Showing posts with label তত্ত্ব. Show all posts
Showing posts with label তত্ত্ব. Show all posts

Sunday, April 8, 2012

কষ্টে শুকিয়ে যাওয়া এক সাগর


কষ্টে শুকিয়ে যাওয়া এক সাগর

কত কষ্টে একটি সাগর শুকিয়ে যায় ?
প্রবাদ আছে – “ অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়” ।
বিশ্বজুড়ে স্বার্থপর মানুষদের কল্যানে প্রবাদটি একটু পাল্টে বলতে হচ্ছে – “ অপরিনামদর্শীরা যেদিকে চায়, সাগরও শুকিয়ে যায়” ।
আর আমরা অভাগাকুল তার শাস্তি ভোগ করি প্রতিবাদহীন ।শুধু রুষে ওঠে প্রকৃতি ।

১৯৮৫ সালের উড়াল সাগর, আকাশ থেকে তোলা ।

আকাশ থেকে ১৯৯৭ সালের দৃশ্য
মহাকাশ থেকে তোলা ২০০৯ সালের উড়াল সাগর

কত দুঃখ নিয়ে একটি সাগর শুকিয়ে যায় ?
পৃথিবী নামের এই গ্রহটির পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়ঙ্কর একটি ট্রাজিক সত্য এটি ।
অরাল নামের সাগর এক । আমরা ডেকেছি “উড়াল সাগর” বলে । এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নের কাজাখাস্তান আর উজবেকিস্তানের মাঝখানে টলটলে পানিতে ভরা একটি লেক ।এতো বিশাল যে সাগর নামেই তাকে ডাকার যোগ্য সে । তার “অরাল” নামটির অর্থ “দ্বীপের সাগর” (Sea of Islands) । আসলেই মুক্তোর মালার মতো ১৫৩৪ টি দ্বীপ ছিলো এর বুকে একদিন । আজ জল-স্থল সব একাকার ।


আটষট্টি হাযার বর্গকিলোমিটার (২৬,৩০০ বর্গমাইল) এলাকা নিয়ে একদিন অরাল ছিলো পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম লেক । “আমু-দরিয়া” আর “সির-দরিয়া” নদীর বয়ে আনা পানিতে তৈরী হয়েছিলো তার টলটলে শরীর । বসতি ছিলো তীরে , ছিলো জেলেদের হৈ-হৈ । শিশুদের হুড়োহুড়ি । বাতাসে ছিলো মাছের আঁশটে গন্ধ ।বন্দরে বন্দরে ছিলো মাছ ধরা জাহাজের আনাগোনা ।
আজ নেই – আজ তার বুকে শুধু ধূঁ-ধূঁ বালুচর । রূপোলী জলে আর চিকচিক করে ওঠেনা মাছেদের বুক । ভাসেনা পাল তোলা নাও ।



উড়াল সাগরের বুকে হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকা কালের স্বাক্ষী । কাজাখাস্তান ।

আমু-দরিয়া আর সির-দরিয়া’র ভালোবাসা থেকে লোভী মানুষেরা তাকে বঞ্ছিত করে রেখেছে । প্রিয়া অদর্শনের কষ্টে শুকিয়ে গেছে সে । এখোন সেখানে কেবল মৃত্যুই খেলা করে যায় । বাতাস তার ভারী হয়ে আছে দূর্গন্ধে । একদিন তার নরোম বুক চিরে , ঢেউ তুলে যে জলযান সাঁতরে বেড়াতো এ বন্দর থেকে সে বন্দরে আজ তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ধুঁ-ধুঁ বালুর বুকে এক রিক্ত হাহাকার নিয়ে ।কালের স্বাক্ষী, মানুষের অপরিনামর্দীতার স্বাক্ষী হয়ে ।

১৯৬০ সাল থেকে উড়াল সাগরের ধুঁকে ধুঁকে মরার শুরু । মাছেদের আঁশটে গন্ধে আসা ঝকঝকে “রুবল” নয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের যে চাই কড়কড়ে “ডলার” । সাদা সোনা চাই তাদের, হোয়াইট গোল্ড । হোয়াইট গোল্ড তুলো চাই তাদের, তুলো । বিশ্বজুড়ে এর চাহিদার শেষ নেই । তাই সোভিয়েত মাটিতে ফলাতে হবে তুলোর গাছ ।লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি জুড়ে যে তুলোর চাষ শুরু করেছে সরকার সেই ১৯৪০ সাল থেকে তাকে তো টিকিয়ে রাখতে জোগাতে হবে জীবন-ধারিনী পানি । তাই আমু-দরিয়া আর সির-দরিয়া’র পানি বইলো অন্যখাতে ।
[পাঠক, আমাদের সর্বনাশ – ফারাক্কা, টিপাইমুখ ইত্যাদির কথা একবার ভাবুন !]
তাদের স্রোত ধারা ঠেলে দেয়া হলো উজবেকিস্তানের উষর মরুভূমিতে গড়ে তোলা “কটন ফিল্ডে”র জন্যে সেচ প্রকল্পে । সোভিয়েত সরকার বললেন, উজবেকিস্তানের মরুভূমিতে আমরা ফসল ফলাবো – ফলাবো ধান, শষ্য, তরমুজ আর তুলো । যা সোভিয়েত মানুষকে খাদ্য যোগাবে, যোগান দেবে ডলার নামের সোনার হরিন । সোভিয়েত প্রভুরা খুশি । কিন্তু প্রকৃতি হেসেছিলো সেদিন অজান্তে ।
নদীর স্রোত আর গড়ালো না উড়াল সাগরের বুকে । ভালোবাসার উষ্ণ জলের পথ চেয়ে চেয়ে সাগরের বুক গেল শুকিয়ে । পানিতে টান ধরায় লবনের ঘনত্ব গেলো বেড়ে । ২০০৭ সালে এসে উড়াল সাগর শুকিয়ে তার আয়তনের ১০ শতাংশে এসে দাঁড়ালো । একদা সাগরের বুকে গড়ে উঠলো আর এক মরুভূমি । যেটুকু পানি একদা সাগরের পরিচয় ধরে রেখেছিলো তাদের লবনাক্ততা বেড়ে গেলো ভয়ঙ্কর ভাবে। প্রতি লিটারে তার পরিমান গিয়ে দাঁড়ালো ১০০ গ্রামে যেখানে সাধারন সাগরের পানিতে এর পরিমান ৩৫ গ্রামের কম । যেটুকু ছিলো মৎস সম্পদ তা ও শেষ হয়ে গেল । জনস্বাস্থ্যের হুমকি হয়ে দাঁড়ালো আবহাওয়া । গ্রীষ্মকালের গরম উঠলো চরমে, শীত হলো আরো প্রলম্বিত – আরো তীব্র ।মানুষ ভুগতে থাকলো মরুভুমিতে সৃষ্ট বালুঝড়ে । শ্বাসকষ্ট বাড়লো তাদের, বিশেষ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হলো মানুষ । শিশু মৃত্যুর হার বাড়লো । ফসল গেলো ধংশ হয়ে আবহাওয়া আর জমির অতিরিক্ত লবনক্ততার কারনে । ৪০ হাযারের মতো জেলে বেকার হয়ে গেলো । বন্ধ হয়ে গেলো মাসকারাত ( এক ধরনের উভচর রডেন্ট ) থেকে আহরিত “ফার” শিল্প । সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমান দাঁড়ালো ৮০০ মিলিয়ন পাউন্ডে (তৎকালীন হিসাব)।


হালকা আর গাঢ় রংয়ে ধরা পড়েছে উড়াল সাগরের ২০০০ থেকে ২০১১ সালের পরিবর্তীত জলের স্তর । স্যাটেলাইট ছবি ।

এর মধ্যেই বিশাল লেকটি শুকিয়ে শুকিয়ে মরুভূমি জেগে উঠলো আর ভাগ হয়ে গেল চারটি ছোট্ট ছোট্ট পানির ধারায় – উত্তর উড়াল সাগর , দক্ষিন উড়াল সাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম বেসিন এবং এর উত্তর আর দক্ষিনের মাঝখানে আরো ক্ষুদ্র একটি জলাশয় হিসেবে । ২০০৯ সালে দক্ষিন উড়াল সাগরের পূব অংশটি মুছে গেলো পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আর পশ্চিম অংশটি সরু একটি নালী হয়ে কোনও মতে টিকিয়ে রাখলো দক্ষিন উড়াল সাগরের নাম । আর বেঁচে থাকা উত্তর উড়াল সাগরের সর্বোচ্চ্ গভীরতা ঠেকলো গিয়ে মাত্র ১৩৮ ফুটে ।
হ্যা, আজ উজবেকিস্তান বিশ্বের প্রথম সারির তুলা রফতানীকারক একটি দেশ ।তুলোর তৈরী সুতোয় হয়তো মানুষের আব্রু ঢেকেছে কিন্তু প্রকৃতি যে উলঙ্গ হয়ে গেলো তার খোঁজ কে রাখে !
তুলা চাষের জন্যে সোভিয়েত সরকারকে সেই ১৯৪০ সাল থেকেই সেচ ব্যবস্থার কথা ভাবতে হয়েছিলো । কিন্তু সেচের খালগুলি ছিলো খুব অপরিপক্ষ ভাবে নির্মিত । এ থেকে পানি শুষে নিত মাটি, রোদের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যেতো । এই সেচ প্রকল্পের অর্ন্তভূক্ত মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম কারাকোরাম ক্যানালের ৩০ থেকে ৭৫% পানিই এভাবে অপচয় হয়ে যেতো । এইসব কারনেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হয়েছিলো বিকল্প কিছু । তাই ১৯৬০ সালে গৃহীত হয় নতুন ইরিগেশান প্রোজেক্ট যাতে আমু-দরিয়া আর সির-দরিয়ার পানিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সেচের খালগুলিতে ।
প্রতি বছর ২০ থেকে ৬০ ঘন কিলোমিটার পানি উড়াল সাগরের পরিবর্তে গিয়ে পড়লো সেচের খালগুলিতে । ফলে হতভাগী উড়াল সাগরের পানির উচ্চতা হ্রাসের পরিমান বেড়ে যেতে থাকলো হু হু করে । প্রতি বছর এখোন এই উচ্চতা হ্রাসের হার ৩১ থেকে ৩৫ ইঞ্চি । কেবলমাত্র ১৯৮০ সালের মধ্যেই উড়াল সাগর থেকে যে পানি হারিয়ে গেলো তার পরিমান লেক “ইরি” আর লেক “অন্টারিও” তে যতো পানি আছে তাদের সমান ।
হয়তো প্রয়োজনেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষকে প্রকৃতির বিরূদ্ধে যেতে হয়েছিলো কিন্তু তার জন্যে তাকে খেসারত দিতে হয়নি কম । আবহাওয়া চরমপন্থী হয়ে গেছে সেখানে । উজবেকিস্তানে আজ কেবল ১২% সেচের খাল ঠিকমতো পানি বয়ে নিতে পারে মাত্র ।
আর তাই মানুষ সৃষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয়ের উদাহরন এটি ।
১৯৬৪ সালে তাই হয়তো সোভিয়েত হাইড্রোপ্রোজেক্ট ইনিস্টিটিউট এর আলেক্সান্দর আসারীন আঙ্গুল তুলে দেখিয়েছেন - "It was part of the five-year plans, approved by the council of ministers and the Politburo. Nobody on a lower level would dare to say a word contradicting those plans, even if it was the fate of the Aral Sea.”
পরিবেশ বিপর্যয়ের এই পরিনতি জানতেন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষও । সাফাই গাইতে কিছু কিছু সোভিয়েত বিশেষজ্ঞরা বলে বসলেন “ অরাল সী ইজ আ ন্যাচারাল এরর ।”
কেউ একজন আগ বাড়িয়ে বললেন , “it is obvious to everyone that the evaporation of the Aral Sea is inevitable.”
তার পরেও অবশ্য সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ উড়াল সাগরকে জীবিত রাখতে তাদের পাঁচশালা সেচ পরিকল্পনায় একে “রি-ফিল” করার প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন । কিন্তু রাশান মূল ভুখন্ডের মানুষদের বিরোধীতা আর খরচের কথা বিবেচনা করে এই প্রোজেক্ট ১৯৮৬ সালে বাতিল করে দেয়া হয় ।
পরের ইতিহাস - ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে । ২০০২ সালে উজবেকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের ( ইউকে) রাষ্ট্রদুত ক্রেইগ ম্যূরে সমস্ত ব্যাপারটিকে বর্ননা করেছেন এভাবে, উজবেকিস্তানের প্রধান নিয়ন্ত্রক ইসলাম কারিমভ জমিকে শোষন করার সোভিয়েত ষ্টাইলের অর্থনীতি এবং দর্শন থেকে দূরে সরে থাকতে পারতেন স্বাধীনতার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে কিন্তু তিনি তা না করে সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছেন কেবলমাত্র নিজের ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করতে ।
উড়াল সাগর শুকিয়ে যাওয়ার জন্যে তিনি দায়ী করেছেন কারিমভের “কটন পলিসি”কে । বলেছেন, সরকার যে সেচের জন্যে এতো বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে তা বিশাল একটি অপচয়, কারন সে জল তুলো চাষের জমিতে পৌঁছানোর আগেই বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে । এখানে কোনও “ক্রপ রোটেশান” এর ব্যবস্থা নেই । এইসব পতিত জমিতে তুলো চাষের জন্যে যে পরিমান রাসায়নিক সার আর কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে তা ধুঁয়ে গিয়ে পড়ছে শুকিয়ে যাওয়া উড়াল সাগরে ।এতে নষ্ট হয়ে গেছে পানি, হচ্ছে পরিবেশ দূষন আর জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি । গণযুদ্ধের পূর্ববর্তী যুক্তরাষ্ট্রের দাস-প্রথার সাথে তুলনা করে তিনি আরো বলেছেন, এখানে জবরদস্তি শ্রম ব্যবহৃত হয়েছে অথচ সমুদয় লাভের টাকা পাচার হয়েছে ক্ষমতাধারীদের দ্বারা ।জনগণ যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে আজেো ।
আর অন্যদিকে কাজাখাস্তানে তুলো চাষটি ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে ।

দিন দিন শুকিয়েছে উড়াল সাগরটি । সব হিসেব নিকেশ শেষে টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের । কাজাখাস্তানের দিক থেকে বাঁধ তৈরী করে উত্তর উড়াল সাগরটিকে কিছুটা হলেও জলবতী করা গেছে ।২০০৫ সালে শেষ হওয়া এই বাঁধের কল্যানে ২০০৮ সালের মধ্যে এতে পানির উচ্চতা বেড়েছে ৭৯ ফুট । কমেছে লবনাক্ততা । দেখা যাচ্ছে মাছেদের রূপোলী ঝিলিক ।
উজবেকিস্তানের টনক নড়েনি । তাই শুকিয়ে যাওয়া দক্ষিন উড়াল সাগরটি তার অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে তার বুকে জন্ম দিয়েছে এক বিশাল হাহাকার – “অরালকুম মরুভূমি” ।

