Showing posts with label দর্শন. Show all posts
Showing posts with label দর্শন. Show all posts

Monday, November 21, 2011

কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শন

by ইমন জুবায়ের
Every object of creation is made of atoms which combine to form molecules. Kanada. (600 BC)
প্রাচীন ভারতের পরমাণু চিন্তার পথিকৃৎ ছিলেন কণাদ। কণাদ-এর মতবাদটি বৈশেষিক দর্শন নামে পরিচিত। কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শনেই সর্বপ্রথম ভারতীয় পরমাণু চিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। কণাদের বৈশেষিক দর্শনটিকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের চেয়েও প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়। (সাম্প্রতিক এক গবেষনার ফলে জানা গেছে, গৌতমবুদ্ধের সময়কাল ৪৯০-৪১০ খ্রিস্টপূর্ব) ... কণাদ-এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতক।
উল্লেখ্য যে, প্রাচীন ভারতে ছটি দার্শনিক মত ছিল। যেমন: সাংখ্য, যোগ, মীমাংশা, বেদান্ত, ন্যায়, এবং বৈশেষিক। ন্যায় দর্শনের অনেক সিদ্ধান্ত বৈশেষিক দর্শনের মতো বলে দর্শনটিকে ন্যায় বৈশেষিকও বলা হয়ে থাকে। তবে এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শনের প্রতি তত্ত্বজিজ্ঞাসু মানুষ আজও গভীর কৌতূহল বোধ করে। বিশ্বসভ্যতায় কণাদ- এর অবিস্মরণীয় অবদানের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ A.L. Basham লিখেছেন, Ancient Indian theories were brilliant imaginative explanations of the physical structure of the world, and in a large measure, agreed with the discoveries of modern physics.
কিন্তু, দর্শনটির নাম বৈশেষিক কেন?
এর একটি ব্যাখ্যা পন্ডিতেরা উপস্থিত করেছেন। কণাদ তাঁর দর্শনে ছয়টি পদার্থের উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পঞ্চম হল: ‘বিশেষ’ (particular)। এই বিশেষ পদার্থটি অপর কোনও দর্শনে স্বীকৃত হয়নি। সুতরাং বিশেষ পদার্থ স্বীকার করার জন্যই দর্শরটির নাম বৈশেষিক।
বৈশেষিক দর্শনের নামকরণ সম্বন্ধে জানা গেল। এবার কণাদ সম্বন্ধে কিছু কথা জানব। ছেলেবেলায় কণাদ-এর নাম ছিল কাশ্যপ। কাশ্যপের বাবার নাম ছিল উলকা। তিনিও দার্শনিক ছিলেন। সে সময়কার প্রাচীন ভারতে বেদ-উপনিষদ-এর ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন ধারায় দর্শন চর্চা হত। কাশ্যপের বাবা উলকা সম্ভবত সেরকমই কোনও ধারার দর্শন চর্চা করতেন। কথিত আছে যে কিশোর কাশ্যপ একবার তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে তীর্থ করতে গঙ্গাতীরের প্রয়াগ নগরে গিয়েছিল । তো সেই নগরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ভিড়। ভক্তেরা গঙ্গায় স্নান করে। মন্দিরে ফুল ও শস্যকণা অর্ঘ দেয়। সে জন্য নগরের রাস্তায় ফুল আর শস্যকণা পড়ে ছিল । কিশোর কাশ্যপ কে দেখা গেল রাস্তা থেকে শস্যকণা কুড়িয়ে নিচ্ছে। কৌতূহলী লোকজন ভিড় করে । কি ব্যাপার সবাই গঙ্গার ঘাটে স্নান করছে, মন্দিরে পূজো দিচ্ছে আর এ ছেলে কিনা শস্যকণা কুড়োচ্ছে।
একজন সৌম্যদর্শন ঋষি এগিয়ে এলেন। হে, বালক। তুমি কী করছ? তুচ্ছ কণা কুড়িয়ে নিচ্ছ কেন?
কাশ্যপ মুখ তুলে বলল, মাননীয়, শস্যকণা তুচ্ছ নয়। এ সমগ্র বিশ্বেরই অংশ। এরকম তুচ্ছ কণা একজন মানুষের আহার হতে পারে। এরকম প্রচুর কণায় একটি পরিবারের অন্নের সংস্থান হতে পারে। এ কণা বিশ্বের মতোই মহার্ঘ। একে তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়।
এভাবেই নাকি কনাদ নামের উদ্ভব।
কণাদ এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতক। যা ছিল বেদ এবং উপনিষদের যুগ। তবে সে ধর্মীয় যুগের প্রভাবে কণাদ কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নিমগ্ন থাকেননি; বরং জগতের বাস্তব রূপ নিয়ে ভেবেছেন। এভাবে প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানের পথ উম্মোচন করে দিয়েছেন। এখানেই তাঁর মহত্ব।
বিজ্ঞান চর্চার প্রথম ধাপ হল পরিপার্শ্বের বস্তর Categorize করা। এই উদ্দেশ্যে কণাদ মহাবিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে নয়টি উপাদানে বিভক্ত করেছেন: এ থেকে তাঁর বিজ্ঞান মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেবল জগতের বাস্তব রূপই নয়, কণাদ কার্যকারণ তত্ত্ব (law of causation) নিয়েও ভেবেছেন। এবং সে ভাবনা লিখে প্রকাশ করেছেন। কণাদ বস্তুর অভ্যন্তরীন গঠন নিয়েও গভীর ভাবে ভেবেছেন। তারপর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন: Every object of creation is made of atoms which combine to form molecules!
কণাদ বৈশেষিক দর্শনটির প্রবক্তা হলেও কীভাবে কণাদ যৌক্তিক চিন্তার অধিকারী হয়েছিলেন-সে বিষয়ে এ যুগের মানুষের মনে কৌতূহল কম না। এ কালের গবেষকগণ প্রাচীন ভারতের বৈদিক সাহিত্যে সে সূত্র খুঁজেছেন। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতকের উপনিষদের যুগে ভাববাদী চিন্তার পাশাপাশি দার্শনিক চিন্তারও স্ফূরণ ঘটেছিল । বৃহদারণ্যক উপনিষদে একটি অত্যন্ত জ্ঞানদ্বীপ্ত শ্লোক রয়েছে। যেখানে ঋষি যাজ্ঞবল্ক মৈত্রেয়ীকে বলছেন:

আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যে মন্তব্যে নিদিধ্যাসসিতব্যঃ (৪/৫)

অর্থাৎ আত্মার তত্ত্বজ্ঞান লাভের দ্বিতীয় ধাপটি হল মনন। এবং মননের প্রধান সাধন হল যুক্তিতর্ক, আর যুক্তিতর্ক শাস্ত্র হল ন্যায় ও বৈশেষিক। তবে আমরা এও জানি যে সে যুগে মননের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ ছিল না। কেননা, বেদকে অস্বীকার করে যুক্তির চর্চা করা যাবে না-বৈদিক শাস্ত্রকারের এ ধরনের প্রগতিবিরুদ্ধ কথাও বলতেন। কেউ কেউ অবশ্য জ্ঞানের স্বার্থে সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেন।
চিন্তানায়ক বিজ্ঞানমনক্স কণাদ ছিলেন তাদেরই একজন।
কণাদ যে বইটি লিখে তাঁর ধ্যানধারণা প্রকাশ করেছেন সে বইটির নাম: ‘বৈশেষিক সূত্র।’ কণাদ বইটির প্রথম আহ্নিকে (আহ্নিক= অধ্যায়) বলেছেন: অথাতো ধর্মং ব্যাখ্যাস্যামঃ। এর মানে: অতএব আমি এখন ধর্ম ব্যাখ্যা করব। কিন্তু কণাদ ধর্ম ব্যাখ্যা করবেন কেন? তিনি তো সত্যসন্ধানী দার্শনিক। ধর্মের সঙ্গে তাঁর কি সম্পর্ক? বস্তুত সংস্কৃত ভাষার ধর্ম শব্দটির সংজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক এবং গভীর । বিশ্লেষনধর্মী অনুসন্ধানও যার অন্তর্গত । উপনিষদেই তো বলা হয়েছে: আত্মার তত্ত্বজ্ঞান লাভের দ্বিতীয় ধাপটি হল মনন। কাজেই কণাদ তো ধর্ম ব্যাখ্যা করছেন। এ জন্যই কণাদকে বলা হয় দার্শনিক-ঋষি ।
কণাদ কে দার্শনিক-ঋষি ছাড়াও আচার্য কণাদও বলা হয়। আচার্যের কাছে শিষ্যরা আসে জ্ঞানলাভের জন্য। কণাদ শিষ্যদের বলছেন: আমি এখন ধর্ম ব্যাখ্যা করব। তাঁর কাছে শিষ্যরা এসেছে অনিবার্য দুঃখের হাত থেকে পরিত্রান পেতে। জগৎ দুঃখময়- কপিলের সাংখ্যদর্শনের প্রভাবে প্রাচীন ভারতে এরকম বিশ্বাস প্রচলিত ছিল । দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পেতেই দর্শনের চর্চা । এ কারণেই দার্শনিক-ঋষি ধর্ম (একালের দর্শন অর্থে) শিষ্যদের কাছে ব্যাখ্যা করছেন।
কণাদ বৈশেষিক সূত্র বইটির পরবর্তী আহ্নিকসমূহে তাঁর পরমাণুবাদ ব্যাখ্যা করেছেন। কেবল তাইই নয়-বৈশেষিক সূত্র বইটিতে কার্যকারণতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কণাদ লিখেছেন- Every effect is a fresh creation or a new beginning. এভাবে কণাদ কার্যর পিছনে পরমকারণের অস্তি¡তকে অস্বীকার করেন। কণাদ, বুদ্ধের মতোই ঈশ্বর অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চুপ ছিলেন। তবে বৈশেষিক দর্শনের পরবর্তী টীকাকারগণ পরমাত্মা হিসেবে ঈশ্বরের ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েছেন: যে ঈশ্বর পরিপূর্ণ ও শাশ্বত। এবং এই পরিপূর্ণ ও শাশ্বত ঈশ্বরই জগৎকারণ। এভাবে কণাদের বৈশেষিক দর্শন বস্তুবাদ থেকে ভাববাদে পরিনত হয় এবং প্রাচীন ভারতের স্বাধীন চিন্তার পথটি রুদ্ধ হয়। সমাজপ্রগতির পথও রুদ্ধ হয়ে যায় ...
বৈশেষিক সূত্র বইতে কণাদ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে ৭টি category তে বিভক্ত করেছেন। যেমন: দ্রব্য (substance), গুণ (quality), কর্ম (action), সামান্য (universal), বিশেষ (particular), সমবায় (inherence) এবং অভাব (non-existence).
এখানে বলে নিতে চাই যে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে বাংলার বাউলগানের একটা সম্পর্ক রয়েছে। আজ যে রাষ্ট্রটি ভারত- সে রাষ্ট্রটি কালের বিবর্তনে বহু ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। প্রাচীন বাংলা প্রাচীন ভারতেরই অন্তর্গত ছিল। এই কারণে ভারতীয় দর্শন তথা বৈশেষিক দর্শনের আলোচনার এ পর্যায়ে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও লালনের একটি গান সম্বন্ধে কিছু কথা বলা আবশ্যক। গানটি হল:

পাবে সামান্যে কি তাঁর দেখা/ বেদে নাই যার রূপরেখা ...

লালনকথিত এই "সামান্য" হচ্ছে universal বা সার্বিক ধারণা। যেমন -মনুষত্ব। আর বিশেষ (particular) হল মানুষ। লালন বলছেন তাঁকে (Ultimate Reality=মনের মানুষ/অচিন পাখি) সামান্যে কিংবা সার্বিক ধারণার মধ্যে পাওয়া যাবে না। তাহলে মনের মানুষকে কোথায় পাওয়া যাবে? মনের মানুষকে পাওয়া যাব বিশেষ-এ; অর্থাৎ particular এ। মনুষত্ব সামান্য হলে মানুষ হল বিশেষ । তাই লালন বলছেন:

পাবে সামান্যে কি তাঁর দেখা

অর্থাৎ সামান্যে তাঁকে পাওয়া যাবে না। তাকে পাওয়া যাবে বিশেষে ... অর্থাৎ মানুষে। লালন তাই মানুষের (বিশেষে) ভিতর মনের মানুষের সন্ধান করতে বলেছেন। লালন তাই গেয়েছেন:

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি নইলে ক্ষ্যাপা রে তোর মূল হারাবি ...

সেই যাই হোক। বলছিলাম ... বৈশেষিক সূত্র বইতে কণাদ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব এই ৭টি category তে বিভক্ত করেছেন। পদার্থকে ৭টি বর্গে বিভক্ত করা ছাড়াও কণাদ নয়টি পরম পদার্থের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি হল ভৌত এবং চারটি অ-ভৌত। পাঁচটি ভৌত পদার্থ হল: পৃথিবী পানি আগুন বাতাস এবং আকাশ। এবং চারটি অ-ভৌত পদার্থ হল: স্থান কাল (সময়) আত্মা ও মন। এদের মধ্যে পৃথিবী পানি আগুন ও বাতাস হল আণবিক। কিন্তু আকাশ হল অ-আণবিক এবং শাশ্বত। এছাড়া স্থান ও কালও শাশ্বত এবং অনন্ত। আত্মার বৈশিষ্ট্য অনেকটা সত্তার মতোই। কণাদ মনে করতেন চৈতন্য হল দৈব । যখন আত্মা শরীরে সংলগ্ন হয় তখনই শরীর চৈতন্য লাভ করে। Thus, consciousness is not considered an essential quality of the soul. মন হল আণবিক কিন্তু অবিভাজ্য এবং শ্বাশত পদার্থ। জগতে যে সব বস্তু রয়েছে মন তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে।
কণাদ লক্ষ করেছেন যে নতুন মৃৎপাত্র তাপে কালো হয়ে যায়। এর মানে বস্তুর ওপর তাপের প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু এর কারণ কি? কণাদ ঠিকই উপলব্দি করতে পেরেছিলেন বস্তুর অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই বস্তুর বাইরের দিকটা বদলে যায়। কণাদ মনে করতেন বস্তুর এই বৈচিত্র আসলে পরমাণুরই বৈশিষ্ট -যা ওই বিশেষ বস্তুটিকে তৈরি করেছে। এসব পর্যবেক্ষণের পর কণাদ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে- বিশ্ববহ্মান্ডের সব পদার্থ আর বস্তুই পরমাণু দ্বারা গঠিত।
পরমাণু সম্বন্ধে ভারতীয় ধারণা সম্ভবত গ্রিসে পৌঁছেছিল গ্রিক সম্রাট আলেকজান্দারের ভারত আক্রমনের পর। গ্রিকরা ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে উত্তর-পশ্চিম ভারতে আক্রমন করেছিল। এর পরপরই গ্রিস ও ভারতের মধ্যে বৈদেশিক ও বানিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। গ্রিকরা পারস্য ও আফগানিস্তানে বসতি স্থাপন করে। তাদের মাধ্যমেই গ্রিসে তথা ইউরোপে ভারতীয় পরমাণু ধারণা পৌঁছেছিল বলে পন্ডিতদের ধারণা।
original post
read more

কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শন

by ইমন জুবায়ের
Every object of creation is made of atoms which combine to form molecules. Kanada. (600 BC)
প্রাচীন ভারতের পরমাণু চিন্তার পথিকৃৎ ছিলেন কণাদ। কণাদ-এর মতবাদটি বৈশেষিক দর্শন নামে পরিচিত। কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শনেই সর্বপ্রথম ভারতীয় পরমাণু চিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। কণাদের বৈশেষিক দর্শনটিকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের চেয়েও প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়। (সাম্প্রতিক এক গবেষনার ফলে জানা গেছে, গৌতমবুদ্ধের সময়কাল ৪৯০-৪১০ খ্রিস্টপূর্ব) ... কণাদ-এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতক।
উল্লেখ্য যে, প্রাচীন ভারতে ছটি দার্শনিক মত ছিল। যেমন: সাংখ্য, যোগ, মীমাংশা, বেদান্ত, ন্যায়, এবং বৈশেষিক। ন্যায় দর্শনের অনেক সিদ্ধান্ত বৈশেষিক দর্শনের মতো বলে দর্শনটিকে ন্যায় বৈশেষিকও বলা হয়ে থাকে। তবে এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে কণাদ-এর বৈশেষিক দর্শনের প্রতি তত্ত্বজিজ্ঞাসু মানুষ আজও গভীর কৌতূহল বোধ করে। বিশ্বসভ্যতায় কণাদ- এর অবিস্মরণীয় অবদানের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ A.L. Basham লিখেছেন, Ancient Indian theories were brilliant imaginative explanations of the physical structure of the world, and in a large measure, agreed with the discoveries of modern physics.
কিন্তু, দর্শনটির নাম বৈশেষিক কেন?
এর একটি ব্যাখ্যা পন্ডিতেরা উপস্থিত করেছেন। কণাদ তাঁর দর্শনে ছয়টি পদার্থের উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পঞ্চম হল: ‘বিশেষ’ (particular)। এই বিশেষ পদার্থটি অপর কোনও দর্শনে স্বীকৃত হয়নি। সুতরাং বিশেষ পদার্থ স্বীকার করার জন্যই দর্শরটির নাম বৈশেষিক।
বৈশেষিক দর্শনের নামকরণ সম্বন্ধে জানা গেল। এবার কণাদ সম্বন্ধে কিছু কথা জানব। ছেলেবেলায় কণাদ-এর নাম ছিল কাশ্যপ। কাশ্যপের বাবার নাম ছিল উলকা। তিনিও দার্শনিক ছিলেন। সে সময়কার প্রাচীন ভারতে বেদ-উপনিষদ-এর ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন ধারায় দর্শন চর্চা হত। কাশ্যপের বাবা উলকা সম্ভবত সেরকমই কোনও ধারার দর্শন চর্চা করতেন। কথিত আছে যে কিশোর কাশ্যপ একবার তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে তীর্থ করতে গঙ্গাতীরের প্রয়াগ নগরে গিয়েছিল । তো সেই নগরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ভিড়। ভক্তেরা গঙ্গায় স্নান করে। মন্দিরে ফুল ও শস্যকণা অর্ঘ দেয়। সে জন্য নগরের রাস্তায় ফুল আর শস্যকণা পড়ে ছিল । কিশোর কাশ্যপ কে দেখা গেল রাস্তা থেকে শস্যকণা কুড়িয়ে নিচ্ছে। কৌতূহলী লোকজন ভিড় করে । কি ব্যাপার সবাই গঙ্গার ঘাটে স্নান করছে, মন্দিরে পূজো দিচ্ছে আর এ ছেলে কিনা শস্যকণা কুড়োচ্ছে।
একজন সৌম্যদর্শন ঋষি এগিয়ে এলেন। হে, বালক। তুমি কী করছ? তুচ্ছ কণা কুড়িয়ে নিচ্ছ কেন?
কাশ্যপ মুখ তুলে বলল, মাননীয়, শস্যকণা তুচ্ছ নয়। এ সমগ্র বিশ্বেরই অংশ। এরকম তুচ্ছ কণা একজন মানুষের আহার হতে পারে। এরকম প্রচুর কণায় একটি পরিবারের অন্নের সংস্থান হতে পারে। এ কণা বিশ্বের মতোই মহার্ঘ। একে তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়।
এভাবেই নাকি কনাদ নামের উদ্ভব।
কণাদ এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতক। যা ছিল বেদ এবং উপনিষদের যুগ। তবে সে ধর্মীয় যুগের প্রভাবে কণাদ কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নিমগ্ন থাকেননি; বরং জগতের বাস্তব রূপ নিয়ে ভেবেছেন। এভাবে প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানের পথ উম্মোচন করে দিয়েছেন। এখানেই তাঁর মহত্ব।
বিজ্ঞান চর্চার প্রথম ধাপ হল পরিপার্শ্বের বস্তর Categorize করা। এই উদ্দেশ্যে কণাদ মহাবিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে নয়টি উপাদানে বিভক্ত করেছেন: এ থেকে তাঁর বিজ্ঞান মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেবল জগতের বাস্তব রূপই নয়, কণাদ কার্যকারণ তত্ত্ব (law of causation) নিয়েও ভেবেছেন। এবং সে ভাবনা লিখে প্রকাশ করেছেন। কণাদ বস্তুর অভ্যন্তরীন গঠন নিয়েও গভীর ভাবে ভেবেছেন। তারপর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন: Every object of creation is made of atoms which combine to form molecules!
কণাদ বৈশেষিক দর্শনটির প্রবক্তা হলেও কীভাবে কণাদ যৌক্তিক চিন্তার অধিকারী হয়েছিলেন-সে বিষয়ে এ যুগের মানুষের মনে কৌতূহল কম না। এ কালের গবেষকগণ প্রাচীন ভারতের বৈদিক সাহিত্যে সে সূত্র খুঁজেছেন। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতকের উপনিষদের যুগে ভাববাদী চিন্তার পাশাপাশি দার্শনিক চিন্তারও স্ফূরণ ঘটেছিল । বৃহদারণ্যক উপনিষদে একটি অত্যন্ত জ্ঞানদ্বীপ্ত শ্লোক রয়েছে। যেখানে ঋষি যাজ্ঞবল্ক মৈত্রেয়ীকে বলছেন:

আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যে মন্তব্যে নিদিধ্যাসসিতব্যঃ (৪/৫)

অর্থাৎ আত্মার তত্ত্বজ্ঞান লাভের দ্বিতীয় ধাপটি হল মনন। এবং মননের প্রধান সাধন হল যুক্তিতর্ক, আর যুক্তিতর্ক শাস্ত্র হল ন্যায় ও বৈশেষিক। তবে আমরা এও জানি যে সে যুগে মননের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ ছিল না। কেননা, বেদকে অস্বীকার করে যুক্তির চর্চা করা যাবে না-বৈদিক শাস্ত্রকারের এ ধরনের প্রগতিবিরুদ্ধ কথাও বলতেন। কেউ কেউ অবশ্য জ্ঞানের স্বার্থে সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেন।
চিন্তানায়ক বিজ্ঞানমনক্স কণাদ ছিলেন তাদেরই একজন।
কণাদ যে বইটি লিখে তাঁর ধ্যানধারণা প্রকাশ করেছেন সে বইটির নাম: ‘বৈশেষিক সূত্র।’ কণাদ বইটির প্রথম আহ্নিকে (আহ্নিক= অধ্যায়) বলেছেন: অথাতো ধর্মং ব্যাখ্যাস্যামঃ। এর মানে: অতএব আমি এখন ধর্ম ব্যাখ্যা করব। কিন্তু কণাদ ধর্ম ব্যাখ্যা করবেন কেন? তিনি তো সত্যসন্ধানী দার্শনিক। ধর্মের সঙ্গে তাঁর কি সম্পর্ক? বস্তুত সংস্কৃত ভাষার ধর্ম শব্দটির সংজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক এবং গভীর । বিশ্লেষনধর্মী অনুসন্ধানও যার অন্তর্গত । উপনিষদেই তো বলা হয়েছে: আত্মার তত্ত্বজ্ঞান লাভের দ্বিতীয় ধাপটি হল মনন। কাজেই কণাদ তো ধর্ম ব্যাখ্যা করছেন। এ জন্যই কণাদকে বলা হয় দার্শনিক-ঋষি ।
কণাদ কে দার্শনিক-ঋষি ছাড়াও আচার্য কণাদও বলা হয়। আচার্যের কাছে শিষ্যরা আসে জ্ঞানলাভের জন্য। কণাদ শিষ্যদের বলছেন: আমি এখন ধর্ম ব্যাখ্যা করব। তাঁর কাছে শিষ্যরা এসেছে অনিবার্য দুঃখের হাত থেকে পরিত্রান পেতে। জগৎ দুঃখময়- কপিলের সাংখ্যদর্শনের প্রভাবে প্রাচীন ভারতে এরকম বিশ্বাস প্রচলিত ছিল । দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পেতেই দর্শনের চর্চা । এ কারণেই দার্শনিক-ঋষি ধর্ম (একালের দর্শন অর্থে) শিষ্যদের কাছে ব্যাখ্যা করছেন।
কণাদ বৈশেষিক সূত্র বইটির পরবর্তী আহ্নিকসমূহে তাঁর পরমাণুবাদ ব্যাখ্যা করেছেন। কেবল তাইই নয়-বৈশেষিক সূত্র বইটিতে কার্যকারণতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কণাদ লিখেছেন- Every effect is a fresh creation or a new beginning. এভাবে কণাদ কার্যর পিছনে পরমকারণের অস্তি¡তকে অস্বীকার করেন। কণাদ, বুদ্ধের মতোই ঈশ্বর অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চুপ ছিলেন। তবে বৈশেষিক দর্শনের পরবর্তী টীকাকারগণ পরমাত্মা হিসেবে ঈশ্বরের ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েছেন: যে ঈশ্বর পরিপূর্ণ ও শাশ্বত। এবং এই পরিপূর্ণ ও শাশ্বত ঈশ্বরই জগৎকারণ। এভাবে কণাদের বৈশেষিক দর্শন বস্তুবাদ থেকে ভাববাদে পরিনত হয় এবং প্রাচীন ভারতের স্বাধীন চিন্তার পথটি রুদ্ধ হয়। সমাজপ্রগতির পথও রুদ্ধ হয়ে যায় ...
বৈশেষিক সূত্র বইতে কণাদ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে ৭টি category তে বিভক্ত করেছেন। যেমন: দ্রব্য (substance), গুণ (quality), কর্ম (action), সামান্য (universal), বিশেষ (particular), সমবায় (inherence) এবং অভাব (non-existence).
এখানে বলে নিতে চাই যে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে বাংলার বাউলগানের একটা সম্পর্ক রয়েছে। আজ যে রাষ্ট্রটি ভারত- সে রাষ্ট্রটি কালের বিবর্তনে বহু ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। প্রাচীন বাংলা প্রাচীন ভারতেরই অন্তর্গত ছিল। এই কারণে ভারতীয় দর্শন তথা বৈশেষিক দর্শনের আলোচনার এ পর্যায়ে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও লালনের একটি গান সম্বন্ধে কিছু কথা বলা আবশ্যক। গানটি হল:

পাবে সামান্যে কি তাঁর দেখা/ বেদে নাই যার রূপরেখা ...

