Showing posts with label সেমিনার. Show all posts
Showing posts with label সেমিনার. Show all posts

Saturday, October 22, 2011

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

by সলিমুল্লাহ খান

lacan-1932.jpg
১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। লাকাঁ বলিয়াছেন–‘[গঠন] ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোল পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন না যাইতেই শব্দটি লইয়া একপ্রকার হুজুগের চল হইবে।’

এই বক্তৃতার তাৎপর্য পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া স্বল্পশিক্ষিত সাংবাদিকরা মনে করিয়াছিলেন জাক লাকাঁ বড় কঠিন লোক। তাঁহার কথা বুঝিবার সাধ্য
hyppo.jpg…….
জঁ ইপ্পোলিত (১৯০৭–১৯৬৮)
……..
সাধারণের নাই। তাঁহারা আরো বলিয়াছিলেন, লাকাঁ সাহেব যেহেতু ইংরেজি ভাষাটি সঠিক আয়ত্ত করিয়া সারেন নাই, তাই তাঁহার বক্তৃতা দশজনের পক্ষে ভালোমতে হজম করাও সম্ভব হয় নাই। আমরা সেই বক্তৃতার অনুবাদ এখানে পেশ করিতেছি। আমাদের তর্জমার ত্রুটিসহ পাঠকগণ দেখিবেন এই বক্তৃতার বিরুদ্ধে যাহা রটিয়াছে তাহা পুরাপুরি সঠিক নয়। ইহা হয়তো বোঝা যায়। নহিলে বাংলায় অনুবাদ করিবার কথাই উঠিত না।

কেহ কেহ বলিয়াছিলেন বল্টিমোর সম্মিলনে মিলনকথা যাহা উঠিয়াছিল তাহা ভাষা ও মানুষের সম্বন্ধটা কী সেই জিজ্ঞাসা লইয়া। একদল জিজ্ঞাসিয়াছিল–মানুষ ভাষা তৈয়ার করিয়াছে নাকি ভাষাই মানুষ তৈরি করিয়াছে? কেহ কেহ দাবি করিয়াছিলেন ফরাসিদেশ হইতে প্রচারিত ‘গঠনতন্ত্র’ নামক প্রচারণা প্রমাণ করিয়াছে যে ‘মানুষ’ বলিয়া সামান্য কিছু নাই। তাই ‘সহজ মানুষ’ বলিয়া বিশেষ কিছু থাকিবে কি করিয়া? বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যবসায়ী মিশেল ফুকো সাহেবের নামে এই প্রচারণা কিছুদিন গাঢ় চলিয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হইতেছে উপরোক্ত ১৯৬৬ সম্মিলনে মিশেল ফুকো হাজির হয়েন নাই। তবে তর্কের খাতিরে স্বীকার করিতে দোষ নাই ঐ বছর ছাপা তদীয় ‘ভাষা ও বস্তু’ (লে মো এ লে শোজ) বইয়ে তিনিও ঐ রকমের ইশারাই করিয়াছিলেন ।

অথচ তিন বছরের মাথায় ছাপা ‘জ্ঞানগরিমার আদিকথা’ নামক পুস্তকে ফুকো ঘোষণা করিলেন ‘গঠনতন্ত্র’ তথা ‘মনুষ্য বলিয়া কিছু নাই’ কথাটি তাঁহার নহে। এহেন দাবি অলীক ও অসার। তিনি ১৯৬৬ সালের বইয়ে বলিয়াছিলেন ‘মানুষ’ অর্বাচীন এবং তাহার অন্তর্ধান অত্যাসন্ন। অথচ তিনি ১৯৬৯ সনের কেতাবে তিনিই ঘোষণা করিলেন–আমি কিন্তু কোথাও ‘গঠন’ কথাটি ব্যবহার করি নাই। (ফুকো ১৯৭২: ২০০-২০১) সুতরাং ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’ [the structuralist controversy] কথাটি অলীক বুলি মাত্র। তবে শেষমেশ এই ফুকো কবুল করিলেন তিনি নিজেও মনুষ্য সাধকের সাধনার মূল্য খানিক কমাইয়া দেখিয়াছিলেন আর কিছু বাড়াইয়া দেখিয়াছিলেন এই গঠনে সেই গঠনে পাওয়া যুগপৎ মিলের মূল্য ।

কী ঘটিয়াছিল এই সময়? বিশেষ করিয়া বলিতে নৃবিজ্ঞানসাধক হজরত ক্লদ লেভি-স্ত্রোস [Claude Lévi-Strauss] যখন দেখাইয়াছিলেন ফ্রয়েডের
Claude Levi Strauss………
ক্লদ লেভি-স্ত্রোস (জন্ম. ১৯০৮)
……….
আবিষ্কৃত অজ্ঞানের গঠন আর মনুষ্যজাতির মধ্যকার পরিবার ও আত্মীয়তা-সম্পর্কের গঠন একই প্রকার গঠনেরই রকমফের মাত্র, প্রকৃত প্রস্তাবে গঠনতন্ত্র প্রস্তাব পেশ করা হইয়াছিল তখনই । ইহাতে জাক লাকাঁ আরও আহুতি দিলেন–বলিলেন অজ্ঞানের গঠন পরিষ্কার ভাষার মতন । গঠনতন্ত্র সত্য সত্যই গড়িয়া উঠিল।

ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাইলেন যাঁহারা তাঁহারা আগের শতকের দর্শনতত্ত্বজ্ঞানী নিৎসের [Friedrich Nietzsche] দোহাই পাড়িলেন। ফুকো একা নহেন, কিছু পরিমাণে জাক দেরিদা আর বহুল পরিমাণে জিল দল্যুজ [Gilles Deleuze] তাঁহার সঙ্গী হইলেন । ইঁহাদের মধ্যে কিছু প্রভেদ
Deleuze ……..
জিল দল্যুজ (১৯২৫—১৯৯৫)
………
থাকিলেও মূল প্রশ্নে সকলেই একমত হইলেন। তাঁহারা ধরিয়া লইলেন ‘গঠনতন্ত্র’ মানে সহজ মানুষের অন্তর্ধান। তাই ফুকো ও দল্যুজ নিৎসের আশ্রয় লইলেন আর দেরিদা উটপাখির মত ভাষার বালিতে আমুণ্ডুপদনখর ডুবিলেন।

‘গঠনতন্ত্র’ কথাটি শুরু হইতেই এই ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়াইয়া আছে। অনেকেই মনে করিয়াছিলেন ‘গঠন’ (structure) থাকিলে ‘সহজ মানুষ’ (subject) থাকিতে পারে না। অথচ জাক লাকাঁ একেবারে বিসমিল্লাহ হইতেই বলিয়া আসিতেছিলেন এই ধারণাটি আদপেই সঠিক নহে। পক্ষান্তরে তিনি দাবি করিলেন, গঠন ও সহজ মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। গঠনের পরই শুদ্ধ সহজ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, পূর্বে বা বিহনে নহে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ‘সহজ মানুষ’ (subject) কী বস্তু? জাক লাঁকা বলিলেন–‘সহজ মানুষ’ কথাটার অর্থই হইতেছে ‘যাহা সহজ নহে’। কোন জিনিস ভাষার মধ্যে ধরিয়া রাখা সহজ নহে বলিয়া আমরা কি বলিতে পারি জিনিসটুকু নাই? সেই সময় শার্ল মোরাজে (Charles Morazé) নামক জনৈক ইতিহাস বিশারদ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন ‘ঋণাত্মক একের বর্গমূল’ (the root of minus one) কথাটির অর্থ কী? গণিতশাস্ত্রে এই চিহ্নটিকে
Moraze………
শার্ল মোরাজে (১৯১৩–২০০৩)
……….
‘অযৌক্তিক’ [irrational] সংখ্যা বলা হইয়া থাকে। অথচ ইহা তো খোদ গণিতেই কাজ করে। জাক লাকাঁ ইহার বরাত দিয়া বলিলেন প্রাণীস্বরূপ মানুষ বা ‘জীব’ ও ‘সহজ’ মানুষের মধ্যকার পার্থক্যও অনুরূপ বটে। ‘সহজ মানুষ’ কথাটা যদি অযৌক্তিক মনে হয় তবে তাহা ভাষারই দোষ। কিন্তু তাই বলিয়া ইহা কাজ করে না বা ইহা নাই বলা যাইবে না।

জাক দেরিদা এক জায়গায় জাক লাকাঁর কাছে জানিতে চাহিলেন ইহাকে ‘সহজ মানুষ’ বা ‘অজ্ঞান’ বলিবার কারণ কী? ইহার উত্তরে লাকাঁ সভাস্থলে উপস্থিত বিদ্বানমণ্ডলীর কাছে একটি গল্প বলিয়াছিলেন।

একদিন হোটেলে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। জাক লাকাঁর ঘরে একটি টেবিল এক জায়গা হইতে আরেক জায়গায় সরাইবার দরকার হইল। তিনি যাহাকে বলে বেলম্যান বা পিয়ন তাহাকে টেবিলটি সরাইতে বলিলেন। পিয়ন সাহেব
d_jaques_derrida.jpg…….
জাক দেরিদা (১৯৩০–২০০৪)
………
তাহাতে ক্ষেপিয়া গেলেন। বলিলেন, ‘মহাশয়, ইহা আমার কর্তব্য নহে। আপনি দরকার মনে করিলে কথাটা বলিবেন গৃহ-পরিচারক বা হাউস-কিপারকে। গৃহ-পরিচারকগণ আসিয়া কাজটা করিয়া গেলেন বটে, কিন্তু তাহারা মহাত্মা লাকাঁর কোন কথাই শুনিলেন না। তাঁহারা শুদ্ধ স্ব স্ব উপরিওয়ালার আদেশ অনুসারে কাজ সারিয়া চলিয়া গেলেন। ইহা হইতেই–লাকাঁ বলিলেন–তিনি ঠাহর করিলেন কাজ যাহা হইয়াছে তাহা (সহজ মানুষস্বরূপ) তাহার ইচ্ছায় হইয়াছে মনে করিলে তিনি ভুল করিবেন। কাজ হইয়াছে হোটেলের নিয়ম অনুসারে, খরিদ্দারস্বরূপ জাক লাকাঁর ইচ্ছায় নহে। মাঝখানকার খরিদ্দারবেশী জাক লাকাঁ নামক অস্থিরতাটুকুরই অপর নাম ‘সহজ মানুষ’। টেবিলটা বড় বেঢপ জায়গায় ছিল। এখন বেশ ঢপ জায়গায় চলিয়া আসিয়াছে। মাঝখানে সৃষ্ট শূন্যতাই এক্ষণে প্রমাণ করিতেছে ঐখানে কি একটা যেন ছিল। অধৈর্যপরায়ণতার বাহক এই স্থানটির নামই ‘সহজ মানুষ’। (রাবাতে ২০০২: ৪০ )

জাক লাকাঁর এই বক্তৃতার নাম দেখিয়াও অনেকেই ইহা পড়িতে চাহিবেন না মনে হয়। সে কি নাম রে বাবা! ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’ [‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’]। মহাত্মা লাকাঁ সেইদিনের বক্তৃতায়ই জানাইয়াছিলেন সমস্যাটি লইয়া তাহার কাজের বয়স ততদিনে ১৫ বৎসর হইবে। কাজেই তাঁহার সমস্ত কথা একদিনে বলা সম্ভব হইবে না।

সেদিনের বক্তৃতার আরও একটি কথা মনে রাখিবার মত যুৎসই হইয়াছিল। বক্তৃতার শেষভাগে এক জায়গায় তিনি বলিলেন: ‘অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।’ কিছু একটা আছে বোঝা যাইতেছে কিন্তু সঠিক কী যে আছে বুঝিতেছি না । তাহা বুঝিতে হইলে খানিক কল্পনার শরণ লইতে হইবে।

মনে রাখিতে হইবে সেই ১৯৫৩ সন হইতেই লাকাঁ বলিয়া আসিতেছিলেন ‘অজ্ঞানের গঠন ভাষার মতন’। ১৯৬৬ সনে–এই বক্তৃতাতেই–তিনি জাহির করিলেন ঐ কথাটি কিছু পরিমাণ বাহুল্যদুষ্ট ছিল। এক্ষণে তাঁহার সহজ মত দাঁড়াইল: ‘অজ্ঞানের গঠন আছে বলিলেই চলিত কারণ গঠন মানেই তো ভাষা’।

লাকাঁর কথা যৎসামান্য উদ্ধার করিতেছি:
সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই।

মনে রাখিবার মতন মচমচে কথা এই বক্তৃতায় আরো এক প্রস্ত পাওয়া যাইতেছে। ‘চিহ্ন’ (sign) ও ‘পদ’ (signifier)-এর মধ্যে ভেদ আছে–এই প্রস্তাব প্রচারের লক্ষ্যে লাকাঁ জানাইলেন চিহ্ন মানে যাহা দিয়া সজ্ঞান এক প্রাণীর খবর অন্য প্রাণীকে দেওয়া চলে। কিন্তু ‘যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে’।

আরো এক জবর খবর–এইস্থলে তিনি বলিয়াছিলেন–আছে। ভাষার বা পদের জগতে যাহা আছে তাহাকে ‘বাসনা’ (desire) বলা হয়। বাসনার এক মানে যাহা বাস করে না–যাহা অস্থির, যাহা অধৈর্য। কিন্তু বাসনার তলে তলে আরো এক জিনিস বাস করে। তাহার নাম মজা (jouissance)। বাসা আর মজা
lucien-goldmann.jpg……..
লুসিয়ঁ গোল্ডমান (১৯১৩–১৯৭০)
……..
মারা ঠিক এক জিনিস নহে। ভাষা মানে বাসনার বিধি–আইন ও ঈশ্বর যে অর্থেই ইচ্ছা–ধরিয়া লইতে পারেন। ভাষাই বিধি। ভাষাই নিষেধ। নিষেধ বা সীমা আছে বলিয়াই প্রাণী (এখানে মানুষ) সেই নিষেধের বেড়া ভাঙ্গিয়া–বা আইল ডেঙ্গাইয়া–ঘাস খাইতে চায়। নিষেধ বা আইল না থাকিলে তো আইলডেঙ্গার দরকারই হইত না–মজাও হইত না। কাজেই বল্টিমোর শহরের বিজ্ঞাপনচিত্রে লেখা ‘এনজয় কোকা-কোলা’ বা ‘কোকা-কোলার মজা মার’ দেখিয়া লাকাঁ বলিলেন সকলেই সকলকে বলিতেছে ‘মজা মার’।

এই মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে একসময় ব্যথা করিতে শুরু করে। অথচ এই ব্যথার সীমায় পৌঁছাইতে না পারিলে মজা যে সে মারিতেছে তাহার প্রমাণই হয় না। লোকে বলে মজাই জীবন, মজা না মারিলে এ জীবন লইয়া সে কী করিত? মজা জীবনের চাহিতেও বড়। জীবন তুচ্ছ। যে কেহই ত্যাগ করিতে পারেন। সকলেই যাহা সহজে পারেন না ভারতীয় শাস্ত্রে তাহারই অপর নাম ‘ভক্তি’।

পাঠিকা, খেয়াল করিয়াছেন ‘ভক্তি’ কথাটার তাৎপর্য? ‘ভক্তি’ কথাটার আগে
jean-pierre-vernant.jpg
জঁ-পল ভেরনা
………
‘বি’ উপসর্গ লাগাইলে কী হয়? ‘বিভক্তি’। বিভক্তি আসিয়াছেন ‘বিভাগ’ করিবার ক্রিয়া হইতে। তাহা নহে তো কী? তাহা হইলে ‘ভক্তি’ আসিয়াছেন ‘ভাগ হইতে’। প্রাণীমানুষ বা ‘জীব’ ভাগ হইলেই ‘সহজ মানুষ’ তৈয়ার হয়েন। এই ভাগকর্মটি করেন যে হাজাম বা নাপিত তাহারই অপর নাম ভাষা। ভাষাই ভাগ করেন। কাজেই ভাগ হইতে যাহার উৎপত্তি তিনিই বিভক্ত বা নিছক ‘ভক্ত’, তাহার পরায়ণতার নামই ভক্তি। খোদ ভক্তি ও মজার মধ্যে তাহা হইলে একটা না একটা যোগ আছে।

মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে ভাগ বা ভক্তি আর থাকিবেন না। তখন মজার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবেক। ভাষা ও মজার, পরকীয়া ও আপনকার এই যুগলবন্দিকেই আমরা এতদিনে ‘গঠন’ বলিয়া চিনিতে পারিলাম। আর জাক লাকাঁর কর্জ নগদ নগদ স্বীকার করিলাম। লাকাঁ কথিত সমাচার এইখানেই মূর্তি পাইল: আপনকার হৃদয় বা অন্তরের সহিত বাহির বা পরকে মিশাইলেই শুদ্ধ সেই ‘সহজ মানুষ’ দেখা দিবেন–অন্য হেতু অন্য কোথা, অন্য কোনখানে দিবেন না। কারণ তাহা যে দিবার নহে।

দোহাই

১. Michel Foucault, The Archeology of Knowledge [L’archéologie de savoir, Paris: Gallimard, 1969], trans. A. M. Sheridan Smith (New York: Pantheon, 1972); ইংরেজি এই সংস্করণে ১৯৭০ সালে কলেজ দো ফ্রঁসে ফুকোপ্রদত্ত বক্তৃতা L’ordre du discourse (Paris : Gallimard, 1971) এর অনুবাদ ‘The Discourse on Language’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।

২. Michel Foucault, The Order of Things [Les mots et les choses: une archéologie des sciences humaines, Paris: Gallimard, 1966], A. Sheridan, tr. (New York: Random House, 1970).

৩. Jacques Lacan, ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in Richard Macksey and Eugerio Donato, eds., 1970, infra, pp.186-200.

৪. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Structuralist Controversy: The Languages of Criticism and the Sciences of Man (Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1972).

৫. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy, (Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1970).

৬. Jean-Michel Rabaté, The Future of Theory (Oxford: Blackwell, 2002).

●●●

অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা

জাক লাকাঁ

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

আমার ইংরেজি উচ্চারণ একদম বাজে। উচ্চারণদোষে আমার বক্তৃতা একদল ইংরেজিভাষী শ্রোতার কানে নিশ্চয়ই বড় মধুর শোনাইবে না। আর বক্তৃতাটা যদি আমি ইংরেজি জবানেই করি তো যাহাকে বলা যাইতে পারে আমার বার্তা তাহা যথাস্থানে না পৌঁছাইবার ঝুঁকিও থাকিয়াই যাইতেছে–আজ বিকালবেলা এই কয়টি কথা আমাকে বুঝাইবার আশায় এক ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ব্যয় করিয়াছেন। সত্য বলিতে বিষয়টি আমার বিবেকের ঘাড়েও ভারি বোঝা হইয়া রহিয়াছে। যদি অন্যথা করি তো তাহা হইবে আমি যে বস্তুকে আমার বার্তা মনে করিয়া থাকি তাহার শতে একশত ভাগ বিপরীত কর্ম। বার্তা বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহা আপনাদের সমক্ষে খুলিয়াই বলিতেছি–বার্তা মানে আমার নিকট আর কিছু নয়, মাত্র ভাষার বার্তা। আজকাল যেখানেই যাই দেখি সকলেই বার্তা বার্তা করিতেছে–জীবদেহের অন্তরের হরমোনে বার্তা, বিমানপোতকে পথ দেখাইবার কিংবা উপগ্রহাদি হইতে সংকেত ধরিবার আলোকরশ্মিও বার্তা। এই ক্রমে আরো আরো আছে। ভাষার বার্তা কিন্তু সেই জিনিস নয়। ইহা ষোল আনাই ভিন্ন বস্তু। বার্তা–মানে আমরা যে বস্তুকে বার্তা নামে ডাকিতেছি তাহা–বিনা ব্যতিক্রমেই পরমের পাঠানো বার্তা। পরম বলিতে আমি বুঝাইতেছি ‘পরমের ঠিকানা বা অধিষ্ঠান’। আমরা সচরাচর যাহাকে ‘পর’ কিম্বা বা ‘অপর’ (other) বলিয়া থাকি, যাহা লিখিতে ছোট ছাদের ‘o’ অক্ষর ব্যবহার করা হয়, এই পরম অবশ্যই সেই পরম নয়, আর সেই কারণেই এক্ষণে ‘পরম’ (Other) বলিয়া যাহাকে ডাকিতেছি তাহা লিখিবার সময় প্রথম হরফ নাগাদ বড় ছাদের ‘O’ ব্যবহার করিয়াছি। এতদ্দেশে, এই বল্টিমোর শহরে, পরম মনে হইতেছে ইংরেজি জবানেই বাতচিত করিয়া থাকেন। আর ইহাই তো স্বভাবসম্মত। তাই আমি যদি এই বক্তৃতাটি ফরাসিযোগেই করিতাম তো তাহা হইত অন্যায় কাজ। অবশ্য উপরে যে ভদ্রলোকের দোহাই দিলাম তাহার কথাটিও ফেলিয়া দিবার মতো নহে। তিনি বলিয়াছিলেন ইংরেজি বোলটা আমার মুখে ঠিক সহজে আইসে না। অধিক কী, তাহা খানিক ভূতের মুখে রামনাম রামনাম শোনায়। আরো কথা আছে। আমি জানি অত্র সভায় এমনও অনেকে আছেন যাহারা শুদ্ধ ফরাসি ভাষাতেই বাতচিত করিতে পারেন, ইংরেজি এক লব্জও বুঝিতে পারেন না। আমি যদি ইংরেজিযোগে বলিতাম ইঁহাদিগের পক্ষে নিরাপদ হইত। তবে আমার হয়তো বাঞ্ছাই নাই যে ইঁহারা অতটি নিরাপদ থাকিবেন। অতএব ইহাদিগের মুখ চাহিয়া আমি একআধটু ফরাসিও কহিব।

jacques-lacan-1.jpg
জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১)

পহিলা দফায় আমি ‘গঠন’ বলিতে কী বুঝায় সেই সম্বন্ধে কিছু আগাম কথা বলিতেছি। ইহাই তো আমাদের অদ্যকার সভার বিষয়বস্তু। ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোলও পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন যাইতে না যাইতেই শব্দটি লইয়া এক প্রকার হুজুগেরও চল হইবে। আমার বেলা এই কথাটি কিন্তু খাটিবে না কেননা আমি শব্দটি এস্তেমাল করিয়া আসিতেছি অনেক দিন হইতেই–পড়াইবার ব্যবসায় আরম্ভ করিবার পর হইতেই। এই বিষয়ে আমার যাহা বলিবার তাহা জানেন অল্প লোক মাত্র। আরো বেশি লোকে জানিতেন যদি না আমি আমার বক্তৃতা সীমিত রাখিতাম মাত্র একদল বিশেষজ্ঞ শ্রোতা–মানে মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের–সমক্ষে। বিষয়টি বড়ই কঠিন। বেয়াড়া রকমের কঠিন মনে হইতেছে। কারণ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা সত্য সত্যই আমি কিসের কথা বলিতেছিলাম তাহা কিছু কিছু জানেন আর মনোবিশ্লেষণবৃত্তিটি যিনিই গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই জানেন এই জিনিসটির সহিত আঁটিয়া উঠা বিশেষ কঠিন কাজ বটে। ‘সহজ মানুষ’ (subject) বলিতে সত্যই যাহা বুঝায় তাহা লইয়া যাহাদের কারবার সেই মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের কাছে ‘সহজ মানুষ’ জিনিসটা তেমন সহজ জিনিস নয়। আমি চাই না আমি যাহা বলিতেছি তাহা লইয়া কোন ভুল বোঝাবুঝি হউক, কোন ‘মেকোনাসঁস’ (méconaissance) হউক। ‘মেকোনাসঁস’ কথাটি ফরাসি। ইংরেজি ভাষায় ইহার সমান অর্থবহ আর কোন শব্দ নাই বলিয়াই আমি ফরাসি শব্দটিই ব্যবহার করিতে বাধ্য হইলাম। মেকোনাসঁসের অর্থই এমন যে ইহার শরণ লইতে না লইতেই ‘সহজ মানুষ’ আসিয়া যায়। অধিক, আমাকে ইহাও জানানো হইয়াছে যে এক মণ্ডলি ইংরেজিভাষী শ্রোতাসমক্ষে ‘সহজ মানুষ’ লইয়া কথা বলাটাও তেমন সহজ কাজ হইবে না। ‘মেকোনাসঁস’ বলিতে বুঝায় ‘ভুল বোঝা’, কিন্তু ইহাতে আমার (বা আপনার) সহজ ভাবকে ভুল বোঝা বা না বোঝা বোঝায় না। সমস্যাটা–প্রকৃত প্রস্তাবে–গঠন (structure) বলিতে আদপেই কী বোঝায় তাহার সঙ্গে জড়িত।

