলে এখানে, অন্তত এই জায়গাটুকুতে, সময় বইছে এক ভিন্ন চালে। নির্বিঘ্নে, আপনমনে। একটুও ডিসটার্ব করেনি কেউ কখনো এখানকার কোনোপ্রকার স্থিতি, গতি বা প্রবাহকে। এই তো কিছুক্ষণ আগে কে যেন এসে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাদের টাইম মেশিনে, অল্প কতক্ষণ ঘুরিয়ে নামিয়ে দিয়ে গেছে এখানে। আর তাতেই পার হয়ে গেছে আশিটি বছর…

original post
read more

পথে, প্রদেশে (২য় পর্ব)

by মাসুদ খান

মাহী-সওয়ার কলেজ। জনশ্রুতি আছে, হজরত শাহ সুলতান নামের এক দরবেশ এক বিশাল মাছের পিঠে চড়ে করতোয়া নদী দিয়ে ভেসে এসে নেমেছিলেন এইখানে, এই ঘাটে। সেই থেকে দরবেশের নাম হজরত শাহ সুলতান মাহী-সওয়ার আর তাঁর নামে নাম এই বিদ্যায়তনের।

কলেজের পাশ দিয়ে লালচে ধূলি-ওড়া পথ। সেই পথ দিয়ে তুফান-গতিতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে চল্লিশ-পেরুনো এক লোক। চোখে স্ফূর্তি, মুখে গান- “চলো যাই ভেসে যাই প্রেমসাগরে নাও ভাসিয়ে দুজনে-এ-এ-এ-এ/ নাও ভাসিয়ে দুজনে/ রেখো মোরে তোমার নয়নে।” চেন পড়ে গেছে, সাইকেল চলছে তবু ঊর্ধ্বশ্বাসে। লুঙ্গি খুলে পড়ে যাচ্ছে চেনের সঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে, স্ফূর্তির চোটে টের পাচ্ছে না মানুষটা। ওদিকে বগলে একগাদা বই আর হাতে প্রচুর কাগজপত্র নিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে ক্লাশের দিকে যাচ্ছেন এক অধ্যাপক, ভুলোমন স্বভাবের…হাতের কাগজ পড়ে যাচ্ছে, খেয়াল হচ্ছে না। পাকুড় গাছের নিচে আড্ডা জমিয়েছে কিছু হুল্লোড়বাজ ছাত্রছাত্রী। একজন দৌড়ে গিয়ে কী যেন কী একটা দেখাচ্ছে প্রফেসর সাহেবকে। ছোট্ট একটি স্ক্রু। বলছে, “স্যার, এটা বোধহয় আপনার, পড়ে গেছে।” আলাভোলা প্রফেসর পেছন ফিরে স্ক্রু-টা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, আর বলছেন, “না তো, আমার না তো।” হাসির হিল্লোল পাকুড় গাছের নিচে। খড়ের মালা গলায় দিয়ে একটা বেড়াল হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছে পাশের আলপথ ধরে। একশো একটা ইঁদুর মারার পর নিয়ত করেছে পুরাপুরি অহিংস হয়ে যাবে সে। ‘অহিংসা পরম ধর্ম্মঃ’ মন্ত্র জপতে জপতে যাত্রা করেছে বুদ্ধগয়ার দিকে। ওই বেড়ালটিও কিনা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে এই দৃশ্য আর মুচকি মুচকি হাসছে।

পাশেই করতোয়ার খাড়া পাড়। নিচে সেই বিশ্ববিশ্রুত অথইদহ। কত জরিপ হয়েছে যুগে যুগে, কিন্তু থই পাওয়া যায়নি সেই রহস্যদহের। লোকশ্রুতি বলে, কয়েকশো বছর আগে এক তারাভরা রাতে আকাশ থেকে বিকট শব্দে বিশাল এক আলোর গোলা এসে পড়েছিল করতোয়ায়। বিশাল সেই গোলার পেছনে পেছনে ছোট-ছোট আরো অসংখ্য গোলাণু, থেমে-থেমে, থেকে-থেকে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সেই আওয়াজে বধির হয়ে গিয়েছিল ১৩১ জন মানুষ, ২৮১টি গরুছাগল, ২২টি শিয়াল। এ বধিরতা যেমন-তেমন বধিরতা নয়। প্রজন্ম-প্রজন্ম বধিরতা। এই যে ঠসাবাড়ির গফফার ঠসা- ও নিজে ঠসা, ওর ব্যাটা ঠসা, বেটি ঠসা, বাপদাদা বারোগোষ্ঠি ঠসা। তাহলে বোঝেন! যা-হোক, সেই বিকট আওয়াজে গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছিল ২৯টি, আর কাঁপুনির চোটে সাঁকো ভেঙেছিল ১৫টি, টঙঘর ১২২, আর ভেঙে পড়েছিল এলাকার সবগুলি খাটা পায়খানা। সবাই ভেবেছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আলামত ছাড়াই কেয়ামত! এরকম তো হওয়ার কথা না। খরে দজ্জাল আর ইমাম মেহেদির জমানা আসার কথা, সেগুলা কই! তাহলে কি ওই শয়তান জমিদারের রূপ ধরেই দজ্জালের আবির্ভাব! এখন না-হয় বুঝলাম দজ্জালের জমানা, কিন্তু এরপর তো ইমাম মেহেদির পালা… তিনি কই, তার তো আবির্ভাব ঘটেইনি এখনো! নাকি মেহেদিপর্ব বাদ দিয়েই শর্টকাট টু কেয়ামত! এইসব নানান ভাবনা ভেবেছিল এই মহাস্থানগড়ের মানুষ, ওই প্রলয়কাণ্ডের রাতে। ভোরের দিকে নারীপুরুষশিশুরা সব ভয়ে ভয়ে জড়ো হতে থাকল করতোয়ার পাড়ে। দ্যাখে কি, আসমানি গোলার আঘাতে আউলাকান্দি মৌজার তিনগুণ-সমান বিশাল এক জায়গা একদম আউলে গিয়ে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে করতোয়ার বুকে। প্রচুর কাদামাটি ছলকে ছলকে উঠে সয়লাব করে দিয়েছে অববাহিকার জায়গাজমিন।

নতুন পলিমাটি পেয়ে বছর কয়েক ফসল ফলেছে প্রচুর। কিন্তু আনকা এক উপদ্রব। চেনা সবজি ও শস্যের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ অচেনা, অদ্ভুতকিম্ভুত সব সবজি ও শস্যের গাছ। এরকম কিম্ভূত-কিমাকার ফসলের গাছ দেখলেই তো ভয় লাগে! আসলো কোত্থেকে, এগুলির বীজ? এ রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি এই সেদিন পর্যন্ত, যেদিন বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এসে আশপাশের মাটি, কাঁকর, বীজ, শস্য, অথইদহের পানি…সবকিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে আবিষ্কার করল, বহু বছর আগে যে আলোর গোলাটি এসে পড়েছিল তা আসলে আর কিছু নয়, সৌরজগতের বাইরের কোনো প্রাণময় গ্রহ থেকে ছুটে আসা এক বিপুলাকার উল্কাপিণ্ড। আর ওই সজীব-সপ্রাণ উল্কার সাথেই এসেছিল ওইসব অচেনা শস্যবীজ। বিশেষজ্ঞরা আরো যা আবিষ্কার করল তা হলো, অবাক-করা কিছু কাঁকর, পাথর। রত্নপাথর। নীলা আকিক গোমেদ পোখরাজ কোনো কিছুরই মতো নয়…না সূর্যের আলো, না চাঁদের আলো কোনো কিছুতেই জ্বলে না সেই রত্ন, চুপচাপ অন্ধকার হয়ে পড়ে থাকে। কেবল বিশেষ কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো ফেললে জ্বলজ্বল করে ওঠে, যেসব আলো হয়তো বিচ্ছুরিত হয় ভিন্ন কোনো নক্ষত্রলোকে।

কত খরা গেল, কত জলসেচ প্রকল্প গেল, কিন্তু কখনোই পুরাপুরি শুকাল না অথইদহের পানি। এই তো বছর কয়েক আগের কথা। নিদারুণ চৈত্রমাস। মাঠঘাট খালবিল সব চৌচির…খরার তীব্রতা ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ড। ডিপ টিউবওয়েলেও পানি উঠছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা বিশাল বিশাল নলকূপ নিয়ে ফিট করেছে ওই অথইদহে, শয়ে শয়ে। এরপর ঘটল সেই অস্বাভাবিক ঘটনা…হাজার হাজার কৌতূহলী মানুষের উপচানো ভিড়। দহের পানি উথালপাথাল। আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক অদ্ভুত অতিকায় প্রাণীর আতঙ্কিত নড়াচড়া… প্রাণীটা খুবসম্ভব উভচর- দুই হাত, দুই পা, আর আমাদের মানিক ময়রার দোকানে বসে যে নাদুসনুদুস ছেলেটা- লুকিয়ে লুকিয়ে মিস্টি খায় খালি, সবাই ডাকে ভোটুস- তার মতো ভুঁড়িভাসানো পৃথুল দেহ। অনর্গল কথা বলছে বহির্জাগতিক অবোধ্য ভাষায়, মাঝে মাঝে স্নিগ্ধ হাসি হাসছে, দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে দাঁত…আবার হঠাৎ হঠাৎ বিমর্ষও হয়ে পড়ছে খুব। উৎসাহী পাবলিক গুলতি, লাঠি, সড়কি, এয়ার গান, ছররা বন্দুক সব নিয়ে এসেছে…বাইনোকুলারও নিয়ে এসেছে চুয়েটে-পড়া লিটন। মনোযোগ দিয়ে পড়তে চেষ্টা করছে, প্রাণীটির সারা গায়ে কোঁকড়া-কোঁকড়া ওগুলি কি লোম নাকি আঁশ। এর মধ্যে হঠাৎ করে দু-একজন গুলিও ছুড়েছে। কোনোটা লেগেছে, কোনোটা অতদূর পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেনি। আক্কাস মণ্ডলের মেজ যে ছেলেটি, মলনালীতে ক্যানসার ধরা পড়েছে, সেও গুলি করেছে দুই রাউন্ড। অথইদহের তলদেশে দাঁড়িয়ে টলোমলো পায়ে ভর দিয়ে অসহায় সেই প্রাণী হাত তুলে তালু খুলে দেখাচ্ছে বারবার, তালুতে গুলি লেগেছে তার, কিন্তু রক্তের রং লাল না হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে না ঠিক…

“মানুষ-প্রাণী ভাই-ভাই” নামের এক পশুপাখিপ্রেমী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অনিল বিশ্বাস এসে তার চৌকস বক্তৃতায় মুগ্ধ করে ফেলে নানা রঙের, নানা মেজাজের মানুষকে। প্রশমিত করে আনে উত্তেজিত মানুষদের জিঘাংসাভাব। এরপর শুরু হয় উদ্ধারপর্ব, শহরে খবর পাঠানো…, তারপর ক্রেন, কনটেইনার, প্রশাসন, থালাবাসন (কাদাপানি সেঁচার জন্য), ল্যাডার, ক্যাডার, জেনারেটর, ইনজিনিয়ার, দড়িদড়া, দমকল, বিশেষজ্ঞ, উকিল-মোক্তার, পশুডাক্তার…সে এক এলাহি কারবার। প্রচুর হাঁকডাক, ‘এই করো সেই করো, এই লে-আও সেই লে-আও’ এইসব আওয়াজ আর প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো অসহায় এলিয়েনের উদ্ধারকাজ। বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে অকহতব্য শ্রম ও মেধা ব্যয় করে তিন-তিনটি ডালাখোলা কনটেইনার জোড়া দিয়ে বিপুলায়তন গালিভারটাকে তার ভেতর উঠিয়ে নিয়ে দুই জোড়া ক্রেন লাগিয়ে বহু কায়দা ও কসরৎ করে ওপরে তুলে আনে লিলিপুটের দল। প্রাণীটার কাছে মানুষগুলি সব হাস্যকর-রকম খর্বকায়।