লালনকথিত এই "সামান্য" হচ্ছে universal বা সার্বিক ধারণা। যেমন -মনুষত্ব। আর বিশেষ (particular) হল মানুষ। লালন বলছেন তাঁকে (Ultimate Reality=মনের মানুষ/অচিন পাখি) সামান্যে কিংবা সার্বিক ধারণার মধ্যে পাওয়া যাবে না। তাহলে মনের মানুষকে কোথায় পাওয়া যাবে? মনের মানুষকে পাওয়া যাব বিশেষ-এ; অর্থাৎ particular এ। মনুষত্ব সামান্য হলে মানুষ হল বিশেষ । তাই লালন বলছেন:

পাবে সামান্যে কি তাঁর দেখা

অর্থাৎ সামান্যে তাঁকে পাওয়া যাবে না। তাকে পাওয়া যাবে বিশেষে ... অর্থাৎ মানুষে। লালন তাই মানুষের (বিশেষে) ভিতর মনের মানুষের সন্ধান করতে বলেছেন। লালন তাই গেয়েছেন:

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি নইলে ক্ষ্যাপা রে তোর মূল হারাবি ...

সেই যাই হোক। বলছিলাম ... বৈশেষিক সূত্র বইতে কণাদ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব এই ৭টি category তে বিভক্ত করেছেন। পদার্থকে ৭টি বর্গে বিভক্ত করা ছাড়াও কণাদ নয়টি পরম পদার্থের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি হল ভৌত এবং চারটি অ-ভৌত। পাঁচটি ভৌত পদার্থ হল: পৃথিবী পানি আগুন বাতাস এবং আকাশ। এবং চারটি অ-ভৌত পদার্থ হল: স্থান কাল (সময়) আত্মা ও মন। এদের মধ্যে পৃথিবী পানি আগুন ও বাতাস হল আণবিক। কিন্তু আকাশ হল অ-আণবিক এবং শাশ্বত। এছাড়া স্থান ও কালও শাশ্বত এবং অনন্ত। আত্মার বৈশিষ্ট্য অনেকটা সত্তার মতোই। কণাদ মনে করতেন চৈতন্য হল দৈব । যখন আত্মা শরীরে সংলগ্ন হয় তখনই শরীর চৈতন্য লাভ করে। Thus, consciousness is not considered an essential quality of the soul. মন হল আণবিক কিন্তু অবিভাজ্য এবং শ্বাশত পদার্থ। জগতে যে সব বস্তু রয়েছে মন তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে।
কণাদ লক্ষ করেছেন যে নতুন মৃৎপাত্র তাপে কালো হয়ে যায়। এর মানে বস্তুর ওপর তাপের প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু এর কারণ কি? কণাদ ঠিকই উপলব্দি করতে পেরেছিলেন বস্তুর অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই বস্তুর বাইরের দিকটা বদলে যায়। কণাদ মনে করতেন বস্তুর এই বৈচিত্র আসলে পরমাণুরই বৈশিষ্ট -যা ওই বিশেষ বস্তুটিকে তৈরি করেছে। এসব পর্যবেক্ষণের পর কণাদ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে- বিশ্ববহ্মান্ডের সব পদার্থ আর বস্তুই পরমাণু দ্বারা গঠিত।
পরমাণু সম্বন্ধে ভারতীয় ধারণা সম্ভবত গ্রিসে পৌঁছেছিল গ্রিক সম্রাট আলেকজান্দারের ভারত আক্রমনের পর। গ্রিকরা ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে উত্তর-পশ্চিম ভারতে আক্রমন করেছিল। এর পরপরই গ্রিস ও ভারতের মধ্যে বৈদেশিক ও বানিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। গ্রিকরা পারস্য ও আফগানিস্তানে বসতি স্থাপন করে। তাদের মাধ্যমেই গ্রিসে তথা ইউরোপে ভারতীয় পরমাণু ধারণা পৌঁছেছিল বলে পন্ডিতদের ধারণা।
original post
read more

Sunday, November 20, 2011

নির্বাণ ও বিজ্ঞান

by শেখ আলীমুজ্জামান

বৌদ্ধ ধর্মমতে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সকল বন্ধন থেকে মুক্তি। এটাকে নির্বাণ বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে নির্বাণ শব্দটির অর্থ নিভে যাওয়া। তা হলে নির্বাণ কি জীবন বিমুখ কোন দর্শন? সক্রিয় সামাজিক জীবন ত্যাগ করে সন্যাস গ্রহণ করা? সন্যাসই যদি মোক্ষ হয় তা হলে পার্থিব জীবনের অর্থ কি? ভোগবাদ বনাম ভাববাদ- এর মূল দ্বন্দটি কোথায়? প্রথমেই স্বীকার করে নেই, বিষয়টি খুবই গভীর এবং আমি এ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ নই। নিজে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও ভিন্ন ধর্মের এই বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি বোঝার জন্য। ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কিছু চিন্তা সবার সাথে শেয়ার করছি এই প্রত্যাশায় যে,এভাবে হয়তো জীবন নিয়ে কবি জীবনান্দের সেই বিপন্ন বিস্ময় কিছুটা স্তিমিত হবে।

অনেকেরই মতোই ধর্ম সম্পর্কে আমার কৌতূহল আছে। উপমহাদেশের অন্যান্য ধর্ম যেমন জৈন বা হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি রয়েছে বিশেষ আগ্রহ, কারণ ধর্মটি আমাদের অঞ্চল হতে উদ্ভুত। নেপালের লুম্বিনী যেখানে গৌতম বুদ্ধ জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কিংবা বিহারের গয়া, যেখানে তিনি বোধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, জায়গাগুলো বা তার বাতাবরণ অনেকটা আমাদের দেশের মতোই। এই অঞ্চলের জীবন যাপন পদ্ধতি বা মেজাজ, জন্ম সূত্রেই আমাদের পক্ষে বোঝা সহজ। অন্য দিকে ইহুদি, খৃষ্টান বা ইসলাম ধর্মের উদ্ভব হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মরু অঞ্চলে, যেখানকার জীবন যাপন পদ্ধতি বা মেজাজের সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে আমরা পরিচিত নই। বঙ্গে ইসলাম ধর্ম আসার আগে আমরা অধিকাংশই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলাম বলে জানি। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরেও আমরা বাঙ্গালী মুসলিমরা যে নমনীয় রয়ে গেছি, তার কারণ বোধ হয় আমাদের এই অতীত প্রেক্ষাপট।

হিন্দু ধর্মে জীবনের প্রধান চারটি অধ্যায় হচ্ছে, ব্রহ্মাচার্য (ছাত্র জীবন), গার্হস্থ্য (সংসার), বানপ্রস্থ ও সন্যাস। ব্রহ্মাচার্য, গার্হস্থ্য সহজেই বোধগম্য। বানপ্রস্থ হচ্ছে সংসারের বিষয় আসয় থেকে মুঠো আলগা করা। অনেক তো কাম-কামাই হলো, এবার কি পেলাম বা কি পেলাম না, সে হিসেব থেকে একটু দূরে সরা। যা আঁকড়ে ধরে আছি তার বাধন হালকা করে, দান-খয়রাতের মাধ্যমে কিছুটা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। আর জীবনের শেষ অধ্যায়, সন্যাস হচ্ছে হাত সম্পূর্ণ খালি করা। সংসার ত্যাগ করে, কোন আশ্রমে গিয়ে ধ্যান বা প্রার্থনা করা।

ইসলাম ধর্ম সন্যাস সমর্থন করে না। ধর্মগ্রন্থ কোরান সমাজের মাঝে থেকেই, আমৃত্যু জীবন যাপন করার বিধান দেয়। দান-খয়রাত করার বিধান আছে, তবে জীবনের শেষ বয়সে আয় উপার্জন থেকে দূরে সরে যেতে হবে সে কথা বলে না। অর্থাৎ সংসারের মাঝে থেকেই বানপ্রস্থ চর্চা করতে হবে, সংসার ত্যাগ করা যাবে না। প্রয়োজনের অধিক সম্পদ আহরণ করা যাবে, প্রয়োজন হলে একাধিক বার বিয়েও করা যাবে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, পার্থিব অর্জনে নিষেধ নেই, নেই বয়সের কোন সীমাবদ্ধতা ।

হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের এই জীবন বিরাগী ও জীবন মুখী দর্শন জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখা যেতে পারে। জীবন যাপনের ক্ষেত্রে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে দুটি বিপরীত সিস্টেম রয়েছে। একটি হচ্ছে সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম অপরটি প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম। সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হলে মানুষ আক্রমানাত্মক হয়ে ওঠে আর প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হলে মানুষ হয়ে ওঠে রক্ষনাত্মক, পলায়নপর। এজন্য এ দুই সিস্টেম এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে “ফাইট অথবা ফ্লাইট (fight or flight)” রেসপন্স বলা হয়। মানুষ কখন ফাইট করবে বা আক্রমণ করবে, আর কখন ফ্লাই করবে বা পালাবে, তা অনেকটা নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর। পরিবেশের প্রভাব একটি গোষ্ঠী বা সমাজকে তূলনামূলক ভাবে অধিক আক্রমণাত্মক বা অধিক পলায়নপর করে তুলতে পারে।

জীবনের প্রতি ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গী ইতিবাচক, তবে তূলনামূলক বিচারে একটু আক্রমণাত্মক বলে মনে হয়। ইসলামে এই ফাইট রেসপন্স এর আধিক্যের কারণে এগিয়ে যাওয়া, যুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে অনেক বার। প্রয়োজনে যুদ্ধের মাঠে শহীদ হবার কথাও বলা হয়েছে। ফ্লাইট রেসপন্স অর্থাৎ পালানোর কথা খুব বেশী বলা হয় নি। এর পিছনেও রয়েছে পরিবেশের প্রভাব । ইসলামের উন্মেষ ঘটে ধূ ধূ মরুভূমি অঞ্চলে। সেখানে পালিয়ে যাওয়ার জায়াগা তেমন নেই। পালিয়ে গেলেও বাঁচা দুষ্কর কারণ জীবন ধারণের অন্যতম উপাদান পানির উৎস সেখানে সীমিত। খাবার কিংবা জীবন ধারণের অন্যান্য উপকরণও অপ্রতুল। সুতরাং জীবন বাজী ধরে যুদ্ধ না করে পালিয়ে গেলে বৈরী পরিবেশে টিকে থাকা দুষ্কর। সম্ভবত একই কারণে সমাজ ত্যাগ করে সন্যাস অবলম্বন করাকে সমর্থন করা হয় নি।

অপর দিকে হিন্দু ধর্মকে তূলনামূলকে বিচারে রক্ষনাত্মক মনে হয়। এ ধর্মে সংসারের প্রতি বৈরাগ্য বা সংসার ত্যাগ করে সন্যাস অবলম্বন করাকে সমর্থন করা হয়। এটা কিন্তু জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় ফাইট নয় বরং ফ্লাইট রেসপন্স। এর পেছনেও রয়েছে পরিবেশের প্রভাব। হিন্দু ধর্ম বিকশিত হয়েছে পাকভারত উপমহাদেশে। এ অঞ্চলে প্রচুর নদীনালা ও বনবাদাড় রয়েছে। আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ, তাই বনবাসী হলেও ফলমূল বা বন্য প্রাণীর দুধ-মাংস খেয়ে জীবন ধারণ করা সম্ভব। আগেকার দিনে সন্যাসীরা তাই করতেন। সঙ্গত কারণেই, এ অঞ্চলে বিকশিত হিন্দু ধর্মের দর্শনে ফ্লাইট রেসপন্স এর আধিক্য পরিলক্ষিত হয়।

বৌদ্ধ ধর্ম এক্ষেত্রে একটু আলাদা। এ ধর্মের অনেক ধারণাই হিন্দু ধর্ম থেকে আসার কারণে মূল সুর রক্ষনাত্মক। তবে বৌদ্ধ ধর্ম সংঘবদ্ধ জীবনের কথা বলে, সন্যাস সমর্থন করে না। ফাইট অথবা ফ্লাইট রেসপন্সএর পরিবর্তে জীবনের প্রতি একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী পরিলক্ষিত হয় এ ধর্মে। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন জীবন যাতনাময়। জীবন যুদ্ধে জিতে কিংবা জীবন থেকে পালিয়ে, কোন ভাবেই জীবন জ্বালা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। বরং জগতের মায়াজালে জড়িয়ে না পড়াই শ্রেয়, কারণ তা দুঃখ ভোগের কারণ হবে। মুক্তি খুঁজতে হবে জাগতিক বাসনা নির্বাপনের মধ্য দিয়ে। আর সেই মুক্তির সর্বোচ্চ সোপান হচ্ছে নির্বাণ।

ভাববাদী দৃষ্টিকোন থেকে নির্বাণ সম্পর্কে অনেক লেখালেখি হলেও, বস্তুবাদী মানুষের পক্ষে দর্শনটি বোঝা বেশ কঠিন। তাই ভাববিদ্যা নয় বরং পদার্থবিদ্যার আলোকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করা যাক। কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে স্থান ও সময়, এ দুটো জিনিস আপেক্ষিক। তাই স্থান বা সময়ের কোন পরম অস্তিত্ব নেই বা সেভাবে তা মাপাও সম্ভব নয়। বিষয়টি মনে রেখে, এবারে দেখা যাক, ধর্ম সময়কে কি ভাবে মাপছে। ইহুদি, খৃষ্টান ও ইসলাম ধর্মে সময় হচ্ছে একটি সরল রেখা। শুরুতে শুধু আল্লাহ বা ঈশ্বর ছিলেন, সময় বলে কিছু ছিল না। সময়ের সরল রেখাটি শুরু হল, যখন তিনি সৃষ্টি করা শুরু করলেন। প্রথমে তিনি ফেরেশতা সৃষ্টি করলেন। তার পরে তিনি মানুষ সৃষ্টি করলেন। তার পরে সেই মানুষকে সিজদা না করার জন্য শয়তানকে বিতাড়িত করলেন। তার পর বেহেস্ত সৃষ্টি করলেন। তার পর সেখানে মানুষকে থাকতে দিলেন এক শর্তে যে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়া চলবে না। মানুষ ভুল করে বসলো। তার পর সৃষ্টিকর্তা আসমান ও যমিন (পৃথিবী এবং চাঁদ-তারা খচিত এই বিশ্ব) সৃষ্টি করলেন। মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন পৃথিবীতে। পার্থিব জীবনের পরীক্ষায় কেউ ভাল রেজাল্ট করলো, কেউ ফেল করলো। সেই অনুযায়ী বেহেস্ত ও দোযখ তৈরী করা আছে, সেখানে রেজাল্ট অনুযায়ী মানুষকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এবং তখনই সময়ের সরল রেখাটি যাবে থেমে ।

এবার আস যাক সময় সম্পর্কিত বৌদ্ধ ধর্মীয় ধারণায়। বৌদ্ধ ধর্মে কিন্তু সময়টা সরল রেখা নয়, বরং বৃত্তাকার। শুরুতে সময় ছিল না। যা ছিল তা ঈশ্বর নয়, তাকে বলে হয়েছে পরম সত্তা (গৌতম বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি, স্বর্গ-নরকের কথা বলেন নি)। সময়ের শুরু হয় মহাবিশ্বের সৃষ্টি লগ্নে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই সৃষ্টি লগ্নকে বলা হয় বিগ ব্যাং। অর্থাৎ একটি বিশাল বীষ্ফোরণ (বিগ ব্যাং) এর ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হলো এবং তা ক্রমাগত সম্প্রাসারিত হতে শুরু করলো। ছায়া পথ, সৌরজগত সৃষ্টি হলো। পৃথিবী নামক গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ঘটলো। সেই প্রাণ বিকশিত হয়ে মানুষের জন্ম হলো। মানুষের দেহ ও আত্মা আছে। আত্মা হচ্ছে সময় শুরু হওয়ার আগে যা ছিল, সেই পরম সত্তার অংশ। এক পর্যায়ে মহাবিশ্বের সম্প্রাসরণ থেমে যাবে। সম্প্রাসারিত বৃত্তটি সংকুচিত হয়ে কিংবা ধ্বসে পড়ে বিলীন হয়ে যাবে। সেখানেই কিন্তু শেষ নয়, বারবার এই চক্রের পূণরাবৃতি ঘটবে। আবারো আর একটা বিগ ব্যাং হবে, মহাবিশ্ব পূণর্বার সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর মতো একটি গ্রহে আবারো প্রাণের উদ্ভব ঘটবে, জন্ম নেবে মানুষ। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, এটাই বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম চক্র।

তবে আগের বার যে ভাবে জন্ম হয়েছিল, পরের বার ঠিক তেমনটি হবে না। পরের জন্মটি হবে পূর্ব জন্মের কর্মের উপর নির্ভর করে। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ বোধি বৃক্ষের নীচে ধ্যানে বসে অতীত অবলোকন করেছিলেন এবং তিনি অতীতের একুশটি বিগ ব্যাং পর্যন্ত তাঁর জন্ম পরম্পরা অবলোকন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যে ভাবে, যেখানেই জন্ম হোক না কেন, জগতে দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণ নেই। তবে এই জাগতিক যাতনা থেকে মুক্তি লাভ করার উপায়ও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সেটা হলো বিগ ব্যাং এর চক্র থেকে আত্মাকে মুক্ত করা। দৈহিক কামনা-বাসনার আগুন পরিপূর্ণ নির্বাপিত করতে পারলেই আত্মার চিরমুক্তি ঘটবে, অর্থাৎ নির্বাণ লাভ হবে। যে নির্বাণ লাভ করবে তার পূণর্জন্ম হবে না। বিগ ব্যাং এর চক্রে সে আর প্রবেশ করবে না। সে মিশে যাবে পরম সত্তার সাথে ।

original post

read more

বিনির্মাণ

by আন্দালিব নিজাম

মাঝে মাঝে কোলাহল মুখ ফিরিয়ে নেয় জলের প্রবাহের মতো শব্দের ঢেউ এলোমেলো যত্রতত্র হঠাৎ খুলে যায় স্রোতমুখ তার অন্যদিকে কোন অন্য মানুষের দিকে

কোলাহলে পিঠ রেখে অন্ধকার দেখি
গাঢ় বিশুদ্ধ অন্ধকার জ্বলছে মেরুদণ্ডহীন
লতানো গাছের মতো নমনীয়, নতজানু
জড়িয়ে আছে বিদ্যুল্লতা
একা একা তীব্র মৌন

নেই আপত্তি নেই অভিযোগ
নেই পুরানো হিসাব মেটানোর দায়

একটা ফ্ল্যাট স্যান্ডের পরে ফটফট করতে করতে পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে উঠে দেখি হাতুড়ি এবং লোহা দিয়ে দুইজনে দেয়াল ভাঙছে। দুম দুম করে কেঁপে উঠছে দরজা জানালা দেয়াল – এমনকি এলিভেটরের কাঠামোও! কাঁপতে কাঁপতে হাতড়ে একটা অবলম্বন খুঁজি। চেয়ার কিংবা শক্ত কোন বাক্স, ভর দিয়ে একটু কাঁপুনি সামলে নিবো। ফর্সা তন্বী দেয়ালে কালো লোহার ছেনির আঘাতে চাপড়া চাপড়া প্লাস্টার খসে পড়ছে। সিমেন্টের গুঁড়ো, ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে বাঁকাত্যাড়া ইটগুলো বেরিয়ে আসছে। দাঁতাল শুয়োরের মত হাসছে। দুইজনে পিটিয়ে দরজার পাল্লাগুলো খুলে ফেলছে। দরজা কপাট হাট হয়ে গেল – নির্লজ্জের মত। দেয়ালে গাঁথা দুয়েকটা পেরেক, ছবি ঝুলেছিল হয়তো সেখানে। সেগুলো নেই। ছবির ফ্রেমের কালো দাগ। হাতুড়ির বাড়িতে তুবড়ে গেল…

সুইচবোর্ড খুলে গেল, পিভিসি পাইপের ভেতর জড়ানো লাল-নীল তার। অমন তারগুলো গলায় জড়িয়ে কোন কোন মেয়ে যেন ঝুলে পড়েছিলো। মনে পড়ে না আর। মৃত্যুর খাতার চাপা পড়া পৃষ্ঠা হারিয়ে ফেলেছি।

রাজমিস্ত্রিদের গায়ে কালো জামা। এই বাসায় ফ্যান নেই, জানালাগুলো চোরের ভয়ে বন্ধ আর গুমোটে ভরে আছে ঘামের নোনা গন্ধ। পিছলে পিছলে চকচকে ঘাম মুছে তারা হাতুড়ি চালায়। দেয়াল ভাঙছে, চাঙড় চাঙড় ইট খুলে আসছে দেয়াল থেকে। দুম দুম শব্দের ঢেউ আমার বুকের মধ্যে ভরে যায়। সারাদিনমান একলা হয়ে যাই আর ভাঙা দেয়ালের মত চোয়াল – বয়ে বেড়াই মৃত্যুর আদুরে আবছায়া, হাতুড়ির মত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য যার।

read more

Saturday, November 12, 2011

“একটা চিঠি” ……(বাবা-মায়ের লেখা, যা পোস্ট করা হয়নি)……….

by আউয়াল উজ জামান রিমন

প্রিয় সন্তান,
…………

আমি যখন বার্ধক্য উপনীত হবো…।আমি আশা করবো.. “তুমি আমাকে বুঝবে এবং আমার সাথে ধৈর্যশীল হবে”

ধরো আমি যদি হঠাৎ থালা ভেঙ্গে ফেলি,অথবা টেবিলে স্যুপ ফেলে নষ্ট করি…..
কারণ আমি আমার দৃষ্টিশক্তি হরিয়ে ফেলছি….। আশা করি তুমি আমার প্রতি চিৎকার করবে না।

বয়স্ক মানুষ খুব স্পর্শকাতর….……
তুমি যখন চিৎকার করে কথা বলো তখন তারা নিজের কাছে খুব ছোট হয়ে যায় , অসহায় আর অপরাধী মনে করে নিজেকে।।

যখন আমার শ্রবণশক্তি শেষ হয়ে আসছে…এবং আমি শুনতে পাচ্ছি না তুমি কী বলছ!!
তোমার তখন আমাকে “বধির” বলা উচিৎ নয়।
দয়া করে তুমি পুনরায় বলো অথবা লিখে দেখাও

আমি দুঃখিত বাবা………….আমি বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি……..আমার পা দুর্বল হয়ে আসে
আমি মনে মনে চাই তোমার সে ধৈর্য থাকবে আমাকে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য।
যেভাবে আমি তোমার পাশে ছিলাম, যখন তুমি ছোট ছিলে……… হাঁটতে শিখছিলে পা পা করে….

