চাই নির্মল আকাশ , নির্মল সাগর স্লোগানে হয়ে গেল ২দিনব্যাপী (৬ ও ৭ জানুয়ারি ) জাতীয় ঘুড়ি উৎসব ২০১২,
ঘুড়ি ফেডারেশন এর ব্যানার.।।
উৎসবে পকেট কাইট, স্টান্ট কাইট, ড্রাগন কাইট, জেলি ফিসসহ হাজার রকমের বৈচিত্রময় ও রঙ-বেরঙয়ের ঘুড়ি উড়ানো হয়।
original post

পাঠ করছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর; ছবি. আরিফ হাফিজ
এ বছর রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী। এই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের নানাবিধ অনুষ্ঠান প্রতিনিয়তই হচ্ছে। তাঁর সঙ্গীত, নৃত্য, কবিতা, ও নাটকের বাইরেও তাঁর জীবনের নানা দিক আলোচনা করা হচ্ছে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র স্রষ্টা যিনি দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও বটে–ভারত ও বাংলাদেশ। ভারতের জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত হয় খুব সম্ভবত ১৯১১ সালে। তখন আমার জন্মও হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ১৯৭১-এ, এক রক্তস্নাত বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জ-জনপদে দাঁড়িয়ে, দেশকে মুক্ত করার মানসে উন্মুখ গণমানুষ সমস্বরে গেয়ে উঠেছিল–“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”
……
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৩০-এ, প্যারিসে
…….
রবীন্দ্রনাথ বস্তুতপক্ষে আমাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বকীয়তা এবং স্বাধিকারের ধ্বজাবাহী হয়ে উদিত হয়েছিলেন বাংলার আকাশে সেই তখন থেকেই যখন পাকিস্তানিদের বর্বরতায় আমার ভাষা হয়েছিল লাঞ্ছিত, আমার সংস্কৃতি ভূলুণ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসক ও শোষকেরা জানত যে, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই আমাদের দেশকে মুক্ত করার উত্তোলিত হাত ভেঙে দেওয়া হবে। তবে রবীন্দ্রনাথের এমনই শক্তি যে তিনি আমাদেরই মাঝে অবস্থান করে আমাদেরকে সর্বদাই অনুপ্রাণিত করে এসেছেন এক স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে।
এহেন রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী অত্যন্ত আগ্রহভরে, হৃদয়গ্রাহীভাবে উদ্যাপিত হবে, এ আর বিচিত্র কী? সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুই খ্যাতিমান নাট্য ও চলচ্চিত্রশিল্পী ঢাকা এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ওপরে একটি আলেখ্য নিয়ে, যা তাঁরা পাঠ করেন ঢাকার র্যাডিসন হোটেলের বলরুমে। তাঁদের সঙ্গে ইংরেজি ভাষ্যে কলকাতার মঞ্চাভিনেতা এবং বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাতা জগন্নাথ গুহ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কলকাতার তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত একটি চেম্বার অর্কেস্ট্রা দল বেহালায় প্রতিচ্যিয় ধ্রুপদী সঙ্গীত দিয়ে শুরু করে ক্রমেই রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক গানগুলো অতীব মুন্সিয়ানার সাথে পরিবেশন করে।
……
পাঠরত শর্মিলা ঠাকুর; ছবি. আরিফ হাফিজ
…….
এই আলেখ্যের শুরু রবীন্দ্রনাথের জন্ম এবং তাঁর মাতার মৃত্যু দিয়ে। নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ কৈশোরেই সাহচর্য পান তাঁর বৌদি কাদম্বরী দেবীর। এই সময় থেকে এই দুটি প্রায় নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বর্ণনায় আছে, রবীন্দ্রনাথ যখন তারুণ্যের উন্মেষে কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদের ওপরে সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে থাকতেন তখন দুজনেরই অজান্তে তাদের মধ্যে একধরনের প্রেমজ সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। এরপরেই আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ খুলনার মেয়ে মৃণালীনিকে বিয়ে করে ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে আসেন। তারপর কাদম্বরীর রহস্যজনক আত্মহনন, যার ফলে রবীন্দ্রনাথ প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। মৃত্যুচিন্তা তাকে প্রায় গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু তা সামান্য কয়েকদিনের জন্যই। তবে তিনি যেমন তাঁর দর্শনে বলেছেন, জীবন এবং মৃত্যু একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত এবং তাদের উভয়েরই অবস্থান শ্বাশ্বত, সকল মানুষের জীবনে। সেই দর্শনেরই শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়ান রবীন্দ্রনাথ, শুরু করেন সৃজনশীলতার পথে তাঁর অগ্রাভিযান। তিনি জানতেন যে কেবলমাত্র ভালবাসাই পারে মনের সকল তিক্ততা এবং দুঃখকে জয় করতে। এই কারণেই মৃত্যুচিন্তার যে ব্যথা, তাকে তিনি অতিক্রম করতে চাইলেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ কড়ি ও কোমলের অন্তুর্গত সেই অবিস্মরণীয় কবিতা প্রাণ এর মধ্য দিয়ে। ‘‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।/ এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/ জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।”
…….