বিশাল হাসি-হাসি মুখ এলিয়েনটার। সদানন্দ। কিছু মানুষ থাকে-না, যাদের চেহারাটাই এমন যে মনে হয় যেন হাসছে, সেরকম। এলিয়েনটা কথা বলছে, হাত নাড়ছে, হাসছে। পৃথিবীর চেয়ে বহুগুণ বড় দূরের প্রায়-জলমগ্ন কোনো এক গ্রহের বুদ্ধিমান অথচ নিরীহ শান্তিপ্রিয় প্রাণীপ্রজাতি। একেবারে উন্নততম নয় বটে, তবে মধ্যম স্তরের প্রজাতি। এলিয়েনদের গ্রহের স্থলদেশ, জলদেশ উভয়দেশেই রয়েছে তাদের সভ্যতা…সম্ভবত।

প্রাণীটা খুবসম্ভব উভচর, কারণ, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে মনে হয় উঠে আসত সে অথইদহ থেকে। ডাঙায় রেখে যেত পদচিহ্ন। ধরিত্রীর বুকে ভিনগ্রহের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট। এলিয়েনটাকে দেখার পর স্থানীয়রা বলাবলি শুরু করে দিলো, “তাই তো কই, বছর-বছর আমাগো খ্যাতের ফসল, গাছপালা, জঙ্গলমঙ্গল সব ডামেশ কইরা ফালায় কেডা! তাই তো কই, এত্ত বড়-বড় পায়ের দাগের মতন দাগ, ওগুলা কিয়ের? ও, কালপ্রিট তাইলে এইটা?” এমনিতে পৃথিবীটা এলিয়েনের জন্য গ্রহান্তর, তার ওপর এতসব অচেনা প্রাণীর ভিড়ের ভেতর তাকে তুলে আনা হয়েছে এক ভয়ানক বৈমাত্রেয় পরিবেশে, তারপরও প্রাণীটা প্রথম প্রথম বেশ সপ্রতিভ, হাসিখুশি। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, ততই মুশকিল হয়ে পড়ছে তার জৈবরাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখা। শ্বসন, প্রস্বেদন, তাপমাত্রা, চাপমাত্রা, পেশিবিক্ষেপ…সবকিছু হয়ে পড়ছে বেসামাল। শুরু হয়ে গেছে রিভার্স অসমোসিস। প্রাণীটির শরীর থেকে প্রচুর জলীয় কণা বের হয়ে আসছে বাষ্প আকারে। চৈত্রের খর্খরে আবহাওয়া। বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা আজ ভয়াবহরকম কম, মাত্র ২০%। এরকম বিশুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যেও সেই বাষ্পবিকিরণের কারণে প্রাণীটির চারপাশে অনেকখানি জায়গাজুড়ে কুয়াশার বাতাবরণ। চারদিকে চরাচরে প্রখর রোদ, শুধু ওই জায়গাটুকু কুয়াশায় ঘেরা। যদিও এই বাষ্পকুয়াশা কেটে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই, কিন্তু ওই আধো-অলৌকিক ঘটনাটি ঘিরে যে কুয়াশার আবরণ, তা আর সহজে কাটে না। কত হবে প্রাণীটার বয়স? গ্রহাণুর মতো বিপুলাকার উল্কাটি যখন করতোয়ায় এসে পড়ে, কয়েকশো বছর আগে, তার সাথেই কি সেও এসেছিল!? এত বয়স? তা ছাড়া, কীভাবে সম্ভব? উল্কাপিণ্ড যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর সবেগে ঢুকে পড়ে তখন তো বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায়। তাহলে বাঁচল কেমন করে? গবেষণা বলছে, অতিকায় উল্কাটির অভ্যন্তরে ছিল একটি সাব-টেরেনিয়ান জলাশয়। মূল গ্রহ থেকে যখন বিচ্ছিন্ন হয় গ্রহাণুটা, তখন এই প্রাণীটা ছিল ওই জলাশয়ের ভেতর। জলাশয়ের ওপরকার আবরণটা ছিল খুব কঠিন এবং পুরু। ফলে সুরক্ষিত ছিল সে।

এলিয়েনটার অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। প্রাণিবিশেষজ্ঞ ও ডাক্তারের দল অযথাই স্টেথোস্কোপ, বিপি-মিটার, থার্মোমিটার, ইনজেকশন সিরিঞ্জ নিয়ে প্রাণীটির চারপাশে ঘোরাঘুরি-দৌড়াদৌড়ি করছে, ওগুলো এতই ক্ষুদ্র ও অপ্রাসঙ্গিক যে, তা নিয়ে তারা নিজেরাই যারপরনাই বিব্রত। কী আর করা! ওগুলোই নিয়ে লাগাচ্ছে প্রাণীটার দেহে। মর জ্বালা! প্রাণীর গায়ে সুড়সুড়িও লাগছে না ঠিকমতো। এক পশুবিশেষজ্ঞ, এমনিতে শ্বেতীতে সারা মুখ শাদা, তার ওপর বিলাতে থাকে বহু বছর ধরে, বেড়াতে এসেছে দেশের বাড়ি। খুব দেমাগ, দেমাগের চোটে মাটিতে পা পড়তে চায় না, কথায় কথায় খালি বিলাতের গল্প, আর নিজে কী কী করেছে তার গল্প। আর সবাইকে খালি জ্ঞান দিতে থাকে। আর পয়সার গরম। কিন্তু গরিব-গুর্বারা একটু সাহায্য-টাহায্য চায়, তা দেয় না। হাটে গিয়ে বড়-বড় মাছ, মাংস, গরুর কল্লা…ভালো-ভালো যা পায় সব কিনে নিয়ে চলে আসে। দরদাম করে না, যা দাম চায় সেই দামেই কিনে ফেলে। বাজারে জিনিশপত্রের দাম সেই যে চড়িয়ে দিয়েছে লোকটা, আর নামে না। মাসখানেকের মধ্যেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গ্রামের লোকজন। বেতমিজ পোলাপান প্রাণিবিশারদের নাম দিয়েছে ‘বিলাতি বান্দর’। তো, সেই প্রাণিবিশেষজ্ঞ এসেই শুরু করে দিলেন হুলুস্থুল লম্ফঝম্ফ। ভেরি এক্সাইটেড! নানারকম অত্যাধুনিক তত্ত্বকথা শোনালেন প্রাণিবিদ্যার, ইংরাজি-বাংলা মিশিয়ে। বললেন, “পৃথিবী নামের এই প্ল্যানেটে যত ক্রিয়েচার আছে, অল আর কার্বন-বেইজ্ড, কিন্তু এই যে ক্রিয়েচারটি দেখছেন, এইটা যে প্ল্যানেটের সেখানকার সব প্রাণীই সিলিকন-বেইজ্ড, এটাও তা-ই। ইউ নো, সিলিকন ক্যান নট হোল্ড ওয়াটার ফর লং, দ্যাখেন না, সিলিকন-ডাই-অক্সাইড, মানে বালু…বালুর মধ্যে তো পানি থাকে না বেশিক্ষণ। সো, এই প্রাণীটাও, আই মিন, এই ক্রিয়েচারটাও ইভাপরেটস ওয়াটার ভেরি কুইক্লি। দিস প্রাণী বিলংস টু দ্য স্পিসিস নেইম্ড হিপ্পোফ্যালাইটিস স্যাপোলিপিথেকাস প্রকান্ডাম।” শুনে লোকজন বলে, আরে! প্রকাণ্ড যে, তা তো দেখতেই পাইতেছি, তো এইসব অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়াণ্ডাম…এগুলা কী কয় না কয় ক্ষ্যাটা! সেই থেকে তারা পশুবিশেষজ্ঞটির খেতাব দিয়েছে ‘অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়াণ্ডাম’। মানুষের মধ্যে কি-জানি-কী একটা ব্যাপার ঘটে…যাকে দেখতে পারে না তো পারেই না…ভালো ভালো কথা বললেও না।

প্রাণীটাকে কীভাবে বাঁচানো যাবে সে-ব্যাপারে প্রেসক্রিপশনও দিলেন বিলাতি পশুবিশারদ। কিন্তু কাজ হলো না কোনো। সব উদ্যম, উত্তেজনা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রাণীটি অচেনা ভাষায় চিৎকার করতে করতে কয়েকঘন্টার মধ্যেই ধরিত্রীলীলা সাঙ্গ করল। প্রাণিবিশেষজ্ঞ তো কেটে পড়ল সুরসুর করে। এরপর এলো এলিয়েনের সৎকারের পালা। কী করা হবে বুঝতে পারছে না কেউ। এই প্রথমবারের মতো ডাক পড়ল সেই বিখ্যাত হকসেদের, এলিয়েনটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে ফতোয়া দেবার জন্য। আসমান-জমিনের অনেক খবরই তো থাকে ওর কাছে। ও, ভালো কথা, এই হকসেদটা কে, সে কথা তো বলাই হয়নি। পরে বলছি। আর বলবেন না, বুড়া হয়ে গেছি, মনেও থাকে না ঠিকমতো, আগের গল্প পরে বলি, পরের গল্প আগে…। তো যাই হোক, হকসেদ বলে, “প্রাণীটা ভিনগ্রহের এক্কেবারে এক নম্বর উন্নত প্রজাতি না হইলে কী হইবো, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের প্রাণী তো বটেই। এদেরও তো একটা রিলিজিয়ন আছে, নাকি? শোনেন নাই, মরার আগ দিয়ে প্রাণীটা বলতেছিল, কক্কারাতাফুকুনটামারিয়ামটালানটালামালাগফিরিস…মানে, সে কইতে চাইতেছিল- কক্কারাতা, মানে কক্কারাতা হইল-গিয়া তাদের ঈশ্বরের নাম, আর এই প্লানেট হইছে তাদের দশটা দোজখের একটা। দীর্ঘ নরকবাস তার শ্যাষ হইলো আইজ। এলিয়েনের আত্মারাম তো অলরেডি উইড়া গ্যাছে-গা অন্য আরেক গ্রহে যেইটা কিনা হইলো-গিয়া তাদের বেহেশত। এলিয়েনের আত্মাডা তো মনে করেন এরই মধ্যে নতুন শরীর ধারণ কইরাই ফালাইছে। আত্মা তো আর ভোগ করতে পারে না কোনো কিছু, না সুখ, না কষ্ট, ভোগ করার জন্য তো বডি লাগে একটা, তাই না? দেহধারণ করা লাগে, ঠিক কিনা? কিন্তু এলিয়েনের তো এইটা দুই নম্বর মরণ, এর আগেও তো একবার মরছিল ব্যাটা, তখন হইছিল তার আসল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এইবার আপনারাই কন, ভদেশটার এই ভুয়া বকেয়া বডি সৎকার কইরা আর কী লাভ? দ্যাখেন, যেটা ভালো হয় করেন। তবে কই কি, এক কাম করা যায়, কাইটা দেখা যায় কী আছে এইডার মধ্যে।”

