সুইডেনের প্রথম সারির কবি ক্যারিন বোয়ি-এর সাথে বাংলাভাষী পাঠকদের পরিচয় তেমন নেই বললেই চলে। বাংলাভাষী প্রবাসী দুই লেখকের আনুকূল্যে ক্যারিন বোয়ি-এর একগুচ্ছ কবিতা এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়ান্টিফোরডটকমের পাঠকদের জন্য। ক্যারিন সম্পর্কে ভাষ্যটি লিখেছেন অংকুর সাহা এবং কবিতাগুলোর ভাষান্তর করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বলা বাহুল্য যে কবিতাগুলো ডেভিড ম্যাকডাফ-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে।
শুদ্ধতায় ক্লিস্ট কবি ক্যারিন বোয়ি (১৯০০-১৯৪১):চল্লিশ বছরের অসমাপ্ত জীবন-চারটি কাব্যগন্থ; মৃত্যুর পরে অপ্রকাশিত কবিতাগুলি নিয়ে আরো একটি; কিছু গদ্যরচনা, ডায়েরি, সাহিত্য-অনুবাদ; গুটিকয়েক আত্ম জৈবনিক উপন্যাস; আরো একটি রাজনীতি-নিবিড়, ভবিষ্যৎসূচক, অপ্রচলিত ভাবনার পর-শিরশির করা উপন্যাস-এই হ’ল ক্যারিন বোয়ির সাহিত্যজীবন। স্কুলের কোমলতা আর বরফকুচির কাঠিন্য তাঁর সাহিত্যে। সুইডেনের বিংশ শতাব্দীর লেখকদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির, কবি হিসেবে অগ্রগন্য, লেখিকা হিসেবে শ্রেষ্ঠতমা। তাঁকে বাদ দিলে স্ক্যান্তিনেভিয়ার কবিতা অসমাপ্ত থেকে যায়। অথচ শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় দীর্ন তাঁর জীবন, ধর্ম ও রাজনীতির টানা-পড়েনে ক্ষতবিক্ষত তিনি; একদিকে কবিতার কামড়ে অস্থির আর অন্যদিকে রয়েছে ছোট ও বড় নারী ও পুরুষের শরীরী প্রেমে বিহ্বল। বিষন্ন, ভাবুক, উন্মনা, দ্বিধাদীর্ণ এক ট্র্যাজিক চরিত্র।
ক্যারিন এর জন্ম ১৯০০ সালের ২৬ অক্টোবর সুইডেনের গোটেবার্গ শহরে। তাঁর পিতৃপক্ষ জার্মান এবং মাতৃপক্ষ সুইডেনের ১৮৪২ সালের হামবুর্গের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরে ঠাকুর্দা এডুয়ার্ড বোয়ি ভাগ্যা্ন্বেষণে বেরোন এবং ইয়োরোপের নানা দেশ ঘুরে ১৮৪৯ সালে সুইডেনের নাগরিকত্ব নেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফ্রিৎস সিভিল এনজিনিয়ারিং এর ডিগ্রি করলেও সফল হন ইনসিওরেনস এর ব্যবসায়ে। তিনি বয়েসে আঠেরো বছরের কনিষ্ঠ। কর্মচারী সিগনে লিলিয়াস্ট্রান্তকে বিবাহ করেন। ক্যারিন তাঁদের প্রথম সন্তান। ফ্রিৎস মানুষটি ছিলেন আবেগপ্রবণ এবং মানসিক স্থায়ীত্বের অভাব ছিলো তাঁর।
১৯০৯ সালে পরিবারটি ছোট শহর গোটেবার্না ছেড়ে রাজধানী স্টকহোমে উঠে আসেন। নতুন পরিবেশে ও নতুন স্কুলে বালিকা ক্যারিনের মানসিক বিকাশ দ্রুততর হয় এবং পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বন্ধুদের সঙ্গে বসে তিনি উপভোগ করতেন আলেকজান্দার ডুমা (১৮০২-১৮৭০) এইচ জি ওয়েলস (১৮৬৬-১৯৪৬), রাডইসার্ড কিপলিং(১৮৬৫-১৯৩৬) ও মরিস মেটারলিংক (১৮৬২-১৯৪৯) এর কথাসাহিত্য। তাঁর প্রথম কৈশোরে এক অজানা দেশের অজানা কবির লেখা অনূদিত হল সুইডিস ভাষায়-সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মোহিত হলেন তিনি। তবে কবিতার চেয়েও আগ্রহ বাড়লো ভারতীয় পুরান, সংস্কৃত ভাষা ও বৌদ্ধ ধর্মে। একই সময় কার্ল গেলারাপ (১৮৫৭-১৯১৯) নামে এক লেখকের “কামানিতা তীর্থে যায়” নামে একটি উপন্যাস পড়লেন যার পটভূমি ভারত। তিনি স্থির করলেন ভারতবর্ষে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়ে ভিক্ষুনী হবেন। ধর্মে অনুরাগ তাঁর থেকে যায় সারা জীবন, তবে বৌদ্ধ ধর্মের বদলে খ্রীষ্টধর্মে। আমূলপ্রোথিত ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরতর আসঙ্গকামনার জট ছাড়াতে কেটে যায় বাকি জীবন।
স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে গেলেন সনাতন ও ঐতিহ্যময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ঠিক করেছিলেন শিক্ষিকা হবার জন্যে প্রশিক্ষণ নেবেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময় কাটলো ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় এবং গির্জায় উপাসনায়-নিৎসের দর্শনতত্ত্বের আলোচনার পাশাপাশি স্থান পেল রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরভাবনাও। মানবজাতির অন্তহীন দুঃখ কষ্ট কী অপকৃত হবে ঈশ্বরের শীতল করস্পর্শে ? এই সব ভাবনাচিন্তা মাথার মধ্যে জড়ো হয়েই সদ্য কৈশোর পেরোনো নারীর কবিতা রচনার শুরু। এবং যৌন কামনা বাসনার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই একান্ত উপলদ্ধি-তাঁর মনের মানুষেরা মানব নন, মানবী! ১৯২১ সালে তিনি ৪২টি কবিতা নির্বাচন করে “মেঘদল” নামে গ্রন্থের পান্ডুলিপি বানালেন এবং জমা দিলেন স্টকহোমের এক বিখ্যাত প্রকাশকের আপিসে; সাহস পাবার জন্যে সঙ্গে নিয়ে গেলেন মাকে। ছাপা হ’ল কবির প্রথম কাব্যগন্থ-কবির ভালো রয়্যালটি নেই, তবে ২০০ ক্রোনার পারিশ্রমিক রিভিউও মোটের ওপর ভালোই।
চলতে থাকলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-তাঁর প্রিয় বিষয় গ্রিক ভাষা, প্লোটোর মূল রচনাগুলি পড়তে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী। জীবনযাত্রা এবং আনকোরা সব চিন্তাভাবনার জন্যে ছাত্রী মহলে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়-“টিও” তাঁর আদরের ডাকনাম। তাঁর দ্বিতীয় প্রিয় শিক্ষার বিষয়-নর্ডিক ভাষাগুলি। আইসল্যান্ডিক সাহিত্যের কবিতা-সেখানে যুদ্ধ, মহামারী, প্রেম, বীরত্ব সব কিছুরই বাড়াবাড়ি-কিন্তু তাতেই মোহিত ক্যারিন। তৃতীয় প্রিয় বিষয় ইয়োরোপের সাহিত্যের ইতিহাস-কিন্তু বই ধরে ধরে পড়াতেন অধ্যাপক, তাতে তাঁর কল্পনার পাখা মেলতে অসুবিধে। লেখাপড়া ছাড়া সময় কাটে ফ্রয়েড নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্কে এবং সদ্য গড়ে ওঠা ছাত্র ইউনিয়নেরও নেতৃত্বে দেন কিছু দিন।
কলেজ জীবনে তাঁর দুই প্রনয়ী-একজন পুরুষ, কবি নিল্স্ স্ভানবার্গে; অন্য জন নারী বয়েসে সাত বছরের বড়, ধর্মতত্ত্ব ও কলাবিদ্যার ছাত্রী সেনিতা ন্যাটহর্স্ট। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় কাব্যগন্থ “গোপন ভূমি”-সেখানে তাঁর কবিতার স্থাপত্য দৃঢ়তর, প্রকাশভঙ্গী দ্বিধাহীন, কিন্তু কন্ঠস্বর বিষন্ন ও নিরানন্দ। বিষয় বস্তুতে ফ্রয়েডের প্রভাব লক্ষ্য করার মতো-তিনি মানবচেতনার অতলে যেতে উৎসুক। ঈশ্বর ভাবনা খানিকটা অপসৃত তবে রেশ থেকে গেছে তার আনুষঙ্গিকে পাপবোধের। কবিতাগুলির শৈলিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব আইসল্যান্ডের প্রাচীন সাহিত্যের, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় “এডা”র (Edda)।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে কবি যোগ দিলেন র্ক্লাটে (clarte) নামে এক আর্যবাদী, বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী ও ধর্মবিরোধী ছাত্র সংস্থায়। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন তাঁর মানসিকতায় এবং চিন্তাভাবনায় এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখে। তখন ইয়োরোপ সুখর শান্তির আশায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধতায় দুই মহাযুদ্ধের মধ্যে সেই টালমাটাল সময়। সমকামীতার অপরাধবোধ কাটিয়ে কবি হতে চাইলেন স্বাভাবিক ও প্রথাসিদ্ধ। অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা যা করে থাকেন, তিনিও তার থেকে আলাদা হবেন না। ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্বে ও সংকটে কেউ কেউ হয়ে যান নীরব, কিন্তু ক্যারিন হলেন মুখর-ডায়েরির পাতা ভরে উঠলো টাটকা নতুন কবিতায়। ধর্ম, সমাজ ও নিয়মের নিগঢ় থেকে তিনি মুক্তি পেতে চান। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হল তৃতীয় কাবগ্রন্থ “ভিটেমাটি”।
কবিতাগুলির মৌলিকত্ব এবং অভিনবত্ব দেখে আকৃষ্ট হলেন ক্ষিনল্যান্ডের সুইডিশ ভাষার শীর্ষস্থানীয়া ও অকালমৃতা কবি এডিথ সোডারগ্রান (১৮৯২-১৯২৩) এর প্রিয় বান্ধবী সহচরী হেগার ওলসন (১৮৯৩-১৯৭৮)। তিনি স্থানীয় জনপ্রিয় সংবাদপত্রে লিখলেন ”সুইডিশ কবিতায় নবীনতম কন্ঠস্বর” নামে প্রবন্ধ। তাঁর মতে গ্রন্থটি অসাধারণ শুদ্ধতার কবিতা-ডয়লেশহীন ও আবেগহীন, সব সময় যাত্রার জন্যে প্রস্তুত; তাতে ভেজাল নেই, দ্বিধাদোলাচল ভাব নেই - অনুপ্রানিত, সাহসী কবিতা - “ Swallow – that is perhaps the word for Karin Boye’s poetry . It is not strong like the eagle; its wing beat does not have the breadth and boldness-but neither does it belong to the grey and frittering breed of “sparrows” এই আলোচনা ও প্রশংসা একদিকে যেমন কবিমহলে প্রতিষ্ঠা এনে দিল তাঁকে, অন্যদিকে বাড়ালো তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং সঠিক পথে এগিয়ে চলার সাহস।
১৯২৭ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু; পরের বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি ফিরে এলেলন স্টকহোমে- তারপর নিয়মিত মেলামেশা ও সাহিত্য আলোচনা স্থানীয় কবিদের সঙ্গে। ক্লারটের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় হ’ল এবং এবং তিনি তাদের সংস্থার প্রকাশিত সাহিত্যপত্রটির সম্পাদনার ভার নিলেন। লেসবিয়ান যৌন সম্পর্ক বজায় থাকলো তাঁর তবে সামাজিক সুবিধের জন্যে ১৯২৯ সালে তিনি আইনগত বিবাহ করলেন সতীর্থ বামপন্থী কবি লিয়েফ বিয়র্ককে; তিন বছর সববাস করলেন তাঁর ’কাগজের বৌ’ হিসেবে। এই সময় তার প্রেমিকা ছিলেন বিখ্যাত সুইডিশ কবি গুনার একেলফ (১৯০৭-১৯৬৮) এর পত্নী গুনেল বার্নাস্ট্রম। পরে দুজনেই নিজ নিজ বিবাহবন্ধন ত্যাগ করে এক সঙ্গে ঘর বাঁধেন। স্বামীর প্রতি ক্যারিনের ছিলো আবেগতাড়নার ও তীব্রতার অভাব; অনিয়মিত হলেও যৌনসম্পর্ক ছিলো- কিন্তু মানসিক বন্ধন ছিলো না। উভযোনী সম্পর্কের মানসিক দ্বন্ধে তিনি তীব্র অবসাদ রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৩১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রিয় বন্ধুরা পরামর্শ দেন বার্লিন শহরে গিয়ে মন:সমীক্ষণ (সাইকোঅ্যানালিসিস) এর চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে।
১৯৩২ সালে জানুয়ারি মাসে কবি বার্লিনে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে একজন পুরুষ মন:চিকিৎসক, কিন্তু দুমাসের অসহ্য মানসিক যন্ত্রনার পর কোন সুফল না পেয়ে একজন নারী চিকিৎসকের কাছে যান। তাতে খানিকটা সুরাহা হয়। প্রথম জন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন রুগির সম্পর্কে “-এনার ক্ষেত্রে কোন ভালো ফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইনি আর দশ বছর নিজেকে বাঁচতে দেবেন কিনা বলা মুশকিল।”
মানসিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতে তিনি লেগে থাকেন নিয়মিত গদ্য রচনায়। আত্মজৈবনিক উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বোঝাপড়া করতে চান তাঁর মনের অবচেতনার গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে। সমাজে নারী পুরুষের অবস্থান ও তার জটিল মানসিক আন্ত:সম্পর্ক তাঁর বিষয়বস্তু। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “আস্টার্টে” (Astarte)–গ্রিক পুরাণের উর্বরতা, যৌনতা সামরিক বাহিনীর আরাধ্য দেবীর নামে। প্রভাবময়ী ও শক্তিশালী নারীচরিত্রের উপাসনায় ক্ষীণজীবী দুর্বল পুরুষ চরিত্রেরা। ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয় আত্মজৈবনিক উপন্যাস “প্রতিভার জাগরণ”-নারী পুরুষ সম্পর্কের জটিল সন্দর্ভ। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস “সংকট” এর মূল চরিত্র তিনি নিজে: ধর্ম বিশ্বাস ও তার কঠিন অনুশাসন বনাম যৌবনজ্বালা এবং নারী শরীরের প্রতি তীব্র কামনা। এক সমালোচকের মতে- ’যিশু ও যৌনতার পুতুল খেলা’। চতুর্থ উপন্যাসে (“অতি অল্প” প্রকাশ ১৯৩৬) আবার ফিরে আসেন নারী পুরুষের মানসিক ও যৌন সম্পর্কের বিশদ বিশ্লেষণে। প্রায় এক নি:শ্বাসে লেখা এই চারটি উপন্যাসে ফুরিয়ে যাবার আগে নিজেকে প্রকাশ করবার অন্তহীন স্পৃহা চোখে পড়ে।
বার্লিন বসবাসের সময়টি অসম্ভব ফলপ্রসূ কবির জীবনে। এরিক মেসটারটন (১৯০৩-২০০৪) নামে এক সতীর্থ কবির সঙ্গে যৌথভাবে একটি নতুন আভাঁ-গার্দ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করলেন, টি এস এলিয়ট সম্পাদিত ”ক্রাইটেরিয়ন” পত্রিকার আদর্শ অনুসারী কাগজটির নাম দিলেন “স্পেকট্রাম”। সুইডেনের আধুনিক কবিতার দিশারী এই কাগজটি। সম্পাদকদ্বয় ছাড়াও গুনার একেলফ, হ্যারি মার্চিনসন এবং সুইডেনের অন্যান্য আধুনিক কবিদের রচনা সেখানে প্রকাশিত হতে থাকলো নিয়মিত । ক্যারিন সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করলেন এলিয়টের “পোড়ো জমি” ও অন্যান্য যুগান্তকারী কবিতা - এলিয়টকে অনুসরণ করে তৈরি হল নতুন কবিতা আন্দোলন। এছাড়াও ইয়োরোপের সুররিয়ালিস্ট কবিরাও সেখানে নিয়মিত অনূদিত ও আলোচিত হলেন।
বার্লিনে এসে তাঁর প্রেমযমুনাতেও নতুন জোয়ার দেখা দিল। বয়েসে বারো বছরের ছোট ইহুদি-জার্মান মহিলা মার্গো হেনেল দেখা দিলেন তাঁর নতুন দয়িতা রূপে। তাঁর বাকি জীবন কাটবে এই সহৃদয়া রমনীর সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের কাছে তাঁর পরিচয় দেবেন “আমার স্ত্রী” বলে। ১৯৩৪ সালে এই দম্পতি স্টকহোমে ফিরলেন এবং দু-কামরার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনে ঘর বাঁধলেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হল তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “বৃক্ষটির জন্যে”-সমালোচনা হল ভাল-খারাপ মেশানো অনেকে দেখলেন পুরানো থিমের ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্ত; অন্যেরা ভাবলেন প্রথাসিদ্ধ কবিতাশৈলি ত্যাগ করে মুক্তছন্দে উঠে আসা ঠিক হয় নি; যিশুর অনুষঙ্গ বাদ দেওয়াকে স্বাগত জানালেন অনেকে; কিন্তু তিনি সরে আসছেন বামপন্থা থেকেও– দেখে অনেক অনুরাগী হতাশ। কবির মতে, পুরানো কাব্যভঙ্গী ত্যাগ করলেই কবিতার সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব। জীবিত অবস্থায় এটি কবির অন্তিম কাব্যগ্রন্থ।
১৯৩১ সালে কবি গিয়েছিলেন রাশিয়া ভ্রমণে। স্তালিনের কঠোর অনুশাসনে শাসিত সোভিয়েত দেশ অসহ্য মনে হয়েছিল তাঁর। তখনও জনসমক্ষে আসেনি নিপীড়নের বা তাঁর যৌথ খামারের কুকীর্তিগুলির কথা। কিন্তু তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদী জার্মানির সঙ্গে বলশেভিক রাশিয়ার কোন মৌল তফাৎ খুঁজে পান নি। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে বিষয়টি ঘোরাফেরা করে তাঁর মানসে। নতুন একটি উপন্যাসের রূপ নেয়–“ক্যালোকেন” (”Kallocain”) প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) রচিত ”১৯৮৪” (প্রকাশ ১৯৪৯), অলডাস হাক্সলি (১৮৯৪-১৯৬৩) রচিত ”সাহসী নতুন পৃথিবী” (প্রকাশ ১৯৩২) অথবা ইয়েডগেনি জামিয়াটি (১৮৯৪-১৯৩৭) রচিত “আমার” (রচনা ১৯২১) মতন কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাসের সঙ্গে তা তুলনীয়। রাষ্ট্রীয় রসায়ন কারখানার বিজ্ঞানী লিও ক্যাল একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যেটি খেলে মানুষ আর মিথ্যে কথা বলবে না। ভবিষ্যতের কোন এক যুগে কাহিনীর ঘটনাকাল যখন রাষ্ট্রের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা এবং নিয়মিত মগজ ধোলাই চলে সাধারণ মানুষের। পাঁচশো পাতার বেশি দীর্ঘ এই উপন্যাসটি তাঁর সর্বাধিক পরিচিত রচনা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত।
এই সময়ে তিনি কবিখ্যাতির শীর্ষে এবং উপন্যাসিক হিসেবেও জনপ্রিয় অথচ তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়ছে ব্যক্তিগত জীবন। সংবাদ পেলেন তাঁর কৈশোর বান্ধবী ও প্রেমিকা অনিতা ন্যাটহর্স্ট ত্বকের দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত; ডাক্তারের বিধান অনুযায়ী তাঁর শরীর কুরে কুরে খাবে সেই ব্যাধি। তিনি গেলেন বন্ধুর সেবা করতে। বর্তমান প্রেমিকা ও প্রাক্তন প্রেমিকার দ্বন্দ্বে পীড়িত তাঁর মন। মার্গো মানসিকভাবে পুরোপুরি তাঁর ওপরে নির্ভরশীল। অন্যদিকে মা নিয়মিত চাপ দিয়ে যান সমকামীত্ব ত্যাগ করে “স্বাভাবিক” জীবন যাপনের জন্যে। হতাশা ও বিষাদ অসহ্য হয়ে দাঁড়ালো শেষ পর্যন্ত- তলিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত ১৯৪০ সালের বসন্তে। ১৯৪১ সালের ২ শে এপ্রিল তিনি ছিলেন আলিঙসাস শহরে বান্ধবী অনিতার গৃহে; সেদিন তিনি একবস্ত্রে ঘর ছাড়লেন, হাতের মুঠোয় কেবল এক শিশি ঘুমের বড়ি। হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলেন শহর সন্নিহিত অরণ্যে আর ফিরলেন না কোনদিন। পুলিশ চিরুনী তালাশ চালালো, কিন্তু খুঁজে পেল না তাঁকে। কয়েকদিন হয় এক পথচারী সন্ধান দিলেন তাঁর মৃতদেহের। সেদিন এপ্রিল ২৭-শহরের উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলে একটি বড় পাথরের আলিঙ্গনে শায়িতা তিনি - পাথরটি এখন এক পুণ্য মেমোরিয়াল, কবিতা প্রেমীদের তীর্থস্থান। এক মাসের ভেতর আত্মহত্যা করলেন মার্গো ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ করে, খুলে দিলেন গ্যাসের লাইনটি। ওই বছর আগস্ট মাসে আরো দুটি মৃত্যু সুইডেনের মালমো শহরে; প্রেয়সী অনিতার এবং কলকাতায় তাঁর কৈশোরের প্রিয় কবির।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি তৈরি করছিলেন নতুন কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। ১৯৪১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল সেই অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি এবং আরো কিছু অগ্রন্থিত কবিতা। “সপ্ত মৃত্যুকল্প পাপ” গ্রন্থটিতে তাঁর শেষ জীবনের মনোবিকলন ও বিষাদের ছাপ স্পষ্ট।
তাঁর প্রথম প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থটি সুইডিশ ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। মার্গারেট আবেনিয়াস রচিত গ্রন্থটির নাম “শুদ্ধতায় আক্রান্ত কবি”- এই নিবন্ধের নামটিও তার অনুসারী। গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। ২০০০ সালে মহাসমারোহে পালিত হয়েছে তাঁর জন্ম শতবর্ষ, সেই উপলক্ষ্যে নতুন তথ্যসমৃদ্ধ আরো একটি জীবনী রচনা করেছেন কামিলা হামারস্ট্রম এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটির নতুন নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে।
খ্যাতনামা ব্রিটিশ অনুবাদক ডেভিড ম্যাকডাফ (১৯৪৫) ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ক্যারিন বোয়ি’র কবিতা সমগ্রের টানা কমপোজে পাঁচটি গ্রন্থ, দীর্ঘ ভূমিকাসহ ১৮৪ পৃষ্ঠা; কবিতার সংখ্যা ১৭৬; প্রকাশ করেছেন ব্রিটেনের রাডেক্স বুকস প্রকাশনা সংস্থা। এই নিবন্ধের অনেক তথ্যই সেই গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
আমি করতে চাই মোকাবেলা…
অস্ত্র-হাতে বর্মে-ঢাকা এসেছিলাম আমি গর্জাতে-গর্জাতে ঢালটা আমার ছিল ঢালাই-করা ভয়ে ও লজ্জাতে। ছুঁড়ে ফেলতে চাই এ-তরবারি বর্শা খরতর। এমন কঠিন রণসজ্জায় আমি হ’য়ে গেছি বরফ। দেখেছি আমি শুকিয়ে-যাওয়া বিচিরা অবশেষে হয়েছে অঙ্কুরিত। দেখেছি আমি দীপ্ত শ্যামলতা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। লোহার চেয়ে অনেক শক্তিশালী প্রাণের সজীবতা, এই পৃথিবীর গভীর থেকে প্রতিরক্ষাহীন উঠে এসেছে তা। ফাগুন জাগে তুহিন মাঘে, যেখানটিতে জ’মে ছিলাম এতদিন। আজকে আমি প্রাণ-বাহিনীর করব মোকাবেলা অস্ত্রশস্ত্রহীন। (I Want to Meet…)
ইবলিস
আমাকে চালিয়ে নিচ্ছে একটা সাপের চাউনি, কট্টর, নিষ্ঠরু - বহু দূর থেকে সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ঠায়, আমার কাছের থেকেও কাছের প্রতিটা কদম পড়ে তার ইচ্ছায়, তার শাসনের, ত্রাসনের কাছে কয়েদি আমি, সে ক্রূর জিঞ্জিরে বাঁধে আমার অভিপ্রায়… দিয়েছে কে এই সাপটিকে তার ভয়াল সু-ঠাম তথা অতল-আকর্ষণ, মরহুম-মধুরতা? কে দিল এমন আতঙ্কে পুরে কসাইয়ের হর্ষ? কালো ও গোপন সুখের মতন হাতছানি দেয় তো তা! হয়তো কোথাও আবে-হায়াতের ঝরনাগুলির তীরে যেখানে সকল ঘোমটারা খুলে যায়, ইবলিস এসে মুখোমুখি হবে কোনো নয়া চেহারায়। অরেরে অশুভ, তুই বিধাতারই ছায়া এক শুধু কি রে? তুই কি রে তার রাতের যমজভাই? (The Corrupter)
বিশ্ব-হৃদয়
বলো, কোনখানে পুড়ছে বিশ্ব-হৃদয়, আগুন -ভরা হৃদয় জগতের? ভারি ও খরখরে, প্রাগৈতিহাসিক কয়লা এর বাসভূমি : নিকষ আঁধার, নিরেট নিশীথ, কেয়স১। খোঁজো সেখানে! কেননা আগুনের সে-ই তো ধর্ম : দুশমনের লড়াইয়ে বলীয়ান- নিজেই এক লড়াই, এক গনগনানো লড়াই আর কোনোই ধর্ম এর নাই। এবং বিজয়? আঁধার যখন অগ্নিশিখায় লীন? জয় কি মরণ? অর্থহীন প্রশ্ন আর অর্থহীন ভয়! এই বিশ্বের হৃদয় আগুন , আগুন শুধু করতে চায় জয়। (The World’s Heart)
১ কেয়স (Chaos) : প্রধানতঃ (সক্রেটিস-পূর্ব) গ্রিক কজমোগনিতে সুবিন্যস্ত বিশ্ব সৃষ্টির আগের অবয়বহীন, রূপহীন বস্তু উপাদানের সর্বব্যাপী বিস্তার।
পাথর
ভারি পাথরের আত্মা ঈশ্বর দিলেন আমাদের। তারপর সমুদ্রতীরে আমরা দাঁড়ালাম, যেখানে লাফায় রোদ, নাচে ফেনা, রাতে ডানা ম্যালে সিন্ধুচিল। খোলামুকচির মতো ছুঁড়লাম পাথরগুলি, মরণ খেলায় যেন। কেননা কিছু তো তোমার করা-ই লাগবে পাথরের সাথে। ছেঁচড়ে গেল মাটি তারা অর্ধবৃত্তাকারে, পিছলে পার হ’য়ে গেল অথৈ পাথার : যেন হাওয়া! আর কী সুখের ঘুম আমাদের : পাখাদের ছোঁয়ায়, এবং পাখিদের জলের উপরে ছলচ্ছলাৎ ছোটায়। (The Stones)
পতনোন্মুখ শুকতারা
‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্, বেয়াদব শুকতারা! সানন্দে দেব তোকে আঁধারের বর, এই দুনিয়ায় প্রিয় তুই সবচেয়ে।’ ‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্, জ্বলন্ত নীল শিখা! জ্বল ধিকিধিকি, পাতালে তুলতে ঝড়, কালো স্ফটিকের শহর এক নে বানিয়ে।’ ‘পড়্, বললেন প্রভু, ‘তুই খ’শে পড়্! অশুভের উদ্গাতা, শিগগিরই ফের খুঁজবি কি তুই ঘর? আমার বুকের সবচেয়ে কাছে কে এ!’ (The Falling Morning Star)
ঐ প্রহর
কোনো দমবন্ধ গ্রীষ্মরাতের আকাশ পৌঁছাবে না শাশ্বতের এতটা ভিতরে, কোনো বিল, কেটে গেলে ভোরের কুয়াশা, বুকের মুকুরে অত নিস্তব্ধতা দেখাতে পারবে না যত পেরেছিল ও-প্রহর–
যখন একাকিতার সকল সীমানা মুছে ফেলা হয় আর চোখগুলি স্বচ্ছ হ’য়ে যায় আর কণ্ঠস্বরগুলি বাতাসের মতো সাদাসিধা আর, কোনোকিছু নাই লুকাবার মতো- তখন আমার ভয় কীসে? আমি আর হারাব না কখনও তোমাকে। (That Hour)
রাতের গভীর চেলো
রাতের গভীর এই চেলো তেপান্তর পার ক’রে ছুঁড়ে দেয় আঁধার রভস। বস্তুজগতের ঝাপসা ছবিগুলি ক্রমশঃ মিলায় বহির্জগতের নানা আলোকধারায়। আদিগন্ত ভাতিমান্ সাগর-জোয়ার ঢেউয়ের উপরে ঢেউ ভেঙে চলে রাত্রিনীল অনন্ত-অবধি। তুমি! তুমি! তুমি! ওজনবিহীন, ভোল-পাল্টানো পদার্থ, তুমি স্পন্দনের স্ফোটমান ফেনা, উঠে-যাওয়া, গা-গোলানো স্বপ্ন এক আরোও স্বপ্নের, চোখ-ধাঁধানো সাদা! আমি এক সিন্ধুচিল, জিরানো, ছড়ানো ডানাটিতে সৈন্ধব-লবণ তুষ্টি পান করি যতদূর জানি আমি, তারও পূর্বে আরও, যতখানি চাই তারও সুদূর পশ্চিমে, আর পাখা ঘ’ষে যাই ব্রহ্মাণ্ড-হৃৎপিণ্ডে- চোখ-ধাঁধানো সাদা! (The Night’s Deep Violoncello)
ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা
রৌদ্রদীপ্ত শীতের বনের মতো ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা। কীভাবে প্রতিজ্ঞা হবে দৃঢ় আর আমার রাস্তাটা শুনবে কথা? আমি ব’য়ে চলছিলাম নকশা-কাটা বাটি এক টুংটুং কাচের।
