Showing posts with label কথাসাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label কথাসাহিত্য. Show all posts

Wednesday, October 19, 2011

সেদিন তুষার ঝরেছিল

by ইমতিয়ার শামীম

শহীদুল জহিরের মৃত্যুর পরপরই কোনও কিছু লেখার বেলায় আমার ব্যক্তিগত সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই হলো, তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি পরিচয় ছিল না। দশকওয়ারি সাহিত্যবিভাজনে বিশ্বাসী সম্পাদক ও
sj1.jpg…….
শহীদুল জহির
…….
আলোচকরা যাদের গায়ে আশির দশকের ছাপ লাগিয়েছিলেন, শহীদুল জহিরসহ আমাদের অনেকের গায়েই সেই ছাপ এতদিনে সুস্পষ্টভাবে বসে গেছে অনেকটা জন্মদাগের মতো। আক্ষরিক জন্মের কথা ধরলে তিনি আমার একযুগ আগে পৃথিবীতে এসেছেন। তবু এখন সম্পাদক ও আলোচকদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি,–তাঁরা আমাদের একই সময়ের বৃত্তে আবদ্ধ করেছেন জন্যে। আশির দশকের উল্লেখযোগ্য সব লেখকের সঙ্গেই ধীরে ধীরে আমার পরিচয় হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু শহীদুল জহির। তাঁকে আমি মুখোমুখি দেখি নি। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় নি।

কালাকালের অর্থে এই দেখা হওয়া না-হওয়া অবশ্য কোনও বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষ যখন বেদনার্ত হয় তখন মহাকালের কথা ভাবে না। মৃত্যুগন্ধী সময়ের আবেগই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। এ জন্যেই হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটির কথা বলতে গিয়ে হয়তো ব্যক্তিটির সঙ্গে স্মৃতিচারকের স্মৃতিগুলিই বড় হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না তা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটিকে অবলম্বন করে নিজেকেই বড় করে তোলার মতো না হয় ততক্ষণ তা দৃষ্টিকটূও নয়। সত্যিকার অর্থে মানুষটির প্রতি ব্যক্তিগত মুগ্ধতা ছাড়া এইসব সময়ে অন্য কোনও বয়ান খুব বেশি প্রীতিকর মনে হয় না। অথচ তেমন কোনও সঞ্চয়ই নেই আমার, যা দিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত হতে পারি।

তারপরও কোনও না কোনওভাবে তিনি আমার ব্যক্তিগত আত্মার সঙ্গী। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর পাঠক এবং আমরা একই সময়ের মানুষ। কারণ যে জনপদ আর মানুষগুলো তাঁর জনপ্রিয় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে বেড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে বেশ ক’টি ছোটগল্পে, কাকতালীয়ভাবে হলেও তাঁর মতো আমিও সেই জনপদের মানুষ। তাঁর মতো আমারও পিতার ভিটে সিরাজগঞ্জ জেলাতে। তাঁর রায়গঞ্জ আমার চেনা জায়গা, চেনা ওই গোপন রাজনীতির ক্ষত ও ক্ষতি। ‘ক্ষত যত ক্ষতি তত’ এই সত্যেরই তো মুখোমুখি করেন তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে। আমরা আমাদের শৈশব কৈশোরের দিনগুলোয় জনপদের সেই ক্ষত ও ক্ষতিকে দেখেছি রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে, অশ্রুপাতের মধ্যে দিয়ে। এমনকি যখন আমরা প্রায়উন্মূল হয়েছি সিরাজগঞ্জ থেকে এবং বিশেষত সিরাজগঞ্জ শহরবাসী কারও টেলিফোন পেলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি কারও মৃত্যু অথবা দুর্ঘটনার খবর পেতে, এই ক্ষত ও ক্ষতি তখন আরও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়েছে। যেমন, এক সকালে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে আমি জানতে পারি ফিরোজ মাস্টার খুন হয়েছেন। ফিরোজ মাস্টার ছিলেন সিরাজগঞ্জ জনপদে গোপন রাজনীতির এক কিংবদন্তি। গোপন রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে তিনি তখন একটি ডানপন্থী দলে যোগ দিয়ে নির্জন জীবনযাপনের পথ বেঁছে নিয়েছেন। প্রতিদিন রাতে খাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হন এবং হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি কালভার্টের ওপর গিয়ে কিছুক্ষণ একা একা বসে থাকেন। এক রাতে তিনি হাঁটতে বেরিয়ে আর ফিরে আসেন না। তাঁকে উদ্ধার করা হয় নিহত অবস্থায়।

আরও একদিন গভীর রাতে খবর এলো, ভয়ানক এক গাড়িদুর্ঘটনা ঘটেছে বগুড়া মহাসড়কে। নিহত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও একদা গণবাহিনীর সংগঠক মির্জা আবদুল আজিজ ও ম. মামুন। গুরুতর আহত আরেকজন গণবাহিনীর সংগঠক ও জাসদ নেতা আবদুল হাই। ম. মামুন ছিলেন গোপন রাজনীতির কালে ফিরোজ মাস্টারের প্রিয় অনুসারী। যৌবনে কামারখন্দে দিনেদুপুরে এক পুলিশ অফিসার হত্যার দায়ে ম. মামুন অভিযুক্ত হয়েছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যুক্ত হন স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাতে।

দূর থেকে এরকম যত মৃত্যুর খবর পেয়েছি কিংবদন্তিময় একটি সময়ের একেক সংগঠকের ততবারই কেন জানি মনে পড়েছে সে রাতে পূর্ণিমা ছিলর কথা। বললে হয়তো বিশ্বাস হবে না–কিন্তু ওই জনপদের অধিবাসী আমরা জানি, রায়গঞ্জ-কামারখন্দ-জামতৈল জনপদের কোনও কোনও এলাকার চেয়ারম্যান হওয়ার মানে জেনেশুনে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। অথচ সেই মৃত্যুর মোহে প্রতিবারই কেউ না কেউ নির্বাচন করে, চেয়ারম্যান হয় এবং কোনও এক রাতে অথবা দিনে খুন হয়ে যায়।

এও এক জাদুবাস্তবতাই বটে!

দুই.
ক্ষত ও ক্ষতি নিয়ে এইভাবে আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে প্রায়উন্মূল হয়েছি, প্রায় সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছি সিরাজগঞ্জের সঙ্গে, পৃথিবীমুখী হয়েছি তারপর আমাদের প্রিয় মার্কেজের বুয়েন্দিয়ার মতো। মাকের্জের উপন্যাস শত বছরের নির্জনতায় গভীর এক ক্রান্তিকালীন সময় আছে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সেখানে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আবারও দূর অভিযানে বের হওয়ার। কিন্তু তার স্ত্রী উরসুলা কিছুতেই রাজি হয় না বসতি ত্যাগ করতে। বুয়েন্দিয়া তাকে বলে, দূরঅভিযানে যেতে তার কোনও অসুবিধাই নেই, কেননা ‘এখনও এখানে আমাদের কেউ মারা যায় নি। মরে মাটির তলায় আত্মীয় কেউ না শোয়া পর্যন্ত কোনও জায়গায় কারও অধিকার বা প্রেম জন্মায় না।’ সে কথা শুনে তার বউ উরসুলা শান্ত কঠিন কণ্ঠে বলে, ‘তা হলে আমি এখানেই মরব, যাতে তোমরা সবাই এখানেই থাকো।’ মানুষের মাটি, স্বদেশ ও বসতি গড়ে ওঠে এরকম সব বুয়েন্দিয়ার আত্মার শোক দিয়ে, এরকম সব উরসুলার হৃদয়ের শোক দিয়ে। শহীদুল জহিরের গ্রামের বাড়ি ছিল রায়গঞ্জে, কিন্তু তিনি জন্ম নিয়েছিলেন পুরানো ঢাকায়। নিজের এক বসতি তিনি স্থাপন করতে চেয়েছেন তাঁর সব গল্পউপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। সেইখানে কখনও তরমুজের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, ডালপুরিভাসা তেল টগবগিয়ে ফোটে, ইঁদুর ও বিড়াল খেলা করে, আবদুল করিম বারবার কাচের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখে, পাতকুয়ায় সুবোধ চন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না বারবার পড়ে যায়। কখনও আবার তিনি যেন বা জেনেশুনেই সংখ্যালঘু হয়ে যান, বিচ্ছিন্নতার বদলে ডুবে যান সংখ্যালঘুতার বিপন্নতায়। বিবিধ অঞ্চল ও আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি অবলম্বন করেছেন বিভিন্ন গল্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের উপস্থাপনস্বর।

আমাদের সেই জনপদের একঘেয়ে মুথা ও মেঠো সমতল, খরখরে গ্রীষ্মের দাবদাহ সঞ্চয় করে রাখা প্রায়উৎপাটিত নিঃসঙ্গ বটগাছ, আঁকাবাঁকা মেঠোরাস্তা, অথবা বর্ষায় ডুবে যাওয়া রুপালি আকাশ, কর্দমাক্ত রাস্তা এবং একজন চেয়ারম্যান খুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুন হওয়ার জন্যে প্রস্তুত আরও সব হবু চেয়ারম্যান, এসব কিছুই শহীদুল জহির একে একে কব্জা করে নিয়েছিলেন। তাঁর মতো আর কেউ জানে নি, এইসব জনপদ ও মানুষের গল্প সত্যিই গল্প মনে হয়। আমাদের গ্রামগুলোর মানুষের গল্প, জীবন, হতাশা, সংগ্রাম আর যৌনতাও এত বিচিত্র যে এই আমিও যখন তা এমনকি সিরাজগঞ্জেরই কাউকে শুনাই, শুনতে শুনতে তারা বলে, এইসব আজগুবি গল্প কোনখানে পাই’ছো? সলপের গল্প, না? ভেবে দেখুন, ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত একজন মানুষ দণ্ডিত হওয়ার পর্যায় এড়াতে গ্রামের সালিশে অজ্ঞান হয়ে গেল। কিছুতেই তার সংজ্ঞা আর ফিরিয়ে আনাই যাচ্ছে না। দাঁতের মধ্যে চামচ ঢুকিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে তাকে পানি খাওয়ানোর। কিন্তু সে পণ করেছে কিছুতেই কিছু খাবে না। হঠাৎ একজন কী মনে করে একগ্লাস দুধ এনে ঠোঁটের ওপর রাখতেই অজ্ঞান মানুষটা গরুর দুধের ঘ্রাণ পেয়ে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার যাবতীয় আশঙ্কা ভুলে ঢক ঢক করে তা গিলে ফেলল। আবার এই মানুষটিই যখন প্রবীণ আর স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত, একদিন হঠাৎ তার পাড়াপড়শিদের সম্পর্কে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই যে ট্রেনে চড়ল, নিজের এলাকার নাম মনে না থাকায় সে আর পারল না নিজের বাড়িতেও ফিরে আসতে। গ্রামের মানুষদের কাছে সে বেঁচে রইল নিরুদ্দেশ এক গ্রামবাসী হিসেবে। কেউ আবার বুড়ো হয়ে গেল প্রচণ্ড বর্ষার সময় বোয়াল মাছের গ্রাসে অণ্ডকোষ হারানোর স্মৃতি নিয়ে। আবার যুদ্ধ যখন চলছে, তখন এমন একজন মানুষকে পাওয়া গেল, যে মৃত, অর্ধমৃত সব খানসেনা আর রাজাকারদের লিঙ্গ কেটে একটি টুকরিতে জমা করত। জালিম খানসেনা আর তার দোসরদের জন্মক্ষমতাই সে নষ্ট করে দেবে, এই তার একমাত্র আকাক্সক্ষা।

এরকম এক জনপদ যেখানে আছে সেখানে শুধুমাত্র জাদুবাস্তবতা দিয়ে শহীদুল জহিরকে বিচার করতে যাওয়া এক অর্থে তার প্রতি অবিচার করা। আমি অবশ্য তাঁর পাঠক হই অনেক পরে। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে। মারুফ রায়হানের আগ্রহে মাটি পত্রিকার গল্পসংখ্যায় শহীদুল জহির লেখেন ‘আমাদের কুটিরশিল্প’, আমি লিখি ‘বালকের বামহাত’। ততদিনে তিনি জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা লিখে সুপরিচিত। কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল গল্পপাঠক হওয়ার মাধ্যমে। তাঁর লেখার শক্তিমত্তা নিয়ে আমার কোনও সংশয় ছিল না, এখনও নেই; কিন্তু তাকে ‘জাদুবাস্তবতা’র ঘেরটোপে বন্দি করতে আমি বরাবরই দ্বিধান্বিত হয়েছি। অনেক পরে বাংলাপিডিয়াতে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য পাই তাঁর সম্পর্কে, সেটিকেই বরং অনেক ঠিক মনে হয়। তাঁর লেখার অন্যতর একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সেখানটাতে, বলা হয়েছে শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিলতে প্রকাশ পেয়েছে বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম।

এর মধ্যে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ বছর পার হয়েছে গত বছর। আমাদের বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে যে রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি হয় এবং ক্রমাগত যা ধর্মাশ্রয়ী বিশ্বরাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিকৃত গণতন্ত্রচর্চার ধারা গড়ে তোলে, কবিতায় এই পরিস্থিতির একটি মনোজগত ও সংঘবদ্ধ ছায়া পড়ে শামসুর রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বইটিতে। কয়েক বছরের মধ্যেই সৈয়দ শামসুল হক লেখেন স্মৃতিমেধ নামের উপন্যাস, যাতে স্বাধীনতার দশ বছর পর শহীদ এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জিনাত এক রাজাকারকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে সবাইকে অস্থির করে তোলে। বিস্মিত, আহত ও ক্রুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা দেবর মুখোমুখি হয় তার ভাবি জিনাতের। আর জিনাত নিজেই নিজেকে অপমানিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জাগিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেন এই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে, তোরা রাজাকারকে মন্ত্রী বানাতে পারিস, আমি পারি না স্বামী বানাতে? এই উপন্যাস পত্রিকায় ছাপা হওয়ারও বছরপাঁচেক পর ১৯৮৭-তে আমাদের হাতে আসে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। যাকে অনেকেই প্রথমে প্রবন্ধের বই মনে করে হাতে নেন, তারপর ‘ও’ বলে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। এ বইটি থেকেই মূলত শহীদুল জহিরকে জাদুবাস্তবতার লেখক হিসেবে অভিহিত করা হতে থাকে। যদিও দর্শন হিসেবে জাদুবাস্তবতার চেয়ে অস্তিত্ববাদই এতে অনেক বেশি প্রকাশিত হয়েছে।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনী লতিয়ে ওঠে ১৯৮৫ সালে, ঢাকার লক্ষীবাজার লেনে। এ কাহিনী প্রকৃতার্থে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পথপরিক্রমার কাহিনী, যে রাজনীতি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর লুপ্ত হয়েছিল, ১৯৭৫-এর পর আবার ফিরে এসেছে মহাসমারোহে। যুদ্ধাপরাধী, যে প্রত্যয়টি ব্যবহারে ইদানিং আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, এক অর্থে তা অনেক বেশি নিরীহ। কেননা এই প্রত্যয়টি কেবল যুদ্ধের অপরাধকেই উচ্চকিত করে, ধর্মীয় রাজনীতির নিষ্ঠুরতা এ প্রত্যয়ে ঢাকা পড়ে যায়। অথচ একাত্তরের স্মৃতি, যন্ত্রণা ও অভিজ্ঞান থেকে আমাদের কাছে ধর্মীয় রাজনীতি যুদ্ধাপরাধের সমার্থক। রাজাকার, আলবদর বা আলশামস প্রত্যয়গুলির প্রয়োগ বরং তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক ইতিহাসচেতনাজাত। যাই হোক, এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তারপরও মনে পড়ল, কারণ শহীদুল জহিরের এ উপন্যাসে বদু মওলানা খানসেনাদের দোসর, যে একাত্তরে মানুষকে চাপাতি দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে তার বাড়ির ছাদ থেকে জনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই বদু মওলানারই ছেলে আবুল খায়ের তার পিতার চেতনাসমেত মহাসমারোহে ফিরে আসে লক্ষীবাজার লেনে। সে আবিষ্কার করে মেয়ের নাম মোমেনা রাখার মধ্যে দিয়ে এই মহল্লার এক অর্বাচীন প্রকারান্তরে তার প্রতি, তার আদর্শের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। কেননা একাত্তরে ওই অর্বাচীনের বোন মোমেনাকেই তো তারা ধর্ষণ করেছিল। তার মানে একাত্তরকে এ বান্দা ভুলে যায় নি। আবদুল মজিদ,–সে আবুল খায়েরকে ভাষণ দিতে দেখে এবং দ্বিধান্বিত হয় এবং দ্বিধার এই জগত ক্রমশ বাড়তে থাকে। তার এই দ্বিধাকে আরও স্থায়ী করে এলাকাবাসী,–যারা বদু মওলানার ভয়ে ভীত–নিজেদের বাড়ি থেকে উৎপাটিত হওয়ার ও নির্যাতিত হওয়ার কিংবা আবারও চাপাতির কোপে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার ভয়ে যাদের পক্ষে সম্ভব নয় আর জেগে ওঠা। সৈয়দ হকের স্মৃতিমেধ-এর সঙ্গে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনীর একটি শ্রেণিরূপ তফাৎ সুস্পষ্ট। স্মৃতিমেধ-এ পুরুষেরা, মধ্যবিত্ত পুরুষেরা, তাদের ওপর, তাদের নারীদের ওপর খানসেনা ও তাদের দোসরদের ধর্ষণ-নির্যাতন ভুলে গিয়ে একই শ্রেণীতে লীন হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত নারীটিকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে হচ্ছে নিজের ইতিহাসগত অস্তিত্ব। আর শহীদুল জহিরের উপন্যাসে নিম্নধ্যবিত্ত পুরুষ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে তার আত্মার নিগড়ে বাধা এক নারীর স্মৃতিকে ঘিরে নতুন এক নারীর উদ্বোধনের মাধ্যমে।

শহীদুল জহিরের দ্বিতীয় উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিলও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ের গল্প। অবক্ষয়িত সময়, গুপ্ত সব হত্যাকাণ্ড এসব এখানে শান্ত সমাহিত পূর্ণিমা রাতের নিচে। গোপন রাজনীতিতে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে বুর্জোয়া ও সাম্যবাদী উভয় রাজনৈতিক শক্তিরই ধর্মীয় রাজনীতির কাছে পরাস্ত হওয়ার আখ্যান তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে এতে। সপরিবারে একটি হিন্দুপরিবারকে হত্যা করার অভিজ্ঞতাকে মূলসূত্র ধরে শহীদুল জহির এ ঘটনাকে নিজের সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে উন্নীত করেন এমন এক অভিজ্ঞানে, যার ফলে খুব সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন এটি আসলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার রূপক উপাখ্যান। বন্যার স্রোতের মতো বাক্যের পর বাক্য বেরিয়ে আসে এ উপন্যাসে, প্রায়ই আমাদের মনে থাকে না কে এ সব বাক্যের কথক, লেখক নিজে নাকি কোনও চরিত্র, নাকি কোনও প্রতিচরিত্র। চাঁদের অমাবস্যা বিভ্রমও রয়েছে একইসঙ্গে। শহীদুল জহিরের আলোচকরা বিশেষত এ উপন্যাসটিকেই জাদুবাস্তবতার প্রামাণ্য বই হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।

আমার মনে হয়, জাদুবাস্তবতার যোগ যতটুকুই থাক না কেন, শহীদুল জহিরের সাহিত্য আলোচনার জন্যে এ প্রত্যয়টি যথেষ্ট নয়। ২০০৫-এ বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তবতাসংক্রান্ত এক লেখায়ও প্রসঙ্গক্রমে আমি লিখেছিলাম, “এইসব ছাপ ছাড়াও শহীদুল জহির টিকে থাকতে পারেন, তাঁর কথাসাহিত্যের একটি উপসংহার তৈরি করতে পারেন।” এ ছাড়াও লিখেছিলাম, ‘‘যে জন্যে তাঁর লেখার প্রতি আমাদের মনযোগ ও মোহাচ্ছন্নতা তৈরি হয় তা হলো লোকজ উপাদান, ভূগোলের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ এবং একই প্রসঙ্গে ঘুরপাক খাওয়ার মতো গ্রামীণ (গ্রাম্য নয়) ভাষাভঙ্গি। বিশেষত এই ভাষাভঙ্গির কারণে নগরের কাহিনীতে প্রবেশ করার পরও শহীদুল জহির পাঠকের কাছে স্বস্তিকর মনে হয়, কেননা আমরা আসলে নিজেদের মধ্যে পরিক্রমণ করতেই ভালবাসি এবং এই ভাষাভঙ্গি পুনরাবৃত্তির মধ্যে দিয়ে অপার এক দুলুনি তৈরি করে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ইতিহাসবোধের প্রতি উপেক্ষা অথবা অমনোযোগ শহীদুল জহিরের লেখা ও অনুভূতির বিস্তৃতিকে সীমিত করে ফেলতে পারে, যা আমরা বিশেষ করে তাঁর সব উপন্যাসেই লক্ষ্য করি। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে আমরা একটি জাতির জাদুবাস্তবতাময় ক্রান্তিকাল খুঁজে পাই বটে, কিন্তু তা কি আমাদের মধ্যে সেই জাতির হাজার বছরের মিশে যাওয়া ইতিহাসবোধের ক্ষরণ ঘটাতে পারে? না কি আমরা হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থেমে গিয়ে সীমিত এক পরিসরেই আনন্দিত হতে থাকি?’’ তাঁর মুগ্ধ পাঠকদের দলে থেকেও এ রকম একটি মন্তব্য করায় তিনি কী মনে করেছিলেন, সেটি আমার আর কোনওদিনই জানা হবে না।

তিন.
মৃত্যুগন্ধী এই সময়ে পুরানো ওই অনুভূতিটুকু আবারও উল্লেখ করছি শুধু এ কারণেই যে অপরিচয়ের বদলে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাই যৌক্তিক ছিল আমার চিন্তাগুলোকে আরও পরিণত করতে। যদি আমার তাঁর সঙ্গে পরিচয় হতো, যদি আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলতাম, তা হলে নিশ্চয়ই তাঁর লেখার এরকম সব দিকই হতো তাঁর ও আমার আলোচনার বিষয়। এখন তাঁর সঙ্গে আর কারোরই দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও কবি সমুদ্র গুপ্তের সঙ্গে যতবার দেখা হবে ততবারই আরও বেশি করে আমার মনে হবে তাঁর কথা এবং হয়তো আনমনে চেষ্টা করব একই বংশোদ্ভূত দুজনের চেহারার মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উদ্ঘাটনের।

এমন হয়েছে, কয়েকবারই আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আমাদের বন্ধু গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা ফয়জুল ইসলামের কারণে। আমি আগ্রহী হয়েছি সেই মানুষটিকে দেখতে, যার বিছানা বরাবর একটি টিভি এমনভাবে প্রতিস্থাপন করা যাতে মানুষটি শুয়ে থেকেও আরাম করে রিমোট ঘুরিয়ে টিভি দেখতে পারে। তাঁর সম্পর্কে ওপরের স্পর্শকাতর বিভিন্ন সব বাক্য লেখার ও ছাপানোর পর আমি তাঁকে আমার তখনকার সর্বশেষ বইটি (মাৎস্যন্যায়ের বাকপ্রতিমা) পাঠাই পাঠ করতে। এবং কয়েকদিন পরে উত্তেজিত কিংবা নিরুত্তেজিত ফয়জুল ইসলাম আমাকে বলে, ‘স্যার তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।’ এই বলাবলি বেশ কয়েকবার ঘটে, আবদুল করিমের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখার মতো। কখনও আমি হাসি, ‘যেতে তো হবেই, আপনি ওনাকে স্যার বলেন, আর আমি তাকে ভাই বলব। আপনি কীভাবে স্যার বলেন সেটা তো আমাকে দেখতে হবে।’ কখনও ফয়জুল আমাকে শোনায়, শহীদুল জহির কার কার লেখার প্রশংসা করেছেন। শুনতে শুনতে বলি, ‘বড় লেখকরা সব সময়েই প্রশংসা করেন। এমনকি খারাপ লেখকদের লেখায়ও মহৎ উপাদান খুঁজে পান। উত্তেজিত হবেন না, ধৈর্য হারাবেন না।’ আসলে যদি আমাদের যাওয়া হতো তা হলে কী নিয়ে কথা বলতাম আমরা? এই জাদুবাস্তবতার ঘোর? অথবা অস্তিত্ববাদ? অথবা বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম? অথবা এসব কিছুই নয়! আমরা কথা বলতাম দুর্ধর্ষ নকশালী ইসমাইলকে নিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা যে সবসময় মাথায় বেধে রাখত মাথায় যুদ্ধকালে আর স্বাধীন সিরাজগঞ্জ শহরে প্রথম প্রবেশ করেছিল যার বাহিনী। অথচ পরে যে পুরো বাহিনীই খুন হয়ে গেল নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে! হয়তো কথা বলতাম ফিরোজ মাস্টারকে নিয়ে, গণবাহিনী নিয়ে, গোপন রাজনীতি নিয়ে, ধর্মজ রাজনীতির হিংস্র কদর্য মানুষগুলিকে হত্যা না করে কেন গোপন রাজনীতির মানুষগুলো কেবল নিজেদের মধ্যেই হানাহানি করেছে সেসব নিয়ে। আর মুক্তিযুদ্ধ,–সে কথাও নিশ্চয়ই উঠত। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দুর্বলতার কথা কে না জানে! আর এই জন্যে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পোস্টিং দিলে তিনি বিব্রতও হয়েছিলেন ভীষণরকম।