ডালাখোলা কনটেইনারের ওপরই শুরু হলো এলিয়েনের পোস্টমর্টেম। শরীরের কোন জায়গা থেকে অস্ত্রোপচার শুরু করা যায় তা দেখতে বিশাল এক লৌহশলাকা-হাতে স্থানীয় শল্য চিকিৎসক ডাঃ আরিফ প্রয়াস নিলো এলিয়েনের শরীরে আরোহণের। কিন্তু পাহাড়ের মতো শরীরের কিছুটা উঠেই পিছলে পড়ে ব্যথা পেল ডাক্তার। এল লাশকাটা ঘরের ডোমেরা। ছুরি-কাঁচির বদলে নিয়ে এসেছে গাছকাটা বিশাল করাত এক জোড়া। হাতটানা করাতের দুই প্রান্তে দুইদল ডোম বসে ঘসঘস করে কাটতে লাগল সর্বশক্তি প্রয়োগ ক’রে। করাতের দাঁতে দাঁতে প্রাণীটার চামড়ার নিচ থেকে উঠে এল প্রচুর ভেজা বালি ও কাঁকর। এলিয়েনটা হঠাৎ নড়ে উঠে আশপাশের বায়ুস্তর কাঁপিয়ে, দিলো এক অট্টহাসি- মরণোত্তর অট্টহাসি। ডোম-সম্প্রদায় ছিটকে পড়ল দূরে দূরে। এখন ডোম, ডাক্তার কেউ আর আসে না কাছে। এল পেশাদার করাতিরা। ঘচাঘচ কেটে আলাদা করে ফেলল ধড়। তরল গড়িয়ে পড়ল পীতবর্ণ, প্রচুর। পরে বোঝা গেল, আসলে এ তো প্রাণী নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক ইকো-সিস্টেম- চলিষ্ণু, জীবন্ত, জঙ্গম। বিষ্ময়কর এক ইকো-সিস্টেম। সারা শরীরে ওই যে ঘন জঙ্গল দেখছেন ওগুলি লোমও নয়, আঁশও নয়, ওগুলি আসলে এক জাতের তৃণ ও শৈবাল-জাতীয় উদ্ভিদ। আর প্রাণীটার চামড়ার নিচে রক্তমাংসচর্বির বদলে বিচিত্র খনিজ ও জৈব উপাদান মেশানো জল-কাদা-বালু-কাঁকরের এক ঘন মশলামিশ্র, যার ভেতর দিয়ে শিকড় চারিয়ে দিয়ে খাদ্যরস শুষে নেয় শরীর জুড়ে গজিয়ে ওঠা ওই তৃণ ও শৈবালের জঙ্গল। ধীরে ধীরে ফুল ফোটে তৃণে ও শৈবালে, ফল হয় চিনা-কাউন বা পোস্তদানার মতো গুড়িগুড়ি, হয়তো আকারে কিছুটা বড়-বড়। কিছু তার খুঁটে খুঁটে খেয়ে ফেলে ছোট-ছোট জলজ ও স্থলজ প্রাণী, বাকিটুকু ঝরে পড়ে ওই মরে যাওয়া তৃণ বা শৈবালের নাড়ার ভেতর। তারপর নতুন মৌসুম শুরু হলে প্রাণীটির সারা গা ভ’রে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন তৃণ ও শৈবাল। এই শস্যচক্র চলতেই থাকে যতদিন বেঁচে থাকে এলিয়েনটা। এলিয়েনটা আসলে একটি প্রাণীই যার সারা-গা-ভর্তি ফুলফলময় উদ্ভিদ। একাধারে সে প্রাণী, উদ্ভিদ এবং এক জ্যান্ত, চলিষ্ণু ভূমিখণ্ড- স্বয়ংক্রিয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক প্রতিবেশচক্র। এলিয়েনটার, মানে সিস্টেমটার অভ্যন্তরে ত্রিস্তরবিশিষ্ট বিশাল-বিশাল আধার। একটি আধার জলাশয়; আরেকটি জীবন্ত রসায়নাগার, যা অটুট রাখে ইকো-চক্রটিকে। তৃতীয়টি প্রত্ন-সংগ্রহশালা। অদ্ভুত গ্রহের অদ্ভুত সব সামগ্রী তাতে। বিচিত্র সব রত্নরাজি, আদিম ও আধুনিক কিছু হাতিয়ার, তৈজস, কৃৎকৌশলের নানান নমুনা…এইসব। আপনি যদি কখনো মহাস্থানগড় আসেন, তবে দেখবেন, ওগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে মহাস্থানগড় বরেন্দ্র জাদুঘরে। যা হোক, শেষটায় অচেনা গ্রহের সেই একখণ্ড জিন্দা ইকোসিস্টেমকে ফালাফালা করে কেটে ছিঁড়ে ফাটিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হলো ধরিত্রীর ধুলার সঙ্গে।

রঙ্গভরা বঙ্গদেশে কত যে রঙ্গ-রগড় হয়! এইতো সেদিন আক্কেলডাঙ্গা ইউনিয়নের ‘গমচোরা’ চেয়ারম্যান আলফাজ উদ্দিন রাগের চোটে, বিগাড়ের বশে ঘোষণা দিয়ে বসল আমরণ অনশনের। গম বরাদ্দ পেয়েছে কম। চেয়ারম্যানের এক পেয়ারা ইল্লৎ অনুচর কুবুদ্ধি দিয়েছে তাকে, “এক কাজ করেন, আমরণ অনশন শুরু কইরা দ্যান। তাইলে দেখবেন, আপনার নাম ছড়ায়া পড়বো, দুইদিন যাইতে না যাইতেই দেখবেন মন্ত্রী, এমপি, ডিসি সবাই ছুইটা আসতেছে অনশন ভাঙ্গাইবার লাগি, সবাই আপনেরে সাধাসাধি করবো, মুখে শরবত তুইলা ধরবো, টিভি-ক্যামেরা ছবি তুলবো, এক্কেরে হুড়াহুড়ি পাড়াপাড়ি লাইগা যাইবো…নামও হইবো, কামও হইবো, আর বরাদ্দ আসবো হুড়মুড়ায়া, আর দ্যাখেন-না খালি, হায়বর মণ্ডল কেমুন হায় হায় করে, জিন্দেগিতে আর সাহস করবো না ইলেকশনে খাঁড়াইতে। আপনে পাবলিকের উদ্দেশে বক্তৃতা দিবেন, “ভাইসব, এই আক্কেলডাঙ্গার জনগণের জন্যে, তাদের রাস্তাঘাট আর পাকা পায়খানার জন্যে আমার এই আমরণ অনশন।” পাবলিক সব আপনের কাছে আইসা বইসা থাকবো, আপনের সাথে একাত্মা হয়া সাহস দিতে থাকবো।”

পাবলিক অবশ্য এসেছে বটে অকুস্থলে, যেখানটায় মঞ্চস্থ হচ্ছে আলফাজের অনশন-নাট্য, ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সামনের সেই ভেরেণ্ডাগাছের তলায়, কিন্তু সাহস দিতে নয়, এসেছে পাহারা দিতে, পালা করে, যাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু না খেতে পারে চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের লোকজন বড় একটা রঙচঙে ব্যানারও টাঙিয়েছে- “আলেক্কডাঙ্গার জনগণের স্বার্থে চেয়ারম্যান আফলাজ উদ্দিনের আমরণ অনশন”। ‘আক্কেলডাঙ্গা’ এর জায়গায় ভুলে ‘আলেক্কডাঙ্গা’ লিখেছে আর্টিস্ট। তাই নিয়ে চেয়ারম্যানের শুক্র এমনভাবে শিরোধার্য হয়েছে যে নিজের নামটাই যে ভুল লেখা সেটা খেয়াল করছে না।

এদিকে একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন যায়, সাঙ্গাতরা নানান জায়গায় মোবাইলে খবর পাঠায়, কিন্তু আসে না কেউই। এক অদ্ভুত জীবনমরণ সমস্যায় পড়ে গেছে চেয়ারম্যান। এদিকে জঠরের তীব্র অ্যাসিড, তাতে আবার ধরেছে দাউদাউ আগুন। আচ্ছা এক গ্যাঁড়াকল, না পারে ভাঙতে অনশন, না পারে সইতে ক্ষুধার আগুন। পাবলিক তো মজা দ্যাখে। বলে, “বোঝ ব্যাটা, খিদার জ্বালা কেমন!” আবার, চেয়ারম্যানের দশা ‘ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা সামলা’ নাকি ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’, কোনটা, তা নিয়েও গবেষণা করে কতিপয় দুষ্ট যুবক। নাটকের শেষ অঙ্কে এসে, পাবলিকের কাছে মাফটাফ চেয়ে আধমরা চেয়ারম্যান নিজে নিজেই ফ্রুটিকা খেয়ে অনশন ভাঙে। এভাবে আচ্ছা আক্কেল পায় আক্কেলডাঙ্গার চেয়ারম্যান।

চা-মিষ্টির এক দোকান আছে মাটিডালিতে। অভাবিতপূর্ব, অনির্বচনীয় একধরনের স্বাদ ও গন্ধ দোকানটার চা ও মিষ্টিতে। একবার খেলে স্বাদেন্দ্রিয়ে তার রেশ লেগে থাকে বহুদিন। দোকান খোলা থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। দূরপাল্লার ড্রাইভারেরা বাস-ট্রাক থামিয়ে চা-মিষ্টি খায় এখানে। আগেই বলেছি মিষ্টি খুব পছন্দ কবিদের। কবিতা নিয়ে অবিরাম ভাবনাচিন্তা, তুমুল আড্ডা, তর্কবিতর্ক সারাদিন এইসব করতে করতে কবিদের শরীর থেকে বিকীর্ণ হয়ে বেরিয়ে যায় প্রচুর রেশমি-রেশমি চিনিবাষ্প, হাওয়াই মিঠাই আকারে। তা ছাড়া কবিরা চিনি দিয়ে মিতালি পাতায় পিঁপড়াদের সাথে। কবিদের শরীরে জাগে তীব্র মিষ্টিবাসনা। মহিমাগঞ্জ থেকে আজ বগুড়া এসেছে কবি মজনু শাহ। সারাটা দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা আড্ডা দিয়েছি আমরা কয়েকজন। রাত একটু ঘন হয়ে এলে নেউলের মতো বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিন নিশাচর…মিষ্টির দুনির্বার আকর্ষণে। রিকশার সিটের দুই পাশে বসেছি দুজন, মজনু আর আমি, দুজনের দুই কাঁধে দিব্যি দুই পা ঝুলিয়ে স্নিগ্ধ ননীচোরার মতো নতমুখে বসে আছে কিশোর কবি অমিত রেজা চৌধুরী। ক্ষীরের সন্দেশের মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। চাঁদ থেকে বিচ্ছুরিত মিহি মসলিন সুতার কোটি-কোটি ঝালর উড়ছে বাতাসে। কবিদের রিকশা চলছে ওইসব সূক্ষ্ম মসৃণ এলোমেলো উড়ন্ত জ্যোৎস্নাতন্তু ঠেলে ঠেলে। তিনজনে মিলে সারা গায়ে শুষে নিচ্ছি সেইসব রেশমি বিকিরণ আর পাঁচ-পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের ওপর ঘটিয়ে তুলছি পাঁচ-পাঁচ রকমের ব্যতিক্রমী সালোকসংশ্লেষণ।