তখন পা-গুলি খুব সতর্ক হ’য়ে গেল, খাবে না হোঁচট। হাতেরাও হুশিয়ার, তিলেক কাঁপবে না তারা, লাগাবে না চোট। আর আমি গলা-জল- বল মাগি ঠুনকো এক তৈজসের কাছে। (A Stillness Expanded)
তুমি বিচি
তুমি বিচি, আর আমি মাটি। তুমি শোও আমার ভিতর। তুমি সেই ঈপ্সিত সন্তান, আমিই তোমার জননী তো।
আশা করি তুমি কাটাচ্ছ এক বিচ্ছিরি অসময়। আশা করি তুমি আমার মতোই জেগে আছ নির্ঘুম, এই আনন্দে লাফিয়ে উঠেছ এবং পরক্ষণে উদ্ভ্রান্ত ও শঙ্কিত আর বেদনায় গুমসুম।
আর সহসাই তড়িঘড়ি তুমি চাইবে ঘুমিয়ে যেতে থামিয়ে দিয়েছ যেন বনব্ন-ঘোরা কোনো লাট্টুকে। আশা করি, যত সোজা ভেবেছিলে, কাজটি তত কঠিন… আশা করি যাতে একটা পলকও না পড়ে তোমার চোখে। (From a Bad Girl)
জলাভূমির পর্যটক
আধাঁর আমার ভূমি। মুসাফির, কে গো তুমি ভাই? জলার, জংলার পর্যটক! অন্ধ হ’য়ে শুয়ে আছে ভূমি। মুসাফির, কে গো তুমি ভাই? টের পাই ভ’রে উঠছে পদচিহ্নগুলি আমার কলজের রক্ত দিয়ে।
চিনতে চাই হাতগুলি তোমার। তারা কি আগুন যারা জ্বালায়- আমাকে দাও, বুঝতে দাও। চিনতে চাই হাতগুলি তোমার। ঠাণ্ডা পাতার মতো হয় যদি তারা তাদের বুলিয়ে নাও গাছের জখমে, মুর্দাটিকে জেগে উঠতে দাও। (Marsh Wanderer)
যেসকল ঠাঁই ঘুমায় কেউ সকৃৎ, স্বপ্ন গীতল, নিরুপদ্রব নিদ।
গাড়ো, তাঁবু গাড়ো! ঐ জাগে নবদিন। আমাদের অভিযাত্রা অন্তহীন। (On the Move)
এ-বিশ্ব সপন এক…
এ-বিশ্ব সপন এক, ঘুমে লীন কোনো দেবতার, উষসীর শিহরন মুড়ে থাকে যার আত্মাটিকে। জগৎ ছিল না যবে, তার গতকালের স্মরণ পিছু ধাওয়া করে তার, লাগায় চমক। সে- যার সত্তার অংশ আমরা নই মোটে, মোলাকাত হ’য়ে যায় রাস্তার মোড়ে তারই সাথে, সে তার নিশ্বাসে ছাড়ে কী এক আতঙ্ক যেটা নয় আমাদের, সুদূর সীমার পার থেকে চ’লে আসে, ভিন্ন কানুনে-বাঁধা অন্য নানা জগতের থেকে। ঘুমাও, স্বপ্নের সাজা শেষ-হওয়া-তক, কিংবা, সৃষ্টিকর্তা, তুমি জেগে ওঠো দিনের আলোয়, আমাদের সত্য ক’রে তোলো! (The world is dreamt…)
দি ক্লেফ্ট পুরোমাত্রায় একটা বণর্নাধর্মী উপন্যাস। ক্লেফ্ট বলতে নারী ও পুরুষের পাহাড়ী বসবাসস্থান ও স্ব স্ব জননেন্দ্রীয়কে বোঝানো হয়। উপন্যাসে নিরোর সময়ের একজন রোমান ইতিহাসবিদ পৌরানণক একটা কাহিনী শোনান। প্রাগৈতিহাসিক কালের কোনো এক সময়ে জগতে কেবল নারীর অস্তিত্ব ছিল। তেমন কাল্পনিক চিত্রে নারীকে আঁকা হয়েছে অলস, সাম্প্রদায়িক ও শুশুকের মত নিরীহ প্রাণী হিসেবে। নারীরা যখন থেকে ছেলেদের জন্ম দেয়া শুরু করলো সেই থেকে অশান্তির সূচনা। অবশ্য ক্রমশ নারী ও পুরুষ পাশাপাশি সহাবস্থান করতে শেখে।
একদিন অসতকর্ভাবে একজন নারী জন্ম দিল ভয়ংকর এক দৈত্য যার ছিল বিশাল পিণ্ড আর উত্থিত মাংশ, দেখতে অনেকটা ক্লিবের মতই। ভীত নারীরা সেই নবজাতকটির মৃত্যু কামনা করে পাহাড়ে নিবার্সন দিল।
তাদের হতবুদ্ধি করে দিয়ে আরো এমন পুরুষ শিশু জন্ম হতে থাকলো; এবং তাদেরকেও মারার জন্য রেখে আসা হতো। অবশ্য ঈগলের কল্যাণে কয়েকটা নবজাতক বেঁচেও গেল। একবার এক ঈগল কয়েকটা শিশুকে উপত্যকায় তুলে নিয়ে গেল। মা হরিণ দুগ্ধ পান করালো। বেঁচে উঠলো কয়েকটা শিশু। কালক্রমে দুটো সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হলো। একদল থাকল উপত্যকায়। যারা অসংগঠিত, অবোধসম্পন্ন ও অভিযানান্মুখ; অন্যদল থাকল সাগরপাড়ের গুহায়। সহজ আর বাস্তব বোধসম্পন্ন।
উপন্যাসে এরপরে উঠে আসে দুটো সম্প্রদায়ের কাছাকাছি হওয়ার চিত্র। পারস্পরিক চাহিদার প্রসার ও দুঃখগাথা। নারীরা ক্রমশ আবিষ্কার করলো তারা এককভাবে আর সন্তান উৎপাদনে সক্ষম নয়। অশান্তি বেড়ে গেল পুরুষ ছাড়া নিজেদের অসম্পূর্ণ দেখে। দেখলো, পুরুষেরা পিতৃত্বের দায়িত্ব এড়িয়ে, সন্তানদের জীবন বিপন্ন করে, অভিযানে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সুগ্রন্থিত ব্যঙ্গের মাধ্যমে হলেও সমাজ-সৃষ্টির একটা আশাপ্রদ কাঠামো অনুসন্ধানের প্রয়াস বলা যায় ক্লেফ্ট উপন্যাসটিকে। ডরিস লেসিং তার পূবর্সূরীকে দেখিয়েছেন ভিক্টোরিয়ান আদলে, যেখানে নারীরা পরোক্ষ, অনুৎসাহী; আগ্রহ কেবল সন্তান ধারণে ও আভিজাত্য রক্ষায়। পুরুষরা কৌতূহলী, উদ্ভাবক, অভিযাত্রী; আবার দায়িত্বহীনও।
উপন্যাসটিতে বৃদ্ধ বর্ণনাকারী একজন স্বল্পবয়স্কা রমণীর সাথে ভালোবাসাহীন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০৫-এর শ্রেষ্ঠ উদীয়মান লেখক হিসেবে জন ডব্লিউ ক্যাম্পবেল পদকপ্রাপ্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের রিভিউয়ার এলিজাবেথ বিয়ারের মতে উপন্যাসে বর্ণিত মানব সমাজের প্রথম সৃষ্টি নারীকে পরিষ্ফূটনের এই কল্পিত ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ইতিহাসবর্ণনাকারীকে তৈরি করা যেত একটা চমৎকার চরিত্র হিসেবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এই চরিত্রটি শেষপযর্ন্ত ব্যঙ্গাত্মক বণর্নায় সীমিত হয়ে পড়েছে। তার মতে, ডরিস লেসিং-এর নোবেল প্রাপ্তি তার রচিত “দি ক্লেফ্ট”-কে আরো বেশি রহস্যপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি মনে করেন, এটা কেবল ত্রুটিপূর্ণ ও ব্যর্থ নয়, বাজে উপন্যাসও বটে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গার্ডিয়ানের রিভিউয়ার জেরালডিন বেডেলও উপন্যাসে কোনো চরিত্র না থাকাটাকে অসুবিধা হিসেবে চিন্থিত করেছেন। অবশ্য একটা উপন্যাসে চরিত্র থাকার আবশ্যিক কোনো নিয়মও নেই, তারপরও যে সমস্ত ঔপন্যাসিকরা নির্মিত উপখ্যান থেকে উপন্যাস রচনা করেছেন তারা প্রথমেই প্রধান চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বিধৃত করেন। এতে উপন্যাসের বিষয়ে প্রবেশ সহজসাধ্য হয়। ক্লেফ্ট-এ বর্ণিত মানববসতি আজ বিলুপ্ত বলে বিষয়টা বোঝাও দুরূহ। এত সুদূরের ঘটনা যে তাদের ব্যক্তিক স্বত্তা ও প্রেম বিষয়ক কোনো ধারণাই আমাদের নেই।
উপন্যাসের বিষয়বস্তু যদিও কাঠামোর কারণে হোচট খেয়েছে তারপরেও লেসিং উপন্যাসটিতে মানুষের আশা ও হতাশার তীব্র অনুভূতি সঞ্চার করতে পেরেছেন। চরিত্রের ব্যক্তিক উপলব্ধি না থাকলেও লেসিং-এর লেখা পরিবর্তনের আকাক্ষাকে চালিত করে। তিনি এমন এক শক্তিশালী বিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়েছেন যা মানুষকে তার অবস্থার অস্থায়ীত্বকে এবং বিপরীতভাবে মানব সম্পর্কের অপরির্তনীয় চিত্রকেও তুলে ধরে।
পুরুষ প্রজাতির মানবের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণার কারণে ডরিস লেসিংকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে তিনি ‘নারীবাদী ঔপন্যাসিক’-এর অভিধা খারিজ করে দিয়েছেন। যে সমাজে মানবের প্রাথমিক ও প্রধান উপাদান হিসেবে পুরুষ স্বীকৃত সেখানে কেউ কেউ ক্লেফ্টকে নারীবাদী নতুন একটা ঘরানা বলে বিবেচনা করেন।
এই উপন্যাসটির বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অভিযোগ এখনও উত্থাপিত হয় নি। এটাতে শুধুমাত্র বিবৃত হয়েছে যে পৃথিবীতে নারীরাই প্রথম আবির্ভূত হয়। লেসিং দাবি করেন, উপন্যাসটি একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ থেকে অনুপ্রাণিত যা নারীকে মৌলিক ও প্রাথমিক মানব হিসেবে সম্ভাব্য একটা ধারণা প্রদান করে। এবং সেটি তার পুরুষ সৃষ্টির নব সংযোজন অভিমতের সাথে সামঞ্জস্যময়। তার মতে পুরুষের নারীর মত দৃঢ়তা নেই। নারীর আছে প্রাকৃতিক কোমলতা, বিশ্বও এমনই। তুলনায় পুরুষ অস্থিরমতি।
দি গোল্ডেন নোটবুক : রঙিন ক্যনভাস
ডরিস লেসিং এর সবচেয়ে দীর্ঘ ও উচ্চাভিলাষী সৃষ্টি ‘দি গোল্ডেন নোটবুক’। প্রতিটি প্রকাশক ছাপার জন্য উদগ্রীব থাকবে এমন এক বিরল প্রতিভার বিরল সৃষ্টি হচ্ছে ‘দি গোল্ডেন নোটবুক’ উপন্যাস। বর্তমান সময়ের ইংরেজী সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হিশেবে এটাকে চিন্থিত করা যায় নির্দ্বিধায়। যে সময়ে আমরা বাস করি তার আচরণ, উচ্চাকাক্ষা, আশঙ্কা এবং নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার বর্ণীল কীর্তি এই উপন্যাস।
হেনরিক ইবসেন ও জর্জ বার্নাড শ যেমন নতুন এক নারীর চিত্র তুলে ধরেন তেমনি এক প্রতিচ্ছায়া দেখা যায় ‘দি গোল্ডেন নোটবুক’-এর আন্না চরিত্রটিতে। এতে একজন আধুনিক নারীর জটিল জীবনকাব্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আন্না পুরুষের মত স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেষ্টা করে। সে একজন লেখিকা, সার্থক একটি উপন্যাস রয়েছে তার। চারটি নোটবুকে লিখে চলেছেন তিনি। কালো রঙের নোটবুকটিতে লেখেন অতীতের আফ্রিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। লাল রঙেরটিতে রাজনৈতিক জীবনের ঘটনা, কমিউনিজমে মোহভঙের কথা। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কাহিনী একটা চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে হলুদ নোটবুকটিতে লিখছেন একটা উপন্যাস। আর নীল নোটবুকটি একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরি। পরিশেষে আমেরিকান এক লেখকের সাথে মানসিক সম্পর্কে বিপযস্ত হয়ে চারটি নোটবুকের সব লেখা একটা সোনালী নোটবুকে সন্নিবেশিত করেন।
জীবনের এই নানাবিধ ঘটনার চিত্র বর্ণনা করে আন্না সাম্প্রতিক সময়ের এক রঙিন ক্যনভাস তুলে ধরেছেন। মুহূর্তের জন্যও এর সত্যতা নিয়ে সন্দিহান হওয়া যায় না। নিখুত প্রামাণিক বর্ণনাধর্মী শিল্প উদ্ভাসিত করে একজন প্রাজ্ঞ নারীর রূপকে। প্রজন্মের পরে প্রজন্ম ধরে চালিত বিতর্ককে তিনি আরো শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মারা ও ডান : পৌরাণিক অভিযাত্রা
হাজার বছর পরের নতুন বরফ যুগের সময়ের ঘটনা। সমগ্র উত্তর গোলার্ধ তলিয়ে গেছে একশ ফিট বরফের নীচে। একদম দক্ষিণের বৃহৎ জনবসতি ইফ্রিকের মাহোন্ডি জনগোষ্ঠির সাত বছরের বালিকা মারা এবং তার কনিষ্ট ভ্রাতা ড্যান প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এক রাত্রিতে ঘর থেকে বিতারিত হয়। কোন এক দরিদ্র গ্রামের সহানুভূতিশীল একজন মাহোন্ডি মহিলা তাদের আশ্রয় দেয়। জলবায়ুর বিরূপতা, খরা ও জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার সংগ্রাম শিখলো ক্রমশ। বর্বর পাহাড়ী জনপদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে যুদ্ধ করাও শেখে। এই বর্বর জাতি তাদের ঘৃনা করতো। দক্ষিণের খরা পর্যুদস্ত ভূমি ধুলোয় ধুসরিত হতে থাকলে পর্যাপ্ত পানি ও খাদ্য পাওয়া যাবে এমন স্থানের খোজে তারা উত্তর অভিমূখী অভিবাসী দলে যোগ দেয়।
যাত্রাপথে তারা নানামূখী বিপদের সম্মুখীন হয় আবার বেঁচেও যায়। অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিরান জনপদে পরিণত অঞ্চলে বেঁচে থাকতে প্রানন্ত সংগ্রামে নিয়োজিত হয়। কখনও বন্দী হয় হারডন জনগোষ্ঠির হাতে। পালিয়েও যায় আবার। উত্তরের দিকে চলতে থাকে। টাউনস নদীর উষ্ণ জল পেড়িয়ে। চ্যারাড নামক একটা দেশে পৌছে বন্দী হয় সৈন্যবাহিনীর এক কমান্ডারের হাতে। চ্যারাড চিরস্থায়ী যুদ্ধের দেশ। ড্যান একসময় সেদেশের সৈন্যবাহিনীর জেনারেল হয়। মারা হয় গুপ্তচর। কিন্তু বিপক্ষ একটা গোষ্ঠী তাকে ছিনতাই করে নিয়ে গেলো গোপন তথ্য লাভের আশায়। একসময়ে উভয়ে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হলো। তারপরে আবার শুরু হলো উত্তর অভিমূখে যাত্রা। মারার জলের জন্য হাহাকার করলে ড্যান তাকে বাঁচিয়ে তোলে। ভ্রাতা-ভগ্নি পরস্পরকে প্রচন্ড ভালবাসে, উত্তরের পানে যাত্রাকালিন আপদে শতাধিকবার একে অপরকে রক্ষা করেছে, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে নি উত্তর কি? উত্তরে গিয়ে তারা কি পাবে?
মারার মনে প্রশ্ন জাগে অজস্র। কে তাদের পিতামাতা? এবং কেন অসংখ্য মানুষ নিজেদের জীবন বিপন্ন করেছে তাদের বাঁচাতে? তারা এমন কি মূল্যবান? চারিপাশের এই ধ্বংষস্তুপের নগরীতে অতীতকালে কারা বাস করতো? কেন এই নগর ও সভ্যতা বিলুপ্ত হয়েছে? মারা স্বপ্ন দেখে পানি, বৃক্ষ আর সুন্দর নগরীর। ভদ্র ও বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষের। শক্তিশালী প্রাকৃতিক শক্তি মারা ও ড্যানের অভিযাত্রাকে চালিত করলেও এবং হাজারো নিষ্ঠূরতার মাঝে থেকেও মারার ভেতরে বিরাজ করে এক সুতীব্র অনুভূতিসর্বস্ব প্রেমময়তা। ডরিস লেসিং এর আকর্ষণীয় নায়িকাদের মধ্যে মারা এক অনবদ্য সৃষ্টি। আর প্রাগৈতিহাসিক যেকোন গল্পের নায়কের মতই ড্যানকে আপনারা একজন সাহসী নায়ক হিশেবে দেখবেন।
কাল্পনিক এক ভবিষ্যতে অবিস্মরনীয় এক অভিযাত্রায় শামিল এক ভাই আর এক বোনের গল্প ফুটে উঠেছে এই মজার উপন্যাসটিতে। কাল্পনিক কাহিনীর একজন দক্ষ রচয়িতা লেসিং আমাদের সময় সম্পর্কে অসচেতনতা ও গুরুত্ব দেবার অপারগতা বিধৃত করেছেন স্বচ্ছ দৃষ্টির চমৎকার পর্যবেক্ষণে।
গত, অন্তত, বছর তিনেক যাবৎ নোবেল সাহিত্য বিজয়ী নিয়ে নানামুখী তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তর্ক-বিতর্কের প্রধান বিষয় দুটি - সাহিত্যরচনার মান এবং সাহিত্যিকদের রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা। আমাদের মনে পড়বে, ২০০৪ সালের নোবেল সাহিত্য বিজয়ী হিসাবে এলফ্রিয়েদে ইয়েলিনেক-এর নাম ঘোষণা করলে নোবেল সাহিত্য নির্বাচক কমিটির একজন বিচারক, নাট আনলান্ড, পদত্যাগ করেন। ইয়েলিনেক-এর সাহিত্যরচনা তাঁর কাছে কেবল শব্দের-পর-শব্দ বসানো শিল্পগুণ-বিবর্জিত রচনা মনে হয়েছে, এবং ইয়েলিনেককে নোবেল সাহিত্য বিজয়ী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নোবেল কমিটি পদকটির মর্যাদার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
পদত্যাগের প্রসঙ্গে আমাদের নিশ্চয়ই আরো একটি ঘটনা মনে পড়বে - সালমান রুশদির ওপর ইরানের আয়াতুল্লাহ খুমিনি কর্তৃক ফতোয়া ঘোষিত হলে নোবেল সাহিত্য কমিটির পক্ষ থেকে রুশদিকে সমর্থন না করায় দুজন বিচারক পদত্যাগ করেন ১৯৮৯ সালে। যাহোক, ইয়েলিনেক-এর পর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যুক্তরাজ্যের হ্যারল্ড পিন্টার (২০০৫) এবং তুরস্কের ওরহান পামুক (২০০৬)। তাঁদের দুজনকে নিয়ে বিতর্ক রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা। এবারের নোবেল বিজয়ী ডরিস লেসিংকে নিয়েও পার্শ্ব-আলোচনার সুযোগ আছে। গত দু’বারের নোবেল সাহিত্য বিজয়ী পিন্টার এবং পামুকের মতো, নিজ নিজ দেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে দু’জনের ভাষ্য, সেটার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সম্পর্ক ইত্যাদির মতোই, ডরিস লেসিংকে নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার প্রদানের সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আমেরিকার আগ্র্রাসী মনোভাবের মধ্যস্থতা করার প্রবণতার মিল লক্ষ্য করা যায়। অন্য একটা কারণেও ডরিস লেসিং নিজেই বিস্মিত! আসছে ২২ অক্টোবর তাঁর বয়স হবে ৮৮। উল্লেখ করা দরকার, তিনিই বয়োজ্যেষ্ঠ নোবেল সাহিত্য বিজয়ী।
জীবনসায়াহ্নে এসে নোবেল সাহিত্য বিজয়ের সংবাদে ডরিস লেসিং নিজেই বিস্মিত, বিস্মিত সাহিত্য-রাজনীতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষ। অনেকেই এর মধ্যে রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন। কোথায় সে রাজনীতির গন্ধ? এর উত্তর পাওয়া যাবে সম্ভবত লেসিং-এর জীবনীতেই। কেননা এ রাজনীতি নারীবাদী সাহিত্য সংশ্লিষ্ট রাজনীতি।
২. ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর পারসিয়ায় (বর্তমান ইরান) জন্মগ্রহণ করেন ডরিস মে টেইলার। বাবা-মা দুজনই ব্রিটিশ। বাবা ছিলেন ইমপেরিয়াল ব্যাংক অব পারসিয়ার কেরানী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পঙ্গু হন ডরিসের বাবা। মা ছিলেন নার্স। ভুট্টা চাষ করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হবার আশায় ডরিসের বাবা-মা ডেরা গাড়েন ব্রিটিশ কলোনি দক্ষিণ রোডেশিয়ায় (বর্তমানে যেটা জিম্বাবুয়ে)। ডরিসের বাবা না চাইলেও মা’র স্বপ্ন ছিলো রাতারাতি কেতাদুরস্ত বনে যাওয়া। মা’র স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। হাজার একর জমি ব্যর্থ হলো কাংক্ষিত ফসল উৎপাদনে।
লেসিং তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, সামান্য আনন্দ আর অশেষ বেদনায় রচিত ছিলো তাঁর শৈশব। বেদনা-আক্রান্ত শৈশবের একমাত্র প্রশান্তি বলতে ভাই হ্যারির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই। মেয়েকে যথার্থ মেয়ে হিসাবে বড় করার লক্ষ্যে ডরিসের মা বাড়ির ভেতরে-বাইরে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেন। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করানো হয় যাজক-পরিচালিত স্কুলে যেখানে নানদের মুখে কেবল স্বর্গ-নরকের ভয়ঙ্কর গল্পই শুনতে হতো। পরে সালিসবারির রাজধানীতে একটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। অচিরেই স্কুল পড়াশোনার ইতি ঘটে। ডরিসের বয়স তখন তেরো, প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার এখানেই সমাপ্তি ঘটে তাঁর।
দক্ষিণ আফ্রিকার অলিভ শ্রেইনার, কিংবা নাদিন গর্ডিমারের মতো লেখকরাও উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করতে পারেননি। তাঁদের মতো করে ডরিসও স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করেন, অসুখী ছেলেবেলা গল্পকার বানানোর কারিগর। তাঁর ভাষায়, আমি মনে করি এটা বাস্তব। যদিও তখন ব্যাপারটা অতো পরিষ্কার বুঝতে পারিনি, এবং নিশ্চয়ই, ভবিষ্যতে লেখক হবো এমনটাও তখন মনে হয়নি। কিন্তু একটা ব্যাপার ছিল, আমি সারাক্ষণ সবকিছু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইতাম।
লন্ডন থেকে পার্সেলে বই আসতো। ডিকেন্স, স্কট, স্টিভেনসন, কিপলিং-এর পর যোগ হলো ডি.এইচ. লরেন্স, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি। মায়ের মুখের ঘুমপাড়ানী গল্প, বাবার মুখে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত-অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে শুনতে কৈশোর কেটেছে ডরিসের। যুদ্ধের বিষয়টা ডরিসের মনে দাগ কেটেছে গভীরভাবে। তিনি লিখেছেন, “আমাদের সবার জন্ম যুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যুদ্ধ আমাদের ক্ষত-বিক্ষত করে, অথচ আমরা অচিরেই সেসব ভুলে যাই।” নোবেল বিজয়ী ঘোষণা করার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবের এক পর্যায়ে জানা যায়, তাঁর পরবর্তী লেখাটিও ‘একটি আবেগঘন যুদ্ধ-বিরোধী’ লেখা। তাঁর সর্বসাম্প্রতিক লেখা ‘আলফ্রেড অ্যান্ড এমিলি’ -তে তিনি তাঁর বাবা-মা’র জীবনের এমন একটি ছবি এঁকেছেন যেখানে যুদ্ধ তাঁদের জীবনকে বাধাগ্রস্ত করেনি।
পনেরো বছর বয়সে মার হাত থেকে পালিয়ে নার্সমেড-এর চাকরি নেন ডরিস। চাকরিদাতার কাছ থেকে রাজনীতি-সমাজনীতির বই পেতেন ডরিস, আর চাকরিদাতার শ্যালকের কাছ থেকে পেতেন রাতের বেলায় এলোপাতাড়ি চুমু। ডরিস বলেছেন, এ সময় তিনি কামতাড়নায় অস্থির হয়ে উঠতেন। গল্প লেখা চলছে সে সময়, দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাগাজিনে দুটো গল্প ছাপাও হয়েছিল।
১৯৩৭ সালে সালিসবারিতে ফেরেন টেলিফোন অপারেটরের চাকুরি নিয়ে। বছরখানেক চাকুরি করেন সেখানে। ঊনিশ বছর বয়সে বিয়ে করেন ফ্রাংক উইজডমকে, দুটো সন্তানের জন্ম হয় তাঁদের। কয়েক বছর পরেই পারিবারিক জীবনে আটকা পড়ে যাচ্ছেন এই ভয়ে পরিবার ত্যাগ করে সালিসবারিতে থেকে যান। শীগগিরই কম্যুনিস্টদের গ্রুপ লেফট বুক ক্লাবের সমমনা সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন, এবং গ্রুপে যোগ দেন। ডরিস যখন গ্রুপে যোগ দেন, তখন গ্রুপের কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন গটফ্রিড লেসিং। ডরিস এবং গটফ্রিড লেসিং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাঁদের একটি পুত্রসন্তান হয়।
যুদ্ধোত্তরকালে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাস হারান ডরিস, এবং ১৯৫৪ সালে কম্যুনিস্ট আন্দোলন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হন। ১৯৪৯ সালের মধ্যে ছোট ছেলেসহ লন্ডনে চলে আসেন ডরিস। ওই বছরই তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গ্রাস ইজ সিংগিং’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার লেখকজীবনের শুরু।
লেসিং-এর ফিকশন গভীরভাবে আত্মজীবনীমূলক যার অনেকটা জুড়েই আছে আফ্রিকার অভিজ্ঞতা। তাঁর লেখার মধ্যে আছে তাঁর নিজের রাজনীতি-সমাজ-সংশ্লিষ্টতা, নানামুখী সংস্কৃতির বিরোধ, বর্ণবাদ কেন্দ্রিক অসাম্যের অবিচার, ব্যক্তির নিজের মধ্যে উপস্থিত বিপরীতমুখী উপাদানগুলোর বিরোধ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং সামষ্টিকতার বিরোধ। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে রচিত গল্প-উপন্যাসগুলোতে আছে সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে কালোদের সব হারানোর কান্না, দক্ষিণ আফ্রিকায় হোয়াইট কালচারের অসারতা। স্পষ্টভাষণের কারণেই দক্ষিণ রোডেশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হন লেসিং।
১৯৫১-১৯৫৯ সালে রচিত শিক্ষামূলক সিরিজ উপন্যাস ‘চিলড্রেন অব ভায়োলেন্স’ লেখার পর অন্য এক ডরিস লেসিং বেরিয়ে আসেন। ১৯৬২-তে এসে তিনি লেখেন “দ্য গোল্ডেন নোটবুক”-এর মতো অসমসাহসী বর্ণনাত্মক নিরীক্ষাধর্মী বয়ান, যেখানে একজন সমসাময়িক সাহিত্যিকের বিভিন্নমুখী সত্তা ফুটে ওঠে অবিশ্বাস্য গভীরতা এবং ব্যাপ্তি নিয়ে।
ডরিস লেসিং-এর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে ‘দ্য গুড টেরোরিস্ট (১৯৮৫)’, ‘দ্য ফিফথ চাইল্ড (১৯৮৮)’। জেন সমারস ছদ্মনামে তিনি দুটো উপন্যাস প্রকাশ করেন: ‘দ্য ডায়েরি অব আ গুড নেইবার (১৯৮৩)’ এবং ‘ইফ দ্য ওল্ড কুড (১৯৮৪)’।
১৯৯৫ সালের জুনে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অনারারি ডিগ্রি গ্রহণ করেন ডরিস, এবং একই বছর দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। ১৯৫৬ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পর সেটাই প্রথম ভ্রমণ। চল্লিশ বছর আগে যেসব বিষয়ের জন্য তাঁকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, সেবার সেসব বিষয়ের ওপরই লেখক হিসাবে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। ওদিকে দীর্ঘ তিরিশ বছর আউট অব প্রিন্ট থাকার পর ১৯৯৬ সালে হার্পারকলিন্স থেকে পুনঃপ্রকাশিত হয় তাঁর ‘গোয়িং হোম’ এবং ‘ইন পারস্যুট অব ইংলিশ’। অসাধারণ বই দুটিতে পাওয়া যায় তাঁর ব্যক্তিত্ব, জীবনদর্শনের গভীর অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান।
গল্প, উপন্যাস ছাড়াও ডরিস লেসিং কবিতা, নাটক, এমনকি সায়েন্স ফিকশনও লিখেছেন। অবশ্য লেসিং-এর সায়েন্স ফিকশনকে চতূর্থ শ্রেণির সায়েন্স ফিকশন হিসাবে উল্লেখ করেছেন সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম।