প্রবাদ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত, নিজেকে শহীদুল জহির সরিয়ে রেখেছিলেন আর সব লেখক থেকে অনেক দূরে। কিন্তু মানুষ থেকেও কি? যাকে তাঁর একাকীত্ব ও নির্জনতা বলছি তাকে কি আমরা ব্যাখ্যা করব শুধু লেখকদের আড্ডায় তাঁর অনুপস্থিতির তত্ত্ব দিয়ে? রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করতে করতে তিনি কি শুনতেন না মানুষের কথা? এই যে এত মানুষ, এত চরিত্র, এত অঞ্চলভাষা তা তিনি পেলেন কোথা থেকে? বেশ কয়েক বছর আগে কথা পত্রিকায় কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের নেয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। উত্তর দেয়ার ভাষাভঙ্গি থেকে মনে হয়েছিল, মানুষ থেকে তিনি যত নির্জনে ছিলেন বলে শোনা যায় তত নির্জনে ছিলেন না সম্ভবত। মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন এবং এই দূরত্বই তাঁকে এ ছাপ এঁটে দিয়েছে। কেননা লেখক হিসেবে মিডিয়ার প্রতি অনেকের যে দাসত্ব রয়েছে, শহীদুল জহিরের দাসত্বহীনতা সে ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়, অনুকরণীয়। দাসত্বের গ্লানি ঢাকার জন্যে তাঁকে তাই ঠেলে দেয়া হয়েছে নির্জনতার প্রকোষ্ঠে।

শহীদুল জহিরের কাছে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না, কেননা মোটা দাগে বলতে গেলে ফয়জুল ইসলামের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ কমে এসেছিল। কেন, সেটা খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে দূরত্বও অনেক দূরত্ব কমিয়ে আনে। ফয়জুলই আমাকে তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানালেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। আমি সেই মৃত্যুর দৃশ্যকল্পের অনেকটাই অনুমান করতে পারলাম, কেননা আমি নিজেও দীর্ঘকাল একা থাকতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম, একজন মানুষ ভর দুপুরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। মুগ্ধ পাঠকদের কেউ কাছে নেই, পদাধিকার বলে অনেক ক্ষমতা থাকলেও সেই সময় ‘জ্বি স্যার’ বলার মতো কেউই তাঁর কাছে নেই। তিনি অনেক কষ্টে সিড়ি ভেঙে ভেঙে নামতে নামতে একসময় নোংরা সিঁড়িতেই বসে পড়লেন। দুপুরের উজ্জ্বল আলো পৃথিবীর সবখানে। ইস্কাটনের ওইসব সরকারি বাসাগুলো দেখার ভাগ্য আমাদের অনেকেরই আছে। তিনি তাঁর অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা করছেন চারপাশের উজ্জ্বল আলোর কাছে। চেষ্টা করছেন বসন্তের বাতাস টেনে নিতে অবাধ্য বুকের ভেতর। অপেক্ষা করছেন নিজস্ব এক জাদুবাস্তবতার। টেলিফোন করছেন বোনের ছেলের কাছে। কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের কানে রিংটোন খুব সহজে পৌঁছায় না, তা সে যত আপনই হোক না কেন। কেউ তার কোনও কাজে আসে নি, কেবল তাকে মানুষ ভেবে হঠাৎ করেই তাকে দেখে ছুটে এসেছে ‘সামান্য’ এক কাজের মানুষ। সে তাকে রিকশায় করে হলি ফ্যামিলিতে পৌঁছে দিয়েছে। তারপর ডাক্তারদের প্রসঙ্গ না হয় থাক। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর অনেক নিঃসঙ্গতা ও মহীয়ানতার সন্ধান পেয়েছি, তিনি তাই নিয়ে বেঁচে থাকুন এই পৃথিবীতে।

চার.
ইংল্যান্ডে তুষার পড়লেও লন্ডনে তুষারপাত বিরল এক ঘটনা। গত গুড ফ্রাইডে’তে হঠাৎ করেই ঘোষণা আসে, আগামীকাল থেকে তুষার পড়তে পারে। ওই রাতে আমি অনেকদিন পর সিগারেট কিনি আসন্ন হিমের আশঙ্কায়। শনিবার সকালে দেখি, সত্যিই এই মার্চের মধ্যে, যখন সামার খুব কাছে চলে এসেছে, ঝির ঝির করে তুষার পড়ছে আকাশ থেকে। পরদিন রবিবার, সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে আর তখনও আমি শুয়ে, স্ত্রী বাইরে থেকে টেলিফোন করে আমাকে আবারও তুষারপাতের খবর জানায়। আমি ওঠার পর জানালা খুলে মুখে একটু বরফ মেখে অভ্যাসবশত ই-মেইল চেক করতে বসি এবং ইনবক্সের প্রথমেই চোখ আটকে যায় ফয়জুল ইসলামের চিঠিটিতে : ‘শহীদুল জহির হ্যাজ ডায়েজ টুডে: লাইফ ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান ডেথ।’ আমার চ্যাটিংবক্সে লালবৃত্ত জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ সেই লাল বৃত্ত পেরিয়ে একই মেসেজ দেয়। আমি এইসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াই।

দেখি সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করে আমার প্রিয় বাংলাদেশের কার্পাস তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা শাদা শাদা নৃত্যরতা তুষার ঝরে পড়ছে, গলে পড়ছে জানালার কাচে, রাস্তার ওপরে, লাইটপোস্টের গায়ে, ওক আর চেরিনাস্ট গাছের গায়ে। মনে হচ্ছে, যে প্রকৃতি এতদিন নীরবে তার সঙ্গী ছিল সেই প্রকৃতি আজ ভেঙে পড়ছে শহীদুল জহিরের শোকে। এই কদিন আগেই এক প্রিয় মানুষকে আমি লিখেছিলাম, মানুষকে বা হাতের উল্টো পিঠে কান্না মুছে হাসি আনতে হয়। আজ আমিও সেই চেষ্টা করি, কাঁপা কাঁপা হাতে তুষারের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে সিগারেট জ্বালানোর চেষ্টা করি, মনে মনে বলি, যিশু চলে গেছেন, যিশু তুষারে ঢেকে যাচ্ছেন।

original post

read more

নূহের নৌকায় শহীদুল জহির (১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩ - ২৩ মার্চ, ২০০৮)

by নাসিমা সেলিম অলীক

cbazaraug1986.jpg…….
কক্সবাজারে, ১৯৮৬ সালে
……..
ঢাকা শহর থেকে দূরে থাকলে বোঝা যায় একটি হাইজ্যাকার অধ্যূষিত, কাকের-সংখ্যা-বেড়ে-যাওয়া ও কবির-সংখ্যা-কমে-যাওয়া নগরীর মায়া কাটানো কেন কঠিন। বা, প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে অন্য একটি মহানগরে থাকতে হয় বিধায় আমি ঢাকার আওয়াজ অদৃশ্যে শুনতে পাই, এবং সেই ধুনেই ‘পূর্ব’ বাংলার গান গাই। নানা খবর বাতাসে কানাকানি করে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকা সহ গোটা বাংলাদেশ বিষয়ে কিছু স্বদেশী আর কয়েকটা বিদেশী কাগজ পড়ে জানতে পারি মানে জানাই ছিল; হঠাৎ আল-গোরের ‘একটি অস্বস্তিকর সত্যি কথা’ শুনে আবারও মনে পড়ে–বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা আগামী কুড়ি বছরে ডুবে যেতে পারে, এবং এটা নাকি প্রায় সম্ভব। তাহলে আমরা যারা বিদেশে যেতে পারি নাই বা চাই নাই, তারা কোথায় যাব। এমন কি হতে পারে যে আমরা এই দেশেই কোনোমতে ঠাঁই খুঁজে নেব বা কেউ কেউ অধিক হারে উদ্বাস্তু হব ভারত বা অধিকতর ‘উন্নত’ কোনো দেশে আমাদের রিফ্যুজি কলোনি হবে? এই বিরাট ভরাডুবির ফলে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল সংখ্যক জনগণ উত্তর-পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের অপরের কাছে জমির ভাগ চাইবে, নতুন করে বাসা বাঁধবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? সেক্ষেত্রে আমার একটা জরুরি প্রশ্ন আছে: যদি এমন ঘটে এবং তখনও আমাকে বেঁচে থাকতে হয় এই দেশে বা অন্য কোথাও, তবে আমি সঙ্গে কী নেব? কী ফেলে যাব, আর কী রাখব মনে–জীবনে? সেই বিষয়ে আজকে ভাবনা করতে চাই।

২৩শে মার্চ দুপুর বেলা বন্ধু প্রকাশক ঢাকা থেকে ফোন করে মৃদু স্বরে একবার বলেছিলেন: শহীদুল জহির ভোর রাতে মারা গেছেন। তারপর দুবার বা তিনবার তিনি আরও বিস্তারিত কী বললেন। আমি শুধু বুঝতে পারলাম, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক ডুবে গেলে যদি কোথাও চলে যেতে হয়, শহীদুল জহির সমগ্রটাই নিতে হবে সঙ্গে। আর কেউ বা আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, শহীদুল জহিরের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত পুস্তকের অস্তিত্ব জরুরি। কিন্তু দেশ ডুবলে বইগুলিও তো ডুববে, প্রকাশনা সংস্থা দেউলিয়া হবে, পাঠক পড়া ছাড়বে, লেখক হারাবে তার লেখার কলম-কম্প্যুটার অথবা লেখার সময়। মহাবিপদসংকেত জারী হলে নূহ নবী কি আর ফিরে আসবেন আমাদের প্রাণ বাঁচাতে? সেটা আমরা জানি না। তবে সেইসব মহান দুর্যোগের দিনে রূপক ও বাস্তব দুই অর্থেই নূহ নবীর নৌকা ছাড়া উপায় কী? এবং বইয়ের পাতা পানিতে ভাসলে সমকালীন বাংলাদেশী সাহিত্য থেকে যদি কিছু কিছু রক্ষা করতেই হয়, তো তাদের মধ্যে শহীদুল জহিরের গ্রন্থগুলি থাকবে–এই আমার দাবি (বা আবদার)। আশা করি আরও কয়েকজন পাঠক আমার লাইনেই বলবেন। ধারণা করি, যেহেতু জহির সদ্যমৃত তাই তার সম্মানার্থে যারা তাঁর লেখা অপছন্দ করতেন, তারাও এই নিয়ে খুব ঝগড়া করবেন না। অতএব আমি ফাঁদতেই পারি আজকের কাহিনী: নূহের নৌকায় শহীদুল জহির।

যারা শহীদুল জহিরের লেখা ভালোবাসত, তারা অন্যদের বোঝাবে কেন তাঁর লেখা ভালো। তাঁর লেখা সব গল্প বা উপন্যাস পড়তে মজা নাও লাগতে পারে, কিন্তু তিনি খারাপ লিখতেন একথা তাঁর শত্র“রাও বলবে না। আর তাঁর বন্ধুরা আপত্তি করবে, কেন তিনি এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন (বা, চলে যেতে বাধ্য হলেন)। তারা অনুযোগ করবে: হৃদযন্ত্রের আরেকটু যত্ন নিলে পারতেন। যদি ঠিক করে ওষুধ খেতেন, আরও কয়েক বছর বাঁচতেন যদি, যদি আরও ভালো লিখতেন! পঞ্চান্ন বছর বয়স কি খুব বেশি বেঁচে থাকার জন্য? ১৯৫৩ সালের পর থেকে সিরাজগঞ্জ আর তারপর ঢাকায় নারিন্দার ভূতের গলির সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ যোগ, আমরা বলছি না তিনি ইস্কাটন গার্ডেনে তাঁর সরকারী বাসভবনে, তারপর অবসর নিয়ে আর কোথাও, হয়তো নারিন্দার ভূতের গলিতেই নিরানব্বই বছর বেঁচে থাকুন, অথবা চলৎশক্তিরহিত হয়ে পড়ে থাকুন শুধু। কারণ, আমরা যারা তাঁর পাঠক বন্ধু, আমরা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত নই, হতে চাই নি, হতামও না। আমাদের আগ্রহ ছিল এবং আছে তাঁর লেখার যাদুতে। অতএব, যখন–২০০৬ সালে মাওলা ব্রাদার্স ছাপায় তাঁর শেষ উপন্যাস মুখের দিকে দেখি, আর তার পরের বছর বইমেলায় পাঠক ‘সমাবেশ’ প্রকাশ করে শহীদুল জহির নির্বাচিত উপন্যাস এবং শহীদুল জহির নির্বাচিত গল্প–আমরা তাকিয়ে ছিলাম, অন্তত আরও আট-দশ-পনের বছর তিনি লিখবেন ও ছাপাবেন। এই আগ্রহের বড় কারণ জহির লিখতেন কম, ছাপাতেন আরও কম। অথচ লিখতেন ভালো। কোনো কোনো লেখা খুব ভালো।

যারা শহীদুল জহিরের লেখা ভালোবাসত আর যারা-ভালোবাসত-না তারা পরস্পরকে বুঝিয়ে বলুক কেন তাঁর লেখা ভালো অথবা ভালো না, বা, ভালো লাগার মত না। আমি শুধু লিখতে চাই মহান দুর্যোগের দিনে নূহ নবীর নৌকায় আমি শহীদুল জহিরের কোন কোন লেখা পড়তে চাই এবং কেন।

চার বছর আগের কোনো এক সন্ধ্যায়, আমাদের ইস্কুলে যিনি একসময় বাংলা পড়াতেন তাঁর বাড়িতে আমার বিদ্রোহী তারুণ্য ঘোষণা দিয়েছিল, বাংলাদেশে ভালো গল্প লেখা হচ্ছে না। ধুউর…শুনে আমার শিক্ষক হাসলেন এবং বললেন, এই বইটা পড়ো দেখি। তখনই ডলু নদীর হাওয়া বইল আর আমার বাংলাদেশী হীনম্মন্যতা উড়িয়ে নিয়ে গেল কোথাও একটা। জহিরের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ, ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প, ২০০৪ সালে যেটা মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছিল বইমেলায়, আর ২০০৫-এ যেটা তাঁর জন্য এনেছিল একটি কাগজ সাহিত্য পুরস্কার। বইটার একটি কপি আমি হাতে পেলাম, তার প্রথম গল্প ‌‌’কোথায় পাব তারে’ (লেখা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে)। গল্প শুরু হয়েছিল জহিরের পুরান ঢাকায়, বেকার আব্দুল করিমের ডালপুরি খাওয়া প্রসঙ্গে এলাকার লোকের ভাবনার জোড়াতালি দিয়ে:

দক্ষিণ মৈশুন্দি, ভূতের গলির লোকেরা পুনরায় এক জটিলতার ভেতর পড়ে এবং জোড়পুল ও পদ্মনিধি লেনের, ওয়ারি ও বনগ্রামের, নারিন্দা ও দয়াগঞ্জের লোকেরা তাদের এই সঙ্কটের কথা শুনতে পায়; তারা, ভূতের গলির লোকেরা বলে: “আমরা পুনরায় আব্দুল করিমের কথায় ফিরে যেতে চাই, কারণ কয়েকদিন থেকে আমরা মহল্লায় শুনতে পাচ্ছিলাম যে, সে ময়মনসিং যাচ্ছে; কিন্তু আমরা তার এই কথাকে গুরুত্ব না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন একদিন বৃহস্পতিবার বিকালে আমাদের মহল্লা, ভূতের গলির ৬৪ নম্বর বাড়ির মালিক আব্দুল আজিজ ব্যাপারি ঠোঙ্গায় করে গরম ডালপুরি কিনে ফেরার পথে আব্দুল করিমের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং সে বলে, আহো মিঞা, ডাইলপুরি খায়া যাও।” (জহির ২০০৪: পৃ. ৯)

প্রথম জহির পাঠে শুধু বিরক্তি ছিল কয়েক মিনিট। ধুউর…কীসের ডালপুরি, কীসের ভূতের গলি, কে আব্দুল করিম আর কী করতে হালায় যাবে ময়মনসিং? একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি মেজাজ খারাপ করতে না করতেই টের পাই আমি শহীদুল জহিরের সযত্নে বোনা ফাঁদে পড়ে গেছি। পুরাতন বাক্যের বারবার ফিরে আসা দিয়ে তিনি জেনেশুনে রচনা করেছেন আব্দুল করিমের মনোজগত, তার সঙ্গে জগত-পিতা-ডালপুরিওয়ালার কথোপকথনে ফিরে আসে সেই একই ধরন–যা এক আশ্চর্য রকম লুপ এবং গিঁট। ঠিক যে মুহূর্তে আমি সিদ্ধান্ত নিতে চাই যে এই গল্প পড়ার কোনো মানে হয় না, তখনই আব্দুল করিমের বন্দু শেপালির আবির্ভাব আর, কোথাও যাবে আব্দুল করিম, কিন্তু যে ঠিকানা আছে তার কাছে সে বড় অদ্ভুত। তার মানে করতে পারে না পাড়ার লোক ও পাঠক। যেমন, “নদী পার হয়া ব্রিজ পিছন দিয়া খাড়াইলে দুপুর বেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টা দিকে, ছেওয়া না থাকলে, যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেই দিকে নদীর পাড় বরাবর… …আগাইলে চাইর দিকে ধান ক্ষেত, পায়ে হাঁটা আইলের রাস্তা দূরে চাইর দিকে আরো গ্রাম ক্ষেতে পাকা ধান যেদিকে কাইত হয়া আছে, সেই দিকে, অথবা, যদি ধানের দিন না হয়, যেদিকে বাতাস বয় সেই দিকে গেলে পাঁচটা বাড়ির ভিটা দেখা যাইব, তিনটা ভিটা সামনে দুইটা পিছনে, পিছনের দুইটা বাড়ির ডালিম গাছওয়ালা বাড়ি।” (জহির ২০০৪: পৃ. ২০-২১)

আব্দুল করিমের চালাকচতুরকুতুহলী সঙ্গী (যেমন ছিল দন কিহোতির সাগরেদ সাঙ্কো পাঞ্জা) দুলাল মিঞার সাথে আমিও প্রায় একমত হই আর আব্দুল করিমকে বলতে চাই: তুমার মত এমুন ভোদাই তো হালায় আমি জিন্দেগীতে দেখিনিকা! (প্রাগুক্ত, পৃ.১৯)। তবু আব্দুল করিম খুঁজতে যায় শেপালিকে, আর ফিরে আসে পুরোটা না গিয়েই। সাঁকোর কাঠের পাটাতনের উপর এক পায়ের উপর বসে থেকে দুলাল মিঞার মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ল দুলাইলা, যাইগা (প্রাগুক্ত, পৃ.২২)। দুলাল মিঞার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও মেজাজ খারাপ হয়। আব্দুল করিম কেন যে এমন উতলা হয়ে খুঁজেছিল শেপালিকে আর কেনইবা হাল ছেড়ে দিল হঠাৎ তার উত্তর মেলে না। শহীদুল জহির পারেন এই অস্বস্তিটা তৈরি করতে। অন্যদিকে ভূতের গলির লোকেদের আগ্রহ কমে যায়, করিম আবার ডালপুরি খায়, এবং উষ্মা প্রকাশ করে বলে, হালারা আলু দিয়া ডাইলপুরি বানায়! (প্রাগুক্ত, পৃ.২৩)। তখন আরও আরও পড়তে ইচ্ছা হয়। মনে হয়, শহীদুল জহির কে? তিনি লিখছেন কেন? সেই সময় এক ধরনের গুজব রটে যায় ঢাকা শহরে। শহীদুল জহির যাকে ভালোবাসতেন সেই মেয়েটি নাকি হারিয়ে গিয়েছিল। জহির তাকে অনেক খুঁজেছেন। কোথাও পাওয়া যায়নি। লোকে বলে, সেই হারিয়ে যাওয়া শেপালির (বা অন্য কোনো নাম) খোঁজ না পেয়ে তিনি চিরকুমার, মানে, বিয়ে করেননি। আর কেউ কেউ বলে, বউ ছিল না বলেই জহিরের যত্ন হয়নি। অকালে মরলেন। হয়তো শেপালি বেঁচে থাকলে এবং লেখকের জীবনে দাম্পত্য থাকলে আরও বাঁচতেন, আরও ভালো লিখতেন। অথবা ঘটত এর উল্টোটা। তিনি এত সুখী হতেন, যে লেখালেখি ছেড়ে অবসর কাটাতেন, শেপালির আশেপাশে ঘুরঘুর করতেন, বলতেন: কই, চা-টা দাও, একটু খবরের কাগজ পড়ি। বা হয়তো অন্য রকম হতো। এতটাই অসুখী হতেন যে লিখতেন সব ধূসর গদ্য ও পদ্য। সন্তানের ও সংসারের ভারে বিষণ্ন, বা হয়তো ঘুষ খেতে কোনো একদিন রাজি হয়ে যেতেন। আমরা জানি না। আর জানতেও পারব না। জহির তাঁর গোপন কথাটি কাউকে বলে গিয়েছিলেন?