হোটেল র্যাডিসনে অনুষ্ঠানের আগে সাংবাদিকদের ছবির জন্য পোজ দিচ্ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর; ছবি. মোস্তাফিজ মামুন
……
এর কিছুকাল পরে আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলে একটি গীত রচনা করেন এবং তাতে সুরারোপ করেন। এই প্রসঙ্গে তাদের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর একেবারে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে এইরকম প্রতিভাধর তরুণ যেই দেশে আছে, সেই দেশের সকল গ্লানি অচিরেই দূরীভূত হবে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুশি হয়ে এই সময় দুই ভাইকে পাঁচশ টাকা পুরস্কার প্রদান করেন। ঐ সময় এই আপাত স্বল্প অর্থের মূল্য যে অনেক গুণ বেশি ছিল, তা বলাই বাহুল্য। এর পরেই রবীন্দ্রনাথের জীবন উদ্ভাসিত হয় সেই স্বর্গীয় আলোকে যাতে জীবন হয়ে ওঠে অর্থবহ এবং অন্তহীন।
এই সময় আমরা তাঁর মধ্যে দেখতে পাই কাব্যের এক অতুলনীয় প্লাবন। সেই প্লাবনে রোগ-জরা-বার্ধক্যের হয় বিনাশ, জেগে ওঠে নতুন জীবন। নিসর্গের প্রতি তাঁর ভালবাসা আরও গভীরভাবে ধরা দেয় তাঁর বিভিন্ন রচনায়। এর পরপরই তিনি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের জমিদারী পরিদর্শনে যান। শুরু হয় পতিসর দিয়ে, দাবদাহ আকীর্ণ এক গ্রীষ্মে। তখন বিন্দুমাত্র বাতাস নেই, রৌদ্রের খরতাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এই পরিবেশেই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ পদ্মা নদীর সাথে। পদ্মার সৌন্দর্য আকণ্ঠ পান করেন তিনি। পতিসর, শিলাইদহ, শাহ্জাদপুর–পূর্ববঙ্গের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়েই প্রেম। তারপর বিশ্বভারতীতে একটি অভূতপূর্ব বিদ্যানিকেতন গড়ে তোলার মানসে আত্মনিবেদন। এরই কিছু পরে হয় বঙ্গভঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না এই বিভাজন। এই সময় ধর্মে ধর্মে, মানুষে মানুষে প্রেমের বন্ধন রচনা করার চেষ্টা তিনি করেন রাখি বন্ধন উৎসব প্রচলনের মাধ্যমে। এটিই ছিল তার প্রতিবাদের রূপ। তখনই রচনা করেন সেই অনবদ্য গান, ‘‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালবেসে”। ইতোমধ্যে ১৯০২ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাঁর পত্নীর মৃত্যু ঘটে। নিজের মধ্যেই যেন এক যুদ্ধের হয় শুরু। একদিকে ব্যক্তিগত শোক, অন্যদিকে দেশ বিভাগের দুঃখ। সেই সময় তাঁর আরও একটি উপলব্ধি ঘটে যে, এই বাংলা ভালবাসা এবং নিসর্গের দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। তাকে ধ্বংস করে, সে ক্ষমতা কারও নেই। কেবল ঐক্যই পারে আমাদেরকে ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় সাহায্য করতে।
…….