আমি মনোবিশ্লেষণশাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিবার পর এক সময় আমার কয়েকজন শ্রোতা আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছিলেন। ইহার কারণ ততদিনে অনেক দিন হইয়াছে আমি একটি সরল সত্যের পরিচয় লাভ করিয়াছি। সেই সত্য অনুসারে আমরা যদি ফ্রয়েডের যে কোন বই–বিশেষ অজ্ঞান সম্বন্ধে লেখা যে কোন বই–খুলিয়া দেখি তো শতে একশত ভাগ নিশ্চিত থাকিতে পারি যে একটা না একটা পাতা পাওয়া যাইবে যেখানে কোন না কোন শব্দ দেখিব–বই হইলেই স্বাভাবিকভাবে তাহা অজস্র শব্দে, ছাপানো শব্দে ঠাসা হইবে–যাহা নিছক শব্দ নয়। এমন শব্দ দেখিব যাহা শব্দরূপী বস্তু বৈ নয়। এই নিশ্চয়তা অবশ্য নিশ্চয়তাই, শুদ্ধ সম্ভাবনা নয়। আমরা এই সমস্ত শব্দেরই মধ্যবর্তিতায় অজ্ঞান কী করিয়া সামলাইতে হয় তাহার পথ ধরিবার চেষ্টা করি। শব্দের অর্থ কী তাহা লইয়া এই স্থলে কথা হইতেছে না, কথা হইতেছে শব্দের হাড়মাস, শব্দের স্বভাব-শরীর লইয়া। ফ্রয়েডের চিন্তাভাবনার বড়–য়া ভাগের কারবারই এই লইয়া, স্বপ্নের মধ্যে শব্দচমক (punning), কিংবা মুখ-ফস্কা কথা (lapsus), কিংবা ফরাসি ভাষায় যাহাকে বলে কালঁবু (calembour) বা চমৎকথা, কিম্বা ওমোনিমি (homonymie) বা নামসমতা তাহা লইয়া, কিংবা অধিক বলিতে কোন কোন শব্দ ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা যে এক এক আলাহিদা অর্থ ধারণ করে তাহা লইয়া। শুদ্ধ শব্দই অজ্ঞানের মালমসলা–এই প্রস্তাব শতে একশত ভাগ প্রমাণসিদ্ধ হয় নাই। তবুও ইহা ভালমত টুকিয়া রাখিবার জিনিস। কারণ প্রমাণসিদ্ধ না হইলেও ইহার হইবার সম্ভাবনা বিলক্ষণ আছে (তদুপরি, যাহাই হউক, আমি কদাচ বলি নাই অজ্ঞান বলিতে মাত্র শব্দের মহফিল মাত্র বোঝায়। আমি শুদ্ধ বলিয়াছি অজ্ঞান বস্তুটা যে ‘গঠিত’ সেই সত্যে সন্দেহ নাই)। ইহার তুলনীয় কোন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আছে বলিয়া আমার জানা নাই। কিন্তু থাকার দরকার আছে। কারণ আমরা কথা বলিতেছি ‘গঠন’ সম্বন্ধে আর অজ্ঞানের গঠন ভাষা আকারে। ইহাতে কী বুঝাইতেছে?

সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই। অধিক ইহাই সবটি নয়। ভাষা মানে কোন ভাষা? আমি নই আমার ছাত্ররা অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া এই সমস্যার ভিন্ন আরেকটি অর্থ খাড়া করাইবার কোশেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা চাহিয়াছিলেন সারাৎসার ভাষার মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে। তাহারা জানিতে চাহিয়াছিলেন কোন জিনিসকে ভাষা পদবাচ্য হইতে হইলে কমসে কম কোন কোন শর্ত পুরাইতে হইবে? হইতে পারে শুদ্ধ চারিটি পদাংক (signantes), চারিটি অর্থধারিণী অংকুর (elements) হইলে পর্যাপ্ত হয়। পরীক্ষাটি বেশ মজাদার। তবে ইহার গোড়ায় গলদ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ইহা দেওয়াল পটে লিখিয়া দেখাইব আশা রাখি। পারী শহরে আমার বক্তৃতাসভায় কয়েকজন তত্ত্বজ্ঞানীও আসিতেন। যাঁহারা আসিতেন তাঁহারা সংখ্যায় অনেক নহেন, তবে বেশ কয়েকজনই আসিতেন। ইহাঁদের কেহ কেহ পরে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন যে সমস্যাটা ভাষার ‘ভিতরে আরেক ভাষার’ কিংবা ভাষার ‘বাহিরে অন্য ভাষার’ নয়। যথা পুরাকথা কিংবা কমাকথার সমস্যাও নয়, সমস্যা খোদ ভাষারই। সমস্যার ঠিকানা প্রস্থান করাইতে ইঁহারা যে কষ্টস্বীকার করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই অসামান্য কাজ। যেমন পুরাকথা লইয়া আলোচনার দরকার হইতেছে না কেননা পুরাকথাও যে ভাষার আকারে গঠিত তাহা একদম পরিষ্কার। আর আমি যখন ‘ভাষা আকারে’ কথাটা খাটাইলাম তখন আমি গণিতের ভাষা, কি সংকেতের ভাষা, চলচ্চিত্রভাষা ইত্যাদি অর্থে বিশেষ বিশেষ ভাষা বুঝাইতে খাটাই নাই। ভাষা ভাষাই আর ভাষা মাত্রেই এক জাতের: যথা ইংরেজি বা ফরাসি প্রভৃতি মূর্তিমান ভাষা। এইসব ভাষায় মনুষ্য কথা বলে। এই পর্যন্ত পৌঁছিয়া একটি কথা বলিতে হইবে: ‘ভাষাপারের ভাষা’ (metalanguage) বলিয়া কোন ভাষা নাই। কারণ ভাষাপারের ভাষা নামে অভিহিত সমস্ত ভাষার কথাই বলিতে হয় ভাষারই মধ্যবর্তিতায়। পটের গায়ে খালি খালি অক্ষর লিখিয়া কেহ গণিত শিখাইতে পারে না। দশজনে বুঝিতে পারিবে এমন কোন না কোন সামান্য ভাষায় কথা কহিবার দরকার করে, সদাসর্বদাই করে।

অজ্ঞান ভাষার আকারে গঠিত। ইহা নিছক এই কারণে নয় যে অজ্ঞানের মালমসলা তৈয়ার হইয়াছে আমরা ফরাসি জবানে যাহাকে বলি লঁগাজিয়ে (langagier) তাহা অর্থাৎ ভাষার মশলা দিয়া। অজ্ঞান আমাদের সমক্ষে যে সমস্যা তুলিতেছে তাহাই ভাষার স্বভাব সম্বন্ধে সবার চাইতে বেশি অভিমানিনী সমস্যার প্রান্ত ছুঁইয়া যায়: এই সমস্যারই নাম ‘সহজ মানুষ’। কোন বাক্যের বক্তা কিম্বা ব্যক্তিপরিচয়দাতা প্রতিনাম (personal pronoun) আর ‘সহজ মানুষ’ এক জিনিস, অমনি অমনি এই কথা বলা চলিবে না। ফরাসি জবানে ‘বক্তব্য’ (ennoncé) বলিতে হুবহু বাক্যই বুঝায়, তবে এমন বক্তব্যও ঢের রহিয়াছে যেখানে বক্তব্যটি ঠিক কে বকিতেছে তাহার কোন হদিশ নাই। যদি বলি ‘ইট রেইনস’ (বৃষ্টি হইতেছে) [it rains] তো যে সহজ মানুষ কথাটি বকিলেন তিনি এই বাক্যে শরিক হইলেন না। যাহাই হউক, এইখানে কোথাও না কোথাও একটা গোল বাঁধিয়াছে। ‘সহজ মানুষ’ আর ভাষাব্যবসায়ীরা যাহাকে বলেন ‘আড়কাঠি’ (shifter) এই দুইকে সব সময় এক ভাবা ঠিক হইবে না।

অজ্ঞানের স্বভাব হইতে যে সমস্যা দেখা দেয় তাহা–সংক্ষেপ করিয়া বলিলে–এই দাঁড়াইতেছে: কিছু না কিছু কখনো না কখনো ভাবিতেছে। ফ্রয়েড আমাদিগের উদ্দেশে কহিয়াছিলেন অজ্ঞান সম্বন্ধে সকল কথার বড় কথা এই: অজ্ঞান ভাবনাই বটে। অধিক জ্ঞানের এলাকায় যাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে সেই ভাবনাই। এই নিষেধ একেক জায়গায় একেক রকম চেহারায় করা হইয়া থাকে, অর্থের কথা উঠাইলে বলিতে হইবে ইহার অর্থও নানান কিসিমের হইতে পারে। প্রধান অর্থটি সত্য সত্যই ‘বাধা’ বটে। এই বাধা হয় ডিঙ্গাইয়া যাইতে হইবে নচেৎ ফুঁড়িয়া পার হইতে হইবে। না হইলে হইবে না। কথাটির ভার আছে, কেননা আমি যদি এই বাধার কথা জোর দিয়া না বলি তো আমাদের জীবন একান্তই মসৃণ মনে হইয়া যাইত। আমরা ফরাসি ভাষায় ‘সা ভুজারঁজ’ (ça vous arrange–[বা আপনার ব্যবস্থা হইয়াছে]–জাতীয় কথা বলিয়া থাকি, কেননা নিচের তলায় বা মাটির নিচে কিছু না কিছু যদি ভাবিয়াই থাকে তো জীবনটা সহজ হইয়া যায়। ভাবনা জিনিসটা সদাসর্বদাই হাজির রহিয়াছে আর প্রাণধারী জীব স্বভাবের চাপে যাহা ভাবিতেছে তাহার সম্বন্ধে একটু হুঁশ হইল, জীবন চলিয়া যাইবে এক রকম। ঘটনা যদি তাহাই হইত তো ভাবনার ভারটা পড়িত প্রাণের উপরই, আর তাহাই হইত স্বাভাবিক, যেমন সাড়াই (instinct) হইত ভাবনা। ভাবনা যদি স্বভাবের ফসল হইত তো অজ্ঞান লইয়া কোনই গোল বাঁধিত না। দুঃখের মধ্যে, অজ্ঞানের সহিত ‘সাড়া’ কিম্বা ‘আদিজ্ঞান’ কিংবা মাটির নিচে বাধা ভাবনার কোনই সম্বন্ধ নাই। ইহা শব্দযোগে ভাবনা অথবা আমাদের জাগরিছুট বা চেতনরাজ্যহারা ভাবনা সম্বন্ধীয় ভাবনা বটে। জাগরি কথাটির ভার আছে। আমাদের চেতন অবস্থা লইয়া কোন দানব যদি খেলা করিত তবে তাহার সহিত এই অজ্ঞানের তুলনা চলিত। এই অপর মানুষটি সঠিক কে তাহা খুঁজিয়া লওয়াই এক্ষণে মূল সমস্যা। আর এই মানুষ অপর কেহ নহেন, ভাষা হইতে ভাবনা শুরু করিলে আমরা যে সহজ মানুষে আসিয়া পৌঁছিতাম এই মানুষ হুবহু সেই মানুষই।

আপনাদের সমক্ষে বক্তৃতা দিবার উদ্দেশ্য লইয়া এই যৎসামান্য কথা যখন সাজাইতেছিলাম তখন বেশ ভালোমতন ভোর হইয়াছে। জানালার ফাঁক গলাইয়া বল্টিমোর দেখিতেছি। প্রহরটি বড়ই মজার। তখনও ঠিক রোদ উঠিয়া সারে নাই। কিন্তু সময় যে বহিয়া যাইতেছে তাহা একটা নিয়নবাতির বিজ্ঞাপন এক ঠাঁই জ্বলিয়া আর ঠাঁই নিবিয়া আমাকে মিনিটে মিনিটে খবর দিতেছিল। রোজ যে রকম হয় তখনও রাস্তায় রাস্তায় সেই রকমই গাড়িঘোড়ার ভিড় ভারি হইয়াছে। দূরে গাছগাছালি কিছু কিছু চোখে পড়িতেছে। মনে মনে বলিয়া উঠিলাম এই কয়টি গাছের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে আমি যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছি সব কিছুই আমার ভাবনা যাহা ভাবিতেছে তাহার ফসল। এইখানে লোকজন ঠিক কী কাজে ব্যস্ত তাহা শতে একশত ভাগ পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে না। তাহা যাহাই হউক, সহজ মানুষের পরিচয় দিবে বলিয়া লোকে যে দাজায়িন (Dasein) বা তথাবস্তু বলিয়া একটা কথা তুলিয়া থাকে তাহাই হাজির হইয়াছিল এই ক্ষণিকের অতিথি বা পলায়নপর সাক্ষীর মধ্যে। অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।

‘সহজ মানুষ’ কোনখানে থাকেন? যে ‘অ-বশ’ বস্তু হারাইয়া গিয়াছে তাহার রূপেই সহজ মানুষকে পাওয়া যায়, এই সত্য আমল করিতেই হইবে। আরও খুটাইয়া বলিলে বলিতে হইবে ‘সহজ মানুষ’ দাঁড়াইয়া থাকেন এই হারানো অবশ বস্তুর ঘাড়ে ভর দিয়া। অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখিবেন ইহা এমন বিদকুটে বস্তু যাহার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবি নাই। কোন কোন জায়গায় দেখা যায় ইহা ‘করা হইয়াছে এমন কোন ক্রিয়া’ মাত্র–দুনিয়ার তাবৎ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী এবং অনেক অনেক বিশ্লেষিত মানুষও ইহা আচ্ছামত ভাল করিয়াই জানেন। এই কারণেই অনেক মনোবিশ্লেষণবৃত্তিজীবী মনে করেন আমাদের পক্ষে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় হইবে। নিউ ইয়র্ক মনোবিশ্লেষণ সমিতির সভাপতি আমাদিগকে বলিয়াছেন ইহাই কর্তব্য। কিন্তু আমি তো বস্তু বদলাইয়া ফেলিতে পারি না। আমি মনোবিশ্লেষণবৃত্তি করি। তবে কেহ যদি কোন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সমীপে হাজির হইতে চাহেন তাহা তাহার নিজ পছন্দের বিষয়। মনোবিজ্ঞানের কথাই যখন উঠিল তখন বলিতেছি, গঠনের সমস্যা কথাটা একলা আমিই ব্যবহার করিতেছি না। অনেক অনেক দিন গুজরান হইয়াছে চিন্তা ও গবেষণা, মায় আবিষ্কার-উদ্ভাবনা যাহাদের বৃত্তি আর যাহারা মন কী জিনিস এই প্রশ্ন লইয়া ব্যাপৃত তাহারাও বছরের পর বছর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন যে গঠন জিনিসটার সবার চাহিতে ভারি এবং স্বভাবজাত গুণ হইতেছে ‘একভাব’ (unity)। ইহার কোন প্রমাণের ডাক পড়ে না। জীবের অখিলে (real) এই গুণ এমনিতে হাজির ধরিয়া দেখিলে স্বতন্ত্র প্রমাণ দিবার দরকারই পড়ে না। জীব যখন ষোলকলায় পূর্র্ণ তখন সে ‘একভাবুক’ এবং একভাবুক আকারেই তাহার কর্মকাণ্ড চলে। এই ‘একভাব’ ধারণাটি যখন মনের বেলায় খাটাইবার কথা উঠে তখনই সমস্যা গোলযোগে ভরিয়া যায়। কারণ মন আপন স্বরূপে ‘নিখিল’ নহে। কিন্তু আপনারা তো জানেনই বলা হইয়াছিল মন এক না হইলেও ‘মতলবগত একভাব’ আছে। এই ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই তো যাহাকে বলা হয় কাণ্ডকারখানার আন্দোলন (phenomenological movement) তাহা সম্ভব হইয়াছিল।

একই কথা পদার্থবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে চলিত তথাকথিত ‘অবয়বপন্থা’ (gestalt) মতবাদ সম্বন্ধেও খাটিত। আর খাটিত ‘সহজ স্বরূপ’ (bonne forme) নামক ধারণার ক্ষেত্রেও। এই ধারণার দৌলতে উদাহরণস্বরূপ এক ফোটা পানির সঙ্গে আরো জটিল ভাবনাচিন্তার সংযোগ ঘটাইয়া দেওয়া। অধিক, বড় বড় মনোবিজ্ঞানীর দল আর এমনকি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা পর্যন্ত ‘নিখিল ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতি ধারণায় ভরপুর। যাহাই হউক, ‘একতাসাধক একভাব’ সবসময়ই সামনে চলিয়া আসে। আমি কখনোই জিনিসটা কী বুঝিতে পারি নাই। কারণ আমি যদি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী হইয়া থাকি আমি তো মনুষ্যসন্তানও বটি আর মনুষ্যসন্তান হিসাবে আমি অভিজ্ঞতা হইতে শিখিয়াছি যে আমার আপন মানব জীবনের প্রধান গুণ একটাই আর তাহা হইল এই জীবন এমন এক জিনিস যাহাকে আমরা ফরাসি ভাষায় বলি বহিয়া যায় (á la dérive)। আমি তো নিশ্চিত এইখানে আপনারা যাঁহারা আছেন তাঁহাদের অভিজ্ঞতাও ইহাই। আর কেহ যদি ইহার সহিত একমত না হইয়া থাকেন আশা করি তিনি হাত উঠাইবেন। জীবন নদীর নাহান বহিয়া যায়, কখনো বা এই তীর স্পর্শ করিল কখনো বা করিল ওই তীর। কখনো এইখানটায় একটুখানি দাঁড়াইল কখনো ওইখানটায়, কিন্তু কেন করিল বা দাঁড়াইল তাহার মাথামুণ্ডুও বুঝিল না–কী ঘটিল তাহার মাথামুণ্ডু কিছু কেহই বুঝিল না। বিশ্লেষণের মূলসূত্র ইহাই। মানব জীবনের ‘একতাসাধক একভাব’ আমার নিকট চিরকালই কলঙ্কজনক মিছাকথা মাত্র মনে হইয়াছে।

এই সকল ব্যাপার কী জিনিস বুঝিয়া উঠিবার প্রয়োজন মিটাইতে হইলে আমরা আরো এক নীতির সাহায্য লইতে পারি। ঘটনা কী তাহা কদাচ অজ্ঞানের দিক হইতে আমরা যে বিচার করিয়া দেখিতে চাহি না তাহারও কারণ আছে। কারণ অজ্ঞান যাহা বলে তাহা শব্দের মধ্যবর্তিতায় ফুটাইয়াই বলিয়া থাকে। আর ইহাদের মূলনীতি কী তাহার সন্ধান হয়তো আমরা লইতে পারি।

আমার প্রস্তাব, আসুন তো ‘একভাব’ ধারণাটি আমরা অন্য আলোক ফেলিয়া দেখি। ‘একতাসাধক একভাব’ নয়, দেখি এক, দুই, তিন প্রভৃতি গণনাসম্ভব ‘একভাব’। পনের বছর ধরিয়া পড়াইবার পর আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশির বেশি পাঁচ পর্যন্ত গুণিয়া দেখিতে শিখাইয়াছি। এই পর্যন্ত গোনা বেশ কষ্টের কাজ (চার পর্যন্ত গোনা আর একটু সোজা)। আর তাঁহারাও ঐ পর্যন্তই শিখিয়াছেন। তবে আজ রাত্রে আমাকে আপনাদের অনুমতি লইয়া দুইয়ের মধ্যেই আটক থাকিতে হইবে। এক্ষণে আমরা পূর্ণসংখ্যার কথা কহিতেছি আর পূর্ণসংখ্যার কথা কহাটা বড় সহজ বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস এই সভায় সমবেতদের অনেকেরই ইহা জানা জিনিস। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে, শুদ্ধ দরকার কয়েকপ্রস্ত সেট (set) এবং এক প্রস্ত ’একের বিম্ব এক’ (one to one correspondence) গণিবার নীতি। যেমন ধরা যাউক, এই ঘরে যতটা পিঁড়ি আছে ঠিক ততজন মানুষ বসিয়া আছেন কথাটা সত্য। কিন্তু ‘পূর্ণসংখ্যা’ কিংবা যাহাকে বলি ‘স্বাভাবিক সংখ্যা’ তাহা হইতে হইলে পূর্বসংখ্যাযোগে গঠিত কোন সংগ্রহের ডাক পড়িবেই। বলা নিষ্প্রয়োজন ইহা একাংশে হইলেও ‘স্বাভাবিক’ (natural) তবে শুদ্ধ এই অর্থেই যে ইহা কী কারণে আছে তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। গণনা জিনিসটা ‘অভিজ্ঞতানির্ভর সত্য’ নয় আর শুদ্ধ অভিজ্ঞতাজাত তথ্য হইতে গণনাকর্মের সৃষ্টি হইয়াছে ইহা প্রমাণ করাও অসম্ভব। হিয়ুম (Hume) সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু ফ্রেগে (Frege) নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রমাণ করিয়াছেন এই চেষ্টা অপরিপক্কতারই প্রমাণস্বরূপ। পূর্ণসংখ্যা মাত্রই একেকটা স্বনির্ভর একক। সমস্যার আসল ভিত্তি এই সত্যেই পাওয়া যাইবে। আমরা যদি এই সংখ্যাকেই একক ধরিয়া লই তো বেশ মজাই হয়। ধরা যাউক পুরুষ আর নারী–পিরিতির সহিত যোগ হইল ‘একভাব’! কিন্তু কিছুক্ষণ যাইতেই সব শেষ। এই দুইজনের পর আর কেহ রহিল না। হয়তো একটা শিশু আসিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা অন্য স্তরে পৌঁছিয়া গেলাম। আর তিনের জন্ম দেওয়া সে তো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। আমরা যখন সংখ্যা বিষয়ে গণিতবিদের প্রস্তাবাদি পড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করি তখন দেখিতে পাই সকল প্রস্তাবের গোড়ায় এক সূত্র: [নতুন সংখ্যা পাইতে হইলে] যে কোন পূর্ণসংখ্যার সহিত ১ সংখ্যাটি যোগ করিতে হইবে, ‘n+১’ বা [n+1]। সংখ্যার জন্ম কী উপায়ে হয় তাহার চাবি এই ‘যোগ এক’ কথার মধ্যেই আছে। আর আমি প্রস্তাব করিতেছি এই ‘যোগ করিয়া একভাব’ করিবার পদ্ধতি যাহার গুণে দুই তৈরি হয় তাহা বাদ দিয়া আমরা দুই সংখ্যাটির সংখ্যাস্বরূপ অখিল (real) জন্ম কীভাবে হয় দেখিব।