দীর্ঘ সাত বছরের ব্যবধানে, ১৯৯৬ সালে, প্রকাশিত হলো তাঁর নতুন উপন্যাস ‘লাভ অ্যাগেইন’। এর আগে তাঁর আত্মজীবনী প্রচারের জন্য বিশ্বভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্য এই বইটির কোনো প্রচারে বের না হবার সিদ্ধান্ত নিলেন ডরিস। অথচ এই বইয়ের জন্য সেবার নোবেল সাহিত্য এবং ব্রিটেনের উইনটারস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন-এর জন্য মনোনীত হন। তাঁর আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড ‘ওয়াকিং ইন দ্য শেড’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে, এবং সেবারই ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কল অ্যাওয়ার্ড-এর জীবনী/আত্মজীবনী বিভাগে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৯, নতুন সহস্রাব্দ শুরুর প্রাক্কালে যুক্তরাজ্যের অনার্স লিস্টে ‘কম্পেনিয়ন অব অনার’ হিসাবে নিযুক্ত হন। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ওই পুরস্কার প্রদান করেন। ২০০৫ সালে প্রথম ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ-এর শর্টলিস্টে ছিলেন। ২০০৭ সালের ডরিস লেসিং নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ডরিস মোটেও উচ্ছ্বসিত নন এ-পুরস্কারে, যেমনটি হননি ২০০৩ সালের নোবেল সাহিত্য বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার জে.এম. কোয়েৎজিও।
এবারের ম্যানবুকারের লংলিস্ট এবং শর্টলিস্টে একটু সতর্ক দৃষ্টি দিলেই বোঝা যাবে, এমনকি, ব্যঙ্গ করার জন্যও অ্যানি এনরাইটকে ম্যানবুকার পুরস্কার বিজয়ী হিসাবে কেউ ভাবেনি। লংলিস্টের চমক ছিলেন ক্যাথেরিন ও’ফ্লিন। তাঁর ‘হোয়াট ওয়জ লস্ট’ ম্যানবুকার ছাড়াও এবছরের ‘গার্ডিয়ান ফার্স্ট বুক অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘অরেঞ্জ প্রাইজ ফর ফিকশন’-এর লংলিস্টে জায়গা নিয়ে রীতিমতো হ্যাটট্রিক করেছে। ফলে চমক হিসাবে তাঁর দিকে দৃষ্টি ছিলো অ্যাডভেঞ্চারিস্টদের। কিন্তু লংলিস্ট থেকে ও’ফ্লিনের বিদায়ের পর অবধারিতভাবেই সবার দৃষ্টি চলে যায় ইয়ান ম্যাকইউয়ানের দিকে। ২০০৫ সালের লংলিস্টে ফেভারিট ছিলেন ম্যাকইউয়ান, ইরাক-যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখিত তাঁর ‘স্যাটারডে’ উপন্যাসের দিকে সবার দৃষ্টি। ব্রিটিশ এই পুরস্কারটির কর্তাব্যক্তিরা ম্যাকইউয়ানকে বিজয়ী হিসাবে ঘোষণা দিয়ে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করবেন; সাহিত্যপ্রেমীদের এবং, বলাই প্রয়োজনীয়, জুয়াড়িদের মধ্যে কানাঘুষার এইরকম একটা পরিস্থিতিতে শর্টলিস্ট থেকেই বাদ পড়লেন তিনি। পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত বিদায়ে সাহিত্য সমালোচকরা ক্ষুব্ধ হন।
ম্যাকইউয়ানের বিপরীতে আইরিশ লেখক সেবাস্টিয়ান ব্যারিকে শর্টলিস্টে রাখার কারণে গার্ডিয়ান পত্রিকায় সমালোচনাও করা হয়। সেবার লংলিস্ট থেকে বিদায় নিলেও এবার ঠিকই শর্টলিস্টে পৌঁছে গেছেন ম্যাকইউয়ান তাঁর ‘অন চেসিল বিচ’ নিয়ে। সঙ্গে আছেন আরো পাঁচজন : নিকোলা বারকার (ডার্কম্যানস), অ্যানি এনরাইট (দ্য গ্যাদারিং), মোহসিন হামিদ (রিলাকটেন্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট), লায়ড জোন্স (মিস্টার পিপ) এবং ইন্দ্রা সিনহা (অ্যানিম্যাল’স পিপল)। ইন্দ্রা সিনহার ‘অ্যানিমেলস পিপল’-এর কথা আপাতত বাদ দিলে (এ-প্রসঙ্গে খানিক বাদে বলছি) সবদিক বিবেচনায় ইয়ান ম্যাকইউয়ান-ই আবারও ফেভারিটের তালিকায়। ম্যানবুকার পুরস্কারের ইতিহাসের দিকে তাকালে আরো সহজেই বোঝা যায়, ম্যাকইউয়ান কেন ফেভারিটের তালিকায় থাকবেন। ১৯৮১ সালে তাঁর উপন্যাস ‘দ্য কমফোর্ট অব স্ট্র্যাঞ্জারস’ বুকারে শর্টলিস্টেড হয়, এরপর ১৯৯২ সালে তাঁর ‘ব্ল্যাক ডগস’ আবার শর্টলিস্টেড হয়, ১৯৯৮ সালে তাঁর ‘আমস্টারডাম’ বুকার পুরস্কারের চূড়ান্ত বিজয়ী হয়, ২০০১-এ তাঁর ‘অ্যাটোনমেন্ট’ শর্টলিস্টেড হয়, ২০০৫-এ লংলিস্টেড হয় তাঁর ‘স্যাটারডে’, এবার ২০০৭-এ শর্টলিস্টেড হয় ‘অন চেসিল বিচ’। অথচ, ২০০৫-এর মতো এবারও শেষতক হোঁচট খেলেন আরেক আইরিশ লেখক অ্যানি এনরাইট-এর কাছে।
এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক অ্যানি এনরাইটের দিকে। ১১ অক্টোবর, ১৯৬২-তে ডাবলিনে জন্ম নেয়া অ্যানি তাঁর পঁয়তাল্লিশতম জন্মদিন পালনের মাত্র পাঁচ দিন পর ঘোষিত হলেন ম্যানবুকার ২০০৭-এর বিজয়ী হিসাবে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়ায় লেস্টার পিয়ারসন ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজ অব দ্য প্যাসিফিক-এ ইন্টারন্যাশনাল ব্যাকালরিয়েট (ডিপ্লোমা) ডিগ্রির জন্য দু’বছরের একটা স্কলারশিপ পান। ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন থেকে ইংরেজি এবং দর্শনে ডিগ্রি লাভ করার পর ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট আংলিয়া’স ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স-এ পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন। অ্যাঞ্জেলা কারটার এবং ম্যালকম ব্র্যাডবারির তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা শেষে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে প্রোডিউসার এবং ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেন ডাবলিনের স্টেট টেলিভিশন আরটিই-তে। ছয় বছরের চাকরিজীবনের প্রথম চার বছর অসম্ভব জনপ্রিয় টিভি শো নাইটহকস-এর প্রোডিউসার ছিলেন। পরের দুই বছর কাজ করেন শিশুদের প্রোগ্রামিং-এ। এর মধ্যেই সময় বের করে লিখতেন। ১৯৯২ সালে ‘দ্য পোর্টেবল ভার্জিন’ নামে গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, এবং একই সালে রুনি প্রাইজ ফর আইরিশ লিটারেচার পুরস্কার লাভ করে। বলা যায় ১৯৯৩ সালের পর থেকে অ্যানি পেশাদার লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যানি এনরাইট বিয়ে করেছেন প্যাভিলিয়ন থিয়েটারের ডিরেক্টর মার্টিন মারফিকে। তাঁদের সন্তান আছে দুটি।
অ্যানি এনরাইটের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য উইগ মাই ফাদার ওর’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। প্রেম, মাতৃত্ব, রোমার ক্যাথলিকিজম, যৌনতা ইত্যাদি উপন্যাসটির আখ্যান দখল করে আছে। উপন্যাসের কথক গ্রেইস কাজ করেন একটি গেম শো-তে। ডাবলিনেই থাকেন তিনি। গ্রেইস নামের মেয়েটির বাবা একটি উইগ পরেন, যেটা আবার তাঁর সামনে উচ্চারণ করা বারণ। স্টিফেন নামের এক দেবদূত ১৯৩৪ সালে আত্মহননের পর এখন আবার মর্ত্যে ফিরে আসেন হারানো আত্মাদের দিকনির্দেশনা দেবার তাগিদে। গ্রেইসের বাড়িতেও একসময় আসেন স্টিফেন, কালক্রমে স্টিফেনের প্রেমে পড়ে যান গ্রেইস। অ্যানির এই উপন্যাসটি আইরিশ টাইমস/‘আয়ার লিংগাস আইরিশ লিটারেচার প্রাইজ’* শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছিলো।
অ্যানির পরবর্তী উপন্যাস ‘হোয়াট আর ইউ লাইক?’ দুই জমজ সহোদরার ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠার আখ্যান। দুই বোনের জন্মের কিছু সময় পরে মারা যান তাদের মা; দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ব্রেইন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। দুই বোনের একজন, মারিয়া, বেড়ে ওঠে বাবার হাত ধরে, ডাবলিনেই। আর অন্যজন, রোজকে দত্তক নিয়ে যায় এক ইংরেজ পরিবার। এভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই পরিবেশে বেড়ে ওঠে দুই বোন। মারিয়া একবার কিছুদিনের জন্য নিউ ইয়র্কে গেলেও আবার চাকরি নেয় ডাবলিনের একটা কাপড়ের দোকানে। ওদিকে রোজ শুধু সেক্স আর সেক্স : “প্র্যাকটিস করেই যাচ্ছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি।” তাদের দু’জনেরই যখন বাইশ বছর বয়স, উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে, রোজ জানতে চায় তার আসল মায়ের পরিচয়। এক পর্যায়ে এও জানতে পারে যে, ওর এক জমজ বোন আছে। মারিয়া, রোজ এবং তাদের বাবা এই তিনজনের দৃষ্টিভঙ্গীতে ছোট ছোট অনুচ্ছেদে রচিত উপন্যাসটি রয়্যাল সোসাইটি অব অথরস এনকোর প্রাইজ লাভ করে। উপন্যাসটি হুইটব্রেড অ্যাওয়ার্ডস-এর নভেল ক্যাটাগরিতেও শর্টলিস্টেড হয়েছিলো।
২০০২ সালে অ্যানি এনরাইটের ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস ‘দ্য প্লেজার অব এলিজা লিঞ্চ’ প্রকাশিত হয়। এলিজা লিঞ্চ (১৮৩৫? - ১৮৮৪) একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। আয়ারল্যান্ডের কর্কে জন্ম নেয়া এলিজা দশ বছর বয়সে আয়ারল্যান্ডের মহাদুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্যারিসে পাড়ি দেন পরিবারের সঙ্গেই। প্যারিজিয়ান কোর্টিজান (কোর্টিজান ইতিহাসের সঙ্গে সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের বাইজি-সংস্কৃতির একটা সম্পর্ক আছে। এ-বিষয়ে স্বতন্ত্র গবেষণা করার ইচ্ছা আছে আমার।) হিসাবে কাজ করতেন এই রমণী। ১৮৫৪ সালে প্যারাগুয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস অ্যান্টোনিও লোপেজ (৪ নভেম্বর ১৭৯০ - ১০ সেপ্টেম্বর ১৮৬২)-এর পুত্র ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এলিজার। ১৮৫৫ সালে লোপেজ যখন প্যারাগুয়েতে ফেরেন, তখন এই রমণী তাঁর বাহুলগ্না ছিলো। পরবর্তী পনেরো বছর দেশের অন্যতম প্রধান ক্ষমতাধর এক নারীর বেশে জীবনযাপন করেছেন এলিজা লিঞ্চ।
১৮৬২ সালে কার্লোস অ্যান্টোনিও লোপেজের মৃত্যুর পর পুত্র ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজ উত্তরাধিকার সূত্রে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট হন। এলিজা লিঞ্চও স্বাভাবিকভাবেই দেশটির ফার্স্ট লেডি (উল্লেখ্য, তাঁরা কখনো বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হননি, অবশ্য কোর্টিজান প্রথা অনুযায়ী এ-জাতীয় সম্পর্ক বিবাহসম্পর্ক-বহির্ভূতই হতো।) বনে যান। প্যারাগুয়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দেন এই নারী, তিন লক্ষাধিক প্যারাগুইয়ানের মৃত্যু হয় সে যুদ্ধে। ১ মার্চ ১৮৭০ তারিখে ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজের মৃত্যুর পর এলিজাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৮৮৪ সালে প্যারিসে অজ্ঞাতেই মৃত্যু হয় এলিজা লিঞ্চের। তাঁর মৃত্যুর একশো বছরেরও বেশি সময় পর স্বৈরাচারী জেনারেল আলফ্রেডো স্ট্রেসনারের নির্দেশে তাঁর মৃতদেহ প্যারাগুয়েতে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়, এবং তাঁকে ন্যাশনাল হিরোইন আখ্যা দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এলিজা লিঞ্চের মেলোড্রামাটিক জীবনী অবলম্বনে অবশ্য আরো কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের তালিকায় আছেÑ গ্র্যাহাম শেলবি’র ডিমান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৯০), লিলি টাক-এর দ্য নিউজ ফ্রম প্যারাগুয়ে (২০০৪)। উপন্যাসটির উচ্চকিত প্রশংসা করে রিভিউ প্রকাশিত হলেও পুরস্কার-প্রদানকারী কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
এনরাইটের চতূর্থ উপন্যাস ‘দ্য গ্যাদারিং’ প্রকাশিত হয় এ-বছর। আয়ারল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসটি মূলত একটি আইরিশ পরিবারের তিন প্রজন্মের আখ্যান। উপন্যাসটির নাম-কারণ উপন্যাসটিরই একটি চরিত্র লিয়াম হেগার্তি’র শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারী জনসমাবেশ। মদ্যপ হেগার্তি ব্রাইটনের সাগরে আত্মহত্যা করে। উপন্যাসটি শুরুই হয়েছে মৃত্যু দিয়ে। হেগার্তি’র আত্মহত্যার কথা তার মাকে জানায় বোন ভেরোনিকা। একে একে পরিবারের সব সদস্য জড়ো হয় হেগার্তির শেষকৃত্যে। উপন্যাসের কথক ঊনচল্লিশ বছর বয়স্ক ভেরোনিকা ছিলো লিয়াম হেগার্তি’র সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ভাইয়ের মৃত্যু-রহস্যের একটা অর্থ দাঁড় করানোর চেষ্টায় ভেরোনিকা তার পারিবারিক টানাপড়েনের অতীত কাহিনী রোমন্থন করে, ছোটবেলার স্মৃতিতে আচ্ছন্ন হয় সে। দাদিমার বাড়িতে থাকার সময় কোনো ঘটনা হয়তো হেগার্তিকে মদ্যপানে আসক্ত করে ফেলে বলে মনে করে ভেরোনিকা। এভাবে মৃত্যু, অস্বস্তিকর পারিবারিক ইতিহাস, অসুখী ছেলেবেলা, স্মৃতি রোমন্থন আর যৌনতার আইরিশ দলিল অ্যানি এনরাইটের ‘দ্য গ্যাদারিং’। বিশেষত যৌনতার বিষয়টা বেশ জটিল বলা যায়। যেমন, উপন্যাসের শেষের দিকে দেখা যায় ভেরোনিকা সন্তানসম্ভবা, সম্ভবত একটি ছেলে কর্তৃক যাকে সে হয়তো লিয়াম (আত্মহত্যা করে যে ভাইটি তার মারা গেছে তার নামও লিয়াম হেগার্তি) নামে ডাকে। অথবা সঙ্গমোত্তর একটা দৃশ্যের বর্ণনায় দেখা যায়, ভেরোনিকা ওর স্বামীকে বলে, “তোমার মেয়েরাও তোমার মতোই পুরুষদের সঙ্গে বিছানায় যাবে। ওরা তাদেরকে ঘেন্না করবে, এই কারণে যে ওরা তাদেরকে আকাক্সক্ষা করে।”
উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এর অনেকগুলো প্রশংসাসূচক রিভিউ প্রকাশিত হয়। বই বিক্রির পরিসংখ্যানও ভালোই বলা যায়। কিন্তু ম্যানবুকারের চূড়ান্ত বিজয়ী ঘোষণার আগে অন্তত বিচারকগণ ভারতের ভোপালের প্রেক্ষাপটে রচিত ইন্দ্রা সিনহার ‘অ্যানিমেল’স পিপল’-এর কথা আরেকবার ভাবতে পারতেন বলে মনে করেন অনেকে। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি টিন-এজ বালক, পেছনের দিকটা বিচ্ছিরিরকম প্যাঁচানো বলে তাকে চার পায়ে হাঁটতে হয়, পশুর মতো। বাচ্চা ছেলেরা তাকে পশু বলেই ডাকে। দিনমান একা একা পথে হাঁটতে হাঁটতে আর বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অনেকটা আধা-বন্য হয়ে ওঠে বালকটি। মানুষদের প্রতি তার ঘেন্নাও বাড়তে থাকে…উপন্যাসটির আখ্যান এরকম।
ম্যানবুকার পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর একজন হাওয়ার্ড ডেভিস অবশ্য অ্যানি এনরাইটকে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলেছেন, উপন্যাসটির শেষটা দুর্দান্ত। এ-মন্তব্য নিয়ে বিস্তর ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা হচ্ছে। গার্ডিয়ানে স্টুয়ার্ট জেফরিজ এ-মন্তব্যের সঙ্গে কোনোভাবেই একমত নন। শেষ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, হোক। এ-লেখাটির শেষ নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে, তাও হোক। শেষ করবো অ্যানি এনরাইটের ‘দ্য গ্যাদারিং’-এর ভেরোনিকার একটি সংলাপ দিয়ে : “একেবারে রাখঢাক ছাড়া বলতে গেলে, শেষতক আমরা তো মানুষ।” ……. *১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পুরস্কারটি যৌথভাবে স্পন্সর করতো আইরিশ টাইমস ও আয়ার লিংগার। ৯২-র পর থেকে আইরিশ টাইমসই স্পন্সর করে আসছে এ পুরস্কার। original post
উনিশ শতকের আমেরিকান কবিদের মধ্যে দুজনকে অরিজিনাল কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ওয়াল্ট হুইটম্যান অপরজন এমিলি ডিকিনসন। এমিলি ডিকিনসন তার কবিতায় ভাঙা ছন্দ, ড্যাশ চিহ্ন, যত্রতত্র বড় হাতের অক্ষর ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব প্রকাশরীতির জন্য আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাত। আমেরিকান স্কুলে অহরহ এমিলির কবিতা পড়ানো হয়। স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে এ দেশের সব ধরনের মানুষ এমিলি ডিকিনসনের নাম ও লেখার সাথে অল্পবিস্তর পরিচিত। যে কোনো লাইব্রেরীতে গেলে তার উপর শতখানেক বই পাওয়া যাবে। তারপরও তার উপরে অনুসন্ধান করে চলেছেন পণ্ডিতরা। এমিলি ডিকিনসন প্রায় ১৮০০ কবিতা লিখেছেন। তার মধ্যে ৮/১২ কবিতা তার জীবদ্দশায় ছাপা হয়েছিল। যে অন্তর্গত তাঁকে জীবন সম্পর্কে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো সেই অন্তর্জগতের ভিত গড়ে উঠেছে সত্যকে (অন্য কথায় সৌন্দর্যে) জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও মৃত্যুচিন্তা থেকে। আর পাশাপাশি দুটি বাড়ি যে বাড়িতে এমিলি ডিকিনসন থাকতেন এবং তার পাশের বাড়ি যেখানে তার ভাই অস্টিন ও তার পরিবার বাস করতো - এই দুটো বাড়ির মধ্যেই এমিলি ডিকিনসন তার জীবন ও চলাফেরা সীমিত রেখেছিলেন। তাই পাশাপাশি এ দুটি বাড়ি তার অন্তর্জগত ছুঁয়ে নানা রূপে ও রূপকে উপস্থাপিত তার কবিতায়। মিউজিয়ামের পেছন দিক। দরজার সর্বডানে রান্নাঘর, যেখান থেকে ট্যুর শুরু হয়। ছবি – লেখক
এমিলি ডিকিনসনের বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে মনে হলো তার বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি চরণ:
I'm Nobody! Who are You? Are you nobody, too? Then there 's a pair of us—don't tell! They 'd banish us, you know.
এমিলি ডিকিনসনের বোধে যে নির্মোহতা যা তার কবিতায় প্রতিফলিত তা তার দীর্ঘদিনের সাধনার অর্জন। সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মাঝে পরিভ্রমন ও সত্য অনুসন্ধানে এমিলির প্রয়োজন ছিল সীমাহীন নির্জনতা। এই নির্জনতা তিনি খুজে নিয়েছিলেন তার মতো করে। এমিলির বাবা মা তাদের তিন সন্তানের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও তাদের ইচ্ছার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এমিলি চেয়েছিলেন একজন লেখক হতে। গৃহস্থালী কাজের দায়িত্ব এমিলি নিতে চাননি, গ্রহণও করেননি উনিশ শতকের এমহার্স্টের সুন্দরীতম এই নারী। সৃজনশীল কাজের জন্য প্রয়োজন নিজস্ব সময় ও অনুশীলন। লাজুক প্রকৃতির হলেও এমিলি ডিকিনসন খুব শক্তভাবেই জানতেন তিনি কি চান।
খন্ডিতভাবে তার জীবনের ঘটনাসমূহের দিকে তাকালে তা বোঝা যায়না। অনেক পন্ডিত এমিলি ডিকিনসন ও তার কবিতাকে বিভিন্ন অবস্থান থেকে দেখেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। এই খন্ডিত দেখার চেষ্টা অনেকক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে মাত্র। কিন্তু কোথাও পৌঁছাতে সহায়তা করেনি।
এমিলি ডিকিনসনের কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয় গ্রিটিংস কার্ডের মাধ্যমে। তখন দেশের বাইরে থেকে কার্ড আসতো ঢাকায়। কিছু কার্ডে সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখা থাকতো। তার বহু পরে আধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও সাহিত্যিক আহমদ ছফার মধ্যে আলাপের সময় আরো অনেক নামের মধ্যে আবারো এমিলি’র নামটা শুনলাম। লেখক ও লেখকের অরিজিনালিটি নিয়ে আলাপ হচ্ছিল সেদিন। রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে গোল টেবিলটায় বসে কথা বলছেন দুই পন্ডিত, আমি একটু দূরে শেলফের বইগুলো দেখছিলাম। নামটা শুনে কান খাড়া করলাম। সেখান থেকেই এমিলি ডিকিনসন ও তার কাজের প্রতি আমার আরো আগ্রহ।
মিউজিয়াম এমিলি ডিকিনসনের মৃত্যুর পরে দীর্ঘদিন ধরে দুটো বাড়িই স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক গৃহ মিউজিয়াম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিলো। ২০০৩ সালে এমহার্স্ট কলেজ-এর অধীনে এ দুটি একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়ামটি। এই মিউজিয়ামের দুটি ভাগ। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হোমস্টেড বা খামারবাড়ি, যেখানে এমিলি থাকতেন এবং এভারগ্রিনস, যে বাড়িটিতে এমিলির ভাই ও তার পরিবার বাস করতেন এবং যে বাড়ির মাধ্যমে এমিলির সাথে এমহার্স্টের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘটতো।
হোমস্টেডস, এভারগ্রিনস ও এমিলি ডিকিনসনের কবিতার ম্যাটাফোর এমিলি ডিকিনসন জন্মেছিলেন ১৮৩০ সালের ৬ ডিসেম্বর। ১৭ বছর বয়সে এমিলি মাউন্ট হলিউক ফিমেইল সেমিনারীতে পড়াশোনা করতে যান। ঘরকাতরতা ও শারীরিক অসুস্থতার জন্য এক বছর পরই ফিরে আসেন। কারো কারো মতে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে তিনি লাঞ্ছিত বোধ করেছিলেন, সে কারণে তিনি ফিরে আসেন। তারপর তিনি খুব একটা বাড়ি থেকে বের হননি বা তেমন কারো সাথে দেখা করেননি। এমিলি ডিকিনসন তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন বাড়ির ভেতরে। আর এ কারণেই তার আবাস গুরুত্বপূর্ণ। মেসেচুসেটস স্টেইটের এমহার্স্ট এ কবি এমিলি ডিকিনসনের (১৮৩০-১৮৮৬) অন্তরঙ্গ আবাসটি এখনো ধরে রেখেছে তার স্মৃতি। এমহার্স্টের মেইন স্ট্রিটের উপরে ব্রিক ফেডারাল স্টাইলের এই বাড়িটি তৈরি ১৮১৩ সালের দিকে। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন এমিলির পিতামহ। যা এখন আমেরিকার একটি জাতীয় ঐতিহাসিক খুটিচিহ্ন। বড় হবার পরে এ বাড়ির মধ্যে এমিলির শোবার ঘরটি ছিলো দোতলায় ডান দিকের কোনায়। যে ঘরের এক জানালা দিয়ে এমহার্স্টের কেন্দ্রস্থল দেখা যেতো, অন্য জানালাটি ছিলো তার ভাই অস্টিনের বাসার দিকে। এই ঘরে বসেই তিনি তার কবিতাগুলো ঘষামাজা করতেন। যার মধ্যে রয়েছে ‘আই এম নোবডি! হু আর ইউ’ এবং ‘বিকজ আই কুড নট স্টপ ফর ডেথ।’ বাগানের দিক থেকে এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়াম, মাঝখানের বারান্দার দরজাটি বর্তমানে এর প্রবেশদ্বার, সর্বডানে ছোট্ট বারান্দাটি বসারঘর সংলগ্ন। ছবি – লেখক
এমিলি ও তার বোন লেভিনিয়া দুই অবিবাহিত বোন থাকতেন বাবা মায়ের সাথে পৈতৃক নিবাসে। ভাই অস্টিনের বিয়ে উপলক্ষে ওদের বাবা তাদের বাসার পাশেই ওদের জন্য আরেকটি বাড়ি তৈরি করে দেন। বাড়িটি ইতালিয়ান স্টাইলে তৈরী। এমিলির বাসাটি যেমন তাকে দিয়েছিল নির্জনতা তেমনি অস্টিন ও সুজানের বাড়িটিতে বিশেষ ব্যক্তিদের আনাগোনার ফলে এমিলি সেখান থেকে পরক্ষে পেতেন এমহার্স্টের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তাপ ।
১৮৮৬ সালে ৫৬ বছর বয়সে এমিলি তার ঘরে লোকান্তরিত হন আর পৃথিবীর জন্য রেখে যান অজস্র অপ্রকাশিত কবিতা।
এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়ামে কবির পোষাকের নমুনা, ব্যবহার্য আসবাব, দু’একটি বই - সব দর্শনীয় করে সাজানো, যেমনটি ছিলো তিনি যখন বেঁচে ছিলেনে। যদিও দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে যে দরজাটি বাড়ির ফটক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেটা এখন বন্ধ । শুধুমাত্র ট্যুর শেষে সেখান দিয়ে দর্শকরা বের হয়ে যান। রান্নাঘরটির আসবাব সরিয়ে অন্যভাবে সাজানো হয়েছে। সেখানে রাখা হয়েছে এমিলির মায়ের পেয়ানোটি।
বর্তমানে বাগানের দিক দিয়ে মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার। ঢুকেই প্রথমে অভ্যর্থনা। সেখানে গিফ্ট শপ এ সাজানো রয়েছে এমিলি ডিকিনসনের কবিতার বই, তার জীবনী, কবির উপরে লেখা অন্যদের বই, গ্রিটিংস কার্ড এবং বিভিন্ন সুভেনির। তার পাশেই পরিচিতি প্রদর্শনী। সেখানে আছে এমিলির কবিতাসম্বলিত পোস্টার, ট্যুর সেন্টারের কার্যক্রম, এমিলি ডিকিনসনের উপরে অনুষ্ঠানমালার বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি। এ দুটোই সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাকী ঘরগুলো দেখতে হলে গাইডেড ট্যুর নিতে হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় রয়েছে একটি করে ৪০ মিনিটের গাইডেড ট্যুর। প্রতিদিন গড়ে এরকম ৬/৮টি ট্যুর থাকে সাধারণত। মিউজিয়ামটি সারা বছর খোলা থাকে না। এ বছর এটা খোলা থাকবে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত।
আমরা গিয়েছিলাম এ বছর গ্রীষ্মে - জুলাই মাসের ২৮ তারিখে।পৌছতে পৌছতে দুপুর।