উড়াল সাগরে জেগে ওঠা মরুভূমিতে ধূলিঝড়, মার্চ ২০১০ ।

যদিও বুকের নীচে তিরতির করে বয়ে চলা “গ্রাউন্ড ওয়াটার” তার তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি । তেমন করে ভেজাতে পারেনি তার শুকিয়ে যাওয়া বুক ।পামির মালভুমি আর তিয়ানশান পর্বতমালায় জন্ম নেয়া এই ভূগর্ভস্থ জল সারাটা পথ বেয়ে গোপনে গোপনে তার বুকের তলদেশে খানিকটা অশ্রূ জমা করে রেখেছে শুধু । এইটুকু সম্বল নিয়ে বেঁচে আছে সে আজো এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
প্রকৃতি যে নিঠুর প্রতিশোধ নিতে পারে উড়াল সাগরের উদাহরন তাই ই । এটাকে বলা হয় "one of the planet's worst environmental disasters" । মানুষ বুঝেছে কি করেছে তারা ।
নিজেদের প্রয়োজনেই মানুষকে আবার ভাবতে হয়েছে । স্বার্থ জড়িত, তাই ১৯৯৪ সালে কাজাখাস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান আর কিরঘিজিস্তান এক বৈঠকে সম্মত হলেন যে তারা তাদের বাজেটের ১% ব্যয় করবেন সাগরটিকে ফিরিয়ে আনার খাতে । ২০০০ সালের মার্চে হেগ এ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরাম এ ইউনেষ্কো উপস্থাপন করলেন তাদের " Water-related vision for the Aral Sea basin for the year 2025 " এ দলিলটি । কাজের কাজ কিছু হলোনা । সমালোচনা হলো এই বলে , এটি একটি অবাস্তব কিছু এবং এতে লেকের কাছাকাছি জনগণের বিশেষ করে উজবেক এলাকার জনগণের স্বার্থের দিকে সুনজর দেয়া হয়নি ।
তবুও ২০০৬ সালের মধ্যে বিশ্ব-ব্যাংকের সহায়তায় চলা “রেস্টোরেশান প্রজেক্ট” এর সুবাদে উত্তর উড়াল সাগর অনেকটা সামলে উঠতে পেরেছে । যা হওয়ার কথা ছিলো তা হয়নি । কারন এলাকা ভিত্তিক জলবন্ঠনের হিস্যা আলাদা করে দিয়েছে তাদের । বাঁধের জলে গড়ে তোলা হাইড্রো-ইলেক্ট্রিক এনার্জী নিয়ে আঞ্চলিক টানাটানি হয়েছে কম নয় । তাই ভেস্তে গেছে সব । কথা উঠেছে, কেবল শাসক শ্রেনীই এই প্রোজেক্টের নকশা প্রনয়নকারী যেখানে ভুক্তভোগী জনগণের মতামত নেই কোথাও ।

রূদ্র আবহাওয়ার কারনে মমিতে পরিনত কার্প। ২০০৫ এর আগষ্টে তোলা ।

এর পরেও আছে আরো কিছু । নিজেদের ঘাড়ে জোয়াল পড়লে তখন টানতেই হয় । তার আগে নড়েচড়ে বসেনা কেউ ।
২০১০ সালের জুলাইয়ের শেষ হপ্তায় স্মরনকালের বৃহৎ বন্যায় যখোন ভাসলো পাকিস্তান তখন আরো নড়েচড়ে বসলো পাকিস্তানের ইসলামাবা ভিত্তিক Sustainable Development Policy Institute (SPDI) নামের থিঙ্ক ট্যাংকের লোকজন । আগে থেকেই তারা মধ্য এশিয়াতে বৈরী আবহাওয়ার কারনে সৃষ্ট সমস্যাগুলি যেমন জলবন্ঠন, আবহাওয়া, অর্থনীতি আর জ্বালানী ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করছিলেন ।উড়াল সাগরের শুকিয়ে যাওয়াতে এই এলাকাতে অর্থনৈতিক আর আবহাওয়াগত যে বৈষম্য তৈরী হয়েছে তা খতিয়ে দেখছিলেন তারা ।তারা দেখলেন, উড়াল সাগর উড়ে যাওয়াতে যে বৈরী আবহাওয়া তৈরী হয়ে গেছে তা কোনও রাজনৈতিক সীমানা মানেনি । তার করাল থাবা পড়েছে মধ্য এশিয়াতেও ।এর উদাহরন টেনে আন্তর্জাতিক আইন আর সুস্থ্য চিন্তার আলোকে তারা ইস্যু তুললেন, এ এলাকার জল সম্পদের সুষম বন্টনের ।তারা বোঝালেন , উড়াল সাগরকে আবার জলবতী করা ছাড়া মধ্য এশিয়াতে শান্তি আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবেনা । তারা নিজের দেশ পাকিস্তানের কথা মাথায় রেখেই এতোদিন বলে এসেছিলেন কথাগুলো । বন্যার কারনে তা আরো সোচ্চার হয়েছে মাত্র । মাত্রা পেয়েছে ভিন্ন । দক্ষিন উড়াল সাগরকে “রি-ফীল” করার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন তারা ।
কে জানে, কবে আবার শুকিয়ে যাওয়া উড়ালের বুক চিরে ভাসবে জেলেদের নাও । উড়ন্ত পাখীরা ছুঁয়ে যাবে উড়ালের জল ।

পাদটীকা -
আমরাও কি এমোন একটি সত্যিকার দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিনা ! উড়ালের তীরে তীরে বসবাসকারী অসহায় মানুষগুলির মতো আমরাও কি দেখতে থাকবো শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে এখোনও ধীরে বয়ে চলা আমাদের নদীগুলো !
শুধু দেখেই যাবো………… ……………..

read more

Saturday, January 21, 2012

জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার উত্তরাধুনিক অবস্থা*

by আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি

আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো সবচেয়ে উন্নত সমাজের জ্ঞানের অবস্থা পর্যালোচনা করা। ‘উত্তরাধুনিক’ কথাটা আমি ব্যবহার করবো অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে। শব্দটি মার্কিন মুল্লুকের সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকরা lyotard.jpg……..
জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার (১৯২৪-১৯৯৮)
…….
আকছার ব্যবহার করেন। এটি ব্যবহার করা হয় আমাদের সংস্কৃতির সেসব পরিবর্তন বোঝাতে যেগুলো উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগ থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার মূল-নিয়ন্ত্রক সূত্রগুলো (Game rules) পাল্টে দিয়েছে। আমার লক্ষ্য হলো এ-পরিবর্তনগুলোকে আখ্যান (Narratives) রচনার সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা।

বিজ্ঞানের সঙ্গে আখ্যানের সবসময়ই দ্বন্দ্ব চলছে। বিজ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে অধিকাংশ আখ্যানই রূপকথায় পরিণত হবে। কিন্তু যখন বিজ্ঞান কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুনগুলো উল্লেখ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-থেকে সত্যের খোঁজ করে, তখন নিজের নিয়ম-কানুনগুলোকে (game rules) সে বৈধতা দেয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। ফলে তার অবস্থানকে বৈধতা দেয়ার জন্যে একটি প্রতর্কের (Discourse) জন্ম দেয় যার নাম ‘দর্শন’। ‘আধুনিক’ কথাটাকে আমি ব্যবহার করবো সেইসব বিজ্ঞানকে বোঝাতে, যারা অন্য একটা মেটাডিসকোর্স/‘বড়-গল্পে’র (Metadiscourse) মধ্যে দিয়ে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেয়। মেটাডিসকোর্সগুলো কোনো না কোনো ধরনের মহা-আখ্যানের (Grand Narrative) দোহাই দিয়ে এসব বিজ্ঞানের বৈধতায় মদদ দেয়। যেমন, দ্বান্দ্বিক-যুক্তিবাদ (Dialectics of Reason), শব্দার্থের তাফসীর (Hermeneutics of Meaning), যুক্তিবাদী কিংবা পেশাধারী প্রজার (Working Subject) মুক্তির স্বপ্ন অথবা সম্পদ-সৃষ্টির মহা-আখ্যানগুলোর দোহাই প্রায়ই দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোন বক্তব্য লেখার ক্ষেত্রে প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সত্যাসত্য নিয়ে ঐকমত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন দুজনই যুক্তি-বুদ্ধি সম্পন্ন; এটি হলো একটি এনলাইটেনমেন্টের আখ্যান। যেখানে জ্ঞানের নায়ক কাজ করে একটি সু-নীতি ও সু-রাজনীতির পক্ষে, বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে। উল্লিখিত নমুনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, এমন মহা-আখ্যান যদি ইতিহাস চিন্তায় আরোপিত হয়ে জ্ঞানকে জায়েয করার কাজ করে, তখন সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এগুলোকে অবশ্যই বৈধ হতে হবে। এভাবেই মহা-আখ্যানের কাছে সত্যের মতো ন্যায় বিচারও হাত-পা বাধা।

সোজাভাবে বললে, ‘উত্তরাধুনিকতা’কে এক কথায় মহা-আখ্যানের (Metanarratives) বৈধতার বিষয়ে সন্দেহ বলা চলে। নিঃসন্দেহে এ প্রশ্ন বিজ্ঞানের প্রগতিরই একটি ফল, তবে এ-প্রগতিও কিন্তু নিজেকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করে। বৈধতা প্রতিষ্ঠার মহাবয়ানের কল-কব্জাগুলো (Apparatus) লক্ষণীয়ভাবে অধিবিদ্যক-দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আস্থা রেখেছিলো অনেক আগে থেকেই। আর তখন আখ্যান-কর্ম তার কামলাদের হারাতে শুরু করেছে; মহা সব নায়ক, সংকট, অভিযান, লক্ষ্য–এর সব কিছুকেই। প্রতিটি আখ্যানের ভাষার মেঘমালায় এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে–আখ্যানমূলক অথচ প্রতীকী, বিধানসমেত ও বর্ণনামূলক। যে স্তরগুলো নানান চাহিদাকে সামাল দেয়ার জন্যেই তৈরি হয়েছে। আমরা এগুলোর ছেদবিন্দুতে বসবাস করি। যাই হোক, আমরা ভাষা ও সম্পদের (মেকী) ভারসাম্য রক্ষা করতে চাই না।

এভাবেই ভাবি সমাজ নিউটনীয় নৃবিজ্ঞানের (যেমন কাঠামোবাদ অথবা বিষয়ভিত্তিক তত্ত্ব) চেয়ে বরং ভাষার প্রয়োগতত্ত্বের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। ভাষার নানা খেলার (Game) মধ্যে পরস্পরবিরোধী উপাদান বিদ্যমান। এরাও প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, তবে বিক্ষিপ্তভাবে–স্থানিকতায় বা লোকাল ডিটারমিনিজমের মধ্যে।

সমাজপতিরা কিন্তু সমাজায়নের মেঘগুলোকে দেয়া-পাওয়ার ছকে সামলাতে চান, তারা ভাবেন, তাদের চিন্তা ও যুক্তি সমগ্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এরাই আমাদের জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয়, তাতে ক্ষমতার জাল বিস্তারে সুবিধা হয়। সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও বৈজ্ঞানিক সত্য উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বৈধকরণের রাস্তা কিন্তু একই। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ও সুনিপুণ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা। এ ক্রীড়ার প্রয়োগে খানিকটা সন্ত্রাসেরও প্রয়োজন পড়ে–কঠোর বা নরম, প্রকাশ্যে বা গোপনে। সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার যুক্তি নিঃসন্দেহে নানান দিক থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ, বিশেষ করে আর্থ-সামাজিকতার পরস্পরবিরোধী প্রেক্ষাপটে, যখন সে বেশি বেশি কাজ দাবি করে অথচ সময় দেয় কম।

এ ধরনের অসামঞ্জস্যের মধ্যে আমরা মুক্তি আশা করতে পারি না, যেমনটা মার্কস করেছিলেন। সন্দেহ বলতে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি।

এখনও উত্তরাধুনিক দুনিয়া (Postmodern Condition) নির্মোহ আগন্তুকের মতো সবকিছু বাতিল করার মূঢ়তা দেখায় না, কিংবা অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়ার ব্যাপারেও গোড়া নয়। তাছাড়া মহা-আখ্যানগুলোর পর বৈধতার জন্যে আর খালি জায়গা কই? দৈনন্দিন কার্য-প্রণালী কৃৎকৌশলের ব্যাপার মাত্র, যার সাথে ন্যায্যতা ও সত্যাসত্য বিচারের কোনো যোগ নাই। বৈধতা কি শুধুমাত্র আলাপ-আলোচনার ঐকমত্যের মধ্যেই পাওয়া যাবে; যেমনটা য়ূরগেন হাবেরমাস (Jürgen Habermas) ভাবেন? এমন মতৈক্য ভাষার পরস্পরবিরোধী খেলাকে স্তব্ধ করে দেয়। আর তর্ক ছাড়া কোনো আবিষ্কার আবিষ্কার হয় না। উত্তরাধুনিক জ্ঞান কোনো ক্ষমতাবানের (Authorities) হাতিয়ার নয়। বরং পার্থক্যগুলোকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে, কাজেই ভিন্নতার প্রতি আমাদের সহনশীল হতে বলে। তাই আমাদের মূলনীতি গবেষকদের সমরূপতায় নয় বরং তাদের বিচিত্রতায় নিহিত।

তাহলে প্রশ্ন হলো : সামাজিক বন্ধন কিংবা ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা কি পরস্পর বিরোধী বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সম্ভব? তাহলে এ ধরনের অসামঞ্জস্যের কী হতে পারে?…

উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগে যেসকল চিহ্নের মাধ্যমে বিজ্ঞান-নির্ভর-জ্ঞানের ‘সংকট’ ধরা পড়েছে, সেগুলো কিন্তু তার বুদ্ধির কারণে ধরা পড়েনি বরং কৃৎকৌশল ও পুঁজিতন্ত্রের বিস্তারের কারণেই তা হয়েছে। এটি জ্ঞানের বৈধতার জমিনে অন্তর্গত ক্ষয়কেই প্রকাশ করে। ভাবনামূলক ক্রীড়ার (speculative game) একেবারে অন্দরমহলেই পচন। তার প্রতিটি খোপের ঠাঁস বুনটের জাল উত্তরাধুনিকতা হালকা করে দেয়।