এই দুইকে যাহার এখনও জন্মই হয় নাই এমন পহিলা পূর্ণসংখ্যা হইতে হইবে খোদ দুইয়ের আবির্ভাবের আগেভাগেই। ইহা সম্ভব হইতেছে কারণ আমরা দেখিয়াছি পহিলা ‘এক’ সংখ্যার আবির্ভাব মানিয়া লইবার ওয়াস্তে এক্ষণে ‘দুই’ আসিয়া বসিয়াছে। ‘এক’ সংখ্যার জায়গায় ‘দুই’ বসাইলেন আর ফলস্বরূপ দেখিলেন ‘দুই’ সংখ্যার জায়গায় ‘তিন’ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই স্থলে আমরা যাহা দেখিলাম তাহার নাম আমি রাখিয়াছি দাগ (mark)। তাহা হইলে আমরা দেখিব কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে যাহাতে দাগ দেওয়া হইয়াছে আর কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে দাগ দেওয়া হয় নাই। পহিলা যে দাগ দেওয়া হইল তাহা হইতে আমরা ঘটনার জন্ম দেখিলাম। হুবহু এই পথেই ফ্রেগে সংখ্যার জন্মকাহিনী ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে শ্রেণীতে কোন অংকুর (elements) নাই তাহাকেই পহিলা শ্রেণী কহে। এইভাবে শূন্যের জায়গায় ‘এক’ আসিল আর তাহার পর একের জায়গাটি কী করিয়া দোসরা জায়গা বনিয়া গেল তাহা সহজেই বুঝা যাইতেছে। এই ক্রমে ‘দুই’, ‘তিন’ ও অন্যান্য সংখ্যার জায়গা বদল হইল। আমাদের হিসাব অনুসারে এই দুইয়ের সমস্যাই সহজ মানুষ সমস্যার রূপ বটে। আর দুইয়ের জন্ম হইয়াছে একের সহিত এক যোগে, একের অভাব পূর্ণ করিয়া নয়, বরং একের জন্ম দিবার খাতিরে একের পুনরাবৃত্তি ঘটাইয়া। ইহা সত্য হইলে আমরা মনোবিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা হইতে যে সত্য জানিতে পারিয়াছি তাহারই সমক্ষে হাজির হইলাম। ‘অজ্ঞান মানুষ’ এমনই চিজ যাহা নিজের আবর্তন ঘটাইবার দিকে ঝুঁকিয়াই থাকে, আর শুদ্ধ ‘এক’ আবর্তন হইলেই হইল, উহার জন্ম হইবে। যাহাই হউক একদফা আবর্তন দেখিতে হইলে আমাদের দেখা দরকার পহিলা ঘটনার পুনরাবর্তন ঘটাইতে দোসরা ঘটনার যে যে গুণ না থাকিলেই নহে তাহা কী কী। আমরা যদি তাড়াহুড়া করিয়া জবাব দিই তো বলিব দরকার দুই ঘটনার এক রকম হওয়া। যদি তাহাই হইত তবে দুইয়ের নিয়মটা হইত যমজেরই নিয়ম। যদি তাহাই সত্য হয় তো ত্রয়ীর কিংবা চতুরঙ্গের নিয়মই বা হইবে না কেন? আমাদের যুগে আমরা ছেলেমেয়েদের শিখাইতাম, ধরা যাউক মাইকের সহিত অভিধান যোগ করা চলিবে না। তবে এই শিক্ষাটা একেবারেই আজগুবি শিক্ষা। কারণ মানুষ যদি মাইকের সহিত অভিধান কিম্বা লুইস ক্যারলের ভাষ্য মোতাবেক বলিলে রাজার লগে বাধাকপি যোগ করিতে না পারিবে তো যোগ করিবার কিছুই তো থাকিবে না। যাহার দৌলতে এক বস্তুর সহিত অন্য বস্তুর প্রভেদটা হিসাবে না লইয়া যোগ সম্ভব হয় সেই অভিন্নতার বাস বস্তুতে নাই, আছে ঐ দাগে (বা মার্কায়)। এই দাগের কল্যাণেই প্রভেদটা যেন ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে এমত অবস্থা হয়। পুনরাবর্তন হইবার সময় সহজ মানুষের, অজ্ঞান সহজ মানুষের ঘটে যাহা ঘটে ইহা তাহারই চাবিকাঠি। কারণ আমরা জানি ‘সহজ মানুষ’ নিদারুণ অর্থময় কিছু একটার পুনরাবর্তন করে। উদাহরণ দিয়া বলিতে, এই যে বস্তুকে আমরা কখনও কখনও বলি বিভীষিকা (‘ট্রমা’) কিম্বা ‘চরম পুলক’ সেই অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে সহজ মানুষ হাজির থাকে। কী ঘটে সেই সংকটে? যদি ‘মাল’টা এই আকারে জগতে বিরাজ করে, এই একত্ববোধক লক্ষণটাই যদি হয় শেষ কথা, তাহা হইলে অভিন্নতার লক্ষণ এই জায়গায় বিলক্ষণ আছে। এক্ষণে আমার মধ্যে যে ‘মাল’টা খুঁজিয়া বেড়ান হইতেছে তাহা পাইতে হইলে পহিলা দাগটা ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলাইতে হইবে। কেননা এই দাগটা আজ তো আজকেই ছিল ঘষামাজার ফলস্বরূপ। সকল ভেদ উঠাইয়া দেওয়ার নামই তো ছিল এইটা আর এই লক্ষণ না হইত তো পহিলা ‘মাল’ই হইয়া যাইত লাপাত্তা। আকারে যাহা অভিন্ন তাহার পুনরাবর্তনকেই যদি পুনরাবর্তনের সারকথা বলা হয় তো তেমন পুনরাবর্তন অসম্ভব, পুনরাবর্তনের রীতিহীনতার রহস্য এইখানেই। যাহাই হউক মানুষ এই পুনরাবর্তনেরই ফলস্বরূপ। কারণ ইহার ফলে সহজ মানুষের প্রথম ভিত্তিটাই হাওয়া হইয়া যাইতে, রদ হইতে বাধ্য হয়। ইহাই সেই কারণ যাহার বলে সহজ মানুষ মাত্রই–অবস্থানের গুণে–বিভক্ত ভাবস্বরূপ হাজির থাকে। আমি ক্ষান্তিহীন বলিব এই লক্ষণ অভিন্ন­তারই লক্ষণ। তবে ইহার ফলে যাহা নিশ্চিত হইতেছে তাহা শুদ্ধ অভিন্নতারই ভিন্নতা। ইহা হইতেছে অভিন্নতা কি ভিন্নতার ফল আকারে নয়, হইতেছে বরং ‘অভিন্নতারই ভিন্নতার’ মধ্যবর্তিতায়। ইহা বুঝিতে পারা সহজ। যথা ফরাসি ভাষায় আমরা বলিয়া থাকি ‘আমি আপনাদের নম্বর মারিলাম’ (Je vous numérotte)। আমি আপনাদের সবাইকে একটি একটি করিয়া নম্বর বাঁটিয়া দিলাম, আর ইহার ফলে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেল আপনারা সকলেই আলাদা তবে শুদ্ধ নম্বরের বিচারে। অন্য কোন দিকবিচারে নয়।

যাহা ‘একই সঙ্গে’ এক কিংবা ‘দুখণ্ডে’ বটে এমন কোন কিছুর মধ্যে এই লক্ষণটা আছে তাহা প্রমাণ করিবার নিমিত্ত আমরা সহজ বুদ্ধির কাছে কোন প্রস্তাব তুলিয়া ধরিতে পারি? নিচের রেখাচিত্রাটির কথাই ভাবা যাক, সুপরিচিত একটি ছবির আদলে আমি ইহার নাম রাখিয়াছি উল্টা আট: [বঙ্গভাষায় উল্টা চার–অনু.]

8.jpg

দেখিতেই পাইতেছেন এইখানের রেখাটিকে একই সঙ্গে এক রেখা বা দুই রেখা উভয়ই গণ্য করা যাইতে পারে। যে আদ্যস্থলে, যে গিরায় সহজ মানুষ গঠিত হয় ইহাকে সেই অকুস্থলেরই অপরিহার্য লিপি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। আমরা পহিলা পহিলা যতখানি ভাবিতে পারি ইহার হাত তাহা হইতে অনেক দূর বেশি যাইতে পারে, কারণ আমরা এই ধরণের লিপি খোদাই করার মতন উপরিতলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িতে পারি। আমরা হয়তো বুঝিতে পারিব নিখিল অর্থে ব্যবহার করা পুরানা প্রতীক–মণ্ডল (the sphere)–দিয়া এখানে কাজ চলিবে না। কোন বৃষ (torus), কোন বোতল (Klein bottle), আড়াআড়ি কাটা উপরিতল (cross-cut surface) এইভাবে কাটিয়া দেখান যায়। এই বৈচিত্র্যের মূল্য আছে। কেননা ইহাতে মনে রোগ কিভাবে গঠিত হয় তাহার ব্যাখ্যা মিলিবে। এই গোড়াকার কাটাদাগের সাহায্যে যদি ‘সহজ মানুষ’ আকার পায়, তবে একই উপায়ে প্রমাণ করা যায় কোন বৃষ কাটিলে ‘স্নায়ুরোগগ্রস্ত সহজ মানুষে’র (neurotic subject) আর ‘আড়াআড়ি কাটা উপরিতল’ কাটিলে অন্য কোন মনোব্যাধির সহিত মিলিয়া যাইবে। আজ রাত্রে আপনাদের সমক্ষে আমি ইহার ব্যাখ্যা দিতেছি না, তবে এই দুরূহ বক্তৃতার সমাপ্তি টানিতে হইলে আমাকে নিচের সারসংক্ষেপটি পেশ করিতেই হইবে।

পূর্ণসংখ্যাধারার গোড়ার দিকটাই শুদ্ধ আমি হিসাবে লইলাম, কারণ ইহা ভাষা ও অখিলের মাঝখানকার বিন্দু বটে। ‘এক’ এবং ‘এক যোগ’ ব্যাখ্যাচ্ছলে আমি যে জাতের লক্ষণ কাজে লাগাইলাম ভাষাও সেই একই লক্ষণ যোগেই গঠিত হইয়াছে। পার্থক্যের মধ্যে ভাষার এই লক্ষণ আর একভাবাপন্ন লক্ষণ (unitary trait) ঠিক এক বস্তু নহে, কারণ আমাদের ভাষায় ভেদভিত্তিক অনেক লক্ষণের একত্র সমাবেশ আছে। কথাটা অন্যভাবে বলি তো বলা যায় ভাষা গড়া হইয়াছে এক দঙ্গল পদ–যেমন বা, তা, পা, ইতি আদি, ইতি আদি লইয়া। দঙ্গলটির সীমা আছে। সহজ মানুষের চলার পথ কাটিতে যাহা লাগে পদমাত্রই তাহা যোগাইতে পারে। আর পদে পদে সম্পর্কের বেলায় যাহা সামান্য সত্য পূর্ণসংখ্যার চলার পথ তাহারই বিশেষ রূপ মাত্র, এই কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই সমুদয় বটে। আমি যাহাকে পরম বলিতেছি তাহা গঠিত হইয়াছে এই পদাবলী দিয়াই। ইহা তাহার সংজ্ঞা বটে। ভাষার কারণে যে ভেদটা সম্ভব হইয়াছে তাহা এই: পদ মাত্রই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কাছ হইতে নিজে অভিন্ন নয় (পূর্ণ সংখ্যার একভাবাপন্ন লক্ষণ ইহার বিপরীত)। ইহার বিশেষ কারণও এই যে অনেক পদের একত্র সমাবেশই ভাষা। আর এই সমাবেশে কোন ‘পদ’ (signifier) নিজ ‘পদার্থের’ (signified) ‘পদ’ হইতে পারে আবার নাও হইতে পারে। এই সুপরিচিত সত্যটিই রাসেলের (Russel) ধাঁধার মূলসূত্র। যে সকল অংকুর (elements) নিজ নিজ দঙ্গলের অংশ নয় তাহাদিগকে শরিক করিয়া নতুন কোন দঙ্গল গঠন করিলে আমরা যে ধাঁধায় পড়িব তাহার পরিণতিতে আমরা জানি ‘কথার সহিত কথার বিরোধ’ (contradiction) তৈয়ার হয়। ইহার অর্থ, সহজ কথায়, শুদ্ধ বাক্যের নিখিলে এমন কিছু থাকতে পারিবে না যাহাতে সকল কিছু রহিয়াছে। আর যে ফাঁকের দৌলতে ‘সহজ মানুষ’ গঠিত হয় এইখানে আরো একবার তাহার দেখা মিলিতেছে। ‘সহজ মানুষ’ মানেই হইতেছে অখিলের মধ্যে খিল ঢুকাইয়া দেওয়া (introduction of a loss in reality)। অথচ ইহা হইতেই পারে না। কেননা সংজ্ঞার গুণেই অখিল বলিতে বুঝায় ‘যাহাতে খিল নাই’ (যাহা যতদূর সম্ভব ততদূরই ভরাট বটে)। খিলের ধারণাটি সম্ভব হইয়াছে সেই লক্ষণের গুণে যাহা আমাদের সৃষ্ট অক্ষরের দৌলতে এক প্রস্ত অভাবের নির্ধারিত স্থান। এই যেমন a1, a2, a3 প্রভৃতি বৈ নয়। আর ‘স্থান’ (space) মানে তো ফাঁকই। ‘সহজ মানুষ’ যখন অভাবের জায়গাটি দখল করেন, তখন শব্দের ভিতর খিল ঢুকিয়া যায়। আর ইহা সহজ মানুষের সংজ্ঞাও বটে।

xex-1.jpg

তবে ইহা যদি লিখিবার আবশ্যক করে তো ইহার সংজ্ঞা বাধিতে হইবে ভাষার মণ্ডলজোড়া বৃত্তের আওতায়। এই বৃত্তের নাম আমি রাখিয়াছি পরকীয়া (otherness)। এ জগতে যাহা কিছু ভাষাপদবাচ্য তাহার সবকিছুই এই পরকীয়ারই আলো আর সেই কারণেই সহজ মানুষ সবসময়ই এই পদাবলী বাদিনীর তলায় তলায় পলায়নপর চির অপসৃয়মান বস্তুস্বরূপ। কারণ পদের সংজ্ঞাই এমন: যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে। ফল এই দাঁড়ায় যে সহজ মানুষ উধাও হইয়া যায়। দুই প্রস্ত একভাবাপন্ন লক্ষণের ক্ষেত্রেও হুবহু একই ঘটনা ঘটে। আর এই সময় যাহাকে বলা হইতেছে অর্থ বা পদার্থ তাহার আবির্ভাব ঘটে দুই নম্বর পদটির আবডালে এবং ইহার পর এই ক্রম ধরিয়া আর আর পদ ও পদার্থের আবির্ভাব চলিতে থাকে।

হারাইয়া যাইতে যাইতেও ‘সহজ মানুষ’ কল্পনার ফানুস বলিয়া পরিচিত এই অত্যাশ্চর্য বস্তুর সাক্ষাত কোন না কোন উপায়ে লিপ্ত থাকিয়া আরও একবার নিজেকে খোঁজার জন্য আকুল হয়। ‘বিষয় বাসনা’ (desire) ইহারই অপর নাম। এই সাধনা জিগাইয়া রাখে সেই বস্তু যাহার নাম আমি রাখিয়াছি হারান সম্ভার (lost object)। ইহার নাম বিসমিল্লায়ই লইয়াছিলাম–ইহার নাম লইতেও ভয়ে কল্পনার হাত না সাধাইয়া যায়। আর ইহার জন্ম ও লালন-পালন এই স্থলেই ঘটে। আমার শব্দ তালিকায় ইহারই নাম হইয়াছে ছোট ছাদের a সম্ভার (object a)। ইহার কথা মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী মাত্রই ভালো করিয়া জানিবেন। কেন না মনোবিশ্লেষণবিদ্যা আদ্যোপান্ত খাড়াও হইয়াছে এই নিদারুণ সম্ভারের কাঁধে ভর করিয়াই। আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাধীন সহজ মানুষের সহিত এই a সম্ভারের সম্পর্ক-কাঠামো সবসময়ই ফানুসের তলায় থাকে আর এই ফানুস থাকে বাসনার তলায়। কেন না বাসনা আর কিছু নয়। শুদ্ধ যাহার নাম রাখিয়াছি সমস্ত অর্থের অনন্তনাম (metonymie, metonymy) ইহা তাহারই অপর নাম।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় মনোবিশ্লেষণবৃত্তির অখিলে গঠন বলিয়া কোন জিনিস বিরাজ করিতেছে তাহা আপনাদিগকে দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছি। তবে ‘সাকার’ ও ‘আকার’ প্রভৃতি দিক সম্পর্কে আমি কিছুই বলি নাই। মনের জীবন যে জীবনের বা অভিজ্ঞতার জগত দিয়া পার হয় তাহার ভিতর আকারের বন্ধন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে তাহা বুঝিয়া লওয়ার কোন বিকল্প নাই। এই কথা না বলিলেও চলিত। কিন্তু আজ রাত্রে আমার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নাই। তবে পুরানা বলিয়া জ্ঞাত এই ‘সহজ মানুষ’ সম্বন্ধে সবার তুলনায় কম জানা অথচ সবার তুলনায় বেশি নিশ্চিত একটি সত্যকথা ভাবিয়া দেখিবেন। জীবিত প্রাণীর জীবনপর্বের ইহাই অর্থপূর্ণ দিক। এই অন্তহীন জিনিসটা জীবন ও মরণের সীমানার মধ্যে কিছু একটার স্বাদ পাইতে সক্ষম। বিষাদ ও হর্ষের মধ্যখানকার পুরা বর্ণালিটা জুড়িয়া থাকিতেও ইহা সক্ষম। ইহাকে আমরা ফরাসি জবানে বলিয়া থাকি ‘সহজানন্দ’ (sujet de jouissance)।

আজ বিকালবেলা এই জায়গায় আসিবার পথে ছোট্ট নিয়ন বাতির বিজ্ঞাপনে দেখিলাম লেখা রহিয়াছে, ‘এনজয় কোকো-কোলা’ [অর্থাৎ কোকা-কোলার মজা মার]। ইহা দেখিয়া মনে পড়িল, যতদূর জানি, ফরাসি ‘জুয়িসঁস’ (পুলক/আনন্দ) কিংবা ল্যাটিন ভাষার ‘ফ্রূয়র’ (fruor) শব্দে পদার্থের যে বিশাল ভার বহন করা হয় তাহার যথার্থ প্রকাশক্ষম পদ ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যাইতেছে না। জুয়ির [Jouir] শব্দের অর্থ আমি অভিধান খুলিয়া দেখিয়াছি। দেখিয়াছি ইহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে ‘টু পজেস, টু ইয়ুজ’ [অর্থাৎ দখলে লওয়ার, ভোগ-ব্যবহার করার] কিন্তু ইহার অর্থ আদৌ তাহা নয়। প্রাণধারী জীব যদি আদৌ ভাবিবার মতন কোন ভাব হইয়া থাকে, তো সব কিছু ছাড়াইয়া তাহার পরিচয় হইবে আনন্দের নন্দন [বা আনন্দের সহজ মানুষ]। তবে, দুঃখের মধ্যে, বেশিক্ষণ না যাইতেই দেখা যাইবে মনোবিশ্লেষণের যে বিধির নাম হইয়াছে আনন্দসূত্র (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে শুদ্ধ নিরানন্দসূত্র বৈ নয়) যাবত আনন্দের পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছে।

যদি এমত হয় যে মজা মারিতে মারিতে আমি একটু মাত্রা ছাড়াইয়া গেলাম, অমনি কথা শুরু হইয়া যায়, ফলে আমি আমার আনন্দ খানিক কমাইয়া আনি। জীবদেহ মনে হয় এমনভাবেই বানান হইয়াছে যাহা অতি মাত্রার আনন্দ এড়াইয়া যায়। আমাদের দেহের গঠন যদি এহেন মজার জিনিস না হইত তো আমরা সকলেই হয়তো ঝিনুকের মতন নিরব হইয়া থাকিতাম, এই গঠনই আমাদের আনন্দপক্ষের আমল ভাঙ্গিতে বাধ্য করে কিংবা আমাদিগকে শুদ্ধ এই আমলের উপর জোর করিবার আর ভাঙ্গিয়া ফেলিবার খোয়াব দেখাইয়া থাকে। পরমের সঙ্গে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ পদের মাপকাঠি বরাবর সহজের গঠন হইতে ইহার বিস্তার ঘটে আর এই গঠনের গোড়া পোতা থাকে ভাষায়। শুদ্ধ ইহার কারণেই বাসনার পূর্ণ বৈচিত্র্য পাখা মেলিবার অবকাশ পায়। ফলে আমরা এই জাতীয় নিষিদ্ধ আনন্দের (জুয়িসঁস) কাছাকাছি যাইবার, যাচাই করিবার সুযোগ পাই। ইহাই আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ যাহার একলা মূল্য আছে।

আলোচনা

আঙ্গুস ফ্লেচার
ফ্রয়েড সত্য সত্য ছিলেন খুবই সরল মানুষ। তবে মানুষের নানান সমস্যার বিচিত্র সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। মানুষের জটিলতা ও সমস্যার ব্যাখ্যা প্রদানের খাতিরে তিনি কখনো কখনো মিথ ব্যবহার করিয়াছেন। যথা: নার্সিসাস মিথ। উনি দেখিলেন কিছু কিছু মনুষ্য আছেন যাহারা আয়নায় আপন মুখ দেখেন আর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে প্রেম করেন। ব্যাপারটা এমনই সহজ। তিনি শব্দের উপরিতলে উপরিতলে ভাসিবার চেষ্টা করেন নাই। আপনি যাহা করিতেছেন তাহা মাকড়সার মতন: আপনি ভারি মিহি যে জালটা বানাইতেছেন তাহার সঙ্গে মানুষের কোন সত্য সম্পর্ক নাই। যেমন আপনি ‘মজা’র কথা বলিলেন। ফরাসি ভাষায় ‘জুয়ির’ (jouir) কথাটির এক অর্থ ‘চরম পুলক’–ইহা বলিবেন না কেন? আমার মনে হয় ইহাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যাহা কিছু শুনিলাম সবই এহেন কায়াহীন কথা…। সমস্যাটা এখানে মনোবিশ্লেষণের নয়। মনোবিশ্লেষণের মূল্য এইখানে যে ইহা মনোবিশ্লেষণের গতি বিষয়ে প্রস্তাবনাস্বরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইয়াছে পরে, বিশেষ বলিতে বিলহেলম রাইখের কাজ। এতসব অতিপদার্থবিদ্যার (metaphysics) কোনই দরকার নাই। আপনার চিত্রলেখাটি (diagram) খুবই মজার হইয়াছে, তবে ইহার সহিত আমাদের কাজকর্মের, খাওয়া দাওয়া, রতি সহবাস ইতি আদির কোনই সংযোগ তো নাই।

হ্যারি উলফ
আমি জিজ্ঞাসা করিতে চাই এই গোড়ালি পাটিগণিত (fundamental arithmetic) আর এই স্থানবিদ্যাও (topology) এক জাতীয় মিথ কি না, নাকি মানস-জীবন ব্যাখ্যার খাতিরে এক প্রকার তুলনার প্রস্তাব মাত্র?