মস্ত বড় সরকারী আমলা ছিলেন তিনি। সরকারী বাসভবনেই থাকতেন বলে জানি। যখন প্রথম তাঁর সঙ্গে যেচে দেখা করি, সেটা ২০০৪-ই। বেইলি রোডের কলোনিতে তাঁর বাসা কোথায় বলেছিল হয় বিজু ভাই নয়তো কবি আলতাফ হোসেন (তিনিও সেই এলাকায় থাকতেন তখন, তার বয়সও প্রায় জহিরের মতন)। মোবাইল দূরে থাক, বাড়ির টেলিফোনেই জহিরকে পাওয়া যায়নি অনেক দিন। সভা সমিতি বক্তৃতা যতটা সম্ভব এড়িয়ে গেছেন তিনি। কথা বলতে গিয়ে টের পাওয়া গেল লিখতেই তিনি ভালোবেসেছেন, বলতে ততটা না। যে কথা বলতে চায় না, যত বড় লেখকই হোক, তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে যাওয়াটা একটা দ্বিপাক্ষিক অস্বস্তি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। বেশি সময় না নিয়ে সেই বিকেলে তাই ফিরে যেতে হলো। খানিকটা আশা ভাঙল। প্রশংসা শুনে তিনি খুশি হন কিন্তু তার উত্তরে কিছু বলতে চান না। বা নিন্দা নিয়েও যার বিশেষ মাথাব্যথা নাই, যে মার্কেজ খুব ভালোবাসেন, ইলিয়াস পছন্দ জানালেন, তার পর আর কিছুই বললেন না। নৈঃশব্দ ঝুলে থাকল ছাদের ঝুলে, আর বিকালের সঙ্গে সঙ্গে সেটাও লম্বা হতে থাকলে আমি বুঝে নিলাম, এর চেয়ে ভালো জহিরের বই পড়া। আগেই আমাকে সাবধান করা হয়েছিল। আর জহির নিজেই যেন বললেন আবারও, কথার চেয়ে ভালো আমার বই পড়া।

ফিরে গিয়ে আমি পড়ি ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থের শেষ পঙ্ক্তি আমাদের কুটিরশিল্পের ইতিহাস। ঊনিশ পৃষ্ঠায় মাত্র একটি বাক্যে জহির গোটা গল্পটা লিখেছিলেন প্রকাশিত হওয়ার নয় বছর আগে। আর জহিরই খোলাসা করে দুবার বোঝালেন: গল্পটি একটিমাত্র অনুচ্ছেদে রচিত, অন্তিমে পূর্ণচ্ছেদসূচক-যতিচিহ্ন বিহীন এবং উন্মুক্ত বা খোলা।…এটাই শুদ্ধ পাঠ (প্রাগুক্ত:পৃ.১৩২)। এক নিঃশ্বাসে পড়া যায় কিন্তু আসলে পড়া যায় না এই লেখা একটানা। যদি কেউ চায়, আবিষ্ট হওয়ার উপাদান যথেষ্ট আছে জহিরের এই একটি দীর্ঘ, বড় দীর্ঘ বাক্যে। আবারও দক্ষিণ মৈশুন্দি এবং আবারও শেফালি। শেফালি ফুল না গাছ এই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে হাঁটা একটি কৈশোর শেষে বেড়ে ওঠা, তরমুজ সম্পর্কে সচেতনতা, আর তারপর কী করে একটা পাড়া, একটা মেয়ে, আর অনেক কিশোর জীবন বদলে বদলে তবু শেফালি বদলায় না, শুধু হারিয়ে যায়। আর, মহল্লার খালি জমিতে হাজি রইসুদ্দিনের ফ্যাক্টরি অর্থাৎ দক্ষিণ মৈশুন্দির শিল্পায়নের ইতিহাস। কী বিষয়ে কী বিষয়ের প্রস্তাবনায়, জহিরের লেখার ধরনে এই নিজস্বতা বা চমক শুধু না (সেটা আরও অনেক লেখকের আছে বা থাকতে পারে); আরও কিছু ছিল।

কেউ বলেন তিনি মার্কেজ আর ইলিয়াস প্রভাবিত ছিলেন। অবশ্য তাঁর সময়কালে, যাদুবাস্তবতার ছাপ আশি-নব্বইয়ের দশকে লাতিন আমেরিকা থেকে উত্তর পশ্চিম হয়ে, মার্কেজের নোবেল প্রাইজের পরে আরও জোরদার হওয়ার পেছনে আমি শুধু সাহিত্যের রাজনীতি দেখতে পাই না। যদিও রাজনীতি ও ক্ষমতা থাকেন সর্বত্র (ফুকো ও তার আগে নীট্শে আরও জোরে বলেছিলেন); তবু এই সময়ের কথা এই সময়ের ভাষায় বলার চেষ্টায় কোনো এক গোপন মহত্ত থাকলেও থাকতে পারে। সর্বগ ক্ষমতার ছকে এ-ও এক অপর ক্ষমতা-ই। জহির ছিলেন বাক্যের বাজিগর, শব্দের না। কোনো কোনো লেখক ধ্বনির প্ররোচনায় শুধু শব্দে শব্দে ঠোঁকাঠুঁকি ভালোবাসেন, তাতে আর কোনও অর্থ জায়গা করে নিতে পারে না। আওয়াজের মজায় আজান শোনা যায় না। জহির সেই জাতের লেখক না। তাঁর শব্দ সাধারণ, কিন্তু তাঁর বাক্য অসামান্য। কীর্তন বা জিকিরের মতন ক্রমশ তুরীয় আনন্দের দিকে ধেয়ে যায় তাঁর সারি সারি বাক্য। অন্তত তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলি, যেমন ‘কোথায় পাব তারে’ এবং ‘আমাদের কুটিরশিল্পের ইতিহাস’ পাঠ করাটা একটা বিশেষ ট্রিপ যা নেশা ধরায়। অবশ্য, যে এই নেশা করতে আগ্রহী সেই এক্ষেত্রে জহুরি হতে পারে। মানে, যে মুমীন (মানে, মুসলমান না হলেও চলবে; তবে, কোনো না কোনো মানবিক বিশ্বাসে আগ্রহী), তার জন্য কোনো না কোনো মায়াজাল জেলে জহির নির্ঘাত বিছাতে পারেন বলে আমি মনে করি।

শহীদুল জহিরের সাক্ষাত আমি আরও একবার পাই ২০০৭ সালে। বড় আশা ছিল সমাবেশ প্রকাশিতব্য আমার প্রথম (এবং এখন অবধি একমাত্র) গল্পগ্রন্থের ভূমিকা তিনি লিখবেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত ও প্রশংসিত লেখক, তাঁর ভালো-মন্দ কথার ভারে আমার বইও লোকে পড়বে আর বিক্রি বাড়বে। সম্ভবত খানিকটা সেই উদ্দেশ্যেও আমি বেশ কিছুদিন তাঁর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি। আর প্রকাশকও আমার হয়ে অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে। পাণ্ডুলিপি পড়তে দিলে তিনি খুব ভদ্রলোক হয়ে বললেন–পড়বেন। তবে আরও বললেন: আমি পড়ব অলীক, কিন্তু ভূমিকা টুমিকা আমি লিখতে পারব না। তখনও আমার ক্ষীণ আশা ছিল। নবীন লেখকদের যেমন থাকে। আর যেহেতু আমিও কম লিখি (প্রথম গল্প লেখার দশ বছর পরে বই) ভেবেছিলাম তিনি নিশ্চয়ই স্নেহবশত একটা ভূমিকা টুমিকা লিখে দেবেন। অথচ একই বইমেলায় সমাবেশ থেকেই তাঁর নির্বাচিত সংকলন বেরুল, আর আমার বেরুল ভূমিকাহীন গ্রন্থ। মন খারাপ হল। যতবার এই নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছি, জহির আশ্বস্ত করতেন: লিখে যদি আনন্দ পান, সেটাই পাবেন। বই আর কে পড়ে! তখনও ভেবেছিলাম, খ্যাতি বড় লোভনীয়, কী এক মজা যেন, যদি লোকে চেনে। তা না হলে জানপ্রাণ দিয়ে একা একা লেখা আধো অন্ধকার ঘরে স্বপ্ন-বাস্তব-যাদুর টানাটানির পরে আর পাওনা কী? জহির ও কি এমনটাই ভাবতেন? বোধ হয়, না। তা হলে তিনি কি মহান? বোধ হয়, না। লোকে লেখা পড়–ক নিশ্চয়ই তিনি চাইতেন। নয়তো ছাপাতেন কেন? আর সভা সমিতি করতেন না সে তাঁর ঝামেলা এড়ানো স্বভাব। একা থাকতে ভালোবাসতেন বলেই একা থাকতেন, মাঝেমাঝে বন্ধুদের সঙ্গেও। আমি বলি না, জহির মহৎ মানুষ। শহিদুল জহির মানুষটা কে? আমি জানি না। ব্যক্তিগত পরিচয় বলতে একজন লেখকের সঙ্গে আরেকজন লেখক-হতে-চাওয়া-ব্যক্তির যা হয় তার মাঝখান থেকে আমি শুধু মনে করতে পারি তাঁর কয়েকটি কথা। তিনি বলতেন তাঁর অধিকাংশ বন্ধুই লেখক নয়। কী কারণে এড়িয়ে চলতেন লেখক সমাজ, সেই তথ্য কেউ কেউ জানে। আমি আর না-ই বলি আজকের দিনে। বরং মনে করি, শহীদুল জহির আর লিখবেন না। আর কোনো দিন তিনি ফিরিয়ে দেবেন না কোন নবীন লেখকের অনুরোধ এমন হৃদ্যতায়। তিনি বলবেন না–আব্দুল করিমেরা কেন যায়, কেন ফিরে আসে, আর শেপালিরা কেন শুধুই হারায়।

ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প ছিল শহিদুল জহিরের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ (প্রথম গল্পগ্রন্থ ১৯৮৫ সালে পারাপার ; প্রকাশ করেছিল মুক্তধারা)। ১৯৯৯ সালে, শিল্পতরু প্রকাশনীর এই বইটা বের হয় যখন, জহির তার আগে লিখেছেন দুটি উপন্যাস, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮) এবং সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫)। তিনি উপন্যাস লিখেছিলেন প্রথমে, আর প্রকাশিত গল্পগুলি তার পর থেকে। প্রথম গল্পের বইয়ে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ অবধি সর্বসাকুল্যে আটটা গল্প। তাঁর মধ্যে এই সময় নিয়ে হয় ফুলকুমার নামের ছবি, আর ‘চতুর্থ মাত্রা’ নিয়ে আরেকটা ছবি করেন নূরুল আলম আতিক। সুতরাং তাঁর গল্পের মজা লোকে পেয়েছিল আর তাঁর গল্পের শ্রোতা তৈরি হতে শুরু করেছিল তাঁর গল্প-উপন্যাস ছাপা হওয়ার পর থেকেই। আমি জহিরকে আবিষ্কার করার অনেক আগে থেকেই জহির পড়েছেন অনেকেই। আর নীরব মানুষ/সরব লেখকের নিজস্ব স্বরে, নিজেকে জাহির-না-করতে-চাওয়া জহির তখনই প্রশংসা ও ঈর্ষা পেয়েছেন বোধ হয়। ‘ডুমুর খেকো মানুষ’ পড়লে নতুন ও খারাপ লেখকদের একপ্রকার হিংসা হতে বাধ্য। যাদু ও বাস্তব এবং স্বপ্ন আর অস্বস্তি শুধু না, জহির তাঁর গল্পে এক ধীরগতির সন্ত্রাসকেও জায়গা দিয়েছেন। বইটির চার নম্বর গল্প, ‘মনোজগতের কাঁটা’ (লেখা হয়েছিল ১৯৯৫ সালে) আবারও ভূতের গলির লোকদের জীবনে একটি সঙ্কট। যা ঘটেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্ধকার ও দিবালোকে, তার কিছু পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ৮০-র দশকের আগেই এবং তার পরে দ্বিতীয় সামরিক শাসনের কালে। মহল্লার একমাত্র হিন্দু সুবোধচন্দ্রকে রাজাকারের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে মহল্লার লোকই প্রাণভয়ে ঠেলে ফেলে দেয় কুয়ায়–স্ত্রী স্বপ্না স্বামীর অনুগামী হয়, তারপর সুবোধচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না ফিরে ফিরে আসে। ১৯৯২ সালে অযোধ্যার মসজিদ ভাঙার খবর পেয়ে কেউ প্রচার করে, সুবোধ-স্বপ্না মিষ্টি কিনে খেয়েছে। তাই আরও একবার কুয়ায় তাঁদের মৃত পাওয়া যায়। এমনি করে নাগরিক সন্ত্রাস, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বগুলোকে আত্মসাৎ করে। সাধারণ প্রতিবেশীর কাছে এইসব ধর্মীয় পরিচয় বড় হয় স্বাভাবিক আত্মরক্ষার তাগিদে বা কেন হিন্দুরা বাবরী মসজিদ ভাঙল অতএব বাংলাদেশের হিন্দুদের মারো একটি সরল সমীকরণই তাদের বোধগম্য। জহিরের গল্পে কোনো মহামানব আসেন না, কিন্তু মানবিক বোধে যে মহল্লা সুবোধদের রক্ষা করতে চায়, পরিস্থিতির চাপ আছে তাঁদেরও, মানবিকতার সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। অতএব পাশবিকতাও মানুষেরই স্বভাব–জহিরের কাছে। ভালো ও মন্দ, পাপ এবং পুণ্য, মানবিক ও পাশবিক এই যাবতীয় দ্বৈততা ছাড়িয়েই যেন জীবন। যার সমীকরণ সমীচীন নয় হয়তো। তবু নৃশংসতার রেশ থাকে ভুক্তভোগী ও সন্ত্রাসী দুইয়ের মনেই, কোনো কোনো কাজ যুদ্ধকালে স্বাভাবিক হয়ে গেলেও পরবর্তীতে মনোজগতের কাঁটা হয়ে বিষ ছড়ায়, আর মহল্লার আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়। জহির তাই মনে করেছেন, লিখে গেছেন : “এই বিভ্রান্তির ভেতর তাদের এরকম মনে হয় যে, তারা হয়তো কোনো এক জায়গায় কোনো এক স্বপ্নের ভেতর আটকা পড়ে আছে এবং এই স্বপ্নের ভেতর তারা অতীত থেকে ভবিষ্যতে অথবা ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে; এবং তাদের মনে হয় যে, সুবোধ ও স্বপ্নার বিষয়টি হয়তো সত্য নয়, স্বপ্ন; কিন্তু তখন তাদের আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়ির প্রাঙ্গণে লাগানো স্বপ্নার তুলসী গাছটির কথা মনে পড়ে, তারা আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে যায় এবং দেয়ালের কিনারায় মৃদু বাতাসের ভেতর তুলসী গাছটিকে দেখে; এবং তখন তাদের কুয়োটির কথা মনে পড়ে।” (জহির ১৯৯৯: পৃ.৭৮)

তিনি কয়েকটি চরিত্রকেও বিশেষ ও বিশদ করে গেছেন। আমরা শেপালি/শেফালি আর আব্দুল করিমের কথা কিছু বলেছি। শহীদুল জহিরের আরও একজন নির্মাণ আকালু। আব্দুল করিম পুরান ঢাকার বেকার নায়ক, ‘কোথায় পাব তারে’ আর ‘চতুর্থ মাত্রা’য় তাকে পড়েছি আমরা। কিন্তু আকালু গ্রামের ছেলে, গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি দেওয়া নায়ক। যার সাফল্য ও ব্যর্থতা অন্তহীন। ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ (লেখা হয়েছিল ১৯৯২ সালে) গল্পে সে সিরাজগঞ্জে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের ভূমিহীন গরিব লোক। তার বউ টেপি। আকালু কাঠুরে। সকলেই তাকে ঠকায়। গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েও সে পাছায় লাথি খায় পুলিশের। প্রচুর টাকা নিয়ে জ্যোতিষ তাকে রত্ন দেয়, আবার সেই রত্নচুরির অভিযোগে আকালুকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। আকালু তাঁর সকল ব্যর্থতার দায় চাপায় দাঁড়কাকের ঘাড়ে। যখনই কোনো কাক বসে ধারেকাছে, আকালু বলে, কাউয়া আইসা গেছে। এবং আরও কোনো বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষা করে। অথচ জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এই দাঁড়কাকের দলই ঘিরে থাকে আকালু-টেপি দম্পতিকে। নতুন ঢাকা শহরের মগবাজারের কাছে নয়াটোলায় কোনো খালি জায়গায় বাসা বাঁধে মানুষ ও কাক। আকালু দিনমজুর এবং টেপি বাসায় ঝি-এর কাজ করে। বাকি সময় এই দম্পতি দাঁড়কাকদের কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসপাতি নিয়ে ব্যবসা করে। গল্পের শেষে মহল্লার লোকের তাড়া খেয়ে আকালু ও টেপি কাকেদের সঙ্গে উড়ে যায়: “এই ঘটনার পর ঢাকা কাক শূন্য হয়ে পড়ে … … একই সঙ্গে রাস্তায় অপরিষ্কৃত আবর্জনার স্তূপ জমে যেতে থাকে এবং শহরের আকাশ পাখিহীন একঘেয়ে হয়ে ওঠে। এভাবে বহুদিন কেটে যায়, তারপর আশেপাশের মফস্বল থেকে কিছু কাক আসে এই শহরে এবং মফস্বলের এই কাকেরা নূতন প্রজন্মের কাকের জন্ম দিয়ে শহরের আকাশ পুনরায় ভরে তোলে।” (প্রাগুক্ত: পৃ. ৩৫)

শহর ও মফস্বল, মফস্বল ও গ্রাম এবং গ্রাম থেকে মফস্বল হয়ে শহর অবধি এই অনবরত চলাচল, প্রায় যাযাবর জীবন যাপন, মানুষ যেন কাক আর কাকেরাও মানুষ। শহরের আবর্জনা সাফ করে মফস্বল বা গ্রামের লোক। একজন অদৃশ্য হলেও জায়গা খুব বেশি সময় খালি থাকে না, ভরে ওঠে অনর্গল অপর পরিযায়ী মানুষে। তারা আকালু, তারা টেপি, তারা সারি সারি দাঁড়কাক। শহীদুল জহিরের কলম তাদের দৈনন্দিন বাঁচা-মরাকে কি এক আলো-অন্ধকারে সাদা কাগজের কালো কালিতে আরেক প্রকার অস্তিত্ব উপহার দিয়ে থাকেন। শহুরে বড়লোকি করুণা বা সরকারী-আন্তর্জাতিক দাতা-দাক্ষিণ্যের গরিবি হটাও প্ররোচনার বাইরে গিয়ে কোথাও জহির জেগে থাকা ক্লান্তি ও স্মৃতিমেদুর চোখে চেয়ে চেয়ে দেখেছেন এইসব। বিস্ময়ে আমরাও দেখি তাঁর চোখ, মন ও বিবেচনা দিয়ে।

শহীদুল জহিরের ব্যক্তিগত জীবন ১৯৫৩ থেকে ২০০৮ অবধি আর ১৯৮৫ থেকে জহিরের প্রকাশিত লেখাগুলোর শুরুয়াৎ। তারপর, গত পঞ্চান্ন (জহিরের জৈবিক বয়স) ও বাইশ বছরে (জহিরের প্রকাশ্য লেখক জীবনকাল) বাংলাদেশী বাঙালীর জীবনে কী কী ঘটেছে? স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, একটা যুদ্ধ, স্বাধীন দেশে দুবার সরাসরি ও তৃতীয়বার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের মৃত্যু ও পচন, ধর্ম হয়েছে রাজনৈতিক-সামাজিক-আন্তর্জাতিক পণ্য, নারী-পুরুষ-গরীব সকলেই টার্গেট পপুলেশন, ইসলামী উগ্রপন্থা আর মার্কিনি বোমাবাজি-জারিজুরির মাঝখানে আমরা সকলে মূষিকভব: আর জহির তার কতটা থেকে মুখ ফিরিয়েছেন আর কিয়দংশে কোন্ কোন্ ঘটনা তাঁকে ভাবিত করেছে তার আভাস ও প্রমাণ দুই-ই তাঁর গল্প জুড়ে থাকে। আর ব্যক্তি জহির জন্ম নেন, এবং মারা যান: সিরাজগঞ্জের বাড়ি থেকে পুরান ঢাকা, মুক্তিযুদ্ধ, শেফালিকে হারানো, ঢাকা-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-এর বিভিন্ন স্কুল, ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াশিংটন ডিসির দি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, এবং বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া, বিয়ে না করা, সরকারী চাকরি, একা থাকা, কিছু বন্ধুবান্ধব, লিখতে থাকা, অপেক্ষাকৃত কম কিন্তু ভালো লিখতেই থাকা, বেইলী রোডের কলোনী থেকে প্রমোশন নিয়ে ইস্কাটন গার্ডেনের সরকারী বাসা–ইত্যাদির বুনটে একটা জমাট জীবন বোঝা জরুরি কিন্তু সেটা বোধ হয় আর সম্ভব না। এবং তাঁর লেখা বোঝার জন্য অপরিহার্যও না। যদি দেখি তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ঐতিহাসিক ঘটনাবলির ছায়ায়-অপচ্ছায়ায় তাঁর প্রকাশ্য সাহিত্য-কর্ম ও প্রণালী। লেখকের নিজের জীবন তো লেখারই রসদ, কিন্তু আজকের দিনে আমাদের এই ব্যক্তিগত কৌতূহল পরিহার করা যায় কেননা জহির তো সর্ব অর্থেই নিভৃতচারী ছিলেন। তিনি-ই কি চাইবেন আমরা তাঁকে নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করি। বরং, এত কথার চেয়ে ভালো–শহীদুল জহিরের বই পড়া।

এত কথার চেয়ে ভালো–ফিরে যাওয়া নূহের নৌকায়। কুড়ি বছর বাদে বাংলাদেশ তখন ডুবছে। আমি ভুল করে জহিরের উপন্যাস সঙ্গে আনিনি। বা ইচ্ছা করেই। মহান দুর্যোগের দিনে একমাত্র তাই পবিত্র ও সঙ্গে রাখা যায় যা সব চাইতে ভালো লাগে বলে জানি। শহীদুল জহিরের গল্পগুলো দামী। তাঁর উপন্যাস (দীর্ঘ দীর্ঘ অনেকগুলি গল্পসমষ্টি) তিনটির চেয়ে তাঁর গল্পের বই দুটিতেই বেশি মজা, অধিক জীবনমৃত্যু, স্বপ্ন ও যাদু। ভালো, কিন্তু অত ভালো লাগে না উপন্যাস (ব্যক্তিগত রুচি) যতটা লাগে তাঁর ছোট ছোট গল্পের স্বাদ। বা হয়তো, আমি নিজে উপন্যাসের চেয়ে গল্প পক্ষপাতী (হতে পারে)। এখন বেশ হাওয়া দিচ্ছে বাইরে, মাঝি দাঁড় বাইছে, বাংলার গান গাইছে। নূহ নবীর নৌকায় কিছু বিচ্ছু পোলাপান উঠে পড়েছে। তাঁরা কেউ কেউ শহীদুল জহিরের (যেমন অন্য কোনো কোনো লেখকের) একান্ত ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার কিস্সার দিকে মনোযোগী। কিন্তু জহির কি কোথাও আছেন? ইহকাল বা পরকালে? ঐ দেখা যায় তাঁর ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প, এই তাঁর ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প। বাংলাদেশ একদিন অনেকখানি ডুবে যাবে, কিন্তু সেদিন পোলাপানরা বেঁচে থাকবে, তারা পড়বে নূহের নৌকায় শহীদুল জহির। আমি ভরসা রাখি।

original post

read more

সালমান রুশদির সঙ্গে একটি সন্ধ্যা

by সেজান মাহমুদ

salman-rushdie-at-florida-s.jpg
ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্যার আহমেদ সালমান রুশদি (জন্ম. ১৯/৬/১৯৪৭)

গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে মুসলিম বিশ্বের কাছে বিতর্কিত, পশ্চিমা বিশ্বের লেখক-সমালোচকদের কাছে এ শতাব্দীর একজন অন্যতম শক্তিশালী লেখক সালমান রুশদি আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ট্যালাহাসি শহরে এলেন বক্তৃতা দেয়ার জন্য। এখানে ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির আমন্ত্রণে সাতদিনের আনুষ্ঠানমালার সূচনা-বক্তার মর্যাদায় এলেন তিনি। এদিন আমার বাড়িতে মেহমান, অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে আমার এক চিকিৎসক বন্ধু, আর বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী তপন চৌধুরী। আমার কাছে midnights_children.jpg……
Midnight’s Children (1981)
…….
টিকিট আছে মাত্র দুটো। দ্বিধা কাটালেন তপন দা নিজেই, বললেন, ‘আমার কোনো আগ্রহ নাই যাওয়ার, তোমরা যাও।’ অতএব তপনদাকে প্রতিবেশীর বাসায় রাতের খাবারের নেমন্তন্ন খেতে দিয়ে আমরা চলে এলাম ইউনিভার্সিটির রুবি ডায়ামন্ড অডিটোরিউয়ামে।

সালমান রুশদি এখানে আসবেন এ খবর চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর বর্তমান কর্মস্থলে যোগাযোগ করি সামনা-সামনি একক সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। কিছুটা আশার আলোও দেখা দিয়েছিল, কিন্তু যেই না জানালাম যে আমি বাংলাদেশের লোক, তারপর থেকেই নানান নিরাপত্তামূলক প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হলো। অগত্যা একক সাক্ষাৎকার না করে প্রশ্ন-উত্তর পর্ব মেনে নেওয়া ছাড়া গতি থাকে না।

আমি বন্ধুকে নিয়ে অডিটরিয়ামের ভেতরে ইউনিভার্সিটির ফ্যাকালটিদের shame_book.jpg……
Shame (1983)
…….
ব্যালকনিতে আসন নিলাম। সালমান রুশদি তাঁর আলোচিত-সমালোচিত উপন্যাস স্যাটানিক ভার্সেস লেখার জন্য ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনীর দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারির সাত বছর পর অনেকটা সাবধানতার সঙ্গে জনসমক্ষে আসা শুরু করেছেন। এর মধ্যে আমেরিকার ‘ফিল ডোনাহিউ শো’তে এসছিলেন, এসছিলেন জনপ্রিয় টক শো লেট নাইট উইথ জে লোনো-তে। এছাড়া এই দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর নতুন উপন্যাস দ্য মুর’স লাস্ট সাই-এর প্রচারনার কাজে আমেরিকায় অনেকটা সর্বসাধারণের জন্য আধা-উন্মুক্ত (সেমি-পাবলিক) পাঠ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি ‘এমেরি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ‘বিশিষ্ট আবাসিক লেখক’-এর মর্যাদায় শিক্ষকতা শুরু করেছেন। এই সূত্রেই তিনি আমাদের শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, এখান থেকে তাঁর নতুন খণ্ডকালীন কর্মস্থল মাত্র আধা ঘণ্টার বিমান-দূরত্বে।