ধ্রুপদী বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রের ভেদরেখা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষেত্রগুলোর সীমানা ভাঙতে শুরু করেছে, সীমানাগুলো একাকার হয়েছে, ফলে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। শিক্ষার প্রাধান্য পরম্পরা (Hierarchy) ভেঙে চোখের সামনে ‘সমতল’ পরিসরকে উন্মুক্ত করে। অথচ প্রতিটি খোপ নিয়তই আবর্তনশীল। পুরোনো ‘জ্ঞানের অনুষদগুলো’ টুকরো টুকরো হয়ে নানান প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লেগে গেছে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাবনামূলক জ্ঞানের বৈধতা হারিয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্লজ্জ গবেষণা (যা ভাবনামূলক-আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত) নিজেকে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের ধারার কাছে সঁপে দিয়েছে। আর শেখানোর ছলে চিন্তাশীল-গবেষক তৈরির বদলে বক্তৃতাবাজ প্রফেসরদের প্রতিকৃতি তৈরি নিশ্চিত করেছে। এ ব্যাপারটিকেই নিৎশে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ও নিন্দা করেছেন।

বৈধকরণের অন্য একটা ক্ষয়িষ্ণু জায়গা হলো, মুক্তির হাতিয়ার প্রশ্নে এনলাইটেনমেন্ট ভাবনামূলক প্রতর্কের (speculative discourse) সাথে বড় কোনো তফাৎ দেখাতে পারেনি। যদিও নানা দিকে সে দৃষ্টি দিয়েছে। সামাজিক, নৈতিক ও রাজনীতির অনুষদগুলোর বিচিত্র সংলাপের ভেতর বিজ্ঞান তার সত্যতার বৈধতা খুঁজে পায়। বৈধতার এ-ধরনের বিন্যাসের ঘূর্ণায়মান বিপদ সম্পর্কে একটু আগেই আমাদের ধারণা হয়েছে যে, সংখ্যা দিয়ে লেখা কোন সমীকরণ ও যুৎসই কোনো বাক্যের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ফলে তারা পরস্পর তুলনাযোগ্য। যদি একটি বাক্য বাস্তব অবস্থাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে আনে সেখানে নিতান্তই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিফলন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন হলে বাড়তি আর কী প্রমাণের দরকার পড়ে?

উদাহরণস্বরূপ, একটা বন্ধ দরজার কথা বলা যায়। যুক্তিমতে ‘কপাট বন্ধ’ ও ‘কপাট খোলা’–এ দু’টি কথার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নাই। বাক্য দুটো স্বতন্ত্র ধারাবিধির মধ্যে পড়ে যার প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন রকমের। এখানে একদিকে তাত্ত্বিক ও অন্যদিকে ব্যবহারিক যুক্তি–এ দুটো ভাগের ফলে বৈধতার বৈজ্ঞানিক প্রতর্ক প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। সরাসরি নয় বরং ঘুরতি পথে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পুরো বিষয়টা নিয়ম-কানুন সমেত ভাষার খেলা। যেমন, এক ঝলকে কান্টের আদিশর্তের (a priori) ধারণা। বাস্তব জীবন-যাপন পরিচালনার জন্য বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো কেরামতি নাই। সুতরাং বিজ্ঞানের নিয়ম-কানুনও অন্য সবার সাথে একই কাতারে দাড়িয়ে আছে।

অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়াটি যদি অল্প-বিস্তর চালানো যায় তবে উত্তরাধুনিকতার সম্ভাবনাময় দুয়ার উন্মুক্ত হয় (যেমনটি হ্বিটগেনস্টাইন তার মতো করেছেন, আর মার্টিন বুবার ও ইমানুয়েল লেভিনাদের মতো চিন্তাশীলরা যা করে গেছেন) । বিজ্ঞান তার ছক কাটা খেলাই খেলছে; অন্য সব ভাষার ক্রীড়াকে বৈধতা দিতে সে অপারগ। অন্তত অন্যের প্রতি নির্দেশমালা তো কিছুতেই তার নিয়ম-কানুনের মধ্যে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো সে তার নিজেকে বৈধতা দানে অক্ষম। যদিও ‘দার্শনিক’ ভাবনাগুলো তা-ই মনে করে।

সমাজের প্রজারা ভাষার ক্রীড়ার ব্যবচ্ছেদের মধ্যে নিজেকে গুলিয়ে ফেলে। সামাজিক বন্ধন মানেই ভাষার কারবার, কিছুতেই একটি মাত্র যোগসূত্রের বিষয় নয়। চাদরটা তৈরিতে কমপক্ষে দুটো (আসলে বাস্তবে অগুনতি) আলাদা ধরনের নিয়ম-কানুনের ভাষা দরকার। হ্বিট্গেনস্টাইনের লেখায় : ‘আমাদের ভাষাকে পুরোনো শহরের মতো দেখায়। যেখানে সাদা-কালো, সরু রাস্তা ও চক্কর রয়েছে। রাস্তার দু’ধার দিয়ে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে কয়েক’শ বছরের চিহ্ন এবং পাশাপাশি নতুন ঝকঝকে প্রশস্ত রাস্তা এবং আবাসিক এলাকাও আছে’। তাহলে সবকিছু সমন্বিতকরণের কিংবা জ্ঞানের মেটাডিসকোর্সের আওতায় এসবের সমন্বয় অসম্ভব। তিনি ‘শহর’কে কর্তা হিসাবে বাক্যটা লিখে উল্টো প্রশ্ন করছেন : ‘কতোটা রাস্তাঘাট দালানকোঠা হলে নগরকে নগর বলা চলে?’

পুরোনো ভাষার গায়ে নতুন শব্দ যোগ হয়ে পুরোনো এলাকা শহরতলীতে রূপ নিচ্ছে : ‘রসায়নের প্রতীক এবং ক্যালকুলাসের অসীম চিহ্নের মতো’। আজ পয়ত্রিশ বছর পর এই তালিকায় যোগ করতে পারি: যন্ত্রের ভাষা, নিয়ম-কানুনের তাত্ত্বিক মেট্রিক্স, সঙ্গীতের নতুন নোট, যুক্তি অনির্দেশক চিহ্ন ব্যবস্থা, জীনতত্ত্বের কোড, উচ্চারণ কাঠামোর গ্রাফ ইত্যাদি।

এ ধরনের খুচরা মন্তব্যে আমাদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। এসব ভাষা নিয়ে কেউ কোনো আওয়াজ দিচ্ছেন না, বলছেন না যে সার্বজনীন মহা-ভাষা (Metalanguage) বলে আসলে কিছুই নেই। নিরপেক্ষ কর্তা-ব্যবস্থা (System-Subject) মুখ থুবড়ে পড়েছে, মুক্তির লক্ষ্যের সাথে বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা সবাই ইতিবাচকতার ফাঁদে আটকে গেছি। শিক্ষার খোপীকরণ ও এলেমদাররা যেখানে নিজেদের বিজ্ঞানী ফলাচ্ছেন, গবেষণার কাজ বাক্সবন্দি হয়ে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়েছে ও এমনভাবে ভাগ হয়ে গেছে যে কোনো একজনের পক্ষে সবগুলোর আত্তীকরণ একেবারেই অসম্ভব।ভাবনামূলক কিংবা মানবিক দর্শনকে বৈধতার কাজ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই দর্শন সংকটের মধ্যে পড়েছে। যখনই সে বৈধতার কাজটা করতে গেছে তখনই তাকে কান ধরে যুক্তিবাদ কিংবা চিন্তার ইতিহাসের ফাঁক-ফোকড় খোঁজার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, ফলে তার আত্মসমর্পণ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

গেল শতাব্দির গোড়া থেকে ভিয়েনা সার্কেল এসব নেতিবাচকতার ফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক ছিলো। শুধু মুজেল, ক্রাউস, হফম্যানস্থাল, লুস, সোয়েনবার্গ ও ব্রোচরাই নন, মাখ আর হ্বিটগেনস্টাইনের মতো দার্শনিকরাও এই কাতারে ছিলেন।১০ তারা তাত্ত্বিক ও শৈল্পিকভাবে অ-বৈধকরণের কাজটিকে যতদূর সম্ভব টেনে নিয়ে গেছেন। এ মুহূর্তে আমরা বলতে পারি (মৃত বৈধতার) শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। তাকে আর কবর থেকে তুলে আনার দরকার কী? হ্বিটগেনস্টাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তিনি ভিয়েনা সার্কেলের তৈরী প্রত্যক্ষবাদের (Positivism) দিকে মুখিয়ে থাকেননি।১১ বরঞ্চ অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন ভাষার নিয়ম-কানুনগুলোর বৈধতা তার ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। উত্তরাধুনিক দুনিয়া এটাই বলতে চাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষেরই অবশ্য আখ্যান-স্মৃতিকাতরতার বাতিক আছে। তার মানে এই নয় যে, তারা কোনো না কোনোভাবে বর্বরতার মধ্যে পড়েন। তাদের নিজস্ব আলাপ-আলোচনা, তর্ক ও চর্চার উপলব্ধিগত জ্ঞান তাদের বাঁচিয়ে দিবে। এখান থেকেই কেবল বৈধতার প্রশ্ন উঠে আসতে পারে। বিজ্ঞান অন্যসব বিশ্বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে ‘শ্মশ্রুমণ্ডিত মুচকি হেসে’ বাস্তবতার খট্খটে জমিন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলেছে।১২

* লেখাটি Jean-Francois Lyotard-এর The Postmordern Condition (University of Minnesota Press, 1984) বইয়ের অংশরূপ।

তথ্যনির্দেশ

১. মহা-আখ্যান (Grand Narrative/Metanarrative) : খৃষ্টবাদ, মার্কসবাদ, হেগেলবাদ–এসবই গল্প। আমরা যেমন বলি ‘তুমি আমাকে দারুণ ‘গল্প’ শোনালে’–অনেকটা এই অর্থে গল্প। যেমন খৃষ্টবাদের ‘গল্প’টি কী? আদম-হাওয়া স্বর্গচ্যুত হলেন ‘পাপ’ করে। অতএব পৃথিবীতে পাঠানো হলো ভালো কাজ করে, অনুশোচনা করে, পাপমোচন পর্ব পার হয়ে শেষমেশ স্বর্গ পুনরুদ্ধার হবে। লিওতার বলছেন, এমনিভাবে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ও একটি ‘গল্প’–সবাই যুক্তি মেনে কাজ-কর্ম করবেন, ফলে সমগ্র বিশ্বে শান্তির সু-বাতাস বইবে। –অনুবাদক।

২. ফ্রেডরিখ নিৎশে (Friedrich Nietzsche), রচনাসমগ্র, ‘অন দি ফিউচার অফ আওয়ার এডুকেশানাল ইন্স্টিটিউশানস’ (‘On the Future of our Educational Institutions’) তৃতীয় খণ্ড, ক্রম ৩৫।

৩. মার্টিন বুভার (Martin Buber), ‘ইখ্ উন্ড ডু’ (Ich und Du) বার্লিন : শকেন ফেরলাগ, ১৯২২ (Berlin: Schocken verlag, 1922) এর ইংরেজী অনুবাদ- রোনাল্ড জি স্মিথ [Ronald G. Smith], ‘আই এন্ড দাও’ (I and Thou) (New York: Charles Scribner’s Son’s,1937)], ইমানুয়েল লেভিনা (Emmanuel Levinas), ‘তোতালিত এ এফিনিত’ (Totalite et Infinite) (The Hagie: Niihoff, 1961) ‘মাখ্তিন বুভার উন্ড ডি এরকেন্টনিসথেওরি’ (‘Martin Buber und die Erkenntnistheorie’) (১৯৫৮), ‘ফিলোসোফেন ডেস্ ২০, ইয়ারহুন্ডার্টস্’ (Philosophen des 20. Jahrhunderts)কোলহামার (Kohlhammer), ১৯৬৩, ফরাসী অনুবাদ, ‘মাখ্তিন বুভার এ লা তেওরি দো লা কনেসন্স’ (‘Martin Buber et la theorie de la connaissance’), ‘নম প্রোপ’ (‘Noms Propres), ‘মতো পেইয়ে: ফাতা মখগানা’ (Montpellier: Fata Morgana), ১৯৭৬.

৪. লাড্ভিগ হ্বিট্গেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein), ‘ফিলোসফিকাল ইনভেস্টিগেশানস’ (‘Philosophical Investigations’), অনুচ্ছেদ ১৮, পৃ: ৮।

৫. প্রাগুক্ত ।

৬. প্রাগুক্ত।

৭. দেখুন, ‘লা তাইলোহিজাসিঁও দো লা হোশ্যাকস’ (‘La taylorisation de la recherche’) ক্রিতিক দো লা সিওন্স (critique de la science) ক্রম ২৬, পৃষ্ঠা-২৯১-৯৩। বিশেষত : ডি জে দো সোলা প্রাইস (D. J. de Solla Price) এর ‘লিটল সাইন্স, বিগ সাইন্স’ (Little Science, Big Science) নিউ ইয়র্ক, কলাম্বিয়া ইউনিভাসিটি প্রেস, ১৯৬৩। বইটিতে জোর দিয়ে লেখক বলেছেন, অল্প সংখ্যক গবেষক নিয়ে তৈরী ছোট্ট অথচ দক্ষ-গবেষকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড় কিন্তু কম-দক্ষ দলটির (দক্ষ/কম-দক্ষের হিসাব পাবলিকেশানের ভিত্তিতে করা) সদস্য সংখ্যা আগের দলটির দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর দক্ষ-দলটির সংখ্যা বেড়েছে, তবে প্রতি ২০ বছর পর। দেখুন, পৃ: ৫৯। প্রাইস বলছেন, একজন ‘নিবেদিত প্রাণ সত্যিকারের বিজ্ঞানী’ সাধারণ মানের বিজ্ঞানীর চেয়ে ১০০ বছর এগিয়ে থাকেন। পৃ. ৫৬।

৮. জে টি দেশান্তি (J. T. Desanti), ‘ছুখ লো হাপোকত্ ত্রাডিসিওনেল দে সিওন্স এ দো লা ফিলোজফি’ (Sur le rapport traditionnel des sciences et de la philosophie) ‘লা ফিলোজফি সিলন্তিউজ উ ক্রিতিক দে ফিলোজফি দো লা সিওন্স’ (La Philosophie silentieuse, ou critique des philosophies de la science) (Paris: Seuil, ১৯৭৫).