চা-মিষ্টি-সন্দেশ খেতে খেতে একই টেবিলে বসা বাসের হেলপার আর কয়েকজন যাত্রীর সাথে গুলতানি মারলাম কিছুক্ষণ। যাত্রী তিনজন কাজ করে ইটের ভাটায়, বাড়ি ভুরুঙ্গামারি, মাস-কয়েক একনাগাড়ে কাজ করে বাড়ি ফিরছে। বেশ কয়েকটি আধুনিক কবিতাও শোনালাম তাদের, বাংলা ভাষার বিখ্যাত বিখ্যাত সব কবিতা, কণ্ঠে বেশ আবেগ ও দরদ লাগিয়ে লাগিয়ে পড়লাম। কিন্তু এ কী! ও মা, এ দেখি বিরক্ত হয়, কিছুটা রাগ-রাগ ভাবও। বলে, “কী সব পড়েন-না আপনেরা! ছাগলের নাদি আর জঞ্জালের চচ্চড়ি!” বুঝলাম, আমাদের কাছে যা কবিতা, ওদের কাছে তা নির্যাতন, ওদের সৌন্দর্যবোধের ওপর নির্যাতন! অমিত বলে, “আচ্ছা, উৎপলের একটা কবিতা শোনাই?” একজন বলে ওঠে, “কার? লুৎফুলের? হ, হুনছিলাম, মধু শ্যাখের ব্যাটা পাগলা লুৎফুল নাকি কবিতা ল্যাখে। হ্যার কবিতা?” আমি তখন বলি, “তাইলে ছন্দের একটা কবিতা শোনাই?” বেয়াদব হেলপারটা বলে কী জানেন, “থোন ফালায়া আপনাগো ছন্দ। আপনাগো ছন্দ, না পাদ-মারা গন্ধ!” তো, দেখলাম আর এগিয়ে কাজ নাই।

সুবিল। করতোয়ার সরু একটা শাখা। বাড়িঘর, গাছপালার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে হালটের মতো। ফিনিকফোটা জ্যোৎস্না। ফেরার পথে দেখলাম অদ্ভুত এক দৃশ্য- ঘোষপাড়ার নিতাই ঘোষ মালকোছা মেরে পলো খালুই নিয়ে গোয়ালঘর আর বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে দুড়দাড় করে নেমে পড়ছে সেই হালটে। আর বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার বউ। হালটে কোমর-পানি। সেই পানিতে গভীর রাতে একা-একা নিতাই খপ-খপ করে পলো ফেলে মাছ ধরছে। এত মাছ এলো কোত্থেকে! রিকশা থামিয়ে খেয়াল করে দেখি-কি, হালটের জলে ভেসে যাচ্ছে সোনালি সোনালি সব বাঁশপাতা। আর নিতাই যেই পলো ফেলছে একেকটি বাঁশপাতার ওপর, অমনি খলবল করে উঠছে পানি এক ঝলক আর ওই সোনালি বাঁশপাতা বদলে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে রুপালি বাঁশপাতারি মাছ। নিতাই সমানে সেই মাছ ধরে ধরে রেখে দিচ্ছে কোমরে-বাঁধা খালুইয়ের ভেতর। অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য এখনো মুদ্রিত হয়ে আছে আমার চোখের তারায়। জানি না মজনু আর অমিতের মনে আছে কিনা। কী মজনু, মনে আছে? অমিত, মনে পড়ে? কিছু বলছেন না যে আপনারা?

পরে শুনেছিলাম, নিতাইয়ের নতুন পোয়াতি বউয়ের বাঁশপাতারি মাছের চচ্চড়ি খাওয়ার খুব সাধ হয়েছিল, কয়েকদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছিল নিতাইয়ের কাছে। নিতাই জোটাতে পারে না। অগত্যা গভীর রাতে হালটের পানিতে নেমেছে নিতাই, আর গর্ভিণী নারীর প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে বাঁশপাতা রূপান্তরিত হচ্ছে বাঁশপাতারি মাছে। এরকম মাঝে-মধ্যে ঘটে কিন্তু দুনিয়ায়। ঘটে না?

original post

read more

পথে, প্রদেশে (৩য় পর্ব)

by মাসুদ খান

কত যে রহস্যজড়ানো, কুহকজাগানো ঘটনায় ভরা মহাস্থানগড়ের এই ছোট্ট অঞ্চলটুকু! প্রিয় পাঠকপাঠিকা ভাইবোনবন্ধুগণ, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে এর আগে হকসেদে নামে একজনের কথা বলেছিলাম অল্প একটু। এই যে হকসেদ খোজা (খাজা নয়, খোজা, হকসেদ খোজা), অদ্ভুত এক রহস্যমানব। ভাঙাচোরা পোড়া-পোড়া মেছতাপড়া চেহারা, কাইস্টা পাটের দড়ির মতো দীর্ঘ পাকানো শরীর, তার ওপর সে খোঁড়া, আবার খোজাও, পেশায় ছিচকে চোর, খুচরা লুচ্চামি-লাম্পট্যে ওস্তাদ, কিন্তু মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত। ‘খোজা’ ছাড়াও আরও অভিধা আছে তার। কেউ কেউ তাকে বলে ল্যাংড়া হকসেদ আবার কেউ বলে হকসেদ পণ্ডিত। দুনিয়ার সব বাঘা-বাঘা পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ তার। নোম চমস্কির কাছ থেকে চিঠি আসে তার কাছে। এই কিছুদিন আগে জাক দেরিদা চিঠি দিয়েছে ফরাসি ভাষায়। অনেক জ্ঞান হকসেদ পণ্ডিতের, ভাষাও জানে অনেকগুলি। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-উপনিষদ…, জেনবাদ থেকে সঞ্জননী ব্যাকরণ, শ্রেণিসংগ্রাম থেকে ক্ষমতাকাঠামো, ভার্ব-বেইজ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে কসমোলজি, ভাষার ডিপ-স্ট্রাকচার ডিবেট থেকে মহা-মন্দার ডেরিভেটিভ থিয়োরি, কালাজাদু থেকে কমোডিটি ফেটিসিজম, স্ট্রিং থিয়োরি থেকে সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি, আসমান-জমিন, আন্ডারগ্রাউন্ড-ওভারগ্রাউন্ড…কমবেশি সবকিছুরই হালনাগাদ খবরাখবর আছে তার কাছে।

বগুড়ার অনেক ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করে দেশবিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। গরমের ছুটিতে ঘরের ছেলেমেয়ে ফিরে এসেছে ঘরে। একদিন দেখি, গণ-উন্নয়ন গ্রন্থাগারের সামনে হকসেদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। হকসেদ তাদের সঙ্গে ক্ষমতা-র বিবর্তন ও গতিবিধি নিয়ে কথা বলছে, পাওয়ার কী ক’রে গড়াতে গড়াতে ফ্রম প্রিস্ট টু প্রিন্স টু প্রেসিডেন্ট টু মার্কেট-প্লেসে এসে দাঁড়াল কালে-কালে, তার ইতিবৃত্ত। তর্ক তুলেছে দুতিনজন তরুণ। এক পর্যায়ে হকসেদ বলছে, “কী সব ডিপ-সিটেড স্টেরিও-টাইপ কথাবার্তা কও-না তোমরা! ভার্সিটিগুলাতে যে কী শেখায়! যত্তোসব ভেড়ার অণ্ডকোষ!” তার কথায় তরুণ-তরুণীরা বিব্রত হচ্ছে দেখে সে আবার বলতে থাকে, “শোনো, রাগ কইরো না, দ্যাখো, হামি হইলাম গিয়া অশিক্ষিৎ মানুষ, দূষিত রক্ত, হামার কথার মধ্যে না-হয় রাসটিসিটি আছে, কিন্তুক ইয়াং শিক্ষিত পোলামাইয়াগো মগজে যে রাস্ট ধইরা গেছে-গা, তার কী? কী আর কমু, অবিদ্যা! অবিদ্যা! স-ব বিদ্যার দোষ!………..” মুগ্ধ হয়ে হকসেদের কথা শুনছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রছাত্রী। মুগ্ধতা ও টান-টান উত্তেজনায় এই গরমের দিনে তাদের মাথা ও কান আরো গরম হয়ে উঠছে।

কেমনে এতকিছু জানে হকসেদ, কী বৃত্তান্ত, কেউ বুঝতে পারে না। থাকে ভাঙা ঘরে, কম্পিউটার নাই, ইন্টারনেট নাই। বিদ্যুতের কানেকশনই নাই ঘরে, তার আবার কম্পিউটার ইন্টারনেট! কিন্তু কেমনে এত পড়াশোনা, কীভাবে এত যোগাযোগ! এও কী সম্ভব! কেমনে কী! দুশ্চরিত্র আর রহস্যময় স্বভাবের কারণে লোকজন খুব একটা ঘেঁষে না তার কাছে। তবে গ্রামে দারোগাপুলিশ ঘোরাঘুরি করতে দেখলে এলাকাবাসী হকসেদকে নিয়ে যায় তাদের কাছে। হকসেদ তখন থাকে টপ গিয়ারে। ফুটফাট ফরাসি, ইংরেজি আর গুরুগম্ভীর বাংলায় তত্ত্বকথা ব’লে ভড়কে দেয় দারোগাকে। যে তেজ ও বেগ নিয়ে দারোগা এলাকায় ঢোকে, নিস্তেজ হয়ে যায় তার অনেকটাই। দারোগা পরেরবার এলে খোঁজ পড়ে যায় হকসেদের। তার কাছ থেকে জ্ঞানের কথা শুনতে চায় পুলিশ। হকসেদ তো আর কিছুতেই কাছে ঘেঁষে না। দূরে দূরে থাকে। বলে, “না ভাই, যাই-গা, পুলিশের ভালবাসা, গেরস্তের মুরগি পোষা…।”

জ্ঞাতিগোষ্ঠী বলতে কেউই নাই হকসেদের। কোত্থেকে সে এসেছে কেউই বলতে পারে না। কেউ বলে, দূরের কোনো জঙ্গল থেকে এসেছে। কেউ বলে, ওই যে ভাঙা রাজবাড়ির লাগোয়া করতোয়ার খাড়া পাড়, যেখানটায় কয়েকশো বছর আগে বিধর্মী হার্মাদের স্পর্শ বাঁচাতে জহরব্রত পালন ক’রে রাজকুমারীরা ঝাঁপ দিয়েছিল করতোয়ায়, সেই খাড়া পাড় বেয়ে উঠে এসেছে হকসেদ, জলবাঁদরের মতো ঘেঁষটে ঘেঁষটে। গায়ে তার মেছো গন্ধ। আর নামটাও দ্যাখেন কেমন! হকসেদ। মোকসেদও না, বাসেদও না, আক্কাসও না, ঝাক্কাসও না, আবার মদের দেবতা ব্যক্কাসও না। মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যায় সে বেশ কিছুদিনের জন্য। জনশ্র“তি আছে, ওই সময়টায় সে চলে যায় দূরের কোনো শহরে। লাইব্রেরিতে বসে বই আর ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে একটানা কয়েকদিন। হকসেদের বয়স কত বোঝা মুশকিল। দাড়ি-গোঁফ-চুল কিচ্ছু নাই, এক্কেবারে মাকুন্দা সাফ-সাফ্ফা, মাথাটা আদ্যোপান্ত গড়ের মাঠ। জাহাঙ্গীরনগরের নৃতত্ত্বের মাহবুব আর মোস্তফা বেশ গবেষণা করে-টরে শনাক্ত করেছে, হকসেদ পণ্ডিত হলো ভেড্ডিড ও মঙ্গোলয়েড নৃগোষ্ঠি আর সেইসঙ্গে পুরাণপ্রসিদ্ধ বায়স পক্ষিগোষ্ঠির সঙ্কর। সময়, ইতিহাস আর ভূগোলের বাইরে থেকে যেন উঠে আসা এই এক প্রহেলিকা-মানব!