আমার কথা শুনো…….
যখন আমি অসহায়ের মত তোমার নিকট কথা বলবো…. ভাঙা রেকর্ডের মতো ….
আমি চাইবো তুমি শুধু আমার কথাটুকু শুনবে..
আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করো না…. অথবা আমার কথা শুনে বিরক্ত হয়ো না……….

তোমর মনে আছে??
তুমি ছোট থাকতে আমার কাছে একটা বেলুন চেয়েছিলে!!!!!

সেটা না পাওয়া পর্যন্ত তুমি বারবার আমাকে সেটাই বলতে….. সারাক্ষণ জিজ্ঞেস করতে.. “কখন দেবে কখন দেবে…………..”

এবং আমার গন্ধ সহ্য করো
বৃদ্ধের মতই আমার গন্ধ হবে…..
এজন্য….
দয়া করে আমাকে গোসল করার জন্য জোর করোনা
আমার শরীর দুর্বল
ঠাণ্ডায় বয়স্ক মানুষেরা খুব তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে পড়ে….

আমার আশা আমি তোমকে অমার্জিত করি নি

তুমি যখন ছোট ছিলে…আমাকে তোমার পেছনে দৌড়াতে হতো… কারণ তুমি গোসল করতে চাইতে না

আমি যখন সহজে রেগে যাই..
এটা বয়স্ক হবার একটা সাধারণ দোষ,
বার্ধক্য আসলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।।

আর যখন তোমার অলস সময় থাকবে
আমি আশা করবো তুমি আমার সাথে একটু সময়ের জন্য হলেও কথা বলো……..

আমি এ সময়ে সর্বদা একাকীত্বে ভুগি
এবং কথা বলার মানুষ পাই না
আমি জানি তুমি ব্যস্ত থাকো কাজের মাঝে..
যদিও তুমি আমার কথায় ও গল্পে আনন্দ না পাও..
আমার জন্য কিছু সময় রেখো

তুমি যখন ছোট ছিলে তোমার কী মনে পড়ে??
তোমার টেডি বিয়ারের কথাও আমি শুনতাম….

যখন সময় আসবে আমি অসুস্থ হয়ে পড়বো এবং
বিছানায় শায়িত হয়ে পড়বো
তুমি কী আমার যত্ন করার মতো ধৈর্য রাখবে??

আমি দুঃখিত
দুর্ঘটনা বশত যদি আমি বিছানা ভিজিয়ে ফেলি
অথবা বোকার মত আচরণ করি

আমি আশা করি তুমি এটুকু ধৈর্য রাখবে জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে আমাকে দেখে রাখার জন্য…
আমি আর বেশিদিন বেঁচে থাকব না,
………..

যাই হোক………..

যখন আমার মৃত্যু আসবে..
তুমি কী আমার হাত ধরে থাকবে না; যা আমাকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য সাহস যোগাবে।

এবং চিন্তা করোনা….
যখন আমার সৃষ্টিকর্তার সাথে দেখা হবে….
আমি তার কানে অবশ্যই বলবো….
তোমকে অনুগ্রহ করতে………..

কারণ তুমি তোমার বাবা-মাকে ভালবেসেছিলে………
তোমার যত্ন ও সহমর্মিতার জন্য ধন্যবাদ………

আমরা তোমাকে ভালোবাসি।।।।

আরও ভালোবাসার সাথে……
বাবা-মা

original post

read more

রাজাকার

by অয়ন মোহাইমেন

স্বপ্নে এক মুক্তিযোদ্ধার সাথে বর্তমানের এক তরুণের দেখা। প্রথমজনই কথা শুরু করলেন।

-রাজাকার কারা?
-একাত্তরে যারা রাজাকার দলের সদস্য ছিল তারা।
-রাজাকাররা কি ঘৃণ্য?
-অবশ্যই, কারণ তাদের কোন আদর্শ ছিল না; দশজনের কথা ভাবার আগে তারা নিজেদের কথা ভেবেছে; নিজের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে তারা হিংস্রতার নিম্নতর স্তরে পর্যন্ত গিয়েছে; সম্পদ লুট করেছে; সাধারণ মানুষ হত্যা এমন কি ধর্ষণ করতেও বাঁধেনি তাদের।
-কিছু কিছু রাজাকার তো ছিল যাদের আদর্শ ছিল, মুসলিম লীগ করে পাকিস্তানের স্বাধীনতা এনেছিল বলে তারা মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করে নি, তাদেরকেও কি তুমি ঘৃণ্য বলবে?
-হ্যাঁ। তাদের অধীনের লোকেরাই এসব নিকৃষ্টতা করেছে কিন্তু তারা কখনো বাধা দেয় নি। এ পৃথিবীর কোনও নীতিতেই এদের প্রশ্রয় দেয়াকে মেনে নেয়া যায় না।
-ঠিক আছে। তবে সে সময়কার সুশীল সমাজের যারা রাজাকারে যোগদান করেনি কিন্তু পাকিস্তানি অফিসারদের পার্টিতে গিয়েছে, তাদের তোষামোদ করেছে, তাদের তুমি কি বলবে?
-তারাও আদর্শহীন। এদিক দিয়ে তারাও রাজাকারের সমতুল্য।
-অর্থাৎ বড় অর্থে ধরলে যারা সুবিধাবাদী, আদর্শহীন এবং আত্মকেন্দ্রিক; নিজে সকল সুবিধা ভোগ করেও যারা অন্যের কথা এতটুকুও চিন্তা করে না তারাই রাজাকার?
-হ্যাঁ।
-অনেক কথা হল। এবার তোমার সম্পর্কে জানা যাক। তুমি তো ২০১১ সালের এক তরুণ, এখন মুক্তিযুদ্ধ হলে তুমি কি যুদ্ধে যেতে?
-(দৃঢ়স্বরে) হ্যাঁ যেতাম।
-রাজাকার হতে না?
-(আরও দৃঢ় ও জোরালো স্বরে) না।
-বেশ ভালো কথা। তা তোমার নাম কি?
-(নাম বলা হল)
-আমি যে স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়ে গেলাম তার কোনও সুবিধা কি তুমি ভোগ করছ?
-আমি আজ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারি, আমার মাতৃভাষায় কথা বলতে পারি, অন্য ভাষা, ভূখণ্ড বা জাতীর কেউ এসে আমার ওপর অবিচার করতে পারে না। অবশ্যই, আপনাদের কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ।
-ভালো কথা। তা তুমি তো একটি সচ্ছল পরিবারে ছেলে?
-জি।
-এখন কি করছ?
-…… বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি।
-আমি আবার বুঝিয়ে বলি, তুমি এক সচ্ছল পরিবারের ছেলে; একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছ; আমার প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতা ভোগ করছ, আমার প্রশ্ন তার বিনিময়ে তুমি কি করছ? আমায় তুমি কতটুকু ফিরিয়ে দিচ্ছ?
-আমি আমার পড়াশোনা করছি, আমি বড় এক চাকুরীজীবী হলে তো এ দেশেরই নাম বাড়বে, তাই নয় কি?
-মনে করিয়ে দেই, তুমি এক স্বপ্নের মাঝে আছ। এখানে মিথ্যা বলা অসম্ভব। এবার বল, তুমি পড় কিসের জন্য? দেশ নাকি নিজের টাকা বানানোর জন্য?
-…… নিজের জন্য।
-দেশের স্বার্থে কোনও বিষয় নিয়ে তুমি মাথা ঘামাও না, ন্যায়ের পথের কোনও আন্দোলনের পিছে দাঁড়াও না, বেশিরভাগ ২৬শে মার্চ, একুশে ফেব্রুয়ারিতে তুমি ঘুমিয়ে কাটাও, যদি কখনো কিছু করেও থাক কি জন্য কর? আমাদের প্রতি সম্মান নিয়ে নাকি বন্ধুরা যায় বলে? ‘মাস্তি’ হবে বলে?
-সত্যি বলতে বন্ধুরা যায় বলেই যাই।
-আচ্ছা আমি নাহয় ধরে নিলাম তুমি তোমার মতো করেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, হয়তো ভালো কিছু, নতুন কিছু করে দেখাতে চাও পড়ালেখা, খেলাধুলা এদের মাঝেই। অথবা সৃষ্টিশীল গান, নাটক বা এধরনের কিছু কর। অর্থাৎ এমন কিছু যা তুমি শুধু নিজের জন্য, নিজের ভালো লাগার জন্য বা খ্যাতির জন্য কর না। মানুষের জন্য কর। এমন কিছু কি তুমি কর? আবারো বলছি তুমি স্বপ্নে আছ। মিথ্যার অস্তিত্ব নেই এখানে।
-আমার ভালো একটি ক্যারিয়ারেও তো মানুষেরই লাভ। আমি একটি ফ্যাক্টরি তৈরি করে কত মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারি। এভাবে আমি মানুষের জন্য করব।
-ভুল করে কারো পকেট থেকে টাকা পড়ে যাবার পর তা যদি কেউ খুঁজে পায় তাকে দান বলা যায় না। আমার প্রশ্নটি উদ্দেশ্যে। তুমি ফ্যাক্টরি দিচ্ছ তোমার জন্য, ক্যারিয়ার ডেভেলপ কর তোমার জন্য মানুষের জন্য নয়। এতে মানুষের কিছু হচ্ছে না তা আমি বলব না, কিন্তু যে কাজ তোমার ইচ্ছায় হয়নি তা থেকে তুমি কিছু দাবি করতে পার না। আবার এ কথাও সত্যি, জীবনের সবচাইতে স্বাধীন সময় তুমি এখন কাটাচ্ছ, এখনই যদি তুমি কারো জন্য কিছু না কর তবে সে সময় করবে এ প্রশ্নই তো আসে না।
-কিন্তু করতেই হবে কে বলেছে?
-কেউ বলেনি যে করতেই হবে। আমি দেখতে পারছি তুমি কিছুই করো না। তোমার মুখ থেকেই জানতে চাচ্ছি যে তুমি করনি। কেননা সুবিধা নিয়ে কিছু না করাই তো অপরাধ। তাই শেষবারের মত বলছি। নিজের জন্য ছাড়া মানুষের জন্য তুমি কিছু কর?
-(দীর্ঘশ্বাস) না।
- তাহলে তুমি হচ্ছ এমন একজন ছেলে যে কিনা সমাজের প্রায় সকল সুবিধাই ভোগ করে, আমার প্রাণর্জিত স্বাধীনতাকে পেট পুরে খায়, কিন্তু যা যেনে আমি ঘুমিয়েছিলাম, যে তুমি মানুষের জন্য কাজ করে যাবে তার কিছুই তুমি কর না। তাই আমি তোমায় বলতেই পারি তুমি একজন আত্মকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী, আদর্শহীন মানুষ।
-জি পারেন।
-তবে স্বপ্নের প্রথমাংশের কথা চিন্তা করে দেখ তো তুমি কে?
-(প্রচণ্ড ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো ছেলেটার। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোনও কথা বেরোচ্ছে না তার মুখ দিয়ে)
-তুমি কে?
-জানি না।
-(উচ্চস্বরে) তুমি কে?
-(নিম্ন-শিরে, নিম্নস্বরে ছেলেটির জবাব) আমি এক রাজাকার।

এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে গিয়ে শোওয়া থেকে বসে পড়ল ছেলেটি। দৌড়ে গিয়ে আয়নার দিকে তাকালো সে।
আঁতকে উঠল।
এত বীভৎস চেহারার এ কে?
ভয়ে বারবার মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকল সে।
কিন্তু আবারো একই দৃশ্য, শত ঝাপটাতেও তা যাবার নয়।
এমনই সময় আকাশ থেকে ভেসে এলো স্বপ্নের কথাগুলো “আমি এক রাজাকার… আমি এক রাজাকার…”, ইয়াহিয়ার সেই ছবিটির মতই কুৎসিত আয়নার চেহারাটি মাথার চারপাশে ঘুরতে লাগলো।
আর সহ্য করতে না পেরে আয়নাটিই ভেঙে ফেলল সে।
অবশেষে নীরবতা ……… প্রশান্তি।
ভেবেই নিচের দিকে তাকালো ছেলেটা।
ভয়-ক্ষোভ-হীনমন্যতা-নিকৃষ্টতায় দুহাতে মাথার চুলগুলো জাপটে ধরে আর্ত চিৎকার করে উঠল সে।

হাজার ভাঙা আয়না হতে তার দিকে তাকিয়ে আছে হাজারটি রাজাকার।

***

(সকল কথা ও চরিত্রই কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে কোনোভাবে মিলে গেলে লেখক দায়ী নন। এমনকি অনেকের সাথে মিলে গেলেও না)

original post

read more

গলা কাটার ‘সৌদি’ তরিকা

by ফজলে রাব্বী আসিফ

১৫০০ বছর আগে মানুষ ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করত, তখন তলোয়ারের কোপে মৃত্যুদণ্ড ই ছিল স্বাভাবিক, কারণ মানুষ এতে অভ্যস্ত ছিল । এখন কি সেই ঢাল- তলোয়ারের যুগ আছে নাকি ?? সময়ের সাথে সাথে মানুষ আরো উন্নত মন-মানসিকতার সাথে পরিচিত হইতেছে, ১৫০০ বছর আগের জীবন যাত্রা চিন্তা চেতনার সাথে এখনকার মানুষের চিন্তা চেতনার আকাশ-পাতাল তফাত।

”মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ না ” … মানুষের আবেগ কে কোনও ধর্ম পাশ কাটাইতে পারে না, এটা ধর্মের উদ্দেশও না। ইসলাম সবচাইতে যুগোপযোগী ধর্ম। একমাত্র এই ধর্মের পক্ষেই সময়ের সাথে ‘আডাপ্ট’ করা সক্ষম, যে কারনে ‘ইজমা’ আর ‘কিয়াস’ এর সৃষ্টি । ধর্মের সবচাইতে বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা অনেক সময় অনেক কাস্টম বা প্রথা কে ধর্মের সাথে ‘গুলায়া’ ফেলি, এরপর এক্সময় সেগুলাকে ধর্মের চাইতেও বেশি গুরুত্তের সাথে নিতে শুরু করি, চিন্তাও করি না যে এর উতপত্তি টা কোথায় আর এটা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। ‘মৌলবাদ’ এর সুচনাও হয় এখান থেকেই … কোন যায়গায় লেখা আছে যে শুধুমাত্র খোলা রাস্তায় মানুশের সামনে তলোয়ারের কোপেই মারতে হবে, অন্য অন্য কোনও ভাবে করলে জায়েজ হবে না ???

বাংলাদেশে সউদি রাষ্ট্রদূত দম্ভভরে বলসে, একজন মানুষকে মারার জন্য পুরো এক গ্রামের সবার গলা কাটা যেতে পারে, এটা কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কথা ?? এই সেম কথাটা সে ইউরোপ- আমেরিকায় সবার সামনে দাঁড়াইয়া বলতে পারবে ???

একজন মানুষকে ৮ জন পিটাইয়া মারে না, এটা কোনও যুক্তিযুক্ত কথাও না। আমি যতদুর জানি মারামারির মধ্যে সে মারা গেছে।যার ‘ব্লো’ তে মারা যায় সে হচ্ছে মারডারার’, আর বাকিরা হয় ‘খুনের ‘সহচর’ বা ‘ Accomplice’ . একটা খুনের জন্য ‘ Murderer’ আর ‘ ‘Accomplice’ সবার ই কি একই শাস্তি হতে পারে ?? সৌদি বিচার ব্যবস্থার উপর কতখানি আস্থা রাখা যায় ?? এমনকি এদের লাশ ও ফেরত দেয় নাই, এইটাও কি ধরমে লেখা আছে নাকি ??

কিছু কিছু বাঙ্গালির দেখি সৌদিদের চাইতেও সৌদি বিচার ব্যবস্থায় আস্থা বেশি। সৌদি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও দেশে প্রকাশ্যে গলা কাটার বিধি নাই, তাই বলে কি তারা সবাই বিধর্মী হয়ে গেছে ? গলা কাটা কি ‘শরিয়তি’ রীতি নাকি ‘অয়াহাব’ ই রীতি সেটাও আসলে জানা দরকার।

আমি কখনই শাস্তির বিপক্ষে নই। অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু ইসলাম আমাকে শিখায় অন্ধভাবে কোনও কিছু অনুসরণ না করতে, নিজের বিচার-বিবেচনা, চিন্তা শক্তি কে কাজে লাগাতে । আমি আমার বিবেচনা বোধ কে কাজে লাগাতে চাই, আপ্নাদের টা আপনাদের যার যার নিজের বিবেচনা। ধর্মে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে যাতে শাস্তি দেখে ভয় পেয়ে অপরাধী অপরাধ করা থেেক বিরত থাকে। কিন্তু প্রতি বছর যেখানে ‘গলা কাটার’ পরিমান বেড়েই চলেছে, তখন বোঝাই যায় নিশ্চয়ই সিস্টেমে কোনও সমস্যা আছে, গলা কাটাই এর একমাত্র সমাধান না।

একই অপরাধে ‘বাংলাদেশী’ অথবা সোমালিয়ান হলে গলা কাটা হবে, আর সৌদি প্রিন্স বা কোনও ‘ ইওরপিয়ান/ আমেরিকান’ করলে আদর করে ছেড়ে দেয়া দেয়া হবে, এটা কি ধর্মের নিয়ম ? ‘ একই অপরাধে একজনের ‘শাস্তি’ আরেকজনের চিন্তাবিহিন ‘স্বস্তি’ ! হাস্যকর ! সৌদিতে এখন ‘আল্লাহর হুকুম’ কায়েম করতেও ‘ ইউরোপ/ আমেরিকা’ র সামন্ত প্রভুদের ‘অনুমতি লাগে !! এটা তো আরো ভয়াবহ অবস্থা …।

original post

read more

Thursday, November 3, 2011

৯/১১ – কোরান পোড়ানোর স্বাধীনতা বনাম অসভ্যতা

by বিপ্লব পাল

আমেরিকা এবং ইসলাম। কেমেস্ট্রি অব রিলেশন।

গ্রাউন্ড জিরো বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি সিভিল বিতর্কে উত্তাল হচ্ছে আমেরিকা। এবার
ডিবেট আরো চমকপ্রদ। ফ্লোরিডার রেভারেন্ড টেরি জোন্স 9/11 এর প্রতিবাদ জানাতে চান কোরান পুড়িয়ে। ব্যাস গোটা বিশ্ব উত্তাল। ইন্দোনেশিয়া থেকে আফগানিস্থানে মুসলিমরা উত্তাল ক্ষোভে-হিলারী ক্লিনটন কাতর আমেরিকার টলারেন্স ইমেজে ( কি সুন্দর বললেন মাত্র ৫০ জনের চার্চের জন্যে বদনাম হবে ত্রিশ কোটি আমেরিকানের!)। আর আফগানিস্তানে আমেরিকার জেনারেল ডেভিড পেট্রাস চিন্তিত আমেরিকান সৈন্যদের নিরাপত্তা নিয়ে। আফগানিস্তানের এক মোল্লা রাজনৈতিক পার্থী জানিয়ে দিয়েছে আমেরকাতে কোরান পোড়ালে সব জায়গায় তারা আমেরিকান মারবে। কিছু যায় আসে না যদি ৫০ জন আমেরিকান কোরান পোড়ায় এবং বাকীরা তার বিরোধিতা করে! গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ বিতর্কে যিনি মুসলমানদের সমর্থন করেছিলেন, সেই নিউ ইয়ার্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ ও কোরান পোড়ানোর বিরোধিতা করছেন না। কারন আমেরিকার সংবিধানের প্রথম ও মূল বক্তব্য-ব্যাক্তিগত স্বাধীনতাতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

আমেরিকা তার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্ট এতটাই মেনে চলে, আমেরিকান সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত মানতে বাধ্য হয়েছে, কেও ব্যাক্তিগত সম্পত্তিতে আমেরিকান পতাকা পোড়ালে, রাষ্ট্রের কিছু করার নেই। কারন তা ব্যাক্তিস্বাধীনতার বিপক্ষে যাবে। বিতর্কিত পাদ্রী টেরি জোন্সও স্বীকার করেছেন কোন মুসলিম তার প্রাইভেট এলাকাতে বাইবেল পোড়ালে তার কোন বক্তব্য নেই।

টেরিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা যতই ধমকি দিক-তার যুক্তিও অখন্ডিত। সে যদি মনে করে কোরান এভিল এবং তার জন্যে সে কোরান পোড়াবে-সেই স্বাধীনতা আমেরিকান সংবিধান দিয়ে থাকে। ঠিক যে আইনে মুসলিমরা আমেরিকাতে ইসলাম পালনের স্বাধীনতা পাচ্ছে, ঠিক একই আইনে আমেরিকাতে আরেকজনের ইসলামের মুন্ডপাত করার ও স্বাধীনতা আছে।

এবার আসি মূল বিতর্কে কি ভাবে দেখবো এই কোরান পোড়ানো খেলা?

ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি পান্ডুলিপি পোড়ানো যায় না। একটা বই পোড়ানোর অর্থ আমার কাছে পরিস্কার না। কোরান পোড়ালে কি আয়াতগুলো নষ্ট হবে?