৯. মানবিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের পুনঃ শ্রেণিকরণের প্রভাব শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমার মনে হয় না বৈধকরণ-দোষের ফাঁদে ফেলে দর্শনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর বন্ধনের জায়গাগুলো চিহ্নিত না করে কিংবা সংযোগস্থলগুলো খুটিয়ে না দেখে কিংবা নিজেকে নতুন করে না সাজালে কোনোভাবেই এগোতে পারবে না। এ বিষয়ে দেখুন, ‘প্রোজে দ্যাঁ এস্তিতুত পলিতেকনিক দো ফিলোজফি’ (Project d’un institut polytechnique de philosophie ) দোপাক্তমো দো ফিলোজফি, ইউনিভাকছিতি দো পাখি, (VIII) (উইত) (Department de philosophic, University de Paris ) ১৯৭৯.

১০. দেখুন, এ্যালেন জানিক (Allan Janik) ও স্টিফেন টলমিন (Stephan Toulmin) , ‘হ্বিটগেনস্টাইনস ভিয়েনা’ (‘Wittgenstein’s Vienna ’) নিউইয়র্ক ১৯৭৩, এবং জে পিয়েল(J. Piel), সম্পাদিত ‘ভিয়েন দেবু দ্যাঁ সিয়েকেল’, “Vienne début d’un siécle,” ক্রিতিক (Critique) (১৯৭৫), পৃ: ৩৩৯-৪০।

১১. দেখুন, য়ুরগেন হাবেরমাস (Jurgen Habermas), ডগমাটিসমুস, ফারনূনফ্ট উন্ড এন্টশাইডুঙ-ৎসু থেওরি উন্ড প্রাক্সিস ইন ডেয়ার ফেরভিসেনশাফ্টলিখেন সিভিলিজাৎসিওন’ (Dogmatismus. Vernunft und Entscheidung - Z u Theorie und Praxis in der verwissenschaftlichen Zivilisation) ১৯৬৩, ‘থেওরি উন্ড প্রাক্সিস’ (Theorie und Praxis) বেকন প্রেস, বোস্টন, ১৯৭১।

১২. ‘এরিস্টটল ইন এনালিটিক্স’ (c.330 BC), দেকার্ত, (Regulae ad directionem ingenii) ১৬৪১ প্রিনসিপ দো লা ফিলোজফি (Principes de la philosophie) (১৬৪৪). জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) ‘সিস্টেম অফ লজিক’ (System of Logic) (১৮৪৩)

original post

read more

Saturday, October 22, 2011

সাহিত্য সমালোচনা ও সমালোচনা সাহিত্য

by সেজান মাহমুদ

বাংলাদেশে সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক বেশ তুঙ্গে। দৈনিকের সাহিত্য পাতার ফরমায়েশি লেখা, বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের মননশীল ধারাভাষ্য থেকে শুরু করে প্রায়-আকাদেমীয় গবেষণাপত্রের মতো তথ্যনির্ভর পর্যালোচনা, আর আন্তর্জালে বা ইন্টারনেটে আসর গরম-করার মতো চুটকি আলোচনা সবই চলছে পুরোমাত্রায়। এই আলোচনা সমালোচনা যদি একটি যৌক্তিক ধারার দিকে যেতে বা চিন্তার মুক্তি ঘটাতে সাহায্য করে তাতে সাহিত্যের উপকার বই অপকার হবে না বলেই মনে হয়।

hahsrn.jpg……..
হাসান আজিজুল হক প্রসঙ্গে সেলিম রেজা নিউটনের পুনর্মুদ্রিত রচনা, ২০১০
…….
গত ২০০৭ সালে ২৯ জুন ও ২৩ জুলাই প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ‘সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব” শিরোনামে দুই কিস্তির লেখা মুদ্রিত হয়েছিল।[১] এর প্রেক্ষিতে সেলিম রেজা নিউটন-এর ‘চিন্তার সংকট সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি; প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্নঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা’ শিরোনামের এক দীর্ঘ লেখা প্রথম লিটল ম্যাগাজিন কাকতাড়ুয়ায় (২০০৮), পরে bdnews24.com-এর আর্টস বিভাগে পুনঃপ্রকাশিত হয় (২০১০)।[২] দুটো লেখার ধরনের মধ্যে বিরাট ফারাক আছে; হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন একজন প্রাজ্ঞ সাহিত্যিকের সমালোচনা বিষয়ে ধারাভাষ্যের মতো করে, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষকতার প্রভাব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে তাঁর লেখক সত্তা; অন্যদিকে নিউটন নিজেও সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগের তরুণ শিক্ষক, তিনি দর্শনের পদ্ধতিগত ধারাকে ঠিক রেখে যুক্তির কাঠামো তৈরি করে যাচাই করে দেখতে চাইছেন কী আমাদের চিন্তার স্বরূপ, কী আমাদের গলতি আর তার মধ্য থেকে আমাদের নিজস্ব, স্বাধীন, চিন্তন ধারার সূচনা বা পরিস্ফূটন করা যায় কিনা (খুব সাধারণভাবে বললাম)।

srn11.jpg……..
সেলিম রেজা নিউটন
…….
প্রথমেই প্রশ্ন আসতে পারে একটি দৈনিক পত্রিকায় একজন প্রাজ্ঞ লেখকের অনেকটা ধারাভাষ্যের মতো লেখাকে পাল্টা একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণী, প্রায়-একাডেমিক লেখা দিয়ে আক্রমণ বা বিচার করা যথাযথ কি না? কেন এই প্রশ্ন? আমাদের সাহিত্য পাতায় কেউ গবেষণাপত্র লেখেন না, দর্শন বা সাহিত্য বিষয়ে তো নয়ই। এ কারণে হাসান আজিজুল হকের লেখার ধরন, যুক্তির কাঠামো অনেকটাই সাহিত্যের ক্লাসে মনোগ্রাহী বক্তৃতার মতো শোনালেও তাঁকে দোষ দেয়া যায় না। আগেই জানিয়ে রাখছি আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই এই দুই লেখকের সমালোচনা করা নয়। বরং এই সূচিত আলোচনার মধ্য থেকে কোন একটি দিকে আমার বিশ্লেষণ ধাবিত করা, যা থেকে হয়তো কিছু একটা বের হয়ে আসতে পারে—যা কারো কাছে দরকারি মনে হতে পারে, অথবা ভবিষ্যতের কোনো আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।

তবু খুব সংক্ষেপে দেখা যাক তিনি (হাসান আজিজুল হক) কী বলতে চেয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? এখানে তিনি দেকার্তের পদ্ধতি অনুসরণ করে সন্দেহ, অস্বীকার করতে করতে একটি জায়গায় পৌঁছুনো যায় কিনা, যেখানে আর সন্দেহের কোন উপায় নেই—তা খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছেন। হ্যাঁ, যেমন নিউটন উল্লেখ করেছেন, এই উপস্থাপনার মধ্যে সরলীকরণ আছে বৈকি। কিন্তু আমি পাঠক হিসাবে অনেক বেশি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পদ্ধতিকে দেখবো যে এখানে হাসান আজিজুল হক যুক্তিবিদ্যার বা নিরঙ্কুশভাবে দর্শনের ইন্ডাক্টিভ বা ডাইডাক্টিভ কোন পদ্ধতির মধ্যে না গিয়েই যখন সাধারণভাবে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন, তখন তাঁর মাথায় সাহিত্য বা দর্শনের অনেক কিছু রেখেই তা করছেন। যা হোক, এভাবেই একসময় তিনি স্বীকার করে নেন যে, ‘শিল্পের গন্তব্য মানুষ… তাহলে মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্ত্বিত্বের ভিত্তি। …সেই সাড়া প্রতিক্রিয়াকেই আলগাভাবে সমালোচনা বলা যেতে পারে।’ (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭)

নিউটন একই পদ্ধতিতে সেটার প্রতি সন্দেহ ছুঁড়ে দিতে পারেন, সন্দেহ করতে পারেন, এবং তা দিয়েছেন, করেছেন। তর্কের খাতিরে শুধু এখানে একটি কথা না বললেই নয়, তাহলে তো এই জগত-সংসার, বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সবকিছু নিয়েই সন্দেহ করা যায়, বলা যায় এসবই ইলিউশন বা মায়া, আমাদের যে অস্তিত্ব আছে তারই তো কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবে কীসের সাহিত্য? কিসের দর্শন? কিসের জ্ঞানকাণ্ডের আলোচনা। সকলই বৃথা। তার মানে যতই তত্ত্বজ্ঞানের দোহাই দিই বা না দিই না কেন, কোনো একটি জায়গায় আমাদের ঘুরে ফিরে আবার প্রয়োগবাদীও হতে হয় (যদিও সেখানেও তত্ত্বজ্ঞান!)।

এবার দেখা যাক সেলিম রেজা নিউটন কী বলতে চেয়েছেন? তিনি হাসান আজিজুল হকের চিন্তাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তির অসঙ্গতি নিয়ে ইঙ্গিত করেছেন, এভাবে বাংলা সাহিত্যের অধিপতি-সাহিত্যধারার দশমহাবিদ্যার তালিকাও প্রস্তুত করেছেন। এই কাজটিকে প্রশংসার চোখে দেখতে হয়, কারণ, এখানে সাহিত্যের ‘স্ট্যাটাস ক্যু’কে প্রশ্নবিদ্ধ করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে নিউটন, ব্যক্তি হাসান আজিজুল হককে যেন ঠেসে ধরতে চেয়েছেন, তার পুরস্কার নেয়া না নেয়া, চশমা পরিহিত গালে হাত দেয়া ছবি বা পোজ, পাশাপাশি সমাজ-পরিবর্তন, শ্রেণিসংগ্রাম, ইত্যাদি বিষয় টেনে এনে লেখাটাকে একটি স্যুডো-একাডেমিক লেখায় পরিণত করেছেন। তাতেও এই লেখাটা থেকে নির্যাসটুকু নিতে কষ্ট হবে না। অন্তত এই আলোচনার জন্য। নিউটন যেখানে হাসান আজিজুল হকের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার (…সমালোচক মিন মিন করে বা মহা আড়ম্বর করে যে রায় দিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন, তার ভিত্তি কতটা মজবুত! তিনি শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেন তো? ভাঁড়ের ভূমিকা নিতে হয় না তো তাকে?–হাসান আজিজুল হক, ২০০৭) কে ‘ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ’ মনে করছেন, সেই নিউটনই আবার সেই ছায়ার কায়াকে প্রতিপক্ষ বানালেন যখন তিনি (হাসান আজিজুল হক) জানালেন যে, ‘শিল্পের গন্তব্য মানুষ, তাহলে মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্তিত্বের ভিত্তি’… সমালোচনা ছাড়া শিল্পই নাই, শিল্পের অস্তিত্বই নাই বলে। ঘুরে ফিরে কী দাঁড়াচ্ছে? একজন লেখকের শ্রেষ্ঠত্বের সাফাই গাইলেন? অন্যজন সমালোচকের, প্রকারান্তরে? সরলভাবে তা বললে খুব কি দোষ দেয়া যায়?

আমি বরং আরো গোড়াতে প্রশ্ন করি, কেউ কি এখানে একবারও খোলাসা করেছেন ‘সমালোচনা’ বলতে কী বুঝিয়েছেন এই দুই লেখায়? কেন এই মামুলি (?) প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরি? এটা স্পষ্ট না হলে এই আলোচনা একটি শূন্য বিষয়-কেন্দ্রিক হতে বাধ্য এবং একারণেই কারো ব্যাখ্যাই কোনো স্বচ্ছতা নিয়ে হাজির হচ্ছে না। এই অস্বচ্ছতার মূল কারণ আলোচনার বা পর্যালোচনার স্তরের ভিন্নতা। এক সময় আমরা টেনে নিয়ে আসছি পৃথিবীর যাবতীয় তত্ত্বকথার উদাহরণ, আরেক সময় টেনে নিয়ে আসছি আমাদের সাহিত্যে বা বাংলা সাহিত্যে কী ঘটছে আর না ঘটছে তার বিবরণ, কোনো রকমের যুক্তির সাজুয্য না রেখেই। এতে বিষয়টা হয়ে যায় ’ঘ্যাগের ওপরে তারাবাতি’র মতো। তারাবাতিটি সুন্দর কিন্তু তা ঘ্যাগের ওপরে মানায় কিনা সেটাও তো দেখা দরকার। যেখানে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে (বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্যে) সাহিত্য সমালোচনা বা সমালোচনা সাহিত্য কি এটাই নির্ধারিত হয় নি সেখানে পশ্চিমের তত্ত্বকথা টেনে এনেই কী আর না এনেই বা কী? এ কথা দর্শন এবং গণযোগাযোগের এই দুই শিক্ষক নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে জ্ঞানতত্ত্বের পদ্ধতি, প্রণালীর ধারাবাহিকতা ইত্যাদি পশ্চিমারাই ধরে রেখেছে যদিও এই সূচনাটা এককভাবে তাদের হাতে ছিল না। যাক সে কথায় পরে আসছি। একটু গোড়াতে তাকালে দেখতে পাই, যেসব আলোচনা-বিশ্লেষণ ছাপা হচ্ছে তাতে একবার মনে হচ্ছে সাহিত্য সমালোচনা অর্থ হলো,

ক। পুস্তক পরিচিতি: হরহামেশা পত্রিকার পাতায় যা দেখা যায়, বইটি কে লিখলেন, গল্প বা কবিতা না উপন্যাস, কয় পৃষ্ঠার বই, প্রচ্ছদ কার আঁকা ইত্যাদির বিবরণ। বড়জোর বইয়ের মলাট থেকে কিয়দংশের উল্লেখ।

খ। বুক রিভিউ: পুস্তক পরিচিতির উপাদানের সঙ্গে সমালোচকের বিজ্ঞ মতামত, লেখকের ভাষা সবল-দুর্বল, ভোকাবুলারি কম-বেশি, আর বড়জোর নিজস্ব পারসেপশন-নির্ভর কিছু মন্তব্য।

গ। সাহিত্য সমালোচনা: পুস্তক পরিচিতি, রিভিউ এর উপাদানের সঙ্গে সমালোচক হয় চড়াও হয়ে খারিজ করে দিলেন লেখকের কর্মকে অথবা প্রশংসায় উচ্চ আসনে তুলে দিলেন, এমন কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস লেখা হয় নি বিগত দশকে বা শতকে; এই লেখা লেখকের দ্রোহের প্রকাশ, আত্মজিজ্ঞাসার দলিল ইত্যাদি ইত্যাদি বলে।

ঘ। সমালোচনা সাহিত্যঃ সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করে নতুন করে আবিষ্কার বা পাঠোদ্ধার করা, এক ধরনের মূল্যায়ন, কিন্তু তা সাহিত্যতত্ত্ব ও দর্শনের মধ্য দিয়ে সাহিত্য-দর্শনের পদ্ধতি, সাহিত্যের সামগ্রিক গন্তব্য বা ঠিকানার নান্দনিক রূপ বিশ্লেষণ করা।