একবার সিঁদ কেটে চুরির কাজ সেরে বের হয়ে দৌড়ে পালাবার সময় হকসেদ নিজেরই খুঁড়ে রাখা সিঁদের গর্তে পড়ে পা ভেঙে ফেলে। সেই থেকে সে হকসেদ খোঁড়া। যখন সে অপরাধ করে, কেউই তাকে ধরতে পারে না ঠিকই, কিন্তু কীভাবে যেন আপনাআপনি প্রাকৃতিক ইনসাফ ঘটে যায় তার বেলায়। একবার এক অন্ধকার ঝড়বৃষ্টির রাতে গামছায় মুখ ঢেকে ঢুকেছিল প্রোষিতভর্তৃকা এক গৃহবধূর ঘরে। মাটির ঘর, স্বামী দারোয়ানের চাকরি করে ঢাকায়; পাহারা দেয় অন্যের বাড়ি, এদিকে নিজের বাড়ি হকসেদের হাওলায়। কী হয়েছিল তা জানা যায়নি, তবে জানালা ভেঙে পড়িমরি প্রাণ-হাতে লাফিয়ে বাইরে এসে পড়েছিল হকসেদ। পড়েই হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড় জঙ্গলের দিকে। পরে, জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে পেশাব করছিল হকসেদ। এদিকে টিপটিপ বৃষ্টির ভেতর কোলাব্যাং ধরতে নিচেই ওৎ পেতে ছিল এক খাটাশ। খাটাশটা কোলাব্যাঙের বদলে খাবলা দিয়ে সোনাব্যাং ছিঁড়ে নিয়ে দৌড়…সেই থেকে হকসেদের নাম হকসেদ খোজা।

মানুষদের মধ্যে নরসুন্দর, প্রাণীদের মধ্যে শৃগাল, আর পাখিদের মধ্যে কাকেরা খুব বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর হয়। শোনা যায়, বিদূষী বাক্সিদ্ধা খনা মারা যাবার পর তার জিহ্বাটা নাকি ভাগাভাগি করে খেয়ে নিয়েছিল শৃগাল ও কাক। সেই থেকে তাদের এত বুদ্ধি। বলা হয়ে থাকে, শিয়ালেরা হাইপার-অ্যানিম্যাল আর কাকেরা, অ্যান্টিবার্ড। তো, পণ্ডিত হকসেদ মানুষের ভাষা শেখাত প্রবাদপ্রসিদ্ধ সেই শৃগাল আর কাকদের। বেশ কিছু কাক ও শৃগাল ইতোমধ্যে রপ্ত করে ফেলেছে ভাঙা-ভাঙা বাংলা। প্রবীণ এক শৃগাল আর এক বায়স তো এখন গ্রামের নানান শালিশ-বৈঠকেও উপস্থিত থাকে। মূল্যবান মতামত দেয় তাদের সেই পাশবীয় বাংলা আর রপ্ত-করা ইশারা ভাষার মিশাল দিয়ে। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম মানবকুলের বৈঠকে শিয়াল ও কাকের কার্যকর অংশগ্রহণ। কাক বসে উঁচু এক টুলের ওপর আর বড় একটি চেয়ারের ওপর উঠে বসে শিয়াল। শিয়াল প্রথম-প্রথম লেজ পেছনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসতো, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে দুষ্ট পাবলিক লেজে চিমটি কাটে, এখন তাই লেজ সামনের দিকে রেখে বসে। পণ্ডিত হকসেদকে কেউ মানে না বটে, কিন্তু তার ওই দুই পাশব সাগরেদ- শিয়াল আর কাক- তাদেরকে ঠিকই মাতবর মানে পাবলিক।

একবার হলো-কি, হকসেদের এক অপকর্মের বিচার বসেছে। শালিশে অন্যান্য মাতবরের সঙ্গে হাজির আছে হকসেদেরই একনিষ্ঠ সাগরেদ ওই শিয়াল আর কাক। হকসেদকে ধরে এনে বেঁধে রাখা হয়েছে কলাগাছের সাথে। এই প্রথমবারের মতো সে ধরা খেয়েছে। অন্যসময় তো অকাম করেই লাপাত্তা হয়ে থাকে বেশ কিছুদিন। পরে সবকিছু যখন ঠাণ্ডা হয়ে আসে, এলাকায় হাজির হয় সে। অবশ্য খুব বড় ধরনের অপরাধ সে করে না, এই ধরেন, ছ্যাঁচড়া চুরিচামারি, খুচরা লুচ্চামি এইসব। তো যাই হোক, হকসেদের বিচারে নানাজনের নানা মত। শেষে সাব্যস্ত হয় হকসেদকে ধোলাই দেওয়া হবে আচ্ছামতো। ঘোড়াঅলা দানেছ মল্লিকের ঘোড়া-চাবকানো চাবুক দিয়ে চাবকানো হবে। গুনে গুনে ২৯ চাবুক। এর মধ্যে হঠাৎ করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিয়াল মাতবর তার ভাঙা-ভাঙা হুক্কাহুয়া বাংলায় উঠল, “খোজাটারে এমন মাইর দেওনের কাম যে খোজা খাড়া-ই থাকবে, খোজার জান থাকবে না।” শিয়ালের কথা শুনে পাবলিক তো থ, কেউ কেউ হাসতে হাসতে খুন হবার জোগাড়। রাগের চোটে হকসেদের চোখ বড় হতে হতে ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আরে! শালা ইবলিশটা কয় কী! তাজ্জব-কি-বাত! গজগজ করতেই থাকে হকসেদ, “শালার শিয়ালটারে তো মানুষ বানাইতে পারলাম না! কীর’ম হাড়ে-হারামজাদা দ্যাখ্ দিনি! বজ্জাতের হাড্ডি কোনহানকার! ওস্তাদের ওপর ওস্তাগরি, না?” পরে অবশ্য একটা মিলমিশ করে দেবার অভিপ্রায়ে শিয়াল মাতবরসহ আরো কিছু মাতবর হকসেদকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ব্যাটা ইল্লৎ, মাফ চা, অকাম করছোস, মাফ চা মুরুব্বির কাছে।” হকসেদ আত্মপক্ষ সমর্থনও করে না, মাফও চায় না। রাগে খালি গরগর করতে থাকে আর কটমট করে তাকায় শিষ্য ইবলিশটার দিকে। অবশ্য যখন দ্যাখে যে, উপায় নাই, সত্যি-সত্যি পড়েছে এবার মাইনকার চিপায়, তখন হরু মির্জার কাছে গিয়ে বলে, “মুরুব্বি, ভুল হইছে, মাফ কইরা দ্যান।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার গোমর ভাব পুরাপুরি অটুট। হরু মির্জা মাফ করে না তো করেই না। অনেক্ষণ হাতজোড় করে সাধ্যসাধনা করে আসামি হকসেদ, অবশেষে বিরক্ত হয়ে একসময় উষ্মামেশানো স্বরে বলে ওঠে, “মাফ দিলে দ্যান, না দিলে তা-ও কন, মাফ কেমনে পাওন লাগে তা ভালো কইরা জানি।” আরে, দ্যাখ্ তো কারবার, মাফও নেবে দেখছি মাস্তানির মাধ্যমে। চোরের মায়ের বড় গলা/ লাফ দিয়া খায় গাছের কলা। এদিকে আবার এরই মধ্যে কিছু লোকজন হরু মির্জার ওপর বিরক্তও হতে শুরু করেছে, বলে, “হরু মির্জার খালি বেশি-বেশি, পোংটা পণ্ডিতটা এত কইরা মাফ চাইতেছে, মাফ কইরা দিলে কী হয়।” পরে অবশ্য অবস্থা বেগতিক দেখে হকসেদকে মাফ করে দেয় হরু। ছাড়া পাবার পর, লোকজনদের বলে কী জানেন? বলে, “দ্যাখ্ তো কিত্তিখান! হামাক লিয়া বানছে গিয়া কলাগাছের সাথোত। কী কমু খালি হাসি আইসলো দেইখা, তা নাইলে এইসব কলাগাছ-মলাগাছ এক্কু ঝাঁকিত উপড়ায়া ফেলায়া কখন যাইতাম গিয়া পলায়া, হামাক আর পায় কেডা! প্রত্যুত্তরে একজন আবার বলে ওঠে, “ও, ওই যে মেনি মাছ না ভ্যাদা মাছ, কি জানি এক মাছ আছে না, জালে আটকা পইড়া নাকি কয়- ফৌজদারি জাল ছিঁড়তে পারি/লাগে আমার এক তুড়ি//কিন্তু যেই মাথা দেই জালের ফাঁকে/অমনি আমার খালি-খালি হাসি লাগে//। হকসেদের হইছে-গিয়া হেই দশা।”

হকসেদ খোজাকে এই দেখা যায় মহাস্থানগড় এলাকায়, তো পরক্ষণেই বগুড়া শহর। তার কায়কারবারই অন্যরকম, মহা-তেলেসমাতি। একদিন পড়–য়া-র সামনে জাহাঙ্গীরনগরের ‘শান্তি ও সংঘর্ষ’ ডিপার্টমেন্টের চৌকস ছাত্র রাশেদ তর্ক করছে বিশ্বরাজনীতির জিওগ্রাফি ও কেমিস্ট্রি নিয়ে, বুশ-ব্লেয়ার-লাদেন-সাদ্দাম নিয়ে, তার সাথে ফুকো, দেরিদা, লাকাঁ, ডেলুজ, হাইপার মডার্নিটি, ইডিওলজি ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রোপাগান্ডা মেশিনারি, সাবঅলটার্ন, জৈন ও সুফিপ্রভাব…আরো কত কী মিশিয়ে-টিশিয়ে বকে চলেছে অনর্গল। পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে হকসেদ, শামীম, অসিত, আরজু …। রাশেদের বাকবিভূতির টানে শামীম, অসিত আর আরজু যেই যাওয়া ধরেছে পড়–য়ার দিকে, অমনি হকসেদ ঠাস করে বলে ওঠে, “সাবধান! কাছে যাইস না, দ্যাহোস-না কেমন বদহজম হইছে রাশেদের, বমি-উমি ছিট্যা আইসা গায়ে লাগবো কইলাম। এঃ, বেবাক বিদ্যা এক্কেরে খায়া লইছে একসাথ!” তারপর বলে, “ও, কাল তো কী জানি একটা সেমিনার আছে না? ফাটাফাটি বক্তৃতা দিবো রাশেদে…বুর্জোয়া, জঙ্গি, সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেটারি…সবগুলারে একধারসে খালি ধ্যান-ধ্যানা-ধ্যান কচুকাটা করবো, হের লেইগা দ্যাহোস-না জিব্বায় ক্যাংকা ধার দিতাছে, আর দ্যাখ্ দ্যাখ্ ভোদাই পাবলিক হা কইরা তা-ই শুনতাছে! আর কইস-না, যত্তোসব পান-জর্দা আঁভা-গার্দা! ‘বিস্ফোরণ’ কইয়া জোরে আওয়াজ মারলেই কি আর বিস্ফোরণ হয়? বিস্ফোরণ ঘটায়া দেখাইতে হয়।”