মিউজিয়ামে গিয়ে তখন যে ট্যুরটি পেলাম তার নাম হলো ‘দিস ইজ মাই লেটার টু দ্য ওয়ার্লড’। এই ট্যুরটির গাইড ছিলেন লেখক ও স্কলার জোয়ান ডেবসন। আর ২০ মিনিট পরে ট্যুর শুরু হবে। এর মধ্যে আরো অনেকে এলো। সব মিলিয়ে ১০ জনের একটা দল। অভ্যর্থনা ঘরের বাম দিকের দরজা খুলে একজন জানতে চাইলেন এই ট্যুরে কতোজন? প্রশ্ন শুনে আমি এগিয়ে গেলাম বামদিকের ঘরটিতে। এমিলি ডিকিনসনের বড় একটি ছবি দেয়ালে। ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলার সাথে চোখাচোখি হতেই আমি হাসলাম, বললাম, হাই। তিনিও হাসলেন। বললেন ইজিন্ট সি বিউটিফুল? আমি বললাম ইয়েস সারটেনলি সি ইজ। ভদ্রমহিলা হাসলেন আবারো, তারপরে নিজের নাম বলতে বলতে বাড়িয়ে দিলেন হাত। আমি তার সাথে হাত মেলাতে মেলাতে আমার নাম বললাম। প্রশ্নের উত্তরে যথারীতি বুঝিয়ে বললাম বাংলাদেশটা কোথায়। ডেবি শুনে উচ্ছ্বসিত। জানতে চাইলেন আমি কি কবির নাম আগে শুনেছি? আমি বললাম, হ্যা বহুদিন আগে যখন বাংলাদেশে ছিলাম। আলাপচারিতায় ডেবি আরো উচ্ছ্বসিত। আমি যখন কথা বলছি ডেবির সাথে তখন অন্যরা বাইরের গিফ্টসপে দাড়িয়ে রয়েছে। কেউ আগ বাড়িয়ে ঘরটিতে আসছে না। আমি একটু অবাকই হলাম। তখনো আমি জানি না ডেবি একজন স্কলার ও খ্যাতিমান লেখক। ডেবির প্রশ্নের জবাবে আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেই চলেছি আমি কি দেখতে চাই। ‘আমি জানতে চাই কবির ব্যবহৃত চিত্রকল্পের সাথে তার পরিবেশের সম্পর্ক। কোন বিষয়গুলো এমিলির কবিতা ভাবনাকে উদ্দীপিত করেছিলো। আমি এমন ভাবে মিউজিয়ামটি দেখতে চাই যেন আমার মনে হবে কবি এইমাত্র এখান থেকে উঠে গেছেন, এক্ষণি ফিরবেন। আর ওনার কি আরো ফটো আছে ভেতরে?’ ডেবি হেসে বললেন ‘এটা খুবই দুঃখজনক যে এমিলির তেমন সিংঙ্গেল ফটো নেই। দু’ একটি ফটো আছে আর আকা ছবি আছে। তবে মিউজিয়ামের ভেতরে গেলে কিছু পারিবারিক গ্রুপ ফটো দেখা যাবে। আর বাকীগুলো এই ট্যুর কিছুটা সহায়তা করবে। তবে আমাদের মেইলিং লিস্টে ঠিকানা দিয়ে গেলে বিভিন্ন ইভেন্টের খবর পাওয়া যাবে।’
এরপর ডেবি সবাইকে ডাকলেন, ওই ঘর থেকেই আমাদের ট্যুর শুরু হলো। প্রথমেই একটা পেসেজ দিয়ে যে ঘরটায় পৌঁছালাম সেটা নতুন করে সাজানো হয়েছে। ওটা ছিল ওই বাড়ির রান্নাঘর। দরজা দিয়ে ঢুকেই দরজা সংলগ্ন দেয়ালের দিকে এমিলির মায়ের পেয়ানো। যে ঘরটিতে প্রথমে দাড়িয়েছিলাম এটা ছিল প্রথমে সেখানে। এই পেয়ানোতে বসেই এমিলি আর তার ভাই অস্টিন গান শিখেছে মায়ের কাছে। এমিলির কবিতায় আওয়াজ বা ধ্বণির চিত্রকল্পের ব্যবহার অথবা কাব্যিক সংগীত সৃষ্টি করার যে প্রবনতা রয়েছে তা সম্ভবত তার এই শৈশবের সুরেলা বোধ থেকেই এসেছে। যদিও ডেবি বলতে শুরু করেছেন দেয়ালে ঝুলানো এমিলির দাদা আর বাবার গল্প দিয়ে। দাদা ছিলেন আইনজীবী, এই বাড়িটি তিনিই এখানে করেছিলেন। বাবাও ছিলেন পেশায় আইনজীবী, তিনি ছিলেন এমহার্স্ট কলেজের কোষাধক্ষ্য ও একজন কংগ্র্রেসম্যান আর মা ছিলেন তৎকালীন গৃহবধু। ওরা তিন ভাইবোন। অস্টিন, এমিলি ও লিভানিয়া।
ঘরের মাঝখানের দরজা দিয়ে বামের ঘরটিতে গেলাম আমরা। ওটা ওদের ডাইনিংরুম। এমিলির মায়ের হাতে তৈরি কাপড়ে সুতা দিয়ে এমব্রডায়েরি করা বাক্য ‘সুইট হোম’ ফ্রেমে ঝুলন্ত - দেয়ালে। পুরানো দিনের ডাইনিংটেবিল। ঘরের কোনে ছোট্ট শোকেসে একটা বই রাখা। বইটি এমিলির মায়ের। তখনকার শিক্ষিত মায়েরা/গৃহবধুরা এই বইটি পড়তেন। বইটির নাম হাও টু বি এ গুড ওয়াইফ। রাস্তার দিকের জানালার পাশে দুটো কাঠের চেয়ারের মাঝখানে একটা কাঠের সাইড টেবিল। তার উপরে অতি পুরানো একটা ইংরেজী অভিধান। ডেবি বললেন ‘এই অভিধানটি এমিলি ডিকিনসনের। এমিলির জীবনে অভিধানের গুরুত্ব অপরিসীম।’
সেটা সহজেই অনুমেয়। এমিলির কবিতায় ম্যাটাফোরের ব্যবহার ও অভিধানের গুরুত্ব দেখার জন্য তার Hope is the thing with feathers কবিতাটির দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, এমিলি ডিকিনসন আলাদা করে কবিতার নামকরণ করতেন না। কবিতার প্রথম চরণই তাই কবিতার শিরোনাম বা পরিচিতি। তার সবগুলো কবিতাকে পরে পাচটি সিরিজের আওতায় বিন্যাস্ত করা হয়েছে। এই সিরিজগুলোর নাম হলো লাইফ (Life), নেচার (Nature), লভ (Love), টাইম এন্ড ইটারনিটি (Time and Eternity) ও সিঙ্গল হাউন্ড (The Single Hound)।
Hope is the thing with feathers That perches in the soul, And sings the tune--without the words, And never stops at all,
এমিলি ডিকিনসন হোপ বা আশাকে ব্যাখ্যা করেছেন পাখীর সাথে তুল্য উপমা দিয়ে। হোপ বা আশা হলো একটা জিনিস (”thing”) কারণ এটা একটা অনুভূতি, যে জিনিস বা অনুভূতি পাখীর মতো। এখানে ডিকিনসন সংজ্ঞার জন্য স্টেন্ডার্ড অভিধান ব্যবহার করেছেন। প্রথমে তিনি শব্দটিকে সাধারণ শ্রেনীতে ফেলেছেন (”thing”) এবং তারপর ঐ শ্রেনীভূক্ত আর সব শব্দ থেকে নির্বাচিত শব্দটিকে পৃথক করেছেন। যেমন, বিড়ালের সংজ্ঞা হবে এই রকম: বিড়াল হলো একটি ম্যামাল । এই শ্রেনীকরণে আরো প্রানী রয়েছে সুতরাং সংজ্ঞার বাকী অংশে থাকবে যা এই বিড়ালকে অন্য ম্যামাল থেকে আলাদা করে অর্থাৎ বৈশিষ্ট্যগুলো। যেমন - যা রোমশ, রাতের শিকারী, যে সমান্য শব্দে কান খাড়া করে ইত্যাদি, সংজ্ঞার দ্বিতীয় অংশ তার গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যের কারনে অন্যান্য ম্যামাল থেকে বিড়ালকে পৃথক ভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এমিলি তার কবিতায় তুল্য প্রানীটির নাম না করে সংজ্ঞার দ্বিতীয় অংশ থেকে এমন সব বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন যা ওই প্রাণীটির চিত্র মানুষের মনে সহজেই তুলে ধরে। যেমন পালক/ পালকগুচ্ছ (feathers), আসনগ্রহণ বা অবতরণ করে (perches), গান গায় (sings) ইত্যাদি যা মনে একটি পাখীর অবয়বই ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু কবিতায় কোথও পাখী শব্দটি সরাসরি নেই।
অল্প বয়সেই এমিলি বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। যেমন ক্লাসিক সাহিত্য, ভারগিল ও লাটিন, গনিত, ইতিহাস ও উদ্ভিদবিজ্ঞান। ১৮৪০ সালে এমিলি এমহার্স্ট একাডেমীতে ভর্তি হন বিজ্ঞানী ও থিওলজিয়ান এডোয়ার্ড হিচককের তত্ত্বাবধানে। এর মধ্যেই প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী এমিলি প্রমাণ করেছেন নিজের মেধা ও অধ্যাবসায়। ১৭ বছর বয়সে এমিলি বাড়ি ছেড়ে যান মাসাচুসেটসের সাউথ হেডলি (South Hadley, Massachusetts)–তে অবস্থিত মাউন্ট হলিওক ফিমেইল সেমিটারি- তে (Mount Holyoke Female Seminary) পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তিনি ফিরে আসেন। শারীরিক অসুস্থতা ও ঘরকাতরতার কারণে, কেউ বলেন কর্তৃপক্ষ মেরি লিওনের এর সাথে মতভেদের কারণে এমিলি লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। পৈতৃক নিবাসে ফিরে এমিলি তার প্রথম কবিতা লেখেন। এমিলি যদিও কলেজ ক্যাম্পাসের কাছেই থাকতেন এবং তাদের বাড়িতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতৃবৃন্দের আসা যাওয়া ছিল। তবু তিনি সব দিক থেকে গুটিয়ে আরো বেশী সময় একা থাকতে শুরু করেন এবং নির্বাচিত কিছু বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে চিঠির যোগাযোগ করতেই তিনি বেশী পছন্দ করতেন।
এই ঘর থেকে আমরা ডেবিকে অনুসরণ করে বাড়ির প্রধান দরজার সামনে দিয়ে গেলাম তার পাশের ঘরে। বসার ঘর। উনিশ শতকের সোফাসেটের গোল মধ্য টেবিলে আছে একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা - ইনডিপেনডেন্ট। এই পত্রিকাটির সাথে এমিলির সম্পর্ক নিবিড়।
অস্টিনের বিয়ের পরে এভারগ্রিনসে আসা যাওয়া ছিল রালফ এমারসন ও ‘স্প্রিংফিল্ড রিপাবলিকান’ পত্রিকার সম্পাদক সেমুয়েল বোলেস এর মতো আরো ব্যক্তিবর্গের। সেমুয়েল বোলেস এমিলির দু-একটি কবিতা তার পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৬২ সালে মাসিক এটলান্টিক পত্রিকায় কবিতা জমা দেবার এক আহবানে এমিলি সাড়া দেন। তিনি পত্রিকার সম্পাদক হিগিসনের সাথে পত্রযোগাযোগ করেন। হিগিসন তার কবিতা সম্পাদনা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এমিলি তাতে সম্মত হননি। যদিও তাদের মধ্যে একটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চিঠির মাধ্যমে তাদের ভাবের ও চিন্তার আদান প্রদান চলতে থাকে। অনেকে মনে করেন হিগিসনের জন্য এমিলির মনে রোমান্টিক একটা স্থান ছিল। গবেষকরা এ রকম আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন।
বসার ঘরের দেয়ালে রয়েছে গ্রুপফটো। পারিবারিক সব ছবি। দেয়ালের দিকে আছে একটা বিশাল কাঠের শেল্ফ। ওটাতে বই ছিলো। এখন আর নেই। বইগুলো চলে গেছে মিউজিয়ামের লাইব্রেরীতে। আমাদের গ্রুপের মধ্যে ছিলো চারটা স্কুলের ছেলেমেয়ে। ডেবি ওদের জিজ্ঞাসা করলেন ‘উনিশ শতকের বিশেষ একটা ঘটনা কি? তখন কি চলছিল চারদিকে?’ বাচ্চা দুটো সমস্বরে বলে উঠলো – ‘গৃহযুদ্ধ।’ ডেবি বললেন ‘এই যুদ্ধ এমিলিকে অস্থির ও হতাশ করতো। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার তীব্র অনুভূতি তার কবিতার মধ্যে এসেছে।’ এর বেশী কিছু আর ডেবি বললেন না। খেয়াল করলাম যেখানেই বিতর্কের অবকাশ আছে সেখানেই ডেবি সাবধানী ও সংযত।
এমিলি ডিকিনসনের সবচেয়ে সৃজনশীল লেখার সময়টি যদিও আমেরিকান গৃহযুদ্ধের কাল, কিন্তু তার লেখায় যুদ্ধ এসেছে কি না তা নিয়ে মতভেদ ছিল। ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ৮৫২টি কবিতা লিখেছেন। যদিও তিনি যুদ্ধের কথা তার চিঠিতে লিখেছেন, কিন্তু বিদ্বানরা তার কবিতায় যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে এক মত নন। ১৯৭৭ সালে এডমুন্ড উইলসন ঘোষরা করেন এবং উইলসনের সাথে কেউ কেউ মনে করেন এমিলির কবিতায় কখনোই যুদ্ধের বিষয়টি আসেনি। অন্যরা আবার ডেনিয়েল এরোনকে সমর্থন করেন। ইনি ১৯৭৩ সালে যুক্তি দেখিয়েছেন যে গৃহযুদ্ধ তখন সমগ্র জাতিকে স্পর্শ করেছিল, সেই সময়ে লেখা এমিলির জোড়ালো আবেগ ও যন্ত্রণাদগ্ধ কবিতাগুলো যুদ্ধেরই ফলশ্র“তি। প্রমাণের নিমিত্তে ১৯৮৪ সালে শিরা উলুস্কি এই বিষয়ের উপরে একটি প্রামাণ্য প্রবন্ধ লেখেন যেখানে তিনি এমন সব কবিতা নির্বাচন করে দেখান যেগুলোতে সরাসরি যুদ্ধের কথা বলা আছে। ১৯৬৫ সালে থমাস ফোর্ড তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন কবি বিশেষ কারো কথা না বলে যুদ্ধে নিহত সবার উদ্দেশ্যে একটি কবিতায় শ্রদ্ধানিবেদন করেছিলেন। আর এই কবিতাটি হলো “It feels a shame to be Alive –” (P444)। উলুস্কি ফোর্ডের ধারনাটিকে গ্রহণ করেন এবং এটাকেই বিস্তৃত করে দেখান “My Triumph lasted till the Drums” (P1227) কবিতাটি শুধুমাত্র যুদ্ধের প্রতি ডিকিনসনের প্রতিক্রিয়াই নয় উপরন্তু এটা তার সংগ্রামের একটা অভিব্যক্তি। যুদ্ধের সাথে তার সংগ্রাম ধর্মের সাথে তার সংগ্রামের মতোই কষ্টকর। ডিকিনসনের রেখে যাওয়া চিঠিতে রয়েছে তার এক আত্মিয় ও এক বন্ধুর কথা - যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং নিহত হয়েছেন। ধীরে ধীরে এখন আরো পন্ডিতরা একমত হচ্ছেন যে এমন একজন সংবেদনশীল কবির পক্ষে গৃহযুদ্ধের মতো মর্মান্তিক ঘটনা অগ্রাহ্য করতে পারার কথা না। তার চারদিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা কোনো না কোনোভাবে তার কবিতায় তিনি চিহ্নিত করবেন। মিউজিয়ামের সমুখভাগ। বাম দিকের দোতলার জানালাটি এমিলির শোবার ঘরের জানালা। এ জানালা দিয়ে তিনি এমহার্স্ট দেখতেন। গৃহযুদ্ধের সময়ে এ জানালা দিয়েই তিনি সৈন্যদের দলবদ্ধ আসাযাওয়া লক্ষ্য করতেন। দরজার সামনে লেখকের মুণ্ডু। ফটো – এস. হাসান
বসার ঘরের জানালার দিকের একটি ড্রয়ারের উপরে রাখা আছে একটি খাতা। খাতাটিতে যত্ন করে আঠা দিয়ে লাগানো অজস্র ফুল ও পাতা, তার নিচে লেখা প্রতিটি ফুল পাতার নাম – সব এমিলির নিজের হাতে লেখা। এমিলি উদ্ভিদ ভালোবাসতেন। তাদের সূক্ষ পার্থক্যগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন। বনজংগল থেকে তুলে এনে রাখতেন নিজের সংগ্রহে। তিনি নিজে এতো ভালো উদ্ভিদ চিনতেন যে তার একটি চিঠিতে উদ্ভিদের শিক্ষকের প্রতি কটাক্ষ রয়েছে যারা মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখেও একটি সাধারণ উদ্ভিদের পাতা চিনতে পারে না। এই বৈঠকখানার পাশে একটা ছোট্ট বারান্দার মতো। এমিলি যখন আর একবারেই বাইরে যেতেন না, যে সময়টিকে বলা হয় এমিলি ডিকিনসনের জীবনের অন্ধকার সময়, সে সময়ে এখানে দাড়িয়ে মাঝে মাঝে বাগানের গাছ গাছালি দেখতেন। প্রকৃতি এমিলির প্রিয় একটি বিষয়। কারন প্রকৃতির দিকে তাকিয়েই তিনি দেখতে পেতেন সত্য অথবা সৌন্দর্য কিংবা চিরন্তন। পাখী পতঙ্গ এবং উদ্ভিদ নানা ভাবে তার কবিতায় রয়েছে। THE SPIDER as an artist বা ‘MORNING’ means ‘Milking’ to the Farmer বা Hope is the thing with feathers, অথবা Wild Nights! Wild Nights! এরকম অজস্র কবিতা থেকে পণ্ডিতরা মনে করেন হোমস্টেড এর প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব তার কবিতার ম্যাটাফোরে ছড়িয়ে রয়েছে। এমর্হাস্টের দিকে যেতে যেতে উচু নিচু পাহাড়ি ঢাল, শস্যক্ষেত্র দেখে আমিও বারবার ভাবছিলাম এটা কি গ্রাম! বাংলাদেশের মতো গ্রাম আর শহরের পার্থক্য যদি বুঝি ক্ষেত ও খামারবাড়ি দিয়ে তবে পথঘাট, বিদ্যুৎ, স্কুল কলেজ থাকা সত্ত্বেও এমর্হাস্ট গ্রাম্য এলাকা। ওদিকটায় খামারবাড়ি আর সশ্যক্ষেত্র রয়েছে প্রচুর। তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও জায়গাটি চমৎকার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপূর।
এমিলির অবিবাহিত নির্জন জীবনযাপন বহু মানুষের মনে বহু কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এমিলি ডিকিনসনের ভাস্তি মার্থা ডিকিনসনের লেখা থেকে এটা স্পষ্ট - সামাজিক কোনো কারণে বা ব্যক্তিগত কোনো অপূর্ণ আকাংখা বা অসুস্থতা তাকে অন্তপুরে ঠেলে দেয়নি। বরং তিনি নিজের শিল্পসাধনার প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় নির্জনতাকে গ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুর জন্যও থামতে নারাজ - তিনি তার সাধনা নিয়ে এতোই নিমগ্ন।
BECAUSE I could not stop for Death, He kindly stopped for me; The carriage held but just ourselves And Immortality.
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আমরা দাড়ালাম ডান দিকের কোনার ঘরটির সামনে - এমিলির শোবার ঘর। জীবদ্দশায় এমিলির ঘরে দু’চারটি মানুষ এসেছে মাত্র, অথচ আজ এই ঘরে পৃথিবীর কত দিক থেকে কত মানুষের পদধুলি পড়ে! জীবনের ছদ্মবেশে ধুলো ও আত্মা, মৃত্যু বা চিরন্তন এসে উকি দিয়ে যায় তার ঘরে। বৃটিশ মনোবিজ্ঞানী হেভলক এলিস’র একটি বিখ্যাত মন্তব্য আছে ‘যন্ত্রণা ও মৃত্যু জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে বাতিল করা মানে জীবনকেই বাতিল করে দেয়া।’ এদিক থেকে আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন জীবনবিমুখ ছিলেন না, বরং যন্ত্রনা ও মৃত্যু তার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। (তেমনি জীবন, প্রকৃতি ও চিরন্তন সত্য তার লেখার অপর তাপর্যপূর্ণ বিষয়।) আর এই ঘরের সাথে এমিলির মৃত্যুচিন্তার একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি মৃত্যুকে চিত্রিত করার উপকরণও রয়েছে এই ঘরের মধ্যেই। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে তার বিছানা। বিছানার পাশে তার মুখ ধোবার পাত্র। জানালার দিকের দেয়ালের কাছে একটা ড্রয়ার। তার পাশে একটা টেবিল ও চেয়ার রয়েছে। কিন্তু এমিলির পড়ালেখার আসল টেবিলটি হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মিউজিয়ামে নিয়ে গেছে এটা আমি আগেই জানতাম।
এমিলির ঘরে ঢুকে ঘরের দরজাটি বন্ধ করে দিয়ে ডেবি বললো ‘এই ঘরটিতে এমিলি যখন ঘুমাতে যেতো আর বোন দরজাটি টেনে দিয়ে চলে যেতো। দরজা বন্ধের সাথে সাথে কড়িডোর থেকে আসা শব্দ ও আলো যেতো নিভে, ঘরময় ঘন অন্ধকার। এই দৃশ্যটি বারবার যখন ঘটছে তখন কবি মিল খুজে পায় কফিনের দরজা বন্ধের সাথে এই দরজা ও আলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত মিল। এখানে ঘরের দরজাটি যেন কফিনের ঢাকনা ও তার বিছানাটি কফিন। আর তখনি এমিলির মনে কয়েকটি পঙ্ক্তি গুনগুনিয়ে ওঠে :
LET down the bars, O Death! The tired flocks come in Whose bleating ceases to repeat, Whose wandering is done.
ডেবি আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললেন ‘এইভাবে তার ঘর ও খামারবাড়ির চারদিকের পরিবেশ থেকে আহরিত এমিলির কবিতার ম্যাটাফোর।’
‘যদিও এমিলি ডিকিনসনের এই সময়টিকে বলা হয় তার জীবনের অন্ধকার সময়। যখন তিনি ঘরের বাইরে যেতেন না, নিজের ঘরে বসে পড়তেন বা লিখতেন কিন্তু এই সময়টি ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়। আমাদের ট্যুরে অংশরত এক শাদা ভদ্রলোক জানতে চাইলেন ডেবির কাছে ‘ উনার কি অসুখ ছিল?’
‘কিডনির সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তা ছাড়া তার চোখের সমস্যাও ছিল। অসম্ভব মাথা ব্যথা ছিল। হয়তো চোখের কারণেই কিংবা মাইগ্রেন।’
এক শাদা ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন ‘ওনার কি ডিপ্রেশন ছিল?’
ডেবি উত্তর দিলেন ‘অনেকে তাই মনে করেন। কিন্তু তার লেখা অজস্র ইতিবাচক কবিতা রয়েছে। মানুষের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বুদ্ধ হবার মতো উনি অনেক কবিতা লিখেছেন।‘
ওদের আলাপে আমার মনে পড়লো একজন মনোবিজ্ঞানী মত প্রকাশ করেছেন এমিলির অসুস্থতাও তার কবিতায় ম্যাটাফোরিকেলি উপস্থাপিত। এই মনোবিজ্ঞানী তার লেখায় ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন এমিলির টাইম ও ইটারনিটি সিরিজের I Felt a Funeral in My Brain কবিতায় কি করে ফিউনারেল ম্যাটাফোরটি কবির বোধে মাথায় যন্ত্রণা বা ব্যথার প্রতিরূপ হিসেবে এসেছে। শবযাত্রা (Funeral) বলতে এই মনোবিজ্ঞানী বোঝেন শোক এবং তারপরে তিনি খুজেঁছেন মস্তিষ্কের শোক কি? উত্তর খুঁজে পেয়েছেন - মাথাব্যথা।
কবিতায় আওয়াজ বা ধ্বণির চিত্রকল্পের ব্যবহার ছাড়াও এমিলি তার কবিতার অস্পষ্টতা ও বিস্তৃত ম্যাটাফোর ব্যবহারের জন্য সুপরিচিত। উপরন্তু এই মনোবিজ্ঞানী শবযাত্রা (Funeral) শব্দটির সাথে একটি মাত্র শব্দের অনুসংগ খুজেঁছেন, আর তা হলো শোক। কিন্তু একটু সুস্থিরভাবে দেখলেই বোঝা যায় শবযাত্রা মানে প্রথমত কারো বিদায়। স্মৃতিকাতরতা ও শোক এখানে বিদায়ের অনুষঙ্গ। অর্থাৎ এই বিদায়ের সাথে জীবন্তদের যে আবেগটি জড়িত তা হলো শোক। সুতরাং এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না এখানে শবযাত্রা বলতে মাথার ভেতর ব্যথাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। যদিও তাকে ধন্যবাদ। মস্তিষ্কে এ শবযাত্রা (Funeral) বলতে হয়তো তার ক্রমশ চোখের জ্যোতি কমে যাবার অসুখের কথা বলেছেন। মাথা ব্যথা হয়তো একটা উপসর্গ। শবযাত্রা বলতে আমরা বুঝি আমাদের মধ্যের কারো একজনের বিদায়। এমিলির মস্তিষ্কে ক্রমশ তার দর্শনেন্দ্রীয়র অংশটি কার্যকারিতা হারাচ্ছিল সেই বোধটিকেই তিনি হয়তো এভাবে প্রকাশ করেছেন, যদি তিনি তার অসুস্থতাকে নির্দেশ করে থাকেন। কিংবা এমনো হতে পারে তিনি ঘুমকে বুঝিয়েছেন। মানুষের যখন ঘুম আসে তখন তার মস্তিষ্কে আংশিক চৈতন্যের বিদায় ঘটে। কিংবা পরের লাইনগুলো থেকে মনে হয় ঘুমাতে চাইছেন ঘুমটি ঠিকমতো আসছে না।
I FELT a funeral in my brain,/And mourners, to and fro,/ কিন্তু যখন কবিতার অন্য চরণগুলো দেখি, (যেমন Kept treading, treading, till it seemed/ That sense was breaking through./) তখন মনে হয় না এ কবিতাটি কোনো ব্যথার বর্ণনা করছে। And when they all were seated, /A service like a drum/ Kept beating, beating, till I thought/ My mind was going numb./ কিন্তু কবিতার শেষ স্তবক পড়ার পরে মনে হয় অসুস্থতা বা ব্যথা বা ঘুমের সমস্যার চেয়েও জরুরী কোনো আত্মোপলদ্ধি বর্ণনার জন্যই উপরের স্তবকগুলোর আগমন (As all the heavens were a bell,/ And Being but an ear,/ And I and silence some strange race,/ Wrecked, solitary, here.)|
এমিলি ডিকিনসনের জীবন তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক চিন্তায় পূর্ণ। আত্মিক বিশুদ্ধতা ও চিরন্তনতা নিয়ে তার ভাবনা তার লেখায় সুস্পষ্ট। নিজের ধর্মতত্ত্বের উপরে তার ছিল অগাধ আস্থা আর এ কারণেই স্বজনের চেয়েও এমিলি ডিকিনসন ছিলেন স্রষ্টার অস্তিত্বে অনেক বেশী নিশ্চিত। তিনি কখনো দাবী করেননি স্রষ্টাকে তিনি সম্পূর্ণ জানেন বা বোঝেন। তার অনেক কবিতায় দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার ভার লক্ষনীয়, কিন্তু তা ঈশ্বর ভীতির চেয়ে অনেক বেশী স্রষ্টাকে না বোঝার মানসিক দ্বন্দ্বপ্রসূত। তার সীমাহীন জিজ্ঞাসা তাকে উন্নিত করেছিল শিশুসুলভ সরল দৃষ্টিভংগীর দরজায়। যেখানে এমিলির কাছে সত্য মানেই প্রকৃতি। আর সেই সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে তিনি সরাসরি অনুভব করতে পারতেন তার স্রষ্টাকে।
"I died for beauty, but was scarce Adjusted in the tomb, When one who died for truth was lain In an adjoining room.
He questioned softly why I failed? "For beauty," I replied. "And I for truth, -the two are one; We brethren are," he said.
And so, as kinsmen met a night, We talked between the rooms, Until the moss had reached our lips, And covered up our names."
একটি বিষয় যা সারাক্ষণ এমিলি ডিকিনসনকে তাড়া করে ফিরেছে তা হলো তার সত্যের চাহিদা। এমিলি তার নিজের চোখে এ সত্য দেখতে চেয়েছেন, নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে চেয়েছেন। গির্জার যাজকের খুতবা থেকে আহরণের চেয়ে তিনি নিজেই ব্রতী আপন ভাষায় নিজের কাছে সেই এক অদ্বিতীয়কে ব্যাখ্যায়। মৃত্যুও সেখানে মামুলি, তিনি এখানে এতোটাই দৃঢ় ।
যে আত্মিক স্বাধীনতা এমিলি ধারন করতেন তা তার সময়কার আমেরিকার নারীদের মাঝে ছিল বিরল। এই আত্মবিশ্বাসই ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয়েছে তার কবিতার মাঝে।
অন্ধকার সময় দ্রুত ঘনিয়ে এলো এমিলির জীবনে। চোখের ডাক্তার দেখানোর জন্য ১৮৬৪ ও ৬৫ সালে এমিলি তার মামাতো ভাইবোনদের বাসায় আতিথ্য গ্রহণ করেন বস্টনে। তখন তিনি লিখতে ও পড়তে পারছিলেন না। সম্ভবত এটাই তার শেষবারের মতো এমর্হাস্ট থেকে বাইরে যাওয়া। ১৮৭০ সালের শুরুর দিকে এমিলির মা বিছানায় পড়ে যান এবং ওরা দু’বোন তখন মাকে দেখাশোনা করতেন। ১৮৭৪ সালে হঠাৎ এমিলির বাবা মৃত্যুবরণ করেন, তখন এমিলি সম্পূর্ণভাবে লোকচক্ষুর সামনে যাওয়া বন্ধ করে দেন, যদিও তিনি তার যোগাযোগগুলো তখনো চিঠিতে রাখতেন। সেই সময়টি তিনি তখন তার ডেস্কে বসে লিখতেন এবং তার নির্জনতা উপভোগ করতেন।
AS children bid the guest good-night, And then reluctant turn, My flowers raise their pretty lips, Then put their nightgowns on.
‘তার ডেস্কের সামনের জানালা দিয়ে দেখতেন এমর্হাস্টের পথ আর পাশের জানালা দিয়ে দেখতেন এভারগ্রিনস। ভাইয়ের বাচ্চাগুলো দুই বাড়ির মাঝখানে ছুটাছুটি করে খেলতো। কখনো এমিলির জানালার নিচে দাড়িয়ে তাকে ডাকতো। ঝুরি নামাতে বলতো। জানালা খুলে এমিলি কাপড়ে বেধে একটা ঝুরি নামিয়ে দিতেন। আর সেই ঝুরি ভরে ভাই ও ভাবির পাঠানো খাবার ও ফল দিতো ওরা। এমিলি সেগুলো উপরে তুলে আবার ঝুরি নামাতেন। সেখানে থাকতো কখনো অন্য কোনো ফল, চকলেট বা একটা কবিতা।‘
‘ডিকিনসন তার এই অন্ধকার সময়েও বাচ্চাদের সাথে বাইরে বসেছেন, ওরা যখন খেলত তখন তিনি বাইরে ওদের জন্য কখনো রান্না করতেন। তবে পরের দিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সব সময় সেটা হয়ে উঠতো না। তখন তিনি নিচের বারান্দায় এসে দাড়াতেন। যখন এমিলি বিশেষ কারো সাথেই আর দেখা করেন না, তখনো ভাস্তি মার্থার সাথে তার আদান প্রদান ছিল ভালো।
DEATH is a dialogue between The spirit and the dust.