সাহিত্য সমালোচনার একটা ইতিহাস তো আছে, ধ্রুপদী ধারা থেকে শুরু করে আজকের নতুন ধারার সমালোচনা পর্যন্ত একটা ছকে ফেলে যে কেউ সাহিত্য সমালোচনার একটা ধারাবাহিক প্রতিকৃতি তৈরি করতে পারবেন। আরিস্ততল-এর ‘পোয়েটিকস’ (খ্রীস্টপূর্ব ৪ শতাব্দী)[৩] বা তার সমসাময়িক ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’[৪] কে যথাক্রমে কবিতার আর ভারতীয় সংস্কৃত নাটকের আদি সমালোচনা (ফরমাল) ধরে রেঁনেসা (ফ্রান্সিস বেকন এবং তৎসমুদয়), অ্যানলাইটেনমেন্ট (ডেভিড হিউম, কান্ট, মেরি উলস্টোনক্রাফট এবং তৎসমুদয়), ঊনবিংশ শতাব্দীর সমালোচনা (হেগেল, মার্ক্স, নিটশে, জন স্টুয়ার্ট মিল, তলস্তয় এবং তৎসমুদয়), নব্য সমালোচনা (ফ্রয়েড, স্যস্যুর, ইয়াকবসন, সার্ত্র, সিমন দ্য ব্যোভয়াঁ, দেরিদা, ফুকো, বার্থ, লাকাঁ, দেলুজ, বাখতিন, ফ্রেই, চমস্কি, সাইদ এবং তৎসমুদয়) থেকে এই প্রতিকৃতি বর্তমানের এক বিমূর্ত-প্রয়োগবাদী-ভাষার-আন্তর্জাতিকরণী-দর্শনাশ্রয়ী সমালোচনার পর্দায় ফেলে আলোচনা করা সম্ভব।

আবার ফিরে আসি হাসান আজিজুল হক এবং সেলিম রেজা নিউটন প্রসঙ্গে। কারণ, এই দুই প্রজন্মের দর্শন ও সাংবাদিকতার অধ্যাপকের কথাকে মন্থন করে, নতুন প্রশ্ন তুলেই আমার আলোচনার দিকধারা নির্ধারণ করে নিতে পারি। হাসান লিখেছেন, “ফুকো, দেরিদা কেউ যদি পড়তে চায়, তাকে আগে ফরাসি ভাষা শিখতে হবে–একথা বলা কি খুব অন্যায় হবে? আমি মনে করি সেটা খুব ঠিক কথা হবে। (নইলে)… শুধু অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া হবে।” কিম্বা অন্যত্র বলেছেন, “ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন পৃথিবীর চিন্তা সংস্কৃতি দর্শন কোন কিছুরই সংস্পর্শে আমরা আসি নি।… তারপর আমাদের আধুনিক সাহিত্য শুরু হয়েছে, ভাষা ক্ষমতাশালী হয়েছে, বুদ্ধির চর্চা শুরু হয়েছে। ইহবাদী মন, মানবতাবাদী উপযোগবাদী কর্মপ্রয়াস, যুক্তিবাদী বিচার প্রবণতা, সুনির্দিষ্টভাবেই পশ্চিমনির্ভর, সন্দেহ নেই। আজ গর্ব করার মতো অনেক কিছু থাকলেও সেসব মৌলিকভাবে আমাদের নিজেদের নয়, বরং পড়ে-পাওয়া চৌদ্দ আনা পশ্চিমি বিদ্যা থেকেই আমাদের সব অর্জন।” (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭)।

অন্যদিকে নিউটন বলেন, “লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা সার্বিকভাবে পশ্চিমা নয়া ঔপনিবেশিক সাহিত্য-থিওরির অনুরণন-সঞ্চারী। গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূত গোলামির জ্ঞানতন্ত্র তাঁদের জ্ঞানবিজ্ঞানের জোগানদাতা। ইঙ্গ-ইউরোপীয়-মার্কিনী-লাতিন জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্য-পদ্ধতিতত্ত্বের শো-বিজের নিত্য নতুন তারকারাজি ও নক্ষত্রপুঞ্জর উত্থান-পতন তথা সুপারনোভা-ব্ল্যাকহোলে গর্ত এবং আতশবাজি তাদের চোখ ধাঁধায় আর উষ্টা খাওয়ায়। এদিকে মার্কস তো ওদিকে চিহ্ন, এদিকে ফুকো তো ওদিকে ফোকর, এদিকে লাঁকা তো ওদিকে ফাঁকা। অবস্থা সঙ্গীন। জনাব সাহিত্যিক শ্রীমান সমালোচককে উড়িয়ে দিচ্ছেন কারণ ঐ দিক থেকে আসা থিওরি-ফোয়ারা নাকি সে-রকমই বলছে। ইত্যাদি। আবার, গোলামির জ্ঞানতন্ত্র শুধু গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূতই নয়, কর্তার সর্বকারকতা-হেতুও বটে।” (সেলিম রেজা নিউটন, ২০০৮, ২০১০)

এই দুই মনোভঙ্গি বা প্রতিন্যাসই তো মুক্ত, স্বাধীন চিন্তার পরিপন্থী! জ্ঞান, সত্য তা পশ্চিম-পূর্ব-উত্তর-দক্ষিণ যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে কি? নিজস্বতার সন্ধান, বা চিন্তন পদ্ধতির শেকড় খুঁজে নিজেদের অহংবোধকে উন্নত রাখা যায়, তাতে অন্যায় কিছু নেই, প্রশ্ন হলো সাহিত্যের সমালোচনা বা সমালোচনা পদ্ধতিতে সেই শেকড়ের অবস্থান, তার বিবর্তন, পরিস্ফূটন, বর্ধন-মার্জন হয়েছে কিনা তাও-ও তো খতিয়ে দেখার বিষয়। জ্ঞান বা জ্ঞানের পদ্ধতি তো স্থবির না। সাহিত্য বলি, দর্শন বলি বিজ্ঞানমনস্কতা না নিয়ে কোনোটাই আগাতে পারে নি, বা বলা যায় বিজ্ঞানের দর্শন, দর্শনেরও বিজ্ঞান জন্ম নিয়েছে। পশ্চিমের বেলায় তা আরো বেশি প্রযোজ্য। আরিস্ততল-এর ‘পোয়েটিকস’ আর ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ পাশাপাশি রেখে কি এক ধরনের তুল্য-বিচার করা যায়? যদিও ‘পোয়েটিকস’ সরাসরি সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হলেও ‘নাট্যশাস্ত্র’ বরং পারফরমিং আর্টসের সঙ্গে যুক্ত, তবু এক শাখার শিল্পবিচারের সঙ্গে অন্য শাখার কোথাও কোথাও মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যেমন ’নাট্যশাস্ত্রে’র অন্তর্গত সংগীত, নৃত্য আর অভিনয়কলার নন্দনতত্ত্ব বহুলাংশে কবিতার নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অন্যদিকে এই দুই প্রাচীন সমালোচনা তত্ত্বের টেক্সট বা আদিপাঠকে নানাভাবে পাশাপাশি রেখে আলোচনা, বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। যদিও আবির্ভাবের কালের দিক থেকে এই দুই টেক্সট সমসাময়িক, কিন্তু স্রষ্টার চরিত্রের দিক থেকে একেবারেই আলাদা। আরিস্ততল ছিলেন ঐতিহাসিক চরিত্র, দার্শনিক, লেখক যার আদিপাঠ সমৃদ্ধতর হয়েছে পাশ্চাত্যের বস্তুবিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, নন্দনতত্ত্ব, এবং ধর্মতত্ত্বের উৎকর্ষের আলোকে। এই দার্শনিকের লেখাকে প্রায় দুই শতকের বেশি সময় ধরে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে ঝালাই-বাছাই করা হয়েছে। তাঁর বিশেষত্ব ছিল জ্ঞানকে বিভক্ত করে প্রতীয়মান অংশকে শনাক্তকরণ পদ্ধতি আর দুই বাক্যের মধ্য থেকে মৌল সিদ্ধান্তে উপনীত হবার পদ্ধতি আবিষ্কারে। অন্যদিকে ভরতমুনি উপকথাভিত্তিক ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি কে বা কারা ছিলেন তা আদৌ জানার উপায় নেই। তাছাড়া যেহেতু এটা ছিল নাট্যশাস্ত্র, শাস্ত্র অর্থই তা ছিল ঐশ্বরিক, ঈশ্বর প্রদত্ত আদিপাঠ, যা সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করলে প্রায় তিনশ পয়তাল্লিশ পৃষ্ঠার বিস্তৃত বর্ণনা, নির্দেশনায় ঠাসা, অন্যদিকে ‘পোয়েটিকস’ ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর মাত্র তিরিশ পৃষ্ঠার স্বল্পভাষিতার আদিপাঠ, কেউ কেউ মনে করেন যে এগুলো আদৌ আরিস্ততলের লেখা নয়, বরং তার বক্তৃতা থেকে ছাত্রদের লিখিত নোট।[৫] তবু এই পোয়েটিকসকে ভিত্তি করে পশ্চিমা নন্দনতত্ত্ব, সমালোচনা তত্ত্ব নানান শাখা-প্রশাখায় অনুসরণ করে আজকের উত্তরাধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে এসে ঠেস দেয়া যায়। অন্যদিকে ‘নাট্যশাস্ত্র’ থেকে কি কোনো ধারাবাহিক পদ্ধতিগত পরিস্ফূটন ঘটেছে, শিল্প বিচারে বা সাহিত্য বিচারে? প্রত্যক্ষবাদী, অভিজ্ঞতাবাদী বা নৈরাজ্যবাদী যা-ই সমর্থন করি না কেন, এই ধারাবাহিকতার সূত্র এবং এই ধারাবাহিকতাহীনতার উপাদানগুলোর মধ্যেই নিজস্ব সাহিত্য-বিচার, সমালোচনাতত্ত্বের ভেদ-বিভেদ আবিষ্কার করা সম্ভব; এখানে পশ্চিমা জ্ঞান—দক্ষিণা জ্ঞানে ভেদ বিচার বরং মুক্তচিন্তার পরিপন্থী।

সাহিত্য কি বা কোনো কিছু আদৌ সাহিত্য হয়ে উঠলো কি না এই বিচারের পদ্ধতি, সাহিত্যের উপাদান যেমন–গঠন, শৈলী, নান্দনিকতা, বিষয়, দর্শন, ভাষা, এরকম নানা রকমের উপাদানের ভূমিকা, কখনও কখনও একটি উপাদানের ওপরে অন্যগুলোর বা অন্যটির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তো সাহিত্যতত্ত্বের নানান শাখা প্রশাখাও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ যুগে, অন্তত পশ্চিমা বিশ্বে সমালোচনা সাহিত্য মূলত সাহিত্যতত্ত্বের বা দর্শনের আলোচনাকেই নির্দেশ করে। এজন্য একটু পশ্চিমা ধারাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে খতিয়ে দেখলে আমার নিজস্ব চিন্তার প্রবাহটাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে সুবিধা হবে।

এক সময় সাহিত্য ছিল ক্ষমতাশালী, বিত্তবানদের বিনোদন, সাহিত্য ছিল ঈশ্বরের স্তুতি বা ক্ষমতাবানের কীর্তি বিনির্মাণের কাজ। তাই সাহিত্যে এসেছে ইতিহাস, এসেছে আদর্শবাদ। এই আদর্শবাদ কিম্বা মানব চৈতন্যের হোতারা আবার ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলেন কীভাবে মানব মন তার বাইরে বস্তুকেও জানতে পারে। এজন্য পশ্চিমা বিশ্বে কান্টের প্রভাবকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে এসেছে ফেনোমেনোলজি।[৬] সাহিত্যে এই ফেনোমেনোলজির পদ্ধতিতে সাহিত্য বিচারের প্রভাব দেখা যায় রুশ ফরমালিস্টদের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের তথাকথিত ‘জেনেভা সমালোচনা’র ধারা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বলা যায়। যেমন হুসসার্ল-এর পদ্ধতি ছিল সাহিত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, লেখক, পাঠকপ্রিয়তা ইত্যাদি টেক্সটের বাইরের সব বাদ দিয়ে শুধু মাত্র ‘টেক্সট’কে লেখকের চৈতন্য হিসেবে দেখা বা বিচার করা। অন্যদিকে একদল আমেরিকান সমালোচক এই ধারার সঙ্গে একটি শর্ত যুক্ত করে নতুন ধরনের সাহিত্যের ‘ব্যাখ্যানের বৈধতা’ বা সপ্রমাণতার দাবি জানালেন। তাদের মতে একটি সাহিত্যকর্মকে নানান ব্যাখ্যান দেয়া যায়, তবে যত ব্যাখ্যাই দেয়া হোক না কেন, তা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন সেই সিস্টেমের মধ্যে পড়ার বেশি সম্ভাবনা থাকতে হবে। এটা অনেকটা বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট বা গবেষণার মতো যেখানে ‘কনফিডেন্স ইন্টারভেল’ বলে একটি বিষয় আছে। যা দিয়ে বলা হয় একটি ঘটনা যদি একশ বার পরীক্ষা করে দেখা হয় তবে শতকরা ৯৫ ভাগ সময়ে তা একটি নির্দ্দিষ্ট ‘ইন্টারভেল’ এর মধ্যে পড়বে, বাকি পাঁচ বার তা কাকতালীয় ভাবে ঘটতে পারে। এই শতকরা ৯৫ ভাগ সময়ে ঘটার সম্ভাবনা থাকলেই তা শুধু বিজ্ঞান গ্রহণ করে। এই ধারার অন্যতম তাত্ত্বিক ই.ডি. হিরশ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ভ্যালিডিটি অব ইন্টারপ্রিটেশন বইতে বিস্তর লিখেছেন এবং বলার চেষ্টা করেছেন কীভাবে এই ‘লেখক কী বলতে চেয়েছেন’-এর নানান রকমের প্রকারভেদ হতে পারে যাকে তিনি নাম দিয়েছেন টেক্সটের ‘অন্তর্নিহিত জেনরে’।[৭] এই ধারাটির সাম্প্রতিককালের একটি শাখাকে বলা যায় ‘রিসেপশন তত্ত্ব‘ যেখানে পাঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়া হয়েছে যা আগের তত্ত্বগুলোতে একেবারেই স্থান পায় নি। কিন্তু এখানেও পাঠকের প্রস্তুতির কথা আছে, যেমন উলফ্যাং আইজার তাঁর দ্য এক্ট অব রিডিং[৮] গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে পাঠককে সাহিত্যের কলাকৌশলের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়, রীতি-নীতি, অর্থবোধের প্রবাহের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে হয়। এর অর্থ আবার পাঠককে উপেক্ষা করা না। পাঠকের সম্ভাবনাও অফুরন্ত, পাঠক যুগে যুগে আবিষ্কার করবেন একেক জন লেখককে, একেকভাবে। সেই অমিত সম্ভাবনার কাছে, যুগজয়িতার কাছে লেখককে আত্মসমর্পণ করতেই হবে, কিন্তু লেখক পাঠকের কাছে আত্মসমর্পণ করে লিখবেন না। আইজার-এর মতো সমালোচকদের কাছে তাই সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা সেইটি যা পাঠককে এক নতুন সমালোচনার সজ্ঞানতার দিকে তাড়িত করে, যা পাঠকের প্রথা ও প্রত্যাশার গৃহীত নীতিমালাকে তছনছ করে দেয়। এই ধরনের সমালোচনাকে কি মুক্ত, মানবিক আদর্শবাদভিত্তিক বলা যায়? হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে বলা যায়। এই ধারার সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য এই একই ‘রিসেপশন তত্ত্বে’র আরেক ধারক ফরাশি দার্শনিক, সাহিত্য সমালোচক রঁলা বার্থ-এর ধারায় আসা যাক। তিনি তাঁর দ্য প্লেজার অব দা টেক্সট গ্রন্থে আইজার-এর একেবারে বিপরীত অবস্থান নিয়ে ভাষার নির্দিষ্ট অর্থকে দ্রবীভূত করে দিয়ে শব্দের মুক্ত অর্থের খেলা খেলেন, এভাবে ভাষার বিরামহীন, অধরা ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে অবদমিত চিন্তাপদ্ধতিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন।[৯] এজন্য কেউ কেউ তাকে হিডানিস্ট বা প্রেয়োবাদীও বলে থাকেন। কিন্তু বার্থকে বুঝতে হবে, ব্যাখ্যা করতে হবে আরও গভীরভাবে, গোড়া থেকে; সে কথায় পরে আসছি।