আরো আছে। হকসেদ যাচ্ছে বাদুড়তলার মধু মোহন্তের ভুসিমালের দোকানের পাশ দিয়ে। সঙ্গে ফিরোজ, ফারুক, অশোক, রন্টি। দোকানে কালার টিভি লাগিয়েছে মধু মল্লিক, তাতে ডিশের কানেকশন। সন্ধ্যার পর দোকানে বসে টিভি দেখছে দত্তবাড়ির শাহীন, পেয়ারা পাকা লেনের স্বপন, বৃন্দাবনপাড়ার রফিক, ঠ্যাঙ্গামারার বাপ্পি…আরো অনেক লোকজন। টিভিতে ডাকসাইটে এক বহুজাতিক কোম্পানির শানদার বিজ্ঞাপন। নতুন এবং ফাটাফাটি। স্বপন, শাহীন, রফিক, বাপ্পি ও আরো কয়েকজন যুবক…বিজ্ঞাপনটার নান্দনিক নানা দিক নিয়ে আলাপ করছে, তারিফও করছে বেশ। তারা বেশ উচ্চকিত, উচ্ছ্বসিত। হকসেদ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরোজ-ফারুকরাও দাঁড়িয়ে গেল। একটুখানি দেখল বিজ্ঞাপনটা। তারপর যুবকদের উচ্ছ্বাসের ওপর বেমক্কা ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে খর্খরে গলায় বলে উঠল হকসেদ, “কেডা জানি কইছিল-না, বিজ্ঞাপন হইল-গিয়া পুঁজির ধর্ষণ। তয় বেশ আর্টিস্টিক কইরা ধর্ষণ করে তো, হের লেইগা ধর্ষণে আমরা বেশ মজাই পাই, ভালোই এনজয় করি! আর খালি মিঠা-মিঠা মিছা কথা! ফলনা মাখলে ফর্সা, দখনা মাখলে লম্বা, থুক্কু, দখনা খাইলে লম্বা! শা-লা! কোটি-কোটি টাকা চুইষা নিয়া বিদেশ পাচার করিচ্ছে নয়া জমানার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলান, আর এইদিকে দ্যাখ্ অ্যাকটিং করলে কয় টাকা দিবো-না-দিবো হের লেইগা, টিভিতে চেহারা একটু দেখাইব-কি-দেখাইবো-না হের লেইগা পোলা-মাইয়া জুয়ান-বুড়া সবতে মিল্যা কীর’ম নাচন-কোঁদন করিচ্ছে বিস্টি-ক্যাদা-প্যাঁকের ভিতরে, ঝাঁকে-ঝাঁক… এই একবার বিলের ধারোত, আরাকবার লঞ্চের উপরোত, আরে! লঞ্চটা উল্টায়া যাইবো তো! ফের দ্যাহো দ্যাহো যায়া উঠছে গাছোত, আবার-ফির হাইরাইজের ছাদোত! কত কিত্তি! আর নেটকি-ভেটকি করিচ্ছে কতর’ম…ওই দ্যাখ্ দ্যাখ্ কোট-টাই-পরা চান্দিছিলাটারে দ্যাখ্, ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান ক্যাংকা তিড়িংবিড়িং ফাল পারিচ্ছে খালি। বাঃ! বাঃ! ফের দ্যাখ্ দ্যাখ্ দ্যাখ্ ঘাড়গর্দান-এক-হয়া-যাওয়া গণ্ডারটারে দ্যাখ্, না পারে ঘাড় ঘুরাইতে, না পারে মাঞ্জা লড়াইতে, তা-ও দ্যাখ্ নাচিচ্ছে ক্যাংকা! আহ! কী জেল্লা! আর জোশ দ্যাখ্ কত! আর এইহানে বইসা বিজ্ঞাপনের অ্যাসথেটিকস নিয়া এইসব অ্যাজলা পোলাপান, বোঝে-না-সোঝে-না, গ্যাঁজলা তুইলা ফালাইচ্ছে মুখোত।”

ঘুমঘুম উদাস দুপুর। সমস্ত চরাচর যেন ঝিমাচ্ছে নিঃশব্দে। ফসলের মাঠে, গাছের পাতায়, করতোয়ার জলে বাতাসের যে হল্লা, হাওয়ার যে গুলতানি ছিল সকালবেলার দিকে, থেমে গেছে সব। কলহপরায়ণ সাতভাই পাখির দল, কলহ থামিয়ে চুপচাপ বসে আছে গাছের ডালে ডালে। চোখের আড়াল হওয়া বাছুরটির জন্য গাভীর যে ঘনঘন ডাক, তা-ও আর শোনা যাচ্ছে না এখন। পাখির কূজন নাই, পাখসাট নাই, শ্যামরঙা ভ্রমরের গুঞ্জন নাই, গাভীর হাম্বারব নাই…সব স্থির, শান্ত, সমাহিত…। এমন সময় হঠাৎ সমস্ত নীরবতা ভেঙে বেজে উঠল ভাটির দিকে বয়ে যাওয়া এক মহাজনি নৌকা…“আমার কাঙ্খের কলসি/ গিয়াছে ভাসি/ মাঝি রে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া রে/ মাঝি রে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া//… ধীরে ধীরে মাঝি যদি সাগর দিতে পাড়ি/ তবে কি কলসিখানা ভাসিত আমারই?//। চরাচরজোড়া নিস্তব্ধতা ভেঙে বেজে ওঠা এই গান তার তীক্ষè সুরসহ তিরের মতো এসে বিঁধল নদীর পাড়ে একা-একা ঘুরতে-থাকা গানপাগলা, বংশীবাদক তপন মল্লিকের কলিজা বরাবর। সুরের প্রহারে শিউরে উঠল তপন। আস্তে আস্তে দৌড়াতে লাগল নদীর ধার ধরে, সুরের পিছে পিছে।

যান্ত্রিক গোলযোগে নাকি খেয়ালি মাঝির হঠাৎ খেয়ালে, ঠিক বোঝা গেল না, তবে গান থেমে গেল সহসা। ফের বেজে উঠল, থামল আবার। অসহ্য লাগছে তপনের। এক পর্যায়ে সে দুই হাতের তালুকে চোঙা বানিয়ে মুখের কাছে এনে ডাক পাঠাল মাঝির উদ্দেশে, “হেই মাঝি ভাই, ওই যে ওই গানটা বাজান-না ভাই একবার… কী জাদু করিলা/পিরিতি শিখাইলা…। তপনের কথা শুনতে পেয়েছে কি পায়নি, ‘কাঙ্খের কলসি’ জলে ছেড়ে দিয়ে বেজে উঠল, “কী জাদু করিলা/পিরিতি শিখাইলা/থাকিতে পারি না ঘরেতে, প্রাণ সজনী/ থাকিতে পারি না ঘরেতে//”। প্রেমের লোকায়ত এই গানখানি যে-ই শুনেছে, আমার ধারণা সে-ই মজেছে… গানের কথা আর তার আধো-রাখালি আধো-ভাটিয়ালি সুরের মধ্যে রয়েছে কী যেন অচেনা এক মায়া ও আবেশ, অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখে ভেতরে-বাহিরে। “আমারো লাগিয়া/ নিরলে বসিয়া/ তোমারে যতনে গড়িল বিধি” কিংবা ওই যে “পড়ে গো ঢলিয়া/ঢলিয়া ঢলিয়া/তোমারো মুখেতে পূর্ণশশী”…কথাগুলি এগুতে থাকে ধীর লয়ে, এগুতে এগুতে ওই যে “তোমারে যতনে” কিংবা “তোমারো মুখেতে” পর্যন্ত গেয়ে চূড়ায় উঠিয়ে নিয়ে যখন ছেড়ে দেয় ক্ষণিকের জন্য, এবং ফের ধরে ফেলে… তখন সুরবিরতির ওই ক্ষুদ্র ক্ষণ-অবকাশের মধ্য থেকে ঘটে রুপালি অগ্ন্যুৎপাত সুরের আকাশে…আর নদীপৃষ্ঠার ওপর দিয়ে জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে নিয়ে সেই সুর যখন ভাটি থেকে ভেসে আসে উদার অবারিত অববাহিকার দিকে, মর্মী মানুষ কেমন মোহিত হয়ে যায় তখন, ভুতগৃহীতের মতো হাঁটতে থাকে সুরের পিছে পিছে, রসজ্ঞ ভিজে যায় রসে, উদাসী মানুষ হয়ে ওঠে আরো উদাসীন। সুরপাগলা তপনেরও আজ হয়েছে তা-ই। ভাটির দিকে বয়ে যেতে যেতে আস্তে আস্তে কখন মিলিয়ে গেছে সুর, কিন্তু বেজেই চলেছে রেশমি রেশটুকু তার। ওই উদাস আনন্দময় সুর আজ সারাটাদিন ঘুরিয়ে মেরছে তপনকে, বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে…

সন্ধ্যার পর ওই সুর গানপাগলা বংশীবাদকের অন্তর্গত সাতমহলার নানা অলিগলি ঘুরে ঘুরে, বর্ণাঢ্য সব আঙরাখা কিংখাব ছুঁয়ে ছুঁয়ে উঠে এলো অধরোষ্ঠে। নদীর ধারে, বর্ষীয়ান সেই অশথ গাছের নিচে, পা মেলে বসে আঁড়বাশিতে সুর তুলল রসিক বাঁশরিয়া…“কী জাদু করিলা…পিরিতি শিখাইলা…থাকিতে পারি না ঘরেতে…।” আহ! বাঁশির সুর। সকল বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে এই বাঁশিই হচ্ছে সবচেয়ে অর্গানিক! অনেকক্ষণ ধরে ধীর লয়ে, প্লুত স্বরে বেজে চলল বাঁশি। অদ্ভুত বিরহমধুর সুর। তারপর কিছুক্ষণ বিরতি। বাঁশি আর বাজছে না দেখে অদূরে আলো-অন্ধকারে পাটশোলার বেড়ার আড়াল থেকে কাবিল কারিগরের ত্রিশোর্ধ বউ আম্বিয়া উনুনে রান্না তুলে দিয়ে কিছুটা আহত গলায় বলে উঠল, “ও মল্লিকের ব্যাটা, বাঁশি থামায়ে দিলেন যে! তোলেন-না ফের ওই গানটা, শুনি।” বাঁশরিয়া আবার হাতে তুলে নিলো বাঁশি। একাগ্রচিত্তে, প্রাণমন উজাড় করে দিয়ে সুর তুলল উথালপাথাল। ফিনকি দিয়ে দিয়ে ছুটছে সুরের স্ফুলিঙ্গ, ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুন সমগ্র চরাচরে… গাছে গাছে, শস্যে শস্যে, ছনের ছাউনিতে আর ধনচে-শোলার বেড়ায় বেড়ায়। এখন আর কোনো শব্দ নাই, সুরের সূক্ষ্ম স্বনন ছাড়া। সব শব্দ গিয়ে মিশে গেছে যেন এক নিঝুম নৈঃশব্দ্যে। এইবার যা ইচ্ছা তা-ই হোক ওই দূরে, দূরে দূরে,… যত মারণকলের কলরব, পরাক্রমীদের দূরাগত তর্জনগর্জন, সার্কাসের লোম-ওঠা বৃদ্ধ সিংহের গোঙানি, সঙ আর জোকারদের নিভৃত নৈশকান্না… এইবার দুনিয়ার যত আঙুর ও কামরাঙা, ভরে উঠুক সব হর্ষবিষাদ রসে, চণ্ডাল ভুলে যাক চিতা-সাজানোর কারিগরি, আক্ষেপ জেগে উঠুক শশ্মানপতির, উ™£ান্ত হয়ে যাক নবীন মৌমাছির ঝাঁক বানডাকা সর্ষেফুলের রূপে, গোরস্তানের পেশাদার রোদনকারী ভুলে যাক রোদন হঠাৎ; দুষ্ট শিশু ধরা খাক, খেয়ে বলতে থাকুক সোনালি-রুপালি মিথ্যা অনর্গল; বাবুই ভুলে যাক বয়নসূত্র আর দাঁড়কাকের ডানায় ভর করে নেমে আসুক আলকাতরার মতো অন্ধকার…আর…ঢেকে দিয়ে যাক স-ব…তারপরও হতে থাকুক…আরো যা যা হয়…