জাক লাকাঁ
কিসের সহিত তুলনা? ‘S’ বলিতে এমন কিছু বোঝায় যাহা হুবহু এই S আকারে লেখা চলে। আমি বলিতেছি এই ‘S’ যাহা দিয়া সহজ মানুষ বুঝান হইতেছে তাহা সাধিত ক্ষতি বুঝাইবার উপযোগী এক জাতীয় হাতিয়ার, কিন্তু ‘সহজ মানুষ’ হিসাবে আমি (এবং আমি নিজেও) যাহা হারাইয়াছি তাহা। অন্য কথায় বলিতে, একদিকে আছে এমন কিছু যাহার খচিত অর্থ আছে আর অন্যদিকে আছে আমার ব্যবহৃত কথার ধারা যাহা দিয়া আমি আপনি যেখানে আছেন সেখানে পোঁছাইতে চাইতেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফাঁক (বা খিল) আছে। আপনাকে এখানে আরেকজন সহজ মানুষরূপে ধরি নাই, ধরিয়াছি আমার কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিবেন এহেন মানুষ হিসাবে। উপমানটা কোনখানে? এই ক্ষতিটা হয় হইয়াছে কিম্বা হয় নাই। যদি হইয়া থাকে তবে তাহা বুঝাইতে হইবে একপ্রস্ত প্রতীক দিয়া। যাহাই হউক, প্রতীকায়ন না ঘটাইবা পর্যন্ত এই ক্ষতিটার অস্তিত্বই নাই। ইহা তো তুলনা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অখিল জগতের কোন না কোন ভাগে, এই ধরনের বৃষে আছে। এই বৃষ আসলেই আছে আর স্নায়ুরোগীর গঠন হুবহু এইটাই। ইহা উপমান নহে। এমনকি ইহা কায়াহীনও নহে, কারণ কায়াহীন মানে তো অখিল জগত হইতে কিছ না কিছু বিয়োগ করাও বুঝাইতেছে। আমার মনে হয় ইহাই খোদ অখিল।

নর্মান হলান্ড
আমি লাকাঁ সাহেবের পক্ষ লইয়া বলিতে চাই। আমার মনে হয় ওঁ চাইছেন খুব ভালো একটা কিছু করিতে। আমি এই আলোচনা সভার আগেভাগেই তাঁহার প্রবন্ধ পড়িলাম। ইহার আগে আমি ওঁর কোন লেখা পড়ি নাই। মনে হইতেছে তিনি ফ্রয়েডের লেখা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞান প্রকল্প’ (Project for a Scientific Psychology) বরাবর ফিরিয়া গিয়াছেন। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ইহাই ফ্রয়েডের পহিলা লেখা। ইহাও খুব কায়াহীন ছিল এবং আপনি এখানে আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার মতনই ছিল। অবশ্য আপনি বীজগণিতের সাহায্য লইতেছেন আর উনি নিউরনের আশ্রয় লইয়াছিলেন, এই রচনার প্রভাব ‘খাবনামা’, ‘ফ্লিস সমীপে চিঠিপত্র’সহ তাঁদের প্রথম বয়সের সমস্ত লেখায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যদিও সেই প্রভাব অনেক সময় কেবল উহ্য রহিয়াছে।

এন্টনি ওয়াইল্ডেন
আমি কিছু কথা যোগ করিতে চাহিয়াতেছি। আপনার বক্তৃতার গোড়ায় আপনি অস্বীকার বা অস্বীকৃতির [মেকোনাসঁসের] ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। আর আমরা ইহার এমন একপ্রস্ত চরম দৃষ্টান্ত হইতে শুরু করিয়াছি যে ইহা হইতে কী করিয়া বাহির হইব বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আপনি কিন্তু শুরু করিয়াছেন আপনার চিন্তার একেবারে মাথা হইতে (আপনার চিন্তার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হইতে) আর ইহার গোড়াটা কী রকম ছিল তাহা খুঁজিয়া বাহির করা আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক কঠিন। এই চিন্তা খুবই ধনশালী এবং খুবই গভীরে ইহার মূল। আমি আপনার লেখা কষ্ট করিয়া তর্জমা করিয়া থাকি, সেই অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি ফ্রয়েডের সহিত আপনি একফোঁটাও বেঈমানি করেন নাই। আজ রাত্রে এইখানে আমরা অনেক আবোল তাবোল বকিব সন্দেহ নাই–তবে এহেন বকাবকির আগে আমাদের উচিত আপনার লেখা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখা। ইহার অন্যথা না করাই উচিত। তাহারা আগে আপনার লেখা পড়িয়া দেখুন, তারপর ফ্রয়েড পড়ুন সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ সমীপে এই মিনতি করি।

রিচার্ড শেচনার
শূন্যতা সম্বন্ধে আপনার চিন্তার সহিত হুসার্ল (Husserl) এবং সার্ত্রের (Sartre) লেখার সম্পর্ক কী?

লাঁকা
আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, সেই শূন্যতা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না আমি বিশেষ কিছু বলিতে পারিব। হুসার্ল সম্পর্কেও পারিব না, সার্ত্র সম্পর্কেও না। সত্য সত্যই, আমার মনে হয় না আমি শূন্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিয়াছি। গড়াইয়া যাওয়া এবং ধরিতে কঠিন হওয়া, কখনো কোথায়ও না থাকা (আমি যখন ঐখানে খুঁজি তখন উহা এইখানে; আর আমি যখন এইখানে) মানে শূন্যতা নয়। আমার বক্তৃতাসভার (Seminar) তালিকায় এই বৎসর আমি যে বস্তুর নাম রাখিয়াছি ‘উদ্ভট কল্পনার যুক্তি’ সেই বিষয়যোগের ঘোষণা দিব। মনে হইতেছে আমার চেষ্টার বেশির ভাগই নিয়োজিত হইবে নানান ধরনের খিল, নানান ধরনের খোয়া, নানান শূন্যতার সংজ্ঞা ঠিক করার পিছনে। এইগুলি একেকটা একেক জাতের, কোনই মিল নাই একটার সহিত অন্যটার। অনুপস্থিতির কথাই ধরুন না কেন? রাণীর অনুপস্থিতি, এই ধরণের অংকুরের সহিত কিছু একটা যোগ করিতে হয় কিন্তু রাণীর অনুপস্থিতি অস্বীকার করিতে হইলে…। আমার ধারণা নিছক শূন্যতা ধারণাটির অস্পষ্টতা এই প্রসঙ্গে কোন কাজে আসিবে না। আমার নিজেরই উধাও হইবার আগে আমাকে যাহা করিতে হইবে, সব কিছুতেই আমার দেরি হইয়া যায়। তবে করিবার মতন কাজটি আগাইয়া নেওয়াও কম কঠিনও নয়। এক ধাপে এক একটা করিয়া আগাইবার দরকার আছে। এখন আমি এই নানান ধরনের ‘অভাব’ (lack) লইয়া আলোচনা করিব।

[কট সাহেব ও ডা: লাঁকা দেওয়ালপটযোগে মোবিয়ুস ফিতার (Möbius strip) নানান বৈশিষ্ট্য লইয়া আলোচনা করিলেন]

ইয়ান কট
একটা মজার জিনিস আছে এইখানে। হয়তো ইহা আপতিক। এই সকল ব্রত (motifs) অন্যবস্তুবাদী (surrealist) ছবিতে দেখিতে পাই। ইহাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক আছে কি?

লাকাঁ
অন্যবস্তুবাদী ছবির সহিত মনে হয় কমসে কম আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে।

পুলে
এই অবশের খোঁয়ারি যাহার কারণে সহজের আবির্ভাব ঘটে আপনি কি ইহার সহিত সার্ত্রের চিন্তার অন্তর্গত নাস্তি [le neant] জিনিসটায় কোন প্রকার যোগ আছে মনে করেন? প্রুস্তের রচনার গোড়ার দিকে দেখা যায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগিয়া উঠিল, তাহার অবস্থার সহিত ইহার তুলনা দেওয়া কি যাইতে পারে? আমাদের মনে পড়ে স্বপ্ন দেখিতে লোকটি জাগিয়া উঠিল আর দেখিল কি যেন হারাইয়াছে। কি যেন নাই। বড় কথা সে নিজে নাই। ইহার সহিত কোন তুলনা কি চলে?

লাকাঁ
আমার ধারণা প্রুস্ত বহুবারই অজ্ঞানের কয়েকরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পোঁছেছিলেন। প্রুস্তের লেখায় এমন অনেক পৃষ্ঠাব্যাপী বা কাছাকাছি বিস্তৃত অংশ পাওয়া যায় যাহা সহজেই আলাদা (découper) করা যাইবে। আমার মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক। প্রুস্ত প্রায় কাছাকাছি চলে যান, তবে তিনি প্রস্তাব আকারে ইহার বিস্তার না ঘটাইয়া নিজের ব্যবসায়–মানে সাহিত্যে–ফিরিয়া আসেন। উদাহরণ লওয়া যাইতে পারে কুমারী ভঁতুইয়ের, বয়ানকার যে দৃষ্টিতে তাহাকে তাহার বন্ধু ও তাহার বাবার ছবি হাতে দেখেছেন তাহার কথা বলিতেছি। আমার মনে হয় না আর কোন সাহিত্যশিল্পী কখনো এহেন ছবি আঁকিয়াছেন। হইতে পারে ইহা হইয়াছে তাহার খোদ কর্মপরিকল্পনার সময় পুনরুদ্ধারের এই আলিশান কর্মকাণ্ডের স্বভাব অনুযায়ী। এই প্রকল্পই তাহাকে পথ দেখাইয়াছে, এমনকি জ্ঞান যতদূর পর্যন্ত যাইবার সাধ্য রাখে তাহার বাহিরেও দেখাইয়াছে।

সিগমুন্ড কখ (Koch)
আপনার বক্তৃতার একটা ধরন নিয়তই আমার দৃষ্টি এড়াইয়াছে। আপনি ইংরেজিতেই বলিয়াছেন, ইহা ছাড়া আমি ইহা হইবার অন্য কোন কারণ দেখিতেছি না। আপনি পূর্ণসংখ্যা ২ লইয়া অনেক ভারি কথা কহিয়াছেন, বিশেষ পূর্ণসংখ্যা ২ য়ের জন্ম লইয়া। আমার যতটুকু স্মরণ হয় আপনার বিশ্লেষণ হইতেছে এই যে আমরা এক নির্দেশক দাগ দিয়া শুরু করিলে দাগাংকিত খাড়াইয়া যায়, ফলে আমরা ২ এর মুখোমুখি হই বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। দাগাংকিত আর দাগানংকিতর সহিত তুলনা দিবার জোড়া কোথায় পাইব? দাগাংকিত মানে কি জ্ঞানতন্ত্র আর দাগানংকিত মানে কি অজ্ঞানতন্ত্র? দাগাংকিতই কি সজ্ঞান মানুষ আর দাগানংকিতই কি অজ্ঞান মানুষ?

লাকাঁ
ফ্রেগের লেখা হইতে আমি শুদ্ধ হইতে ধার করিয়াছি যে শূন্য সংখ্যাটি যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যবাচক সংখ্যা সেই শ্রেণীই হইতেছে ১ সংখ্যার ভিত্তি। মনোবিশ্লেষণসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গক্রমে আমি ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি একটি কারণে, তাহা হইতেছে এই–‘এরোস’(eros) বা রতির রূপরেখা আঁকিতে গিয়া ফ্রয়েড ২ সংখ্যার উপর বেশ গুরুভার আরোপ করিয়াছেন। জীবনের পরিসরে যে শক্তি একতাসাধন করিয়া থাকে তাহার নামই রতিশক্তি, আর ইহাতে ভিত্তি করিয়া অনেকানেক মনোবিশ্লেষক যৌনাঙ্গের পরিপকৃত বলিয়া একটা কথা বাহির করিয়াছেন। ইহার ভিত্তিতে তাহারা দাবি করিয়াছেন যেমন ‘নিখুঁত বিবাহ’ বলিয়া কোন জিনিস সম্ভব। লক্ষ্য হিসাবে বিষয়টি রহস্যাবৃত আর সাংঘাতিক একগুঁয়েমির সহিত ইহার পক্ষে প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে। যে শ্রোতামণ্ডলির সহিত ফ্রেগে উত্থাপিত সমস্যাটির পরিচয় ঘটে নাই শুদ্ধ তাহাদের কথা মাথায় লইয়া আমি, পহিলা দফায়, এই ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি। ১ সংখ্যার মোকাবেলায় ০ সংখ্যা। এই পহিলা পরিচয় পর্বে, যে কর্তব্য সম্পাদন করিতে পারিতে ২ সংখ্যার মোকাবেলায় ১ সংখ্যাটিও সেই কর্তব্য করিতে পারিবে।
আপনার দুই নম্বর সওয়াল প্রসঙ্গে বলিতেছি।

lacan2.jpg
জাক লাকাঁ

যাহারা ফ্রয়েডের লেখার সহিত কোন প্রকার খুঁত ব্যতিরেকেই পরিচিত রহিয়াছেন তাঁহারা জানেন এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমি স্বভাবগত নিয়মেই উহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দাবাইয়া রাখা প্রসঙ্গে এই কথাটি একদমই ভুলিয়া থাকা চলিতে না যে ফ্রয়েড বলিয়াছেন দাবাইয়া রাখার রহস্য যাহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে তাহাকে জার্মান ভাষায় বলে ‘উয়রফেরড্র্যাংগুঙ্গ’ (urverdrängung) বা আদ্যদমন। আমি আজ আমার প্রস্তাবের পুরাটাই এখানে সূত্রমাফিক পেশ করিতে পারি নাই, ইহা স্বভাবগত কারণেই ঘটিয়াছে। সূত্রবদ্ধ করা ফ্রয়েড ঘরানার ভাষায় যাহাকে ঘনায়ন (condensation) বলে তাহা বুঝাইতে হইলে রূপকের ওপর গোড়াতেই নির্ভর করিতে হয়, ইহা জানা না থাকিলে কিন্তু একদমই চলিতেছে না। [ডা. লাকাঁ কালো বোর্ডে ‘অক্ষরের নাছোড়বান্দামি’ (L’instance de la lettre) বিষয়ের সার দেখাইয়া তাঁহার মন্তব্য শেষ করিলেন।]

গোল্ডমান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমি যে উপায়ে কাজকারবার চালাইতেছি তাহার কারণে একটা জিনিস আমার দৃষ্টিতে লাগে। ইহা আর কিছুই নয়, গুরুত্বপূর্র্ণ, ইতিহাসভিত্তিক, দশজনীন ঘটনাধারা আর গুরত্বপূর্ণ রচনাকর্ম লইয়া বিচার-বিশ্লেষণ করিতে আমার বিশ্লেষণকর্মে আমি কদাচ অজ্ঞান ধারণাটির প্রয়োজন অনুভব করি না। তথাপি আমি এই ভেদটা দেখাইয়া বলিয়াছিলাম: অবশ্য আমার প্রয়োজন হয় জ্ঞানহীন ধারণার। অজ্ঞান অংকুর ইতি আদি তো আছেই; কী কী উপায়যোগে ব্যক্তি নিজের হিসাব পেশ করিতেছে আমি তো তাহা বুঝিতে পারি না–আর, আমি তো বলিয়াছি, ইহা মনোবিশ্লেষণের এলাকা যাহার সহিত আমি মিশিতে চাহি না। কিন্তু দুই ধরনের ঘটনা আছে যাহা, সব ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুসারেই, সামাজিক বলিয়া মনে হয় আর এই সব ঘটনা বুঝিতে হইলে আমাকে অজ্ঞান নয় জ্ঞানহীনের সাহায্য লইতে হয় আমার মনে হইতেছে আপনি বলিয়াছেন অজ্ঞান দশজনের ভাষা ইংরেজি ফরাসি প্রভৃতি যে সকল ভাষায় আমরা কহিয়া থাকি সেই রকম ভাষা।

লাকাঁ
আমি বলিয়াছি ভাষার, ইংরেজি বা ফরাসি ইতি আদির মতন।

গোল্ডমান
কিন্তু এই ভাষা হইতে স্বতন্ত্র? তাহা হইলে তো আমি হাসিব: আমার আর কোন প্রশ্ন রহিল না। সজ্ঞান আমরা যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি এই জিনিস তাহার সহিত যুক্ত।

লাকাঁ
জ্বি, হা।

গোল্ডমান
সঠিক আছে। আমি যদি আপনার কথা ঠিকমতো বুঝিয়া থাকি, দোসরা যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কাটিয়াছে। সজ্ঞান মানে যে স্তরে অজ্ঞান ধারণাটির সাহায্য ছাড়াই আমার চলিয়া যায় সেই স্তরে কয়েকটা। প্রক্রিয়ার সহিত তুলনা দিবার মতন কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যায়। পাসকাল, হেগেল, মার্ক্স ও সার্ত্র হইতে শুরু করিয়া বলিতে এমন কিছু জিনিস আমরা জানি যাহা অজ্ঞানের তোয়াক্কা করে না: প্রভেদের সঙ্গে এই ধ্রুবগুলি যোগ করিয়া মানুষ কী তাহার সংজ্ঞা দেওয়া চলে। পাসকাল বলিয়াছেন: ‘মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াইয়া গিয়া কেহ’ (dépasse l’ homme) কিছু করে না। অজ্ঞানের দোহাই না দিয়াও বলা চলে, এই ফাঁকটুকুর সাহায্য ছাড়া ইতিহাস কিংবা গতিবিদ্যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সজ্ঞান মনের স্তরে আমি যে দোসরা ঘটনার দেখা পাই: সজ্ঞান মন যতখানি কর্মকাণ্ডের সহিত সংযুক্ত ততখানি বলিতে–কী জিনিস তাহা মনে তাহার অঙ্গীভূত ধ্রুব মানে অসাড় দ্রব্যের সাহায্য ছাড়া এবং এই ধ্রুবসকল সহিত প্রভেদের সংযোগ না ঘটাইয়া বলা যাইবে না। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা একাধিক হইলে তৎক্ষণাৎই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। ধ্রুববস্তুর অঙ্গসংস্থানের সহিত কর্মের ঘনিষ্ট সংযোগ। ইহার কারণেই প্রভেদের মধ্যে বিশেষ বিন্যাস সম্ভব হয়। এই বিশেষ মানুষ জন্ম লইবার আগে হইতেই ভাষা জন্ম লইয়াই বসিয়া আছে–এই ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি ইতি আদি) কি শুদ্ধ এর অতিশয়পনা সমস্যার সহিতই যুক্ত? এই সম্বল, ভাষা আর এই অসাড় দ্রব্য ছাড়া কোন সহজ মানুষ হইতে পারে না। আমার প্রশ্ন হইতেছে: এই সম্বলবাদ আর তাহার নানান হেরফের কি মাত্র এই অতিশয়পনা, এই অজ্ঞান আর বাসনারই আত্মীয়, নাকি ইহার সহিত কাজ নামে পরিচিত কোন কিছুর বাহিরে দুনিয়ার রূপান্তর এবং সমাজ জীবনেরও আত্মীয়তা আছে? আর আপনি যদি এইগুলির সহিতে আত্মীয়তার কথাও মানিয়া লয়েন তো একটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠে: যুক্তিটা কোথায়, বুঝিবার উপায়টা কই? মানুষ মানে কেবল সবটাকে এক করিবার আশা, আমি ইহা প্রত্যয় করি না। আমি সেইদিনও বলিয়াছি আমরা এখনও একটা মিশাল অবস্থার মুখামুখি হইতেছি। তবে মিশালটি বুঝিতে হইলে ইহার অংশ অংশ আলাদা করিতে হইবে, না করিলে চলিবে না।

লাকাঁ
আর আপনি কি মনে করেন এই স্রোতে আঁকড়াইয়া ধরিবার মতন ‘নোঙ্গর ঘাট’ যাহা পাওয়া যায় তাহার মধ্যে এই কাজও পড়িতেছে?

গোল্ডমান
আমি মনে করি সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষেও বলিতে হইবে মনুষ্যজাতি কিছু ভারি কাজের মতো কাজ করিয়াছে।

লাকাঁ
আমার মনে হয় না ইতিহাসের বই খুব একটা নিয়মবাঁধা বই। এই বিখ্যাত ইতিহাস, যাহাতে কোন ঘটনা অতীত হইয়া গেলে সকলেই সবকিছু এত ভাল করিয়া পায়, তাহা এমন কোন বাগদেবী নহে যাহার ঘরে আমার আস্থা রাখিতে পারি। এমন এক জমানা ছিল যখন–এই যেমন বসুয়ে যে যুগে লিখিতেছেন সেই যুগে ক্লিও খুব বড় গুরুত্বের দাবিদার লোক ছিলেন। হয়তো আবার আগের মার্কসের যুগে। তবে ইতিহাসের ঘরে আমি শুদ্ধ বিস্ময় পাইতে চাই। এই মত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টায় আমি সফল হই নাই, যদিও আমি প্রচণ্ড চেষ্টা করিয়াছি। আপনি যে সকল স্থানাংক দিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন আমি সেইগুলির সাহায্যে নয়, অন্য স্থানাংকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করি। বিশেষ বলিতে, কাজের সমস্যাটিকে এই স্থলে আমি সম্মুখের সারিতে বসাইব না।

শার্ল মোরাজে
আজিকার আলোচনায় সংখ্যার জন্ম কী করিয়া হয় তাহার ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গোল্ডমান সাহেবের উত্তর দিতে গিয়া বলিব, আমি যখন ইতিহাস পড়ি তখন আমি ভরসা রাখি এই একই সংখ্যার জন্মের উপর, মনে করি ইহারাই সবচেয়ে নিরেট অখিল জগত। ইহার মুখামুখি অবস্থায় দাঁড়াইয়া আমি একটা প্রশ্ন করিতে চাহিতেছি, উদ্দেশ্য আমরা যাহা যাহা সত্য বলিয়া অনুমান করিয়া লইতেছি তাহা আসলেই এক না ভিন্ন তাহা পরখ করিয়া দেখা। আমার মনে হয় বক্তৃতার শুরুতে আপনি কহিয়াছেন যে আপনার কাছে সজ্ঞান মনের গঠন ভাষার মতন, আবার শেষদিকে আপনি কহিলেন, অজ্ঞান মন ভাষার আকারে গঠিত। আপনার এই দ্বিতীয় প্রস্তাবখানি যদি সঠিক হইয়া থাকে, তবে আমার বক্তব্যও তাহাই।

লাকাঁ
অজ্ঞান মনই ভাষার আকারে গঠিত–এই বক্তব্যের হেরফের আমি কখনই করি নাই।

রিচার্ড ম্যাকসি
এই অধিবেশন বাবদ যে পরিমাণ ভুলবোঝাবুঝি (méconnaissances) আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, হইতে পারে তাহার সবটুকুই আমরা ইহার ভিতর খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। তাহার পরও আপনি ফ্রেগে আর রাসেলের যে দোহাই দিলেন তাহার প্রভাব আপনার ভাববাদে (ontology) (বা নিদেনপক্ষে আপনার ভাবজগতে) কেমন পড়িয়াছে তাহা লইয়া আমার এখনও একটু ঘোর থাকিয়া গেল। উদাহরণ দিতেছি, আপনি গণিত হইতে যে উদাহরণ দিলেন তাহার একটা অর্থ হইতে পারে আপনি অখিল জগতবাদ প্রস্তাবের চরম ভাষ্যে বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন এইখানেই। সম্পূর্ণ বর্ণনা অসম্ভব হইলে অখিল জগৎ ধ্বসিয়া পড়িবে এই যুক্তি আমাকে বিচলিত করে না। কারণ গোয়ড়েল (Gödel) নিজেই বলিয়াছেন তিনি অখিল জগৎবাদে আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন এই উপপাদ্যের অর্থ আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে সম্বলবাদের প্রকাশক্ষমতার গোড়াতেই একটা সীমা আছে। আমি মনে করি যুক্তিওয়ালা প্রস্তাবটাই বরং গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের লেখকগণ যদি কয়েকটি সেটের বিশেষ সেট বলিয়া স্বাভাবিক সংখ্যার সংখ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তবে–প্রসারতত্ত্বে যে সকল ভাষাপারের ভাষাসংশ্লিষ্ট (metalanguage) গণ্ডগোল বাধে তাহার কথা ছাড়িয়াও বলা যায়–আমরা পাল্টা বলিতে পারি তাহাদের সিদ্ধান্তটা মনগড়া, কারণ সেটতত্ত্বে–মানে যে সেটতত্ত্ব প্রকারতত্ত্বের ভিতে দাঁড়াইয়া নাই–তাহাতে উদাহরণস্বরূপ যে সেটের একমাত্র সংখ্যা খিল সেট, ইতি আদি ক্রমে তাহাই ‘এক’ সংখ্যার সংজ্ঞা বলা যাইতে পারে যাহার বলে স্বাভাবিক সংখ্যার প্রচলিত ধর্ম অক্ষুণœ থাকে। সুতরাং আমরা সওয়াল করিতে পারি কোন সেটটিতে ‘এক’ সংখ্যা হয়? কয়েক মাস আগে পল বেনাসেরাফ (Paul Benacerraf) এই ধারার যুক্তিকে আরো টানিয়া নিয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন স্বাভাবিক সংখ্যার অনপনেয় ধর্ম আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে এই সংখ্যা পুনরাবৃত্তিভিত্তিক প্রগমন বটে। সুতরাং এই নিয়মতন্ত্রে না হয়, ঐ নিয়মতন্ত্র যাহাতে এই প্রগমন সম্ভব তাহাতেই কাজ চলিবে। এই নিয়মতন্ত্রের ধর্ম মিলিতেছে বিশেষ সংখ্যার দাগে নহে, বরং আত্মীয়পরম্পরাভক্ত, নিষ্কায়া গঠনে (অঙ্গীভূত অসাড় দ্রব্যে নয়)। অখিল জগতবাদী (realist) প্রস্তাবমাত্রই যাহা দাবি করেন সেই প্রস্তাব অর্থাৎ সংখ্যা ও ভাব বা অবশ দ্রব্য মাত্রই সমান (আর এক জাতীয় ধারণাপন্থী বা নামকাওয়াস্তে গঠনতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখায়) কথাটি এই হামলার মুখে পড়িতেছে।

original post

read more

মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি

by সলিমুল্লাহ খান

foucault1.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

~ মিশেল ফুকো বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের সেমিনার ~

মুখবন্ধ

নিচের প্রবন্ধটি বর্তমান লেখকের বলা একটি বক্তৃতার লিখিত ভাষ্য। ফিতার রেকর্ড থেকে অক্ষরে লিখে নেওয়ার মেহনতটুকু করেছেন আমার বন্ধু জামিল আহমদ। তিনি আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। এই বক্তৃতা কয় তারিখে দিয়েছিলাম রেকর্ডে তার নিদর্শন নাই। আমার ধারণা তারিখটা হয়ত মার্চ কি এপ্রিল মাসের কোন শুক্রবার হবে। যতদূর মনে পড়ে এই বক্তৃতামালা শেষ করেছিলাম মোট আট দিনে। বর্তমান লেখাটি দ্বিতীয় দিনের রেকর্ড থেকে তৈরি করা বলে মনে হয়। প্রথম দিনের বক্তৃতা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সঠিক রেকর্ড হয় নাই।