সালমান রুশদি কি বিতর্কিত লেখার জন্য আলোচিত নাকি আসলেও একজন বড় মাপের লেখক? এ প্রশ্ন প্রায়শ সাহিত্যের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক আড্ডায় ঝড় তোলে। পশ্চিমা সাহিত্য সমালোচকেরা তাঁর সাহিত্যকর্মকে চিনতে শুরু করেছে সেই মিডনাইট’স চিলড্রেন উপন্যাস থেকে, যেটি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় এবং বুকার পুরস্কার অর্জন করে। satanic_verses.jpg……..
The Satanic Verses (1988)
……
উপন্যাসে বা ছোটগল্পে জাদুবাস্তবতা, ইতিহাস বা মিথের ব্যবহার, সর্বোপরী অসাধারণ ভাষার জন্য তিনি সমালোচকদের কাছে এবং পাঠকের কাছে নন্দিত। এই ভাষা কেমন, বা এর স্বাতন্ত্রই বা কোথায়? যারা বৃটিশ ধ্রুপদী ধারার ইংরেজির বা ফরস্টেরিয়ান ইংরেজির রাহুমুক্ত হতে সচেতন প্রয়াসী তারা রুশদির প্রশংসায় বরং আরও এক কদম এগিয়ে। তার কারণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড বা ক্যারাবিয়ান লেখকেরা যেরকম নতুন ধারার ইংরেজি ভাষা সৃষ্টি করেছেন, তেমনি রুশদির ভাষা যেন এরকম ‘ইন্ডিয়ান ইংরেজি’ যা আর কোথাও সহজে মেলে না। এমনকি অন্য ভারতীয় বংশোদ্ভুত লেখকদের মধ্যেও নয়। রুশদির বিখ্যাত বাক্যবিন্যাস ‘ওয়ান ডে ইউ উইল কিলোফাই (killofy) মাই হার্ট’ বা ‘আই’উল জাস্ট বাইড-ও মাই টাইম’ যেন সেই নতুন ধারার ইংরেজির নমুনা।

সালমান রুশদি তাঁর এক ঘণ্টার বক্তৃতা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যে তাকে ‘ইতিহাসে উপন্যাসের ভূমিকা ও সমসাময়িক জীবন’ শিরোনাম অনায়াসেই দেয়া যায়। প্রথমেই তিনি আমেরিকান পপ কালচার যেমন ব্রিটনী স্পিয়ার, প্যারিস হিলটন নিয়ে মিডিয়ার মাতামাতির প্রতি কঠাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলেলেন, ‘একটি সস্তা হোটেল থেকে কী করে যে সস্তা সেলিব্রেটি তৈরি হয়, তার প্রমাণ প্যারিস হিলটন।’ একই সঙ্গে সমালোচনা করলেন প্রেসিডেন্ট বুশকে। উল্লেখ্য, সালমান রুশদি গোড়া থেকেই ‘ইরাক যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি নেই’ এরকম সমালোচনা করে এসেছেন। ইতিহাসে ও সমসাময়িক জীবনে উপন্যাসের ভূমিকা নিয়ে বলতে গিয়ে প্রথমেই বললেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে ভালো উপন্যাসগুলো বেশিরভাগ সময়েই খারাপ রিভিউ পেয়ে এসেছে।
—————————————————————–
“পৃথিবীর ইতিহাসে ভালো উপন্যাসগুলো বেশিরভাগ সময়েই খারাপ রিভিউ পেয়ে এসেছে। একমাত্র অতীতের দিকে ফিরে গিয়েই আমরা ভালো সাহিত্যের মর্যাদা বুঝতে পারি।”
—————————————————————–
একমাত্র অতীতের দিকে ফিরে গিয়েই আমরা ভালো সাহিত্যের মর্যাদা বুঝতে পারি।’ একই সময়ে তিনি আমেরিকান লেখকদের সমালোচনা করলেন এই বলে যে আমেরিকার বিশ্বব্যাপী যে নেতিবাচক অবস্থান, রাজনৈতিক অবক্ষয়, তা নিয়ে লেখার কোনো দায়িত্বশীলতা তিনি তাদের মধ্যে দেখেন না। লেখকদের ওপরে লেখকদের প্রভাব নিয়ে তিনি বললেন, ‘কিছু লেখককে পড়তে হয় এজন্য যে আমি তাদের মতো লিখতে চাই না, যেমন ড্যান ব্রাউন (দ্য ভিঞ্চি কোডের লেখক)। কিছু লেখকদের পড়তে হয় এজন্য যে আমি তাঁদের মতো লিখতে চাই, যখন বুঝতে পারি এই চাওয়াটাই অসম্ভব চাওয়া, তখন অনুপ্রাণিত হয়ে লিখি, যেমন জেমস জয়েস।’ জার্মান ঔপন্যাসিক নোবেল লবিয়েট গুন্টার গ্রাস, কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক আরেক নোবেল লবিয়েট গাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকেজ তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছেন একথা অকপটে বললেন সালমান রুশদি। তাঁর প্রথম বই ফ্যান্টাসি আর কল্পবিজ্ঞানের মিশেল দেয়া গ্রিমাস সম্পর্কে জিগ্যেস করলে জানালেন, ‘এই বইটি নিয়ে আমি এখন বিব্রত।’

সালমান রুশদি মানেই স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে বিতর্ক, খোমেনীর দেয়া মৃত্যুদণ্ড ও মুসলিম বিশ্বের ভূমিকার প্রসঙ্গ চলে আসে। প্রথম প্রশ্নটি আমিই করি। প্রথমেই বলি যে, ‘আমি তোমার বই না-পড়া কোনো মুসলমান না। haroun.jpg…….
Haroun and the Sea of Stories (1990)
……..
এখানে জাদুবাস্তবতা, ফ্যান্টাসি, অ্যাবসার্ডিটি, ব্যাঙ্গাত্মক রস এগুলো আমলে নিয়ে তোমার কথার জের ধরেই বলছি, সাহিত্যের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হলো আনন্দ সৃষ্টি (সালমান রুশদি নিজেও সেটা উল্লেখ করেছিলেন তাঁর বক্তৃতায়)। যখন বাস্তবে দেখলে এর ঠিক উল্টোটি হচ্ছে, আনন্দের বদলে তিক্ততা, তখন কি তোমার মনে কোনো নৈতিক দোদুল্যমানতা (মর‌্যাল ডাইলেমা) দেখা দিয়েছিল কি না?’ এর প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিলেন সালমান রুশদি। প্রথমে বললেন, ঠিক বুঝতে পারছি না, তুমি কি স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে বলছে? বললাম, হ্যা। তখন তিনি উত্তর দিলেন, যা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। ‘পাঠকের বই পড়ে কি প্রতিক্রিয়া হবে তার দায়ভার তো আমি নিতে পারি না। পাঠক যদি কোনো কিছুতে অফেন্ডেড হন, তা থেকে বাঁচার সহজ উপায় হলো বইটি বন্ধ করে দেয়া। আমি তো প্রতিদিনই কোনো না কোনো কিছুতে অফেন্ডেড হচ্ছি। তাছাড়া এই ফতোয়াবাজদের জীবন ফিরে পাওয়া উচিত (দে নিড টু গেট আ লাইফ)।’

এ প্রসঙ্গে অন্যত্র সালমান রুশদি বলেছেন যে স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে বিরূপ সমালোচনা বা হইচই হওয়াতে ভালো-মন্দ দুটোই হয়েছে। এতে অনেক মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে বইটি পড়ার জন্য, কিন্ত এই হইচই বড় রকমের বাঁধা এই উপন্যাসের শিল্পমূল্য বোঝার জন্য। স্যাটানিক ভার্সেস বুকার পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও পুরস্কার পায় নি, যদিও বছরের সেরা উপন্যাস হিসেবে ‘হোয়াইটব্রেড এওয়ার্ড’ পেয়েছিল এবং পশ্চিমা সমালোচকদের বানানো শতাব্দীর সেরা একশটি বইয়ের তালিকায় উঠে এসেছে কয়েকবার।

800px-sir_ahmed_salman_rush.jpg
‘এমেরি’ বিশ্ববিদ্যালয় ডিসকাশন গ্রুপে সালমান রুশদি; ছবি: Brett Weinstein, ১১/২/২০০৮

এখানে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগুচ্ছ ফ্রি এক্সপ্রেশন ইজ নো অফেন্স-এর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি পাকিস্তান থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ইন্টারন্যাশনাল গেরিলাস-এর গল্পটি বলেন। ১৯৯০ সালে স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশিত হওয়ার পর পর এই ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়। এই ছবিতে সালমান রুশদিকে একজন র‌্যাম্বো ধাঁচের ভিলেন হিসেবে দেখানো হয়েছে যাকে চারজন পাকিস্তানি গেরিলা হত্যার জন্য খুঁজছে। এই ছবিটি ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিষদ মুক্তি দিতে অস্বীকার করে এই বলে যে এখানে সালমান রুশদিকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং ছবিটি মুক্তি দিলে সালমান রুশদি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মানহানীকর ছবি মুক্তি দেয়ার জন্য মামলা করে দিতে পারেন। একথা জানার পর সালমান রুশদি নিজে একটি দাসখত লিখে দিলেন ‘যদিও ছবিটি বিকৃত, অকেজো আবর্জনা, তবুও এটি মুক্তি দিলে আমি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবো না।’ এভাবে ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে সালমান রুশদি ব্রিটিশ সরকারের ‘রেসিয়াল এন্ড রিলিজিয়াস হেট্রেট এ্যাক্ট’-এর ঘোরতর বিরোধী।

১৯৮৮ সালে ইরানের ফতোয়া জারির পর থেকে অনেক ঘটনা ঘটেছে। last_sigh.jpg…….
The Moor’s Last Sigh (1995)
……..
বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশগুলো যেমন নিষিদ্ধ করেছে স্যাটানিক ভার্সেস, নিন্দা জানিয়েছে সালমান রুশদির বিরুদ্ধে, তেমনি লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা ধরনের মুক্তচিন্তার মানুষেরা এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, লেখকের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। এই ফতোয়ার জন্য সালমান রুশদি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হিতোশি ইগারাশি, যিনি স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসটি জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ করেন তাকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা হয় ১৯৯১ সালে। ইতালির অনুবাদক ইতোরে ক্যাপ্রিওলোকে একই মাসে ছুরিকাঘাত করা হয়, যদিও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। নরওয়ের প্রকাশক উইলিয়াম নাইগার্ড অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান আততায়ীর গুলি থেকে। ১৯৮৯ সালে ব্রিটেনে যে ট্রেন-বোমা ফাটানো হয় তা ছিল সালমান রুশদিকে উদ্দেশ করে হিজবুল্লাহ’র আক্রমণ। যদিও ১৯৯৮ সালে ইরানের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ খাতামী জনসমক্ষে প্রতিশ্রুতি দেন যে তারা যেমন ‘রুশদিকে হত্যার ফতোয়া সমর্থন করেন না তেমনি এটি রহিতও করেন না,’ সুওরাং এটি আজও বহাল আছে। সালমান রুশদি ঈষৎ মুচকি হাসি হেসে বলেন যে এখনও অনেকটা ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র মতো ফেরুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে তাঁর কাছে বেনামে কার্ড আসে যাতে লেখা ground_beneath.jpg……
The Ground Beneath Her Feet (1999)
…….
থাকে ‘আমরা এখনও ভুলি নি’। তিনি আরও বলেন এটা এখন সত্যিকারের ভয়-দেখানোর চেয়ে অনেকটা ‘রেটরিকের’ মতো হয়ে গেছে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেয়ার চেয়ে এটাকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করলেই বরং সবার জন্য মঙ্গল হতো। মানুষের বিশ্বাস কেন এতো সহজে আহত হবে, ঠুনকো কাচের মতো ঝুরঝুরে হবে যে ভিন্নমতকে খতমই করতে হবে, আমি আমার নিজের ভাষায় এভাবে বলি যে, ‘কারো যেমন ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে, তেমনি কারো তো নাস্তিকানুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে, অনুভূতি তো সবারই সমান!’

সালমান রুশদি তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাস লিখতে সময় নিয়েছেন পাঁচ বছরের মতো, মিটনাইট’স চিলড্রেন, স্যাটানিক ভার্সেস, দ্য মুর’স লাস্ট সাই, বা শালিমার দ্য ক্লাউন। সামনের পাঁচ বছরে কী লিখছেন? দ্য এনচ্যানট্রেস অফ ফ্লোরেনস সালমান রুশদির পরবর্তী নতুন বই। এখানেও তিনি তাঁর নিজস্ব ধারা ঠিক রেখেছেন ইতিহাস থেকে উপকথা বা উপাদান নিয়ে চরিত্র সৃষ্টির। এই উপন্যাসের কথক একজন ইউরোপীয় ভ্রমণকারী যার নাম “মোগর ডেল’ আমর” বা ভালোবাসার মুঘল। তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে এসে দাবি করেন যে তিনি সম্রাট বাবরের কনিষ্ঠতম বোন ‘কারা কোজ’-এর সন্তান। কারা কোজ ছিলেন অসামান্য সুন্দরী। ধীরে ধীরে জানা যায় এই ‘কারা’কে উজবেকিস্তানের এক যুদ্ধবাজ অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তাঁকে নিয়ে যায় পারস্যের ‘শাহ’ এবং সর্বশেষে ‘আরগালিয়া’ নামের ফ্লোরেনসের এক যোদ্ধা যে তাঁকে সেবাদাসী করে রাখে। এভাবে এক নারী তাঁর নিজের পরিচয়, জীবনের দাম খুঁজে বেড়ায় এই পুরুষশাসিত পৃথিবীতে। সেই চোখে উন্মোচিত হয় পৃথিবীর দুই মহাযুগের চালচিত্র, একদিকে মুঘল সাম্রাজ্য, অন্যদিকে রেনেসাঁর ফ্লোরেনস। এরা কি ইতিহাসের সত্যি গল্প? কী ঘটলো সেই অসামান্য সন্দুরী ‘কারা কোজ’-এর? এ উপন্যাস নিয়ে কি সৃষ্টি হবে আরেক বিতর্কের? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী জুনের তিন তারিখ পর্যন্ত। কারণ ২০০৮ সালের জুন ৩ তারিখে এই বই আমেরিকার বাজারে আসবে। এই উপন্যাসের পটভূমি থেকে আমার মনে একটি প্রশ্ন জোড়ালোভাবে দানা বাঁধে, সালমান রুশদি যদিও একবারও তুরস্কের আরেক নোবেলপ্রাপ্ত লেখক অরহান পামুকের নাম বলেন নি, কিন্তু তাঁর প্রভাব কি দেখা যাচ্ছে না? তাঁকে আরেকটি প্রশ্ন করতে করতেই আমার মাইক বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রশ্ন করার আর সুযোগ হয় না। প্রশ্নটি ছিল, তিনি কি প্রি-ইসলামিক বা প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকে ইতিহাসের উপদান নিয়ে কোনো উপন্যাস লিখবেন, কখনও? ততক্ষণে রাত প্রায় এগারোটা। তুমুল বৃষ্টি আর মাতাল বাতাসের দাপট মাথায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাই, এবার ঘরে ফেরার পালা!

read more

প্রতিদিনের রুমাল, ষাট-সত্তরের ঢাকা ও চিরদিনের সাহিত্য

by সুমন রহমান

এক.
প্রয়াত হলেন আমাদের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী মাহমুদুল হক। বিরাশি সালের পর থেকে আর কিছুই লেখেন নি এই প্রতিভাধর লেখক, সেই অর্থে mah-p-3.jpg এটি তাঁর দ্বিতীয় প্রয়াণ। যাঁর প্রয়াণের ব্যথাটুকু আমরা গত দুদশক ধরেই আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ও রুমালে বয়ন করে চলেছি, তাঁর শরীরী প্রস্থানের ফলে কেবল আমাদের এই অভ্যাসটুকুরই ইতি ঘটল। প্রশ্নটি কিন্তু রয়েই গেল: মাহমুদুল হক আমাদের কেমন আত্মীয়? প্রতিদিনের, নাকি চিরদিনের?

মাহমুদুল হকের পাঠক কিন্তু এই প্রশ্নের জবাবে কোনো পরিষ্কার পজিশন নেয় না। তাঁকে প্রতিদিনের হুমায়ুনের কাতারে রাখতে সে অপারগ, আবার চিরদিনের হাসান-ইলিয়াস চত্বরেও তাঁর আসন পেতে দিতে দোনোমনা সে। কোনো খাপেই যেন এই তলোয়ার ঢোকে না। সমস্যা কি তলোয়ারটির? নাকি আমাদের সাহিত্যরুচির?

লক্ষণীয়, মাহমুদুল হক আটটি উপন্যাস এবং কমপক্ষে এগারটি গল্প লিখেছেন তাঁর দুদশকের সাহিত্যজীবনে। তুলনায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং হাসান আজিজুল হকের উপন্যাসের সংখ্যা দুইয়ের অধিক না। তবু তাঁর পাঠকের দাবি, অনেক কম লিখেছেন এই লেখক। আবার কোনো কোনো বোদ্ধা ভাবেন যে, বিশাল ক্যানভাসে বা মহৎ কোনো উপন্যাস লেখেন নি তিনি। ধন্দ লাগে, এ হেন প্রত্যাশার হেতু কী? যা লিখেছেন মাহমুদুল হক তা নিয়েই আমরা কেন সন্তুষ্ট হতে পারি না? সে কি আমরা তাঁর মাঝে অমিত সম্ভাবনা দেখেছিলাম বলে, নাকি তিনি আমাদের ক্যাটাগোরাইজেশনের নৌকাটিকে মাঝ নদীতে ছেড়ে গিয়েছেন বলে? টানাহেঁচড়া কিছু হয়েছে, হয়ত আরো হবে, কিন্তু তাতে বিশেষ ফল হয় নি। মাহমুদুল হক আসন পেতেছেন এমন একটি নো-ম্যানস ল্যান্ডে যা বিদ্যমান সাহিত্য সমালোচনাধারার জন্য অস্বস্তির।

মনে পড়ে হুয়ান রুলফো-র কথা: নাতিদীর্ঘ একটা উপন্যাস, আরেকটা উপন্যাসের প্রতিশ্রুতি আর গোটা তের-চৌদ্দখানা গল্পই তাঁর সারাজীবনের সাহিত্যকীর্তি। তা দিয়েই তাঁকে গোটা লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের পুরোধা মেনে নিতে কষ্ট হয় না। কাফকা যেমন। মার্কেজ বলেন যে, গোটা লাতিন আমেরিকান যাদুবাস্তব সাহিত্য কাফকার মেটামরফোসিস পাঠের ফলাফল। বোঝা যাচ্ছে যে, মহৎ সাহিত্য মানেই ইউলিসিস বা ওয়র এন্ড পীস নয়, চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি মেটামরফোসিস থেকে জন্মাতে পারে একটি গোটা মহাদেশের সাহিত্য, যেমন একটি ছেঁড়াখোড়া ওভারকোট থেকে বেরুতে পারে গোটা রুশ সাহিত্য। “জাতির বৃহত্তর ইতিহাস” রচনার দায় সাহিত্য কেন নেবে? সাহসী সাহিত্যিক তার পাঠক-সমালোচকের প্রত্যাশায় চালিত হবেন, নাকি তিনি চলবেন তার আত্মার আদেশে? দায় চাপাতে চাইলে তিনি তো দেখি অবলীলায় বলেন “বরং নিজেই তুমি লেখ নাক’ একটি কবিতা”! এ কারণেই হয়ত মহৎ-এর নেশা আর বৃহৎ-এর পেশা মাহমুদুল হকের সাহিত্যে আমরা দেখি না। যারা মহৎ মহৎ ভাবাদর্শের বাটখারা এজেন্ডা আকারে নিজের সাহিত্য আর প্রত্যাশা আকারে অন্যের সাহিত্যের ওপর চাপান, তারা ভুলে যান সাহিত্য অনেক রকম। কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের সংজ্ঞা সে নিজেই তৈরি করে।

এই আলাপ থেকে পাঠক আশা করি এটা ধরে নেবেন না যে আমি সাহিত্যকে স্বয়ম্ভূ থাকতে বলছি বা বলছি অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ডের সাথে যোগাযোগহীনতাই কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের লক্ষণ। যোগাযোগ নিশ্চয়ই থাকবে, তবে সাহিত্যের দরকার স্বায়ত্তশাসন। সে কেন ইতিহাসের দাসত্ব করবে, বা সমাজবিজ্ঞানের? নিজের পাটাতনে শক্তপায়ে দাঁড়িয়েই সাহিত্য অপরাপর জ্ঞানকাণ্ডের সাথে যোগাযোগ করুক। নিজের জানলা দিয়েই জগত দেখুক, সর্বোপরি। মাহমুদুল হকের সাহিত্য আমাদের মনোভূমির দিকে তেমনি একটি জানলা খুলে দেয়।

দুই.
ভাষাব্যবহার দিয়েও মাহমুদুল হক আমাদের সাহিত্যে স্বতন্ত্র হয়ে থাকবেন। অসামান্য ভাষাশিল্পী তিনি, শামসুর রাহমান লিখেছিলেন জীবন আমার বোন-এর ব্যাক কাভারে। কিন্তু তাঁর ভাষা কি নৈরাজ্যময়? আমার মনে হয় না। ভাষার নৈরাজ্য অন্য জিনিস। কাব্যধর্মী বর্ণনামাত্রই যুক্তিহীন নৈরাজ্যময় এটা ভাবা বাতুলতা। বাংলাভাষার বিদ্যমান যুক্তিশৃঙ্খলার বাইরে মাহমুদুল হক খুব হাঁটাচলা করেছেন এমন মনে হয় নি। বরং ছুরির মত ধারালো, চাবুকের মত নির্মেদ, আয়নার মত ঝকঝকে যে ভাষাটি মানিক-তারাশঙ্কর হয়ে পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্বিষ্ট হয়ে উঠছিল, মাহমুদুল হক সেই স্রোতে গা ভাসান নি। ভাষাপ্রশ্নে তিনি হাঁটলেন উল্টোদিকে, কিছুটা রবীন্দ্র-বঙ্কিম হয়ে সংস্কৃত নন্দনকাননে। তাঁর বর্ণনা অসম্ভব কাব্যভণিতায় ভরা, হাওয়াই মিঠাই-এর মত ফোলানো ও মনোলোভা। তিনি জানতেন এই ফোলানোটুকুই সাহিত্য, বাদবাকিটুকু হয় নিজ নিজ সময়ের দাস, না হয় মরিচার খাদ্য। কথার যাদুকর তিনি, প্রগল্ভতাই তাঁর সাহিত্যের শক্তি। বকবকাইন। এই কাব্যভণিতার কারণেই আমরা ভেবে বসি তিনি এক ফুরফুরে পাঞ্জাবি-পরা সাহিত্যিক, জানলা খুলে যতটুকু জগত দেখা যায় তাইই দিলখোশ লিখে দিয়েছেন! কতটা বালখিল্য এই ধারণা, তা বোঝার জন্য মাত্র দুটো গল্পই যথেষ্ট: ‘বুড়ো ওবাদের জমাখরচ’ এবং ‘সপুরা ও পরাগল’। ভয়ংকর দুটো গল্প, পড়তে পড়তে ভাবি, তাঁর ভাষার কী দারুণ ক্ষমতা, কী অবলীলায় এমনিতর নিষ্ঠুরতার পাতালে সিঁড়ি নামিয়ে দেয়! এখানেই মাহমুদুল হক আলাদা, গদ্যের ভাষাকে তিনি মুক্তি দিয়েছেন দলিলি প্ররোচনা থেকে, প্রত্যক্ষবাদ থেকে, নিজে আষ্টেপৃষ্ঠে লিপ্ত হয়ে পড়েন ভাষা, চরিত্র ও বিষয়বস্তুর সাথে, সাহিত্যিকের নির্মোহ দূরত্ব তিনি মানেন নি। এখন পর্যন্ত তিনিই আমাদের একমাত্র ঘুমে-হাঁটা মোহগ্রস্ত সাহিত্যিক। এই সাহিত্যের পাঠ তাঁর কাছ থেকে নেয়ার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? আমরা কি গ্রহণে সক্ষম?