বাঁশি থেমে গেছে। অনেক রাত করে গঞ্জ থেকে বাড়ি ফিরেছে কাবিল কারিগর। খেতে বসেছে। একে তো ঠাণ্ডা ভাত, তার ওপর তরকারিতে নাই লবণ। আলুনি সালুন খেয়ে রাগ চড়েছে কাবিলের। ভাত ফেলে উঠে গিয়ে বকাঝকা করেছে আম্বিয়াকে, দুচারটা ঠোনাও মেরেছে হয়তো। রাতের দ্বিতীয় যামে অস্পষ্ট সুর তুলে কাঁদছে আম্বিয়া। কালা-র প্রাণ-উতলা আনন্দমেদুর সুরের পর, হায়, রাধাকেও তুলতে হয় বিষাদবিধুর ধুন- এটাই সংসারের বিধি। পিরিতিসুরের সর্বনাশা বিস্তারের পরপরই দহনসুরের ঝালা। রাধিকার নেপথ্যে হয়তো তখন বেজে চলেছে- “উনানে রান্না তুলে/নুন দিতে যাই যে ভুলে/কালা, তোর কারণে নষ্ট হতে আর কী বাকি?// কালা, তোরই পানে আড়নয়নে চেয়ে থাকি//”

কত অলৌকিক ঘটনা ঘটে এই লৌকিক দুনিয়ায়! বাস্তবতার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় কত অবাস্তব নাটক! কিন্তু মহাস্থানগড়ের এই এলাকাটুকুতে মাঝেমধ্যে এমনসব ঘটনা ঘটে যেগুলি একাকার করে দিয়ে যায় লৌকিক-অলৌকিকতার ভেদরেখা। পেরিয়ে যায় বাস্তব-অবাস্তবের সংজ্ঞা ও সীমানা। এইসব অবাক-অচেনা ঘটনায় লোকে এতটাই বেকুব বনে যায়, হয়ে পড়ে এতটাই বিহ্বল যে, ওগুলিকে তারা ঠিক কোথায় ঠাঁই দেবে- সংবাদে, ইতিহাসে, রূপকথায়, নাকি কিংবদন্তিতে- স্থির করতে পারে না। তাই তারা মহাস্থানের চালু ইতিহাস আর প্রচল কিংবদন্তির আড়ালে ঢেকে রেখে দেয় এইসব অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহকে। এমনকি বগুড়ার বাইরে থেকে যারা আসে, পর্যটন, প্রশাসন বা গবেষণার কাজে, তারাও কী এক অজ্ঞাত কারণে বেমালুম চেপে যায় সবকিছু। মনে হয় কখনো কিছুই ঘটেনি, আর আমরাও দেখিনি কিছুই।

একবার প্রকাশ্য দিবালোকে আকাশ অন্ধকার করে নেমে আসে পাখির বিশাল বিশাল ঝাঁক। আবাবিল পাখি নয়, তবে তাদের মতোই ছোট ছোট, অসংখ্য, অগণিত। বৃষ্টির মতো তারা ঝেঁপে পড়ল লালে-লাল হয়ে থাকা মরিচের মাঠে। পাখিদের ঠোঁটগুলি লাল, ডানায় ছোপছোপ লালের মাঝে সবুজ-সবুজ পালক। মাথায় ছোট্ট সবুজ ঝুঁটি। মরিচ খেতের মরিচ লাল, পাতা সবুজ। পাখি আর মরিচগাছের এক অদ্ভুত ম্যাচিং। রঙের অভূতপূর্ব ঐকতান। প্রতিটি মরিচগাছে অন্তত তিনচারটি পাখির ডানা ঝাপটানো আর দ্রুত ঠুকরে ঠুকরে লঙ্কাভক্ষণ…। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী এই কায়নেটিক আর্ট। পাতাঝলমলে তুঁতগাছে তুঁতপোকা ছেড়ে দিলে যেমন মুহূর্তের মধ্যে সব ডালপালা পুরোপুরি নাঙ্গা, নিষ্পত্র হয়ে যায়, তেমনই এই নব্য আবাবিলের ঝাঁক কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ মরিচশূন্য করে ফেলল মাঠকে মাঠ। তাজ্জব ব্যাপার! তবে তাজ্জবের আর দেখলেন কী! আরো তো বাকি। মরিচখেত সাবাড় করে ঝাঁকের পর ঝাঁক উড়ে গিয়ে পড়ল পাশের পাকা ধানের খেতে। লঙ্কাকাণ্ডের পর এবার ধান্যকাণ্ড। ধানখেতে গিয়েই পাখিগুলি সব হাই তুলতে শুরু করে দিল চঞ্চুব্যাদান করে। বগুড়ার মরিচ- এত ঝাল যে, পাখিদের চঞ্চু আর জিহ্বা থেকে ছুটল ছোট-ছোট আগুনের ফুলঝুরি। নিমেষে আগুন ধরে গেল পাকা ধানের মাঠে। পাখির ঝাঁক উড়ে উঠল ফের। আকাশটা যেন ছেয়ে গেল ঘন কালো মেঘে। নেমে এল রাহুগ্রাসের অন্ধকার…সেই অন্ধকারের মধ্যে মাঠের ধানপোড়া ভস্মের ভেতর ফুটে উঠল অজস্র শাদা-শাদা খই। লোকে ভাবল শেষ হলো বোধহয় এই গজব-নাট্য। কিন্তু না, এ-দৃশ্যও ক্ষণদৃশ্য; ঝাঁক আবার নেমে এলো মাটিতে। নেমেই খুঁটে খুঁটে সাফ করে খেয়ে ফেলল সব খই। ভুরিভোজের পর পাখিদের খানিকক্ষণ বিরতি। তারপর আবার উড়াল। এবার সত্যি-সত্যি বিদায়। রাহু কেটে গেল, হেসে উঠল আলো। পরে একসময় দিনের আলোও নিভে এল। সন্ধ্যা নামল। মহাস্থানের মানুষ দাঁড়িয়ে রইল মহাস্তব্ধ হয়ে, মাঠ ঘিরে, অর্ধবৃত্তাকারে। তেলেসমাতির মতো মাঠকে মাঠ লাল মরিচ, পাকা ধান, নিমেষে সব ফৌত হয়ে গেল একবারে! গুঁড়িয়ে-দেওয়া, গায়ে-হিমধরানো ভয়মেশানো বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই গ্রামবাসীদের আবার অবাক হবার পালা। সেদিন ছিল প্রতিপদ। প্রতিপদের সময় লোকে শোলক কাটে, ত্র“টিপূর্ণ ছন্দে- আইজ প্রতিপদ কাইল দ্বিতীয়া/চান উঠব আসমান গুতিয়া। তো, সেই প্রতিপদের রাতে, অন্ধকারের মধ্যে তারা তাজ্জব তাকিয়ে দ্যাখে, মাঠভর্তি ছাইয়ের ভেতর ছোট্ট ছোট্ট অসংখ্য রতœদানার মতো কী যেন সব জ্বলজ্বল করছে। ভয়ে ভয়ে কাছে যায়, দ্যাখে- অজস্র হিরার টুকরা। হীরকবিন্দুগুলি থেকে অন্ধকারেই বিচ্ছুরিত হচ্ছে বহুতল বর্ণালী-বর্ণমালা। পাখি খেয়ে গেল মরিচ আর ধানপোড়া খই, রেখে গেল রতœদানা, পুরীষ আকারে। কেমনে কী, কী বৃত্তান্ত কিছুই না বুঝে মহাস্থানের বিস্ময়জব্দ মানুষেরা অন্ধকার রাতে পোড়া মাঠে ছড়িয়ে-থাকা ছাইয়ের ভেতরে রতœ কুড়ানো শুরু করে দেয়।

ওগুলি আসলেই হীরকখণ্ড। কিন্তু কীভাবে? মাজেজাটা জানা গেল পরে। রহস্যময় ওইসব পাখি যখন আহার করে, তখন তাদের পেটের ভেতর ঘটতে থাকে এক জটিল আন্ত্রিক আলকেমি। মাটির গভীর নিচে তাপে চাপে নিষ্পেষণে দিনে দিনে বৃক্ষের কার্বন হয়ে যায় কয়লা, আরো-আরো তাপে চাপে আরো বহুকাল পরে ওই কালো-কুচ্ছিৎ অঙ্গারই ফের রূপান্তরিত হয় জ্বলজ্বলে হীরকে। সেই একই সিলসিলায়, একই প্রক্রিয়ায় পাখির পাকস্থলির রসায়নের দাপটে এমন তাপ ও চাপের সৃষ্টি হয় যে ওই মরিচের কার্বন, খইয়ের কার্বন সব রূপান্তরিত হয়ে যায় কাঁচা হিরায়। তবে ভূগর্ভে যে-প্রক্রিয়া চলে হাজার-হাজার বছর ধ’রে, পাখির পেটে তা ঘটে যায় বড়জোর আধা-ঘন্টায়। রহস্য-পাখির পেটে-পেটে যে এত রস রহস্য রসায়ন, এত তেলেসমাতি, কে জানত! শোনা যায়, এরকম ঘটনা নাকি ওই একবারই ঘটেছে দুনিয়ায়।

এরপর থেকে দেখা গেল মহাস্থানের বউঝিদের নাকফুলে, কানের দুলে হিরার কুচি। ভেরুয়া টাইপের আলসে ঘরজামাইদেরও আংটিতে হীরকদানা… এমনকি ঠিকমতো খেতে পায় না, কিডনি বেচে ঋণ শোধ করে মহাজনের, এমন ফ্যামিলিতেও আছে হিরার অলঙ্কার। হিরার টুকরাগুলি খনিজ হিরার মতোই বহুতল। বিচ্ছুরণও হয়, কিন্তু কেমন যেন দুইনম্বরি-দুইনম্বরি ভাব, অতটা শক্ত নয়, কাচ কাটা যায় না ঠিকমতো। এই হিরা তাই অলঙ্কারে সচল, কিন্তু বাজারে অচল। অচল হিরার জাগে সচল রতœরীতি দিকে দিকে…।