পড়ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়; ছবি. আরিফ হাফিজ
……
১৯০৭-এ তাঁর পুত্র সমীন্দ্রনাথের মৃত্যু তাঁকে ভক্তি সঙ্গীতের দিকে আকৃষ্ট করে। আকৃষ্ট করে নানাবিধ বৃক্ষ এবং লতাগুল্মের ওপর। কেননা, সমীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় ছিল এই সব প্রকৃতির দান। অতঃপর তাঁর গীতাঞ্জলি অনূদিত হয়ে নোবেল পুরস্কার লাভ করে। ডব্লিউ বি ইয়েটস-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। তিনি নোবেল পুরস্কারকে কখনওই খুব বড় একটি স্বীকৃতি বলে মানতেন না। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ বৃটিশ সরকার কর্তৃক ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু পাঞ্জাবের জালিয়ানওলাবাগে কর্ণেল ডায়ারের নেতৃত্বে বৃটিশ সেনারা যখন ভারতীয়দেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে, সেই প্রতিবাদে তিনি এই স্যার উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন। তখন ভারতবর্ষের সর্বত্র বৃটিশবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। সেই আন্দোলনেরই পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেন তাঁর অমোঘ বাণী, ‘‘স্বীয় অন্তরকে করো মুক্ত, তবেই মুক্ত হবে স্বদেশ”। তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পন্থা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে মতভেদ হয় প্রায় সকল রাজনৈতিক কর্মীর এমনকি স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীরও। রচিত হয় সেই অবিস্মরণীয় গান, ‘‘সময় কারও যে নাই, ওরা চলে দলে দলে–/গান হায় ডুবে যায় কোন্ কোলাহলে॥” রবীন্দ্রনাথ চাইছিলেন শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে, সুচিন্তার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল একটি জাতি স্বাধীনতার জন্য যখন দাবি তুলবে, তখন বিশ্বের কোনো শক্তি তাকে রোধ করতে পারবে না। এই আলেখ্যে উল্লেখিত হয়েছে যে, গান্ধীজীর সঙ্গে একান্ত আলাপে বসে রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিকভাবেই বাইরে সংঘটিত রক্তস্নাত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘মহাত্মা, এই কি তোমার অহিংস আন্দোলন?” রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই চাইতেন বিশ্ব মানব হিসেবে যেন ভারতবাসীর উত্তরণ ঘটে। তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল মানবতার প্রতি। এই সময়ই তাঁর রচনা সেই প্রখ্যাত গান, ‘‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান” এবং ‘‘ঐ মহামানব আসে”।
জীবনের প্রায় অন্তে গিয়ে যে মহা তাৎপর্যপূর্ণ কাজে রবীন্দ্রনাথ ব্রতী হন, তা হচ্ছে চিত্রাংকন। তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন এবং ছবিতেই তাঁর মুক্তি ঘটে বলে উল্লেখ করেন। ঐ আলেখ্যের মাঝেই আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পাই বিশ্বের সর্বত্র। তিনি তাঁর দর্শনকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ইয়েটস, আইনস্টাইন, রথেনস্টাইন, প্রমুখ মহাপুরুষদের মাঝে এবং দূর প্রাচ্যের জাপান থেকে শুরু করে পশ্চিমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র।
এই এক ক্ষণজন্মা মানুষ, যাকে বাঙালি সভ্যতার একক প্রতিফলন বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। তাঁর ওপরে কেবল ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টার একটি আলেখ্য কখনওই সম্পূর্ণ সুবিচার করতে পারে না। তবুও তাঁর এই শিক্ষা, সভ্যতা, সুরুচি এবং দর্শনঋদ্ধ জীবন সম্বন্ধে স্বল্প সময়ে বলতেই তো হবে আমাদের। বলতে হবে যারা এখনও রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে রয়ে গেছেন আঁধারে তাদের কিঞ্চিৎ জ্ঞান লাভের আশায়।
ক্রমেই জীর্ণ হয়ে আসে তাঁর পরিশ্রান্ত শরীর। ১৯৪১-এ মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। প্রণিধানযোগ্য, প্রসঙ্গত তাঁর মৃত্যুর পূর্বে লিখিত একটি কবিতার অংশবিশেষের উল্লেখ যথাযথ হবে বলে আমার বিশ্বাস:
যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।
…….
কলকাতা মিউজিক অ্যাকাডেমির সঙ্গীত পরিবেশনা; ছবি. আরিফ হাফিজ
…….