তিন.
পড়ছিলাম মাহমুদুল হকের একমাত্র গল্পগ্রন্থ প্রতিদিন একটি রুমাল। ঘটনাচক্রে সাহিত্যপাঠ আমার এবারের উদ্দেশ্য নয়, আমি মধ্য ষাট থেকে মধ্য সত্তর দশকের ঢাকা শহরের একটা চেহারা পেতে চাইছি তাঁর গল্প থেকে। প্রথমেই থমকালাম ‘সপুরা ও পরাগল’ পাঠ করে। ১৯৬৪ সালে লেখা এই গল্প, যেখানে সপুরা এক নারী ভিক্ষুক যার পা নেই কিন্তু আছে “কলসীর কানা উপচানো ফেনার মতো স্বাস্থ্য” যা বিব্রত পথচারীর চোখে রঙ ধরায়। গল্পের কেন্দ্রীয় টেনশনটি ফ্রয়েডীয় যা বিস্তৃত সপুরা, পরাগল, মালগনি মিয়া ও মায়মুনা নামক চারটি চরিত্রের পারস্পরিক যৌন আচরণের মাঝে। আলাপের বিষয় এটা নয়, বরং এই টেনশনটি যে প্রেক্ষিতের ওপর ছড়ানো তাকে খুলে দেখা যাক। গল্পের সময়কাল ষাট দশকের ঢাকা এবং প্রেক্ষাপট ঢাকার ভিক্ষুক নেটওয়ার্ক। অবিশ্বাস্য এক চিত্র হাজির করেন মাহমুদুল হক ষাট দশকীয় ঢাকাই ভিক্ষাবৃত্তির। সেখানে মালগনি মিয়া এক ভিক্ষাব্যবসায়ী যে কিনা সপুরা, পরাগল মিয়ার মত আরো অনেক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের সংগ্রাহক, ইম্প্রোভাইজার, নিয়ন্ত্রক ও আশ্রয়দাতা। এসব ভিক্ষুকের রোজগারের বেশির ভাগই চলে যায় মালগনি মিয়ার ট্যাকে। পরাগল মালগনির সহযোগী, নুলোভিখিরির পরিবহনের দায়িত্ব তার। আরো জানা যায় যে, ভিক্ষাবৃত্তির সুবিধার জন্য সপুরার পা কেটে ফেলে পরাগল, হাত মুচড়ে ভেঙে দেয় অন্য একটি কচি মেয়ের।

লক্ষণীয় যে, মালগনির আস্তানাটি কোনো বস্তিতে কি না সেটা গল্পে পরিষ্কার নয়। বরং মনে হয় এটা আলাদা কোনো জায়গা, পোড়োবাড়িমত, যেখানে ভিক্ষুকদের থাকার আবাস তৈরি করেছে মালগনি। অর্থাৎ তাদের বৃহত্তর সমাজ গড়ে ওঠেনি তখনো। এতদূর পর্যন্ত জিনিসটা সমাজবিজ্ঞানের জন্য স্বস্তিদায়ক, কারণ ষাট দশকের ঢাকা তখনো এমন ম্যাসিভ আকারে ‘সিটি অব স্লামস’ হয়ে ওঠে নি বলে সেও সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু ভিক্ষা ইন্ডাস্ট্রির যে চেহারা মাহমুদুল হক তুলে ধরেন, নিশ্চিত যে এটি সমাজ গবেষককে কিছু হলেও অপ্রতিভ করে দেবে। ঢাকাই ভিক্ষাবৃত্তির ওপর কোনো বড় ধরনের অনুসন্ধানী গবেষণা হয় নি, বস্তি-গবেষণার অংশ হিসেবে যতটুকু এসেছে সেটা ছাড়া। হালে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার ৩০ নভেম্বর ২০০৭ সংখ্যায় ‘কোটি টাকার ভিক্ষা ব্যবসা নেটওয়ার্ক’ নামে যে প্রতিবেদনটি রয়েছে মাহমুদুল হকের সাক্ষ্য অনুযায়ী ষাট দশকের চিত্রটি তার চেয়ে বহুগুণে ভয়ানক। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু ভিক্ষুকদের নিয়ে একটি গবেষণাকর্ম করেছেন যেটির কথা তাঁর মুখে শুনেছি। কই, এত নারকীয় দশা তো তিনিও দেখেন নি এই কালে এসেও। তাহলে কি ভিক্ষুকদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে? নাকি সমাজবিজ্ঞানের পক্ষে সেই অতলে যাওয়া মুশকিল, যেখানে সাহিত্য পৌঁছায়?

এবার ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’ গল্পটির কথা ধরা যাক। ১৯৭৪ সালের ঢাকাকে নিয়ে গল্প। সেখানে আলতাফ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র যে কিনা ঢাকাশহরে মৌজমাস্তিমোটরকারমেয়েমানুষ করে বেড়ায়। তারও আনন্দ প্রদর্শনে; আর এর জন্য সে বেছে নেয় তার পুরনো বন্ধু মফস্বলের গোবেচারা কলেজ শিক্ষক সবুজকে। সবুজের তাড়না হল ঢাকায় বদলির, যেহেতু ওর স্ত্রী-সন্তান ঢাকায় বসবাস করে। ফলে এই নির্বিরোধী চরিত্রটিকে আলতাফের খেয়ালখুশির ঝড়ে বিপন্ন হতে হয়। মনে রাখতে হবে এটি স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা, কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী নয়। ঐ সময়ের যা ইতিহাস তাতে মাহমুদুল হক খোলাসা না করলেও আমরা আঁচ তরতে পারি আলতাফ চরিত্রটি কাদের রিপ্রেজেন্ট করে। তখন রক্ষীবাহিনীর যুগ, আবার গণবাহিনীরও যুগ, আওয়ামী সমাজতন্ত্রের ফিকে প্রতিশ্রুতির সামনে জাসদের তরুণ তুর্কিদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র! বৈশ্বিক ক্ষমতাদ্বন্দ্বটির ছোট একটি রিহার্সাল ঘটানোর জন্য একটা খুব গোছানো পাপেট শো! এমতাবস্থায় আলতাফ চরিত্রটি যার কাছে বদলির তদবির করা যায় অর্থাৎ সে সরকারের কাছের লোক, আবার যে কিনা গলির মুখে ছেড়ে-আসা গাড়ি হাইজ্যাক হয়ে যায় কিনা সেই টেনশনেও থাকে, আবার স্রেফ ইতিবাচক ‘রেসপন্স’ না-পাওয়ায় রিকশারোহী এক অচেনা তরুণীকে গাড়িচাপা দিয়ে অবলীলায় সেই ঘটনাকে ফিলোসোফাইজ করে ফেলে। আলতাফ যেন শুধু তিয়াত্তরের ঢাকা নয়, গোটা সরকারব্যবস্থার প্রতীক হয়ে ফুটেছে এই গল্পে! গাড়িচাপা দিয়ে তরুণীকে খুন করার পর নির্ভার আলতাফ তার উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত বন্ধুকে উপদেশ দিচ্ছে, “ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই।” সত্যিই তো! ভুলে যাওয়ার পর্বতপ্রমাণ ক্ষমতারই প্রমাণ যেন আমরা দিয়েছি বাহাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে। একদলীয় বাকশাল, প্রতিরোধের গণবাহিনী, রিলিফের কম্বলচুরি থেকে পঁচাত্তরের মুজিব হত্যাকাণ্ড সবই আমাদের ভুলে যাওয়ার অপরিসীম ক্ষমতার স্মারক।

এই যে দুই দশকের দুরকম ঢাকার চেহারা আমরা দেখেছি মাহমুদুল হকের গল্পে, তাতে কি অতিরঞ্জন আছে খানিকটা? সমাজবিজ্ঞানী হয়ত বলবেন ’৬৪-র ঢাকাকে একটু বেশি যেন বীভৎস দেখায় ‘সপুরা ও পরাগল’ গল্পে, আবার ইতিহাসবিদ ভাবতে পারেন ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’ গল্পে তিয়াত্তরের যে ঢাকা তা যেন সামান্য বেশি নাটকীয়। এরকম ফয়সালা হলে সেটা তাদেরই, সাহিত্যিকের এই প্রশ্নের জবাব দেবার দায় নেই। দরকারও নেই। আমরাও চাই সাহিত্য অপরাপর জ্ঞানকাণ্ডগুলোকে আরো অনুসন্ধানী করে তুলুক। মাহমুদুল হকের ঢাকা আমার সামনে সে ধরনের পথ খুলে দেয়, দেখতে পাই।

চার.
শুরুর প্রসঙ্গে ফিরি। প্রতিদিনের সাহিত্যই রচনা করেছেন মাহমুদুল হক। সেটা করতে গিয়ে প্রতিদিনের ক্লিশেগুলোকে তিনি তাঁর জাদুকরী ভাষার কারুকাজ দিয়ে রিপু করে দিয়েছেন। বড় একটি ক্যানভাসের এক কোনে তিনি তার ছবি এঁকেছেন, বাদবাকি ক্যানভাসে যা যা আছে বা থাকবে তার সুস্পষ্ট ইশারাসহ। ফলে বাকি ছবিটুকু আঁকার দায়িত্ব পাঠকের ওপর বর্তায়। দৃষ্টান্ত দিই: তাঁর প্রায় সব উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয় কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু সেই মুক্তিযুদ্ধ তাঁর উপন্যাসে সরাসরি নয়, বরং সবসময় কোন-না-কোন ভনিতার আড়ালে হাজির থাকে, হোক সেটা জীবন আমার বোন, কিংবা হোক সেটা খেলাঘর। এইই হল প্রতিদিনের দেখার ভঙ্গি।

আবার, প্রতিদিনের জীবন যতখানি ভাবাদর্শচালিত তারচে অনেক বেশি বৈপরীত্যময়, একঘেঁয়ে, পৌনঃপুনিক এবং অনাবশ্যক সব ডিটেইল-এ ভরা। তাকে সাহিত্যিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য যে অস্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন মাহমুদুল হক সেটি, আগেও বলেছি, তাঁর ভাষা। এই ভাষা নৈরাজ্যের নয়, এই ভাষা এর পাঠককে আক্রমণ করে না, কারণ নিজেই সে ঘোর-আক্রান্ত, ফেননিভ, উপশমমূলক। মাহমুদুল হক তাঁর সময়ের সেই বিরলতম লেখক যিনি জানতেন একমাত্র ভাষাব্যবহারের জাদুতেই পৃথিবী বারবার নবীনা হয়ে ওঠে। প্রতিদিন। চিরদিন।

original post

read more

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ বছর রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এ সময়ের গল্পকাররা

by প্রমা সঞ্চিতা অত্রি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর দেড়শ বছর পরে তাঁর ছোটগল্প নিয়ে কী ভাবছেন এখনকার গল্পলেখকরা? এ সময়ের লেখকদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে কিছু প্রশ্ন রাখা হয়। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা গল্পে কী কী বদল ঘটেছে, রবীন্দ্রগল্পের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
all-in-one.jpg
কোনগুলি, রবীন্দ্রনাথের গল্প দিয়ে তিনি কতটা প্রভাবিত বা আদৌ প্রভাবিত কিনা বা তা কোন বৈশিষ্ট্যে আলাদা এবং তাদের প্রিয় রবীন্দ্র ছোটগল্প কোনগুলি–এ বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। দেখা গেছে, নিজের গল্পে রবীন্দ্রপ্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে গল্পকাররা একেকজন একেক রকম মত প্রকাশ করেছেন। কেউ যেমন নিজের লেখাতে অনেকাংশেই রবীন্দ্রনাথের ছায়া দেখতে পান, তেমনি অনেকেই আবার তাদের লেখায় রবীন্দ্র প্রভাব একেবারে নেই বলেই মনে করেন।

——————————————————-

শফিক রেহমান

shafik-rehman2-11111934.jpg…….
(জন্ম: ১১ নভেম্বর ১৯৩৪)
…….
রবি ঠাকুরের পরে আমাদের দুই বাংলাতেই অনেক ভাল গল্প লেখকের আর্বিভাব ঘটেছে বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় ঔপন্যাসিকের চাইতে গল্পকারই বেশি এসেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। অনেক ভাল ভাল গল্পকার যেমন, সুবোধ ঘোষ, রমাপদ চৌধুরী, বারীন্দ্রনাথ দাস—যাঁর নাম হয়তো সবাই জানেন না, এরকম আরও অনেকেই আছেন। তারপর আরও আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়–যাঁরা একাধারে ঔপন্যাসিকও বটে।

যেহেতু আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তাই আমি বলছি আমি হয়ত বর্তমান রাজনৈতিক ঘটনার উপরেই বেশি লিখেছি, সেটাই আমাকে বেশি চিন্তিত করে।… হয়ত রবিঠাকুরের সময়ে, তাঁর লেখাতে রাজনীতি অতটা ইম্পর্টেন্ট হয়তো ছিল না। যদিও তার কিছু কিছু লেখায় রাজনীতি এসেছে কিন্তু সেটা তুলনামূলকভাবে কম।

তবে একটা জিনিস আমার কাছে যেটা মনে হয় যে, বাংলাদেশে ছোটগল্পটা ঠিক সেইভাবে হয় নি। এটার জন্য আমি চেষ্টা করেছি। ‘যায়যায়দিন’ যখন সাপ্তাহিক ছিল এবং এখন ‘মৌচাকে ঢিল’ এই দুই কাগজের মাধ্যমে আমি চেষ্টা করছি বাংলাদেশে যাতে ছোটগল্পকারের জন্ম হয়। সুখের বিষয় এই যে অনেকেই যারা খ্যাতিমান লেখক নন, মফঃস্বলের লেখক বা লেখিকা, তারা অনেকেই কিন্তু খুব ভাল লিখেছেন। কিছু কিছু গল্প আছে যেগুলো প্রায় ওয়ার্ল্ড ক্লাস হয়েছে, আমি বলব। কিন্তু এদেরকে কিন্তু অনেকেই চেনেন না। একটা নিদিষ্ট গণ্ডির মধ্যে তাদের পরিচয় সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। মোট কথা, এখানে কিন্তু ছোটগল্পকার অনেক হয়েছে এবং যখনই আমরা কোনো বিশেষ সংখ্যা বের করি, সেই সংখ্যাগুলো খুবই জনপ্রিয় হয় এবং তাতে অনেক ভাল ভাল গল্প থাকে। আমার মনে হয় ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক ছোটগল্প আসবে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের এখানে মূলত পরিচিত তাঁর কবিতা ও গানের কারণে। এ ব্যাপারটা ভীষণ লক্ষণীয় যে, আমাদের এখানে সাধারণ মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু গীতিকার ও কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। এর বাইরেও তাঁর যে পরিচয় আছে সেটা কিন্তু সাধারণ মানুষ অতটা জানে না। তিনি যে ছোটগল্প লিখেছেন সেগুলো কিন্তু তাঁর গান বা তাঁর কবিতাগুলোর মত ততটা জনপ্রিয় নয় বা তাঁর গীতিনাট্যগুলোও দেশে-বিদেশে যতটা সমাদৃত ততটা কিন্তু তাঁর উপন্যাস বা ছোটগল্পগুলি নয়। এখন তাঁর ছোটগল্পগুলোকে যদি সেভাবে নাট্যরূপ দেয়া যেত বা সবার মধ্যে পৌঁছে দেয়া যেত তাহলে লোকে হয়ত জানত যে তিনি একজন বড় গল্পলেখকও বটে। কিন্তু সেটা করা হয় নি। ফলে বেশিরভাগ লোক কিন্তু জানেই না যে তিনি একজন গল্পকার। বাংলাদেশে তিনি প্রথমত পরিচিত জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হিসেবে দ্বিতীয়ত গীতাঞ্জলির লেখক হিসেবে এবং তৃতীয়ত তাঁর ‘সঞ্চয়িতা’র জন্য তাঁকে কবি হিসেবে চেনে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে তাঁকে আমরা শুধুমাত্র তাঁর গান ও কবিতার মধ্যেই বেঁধে ফেলেছি। তাঁর কাজগুলোকে আমরা সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। ফলে, তাঁর উপন্যাস বা ছোটগল্প নিয়ে বলতে গেলে কোনো কাজই হয়নি এখানে।

আমার গল্প নিয়ে আমি প্রথমে যে কথাটা বলব সেটা হচ্ছে আমি গল্প বেশি লিখিনি। গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। সময় পেলে লিখতাম। আর যেসব গল্প আমি লিখেছি সেগুলো মূলত রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। আমাদের দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অবস্থা চলছে এবং চারপাশে অস্থির যে সমাজ, সেটাই হয়ত আমার লেখায় চলে এসেছে। সেই ক্ষেত্রে রবিঠাকুরের সাথে আমার ডিফারেন্স। তবে আমি মনে করি যে রবিঠাকুরের সাথে আমার তুলনাই হতে পারে না। এটা একেবারেই ধৃষ্টতা বলে আমি মনে করি। উনার সঙ্গে আমার নাম নেয়াটাই আসলে ঠিক হবে না। এটা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা, ঔদ্ধত্য হবে। এটার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু যেহেতু আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তাই আমি বলছি আমি হয়ত বর্তমান রাজনৈতিক ঘটনার উপরেই বেশি লিখেছি, সেটাই আমাকে বেশি চিন্তিত করে। কারণ, এখানে ষোল কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করছে রাজনীতির উপর। হয়ত রবিঠাকুরের সময়ে, তাঁর লেখাতে রাজনীতি অতটা ইম্পর্টেন্ট হয়তো ছিল না। যদিও তার কিছু কিছু লেখায় রাজনীতি এসেছে কিন্তু সেটা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু আমার লেখায় রাজনীতিই প্রধান উপজীব্য।
আমার প্রিয় রবীন্দ্র ছোটগল্প হচ্ছে কাবুলিওয়ালা, ছোটবেলায় এটা পড়েছিলাম। এটার কথাই এ মুহূর্তে বেশি মনে পড়ছে।

হাসান আজিজুল হক

hassan-a-h-221939.jpg…….
(জন্ম: ০২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯)
…….
রবীন্দ্র পরবর্তীকালে বাংলা ছোটগল্প নানারকম ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। সেগুলো একটু ঘেঁটে দেখলেই ভালমত বোঝা যাবে। পরবর্তীকালের বিশাল গল্পভুবন নিয়ে আলোচনা করার তো এখানে সুযোগ নেই, দুই একটা পতাকা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন, রবীন্দ্রনাথের পরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তারপরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়–এদের কথা চলে আসে। এরপর পরবর্তীকালে আরও কজন বিশিষ্ট ছোটগল্পকার যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, এরকম আরও কয়েকজন আছেন। তারা গল্পের বিষয়বস্ত্তর ক্ষেত্রে ভীষণ রকম বৈচিত্র নিয়ে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্পে সাধারণ মানুষের কথা ছিল, গ্রাম্য সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিল, কিন্তু তারা পেশার দিক থেকে জীবিকার দিক থেকে অনেকটা একইরকম ছিল।

রবীন্দ্রনাথের গল্পে সাধারণ মানুষের কথা ছিল, গ্রাম্য সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিল, কিন্তু তারা পেশার দিক থেকে জীবিকার দিক থেকে অনেকটা একইরকম ছিল।… ভাষার দিক থেকেও রবীন্দ্রনাথের যে—অসাধারণ, অতিশয় উচ্চমার্গের যে ভাষা ছিল, যে ভীষণ মাধুর্যময় ভাষা ছিল, তাতে অনেকে এ অভিযোগও করতে পারে যে যতটা বিশাল কান্তি ছিল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে, যতটা কান্তি ও সৌন্দর্য ছিল তার ভাষায়, তার পেশি অতটা জোরালো ছিল না।

কিন্তু পরবর্তীকালের গল্পে বিচিত্র মানুষের সমাবেশ হয়েছে, সমাজের নানা স্তরের মানুষের সমাবেশ হয়েছে। একেবারে কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ যেমন আছে, একেবারে গ্রাম্য অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকেদের কথাও আছে। এই যে ব্যাপারটা, সেটা কিন্তু রবীন্দ্র পরবর্তীকালে–এটা ঘটেছে। আবার ভাষার দিক থেকেও রবীন্দ্রনাথের যে—অসাধারণ, অতিশয় উচ্চমার্গের যে ভাষা ছিল, যে ভীষণ মাধুর্যময় ভাষা ছিল, তাতে অনেকে এ অভিযোগও করতে পারে যে যতটা বিশাল কান্তি ছিল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে, যতটা কান্তি ও সৌন্দর্য ছিল তার ভাষায়, তার পেশি অতটা জোরালো ছিল না—এ অভিযোগ কেউ করতেও পারেন। রবীন্দ্র পরবর্তী কালের গল্পে ভাষাতে অনেক পেশি যোগ হয়েছে আর অনেক মাংসও যোগ হয়েছে, কিন্তু হয়ত অত মাধুর্য নেই, অত সৌন্দর্য নেই।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, মানবিকতার যে বিশুদ্ধ রূপ রবীন্দনাথ তুলে ধরেছেন তাঁর ছোটগল্পে, আমি বলব এটাই তার গল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। যা পরবর্তীকালের লেখকরা পারেন নি। পরবর্তীকালে মানবিকতার চাইতে মানুষের রূপটাতেই আরেকটু বেশি জোর পড়েছে। যে মানুষ কামনা-বাসনা দ্বারা ক্ষুব্ধ, তাদের কথাই একটু জোরালোভাবে এসেছে।

রবীন্দ্র ছোটগল্প থেকে আমার ছোটগল্প কতটুকু বের হয়ে এসেছে বা আদৌ এসেছে কিনা সেটা আমার চাইতে সমালোচকরাই ভাল বলতে পারবেন বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে আমার কোন মত নেই। এই দায়িত্বটা আমি আমার গল্পের পাঠকদের উপরেই দিতে চাই। তারাই এটা বিচার করুক। আমি যখন গল্প লিখি, আমার মনের মধ্যে তখন কত লোক যে বিচরণ করেন–তার কি কোন ঠিক আছে! লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে, রবীন্দ্রনাথ আছে, অন্য আরও সাহিত্যিকেরা আছে, ফলে কখন যে কার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি বা হইনি তা বলা মুশকিল। আরেকটা কথা সেটা হচ্ছে আমি আমার লেখালেখি শুরু করার পরেও অনেক সময়কাল পর্যন্ত বাংলা ছোটগল্পের সাথে আমার ফরমাল পরিচয় যাকে বলে, সেটা ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও ততদিনে আমি আমার গল্পগুলো লেখা শুরু করে দিয়েছি। তার মানে একদিক থেকে বাংলা ছোটগল্পের ঐতিহ্যের ধারাটাকে আমি যে ঠিক অনুসরণ করেছি আমার লেখার ব্যাপারে, এটা বলাই যাবে না। এক অর্থে আমি নিজের ইঞ্জিনে নিজেই কয়লা দিয়েছি এবং সেই কয়লা থেকে যে বাষ্প বেড়িয়েছে তা দিয়েই আমার ইঞ্জিনটাকে চালানোর চেষ্টা করেছি। তবে পরবর্তীকালে অনেক কিছু পড়েছি, জেনেছি; ফলে কারও কারও ছাপ আমার লেখার মধ্যে পড়তেও পারে, সেটা অস্বীকার করছি না। অনেক প্রিয় লেখক আছেন যাদের দ্বারা হয়ত প্রভাবিত হয়েছি কিন্তু সেটা আমার চাইতে আমার সমালোচকেরাই বেশি ভাল বলতে পারবেন বলে আমার ধারনা।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে প্রায় শ’খানেক গল্প আছে। এর মাঝে পাঁচ সাতটা গল্প আছে যেগুলো আমার কোনদিনই পড়া হয় নাই। এছাড়া অন্য যে গল্পগুলো আছে, সেগুলো বেশিরভাগই আমার অনেকবার করে পড়া হয়েছে। এর মাঝে আমার, বেশ কিছু গল্প আছে খুব পছন্দের, যেমন পোস্টমাস্টার, ছুটি, কাবুলিওয়ালা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, সম্পত্তি সমর্পণ, দেনা পাওনা, মণিহার ইত্যাদি। তবে আমার কাছে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ও ‘শাস্তি’ গল্প দুটিকে রবীন্দ্রনাথের অন্যতম দুটি শ্রেষ্ঠ গল্প বলে মনে হয়।

হাসনাত আবদুল হাই

hasnat-a-h-491939.jpg…….
(জন্ম: ০৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯)
…….
রবীন্দ্র পরবর্তীকালে বাংলা ছোটগল্পের বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমত পরিবর্তন এসেছে কাহিনী বা পটভূমির দিক দিয়ে। অধিকাংশ রবীন্দ্র ছোটগল্পের পটভূমি ছিল গ্রাম। গ্রামই ছিল তাঁর গল্পের প্রাণ। গ্রামের সৌন্দর্য ও গ্রামীণ জীবন তাঁর মত করে আর কেউ বর্ণনা করতে পারেনি। পরবর্তী কালের গল্পকারদের ক্ষেত্রে শহরকে পটভূমি করেই গল্প লেখার প্রবণতাটা বেশি দেখা গেছে। আরেকটা পরিবর্তন এসেছে গল্প বলার ধরনে। সেটা হচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলোতে গল্প বর্ণনার ভঙ্গিটি ছিল সরাসরি। কিন্তু এখন সরাসরিভাবে বয়ান না করে একটু পরোক্ষভাবে গল্প বয়ানের রীতি প্রচলিত হয়েছে। তাছাড়া উনি গল্প লিখেছেন বিশ শতকের গোড়ার দিকে। সে সময়ের সমাজ বাস্তবতার সাথে তাঁর পরবর্তীকালের সমাজ বাস্তবতার ছিল বিস্তর ফারাক। সে বিষয়গুলোও তাঁর গল্পের থেকে পরবর্তীকালের রচিত গল্পগুলোর মাঝে পার্থক্য তৈরি করেছে। পরবর্তীকালে গল্পের চরিত্রগুলোর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে এবং গল্পের বিষয়বস্ত্ততেও অনেক বৈচিত্র এসেছে। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট চরিত্রগুলো ছিল সহজ-সরল ও ন্যায়বান কিন্তু পরবর্তীকালে চরিত্র চিত্রণে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার এসেছে। চরিত্রগুলোর মাঝে অনেক জটিলতা ঢুকে পড়েছে। গল্পকারের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তনের সাথে গল্পের স্বরূপও পাল্টে যাচ্ছে। মোটকথা রবীন্দ্রনাথের প্রয়াতকাল পরবর্তী এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ছোটগল্পের বেশ কিছু বাঁক বদল ঘটেছে।

উনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে অনেক কথা বলেছেন।… মূলত এই বিষয়টাই ছিল তাঁর ছোটগল্পের মূল উপজীব্য।… সহজ চোখে সরলভাবে যা দেখতেন তাই তাঁর গল্পে তুলে ধরতেন। এখন আমরা অনেক বাইরের পত্র-পত্রিকা পড়ি, ওগুলো দ্বারা প্রভাবিত হই…।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। মানব মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো তিনি অনেক আন্তরিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। মূলত এই বিষয়টাই ছিল তাঁর ছোটগল্পের মূল উপজীব্য। যেমন, পোষ্টমাস্টার গল্পে তারপর সমাপ্তি, হৈমন্তি এইসব গল্পগুলোতেও তাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্র কিংবা বঙ্কিমের গল্পে এ ব্যাপারটা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল উনি তাঁর গল্প নিয়ে অতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন না। চারপশের বাস্তব জীবন থেকেই তিনি তাঁর গল্পের রসদ জোগাড় করতেন। সহজ চোখে সরলভাবে যা দেখতেন তাই তাঁর গল্পে তুলে ধরতেন। এখন আমরা অনেক বাইরের পত্র-পত্রিকা পড়ি, ওগুলো দ্বারা প্রভাবিত হই, কিন্তু তাঁর সময়ে তো তিনি এত পত্র পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাননি, কিংবা পেলেও তা এখনকার তুলনায় অনেক কম।ফলে এই বিষয়গুলো তাঁর ভিতর খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আমার ছোটগল্প থেকে আমি বলব অনেক দিক দিয়েই অন্যরকম। আমি এবং আমার যারা সমসাময়িক তারা প্রায় সবাই থাকি শহরে। তাই আমাদের গল্পগুলো হয় অধিকাংশই নগরকেন্দ্রিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায় তাঁর গল্পগুলো প্রায় সবই কিন্তু গ্রামীণ জীবন নিয়ে লেখা। এখানেই একটা বড় পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি। আর আরেকটা পার্থক্য যেটা আছে সেটা হল ভাষা এবং বর্ণনাভঙ্গীতে। উনার গল্প বর্ণনার ধরন এবং ভাষার ব্যবহার এখনকার লেখকদের চেয়ে তো অবশ্যই অনেক আলাদা।

আমার প্রিয় রবীন্দ্র ছোটগল্প হচ্ছে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’।

আবদুশ শাকুর

shakoor-2521941.jpg…….
(জন্ম: ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১)
…….
আমার কাছে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ছোটগল্পে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে, ছোটগল্পের আকৃতিতে-প্রকৃতিতে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাঠামোর বাইরে গিয়ে গল্প নিয়ে যত প্রচেষ্টা হয়েছে সে অনুপাতে সার্থকতা ততটা আসেনি। ততটা স্থায়ী মানের বা স্থায়ী গদ্যের ছোটগল্প রচিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথের পরে প্রেমেন্দ্র মিত্রকেই একমাত্র বলা যায় সত্যিকারের নতুন গল্পকার। কিন্তু এরকম খুব কমই দেখা গেছে। প্রমথ চৌধুরী ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ছোটগল্পকে ছোট হতে হবে এবং গল্প হতে হবে। এই দু’টিই শর্ত।’ কিন্তু পরবর্তী কালের গল্পকারদের গল্পে আর গল্পত্ব থাকেনি। তারা ভেবেছেন গল্পের অ্যাখানভাগ অত বেশি থাকলে সার্থক ছোটগল্প হয় না, ওটা গল্প হয়ে যায়। তাই তারা অ্যাখানভাগ একদম কমিয়ে দিতে দিতে প্রায় একরকম বাদই দিয়ে ফেলছেন। এজন্যে এখনকার গল্পকারদের গল্পে আর গল্প থাকে না। থাকে শুধু কথা আর কথা, ব্যাখ্যা আর ব্যাখ্যা, কাব্যিয়ানা আর কাব্যিয়ানা, এইসব। গল্পত্ব অল্পই থাকে।

পরবর্তী কালের গল্পকারদের গল্পে আর গল্পত্ব থাকেনি। তারা ভেবেছেন গল্পের অ্যাখানভাগ অত বেশি থাকলে সার্থক ছোটগল্প হয় না, ওটা গল্প হয়ে যায়। তাই তারা অ্যাখানভাগ একদম কমিয়ে দিতে দিতে প্রায় একরকম বাদই দিয়ে ফেলছেন। এজন্যে এখনকার গল্পকারদের গল্পে আর গল্প থাকে না। থাকে শুধু কথা আর কথা, ব্যাখ্যা আর ব্যাখ্যা, কাব্যিয়ানা আর কাব্যিয়ানা…। গল্পত্ব অল্পই থাকে।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তা গ্রামবাংলার প্রাণের কথা বলে এবং তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই এসব গল্প রচিত হওয়া বলেই তা গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে একেবারে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ একটা ধারণা তুলে ধরে। পল্লিগ্রামের যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশা, সংস্কার, কুসংস্কার সবই এসেছে তাঁর গল্পে। বলা হয়ে থাকে সব মিলিয়ে তাঁর ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় পঁচাশি বা মতান্তরে নব্বইয়ের উপর। তাছাড়া তাঁর ছোটগল্পের নানারকম ভ্যালুয়েশন বা আমরা যাকে বলি মূল্য সংযোজন, সেটা হয়েছে। বলতে গেলে তিনিই তো বাংলা ভাষার প্রথম ছোটগল্পকার। সুতরাং ছোটগল্পকে তিনি গড়েছেন নিজের হাতে, নানা রূপে।

আমার ছোটগল্পগুলো রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের থেকে প্রথমত ভাষার দিক দিয়ে অন্যরকম। আমি তো একেবারে প্রবন্ধের ভাষায় গল্প লিখি আর উনি একেবারে প্রাঞ্জল, সহজ-সরল ভাষায় গল্প লিখেছেন। আর তাছাড়া প্রতিটা মানুষই তো স্বতন্ত্র ফলে দেখার ভঙ্গিতে কিছুটা তফাৎ আছে, কালের প্রেক্ষিতে দৃষ্টিভঙ্গির যে পার্থক্য হয় সেটাও আছে। যেমন, আমার গল্পে সমাজতন্ত্র অনেক বেশি আসে, উনার গল্পের চাইতে; তারপর তাঁর গল্পে মানবিকতা বেশি আর আমার গল্পে সমাজবাস্তবতা বেশি।

তাঁর অনেক গল্পই আছে যেগুলো ভাল লাগে। নানা বিষয়ের উপরেই তো তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে ঘাটের কথা, ক্ষুধিত পাষাণ তারপরে পোষ্টমাস্টার, শাস্তি-এই গল্পগুলো বেশি পড়া হয়েছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

syed-manjurul-i-1811951.jpg…….
(জন্ম: ১৮ জানুয়ারি ১৯৫১)
…….
রবীন্দ্র ছোটগল্পের একটা ধারা আর তার পরবর্তী ছোটগল্পের যে ধারা দুটি প্রায় ভিন্ন দুটি ধারা। রবীন্দ্রনাথের পরে সমাজ বাস্তবতা পাল্টেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টেছে, বৈশ্বিক বাস্তবতা পাল্টেছে; তারপর ছোটগল্পের ধরনে অনেকগুলো পরিবর্তন এসেছে যেমন এক সময় তো বাস্তববাদী যুগ ছিল তারপর আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথ নিজেও লিখেছেন, অনেক ধরনের শৈলী ব্যবহার করেছেন। আধুনিক কাল পরিবর্তিত হয়ে উত্তরাধুনিক কালে গেছে, আখ্যানধর্মিতার পরিবর্তন এসেছে। ফলে রবীন্দ্রনাথের পরে ছোটগল্পে অনেকরকম পরিবর্তন এসেছে। বিষয়বস্ত্ততে হয়ত কয়েকটা ব্যাপার আছে যা চিরন্তন, কিন্তু তারপরও সমাজ বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়বস্ত্ততে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই যে দেশবিভাগ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, এ বিষয়গুলো ছোটগল্পের মধ্যে চলে এসেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। এগুলি তো রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতায় ছিল না। তারপর যেটা হচ্ছে যে–শৈলীতে এবং আখ্যান বয়ানভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। তো এইটাই খুব স্বাভাবিক।

তিনি কিন্তু খুব বড় পরিসরে গল্প লেখেননি। তাঁর গল্পের পাত্র-পাত্রীরা সবাই খুব সাধারণ।… তাঁর গল্পের যে ভাষা সেটি অত্যন্ত চমৎকার ও সংবেদনশীল একটি ভাষা। তাঁর চরিত্র চিত্রায়ন অসম্ভব কুশলতাপূর্ণ।… তাঁর এক চরিত্রের সঙ্গে আরেক চরিত্রের যে সম্পর্ক স্থাপন পদ্ধতি তা এত চমৎকার যে মনে হয় এর কোন বিকল্প নেই।… তাঁর ছোটগল্পের ভুবন একেবারেই আমাদের জানাশোনা অন্তরঙ্গ একটি ভুবন। যে ভুবনে তিনি আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে যান। তিনি কখনো পাঠকদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেন না। উনি যেন তাঁর হাত ধরিয়ে আমাদেরকে তাঁর গল্পের ভুবন দিয়ে হাঁটান!

রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর ছোটগল্পের একটা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন যে, ছোট ছোট দুঃখকথা থাকবে, নিতান্তই সহজ-সরল হবে অর্থাৎ খুব বেশি বাগাড়ম্বর থাকবে না, আর শৈলীর নামে শৈলী নির্ভরতাটা থাকবে না। ছোটগল্পের ভুবনটা হবে এরকম যে একটা আখ্যান থাকবে এবং যে ভাষাটি ব্যবহৃত হবে সেটি হবে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটা ভাষা, যেটি পণ্ডিতি বা পোশাকি ভাষা নয়, যে ভাষাটি মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে আর সবচেয়ে বড় জিনিস–যেটা তিনি বলেছিলেন—যে, ছোটগল্পের অভিঘাতটা হবে যে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ। এটা রবীন্দ্রনাথের চমৎকার একটা অভিঘাত যে, তিনি বলে যাচ্ছেন আর আমরা গল্পটা পড়ছি এবং একবার পড়ার পর মনে হয় যেন আবার পড়ি! কিছুতেই যেন আমাদের মনে হচ্ছে না যে গল্পটা শেষ হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাটা আসলে আবেগের, অনুভূতির। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তাঁর অধিকাংশ গল্পই রচিত হয়েছে মানুষের ছোট ছোট অনুভূতির জায়গাগুলোকে নিয়ে। তিনি কিন্তু খুব বড় পরিসরে গল্প লেখেননি। তাঁর গল্পের পাত্র-পাত্রীরা সবাই খুব সাধারণ। মধ্যবিত্ত পরিবার, গ্রামের মানুষ এরাই তাঁর গল্পের চরিত্র হয়ে এসেছে ঘুরে ফিরে। আমাদের চারপাশে অভিজ্ঞতার যে সাধারণ পরিমণ্ডল এর থেকে খুব একটা বাইরে তিনি যাননি । সে অর্থে বলা যায়, তাঁর গল্পের বিষয়বস্ত্ত আমাদের একেবারেই অন্তরঙ্গ একটা বিষয়বস্ত্ত। আরেকটা দিক যেটা–সেটা হচ্ছে, তাঁর ভাষা। তাঁর গল্পের যে ভাষা সেটি অত্যন্ত চমৎকার ও সংবেদনশীল একটি ভাষা। তাঁর চরিত্র চিত্রায়ন অসম্ভব কুশলতাপূর্ণ। প্রতিটা চরিত্রই অত্যন্ত জীবন্ত বলে মনে হয়। তারপরে তাঁর এক চরিত্রের সঙ্গে আরেক চরিত্রের যে সম্পর্ক স্থাপন পদ্ধতি তা এত চমৎকার যে মনে হয় এর কোন বিকল্প নেই। একেবারে নির্বিকল্প একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর সেই পারদর্শিতাটি। সব মিলিয়ে আমি বলব যে তাঁর ছোটগল্পের ভুবন একেবারেই আমাদের জানাশোনা অন্তরঙ্গ একটি ভুবন। যে ভুবনে তিনি আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে যান। তিনি কখনো পাঠকদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেন না। উনি যেন তাঁর হাত ধরিয়ে আমাদেরকে তাঁর গল্পের ভুবন দিয়ে হাঁটান! এ বিষয়টা আমার কাছে অনেক বড় একটা ব্যাপার বলে মনে হয়।

আমার নিজের লেখার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বরাবরই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। শুধু আমি না আমার মনে হয় যিনিই বাংলা ভাষায় ছোটগল্প লিখবেন এবং যে শৈলীতেই লিখুন না কেন তিনি রবীন্দ্রনাথের থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। তাঁকে অনুসরণ করবেন না, কারণ অনুসরণ করার আসলে কিছু নেই। তিনি এমন একজন মানুষ যাকে অনুসরণ করতে গেলে তাঁর পদচিহ্নের মধ্যেই আটকে থাকতে হবে। আমি আমার দু’টো বিষয়ে মনে করি যে রবীন্দ্রনাথের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। একটা হচ্ছে যে গল্পের ভেতরে একটা গল্প থাকতে হয়। আমি চেষ্টা করেছি গল্পটাকে শুধু অন্তঃসার শূন্য না, শুধু বাগাড়ম্বর বা কথার সর্বস্বতা না বা শুধু শৈলীর সর্বস্বতায় আমি কখনো বিশ্বাস করিনি। তাঁর প্রতিটা গল্পের ভিতরে একটা গল্প থাকে যা আমাকে সবসময়ই খুব অনুপ্রাণিত করে। আর দ্বিতীয় হচ্ছে তাঁর চরিত্রায়ন। অত্যন্ত জীবন্ত তাঁর চরিত্রায়ণ। জীবন্ত, এজন্য যে তাঁর প্রতিটা চরিত্রই জীবন থেকে নেয়া। বাস্তব চরিত্র। কোন আরোপিত বা একেবারে মনগড়া কোন চরিত্র তাঁর গল্পের মাঝে নেই। এই যে জীবনের সাথে সম্পর্কিত চরিত্র, প্রতিদিনের গল্পের ভিতর জেগে উঠা চরিত্র, এটি আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়।

তবে আমার লেখার আরও কিছু বিষয় আছে, যেমন জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা, যেটা রবীন্দ্রনাথের গল্পে এভাবে ছিল না। তিনিও কাজ করেছেন পরাবাস্তবতা নিয়ে যেমন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে, কিন্তু আমার গল্পে আমি জাদুবাস্তবতার যে বিষয়টা সেটা ব্যবহার করেছি বাস্তবতার অনুষঙ্গ হিসেবে, বাস্তবেরই একটা সম্প্রসারণ হিসেবে। এই একটা দিকই আমি বলতে পারব যে আমি বেরিয়ে এসেছি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প থেকে। আর দ্বিতীয় আরেকটা ব্যাপার আছে সেটা হচ্ছে ভাষার দিক থেকে। আমি আমার লেখায় আমার একেবারে আঞ্চলিক ভাষাটাও মাঝে মাঝে ব্যবহার করি। যেটা রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় একেবারেই করেননি। তবে একথা আমি আবারও বলি যে, রবীন্দ্রনাথের সাথে আমার তুলনা আমি কোন ক্রমেই করতে চাই না। কারণ একেবারে হিমালয়ের সাথে একটা মাটির ঢিবির তুলনাটা শুধু আকৃতিগতভাবে একটা খুব বিপর্যয়েরই সৃষ্টি করে! আমি তাই সবসময়ই বলি যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের অনুপ্রেরণা।

তাঁর অনেক গল্প আছে যেগুলো মনে দাগ কেটেছে। যেমন, ‘একরাত্রি’ নামে একটা গল্প আছে, অসাধারণ একটা গল্প তারপর ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পটা আমাকে খুবই নাড়া দেয়, যতবার পড়ি আমার কাছে অদ্ভুত লাগে গল্পটা। ‘দান-প্রতিদান’, ‘মনিহার’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘হৈমন্তি’, ‘পোস্টমাষ্টার’–এ গল্পগুলো উনার একেবারে অমর-অজর গল্প। এগুলো কোনোদিন মানুষ ভুলবে না। তারপর তাঁর ‘ল্যাবরেটরি’ উত্তরাধুনিক ধাচেঁর একটা গল্প। এ গল্পটাও বেশ মজার। মোটের উপর, তাঁর লেখা প্রিয় ছোটগল্প আমার এগুলোই।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

karuzzaman-jahangir-3111963.jpg…….
(জন্ম: ৩১ জানুয়ারি ১৯৬৩)
…….
রবীন্দ্র পরবর্তীকালেই শুধু রবীন্দ্র গল্প’র পরিবর্তন হয়নি, বরং তিনি তার কালে–তিনিই তিনার গল্পের অনেক পরিবর্তন করেছেন। ছোট প্রাণ ছোট ব্যথার গল্পকৌশল তিনি নিজেই নড়বড়ে করে দিয়েছেন। নষ্টনীড় আর ল্যাবরেটরি ধরনের গল্পে এসেছে জীবনের বহুমাত্রিক বয়ান। এই সময়ের গল্প, গল্পের জায়গা-জমিন, বলার ধরন, ভাষার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একসময় মনে করা হতো গল্পে গল্প থাকবে, রবীন্দ্রনাথের গল্পে তা ছিলও; এখন গল্পহীন গল্পও হয়, কখনও-বা শুধু অনুভূতির সারাৎসার হয়ে যাচ্ছে গল্প।

তিনি গল্পে একটা নিপুণ কাহিনী বলতে চান, ম্যাসেজ দেয়ার টেন্ডেন্সি তার আছে। ন্যারেটিভ বেশ সরস, পূর্ববাংলার জীবন-জগৎ তার গল্পে চলে আসে। এখানেই তার উপন্যাস আর প্রবন্ধ থেকে তার ভাবময়তা যেন আলাদা। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে তার উপন্যসে পূর্ববাংলার কোনো বিস্তৃত জীবনালেখ্য নেই, ভাব নেই, ভাবযাতনা নেই। তিনি জল-নদী-হাওর-খাল-বিলের এই বঙ্গকে উপন্যাসের যথার্থ চারণভূমি যেন মনে করতে চাননি! তার গল্পের শিক্ষিত চরিত্রসকল প্রায়শঃই উপনিবেশ চৈতন্যকে লালন করে।

তিনি গল্পে একটা নিপুণ কাহিনী বলতে চান, ম্যাসেজ দেয়ার টেন্ডেন্সি তার আছে। ন্যারেটিভ বেশ সরস, পূর্ববাংলার জীবন-জগৎ তার গল্পে চলে আসে। এখানেই তার উপন্যাস আর প্রবন্ধ থেকে তার ভাবময়তা যেন আলাদা। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে তার উপন্যসে পূর্ববাংলার কোনো বিস্তৃত জীবনালেখ্য নেই, ভাব নেই, ভাবযাতনা নেই। তিনি জল-নদী-হাওর-খাল-বিলের এই বঙ্গকে উপন্যাসের যথার্থ চারণভূমি যেন মনে করতে চাননি! তার গল্পের শিক্ষিত চরিত্রসকল প্রায়শঃই উপনিবেশ চৈতন্যকে লালন করে। তার গল্পে জীবনের বহুমাত্রিকতা আছে, আছে ভাষার পরিবর্তন। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষজন, যেমন, চাকর, কৃষক, অবহেলিত নারী, এমনকি বৈরাগী/মুসলমান চরিত্রও তার গল্পে লক্ষ করা যায়।

আমার ছোটগল্প রবীন্দ্র-প্রভাব নেই বলেই ধারণা রাখি। আমার গল্পে জীবন আরও বর্ণিল, বৈচিত্রের ভিতর দিয়ে যাতায়াত করে। কেবল অনুভূতি, কাহিনী, বা ম্যাসেজ আমার গল্পের নিয়ন্ত্রক নয়। আসলে আমার গল্পে কোনো নিয়ন্ত্রণকারী আছে বলেও মনে করি না। একই গল্পে ভাষার চলিত-লৌকিক, এমনকি বৈঠকি মেজাজ থাকতে পারে, অনেক বেশি রাজনৈতিক, সমকালীনতা প্রচণ্ডভাবে আছে বলে আমি মনে করি। আমি আর আমার গল্পচরিত্র বা জীবন আলাদা আছে বলে মনে করতে চাই না। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস-কবিতা-প্রবন্ধ-জমিদারি ইত্যাদির ফাঁকে ফাঁকে গল্প লিখেছেন বলে আমার ধারণা হয়। কিন্তু আমি জীবনের সামগ্রিকতা থেকে গল্পকে আলাদা করতে পারি না। তবে এ কথাও স্বীকার করতে চাই, রবীন্দ্রনাথ গল্পভুবনের এক বিশাল বৃক্ষের নাম, এর ছায়ায় না-এসে কারও উপায়ও নাই।

রবীন্দ্রনাথের প্রিয় গল্প অনেক। বিশেষ করে আমার পাঠকৃত একাডেমিক গল্প নানাভাবে আমায় জারিত করে– এসব হচ্ছে বলাই, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, হৈমন্তি। এর বাইরে বার বার পাঠ করি ক্ষুধিত পাষাণ, নষ্টনীড়, কঙ্কাল, শাস্তি, স্ত্রীর পত্র, জীবিত ও মৃত, একরাত্রি, ল্যাবরেটরি, বোষ্টমি।

শাহাদুজ্জামান

shahaduzzaman.jpg…….
(জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৬২)
…….
আধুনিক ছোটগল্প ব্যাপারটি যখন বিশ্বসাহিত্যে দানা বাঁধছে তার কাছাকাছি সময়েই রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখতে শুরু করেছেন এবং যে গল্পগুলো তিনি লিখেছেন সেগুলো সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যের গল্পগুলোর সমান্তরালে রাখা চলে। বলা চলে একেবারে সূচনা থেকে রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বিশ্বমানের গল্প দিয়েই বাংলা ছোটগল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। ফলে পরবর্তীকালে যারা গল্প লিখতে এসেছেন তাদের একটি বেশ উঁচু মানদণ্ডের বিপরীতে কাজ করতে হয়েছে। তবে ছোটগল্পের বিষয়বস্তু, ভাষা, প্রকরণের যে মানচিত্র রবীন্দ্রনাথ তৈরী করেছিলেন তাঁর সীমানা অতিক্রম করবার চেষ্টা করেছেন পরবর্তীকালের অনেক লেখকই। বেশ কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও রবীন্দ্রনাথের গল্পের প্রধান পাত্রপাত্রীরা শিক্ষিত, সুশীল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর। রবীন্দ্রপরবর্তীকালের অনেক লেখক তাদের গল্পে শ্রেণীর এই সীমা অতিক্রম করেছেন, তাঁরা নিন্মবিত্ত, অন্ত্যজ মানুষের জীবনকে তাদের গল্পে তুলে এনেছেন। আবার রবীন্দ্রভাষা বলয় থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভঙ্গির গল্প লিখেছেন কমলকুমার মজুমদার। গল্পের প্রকরণ পরিবর্তনেরও চেষ্টা চলেছে। আদি-মধ্য-অন্তের ন্যারেটিভকে ভেঙে অ্যান্টি-ন্যারেটিভ গল্প লেখা হয়েছে। সুবিমল মিশ্র প্রমুখ সে চেষ্টা করেছেন। বিশ্বসাহিত্যের নানা নতুন ভাবধারাকে বাংলা গল্পে আনবার চেষ্টা হয়েছে। শহীদুল জহির যেমন যাদুবাস্তবতার ভাবনা এবং প্রকরণের ব্যবহার করেছেন। তবে গল্পের এইসব প্রবণতার কথা মাথায় রেখেও বলা যায় মোটাদাগে পরিসর, থিম, মুহূর্তের সমন্বয়ে অ্যালান পো যাকে বলেছিলেন ‘ইউনিটি অব ইফেক্ট‘, যা ছিলো রবীন্দ্রগল্পের মূল প্রবণতা, তা থেকে বাংলা গল্প ব্যাপক কোনো বাঁক নিয়েছে তা বলা যায় না। রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার মানচিত্রের যে আমূল পরিবর্তন আমরা দেখি গল্পের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না।