‘১৮৮৬ সালে এমিলি ডিকিনসন লোকান্তরিত হন। মৃত্যুর আগে তিনি তার ছোটবোন লেভিনিয়াকে একদিন ডেকে বালিশের নিচ থেকে বের করে তার হাতে তিনটি পান্ডুলিপি দেন। নিজের হাতে সেলাই করা বইয়ের মতো তিনটা পান্ডুলিপি।’ কথাগুলো বলতে বলতে ডেবি আমার হাতে তিনটি পান্ডুলিপি তুলে দিলো।
মুহূর্তে অক্কা পেলাম আমি। আমার মনে হলো আমি যেন মুর্হূতে হয়ে গেছি ধুলো। আমার বুকের পাখী আমার হাতের তালুতে এসে বসেছে, এই বুঝি যাবে উড়ে। পাশ থেকে ভেসে এলো একটা কন্ঠস্বর। কেউ একজন বললো - ‘এটা তো ফটোকপি, তাই না?’ তখন কাদার চাদর গায়ে আমি প্রশ্নের সমুদ্র নড়ে উঠলাম। একটা পান্ডুলিপি পাশের জনকে দিলাম, কেউ একজন ইতিমধ্যে আরেকটা আমার হাত থেকে নিজেই তুলে নিয়েছেন। আমার হাতে যেটা ছিল সেটা আমি উল্টেপাল্টে দেখে পড়ার চেষ্টা করলাম। কতক্ষন জানি না, বেশ একটুক্ষন পরে আমি পড়তে শুরু করলাম - দিস ইজ মাই লেটার টু দ্যা ওয়ালর্ড। কিন্তু ওখানেই থামতে হলো। অন্যরাও ফটোকপি পান্ডুলিপিটি হাতে ধরে দেখতে চান। এমিলি দিস্তা কাগজ সেলাই করে খাতা বানাতেন আর তাতে লিখতেন পেন্সিল দিয়ে। আমাদের হাতে যে পান্ডুলিপি সেটা সেলাই করা। লেখাগুলো একটু গাঢ় - কলমের কালির মতো।
এমিলি ডিকিনসনের ঘর থেকে বেরিয়ে ডেবি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন কোরিডোরে শোকেসে রাখা তার শাদা জামাটির দিকে। উনিশ শতকের ইউরোপিয়ান আমেরিকান নারীরা যেমন সর্বাঙ্গে আচ্ছাদিত জামা পরতেন তেমনি একটা শাদা পোষাক। পোষাকের ডান দিকে একটা পকেট আছে। এই পকেটে একটা দিস্তা কাগজের সেলাই করা খাতা ও একটা পেন্সিল থাকতো অধিকাংশ সময়। এ জামাটির কলারে, হাতে ও পকেটের উপর লেভিনিয়া বেগুনি রঙের সুতার নকশা করে দিয়েছিলেন। শেষের বছরগুলোতে এমিলি শাদা পোষাক পড়তে খুব পছন্দ করতেন। মৃত্যুর সময় এমিলি ডিকিনসনের পরনে এমনি একটি পোষাক ছিল। তার মরদেহ কোনো চার্চে নেয়া হয়নি, বাড়িতেই জড়ো হয়েছিল কিছু মানুষ আর সেখান থেকে কবরস্থানে। মিউজিয়ামের সাইনবোর্ড। মনোগ্রামটি কবির জীবন ও কর্মের প্রতীক। ছবি – লেখক
এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়াম দেখা যখন প্রায় শেষ, আমরা সিড়ি দিয়ে নেমে এলাম বাড়িটির সদর দরজায়। বাইরে বের হয়ে পায়ে পায়ে সবাই জড়ো হলাম বাগানের বিশাল ওক গাছের নিচে। এই গাছের কাছে দাড়িয়ে এমিলি কোনো কবিতা লিখেছেন কি না জানি না, তবে কখনো কবি তার বাড়ির বাচ্চাদের জন্য রান্না করেছেন। আমাদের গাইড ডেবি তাই বললেন। ডেবি জানতে চাইলেন –‘কারো কোনো প্রশ্ন?’ আমি ঘড়ি দেখলাম। পরবর্তী ট্যুরের সময় আসন্ন। সওয়াল জবাব স্বল্প সময়ে পূর্ণ হবে না। ডেবি আমাদের সবার হাতে একটি করে লেমিনেটেড কবিতা দিলেন। সবাই তাদের যার যার কবিতা পড়লো। আমি আমার হাতের কবিতাটির দিকে তাকালাম, কবির বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম কবিতাটি :
This is my letter to the world, That never wrote to me,-- The simple news that Nature told, With tender majesty. Her message is committed To hands I cannot see; For love of her, sweet countrymen, Judge tenderly of me!
আমার কণ্ঠস্বর আমার কানে গেঁথে রইলো - For love of her, sweet countrymen, Judge tenderly of me! সব! এমিলি ডিকিনসনের কাজ ও জীবন নিয়ে যেসব তদন্ত হয়েছে সৌভাগ্যবশত সবই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়নি। যেমন, তার স্বেচ্ছা নির্বাসনকে প্রথমে মানুষ যেভাবে দেখছিলেন সে-সব দৃষ্টিভঙ্গী বদলে গেছে। কোনো সমাজবিরোধী অনুভূতি বা কোনো ব্যর্থতা এমিলি ডিকিনসনকে সমাজ থেকে গুটিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেনি। বরং স্বতস্ফূর্তভাবে নিজের সামাজিক জীবনের উপরে নিজেই কিছু সীমা টেনেছিলেন তিনি নিজের চূড়ান্ত শৈল্পিক ঐক্য অর্জনের জন্য, নিজের আত্মিক জগতকে আবিস্কারের উদ্দেশ্যে। এক কথায়, সত্য অনুসন্ধান ও শিল্পসাধনা ছিল তার আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসাজাত যা দ্বারা তার অর্ন্তজগত ও একান্ত জীবন পরিচালিত। আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার কাব্যিক সম্ভারে। তার এই আধ্যাত্মিকতা চিরাচরিত ধর্মাচার থেকে অনেক আলাদা। অতি উচ্চমার্গীয় শিল্পসাধনায় এমিলি ডিকিনসন নিজেই তার নিজের সূত্র। প্রচলিত কবিতার ব্যকরণ দিয়ে যেমন তার কবিতাকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তেমনি নারীদের প্রচলিত সামাজিক জীবনকে মানদন্ড ধরে ডিকিনসনকে বুঝতে চাইলে সে অনুসন্ধান কোথাও পৌঁছে না। তাই তাকে ও তার লেখাকে বিচার করতে হবে তার স্বতন্ত্র অবস্থান থেকেই।
বোস্টন, নভেম্বর ১২, ২০০৭
আনুষঙ্গিক তথ্য
ট্যুর এই মিউজিয়ামের দুটি গৃহে প্রবেশের একমাত্র পথ হলো এখন গাইডেড ট্যুর। লেন্ডস্কেপের অডিও ট্যুরো পাওয়া যায়। মিউজিয়ামে ট্যুরগুলো আয়োজন করে ট্যুর সেন্টার। সেন্টারটি মিউজিয়ামের ভেতরেই রয়েছে। এই ট্যুর সেন্টারে গিফ্ট সপ রয়েছে। প্রাথমিক একটা ধারণা দেবার জন্য অভ্যর্থনা কক্ষের পাশের ঘরটিতে রয়েছে পরিচিতি প্রদর্শনী। আগে থেকেই ওদের সাথে যোগাযোগ করে আয়োজন করা যায় দলীয় ট্যুর। ২০০৭ সালে অক্টোবর থেকে মধ্য ডেসেম্বর পর্যন্ত বুধবার থেকে রোববার ১২:৩০ থেকে ৫:৩০ পর্যন্ত প্রতিদিন খোলা। মধ্য ডেসেম্বর থেকে ২০০৮ সালের ফেব্রয়ারী পর্যন্ত মিউজিয়ামটি বন্ধ থাকবে। আবার মার্চ ২০০৮ সালে এই সময় অনুযায়ী এটা খোলা থাকবে। পাকিং ও পথনির্দেশনার জন্য ইন্টারনেটে ডিরেকশন পাওয়া যায়। ওদের রয়েছে ওয়েবসাইট।
তথ্যপঞ্জি 1. An Emily Dickinson Encyclopedia. (1998) Contributors: Jane Donahue Eberwein - editor. Greenwood Press. Westport, CT. Page Number: 40.
2. Emily Dickinson Museum the homestead & the evergreens (Leaflet), published by Emily Dickinson Museum (2007), Amherst, Massachusetts.
3. Heaven Beguiles the Tired: Death in the Poetry of Emily Dickinson. (1966) Contributors: Thomas W. Ford - author. University of Alabama Press. University, AL. Page Number: 18.
4. The complete poems of Emily Dickinson Edited by Thomas H. Johnson (1961) 5. The Gift of Screws: The Poetic Strategies of Emily Dickinson. Contributors: R. Bruce Ward (1994) Publisher: Whitston Publishing. Troy, NY. Page Number: 1.
6. The Language of Exclusion: The Poetry of Emily Dickinson and Christina Rossetti. (1987) Contributors: Sharon Leder, Andrea Abbott - author. Greenwood Press. New York. Page Number: 58.
7. The Life and Letters of Emily Dickinson by Martha Dickinson Bianchi (1971); Biblo and Tannen, 388 pgs. New York. :. Page Number: 4.
8. The life of Emily Dickinson, by Richard B. Sewall (1994), 6th printing, Harvard University press, Cambridge, Massachusetts.
সুইডিশ কবি, মনস্তত্ববিদ, অনুবাদক টোমাজ ট্রান্সট্রোমার সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৫০ সাল থেকে ট্রান্সট্রোমার সুইডিশ সাহিত্যে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে পরিচিত স্ক্যান্ডিনেভিয় কবি। তার কবিতার টিপিক্যাল বৈশিষ্ট্য–পরাবাস্তবাদী ইমেজ, যেখানে ডাকটিকেটকে দেখা যায় জাদুর কার্পেট হিসেবে, গাছের ছায়া হলো কালো সংখ্যা, লোকের ভিড় হয়ে যায় অমসৃণ আয়না।
টোমাজ ট্রান্সট্রোমার স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন, ১৫ এপ্রিল ১৯৩১ সালে। তার বাবা সাংবাদিক ছিলেন, কিন্তু বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হবার পর বাবার সাথে তার খুব কম দেখা হয়েছে। মা ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ট্রান্সট্রোমার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়টাতে রানমারো দ্বীপে তার শৈশবের অনেকগুলো গ্রীষ্ম কাটিয়েছেন। সুইডেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকলেও এক সাক্ষাতকারে বলেছেন তিনি ছিলেন “ মিত্রপক্ষের সবচেয়ে বড় মিলিট্যান্ট সমর্থক”। পরর্বতীতে তার কবিতার বই অস্তেরসজোয়ার (১৯৭৪,বাল্টিক) এবং স্মৃতিকথা “মিন্নেনা সের মিগ” (১৯৯৩) ট্রান্সট্রোমার আরকিপেলাগোর দৃশ্যভূমিতে ফিরে গেছেন।
সংগীত ও ছবি আঁকায় আগ্রহী হয়ে ওঠার আগে ট্রান্সট্রোমার প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতি খুব আকৃষ্ট ছিলেন এবং একজন অনুসন্ধানী পর্যটক হবেন বলে ভাবতেন তিনি । তখন লিভিংস্টোন ও স্টানলি ছিল তার নায়ক। ১৯৫১ সালে স্কুলের এক বন্ধুর সাথে তিনি আইসল্যান্ড ঘুরতে যান। তার প্রথম কবিতার বই থেকে আসা অর্থ দিয়ে তিনি গ্রীস ও তুরস্ক ভ্রমণ করেন।
সোডরা ল্যাটিন স্কুলে পড়ার সময়, ট্রান্সট্রোমার কবিতা পড়তে ও লিখতে শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে মনোবিজ্ঞানে ডিগ্রী লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোটেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে কাজ করতেন তিনি। ১৯৬০ সালে ট্রান্সট্রোমার কিশোর অপরাধীদের জন্য ইনস্টিটিউট রক্সটানায় মনোস্তত্ববিদ হিসেবে নিয়াগ পান।
১৯৬০ এর মাঝামাঝি থেকে ট্রান্সট্রোমার তার সময়কে লেখা ও কাজ-এ ভাগ করে ফেলেন। ১৯৬৫ সালে পরিবারের সাথে তিনি স্টকহোম থেকে ৬০ মাইল পশ্চিমের শহর ভাস্তেরাসে চলে যান। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি ‘আরবেটসমারর্কনাডসইন্সটিটুটেট’ নামে শ্রমিক সংগঠনের একটা ইনস্টিটিউটে মনোস্তত্ববিদ হিসাবে কাজ করেন।
কবি হিসেবে ট্রান্সট্রোমারের পরিচিতি শুরু হয় ২৩ বছর বয়সে, ‘১৭ ডিকটের (১৯৫৪)’ এর মাধ্যমে। এই কবিতাগুলি ছিল অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা। পরবর্তীতে তিনি মাত্রা-ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, যদিও তার বেশিরভাগ কবিতা মুক্ত ছন্দে লিখিত। হেমলাইয়েতার পা ভ্যাগেন(১৯৫৮) এবং ক্লাংগের ওক স্পার(১৯৬৬)-এর থিম ট্রান্সট্রোমার নিয়েছেন বল্কান, স্পেন, আফ্রিকা, এবং আমেরিকায় তার ভ্রমণ থেকে। তার পরবর্তী কাজেও কম্পোজার এডয়ার্ড গ্রেইগ-এর পোর্ট্রেট-এর উপস্থিতি ছিল। ‘ইজমির ক্লকান ত্রে’ (হেমলাইয়েতার পা ভ্যাগেন থেকে)-এ একজন ভিক্ষুক আরেকজন ভিক্ষুককে পিঠে করে বহন করছে–যার পা নেই, ‘ওকলাহোমা’(ক্লাংগের ওক স্পার)-এ ‘অন্ধকারে চলমান গাড়ি, বাতিগুলি জ্বলছে, ফ্লাইং সসার হয়ে যায়।’ ‘এ ম্যান ফ্রম বেনিন’-এ একটা ছবির রেফারেন্স আছে যেটা ট্রান্সট্রোমার ভিয়েনার যাদুঘর ফুর ভাল্কেরকুন্দে-তে দেখেছিলেন।
ট্রান্সট্রোমার-এর কবিতা প্রায়ই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, একক, ছদ্মবেশী সরল ইমেজকে ঘিরে নির্মিত হয় যেটা মনস্তত্বের গভীরে আর অধিবাস্তব (metaphysical) অনুভবের দুয়ার খুলে ধরে । মরকসেন্ডি (১৯৭০) বইতে কবির ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশিত; এছাড়া আত্নীয়ের মৃত্যু ও অসুখ এবং একটি মারাত্মক বিপর্যয়কে ঘিরে আবর্তিত। স্টিগার (১৯৭৩) বইতে ট্রান্সট্রোমার-এর নিজের কবিতা ছাড়াও তার অনুবাদে রবার্ট ব্লাই ও জ্যানস পিলিনস্কির কবিতা ছিল। ট্রান্সট্রোমার-এর প্রচুর কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ব্লাই। ২০০১ সালে পাবলিশিং কোম্পানী বনীয়েরস ট্রান্সট্রোমার-এর ৭০-তম জন্মদিন উদযাপন করে এয়ার মেইল প্রকাশ করার মাধ্যমে। এয়ার মেইল একটা চিঠিপত্রের সংকলন–১৯৬৪ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে ট্রান্সট্রোমার ও ব্লাই—দুই লেখক এই চিঠিগুলি লিখেছিলেন একজন অন্যজনকে।
তার বেশ কিছু কবিতায় প্রকৃতি এবং এর বৈপরীত্যপূর্ণ উপাদানগুলির দ্বন্দ্ব, যেমন সমুদ্র ও তার সৈকতের লড়াইয়ের রূপকে হাজির করেছেন স্বাধীনতা ও বাক-নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃতি এবং এর উপর মানুষের কর্তৃত্ব-এর মতো বৈপরীত্যমূলক শক্তিকে। বিশেষত ‘অসটারজোয়ার’-এবাল্টিক দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে লেখা তার কবিতাগুলোতে এই এলাকার রাজনৈতিক অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে–১৯৭০ সালে বাল্টিক দেশগুলো তখনো সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৭০ সালে লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া পরিদর্শন করতে গিয়ে নিজেকে গ্রাহাম গ্রীনের গল্পের একজন বলে মনে হয়েছিল ট্রান্সট্রোমার-এর। ট্রান্সট্রোমার একবার বলেছিলেন, “বাল্টিক ছিল তার গান লেখার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টা।”
আন্দোলন ও পরিবর্তন ট্রান্সট্রোমার-এর কাব্যিক পটভূমির অংশ , যদিও তার ‘মহাজাগতিক শান্তি’র ধারনা র্যাডিক্যাল লেখকদের কাছে সমালোচিত হয়েছে। এক সাক্ষাতকারে ট্রান্সট্রোমার বলেছেন যে তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী, তবে সেটা যতটা না আদর্শের জন্য তারও চেয়ে বেশি মানবিকতার জন্য। (‘টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের সাক্ষাৎকার’–ট্যাম লিন নেভিল ও লিন্ডা হোরভ্যাথ, পেইন্টেড ব্রিজ কোয়ার্টারলি, নম্বর: ৪০-৪১, অনুবাদ সংখ্যা, ১৯৯০।)
১৯৯০ সালে ট্রান্সট্রোমার-এর একটা স্ট্রোক হয়, ফলে তিনি বাকশক্তি হারান। তার আগের বছর তিনি তার দশম কবিতা সংকলন ‘ফর লেভান্দে ওখ ডোডা (ফর দি লিভিং এন্ড দি ডেড)’ বের করেন। লেখক হিসেবে কিছুদিন নৈঃশব্দযাপনের পর তিনি ফিরে আসেন সর্জেগন্ডোলেন (১৯৯৬,গ্রিফ গোন্ডলা) নিয়ে, যার টাইটেল নিয়েছেন ফ্রাঞ্জ লিজ-এর দুইটা পিয়ানো কম্পোজিশন থেকে। লিজ এ সব কম্পোজিশন করেন যখন তার মেয়ে জামাই রিচার্ড ভাগনার মারা যান। ‘গ্রিফ গোন্ডলা’ বইয়ের ৩০০০০ কপি বিক্রি হয় সুইডেনে। সংগীত বিষয়ক আগ্রহ ট্রান্সট্রোমার-এর অনেকগুলো সংকলনে প্রকাশ পেয়েছে – তিনি একজন নিপুণ অপেশাদার সংঙ্গীতক, পিয়ানো এবং অর্গান বাজান।
‘সর্জেগন্ডোলেন’-এ কবি স্বীকার করেছেন তার অভিব্যক্তির সীমাবদ্ধতা, যেখানে শব্দেরা এবং যা তিনি বলতে চান তা—‘নাগালের বাইরে ক্ষীণ এক আলো, মহাজনের কাছে বন্ধকী রুপার মতো।’ তারদেন স্টোরা গাটান (২০০৪) এর অনেকগুলো হাইকু মৃত্যুকে নিয়ে রচিত। তিনি লিখেছেন “মৃত্যু আমার উপর ঝুঁকে আছে” ।
নোবেল পুরস্কার পাবার আগে ট্রান্সট্রোমার ১৯৯০ সালে পেয়েছেন নস্টাড ইন্টারন্যাশনাল সাহিত্য আওয়ার্ড, কবিতার জন্য বোনার অ্যাওয়ার্ড, জার্মানির পেত্রার্ক পুরস্কার, বেলম্যান পুরস্কার, সুইডিশ একাডেমীর নর্ডিক পুরস্কার, এবং অগাস্ট প্রাইজ। ১৯৯৭ সালে ভাস্তেরাস শহর বিশেষ ট্রান্সট্রোমার পুরস্কার প্রবর্তন করে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতা ডাচ, ফিনিশীয়, হাঙ্গেরিয় এবং ইংরেজিসহ ৬০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার কবিতার চাইনীজ অনুবাদক বেই ডাও, তার প্রবন্ধ ‘ ব্লু হাউজ’-এর নামকরণ করেছেন ট্রান্সট্রোমার-এর এর বাড়ির নামানুসারে। স্ট্রোক থেকে সেরে উঠবার সময়ে ট্রান্সট্রোমার ও ডাও একসথে গ্লেন গোল্ডে-এর বাজানো বাখ সংঙ্গীত শুনেছিলেন।
০৬ অক্টোবর ২০১১ সুইডিশ একাডেমীর স্থায়ী সচিব পিটার ইঙলান্ড এ বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে টোমাজ ট্রান্সট্রোমার-এর নাম ঘোষণা করেন। ইঙলান্ড ৩৫ সেকেন্ডের ঘোষণায় ট্রান্সট্রোমারকে পুরস্কার দেবার কারণ হিসেবে বলেন ‘ঘন, আবছা চিত্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবতায় আমাদের প্রবেশ তরতাজা করে দেন তিনি।’
এটি একটি যৌথ রচনা, আমার (ফরিদ আহমেদ) এবং অভিজিৎ এর। সেই পাঁচ বছর আগে মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে বইটা এক সাথে লিখেছিলাম আমরা। তারপর আর একসাথে কোনো কিছু লেখা হয় নি দুজনে। অনেকদিন পরে আবার আরেকটা প্রচেষ্টা নিলাম। কেমন হয়েছে জানি না। পাঠকদের কাছ থেকে আগ্রহ এবং সাড়া মিললে দুজনে মিলে এই ধরনের কিছু লেখা লিখবার আশা আছে ভবিষ্যতে।
কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের দেশে প্রায় সব খ্যাতিমানদের একটা সময় পরে মাথায় তোলা শুরু করি আমরা। মানব থেকে প্রথমে মহামানব, পরে দেবতা বানিয়ে ফেলি তাঁদের। হয়তো নিজেরা অক্ষম বলে, দুর্বল বলে যে হীনমন্যতায় আমরা ভুগি, সেই হীনমন্যতা লুকোনোর জন্যই দেবতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে আমাদের। একটা সময় পর্যন্ত হয়তো কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। কিন্তু আজকের এই যুগে এসে এটাকে আর মেনে নেওয়া যায় না। সময়ের প্রয়োজনেই আজকে দরকার হয়ে পড়েছে দেবোত্বের দেয়ালকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে আসল মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। শুধু ভাল ভাল দিক নয়, তাঁদের কোনো অন্ধকার দিক থাকলেও সেটাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। এই কাজটা করা হবে কোনো প্রতিহিংসা থেকে নয়, তাঁদেরকে অবমাননা করা বা অপমান করার মানসিকতা থেকে নয়। বরং সত্যকে কঠিন এবং নির্মমভাবে তুলে ধরাটাই হবে মূল উদ্দেশ্য। রবি ঠাকুরের ভাষাতেই, সত্য যে কঠিন, সেই কঠিনরে ভালবাসিলাম।
আবর্জনাকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেও আবর্জনাই থাকে- হুমায়ুন আজাদ
১
বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য স্রষ্টা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর মত করে এরকম দুহাত উজাড় করে বাংলা সাহিত্যকে এত রত্নভাণ্ডার আর কেউ উপহার দিতে পারে নি। ঊনিশ শতকের এক দরিদ্র সাহিত্যের অধিকারী বাংলাকে তিনি প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই জাতে তুলেছেন, সমৃদ্ধকর করে তুলেছেন। বিশ্বসভায় বাংলা সাহিত্যকে সগৌরবে উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। নিরন্তর সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর মত এরকম ঐকান্তিক একাগ্রতায় সারা জীবনব্যাপী শুধুমাত্র সাহিত্য সৃষ্টি আর কোনো সাহিত্যিকের দ্বারা সম্ভবপর হয় নি। না এই অঞ্চলে, না সারা বিশ্বে। সচ্ছল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে জীবিকা নিয়ে তাঁকে তেমন করে ভাবতে হয় নি কখনো। ফলে, আমৃত্যু তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অফুরান সময় পেয়েছেন। আর সেই সুযোগকে পূর্ণভাবে তিনি কাজে লাগিয়েছেন তাঁর অবিরাম আগ্রহ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং ক্লান্তিহীন লেখালেখির মাধ্যমে। সেই কৈশোর বয়স থেকে যে তরী তিনি ভাসিয়েছেন সাহিত্যের স্রোতস্বিনীতে, তার সফল সমাপন ঘটেছে মরণ সাগরের তীরে এসে।
দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও রবীন্দ্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় নি। একদল যেমন ভক্তিরসে ভরপুর হয়ে তাঁকে পুজো করে ছাড়ছে, অন্য দল তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার বর্ষণ করে চলেছে, মূলতঃ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই দুয়ের মাঝামাঝি থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তি আলোচনা নেই বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই সমস্যাটা আজকের নয়। তিনি জীবিত থাকা অবস্থা থেকেই এটা চলে আসছে। নীরদ চৌধুরী তাঁর আত্মঘাতী বাঙালী গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্ব আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ এর ভূমিকাতে লিখেছিলেন :
তাঁহার (রবীন্দ্রনাথের) সম্বন্ধে সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা আজ পর্যন্ত হয় নাই। যাহা হইয়াছে তাহা একপক্ষে হিন্দুর মূর্তিপূজার মত, অন্য পক্ষে মুসলমানের মূর্তি ভাঙার মত। জীবিতকালে তিনি যেন হিন্দু হইয়া মুসলমানের রাজত্ব বাস করিয়াছিলেন, অর্থাৎ প্রধানত আক্রমণেরই লক্ষ্য ছিলেন। এই অবস্থার জন্য তাঁহার ব্যক্তিত্ব, মতামত ও রচনা সম্বন্ধে যেসব কথা বলা ও লেখা হইয়াছিল তাহাকে মিথ্যা নিন্দা ভিন্ন আর কিছু বলা যাইতে পারে না। আবার এই বিদ্বেষপ্রসূত নিন্দার পরিমাণ, তীব্রতা ও ইতরতা এমনই হইয়াছিল যে উহার ভারে ও ধারে বেশীর ভাগ বাঙালির কাছেই তাঁহার আসল রূপ চাপা ও কাটা পড়িয়াছিল।
অবশ্য ইহাদের প্রতিপক্ষও যে ছিল না তাহা নয়, অর্থাৎ ভক্তও তাঁহার জুটিয়াছিল। ইহারা বিদ্বেষীদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম হইলেও দলে নিতান্তই অল্পসংখ্যক ছিল না। তবে ইহাদের দ্বারাও রবীন্দ্রনাথের হিত হয় নাই। ইহারাও তাঁহার যে রূপ প্রচার করিয়াছিল তাহা অন্ধ স্তাবকের প্রশস্তি ভিন্ন কিছু নয়। এমন কি এই রবীন্দ্রভক্তি এমনই বাক্যভঙ্গি ও আচরণে প্রকাশ পাইত যে, উহাকে হাস্যাস্পদ করা নিন্দাকারীদের পক্ষে খুবই সহজ হইত। ফলে, রবীন্দ্র ভক্তেরাও রবীন্দ্র বিদ্বেষীদের মতই মিথ্যারই প্রচারক হইয়াছিল।
বর্তমানে অবশ্য অবস্থাটা উল্টা হইয়াছে, অর্থাৎ রবীন্দ্র নিন্দুকেরা লোপ না পাইলেও রবীন্দ্রভক্তেরাই প্রবল হইয়াছে। কিন্তু না ভক্তি না নিন্দা, কোনটাই উচ্চস্তরে উঠে নাই। এখনও রবীন্দ্রনাথের সত্যরূপ আত্মপ্রকাশ করিতে পারিতেছে না।
নীরদ চৌধুরী যে কথাগুলি বলে গিয়েছেন তার কী আশ্চর্য প্রতিফলন আজকের যুগে। রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের মধ্যে অগ্রগন্য। তাঁর অসীম মেধা, সীমাহীন সৃষ্টিশীলতা, শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে গ্রীবা উন্নত রাজহংসের মত সাবলীল বিচরণ অন্য সব বাঙালিদের থেকে তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। কিন্তু এই অনন্যতা তাঁকে নিশ্চয়ই দেবত্ব দেয় নি। অথচ আজকের যুগে অনেক বাঙালিই রবীন্দ্রনাথকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়ে ফেলেছেন। তাঁকে নিয়ে ভক্তি গদ্গদ হয়ে পূজোর আসর বসিয়েছেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের সামান্যতম সমালোচনা, ক্ষীণতম ত্রুটি-বিচ্যুতি্র উল্লেখ তাঁদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। উন্মাতালের মত ঝাপিয়ে পড়তে চান সমালোচনাকারীর উপরে। অথচ এঁরা কখনোই বিবেচনায় নেন না যে, রবীন্দ্রনাথও রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ ছিলেন। তাঁরও অন্য আর দশটা মানুষের মতই মানবীয় সীমাবদ্ধতা ছিল। ছিল লোভ, ছিল হিংসা, ছিল ক্ষুদ্রতা, ছিল মহত্ব, ছিল ভালবাসা, ছিল প্রেম। ছিল অনেক ধরনের প্রশংসনীয় মানবীয় গুণাবলী এবং সেই সাথে সাথে নিন্দাযোগ্য অগুণাবলীও।
এই সমস্ত অন্ধ স্তাবক এবং গুণমুগ্ধ প্রেমিক পূজারীদের কারণে রবীন্দ্রনাথের সঠিক মূল্যায়ন আজকের যুগে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল অংশকে উদ্ভাসিত করে দিতে এঁরা যেমন তৎপর, তেমনই তাঁর অন্ধকার অংশগুলোকে অতি যত্নে আড়াল করতেও এঁদের কোনো কার্পণ্য নেই। সে কারণেই জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথের যে সমস্ত সমালোচনা হয়েছে, সেগুলোকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ নীরদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথের জীবিত থাকার সময়ে তাঁর গুণমুগ্ধ স্তাবকের তুলনায় বিরূপ সমালোচকের সংখ্যাই অনেক বেশি ছিল। প্রায় সব রবীন্দ্র গবেষকই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রবীন্দ্রনাথের আঁধার অংশগুলোকে অপসারিত করে দিয়েছেন। ধর্ম অনুসারীরা যেরকম করে তাঁদের ধর্মীয় নেতাকে মহামানব তৈরি করে তাঁর মহৎ গুণগুলোকে শুধুমাত্র উল্লেখ করে, ঠিক সেরকম করেই রবীন্দ্র ভক্তরাও রবীন্দ্রনাথকে প্রেরিত পুরুষ বা অবতার বানানোর আয়োজন প্রায় সুসম্পন্ন করে ফেলেছে। কেউ রবীন্দ্রনাথের সামান্যতম সমালোচনা করলেই লাঠিসোঠা হাতে হা-রে-রে-রে বলে তেড়ে এসেছেন তাঁরা। আহমদ শরীফ তাঁর রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন প্রবন্ধে লিখেছেন :
তাঁর লঘু-গুরু ত্রুটি-বিচ্যুতি, মন-মননের সীমাবদ্ধতা বিমুগ্ধ-বিমূঢ় ভক্ত-অনুরক্তেরা এতো কাল চেপে রেখেছেন, অন্য কেউ উচ্চারণ করতে চাইলেও মারমুখো হয়ে উঠেছেন। প্রমাণ ষাটের দশকে বুদ্ধদেব বসুকে এবং ইদানীং সুশোভন সরকারকে ও সুভোঠাকুরকে গালমন্দ শুনতে হয়েছে। আর পঞ্চাশের দশকে কম্যুনিস্টরাও হয়েছিল নিন্দিত রবীন্দ্র বিরোধিতার জন্যে।
এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিরুপ আলোচনা একটু বিপদজনকই বটে। তবুও কিছুটা ভরসা আছে আমাদের এই লেখার জায়গাটা মুক্তমনা বলেই। এর অধিকাংশ পাঠকই মুক্তবুদ্ধির, মুক্তচেতনার এবং মুক্তমনের মানুষ। অন্ধ ভক্তি-শ্রদ্ধার উর্ধ্বে উঠে গুণীর কদর এঁরা যেমন করতে জানেন, ঠিক সেরকমই যে কোনো মান্যবরের মানবীয় সীমাবদ্ধতাকেও না লুকিয়ে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেও অভ্যস্ত তাঁরা। রবীন্দ্রনাথও ইন্দ্রিয়চালিত মানুষ ছিলেন। কাজেই, নানা প্রয়োজনে তাঁরও দোষগুণ নানা প্রসঙ্গে উচ্চারণ করতে হয়, হবে। এতে বাধা দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়।
রবীন্দ্রনাথ যে দোষেগুণে মিলিয়ে আমাদের মতো এক রক্তমাংসের মানুষই ছিলেন তার প্রমাণ আছে তাঁর নিজের জীবনেই। তাঁর ভক্তদের মত রবীন্দ্রনাথ নিজেও নিজের বিরূপ সমালোচনা সইতে পারতেন না। সমালোচনায় উদ্বেলিত হয়ে, উৎকণ্ঠিত হয়ে তা খণ্ডনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়তেন তিনি। তাঁর হয়ে কেউ প্রতিবাদ করুক, সেই আশায় বসে থাকতেন তিনি। সেরকম কাউকে পাওয়া না গেলে নিজেই ছদ্ম কোনো নাম নিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিকারে নেমে পড়তেন। এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ বলেন :
