by
অ্যাঙ্গেল বয়কম্পিউটার গেমস এক ধরণের সফট্ওয়্যার বা প্রোগ্রাম যার মাধ্যমে ব্যবহারকারী শিক্ষনীয় উপকরণের পাশাপাশি বিনোদন পেয়ে থাকেন। প্রযুক্তির বিকাশ আজ সর্বত্র। আর সেই মাত্রায় কম্পিউটার গেমসে সংযোজিত হয়েছে চোখ ধাঁধানো সব আয়োজন। এটা ঠিক যে, কম্পিউটার গেমস ব্যবহারকারীর আইকিউ অনেকক্ষেত্রে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই গেমসের অপব্যবহার ব্যবহারকারীকে বিপদজনক পথে ঠেলে দেয়। এক প্রকার নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এর ব্যবহারকারী। এই অবস্থায় অসহায় অভিভাবক ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
কম্পিউটার গেমসের ক্রমবিকাশ
প্রথম কম্পিউটার গেমস উন্নয়ন করা হয় ১৯৬১ সালে। এই গেমসের নাম স্পেসওয়ার্ল। মূলত এটি পরিসংখ্যানগত গণনা সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কীবোর্ডের মাধ্যমে কমান্ড প্রয়োগ করে গেমস পরিচালনা করা হতো। এই গেমস সমূহে খুব সাধারন গ্রাফিক্স ছিল। ১৯৮৭ সালের দিকে কম্পিউটারে মাউসের ব্যবহার শুরু হলে কম্পিউটার গেমসে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আর এ সময় থেকে কম্পিউটার গেমস জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৯৩ সালে থ্রিডি গ্রাফিক্স গেমস ‘ডুম’ বাজারে আসে। এটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অবশ্য স্বাভাবিকভাবে কম্পিউটার হার্ডওয়্যারে পরিবর্তন আসতে থাকে। ১৯৯৫ সালে মাইক্রোসফট্ কোম্পানী তার উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের উপযোগী থ্রিডি গেমস উন্নয়ন করে। সুপার মারিও ৬৪ মাইক্রোসফটের এ ধারার একটি গেমস। পারসোনাল কম্পিউটার আরো গতিশীল হয় কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের ব্যাপক পরিবর্তনের মাধ্যমে। ২০০৫ এর শেষের দিকে মাইক্রোসফটের এক্সবক্স ৩৬০ গেমস ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পরে আসে প্লেস্টেশন থ্রি সহ আরো অসংখ্য গেমস। বর্তমান সময়ে কম্পিউটার গেমস অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
কম্পিউটার কেনার মূল উদ্দেশ্য গেমস নয়
কম্পিউটার কেনার মূল উদ্দেশ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে যথাযথ দক্ষতা অর্জন করা। অভিভাবকগণ এ উদ্দেশ্যে সন্তানদের কম্পিউটার কিনে দেন। সন্তান যখন কম্পিউটার গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ে তখন অভিভাবক চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে এ পর্যায়ে অভিভাবকগণের সচেতনতা তার সন্তানকে সঠিক পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে।
ব্যবহারকারী কী পেয়ে থাকেন
কম্পিউটার গেমস শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য। মোটেই তা নয়। এর মাধ্যমে আনন্দ, বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষনীয় বিষয় এবং আইকিউ বাড়ানো যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী বিনোদনের চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। তবে অল্প সংখ্যক ব্যবহারকারী আছেন যারা কম্পিউটার গেমস থেকে শিক্ষনীয় বিষয় এবং আইকিউ বাড়ানোর জন্য সচেষ্ট হন।
কারা কম্পিউটার গেমস খেলেন
মূলত দুই ধরণের ব্যবহারকারী কম্পিউটার গেমস খেলেন। এক. কিশোর- যাদের বয়সসীমা ১২ থেকে ১৭ পর্যন্ত। দুই. শিশু- যাদের বয়সসীমা ৩ থেকে ১০ পর্যন্ত। তবে কিশোরদের নিকট হতে শিশুরা উৎসাহিত হয়ে থাকে। এছাড়া অন্যান্য বয়সের ব্যবহারকারীও রয়েছেন। কিশোরদের নিকট কম্পিউটার গেমস খুবই আকর্ষনীয়।
ইতিবাচক দিকসমূহ
কম্পিউটার গেমস কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি ভার্চুয়াল বিশ্ব যেখানে ব্যবহারকারী কিংবা খেলোয়ার এর সহিত সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে একটি লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হয়। কিছু ক্ষেত্রে কম্পিউটার গেমস থেকে ব্যবহারকারী অবশ্যই সুফল পেয়ে থাকেন। এমন কম্পিউটার গেমস রয়েছে যা উন্নয়নের সময় শিক্ষনীয় বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়। প্রথম কম্পিউটার গেমস গণনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে কম্পিউটার গেমসের অন্যতম দিক হচ্ছে মেথমেটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট বা গাণিতিক উন্নয়ন।
একজন ব্যবহারকারী প্রথমে গেমস অপারেট করতে শিখে। এরপর তার গেমস স্কিলনেস বা দক্ষতা বাড়ে। এরপর গেমসে যে মিশন রয়েছে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। এই চিন্তাধারা ব্যবহারকারী তার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হয় যে, তাকেও জীবনে সফল হতে হবে। সে কৌশল অর্জন করতে শিখে। বিভিন্ন পাজল গেমস বা এ ধরণের গেমস আইকিউ বাড়াতে সহায়তা করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর চিন্তাধারা প্রসারিত হয়। সে নতুন নতুন বিষয় জানতে পারে। যেমন সে জ্যোতির্মন্ডল, গ্যালাক্সি প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে। আবার গেমসে শিক্ষনীয় বিষয় থাকতে পারে। তবে প্রতিটি গেমসে একটি ম্যাসেজ থাকে।
দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমেরিকান সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের শিক্ষা দেওয়ার কম্পিউটার গেমারদের নিযুক্ত করছেন। এর মাধ্যমে তারা কীভাবে কৌশল অর্জন করবেন তা শেখানো হচ্ছে। দ্রুত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এই পদ্ধতিকে কর্তৃপক্ষ সহায়ক মনে করছেন।
কম্পিউটার গেমস কী স্মার্ট করে গড়ে তোলে?