হুসসার্লের পরাতত্ত্ব যেখানে ‘আমি’র বোধ এবং উপলব্ধির মধ্যে জ্ঞানের সম্পূর্ণতা খোঁজে (দেকার্তের উক্তির কথা মনে পড়ে কি? ‘আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই অ্যাম’), সেখানে হাইডেগার কিন্তু জ্ঞানের সম্ভবপরতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘চেতনা’র বদলে ‘সত্তা’কে কেন্দ্র করে নিলেন (বিইং এন্ড টাইম, ১৯২৭)।[১০] এই সত্তা কেন্দ্র হবার কারণেই আবার ভাষার গুরুত্ব অন্য রকম হয়ে যায়। সে কৃতিত্বও হাইডেগারকেই দেয়া যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন ভাষার স্বাধীন, স্বাবলম্ব অস্তিত্ব, মানুষের সকল চিন্তা, দর্শন, সমালোচনা, বিশ্লেষণ সবকিছু প্রকাশের কলকাঠি এই ভাষা, ভাষা এক পরিমাপহীন সম্ভাবনা-ভাষা হলো ভাষা। এই নিয়ে আরেক ফরাসি তাত্ত্বিক জাক লাকাঁ আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। নব্য সমালোচনা আধুনিক বিজ্ঞান আর শিল্পায়নের যুগে যথেষ্ট পরিশীলিত শৈলীর মাধ্যমে নিজের কর্ম সাধন করলেও এই ধারাতে এককভাবে টেক্সটের প্রতি অবসেসিভ মনোযোগ দেয়ায় সাহিত্যের বিস্তৃত, কাঠামোগত দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে। সাহিত্য যে শুধু একটি সামাজিক অনুশীলন নয়, বরং নান্দনিক সামগ্রী তা বোঝাতে ঠিক যেন সাহিত্যের সকল শাখার সামগ্রিকীকরণ করে নরথ্রোপ ফ্রেই লিখলেন অ্যানাটমি অব ক্রিটিসিজম (১৯৫৭)।[১১] ফ্রেই আত্মনিষ্ঠ বিচার, আত্মগত পারসেপশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন যে সাহিত্য নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করে, পদ্ধতি তৈরি করে। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব বিচার বা ভ্যালু জাজমেন্টকে সাহিত্য সমালোচনার পথ থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। সাহিত্য হলো একটি সুসংবদ্ধ, নিশ্ছিদ্র কাঠামো যার ভেতরে সাহিত্য ছাড়া আর কিছু ঢুকতেই পারবে না। এভাবে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটবে নতুন নতুন দ্যোতনায়। অনেকটা পরিবেশবাদীদের রিসাইক্লিং-এর মতো। যদিও এই চিন্তন পদ্ধতিতে ইতিহাসের প্রতিও এক ধরনের বীতশ্রদ্ধতা আছে, তবু ফ্রেই মনে করেন, একমাত্র সাহিত্যেই আমরা থাকবো স্বাধীন আর সাহিত্য হবে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার কল্পিত বিকল্প। তাঁর এই তত্ত্বের ‘সায়ন্টিফিক ইমপালস’ নব্য সমালোচকদের চেয়ে বরং ফরমালিস্টদের কাছে বেশি পূর্ণকায়া দাবি রাখে। এ কারণেই বোধহয় দেখা যায় এর পরপরেই ষাটের দিকে ফারদিনান্দ স্যস্যুর-এর ‘কোর্স ইন জেনারেল লিংগুয়িস্টিক’ (১৯১৬)[১২]-এর ওপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রাগ লিংগুয়িস্টিক সার্কেল’ (১৯২৬)[১৩] এর প্রতিষ্ঠা, আর ইয়াকবসন, জাঁ মুকারভস্কি, ফেলিক্স ভদিকা এবং অন্যান্যের হাত ধরে ফরমালিজম থেকে স্ট্রাকচারালিজম-এর উত্থান ঘটছে (১৯৬০)। স্ট্রাকচারালিজম-এ সাহিত্যের আধেয় বা উপাদানের চেয়ে আঙ্গিকের গুরুত্ব বেশি হয়ে ওঠে, এক পর্যায়ে তা সেই উপাদানকেই বর্ণনার কাঠামো বা স্ট্রাকচার হিসেবে প্রতিভাত করে। কবিতার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। সস্যুর যেখানে ভাষাকে ‘ব্যবধানরাশির এক সিস্টেম’ বলেন সেখানেই রুশ সেমিওটিশিয়ান ইউরি লতমান ‘দ্য স্ট্রাকচার অব দা আর্টিস্টিক টেক্সট’ (১৯৭০)[১৪] এবং ‘দ্য অ্যানালিসিস অব দা পোয়েটিক টেক্সট’(১৯৭২)[১৫]-এ তুলে ধরেন কীভাবে টেক্সটের অর্থ প্রাসঙ্গিকতার মধ্য দিয়ে বৈপরীত্য নিয়ে সমান্তরালে অবস্থান করে। যাকে স+9857৮৭স্যুরিয়ান ‘ডিফারেন্স’ অনুষঙ্গ বলা যায়। ইউরির মতে টেক্সট হলো ‘সিস্টেম অব এ সিস্টেম’। কিন্তু তিনি মনে করেন না যে কবিতা বা সাহিত্যের ভাষার অন্তর্গত গুণাবলী দিয়ে তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব। কারণ, ভাষা শুধুমাত্র নিজের অন্তর্গত সাংসিদ্ধিক (ইনহিয়ারেন্ট) অর্থই বহন করে না, তা টেক্সটের ভেতরে আরো ব্যাপক সিস্টেমের অর্থকেও ধারণ করে। এভাবে তিনি পাঠককে আবার সামনে নিয়ে আসেন যে পাঠক তার গ্রহণের নীতিমালা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট টেক্সটের পটভূমিতে অন্তর্গত অর্থ উদ্ধার করে নেয়। এখানেও কিন্তু সেই পাঠকের প্রস্তুতির প্রশ্ন আসে, পাঠকের গ্রহণের নীতিমালা বা ‘রেসেপ্টিভ কোডস’ তো অনেক বিষয়ের ওপরে নির্ভরশীল। এ কারণেই বোধকরি স্ট্রাকচারালিজমে ‘আদর্শ পাঠক’ বা ‘আইডিয়াল রিডার’ আর ‘খাসা পাঠক’ বা ‘সুপার রিডার’-এর কথা বলা আছে [১৬] যা মূলত নোওম চমস্কির পাঠকের ‘ভাষাগত সামর্থ্য’ বা ‘লিঙ্গুয়িস্টিক কম্পিটেন্স’ নামক প্রতিন্যাসের ওপরে ভিত্তি করে সৃষ্ট।[১৭]

বলাই বাহুল্য, স্ট্রাকচারালিজমের সীমাবদ্ধতাই পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের জন্ম দিয়েছে। দেরিদা ভাষার শব্দরাশির অর্থের এই ব্যবধান বা ডিফারেন্স অনুষঙ্গ নিয়ে প্রমাণ করেন যে এই নির্দিষ্ট ব্যবধান বা বৈপরীত্য আসলে পরাতাত্ত্বিক বা মেটাফিজিক্যাল এবং তাকে ভেঙে দেয়ার খেলাই সাহিত্যের অনির্বচনীয়, সীমাহীন আনন্দ ও আবিষ্কার। দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন বা বিনির্মাণতত্ত্ব টেক্সটের অমিত সম্ভাবনাকে কেন্দ্রে রেখে মানব সম্ভাবনাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ কারণে লেখক লেখার শেষে কেন্দ্র থেকে (টেক্সট?) সরে যান, সরে যায় তার বিশ্বাস, সংস্কার সবকিছু, শুধু থেকে যায় লিখিত টেক্সট বা আদিপাঠ। এই ভাষায় কেন্দ্রীভূত জীবনের সারাৎসার–তা তো আমাদের বিকশিত করে, পুনঃনির্মাণ করে, পুনরাবিষ্কৃত করে, তবু সেই ভাষার অর্থ অস্থির, অধরা, অনধিগম্য থেকে যায়। এই মানবজীবন, জাগতিক ব্যাপার স্যাপার যেমন বহুলাংশে ছায়াময়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত, তেমনি ভাষার প্রতিটি নতুন নতুন দ্যোতনা, তাৎপর্য বহুলাংশে ছায়াময়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত।[১৮],[১৯] এর অন্বেষণই কি সাহিত্য? সৃজনশীলতার মোক্ষধাম? হাসান আজিজুল হক একবার বলেছিলেন, […বাস্তবকে বিমূর্ত করা আমি বলবো না, বরং বাস্তবতাকে আরেক রকমের উপরে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রতীকী ধারণা, প্রতীকী সত্য আরেকভাবে তার মধ্যে ভরে দেয়া হয়েছে। যেটা, আমার মনে হয় সৃজনের জায়গাটাও তাই। সৃজনশীলতা কিন্তু আর কিছুই না—একটা ভয়ঙ্কর, বিশাল শূন্যতা ও সম্ভাবনা। সৃজন কোন নির্দিষ্ট বিষয় নয়। যে লিখতে যায় সে জানে, যে আঁকতে যায় সে জানে; সে হাবুডুবু খায় এবং সে বোঝে যে এর কোন অন্ত নেই, মহাবিশ্বের যেমন অন্ত নেই। সৃজনের জায়গাটারও কোন অন্ত নেই, সেখান থেকে একটা জায়গাকে খুপড়ি কেটে আলাদা করে সেইখানটাকে পুরণ করতে হয়, একটু একটু করে।–হাসান আজিজুল হক, ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলোচনা, ২০০৯] [২০]
এই ছায়ামায়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত মানবিক ব্যাপার-স্যাপারের অন্বেষণ শুধু সৃজনশীলতার মোক্ষধামই না; বরং এটাকেই বলা যায় এ যুগের দর্শনের সূত্র, তাকে কেউ উত্তরাধুনিকতা বলতে চাইলেও বলতে পারেন। আমি সেরকম কোন নামে বিশ্বাসী নই, আমার কাছে তা ট্রুইজম।
বার্থ যেমন শুরুর দিকে কট্টর স্ট্রাকচারালিস্ট ছিলেন যার প্রতিফলন দেখা যায় ‘মিথোলজিস’ (১৯৫৭)[২১], ‘এলিমেন্টস অব সেমিওলজি’ (১৯৬৪)[২২] এবং ‘সিস্টেম ডে লা মোড’ (১৯৬৭)[২৩] গ্রন্থে। কিন্তু বার্থেরও বিবর্তন হয়েছে, তবু তিনি ‘সাহিত্যের বিজ্ঞান’ (যাকে বার্থ মনে করতেন শুধু মাত্র আঙ্গিকের বিজ্ঞান, উপাদানের বিজ্ঞান না) এর সম্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন, যেমন করেছেন মিখাইল বাখতিন, কিন্তু আরো বেশি বিজ্ঞানসন্মতভাবে। বার্থ-এর মতে লেখক নামের শক্তিশালী এক অবয়বের সৃষ্টি এই সমাজ ব্যবস্থা, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ত প্রভু অথবা পূঁজির ক্ষয়িষ্ণু রক্ষকেরা। সাধারণ সংস্কৃতিতে (যেমন, বাঙালি সংস্কৃতি) সাহিত্য বলতেই একনায়কীয় কেন্দ্রিক লেখকের কথা চলে আসে, তার ব্যক্তিত্ব, জীবন, রুচি, মোহময়তা। যেমন রবীন্দ্রনাথ, যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ নতুন ধারার সাহিত্য সমালোচনায় ‘মানুষ বোদলেয়ারের’ ব্যর্থতাই বোদলেয়ার এর প্রকৃত সৃষ্টি, ভ্যান ঘগ এর পাগলামি কিম্বা চাইকোভস্কির করুণ মৃত্যু আর তাঁর সাগরেদদের মধ্যেই তাঁর অতুলনীয় সংগীতের অমরত্ব। অথচ প্রথাগত সমালোচনায় কমবেশি শোনা যায় একই ব্যক্তির একক কন্ঠস্বর–লেখক, যা আমাদেরকে আবদ্ধ করে রাখে। এই লেখক কে যখন সারিয়ে নেয়া হয় তখন লেখা আর শুধু একটি ঐতিহাসিক তথ্যাধার বা লেখকের লেখার কাজ হিসাবে থাকে না, পরিণত হয় পরিপূর্ণভাবে আধুনিক টেক্সট-এ; কিন্তু বার্থের মতে এটা শুধু টেক্সট না, লেখার সঙ্গে সঙ্গেই পরিণত হয় আধুনিক স্ক্রীপ্টরে। যখন লেখক কে সরিয়ে নেয়া হয় তখন এই টেক্সটকে ডিসাইফার করা হয়ে ওঠে আরো অর্থবহ। এভাবে লেখকের মৃত্যু ঘটে লেখার মধ্য দিয়েই, লেখার বহুমাত্রিকতাও আসে।[২৪] বার্থের এই ‘লেখকের মৃত্যু’ আর ‘পাঠকের জন্ম’ সাহিত্যের ইতিহাসে বোধকরি সবচেয়ে ‘ভুল পঠিত’ প্রতিন্যাস বা নৌশন। এমন কি পাশ্চাত্যেও এই ভুল পাঠের ফল হিসেবে সাহিত্যের আধুনিক শিল্পিত বয়ানের বিপরীতে খুব জনপ্রিয় ধাঁচের বয়ানের আন্দোলন কদাচিৎ দেখা গিয়েছিল; কারণ যুক্তি একটিই, সৃজনশীলতা তো পাঠকের হাতের শিল্প (ক্রিয়েটিভিটি ইজ নাও দ্য আর্ট অব দ্য বিহোল্ডার)। সুতরাং যেভাবে পারো পাঠক পাও। বলাই বাহুল্য এমন কি বার্থ নিজেও এই ধারণায় লজ্জায় পড়তেন। সম্প্রতি ইতালিয় দার্শনিক জর্জিও এগাম্বেন ‘দ্য অথর এজ জেসচার’ শিরোনামের প্রবন্ধে বার্থের ‘ডেথ অব দ্য অথর’ এবং মিশেল ফুকোর ‘হোয়াট ইজ এন অথর’ লেখা দুটোর নতুন পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে দেখিয়েছেন কীভাবে এই ‘ভুল পাঠ’ সাহিত্য সমালোচনায় নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। মূলতঃ লেখকের মৃত্যু মানে হলো লেখকের কর্তা হিসেবে উপস্থিতি না থেকে টেক্সটের পাঠোদ্ধারে লেখকের ট্রানসেন্ডেন্টল (সীমাতিক্রম্য) উপস্থিতিকে অর্থবহ করা।[২৫]