রবীন্দ্রনাথ বিরূপ সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না, প্রতিবাদ করার লোক পাওয়া না গেলে বেনামে লিখে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতেন। রবীন্দ্রানুরাগী ও রবীন্দ্রস্নেহভাজন অন্নদাশংকর রায় বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ত্রুটি-নিন্দা-কলঙ্কের সাক্ষ্য প্রমাণ সতর্ক প্রয়াসে অপসারিত বা বিনষ্ট করতেন। তা সত্ত্বেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সুশোভন সরকার তাঁর প্রণাম-প্রীতিরূপ দুর্বলতার কথা বলে গেছেন। তাঁর সেজো ভাইয়ের পৌত্র সুভোঠাকুর [সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর] জমিদার পরিচালনায় তাঁর স্বার্থবুদ্ধির কথা বর্ণনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষের কবিতার নায়ক অমিতের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন যে, কবি মাত্রেরই পাঁচ বছরের জন্য কবিত্ব করা উচিত। তা না হলে শেষকালটায় অনুকরণের দল চারি দিকে ব্যূহ বেঁধে তাদেরকে মুখ ভ্যাংচাতে থাকে। তাদের লেখার চরিত্র বিগড়ে যায়, পূর্বের লেখা থেকে চুরি শুরু করে হয়ে পড়ে পূর্বের লেখার ‘রিসীভর্স্ অফ স্টোল্ন্ প্রপার্টি’। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ঈর্ষণীয় রকমের দীর্ঘায়ু ছিলেন। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির পরিমাণের দিক দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ধারে কাছেও কেউ নেই। তাঁর সমতুল্য সৃষ্টি বিশ্বের অন্য কোনো সাহিত্যে আর কেউ করেছে কি না বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই বিপুল সৃষ্টিতে কতখানি তিনি তাঁর নিজের লেখা থেকেই নকল করে লিখেছেন, সেটা রবীন্দ্র গবেষকরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে, যেখানে কবি সাহিত্যিকদের বেশিরভাগেরই প্রতিষ্ঠা আসে জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরের মধ্যে, তারপর তাঁদের জীবনে মোটামুটি বন্ধ্যাত্ব নেমে আসে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু লিখে গিয়েছেন অকাতর। শুধু লিখে গিয়েছেন বললে ভুল হবে, উৎকর্ষের দিক দিয়ে এই শেষের বছরগুলো বরং ছাড়িয়ে গিয়েছে আগের রবীন্দ্রনাথকে। এ বিষয়ে নীরদ চৌধুরী লিখেছেনঃ
ওয়ার্ডসওয়ার্থ, টেনিসন, ব্রাউনিং কেহই পরবর্তী জীবনে আগের রচনার তুলনায় উৎকৃষ্টতর কবিতা লেখেন নাই –ইঁহাদের কবিকীর্তি চল্লিশ বৎসরের আগে রচিত কাব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ও হুগো শেষ জীবনে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা আগের জীবনে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার সমানতো বটেই, কোনো কোনো রচনায় উচ্চতর।
আহমদ শরীফও একই ধরণের মতামত দিয়েছেন। তবে এই বিভাজনকে তিনি চল্লিশ বছরের আগে আর পরে করেন নি। বরং নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সময়টাকে বিভাজন রেখা হিসাবে বিবেচনা করেছেন। আহমদ শরীফের মতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগের রবীন্দ্রনাথের কাঁচা লেখা প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে নোবেল প্রাপ্তির পরের সময়ে। তাঁর ভাষাতেইঃ
নোবেল পুরস্কারের মান রক্ষার খাতিরেই রবীন্দ্রনাথকে বৈশ্বিক ও বিশ্বমানবিক চিন্তা-চেতনার অনুশীলন করতে হয়েছে। তাঁর দীর্ঘায়ু তাঁকে এ সুযোগ-সৌভাগ্য দিয়েছে। পুরস্কার প্রাপ্তির পরে তিনি সুদীর্ঘ আটাশ বছর বেঁচে ছিলেন, তার আগে বাল্য-কৈশোরের যৌবনের মধ্যবয়সের জীবনদেবতা চালিত কাঁচা-পাকা লেখায় ঊনিশ শতক ও এ শতকের এক দশক কেটেছে বটে, প্রায় সমসংখ্যক বছরব্যাপী, কিন্তু পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক জ্ঞান-প্রজ্ঞা, মন-মনন এবং মনীষা ও নৈপুণ্য নিয়ে বিশ্ববোধ অন্তরে জাগ্রত রেখে লিখেছেন জীবনের স্বর্ণযুগে আটাশ বছর ধরে। বলতে গেলে পুরস্কার পূর্বকালের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঊনিশ শতকী কবি আর পুরস্কার উত্তরকালের রবীন্দ্রনাথ হলেন বিশ শতকের মনীষা মানুষ।
তবে এই রকম বিপুল বিক্রমে লিখে গেছেন বলে এটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে তিনি কাউকে অনুসরণ করেন নি, অনুকরণ করে নি, বা নকল করেন নি কখনো। কবি সাহিত্যিকরা তাঁদের জীবনের কোনো না অংশে কারো না কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকেন। এতে দোষের কিছু নেই। দোষ হয় তখনই, যখন কেউ অন্যের সৃষ্টিকে সচেতনভাবে নিজের নামে চালাতে চায়। রবীন্দ্রনাথের নামে এই ধরনের অভিযোগ তেমন একটা আসে নি। এর মানে অবশ্য এই না যে তিনি কুম্ভিলকতার দোষ (plagiarism) থেকে মুক্ত। আমাদের মত অর্বাচীন লেখকদের চোখে তো বটেই, বহু বিদগ্ধ গবেষকদের চোখেও সেগুলো পড়েছে। কিন্তু ধর্মপ্রচারকদের অনুসারীদের মতোই অধিকাংশই কেবল ‘ঠাকুর পুজো’ আর ‘নিভৃত প্রাণের দেবতার’ স্তব করে গেছেন অহর্নিশি, আর কঠিন, নির্জলা এবং রূঢ় সত্যগুলোকে আড়াল করে ঠেলে দিয়েছেন কৃষ্ণগহ্বরের গহীন আধাঁরে। হ্যা, স্তাবক দলের মোহনীয় পরিবেশনায় আমরা রবীন্দ্রাকাশে এতোদিন কেবল চাঁদের একটি পিঠই দেখে এসেছি। আজ আমরা মুক্তমনা লেখকেরা চাঁদের উলটো পিঠটাও দেখতে আগ্রহী। তাই, এই প্রবন্ধে আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে কুয়াশার কালো চাঁদর সরানোর সংকল্প করেছি। তবে, তার আগে এটুকু বলে নিতে চাই যে, রবীন্দ্র বিদ্বেষ থেকে এই প্রবন্ধটি লেখা হয় নি। বরং আমাদের মধ্যে অনেকের মধ্যেই অহেতুক যে পূজো করার বাতিক আছে, সেই পূজারীদের রবি ঠাকুরের মুর্তি গড়ে আড়ম্বরপূর্ণ পূজোতে বাগড়া দেওয়াটা এখানে মূল উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখতে চাই নির্লিপ্ত এবং নির্মোহ দৃষ্টিতে, পূজারীদের প্রেমকাতরতাময় কিংবা বিদ্বেষীদের বিষ মাখানো বিষাক্ত দৃষ্টিতে নয়।
২
রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানপ্রেমিক ছিলেন সে কথা কারো অজানা নয়। বাংলার সেরা বিজ্ঞানী জগদীশ্চন্দ্র বসু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নীরদ চৌধুরীর আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ থেকে জানা যায় এই ঘনিষ্ঠতা এমনই পর্যায়ের ছিল যে, জগদীশ বসু প্রায়শই রবি ঠাকুরের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে এসে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথেও সাক্ষাৎ করে গিয়েছেন। এর সবকিছুই তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল ভালবাসার প্রমাণ হিসাবে আমরা নিতে পারি। কিন্তু, এতেও যাঁরা সন্তুষ্ট হবেন না বলে মনে হয়, তাঁদের কারণেই হয়তো বিজ্ঞানের উপর চমৎকার এবং অত্যন্ত উন্নত মানের একটা বই লিখে গিয়েছেন তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে। ছিয়াত্তর বছর বয়সে লেখা একশ পনের পৃষ্ঠার সেই বইটির নাম ছিল বিশ্বপরিচয়। তিনি যে বিজ্ঞানপ্রেমিক ছিলেন, বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে তাঁর যে লোভের অন্ত ছিল না, সেটা আমরা এই বইয়ের উৎসর্গপত্র থেকেও জানতে পারি। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। সেই উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন :
আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না। আমার বয়স বোধ করি তখন নয়-দশ বছর; মাঝে মাঝে রবিবারে হঠাৎ আসতেন সীতানাথ দত্ত [ ঘোষ ] মহাশয়। আজ জানি তাঁর পুঁজি বেশি ছিল না, কিন্তু বিজ্ঞানের অতি সাধারণ দুই-একটি তত্ত্ব যখন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আমার মন বিস্ফারিত হয়ে যেত। মনে আছে আগুনে বসালে তলার জল গরমে হালকা হয়ে উপরে ওঠে আর উপরের ঠাণ্ডা ভারী জল নীচে নামতে থাকে, জল গরম হওয়ার এই কারণটা যখন তিনি কাঠের গুঁড়োর যোগে স্পষ্ট করে দিলেন, তখন অনবচ্ছিন্ন জলে একই কালে যে উপরে নীচে নিরন্তর ভেদ ঘটতে পারে তারই বিস্ময়ের স্মৃতি আজও মনে আছে। যে ঘটনাকে স্বতই সহজ বলে বিনা চিন্তায় ধরে নিয়েছিলুম সেটা নয় এই কথাটা বোধ হয় সেই প্রথম আমার মনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার পরে বয়স তখন হয়তো বারো হবে (কেউ কেউ যেমন রঙ-কানা থাকে আমি তেমনি তারিখ-কানা এই কথাটি বলে রাখা ভালো) পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে। সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরিশৃঙ্গের বেড়া-দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন। তিনি যা বলে যেতেন তাই মনে করে তখনকার কাঁচা হাতে আমি একটা বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি। স্বাদ পেয়েছিলুম বলেই লিখেছিলুম, জীবনে এই আমার প্রথম ধারাবাহিক রচনা, আর সেটা বৈজ্ঞানিক সংবাদ নিয়ে।
তার পরে বয়স আরো বেড়ে উঠল। ইংরেজি ভাষা অনেকখানি আন্দাজে বোঝবার মতো বুদ্ধি তখন আমার খুলেছে। সহজবোধ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই যেখানে যত পেয়েছি পড়তে ছাড়ি নি। মাঝে মাঝে গাণিতিক দুর্গমতায় পথ বন্ধুর হয়ে উঠেছে, তার কৃচ্ছ্রতার উপর দিয়ে মনটাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছি। তার থেকে একটা এই শিক্ষা লাভ করেছি যে, জীবনে প্রথম অভিজ্ঞতার পথে সবই যে আমরা বুঝি তাও নয় আর সবই সুস্পষ্ট না বুঝলে আমাদের পথ এগোয় না এ কথাও বলা চলে না। জলস্থল-বিভাগের মতোই আমরা যা বুঝি তার চেয়ে না বুঝি অনেক বেশি, তবুও চলে যাচ্ছে এবং আনন্দ পাচ্ছি। কতক পরিমাণে না-বোঝাটাও আমাদের এগোবার দিকে ঠেলে দেয়। যখন ক্লাসে পড়াতুম এই কথাটা আমার মনে ছিল। আমি অনেক সময়েই বড়োবয়সের পাঠ্যসাহিত্য ছেলেবয়সের ছাত্রদের কাছে ধরেছি। কতটা বুঝেছে তার সম্পূর্ণ হিসাব নিই নি, হিসাবের বাইরেও তারা একরকম করে অনেকখানি বোঝে যা মোটে অপথ্য নয়। এই বোধটা পরীক্ষকের পেনসিলমার্কার অধিকারগম্য নয় কিন্তু এর যথেষ্ট মূল্য আছে। অন্তত আমার জীবনে এইরকম পড়ে-পাওয়া জিনিস বাদ দিলে অনেকখানিই বাদ পড়বে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলুম। এই বিষয়ের বই তখন কম বের হয় নি। স্যার রবর্ট বল-এর বড়ো বইটা আমাকে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছে। এই আনন্দের অনুসরণ করবার আকাঙ্ক্ষায় নিউকোম্ব্স, ফ্লামরিয়ঁ প্রভৃতি অনেক লেখকের অনেক বই পড়ে গেছি – গলাধঃকরণ করেছি শাঁসসুদ্ধ বীজসুদ্ধ। তার পরে এক সময়ে সাহস করে ধরেছিলুম প্রাণতত্ত্ব সম্বন্ধে হক্সলির এক সেট প্রবন্ধমালা। জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রাণবিজ্ঞান কেবলই এই দুটি বিষয় নিয়ে আমার মন নাড়াচাড়া করেছে। তাকে পাকা শিক্ষা বলে না, অর্থাৎ তাতে পাণ্ডিত্যের শক্ত গাঁথুনি নেই। কিন্তু ক্রমাগত পড়তে পড়তে মনের মধ্যে বৈজ্ঞানিক একটা মেজাজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। অন্ধবিশ্বাসের মূঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধা আমাকে বুদ্ধির উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে আশা করি অনেক পরিমাণে রক্ষা করেছে। অথচ কবিত্বের এলাকায় কল্পনার মহলে বিশেষ যে লোকসান ঘটিয়েছে সে তো অনুভব করি নে।
কাজেই, রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান প্রেম নিয়ে আর কোনো সন্দেহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের প্রতি প্রেমের কারণে বিশ্বপরিচয় লেখার আগে বেশ কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধও তিনি লিখেছিলেন। যদিও সেগুলোর মান ছিল শিশুতোষ পর্যায়ের। সেই প্রবন্ধগুলো আসলেই যে শিশুতোষ ছিল তার উদাহরণ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ লিখিত একটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধকে এখানে তুলে দিচ্ছি।
মাকড়সা-সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব
পৌরুষ সম্বন্ধে স্ত্রী-মাকড়সার সহিত পুরুষ-মাকড়সার তুলনাই হয় না। প্রথমত, আয়তনে মাকড়সার অপেক্ষা মাকড়সিকা ঢের বড়ো, তার পর তাহার ক্ষমতাও ঢের বেশি। স্বামীর উপর উপদ্রবের সীমা নাই, তাহাকে মারিয়া কাটিয়া অস্থির করিয়া দেয়। এমন-কি, অনেক সময় তাহাকে মারিয়া ফেলিয়া খাইয়া ফেলে; এরূপ সম্পূর্ণ দাম্পত্য একীকরণের দৃষ্টান্ত উচ্চশ্রেণীর জীবসমাজে আছে কি না সন্দেহ।
না, এটি কোন আনাড়ি স্কুল ছাত্রের শুরু করা এবং পথিমধ্যে হাল ছেড়ে দেয়া কোন প্রবন্ধের একাংশ নয়। এটি পরিণত বয়সে লেখা তাঁর একটি পুরো প্রবন্ধই। অবাক লাগছে? বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্যি। বিশ্বপরিচয় বাদ দিলে বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি যে সকল প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলো এই মাকড়সা-সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব ধরণের। এই প্রবন্ধটি নিয়ে মুক্তমনায় একটি ধাঁধা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, এই প্রবন্ধটি যদি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মুক্তমনায় পাঠাতেন প্রকাশের জন্য সেক্ষেত্রে মুক্তমনার মডারেটররা এটাকে প্রকাশ করতেন কি না? এর উত্তরে আদিল মাহমুদ বলেছিলেন যে, “প্রকাশ করতেন। তবে বিজ্ঞান বিভাগে নয়, রম্য বিজ্ঞান বিভাগে”।
তো এই রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই শেষ বয়সে বেরিয়ে এসেছিল বিশ্বপরিচয়ের মত সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানের উন্নত একখানা বই। এতেও কোনো সমস্যা ছিল না, বরং আমাদের জন্য তা সৌভাগ্যেরই বিষয়। এর মধ্যে তিনি হয়তো বিজ্ঞানের উপরে আরো পড়াশোনা করেছেন, নিজের উৎকর্ষতা বাড়িয়ে নিয়েছেন, নিজেকে সমৃদ্ধতর করেছেন। তাঁর মানের একজন ব্যক্তি তা করতেই পারেন। কিন্তু বিশ্বপরিচয়ের উৎসর্গপত্রের শেষের দিকে রবীন্দ্রনাথ কিছু কথা বলেছিলেন, যা অনেকটা ছন্দপতনের মতই ছিল। যদিও তিনি আন্তরিক অকপটতায় কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এর মধ্য থেকেই বেরিয়ে এসেছিল ভয়ংকর এক সত্য। সেই ভয়ংকর সত্যকে জানার আগে আসুন দেখি রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন। উৎসর্গপত্রের শেষের দিকে এসে তিনি এই গ্রন্থটি লেখার কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেনঃ
শ্রীমান প্রমথনাথ সেনগুপ্ত এম. এসসি. তোমারই ভূতপূর্ব ছাত্র। তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-অধ্যাপক। বইখানি লেখবার ভার প্রথমে তাঁর উপরেই দিয়েছিলেম। ক্রমশ সরে সরে ভারটা অনেকটা আমার উপরেই এসে পড়ল। তিনি না শুরু করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তাছাড়া অনভ্যস্ত পথে শেষ পর্যন্ত অব্যবসায়ীর সাহসে কুলোত না তাঁর কাছ থেকে ভরসাও পেয়েছি সাহায্যও পেয়েছি।
এখানেই এসেই মূলত খটকাটা শুরু হয়। যে বই লেখার ভার পড়েছিল প্রমথনাথের উপরে সেই বই লেখার ভার হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথের ঘাড়ে গিয়ে পড়লো কেন? তাছাড়া কথা হচ্ছে, প্রমথনাথ ঠিক কতখানি শুরু করেছিলেন? যতটুকু শুরু করেছিলেন তাতে করে সহলেখক হিসাবে তাঁর নাম আসাটা যুক্তিসঙ্গত ছিল কি না? এটি অনুসন্ধান করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে চরম এবং ভয়ংকর সত্যটা; যে সত্যটাকে দীর্ঘকাল গোপন করে রাখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ইমেজকে তাঁরই পরনের সাদা আলখাল্লার মত পুতপবিত্র রাখার বাসনায়।
মূল ঘটনায় যাবার আগে ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থটি শুরুর ইতিবৃত্তটুকু একটু জেনে নেয়া যাক। রবীন্দ্রনাথের এক সময় ইচ্ছে হয়েছিলো পশ্চিমের ‘হোম ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি’র অনুকরণে ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’ তৈরির -- যেটি জনপ্রিয় ভাষায় বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের কাছে পোঁছিয়ে দেবে। কাজেই ভাষা হতে হবে যথাসম্ভব সহজ সরল, পাণ্ডিত্যবিবর্জিত। তিনি ভেবেছিলেন মহাবিশ্বের সাথে সাধারণ পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য একটা বই লেখা হবে, এবং বইটির ভার তিনি দেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকের কাজ নিয়ে বিশ্বভারতীতে যোগ দেয়া তরুণ অধ্যাপক প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর।
রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন [প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ‘রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক’ ৪র্থ খণ্ড, বিশ্বভারতী,১৪০১, পৃ ৯৬]-
‘আমাদের আলোচ্যপর্বে রবীন্দ্রনাথকে আর-একটি বিষয়ে আলোচনা করিতে দেখিতেছি, সেটি হইতেছে লোকশিক্ষার ক্ষেত্রে। পাঠকদের স্মরণে আছে বহু বৎসর পূর্বে Home University Libraryর অনুরূপ গ্রন্থমালা বাংলাভাষায় প্রকাশনের কথা কবির মনে আসিয়াছিল। এতকাল পরে বিশ্বভারতী প্রকাশন-বিভাগের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যের উদ্যোগে লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা প্রকাশের পরিকল্পনা গৃহীত হইল। কবির মতে, ‘সাধারণজ্ঞানের সহজবোধ্য ভূমিকার আরম্ভ হইবে বিজ্ঞানচর্চায়। তদুদ্দেশে কবির ইচ্ছা যে, এই লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার প্রথম গ্রন্থ হইবে বিশ্বপরিচয়। কবি বলেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার। … জ্ঞানের এই পরিবেশনকার্যে পাণ্ডিত্য (pedantry) যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি। এই প্রথম গ্রন্থখানি লিখিবার ভার অর্পণ করা হইয়াছিল প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর। প্রমথনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র, সত্যেন বসুর প্রিয় শিষ্য, শিক্ষাভবনে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক।’
তরুণ শিক্ষক প্রমথনাথ শান্তিনিকেতনে চাকরী পেয়েছিলেন সত্যেন বোস এবং জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের সুপারিশে। তিনি বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র ছিলেন। কিন্তু বাংলায় খুব বেশি দখল ছিল না, (অন্ততঃ রবীন্দ্রনাথের সমপর্যায়ের নন বলে তিনি মনে করতেন)। । রবীন্দ্রনাথ প্রমথবাবুকে ব্রিটিশ পদার্থবিদ জেমস জিনসের একটা বই – ‘থ্রু স্পেস অ্যান্ড টাইম’ পড়তে দিয়েছিলেন। জেমস জিন্স খুব বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন না, কিন্তু জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে কিছু সুনাম তাঁর ছিল। ফলে, তার বই থেকে জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই কিভাবে লিখতে হয় তার একটা রসদ পাবেন প্রমথবাবু – সেরকম একটা ধারণা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজেই, রবীন্দ্রনাথ যখন প্রমথবাবুকে বই লেখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন (তখন কি তিনি কস্মিনকালেও জানতেন, তার এই রসদ রবিবাবু পুরোটাই নিজের বইয়ের কাজে ব্যবহার করবেন) যার পর নাই খুশি হয়েছিলেন। কী রকম উচ্ছ্বাস তার হয়েছিল, তা প্রমথবাবুর ভাস্য থেকেই শোনা যাক -
‘সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলাম, তারপর ধীরে ধীরে শুরু হল বই লেখার কাজ। সে এক বিপর্যয় কান্ড। কোনদিন বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সুসংবদ্ধ বাংলা রচনায় হাত দেইনি, দু একটা ছোটখাট রচনা যা লিখেছি তা ছিলো ইংরেজীতে। তাই এই অনভ্যস্ত পথে প্রতিপদে কেবল হোঁচট খেতে হল। এগোন আর হচ্ছিলো না। নিজের লেখা নিজেরই এত খারাপ লাগতে লাগল যে, দু এক পাতা লিখেই তা ছিঁড়ে ফেলতাম। ফলে ছিন্ন কাগজের পাতায় ঝুড়ি ভর্তি হয়ে উঠল। খাতাখানাও সম্বল হারিয়ে ক্রমশঃ শীর্ণকায় হয়ে উঠল। অবশ্য এতে একজন খুব খুশি হলেন, উনুন ধরাবার কাজে অনায়াসলব্ধ এই ছিন্নপত্রগুলো আমার স্ত্রী যথাযথ সদ্গতি করে চললেন।
এই উদ্ধৃতিটি আছে প্রমথনাথ সেনগুপ্তের আনন্দরূপম বইয়ে, যা বাসুমতি, কলকাতা থেকে একসময় প্রকাশিত হয়েছিল (এখন বইটি দুর্লভ, খুঁজলেও পাওয়া যায় না)। বইয়ের এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় লেখক বাংলা নিয়ে অতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু এটি অন্ততঃ ভেবেছিলেন বইটি তাঁরই হবে।
এ সময় পাঠভবনের অধ্যাপক তনয়বাবু (তননেন্দ্রনাথ ঘোষ, পাঠভবনের অধ্যাপক) এসে বললেন -
এভাবে তো হবে না, আপনি যা পারেন লিখুন। তবে তথ্যের দিক থেকে যেন হাল্কা না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। আমাদের বিচারে যে ভাষা সাধারণতঃ ভালো বলে আখ্যা পায়, গুরুদেবের হাতে পড়লে তার খোল-নলচে বদলে গিয়ে এক নতুন ভাষা প্রকাশ পায়। কাজেই বৈজ্ঞানিক তথ্য পর পর সাজিয়ে দিন, ভাষার ভার গুরুদেব নেবেন। গুরুদেব সেই ভাষা দেখে পরবর্তী পর্যায়ে লিখতে শুরু করবেন।’
পাঠক, বুঝতেই পারছেন, কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে। কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে কেবল ভাষার মাধুর্য বাড়িয়ে প্রমথনাথের মূল তথ্যগুলো হাতিয়ে নেবার পায়তারা চলছে। কিন্তু তারপরেও বই লেখার এ পদ্ধতি ঠিক হবার পরেও হতভাগ্য প্রমথবাবু কিন্তু ভাবছেন বইটা তাঁরই হবে। তিনি বইয়ের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন – ‘বিশ্বরচনা’। তাই তিনি লিখলেন -
‘ওদের উপদেশ মেনে নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হল। বইটার নামকরণ করলাম “বিশ্বরচনা” । ধীরে ধীরে কাজ এগুতে লাগল। ‘পরমাণুলোক’ দিয়ে শুরু হল বইয়ের প্রথম অধ্যায়, এটা শেষ করে গুরুদেবের কাছে নিয়ে যেতে হবে।’
প্রথম অধ্যায় লেখা শেষ করে প্রমথনাথ রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ দেখে বললেন,
“রচনাটি আমার কাছে রেখে যাও, কাল ফেরৎ পাবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটাতে হলে ভাষাটা কীরকম হবে, তাই শুধু দেখিয়ে দেব”।
শুধু পরমাণুলোক নয়, এর পর নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক এবং উপসংহার সব অধ্যায়ই লিখেছেন প্রমথবাবু। আর রবীন্দ্রনাথ খোল নলচে বদলে দিয়েছেন। সেই সংশোধন করা পাণ্ডুলিপিগুলো প্রমথনাথ অবশ্য আনন্দরূপম বইয়ে ছাপিয়েছিলেন কিছু কিছু ।
প্রমথবাবু পুরো বইটি এবং তার উপসংহার শেষ করার পরে রবীন্দ্রনাথ ঠিক করেন বইটার নাম “বিশ্বপরিচয়” হবে। কিন্তু প্রমথনাথকে ঘূর্ণাক্ষরেও তিনি জানতে দেননি একথা। বরং ভিন্ন একধরণের নাটকের অবতারণা করলেন ধীরেন্দ্রমোহন সেনকে নিয়ে এসে। নাটক বলছি কেন সেটা পাঠকেরা শুনেই বুঝতে পারবেন আশা করছি।
ডঃ সেন হঠাৎ ওকে (প্রমথ বাবুকে) বললেন,
বিশ্বপরিচয় নিয়ে আপনি যে পরিশ্রম করেছেন তাতে বইটার যুক্তগ্রন্থকার হওয়া উচিৎ – রবীন্দ্রনাথ-প্রমথনাথ।
‘গুরুদেব’ সাথে সাথে বললেন,
সে কীরে, বইটার বিষয়বস্তু রচনার কাজ তো প্রমথই করেছে। আমি শুধু ভাষার দিকটা দেখে দিয়েছি। গ্রন্থকার তো প্রমথেরই হওয়া উচিৎ। তবে আমার নামের সাথে যদি প্রমথ যুক্ত করতে চান, তাহলে প্রমথনাথ-রবীন্দ্রনাথ হওয়াই ঠিক হবে।
নিঃসন্দেহে এটা প্রমথবাবুর জন্য বড় রকমের ধাক্কা ছিল। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন তার নামেই বইটা হবে। বইয়ের সব তথ্য যে তাঁরই যোগাড় করা! তারপরেও রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ভাষার সবকিছু ঢেলে সাজিয়েছেন, সেহেতু যুক্তগ্রন্থকার হলেও খুব বেশি হারাবার নেই বলেই ভেবেছিলেন হয়তো। সেই বিহবল অবস্থা ধরা পড়ে প্রমথবাবুর লেখায় -
তারপর পান্ডুলিপি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন, তারপর ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ডক্টর সেন বললেন যে, সম্ভব হলে ঐ গ্রীষ্মের ছুটির মধ্যেই যেন ‘পৃথ্বী-পরিচয়’ বইটা আমি শেষ করি। ওর কথা বলার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল ‘বিশ্বপরিচয়’ বইটার লেখকের নাম নিয়ে কোথায় যেন একটা সংশয় জেগেছে, অবশ্য এ ব্যাপারে ওঁকে খোলাখুলি কিছু জিজ্ঞেস করাও সম্ভব নয়।’
এর বেশ কিছুদিন পর নাটকের আসল যবনিকাপাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক করলেন প্রমথবাবুকে জানাবেন ব্যাপারটা যে, নিজেই বইয়ের লেখক হতে চান, প্রমথবাবুকে বাদ দিয়ে। কীভাবে সেটা প্রমথবাবুর মুখেই শোনা যাক -
গ্রীষ্মের ছুটির পর গুরুদেব আলমোড়া থেকে ফিরে একদিন সন্ধ্যার সময় ডেকে পাঠালেন। উত্তরায়নে গিয়ে দেখি ক্ষিতিমোহনবাবু ও শাস্ত্রীমশায়ের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, আমাকে ডেকে সস্নেহে পাশে বসালেন, কুশল প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, “দেখো, বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না। ” একটু থেকে বললেন, “অবশ্য তুমি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তা ছাড়া বিজ্ঞানের অনভ্যস্ত পথে চলতে শেষপর্যন্ত এই অধ্যবসায়ীর সাহসে কুলাতো না। তুমি ক্ষুন্ন হয়ো না।