রবীন্দ্রনাথ যখন গল্প লিখতে শুরু করেন তখন বিশ্বসাহিত্যের ছোটগল্পের দিকপাল লেখকরা হচ্ছেন সমরসেট মম, অ্যাডগার অ্যালান পো, মোঁপাশা, ও হেনরি প্রমুখ। লক্ষ করি এইসব বিশ্বখ্যাত লেখকদের ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘সারপ্রাইজ’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখতে গিয়ে সে পথে হাঁটেননি। যদিও তাঁর গল্পে সারপ্রাইজ আছে তবে ‘সারপ্রাইজ ইলিমেন্ট’ তার গল্পের প্রধান শক্তি নয়। অপ্রত্যাশিত চমক দিয়ে সাধারণত তাঁর গল্প শেষ হয় না বরং গল্প শেষে পাঠকের জন্য একটা বিশেষ থিমের উসকানি থাকে।

রবীন্দ্রনাথ যখন গল্প লিখতে শুরু করেন তখন বিশ্বসাহিত্যের ছোটগল্পের দিকপাল লেখকরা হচ্ছেন সমরসেট মম, অ্যাডগার অ্যালান পো, মোঁপাশা, ও হেনরি প্রমুখ। লক্ষ করি এইসব বিশ্বখ্যাত লেখকদের ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘সারপ্রাইজ’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখতে গিয়ে সে পথে হাঁটেননি। যদিও তাঁর গল্পে সারপ্রাইজ আছে তবে ‘সারপ্রাইজ ইলিমেন্ট’ তার গল্পের প্রধান শক্তি নয়। অপ্রত্যাশিত চমক দিয়ে সাধারণত তাঁর গল্প শেষ হয় না বরং গল্প শেষে পাঠকের জন্য একটা বিশেষ থিমের উসকানি থাকে। এটি রবীন্দ্রগল্পের বৈশিষ্ট্য।

রবীন্দ্রনাথের গল্পের কাঠামোর একটা ব্যাপার আমি বেশ উপভোগ করি। প্রায়শঃই তাঁর এক গল্পে একাধিক গল্প জুড়ে দেয়া থাকে। রাশান মাত্রিওস্কা পুতুলগুলোর মত এক গল্পের কোঠরে আরেক গল্প গুঁজে দেয়ার টেকনিকটি কৌতূহলোদ্দীপক। কালঘনিষ্ঠতাও তাঁর গল্পের একটি বৈশিষ্ট্য। তাঁর গল্পগুলো তার সমকালের বিবিধ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তাঁর বয়ান বলা যায়। উদীয়মান শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের নানা প্রগলভতা, সামন্ত ক্ষয়িষ্ণুতা, জাতপাত, কন্যাদায়গ্রস্ততা, সাহিত্যিক উন্নাসিকতা, নারী পুরুষ সম্পর্কের পরিবর্তনশীলতা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গকে কখনো কৌতুক, কখনো বিষাদ, কখনো ক্রোধে তিনি উপস্থিত করেছেন তাঁর গল্পে।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়ি কৈশোরে, বেশ গোগ্রাসে পড়েছি মনে আছে। তারপর বহু বছর আর তাঁর গল্প পড়িনি। আমি নিজে যখন গল্প লেখা শুরু করি তখন আমার মনোযোগ ছিলো বিশেষত ল্যাটিন আমেরিকার গল্প পড়ার দিকে আর পড়েছি বাংলা সাহিত্যে সমসাময়িক যারা নানারকম নিরীক্ষাধর্মী গল্প লিখছেন তাদের লেখা। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে যাবার পর আমি আবার মনোযোগের সঙ্গে গল্পগুচ্ছ পড়ি। কৈশোরের সারল্য তখন আর নেই। মগজে মার্ক্সিস্ট ইসথেটিকস, পোস্টমর্ডানিস্ট বিতর্ক। তবু নতুন পাঠেও রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গল্পে আমার মনোযোগ অখণ্ড থাকে। আমার ছোটগল্পের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মিল অমিল আছে কিনা ভেবে দেখিনি। রবীন্দ্রনাথের কাছে ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধের জন্য পৃথক ঘর, আমার এই ঘরগুলোর দেয়াল ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা হয়, চেষ্টা করি। তবে গল্পের ভেতর গল্প, চমকের বদলে গল্পে একটা কোন মুহূর্ত, কোন অমীমাংসিত অনুভূতি, কোন তর্ককে জারি রাখার রবীন্দ্রনাথের চেষ্টাটি আমাকে আকর্ষণ করে। এসবের হয়তো পরোক্ষ প্রভাব আমার গল্পে থেকে থাকতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো অনেক আগে পড়েছি। সবগুলো গল্প মনেও নেই। এ মুহূর্তে প্রিয় গল্প বেছে বলা দুষ্কর। রবীন্দ্রনাথের কিছু গল্প স্কুল পাঠ্যপুস্তকে পড়তে গিয়ে কিম্বা কিছু গল্পের চলচ্চিত্ররূপ দেখতে গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে সেসব গল্প পাঠের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। তবে ভাবতে বসলে কিছু গল্পের ছবি, চরিত্র মনে উঁকি দেয় বৈকি। ‘অতিথি’ গল্পের তারাপদকে মনে পড়ে–যে স্নেহ, প্রেম, বন্ধুত্বের ষড়যন্ত্রবন্ধন জীবনকে ঘিরে ফেলবার আগেই বার বার পালায়; মনে পড়ে ‘একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প’-এ গল্পকে ভেঙে ফেলবার ভঙ্গিটি, চাইলে গল্পটির গায়ে রীতিমত উত্তর আধুনিকতার তকমা পড়ানো যায়; ‘কঙ্কাল’ গল্পে একটি খুলির মুখে প্রেম, হত্যা, আত্মহত্যার বয়ানটিকে যেভাবে সাজানো হয়েছে সেটিও চমৎকার, ‘অপরিচিতা’ গল্পের সপ্রতিভ মেয়ে কল্যাণীকে মনে পড়ে–অন্ধকার প্লাটফর্ম থেকে যার কণ্ঠস্বর শোনা যায় ‘জায়গা আছে’। ‘ঠাকুর দাদা’ গল্পের নিঃস্ব জমিদারের বিত্তের মর্মান্তিক ছলনাটির কথা মনে আছে, মনে আছে ‘দুরাশা’ গল্পে দার্জিলিং এর কুয়াশায় দাঁড়ানো নারী সন্ন্যাসীটির কথা যে সেপাই বিদ্রোহের পক্ষাবলম্বী কুলত্যাগী এক মুসলমান নবাবের; ‘অধ্যাপক’ গল্পের সেই দৃশ্যটি মনে পড়ছে যখন কিরণের শাড়ির আঁচল থেকে তার আধখাওয়া পেয়ারাটি মাটিতে গড়িয়ে পড়লে তার ঐ ‘দংশনচিহ্নিত, অধরচুম্বিত’ পেয়ারাটি হাতে তুলে নেবার জন্য মহীন্দ্রের প্রাণ উচাটন হয়ে ওঠে।

পাপড়ি রহমান

papri-r.jpg…….
(জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৬৪)
…….
রবীন্দ্রনাথের পরে ছোটগল্প কতটুকু পরিবর্তিত হয়েছে একেবারে সঠিক মাপজোক করা মুশকিল। তবে অবশ্যই পরিবর্তিত হয়েছে। এই শতবর্ষের অধিক সময়ে সমাজ, জীবন তথা রাষ্ট্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে ছোটগল্পও বদলে গেছে। ওই সময়টাতে কথাসাহিত্য অধিকাংশই ছিল ভাববাদের আলোকে বাস্তববাদের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি। কিন্তু এখন তো তা নয়। এখন সরাসরি বাস্তবই হয়ে উঠছে শিল্প বা গল্প। রবীন্দ্রনাথ মানব সংসারের যা কিছু কদর্য, হতশ্রী তা আড়ালে আবডালে রাখতেই ভালোবাসতেন। কিন্তু এখনকার ছোটগল্প একেবারে উন্মোচিত। ভয়ানক রুঢ়, কঠিন, নির্লজ্জ্ব, নগ্ন এর প্রকাশ। এই সময়ের ছোটগল্পকাররা অনেক বেশি বাস্তববাদী। সাহসী। জীবনজটিলতাগুলো খোলাখুলিই বলতে চান। ফলে রাখঢাকের বালাই তাদের কম।আমাদের এ সময়ের বেশিরভাগ গল্পই নীতিভ্রষ্টতা, মনোবীক্ষণ, হতাশা, রাজনীতি, ধূসরতা ইত্যাদি নিয়ে আবির্ভূত।আবার কে যে কোথা থেকে কী বা কাকে কিভাবে গল্প করে তুলছেন এটাও বলা মুশকিল। সেদিন একেবারে অনতি তরুণের এক গল্প পড়ে চমকে উঠলাম। গল্পের নাম-বেওয়ারিশ কুকুর, কালার পরোটা এবং একটি ব্যক্তিগত আফসোস।একটা কুকুর ট্রেনে কাটা পড়ার আগে নিজের আধখানা পরোটা খাইয়েছিল কুকুরটিকে।কুকুরের বাকি অংশ যখন একজন আরেকটা চলমান ট্রেনের তলায় দিয়ে এলো, ওই আধখানা পরোটার আফসোস তখনো তার যায়নি! কী জটিল মনঃস্তত্ত্ব ভাবা যায়? তো আগেই বলেছি একেবারে নির্ধারণ করা মুশকিল বদলটা কোথায় বা কতোটা?

ওই সময়টাতে কথাসাহিত্য অধিকাংশই ছিল ভাববাদের আলোকে বাস্তববাদের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি। কিন্তু এখন তো তা নয়। এখন সরাসরি বাস্তবই হয়ে উঠছে শিল্প বা গল্প। রবীন্দ্রনাথ মানব সংসারের যা কিছু কদর্য, হতশ্রী তা আড়ালে আবডালে রাখতেই ভালোবাসতেন। কিন্তু এখনকার ছোটগল্প একেবারে উন্মোচিত। ভয়ানক রুঢ়, কঠিন, নির্লজ্জ্ব, নগ্ন এর প্রকাশ। এই সময়ের ছোটগল্পকাররা অনেক বেশি বাস্তববাদী। সাহসী। জীবনজটিলতাগুলো খোলাখুলিই বলতে চান। ফলে রাখঢাকের বালাই তাদের কম।

উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য না বলে পছন্দনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো বরং বলি। যেমন যে কোনো গল্পের জন্য ভাষা একটা বড় বিষয় আমার কাছে।রবীন্দ্রনাথের গল্পভাষা বেগবান, স্রোতস্বিনী। শান্ত-স্নিগ্ধ শ্রী তে মনোরম তাঁর ভাষা। করুণরসের আধিক্য বেশিরভাগ গল্পেই দেখা যায়। হতে পারে পাঠক আসলে ভেতরে ভেতরে কাঁদতে পছন্দ করে। আমি নিজেও হয়তোবা। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের নিজে যে ব্যাখা দিয়ে গিয়েছেন–‘শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ এই ফ্রেমে আবদ্ধ তাঁর অধিকাংশ গল্পই। বা তাঁর গল্পগুলো গ্রামবাংলার প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে যেভাবে পরিস্ফুট করেছে তা আমাকে ব্যাপক টানে।রবীন্দ্র ছোটগল্পের পাত্র-পাত্রীরা বেশির ভাগই মানবীয় ধর্মে উদ্ভাসিত। ত্যাগ, তিতিক্ষা, বেদনা, অপ্রাপ্তি বা মনস্তত্ত্ব এত বেশি স্পষ্ট যে সেসবও বারংবার স্পর্শ না করে পারে না। ‘নষ্টনীড়ের’ চারুবালা যখন পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে নিজের বেগবান কান্নাকে দমানোর অপচেষ্টা করে, তা এতটাই মৌলিক যে, আমি যেন চাক্ষুস দেখতে পাই। তাছাড়া তাঁর গল্পে উপমা, তুলনা বা চিত্রকল্পের ব্যবহারে যে সাবলীলতা এখনো কেউ তা তেমন সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

আমার গল্প তাঁর গল্প দ্বারা প্রভাবিত কিনা জানতে চাইলে বলব- না, একেবারেই না। যদিও আমার বেশিরভাগ গল্পই গ্রাম নির্ভর। রবীন্দ্রগল্পও তাই। আসলে যে জীবন আমি যাপন করি, তা আমি লিখতে অপছন্দ করি। কারণ আমি মনে করি এতে আমার শ্রম কম দেবার আশংকা থাকে। ফলে আমি বেছে নিয়েছি যা আমাকে কষ্ট করে তুলে আনতে হয়। যদিও আমরা চেতন বা অবচেতনে কারো না কারো লেখার দ্বারা প্রভাবিত হয়েই লিখতে শুরু করি। তবে রবীন্দ্রনাথের গল্প দ্বারা আমার গল্প মোটেও প্রভাবিত নয়। একশ বছরের আগের একজন লেখক দ্বারা আমি প্রভাবিত কেন হবো? আমি অতটা প্রাচীনপন্থী নই, তা সে যত বড় মাপের লেখকই হোক না কেন! আমার গল্প একেবারেই আমার নিজস্ব গল্প। আমার নিজের গল্প। যেমন আমি যদি আমার ‘মঙ্গাক্রান্ত আকালুর মাছ সমাচার’ গল্প প্রসঙ্গে বলি- গর্ভ হওয়া স্ত্রী ভাত বেশি খাচ্ছে বলে স্বামী আকালু প্রায়ই ভাবছে-অই ফুলে ওঠা পেটে যদি বাম পায়ের গোঁড়ালি দিয়ে জোরে একটা যাতা দেয়া যেতো! অথবা পেটটা যদি ফটাশ করে ফেটে যেত-প্রতিদিন নাগরিক সংগ্রামের সাথে আকালু পেরে উঠছে না। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশ ছোঁয়া দামের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গনজেরা বেগমের ভাত বেশি খাওয়া, এই রূঢ় বাস্তবের বীভৎসতা রবীন্দ্রনাথ হয়তো ভাবতেও পারেন নি। সমাজ যে ভাবে বদলেছে তাতে গর্ভ হওয়া স্ত্রীর বেশি ভাত খাওয়াও স্বামী মেনে নিতে পারছে না। আমাদের নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এটা স্বাভাবিক ঘটনা। অথবা আমি যদি আমার ‘শোধ’ গল্পের কথা বলি–স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদে প্রথম স্ত্রী স্বামীর/সতীনের যৌথ বিছানা পেশাবে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা তো আমি পেয়েছি বলেই লিখেছি। ফলে আমি প্রতিবাদের ধরন পালটে দিতে পেরেছি। বা ‘ছহি বড় সোনাভান’ গল্পে–শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তির জন্য বিবাহিত থাকা। কারো জন্য কারো দায় নেই, পরোয়াও নেই–শুধু স্বামীটির ইচ্ছা হলেই সে আসছে। এবং দিনে দুপুরেই আসছে-কারণ সে নাইটগার্ডের চাকরী করে। রাতে তার আসার সময় নেই। বা অন্য কোনো টানও তাঁর নেই। এরকম অনেক নগ্নতা, প্রকট বাস্তবতা, সংগ্রাম, বিবমিষা, দ্রোহ, ক্ষরণ, বেদনা, অস্থিরতা এ সময়ে ক্রিয়াশীল। আমাদের এই জীবনের যাপন কি রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন? দেখেননি। ফলে এইসব নানান মনস্তত্ত্ব তাঁর গল্পে আসেও নি। তাঁর গল্পে আছে তাঁর সময় বা তাঁর জীবন। বা রবীন্দ্রগল্পের যে শান্ত-স্নিগ্ধ শ্রী, যে পরিমিতি বা স্থিতি তা আমার গল্পে নেই। অথবা তাঁর গল্পে যে মনোরম ভাষাভঙ্গিটি, তাও আমার নেই। আমি তো প্রতিনিয়ত যাচ্ছিই অস্থিরতার ভেতর দিয়ে। নগ্নতা, প্রকট বাস্তবতা, বিবমিষা , দ্রোহ, সংগ্রাম, বেদনা, ক্ষরণের ভেতরে থেকে থেকে একজন লেখক তো এমনি লিখবে।হয়তো তাঁর সময়েও এসব ছিল, কিন্তু তা এমন প্রকট দৃশ্যমানভাবে ছিল না। বা তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমন অস্থিরভাবে ছিল না। এখন যেমন আমার চারপাশে আছে। ফলে তাঁর মনোজগত ছিল ভিন্ন। এদিকে আমার মনোজগতও ভিন্ন। স্বাভাবিকভাবেই আমার গল্পের বুনন বা কৌশল, জমিন, বার্তা বা চরিত্র–সবই রবীন্দ্রগল্প থেকে আলাদা হবেই।

যদিও রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য রচনাবলীর চাইতে তাঁর গল্পের প্রতিই আমার অধিক প্রেম, অধিক আসক্তি। সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথের গল্পভাণ্ডার আমাকে মুগ্ধ করে। পরিতৃপ্তও করে। তারপরও কম বেশি পক্ষপাত তো থাকেই। সেক্ষেত্রে বলা যায় – নষ্টনীড়, শাস্তি, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, কংকাল, ল্যাবরেটরী, স্ত্রীর পত্র, মধ্যবর্তিনী ইত্যাদি।

মশিউল আলম

mashiul_alam-26111968.jpg…….
(জন্ম: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৮)
…….
রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা ছোটগল্পের জন্ম এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে। একশ বছরে যে-কোনও সাহিত্য মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন ঘটা স্বাভাবিক। বাংলা ছোটগল্পেও সেটা ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের নিজের গল্পই শুরুর দিকে যেমন ছিল, শেষের দিকে তেমন থাকেনি, বদলে গিয়েছে। তাঁর পরে, বিশেষ করে গত শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশকে প্রচুর গল্প লেখা হয়েছে, সেগুলো আঙ্গিক, কথনভঙ্গি ও বিষয়ের দিক থেকে বিচিত্রমুখী। ষাট দশকের পর থেকে পরিবর্তন আরও বেশি হয়েছে। বাঙালি লেখকরা বিদেশি ছোটগল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সেসবের প্রভাবও পড়েছে। আমার মনে হয়, পরিবর্তন বেশি ঘটেছে ভাষায় ও বর্ণনাভঙ্গিতে।

সহজ সরল ভাষাভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। উপমার ব্যবহার বেশি, এবং তিনি তা করেছেন খুব দক্ষতার সঙ্গে। কাহিনী বিন্যাসে তিনি প্রধানত একরৈখিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাঁর উপন্যাসের মতো তাঁর ছোটগল্প বক্তব্য প্রধান নয়, আইডিয়া-নির্ভর নয়।

রবীন্দ্রনাথের নিজের গল্পই শুরুর দিকে যেমন ছিল, শেষের দিকে তেমন থাকেনি, বদলে গিয়েছে।… সহজ সরল ভাষাভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। উপমার ব্যবহার বেশি, এবং তিনি তা করেছেন খুব দক্ষতার সঙ্গে। কাহিনী বিন্যাসে তিনি প্রধানত একরৈখিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাঁর উপন্যাসের মতো তাঁর ছোটগল্প বক্তব্যপ্রধান নয়, আইডিয়া-নির্ভর নয়।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো যখন প্রথম পড়ি, স্কুলে পড়ার সময়, তখন বেশ নাড়া খেয়েছি। ছুটি গল্পের ফটিকের জন্য কেঁদেছি, কাবুলিওয়ালার জন্য মন খারাপ হয়েছে; খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন গল্পের রাইচরণের দুঃখে দুঃখ পেয়েছি। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথই সেই ছোটগল্পকার, যাঁর অনেকগুলো গল্প অনেক বছর ধরে আমার মনে আছে, অর্থাৎ সেগুলো আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। এখনকার গল্পগুলি তো পড়ার পরেই ভুলে যাই, মনে দাগ কাটে না। আমার নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কোনও প্রভাব পড়েছে কি না ভাবতে গিয়ে এই কথাগুলোই প্রথমে মনে এল। প্রভাব প্রায়শঃ অবচেতন প্রক্রিয়া। আমার গল্প লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যদি কিছু থেকে থাকে, আমি নিজে তা টের পাই না। আর নিজের গল্প নিয়ে আমি যেহেতু পর্যালোচকের মতো করে ভাবিনি, তাই আমার পক্ষে বলা খুব কঠিন সেগুলোতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আছে কি না। তবে সাধারণভাবে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের মেজাজের সঙ্গে আমার মেজাজের মিল নেই। তিনি চির-আনন্দবাদী, আগাপাশতলা সৌন্দর্যবাদী ও আশাবাদী একজন শিল্পী। আমি হয়তো সেরকম নই, আমার মধ্যে সংশয়বাদ, নৈরাশ্য ইত্যাদি আছে। সেকারণে হয়তো আমার গল্পে অনেক মর্বিডিটি এসেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখায় বেশ উইট আছে, রসবোধ অসামান্য ছিল তাঁর। আমার লেখায় এই গুণটার বড্ড অভাব। আমার আগ্রহের বিষয়বস্তুও রবীন্দ্রনাথের থেকে আলাদা। এ ক্ষেত্রে জগদীশ গুপ্ত বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কিছু মিল থেকে থাকতে পারে। কথনশৈলীর দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সময়ের দেশি ও বিদেশি অনেক লেখকের প্রভাব হয়তো আমার ওপর পড়েছে।

আমার প্রিয় রবীন্দ্রছোটগল্প অনেকগুলো। ছুটি, বলাই, কাবুলিওয়ালা, পোস্টমাস্টার, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, হৈমন্তি, এক রাত্রি…। এমনকি ঘাটের কথাও আমার বেশ প্রিয়। প্রথম জীবনের মুগ্ধতার পেছনে কিন্তু কোনও বিচার-বিশ্লেষণ ছিল না। নবীন পাঠকের কচি মনে যে-অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছিল সেটাই প্রধান। তাঁর যেসব গল্প পড়ে আমি আলোড়িত হয়েছিলাম সেগুলো হয়তো তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প নয়।

চঞ্চল আশরাফ

cashraf.jpg…….
(জন্ম: ১২ জানুয়ারি ১৯৬৯)
…….
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তন হয়েছে অনেকখানি। বিশেষত বিষয়ের দিক থেকে, আঙ্গিকের দিক থেকে এবং ভাষার দিক থেকে। সব দিক থেইে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের পরে বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের যে প্রকরণ বা ভাষাশৈলী ছিল সেইটা থেকে বাংলা ছোটগল্প অনেকখানি এগিয়েছে। আজকে কেউ রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে সামনে রেখে গল্প লিখতে বসেন না বা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়ে সেই গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে কেউ রসদ সংগ্রহ করেন বলে আমার মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের গল্প এখন, মানে ইতিহাসগত কারণেই এর এখন একটা গুরুত্ব আছে কিন্তু আমি বলব যে প্রকরণ বৈশিষ্ট্য বা ভাষাগত কারণে এর গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেকখানি কম।

কিন্তু তাই বলে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের যে ঐশ্বর্য তাতে কোন ভাটা পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ যখন ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন তখন সারা পৃথিবীতে তিন চারটা ভাষার বাইরে আর ছোটগল্প লিখিত হত না। সেই অর্থে ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান বিপুল। তা সত্ত্বেও সাহিত্যের যে গতিশীলতা, ছোটগল্পের সে গতিশীলতা সেটার একটা নিজস্ব ধর্ম আছে। সেটা এক জায়গায় স্থির থাকে না, কালে কালে দিক বদলায় এবং এই বদলানো থেকেই বৈচিত্রের সৃষ্টি হয় এবং সেই বৈচিত্রই সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথের পরে যারা গল্প লিখেছেন বিশেষত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দ্বীপন চট্টোপাধ্যায়, তারপর দেবেশ রায় পর্যন্ত যদি আমরা ধরি, এমনকি হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেও যদি আমরা ধরি তাহলে দেখব যে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ছোটগল্প অনেক অনেক দূর এগিয়েছে। আর সেই আগমনটা খুবই সদর্থক।