সুতরাং টেরি দেখাতে চাইছেন, ইসলামকে তিনি ঘৃণা করেন। কারন বইটা নাকি অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণায় ভর্ত্তি। সেটা যদি হয়েও থাকে আমি পরিস্কার ভাবেই বলব ঘৃণা দিয়ে ঘৃণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না। ইসলামে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা এবং হিংস্রতাকে কেও যদি সভ্যতার শত্রু বা অসভ্যতা বলে মনে করে-এবং সেটি প্রকাশ করার জন্যে নিজে অসভ্যতা এবং ঘৃণার আশ্রয় নেয়- তার উদ্দেশ্য ও পন্থা ভুল। অন্যের অসভ্যতা ধরাতে নিজেদের সভ্য হতে হয়। অন্যের ঘৃণাটা দেখাতে নিজেকে ভালোবাসা দেখাতে হয়। অনেকে বলবেন-সেটাকে মুসলমানরা অমুসলমানদের দুর্বলতা বলে মনে করে এবং ইউরোপের মতন পেয়ে বসবে। আমি কিন্ত মনে করি ইউরোপ মুসলমানদের কখনোই ভাই হিসাবে মেনে নেয় নি-তারা ঘৃণা এবং বৈষম্যেই পেয়েছে। তাই তারাও ঘৃণাই উগরে দিয়েছে জাতিদাঙ্গাতে। বর্তমানে পশ্চিম বঙ্গের দেভাঙ্গাতে গত দু দিন ধরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লেগেছে। তাতে মিলিটারি নামাতে হয়েছে পুরো এক ব্যাটেলিয়ান। বেশ কিছু হিন্দু দোকান ভাংচুর হয়েছে মুসলিম প্রধান দেভাঙ্গাতে। আশে পাশে সবাই ফিস ফাস করছে, যেখানেই মুসলমান সেখানেই দাঙ্গা।

কিন্ত সত্যিই কি তাই ? এর পেছনে বস্তুবাদি কারন খুব সিম্পল। মুসলিমদের মধ্যে জন সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ে-কারন তারা অশিক্ষার কারনে ধর্মের মাদকে জন্ম নিয়ন্ত্রন করে না। ফলে একটা লিমিটেড রিসোর্স শেয়ার করার জন্যে সর্বত্র একটা কঠিন পরিস্থিতে তাদের বাঁচতে হয়। এমন পরিবেশে তারা বড় হয় তাদের বঞ্চনার জন্যে অন্যদের দোষ বিক্রি করা সহজ। তারপরে সেই অন্যদের চোখে যখন ঘৃণা ছারা কিছু দেখে না-তখন তারা আরো বড় মৌলবাদি হয়ে ওঠে।

শুধু কিছু মিডিয়া এটেনশন টেনে অন্য ধর্মকে অপমান করে কি লাভ আছে আমি জানি না। কোরান যদি কেও এভিল বলে মনে করে, সে সেটা যুক্তি দিয়ে প্রমান করলেই সব থেকে ভাল করবে। অনেকেই তাই করছে। এবং তার বিরুদ্ধে মুসলমানরাও যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। এই দ্বন্দটাই কাম্য। কারন দ্বন্দের ফলেই উন্নতি বা অগ্রসরতা আসে।

বহুদিন ধরে ইসলাম এবং তার রাষ্ট্রীয় রক্ষকরা ধর্মের সমালোচনার এই স্বাধীনতা দেয় নি। আজ ইন্টারনেটের যুগে যখন সেন্সরশিপ অচল-সেখানে তাদের যুক্তিবুদ্ধি দিয়েই ইসলামকে ডিফেন্ড করতে হচ্ছে। এটা খুব ভাল। কারন সেক্ষেত্রে অবস্থার তাগিদেই তারা কোরানের উন্নততর ব্যাখ্যাগুলি আনতে সমর্থ হবে। ভারতে হাজার হাজার বছর আগে উপনিষদিক চিন্তা এই ভাবেই এসেছিল। বৌদ্ধদের চ্যালেঞ্জ খেয়ে, বেদকে বাঁচাতে বেদান্তের বা উপনিষদের জন্ম হয়। যা সেই বেদের উন্নততর ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়েই এসেছে।

সুতরাং ধর্মের সমালোচনা পুরো মাত্রায় চলুক। কিন্ত ধর্মের বিরুদ্ধে আমার অবস্থানটাকে যেহেতু আমি অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তোরন-অসভ্যতা থেকে সভ্যতায় যাত্রা বলে মনে করি-সেহেতু ধর্মের সমালোচনার ক্ষেত্রে আমি মোটেও অসভ্যতাকে সমর্থন করতে পারি না। সদালাপ বলে একটি মুসলিম মৌলবাদি সাইট যুক্তিবাদিদের বিরুদ্ধে যে অসভ্যতা করে-তাতে আমাদের বক্তব্য আরো জোরালো হয় যে-ধর্ম আসলেই লোকেদের অসভ্য করে। কিন্ত যুক্তিবাদিরা বা সভ্যতার দাবিদার কেও যদি, সেই অসভ্যতাই করে, তাহলে পার্থক্যটা কোথায় রইল?

quran burning day

read more

Wednesday, October 26, 2011

কমিনিউস্ট চিন্তাধারার বৃত্তীয় ভুল

by বিপ্লব পাল



(১)

ফেসবুক বা স্যোশাল নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক চর্চাকারীদের মধ্যে বাম বা ডান মনোভাবা সম্পন্ন লোকেদের একবল্গা লজিকের সাথে আমরা কমবেশী সবাই পরিচিত। পার্টিভক্ত অন্ধ, ধর্মান্ধ, তাত্বিক অন্ধ ইত্যাদি ভক্তিভাবের প্রকাশ শুধু বাঙালী না পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজেই দৃশ্যমান। ধর্মে অন্ধ হয়ে বিবর্তনকে অস্বীকার করা বা পার্টিতে অন্ধ হয়ে স্টালিন বা কমিনিউজমের নৃশংস ইতিহাসকে বুর্জোয়া মিডিয়ার ছল বলা, মূলত একই মানসিক ব্যধির দুই পিঠ।

কিছুদিন আগে ব্রেভিককে নিয়ে লিখতে গিয়ে,আমাকে অনেকের কাছেই ব্যখ্যা করতে হয়েছে কেন দক্ষিনপন্থী হিন্দুত্ববাদি বা ইসলামিস্টদের সাথে “বামপন্থী” কমিনিউস্টদের একসারিতে রেখেছি। এদের অনেকেই বামঘেঁসা বা কমিনিউস্ট প্রীতির আঁতুরঘরের গন্ধমাখা লোকজন। এদের বক্তব্য কমিনিউস্টরা যদি খারাপ কিছু করেও থাকে তা মেহনতি মানুষের জন্যেই করেছে। সেখানে ধর্ম শোষক শ্রেনীর সহায়ক ছারা অন্য কিছুত না!

সমস্যা হচ্ছে, যারা সিপিএমের এই ৩৫ বছরের দুস্বপ্নের দিনগুলি পশ্চিম বঙ্গে কাটিয়েছেন, তারা নিশ্চিতভাবেই মানবেন পার্টি এই রাজ্যে শোষক শ্রেনীর শত্রু না, বন্ধুই ছিল। অন্যথা, কিছু সম্ভব ছিল না। হয় ও নি। এটা ত সাম্প্রতিক বাস্তব।

ইতিহাসে তাকালে দেখা যাবে, ধর্ম মাত্রেই প্রতিবাদি আন্দোলন হিসাবে ইতিহাস থেকে উঠে এসেছে। স্যোশাল জাস্টিস এবং ইনজাস্টিস সব কিছুই হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মগ্রন্থগুলির উপপাদ্য। আমেরিকার রিপাবলিকান বা টি পার্টি ছারা আর কোন সামাজিক আন্দোলন বা আদর্শবাদ আমার জানা নেই যা গরীব দরদি না। বস্তত ধর্ম গ্রন্থগুলির মধ্যে ধর্মীয় সমাজতন্ত্রের বা ভাববাদি সমাজতন্ত্রের ছোঁয়া সব সময় ছিল-এবং তার পরেও তারা শাসক শ্রেনীয় সহায়ক হিসাবেই আবির্ভূত। মার্ক্স কথিত বস্তুবাদি সমাজতন্ত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি-লেনিনিজম সব থেকে কুখ্যত শাসক এবং অত্যাচারীদেরই জন্মদাত্রী। এবং একটু ভাবলে দেখা যাবে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরনের জন্যে এমনটা হওয়ারই কথা।


এই নিয়েও আগেই বিস্তারিত লিখেছি-কিভাবে একটি বাম আন্দোলন আস্তে আস্তে দক্ষিন পন্থী আন্দোলনে ইউ টার্ন নিয়ে থাকে ( যা ধর্ম, লেনিনবাদ , মাওবাদ সবার জন্যেই প্রযোজ্য )।

(২)

আমি এই প্রবন্ধ লিখছি সম্পূর্ন অন্য কারনে। বহুদিন থেকেই দেখছিলাম, কমিনিউস্টরা কমিনিউস্ট ইতিহাসের সব নির্মম দিক নিয়ে গর্ব করে। সাঁইবাড়ির খুনী থেকে স্টালিনের খুন গুলিকে এরা শ্রেণীযুদ্ধে ” প্রয়োজনীয়” মনে করে। এবং এটাই পার্টি লাইন।

সমস্যার শুরু এখান থেকেই। কারন এদের মতবাদ বা কমিনিউজমের শাস্বত মতবাদ হচ্ছে কমিনিউজমই আসল


মানবতাবাদ। মার্ক্স ব্যাপারটাকে এভাবে লিখেছিলেনঃ

“… communism, as fully developed naturalism, equals humanism, and as fully developed humanism equals naturalism; it is the genuine resolution of the conflict between man and nature and between man and man – the true resolution of the strife between existence and essence, between objectification and self-confirmation, between freedom and necessity, between the individual and the species. Communism is the riddle of history solved, and it knows itself to be this solution”..

কমিনিউজমের উৎস সন্ধানে, বা মানুষ কেন কমিনিউস্ট হতে চায়, তার মূলে ঢুকতে গেলে, এই বাক্যটির গুরুত্ব অপরিসীম।

কারন যারা কমিনিউজমের বিশ্বাস করে, তারা মনে করে কমিনিউজমই হচ্ছে একমাত্র রাজনৈতিক আদর্শবাদ যা মানুষের সাথে মানুষের, মানুষের সাথে প্রকৃতির, অস্তিত্বের সাথে প্রয়োজনীয়তার, স্বাধীনতার সাথে প্রয়োজনীয়তার, ব্যাক্তির সাথে প্রজাতির দ্বন্দের অবসান ঘটাতে সক্ষম। এবং কমিনিউজম হচ্ছে সেই প্রাকৃতিক দর্শন ( যা প্রকৃতি বিজ্ঞানকে অনুসরণ করে আসে)।

কমিনিউস্টরা ধর্মীয় বা ব্যক্তি স্বতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে যে মানবতার সংজ্ঞা তাতে “বিশ্বাস” করে না। মানুষ তাদের কাছে সমাজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। লুইস আলথুজার নামে একজন ফ্রেঞ্চ স্ট্রাকচারালিস্ট ( যিনি একজন অন্ধ স্টালিন ভক্ত ছিলেন), বুর্জোয়া দের দেওয়া মানবতার সংজ্ঞাকে ( অর্থাৎ সবার ওপর মানুষ সত্য ) মানবিক বিভ্রম বলে আখ্যায়িত করেছেন!

“humanism” means the illusion that individual human beings are autonomous, thinking subjects, whereas for structuralists (and poststructuralists), individual human beings are nothing but unconscious agents of structural forces, in much the same way as organisms are agents for the spread of a disease. Thus structuralists associate humanism with a naive and unproblematic conceptions of language and consciousness, and illusory belief in the autonomy of human beings.

অর্থাৎ হে কমিনিউস্ট বৃন্দ- বর্তমান সমাজের মানবিকতার ব্যখাতে ভুলিও না-কমিনিউজমের সেই সোনার ম্যাজিক বলই আসল মানবিকতা! সাঁইবাড়ির প্রনব সাঁই বা ষষ্টি দুলেদের কুপিয়ে কাটা সেই মহান মানবিক সমাজের প্রতিষ্ঠার জন্যেই দরকার!

(৩)

আলথুজারকে নিয়ে চিন্তা নেই-ভদ্রলোক বিজ্ঞানের দর্শন বিশেষ কিছু বুঝতেন না। যা লিখেছেন, তা বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক দার্শনিকদের চোখে বালখিল্যই হবে। এই প্রবন্ধ লেখা এই কারনে, যে মার্ক্সের ওই মারাত্মক দাবি-কমিনিউজম হচ্ছে সকল বিভেদের সমাধান, সেটা কতটা বালখিল্যতা বা হাস্যকর তা বিচার করা।

প্রথমেই বিশ্লেষণ করা দরকার বিভেদ কেন?

মার্ক্সত, ইয়ে মানে হেভিওয়েট দার্শনিক। তার একবাক্যের ওজন চোদ্দমন। সাধারন মাথাতে ঢোকাতে গেলে কিলোতে ঢোকানোই ভাল। উনার দাবীগুলিকে ১, ২, ৩…এইভাবে ভাংলে গোঁজামিল, বা যুক্তির বৃত্তীয় ভুল খুব সহজে ধরা যাবে,

উনার প্রথম দাবী-কমিনিউজম একধরনের ন্যাচারালাজিজম বা প্রাকৃতিক দর্শন। যেসব দর্শন ভাবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে যাবতীয় প্রশ্নের মিমাংসা করা যায়, তাদের বলে প্রাকৃতিক দর্শন। প্রথম দাবীটিই ভুল। কমিনিউজম বিজ্ঞানের দর্শনের প্রথম ধাপ-ফলসিফিকেশন উপপাদ্যটিই মানে না। ফলসিফিকেশনের সাদামাটা মানে আ) সব তত্ত্বই ভুল হতে পারে ক) তাই সব তত্ত্বের বাতিলযোগ্যতার পরীক্ষা দরকার। মার্ক্সীয় বিপ্লবের তত্ত্ব সর্বত্রই ভুল প্রমাণিত-তবুও কমিনিউস্টদের চোখে তা বাতিলযোগ্য না! এটি বহুচর্চিত -স্যার কার্ল পপার এবং মার্ক্সীয় অপবিজ্ঞান নিয়ে আগে অনেক লিখেছি।

এরপরে যদি ধরেও নিই, কমিনিউজম বিজ্ঞানভব (!), তারপরে রাউন্ড টুতে প্রশ্ন আসবে, মানুষে মানুষে বিভেদের কি কোন বৈজ্ঞানিক সূত্র -বা কার্য কারন সূত্র সম্ভব?

খুব সহজ ব্যপার। বাইরে চোখ রাখুন-দেখবেন দুজন পুরুষ মারামারি করে মূলত সম্পদ এবং নারীর অধিকার নিয়ে। “শ্রেণী” যুদ্ধের একমাত্র কারন না-নারী, জাতি, প্রজাতি-আরো অনেক কিছুই বিবাদের কারন হতে পারে। এই জটিল সিস্টেমকে কোন বৈজ্ঞানিক সূত্রে বাঁধা সম্ভব না।

আরেকটা উদাহরন দিচ্ছি। পাওলি দাম নামে এক বাঙালী “মেইনস্ট্রুম” অভিনেত্রী, ছত্রাক নামে এক সিনেমাতে সম্পূর্ন নগ্ন শয্যদৃশ্যে অভিনয় করে বেশ সামাজিক ঝড় তুলেছেন। রক্ষণশীল বনাম প্রগতিশীল বাঙালীরা দ্বিধাভিকক্ত।

কে ঠিক? এর বিচারে কোন বিজ্ঞান বা যুক্তিবাদ চলে না। কারন পাওলি দাম নগ্ন হয়ে ঠিক করেছেন না ভুল করেছেন, তার ফলসিফিকেশন সম্ভব না। কারন এটা ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্ন। অর্থাৎ এই বিভেদের মূলে যেতে “একক” কোন বৈজ্ঞানিক সূত্র ব্যর্থ।

আরো উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক কমিনিউজম এসেই গেল। কিন্ত তার মানে ত এই নয় রক্তমাংসের মানুষগুলো সব রোবট হয়ে গেল। তখন কমিনিউস্ট সমাজে যদি একজন সুন্দরী মেয়েকে দশজনের ভাল লাগে, তাহলে কি হবে? তাহলে দশজনের মধ্যে গন্ডোগলের সম্ভাবনা নেই? নাকি কমিনিউজমে সাম্যবাদের সূত্র মেনে দশপুরুষই নারীটিকে ভোগ করবে? বা “কমিউন” ম্যারেজ চালু হবে? মানে দশটা পুরুষ দশটা নারীকে বিয়ে করবে! তাতেও কি গন্ডোগল কমবে বলে মনে হয়?

মোদ্দা কথা এমন এক জটিল সামাজিক সিস্টেমের কোন বৈজ্ঞানিক সূত্র হয় না। সেখানে সমাজের কার্যকারন সব বুঝিয়াছি এবং তার বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিস্কার করিয়াছি এমন দাবী বেশ বালখিল্যতাই বটে।

এবার আসি রাউন্ড তিনে। মার্ক্স আরো দাবী করছেন, কমিনিউজম মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য এবং বিধেয়র মধ্যে বিভেদ মেটাবে। এটা সত্যই আরো বড় গোলা।

জীবনের উদ্দেশ্য কি এই প্রশ্নটা যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানের বাইরে। যদি ধরে নেওয়া যায়, জীবনে উদ্দেশ্য বিজ্ঞান দিয়ে ব্যখ্যা করা যায়, অর্থাৎ জেনেটিক সারভাইভালই আমাদের উদ্দেশ্য, তাহলে বিজ্ঞান কিন্ত মানব সমাজ এবং মানবতার অনেক কিছুই ব্যখ্যা করতে পারবে না। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখি যদি, দুই সন্তানের মধ্যে একজন পঙ্গু হয়ে জন্মায়, মা কিন্ত পঙ্গু সন্তানকেই বেশী যত্ন করে যদিও এটা জেনেই যে সে প্রজননে অক্ষম। আলট্রুইজম বা উপকারিতা বেঁচে থাকার উপায় বটে কিন্ত অনেক ধরনের আলট্রুইজম বা উপকারীতার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যাই সম্ভব না। এটা ঠিক যে জীবনের উদ্দেশ্যের ৯০% জীববিজ্ঞানদিয়ে ব্যখ্যা করা যায়-কিন্ত যে সন্নাসী হতে চাইছে-তার ব্যখ্যা কি? অনেক দম্পতিই আজকাল চাইল্ডলেস বাই চয়েস থাকছে-তার পেছনেই বা কি যুক্তি?

তাদের জীবনের উদ্দেশ্যকি ভুল যেহেতু তা “ন্যাচারালাজিম” না???

যে ড্রাগ, নারী আসক্ত হয়ে জীবন কাটাচ্ছে সেও কি ভুল?

এই ঠিক বা ভুলের মাপকাঠি কি করে ঠিক করবে? আর ৫০০ মিলিয়ান বছর বাদে সৌর জগত সম্পূর্ন ধ্বংস হবে-আরো সূদূরে এই মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে, আবার বিন্দুতেই শেষ হবে। সুতরাং কে কি করল, তাতে মহাবিশ্বের ইতিহাস বদলাচ্ছে না। জীবনটা সাময়িক,সময়ের খুব ক্ষুদ্র স্কেলে করা জ্যাঠামি। কে সন্নাসী হয়ে কাটাল, কে পরকিয়া করে কাটাল-কে বেশ্যাগৃহে কাটাল-তাতে মানুষ এবং মহাবিশ্বের ভবিষ্যত কিছুই বদলাবে না।

সুতরাং ঘুরেফিরে আমরা সেই বৃত্তেই ফিরে আসি-সেখানে মানুষই একমাত্র সত্য। মানুষের হাতে তৈরী ধর্ম বিজ্ঞান কমিনিউজম, ক্যাপিটালিজম কোন তত্ত্বই মানুষের থেকে বড় হতে পারে না। অন্তিম বিচারে এর সবকিছুর ওপরেই মানবতার জয় ঘোষিত হবেই। সুতরাং কোন আদর্শবাদের দোহাই দিয়ে অমানবিক কোন কাজই সমর্থনযোগ্য না-এবং তা সব থেকে বড় অশিক্ষার ও কুশিক্ষার পরিচয়।

original post
read more

Saturday, October 22, 2011

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

by সলিমুল্লাহ খান

lacan-1932.jpg
১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। লাকাঁ বলিয়াছেন–‘[গঠন] ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোল পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন না যাইতেই শব্দটি লইয়া একপ্রকার হুজুগের চল হইবে।’

এই বক্তৃতার তাৎপর্য পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া স্বল্পশিক্ষিত সাংবাদিকরা মনে করিয়াছিলেন জাক লাকাঁ বড় কঠিন লোক। তাঁহার কথা বুঝিবার সাধ্য
hyppo.jpg…….
জঁ ইপ্পোলিত (১৯০৭–১৯৬৮)
……..
সাধারণের নাই। তাঁহারা আরো বলিয়াছিলেন, লাকাঁ সাহেব যেহেতু ইংরেজি ভাষাটি সঠিক আয়ত্ত করিয়া সারেন নাই, তাই তাঁহার বক্তৃতা দশজনের পক্ষে ভালোমতে হজম করাও সম্ভব হয় নাই। আমরা সেই বক্তৃতার অনুবাদ এখানে পেশ করিতেছি। আমাদের তর্জমার ত্রুটিসহ পাঠকগণ দেখিবেন এই বক্তৃতার বিরুদ্ধে যাহা রটিয়াছে তাহা পুরাপুরি সঠিক নয়। ইহা হয়তো বোঝা যায়। নহিলে বাংলায় অনুবাদ করিবার কথাই উঠিত না।

কেহ কেহ বলিয়াছিলেন বল্টিমোর সম্মিলনে মিলনকথা যাহা উঠিয়াছিল তাহা ভাষা ও মানুষের সম্বন্ধটা কী সেই জিজ্ঞাসা লইয়া। একদল জিজ্ঞাসিয়াছিল–মানুষ ভাষা তৈয়ার করিয়াছে নাকি ভাষাই মানুষ তৈরি করিয়াছে? কেহ কেহ দাবি করিয়াছিলেন ফরাসিদেশ হইতে প্রচারিত ‘গঠনতন্ত্র’ নামক প্রচারণা প্রমাণ করিয়াছে যে ‘মানুষ’ বলিয়া সামান্য কিছু নাই। তাই ‘সহজ মানুষ’ বলিয়া বিশেষ কিছু থাকিবে কি করিয়া? বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যবসায়ী মিশেল ফুকো সাহেবের নামে এই প্রচারণা কিছুদিন গাঢ় চলিয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হইতেছে উপরোক্ত ১৯৬৬ সম্মিলনে মিশেল ফুকো হাজির হয়েন নাই। তবে তর্কের খাতিরে স্বীকার করিতে দোষ নাই ঐ বছর ছাপা তদীয় ‘ভাষা ও বস্তু’ (লে মো এ লে শোজ) বইয়ে তিনিও ঐ রকমের ইশারাই করিয়াছিলেন ।