জানিয়ে রাখা যায় আমাদের বিজ্ঞাপিত সমাজের সামান্য নাম ছিল ‘জাক লাঁকা বিদ্যালয়’ আর ঐবারের বিশেষ বক্তৃতামালা প্রচারিত হয়েছিল ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’ নামে। মিশেল ফুকো তাঁর দেশের অপর প্রভাবশালী তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁর ঋণ বিশেষ স্বীকার করেন নাই। তবে লাকাঁর ঋণ তিনি দুই হাতেই নিয়েছেন।

তত্ত্বজ্ঞানী জাক দেরিদার সঙ্গে ফুকোর মতভেদ প্রকৃত প্রস্তাবে মহাত্মা লাঁকার শিক্ষার দুই দিক নিয়ে টানাটানির অধিক নয়। জাক লাকাঁ ভাষার বা পদের একাধিপত্য বলে যে উপপাদ্য প্রচার করেন, দেরিদা সেই বক্তব্যই নিজের বলে জাহির করেছিলেন। ‘লেখার বাহিরে কিছু নাহিরে’ বলে তিনি বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বৈ কি ।

মিশেল ফুকো আঁকড়ে ধরেন জাক লাকাঁর অপর একটি উপপাদ্য। এই উপপাদ্য অনুসারে মানুষের ইতিহাসে ভাষাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা ‘সহজ মানুষ’ বা সাবজেক্ট। যে ইতিহাসে অর্থ তৈরি করে থাকে তাকেই সহজ মানুষ বলে। জীবনের শেষদিকে ফুকো প্রকারান্তরে সেই সত্য স্বীকার করেছিলেন। বাতি জ্বালানি বা এনলাইটেনমেন্ট বিষয়ে মহাত্মা ফুকোর বক্তব্যে সেই অঙ্গীকারের পুবাল হাওয়ার ছোঁওয়া পাওয়া যায়।

সকলেই জানেন মনীষী মিশেল ফুকো ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮৪ (অর্থাৎ তাঁহার অকাল মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় কলেজ দহ ফঁসের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি ঐ বিদ্যালয়ে যে অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করতেন তার নাম ছিল ‘চিন্তাজগতের ইতিহাস’। ইতিহাস বিচারে প্রতিষ্ঠালব্ধ ফরাসি মনীষী ফেরনঁ ব্রদেল (Fernand Braudel) প্রস্তাবিত পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। ব্রদেল যেখানে এক যুগের সহিত অন্য যুগের যোগধর্ম বা ‘কনটনুয়িটি’ আবিষ্কার করার দিকে মন সংযোগ করতেন সেখানে ফুকো যুগান্তর বা এক যুগের সহিত অন্য যুগের বিয়োগধর্ম অথবা ‘ডিস্কনটনুয়িটি’র জয় ঘোষণা করতে বিস্তর দিনক্ষণ ব্যয় করেছিলেন। (দান্তো ১৯৯৮: ১৮১-৮২)

এই দিক থেকে দেখলে ‘মানুষের অবসান’ বিষয়ে ফুকো প্রচারিত বিতর্কে বিয়োগধর্মই বড় মনে হয়েছিল। অথচ এনলাইটেনমেন্ট ওরফে ‘বাতিজ্বালানি’ বিষয়ে তাঁর কহতব্য কী হিসাব করলে বিপরীত সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য ঠেকে। হিয়ুম্যানিজমে নাস্তিক্যজনিত অনিকেত ফুকো শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টে আস্তিকতা অর্জন করেছিলেন।
(৯ নবেম্বর ২০০৭)

মূল বক্তৃতা

ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন এই নামে একটা বই ইংরেজিতে বেরিয়েছে। এটা তাঁর লেখার কালেকশন। বইটা এখনও আমার হাতে আসে নাই। আপনারা অবশ্যই জানেন ঢাকায় গবেষণা করতে বড় অসুবিধা - সাহিত্যের, বইপত্রের অভাব। আপনি যদি এয়ুরোপীয় বিদ্যা নিয়ে আলোচনা করতে চান, আপনার এয়ুরোপীয় ভাষা জানতে হবে। আর ভাষা জানলেও চলবে না, এয়ুরোপীয় মালটা, মেটারিয়েলটা তো বাজারে বা লাইব্রেরিতে পেতে হবে। আমাদের এখানে এমন কোনো লাইব্রেরি নাই, যেখানে আপনি গোছানোভাবে এয়ুরোপীয় সাহিত্য পাবেন। তো আমরা নির্ভর করি সাধারণ ব্যক্তিগত যোগযোগের উপর।

এখন ‘ফুকো’র এই লেখাগুলো সম্পর্কে একটা বাড়তি কথা আছে।

ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে উনি কিছুদিন উৎসাহ বোধ করেছিলেন। অবশ্য পরে সেই উৎসাহের আগুনে কিছু বালিও ঢেলে দেয়া হয়। ঢেলে দেন তিনি নিজেই। সেইজন্য আমরা এ বিষয়ে তাঁর লেখা সব আর সহজে পাই না। এগুলো ঠিক তাঁর বন্ধুরাও আর ছাপতে চান না। ঘটনাচক্রে এই লেখাগুলোর একটা ইংরেজি সংকলন বেরিয়েছে ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন নামে। আগেই বলেছি, সেটা আমি জোগাড় করতে পারি নাই। সৌভাগ্যের মধ্যে ফরাসিতে যে কয়টা লেখা বের হয়েছে সেগুলো আবার আলাদাভাবেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, আমি পড়েছি ওই কয়টাই ।

এসব লেখা ফুকোর তিনটা ইংরেজি বইয়ে পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এসেনশিয়াল রাইটিংস্ অব মিশেল ফুকো নামে প্রকাশিত হয়েছে এগুলো। এক ভলিয়ুমের নাম এথিক্স। দ্বিতীয়টার নাম এস্থেটিকস্। তিন নম্বরের নাম পাওয়ার। আমার হাতের এই বই [ফটোকপি দেখিয়ে] আমি কিছু কিছু এইসব থেকে তৈরি করেছি।

আমাদের এই সেমিনারের বিষয় মিশেল ফুকো। আমরা বাংলায় বলছি ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’। ইংরেজিতে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিশেল ফুকো’। তো এখন প্রশ্ন হবে, সবাই বলবে - ‘মিশেল ফুকো’তে আমাদের আগ্রহ কেন? উত্তর হতেই পারে যে মিশেল ফুকো সম্পর্কে যে কোনো লোক যখন আগ্রহী আমরা তখন আগ্রহী হবো না কেন? কিন্তু আমি বিশেষ বলছি ফুকো কখন বিখ্যাত হন।

ফুকোর বিখ্যাত থিসিসের কথা ছেড়ে বললে বলা যায়, তাঁর প্রথম বিখ্যাত বই ১৯৬৬ সনে প্রকাশ পায়। সেই বইয়ের নাম ইংরেজিতে দি অর্ডার অব থিংস। এইটা অনুবাদ। ১৯৭০ সনে হয়েছে। মূল নাম ছিলো ‘লে মো এ লে শোজ’ (Les mots et les choses) মানে ‘ওয়ার্ডস এন্ড থিংস’। এই বইয়েরই ইংরেজি নাম হয়েছে ‘দি অর্ডার অব থিংস’।

সাবটাইটেলটা লক্ষ্য করবেন: ‘এন আর্কিওলজি অব দি হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’। ফ্রান্সে যেটাকে ‘হিয়ুম্যান সাইন্সেস’ বলে ইংরেজিতে তাকেই আমরা ‘হিয়ুম্যানিটিজ’ আকারে চিনি। সেখান থেকে তিন চারগুচ্ছ বেছে নিয়েছেন ফুকো। তাদের জন্মবৃত্তান্ত - মানে ইতিহাসই বলা যায় - আলোচনা করেছেন। তার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। যেটাকে আমরা পশ্চিমে হিয়ুম্যানিজম বলি সেটা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করার মত। আমি ফুকোর থিসিসটা সংক্ষেপে আপনাদের বলছি। এতদিন যেমন আমরা মনে করতাম, হিয়ুম্যানিজম ও এনলাইটেনমেন্ট একই জিনিস। এই দুইটা বড় বড় শব্দ পশ্চিমা দর্শনে আছে, এই দুইটাকে আমরা প্রায় একই মনে করতাম। অথচ এই দুই জিনিস এক জিনিস নয়। দুইটাকে আলাদা করতে হবে।

১৯৬৬ সনে ফুকো বলেছিলেন ‘আমি হিয়ুম্যানিজম জিনিসটা পছন্দ করি না’। কারণ ‘হিয়ুম্যান’ কথাটাই অসার ও অর্বাচীন। হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক হিসেবেই তিনি এই বইটা লেখেন। যদিও দেখবেন নাম আছে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’, তথাপি খেয়াল রাখবেন ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ যে অর্থে বলা হয় সেই অর্থে হিয়ুম্যানিজম বলাও চলে। যেমন ধরেন আগে স্কুল কলেজে যে বিষয়বস্তু পড়ানো হতো, যেমন গ্রামার বা বলা যাক আরবিতে যাকে বলে তফসির বা ইন্টারপ্রিটেশন, সেই ধরনের জিনিসকে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ এয়ুরোপখণ্ডে বলা হতো। এয়ুরোপে ওগুলোর নাম ছিল ‘হিয়ুম্যানিস্ট স্টাডিজ’। আমরা যে এখনো হিয়ুম্যানিটিজ গ্রুপ (মানবিক বিদ্যা) আর সায়েন্স গ্রুপ (বা বিজ্ঞান বিদ্যা) যোগে ম্যাট্রিক বা এসেসসি পাস করি ওইটা ওই জায়গা থেকেই এসেছে।

‘হিয়ুম্যানিজম’ কথাটা আস্তে আস্তে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। একটা উদাহরণ দেখাতে পারি। যেমন আপনি গ্রামার পড়েন। কেন পড়েন? কারণ আপনি ভাষা বুঝতে চান। তা ভাষা পড়েন কেন? কারণ মানুষ ভাষায় কথা বলে। তাহলে, দি স্টাডি অব গ্রামার এন্ড দি স্টাডি অব ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যান বি আল্টিমেটলি রেফারড টু ইয়োর ইন্টারেস্ট ইন হিয়ুম্যান বিয়িংস অর দি হিয়ুম্যানিটি এ্যাজ এ হোল। এই হচ্ছে বিষয়। শেষ বিচারে আপনি মানবে আস্থা রাখেন। আপনি মানবজাতিতে আগ্রহী, মানবজাতি কথা বলে সুতরাং কথা বলাটাই মানবজাতির চরিত্র। এই অর্থে আপনিও হিয়ুম্যানিস্ট। এখন আমরা বলি কি আপনি যদি ইতিহাস পড়েন, তো আপনি হিয়ুম্যানিটিজই পড়ছেন। নানাভাবে আমরা শব্দগুলির আকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছি। হিয়ুম্যানিটি কথাটা লক্ষ্য করেন, এইটা থেকে হিয়ুম্যানিটিজম না হইয়া হইল ‘হিয়ুম্যানিজম’। একসময় একরকম বলা হতো, আস্তে আস্তে এর বদল ঘটলো। শব্দের ইতিহাস ট্রেস করলে, তার পায়ের চিহ্ন ধরে আগাইলে আপনি এটা বুঝতে পারবেন।

খুব সংক্ষেপে বলছি। ফুকো এপিয়ারড ইন ১৯৬৬ এ্যাজ এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। লক্ষ্য করেন। এখন হিয়ুম্যানিজম মানেটা কী? আমি সেজন্য বলছি, তখন ফ্রান্সে যে বস্তুকে ‘সিয়ঁস উমেন’ বা ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ বলা হতো সেটাই আমাদের বিদ্যার মানবিক শাখা। ওরা ফ্রেঞ্চে হিয়ুম্যান উচ্চারণ করে উমেন (humaine) আকারে।

এই যে উমেনের সমালোচনা ফুকো করলেন তার সুদ বাবদ ওঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আনুমানিক বারো বছর পর ১৯৭৮ সন নাগাদ উনি ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু?’ নামধারী প্রবন্ধটা লেখেন। এটা সেই ১৯৭৮ সালের প্রবন্ধ। আমি দেখাতে চাচ্ছি বারো বছরের মধ্যে কী পরিবর্তনটা হলো। পরিবর্তনটা হয়ে গেল। ফুকো বলছেন যে, ‘১৯৬৬ সনে কী যেন বলেছিলাম আমি, তার দ্বারা আমি চিরকাল বন্দি থাকবো কেন? আমি তো বন্দি থাকতে বাধ্য নই। আই হ্যাভ এ রাইট টু চেঞ্জ মাই ওপিনিয়ন। প্রত্যেকে নিজের মতামত বদলাতে পারে।’

কিন্তু আমাদের আগ্রহ হলো উনি কী, কোন যুুক্তি দেখিয়ে নিজের মতামত বদলালেন? অথবা তিনি যেটা বলছেন সেটা দিয়ে আমাদের প্রতারিত করছেন না তো? সত্যি বদলেছেন কি নিজের মতবাদ? তখন আরেকটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, হোয়াট ইজ (হু ইজ নয়) দি রিয়েল মসিয়ঁ ফুকো? আসল ফুকো কোনটা? আমরা দেখব এটাও পরে অনেক লোকের মাথাব্যথার কারণ হবে।

আমি আবার বলি। ১৯৬৬ সনে ফুকো বলছেন, ‘আমি হিয়ুম্যানিস্ট নই, আই অ্যাম এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম এ্যাজ এন এপ্রোচ।’ আবার পরে বলছেন কি, ‘আই স্টিল রিমেন এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। বাট নাউ লেট মি টেক আউট এনলাইটেনমেন্ট ফ্রম দ্যাট ডুয়ো - আওয়ার কাপল্। আগে হিয়ুম্যানিজম বলতে এনলাইটেনমেন্টকেও বোঝানো হতো। কমসে কম ফ্রান্সে বোঝান হতো। সেই জন্যই উনি বলছেন, আমার ক্রিটিসিজম ইজ স্টিল ভ্যালিড ইন সো ফার এজ হিয়ুম্যানিজম ইস কনসার্নড. … ..বাট আই অ্যাম নাউ এ ফলোয়ার অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রেডিশন।’ কিন্তু আমরা ১৯৬৬ সনে মনে করেছিলাম, হি ইজ এ ক্রিটিক অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রাডিশন টূও, হি ইজ এগেইন্স্ট দি এনলাইটেনমেন্ট।

আর ১৯৭৮ এর পর থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত (ওঁর মৃত্যু হয়েছে ১৯৮৪ সনে) এই সাত বছর উনি অনবরত একটি ভিন্ন মতবাদ প্রচার করেছেন: হোয়াট উই নিড টুডে ইজ এ নিউ এনলাইনটেনমেন্ট। এয়ুরোপের আজকে দরকার নয়া বাতি। অ্যামেরিকার আজকে দরকার নয়া বাতি। আজ সারা পৃথিবীর দরকার নয়া বাতি।

তাহলে ইনি নয়া ‘বাতি-জ্বালানি’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) বলতে কী বোঝাচ্ছেন? আগের লোকেরা এনলাইটেনমেন্ট বলতে কী বোঝাত? তারপর তিনি পরিষ্কার উচ্চারণ করেছেন, আমি যাঁদের উত্তরাধিকারী তাঁদের মধ্যে - আমার পূর্বসূরীদের মধ্যে - ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বটেন। এইটা মনে রাখা দরকার। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে তাঁর সমসাময়িক দার্শনিক কে? হাবারমাস (Habermas)। মিশেল ফুকোর জন্ম ১৯২৬ সনে। হাবারমাসের ১৯২৯ সনে। মানে ফুকোর চেয়ে তিনি তিন বছরের ছোট। হাবারমাসের একটা বই আছে ‘দ্যা ফিলোসফিকাল ডিসকোর্স অব মডার্নিটি। ওতে একলা ফুকোর উপর আছে দুইটা অধ্যায় আর অন্যান্য দার্শনিকদের উপদেশ মিলিয়ে মোট বারোটা অধ্যায়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বই। তাতে আপনি দেখতে পাবেন মিশেল ফুকো এবং হাবারমাসের মধ্যে কিছু মিল আছে আবার কিছু অমিলও আছে। আমার বক্তব্যের সারকথা এটাই।

মিশেল ফুকো যিনি ১৯৬৬ সনে হিয়ুম্যানিজমের সমালোচকরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি ১৯৭৮ সন নাগাদ নিজের মতবাদ খানিকটা বদলিয়ে নিলেন। আমরা এখন অনুসন্ধান করবো, আদৌ তিনি বদলিয়েছেন কিনা। এই আমার প্রস্তাব, এই আমার প্রতিপাদ্য। আমাদের শুদ্ধ দেখতে হবে ফুকোর উপপাদ্যটা কী? উনি কী প্রমাণ করতে চান? হিয়ুম্যানিজমকে উনি যদি বর্জনই করেন তো হিয়ুম্যানিজমের ত্রুটিটা কী? আর উনি যদি নতুন করে এনলাইটেনমেন্টেরই ভক্ত হলেন তবে এনলাইটেনমেন্টের কোন গুণটা আছে যে ফুকো কারণে-অকারণে হিয়ুম্যানিজম-এনলাইটেনমেন্টর বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একলা এনলাইটেনমেন্ট তত্ত্বের আঁচলটি আকঁড়ে ধরেন?


এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে লক্ষ্য করবেন যাদের মধ্যে প্রথমে মিলন হয়েছিল, ফুকো প্রথমদিকে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখতে পেলেন। এখন আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আবার দুইয়ের মধ্যে নতুন মিলন ঘটাতে পারেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার।

তাহলে আমাদের আলাদাভাবে বলতে হবে হিয়ুম্যানিজম কী জিনিশ, আর এনলাইটেনমেন্টইবা কী বস্তু? তারপর আরেকটা কথা আছে। সেটাও এটার সাথে যুক্ত। আপনারা না বললেও আমি জানি, সেটার নাম ‘মডার্নিটি’, এদের সাথেই যুক্ত। আপনি তিন নম্বর হিসেবে বলতে পারেন। হিয়ুম্যানিজম, এনলাইটেনমেন্ট, মডার্নিটি। এই সব কথা এখনও এয়ুরোপে আলোচিত হয়।

এখন এয়ুরোপের নতুন দর্শনের যে অধ্যায়কে আমরা নাম দিচ্ছি ‘পোস্টমডার্নিজম’, তার প্রবক্তারা বলছেন ‘মডার্নিটি জিনিসটা একসময় জন্ম নিয়েছিল। এখন তার মৃত্যু হয়েছে।’ তারপরে আমরা আরেকটা মতবাদের জন্ম দিচ্ছি। এখন লক্ষ্য করেন এখানে একটা প্রভাবশালী শব্দ আছে ‘টাইম’। মডার্নিটি ইজ এ কনসেপ্ট রিলেটিব টু টাইম। ইট হ্যাজ বিন বর্ন অ্যান্ড ইট লিভড ফর এ হোয়াইল, সো ইট উইল ডাই সামটাইম অন। অর্থাৎ তাকে একটা অর্গানিজমের মত দেখতেছি। মডার্নিটি ইজ লাইক এ বডি, যার জন্ম আছে, বিকাশ আছে এবং মৃত্যু আছে।

কিন্তু মডার্নিটির আরেকটা ধারণাও আছে। এটার প্রবক্তা ‘বোদলেয়ার’। শার্ল বোদলেয়ার। ফরাসি কবি, যাঁর কবিতা আমরা অনেকেই ‘বুদ্ধদেব বসু’র বাংলা অনুবাদে পড়েছি। উনি বড় একজন চিত্র সমালোচকও ছিলেন। তাঁর অনেক চিত্র সমালোচনামূলক লেখা আছে। তার মধ্যে আমি দুইটা প্রবন্ধের রেফারেন্স রেখেছি এখানে, একটার নাম ‘দি পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ’। আরো লেখা আছে। সেটার মধ্যে বোদলেয়ার মডার্নিটির সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘মডার্নিটি ডাজ নট রিলেট টু এনি টাইম, ইট ইজ এন এটিচুড’। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই কিছু লোক আছে যারা মডার্ন আবার কিছু আনমডার্ন। এটা অনেকটা প্রগতি আর প্রতিক্রিয়ার মত। প্রত্যেক যুগেই কিছু ভালো মানুষ থাকে আবার কিছু মন্দ মানুষ থাকে। অর্থাৎ এমন নয় যে পৃথিবীতে মানুষ একসময় সবাই মন্দ ছিলো আর এখন আমরা সবাই ভালো, এমন নয়। মানে আগে সবাই ভালো ছিল আর এখন সবাই মন্দ হয়ে গেছি এরকম নয়। একটু যুগ ছিলো অন্ধকার যুগ আর এখন আলোকের যুগ, এটা ঠিক নাও হতে পারে। অর্থাৎ আলো অন্ধকার দিবালোক আর রাত্রির মত জড়াজড়ি করে থাকে। এই টাইপের একটি মতবাদ বোদলেয়ার বলেছেন। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘আধুনিক জিনিসটা একটা মনোভাবের ব্যাপার, এটা সময়ের ব্যাপার নয়, কাজেই আধুনিকতার মৃত্যু হতে পারে না অথবা আধুনিকতা প্রাচীনকালে ছিলো না এটা বলা যাবে না।’

এই জন্যই বলছি প্রাচীন ভারতের মহাভারত কাব্য যদি আপনি পাঠ করেন, সেটাও আধুনিক মনে হবে। হোমারের কবিতাও আধুনিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা মাঝে মাঝেই বলেছেন। বলেছেন এর মধ্যে একটু ভুলভাল মিশিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন কি, ‘মাঝেমাঝে নদী যেমন বাঁক পরিবর্তন করে সাহিত্যও তাই করে। সেটাই আধুনিকতা।’ কারণ রবীন্দ্রনাথ একটু ইংরেজি পড়ে আন্দাজ করে বলেছিলেন। তাঁর তো ইনজেনুয়িটি আছে, নিজস্ব চিন্তাক্ষমতা আছে। আধুনিকতার সংজ্ঞা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা প্রবন্ধ আছে। আপনারা দেখতে পারেন। ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামে একটা ছোট সংকলন আছে, তাতেও দেখতে পারেন।