লাকাঁর সাইকো-এনালিসিস নিয়ে বাংলায় লিখতে গিয়ে ‘মতিবিভাজনের’ যে বিভ্রাট তা নিয়ে আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে মতির বিভাজনের চেয়ে সত্তার বিভাজন কতটা যুক্তিগ্রাহ্য (তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন, সলিমুল্লাহ খান, ২০০৭)।[২৬]সেখানে আরও উল্লেখ করেছিলাম লাকাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তির একটি অনুষঙ্গে লালনের ‘আরশী নগরের পরশী’র কথা (তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন এর অংগ বিভাজন, সেজান মাহমুদ, ২০০৭)।[২৭ ] সত্তা এবং এই আধেয়, অধরা অনুষঙ্গ এদুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তথাকথিত উত্তরাধুনিক সাহিত্য তত্ত্বে। বলাই বাহুল্য, একারণেই লাঁকা দেকার্তের বিখ্যাত উক্তিটিকে পুনরায় লেখেন এভাবেঃ ‘আই থিঙ্ক দেয়ারফোর আই এম’ = ‘আই এম নট হোয়ার আই থিঙ্ক, এন্ড আই থিঙ্ক হোয়ার আই এম নট’। এই পর্যালোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে লাকাঁর পদ্ধতিতে শুধু একটি লেখার চরিত্রের সাইকো-এনালিসিস করাই সম্ভব নয়, লেখকেরও সাইকো-এনালিসিস করা সম্ভব। ফ্রয়েডের ‘আর্ট এন্ড সাইকো-এনালিসিস’ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন ভাইগতস্কি এই বলে যে ‘ফ্রয়েড যেভাবে শিল্পের বিচার করেছেন যেখানে শিল্পের ওপরে সমাজের ভূমিকা খর্ব করা হয়েছে’ (দ্য সাইকোলজি অব আর্ট, ১৯৭১)।[২৮] ভাইগতস্কি নিজে ছিলেন একাধারে সাহিত্যের শিক্ষক, অন্যদিকে ভাষাবিদ এবং মনোবিজ্ঞানী। তার মতে শব্দ আমাদের শেখায় ‘আমরা কী না, বরং আমরা কী হতে পারি তা’। মজার ব্যাপার হলো মিশেল ফুকো বা পল ডি মান এর মতো ভাষার দার্শনিকেরা কিন্তু এখান থেকে ধার নিয়েছেন; ফুকো তাঁর ‘দা অর্ডার অব থিংস’ (১৯৭৩) গ্রন্থে লেখেনঃ

“This proper being of language is what the nineteenth century was to call the Word, as opposed to the Classical “verb”, whose function is to pin language, discreetly but continuously, to the being of representation. And the discourse that contains this being and frees it for its own sake is literature. (উনবিংশ শতকে এসে ভাষার যথার্থ অস্তিত্ব ধ্রুপদী ধারার ‘ক্রিয়াপদে’ না খুঁজে ‘শব্দে’র মাঝে খোঁজা হয়েছে, যার (শব্দের) কাজ হলো ভাষাকে রূপায়নের সত্তার সঙ্গে গ্রন্থিত করা, কৌশলী বিচক্ষণতার সঙ্গে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে। আর যে ডিসকোর্স যা এই সত্তাকে ধারণ করে এবং নিজের জন্যই মুক্ত করে তা-ই সাহিত্য। )” [২৯]

পল ডি মানের কন্ঠেও একই কথার প্রতিধনি:
“Here…consciousness does not result from the absence of something, but consists of the presence of a nothingness. Poetic language names this void with ever-renewed understanding and…it never tries to naming it again. This persistent naming is what we call literature. (এখানে…চৈতন্য কোন কিছুর অনুপস্থিতি থেকে তৈরি হয় না, বরং এক শূন্যতার উপস্থিতির মধ্যে সৃষ্ট। কবিতার ভাষা এই শূন্যতাকে চির নতুন উপলব্ধির মধ্য দিয়ে অভিধা দেয়,…আর কখনও তা পূনঃআখ্যায়িত করে না। এই অভিধা দেয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম-ই সাহিত্য।)” [৩০], [৩১]

আমার পূর্বে উল্লেখিত ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলচনায় হাসান আজিজুল হকের মন্তব্য আর এই বক্তব্যের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি? আমরা সব সময়ই বিদেশি কুকুর ধরি দেশের ঠাকুর ফেলে দিয়ে (যদিও পূর্ব-পশ্চিম নিয়েই আমাদের এতো সংশয়!)। কথা সেটা নয়, কথা হলো এই বিদেশি তত্ত্বজ্ঞান দিয়েও আমাদের সাহিত্য সমালোচনা বা সমালোচনা সাহিত্য রচনা সম্ভব। কারণ যখন সমালোচনা সাহিত্য অর্থাৎ লেখার পাঠোদ্ধার, দর্শনের মূল্যায়ন হবে, তা হবে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মানসজগতের মধ্য দিয়ে, এই সুসংবদ্ধ প্রকরণ-প্রণালী তাকে আরো চৌকস করবে।

বার্থ এর ব্যাপক প্রভাব সাহিত্য সমালোচনায় বা সমালোচনা সাহিত্যে আরেকটি দিকে মনোযোগী করে আমাদের, যা পরিপূর্ণভাবে খোলাসা না করলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রে যে কেউ পড়তে পারেন; তা হলো বার্থের স্ববিরোধিতা, বা প্যারাডক্স। বার্থের ‘রাইটিং ডিগ্রি জিরো’ (১৯৫৩)[৩২] মূলত সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের আবহাওয়ায় লিখিত, যদিও বার্থ সার্ত্রের লেখার ধরণকে বরং সমালোচনাই করেছেন। কিন্তু প্রথম প্রবন্ধেই প্রশ্ন রাখেন, লেখা কি (হোয়াট ইজ রাইটিং)? যেমন সার্ত্রের বিখ্যাত শিরোনাম, সাহিত্য কি (হোয়াট ইজ লিটারেচর)?[৩৩] কিম্বা সেই লেখকের স্বাধীনতা আর দায়িত্বের বিষয় বার বার ফিরে আসে। অনেকেই বলেন বার্থের এই ‘জিরো ডিগ্রি’ প্রতিন্যাসটি মূলত ডেনিশ ভাষা-ইতিহাসবিদ ভিগো ব্রনডাল থেকে ধার নেয়া। জিরো ডিগ্রিতে লিখতে যাওয়ার বড় যুক্তিটি ছিল সাহিত্যে আঙ্গিকের ইতিহাস, ইতিহাসমুখিনতা, এমন কি ভাষার ইতিহাসকে একটি বিষয় বা ধারণা হিসেবে নিয়ে আসা যাকে কেউ কেউ বলেন ভাষা আর ডিসকোর্সের দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক। কিন্তু এখানে সার্ত্রীয় মার্ক্সবাদ একেবার নির্বাসিত হয়ে নতুন ধরণের সম্পর্ককে উপস্থাপন করে। বার্থ সাহিত্যের কাজ কে অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে নারাজ ছিলেন, বরং বার্থের মতে লেখক নিজেই উৎপাদক, ‘দ্য অথার এজ আ প্রোডিউসার’। এভাবে বার্থের মতে যে কোন সাহিত্য-আঙ্গিকে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ অনুসারে লেখক তাঁর সুর বাঁধতে পারেন যদি চান, কারণ এখানেই লেখক তাঁর দায়বদ্ধতা দেখাতে পারেন। সুতরাং সাহিত্যের ইতিহাস, এবং সাহিত্যে ইতিহাসের অবস্থান নিয়ে বার্থ এই গ্রন্থে ছিলেন স্ববিরোধী। তাঁর এই স্ববিরোধিতা দেখা যায় ভাষা নিয়ে, প্যাট্রিজিয়া লম্বারডো তো এটাকে বার্থের ‘ভাষার বিরুদ্ধে লড়াই’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।[৩৪] বার্থ আর লাঁকায় অনেক পার্থক্য আছে ইতিহাস আর ভাষার অবস্থান নির্ণয়ে, সে আলোচনায় নাই বা গেলাম। কিন্তু বার্থ যেন স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়েই আবার ইতিহাস কে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর কাছে একটি স্থিরচিত্র বা ফটোগ্রাফি একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরে, বস্তুর প্রকৃত অস্ত্বিত্ত্বের সাক্ষ্য দেয়, অন্যদিকে ইতিহাস শুধু মাত্র সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে শেখায়। কিন্তু একটি ছবি তা যতই একটি বস্তুর অস্ত্বিত্বের সাক্ষ্য দিক না কেন, তা তো বস্তু নয়, তাকে বস্তু হতে হলে একজনকে হ্যালোসিনেশন এর মধ্য দিয়ে ছবি আর বাস্তবতার ফারাকটাকে ঘুচাতে হবে। ভাষায় যে ছবি বা ইতিহাস প্রতিভাত হয় তার তবে কত অযুত বাস্তবতা?

বাখতিন অন্যদিকে স্ট্রাকচারালিজম কে ভেঙ্গে দিতে চান। স্যস্যুরিয়ান অবস্থানের নিরিখে বাখতিনের অবস্থান যেন ভিন্নমুখী, স্ট্রাকচারালিজম এর এন্টিথিসিস আর কী হতে পারে? স্যস্যুর ভাষাকে দেখতে চান বিমূর্ত এবং রেডি-মেড সিস্টেম হিসাবে, বাখতিন দেখতে চান শুধু মাত্র জলজ্যান্ত বাচনিক গতিময়তার মধ্যে (ডায়নেমিকস অব লিভিং স্পিচ); স্যস্যুর এর মতে ভাষা একজন বক্তার কাছে পরোক্ষভাবে তৈরি হয়, বক্তার ফাংশন বা অপেক্ষক নয়; সেকারণে এই পরোক্ষতা তাঁর কাছে এক ধরণের ছদ্মরূপ বা অনুকরণ, অন্যদিকে বাখতিনের কাছে তা সংগ্রাম এবং বৈপরীত্যের প্রক্রিয়া; আর স্যস্যুর যেখানে ব্যক্তি এবং সমাজ কে দ্বি-মুখী করে দেখেন, সেখানে বাখতিন অনুমান করেন ব্যক্তি সমাজেরই সৃষ্ট একক, একারণে চেতনা হলো সংলাপ আর সমাজের ‘অন্যান্য’দের পাশাপাশি বা সন্নিধির মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপার। একারণেই বাখতিনের মতে পরোক্ষভাবে ভাষিক অর্থ অনুধাবনের মানে হলো আদপেই কোন অর্থ অনুধাবন না করা, এটা শুধুই অর্থের বিমূর্ত রূপ। আর এখানেই তিনি বলেন যে কোন সুনির্দিষ্ট উচ্চারণ বা উপন্যাসের বয়ান থেকে পাকাপোক্ত অর্থ উদ্ধার না করে এরূপ বিমূর্ত অর্থ তুলে আনা এক ধরণের কানাগলিতে পৌঁছানোর মতো, যেখানে ভাষিক মানদণ্ডের বিমূর্ততাকে মূর্তিমান করে তোলা হয়, বাস্তবতায় টেনে নামানো হয়, এবং এক রকমের ‘মডেল’ তৈরি করে যা দিয়ে ভাষার আর কোন আলোচনা সম্ভব হয় না-আর এখানেই, বাখতিনের মতে সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। এখানে স্যস্যুরিয়ানদের অনেক পৈতৃকসূত্রে পাওয়া ধ্যান-ধারণা যেমন ভাষা এবং ডিসকোর্সের মধ্যে পার্থক্য (লাঙ্গু ভারসাস প্যারোল), চিহ্নের অযৌক্তিক স্বভাব, এবং সরাসরি কবিতার ভাষা আর সাধারণ ভাষার মধ্যকার পার্থক্য এগুলো পুনরার্বিভূত হতে থাকে ‘ট্রান্সফরমেশনাল গ্রামারে’, পুরনো বা নতুন লিখন শৈলী এমনি কিছু আধা-মার্ক্সিস্ট তত্ত্বের মধ্যেও। এই পুনরায় আবির্ভাব কিন্তু সরাসরি বাখতিনের বিপক্ষে চলে যায়। কারণ বাখতিনের মতে যে উচ্চারণ ঘটে–তা একটি বিচ্ছিন্ন শব্দ, এমন কি পরিপূর্ণ সাহিত্য-রচনা, তা ঘটে একটি প্রাসঙ্গিকতার মধ্য দিয়ে, যাপিত সময়কালে। এ কারণে যতোই একটি উপন্যাসের বিষয়কে উপেক্ষা করতে চাই না কেন সেই বিষয় এবং বর্ণনার সামগ্রিকতা যা লেখকের সবচেয়ে শিল্পিত কাজ–তাকে শুধু ভাষার আঙ্গিকে সংকুচিত করা যায় না, বরং তা সামগ্রিকতার অবিচ্ছিন্ন অংশ, যেমন ভাষিক উপাদানগুলো হয়ে ওঠে সামগ্রিক উচ্চারণের অবিচ্ছিন্ন অংশ।[৩৫] এখানে আবারো হাসান আজিজুল হকের একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ
“…তাহলে সাহিত্যের জন্য আলাদা একটা জায়গা নির্ধারণ করতে হয়। তখন সেটাকে বিষয় দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। তখন জীবনঘনিষ্ঠ বলেও কোন লাভ হয় না। গ্রাম জীবন, সবার জীবন বলেও কোন লাভ হয় না। তারাশংকর গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, বিভূতিভূষণও গ্রাম নিয়ে লিখেছেন। তো বললেই হয় এরা তিনজনই গ্রামজীবনের লেখক। ব্যাস হয়ে গেল। তাতে সাহিত্যের কোন ভোগ হয় না, আস্বাদন হয় না। …আমার কতগুলো প্রশ্ন জাগে। সেজানের বইয়ের বিষয়বস্তু কি? সেই যে বিষয়বস্তুর আমি বিরোধিতা করলাম, তা-ই আবার জানতে চাচ্ছি। বিষয়বস্তু হলো সেই জায়গাটা যেখান থেকে আমি উড়তে শুরু করি। সাহিত্যের সেই জায়গাটা যেখান থেকে আমি পাখা মেলতে শুরু করি, যেখান থেকে আমি কলম চালাই, এবং যেখান থেকে আমি কিছুতেই বাস্তবকে হাজির করতে পারি না। আমি তখন ভাষার ভিতর দিয়ে ছবি বার করি, ভাষার ভিতর দিয়ে সৌন্দর্য বার করি।” (হাসান আজিজুল হক, ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলোচনা, ২০০৯)