এই হচ্ছে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থ রচনার ইতিবৃত্ত। রবীন্দ্রনাথের বিশাল পরিচিত এবং ব্যক্তিত্বের কাছে নতজানু প্রমথনাথ ক্ষুন্ন হয়েছিলেন কি না জানা নেই আমাদের। তবে, এই ঘটনা জেনে আমরা যে ভয়ংকর রকমের ক্ষুব্ধ, ক্ষুন্ন এবং ক্ষীপ্ত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। রবীন্দ্রনাথের মত একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব তাঁরই অধীনস্থ সামান্য একজন শিক্ষকের সাথে এরকম প্রতারণা করবেন, তাঁর লেখা বইকে নিজের নামে ছাপিয়ে দেবেন কোনো ধরনের চক্ষুলজ্জার ধার না ধেরে, সেটা মেনে নেওয়াটা আসলেই কষ্টকর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ‘রাহাজানির’ (হ্যা, এটি আমাদের চোখে রাহাজানিই, ছোটখাট ‘জোচ্চুরি’ নয়) ঘটনার পুরো বিবরণ আছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত দীপঙ্কর চট্টোপাধায়ের লেখা ‘রবীন্দনাথ ও বিজ্ঞান’ [ আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, জানুয়ারি, ২০০০] বইয়ে। দীপঙ্কর চট্টোপাধায় পেশায় পদার্থবিদ, দাপটের সাথে এক সময় অধ্যাপনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫৮ -৬১), এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জনের পরেও তিনি রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরুতে পারেননি, বরং ‘দেশ পত্রিকার’ অনুগ্রহপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধ রবীন্দ্রস্তাবকদের একজন ছিলেন তিনি। যথারীতি আর সব সমসাময়িক রাবীন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মতোই রবিঠাকুরকে মাথায় তুলে নেচেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ কত বড় বিজ্ঞানমনস্ক, কত পরিশীলিত ছিলো তার জ্ঞান, কত আধুনিক ছিলো তার দৃষ্টিভঙ্গি, সে সময়কার কত বড় বড় বিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচিত হবার জন্যে পাগল হয়ে বসেছিলো -- তা নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখে গেছেন পাতার পর পাতা। এমনকি আইনস্টাইন-রবীন্দ্রনাথের সংলাপের পরিপ্রেক্ষিতে আইনস্টাইনের চেয়ে রবীন্দ্রনাথই যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রে বেশি সঠিক ছিলেন সেটাও আকারে ইঙ্গিতে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দীপঙ্কর বাবুকে একলা দোষ দেয়া যায় না। যুগটাই রবীন্দ্রবন্দনার, রবিঠাকুরের মিছে ভাবমূর্তি গড়ে চোখ মুদে স্তব করার। মডারেট শিক্ষিত ইসলামিস্টরা যেমন কোরাণের মধ্যে বিগব্যাং থেকে শুরু করে সমাজ এবং অর্থনীতির যাবতীয় সূত্র খুঁজে পান, ঠিক তেমনি মডারেট শিক্ষিত রবীন্দ্রস্তাবকেরাও সেই কাজটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অতীব নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন, ভারত এবং বাংলাদেশ -- দু জায়গাতেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, মানবতাবাদ, কৃষি, সমাজতন্ত্র, কোয়ান্টাম ফিজিক্স -- এমন কোন ক্ষেত্র নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথের নিত্য নতুন অবদান আবিস্কৃত হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান-সমজ-সভ্যতা ধন্য হচ্ছে না তার স্তাবককূলের হাতে পড়ে। ‘সমাজতন্ত্র কেন কাজ করেনি?’ -- রবীন্দ্রনাথ নাকি সেই বিশের দশকেই রাশিয়ার চিঠিতে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক সংকেত উত্থাপন করে আমাদের জানিয়ে গিয়েছিলেন -- একদিন সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়বে। আইনস্টাইনের মতো জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ নাকি ভৌত বাস্তবতার প্রকৃতি আরো ভাল বুঝতেন, আর তার ইঙ্গিত নাকি দিয়ে গেছেন শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ কবিতায় ‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’ চরণের মাধ্যমে। শুধু সমাজতন্ত্র কিংবা পদার্থবিজ্ঞান নয়, পত্রপত্রিকার রবীন্দ্রভক্ত বুদ্ধিজীবীদের কলাম থেকে আমরা আজ শুনছি -- আধুনিক ক্ষুদ্র ঋণের আবিস্কারকও নাকি রবীন্দ্রনাথ। পাশাপাশি কৃষিকর্মকাণ্ড, সমবায় প্রচেষ্টা, নারীশিক্ষা সবকিছুরই আদি অকৃত্রিম অগ্রদূত রবিঠাকুর। আজকের জামানায় রবীন্দ্রনাথ আবির্ভূত হয়েছেন যেন নতুন এক পয়গম্বর হিসেবে। কাজেই দীপঙ্কর চট্টোপাধায় নতুন কিছু করেননি, বহমান বাতাসেই নিজ নৌকার পাল তুলে দিয়েছেন, নিজেকে ভাসিয়েছেন গড্ডালিকা প্রবাহে। বিনিময়ে পেয়েছেন দেশ পত্রিকায় লেখার এবং আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই বের করার দারুণ সুযোগ। বাংলাদেশের নামকরা পদার্থবিজ্ঞানী শমশের আলীরা যেমন ‘কোরানিক বিজ্ঞান’ থেকে বেরুতে পারেন না, কোরানের প্রাচীন আয়াতের মধ্যে যাবতীয় আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অন্বেষণ করেন, ঠিক তেমনি দীপঙ্কর চট্টোপাধায়ের মতো রবীন্দ্র স্তাবকেরা ধর্মগুরুর মতোই রবীন্দ্রনাথকে জ্ঞান করেন, তাকে সঠিক মনে করেন, আর রবীন্দ্র রচনাবলীর মধ্যে সন্ধান করেন আধুনিক বিজ্ঞান এবং দর্শনের। তারপরেও তার গুরুজির এভাবে রাহাজানি করে মেধাসত্ত্ব মেরে দেয়ার এই লজ্জা দীপঙ্করবাবুও লুকাতে পারেন নাই। যেমন দীপঙ্কর মশাই বলছেন -
কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে। গোড়া থেকেই প্রমথনাথের মনে কবি একটা প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিলেন। প্রথমে তো বলেছিলেন বইটা প্রমথবাবুকেই লিখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, বিশেষ করে ভাষার ব্যাপারে। এটা বলা কতদূর সঙ্গত হয়েছিল সেটাই প্রশ্ন।
তারপরেই আবার পূজারী রবীন্দ্রনাথের সাফাই গেয়েছেন এই বলে -
রবীন্দ্রনাথের একটা মজার ব্যাপার ছিল। অনেককেই তিনি গল্পের প্লট দিতেন, গল্প লিখিয়ে নিতেন। অনেক কবিযশঃপ্রার্থীর কবিতা সংশোধন করে দিতেন। এসব তিনি করেছেন খ্যাতির চূড়ায় বসেও। অত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি এসব কী করে করতেন কে জানে!
প্রিয় পাঠক, উক্তিটা শুনে সেই ব্যাঙ-এর গল্পের কথা মনে পড়ছে না? ছেলেপিলেরা পুকুর পাড়ে বসে ব্যাঙদের উপর ঢিল ছুঁড়তো। ছেলেদের জন্য নির্দোষ ঢিল ছোঁড়া -- যেটা তাদের কাছে স্রেফ মজার ব্যাপার ছিলো, সেটাই কিন্তু ছিলো ব্যাঙদের জন্য মরণের কারণ। বুঝতে কী এটি খুব বেশি সমস্যা -- রবীন্দ্রনাথ একে তাকে দিয়ে যেটা “মজার ব্যাপার” মনে করে লিখিয়ে নিতেন, আর তারপর নিজের নামে চালিয়ে দিতেন -- সেটা প্রমথনাথের মত নবীন লেখকদের জন্য হয়েছিলো সর্বনাশের কারণ?
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের দীপঙ্ককর চট্টোপাধ্যায় -- যারাই রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই কলঙ্কিত অধ্যায়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়েছেন, তারাই কিছুটা হলেও লজ্জিত হয়েছেন, কিন্তু তারপরেও ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ থেকে তাদের মোহমুক্তি ঘটেনি। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চেয়েছেন যে, প্রমথনাথের ভাষার চেয়ে রবীন্দনাথের ভাষা ছিলো অতুলনীয়, খোলনলচে বদলানোর পর লেখাটা এতোটাই বদলে গেছে যে সেটা প্রমথনাথের বই হবার যোগ্যই ছিলো না। তাই তাকে লেখকের পদ থেকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সঠিক কাজই করেছেন। যুক্তি বটে! তাদের কথা মানা যেত, যদি বইয়ের কাজটি রবীন্দ্রনাথই প্রথম থেকে শুরু করতেন, পাণ্ডুলিপিটি নিজে লিখতেন, এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য প্রমথনাথের সাথে কেবল আলোচনা করে ভুলচুক থাকলে সেটা শুধরে নিতেন, অথবা তাকে দিয়ে রিভিউ করাতেন। তা রবীন্দ্রনাথ করেনিনি। বরং পুরো বইটি লিখিয়েছেন প্রমথনাথকে দিয়েই। একটি দুইটি অধ্যায় নয় -- পুরো গ্রন্থের সবগুলো অধ্যায় -- পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভুলোক, এমনকি উপসংহার পর্যন্ত তাকে দিয়ে লিখেছেন। কিন্তু মূল গ্রন্থাকার হিসেবে প্রমথনাথকে কৃতিত্ব দেয়া দূরের কথা -- সহগ্রন্থকার হিসেবেও তাকে ঠাঁই দেননি ‘ঋষিপ্রতিম’ রবীন্দ্রনাথ, কেবল ভূমিকায় একটি বাক্যে তার নামের উল্লেখ করে দায় সেড়েছেন। একে রাহাজানি ছাড়া আর কীই বা বলা যায়?
৩
রবীন্দ্রনাথের মত অতুলনীয় সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে খুব কম সাহিত্যিকই জন্মেছেন। তাঁর রচনাসমূহ নিয়ে ভক্তদের মাতামাতি, উচ্চ প্রশংসা, জীবনের সর্ব আবেগের প্রকাশ রয়েছে রবীন্দ্রনাথে বা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালিত্ব অসম্পূর্ণ ইত্যাদি উচ্ছ্বাসভরা কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তবে, তাঁর গান নিয়ে যা হয় সেটাকে ঠিক মাতামাতি শব্দটা দিয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের গানকে একরকম প্রার্থনা সংগীত বানিয়ে ফেলেছেন তাঁর পূজারীর দল। যে ভাবগম্ভীর পবিত্রতা নিয়ে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করা হয় বা শোনা হয়, তা দেখলেই যে কেউই একে পূজোর আচার আচরণ ভেবে ভুল করে বসে থাকতে পারেন। ভেবে বসে থাকতে পারেন যে, একদল পূজারী গভীর ভক্তিভরে তাঁদের কোনো প্রাণপ্রিয় দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য পরিবেশন করে চলেছেন। এর পূজারীর দল রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া পৃথিবীতে যে অন্য কোনো সংগীত থাকতে পারে, আর সেগুলো যে এর থেকেও ভাল হতে পারে সেটা কোনোভাবে মেনে নিতে রাজী নন। অনেকেই খুব ‘গৌরবের সাথে’ এবং নির্দ্বিধায় বলে দেন যে, রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া অন্য কোনো সংগীতই শোনেন না। বাংলা গান শোনার ক্ষেত্রে কিছু বাঙালির এই একপেশে আচরণ সম্পর্কে কবীর সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়) তাঁর লিখিত বই কোন পথে গেল গান-তে বলেছেনঃ
বাংলা গান শোনা আমাদের সমাজে বরাবরই একপেশে। ফলে, কালক্রমে কিছু জনপ্রিয় গায়ক গায়িকা ও তাঁদের স্মৃতি ঘিরেই আমাদের গানপ্রেম আবর্তিত। সেই সঙ্গে ‘আমি বাপু রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া কিছু শুনি না’, ‘আমি বাবা রবীন্দ্র-নজরুল-দ্বিজেন্দ্রলাল-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্তর বাইরে কিছু মানতে রাজি নই’,…. গোছের বেরসিক, একদেশদর্শী, সুরবধির মানসিকতার শুধু বহির্প্রকাশই নয়, সগর্ব উচ্চারণ।
ভক্তি এবং ভাবে গদগদ ভক্তদের এক্ষেত্রে অবশ্য এককভাবে দোষ দেওয়াটাও অনুচিত। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর দুটো গান দুটো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত। রবীন্দ্রনাথের নিজেরও তাঁর গান সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা ছিল। তাঁর অন্য কোনো সাহিত্যকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও গান যে হবে সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন। তাইতো তিনি বলেছিলেন, “জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে তা বলতে পারি না। কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু। জোর করে বলা যায় না, যুগ বদলায়, তার সঙ্গে তো সবকিছু বদলায়। তবে সবচেয়ে স্থায়ী আমার গান, এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালীরা, শোকে দুঃখে সুখে আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে। [লেখক সমাবেশ, ৫ম বর্ষ সংখ্যা – ১৩, প্রথম পক্ষ মে ১৯৮৫, পরেশ ধর – উদ্ধৃত]
রবীন্দ্রনাথের কথা আপাত সত্য। তবে, আজীবনের জন্য সত্য নয়। কোনো জিনিসই চিরস্থায়ী হয় না, তা সে সেই সময়ের জন্য যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন। এর জ্বলন্ত প্রমাণ মধুসুদন। এরকম একজন অসাধারণ মেধাবী কবি এখন শুধু টিকে আছেন পাঠ্য বইয়ে। কাল সবকিছুকেই গ্রাস করে নেয়। রবীন্দ্রনাথও একসময় প্রাচীন কবি হবেন, তাঁর অধিকাংশ রচনা মূল্য হারাবে- রবীন্দ্র-মহিমাও হবে ম্লান থেকে ম্লানতর। তাঁর উপন্যাস কিংবা গল্পের অনেক কিছুতেই ‘সেকেলের ছাপ’ লেগে গেছে ইতোমধ্যেই, এমনকি বহু আধুনিক মেধাবী কবিদের কবিতা কিংবা গীতিকারদের গান রবীন্দ্ররচনার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে, কখনো বা উৎরে গেছে রবীন্দ্র সংগীতকে পিছনে ফেলে দিয়ে।
সমস্যা হচ্ছে যে রবিন্দ্রভক্তরা এই কথাটা মানতে রাজি নন। এই পরিস্থিতিটাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম নন। ফলে, বিভিন্ন নিষেধ জারি করে রবীন্দ্রনাথের গানকে বিশুদ্ধ রাখার, আজীবন টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁরা।
দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন কিশোরগঞ্জের মানুষ। ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। সে কারণে হিন্দুরা তাঁদেরকে ম্লেছ বলে অভিহিত করতো। স্কুলে তিনি যে বেঞ্চে বসতেন সেই বেঞ্চে অন্য কোনো হিন্দু ছেলে বসতো না। গ্রামের কয়েকজন মুসলমান রাখাল ছিল তাঁর বন্ধু। অসাধারণ দরাজ গলা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। গানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে প্রার্থনা সংগীত গাইতে গাইতেই রবীন্দ্র সংগীত শিখেছেন তিনি। এই দেবব্রত বিশ্বাসকে রীতিমত জ্বালিয়ে মেরেছিল ‘রবীন্দ্রভারতী মিউজিক বোর্ড’। রবীন্দ্রনাথের গানের কপিরাইট তাঁদের হাতে ছিল। ফলে, রবীন্দ্র সঙ্গিতের যে কোনো রেকর্ডকেই বিশ্বভারতীর অনুমোদন নিতে হতো বাজারজাত করার আগে। রবীন্দ্রভারতী একাধিকবার দেবব্রত বিশ্বাসের গানকে অনুমোদন দেয় নি বিচ্যুতি এবং অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অজুহাত তুলে। এর ফলে, হতাশ হয়ে ১৯৭০ সালের পরে তিনি আর কোনো রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড করান নি। কেনো তাঁর গাওয়া গানকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে একবার তাঁদের চিঠির সাথে রবীন্দ্র সংগীতের সাথে কী কী ধরণের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে তার একটা তালিকা দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। সেই তালিকাটা এরকম।
রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী যন্ত্রঃ
১। (ক) এস্রাজ, বাঁশী, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা বা অর্গান।
(খ) পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা।
২। প্রতি গানের মূল আবেগটির প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুকূল আবহসংগীত যন্ত্রে রচনা করে, আরম্ভে এবং যেখানে গায়কের কণ্ঠের বিশ্রাম প্রয়োজন, সেখানে তা প্রয়োগ করতে হবে।
৩। যে কটি যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, গানের সঙ্গে তার সব কটিকেই বাজান যেতে পারে কিন্তু কোন যন্ত্রটি কিভাবে আবহ সংগীতে বাজবে সংগীত রচয়িতাকে তা স্থির করতে হবে গানের প্রতি ছত্রের ভাবটির প্রতি লক্ষ্য রেখে।
৪। আবহ সংগীত গায়কের গলার শব্দকে ছাড়িয়ে যাবে না কখনো। কণ্ঠের বিশ্রামের সময় বা গান আরম্ভের পূর্বে যখন যন্ত্রে আবহসংগীত বাজবে তখনও এই দিকটার প্রতি বাজিয়েরা যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখেন।
৫। তালযন্ত্রের সঙ্গতের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তালের ছন্দ বা বোল যেন কথার ছন্দ ও লয়ের বিপরীত না হয়। অর্থাৎ দ্রুত ছন্দের গানে যেমন দ্রুত লয়ের ঠেকার প্রয়োজন ঢিমালয়ের গানে তেমনি ঢিমালয়ের ঠেকার প্রয়োজনকে মানতেই হবে।
৬। কথার উপরে ঝোঁক দিয়ে অনেক গান গাইতে হয়। এই সব গানের সঙ্গে সঙ্গতের সময় তালবাদ্যেও কথার ছন্দের অনুকূল ঝোঁক প্রকাশ পাওয়া দরকার। তাতে গানের ভাবের সঙ্গে কথার ভাবের সঙ্গতি থাকে।
রবীন্দ্রভারতীয় মিউজিক বোর্ডের এই সব হাস্যকর নিয়মকানুনকে মানতে পারেন নি দেবব্রত বিশ্বাস। সে কারণে সিদ্ধান্ত নেন যে, রবীন্দ্রসংগীত আর রেকর্ড করবেন না। রবীন্দ্রপূজারী এবং রবীন্দ্র শুদ্ধবাদীদের এই বাদ্যযন্ত্রের নিয়মাবলী যে কতটা হাস্যকর যে বিষয়টা দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর আত্মজীবনী ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত এ এভাবে তুলে ধরেছেন-
রেকর্ডে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় উপর্যুক্ত নির্দেশগুলি কে বা কারা দিয়েছেন আমি জানি না। তবে বেশ সহজেই বোঝা যায় যে, যিনি বা যাঁরা ওই নির্দেশগুলি জারী করেছেন তাঁর বা তাঁদের রেকর্ডিঙের ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই। উপরে উল্লিখিত ৪নং নির্দেশটি পড়লে মনে হবে রেকর্ড করার সময় যাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজান, আবহসংগীত বাজাবার সময় বাজিয়েদের ওপরেই সমস্ত দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। উপর্যুক্ত নিয়ামকরা জানেন না যে এই ব্যাপারে বাদ্যযন্ত্রীদের কোনো দায়িত্বই নেই। রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার তাঁর ঘরে বসে রেকর্ডিং যন্ত্রের নানা ধরনের চাবিকাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কণ্ঠের এবং বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজগুলি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রয়োজন হলে ইঞ্জিনিয়ার ইশারা করে অথবা নিজে এসে নির্দেশ দিয়ে যান। ৫নং নির্দেশটিতে তালযন্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তা পড়ে মনে হবে সেগুলি খুব বিশেষ চিন্তাপ্রসূত নয়। তালযন্ত্র বিশেষ করে তবলা বাজাবার ব্যাপারটি অত্যন্ত জটিল এবং খুব সূক্ষ্ণ অনুভূতির ব্যাপার। তাই হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানী যখন এই চিঠিগুলি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন তখন ভেবেছিলাম এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য বা করাই ভাল। তাছাড়া রবীন্দ্রসংগীত আর রেকর্ড করবো না বলেই স্থির করেছিলাম।
এই বিশুদ্ধবাদীরা কিছু জানুক বা না জানুক, একটা জিনিস খুব ভাল করেই তাঁরা জানে। তা হচ্ছে যে, কেমন করে তাঁদের দেবতাতুল্য মহামানবের ঐশ্বর্য এবং সম্পদকে অবিকৃত এবং অক্ষুন্ন রাখা যায়। তাতে করে দেবব্রত বিশ্বাসের মত দুইচারজন রবীন্দ্রসংগীত না গাইলেও কিছু এসে যায় না তাঁদের।
কয়েক বছর আগে ব্যাণ্ড সংগীত শিল্পী মাকসুদ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সহযোগে রবীন্দ্রনাথের একটা গান “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়” এই গানটি নিজস্ব ঢং এ ফিউশন বানিয়ে গেয়েছিলেন। তখন রবীন্দ্রপুজারীরা, যারা রবীন্দ্রনাথকে নশ্বর মানব থেকে অবিনশ্বর ঈশ্বরে উপনীত করে ফেলেছেন, তাঁরা রবীন্দ্র সংগীতের জাত গেল, জাত গেল বলে শোরগোল তুলেছিলেন। কোরানের আয়াতের সামান্য বিচ্যুতি যেমন মোল্লাদের সহ্য হয় না, নারী নীতির বিরুদ্ধে হুঙ্কার পেড়ে রাস্তায় নামেন আমিনী গং, ঠিক একই রকমভাবে আমাদের দেশের রবীন্দ্রমোল্লারা রাস্তায় নেমেছিলেন ‘পবিত্র রবীন্দ্র সঙ্গীতের’ শুদ্ধতা রক্ষার জন্য। শুদ্ধবাদীদের মধ্য থেকে ওয়াহিদুল হক পত্রিকায় কলম ধরেছিলেন মাকসুদের পিণ্ডি চটকানোর জন্য। অথচ গান নিয়ে নিরন্তর গবেষণা, গানকে ভেঙেচুরে সাজানো বহমান সংস্কৃতিরই অংশ। পশ্চিমা বিশ্বে রক এণ্ড রোল, রেগে, ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিক নিয়ে নিরন্তর ভাঙ্গাচোরা চলে। এলভিস প্রিসলী কিংবা চাক বেরি একসময় যে ঢং এ রক এন্ড রোল সংগীত পরিবেশন করতেন, আজকের শিল্পীরা সেভাবে সংগীত পরিবেশন করেন না। তারা বরং পুরোন গানগুলোকে নিজদের মতো করে ঢেলে সাজান, প্রয়োগ ঘটান নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের, কখনো নতুন তাল এবং ছন্দেরও। এতে করে কারো জাত যায় না, কারো মাথায় আকাশও ভেঙে পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের রবীন্দ্র-মোল্লারা রবীন্দ্রনাথকে রাখতে চান সমস্ত গবেষণা এবং কাটাছেড়ার উর্ধ্বে। বেদ পাঠ করার অপরাধে মহাত্মা রাম যেমন একসময় শিরোচ্ছেদ করেছিলেন নীচু জাতের শম্বুকের তার তথাকথিত ‘রাম রাজ্যে’, ঠিক তেমনি সমস্ত রবীন্দ্রপূজারীরা শিরোচ্ছেদ করার ফতোয়া দিতে চান কারো মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের সামান্যতম বিচ্যুতি লক্ষ্য করলে। রবীন্দ্রনাথকে যেন রাখতে হবে মাথার পরে একেবারে দেবতার আসনে বসিয়ে, দিবানিশি কেবল পায়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে, আর করজোড়ে স্তব করে। মাকসুদের ফিউশন করার প্রচেষ্টাটি ভাল ফলাফল বয়ে এনেছিলো নাকি খারাপ, সেটি আমাদের প্রশ্ন নয়, তাকে সমালোচিত হতে হয়েছিলো রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে কোন রকম নাড়াচাড়া করার চেষ্টার কারণেই। মাকসুদও থেমে থাকেন নি। এর পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন তিনিও কলাম লিখে। মাকসুদ বলেছিলেন, ’এদেশ আগে রবীন্দ্রনাথকে বুঝুক তারপর তর্ক করবো। এদেশে এখনো রবীন্দ্র সংগীত মানেই হারমোনিয়াম ধরে প্যা প্যা…. অথচ অবাক বিষয় শান্তিনিকেতনে হারমনিয়াম ঢুকতে পারেনা।’ সচেতন পাঠক হয়তো খেয়াল করেছেন যে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের দেওয়া ‘রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী’ বাদ্যযন্ত্রের তালিকায় আসলেই হারমোনিয়াম নেই, সেক্ষেত্রে গিটার, কি-বোর্ড, স্যাক্সোফোনের অনুপ্রবেশ তো দূর অস্ত!।
রবীন্দ্রনাথ বাইশ শ’-র উপরে গান লিখেছেন। বাঙালিরা গভীর ভক্তিভরে, সশ্রদ্ধ চিত্তে এগুলোকে শুনে থাকে, গেয়ে থাকে। এর ভাবসম্পদকে আবিষ্কার করা চেষ্টা করে। পরম পূজনীয় ভেবে এর বিশুদ্ধতা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু এরাই জানে না যে, রবীন্দ্রনাথের এই বাইশ শ’ গানের অনেকগুলোই বিশুদ্ধ নয়, রবীন্দ্রনাথের মৌলিক গান নয়। অন্য কোনো গানের সুর থেকে সরাসরি নকল করা বা সেগুলোকে ভেঙে চুরে রবীন্দ্রনাথ নিজের মত করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান আছে বিদেশী সুর থেকে নেয়া, অনেক গান আছে লোকসংগীত থেকে নেয়া, অনেক গান আছে বাউল সুর থেকে নেয়া। নীচে একটা বিদেশী গান দিচ্ছি। একটা খুব জনপ্রিয় রবীন্দ্র গানের সুর নেয়া হয়েছে এই গানটা থেকে। যাঁরা রবীন্দ্র সংগীত শোনেন, খুব বেশি দেরি হবে না তাঁদের সুরটাকে সনাক্ত করতে। যাঁরা পারবেন না তাঁদের জন্য রবীন্দ্রনাথের গানটাও দিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার নীচেই।
পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত সাহিত্যিক বা সংগীত স্রষ্টাই অন্যের সৃষ্টি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়। এতে দোষের কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথও তাঁর ভক্তদের ভাষায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তবে, হুবহু অন্যের সৃষ্টিকে নকল করা অর্থাৎ সরাসরি কুম্ভিলকতা বা চৌর্যবৃত্তি কীভাবে ‘অনুপ্ররেরণা যোগ্য’ হয় সেটা অবশ্য আমরা জানি না। রবীন্দ্রনাথের এই সমস্ত “অনুপ্রাণিত” গানকে ভাঙা গান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীর রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গানের একটা তালিকা করেছিলেন। সেখানে তিনি ২৩৪টি ভাঙা গান হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ইন্দিরা দেবীর বক্তব্যকে যদি সত্যি বলে ধরে নেই, তাহলেও দেখা যাচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট গানের এক দশমাংশেরও বেশি অন্যের সৃষ্ট সুর থেকে “অনুপ্রাণিত”। যে রবীন্দ্রনাথে নিজেই অন্যদের সুরকে ভেঙেচুরে বা অবিকলভাবে নকল করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথের অনুসারীদের তাঁর গানকে অবিকৃত রাখা বা বিধিনিষধের বেড়াজাল দিয়ে বিশুদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা যে অনুচিত এবং অভব্য কাজ, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।
রবীন্দ্রনাথ এই রকম অনুপ্রাণিত হতে গিয়ে বহু দেশি-বিদেশি সুরস্রষ্টার সৃষ্ট সম্পদকে নিজে ব্যবহার করেছেন। হিন্দি ছবির কিছু নির্লজ্জ সুরকারেরা যেমন অন্যের সুর বেমালুম ‘আত্মীকরণ’ করেন (প্রীতম যেমন মেরে দিয়েছেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গানের সুর), ব্যাপারটা সেরকমেরই। এঁরা বিগত হয়েছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথের অন্যায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এই অনুপ্রাণিত হওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে আসুন একটা গান শুনি। এই গানটির সুরকে সনাক্ত করতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কোনো মানুষেরই বিন্দুমাত্র সমস্যা হবার কথা নয়। কারণ, এই সুরটা আমরা অহরহ শুনি, গভীর আবেগে এই সুরের গাওয়া গানটার সাথে গলা মেলাই।
অবাক হচ্ছেন, বিস্মিত হচ্ছেন, তাই না? ভাবছেন কার এত বড় দুঃসাহস যে, এরকম করে অবিকল রবীন্দ্রনাথের গানের সুরটাকে, আমাদের জাতীয় সংগীতটাকে নকল করেছে। কিন্তু আপনাদের এই অবাক এবং বিস্ময়ের মাত্রা অনেকগুণ বেড়ে যাবে যখন জানবেন যে আমি কোথায় পাবো তারে এই গান রচিত এবং সুর করা হয়েছিল আমার সোনার বাংলা গানটি রচিত এবং সুর করার অনেক আগে। চাপাবাজি নয়, মিথ্যাচার নয়, সত্যের অপলাপ নয়। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। আমি কোথায় পাবো তারে গানটির রচয়িতা এবং সুরকার একজন হতদরিদ্র ডাক পিওন। গগন হরকরা তাঁর নাম। লালনের সমসাময়িক, কুষ্টিয়ার এক বাউল তিনি। কীভাবে গগন হরকরার সুরকে নিজের নামিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালিয়ে দিয়েছিলেন, আসুন সে বিষয়টা দেখি আমরা।