অথচ তিন বছরের মাথায় ছাপা ‘জ্ঞানগরিমার আদিকথা’ নামক পুস্তকে ফুকো ঘোষণা করিলেন ‘গঠনতন্ত্র’ তথা ‘মনুষ্য বলিয়া কিছু নাই’ কথাটি তাঁহার নহে। এহেন দাবি অলীক ও অসার। তিনি ১৯৬৬ সালের বইয়ে বলিয়াছিলেন ‘মানুষ’ অর্বাচীন এবং তাহার অন্তর্ধান অত্যাসন্ন। অথচ তিনি ১৯৬৯ সনের কেতাবে তিনিই ঘোষণা করিলেন–আমি কিন্তু কোথাও ‘গঠন’ কথাটি ব্যবহার করি নাই। (ফুকো ১৯৭২: ২০০-২০১) সুতরাং ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’ [the structuralist controversy] কথাটি অলীক বুলি মাত্র। তবে শেষমেশ এই ফুকো কবুল করিলেন তিনি নিজেও মনুষ্য সাধকের সাধনার মূল্য খানিক কমাইয়া দেখিয়াছিলেন আর কিছু বাড়াইয়া দেখিয়াছিলেন এই গঠনে সেই গঠনে পাওয়া যুগপৎ মিলের মূল্য ।

কী ঘটিয়াছিল এই সময়? বিশেষ করিয়া বলিতে নৃবিজ্ঞানসাধক হজরত ক্লদ লেভি-স্ত্রোস [Claude Lévi-Strauss] যখন দেখাইয়াছিলেন ফ্রয়েডের
Claude Levi Strauss………
ক্লদ লেভি-স্ত্রোস (জন্ম. ১৯০৮)
……….
আবিষ্কৃত অজ্ঞানের গঠন আর মনুষ্যজাতির মধ্যকার পরিবার ও আত্মীয়তা-সম্পর্কের গঠন একই প্রকার গঠনেরই রকমফের মাত্র, প্রকৃত প্রস্তাবে গঠনতন্ত্র প্রস্তাব পেশ করা হইয়াছিল তখনই । ইহাতে জাক লাকাঁ আরও আহুতি দিলেন–বলিলেন অজ্ঞানের গঠন পরিষ্কার ভাষার মতন । গঠনতন্ত্র সত্য সত্যই গড়িয়া উঠিল।

ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাইলেন যাঁহারা তাঁহারা আগের শতকের দর্শনতত্ত্বজ্ঞানী নিৎসের [Friedrich Nietzsche] দোহাই পাড়িলেন। ফুকো একা নহেন, কিছু পরিমাণে জাক দেরিদা আর বহুল পরিমাণে জিল দল্যুজ [Gilles Deleuze] তাঁহার সঙ্গী হইলেন । ইঁহাদের মধ্যে কিছু প্রভেদ
Deleuze ……..
জিল দল্যুজ (১৯২৫—১৯৯৫)
………
থাকিলেও মূল প্রশ্নে সকলেই একমত হইলেন। তাঁহারা ধরিয়া লইলেন ‘গঠনতন্ত্র’ মানে সহজ মানুষের অন্তর্ধান। তাই ফুকো ও দল্যুজ নিৎসের আশ্রয় লইলেন আর দেরিদা উটপাখির মত ভাষার বালিতে আমুণ্ডুপদনখর ডুবিলেন।

‘গঠনতন্ত্র’ কথাটি শুরু হইতেই এই ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়াইয়া আছে। অনেকেই মনে করিয়াছিলেন ‘গঠন’ (structure) থাকিলে ‘সহজ মানুষ’ (subject) থাকিতে পারে না। অথচ জাক লাকাঁ একেবারে বিসমিল্লাহ হইতেই বলিয়া আসিতেছিলেন এই ধারণাটি আদপেই সঠিক নহে। পক্ষান্তরে তিনি দাবি করিলেন, গঠন ও সহজ মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। গঠনের পরই শুদ্ধ সহজ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, পূর্বে বা বিহনে নহে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ‘সহজ মানুষ’ (subject) কী বস্তু? জাক লাঁকা বলিলেন–‘সহজ মানুষ’ কথাটার অর্থই হইতেছে ‘যাহা সহজ নহে’। কোন জিনিস ভাষার মধ্যে ধরিয়া রাখা সহজ নহে বলিয়া আমরা কি বলিতে পারি জিনিসটুকু নাই? সেই সময় শার্ল মোরাজে (Charles Morazé) নামক জনৈক ইতিহাস বিশারদ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন ‘ঋণাত্মক একের বর্গমূল’ (the root of minus one) কথাটির অর্থ কী? গণিতশাস্ত্রে এই চিহ্নটিকে
Moraze………
শার্ল মোরাজে (১৯১৩–২০০৩)
……….
‘অযৌক্তিক’ [irrational] সংখ্যা বলা হইয়া থাকে। অথচ ইহা তো খোদ গণিতেই কাজ করে। জাক লাকাঁ ইহার বরাত দিয়া বলিলেন প্রাণীস্বরূপ মানুষ বা ‘জীব’ ও ‘সহজ’ মানুষের মধ্যকার পার্থক্যও অনুরূপ বটে। ‘সহজ মানুষ’ কথাটা যদি অযৌক্তিক মনে হয় তবে তাহা ভাষারই দোষ। কিন্তু তাই বলিয়া ইহা কাজ করে না বা ইহা নাই বলা যাইবে না।

জাক দেরিদা এক জায়গায় জাক লাকাঁর কাছে জানিতে চাহিলেন ইহাকে ‘সহজ মানুষ’ বা ‘অজ্ঞান’ বলিবার কারণ কী? ইহার উত্তরে লাকাঁ সভাস্থলে উপস্থিত বিদ্বানমণ্ডলীর কাছে একটি গল্প বলিয়াছিলেন।

একদিন হোটেলে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। জাক লাকাঁর ঘরে একটি টেবিল এক জায়গা হইতে আরেক জায়গায় সরাইবার দরকার হইল। তিনি যাহাকে বলে বেলম্যান বা পিয়ন তাহাকে টেবিলটি সরাইতে বলিলেন। পিয়ন সাহেব
d_jaques_derrida.jpg…….
জাক দেরিদা (১৯৩০–২০০৪)
………
তাহাতে ক্ষেপিয়া গেলেন। বলিলেন, ‘মহাশয়, ইহা আমার কর্তব্য নহে। আপনি দরকার মনে করিলে কথাটা বলিবেন গৃহ-পরিচারক বা হাউস-কিপারকে। গৃহ-পরিচারকগণ আসিয়া কাজটা করিয়া গেলেন বটে, কিন্তু তাহারা মহাত্মা লাকাঁর কোন কথাই শুনিলেন না। তাঁহারা শুদ্ধ স্ব স্ব উপরিওয়ালার আদেশ অনুসারে কাজ সারিয়া চলিয়া গেলেন। ইহা হইতেই–লাকাঁ বলিলেন–তিনি ঠাহর করিলেন কাজ যাহা হইয়াছে তাহা (সহজ মানুষস্বরূপ) তাহার ইচ্ছায় হইয়াছে মনে করিলে তিনি ভুল করিবেন। কাজ হইয়াছে হোটেলের নিয়ম অনুসারে, খরিদ্দারস্বরূপ জাক লাকাঁর ইচ্ছায় নহে। মাঝখানকার খরিদ্দারবেশী জাক লাকাঁ নামক অস্থিরতাটুকুরই অপর নাম ‘সহজ মানুষ’। টেবিলটা বড় বেঢপ জায়গায় ছিল। এখন বেশ ঢপ জায়গায় চলিয়া আসিয়াছে। মাঝখানে সৃষ্ট শূন্যতাই এক্ষণে প্রমাণ করিতেছে ঐখানে কি একটা যেন ছিল। অধৈর্যপরায়ণতার বাহক এই স্থানটির নামই ‘সহজ মানুষ’। (রাবাতে ২০০২: ৪০ )

জাক লাকাঁর এই বক্তৃতার নাম দেখিয়াও অনেকেই ইহা পড়িতে চাহিবেন না মনে হয়। সে কি নাম রে বাবা! ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’ [‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’]। মহাত্মা লাকাঁ সেইদিনের বক্তৃতায়ই জানাইয়াছিলেন সমস্যাটি লইয়া তাহার কাজের বয়স ততদিনে ১৫ বৎসর হইবে। কাজেই তাঁহার সমস্ত কথা একদিনে বলা সম্ভব হইবে না।

সেদিনের বক্তৃতার আরও একটি কথা মনে রাখিবার মত যুৎসই হইয়াছিল। বক্তৃতার শেষভাগে এক জায়গায় তিনি বলিলেন: ‘অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।’ কিছু একটা আছে বোঝা যাইতেছে কিন্তু সঠিক কী যে আছে বুঝিতেছি না । তাহা বুঝিতে হইলে খানিক কল্পনার শরণ লইতে হইবে।

মনে রাখিতে হইবে সেই ১৯৫৩ সন হইতেই লাকাঁ বলিয়া আসিতেছিলেন ‘অজ্ঞানের গঠন ভাষার মতন’। ১৯৬৬ সনে–এই বক্তৃতাতেই–তিনি জাহির করিলেন ঐ কথাটি কিছু পরিমাণ বাহুল্যদুষ্ট ছিল। এক্ষণে তাঁহার সহজ মত দাঁড়াইল: ‘অজ্ঞানের গঠন আছে বলিলেই চলিত কারণ গঠন মানেই তো ভাষা’।

লাকাঁর কথা যৎসামান্য উদ্ধার করিতেছি:
সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই।

মনে রাখিবার মতন মচমচে কথা এই বক্তৃতায় আরো এক প্রস্ত পাওয়া যাইতেছে। ‘চিহ্ন’ (sign) ও ‘পদ’ (signifier)-এর মধ্যে ভেদ আছে–এই প্রস্তাব প্রচারের লক্ষ্যে লাকাঁ জানাইলেন চিহ্ন মানে যাহা দিয়া সজ্ঞান এক প্রাণীর খবর অন্য প্রাণীকে দেওয়া চলে। কিন্তু ‘যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে’।

আরো এক জবর খবর–এইস্থলে তিনি বলিয়াছিলেন–আছে। ভাষার বা পদের জগতে যাহা আছে তাহাকে ‘বাসনা’ (desire) বলা হয়। বাসনার এক মানে যাহা বাস করে না–যাহা অস্থির, যাহা অধৈর্য। কিন্তু বাসনার তলে তলে আরো এক জিনিস বাস করে। তাহার নাম মজা (jouissance)। বাসা আর মজা
lucien-goldmann.jpg……..
লুসিয়ঁ গোল্ডমান (১৯১৩–১৯৭০)
……..
মারা ঠিক এক জিনিস নহে। ভাষা মানে বাসনার বিধি–আইন ও ঈশ্বর যে অর্থেই ইচ্ছা–ধরিয়া লইতে পারেন। ভাষাই বিধি। ভাষাই নিষেধ। নিষেধ বা সীমা আছে বলিয়াই প্রাণী (এখানে মানুষ) সেই নিষেধের বেড়া ভাঙ্গিয়া–বা আইল ডেঙ্গাইয়া–ঘাস খাইতে চায়। নিষেধ বা আইল না থাকিলে তো আইলডেঙ্গার দরকারই হইত না–মজাও হইত না। কাজেই বল্টিমোর শহরের বিজ্ঞাপনচিত্রে লেখা ‘এনজয় কোকা-কোলা’ বা ‘কোকা-কোলার মজা মার’ দেখিয়া লাকাঁ বলিলেন সকলেই সকলকে বলিতেছে ‘মজা মার’।

এই মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে একসময় ব্যথা করিতে শুরু করে। অথচ এই ব্যথার সীমায় পৌঁছাইতে না পারিলে মজা যে সে মারিতেছে তাহার প্রমাণই হয় না। লোকে বলে মজাই জীবন, মজা না মারিলে এ জীবন লইয়া সে কী করিত? মজা জীবনের চাহিতেও বড়। জীবন তুচ্ছ। যে কেহই ত্যাগ করিতে পারেন। সকলেই যাহা সহজে পারেন না ভারতীয় শাস্ত্রে তাহারই অপর নাম ‘ভক্তি’।

পাঠিকা, খেয়াল করিয়াছেন ‘ভক্তি’ কথাটার তাৎপর্য? ‘ভক্তি’ কথাটার আগে
jean-pierre-vernant.jpg
জঁ-পল ভেরনা
………
‘বি’ উপসর্গ লাগাইলে কী হয়? ‘বিভক্তি’। বিভক্তি আসিয়াছেন ‘বিভাগ’ করিবার ক্রিয়া হইতে। তাহা নহে তো কী? তাহা হইলে ‘ভক্তি’ আসিয়াছেন ‘ভাগ হইতে’। প্রাণীমানুষ বা ‘জীব’ ভাগ হইলেই ‘সহজ মানুষ’ তৈয়ার হয়েন। এই ভাগকর্মটি করেন যে হাজাম বা নাপিত তাহারই অপর নাম ভাষা। ভাষাই ভাগ করেন। কাজেই ভাগ হইতে যাহার উৎপত্তি তিনিই বিভক্ত বা নিছক ‘ভক্ত’, তাহার পরায়ণতার নামই ভক্তি। খোদ ভক্তি ও মজার মধ্যে তাহা হইলে একটা না একটা যোগ আছে।

মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে ভাগ বা ভক্তি আর থাকিবেন না। তখন মজার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবেক। ভাষা ও মজার, পরকীয়া ও আপনকার এই যুগলবন্দিকেই আমরা এতদিনে ‘গঠন’ বলিয়া চিনিতে পারিলাম। আর জাক লাকাঁর কর্জ নগদ নগদ স্বীকার করিলাম। লাকাঁ কথিত সমাচার এইখানেই মূর্তি পাইল: আপনকার হৃদয় বা অন্তরের সহিত বাহির বা পরকে মিশাইলেই শুদ্ধ সেই ‘সহজ মানুষ’ দেখা দিবেন–অন্য হেতু অন্য কোথা, অন্য কোনখানে দিবেন না। কারণ তাহা যে দিবার নহে।

দোহাই

১. Michel Foucault, The Archeology of Knowledge [L’archéologie de savoir, Paris: Gallimard, 1969], trans. A. M. Sheridan Smith (New York: Pantheon, 1972); ইংরেজি এই সংস্করণে ১৯৭০ সালে কলেজ দো ফ্রঁসে ফুকোপ্রদত্ত বক্তৃতা L’ordre du discourse (Paris : Gallimard, 1971) এর অনুবাদ ‘The Discourse on Language’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।

২. Michel Foucault, The Order of Things [Les mots et les choses: une archéologie des sciences humaines, Paris: Gallimard, 1966], A. Sheridan, tr. (New York: Random House, 1970).

৩. Jacques Lacan, ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in Richard Macksey and Eugerio Donato, eds., 1970, infra, pp.186-200.

৪. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Structuralist Controversy: The Languages of Criticism and the Sciences of Man (Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1972).

৫. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy, (Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1970).

৬. Jean-Michel Rabaté, The Future of Theory (Oxford: Blackwell, 2002).

●●●

অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা

জাক লাকাঁ

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

আমার ইংরেজি উচ্চারণ একদম বাজে। উচ্চারণদোষে আমার বক্তৃতা একদল ইংরেজিভাষী শ্রোতার কানে নিশ্চয়ই বড় মধুর শোনাইবে না। আর বক্তৃতাটা যদি আমি ইংরেজি জবানেই করি তো যাহাকে বলা যাইতে পারে আমার বার্তা তাহা যথাস্থানে না পৌঁছাইবার ঝুঁকিও থাকিয়াই যাইতেছে–আজ বিকালবেলা এই কয়টি কথা আমাকে বুঝাইবার আশায় এক ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ব্যয় করিয়াছেন। সত্য বলিতে বিষয়টি আমার বিবেকের ঘাড়েও ভারি বোঝা হইয়া রহিয়াছে। যদি অন্যথা করি তো তাহা হইবে আমি যে বস্তুকে আমার বার্তা মনে করিয়া থাকি তাহার শতে একশত ভাগ বিপরীত কর্ম। বার্তা বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহা আপনাদের সমক্ষে খুলিয়াই বলিতেছি–বার্তা মানে আমার নিকট আর কিছু নয়, মাত্র ভাষার বার্তা। আজকাল যেখানেই যাই দেখি সকলেই বার্তা বার্তা করিতেছে–জীবদেহের অন্তরের হরমোনে বার্তা, বিমানপোতকে পথ দেখাইবার কিংবা উপগ্রহাদি হইতে সংকেত ধরিবার আলোকরশ্মিও বার্তা। এই ক্রমে আরো আরো আছে। ভাষার বার্তা কিন্তু সেই জিনিস নয়। ইহা ষোল আনাই ভিন্ন বস্তু। বার্তা–মানে আমরা যে বস্তুকে বার্তা নামে ডাকিতেছি তাহা–বিনা ব্যতিক্রমেই পরমের পাঠানো বার্তা। পরম বলিতে আমি বুঝাইতেছি ‘পরমের ঠিকানা বা অধিষ্ঠান’। আমরা সচরাচর যাহাকে ‘পর’ কিম্বা বা ‘অপর’ (other) বলিয়া থাকি, যাহা লিখিতে ছোট ছাদের ‘o’ অক্ষর ব্যবহার করা হয়, এই পরম অবশ্যই সেই পরম নয়, আর সেই কারণেই এক্ষণে ‘পরম’ (Other) বলিয়া যাহাকে ডাকিতেছি তাহা লিখিবার সময় প্রথম হরফ নাগাদ বড় ছাদের ‘O’ ব্যবহার করিয়াছি। এতদ্দেশে, এই বল্টিমোর শহরে, পরম মনে হইতেছে ইংরেজি জবানেই বাতচিত করিয়া থাকেন। আর ইহাই তো স্বভাবসম্মত। তাই আমি যদি এই বক্তৃতাটি ফরাসিযোগেই করিতাম তো তাহা হইত অন্যায় কাজ। অবশ্য উপরে যে ভদ্রলোকের দোহাই দিলাম তাহার কথাটিও ফেলিয়া দিবার মতো নহে। তিনি বলিয়াছিলেন ইংরেজি বোলটা আমার মুখে ঠিক সহজে আইসে না। অধিক কী, তাহা খানিক ভূতের মুখে রামনাম রামনাম শোনায়। আরো কথা আছে। আমি জানি অত্র সভায় এমনও অনেকে আছেন যাহারা শুদ্ধ ফরাসি ভাষাতেই বাতচিত করিতে পারেন, ইংরেজি এক লব্জও বুঝিতে পারেন না। আমি যদি ইংরেজিযোগে বলিতাম ইঁহাদিগের পক্ষে নিরাপদ হইত। তবে আমার হয়তো বাঞ্ছাই নাই যে ইঁহারা অতটি নিরাপদ থাকিবেন। অতএব ইহাদিগের মুখ চাহিয়া আমি একআধটু ফরাসিও কহিব।

jacques-lacan-1.jpg
জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১)

পহিলা দফায় আমি ‘গঠন’ বলিতে কী বুঝায় সেই সম্বন্ধে কিছু আগাম কথা বলিতেছি। ইহাই তো আমাদের অদ্যকার সভার বিষয়বস্তু। ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোলও পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন যাইতে না যাইতেই শব্দটি লইয়া এক প্রকার হুজুগেরও চল হইবে। আমার বেলা এই কথাটি কিন্তু খাটিবে না কেননা আমি শব্দটি এস্তেমাল করিয়া আসিতেছি অনেক দিন হইতেই–পড়াইবার ব্যবসায় আরম্ভ করিবার পর হইতেই। এই বিষয়ে আমার যাহা বলিবার তাহা জানেন অল্প লোক মাত্র। আরো বেশি লোকে জানিতেন যদি না আমি আমার বক্তৃতা সীমিত রাখিতাম মাত্র একদল বিশেষজ্ঞ শ্রোতা–মানে মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের–সমক্ষে। বিষয়টি বড়ই কঠিন। বেয়াড়া রকমের কঠিন মনে হইতেছে। কারণ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা সত্য সত্যই আমি কিসের কথা বলিতেছিলাম তাহা কিছু কিছু জানেন আর মনোবিশ্লেষণবৃত্তিটি যিনিই গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই জানেন এই জিনিসটির সহিত আঁটিয়া উঠা বিশেষ কঠিন কাজ বটে। ‘সহজ মানুষ’ (subject) বলিতে সত্যই যাহা বুঝায় তাহা লইয়া যাহাদের কারবার সেই মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের কাছে ‘সহজ মানুষ’ জিনিসটা তেমন সহজ জিনিস নয়। আমি চাই না আমি যাহা বলিতেছি তাহা লইয়া কোন ভুল বোঝাবুঝি হউক, কোন ‘মেকোনাসঁস’ (méconaissance) হউক। ‘মেকোনাসঁস’ কথাটি ফরাসি। ইংরেজি ভাষায় ইহার সমান অর্থবহ আর কোন শব্দ নাই বলিয়াই আমি ফরাসি শব্দটিই ব্যবহার করিতে বাধ্য হইলাম। মেকোনাসঁসের অর্থই এমন যে ইহার শরণ লইতে না লইতেই ‘সহজ মানুষ’ আসিয়া যায়। অধিক, আমাকে ইহাও জানানো হইয়াছে যে এক মণ্ডলি ইংরেজিভাষী শ্রোতাসমক্ষে ‘সহজ মানুষ’ লইয়া কথা বলাটাও তেমন সহজ কাজ হইবে না। ‘মেকোনাসঁস’ বলিতে বুঝায় ‘ভুল বোঝা’, কিন্তু ইহাতে আমার (বা আপনার) সহজ ভাবকে ভুল বোঝা বা না বোঝা বোঝায় না। সমস্যাটা–প্রকৃত প্রস্তাবে–গঠন (structure) বলিতে আদপেই কী বোঝায় তাহার সঙ্গে জড়িত।

আমি মনোবিশ্লেষণশাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিবার পর এক সময় আমার কয়েকজন শ্রোতা আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছিলেন। ইহার কারণ ততদিনে অনেক দিন হইয়াছে আমি একটি সরল সত্যের পরিচয় লাভ করিয়াছি। সেই সত্য অনুসারে আমরা যদি ফ্রয়েডের যে কোন বই–বিশেষ অজ্ঞান সম্বন্ধে লেখা যে কোন বই–খুলিয়া দেখি তো শতে একশত ভাগ নিশ্চিত থাকিতে পারি যে একটা না একটা পাতা পাওয়া যাইবে যেখানে কোন না কোন শব্দ দেখিব–বই হইলেই স্বাভাবিকভাবে তাহা অজস্র শব্দে, ছাপানো শব্দে ঠাসা হইবে–যাহা নিছক শব্দ নয়। এমন শব্দ দেখিব যাহা শব্দরূপী বস্তু বৈ নয়। এই নিশ্চয়তা অবশ্য নিশ্চয়তাই, শুদ্ধ সম্ভাবনা নয়। আমরা এই সমস্ত শব্দেরই মধ্যবর্তিতায় অজ্ঞান কী করিয়া সামলাইতে হয় তাহার পথ ধরিবার চেষ্টা করি। শব্দের অর্থ কী তাহা লইয়া এই স্থলে কথা হইতেছে না, কথা হইতেছে শব্দের হাড়মাস, শব্দের স্বভাব-শরীর লইয়া। ফ্রয়েডের চিন্তাভাবনার বড়–য়া ভাগের কারবারই এই লইয়া, স্বপ্নের মধ্যে শব্দচমক (punning), কিংবা মুখ-ফস্কা কথা (lapsus), কিংবা ফরাসি ভাষায় যাহাকে বলে কালঁবু (calembour) বা চমৎকথা, কিম্বা ওমোনিমি (homonymie) বা নামসমতা তাহা লইয়া, কিংবা অধিক বলিতে কোন কোন শব্দ ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা যে এক এক আলাহিদা অর্থ ধারণ করে তাহা লইয়া। শুদ্ধ শব্দই অজ্ঞানের মালমসলা–এই প্রস্তাব শতে একশত ভাগ প্রমাণসিদ্ধ হয় নাই। তবুও ইহা ভালমত টুকিয়া রাখিবার জিনিস। কারণ প্রমাণসিদ্ধ না হইলেও ইহার হইবার সম্ভাবনা বিলক্ষণ আছে (তদুপরি, যাহাই হউক, আমি কদাচ বলি নাই অজ্ঞান বলিতে মাত্র শব্দের মহফিল মাত্র বোঝায়। আমি শুদ্ধ বলিয়াছি অজ্ঞান বস্তুটা যে ‘গঠিত’ সেই সত্যে সন্দেহ নাই)। ইহার তুলনীয় কোন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আছে বলিয়া আমার জানা নাই। কিন্তু থাকার দরকার আছে। কারণ আমরা কথা বলিতেছি ‘গঠন’ সম্বন্ধে আর অজ্ঞানের গঠন ভাষা আকারে। ইহাতে কী বুঝাইতেছে?

সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই। অধিক ইহাই সবটি নয়। ভাষা মানে কোন ভাষা? আমি নই আমার ছাত্ররা অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া এই সমস্যার ভিন্ন আরেকটি অর্থ খাড়া করাইবার কোশেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা চাহিয়াছিলেন সারাৎসার ভাষার মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে। তাহারা জানিতে চাহিয়াছিলেন কোন জিনিসকে ভাষা পদবাচ্য হইতে হইলে কমসে কম কোন কোন শর্ত পুরাইতে হইবে? হইতে পারে শুদ্ধ চারিটি পদাংক (signantes), চারিটি অর্থধারিণী অংকুর (elements) হইলে পর্যাপ্ত হয়। পরীক্ষাটি বেশ মজাদার। তবে ইহার গোড়ায় গলদ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ইহা দেওয়াল পটে লিখিয়া দেখাইব আশা রাখি। পারী শহরে আমার বক্তৃতাসভায় কয়েকজন তত্ত্বজ্ঞানীও আসিতেন। যাঁহারা আসিতেন তাঁহারা সংখ্যায় অনেক নহেন, তবে বেশ কয়েকজনই আসিতেন। ইহাঁদের কেহ কেহ পরে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন যে সমস্যাটা ভাষার ‘ভিতরে আরেক ভাষার’ কিংবা ভাষার ‘বাহিরে অন্য ভাষার’ নয়। যথা পুরাকথা কিংবা কমাকথার সমস্যাও নয়, সমস্যা খোদ ভাষারই। সমস্যার ঠিকানা প্রস্থান করাইতে ইঁহারা যে কষ্টস্বীকার করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই অসামান্য কাজ। যেমন পুরাকথা লইয়া আলোচনার দরকার হইতেছে না কেননা পুরাকথাও যে ভাষার আকারে গঠিত তাহা একদম পরিষ্কার। আর আমি যখন ‘ভাষা আকারে’ কথাটা খাটাইলাম তখন আমি গণিতের ভাষা, কি সংকেতের ভাষা, চলচ্চিত্রভাষা ইত্যাদি অর্থে বিশেষ বিশেষ ভাষা বুঝাইতে খাটাই নাই। ভাষা ভাষাই আর ভাষা মাত্রেই এক জাতের: যথা ইংরেজি বা ফরাসি প্রভৃতি মূর্তিমান ভাষা। এইসব ভাষায় মনুষ্য কথা বলে। এই পর্যন্ত পৌঁছিয়া একটি কথা বলিতে হইবে: ‘ভাষাপারের ভাষা’ (metalanguage) বলিয়া কোন ভাষা নাই। কারণ ভাষাপারের ভাষা নামে অভিহিত সমস্ত ভাষার কথাই বলিতে হয় ভাষারই মধ্যবর্তিতায়। পটের গায়ে খালি খালি অক্ষর লিখিয়া কেহ গণিত শিখাইতে পারে না। দশজনে বুঝিতে পারিবে এমন কোন না কোন সামান্য ভাষায় কথা কহিবার দরকার করে, সদাসর্বদাই করে।

অজ্ঞান ভাষার আকারে গঠিত। ইহা নিছক এই কারণে নয় যে অজ্ঞানের মালমসলা তৈয়ার হইয়াছে আমরা ফরাসি জবানে যাহাকে বলি লঁগাজিয়ে (langagier) তাহা অর্থাৎ ভাষার মশলা দিয়া। অজ্ঞান আমাদের সমক্ষে যে সমস্যা তুলিতেছে তাহাই ভাষার স্বভাব সম্বন্ধে সবার চাইতে বেশি অভিমানিনী সমস্যার প্রান্ত ছুঁইয়া যায়: এই সমস্যারই নাম ‘সহজ মানুষ’। কোন বাক্যের বক্তা কিম্বা ব্যক্তিপরিচয়দাতা প্রতিনাম (personal pronoun) আর ‘সহজ মানুষ’ এক জিনিস, অমনি অমনি এই কথা বলা চলিবে না। ফরাসি জবানে ‘বক্তব্য’ (ennoncé) বলিতে হুবহু বাক্যই বুঝায়, তবে এমন বক্তব্যও ঢের রহিয়াছে যেখানে বক্তব্যটি ঠিক কে বকিতেছে তাহার কোন হদিশ নাই। যদি বলি ‘ইট রেইনস’ (বৃষ্টি হইতেছে) [it rains] তো যে সহজ মানুষ কথাটি বকিলেন তিনি এই বাক্যে শরিক হইলেন না। যাহাই হউক, এইখানে কোথাও না কোথাও একটা গোল বাঁধিয়াছে। ‘সহজ মানুষ’ আর ভাষাব্যবসায়ীরা যাহাকে বলেন ‘আড়কাঠি’ (shifter) এই দুইকে সব সময় এক ভাবা ঠিক হইবে না।

অজ্ঞানের স্বভাব হইতে যে সমস্যা দেখা দেয় তাহা–সংক্ষেপ করিয়া বলিলে–এই দাঁড়াইতেছে: কিছু না কিছু কখনো না কখনো ভাবিতেছে। ফ্রয়েড আমাদিগের উদ্দেশে কহিয়াছিলেন অজ্ঞান সম্বন্ধে সকল কথার বড় কথা এই: অজ্ঞান ভাবনাই বটে। অধিক জ্ঞানের এলাকায় যাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে সেই ভাবনাই। এই নিষেধ একেক জায়গায় একেক রকম চেহারায় করা হইয়া থাকে, অর্থের কথা উঠাইলে বলিতে হইবে ইহার অর্থও নানান কিসিমের হইতে পারে। প্রধান অর্থটি সত্য সত্যই ‘বাধা’ বটে। এই বাধা হয় ডিঙ্গাইয়া যাইতে হইবে নচেৎ ফুঁড়িয়া পার হইতে হইবে। না হইলে হইবে না। কথাটির ভার আছে, কেননা আমি যদি এই বাধার কথা জোর দিয়া না বলি তো আমাদের জীবন একান্তই মসৃণ মনে হইয়া যাইত। আমরা ফরাসি ভাষায় ‘সা ভুজারঁজ’ (ça vous arrange–[বা আপনার ব্যবস্থা হইয়াছে]–জাতীয় কথা বলিয়া থাকি, কেননা নিচের তলায় বা মাটির নিচে কিছু না কিছু যদি ভাবিয়াই থাকে তো জীবনটা সহজ হইয়া যায়। ভাবনা জিনিসটা সদাসর্বদাই হাজির রহিয়াছে আর প্রাণধারী জীব স্বভাবের চাপে যাহা ভাবিতেছে তাহার সম্বন্ধে একটু হুঁশ হইল, জীবন চলিয়া যাইবে এক রকম। ঘটনা যদি তাহাই হইত তো ভাবনার ভারটা পড়িত প্রাণের উপরই, আর তাহাই হইত স্বাভাবিক, যেমন সাড়াই (instinct) হইত ভাবনা। ভাবনা যদি স্বভাবের ফসল হইত তো অজ্ঞান লইয়া কোনই গোল বাঁধিত না। দুঃখের মধ্যে, অজ্ঞানের সহিত ‘সাড়া’ কিম্বা ‘আদিজ্ঞান’ কিংবা মাটির নিচে বাধা ভাবনার কোনই সম্বন্ধ নাই। ইহা শব্দযোগে ভাবনা অথবা আমাদের জাগরিছুট বা চেতনরাজ্যহারা ভাবনা সম্বন্ধীয় ভাবনা বটে। জাগরি কথাটির ভার আছে। আমাদের চেতন অবস্থা লইয়া কোন দানব যদি খেলা করিত তবে তাহার সহিত এই অজ্ঞানের তুলনা চলিত। এই অপর মানুষটি সঠিক কে তাহা খুঁজিয়া লওয়াই এক্ষণে মূল সমস্যা। আর এই মানুষ অপর কেহ নহেন, ভাষা হইতে ভাবনা শুরু করিলে আমরা যে সহজ মানুষে আসিয়া পৌঁছিতাম এই মানুষ হুবহু সেই মানুষই।

আপনাদের সমক্ষে বক্তৃতা দিবার উদ্দেশ্য লইয়া এই যৎসামান্য কথা যখন সাজাইতেছিলাম তখন বেশ ভালোমতন ভোর হইয়াছে। জানালার ফাঁক গলাইয়া বল্টিমোর দেখিতেছি। প্রহরটি বড়ই মজার। তখনও ঠিক রোদ উঠিয়া সারে নাই। কিন্তু সময় যে বহিয়া যাইতেছে তাহা একটা নিয়নবাতির বিজ্ঞাপন এক ঠাঁই জ্বলিয়া আর ঠাঁই নিবিয়া আমাকে মিনিটে মিনিটে খবর দিতেছিল। রোজ যে রকম হয় তখনও রাস্তায় রাস্তায় সেই রকমই গাড়িঘোড়ার ভিড় ভারি হইয়াছে। দূরে গাছগাছালি কিছু কিছু চোখে পড়িতেছে। মনে মনে বলিয়া উঠিলাম এই কয়টি গাছের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে আমি যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছি সব কিছুই আমার ভাবনা যাহা ভাবিতেছে তাহার ফসল। এইখানে লোকজন ঠিক কী কাজে ব্যস্ত তাহা শতে একশত ভাগ পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে না। তাহা যাহাই হউক, সহজ মানুষের পরিচয় দিবে বলিয়া লোকে যে দাজায়িন (Dasein) বা তথাবস্তু বলিয়া একটা কথা তুলিয়া থাকে তাহাই হাজির হইয়াছিল এই ক্ষণিকের অতিথি বা পলায়নপর সাক্ষীর মধ্যে। অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।

‘সহজ মানুষ’ কোনখানে থাকেন? যে ‘অ-বশ’ বস্তু হারাইয়া গিয়াছে তাহার রূপেই সহজ মানুষকে পাওয়া যায়, এই সত্য আমল করিতেই হইবে। আরও খুটাইয়া বলিলে বলিতে হইবে ‘সহজ মানুষ’ দাঁড়াইয়া থাকেন এই হারানো অবশ বস্তুর ঘাড়ে ভর দিয়া। অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখিবেন ইহা এমন বিদকুটে বস্তু যাহার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবি নাই। কোন কোন জায়গায় দেখা যায় ইহা ‘করা হইয়াছে এমন কোন ক্রিয়া’ মাত্র–দুনিয়ার তাবৎ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী এবং অনেক অনেক বিশ্লেষিত মানুষও ইহা আচ্ছামত ভাল করিয়াই জানেন। এই কারণেই অনেক মনোবিশ্লেষণবৃত্তিজীবী মনে করেন আমাদের পক্ষে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় হইবে। নিউ ইয়র্ক মনোবিশ্লেষণ সমিতির সভাপতি আমাদিগকে বলিয়াছেন ইহাই কর্তব্য। কিন্তু আমি তো বস্তু বদলাইয়া ফেলিতে পারি না। আমি মনোবিশ্লেষণবৃত্তি করি। তবে কেহ যদি কোন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সমীপে হাজির হইতে চাহেন তাহা তাহার নিজ পছন্দের বিষয়। মনোবিজ্ঞানের কথাই যখন উঠিল তখন বলিতেছি, গঠনের সমস্যা কথাটা একলা আমিই ব্যবহার করিতেছি না। অনেক অনেক দিন গুজরান হইয়াছে চিন্তা ও গবেষণা, মায় আবিষ্কার-উদ্ভাবনা যাহাদের বৃত্তি আর যাহারা মন কী জিনিস এই প্রশ্ন লইয়া ব্যাপৃত তাহারাও বছরের পর বছর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন যে গঠন জিনিসটার সবার চাহিতে ভারি এবং স্বভাবজাত গুণ হইতেছে ‘একভাব’ (unity)। ইহার কোন প্রমাণের ডাক পড়ে না। জীবের অখিলে (real) এই গুণ এমনিতে হাজির ধরিয়া দেখিলে স্বতন্ত্র প্রমাণ দিবার দরকারই পড়ে না। জীব যখন ষোলকলায় পূর্র্ণ তখন সে ‘একভাবুক’ এবং একভাবুক আকারেই তাহার কর্মকাণ্ড চলে। এই ‘একভাব’ ধারণাটি যখন মনের বেলায় খাটাইবার কথা উঠে তখনই সমস্যা গোলযোগে ভরিয়া যায়। কারণ মন আপন স্বরূপে ‘নিখিল’ নহে। কিন্তু আপনারা তো জানেনই বলা হইয়াছিল মন এক না হইলেও ‘মতলবগত একভাব’ আছে। এই ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই তো যাহাকে বলা হয় কাণ্ডকারখানার আন্দোলন (phenomenological movement) তাহা সম্ভব হইয়াছিল।

একই কথা পদার্থবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে চলিত তথাকথিত ‘অবয়বপন্থা’ (gestalt) মতবাদ সম্বন্ধেও খাটিত। আর খাটিত ‘সহজ স্বরূপ’ (bonne forme) নামক ধারণার ক্ষেত্রেও। এই ধারণার দৌলতে উদাহরণস্বরূপ এক ফোটা পানির সঙ্গে আরো জটিল ভাবনাচিন্তার সংযোগ ঘটাইয়া দেওয়া। অধিক, বড় বড় মনোবিজ্ঞানীর দল আর এমনকি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা পর্যন্ত ‘নিখিল ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতি ধারণায় ভরপুর। যাহাই হউক, ‘একতাসাধক একভাব’ সবসময়ই সামনে চলিয়া আসে। আমি কখনোই জিনিসটা কী বুঝিতে পারি নাই। কারণ আমি যদি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী হইয়া থাকি আমি তো মনুষ্যসন্তানও বটি আর মনুষ্যসন্তান হিসাবে আমি অভিজ্ঞতা হইতে শিখিয়াছি যে আমার আপন মানব জীবনের প্রধান গুণ একটাই আর তাহা হইল এই জীবন এমন এক জিনিস যাহাকে আমরা ফরাসি ভাষায় বলি বহিয়া যায় (á la dérive)। আমি তো নিশ্চিত এইখানে আপনারা যাঁহারা আছেন তাঁহাদের অভিজ্ঞতাও ইহাই। আর কেহ যদি ইহার সহিত একমত না হইয়া থাকেন আশা করি তিনি হাত উঠাইবেন। জীবন নদীর নাহান বহিয়া যায়, কখনো বা এই তীর স্পর্শ করিল কখনো বা করিল ওই তীর। কখনো এইখানটায় একটুখানি দাঁড়াইল কখনো ওইখানটায়, কিন্তু কেন করিল বা দাঁড়াইল তাহার মাথামুণ্ডুও বুঝিল না–কী ঘটিল তাহার মাথামুণ্ডু কিছু কেহই বুঝিল না। বিশ্লেষণের মূলসূত্র ইহাই। মানব জীবনের ‘একতাসাধক একভাব’ আমার নিকট চিরকালই কলঙ্কজনক মিছাকথা মাত্র মনে হইয়াছে।

এই সকল ব্যাপার কী জিনিস বুঝিয়া উঠিবার প্রয়োজন মিটাইতে হইলে আমরা আরো এক নীতির সাহায্য লইতে পারি। ঘটনা কী তাহা কদাচ অজ্ঞানের দিক হইতে আমরা যে বিচার করিয়া দেখিতে চাহি না তাহারও কারণ আছে। কারণ অজ্ঞান যাহা বলে তাহা শব্দের মধ্যবর্তিতায় ফুটাইয়াই বলিয়া থাকে। আর ইহাদের মূলনীতি কী তাহার সন্ধান হয়তো আমরা লইতে পারি।

আমার প্রস্তাব, আসুন তো ‘একভাব’ ধারণাটি আমরা অন্য আলোক ফেলিয়া দেখি। ‘একতাসাধক একভাব’ নয়, দেখি এক, দুই, তিন প্রভৃতি গণনাসম্ভব ‘একভাব’। পনের বছর ধরিয়া পড়াইবার পর আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশির বেশি পাঁচ পর্যন্ত গুণিয়া দেখিতে শিখাইয়াছি। এই পর্যন্ত গোনা বেশ কষ্টের কাজ (চার পর্যন্ত গোনা আর একটু সোজা)। আর তাঁহারাও ঐ পর্যন্তই শিখিয়াছেন। তবে আজ রাত্রে আমাকে আপনাদের অনুমতি লইয়া দুইয়ের মধ্যেই আটক থাকিতে হইবে। এক্ষণে আমরা পূর্ণসংখ্যার কথা কহিতেছি আর পূর্ণসংখ্যার কথা কহাটা বড় সহজ বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস এই সভায় সমবেতদের অনেকেরই ইহা জানা জিনিস। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে, শুদ্ধ দরকার কয়েকপ্রস্ত সেট (set) এবং এক প্রস্ত ’একের বিম্ব এক’ (one to one correspondence) গণিবার নীতি। যেমন ধরা যাউক, এই ঘরে যতটা পিঁড়ি আছে ঠিক ততজন মানুষ বসিয়া আছেন কথাটা সত্য। কিন্তু ‘পূর্ণসংখ্যা’ কিংবা যাহাকে বলি ‘স্বাভাবিক সংখ্যা’ তাহা হইতে হইলে পূর্বসংখ্যাযোগে গঠিত কোন সংগ্রহের ডাক পড়িবেই। বলা নিষ্প্রয়োজন ইহা একাংশে হইলেও ‘স্বাভাবিক’ (natural) তবে শুদ্ধ এই অর্থেই যে ইহা কী কারণে আছে তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। গণনা জিনিসটা ‘অভিজ্ঞতানির্ভর সত্য’ নয় আর শুদ্ধ অভিজ্ঞতাজাত তথ্য হইতে গণনাকর্মের সৃষ্টি হইয়াছে ইহা প্রমাণ করাও অসম্ভব। হিয়ুম (Hume) সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু ফ্রেগে (Frege) নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রমাণ করিয়াছেন এই চেষ্টা অপরিপক্কতারই প্রমাণস্বরূপ। পূর্ণসংখ্যা মাত্রই একেকটা স্বনির্ভর একক। সমস্যার আসল ভিত্তি এই সত্যেই পাওয়া যাইবে। আমরা যদি এই সংখ্যাকেই একক ধরিয়া লই তো বেশ মজাই হয়। ধরা যাউক পুরুষ আর নারী–পিরিতির সহিত যোগ হইল ‘একভাব’! কিন্তু কিছুক্ষণ যাইতেই সব শেষ। এই দুইজনের পর আর কেহ রহিল না। হয়তো একটা শিশু আসিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা অন্য স্তরে পৌঁছিয়া গেলাম। আর তিনের জন্ম দেওয়া সে তো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। আমরা যখন সংখ্যা বিষয়ে গণিতবিদের প্রস্তাবাদি পড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করি তখন দেখিতে পাই সকল প্রস্তাবের গোড়ায় এক সূত্র: [নতুন সংখ্যা পাইতে হইলে] যে কোন পূর্ণসংখ্যার সহিত ১ সংখ্যাটি যোগ করিতে হইবে, ‘n+১’ বা [n+1]। সংখ্যার জন্ম কী উপায়ে হয় তাহার চাবি এই ‘যোগ এক’ কথার মধ্যেই আছে। আর আমি প্রস্তাব করিতেছি এই ‘যোগ করিয়া একভাব’ করিবার পদ্ধতি যাহার গুণে দুই তৈরি হয় তাহা বাদ দিয়া আমরা দুই সংখ্যাটির সংখ্যাস্বরূপ অখিল (real) জন্ম কীভাবে হয় দেখিব।