অনুষ্ঠানটি দেখছিলাম আর মনে নানা কথা উঁকি মারছিল। তবে সর্বাগ্রে অনুষ্ঠানটির পরিবেশনের ওপর দু একটি কথা। শর্মিলা ঠাকুর স্বীয় খ্যাতিতে ভাস্বর। তাঁর প্রথম ছবি অপুর সংসার। সেই ছবির সেই অতি মিষ্টি মেয়েটি, সাদা কালোয় সুব্রত মিত্রের ক্যামেরায়, সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনায় আমাদের হৃদয়ে যে আসন করে নিয়েছেন সেখানে থেকে অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। তিনি পড়ছিলেন, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছিল যে তাঁর অন্তর বোধ হয় রয়েছে অন্য কোথাও। এটি কোনো অভিযোগ নয়। এই তো স্বাভাবিক। প্রথমত, সেই কবেই তিনি তাঁর প্রিয় বঙ্গদেশকে ছেড়ে চলে গেছেন হিন্দিভাষী ভারতে বাস করতে। দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্বামী পতৌদির নবাব মনসুর আলী খানকে। তাঁর পক্ষে একটু দ্বিধা, একটু অস্পষ্টতা তো থাকা স্বাভাবিকই। জগন্নাথ গুহ অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন তাঁর ইংরেজি ভাষ্যে। তাঁর অভিব্যক্তিও ছিল প্রয়োজনীয় নাটকীয়তায় আকীর্ণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র দা, আমাদের অত্যন্ত আপন মানুষ। তবে তাঁরও যে বয়স বেড়েছে তা বোঝা যায় যখন এমন সুগ্রন্থিত একটি উপস্থাপনা পাঠ করবার সময় তিনি পাণ্ডুলিপির সঠিক পাতাটি সঠিক সময়ে খুঁজে পান না। মাঝে মধ্যেই গলা ভেঙে যায়। আমরা সবাই কি তাহলে ঐ পথেই চলেছি, যখন স্তিমিত হয়ে আসে শেষ বিকেলের আলো? তবে সবকিছুকেই ছাপিয়ে গেছে অ্যাব্রাহাম মজুমদারের নির্দেশনায় কলকাতা মিউজিক অ্যাকাডেমি কৃত চেম্বার অর্কেস্ট্রার অসাধারণ সঙ্গীত পরিবেশনা। সৌমিত্র মিত্রের পরিচালনায় অনেক জায়গাতেই ফাঁক থেকে গেছে। যেমন, তিনি তিন খ্যাতিমান শিল্পীর পাঠ-এর প্রতি যত্নশীল ছিলেন না বিধায় একই মঞ্চে অপর পাশে সংঘটিত অর্কেস্ট্রা অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী বলে মনে হয়েছে। বস্তুতপক্ষে ঐ অর্কেস্ট্রা না থাকলে আলেখ্যটি নিশ্চিত ঝুলে পড়তো বলা যায়। এছাড়াও মঞ্চের ওপরে অনুষ্ঠিত আলেখ্যের ছবি ক্লোজ সার্কিটে সামনের পর্দার ওপরে দেখানোর মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক ছবিগুলোর যে সংমিশ্রণ, সেটি অত্যন্ত অপেশাদার ও বেখাপ্পা ঠেকে। মঞ্চের ছবি আরও অনেক কমিয়ে দিয়ে অনেক সুচারুভাবে রবীন্দ্রনাথের জীবনের আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ছবিগুলোকে সাজিয়ে পরিবেশন করা যেতো। তাহলে অনুষ্ঠানের আকর্ষণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেতো। এই অনুষ্ঠানে এটাও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়েছে যে, প্রদর্শনীটির আগে অনুষ্ঠানটির যথেষ্ট মহড়া হয়নি।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর; ছবি. আরিফ হাফিজ
ছোটখাটো এইসব ত্রুটি সত্ত্বেও আমি বলবো যে এমন একটি জীবনালেখ্য কলকাতা আমাদেরকে পরিবেশন করে গেলো যা আমাদের মধ্যে অনেক দুঃখের সঞ্চার করে। রবীন্দ্রনাথ তো আমাদেরও। বস্তুতপক্ষে অনেক অধিক আমাদের। অথচ আমরাই কখনও ভাবিনি তাঁর জীবন নিয়ে একটি সর্বাঙ্গ সুন্দর অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার কথা, তাঁর এই সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতেও। অনুষ্ঠান শেষে একটি অসম্পূর্ণ বোধ এবং ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এলাম সেই রাতে।

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.
Join our income making program absolutely free and 100% risk free.
Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site