রবীন্দ্রনাথদের পৈত্রিক জমিদারী ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী দেখাশোনার জন্য এখানে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চারপুরুষ ধরে তাঁদের জমিদারীর প্রজাদের উপর পীড়ন চালিয়েছেন জোড়াসাকোর এই ঠাকুর পরিবারটি। তিনিও তাঁর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কবি হিসাবে তিনি যত রোমান্টিকই হোন না কেন, বৈষয়িক বিষয়ে তাঁর স্বার্থবুদ্ধি ছিল একেবারে টনটনে। ১৮৯৪ সনে রবীন্দ্রনাথ চাষীদের খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, খাজনা আদায়ও করেছিলেন [শচীন্দ্র অধিকারি, শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ পৃঃ ১৮, ১১৭]। নতুন জমিদারী ক্রয় করেছিলেন [মার্টিন কোম্পানী থেকে নদীয়ার ডেব্রাকোল ক্রয়]। করবৃদ্ধির ও বলপ্রয়োগে কর আদায়ের ফলে প্রজাবিদ্রোহ ঘটলে তাও তিনি সাফল্যের সঙ্গে দমন করেন। বিশশতকের বিশ দশকে প্রজাপীড়ক শোষক রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে শিলাইদহের ইসলাইল মোল্লার নেতৃত্বে দু’শঘর প্রজার বিদ্রোহ এ সূত্রে উল্লেখ। [অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, দেশ শারদীয়া, ১৩৮২।]
তাঁর এই বুর্জোয়া, শোষণপ্রিয় মানসিকতার ছাপ পড়েছে তাঁর লেখালেখিতেও। রবীন্দ্রনাথের সীমাহীন রচনাতে সাধারণ মানুষ প্রায় অনুপস্থিতই বলা চলে। সামান্য যেটুকু এসেছে, সেটা নিজেকে গরীবের পক্ষের লোক হিসাবে প্রমাণের তাগিদ থেকেই এসেছে, আন্তরিকতা থেকে নয়। আজীবন শোষক হয়ে শোষিতের পক্ষে কলম ধরাটা একটু কষ্টকরই বটে। আহমদ শরীফ তাঁর ‘রবীন্দ্র সাহিত্য ও গণমানব’ প্রবন্ধে লিখেছেনঃ
রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তরের গভীরে প্রোথিত সামন্ত-বেণে-বুর্জোয়াচেতনা ও স্বার্থবোধ শেষাবধি পরিহার করতে সমর্থ হননি। একজন কারখানা মালিক যেমন তার শ্রমিকদের দাবি আদায়ের মিছিলে সামিল হতে পারে না, সামন্ত বেণে-বুর্জোয়া-জমিদার রবীন্দ্রনাথও তেমনি পারেননি দুস্থ-দুঃখী-চাষী-মজুরের শোষণ-পীড়ণ জর্জরিত জীবনের আলেখ্য আঁকতে। এ হচ্ছে শ্রেণীক ও ব্যক্তিক স্বার্থ চেতনার বন্ধন। নইলে যে রবীন্দ্রনাথ প্রমত্তা পদ্মায় জেলে-মাঝিকে ডুবে মরতে দেখেছেন, পদ্মার যমুনার তীর ভাঙনে হাজার হাজার গরিব চাষী-মজুরকে নিঃস্ব হতে উদ্বাস্তু হতে দেখেছেন, দেখেছেন স্বচ্ছল চাষীকে সপরিবারে পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে, প্রত্যক্ষ করেছেন দুর্ভিক্ষে অনাহারে-অপুষ্টিতে-তুচ্ছ রোগে ভুগে ভুগে অকালে অপমৃত্যু কবলিত হতে হাজার হাজার নিঃস্ব-নিরন্ন-নিরক্ষর-নির্বিরোধ মানুষকে। আরো দেখেছেন তাঁরই হুকুমে বা সম্মতিতে তাঁরই গোমস্তাদের খাজনার দায়ে তাঁরই গরিব প্রজার ঘটি-বাটি ক্রোক করতে, প্রজাকে ভিটে-ছাড়া করতে, বারবার দেখেছেন ঝড়-খরা-বন্যা তাড়িতি মানুষের চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অপমৃত্যু – সেই রবীন্দ্রনাথের বিপুল-বিচিত্র রচনায় এদের নাম-নিশানা মাত্র নেই কেন! বোঝা গেল, শোষক তিনি যত বড়ো মহাপুরুষই হোন, শোষিতের পক্ষে লড়াই দূরে থাক, তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশেও অনীহ।
শুধু সহানুভূতি প্রকাশে অনিচ্ছুকই নয়, নিজেদের শোষণ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন তিনি। ফলে, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। জমিদারী প্রথা যে প্রজা মঙ্গলের জন্য উত্তম সেটাকেই বিশ্বাস করতেন তিনি। সেকারণেই বলেছেন, “জমিদারী উঠে গেলে গাঁয়ের লোকেরা জমি নিয়ে লাঠালাঠি কাড়াকাড়ি ও হানাহানি করে মরবে। [প্রমথ চোধুরী – রায়তের কথা]
রবীন্দ্রনাথের প্রজা পীড়নের কাহিনি কিছুটা জানা যায় আহমদ শরীফের রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথের প্রজাপীড়ন সম্পর্কে জানার জন্য তিনি তাঁর ছাত্র আবুল আহসান চৌধুরীকে চিঠি লিখে তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছিলেন। আহমদ শরীফের চিঠির উত্তরে আবুল আহসান চৌধুরী এ বিষয়ে নানা তথ্য দিয়ে একটা পত্র লেখেন। আহমদ শরীফ তাঁর প্রবন্ধের তথ্য নির্দেশ অংশে সেই চিঠিটা হুবহু প্রকাশ করেছিলেন। সেই চিঠিটা এরকমঃ
শ্রদ্ধাভাজনেষু
স্যার, সালাম জানবেন। অসুস্থতার জন্যে আপনার চিঠির জবাব দিতে কয়েকদিন দেরী হলো। অনুগ্রহ করে মাফ করবেন আমাকে।
ঠাকুর জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকার কোন বর্ষ কোন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তা আমার সঠিক জানা নেই। আমাদের কাছে গ্রামবার্তার যে ফাইল আছে, তাতে এই সংবাদ নেই। প্রজাপীড়নের এই সংবাদ-সূত্রটি পাওয়া যায় কাঙাল-শিষ্য ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র একটি প্রবন্ধে। কাঙালের মৃত্যুর পর অক্ষয় কুমারের এই প্রবন্ধটি সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে মৈত্রেয়বাবু কাঙাল হরিনাথের সংবাদপত্র পরিচালনায় সততা ও সাহসের পরিচয় প্রসঙ্গে প্রজাপীড়নের সংবাদ ‘গ্রামবার্তায়’ প্রকাশের উল্লেখ করেন। ঠাকুর-জমিদারদের অত্যাচার সম্পর্কে হরিনাথ নিজে অক্ষয়কুমারকে যে পত্র লেখেন, তিনি এই প্রবন্ধে তা উদ্ধৃত করে দেন। এই প্রবন্ধ প্রকাশের ফলে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ রুষ্ট ও অপ্রসন্ন হন এবং তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়কে বলে অক্ষয়কুমারের ‘রানী ভবানী’ গ্রন্থপ্রকাশের অর্থ-সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করান। কাঙাল-পুত্র সতীশচন্দ্র মজুমদার সূত্রে জানা যায়, ঠাকুর জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ-প্রকাশের অপরাধে (?) তাঁরা লাঠিয়াল-গুণ্ডা লাগিয়ে কাঙালকে শায়েস্তা করার ব্যবস্থা নেন। এইসব ঘটনা ঠাকুর জমিদারীর ইতিহাসের দুঃখজনক কালো অধ্যায়।
এ ছাড়া অন্যত্র যেমন মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’ পত্রিকায়, ঠাকুর-জমিদাররা যে প্রজাসাধারণের দুঃখ-কষ্ট মোচনে তেমন তৎপর ও মনোযোগী ছিলেন না তার ইঙ্গিত আছে। ঠাকুরবাবুরা তাঁদের জমিদারী এলাকায় গো-কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এই নির্দেশ অমান্যকারীদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়। শিলাইদহ ঠাকুর-জমিদারীর এই ভূস্বামী-স্বার্থরক্ষার কৌশল-ব্যবস্থা ও প্রজাপীড়নের ঐতিহ্য চারপুরুষের, দ্বারকানাথ থেকে সুরেন্দ্রনাথ পর্যন্ত। কাঙাল হরিনাথের দিনলিপিতেও এর ইঙ্গিত মেলে।
শিলাইদহ জমিদারীতে রবীন্দ্রনাথের আমলেও কিছু অবাঞ্ছিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। চরের মুসলমান প্রজাদের ঢিঢ করবার জন্যে নমঃশুদ্র প্রজা এনে বসতি স্থাপনের সাম্রদায়িক-বুদ্ধিও রবীন্দ্রনাথের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। এ-ছাড়া পুত্র রথীন্দ্রনাথের নিরীক্ষামূলক শখের কৃষি-খামারের প্রয়োজনে গরীব মুসলমান চাষীর ভিটেমাটি দখল করে তার পরিবর্তে তাকে চরের জমি বরাদ্দের মহানুভবতাও রবীন্দ্রনাথ প্রদর্শন করেছিলেন। এ-সব কথা ও কাহিনী উক্ত জীবনীকারদের যত্ন ও সৌজন্যে চাপা পড়ে গেছে। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরতে গেলে অনেককেই হয়তো সাম্প্রদায়িক বা রবীন্দ্র-বিদ্বেষী শিরোপা, নয়তো সুভো ঠাকুরের (বিস্মৃতিচারণার প্রতিক্রিয়া দ্রষ্টব্য) মতো ধিক্কার ও তিরস্কার অর্জন করতে হবে।
ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা-পীড়নের বিষয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের জীবনের নিপুণ ভাষ্যকার শ্রীশচীন্দ্রনাথ অধিকারীকে (তিনি নিজে শিলাইদহবাসী ও ঠাকুর-এস্টেটের কর্মচারী ছিলেন এবং এই বিষয়গুলো জানতেন) চিঠিপত্রে নানা প্রশ্ন করে ছিলাম। তিনি এ-সব জিজ্ঞাসার জবাব এড়িয়ে ও অস্বীকার করে এই ধরণের কৌতুহলকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছিলেন।
উপরি-বর্ণিত বিষয়গুলোর কিছু কিছু তথ্য আমার সংগ্রহে আছে। আপনার প্রয়োজন হলে সেগুলো পাঠাতে পারি। আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় রইলাম। এই বিষয়ে আপনি কোন প্রবন্ধ লিখেছেন কী না জানিয়ে বাধিত করবেন। আমার গবেষণার কাজ (‘মীর মশাররফ হোসেনের শিল্পকর্ম ও সমাজচিন্তা’) চালিয়ে যাচ্ছি। এ বছরের মধ্যে থিসিস জমা দেবো এমন আশা আছে। আমার লেখার কাজে আপনার প্রশ্রয় ও প্রেরণার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আপনার জবার প্রত্যাশায় রইলাম। আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শেষ করি।
স্নেহসিক্ত,
আবুল আহসান চৌধুরী
এই শিলাইদহ, শাহজাদপুরে জমিদারী দেখাশোনা করতে গিয়েই বাউলদের সংস্পর্শে আসেন রবীন্দ্রনাথ। বাউলদের গান শুনে সেগুলোর ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। শুধু মুগ্ধই নন, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল গানের সুর রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের গানের মধ্যে নিয়ে আসেন। তাঁর নিজের ভাষাতেই :
আমার লেখা যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল-পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল-সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। (শান্তিদেব ঘোষ- রবীন্দ্রসংগীত)
এখানেই গগন হরকরার সাথে পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের। গগন হরকরার জন্ম শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রামে। কাজ করতেন ডাক বিভাগে ডাক হরকরা হিসাবে। তিনি একজন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই গগন হরকরাকে কাছারিতে ডেকে নিয়ে আসতেন গান শোনার জন্য। গগন হরকরাও সানন্দে গান শুনিয়ে যেতেন তাঁদের জমিদারবাবুকে। গ্রামের এই সহজ সরল বাউল তখনও ভাবেন নি জমিদারবাবুর মনের মধ্যে কী রয়েছে। গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ এই গানটার অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখেন আমার সোনার বাংলা বলে। এই অবিশ্বাস্য কথাটা যাঁদের বিশ্বাস হচ্ছে না, তাঁদের জন্য গগন হরকরার আমি কোথায় পাবো তারের গীতি কবিতাটা এখানে তুলে দিচ্ছি, সেই সাথে আমার সোনার বাংলার গীতিও। আপনারা মিলিয়ে দেখতে পারেন।
আমি কোথায় পাব তারে
আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে –
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানুস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত
আমার সোনার বাংলা আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে
ঘ্রাণে পাগল করে–
(মরি হায়, হায় রে)
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা খেতে,
(আমি) কি দেখেছি মধুর হাসি।।
কী শোভা, কী ছায়া গো,
কী স্নেহ, কী মায়া গো–
কী আঁচল বিছায়েছ
বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।।
মা তোর মুখের বাণী
আমার কানে লাগে
সুধার মতো–
(মরি হায়, হায় রে)
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে
আমি নয়ন জলে ভাসি।।
শুধু এই গানের কাঠামো অনুসরণে কবিতা রচনা করেই ক্ষান্ত হন নি তিনি। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় আমার সোনার বাংলাতে হুবহু গগন হরকরার সৃষ্ট সুর বসিয়ে দেন। আমাদের জানামতে গগন হরকরা সেই সময় জীবিত থাকার পরেও তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বা তাঁকে জানানোর প্রয়োজনটুকুও তিনি বোধ করেন নি। এ যেন তাঁর নিজের লিখিত দুই বিঘা জমির সেই জমিদারের মত। রাজা হয়েও ‘যার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’। এত বড় একজন কবি এবং সংগীতকার হয়েও গ্রামের একজন দরিদ্র ব্যক্তির মেধাপ্রসূত সম্পদকে চুরি করতে তাঁর বিন্দুমাত্রও বাধে নি। যোগাযোগের অপ্রতুলতা এবং এখনকার মত তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেই সময়ে না থাকার কারণে কারো পক্ষেই এত বড় একটা চুরি ধরা সম্ভবপর হয় নি। পরে যখন বিষয়টা জানা গেছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ পরিণত হয়ে গিয়েছেন মহাকাশস্পর্শী এক মহীরুহে। তাঁর বিশাল এক স্তাবকবাহিনী তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই স্তাবকবাহিনী তাঁদের পূজনীয় ঠাকুরকে বাঁচানোর জন্য গালভরা এক শব্দ ‘অনুপ্রেরণা’কে বেছে নিয়েছেন, ভাঙা গানের ভরাট ঢালের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে নিয়ে গিয়েছেন শতাব্দীর সেরা চৌর্যবৃত্তিকে।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের অনেক কিছুই মৌলিক নয়, বরং বলা যায় বিদেশী সাহিত্যের ছায়া-অবলম্বনে লেখা । যেমন, গবেষক প্রতাপনারায়ণ বিশ্বাস তার লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের রহস্য গল্প ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ নামের একটি বইয়ে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চারটি অতি পরিচিত গল্প -যেমন মহামায়া, গুপ্তধন, নিশীথে, এবং সম্পত্তি সমর্পণ -- বিখ্যাত মার্কিন রহস্য গল্পলেখক এডগার অ্যালান পো’র সে সময়কার চারটি গল্প থেকে ‘অনুপ্রাণিত’। ফরাসি লেখক তেওফিল গতিয়ের লেখা Le Pied de Mome (১৮৬৬) গল্পের প্রভাব আছে তার বিখ্যাত গল্প ক্ষুধিত পাষাণের ওপর; আর রক্তকরবীর ওপর আছে সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিণ্ডবার্গের ‘A Dream Play’-এর ছাপ [প্রতাপনারায়ণ বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী : তত্ত্ব ও তথ্য, অনুষ্টুপ, ১৯৮৯]। কিন্তু এগুলোর ক্ষেত্রে কেবল ‘বিদেশী গল্পের ছায়া’ থাকায় সরাসরি প্লেইজারিজমের অভিযোগ থেকে না হয় তাকে অব্যাহতি দেয়া যায়, কিন্তু হতদরিদ্র গগন হরকরার সাথে জমিদারবাবু যা করেছিলেন তার কোন তুলনা নেই। ২০০৬ সালে বিবিসি সর্বকালের সেরা বাংলা গান কোনটি তাঁর একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে বিপুল ভোট পেয়ে সেরা গান হয়েছিল আমার সোনার বাংলা। অথচ কী আশ্চর্য! সর্বকালের সেরা গানের সুরস্রষ্টা গগন হরকরাকে আমরা চিনি-ই না, চিনি একজন কুম্ভিলক রবীন্দ্রনাথকে। এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে। এই গানটা আবার আমাদের জাতীয় সংগীতও। শত শত বছর ধরে এটা গাওয়া হবে, অনাগত দিনের বাংলাদেশিরা সকৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে রবীন্দ্রনাথ নামের একজন মহান কবি এবং সংগীতকারকে, এরকম একটি অসাধারণ শ্রুতিমধুর গানকে সৃষ্টি করার জন্য। এর পিছনের বঞ্চনার ইতিহাস, চুরির ইতিহাস ঢাকা পড়ে যাবে অন্ধ পূজারীদের পরম মিথ্যায় এবং রবির কিরণের তীব্র কষাঘাতে। বেচারা গগন হরকরা। তাঁর সৃষ্ট সম্পদ অন্যে চুরি করেছে বলে যে হতাশামাখানো দীর্ঘশ্বাসটুকু ফেলবেন, তাঁর সুযোগও নেই। জানতেই পারেন নি যে, নিজের অজান্তেই সর্বকালের সেরা বাংলা গানের সুর সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন তিনি। আর সেই অনন্য সুরটাকে নির্দ্বিধায় মেরে দিয়েছিল, তাঁর গানের কথাকে অনুকরণ করে কবিতা লিখেছিল, তাঁদেরই গানপাগলা জোড়াসাঁকোর জমিদারবাবু ছোটো ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন প্রায় সত্তর বছর আগে। তাঁকে নিয়ে যে অনন্ত আবেগ তৈরি হয়েছিল, সেই আবেগকে অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট সময় এটি। তারপরেও সেই আবেগ যায় নি। তবে, একেবারে না গেলেও কমে আসছে ঠিকই। দ্রুতগতিতে না হলেও তাঁর ভক্ত অনুরক্তের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এমন একদিন আসবে যখন তাঁর ভক্ত, স্তাবক বলতে কেউ-ই থাকবে না। তখন নতুন প্রজন্মের মানুষ নতুনভাবে রবীন্দ্র মূল্যায়ন করতে পারবে। সেই মূল্যায়ন হবে নিরপেক্ষ। ভাল মন্দ কোনো ধরনের তথ্যকেই চেপে রাখবে না নতুন মানুষেরা। অনাসক্ত এবং অভ্রভেদী নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করবে সবকিছুকে। কোনো তথ্যকেই আবেগের রসে রসসিক্ত করে বিকৃত করার চেষ্টা করবে না তারা। সেই দিন শুধু আমাদের জন্যই নয়, রবীন্দ্রনাথের জন্যও শুভ হব্ মঙ্গলময় হবে। আসল রবি ঠাকুরকে চেনা হবে তখন। সম্মানিত করা হবে প্রকৃত মানুষটিকে, তাঁর সঠিক সৃষ্টিকে।
পশ্চিমা বিশ্বে অ্যারিস্টটলেরও একসময় এরকমই অনেকটা দেবতার আসন ছিলো। তাঁর চিন্তা ভাবনা, দর্শন নীতি সব কিছুকেই মানুষ বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিতো। সমাজে তার প্রতিপত্তি ছিলো বিশাল, অনুরাগীর সংখ্যাও ছিলো বিপুল। তার বাণী সমাজে গৃহীত হতো অনেকটা যেন ‘ঈশ্বরের বাণী’র মতোই। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে চারটি মৌলিক পদার্থ দিয়ে, মাটি, বায়ু, আগুন এবং পানি দিয়ে, অতএব সেটাই ঠিক। অ্যারিস্টটল ভেবেছিলেন, সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘরে। অতএব সেটাই হতে হবে ঠিক। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ভারী বস্তু আর হাল্কা বস্তু উপর থেকে ছেড়ে দিলে সব সময় ভারী বস্তুই নীচে পড়বে। অতএব সেটাকেই ঠিক হতে হবে। ঠিক ঠিক ঠিক!
কিন্তু জামানা বদলায়। দেবতারও পতন হয়। বিশেষতঃ গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীদের হাত ধরে পর্যবেক্ষণমূলক পদার্থবিজ্ঞানের উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ বুঝতে পারলো অ্যারিস্টটলের অনেক কথাই আসলে ভ্রান্ত। তার চিন্তা চেতনা পশ্চাৎগামী, তার বহু ভাবনা অবৈজ্ঞানিক শুধু নয় রীতিমত হাস্যকর। আসলে জ্ঞান বিজ্ঞান যত এগিয়েছে ততই কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে প্লেটো এবং এরিস্টটলের ভুতকে ঘার থেকে নামিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন পড়েছিলো। বার্ট্রান্ড রাসেল তার হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘Almost every serious intellectual advance has had to begin with an attack on some Aristotelian doctrine; in logic, this is still true at the present day”। অর্থাৎ, সহজভাবে বললে আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস আসলে এরিস্টটলকে হটানোরই ইতিহাস। সমালোচকেরা চাঁছাছোলা ভাবেই বলেছিলেন -- ‘এরিস্টটল আসলে যা শিখিয়েছিলেন, তা সবই ছিলো ভুল’। এ ধরণের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করতেও দ্বিধান্বিত হননি পাশ্চাত্যের সমালোচকরা এরিস্টটলকে নিয়ে। অ্যারিস্টটলের মতো ব্যক্তিত্বকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছিলেন বলেই সভ্যতা এগুতে পেরেছে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও এটি করা দরকার। আমাদের এগোনোর স্বার্থেই এটি দরকার। সেজন্যই মুক্তমনা লেখকদের সংকলন ‘স্বতন্ত্র ভাবনা’র (চারদিক, ২০০৮) ভূমিকার একটি অংশে লেখা হয়েছিলো -
‘চিন্তার দাসত্ব’-এর ক্ষেত্রে কেবল মৌলবাদীদের একচ্ছত্র আধিপত্য তা ভেবে নিলে কিন্তু ভুল হবে। ভ্রান্ত চিন্তা, কুপমুন্ডুকতা আর অন্ধবিশ্বাস কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আজকের বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল নামধারী বুদ্ধিজীবী সমাজকেও। কার্ল মার্ক্স, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী রামকৃষ্ণ, মাদার টেরেসা, শেখ মুজিবুর রহমান, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বড় বড় নামগুলো তৈরী করেছে ইতিমধ্যেই তৈরী করে ফেলেছে কিছু অযাচিত মিথ; জন্ম দিয়েছে শত সহস্র স্তাবকের। এ সমস্ত মনীষীদের আনেকেই অনেক ক্ষেত্রেই প্রগতিশীল চিন্তা করেছেন সত্যি, কিন্তু সেই সাথে আবার তৈরী করেছে কিছু অন্ধবিশ্বাসীদের যারা মনে করেন রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্বামী বিবেকানন্দের বাণী মানেই অভ্রান্ত সত্যি। তাদের ‘আরাধ্য দেবতাদের’ ন্যুনতম সমালোচনাও তাদের কাছে অসহনীয়। গনহিস্টিরিয়াগ্রস্ত এ সমস্ত স্তাবকদল বোঝে না যে, যুক্তির কাছে ‘ব্যক্তিপূজা’র প্রাবল্য অর্থহীন। রবীন্দ্রনাথের প্লানচেটে বিশ্বাসের ওপর প্লানচেট কিংবা আত্মার অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব নির্ভর করে না। রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীতের ওপর নির্ভর করে প্রমাণিত হয় না পরম ব্রহ্মের অস্তিত্ব। শুধু দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রেই নয়, কখনও কখনও রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের প্রশস্তি করেছেন, ভেবে নিয়েছেন ব্রিটিশ শাসন ছাড়া ভারতবাসীর মুক্তি অসম্ভব। আবার কখনও বা নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তিকে অস্বীকার করে বলেছেন, ‘প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে, বাইরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না।’এধরনের বিশ্বাস কিংবা মন্তব্যগুলোর কোনটিই কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অভ্রান্ততা তুলে ধরে না, বরং প্রমাণ করে যে চিন্তা-চেতনায় রবীন্দ্রনাথেরও সীমাবদ্ধতা ছিলো। একজন প্রকৃত যুক্তিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে ব্যক্তি পূজার উর্ধ্বে উঠে নির্মোহ দৃষ্টিতে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতাকে বিশ্লেষণ করা।
হ্যা, বল্গাহীন আবেগে আর লাগাতার রবীন্দ্র স্তবে গা ভাসিয়ে দিয়ে আত্মহারা না হয়ে বরং রবীন্দ্রনাথের পুরোটুকু জানাটাই বেশি জরুরি। তার ভুলগুলো জানাটা, জানানোটা, স্পষ্ট সমালোচনা করাটা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের সময়ে। যারা মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নারীস্বাধীনতার অগ্রদূত, তাদের দেখানো দরকার নারীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন কুৎসিৎতম একটি প্রবন্ধ ‘রমা বাঈ এর বক্তৃতা উপলক্ষে’ শিরোনামে, যেখানে তিনি প্রকৃতির দোহাই পেড়ে নারীদের ঘরে অবরুদ্ধে রাখতে চেয়েছেন, আর ভদ্র ভাষায় ওয়ার্কিং ওম্যানদের গালাগালি করেছেন। যারা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দারুণ বিজ্ঞানমনস্ক, আইনস্টাইনের চেয়েও বিজ্ঞান ভাল বুঝতেন, তাদের দেখানো দরকার রবীন্দ্রনাথ তার জীবনে কীভাবে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করেছেন, কিভাবে হোমিওপ্যাথির মত অপবিজ্ঞানকে শুধু বিশ্বাসই করেননি, নিজেও হাতুরে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে প্রমথনাথ কিংবা গগন হরকরার মেধাসত্ত্ব লোপাট করেছেন, অনুভব করেননি কোন বিবেকের দংশন। এ ব্যাপারগুলো জানা দরকার। আমরা মনে করি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তৈরি হওয়া অর্ধসত্য এবং অতিকথন নয়, পুরো সত্যটি জানলেই ভক্তদের তৈরি কৃত্রিম প্রাসাদ ছেড়ে তিনি ফিরে আসবেন তাঁর নিজস্ব আলয়ে। সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবেন তিনি সেদিন। আহমদ শরীফকে দিয়ে শেষ করি এই প্রবন্ধ-
রবীন্দ্রনাথসম্পৃক্ত আবেগের কাল অপগত। এখনো যাঁরা আবেগে, ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় কিংবা গৌরবে গর্বে অভিভূত, রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণবসূলভ আবেগে-ভক্তিতে বিগলিত হন, রবীন্দ্রত্রুটি কেউ উচ্চারণ করলেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তাদের মন-বুদ্ধি, রুচি-চিন্তা-চেতনা-বিবেক-বিবেচনার পরিপক্কতায় আস্থা রাখা সম্ভব হয় না। আজ আত্মকল্যাণেই, আত্মবিকাশের ও প্রগতির প্রয়োজনেই ব্যক্তি নিরপেক্ষ ও অনাসক্ত মন নিয়ে যুক্তি-বুদ্ধি-চিন্তা-চেতনা প্রয়োগে সমাজ-সদস্য ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের মন-মেজাজ, সামাজিক-নৈতিক কর্ম ও আচরণ, বিশ্বাস-সংস্কার চালিত রুচি ও স্বভাব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যোগে জানতে ও বুঝতে হবে। (রবীন্দ্র সাহিত্য ও গণমানব)
Turn your valuable web site traffic into income.
Work online and join our free money making affiliate program.
We offer the most pay-per-click rate to help maximize your
cash stream.
Join our income making program absolutely free and 100% risk free.
Imagine running of a something that never failed to provide you with
cash-flow.
A earning money program
so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!
CASH WHILE YOU SLEEP
Earn $1,000... $2,000... $5,000...
Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing.
Our goal is to enable you to make as much as possible from your
site.
We pay monthly, either by check, or through PayPal.
Begin collecting steady partner commissions
Our money making program really
can make you income on the same day.
Start receiving steady partner revenue with
almost no effort at all. This is a serious revenue
opportunity, the chance for you to build a steady, reliable,
long-time profitable business.