তা প্রশ্নটা হলো ‘আধুনিকতা কি স্থায়ী জিনিশ?’ নাকি এটা কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ? এখন যাঁরা পোস্টমডার্নিজম বলছেন, তাহলে তাঁদের এই কথাটার অর্থ কী? একটা হতে পারে যে, আগে মানুষের মনোভাব দুই রকম ছিল। মানুষ ছিল আগে নারী ও পুরুষ । এখন আরেকটা জাতির জন্ম হয়েছে। ধরেন এর নাম হিজড়া। তাহলে দুই লিঙ্গের জায়গায় এখন তিন লিঙ্গ তৈরি করলাম। ভালোমন্দের সাথে মাঝামাঝি আপনি আরেকটা তৈরি করলেন, যারা ভালোও নয়, মন্দও নয়। এরকমই কি আধুনিকতা? নাকি, আধুনিকতা ক্রোনোলজিকাল। এই যে ক্রোনলজি, তা ক্রোনোস বা কালের দেবতার কথা। আমরা বর্ষ ভারতে বলি মা কালি, কালি আমাদের দেবীর নাম। অনেকের ধারণা যে ভদ্রমহিলার চেহারা কালো, তাই তাকে ‘কালি’ বলি আমরা। সেটা পপুলার। সুতরাং বলা যেতেই পারে। কিন্তু এটার মধ্যে আরেকটা কথা আছে, এ কথার অর্থ কালের করাল গ্রাস। কালি মানে ‘গডেস্ অব টাইম’। কাল সবকিছুকে গ্রাস করে। আমরা বলি না ‘তোমারে কালে খাইলো’? মাঝে মাঝে আমরা খারাপ কাল সম্পর্কে বলি আকাল। যথা: ‘আকালের সন্ধানে’।

সমস্যাটা এখানে: আধুনিকতাটা কি ক্রোনোস-এর ভিতরের না বাইরের? বোদলেয়ারের মতটাই আমি সংক্ষেপে বলছি। বোদলেয়ার যেহেতু বলছেন, ‘আধুনিকতা জিনিসটা সময়ের ব্যাপার নয়’ কাজেই আমিও বলবো, ‘পোস্টমডার্নিজম’ কথাটা কোনো অর্থই বহন করে না। ‘সিনস্ দেয়ার ইজ নো মৃত্যু হাউ ক্যান দেয়ার বি পোস্ট মর্টেম?’ যেহেতু মৃত্যু নাই তাহলে আবার মরণোত্তর ময়না তদন্ত হবে কী করে? জীবন্তের কি ময়না তদন্ত হয়? এটা বোদলেয়ারের বক্তব্য। আমি এস্তেমাল করলাম মাত্র।

ফুকো সাহেবও সেই বক্তব্যটাই গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করে ইমানুয়েল কান্টের যুক্তির গাছে ‘গ্রাফ্ট’ করেছেন। গ্রাফ্ট মানে কি? এই যে আম গাছে ‘কলম’ করেন আপনারা। গাছের উপর গাছ লাগিয়েছেন। তাহলে, নতুন একটা বাগান হয়েছে। সেই বাগানের নাম হয়েছে নতুন বাতি-জ্বালানি, নতুন এনলাইটেনমেন্ট। মডার্নিটি ইজ সামথিং ইটার্নাল, ইট হ্যাজ অলওয়েজ বিন। উনি বলছেন এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা এই: এনলাইটেনমেন্ট মানে এতদিন যেমন আমরা যা হিয়ুম্যানিজমের সাথে যুক্ত মনে করতাম সেইটা নয়।

একদা ঈশ্বর ছিলেন, এখন তিনি মারা গেছেন। এখন তাঁর জায়গায় প্রবেশ করেছে মানুষ। এটা এয়ুরোপীয় একজন বড় দার্শনিকের উক্তি। নাম নিৎসে। নিৎসের উক্তিটায় বলা হয়েছে কি না, ‘গড ইজ ডেড’। তার মানে ‘গড ওয়াজ ওয়ানস্ এলাইব’। এট লিস্ট। এই স্বীকৃতিটুকু তো আছে। আসুন এখন আমরা শুকরিয়া আদায় করি তিনি স্বীকার করছেন যে একসময় ঈশ্বর ছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘হু হ্যাজ অকুপাইড দি ডেড গডস্ চেয়ার’? এটিকে ব্যঙ্গ করেছে কার্ল মার্ক্সের শত্রুপক্ষ, আমেরিকান মিডিয়া। যেমন টাইম ম্যাগাজিন ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে একটা হেডলাইন করেছিলো, আমার মনে আছে। আমরা তখন ছাত্র। ওঁরা লিখেছিল, ‘গড ইজ ডেড, মার্ক্স ইজ ডেড এন্ড আই এম নট ফিলিং টুও ওয়েল মাইসেল্ফ’। ফরাসি দেশে আন্দ্রে গ্লুক্সমান বলে একজন দার্শনিক ছিলেন, ইনি কাজ করতেন সার্ত্রের সেক্রেটারি হিসেবে। উনি বলেন যে, ‘পৃথিবীতে এখন আস্তিকতার দিন শেষ হয়ে গেছে, এমনকি কম্যুনিজমের দিনও শেষ হয়ে গেছে, আর আমরা যারা তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি, সেই আমরাও বোধ হয় মারাই যাচ্ছি। তাহলে সামনের পৃথিবীতে কী আছে আমরা জানি না।’ কী এর নিহিতার্থ? তিনি মিশেল ফুকোর বন্ধু ছিলেন সেই সময়। অনেকটা ফুকোলশিয়ান (Foucaultian) বলা যেতে পারে। আমি ফুকোর উপর এটা আরোপ করবো না।


ফুকো একসময় বলতেন ‘আমি নিৎসের শিষ্য’। পরে দেখা গেলো কি উনি নিৎসের থেকে একটু গা মোচড় দিলেন। শেষ বয়সে উনিই প্রমাণ করলেন যে উনি কান্টেরও শিষ্য।

এখানে একটা কথা বলে রাখার দরকার আছে। আমরা যারা এয়ুরোপীয় দর্শনের ইতিহাস পড়তে চাই তাদের পক্ষে এই নামগুলো প্রথমে কতক ধূম্রজাল তৈরি করে। কান্টের লেখা আমরা সবটুকু পড়ি নাই। কাজেই আন্দাজ করে বলা যাবে না কান্ট কী জিনিস? সেটা ভারতীয় বিখ্যাত হাতির মত। কারো কাছে মনে হবে থামের মত, কারো কাছে কুলার মত, কারো কাছে ঢেঁকির মত। আমরা এখন দেখবো কান্টের কোন অংশটা কী? এইজন্য আমরা শুধু এইটুকু বলবো, এয়ুরোপে যে যুগটাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয় সেটাকেই আমি খুব সংক্ষেপে বলছি আমাদের যুগ। অষ্টাদশ শতাব্দি বলে যে বড় শতাব্দি ওইটাই এনলাইটেনমেন্টের শতাব্দি। মনে হতে পারে, আমিও মানুষের চোখে একটু ধুলা দিতে পছন্দ করি। কিন্তু আসলে তা নয়। মনে হয় আমরা এখনও কান্টের যুগেই আছি। নচেৎ আমাদের বাতিজ্বালানি শেষ হয় না কেন?

এখন কান্ট সাহেবের প্রবন্ধটাও লেখা হয়েছে একই নামে। কান্ট লিখেছেন হিসেব করে দেখেন সেই ১৭৮৩ বা ১৭৮৪ সময় নাগাদ। এটা অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ পর্যায়। তার মানে আমি এটা বলতে পারি, আমরা বলি কি, ‘দি ওউল অব মিনার্বা বিগিনস্ ইটস্ ফ্লাইট ওনলি আফটার ডার্ক।’ এটা হেগেলের বিখ্যাত উক্তি। মিনার্বা দেবির পেঁচাটি উড়াল শুরু করে সূর্য যখন অস্তাচলে বসে ঠিক তখন। অন্ধকার হয়ে আসছে যখন তখনই পেঁচা রাষ্ট্র হয়। দিনের বেলা পেঁচা বের হতে পারে না।
‘পেঁচা রাষ্ট্র করে দেয় পেলে কোন ছুতা,
জানো না সূর্যের সঙ্গে আমার শত্রুতা?’

কাজেই দিনের বেলা সে বের হতে পারে না। তাই উনি বলছেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন দার্শনিকের পক্ষে তাকে বোঝা হয়ত সম্ভব হয় না। ঘটনা যখন শেষ হয়ে যায়, দার্শনিক তখনই তার সূত্র তৈরি করেন।

কান্টের ক্ষেত্রে সেটা সত্য মনে হচ্ছে। এনলাইটেনমেন্ট প্রায় শেষ পর্যায়ে যখন এসে পৌঁছেছে এয়ুরোপে তখনই কান্ট এই প্রবন্ধটা লিখে বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বলতে আপনারা এতদিন যা মনে করতেন, এনলাইটেনমেন্ট তা নয়।’ ‘ইট ইজ সামথিং ডিফারেন্ট।’

তাহলে এনলাটেনমেন্ট বলতে আসলে এতদিন কী মনে করতেন এয়ুরোপের দার্শনিকরা? দুই একজনের নাম নেন। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে বড় দার্শনিক কারা? যেমন ভলতেয়ার। যাকে কখনো গুরু মানেন আমাদের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায়। তাঁর সম্পাদিত জিজ্ঞাসা পত্রিকা ঢাকায় আসতো বলে আমরা কিছু পড়েছি। উনি এখনো মনে করেন যে আমাদের বাংলাদেশের বা ভারতের মতন তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সমস্যা এনলাইটেনমেন্টের সমস্যা। আমরা এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দিব্যদৃষ্টি লাভ করি নাই। শিবনারায়ণ রায়ের বক্তব্য অনুসারে এনলাইটেনমেন্টই আমাদের মত গরিব দেশের প্রধান সমস্যা।

তো এনলাইটেনমেন্ট মানেটা কী? আক্ষরিক অর্থে ধরেন আপনি সন্ধ্যাবেলা একটা বাতি জ্বালান। সেটাই এনলাইটেনমেন্ট। যেখানে আগুন নাই, সেখানে আগুন নিয়ে আলো করা। এখন আগুনের দুটা সমস্যা। ইট জেনারেটস বোথ লাইট এন্ড হিট। এখন আপনি যদি এমন একটা আগুন দেখেন হুয়িচ জেনারেটস মোর হিট দ্যান লাইট, তাহলে সেটা অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। আমরা আগুন এনেছি আলো করার জন্যে, কিন্তু অধমদের দেশে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ড। আমরা মনে করি কি এনলাইটেনমেন্ট বলে একটা আদর্শ এয়ুরোপে তৈরি হয়েছে, সেটা আমরা আমদানি করেছি, ইচ্ছায় হোক আর বাধ্য হয়েই হোক। এইটা আমাদের দেশে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুন আলোর জন্য না অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর জন্য সেটাই বিচার্য বিষয়। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, আগুন জ্বালানোই আমাদের দায়িত্ব, তা অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে না আলোক দান করবে সেটা পরের ব্যাপার।

এই ধরনের একটা এটিচুড আছে। এই এটিচুডের একটা উদাহরণ ‘গোলাম মুরশিদ’। তিনি আমাদের এখানে শিব রায়ের ছাত্র। উনি একটা বই লিখেছেন। নাম রিলাকটেন্ট দেবুতাঁত (Reluctant Debutante)। বাংলা মানে লিখেছেন ‘সংকোচের বিহ্বলতা’। এই নামে উনিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন, নিজের বই নিজেই। সেখানে বলছেন, মেয়েরা যে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, আস্তে আস্তে পুরুষেরা মেয়েদের শিক্ষিত করলেন এইটাকে হলো এনলাইটেনমেন্ট। এনলাইটেনমেন্ট সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। আমি এখানে একটাই বললাম।

আরেকটা হল, এনলাইটেনমেন্টের প্রধান শত্রুর নাম যে জিনিশ তাকে তাঁরা বলেন কুসংস্কার। প্রথমে সংস্কার এবং তার আগে কু লাগিয়ে দিলেন। তাঁরা মনে করেন ঝাড় ফুঁকে বিশ্বাস, পীর ফকিরে বিশ্বাস এগুলোই কুসংস্কার। এটা বলতে বলতে তাঁরা বলেন যে কোনো ধর্মে, মানে নীতিটীতিতে বিশ্বাস করাও কুসংস্কার। এনলাইটেনমেন্টের মূল মেসেজ এইটা।

এনলাইটেনমেন্ট ওয়াজ নোওন ইন এয়ুরোপ এজ এন্টি-রিলিজিয়ন। যেটা থেকে আজকের সেক্যুলারিজম কথাটা তৈরি হয়েছে। শিব রায় বলেন ‘আমরা নাস্তিক।’ এটা বলেন তাঁরা ঘরের মধ্যে। আর পাবলিককে বলেন কি ‘আমরা এনলাইটেন্ড পিপল।’ এখন এইটারই একটা কুৎসিত অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মহাশয়: ‘আলোকিত মানুষ’। এনলাইটেনড মানে আলোকিত। আলোকিত শব্দটা খেয়াল করছেন? যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, যেমন আমি এখানে আছি। আর ওখানে বাতি জ্বলছে। আমি আলোকিত হলাম না? আলোটা বাইরে থেকে আসছে। কিন্তু কান্টের লেখা পড়লে আপনি দেখবেন, আমার ভেতর থেকে যদি আলো আসতো, আলো বের হতো তাহলে আমি তো আলোকিত হতাম না, হতাম আলোকদানকারী।

সে হতো ‘আলোকিত’ নয়, ‘আলোকক’। আলোকিত বা আলো মুরগি হবে কেন সে? সে হবে ‘আলোকক’ বা আলো মোরগ। উনি যেটা করছেন সেটা আলো মুরগি বলেই মনে হয়। আসলে এইটা কী? যদি আপনি মার্ক্সের ভাষায় দেখেন, এয়ুরোপের প্রবলেম এমনই। ধনিক শ্রেণী চেয়েছে, আমাদের গরিবরা, আমাদের কথামত চলবে। আমরা তাদের ভালো করে একটু খাওয়াবো পরাবো। তাদের ঠিক যে পরিমাণ বিদ্যা দরকার এ পরিমাণ দেব। যেমন ক্লাস ফাইভ। যেমন এখানে ব্রাক বলে, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট। সেই রকম আর কি ।

এই ধরনের মতবাদই এনলাইটেনমেন্টের মতবাদ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বে আসছে। এয়ুরোপে কী ছিলো সে কথা আমরা মিশেল ফুকোকে বলতে দেব। আমাদের দেশে এর মানে হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারী শিক্ষা এবং ঠিক সেইটুকু শিক্ষা যেইটা শুধু দরকার। এইটার নাম হয়েছে ইনফর্মাল এডুকেশন। আর কী বাজে এর বাংলা তর্জমা, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’! এইজন্য তাঁরা লাখ লাখ কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছেন। কমনওয়েলথ্ এডুকেশন ফান্ড ইত্যাদি আবরণে হেন কাজ নাই তারা করছেন না। লোকগুলোকে ‘শিক্ষিত’ করতে হবে। শিক্ষার আলো বিলাতে হবে।

শিক্ষার সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞাটা স্বচ্ছ বটে: যেটুকু করলে সে করে খেতে পারবে, পরতে পারবে। কান্ট সাহেবের সংজ্ঞাটা ঠিক সেইরকম নয়। আমি এই জন্যই বলছি, যখনই আমরা কোনো শব্দ পাব, শব্দটার গিভেন যে অর্থ বাজারে সেটাই আমাদের মাথায় প্রথমে লাফ দিয়ে আসবে। কিন্তু দেখবেন যে ওইটার বিরুদ্ধে লড়াই একটা করতে হবে আপনাকে। নইলে আপনি একজনের রক্ত আরেক জনের গায়ে দেবেন। উদোর পিণ্ডি দেবেন বুদোর ঘাড়ে ।

আমি প্রথমেই বলেছিলাম জানতে হবে পরিবর্তনটা কেন? তথাকথিত হিয়ুম্যানিজম বা মানবতাবাদের সমালোচক হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর মিশেল ফুকো হঠাৎ করে এনলাইটেনমেন্টের ভক্ত হয়ে উঠলেন কেন?

তাঁকে তো কিছু একটা করতে হবে। উনি বললেন, এনলাইনটেনমেন্ট কথাটাকেও আমি খৎনা বা ক্যাসট্রেট করাবো। দ্যা ওয়ার্ড ইটসেলফ্ হ্যাজ টু বি ক্যাসট্রেটেড। এর মধ্যে দুইটা অর্থ মিশে আছে। এনলাইটেনমেন্ট অর্থে এতদিন বলা হতো, আলোকিত করা। উনি বললেন, না তা নয়। বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট অর্থ আলোকক তৈরি করা। যে লোক আলোর দ্বারা আলোকিত হয় না, যে নিজেই আলো দেয়, এমন লোককেই প্রকৃত প্রস্তাবে বলা হবে এনলাইটেনড ম্যান। উনি রেফারেন্স দিলেন কান্ট সাহেবের। কান্ট ভরসা ফুকো। খেলা জমলো।

এখানেই ফুকোর মূল বক্তব্য। এনলাইটেনমেন্ট মানে আগে বলা হতো হিয়ুম্যানিজম। হিয়ুম্যানিজমের ভেতর কী আছে। হিয়ুম্যানিজমের ভিতর আছে একটা গোঁয়ার গোবিন্দ, একটা এরোগেন্স। এরোগেন্সটা কী? ম্যান হ্যাজ রিপ্লেস্ড গড এজ দি সেন্টার অব হিয়ুম্যান অ্যাটেনশন। এইটাই বটে হিয়ুম্যানিজম। এটা আসছে কোথা থেকে ? কোপারনিকাস আর কেপলার থেকে। সৌরজগতের কেন্দ্র আর পৃথিবী নয়, সূর্য। এইটাও একটা মতবাদ। কেন্দ্র কী? এই কথাটার মধ্যেই মতান্ধতার নিশানা হাজিরনাজির আছে।

তারপর একদিন বোঝা গেল কিনা মানুষ ‘আশরাফুল মখলুকাত’ এই কথাটাও ঠিক নয়। মানুষ আর পাঁচটা প্রাণীর মতই আরেকটি প্রাণী বটে। এটা ডারুয়িন বললেন।

তারপর সবশেষে জানা গেল, মানুষ যুক্তিশীল এটাও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে যুক্তি ও অযুক্তির সমান প্রাধান্য এবং মানুষ যে অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতার সঙ্গে বলেছে আমরা যুক্তিশীল, আসলে মানুষের ইতিহাস দেখলে তা সত্য মনে হয় না। এই দুনিয়ায় যত যুদ্ধবিগ্রহ এবং যত অন্যায় অবিচার সেইগুলিও যদি মানুষই করে থাকে তবে মানুষ একাধারে যুক্তিশীল এবং অন্যাধারে যুক্তিহীন দুটো কথাই সত্য এ কথা একসাথেই বলতে হয়। ফ্রয়েডের আবিষ্কার এ ছাড়া আর কী?

foucault001.jpg
মিশেল ফুকো

তবে হ্যাঁ, মানুষ কথা বলে । এই অর্থে যদি আপনি বলতে চান মানুষ যুক্তিশীল তবে ঠিক আছে। জাক লাকাঁ দেখাচ্ছেন এ সত্যে আত্মম্ভরিতার কিছু থাকছে না। কারণ মানুষ যতটা না ভাষার মনিব, তার চেয়ে ঢের বেশি তার গোলাম। মানে দাস। দাশ নয়; দাস।

তিনটা অংকুর আছে হিয়ুম্যানিজমের। একটা: ম্যান এজ দি সেন্টার বা কেন্দ্রাভিমানী মনু বা মনিশ্বর। লক্ষ্য করেন, এই আইডিয়াটা। মানুষ ঈশ্বরের জায়গা দখল করেছে। এই এরোগেন্সেরই নাম ছিলো হিয়ুম্যানিজম। কথাটার বাংলা দাঁড়ায় মনিশ্বরবাদ। এটা আমি বানালাম। আর ওই এরোগেন্স প্রচারক বা পয়গম্বর আন্দোলনের নাম এনলাইটেনমেন্ট। ইহার বাংলা হতে পারে বাতিশ্বরবাদ। তাতে বোঝায় কী? বোঝায় মানুষ নিরন্তর প্রগতিসাধন করছে। প্রগ্রেসকে আমরা বাংলায় বলেছি প্রগতি। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রগতি হয়েছে। আগে মানুষ বনেজঙ্গলে ছিল, তারপর মানুষ গ্রাম করেছে, এরপর শহর করেছে। এখন শহর থেকে মানুষ চাঁদে যাবে। ধরেন এইটাই প্রগতির ইতিহাস।

মানুষ জঙ্গলে ছিল। সেখানে মানুষ কী করতো? মানুষ সেখানে ছিল পেগান। তারা প্রকৃতি-পূজারি ছিল। তারপর একসময় তারা বুঝতে পেরেছে প্রকৃতিপূজা নয় কোন দেবির কি দেবতার পূজা করতে হবে। তারপর মানুষ ভাবল, না, না, গোষ্ঠী বা জাতি (ট্রাইব) পূজা এসবও ঠিক নয়। সমগ্র নিখিল জগতের এক প্রতিপালক আছেন তাঁর পূজা করতে হবে। এখন নয়া এনলাইটেনমেন্ট বলছে, আসলে নিখিল জগতের একমেবাদ্বিতীয়ম যে প্রতিপালক আছেন সে সত্যও মিথ্যার রকমফের বৈ নয়। এই প্রগতির ধারণা এইভাবে দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই ধারণাগুলির ধারাকেই আমরা বলছি এনলাইটেনমেন্ট।

মানুষ এখন বুঝতে পারছে এই বিরূপ বিশ্বে সে নিয়ত একা। তার কোন প্রভু নাই। যে পরিমাণে সে নিজেই নিজের প্রভু সেই পরিমাণেই সে অসহায়। ফ্রিডম ইজ এ ডেঞ্জারাস থিং। ম্যান হ্যাজ টু নো হি ইজ ফ্রি এন্ড হি ইজ এলোন ইন দ্যা ইউনিভার্স। এই যে মনোভাব, এটাই এনলাটেনমেন্টের বক্তব্য হিসেবে জারি আছে।

তার সাথে যুক্ত হলো এটা ও সেটা। জোর ও জবরদস্তি। ধর্ষকাম ও বলপ্রয়োগ ছাড়া এনলাইটেনমেন্ট হয় না। আমি বললাম অসুবিধা কী, তুমি তোমার মনোভাব নিয়ে তোমার বাড়িতে থাক আর আমি আমার মনোভাব নিয়ে আমার বাড়িতে থাকি। কিন্তু তা তো নয়। বাতিওয়ালা বলে বসে: তোমাকে আমার মতবাদ গ্রহণ করতে হবে। নইলে আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।

এই যুদ্ধ নিয়ে এয়ুরোপ গেল আমেরিকায়। সে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের বললো, তোমরা তোমাদের এই প্রাগৈতিহাসিক ধারণা নিয়ে থাকতে পারবে না। তোমাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে হবে। শুধু গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে না। তোমাদের বৈজ্ঞানিক ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। সেক্যুলারিজম গ্রহণ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে খ্রিস্টধর্ম এবং সেক্যুলারিজম এক হয়ে গেছে। এটার লম্বা ইতিহাস। তাঁরা একহাতে বাইবেল আরেক হাতে রাইফেল নিয়ে গেছে। জয় করেছে। জয় করে তাঁরা সেখানে সভ্যতা কায়েম করেছে। এটার নাম এনলাইটেনমেন্ট।