ইতিহাসগত কারণেই এর এখন একটা গুরুত্ব আছে কিন্তু আমি বলব যে প্রকরণ বৈশিষ্ট্য বা ভাষাগত কারণে এর গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেকখানি কম।… রবীন্দ্রনাথের পরে যারা গল্প লিখেছেন বিশেষত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দ্বীপন চট্টোপাধ্যায়, তারপর দেবেশ রায় পর্যন্ত যদি আমরা ধরি, এমনকি হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেও যদি আমরা ধরি তাহলে দেখব যে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ছোটগল্প অনেক অনেক দূর এগিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মাঝে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং মানুষ প্রকৃতির যে একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ সেই জিনিসটা এত বেশি এসেছে যা আর কোন বাংলা ছোটগল্পে এত বেশি দেখা যায় না। এটা তাঁর গল্পের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। আরেকটা হল রবীন্দ্রনাথ তার ছোটগল্পে অনেক বড় ঘটনা খুব সহজেই বর্ণনা করতে পারতেন। যেমন মৃত্যুর মত একটা বড় ও বেদনাদায়ক ঘটনা রবীন্দ্রনাথ কিন্তু খুব সহজে এবং পরিমিতভাবে বর্ণনা করে গেছেন। তার চরিত্রগুলোর মাঝেও অনেক বৈচিত্র আছে। একেবারে কেরানী থেকে শুরু করে ডাক্তার, অধ্যাপক পর্যন্ত সব রকমের চরিত্রই তাঁর গল্পের মধ্যে আছে। তাঁর চরিত্রগুলো ˆবৈচিত্র্যময় এবং চরিত্রগুলো প্রকাশের মধ্যেও তার অনেক বৈচিত্র্য আছে। তার ঘটনার বিন্যাসে একটা বিশেষ দক্ষতা ও ডিসিপ্লিন বা প্রপোরসনের বিষয়গুলো আছে। এই বিষয়গুলোই তাঁর ছোটগল্পের বিশেষ দিক বলে আমি মনে করি।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের যে ধারা বা যে প্রকৃতি এবং এখনকার ছোটগল্পের যে ধারা বা প্রকৃতি তা একটু আলাদা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এখনকার যে জীবনধারা, এখনকার জীবনের যে জটিলতা সেগুলো তো বিশ শতকের প্রথমার্ধের থেকে একেবারেই আলাদা। মৌলিক বিষয়গুলো যেমন প্রেম, ঘৃণা বা একাকিত্ব এই বিষয়গুলোতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। যদিও মূল বিষয়গুলো এখনও একরকমই আছে কিন্তু পারস্পরিক আচরণের ধরনগুলো পাল্টে গেছে। সেই দিক থেকেও বলতে পারি শুধু আমি কেন আর কেউ যদি গল্প লেখেন এবং যদি একই বিষয় নিয়েও লেখেন তবুও সেটার চেহারাটা ভিন্ন হতে বাধ্য। যদি বাধ্য না হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে যে তাঁর মধ্যে সমকালীনকে ধারন করা এবং তাকে ধাতস্থ করে অতিক্রম করার যে স্বাধীনতা, সেটার অভাব আছে। আর আমার ছোটগল্পের বিষয়ে আমি বলতে পারি যে আমার গল্প রবীন্দ্রনাথ থেকে আলাদা তো বটেই এবং বিষয় ও উপস্থাপনার দিক থেকেও একেবারে স্বতন্ত্র। আমি আমার লেখার ব্যাপারে নিরীক্ষাধর্মী এবং বিষয় নির্বাচনেও আধুনিক। মানুষের দৈনন্দিন জটিলতার যে টার্মগুলো আমার গল্পের বিষয় সেগুলো রবীন্দ্রনাথের ছিল না এবং থাকাটা সম্ভবও ছিল না। কারণ, আধুনিক মানব জীবনের একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা বা বিচ্ছিন্নতাবোধ–এটাই কিন্তু আমার গল্পের মূল বিষয়। আমার চরিত্রগুলোর যে বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং তার সে নিজস্ব একটা অবস্থা, সেখানে তার একটা ক্ষয় আছে, পতন আছে, সে পতন থেকে উত্তরণের আকাংখা আছে, সে আকাঙ্খা মেটাবার সংগ্রাম আছে, এ বিষয়গুলো আমার গল্পে স্থান পেয়েছে। এগুলো আমার মনে হয় না যে রবীন্দ্রনাথের গল্পে এভাবে ছিল। আর আমার ভাষাও তার থেকে আলাদা। আমি মনে করি যে বিষয়-আশয় নিয়ে আমি কাজ করেছি, যে কাল বা যে ব্যক্তি বা যে সমাজকে আমি ধারন করেছি সেটা যেহেতু রবীন্দ্রনাথের ছিল না, ফলে আমার গল্পগুলোও তার মত নয়।

রবীন্দ্রনাথের অনেক ছোটগল্প আছে যেগুলো আমার প্রিয়। তবে চট্ করে আমার মনে আসছে ‘মধ্যবর্তিনী’ গল্পটির কথা। তারপরে ‘শাস্তি’ গল্পটিও আমার প্রিয়। এছাড়া ‘নষ্টনীড় ‘ গল্পটাও আমার আরেকটি প্রিয় গল্প।

সুমন রহমান

sumon_rahman-3011970.jpg…….
(জন্ম: ০৩ জানুয়ারি ১৯৭০)
…….
আমাদের দেশে অধিকাংশ ছোটগল্প মূলত সোশ্যাল রিয়েলিজমের ওপর লেখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ, শেখভ, মোঁপাসা—এরা একেকজন একেকটা চূড়া স্পর্শ করেছেন পৃথিবীতে। তো আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথও তাই। পরে যাঁরা এসেছেন, আমরা যদি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—এদের কথা বলি, তারা বেসিক্যালি সেই ধারাটিকে ফারদার ন্যারিশ করে যাচ্ছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটা লেখা আছে যে, ‘বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে?’ উনি আসলে যে বিষয়টাকে ঈঙ্গিত করেছেন সেটা হচ্ছে যে আসলে ছোটগল্প বলতে আমরা যে ফরম্যাটটাকে বুঝি বা যে ফরম্যাটটাকে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা করা হচ্ছে তাতে আর রহস্য বলে কিছু নাই। এটা প্রকাশিত; অর্থাৎ ছোটগল্প হচ্ছে এখন খুবই প্রকাশিত একটা ফরম্যাট, যে ফরম্যাটে একটা জিনিস ফেলে দিলে তা গল্প হয়ে বেরিয়ে আসে এবং এই প্র্যাকটিসটা আমরা দীর্ঘদিন আমাদের এখানে দেখেছিও। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ওই যে আশংকাটা—ছোটগল্প কি সত্যিই মরে যাচ্ছে, এর প্রমাণ আসলে আমরা পাই আমাদের পরবর্তীকালের ছোটগল্পে। কিন্তু তারপরে বিশ্বসাহিত্যে নান্দনিক চিন্তাভাবনা বোধের কিছু পরিবর্তন ঘটে। এর একটা হচ্ছে ম্যাজিক রিয়েলিজম। ম্যাজিক রিয়েলিজমের প্রভাব আমরা বাংলা ছোটগল্পে পাই শহীদুল জহিরের কিছু গল্পে। আবার অনেকেই আছেন যাঁরা শেখভিয়ান হিউমারকে আশ্রয় করে গল্প লিখেছেন এবং কিছু নতুন ফ্লেভার দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমন শাহাদুজ্জামানের প্রথম দিককার কিছু গল্প। এরা আসলে বাংলা ছোটগল্পকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের জন্যে নতুন যে গল্পের একটা ফর্ম তৈরি করা, সেটা আসলে এযাবৎকাল তেমন সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্টভাবে কেউ করতে পারেননি। এ জায়গাটায় এখনো আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাদের চেষ্টাগুলো আমার মনে হয় আরও সময় গেলে আমরা বুঝতে পারব—যে, এটা আসলে কোন দিকে যাবে। রবীন্দ্র-উত্তর ছোটগল্পে আসলে আমরা এরকম একটি দশার মধ্যে আছি যে, আমরা রবীন্দ্রনাথের সোশ্যাল রিয়েলিজমকে উৎরাতে পারিনি আবার পরবর্তীকালে মার্ক্সিজম প্রভাবিত ছোটগল্প বাহিত সমাজবাস্তবতার বিশ্লেষণের ধারা, যেটাতে একসময় মানিক, তারাশংকর এরা একটা পিক স্পর্শ করেছেন, আমাদের বর্তমান কালের গল্প সেই চূড়ারও বাইরে যেতে পারেনি। ফলে আমার মনে হয় যে, এটা সম্পূর্ণই ফর্মের একটা ক্রাইসিস্, যে ক্রাইসিসটা আমরা এখন ফেইস করছি। তো সে জায়গাতে এখনো আমাদের অনেক হোমওয়ার্ক বাকি আছে এবং সেটা আমাদেরকে করতে হবে।

রবীন্দ্র-উত্তর ছোটগল্পে আসলে আমরা এরকম একটি দশার মধ্যে আছি যে, আমরা রবীন্দ্রনাথের সোশ্যাল রিয়েলিজমকে উৎরাতে পারিনি আবার পরবর্তীকালে মার্ক্সিজম প্রভাবিত ছোটগল্প বাহিত সমাজবাস্তবতার বিশ্লেষণের ধারা, যেটাতে একসময় মানিক, তারাশংকর এরা একটা পিক স্পর্শ করেছেন, আমাদের বর্তমান কালের গল্প সেই চূড়ারও বাইরে যেতে পারেনি। ফলে আমার মনে হয় যে, এটা সম্পূর্ণই ফর্মের একটা ক্রাইসিস্, যে ক্রাইসিসটা আমরা এখন ফেইস করছি।

রবীন্দ্র-উত্তর ছোটগল্পের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যেটা আমার মনে হয়–উনার ছোটগল্প খুব ডিফাইনড। মানে ছোটগল্প কাকে বলে—রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিজেই এটার একটা প্রমাণ যে ছোটগল্প হচ্ছে এরকম। একদম আদর্শ একটা ফরম্যাটের মধ্যে উনি গল্প লিখেছেন। কাজটা তার সমসাময়িক বা একটু সিনিয়র যাঁরা বিশ্বসাহিত্যে শেখভ বা মোঁপাসা তারাও এটা করেছেন যে ছোটগল্প বলে ফর্মটাকে তারা স্ট্যাবলিশ করেছেন। এর আগে আসলে ওই ফর্ম ছিল না। ন্যারেটিভকে ভেঙে, ব্যালাড ফর্মকে ভেঙে ছোটগল্পের যে গদ্য ফর্ম অর্থাৎ আঁটোসাঁটো একটা গদ্য ফর্ম তৈরি করা, সেটা রবীন্দ্রনাথ করেছেন। আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সোশ্যাল রিয়েলিজমের প্র্যাকটিসটা ছিল। উনি ছিলেন সোশ্যাল রিয়েলিস্টিক, ফলে সোসাইটি এবং পারিবারিক যে বাস্তবতা, সে বাস্তবতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার নানারকম নিদর্শন আমরা তার গল্পে পাই। আরেকটা বিষয় হচ্ছে কাব্যিকতা। তাঁর অনেক গল্প আছে খুব কাব্যিক। আবার একেবারেই কাব্যিকতা নেই, এরকম গল্পও তাঁর আছে। আসলে রবীন্দ্রনাথের গল্প কোনো একটা বিষয় টাচ্ করে নাই, এরকম দিক খুব কম আছে। ওই অর্থে রবীন্দ্রনাথ ডেফিনিটলি আমাদের জন্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেও ছোটগল্পের জন্য একটা আদর্শ উদাহরণ।

ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে কাব্যিক সংজ্ঞা আছে, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’, ‘ছোট প্রাণ ছোট কথা’—আমরা সাধারণত এই সংজ্ঞাটাকে ধ্রুব জ্ঞান করেই ছোটগল্প লিখে থাকি। তো আমি আসলে এই সংজ্ঞার বাইরে অবস্থান করছি বলে আমার ধারণা। এটা যে আমি ইচ্ছা করে যাচ্ছি, তা না। আসলে গল্প লিখতে গিয়ে আমি দেখলাম যে আমি আর এই সংজ্ঞার ভেতরে থাকতে পারছি না। তখন আমি আমার গল্প নিয়ে নিজেই ভাবতে শুরু করলাম—যে, আমি কেন ওভাবে গল্প লিখছি। আমি দেখেছি আমার গল্পে আসলে ভিন্ন ভিন্ন দুটা ন্যারেটিভ থাকে। একটা ন্যারেটিভ থাকে–যেটা প্রকাশ্যে গল্পটা বলে, আর আরেকটা ন্যারেটিভ থাকে ওটার আন্ডারনিথ। দুইটা ন্যারেটিভকে আমি প্যারালাল রান করাই বা করতে দেখতে পছন্দ করি এবং দুটা ন্যারেটিভের একটা দ্বন্দ্ব আমার টোটাল গল্পের মধ্যে থাকে। দুটা ন্যারেটিভ কখনো তারা একই কথা বলে আবার কখনো দু’টা ভিন্ন কথা বলে। এরকম একটা বিষয় আমার গল্পের মধ্যে থাকে যেটা আমি আসলে আমার পড়া অন্য কোনো গল্পের মাঝে পাই নি। সেটা শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, তার পরবর্তী বাংলা ছোটগল্পেও এমনকি বাইরের যেসব গল্প আমি পড়েছি সেগুলার মাঝেও আমি খুব রেয়ারলি এরকম ধারা দেখেছি। তো এটা যে আমি খুব কনশাসলি করেছি তা আসলে নয়। আর রবীন্দ্র ছোটগল্পের ব্যাপারে আমি বলব যে আমি রবীন্দ্র ছোটগল্প পড়েছি, তাঁর গল্প অনেক পছন্দও করেছি; কিন্তু ছোটগল্প লেখক হিসেবে যখন আমি ছোটগল্প লিখতে বসি তখন ঠিক রবীন্দ্রনাথ আমার মাথায় থাকে না বা আমি তাঁর কথা ভাবি না। কিন্তু অবশ্যই তাকে আমি অনেক বড় গল্পকার বলে মনে করি। তাই আমার ধারণা আমি আসলে তার দ্বারা প্রভাবিত নই।

তাঁর একটা গল্প আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। গল্পটার নাম ’শাস্তি’। এই গল্পটা তাঁর অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি গল্প। একান্ত নিম্নবর্গের জীবনের একটা ভয়াবহ চিত্র তিনি এখানে তুলে ধরেছেন এবং এত নিপুণভাবে তিনি এটা তুলে ধরেছেন যে তাতে এটা মনেই হয় না যে তিনি ওই শ্রেণীতে নাই; তিনি যে অন্য একটি শ্রেণীর লোক, সেটা মনেই হয় না। যে শ্রেণীতে তিনি কোনোদিনও অধিষ্ঠান করেননি, যে শ্রেণীটি আসলে তাঁর পক্ষে জানালা দিয়ে দেখাও বেশ দুরূহ, সেই শ্রেণীর একটা আলেখ্য এই গল্পে চলে এসেছে এবং এত গভীরভাবে, এত নিবিড়ভাবে এসেছে যে এতে বিস্মিত হতে হয়। এইখানেই হল প্রকৃত সাহিত্যিকের আসল সিদ্ধি।

অদিতি ফাল্গুনী

af.jpg…….
(জন্ম: ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)
…….
রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা ছোটগল্প অবশ্যই অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক,’ বিভূতি ভূষণের ‘পুঁইমাচা,’ প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার,’ অমিয়ভূষণের ‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া,’ হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ,’ ‘শকুন’ বা ‘পাতালে হাসপাতাল’ কিম্বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোঁয়ারি’ বা ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ নাম্নী গল্পগুলোয় বাংলা ছোটগল্পের অনেক পরিবর্তন বা বাঁকবদল আমরা দেখতে পাই। তবে, এখানে একটি ছোট্ট ‘কিন্তু’ থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা যেমন বলেন যে মানুষ তার পিতা-মাতা থেকে কিছুটা আলাদা চেহারা নিয়ে জন্মায় আবার পিতা-মাতার কিছু ছাঁচ বা আদলও থেকে যায়… এভাবে যতই প্রজন্ম যায়, ততই চেহারা আলাদা হয়… কিন্তু, তৃতীয় বা ষষ্ঠ পুরুষে এসে দেখা গেল তিন বা ছয় পুরুষ আগের কোনো পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারীর হুবহু চেহারা পেয়েছে সেই উত্তর পুরুষ বা উত্তর নারী। বংশগতি বিদ্যা বা ডিএনএর এ এক মজার খেলা। সাহিত্যেও এমন বংশগতি বিদ্যা বা ডিএনএ রয়েছে। কাজেই, যতই আমরা সামনে অগ্রসর হই না কেন, হাজার বছর আগের চর্যাপদ, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, বঙ্কিম-শরৎ-রবীন্দ্রনাথ, ‘তিন বন্দ্যোপাধ্যায়,’ ‘দুই মজুমদার (কমল ও অমিয়)’, এপার আর ওপার মিলিয়ে কয়েকজন ‘সৈয়দ (ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক,সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ)’… এই সবার প্রভাবই ছয় প্রজন্ম পরেও আমাদের লেখায় থেকে যাবে। এলিয়ট যখন লেখেন ‘April is the cruellest month, breeding/ Lilacs out of the dead land…’ হয়তো এই চরণে সুদূরতম অপ্রত্যক্ষতায় হলেও ধ্বনিত রয়েছে মধ্যযুগের চসারের ‘Whan that aprill with his shoures soote/ The droghte of march hath perced to the roote…’ কণ্ঠস্বর। ওসিপ মেন্দেলস্তামের কবিতা পুশকিনের থেকে অনেক আলাদা হলেও পুশকিনের কিছু ছাঁচ কিন্তু থেকে যাবে। কবিতায় তাই পূর্ববর্তীদের অনেক শব্দ আমরা ফেলে দিই, অনেক শব্দ ফেলে না দিয়ে নতুন অর্থে ব্যবহার করি। গল্পেও তাই। সাহিত্যে আসলে এভাবে ‘বাইনারি অপোজিট’ করে কিছু বলা যায় না।

পূর্ব বাংলার শিলাইদহের গ্রামাঞ্চলে দশ বছর জীবন যাপনের ফলে গ্রামীণ জীবনের এমন অভিজ্ঞতা ‘জমিদার’ রবীন্দ্রনাথের ছিল যা পরবর্তীকালে মানিক-হাসান-ইলিয়াস সহ বাংলা সাহিত্যের তাবৎ ‘বামপন্থী’ কিন্তু ‘নাগরিক’ লেখকদের নেই (পরবর্তী এই সব লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেই বলছি), কাজেই ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরার স্বামী বা দিনমজুর ছিদামের মত চরিত্র হাজার মার্ক্সবাদ পড়েও অধুনা আমরা যারা ‘মার্ক্সবাদী’ লেখক হবার কথা ভাবি-টাবি… আমরা পারি না! আমাদের অভিজ্ঞতা বা জীবন যাপনের দৌড় ত’ শেষমেশ ঢাকায় শাহবাগ আজিজ মার্কেট বা কলকাতার লেখকদের ক্ষেত্রে হয়তো কফিহাউস।

প্রথমত অসম্ভব সুন্দর অথচ সহজ ভাষাশৈলী, দ্বিতীয়ত পূর্ব বাংলার শিলাইদহের গ্রামাঞ্চলে দশ বছর জীবন যাপনের ফলে গ্রামীণ জীবনের এমন অভিজ্ঞতা ‘জমিদার’ রবীন্দ্রনাথের ছিল যা পরবর্তীকালে মানিক-হাসান-ইলিয়াস সহ বাংলা সাহিত্যের তাবৎ ‘বামপন্থী’ কিন্তু ‘নাগরিক’ লেখকদের নেই (পরবর্তী এই সব লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেই বলছি), কাজেই ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরার স্বামী বা দিনমজুর ছিদামের মত চরিত্র হাজার মার্ক্সবাদ পড়েও অধুনা আমরা যারা ‘মার্ক্সবাদী’ লেখক হবার কথা ভাবি-টাবি… আমরা পারি না! আমাদের অভিজ্ঞতা বা জীবন যাপনের দৌড় ত’ শেষমেশ ঢাকায় শাহবাগ আজিজ মার্কেট বা কলকাতার লেখকদের ক্ষেত্রে হয়তো কফিহাউস। তৃতীয়ত পূর্ব বাংলার সেই সময়কার বিস্তৃত নিসর্গের সাথে গল্পকার রবীন্দ্রনাথের গড়ে ওঠা এক নিবিড় আধ্যাত্মিকতা যা তাঁর গল্পকে একেবারেই ভিন্ন ব্যঞ্জনা দান করেছে তাঁর পূর্ব ও পরবর্তী বাংলা ভাষার অন্য সব গল্পকারদের থেকে। চতুর্থত অসম্ভব কৌতুক ও রসবোধ। পঞ্চমত: ‘বার্ডস আই ভিউ’ থেকে মানব-মানবীর আন্তঃসম্পর্ক ও চরিত্রগুলোর জটিলতা এবং দ্বন্দ্বের মূল্যায়ন।

আসলে সময়, বেড়ে ওঠার পরিবেশ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের অবিভক্ত বাংলা ও ১৯৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ), লৈঙ্গিক ভিন্নতা… নানা কারণেই আমি তো আর রবীন্দ্রনাথের মতো গল্প লিখতে পারব না। চাইলেও তেমন হবে না। কিন্তু, বড় লেখকদের বা নিজ ভাষায় (সম্ভব হলে ভিন্ন ভাষারও) ধ্রুপদী সাহিত্য পাঠের একটা বড় সুবিধা হলো টেবিলে বসে যখন আপনি মাঝে মাঝে আটকে যাবেন… তখন হঠাৎ তাদের একটি লাইন বা ঠিক নির্দিষ্ট কোন লাইনও নয়… ধ্রুপদী লেখকদের ভাষাশৈলী… তাদের লেখায় বর্ণিত মেঘ, রৌদ্র, নদী বা গাছপালার বর্ণনার ব্যঞ্জনাই আবার আপনার কলমকে সচল করতে সাহায্য করবে। আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এক্ষত্রে বলি। ২০০২-এর ঈদ সংখ্যা ‘প্রথম আলো’য় গল্প চাওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝেই ফোন আসে, ‘কী অবস্থা? লেখা কতদূর?’ আমার এই গল্পের নায়িকা হলেন টানবাজার পতিতা পল্লীর এক মুসলিম পতিতা। শৈশবে যে ছিল পর্দানশীন ও ধর্মভীরু। ইসলামী শাস্ত্রমতে ‘শব-ই-বরাত’-এর রাত বা পবিত্রতম রজনী বা সৌভাগ্যের রজনীতে জন্ম বলে তার নাম রাখা হয়েছিল শাবানা। তবে, পতিতা পল্লীর একটি রিচ্যুয়াল হলো শবেবরাতের রাতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী পতিতারা কেউ কোনো খদ্দের গ্রহণ করে না ও গোটা পল্লী ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে। তো গল্পটা লিখতে গিয়ে একটা জায়গায় কলম আটকে আছে দু’দিন। হঠাৎই গল্পগুচ্ছ-এর পাতায় পাতায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় যেমন পড়া যায় যে ‘গাছের পাতায় চঞ্চল রৌদ্র ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি… আমি লিখলাম যে টানবাজারের প্রতিটা ঘরের জানালায় সকালের রোদ ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এরপর আবার ফ্লো চলে এলো। টেরি ঈগলটন একেই বলেন যে তরুণ লেখকরা যখন আটকে যায়, কাঁধের ওপর দেবদূতের মতো পূর্বসুরী লেখকেরা থাকেন। তাঁরাই হাত বাড়িয়ে কাদায় আটকে যাওয়া তরুণ লেখকের গাড়িকে আবার সচল করেন। গল্পগুচ্ছ পড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে সেবার আমি ঐ গল্পটা সত্যিই শেষ করতে পারতাম না! ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক বা অমিয় ভূষণ এমন সাহায্য কতবার করেছেন! সবটা বলবো না বা স্বীকার করবো না… হা হা–বুদ্ধিমান পাঠক পড়লেই বুঝে নেবেন।

গোটা গল্পগুচ্ছই আমার অনেক প্রিয়। আমার শৈশব কৈশোরে আমি সব মিলিয়ে পঞ্চাশ ষাটবারের মতো গোটা বইটা পড়েছি। রবীন্দ্র ও সুকুমার সাহিত্য পড়া থাকলে যে কোন তরুণ ভালো বাংলা লিখতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের সমসাময়িক বা সতীর্থ অনেক লেখকের লেখা পড়েই আমি চোখ বুঁজে বলে দিতে পারি কে বা কারা শৈশবে রবীন্দ্রনাথ ভাল ভাবে পড়েছেন আর কারা পড়েন নি। যারা পড়েছেন তাদের জন্য দৌড়টা সবসময়ই সহজতর হবে।
original post
read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site