এই দুইকে যাহার এখনও জন্মই হয় নাই এমন পহিলা পূর্ণসংখ্যা হইতে হইবে খোদ দুইয়ের আবির্ভাবের আগেভাগেই। ইহা সম্ভব হইতেছে কারণ আমরা দেখিয়াছি পহিলা ‘এক’ সংখ্যার আবির্ভাব মানিয়া লইবার ওয়াস্তে এক্ষণে ‘দুই’ আসিয়া বসিয়াছে। ‘এক’ সংখ্যার জায়গায় ‘দুই’ বসাইলেন আর ফলস্বরূপ দেখিলেন ‘দুই’ সংখ্যার জায়গায় ‘তিন’ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই স্থলে আমরা যাহা দেখিলাম তাহার নাম আমি রাখিয়াছি দাগ (mark)। তাহা হইলে আমরা দেখিব কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে যাহাতে দাগ দেওয়া হইয়াছে আর কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে দাগ দেওয়া হয় নাই। পহিলা যে দাগ দেওয়া হইল তাহা হইতে আমরা ঘটনার জন্ম দেখিলাম। হুবহু এই পথেই ফ্রেগে সংখ্যার জন্মকাহিনী ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে শ্রেণীতে কোন অংকুর (elements) নাই তাহাকেই পহিলা শ্রেণী কহে। এইভাবে শূন্যের জায়গায় ‘এক’ আসিল আর তাহার পর একের জায়গাটি কী করিয়া দোসরা জায়গা বনিয়া গেল তাহা সহজেই বুঝা যাইতেছে। এই ক্রমে ‘দুই’, ‘তিন’ ও অন্যান্য সংখ্যার জায়গা বদল হইল। আমাদের হিসাব অনুসারে এই দুইয়ের সমস্যাই সহজ মানুষ সমস্যার রূপ বটে। আর দুইয়ের জন্ম হইয়াছে একের সহিত এক যোগে, একের অভাব পূর্ণ করিয়া নয়, বরং একের জন্ম দিবার খাতিরে একের পুনরাবৃত্তি ঘটাইয়া। ইহা সত্য হইলে আমরা মনোবিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা হইতে যে সত্য জানিতে পারিয়াছি তাহারই সমক্ষে হাজির হইলাম। ‘অজ্ঞান মানুষ’ এমনই চিজ যাহা নিজের আবর্তন ঘটাইবার দিকে ঝুঁকিয়াই থাকে, আর শুদ্ধ ‘এক’ আবর্তন হইলেই হইল, উহার জন্ম হইবে। যাহাই হউক একদফা আবর্তন দেখিতে হইলে আমাদের দেখা দরকার পহিলা ঘটনার পুনরাবর্তন ঘটাইতে দোসরা ঘটনার যে যে গুণ না থাকিলেই নহে তাহা কী কী। আমরা যদি তাড়াহুড়া করিয়া জবাব দিই তো বলিব দরকার দুই ঘটনার এক রকম হওয়া। যদি তাহাই হইত তবে দুইয়ের নিয়মটা হইত যমজেরই নিয়ম। যদি তাহাই সত্য হয় তো ত্রয়ীর কিংবা চতুরঙ্গের নিয়মই বা হইবে না কেন? আমাদের যুগে আমরা ছেলেমেয়েদের শিখাইতাম, ধরা যাউক মাইকের সহিত অভিধান যোগ করা চলিবে না। তবে এই শিক্ষাটা একেবারেই আজগুবি শিক্ষা। কারণ মানুষ যদি মাইকের সহিত অভিধান কিম্বা লুইস ক্যারলের ভাষ্য মোতাবেক বলিলে রাজার লগে বাধাকপি যোগ করিতে না পারিবে তো যোগ করিবার কিছুই তো থাকিবে না। যাহার দৌলতে এক বস্তুর সহিত অন্য বস্তুর প্রভেদটা হিসাবে না লইয়া যোগ সম্ভব হয় সেই অভিন্নতার বাস বস্তুতে নাই, আছে ঐ দাগে (বা মার্কায়)। এই দাগের কল্যাণেই প্রভেদটা যেন ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে এমত অবস্থা হয়। পুনরাবর্তন হইবার সময় সহজ মানুষের, অজ্ঞান সহজ মানুষের ঘটে যাহা ঘটে ইহা তাহারই চাবিকাঠি। কারণ আমরা জানি ‘সহজ মানুষ’ নিদারুণ অর্থময় কিছু একটার পুনরাবর্তন করে। উদাহরণ দিয়া বলিতে, এই যে বস্তুকে আমরা কখনও কখনও বলি বিভীষিকা (‘ট্রমা’) কিম্বা ‘চরম পুলক’ সেই অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে সহজ মানুষ হাজির থাকে। কী ঘটে সেই সংকটে? যদি ‘মাল’টা এই আকারে জগতে বিরাজ করে, এই একত্ববোধক লক্ষণটাই যদি হয় শেষ কথা, তাহা হইলে অভিন্নতার লক্ষণ এই জায়গায় বিলক্ষণ আছে। এক্ষণে আমার মধ্যে যে ‘মাল’টা খুঁজিয়া বেড়ান হইতেছে তাহা পাইতে হইলে পহিলা দাগটা ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলাইতে হইবে। কেননা এই দাগটা আজ তো আজকেই ছিল ঘষামাজার ফলস্বরূপ। সকল ভেদ উঠাইয়া দেওয়ার নামই তো ছিল এইটা আর এই লক্ষণ না হইত তো পহিলা ‘মাল’ই হইয়া যাইত লাপাত্তা। আকারে যাহা অভিন্ন তাহার পুনরাবর্তনকেই যদি পুনরাবর্তনের সারকথা বলা হয় তো তেমন পুনরাবর্তন অসম্ভব, পুনরাবর্তনের রীতিহীনতার রহস্য এইখানেই। যাহাই হউক মানুষ এই পুনরাবর্তনেরই ফলস্বরূপ। কারণ ইহার ফলে সহজ মানুষের প্রথম ভিত্তিটাই হাওয়া হইয়া যাইতে, রদ হইতে বাধ্য হয়। ইহাই সেই কারণ যাহার বলে সহজ মানুষ মাত্রই–অবস্থানের গুণে–বিভক্ত ভাবস্বরূপ হাজির থাকে। আমি ক্ষান্তিহীন বলিব এই লক্ষণ অভিন্ন­তারই লক্ষণ। তবে ইহার ফলে যাহা নিশ্চিত হইতেছে তাহা শুদ্ধ অভিন্নতারই ভিন্নতা। ইহা হইতেছে অভিন্নতা কি ভিন্নতার ফল আকারে নয়, হইতেছে বরং ‘অভিন্নতারই ভিন্নতার’ মধ্যবর্তিতায়। ইহা বুঝিতে পারা সহজ। যথা ফরাসি ভাষায় আমরা বলিয়া থাকি ‘আমি আপনাদের নম্বর মারিলাম’ (Je vous numérotte)। আমি আপনাদের সবাইকে একটি একটি করিয়া নম্বর বাঁটিয়া দিলাম, আর ইহার ফলে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেল আপনারা সকলেই আলাদা তবে শুদ্ধ নম্বরের বিচারে। অন্য কোন দিকবিচারে নয়।

যাহা ‘একই সঙ্গে’ এক কিংবা ‘দুখণ্ডে’ বটে এমন কোন কিছুর মধ্যে এই লক্ষণটা আছে তাহা প্রমাণ করিবার নিমিত্ত আমরা সহজ বুদ্ধির কাছে কোন প্রস্তাব তুলিয়া ধরিতে পারি? নিচের রেখাচিত্রাটির কথাই ভাবা যাক, সুপরিচিত একটি ছবির আদলে আমি ইহার নাম রাখিয়াছি উল্টা আট: [বঙ্গভাষায় উল্টা চার–অনু.]

8.jpg

দেখিতেই পাইতেছেন এইখানের রেখাটিকে একই সঙ্গে এক রেখা বা দুই রেখা উভয়ই গণ্য করা যাইতে পারে। যে আদ্যস্থলে, যে গিরায় সহজ মানুষ গঠিত হয় ইহাকে সেই অকুস্থলেরই অপরিহার্য লিপি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। আমরা পহিলা পহিলা যতখানি ভাবিতে পারি ইহার হাত তাহা হইতে অনেক দূর বেশি যাইতে পারে, কারণ আমরা এই ধরণের লিপি খোদাই করার মতন উপরিতলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িতে পারি। আমরা হয়তো বুঝিতে পারিব নিখিল অর্থে ব্যবহার করা পুরানা প্রতীক–মণ্ডল (the sphere)–দিয়া এখানে কাজ চলিবে না। কোন বৃষ (torus), কোন বোতল (Klein bottle), আড়াআড়ি কাটা উপরিতল (cross-cut surface) এইভাবে কাটিয়া দেখান যায়। এই বৈচিত্র্যের মূল্য আছে। কেননা ইহাতে মনে রোগ কিভাবে গঠিত হয় তাহার ব্যাখ্যা মিলিবে। এই গোড়াকার কাটাদাগের সাহায্যে যদি ‘সহজ মানুষ’ আকার পায়, তবে একই উপায়ে প্রমাণ করা যায় কোন বৃষ কাটিলে ‘স্নায়ুরোগগ্রস্ত সহজ মানুষে’র (neurotic subject) আর ‘আড়াআড়ি কাটা উপরিতল’ কাটিলে অন্য কোন মনোব্যাধির সহিত মিলিয়া যাইবে। আজ রাত্রে আপনাদের সমক্ষে আমি ইহার ব্যাখ্যা দিতেছি না, তবে এই দুরূহ বক্তৃতার সমাপ্তি টানিতে হইলে আমাকে নিচের সারসংক্ষেপটি পেশ করিতেই হইবে।

পূর্ণসংখ্যাধারার গোড়ার দিকটাই শুদ্ধ আমি হিসাবে লইলাম, কারণ ইহা ভাষা ও অখিলের মাঝখানকার বিন্দু বটে। ‘এক’ এবং ‘এক যোগ’ ব্যাখ্যাচ্ছলে আমি যে জাতের লক্ষণ কাজে লাগাইলাম ভাষাও সেই একই লক্ষণ যোগেই গঠিত হইয়াছে। পার্থক্যের মধ্যে ভাষার এই লক্ষণ আর একভাবাপন্ন লক্ষণ (unitary trait) ঠিক এক বস্তু নহে, কারণ আমাদের ভাষায় ভেদভিত্তিক অনেক লক্ষণের একত্র সমাবেশ আছে। কথাটা অন্যভাবে বলি তো বলা যায় ভাষা গড়া হইয়াছে এক দঙ্গল পদ–যেমন বা, তা, পা, ইতি আদি, ইতি আদি লইয়া। দঙ্গলটির সীমা আছে। সহজ মানুষের চলার পথ কাটিতে যাহা লাগে পদমাত্রই তাহা যোগাইতে পারে। আর পদে পদে সম্পর্কের বেলায় যাহা সামান্য সত্য পূর্ণসংখ্যার চলার পথ তাহারই বিশেষ রূপ মাত্র, এই কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই সমুদয় বটে। আমি যাহাকে পরম বলিতেছি তাহা গঠিত হইয়াছে এই পদাবলী দিয়াই। ইহা তাহার সংজ্ঞা বটে। ভাষার কারণে যে ভেদটা সম্ভব হইয়াছে তাহা এই: পদ মাত্রই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কাছ হইতে নিজে অভিন্ন নয় (পূর্ণ সংখ্যার একভাবাপন্ন লক্ষণ ইহার বিপরীত)। ইহার বিশেষ কারণও এই যে অনেক পদের একত্র সমাবেশই ভাষা। আর এই সমাবেশে কোন ‘পদ’ (signifier) নিজ ‘পদার্থের’ (signified) ‘পদ’ হইতে পারে আবার নাও হইতে পারে। এই সুপরিচিত সত্যটিই রাসেলের (Russel) ধাঁধার মূলসূত্র। যে সকল অংকুর (elements) নিজ নিজ দঙ্গলের অংশ নয় তাহাদিগকে শরিক করিয়া নতুন কোন দঙ্গল গঠন করিলে আমরা যে ধাঁধায় পড়িব তাহার পরিণতিতে আমরা জানি ‘কথার সহিত কথার বিরোধ’ (contradiction) তৈয়ার হয়। ইহার অর্থ, সহজ কথায়, শুদ্ধ বাক্যের নিখিলে এমন কিছু থাকতে পারিবে না যাহাতে সকল কিছু রহিয়াছে। আর যে ফাঁকের দৌলতে ‘সহজ মানুষ’ গঠিত হয় এইখানে আরো একবার তাহার দেখা মিলিতেছে। ‘সহজ মানুষ’ মানেই হইতেছে অখিলের মধ্যে খিল ঢুকাইয়া দেওয়া (introduction of a loss in reality)। অথচ ইহা হইতেই পারে না। কেননা সংজ্ঞার গুণেই অখিল বলিতে বুঝায় ‘যাহাতে খিল নাই’ (যাহা যতদূর সম্ভব ততদূরই ভরাট বটে)। খিলের ধারণাটি সম্ভব হইয়াছে সেই লক্ষণের গুণে যাহা আমাদের সৃষ্ট অক্ষরের দৌলতে এক প্রস্ত অভাবের নির্ধারিত স্থান। এই যেমন a1, a2, a3 প্রভৃতি বৈ নয়। আর ‘স্থান’ (space) মানে তো ফাঁকই। ‘সহজ মানুষ’ যখন অভাবের জায়গাটি দখল করেন, তখন শব্দের ভিতর খিল ঢুকিয়া যায়। আর ইহা সহজ মানুষের সংজ্ঞাও বটে।

xex-1.jpg

তবে ইহা যদি লিখিবার আবশ্যক করে তো ইহার সংজ্ঞা বাধিতে হইবে ভাষার মণ্ডলজোড়া বৃত্তের আওতায়। এই বৃত্তের নাম আমি রাখিয়াছি পরকীয়া (otherness)। এ জগতে যাহা কিছু ভাষাপদবাচ্য তাহার সবকিছুই এই পরকীয়ারই আলো আর সেই কারণেই সহজ মানুষ সবসময়ই এই পদাবলী বাদিনীর তলায় তলায় পলায়নপর চির অপসৃয়মান বস্তুস্বরূপ। কারণ পদের সংজ্ঞাই এমন: যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে। ফল এই দাঁড়ায় যে সহজ মানুষ উধাও হইয়া যায়। দুই প্রস্ত একভাবাপন্ন লক্ষণের ক্ষেত্রেও হুবহু একই ঘটনা ঘটে। আর এই সময় যাহাকে বলা হইতেছে অর্থ বা পদার্থ তাহার আবির্ভাব ঘটে দুই নম্বর পদটির আবডালে এবং ইহার পর এই ক্রম ধরিয়া আর আর পদ ও পদার্থের আবির্ভাব চলিতে থাকে।

হারাইয়া যাইতে যাইতেও ‘সহজ মানুষ’ কল্পনার ফানুস বলিয়া পরিচিত এই অত্যাশ্চর্য বস্তুর সাক্ষাত কোন না কোন উপায়ে লিপ্ত থাকিয়া আরও একবার নিজেকে খোঁজার জন্য আকুল হয়। ‘বিষয় বাসনা’ (desire) ইহারই অপর নাম। এই সাধনা জিগাইয়া রাখে সেই বস্তু যাহার নাম আমি রাখিয়াছি হারান সম্ভার (lost object)। ইহার নাম বিসমিল্লায়ই লইয়াছিলাম–ইহার নাম লইতেও ভয়ে কল্পনার হাত না সাধাইয়া যায়। আর ইহার জন্ম ও লালন-পালন এই স্থলেই ঘটে। আমার শব্দ তালিকায় ইহারই নাম হইয়াছে ছোট ছাদের a সম্ভার (object a)। ইহার কথা মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী মাত্রই ভালো করিয়া জানিবেন। কেন না মনোবিশ্লেষণবিদ্যা আদ্যোপান্ত খাড়াও হইয়াছে এই নিদারুণ সম্ভারের কাঁধে ভর করিয়াই। আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাধীন সহজ মানুষের সহিত এই a সম্ভারের সম্পর্ক-কাঠামো সবসময়ই ফানুসের তলায় থাকে আর এই ফানুস থাকে বাসনার তলায়। কেন না বাসনা আর কিছু নয়। শুদ্ধ যাহার নাম রাখিয়াছি সমস্ত অর্থের অনন্তনাম (metonymie, metonymy) ইহা তাহারই অপর নাম।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় মনোবিশ্লেষণবৃত্তির অখিলে গঠন বলিয়া কোন জিনিস বিরাজ করিতেছে তাহা আপনাদিগকে দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছি। তবে ‘সাকার’ ও ‘আকার’ প্রভৃতি দিক সম্পর্কে আমি কিছুই বলি নাই। মনের জীবন যে জীবনের বা অভিজ্ঞতার জগত দিয়া পার হয় তাহার ভিতর আকারের বন্ধন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে তাহা বুঝিয়া লওয়ার কোন বিকল্প নাই। এই কথা না বলিলেও চলিত। কিন্তু আজ রাত্রে আমার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নাই। তবে পুরানা বলিয়া জ্ঞাত এই ‘সহজ মানুষ’ সম্বন্ধে সবার তুলনায় কম জানা অথচ সবার তুলনায় বেশি নিশ্চিত একটি সত্যকথা ভাবিয়া দেখিবেন। জীবিত প্রাণীর জীবনপর্বের ইহাই অর্থপূর্ণ দিক। এই অন্তহীন জিনিসটা জীবন ও মরণের সীমানার মধ্যে কিছু একটার স্বাদ পাইতে সক্ষম। বিষাদ ও হর্ষের মধ্যখানকার পুরা বর্ণালিটা জুড়িয়া থাকিতেও ইহা সক্ষম। ইহাকে আমরা ফরাসি জবানে বলিয়া থাকি ‘সহজানন্দ’ (sujet de jouissance)।

আজ বিকালবেলা এই জায়গায় আসিবার পথে ছোট্ট নিয়ন বাতির বিজ্ঞাপনে দেখিলাম লেখা রহিয়াছে, ‘এনজয় কোকো-কোলা’ [অর্থাৎ কোকা-কোলার মজা মার]। ইহা দেখিয়া মনে পড়িল, যতদূর জানি, ফরাসি ‘জুয়িসঁস’ (পুলক/আনন্দ) কিংবা ল্যাটিন ভাষার ‘ফ্রূয়র’ (fruor) শব্দে পদার্থের যে বিশাল ভার বহন করা হয় তাহার যথার্থ প্রকাশক্ষম পদ ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যাইতেছে না। জুয়ির [Jouir] শব্দের অর্থ আমি অভিধান খুলিয়া দেখিয়াছি। দেখিয়াছি ইহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে ‘টু পজেস, টু ইয়ুজ’ [অর্থাৎ দখলে লওয়ার, ভোগ-ব্যবহার করার] কিন্তু ইহার অর্থ আদৌ তাহা নয়। প্রাণধারী জীব যদি আদৌ ভাবিবার মতন কোন ভাব হইয়া থাকে, তো সব কিছু ছাড়াইয়া তাহার পরিচয় হইবে আনন্দের নন্দন [বা আনন্দের সহজ মানুষ]। তবে, দুঃখের মধ্যে, বেশিক্ষণ না যাইতেই দেখা যাইবে মনোবিশ্লেষণের যে বিধির নাম হইয়াছে আনন্দসূত্র (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে শুদ্ধ নিরানন্দসূত্র বৈ নয়) যাবত আনন্দের পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছে।

যদি এমত হয় যে মজা মারিতে মারিতে আমি একটু মাত্রা ছাড়াইয়া গেলাম, অমনি কথা শুরু হইয়া যায়, ফলে আমি আমার আনন্দ খানিক কমাইয়া আনি। জীবদেহ মনে হয় এমনভাবেই বানান হইয়াছে যাহা অতি মাত্রার আনন্দ এড়াইয়া যায়। আমাদের দেহের গঠন যদি এহেন মজার জিনিস না হইত তো আমরা সকলেই হয়তো ঝিনুকের মতন নিরব হইয়া থাকিতাম, এই গঠনই আমাদের আনন্দপক্ষের আমল ভাঙ্গিতে বাধ্য করে কিংবা আমাদিগকে শুদ্ধ এই আমলের উপর জোর করিবার আর ভাঙ্গিয়া ফেলিবার খোয়াব দেখাইয়া থাকে। পরমের সঙ্গে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ পদের মাপকাঠি বরাবর সহজের গঠন হইতে ইহার বিস্তার ঘটে আর এই গঠনের গোড়া পোতা থাকে ভাষায়। শুদ্ধ ইহার কারণেই বাসনার পূর্ণ বৈচিত্র্য পাখা মেলিবার অবকাশ পায়। ফলে আমরা এই জাতীয় নিষিদ্ধ আনন্দের (জুয়িসঁস) কাছাকাছি যাইবার, যাচাই করিবার সুযোগ পাই। ইহাই আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ যাহার একলা মূল্য আছে।

আলোচনা

আঙ্গুস ফ্লেচার
ফ্রয়েড সত্য সত্য ছিলেন খুবই সরল মানুষ। তবে মানুষের নানান সমস্যার বিচিত্র সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। মানুষের জটিলতা ও সমস্যার ব্যাখ্যা প্রদানের খাতিরে তিনি কখনো কখনো মিথ ব্যবহার করিয়াছেন। যথা: নার্সিসাস মিথ। উনি দেখিলেন কিছু কিছু মনুষ্য আছেন যাহারা আয়নায় আপন মুখ দেখেন আর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে প্রেম করেন। ব্যাপারটা এমনই সহজ। তিনি শব্দের উপরিতলে উপরিতলে ভাসিবার চেষ্টা করেন নাই। আপনি যাহা করিতেছেন তাহা মাকড়সার মতন: আপনি ভারি মিহি যে জালটা বানাইতেছেন তাহার সঙ্গে মানুষের কোন সত্য সম্পর্ক নাই। যেমন আপনি ‘মজা’র কথা বলিলেন। ফরাসি ভাষায় ‘জুয়ির’ (jouir) কথাটির এক অর্থ ‘চরম পুলক’–ইহা বলিবেন না কেন? আমার মনে হয় ইহাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যাহা কিছু শুনিলাম সবই এহেন কায়াহীন কথা…। সমস্যাটা এখানে মনোবিশ্লেষণের নয়। মনোবিশ্লেষণের মূল্য এইখানে যে ইহা মনোবিশ্লেষণের গতি বিষয়ে প্রস্তাবনাস্বরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইয়াছে পরে, বিশেষ বলিতে বিলহেলম রাইখের কাজ। এতসব অতিপদার্থবিদ্যার (metaphysics) কোনই দরকার নাই। আপনার চিত্রলেখাটি (diagram) খুবই মজার হইয়াছে, তবে ইহার সহিত আমাদের কাজকর্মের, খাওয়া দাওয়া, রতি সহবাস ইতি আদির কোনই সংযোগ তো নাই।

হ্যারি উলফ
আমি জিজ্ঞাসা করিতে চাই এই গোড়ালি পাটিগণিত (fundamental arithmetic) আর এই স্থানবিদ্যাও (topology) এক জাতীয় মিথ কি না, নাকি মানস-জীবন ব্যাখ্যার খাতিরে এক প্রকার তুলনার প্রস্তাব মাত্র?

জাক লাকাঁ
কিসের সহিত তুলনা? ‘S’ বলিতে এমন কিছু বোঝায় যাহা হুবহু এই S আকারে লেখা চলে। আমি বলিতেছি এই ‘S’ যাহা দিয়া সহজ মানুষ বুঝান হইতেছে তাহা সাধিত ক্ষতি বুঝাইবার উপযোগী এক জাতীয় হাতিয়ার, কিন্তু ‘সহজ মানুষ’ হিসাবে আমি (এবং আমি নিজেও) যাহা হারাইয়াছি তাহা। অন্য কথায় বলিতে, একদিকে আছে এমন কিছু যাহার খচিত অর্থ আছে আর অন্যদিকে আছে আমার ব্যবহৃত কথার ধারা যাহা দিয়া আমি আপনি যেখানে আছেন সেখানে পোঁছাইতে চাইতেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফাঁক (বা খিল) আছে। আপনাকে এখানে আরেকজন সহজ মানুষরূপে ধরি নাই, ধরিয়াছি আমার কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিবেন এহেন মানুষ হিসাবে। উপমানটা কোনখানে? এই ক্ষতিটা হয় হইয়াছে কিম্বা হয় নাই। যদি হইয়া থাকে তবে তাহা বুঝাইতে হইবে একপ্রস্ত প্রতীক দিয়া। যাহাই হউক, প্রতীকায়ন না ঘটাইবা পর্যন্ত এই ক্ষতিটার অস্তিত্বই নাই। ইহা তো তুলনা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অখিল জগতের কোন না কোন ভাগে, এই ধরনের বৃষে আছে। এই বৃষ আসলেই আছে আর স্নায়ুরোগীর গঠন হুবহু এইটাই। ইহা উপমান নহে। এমনকি ইহা কায়াহীনও নহে, কারণ কায়াহীন মানে তো অখিল জগত হইতে কিছ না কিছু বিয়োগ করাও বুঝাইতেছে। আমার মনে হয় ইহাই খোদ অখিল।

নর্মান হলান্ড
আমি লাকাঁ সাহেবের পক্ষ লইয়া বলিতে চাই। আমার মনে হয় ওঁ চাইছেন খুব ভালো একটা কিছু করিতে। আমি এই আলোচনা সভার আগেভাগেই তাঁহার প্রবন্ধ পড়িলাম। ইহার আগে আমি ওঁর কোন লেখা পড়ি নাই। মনে হইতেছে তিনি ফ্রয়েডের লেখা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞান প্রকল্প’ (Project for a Scientific Psychology) বরাবর ফিরিয়া গিয়াছেন। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ইহাই ফ্রয়েডের পহিলা লেখা। ইহাও খুব কায়াহীন ছিল এবং আপনি এখানে আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার মতনই ছিল। অবশ্য আপনি বীজগণিতের সাহায্য লইতেছেন আর উনি নিউরনের আশ্রয় লইয়াছিলেন, এই রচনার প্রভাব ‘খাবনামা’, ‘ফ্লিস সমীপে চিঠিপত্র’সহ তাঁদের প্রথম বয়সের সমস্ত লেখায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যদিও সেই প্রভাব অনেক সময় কেবল উহ্য রহিয়াছে।

এন্টনি ওয়াইল্ডেন
আমি কিছু কথা যোগ করিতে চাহিয়াতেছি। আপনার বক্তৃতার গোড়ায় আপনি অস্বীকার বা অস্বীকৃতির [মেকোনাসঁসের] ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। আর আমরা ইহার এমন একপ্রস্ত চরম দৃষ্টান্ত হইতে শুরু করিয়াছি যে ইহা হইতে কী করিয়া বাহির হইব বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আপনি কিন্তু শুরু করিয়াছেন আপনার চিন্তার একেবারে মাথা হইতে (আপনার চিন্তার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হইতে) আর ইহার গোড়াটা কী রকম ছিল তাহা খুঁজিয়া বাহির করা আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক কঠিন। এই চিন্তা খুবই ধনশালী এবং খুবই গভীরে ইহার মূল। আমি আপনার লেখা কষ্ট করিয়া তর্জমা করিয়া থাকি, সেই অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি ফ্রয়েডের সহিত আপনি একফোঁটাও বেঈমানি করেন নাই। আজ রাত্রে এইখানে আমরা অনেক আবোল তাবোল বকিব সন্দেহ নাই–তবে এহেন বকাবকির আগে আমাদের উচিত আপনার লেখা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখা। ইহার অন্যথা না করাই উচিত। তাহারা আগে আপনার লেখা পড়িয়া দেখুন, তারপর ফ্রয়েড পড়ুন সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ সমীপে এই মিনতি করি।

রিচার্ড শেচনার
শূন্যতা সম্বন্ধে আপনার চিন্তার সহিত হুসার্ল (Husserl) এবং সার্ত্রের (Sartre) লেখার সম্পর্ক কী?