অনেকে মনে করেন, কম্পিউটার গেমস ব্যবহারকারীকে স্মার্ট করে। এটা ঠিক তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। প্রকৃতপক্ষে তারা অধিক বুদ্ধিমান হচ্ছেন এটা ঠিক নয়।
ক্ষতিকারক দিকসমূহ
লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী তাদের অবসর কিংবা মূল্যবান সময় ব্যয় করছে কম্পিউটার গেমস খেলে। তাদের বিশ্বাস তারা নিজেদের উন্নয়ন করছে। আদৌ কি তা সম্ভব হচ্ছে? বরং কম্পিউটার গেমস-এর প্রতি আসক্তি পড়াশুনায় যথেষ্ট ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। যে কোনো আসক্তি ক্ষতিকারক। আর কম্পিউটার গেমসে একবার আসক্তি জন্মালে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এক নাগাড়ে কম্পিউটারের সামনে বসে গেমস খেললে চোখের ক্ষতি হয়। তাছাড়া দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার গেমস খেললে শরীরেও তার প্রভাব পড়ে যা স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর নয়। ব্যবহারকারীর মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়। ব্যবহারকারী বাইরে অর্থাৎ মাঠে খেলতে বরং অন্যুৎসাহিত বোধ করে। ক্রমশ একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই যুদ্ধবিগ্রহ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল কিংবা হিংস্রতা প্রভৃতি বিষয় এসে যায়। শিশু-কিশোররা অনেক সময় সমরাস্ত্রের প্রতি উৎসাহিত হয়। এসব গেমসে থেকে ব্যবহারকারী মনে আক্রমণাত্মক মনোভাব সৃষ্টি হলে তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। মোটকথা, কম্পিউটার গেমসের প্রতি খুব বেশি আসক্তি থাকলে তা সব রকম রুটিন ওয়ার্কে ব্যাঘাত ঘটায়।
অভিভাবকদের দৃষ্টিতে কম্পিউটার গেমস
অধিকাংশ অভিভাবকগণ কম্পিউটার গেমসকে ভালো দৃষ্টিতে দেখছেন না। তাদের দৃষ্টিতে বরং কম্পিউটারের অপব্যবহারই হচ্ছে। তবে এ প্রজন্মের অভিভাবকগণ এ ধারণাকে পুরোপুরিবাবে বিশ্বাস করছেন না। তারা সন্তানকে সময় সচেতন করে গড়ে তুলতে চান। তারা নিয়ম মাফিক কম্পিউটার গেমস খেলতে উৎসাহিত করছেন। অর্থাৎ রুটিন মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
ছাত্রদের দৃষ্টিতে কম্পিউটার গেমস
মেধাবী ছাত্রগণ কম্পিউটার গেমসকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিকারক দৃষ্টিতে না দেখলেও কম্পিউটার গেমসের প্রতি আসক্তিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তবে তারা নিয়মমাফিক এবং ইতিবাচক কম্পিউটার গেমস খেলার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
গবেষকদের দৃষ্টিতে কম্পিউটার গেমস
কম্পিউটার গেমস শিশুদের জন্য বিপদজনক হতে পারে। লন্ডনের সানডে টাইমের একটি প্রতিবেদনে ভায়োলেন্স কম্পিউটার গেমস এবং টিনএজার বালকদের আক্রমণাত্মক মনোভাবের মাঝে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির জন কলওয়েল তাঁর গবেষনায় দেখিয়েছেন, গেমসের কারণে টিনএজার বালকদের মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে ভায়োলেন্স কম্পিউটার গেমস খেলে অভ্যস্ত তারা নিয়মিত কম্পিউটার গেমস খেলে না তাদের অপেক্ষা বেশি আক্রমণ করার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়।
শেষ কথা
কম্পিউটার গেমসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক রয়েছে। এজন্য সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোররা যেনো ভায়োলেন্স অনুশীলন বা আক্রমণাত্মক না হয় সেদিকে অভিভাবকগণ খেয়াল রাখবেন। কোনোভাবে আসক্তি মনোভাব বেড়ে না ওঠার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হতে হবে সবাইকে।
original post