এ অঞ্চলে যে কত মধু ও বিষাদের ঐকতান, বেদনা ও হাসাহাসির অর্কেস্ট্রা, ইয়ত্তা নাই তার। ওই যে কার্তিকের জ্যোৎস্নায় শিশিরভেজা নাড়ার খেত মাড়িয়ে হেঁটে চলেছে অসমবয়সী দুই মানবসন্তান। পিতাপুত্র। পিতা ছাত্তার। পুত্র ডেভিড। ছেলেবেলার নাম মোস্তফা। বহুবছর পর দৈবাৎ দেখা বাবায়-ছেলেতে। ফিরে-পাওয়া পুত্রকে নিবিড় অপত্য স্নেহে ভিজিয়ে একাকার করে দিতে চাইছে পিতা। দেখা হবার পর থেকেই একনাগাড়ে ভাবাবেগ দিয়ে, বাৎসল্য দিয়ে কতরকম চেষ্টা করছে পুত্রের ভেতর রিশতাভাব জাগিয়ে তুলতে। শৈশবের কত কথা, কত স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চাইছে পুত্রের মনে। কিন্তু যোগাযোগ হচ্ছে না কিছুতেই। অচেনা বেদনায় বিমর্ষ হয়ে পড়ছে বৃদ্ধ বাবা, তবু হাল ছাড়ছে না। খুব ছোটবেলা থেকেই ছেলে বিদেশে, পড়ালেখা করেছে অনেক, তাই হয়তো সমীহাবশত হাইস্কুল-পাশ বাবা শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলায় ছেলের সঙ্গে খুব মিস্টি করে কথা বলছে। অবশ্য মাঝে-মধ্যে ছুটে যাচ্ছে তার প্রমিত ভাষাভঙ্গি। ছেলেকে মোস্তফা না ডেভিড বলে ডাকবে, আপনি বলবে না তুমি বলবে, এইসব দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে ছাত্তার অবশেষে… “আহা! কতদিন পর দেখা হলো! এতকাল কোথায় থাকা হলো বাবা, কীভাবে আসা হলো, পথে কষ্ট হয় নাই তো” এভাবে কথা বলতে থাকল ভাববাচ্যে। পরক্ষণে আবার ছেলের সঙ্গে আপনি-আপনি করতে লাগল। ছেলে বলে উঠল, “আব্বা, আমি মোস্তফা, হারিয়ে যাওয়া ছেলে আপনাদের, বহুকাল পর পালিয়ে ছুটে এসেছি… এইভাবে কথা বলছেন কেন, আব্বা, আমার সাথে?” পুত্রের আন্তরিকতায় পিতা একটু একটু করে ভাববাচ্য থেকে সম্বোধন বাচ্যে আর আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই-য়ে নেমে এল।

ডুগডুগির মেলা থেকে ছাত্তার মিয়া ঘুরিয়ে নিয়ে এলো ছেলেকে। “তোর কি মনে পড়ে বাবা, তুই যখন ছোট, তোকে একটা শোলক শিখায়েছিলাম, ধাঁধা দিয়া শোলক..! তোর মা যখন তোর নানির পেটে, তুই তখন কোথায় ছিলি, বল তো?… পারলি না? মা যখন নানির পেটে/ আমি তখন ডুগডুগির হাটে//। এই হলো সেই ডুগডুগির হাট। একবার হলো কি, মেলায় খুব ভিড়। তুই আমার পিছন পিছন। হঠাৎ কী হলো, আমি হারিয়ে ফেললাম তোকে। মনে পড়ে, মোস্তফা? সন্ধ্যা পার হয়-হয়। বহুৎ দূরের পথ। মেলার মধ্যে আমি তোকে খুঁজি, তুই আমাকে…কেউ কাউরে পাই না… পাই না তো পাই-ই না। পরে, এই মেলার মধ্যে ওই যে অর্জুন গাছ, ওইটার তলায় বসে তুই কাঁদছিস আর আ-ব্বা আ-ব্বা…বলে জোরে জোরে ডাক পাড়ছিস। তখন ইল্লৎ হকসেদ- মনে আছে নাকি বাবা, হকসেদের কথা?- মেলার মধ্যে কোত্থেকে-না-কোত্থেকে এসে তোকে দেখে বলে, “কীরে, আব্বা-আব্বা কইয়া ডাক পাড়তাছস, মেলার মধ্যে তো কত আব্বা! ছা-ত্তা-র… ছা-ত্তা-র… কইয়া জোরে জোরে ডাক দে, দেখবি তর বাপ তরতরায়া ঠিকই আয়া পড়বো।” আর তুই বাবা হকসেদের কথামতো আমার নাম ধরে ডাকতে শুরু করেছিস আর আমি পেছন থেকে এসে তোর কান মলে দিয়েছিলাম আচ্ছা ক’রে। হা হা হা… তখন তোর সে কী কান্নামিশানো লজ্জা! মনে পড়ে, মোস্তফা?”

চাঁদনি রাতে হেমন্তের আকাশে দুচারটি হালকা শাদা মেঘের চিলতে। অনেক দূরে দূরে। আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাবা নামিয়ে আনছে সেই মেঘ ছেলের মাথার ওপর। এক তুড়িতে শাদা মেঘকে নীল করছে, ফের নীল মেঘকে লাল বেগনি কমলা…। রঙিন মেঘের ছেঁড়া-ছেঁড়া ছ্যাঁকড়া-ছ্যাঁকড়া অংশ ক্যান্ডি ফ্লসের মতো আটকে থাকছে রাংচিতা ঝোপের ওপর। কিছুটা আটকে থাকল খেসারি-খেতের কাঁটা-কাঁটা কুসুম্বা ঝাড়ের বেড়ার ওপর। আর কিছুটা ছেলের চুলে। প্লাবিত জ্যোৎস্নালোকে খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সওয়ারবিহীন এক জাদুর গালিচা। বাবা তা লাফ দিয়ে ধরে নামিয়ে এনে তার ওপর ছেলেকে উঠিয়ে নিয়েছে। বাতাসের ঢেউয়ে দুলে দুলে গালিচা ভেসে চলেছে বড় পিরের ধাপ থেকে নিতাই ধোপানির পাট…। গালিচা এক্সপ্রেস। ধোপানির পাটে এসে নেমে পড়ল পিতাপুত্র। গালিচা সাঁই করে উড়ে জ্যোৎস্নাকুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল দূরে। ছেলে খুব অবাক হচ্ছে, পুলক বোধ করছে, কিন্তু কেমন-যেন ঠিক যোগাযোগ হচ্ছে না।

ওই যে লম্বা এক তালগাছ, পাশে জিন্না ভাইদের বাড়ি, যুদ্ধের সময় মিলিটারিরা প্রথম এসেই এখানে একই বাড়ির সাত-সাতজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছিল, চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল মহাসন্ত্রাস। পাশেই প্রাচীন এক বৌদ্ধ গুম্ফার ধ্বংসাবশেষ। লোকে বলে, বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর। যুগ-যুগান্তরের ইতিহাস ও কিংবদন্তির ধূলি আর ঘাস জমে জমে রূপান্তরিত হয়েছে বিশাল এক ¯তূপে, ছোটখাটো টিলার মতো। বাবা বলছে, ‘তোর মনে পড়ে, মোস্তফা, একবার পাল্লা দিয়েছিলাম তুই আর আমি, দেখি কে আগে উঠতে পারে ওই টিলার উপর। মনে আছে, মোস্তফা? আমি আগে উঠে পড়েছিলাম। তুই ছোট্ট-ছোট্ট হাত-পা দিয়ে টিলার ঢাল বেয়ে উঠে আসছিস আর কাঁদছিস। হেরে গিয়ে তোর সে-কী রাগ! কাঁদতে কাঁদতেই বলছিলি তুই, “বড় হই আগে, তখন দেখো তোমাকে ঠিক হারায়ে দেবো। বাবা, আজ তুই কত বড় হয়েছিস! আমাকে তো একদম গো-হারা হারায়ে দিয়েছিস রে বাবা। এক্কেবারে মহাজব্দ হয়ে বসে আছি!” বাবার কথা শুনে ছেলের ভালো লাগছে, ছেলে খুশি হচ্ছে, স্মিতমুখ বালকের মতো তাকাচ্ছে বাবার দিকে বারবার, কিন্তু ঠিক যোগাযোগ হচ্ছে না।

ভালো থাকবে, ভালো খাবে, মানুষের মতো মানুষ হবে এই আশায় বুকে পাথর বেঁধে এনজিও-র এক বিদেশিনীর হাতে শিশুপুত্রকে তুলে দিয়েছিল দারিদ্র্যজর্জর বাবা-মা। আর তুলে দেবার পরপরই এক অবাক অচেনা নিঃসঙ্গতা, এক অদ্ভুত বোবা ব্যথায় যারপরনাই কাতর হয়ে পড়েছে বাবা-মা। ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য কত কান্নাকাটি, কত কাকুতিমিনতি…। বিদেশিনী তো পালকপুত্রকে নিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে জার্মানি। অসহায়, পাগলপ্রায় মা-বাবা ঠিকানা জানে না, পথ চেনে না…তবুও উদ্ভ্রান্তের মতো হাহাকার করতে করতে জলাজংলা ঝোপঝাড় কাঁকর কাঁকড়া ক্যাকটাস আর ফাটাফাটা ভূগোল পেরিয়ে ঢাকার জাহাজঘাটা পর্যন্ত চলে এসেছিল, একজনকে হাতেপায়ে ধ’রে। কিন্তু ছেলেকে পেল না অল্পের জন্য। অ্যালুমিনিয়ামের এক বিশাল পাখি তার পেটের মধ্যে ছেলেকে উঠিয়ে নিয়ে উড়ে চলে গেল এক না-ফেরার দেশে, বেশ কিছুক্ষণ আগে। যারা দেখেছে পুত্রহারা মা-বাবার সেই ব্যথাজর্জর কাতরতা, কিছুটা হলেও তারা জানে বেদনার মাত্রা হতে পারে কতটা তীব্র!

সন্তান ক্ষয়ে ঝরে গেলে মনকে তবু প্রবোধ দেওয়া যায়, কিন্তু নিজের দোষে অল্পের জন্য চিরতরে হারানোর ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই। আহা! ছোট্ট আদর-কাড়া মায়া-মায়া চেহারার ছেলেটা মা-মা ব’লে না-জানি কতবার কাতরে উঠেছে, কাঁদতে কাঁদতে পেছন ফিরে তাকিয়েছে কতবার! বিচ্ছেদ ও অনুশোচনার তাপে মা-টা কিছুদিনের মধ্যেই পাথর হয়ে গেল একেবারে। শোকে, তাপে, ভগ্নহৃদয়ের অসুখে কয়েক মাসের মধ্যেই মারা গেল শোকাতুরা মা। হৃদয়ে জখম নিয়ে আধপাগলা হয়ে বেঁচে থাকল বাবা।

তারপর, বহুদিন পর শিকড় খুঁজতে খুঁজতে জার্মান থেকে নানা দেশ ঘুরে উড়ে এসেছে ছেলে। সন্ধানও পেয়েছে তার আকাক্সিক্ষত ছেঁড়া শিকড়বাকড়ের। পেয়েছে বাবাকে, কিন্তু পায়নি মাকে। ছেলে আজ বড় হয়েছে, ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়েছে। কিন্তু বাবায় ছেলেতে যোগাযোগে গোলযোগ! মর্মে-মর্মে পুড়ে যাচ্ছে বাবা, হয়তো ছেলেটাও…

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site