লাঁকা
আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, সেই শূন্যতা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না আমি বিশেষ কিছু বলিতে পারিব। হুসার্ল সম্পর্কেও পারিব না, সার্ত্র সম্পর্কেও না। সত্য সত্যই, আমার মনে হয় না আমি শূন্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিয়াছি। গড়াইয়া যাওয়া এবং ধরিতে কঠিন হওয়া, কখনো কোথায়ও না থাকা (আমি যখন ঐখানে খুঁজি তখন উহা এইখানে; আর আমি যখন এইখানে) মানে শূন্যতা নয়। আমার বক্তৃতাসভার (Seminar) তালিকায় এই বৎসর আমি যে বস্তুর নাম রাখিয়াছি ‘উদ্ভট কল্পনার যুক্তি’ সেই বিষয়যোগের ঘোষণা দিব। মনে হইতেছে আমার চেষ্টার বেশির ভাগই নিয়োজিত হইবে নানান ধরনের খিল, নানান ধরনের খোয়া, নানান শূন্যতার সংজ্ঞা ঠিক করার পিছনে। এইগুলি একেকটা একেক জাতের, কোনই মিল নাই একটার সহিত অন্যটার। অনুপস্থিতির কথাই ধরুন না কেন? রাণীর অনুপস্থিতি, এই ধরণের অংকুরের সহিত কিছু একটা যোগ করিতে হয় কিন্তু রাণীর অনুপস্থিতি অস্বীকার করিতে হইলে…। আমার ধারণা নিছক শূন্যতা ধারণাটির অস্পষ্টতা এই প্রসঙ্গে কোন কাজে আসিবে না। আমার নিজেরই উধাও হইবার আগে আমাকে যাহা করিতে হইবে, সব কিছুতেই আমার দেরি হইয়া যায়। তবে করিবার মতন কাজটি আগাইয়া নেওয়াও কম কঠিনও নয়। এক ধাপে এক একটা করিয়া আগাইবার দরকার আছে। এখন আমি এই নানান ধরনের ‘অভাব’ (lack) লইয়া আলোচনা করিব।

[কট সাহেব ও ডা: লাঁকা দেওয়ালপটযোগে মোবিয়ুস ফিতার (Möbius strip) নানান বৈশিষ্ট্য লইয়া আলোচনা করিলেন]

ইয়ান কট
একটা মজার জিনিস আছে এইখানে। হয়তো ইহা আপতিক। এই সকল ব্রত (motifs) অন্যবস্তুবাদী (surrealist) ছবিতে দেখিতে পাই। ইহাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক আছে কি?

লাকাঁ
অন্যবস্তুবাদী ছবির সহিত মনে হয় কমসে কম আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে।

পুলে
এই অবশের খোঁয়ারি যাহার কারণে সহজের আবির্ভাব ঘটে আপনি কি ইহার সহিত সার্ত্রের চিন্তার অন্তর্গত নাস্তি [le neant] জিনিসটায় কোন প্রকার যোগ আছে মনে করেন? প্রুস্তের রচনার গোড়ার দিকে দেখা যায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগিয়া উঠিল, তাহার অবস্থার সহিত ইহার তুলনা দেওয়া কি যাইতে পারে? আমাদের মনে পড়ে স্বপ্ন দেখিতে লোকটি জাগিয়া উঠিল আর দেখিল কি যেন হারাইয়াছে। কি যেন নাই। বড় কথা সে নিজে নাই। ইহার সহিত কোন তুলনা কি চলে?

লাকাঁ
আমার ধারণা প্রুস্ত বহুবারই অজ্ঞানের কয়েকরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পোঁছেছিলেন। প্রুস্তের লেখায় এমন অনেক পৃষ্ঠাব্যাপী বা কাছাকাছি বিস্তৃত অংশ পাওয়া যায় যাহা সহজেই আলাদা (découper) করা যাইবে। আমার মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক। প্রুস্ত প্রায় কাছাকাছি চলে যান, তবে তিনি প্রস্তাব আকারে ইহার বিস্তার না ঘটাইয়া নিজের ব্যবসায়–মানে সাহিত্যে–ফিরিয়া আসেন। উদাহরণ লওয়া যাইতে পারে কুমারী ভঁতুইয়ের, বয়ানকার যে দৃষ্টিতে তাহাকে তাহার বন্ধু ও তাহার বাবার ছবি হাতে দেখেছেন তাহার কথা বলিতেছি। আমার মনে হয় না আর কোন সাহিত্যশিল্পী কখনো এহেন ছবি আঁকিয়াছেন। হইতে পারে ইহা হইয়াছে তাহার খোদ কর্মপরিকল্পনার সময় পুনরুদ্ধারের এই আলিশান কর্মকাণ্ডের স্বভাব অনুযায়ী। এই প্রকল্পই তাহাকে পথ দেখাইয়াছে, এমনকি জ্ঞান যতদূর পর্যন্ত যাইবার সাধ্য রাখে তাহার বাহিরেও দেখাইয়াছে।

সিগমুন্ড কখ (Koch)
আপনার বক্তৃতার একটা ধরন নিয়তই আমার দৃষ্টি এড়াইয়াছে। আপনি ইংরেজিতেই বলিয়াছেন, ইহা ছাড়া আমি ইহা হইবার অন্য কোন কারণ দেখিতেছি না। আপনি পূর্ণসংখ্যা ২ লইয়া অনেক ভারি কথা কহিয়াছেন, বিশেষ পূর্ণসংখ্যা ২ য়ের জন্ম লইয়া। আমার যতটুকু স্মরণ হয় আপনার বিশ্লেষণ হইতেছে এই যে আমরা এক নির্দেশক দাগ দিয়া শুরু করিলে দাগাংকিত খাড়াইয়া যায়, ফলে আমরা ২ এর মুখোমুখি হই বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। দাগাংকিত আর দাগানংকিতর সহিত তুলনা দিবার জোড়া কোথায় পাইব? দাগাংকিত মানে কি জ্ঞানতন্ত্র আর দাগানংকিত মানে কি অজ্ঞানতন্ত্র? দাগাংকিতই কি সজ্ঞান মানুষ আর দাগানংকিতই কি অজ্ঞান মানুষ?

লাকাঁ
ফ্রেগের লেখা হইতে আমি শুদ্ধ হইতে ধার করিয়াছি যে শূন্য সংখ্যাটি যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যবাচক সংখ্যা সেই শ্রেণীই হইতেছে ১ সংখ্যার ভিত্তি। মনোবিশ্লেষণসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গক্রমে আমি ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি একটি কারণে, তাহা হইতেছে এই–‘এরোস’(eros) বা রতির রূপরেখা আঁকিতে গিয়া ফ্রয়েড ২ সংখ্যার উপর বেশ গুরুভার আরোপ করিয়াছেন। জীবনের পরিসরে যে শক্তি একতাসাধন করিয়া থাকে তাহার নামই রতিশক্তি, আর ইহাতে ভিত্তি করিয়া অনেকানেক মনোবিশ্লেষক যৌনাঙ্গের পরিপকৃত বলিয়া একটা কথা বাহির করিয়াছেন। ইহার ভিত্তিতে তাহারা দাবি করিয়াছেন যেমন ‘নিখুঁত বিবাহ’ বলিয়া কোন জিনিস সম্ভব। লক্ষ্য হিসাবে বিষয়টি রহস্যাবৃত আর সাংঘাতিক একগুঁয়েমির সহিত ইহার পক্ষে প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে। যে শ্রোতামণ্ডলির সহিত ফ্রেগে উত্থাপিত সমস্যাটির পরিচয় ঘটে নাই শুদ্ধ তাহাদের কথা মাথায় লইয়া আমি, পহিলা দফায়, এই ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি। ১ সংখ্যার মোকাবেলায় ০ সংখ্যা। এই পহিলা পরিচয় পর্বে, যে কর্তব্য সম্পাদন করিতে পারিতে ২ সংখ্যার মোকাবেলায় ১ সংখ্যাটিও সেই কর্তব্য করিতে পারিবে।
আপনার দুই নম্বর সওয়াল প্রসঙ্গে বলিতেছি।

lacan2.jpg
জাক লাকাঁ

যাহারা ফ্রয়েডের লেখার সহিত কোন প্রকার খুঁত ব্যতিরেকেই পরিচিত রহিয়াছেন তাঁহারা জানেন এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমি স্বভাবগত নিয়মেই উহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দাবাইয়া রাখা প্রসঙ্গে এই কথাটি একদমই ভুলিয়া থাকা চলিতে না যে ফ্রয়েড বলিয়াছেন দাবাইয়া রাখার রহস্য যাহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে তাহাকে জার্মান ভাষায় বলে ‘উয়রফেরড্র্যাংগুঙ্গ’ (urverdrängung) বা আদ্যদমন। আমি আজ আমার প্রস্তাবের পুরাটাই এখানে সূত্রমাফিক পেশ করিতে পারি নাই, ইহা স্বভাবগত কারণেই ঘটিয়াছে। সূত্রবদ্ধ করা ফ্রয়েড ঘরানার ভাষায় যাহাকে ঘনায়ন (condensation) বলে তাহা বুঝাইতে হইলে রূপকের ওপর গোড়াতেই নির্ভর করিতে হয়, ইহা জানা না থাকিলে কিন্তু একদমই চলিতেছে না। [ডা. লাকাঁ কালো বোর্ডে ‘অক্ষরের নাছোড়বান্দামি’ (L’instance de la lettre) বিষয়ের সার দেখাইয়া তাঁহার মন্তব্য শেষ করিলেন।]

গোল্ডমান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমি যে উপায়ে কাজকারবার চালাইতেছি তাহার কারণে একটা জিনিস আমার দৃষ্টিতে লাগে। ইহা আর কিছুই নয়, গুরুত্বপূর্র্ণ, ইতিহাসভিত্তিক, দশজনীন ঘটনাধারা আর গুরত্বপূর্ণ রচনাকর্ম লইয়া বিচার-বিশ্লেষণ করিতে আমার বিশ্লেষণকর্মে আমি কদাচ অজ্ঞান ধারণাটির প্রয়োজন অনুভব করি না। তথাপি আমি এই ভেদটা দেখাইয়া বলিয়াছিলাম: অবশ্য আমার প্রয়োজন হয় জ্ঞানহীন ধারণার। অজ্ঞান অংকুর ইতি আদি তো আছেই; কী কী উপায়যোগে ব্যক্তি নিজের হিসাব পেশ করিতেছে আমি তো তাহা বুঝিতে পারি না–আর, আমি তো বলিয়াছি, ইহা মনোবিশ্লেষণের এলাকা যাহার সহিত আমি মিশিতে চাহি না। কিন্তু দুই ধরনের ঘটনা আছে যাহা, সব ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুসারেই, সামাজিক বলিয়া মনে হয় আর এই সব ঘটনা বুঝিতে হইলে আমাকে অজ্ঞান নয় জ্ঞানহীনের সাহায্য লইতে হয় আমার মনে হইতেছে আপনি বলিয়াছেন অজ্ঞান দশজনের ভাষা ইংরেজি ফরাসি প্রভৃতি যে সকল ভাষায় আমরা কহিয়া থাকি সেই রকম ভাষা।

লাকাঁ
আমি বলিয়াছি ভাষার, ইংরেজি বা ফরাসি ইতি আদির মতন।

গোল্ডমান
কিন্তু এই ভাষা হইতে স্বতন্ত্র? তাহা হইলে তো আমি হাসিব: আমার আর কোন প্রশ্ন রহিল না। সজ্ঞান আমরা যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি এই জিনিস তাহার সহিত যুক্ত।

লাকাঁ
জ্বি, হা।

গোল্ডমান
সঠিক আছে। আমি যদি আপনার কথা ঠিকমতো বুঝিয়া থাকি, দোসরা যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কাটিয়াছে। সজ্ঞান মানে যে স্তরে অজ্ঞান ধারণাটির সাহায্য ছাড়াই আমার চলিয়া যায় সেই স্তরে কয়েকটা। প্রক্রিয়ার সহিত তুলনা দিবার মতন কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যায়। পাসকাল, হেগেল, মার্ক্স ও সার্ত্র হইতে শুরু করিয়া বলিতে এমন কিছু জিনিস আমরা জানি যাহা অজ্ঞানের তোয়াক্কা করে না: প্রভেদের সঙ্গে এই ধ্রুবগুলি যোগ করিয়া মানুষ কী তাহার সংজ্ঞা দেওয়া চলে। পাসকাল বলিয়াছেন: ‘মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াইয়া গিয়া কেহ’ (dépasse l’ homme) কিছু করে না। অজ্ঞানের দোহাই না দিয়াও বলা চলে, এই ফাঁকটুকুর সাহায্য ছাড়া ইতিহাস কিংবা গতিবিদ্যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সজ্ঞান মনের স্তরে আমি যে দোসরা ঘটনার দেখা পাই: সজ্ঞান মন যতখানি কর্মকাণ্ডের সহিত সংযুক্ত ততখানি বলিতে–কী জিনিস তাহা মনে তাহার অঙ্গীভূত ধ্রুব মানে অসাড় দ্রব্যের সাহায্য ছাড়া এবং এই ধ্রুবসকল সহিত প্রভেদের সংযোগ না ঘটাইয়া বলা যাইবে না। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা একাধিক হইলে তৎক্ষণাৎই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। ধ্রুববস্তুর অঙ্গসংস্থানের সহিত কর্মের ঘনিষ্ট সংযোগ। ইহার কারণেই প্রভেদের মধ্যে বিশেষ বিন্যাস সম্ভব হয়। এই বিশেষ মানুষ জন্ম লইবার আগে হইতেই ভাষা জন্ম লইয়াই বসিয়া আছে–এই ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি ইতি আদি) কি শুদ্ধ এর অতিশয়পনা সমস্যার সহিতই যুক্ত? এই সম্বল, ভাষা আর এই অসাড় দ্রব্য ছাড়া কোন সহজ মানুষ হইতে পারে না। আমার প্রশ্ন হইতেছে: এই সম্বলবাদ আর তাহার নানান হেরফের কি মাত্র এই অতিশয়পনা, এই অজ্ঞান আর বাসনারই আত্মীয়, নাকি ইহার সহিত কাজ নামে পরিচিত কোন কিছুর বাহিরে দুনিয়ার রূপান্তর এবং সমাজ জীবনেরও আত্মীয়তা আছে? আর আপনি যদি এইগুলির সহিতে আত্মীয়তার কথাও মানিয়া লয়েন তো একটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠে: যুক্তিটা কোথায়, বুঝিবার উপায়টা কই? মানুষ মানে কেবল সবটাকে এক করিবার আশা, আমি ইহা প্রত্যয় করি না। আমি সেইদিনও বলিয়াছি আমরা এখনও একটা মিশাল অবস্থার মুখামুখি হইতেছি। তবে মিশালটি বুঝিতে হইলে ইহার অংশ অংশ আলাদা করিতে হইবে, না করিলে চলিবে না।

লাকাঁ
আর আপনি কি মনে করেন এই স্রোতে আঁকড়াইয়া ধরিবার মতন ‘নোঙ্গর ঘাট’ যাহা পাওয়া যায় তাহার মধ্যে এই কাজও পড়িতেছে?

গোল্ডমান
আমি মনে করি সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষেও বলিতে হইবে মনুষ্যজাতি কিছু ভারি কাজের মতো কাজ করিয়াছে।

লাকাঁ
আমার মনে হয় না ইতিহাসের বই খুব একটা নিয়মবাঁধা বই। এই বিখ্যাত ইতিহাস, যাহাতে কোন ঘটনা অতীত হইয়া গেলে সকলেই সবকিছু এত ভাল করিয়া পায়, তাহা এমন কোন বাগদেবী নহে যাহার ঘরে আমার আস্থা রাখিতে পারি। এমন এক জমানা ছিল যখন–এই যেমন বসুয়ে যে যুগে লিখিতেছেন সেই যুগে ক্লিও খুব বড় গুরুত্বের দাবিদার লোক ছিলেন। হয়তো আবার আগের মার্কসের যুগে। তবে ইতিহাসের ঘরে আমি শুদ্ধ বিস্ময় পাইতে চাই। এই মত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টায় আমি সফল হই নাই, যদিও আমি প্রচণ্ড চেষ্টা করিয়াছি। আপনি যে সকল স্থানাংক দিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন আমি সেইগুলির সাহায্যে নয়, অন্য স্থানাংকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করি। বিশেষ বলিতে, কাজের সমস্যাটিকে এই স্থলে আমি সম্মুখের সারিতে বসাইব না।

শার্ল মোরাজে
আজিকার আলোচনায় সংখ্যার জন্ম কী করিয়া হয় তাহার ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গোল্ডমান সাহেবের উত্তর দিতে গিয়া বলিব, আমি যখন ইতিহাস পড়ি তখন আমি ভরসা রাখি এই একই সংখ্যার জন্মের উপর, মনে করি ইহারাই সবচেয়ে নিরেট অখিল জগত। ইহার মুখামুখি অবস্থায় দাঁড়াইয়া আমি একটা প্রশ্ন করিতে চাহিতেছি, উদ্দেশ্য আমরা যাহা যাহা সত্য বলিয়া অনুমান করিয়া লইতেছি তাহা আসলেই এক না ভিন্ন তাহা পরখ করিয়া দেখা। আমার মনে হয় বক্তৃতার শুরুতে আপনি কহিয়াছেন যে আপনার কাছে সজ্ঞান মনের গঠন ভাষার মতন, আবার শেষদিকে আপনি কহিলেন, অজ্ঞান মন ভাষার আকারে গঠিত। আপনার এই দ্বিতীয় প্রস্তাবখানি যদি সঠিক হইয়া থাকে, তবে আমার বক্তব্যও তাহাই।

লাকাঁ
অজ্ঞান মনই ভাষার আকারে গঠিত–এই বক্তব্যের হেরফের আমি কখনই করি নাই।

রিচার্ড ম্যাকসি
এই অধিবেশন বাবদ যে পরিমাণ ভুলবোঝাবুঝি (méconnaissances) আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, হইতে পারে তাহার সবটুকুই আমরা ইহার ভিতর খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। তাহার পরও আপনি ফ্রেগে আর রাসেলের যে দোহাই দিলেন তাহার প্রভাব আপনার ভাববাদে (ontology) (বা নিদেনপক্ষে আপনার ভাবজগতে) কেমন পড়িয়াছে তাহা লইয়া আমার এখনও একটু ঘোর থাকিয়া গেল। উদাহরণ দিতেছি, আপনি গণিত হইতে যে উদাহরণ দিলেন তাহার একটা অর্থ হইতে পারে আপনি অখিল জগতবাদ প্রস্তাবের চরম ভাষ্যে বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন এইখানেই। সম্পূর্ণ বর্ণনা অসম্ভব হইলে অখিল জগৎ ধ্বসিয়া পড়িবে এই যুক্তি আমাকে বিচলিত করে না। কারণ গোয়ড়েল (Gödel) নিজেই বলিয়াছেন তিনি অখিল জগৎবাদে আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন এই উপপাদ্যের অর্থ আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে সম্বলবাদের প্রকাশক্ষমতার গোড়াতেই একটা সীমা আছে। আমি মনে করি যুক্তিওয়ালা প্রস্তাবটাই বরং গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের লেখকগণ যদি কয়েকটি সেটের বিশেষ সেট বলিয়া স্বাভাবিক সংখ্যার সংখ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তবে–প্রসারতত্ত্বে যে সকল ভাষাপারের ভাষাসংশ্লিষ্ট (metalanguage) গণ্ডগোল বাধে তাহার কথা ছাড়িয়াও বলা যায়–আমরা পাল্টা বলিতে পারি তাহাদের সিদ্ধান্তটা মনগড়া, কারণ সেটতত্ত্বে–মানে যে সেটতত্ত্ব প্রকারতত্ত্বের ভিতে দাঁড়াইয়া নাই–তাহাতে উদাহরণস্বরূপ যে সেটের একমাত্র সংখ্যা খিল সেট, ইতি আদি ক্রমে তাহাই ‘এক’ সংখ্যার সংজ্ঞা বলা যাইতে পারে যাহার বলে স্বাভাবিক সংখ্যার প্রচলিত ধর্ম অক্ষুণœ থাকে। সুতরাং আমরা সওয়াল করিতে পারি কোন সেটটিতে ‘এক’ সংখ্যা হয়? কয়েক মাস আগে পল বেনাসেরাফ (Paul Benacerraf) এই ধারার যুক্তিকে আরো টানিয়া নিয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন স্বাভাবিক সংখ্যার অনপনেয় ধর্ম আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে এই সংখ্যা পুনরাবৃত্তিভিত্তিক প্রগমন বটে। সুতরাং এই নিয়মতন্ত্রে না হয়, ঐ নিয়মতন্ত্র যাহাতে এই প্রগমন সম্ভব তাহাতেই কাজ চলিবে। এই নিয়মতন্ত্রের ধর্ম মিলিতেছে বিশেষ সংখ্যার দাগে নহে, বরং আত্মীয়পরম্পরাভক্ত, নিষ্কায়া গঠনে (অঙ্গীভূত অসাড় দ্রব্যে নয়)। অখিল জগতবাদী (realist) প্রস্তাবমাত্রই যাহা দাবি করেন সেই প্রস্তাব অর্থাৎ সংখ্যা ও ভাব বা অবশ দ্রব্য মাত্রই সমান (আর এক জাতীয় ধারণাপন্থী বা নামকাওয়াস্তে গঠনতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখায়) কথাটি এই হামলার মুখে পড়িতেছে।

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site