এনলাইটেনমেন্ট একটা দার্শনিক মতবাদ মাত্র নয়। এটা একটা রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরে, সবশেষে বলা হচ্ছে কি এনলাইটেনমেন্টের ফলে আমরা যারা আমেরিকান-ইন্ডিয়ানদের মত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাই নাই - চীন, আরব বা আফ্রিকা এই সমস্ত দেশের মানুষ - যারা এয়ুরোপের সংস্পর্শে এসেছে তারাও এয়ুরোপের মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমরা আমাদের দেশে এমন সব মানুষ তৈরি করেছি যারা এয়ুরোপীয় মতবাদকে আমাদের ভাষায় প্রচার করেন এবং সেই প্রচার বাবদ তারা যেই যুক্তি দেন সেইটাই এনলাইটেনমেন্টের যুক্তি। মানুষকে আলোকিত হতে হলে এই কুসংস্কার সেই কুসংস্কার বাদ দিতে হবে। ইনফ্যাক্ট সমস্ত সংস্কার বাদ দিতে হবে।

এখন আমাদের সমালোচনা হবে: কুসংস্কার বাদ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সমস্ত সংস্কার বাদ দেওয়া কি সম্ভব? নাকি এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটা সংস্কার নয়? মিশেল ফুকো এই কথা জিজ্ঞেস করেছেন। উনি বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটি সংস্কার। তাহলে সেটা কী সংস্কার? সেটার আগে কি ‘ক’ু কথাটা ব্যবহার করা যায়? ধরুন, এনলাইটেনমেন্টও আরেকটি কুসংস্কার। এক কুসংস্কারের বদলে তবে আপনি আরেক কুসংস্কার আনছেন। তাই না? তার বিরুদ্ধে লড়াই করার দাওয়াটা কী আপনার? এই হচ্ছে জিজ্ঞাসা।

এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটা ভালো কেন? উনি বললেন, এনলাইটেনমেন্ট এমন একটা মতবাদ যে নিজের খাওয়াইর ভিতরই নিজের দাওয়াই তৈরি করে নেয়। ওর বিষের মধ্যেই ওষুধ আছে। এনলাইটেনমেন্ট ইজ এ ডকট্রিন অব প্রগ্রেস অব ম্যানকাইন্ড। সামন্তবাদের পরে পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের পরে সমাজতন্ত্র। এটাকে বলে গ্রান্ড ন্যারেটিভ অব প্রগ্রেস। অথবা কুসংস্কার থেকে সুসংস্কার।

কিন্তু তার ত্রুটিটাও এইখানে। এটা খোদ কার্ল মার্ক্সই বলেছেন। আজ পর্যন্ত যত ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে সব ধর্মই বলেছে কি না আমি সত্য, আমার আগের সব ধর্মই মিথ্যা, সব ভুল। আমিই হইলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সঠিক ধর্ম। খ্রিস্টধর্মের মূল আর্গুমেন্টটা কী? আর্গুমেন্টটা এইমতো: আমরা এয়াহুদি জাতির সন্তান, কিন্তু বর্তমান এয়াহুদি যারা রাব্বাই আছেন, তারা ধর্মটাকে বিকৃত করেছেন। কাজেই ধর্মটাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আরেকজন নতুন নেতা এসে গেছেন। তিনি ‘হযরত ঈসা’। আমরা তাঁর অনুসারী। তিনি ভগবানের বা ভগওয়ালার পুত্র। সুতরাং আমাদেরটাই সঠিক ধর্ম। ইতোপূর্বে আগের ধর্ম যেহেতু বিকৃত হয়েছে তাই সেটা বাতিল। এটাই সর্বশেষ ধর্ম।

একই যুক্তিতে ইসলামের শর্তও এই: ইসলামই সর্বশেষ ধর্ম। ইসলাম এমবডিস দ্যা লেটেস্ট ট্রুথ, সর্বশেষ সত্য। আমার শেষ বহির ধর্ম, লাস্ট রিভিলড রিলিজিয়ন। আর কোন রিভিলড রিলিজিয়ন আসবে না। অর্থাৎ এই পর্যন্ত যেগুলো এসেছিল সব বাতিল। এখন ইসলামের পরে কে আসবে? ইসালামের পরে শুধু ইসলামই আসতে পারে। আর কিছু আসতে পারে না। হোয়াটয়েভার কামস মাস্ট বিন উয়িদিন ইসলাম। যদি এটা ইসলাম-বিরোধী হয় তাহলে এটা বাতিল অথবা ইসলামের ভিতরের হয় তাহলে এটা এর অংশ। আবার আরেকটা ইসলামের দরকার নাই। দি সেইম ইসলাম দেয়ারফোর কেন নট বি ইমপ্রুভড।

এখন মজার বিষয়, ধনতন্ত্রের ইতিহাসও একই যুক্তিতে এগিয়েছে। এটা কার্ল মার্ক্স বলছেন। উনি বলছেন যে একসময় পৃথিবীতে মানুষ বনেজঙ্গলে থাকতো, সেখান থেকে কিছু মানুষ কিছু মানুষকে দাস করেছে দাস প্রথা তৈরি করেছে। তারপর মানুষ সামন্ত—প্রথা - তৈরি করেছে। কিছু মানুষ কিছু মানুষের সার্ভেন্ট থাকবে। তারপর এখন আমরা তৈরি করছি ধনতন্ত্র। এই তন্ত্রে বলা হয়েছে কি সবাই স্বাধীন। কিছু লোক শ্রমিক, কিছু লোক পুঁজিপতি থাকবে। তার মধ্যে সকলে সমান। কিন্তু আবার সকলে সমান নয়। অদ্ভুত যুক্তি। যাঁর সম্পত্তি আছে সে, যার সম্পত্তি নাই তাকে নিজের কাজে খাটাতে পারে। তখন সে বলে যে, আপনিও একজন মজুরি শ্রমিক। তবে আপনি যদি ডাক্তার হন, তবে ইউ আর ওনলি এ হাইলি এফিশিয়েন্ট ডে ‘লেবার’। আপনার বেতনটা একটু বেশি, কিন্তু চরিত্র একই।

এই মতবাদটি অ্যাডাম স্মিথ প্রচার করলেন: ‘ধনতন্ত্রের পরে পৃথিবীতে আর কোন তন্ত্র নাই’। এটাই শেষ তন্ত্র, লাস্ট রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম। ক্যাপিটালিজম ইজ দ্যা নিউ ইসলাম অব মডার্ন টাইমস। ধনতন্ত্রই আধুনিক জমানার শেষ এসলাম। এরপর আর কোন রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম থাকতে পারে না।

এই যে মতবাদ, এনলাইটেনমেন্টও তাই। ভলতেয়ার ও দিদ্রো প্রভৃতি ফরাসি দার্শনিক বললেন, ‘আমরা যে সংস্কারে এসে উপনীত হয়েছি, সেটা পৃথিবীর শেষ সংস্কার’। মিশেল ফুকো বললেন, ‘এই কথা ঠিক নয়।’। এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটাকে আমরা কেন বেছে নেবো, এটাও যদি আগের মতই হয়? উনি বলছেন, ‘আমি যদি এয়াহুদি ধর্ম ত্যাগ করি তাহলে আমি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করবো না কেন? আর খ্রিস্টধর্মই যদি ত্যাগ করতে পারি তবে ইসলাম ত্যাগ করবো না কেন? সুতরাং আখেরি যুক্তি, লাস্ট লজিক হচ্ছে কি আমি কোনো ধর্মেই থাকব না।

ওঁর বক্তব্য: আমি যদি সামন্তবাদ ত্যাগ করতে পারি, দাসপ্রথা ত্যাগ করতে পারি, ধনতন্ত্র ত্যাগ করতে পারি তাহলে আমি সমাজতন্ত্রে আসব না কেন? উনি আরও বলেন ‘অবশ্যই আসব, কিন্তু এত যখন ত্যাগ করলাম তাহলে সমাজতন্ত্রটা ত্যাগ করতে অসুবিধা কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি যাব কোথায়? আমার তো একটা লক্ষ্য দরকার’। এই হলো ক্রাইসিস এর পর্যায়।

এইখানে, এই যে আমি আপনাদের সামনে একটা গোলকধাঁধার মত অবস্থা উপস্থিত করলাম, এটাই হচ্ছে মিশেল ফুকোর সার বক্তব্য। উনি বলেছেন, ‘মানুষের কোন আলটিমেট তন্ত্র থাকতে পারে না। কোন আলটিমেট ধর্ম থাকতে পারে না’। তাহলে, আপনাকে প্রতিদিনই নিজের ধর্ম নিজে রচনা করতে হবে। প্রতিদিনই নিজের তন্ত্র নিজে রচনা করতে হবে।

এইটা বলে যদি তিনি পার পেতেন, তাহলে আমরা আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতাম না। কিন্তু, তিনি কিছু সমস্যা রেখে গেছেন। সেইটাই আমাদের দেখতে হবে। এখন, ‘ক্রিটিক’ বলতে তিনি কি বোঝাচ্ছেন? উনি বলছেন, ‘এলাইটেনমেন্ট মতবাদ বটে, সে অন্যের সমালোচনা শুধু করে না, সে নিজেও নিজের সমালোচনা করে’। এটা সেফ রিফ্লেকসিভ। অর্থাৎ এনলাইটেনমেন্ট বলে দিতে পারে যে এটা আমার ত্রুটি। তিনি বলছেন, ‘আমার সেই এনলাইটেনমেন্ট চাই যে নিজেই নিজের ত্রুটি দেখাতে সক্ষম’। তো, সেটা কী করে সম্ভব?

তাই তিনি বললেন, আসুন আমরা কান্টের লেখাটা পড়ি। কান্ট যেহেতু খ্রিস্টধর্মের ভিতরে বড় হয়েছেন, সেহেতু তাঁর লেখাও খ্রিস্টিয় রেফারেন্সে ভর্তি। কান্টের রেফারেন্স হলো এই, ‘মানুষ যতদিন পর্যন্ত নাবালেগ থাকে, ততদিন পর্যন্ত তাকে বাইরের থেকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যায় কেউ। মানুষ যখন সাবালেগ, প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন সে নিজে নিজেই চলতে পারে’। এয়ুরোপের পরিপ্রেক্ষিতে উনি নামটা না বললেও এটাই বোঝাচ্ছেন। খ্রিষ্টধর্মের ধর্মসভা, অরগানাইজেশন অব ক্রিশ্চিয়ান থিয়োলজি, যিশুর অনুসারির চার্চ।

আমরা চার্চ মানে দালানটা মনে করি, উনি দালানটা না বলে বলেছেন, দালানের ভেতরে যে মনোভাবটা থাকে সেটাই চার্চ। এসোসিয়েশন অব ক্রিশ্চিয়ানস। এটা অফিসিয়াল এসোসিয়েশন। সংক্ষেপে খ্রিস্টান-সমাজ। এটাই নিয়ম করেছে তুমি এটা করতে পারবা, সেইটা করতে পারবা না। এটা জায়েজ, ওইটা নাজায়েজ। ইতি আদি।

কান্টের বক্তব্য হলো, ‘যে মানুষ চার্চের হাতে আত্মসমর্পণ করেছে সে মানুষ বালেগ নয়। যে মানুষ নিজেই নিজের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে, সেই বালেগ’। কাজেই উনি এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা দিলেন এভাবে, ‘মানুষ যখন সাবালেগ হয়, সেই যুগটাই এনলাইটেনমেন্টের যুগ। তো, সাবালেগ হবার লক্ষণ কী? সে যেমন পরের সমালোচনা করতে পারে, তেমন নিজেও নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত বা সক্ষম। এই মানুষ আলোকিত নয়, আলোকক। কোন মানুষ আলোকক? যে নিজেই নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত সেই মানুষই আলোকক, বাংলার গুণে বলা যাক আলোর মোরগ। আর সেই মানুষই হচ্ছে আলোর মুরগি যে শুদ্ধ পরের সমালোচনা করে, নিজের বিচার করতে সক্ষম নয়। অক্ষম কেবল বলে বেড়ায়, আমার বিচার তুমি কর।

এলাইনটেনমেন্ট বলতে আমাদের বুঝতে হবে আরো নানান জিনিশ, এনলাইটেনমেন্টর মধ্যে একটা পরোপকারের ভাব আছে। যেমন এয়ুরোপ থেকে এনলাইটেনমেন্টের জন্য রবার্ট ক্লাইব বা ক্রিস্টোফার কলম্বাস সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস সদা বিশ্বাস করেছেন (অলওয়েজ বিলিভড দ্যাট) তিনি একজন মিশনারি, ধর্মপথিক, তীর্থযাত্রী বা হাজি। শুদ্ধ ঈশ্বরের গুণগান কীর্তনের জন্যই আমেরিকায় গিয়েছিলেন তিনি। হি অলওয়েজ থট দ্যাট হি ওয়াজ এ রিলিজিয়াস ম্যান এন্ড দ্যাট ওয়াজ হিজ মিশন।

মগর তিনি কিতা খরলেন ভগবানের আমেরিকাখণ্ডটায়? বাট হোয়াট হি ডিড ইন দি আমেরিকাস? এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, যা করেছিলেন তার সরল পরিচয় প্রলয়, সেটা ডেভাস্টেশন। আফ্রিকা থেকে লোক ধরে দাস বানালেন তাঁরা, একরোখা কলম্বাসবাদীরা। দে ওয়ার ব্রিঙ্গিং স্ল্যাভস ফ্রম দি পপুলেশন।

তাহলে ওই আমেরিকানদের দোষটা ছিল কী? এক নম্বর দোষ তারা খ্রিষ্টান ছিলেন না। দুই নম্বরে তারা এয়ুরোপীয় ছিলেন না। এরকম দোষ আপনারা ধরতে পারেন। সেখান থেকে তারা যে ইন্ট্রিগ্রেটেড হয় নাই এজন্য তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলেছে। একটা-দুটা কাহিনী আমরা পড়ি। যেমন ‘পো-কা-হুন-টাস’। একটা আমেরিকান-ইন্ডিয়ান মেয়েকে এয়ুরোপে নিয়া আসলো। তারপর কী যেন, একটা চিড়িয়াখানার বাঘের মত সে তো শেষে মারাই গেলো।

আমি এজন্যই বলছি যে, এনলাইটেনমেন্ট বলতে চলন্ত ধারণা হলো, ‘দি ডিসকোর্স অব প্রগ্রেস, মডার্নিটি এন্ড হিয়ুম্যানিজম।’ মিশেল ফুকো বলছেন, ‘নো, এনলাইটেনমেন্ট কথাটির আরেকটি অর্থ করা যায়। এনলাইটেনমেন্ট মিনস্ দি পসিবিলিটি অব অটোক্রিটিক।’ অর্থাৎ, বিদ্যমান সবকিছুরই নিরন্তর সমালোচনা। এটা কার্ল মার্ক্সের বক্তব্য। এটা কি সম্ভব? আমি আপনাদের বোঝাতে চাচ্ছি, হোয়াট ইজ দ্যা প্রজেক্ট অব মিশেল ফুকো? আপনারা লেখাটা পড়ে দেখেন যে আমি যে সারমর্ম করলাম তার মধ্যে কী পরিমাণ বিকৃতি সাধন করলাম। আমি যা বলেছি তার মধ্যে ফুকোকে কী পরিমাণ মিস-রিপ্রেজেন্ট করেছি।

মিশেল ফুকোর কথা গ্রহণ করতে হলে উনি যেই সোর্সগুলোর নির্দেশনা দিয়েছেন তা দেখতে হবে। প্রথম সোর্স হল, ইমানুয়েল কান্টের লেখা। উনি কী বলছেন? পত্রিকায় একটা প্রশ্নের উত্তরে উনি এটা লিখেছিলেন। জার্মানির একটি পত্রিকা বার্লিনিশে মোনৎশ্রিফ্ট্, (Berlinische Monatschrift) বাংলায় করলে দাঁড়ায় ‘মাসিক বার্লিন পত্রিকা’। সেই পত্রিকা প্রশ্নে বলছে, ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু? মাননীয় দার্শনিকগণ উত্তর দিন।’

প্রথম যিনি উত্তর দিলেন তাঁর নাম ‘মোজেজ মেন্ডেলসন’। ইনি জার্মানির সবচেয়ে মশহুর এয়াহুদি দার্শনিক তখন। ইয়াহুদি হিসেবেই তিনি পরিচিত। আর এমানুয়েল কান্ট মহোদয় খ্রিস্টান দার্শনিক। এই কান্টের উত্তরটা দ্বিতীয় উত্তর। সেখানে কান্ট বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট বলতে আমরা বুঝবো, মানবসন্তান যে পর্যন্ত নিজেই নিজেকে নাবালক করে রাখে, সেই অবস্থা থেকে তার মুক্তি।’ তাহলে নাবালক অবস্থা কী জিনিশ? এটা একটা কথার রূপ বা মেটাফোর। যে মানুষ বয়সে পঁয়ত্রিশ বছর হয়েছে কিন্তু এখনো পাঁচ বছরের বাচ্চার মত কথা বলে। অর্থাৎ আমরা এয়ুরোপের অনেকদূর অগ্রগতি করেছি কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় এখনো শিশুর মত আছি। সেই শৈশব থেকে মানব জাতির বন্ধনদশা যখন ঘোচে তখনই এলাইটেনমেন্টের উৎপত্তি হয়। এটা একরকম ভোরবেলা। যখন আলো ফোটে। আমরা বেগম রোকেয়ার ভাষায় বলতে পারি এটা ‘সুব্হে সাদেক’। এখন সকাল হল। আলো ফুটল।

আরবিতে ‘সাদেক’-এর মধ্যে যে সত্যের একটি আভাস আছে, এইখানেও এরকম একটি আভাস দেখছেন উনি। দি এনলাইটেনমেন্ট মিন্স ইউর ইমার্জেন্স টু ট্রুথ। যদিও উনি বলছেন না বাংলায় আমরা এটার নাম দিয়েছি খুব বিশ্রি, ‘প্রথম আলো’। বাংলায় এনলাইটেনমেন্টের সবচেয়ে চালু অনুবাদ কোনটা জানেন? ‘প্রথম আলো’। দিস ইজ দ্যা টাইটেল অব এ বুক বাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এন্ড হুইচ আওয়ার ফ্রেন্ডস্ আর কপিয়িং হিয়ার। তার জন্মের মধ্যে এই ত্রুটিটা আছে আরকি। এটা নকলনবিশ নাম। ‘প্রথম আলো’ মানেই সুব্হে সাদেক। ‘প্রথম আলো’ মানেই এনলাইটেনমেন্ট। এইটাকেই জার্মানরা বলে ‘আউফক্লারুঙ্গ’। আউফ মানে আপ। ক্যারুঙ্গ মানে ক্লিয়ারিং। আক্ষরিক অর্থে। অর্থাৎ ময়লাটা মুছে ফেলুন।

এই এনলাইটেনমেন্ট আসছে খ্রিস্টধর্মের বিচার বা সমালোচনা হিসেবে। সব কথা বলা যাবে না এখানে। সময় সংক্ষিপ্ত, মোখ্তসর। সেখানে স্বৈরতন্ত্র ছিল। ধর্মতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র সমার্থক। হোয়াট ওয়াজ জার্মানি এট দ্যাট টাইম? ইট ওয়াজ এ হলি রোমান এম্পায়ার। মানে পবিত্র রোম সাম্রাজ্য। ভলতেয়ার ভাঁড়সুলভ ভাষায় কয়েছেন ঐ সাম্রাজ্য না ছিল হলি, না রোমান, না এমনকি সাম্রাজ্য। তবে অবিচার ছিল, ভাগাভাগি ছিল ক্ষমতার। ওরা বলেছিল এখানে পরকালের দায়িত্ব পোপ সাহেবকে দিচ্ছি। আর ইহকালের দায়িত্ব আমরা সম্রাট সাহেবরা নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের অথরিটি আসছে ফ্রম দ্যাট, মানে ঐখান থেকে। ধর্মই আমাদের সিদ্ধির মাপকাঠি।

তার ভেতরেই চাকরি করেন দার্শনিক ‘ইমানুয়েল কান্ট’। এর মধ্যে থেকে তিনি যেটুকু বলতে পারেন, বলছেন যে, ‘সমস্ত ব্যাপারে চার্চের মাতব্বরি মেনে নেওয়া আমাদের প্রগতির পক্ষে অসুবিধা।’ প্রশ্ন হল, কী সমালোচনা করা যাবে আর কী করা যাবে না? তখন সেন্সর চালু ছিল। নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, এইটা সমালোচনা করতে পারবেন আর এইটা সমালোচনা করতে পারবেন না। কারণ কী? এটা সেন্সিবিলিটিতে আঘাত করবে। এইভাবে আসতে আসতে কান্টের মূল সিদ্ধান্ত হল: ‘আপন যুগের, আপন ধর্মের সমালোচনা আপনাকে করতে হবে। এনলাইটেনমেন্ট মাস্ট পারমিট ক্রিটিসিজম অব রিলিজিয়ন।’

কান্টের এই কথার সূত্র ধরেই মিশেল ফুকোও যোগ করলেন আপনকার এক ফোঁটা নবীন শিশির । উনি বললেন, ‘তাহলে ইস্! উই ক্যান ক্রিটিসাইজ এনলাটেনমেন্ট ইটসেল্ফ।’ দার্শনিক যুক্তি হিসেবে এমন মহা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোন জিনিসের মূল্য নির্ভর করে তার মৌলিক উত্তরের উপর শুধু নয়। তার সমসাময়িকতার উপরও। কোন সময়ে কোন জায়গায় কে কী বলছেন, সেটাই দরকারি হয়ে ওঠে।

মিশেল ফুকো বলছেন, ‘এখন এয়ুরোপে যে ধনতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে তার আধ্যাত্মিক আদর্শ এনলাইটেনমেন্ট। এই এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে আমরা হয়ত এই ধনতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারবো না, কাজেই আমাদের এইটার সমালোচনা করার মত একটা সূত্রও বের করতে হবে। নাম তিনি দিয়েছেন ‘ক্রিটিক’। ‘ক্রিটিক’ কথাটা এয়ুরোপে প্রথম প্রমিনেন্ট করেছেন ইমানুয়েল কান্ট। ‘ক্রিটিক’ মানে সমালোচক নয়, সমালোচনার ধর্ম। অনেকে এই ‘ক্রিটিক’-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘সম-আলোচনী’। ক্রিটিক মিনস্ এ ডিসকোর্স হুইচ কন্টেইনস ক্রিটিসিজম। কন্টেইন শব্দে যেমন ধারণ করা বোঝায়, আবার রোধ করাও বোঝায়। এ তলোয়ার দুধারি।

‘ডিসকোর্স’ কথাটার অর্থ আমরা পরিষ্কার বুঝি কিনা বোঝা দরকার। আমি নিজেও বুঝতাম না। আনটিল আই কেইম এক্রস দি রাইটিংস্ অব জাক লাকাঁ। জাক লাকাঁর মধ্যে ডিসকোর্স কথাটা কোন অর্থে আসছে? ডিসকোর্সের যদি আক্ষরিক অর্থ করেন, ইট ইজ এ কোর্স অব স্পিচ্। এখন এর একটা নতুন বাংলা আমি প্রস্তাব করেছি। আপনারা হয়ত এখনো শোনেন নাই। এই ডিসকোর্সের বাংলা ‘সন্ধ্যা’।

আপনারা সান্ধ্য আইনের কথা শুনেছেন, কিন্তু ‘সন্ধ্যাভাষা’র কথা হয়ত এখনো শোনেন নাই। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। সন্ধ্যাভাষা বলে কোনটাকে? চর্যাপদের ভাষা এক ধরনের সন্ধ্যাভাষা। আমরা যে অর্থ নিয়েছি এর তা কি জানেন? মধ্যযুগ বলে একটা জায়গা আছে। তার সঙ্গে আছে অমধ্যযুগ। দুইয়ের একটা সন্ধিস্থল থাকবেই।

কিন্তু চর্যাপদ কোন সময়ে লেখা? বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রচার তুঙ্গে উঠেছে, এটা মূলত হযরত গৌতম বুদ্ধের অনেক পরে। তাঁর এক হাজার দেড় হাজার বছর পরে বঙ্গীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধরা তাঁদের গান (প্রার্থনা সঙ্গীত) যে ভাষায় করছেন সেইগুলিকে আমরা সন্ধ্যাভাষার নমুনা বলি এখন। এখনও দাবি করি এসব বাংলা। হরপ্রসাদ দাবি করলেন এগুলো হাজার বছরের পুরানা বাংলা। কে জানে এগুলো কি বাংলা, না বাংলা নয়? হিন্দিওয়ালারা বলেন হিন্দি। উড়িয়ারা বলেন উড়িয়া। অহমিয়ারা বলেন অহমিয়া। আমরা বলি বাংলা। কিছু আসে যায় না। এসব ব্রজের ভাষার মত বা মিথিলার ভাষার মত।

এখন সন্ধ্যাভাষা কোন সমাজের বৈশিষ্ট্য? শহীদুল্লাহ সাহেবের থিওরি যদি সত্য হয় তবে, সপ্তম থেকে একাদশ-এর মধ্যে হয়েছে এটা। খ্রিস্টিয় শতাব্দী অনুসারে আজ থেকে চোদ্দশ তেরোশ বারোশ বছর আগে। আসলে কিন্তু আমরা ওই সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিও না। আমি সেই অর্থে সন্ধ্যা ব্যবহার করি নাই। সন্ধ্যা মানে হেঁয়ালিও নয় ।

দিবা ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ, সেইখান থেকে সন্ধ্যা কথাটা আসছে। সন্ধি মানে চুক্তি, যুদ্ধে যেমন সন্ধি হয়। সন্ধি মানে এক অর্থে মিলন। কিন্তু এই মিলন আবার এক অর্থে যুদ্ধচিহ্নিত। সন্ধ্যাভাষায় তাহলে কার সাথে কার চুক্তি?

ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ এ ভেক্টর। রাশি বলি দুই ধরনের। স্কেলার রাশি আর ভেক্টর রাশি। ভেক্টর মানে যেখানে ডিরেকশন্ থাকে। আমি আপনার উদ্দেশে বলছি, আপনি আমার উদ্দেশে বলছেন। এই ভেক্টর যেখানেই থাকে সেখানেই সন্ধির উৎপত্তি হয়। ইট ইজ দি ভেক্টর অব সাবজেক্ট। হুইচ ট্রাইস টু মেক এ লিঙ্ক উইথ দ্যা ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি যখন দাঁড়িয়ে এখানে বক্তৃতা দিচ্ছি আপনারা বলছেন সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমি যে বক্তৃতা দিচ্ছি সে আর আমার ‘আমি’ কিন্তু এক নয়। আমার একটা ‘সহ-জ’ আছে, যে আমার সঙ্গে জন্মেছে। বক্তৃতা আমি দিচ্ছি। কিন্তু আবার আমার সহজও দিচ্ছে। যুগপৎ। কখনও আমি দিচ্ছি। এ বক্তৃতা খালি। কখনও সে (সহজ) আর আমি দিচ্ছি। এটা ভরা।

আমরা ডিসকোর্স বলি সেই ভাষাকেই যে ভাষা ডিরেকশন বা দিক গ্রহণ করেছে। এইজন্য বলি মাস্টারস ডিসকোর্স, স্লেভস ডিসকোর্স, উমেনস ডিসকোর্স, ইতি আদি। স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ, ডিসকোর্স তিনেই এক জিনিস বুঝায়। কিন্তু আলাদা তারা। সবগুলিরই বাংলা করতে পারেন ‘ভাষা’। স্পিচ বলতে আমরা বলি ‘বাক্’। যথা মানুষ বাক্শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষের স্পিচ পাওয়ার আছে। আবার বলছি কি মানুষ কী ভাষার মধ্যে বাস করে। ম্যান লিভস ইন ল্যাঙ্গুয়েজ। এখন নতুন কথা হিসেবে বলছি কী?

মানুষ যেভাবে কথা বলে সেটা কোনো না কোনো ডিসকোর্সে বিভক্ত। ইন্সটিটিউটের মধ্যে যেমন ডিপার্টমেন্ট থাকে, তেমনি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ডিভাইডেড ইনটু ডিসকোর্সেস।

এখন ডিসকোর্সের নিকটতম তুলনা কী? সেন্টেনস্। আপনি একটা শব্দ দেন। কোন এক অর্থ বহন করবে। যদি শব্দটা কোন বাক্যের মধ্যে বলেন তবে আরেকটা অর্থ গ্রহণ করবে। যদি বাক্যটা কোন প্যারাগ্রাফ বা এসের অংশ হয় তবে আরেকটা অর্থ হবে। আপনার গোটা বক্তৃতাটাকে আমরা ডিসকোর্স বলি। এইজন্যই আমি বলছি, সন্ধ্যা কথাটা আমরা আনছি ওই জায়গায় থেকেই। সন্ধ্যা সন্ধির ভাষা বটে। সন্ধিটা কার সাথে? সহজের সঙ্গে ভাষার সন্ধি। ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে আমি নিজেকে প্রকাশ করেও করি না। কিন্তু আমি ছুটতে থাকি ল্যাঙ্গুয়েজের পেছনে। এই ছোটার মধ্যেই আমি। আমার সহজ জন্মায় এই ছোটার টানে।

এই জন্য প্রভুদের ভাষা সন্ধ্যা নামে খ্যাত হয়। মানে আমরা যাঁদের বৌদ্ধধর্মগুরু বলি বা যাঁদের বলি সিদ্ধাচার্য তাঁদের ভাষার মধ্যে যে একটা আলো-আঁধারির ভাব আছে তা সন্ধ্যা নামে খ্যাতি পায়।

এখন আমি অনুবাদ করবো সহজ (Subject) ও সন্ধ্যা (Discourse)। ইংরেজিতে ‘সহজ’কে বলেছি সাবজেক্ট, আর ‘সন্ধ্যা’কে ডিসকোর্স। তাহলে সাবজেক্ট এন্ড ডিসকোর্স, তাদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এইজন্য আমি এটার নাম প্রস্তাব করেছি ‘সন্ধ্যাভাষা’। সন্ধির ভাষা। জানতে হবে, সন্ধির দুইপক্ষ কে কে। দি স্পিকার ইজ স্পিকিং টু সামবডি। প্রভু দাসের উদ্দেশে কিছু বলছেন। স্বামী স্ত্রীর উদ্দেশে, ছাত্র শিক্ষকের উদ্দেশে বলছে। জাক লাকাঁ তাঁর ডিসকোর্সে চারটা ডিসকোর্সের কথা বলেছেন। দি মাস্টারস ডিসকোর্স বা সেয়ানার সন্ধ্যা। এইক্রমে ইনভার্সিটি ডিসকোর্স। দি এনালিস্টস ডিসকোর্স এবং শেষ তক দি এনালিসেন্ডস বা হিস্টেরিক্স্ বা বোকাচোদার ডিসকোর্স। নামটা বসেছে সেয়ানের জায়গায় যে বসেছে তার নামে।

আমার শেষ মন্তব্য এনলাইটেনমেন্ট বোঝার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ‘হুজ ডিসকোর্স ইজ এনলাইটেনমেন্ট?’ কে বলছে? সেয়ানা কে এখানে?

আগে লোকে বলেছে, ঈশ্বর মানুষের কাছে যখন ওহি পাঠান তখন ঈশ্বর বলছেন বহুবচনে আমরা এটা করেছি, আমরা ওটা করেছি। ল্যাঙ্গুয়েজটা খেয়াল করবেন। এখন মানুষ যখন মানুষের উদ্দেশে বাণী পাঠায় এবং কোনো কোনো সময় ঈশ্বরের জায়গা নিজে দখল করে বলে কি, ‘আমি মানুষ, কিন্তু আমি সেয়ানা, তোমাকে ঈশ্বরের জায়গা থেকে আদেশ করছি’। সেইটা কিন্তু ওই ঈশ্বরের ডিসকোর্স গ্রহণ করে।

এই জন্য মিশেল ফুকোর নতুন কথা হল, ‘মানুষ কথাটা অর্বাচীন কথা। মানুষ শব্দটার বয়স এই মাত্র দুইশ বছর।’ আপনারা সকলেই তার প্রতিবাদ করতে পারেন। কারণ, মানুষ শব্দটা আমরা বহুদিন আগ থেকে - হযরত আদমের সময় থেকে দেখছি। আমরা সব ভাষায় দেখতেছি ‘ইনসান’ কথাটা, ‘হিয়ুম্যান’ শব্দটা আছে। কিন্তু মিশেল ফুকোর কথা অন্য। মানুষের অহমটা, অহংকারের হুংকারটা নতুন।

এই বিখ্যাত বইয়ের শেষ বাক্যে মিশেল ফুকো বলছেন, “সবকিছুর কেন্দ্রে বসা মানুষ’ কথাটা মানুষই লিখেছে। ওটা বেশি দিন টিকবে না। সমুদ্রতীরে, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে।” সমুদ্রের কাছে গিয়ে লোকে মাটিতে বসে বালিতে নিজের নাম লেখে না? জোয়ার আসলে আবার মুছে যায়। তাহলে মানুষ শব্দটা মানুষ লিখেছে এইরকম, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে। বাক্যটা খুব স্মরণীয়।

ফুকো ক্লাসিকাল আর মডার্ন এজ বলতে কী বোঝাচ্ছেন? ফুকোর কাছে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি মানে আঠারো শ সন থেকেই মডার্ন যুগের শুরু। আর আগের যুগটাকে - মানে এর আগের দেড়শ বছরকে - তিনি বলেন ক্লাসিকাল বা বুনিয়াদী যুগ। মানে ১৬৫০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত এই সময়টাই ফুকোর অভিধানে ক্লাসিকাল যুগ আর ১৮০০ থেকে আজ পর্যন্ত বাকিটা মডার্ন যুগ।

এখানেই ফুকো বলেছেন, খেয়াল করবেন, ‘ওয়ান ক্যান সার্টেইনলি ওয়েজার (Wager - এর অর্থ বাজি ধরা, রেসের ঘোড়ার মানুষ যে বাজি ধরে, কোন ঘোড়া ফার্স্ট হবে? এইটা হল সেই বাজি ধরা) দ্যাট ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি।’ আপনি বাজি ধরতে পারেন, মানুষের দিন শেষ হয়ে গেছে। এই জন্য তিনি ফরাসিদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট হিসেবে। ফ্রান্সে কয়েকজন দার্শনিককে এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট বলা হয়েছে সেই সময়। একজন ফুকো। আরজন লুই আলথুসার। আরেকজন জাক লাকাঁ।

foucault7.jpg
মিশেল ফুকো

এরা কেন মানববিরোধী? আমরা মানববিরোধী থেকে অনুবাদ করে বলেছি মানববিদ্বেষী। ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি। ক্লাসিকাল যুগের চিন্তা মানে দেকার্ত থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত সময়টা। তার ভেতরে এনলাইটেনমেন্টও আছে।

তার পরেই শুদ্ধ মানব বা ম্যান আইডিয়াটা চলেছে এয়ুরোপে। সেটাও এতদিনে ধ্বংসের মুখে এসেছে, চলে যাবে। এটাই ছিল তাঁর প্রজেক্ট। মিশেল ফুকোর প্রকল্প এন্টি-হিয়ুম্যানিজম। কিন্তু লোকটি কেন এনলাইটেনমেন্টে আবার ফিরে আসলেন? এটা বোঝার জন্য আপনারা যদি শুদ্ধ একটা ক্লু লাভ করতে চান আমি এটা বলেই শেষ করছি, ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পড়ে দেখলেই তা পাবেন বলে।

মিশেল ফুকো কেন ইরানের বিপ্লবকে প্রথমে সমর্থন করেছিলেন এবং কেন পরে সমর্থন করতে পারেন নাই, কেন পরে তা প্রত্যাহার করলেন, সেই রহস্যের চাবিকাঠি সেখানে আছে বলে আমার বিশ্বাস। মিশেল ফুকো : পাঠ ও বিবেচনা নামের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত একটা সামান্য প্রবন্ধে আমি এই বিষয়টা বলতে চেয়েছি। (খান ২০০৭/ক)

প্রশ্নোত্তর

(দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রশ্নগুলো রেকর্ড হয় নাই। কাজেই এখানে প্রশ্নকর্তাদের বেনামিতে শুকরিয়া জানাচ্ছি।)

১ নং উত্তর
ডিসকোর্সের মধ্যে কোন জিনিসটা উপস্থিত? ডিসকোর্স মানে ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ এ সাবজেক্ট। এখন সাবজেক্ট কথাটায় যদি আপনার অসুবিধা হয় তবে আপনি বলেন ‘এ স্পিকার’ কিন্তু এটা সত্য নয়। এটা তার প্রথম বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: ডিসকোর্সের মধ্যে একজন বক্তা থাকে। বক্তা কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকে একটা তীর থাকে। কাজেই এটা একটা ভেক্টর। ইট ইজ এ ভেক্টর অব স্পিচ। আপনি কোর্স কথাটা খেয়াল করছেন? এককোর্সের ডিনার বলেন না? আরো বহু রকমের কথা আছে।

আপনারা একটা সুন্দর অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন না? যেটার নাম ‘ইন্টারকোর্স’? রতিক্রিয়ার চেয়ে কতই না সুন্দর পদটা! মিল আছে তো এখানেও। ডিসকোর্স আর ইন্টারকোর্স ইজ নট ফার ফ্রম ইচ আদার। ডিসকোর্স ইজ এ কাইন্ড অব ইন্টারকোর্স, বাই দ্যা ওয়ে। কথাও এক প্রকার সঙ্গম, সন্ধি। এটাই আমি ভদ্রভাবে বললাম, ইট ইজ এ ভেক্টর। ডিসকোর্স ইজ ইন্টারকোর্স। দেয়ার ক্যান্ট বি ওয়ান ডিসকোর্স অ্যালোন। এইটার অন্য আরেকটা নাম আছে। ‘ওনানীয়ি’ জার্মানিতে বলে। ইংরেজিতে বলে ওনানিজম। যেটার সহজ বাংলা হল স্বমেহন। আত্মমৈথুন। যেখানে ইয়ু আর দি লাভ অবজেক্ট অব ইয়োরসেল্ফ। আপনি নিজেই নিজেকে ভালোবাসেন। একা একা দাবা খেলা যায় হয়তো। বেশি একা কথা বললে অন্যে পাগল ভাববে।

আমার নতুন কথা হল, ডিসকোর্স ইজ এ ফ্যাক্ট বিটুইন সাবজেক্ট এণ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। ল্যাঙ্গুয়েজ কেন? কারণ ইট ইজ ফ্রম ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যালোন দ্যাট স্পিচ কাম্স্। লোকে যখন বলে আমি বলি।

আই থিংক দেয়ার ফোর আই অ্যাম। দেকার্তের প্রধান কুসংস্কার এই। মানে এয়ুরোপের লড়াইটা হচ্ছে এখানে, মানুষ মনে করে কি আমি আমার স্পিচের মালিক। এটা একটা ইলিয়ুশন। এই ইলিয়ুশনের উপরে এন্টায়ার এয়ুরোপীয় ফিলোসফি দাঁড়িয়ে আছে গত সাড়ে তিনশো বছর। এন্ড দিস ইজ দ্যা ফান্ডামেন্টাল ডিসকভারী অব দি লাস্ট ফিফটি ইয়ারস।

১৯৫০ এর পরে এয়ুরোপে যে দার্শনিক আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর: ম্যান ইজ নো লংগার মাস্টার অব হিজ ওউন হাউজ। মানুষ তার আপন বাড়ির প্রভু নয়। কথাটা ফ্রয়েডের। মিশেল ফুকো এ কথাটা পুরা তামিল করেন নাই। তিনি বলেন এনলাইটেনমেন্ট এলাউস সেল্ফক্রিটিক, অটোক্রিটিক।

ফুকো কিন্তু এই লেসন আত্মস্থই করতে পারেন নাই। সেটা আমি পরে [আরেক দিনের বক্তৃতায়] দেখাবো। অন্য কোন দিন দেখাবো। ইরানের বিপ্লবে তাঁর মনের যে দ্বিভঙ্গি ধরা পড়েছে, সেটা কিন্তু ফিলোসফির এই ত্রুটি থেকেই। এই দ্বিভঙ্গিটা আপনি জাক লাকাঁর মধ্যে দেখবেন না। অন্ধকার রাত্রে সব গাভি কালো দেখায়। সেজন্য আপনার মনে হতেই পারে জাক লাকাঁ যা মিশেল ফুকোও তা এখন। দুইজনেই ফরাসি ভদ্রলোকমাত্র। কিন্তু পরে যখন আপনারা আরো এগুতে রাজি হবেন আমি দেখাবো যে এই দুজনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য মেটেরিয়াল, রিয়েল, মানে অখিল পার্থক্য।

প্রথম কথা, মিশেল ফুকো হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক কিন্তু তিনি এনলাইটেনমেন্টকে সংশোধন করে গ্রহণ করতে চান। জাঁক লাকাঁ দুইটাকেই বর্জন করতে চান। জাক লাকাঁ আধুনিক বিজ্ঞানকেই বর্জন করতে চান। তাহলে বিজ্ঞানের জায়গায় কী জিনিস আমি স্থাপন করবো? সেটাকেও কি আমি বিজ্ঞান বলবো? লাকাঁ বলেন সেটাকে বিজ্ঞান না বলাই ভালো। ওটাকে ডিসকোর্স বলবো।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় ত্রুটি এই: সে নিজেই মনে করে মেটা-ডিসকোর্স। মানে মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ। তার কোনো ডিরেকশানলিটি নাই। সে স্বয়ম্ভু। সে প্রভুর মত। শ্রেণীস্বার্থ গোষ্ঠীস্বার্থ কোনো কিছুই তার জন্যে মেটার করে না। পয়েন্ট অব ভিউ জিনিসটাকে সে অস্বীকার করতে চায়।

আমরা অনেক সময় মনে করি কি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ র‌্যাশনাল প্রাণী। এই কথাটার মধ্যে বিরাট আকারের একটা ফাঁকি আছে। যদি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন না হতো তাহলে আমরা আর কোন কথা বলতাম না। কিন্তু মানুষ যে যুক্তিনিষ্ঠ, র‌্যাশনাল যে বলা হয়, এর অর্থ কী?

মানুষের সকল কর্মকাণ্ড মানুষ নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সে যেন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। কার্ল মার্ক্স এক জায়গায়, মোতাবেক ‘কুয়াশা মাসের আঠার তারিখ’ নামক এক কেতাবের ফাতেহায়, বলছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে বটে, তবে সে ইতিহাস যাচ্ছেতাই নয়। অতীত থেকে আসা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাকে ইতিহাস নির্মাণ করতে হয়। তাকে কতগুলো অবস্থা ভাগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তারপরে গিভেন মেটেরিয়েল দিয়ে সে ইতিহাস নির্মাণ করতে পারলে পারে, না হলে পারে না।’ এটারই প্রতিধ্বনি আমরা পাবো আধুনিক কালে। মানুষের ভাষা প্রমাণ করে যে, মানুষ ভাষারই ক্রীড়নক, বেশ কিছু পরিমাণে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

ফুকো যে মোটের ওপর অর্ধশিক্ষিত দার্শনিক তার প্রমাণ এই যে, তিনি এখানেই তাঁর বই শেষ করেছেন। জাক লাকাঁ কিন্তু ঐখানেই কথা শেষ করেন নাই। জাক লাকাঁ তাঁর চেয়ে অন্তত এক আনা ঢের শিক্ষিত। উনি বললেন, বাট রিমেম্বার মাই ফ্রেন্ড, ম্যান স্টিল স্পিকস। অ্যাণ্ড অ্যাটেম্পট্স্ টু এসকেপ ফ্রম দি আদার। কিন্তু পারে না। একপক্ষে কখনো সন্ধি হয় না। ভাষাই যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো তাহলে সাবজেক্টিভিটির কোন মূল্য থাকতো না।

আমি সংক্ষেপে বলি, জাক দেরিদার যে ত্রুটি আমি একটা ছোট প্রবন্ধে দেখিয়েছি, ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ আরো দেখানোর ইচ্ছে আছে। জাক দেরিদা ইজ নট মাচ ডিফারেন্ট ফ্রম জর্জ বুশ। অনলি ডিফারেন্স ইজ; হি ইজ এ ফিলোসফার এন্ড দ্যাট ম্যান ইজ এ প্রেসিডেন্ট। একজন বৃত্ত আরেকজন দুর্বত্ত। (খান ২০০৭/খ)

এতদিন যাবৎ আমরা মিশেল ফুকো ও জাক দেরিদাকে কিছুটা ভক্তি দেখিয়েছিলাম। দে আর ক্রিটিকস্ অব এয়ুরোপিয়ান মেটাফিজিকস্, ক্রিটিকস অব এয়ুরোপিয়ান লিবারেলিজম। কিন্তু যখন অখিল আপন জায়গায় আসে, তখন ধরা যায় তাঁদের ভেক ভেকমাত্র।

২ নং উত্তর
মিশেল ফুকো পড়ার জন্য আপনাদের আমি এন্টিডোট হিসেবে দুইটা জিনিস তুলনা করতে বলি। এক: আপনারা মিশেল ফুকোর সমস্ত লেখার সাথে মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়েন। এটা একটা মাপকাঠি। তাঁর আট দশটা বই আছে, সবগুলো পড়তে হবে। এটা হল আমাদের লংটার্ম সিলেবাস। আর দুই: মিশেল ফুকোকে তাঁর আদার কন্টেমপোরারির সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। এর মধ্যে আছেন দেরিদা এবং লাকাঁ। আরো অনেকে আছেন। আমি আপাতত মাত্র এই দুইজনেরই নাম নিচ্ছি।

আমি এই কথা বলবো যে, মিশেল ফুকো লিবারেল কি ইল্লিবারেল সেটার বাইরেও বড় কথা মিশেল ফুকো একজন ভালো লেখক এবং তাঁর কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। বড় শিক্ষকেরা, বড় লেখকেরা যখন ভুলও করেন তখন তাঁরা অনেক ছোট ছোট চেরাগ রেখে যান। সেগুলো থেকে আমাদের শেখার আছে। আমি এইজন্য মনে করেছি মিশেল ফুকোকে আমাদের পাঠ্যসূচির প্রধান ক্যান্ডিডেট হিসেবে।

৩ নং উত্তর
আপনারা জানেন মিশেল ফুকো কম বয়সে দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘পাগলামির ইতিহাস’। আরেকটা ‘হাসপাতালের ইতিহাস’। ‘ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন’এবং ‘বার্থ অব দি ক্লিনিক’। ‘অর্ডার অব থিংস’ তাঁর তৃতীয় বই। আর ওঁর চতুর্থ বই ‘আরকিওলজি অব নলেজ’। তৃতীয় আর চতুর্থ বই দুটা আসলে একই বইয়েরই দুই খণ্ডমাত্র।

এরপরে তিনি দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’। এটা ‘জেলখানার ইতিহাস’। তারপর সর্বশেষ যেটাকে আমরা বলি ‘রতির ইতিহাস’। ‘হিস্ট্রি অব সেক্সচুয়ালিটি’। রতির ইতিহাস লিখার পর তিনি বিরতি দিলেন।

৪ নং উত্তর
লুই আলথুসার বলছেন, হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। দেয়ার ইজ নো সাবজেক্ট। এখন আমি এ বাক্য ফুকোতে এট্রিবিউট করছি না, তবে ইট ওয়াজ অলসো ফুকোস ভারচুয়াল পজিশন। অর্থাৎ হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। উনি সাবজেক্ট বলে কিছু স্বীকার করেন না। আমি বলছি লাকাঁ ফ্রম দি ভেরি বিগিনিং এডমিটেড দি এক্সিসটেন্স অব দি সাবজেক্ট। পার্থক্যের মধ্যে এই।

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site