এই যে নানাবিধ সাহিত্যতত্ত্বের আধার, তাতে যা উঠে আসে নতুন করে বা পুরনোভাবে তা হলো সমালোচক আর লেখকের কোন বিরোধ নেই। লেখক যেমন সমালোচক, সমালোচকও তেমনি লেখক। সমালোচনা সাহিত্য হবে নতুন নতুন ব্যাখ্যা, নতুন নতুন উন্মোচন। সেখানে লেখকও তো লেখা শেষে একজন পাঠক এবং সমালোচক। লেখকও উদ্ধার করতে পারেন নতুন মর্মার্থ, যা লেখার সময়ে কীভাবে লেখা হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই, বোর্হেজ যেমন বলেন, ‘আমি জানি না আমাদের দুজনের কোন জন এই পৃষ্ঠাখানি লিখেছে।’ লেখকের যতোই মৃত্যুর কথা বলা হোক না কেন, লেখক কে যতোই আলাদা করে টেক্সট-এর পাঠোদ্ধার হোক না কেন, তাতে লেখকের মৃত্যু তো হয়ই না বরং লেখক আরো মহীরূহ হয়ে ওঠেন। একারণেই ‘লেখকের মৃত্যু’র স্রষ্টা বার্থকেই লিখতে হয় ‘রলাঁ বার্থ বাই রলাঁ বার্থ’। লেখক তো বলতেই পারেন আমি আমার অভিজ্ঞতা, আমার মতো করে দিলাম, তোমার মতামত জানতে না, শেয়ার করতে। আবার পাঠকও বলতে পারেন তোমার লেখা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না এবং তা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন। কিন্তু পাঠক তা করেন একেবারে নিজস্ব, ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে। অন্যদিকে সমালোচক যখন যা বলেন তা নির্দিষ্ট গ্রন্থকে অব্জেক্টিফাই করে বলেন, যেখানে সৃজনের দায়ভার আরো বেশি। এভাবেই একই টেক্সটের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হবে, একজন সমালোচক সৃষ্টি করবেন মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ, তার ওপরে আরেক মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ, এক অন্তহীন সম্ভাবনা। আমি লাকাঁর ‘সিগনিফায়ার’ গুলোর তলে ’সিগনিফায়েড’ এর লুকিয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি ধাঁধাঁ দিয়েছিলাম,
‘হরির ওপরে হরি হরি শোভা পায়, হরি কে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়’ -এর মানে কি?

এখানে ‘হরি’ বিষ্ণু বা নারায়ণের এক নাম আবার ‘হরি’ দিয়ে অন্য দুই দেবতা ও বহুবিধ জিনিসকে বোঝাবার রীতি ছিল। যেমনঃ জল, পদ্মপাতা, ব্যাঙ, সাপ, কোকিল, সিংহ ইত্যাদি। তাহলে এই বাক্যের অর্থ হতে পারে,
‘জলের ওপরে পদ্মপাতায় ব্যাঙ শোভা পায়/ সাপ কে দেখে ব্যাঙ পানিতে লুকায়’।

এখানে জলের ওপরে পদ্মপাতা তার ওপরে ব্যাঙ ইত্যাদি পদার্থ আলাদা আলাদা অবস্থান করছে। লাকাঁর ধারণা মতে এবার অর্থগুলো এক করে দিলে কী হয়?
‘জলের ওপরে জল, জল শোভা পায়/জল কে দেখে জল জলেতে লুকায়’। [৩৬]

সাহিত্যেও তেমনি, একের ওপরে আরেক অর্থ যা আমাদের বস্তুজগত সম্পর্কে ইউক্লিডিয়ান ধারণাকে ভেঙ্গে সীমাহীন অর্থের ব্যঞ্জনা এনে দেবে, এই ব্যঞ্জনা কখনই কাল, ইতিহাস, সমাজ নিরপেক্ষ নয়। সেখানে কী পশ্চিম আর কী পূর্ব থেকে এলো তার তর্ক অর্থহীন, কে বড়? সমালোচক না লেখক সে তর্কও অর্থহীন।

আবার বাখতিনে ফিরে আসি; বাখতিন সেই আরিস্ততলের মতো সাহিত্যকে আত্মিক বা চৈতন্যের ‘সেফটি ভাল্ব’ হিসাবে দেখেন, যেমন আরিস্ততল দেখেছিলেন ঘন আবেগাশ্রিত শিল্প (যেমন, ট্রাজিক নাটক) কে সমাজের ‘রেচক’ বা বর্জ্যদূরীকরণের ‘সেফটি ভাল্ব’ হিসেবে। সেখানে ভাষা তাই সকল অর্গলমুক্ত। বাখতিনও স্ট্রাকচারালিজমের সকল দ্বি-মুখীনতাকে সজোরে অস্বীকার করেছেন; অস্বীকার করেছেন কার্তেসীয় বাস্তববাদিতা এবং লিবনিজ এর ‘ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ’ দিয়ে। সে আলোচনা হয়তো অন্য কোন দিন বা অন্য কোনখানে করা যাবে। কিন্তু ঠিক এইখানে এসে একটি বিপ্লবাত্মক আবিষ্কারের জানান দিয়ে আমার বক্তব্যের লক্ষ্য স্থির করে দেয়া যায়। আমি যখন এই লেখা লিখছি ঠিক তখন একজন এবং একদল বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক আবিষ্কার করে ফেলেছেন–কী করে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা একটি মাত্র ভাষা থেকে এসেছে, আলাদা আলাদা ভাষা থেকে হয় নি।[৩৭] এই আবিষ্কার মানুষের বংশগতির উন্নতির সঙ্গে এক করলে যা পাওয়া যায় তা সকল নৃবিজ্ঞানী, বিবর্তনবাদীদের একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর পেতে সাহায্য করে; প্রশ্নটি হলো এই যে বিভিন্ন গোত্রের আদি মানুষের মধ্য থেকে কোন একটি বিশেষ গোত্র সমস্ত সংগ্রামের মধ্যে টিকে থেকেছিল তার প্রধান কারণ কি? এর উত্তর নিহিত আছে এই ভাষার গবেষণায়; এই ভাষার শক্তির জন্যেই, এই যোগাযোগের উৎকর্ষের জন্যেই সেই গোত্র পেরেছিল অস্তিত্বের লড়াইয়ে জয়ী-পুরোধা হতে। যদি বাখতিন, দেকার্ত, লিবনিজের হাতে এই গবেষণার ফলাফল থাকতো তবে চমস্কির সঙ্গে ভিন্ন এক তাত্ত্বিক মোলাকাত হতো তাঁদের। অন্যদিকে মিশেল ফুকো যেখানে বলেছিলেন আগামী শতক হবে দেলুজিয়ান, তা ঠাট্টা করেই বলুন আর সত্যি করেই বলুন না কেন, দেলুজের ওপরে লিখতে গিয়ে কাসারিনো যে ‘ফিলোপয়েসিস’[৩৮] যা আমি বাংলায় বলবো ‘দর্শনাহিত্য’ নামের ভোকাবুলারির জন্ম দিলেন, তা হতে পারে সাহিত্য ও সমালোচনা সাহিত্যের এক কাঙ্খিত গন্তব্য। দেরিদার অধিবিদ্যামূলক ডিসকোর্স (পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম ও বিনির্মাণতত্ত্ব) দিয়ে প্রত্যক্ষবাদী বিশ্লেষণ করা হলে, বিশেষ করে ভাষার মতো অন্তহীন বায়বীয় ক্ষেত্রে, যুক্তিবিদ্যায় বা চৈতন্যের উপলব্ধিতে তা যে কতটা বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে তা-ও আমাদের অজানা নয়। একারণেই সাহিত্যের ভ্যালু জাজমেন্ট না করে এই যে লেখকের উপলব্ধি, যার শিল্পিত প্রকাশ ঘটলো, তার পাঠোদ্ধারে, দর্শনের নতুন নতুন মাত্রা আবিষ্কারে, দর্শনের গন্তব্য ও পদ্ধতিগত মূল্যায়ন কোরে, বিশ্বজনীন ভাষায়, কোন একদিন একক সাহিত্যের ভাষায় সৃষ্টি হবে ‘সাহিত্য সমালোচনার’ অন্য নাম ‘সমালোচনা সাহিত্য’। সেই সমালোচনা সাহিত্য রাজনৈতিক মুক্তি আন্দোলন না ঘটাতে পারলেও (যেমন পারে নি ফ্রান্সে)[৩৯] আমাদের চিন্তার মুক্তি ঘটাতে জারক রসের ভূমিকা অন্তত নিতে পারে। সেই দর্শনাহিত্য আর ভাষার এই মিলন নিয়ে কথা বলবো অন্য কোন দিন, অন্য কোন ভাষায়!

original post
read more

Saturday, September 17, 2011

গ্রীক পুরাণের মায়াবী সুরসৃষ্টিকারী রহস্যময়ী মৎসকন্যা সাইরেন ( যাদের অকৃত্রিম ভালবাসার কাছে পরাজিত হলাম, তাদের সবাইকে এই পোষ্ট উৎসর্গ করলাম )

by ইশতিয়াক আহমেদ চয়ন


মহাসমুদ্রের মৎসকন্যা বা সাইরেন(মারমেইড) ছিল গ্রিকপুরাণের মায়াবিনী গায়িকা। সুরের মায়াজাল সৃষ্টির মাধ্যমে তারা জাহাজের যাত্রীদের মৃত্যুর দিকে আকর্ষণ করতো। তাদের গানের গলা এতই চমৎকার ছিল যে সেই গান নাবিকদের কানে পৌঁছালে নাবিকরা সেই দ্বীপের দিকেই ধাবমান হতো। ফলে সেই জাহাজ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে মৃত্যুবরণ করত সবাই। সাইরেন ছিল নদীদেবতা একিলেপাসের কন্যা। হোমারের ওডিসিতে সাইরেনদের ঊর্দ্ধাংশ মানবী এবং নিম্নাংশ পাখির মত দেখতে বলা হয়েছে।

ওডিসি অনুসারে সাইরেন



কিন্তু অন্যান্য সূত্রে সাইরেনদের দেহের ঊর্দ্ধাংশ মানবী এবং নিম্নাংশ মাছের মত বলে জানা যায়। সাইরেনিয়া নামক একটি দ্বীপে ছিল সাইরেনদের বাস।


আর্গোনটরা ( সোনালী ভেড়ার চামড়া সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের দল ) একবার সাইরেনদের দ্বীপ অতিক্রম করতে যাচ্ছিল। তাদের পরিণতির কথা ভেবে দেবী আফ্রোদিতি অর্ফিউসকে সাইরেনদের দ্বীপ অতিক্রমনের সময় তাঁর বীনায় মোহময় সুর সৃষ্টি করতে নির্দেশ দেন। অর্ফিউস ছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব সুর স্রষ্টা।


দেবতাদের পর মরণশীলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সুরের জাদুকর এই অর্ফিউস। সে এক বিশেষ ধরনের বাশি বাজাত, যেটার নাম ছিল লাইর। দেবতা হারমিসের তৈরি এ বাশি পূর্ণতা পেয়েছে অর্ফিউসের কাছে। অর্ফিউস ছিল দেবতা অ্যাপোলোর পুত্র। অর্ফিউসের মা ছিল ক্যালিউপ। অর্ফিউসের বাস ছিল পিম্পলিয়ায় , যেখানে সে তার শৈশব মা এবং বোনদের সাথে কাটিয়েছে। দেবতা অ্যাপোলো অর্ফিউসকে খুব ভালবাসতেন এবং তিনিই প্রথম অর্ফিউসকে লাইর বাজানো শেখান।


জেসন ছিল আর্গোনট দলের নেতা। জেসনের দল যখন সাইরেনিয়া দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো , তখন অর্ফিউস তার বাঁশি বাজানো শুরু করলো । তার সুর সাইরেনদের সুরকে ছাপিয়ে গেলো । নাবিকরা নিরাপদে দ্বীপ পার হতে পারলো ।কিন্তু একজন আর্গোনট জাহাজের পাল ওড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় তার কানে অর্ফিউসের সুর প্রবেশে ব্যর্থ হয়। ফলে সে উন্মাদের মতো জাহাজ থেকে লাফিয়ে সাগরে পড়ে যায়। আফ্রোদিতি অবশ্য পরে তাকেও ঊদ্ধার করেন।


ট্রয়যুদ্ধ শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে মহাসমুদ্র দেবতা পোসিডনের ষড়যন্ত্রে দিকভ্রান্ত অডিসিউসও সাইরেনদের কবলে পড়েন। ফলে তিনি সাইরেনদের দ্বীপ অতিক্রম করার আগে প্রত্যেক নাবিকের কান মোম দিয়ে বন্ধ করে দেন এবং নিজেকে মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে রাখেন।

ফলে সাইরেনরা প্রথমবারের মতো ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতার লজ্জায় তারা সমুদ্রে ডুবে আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর পর সাইরেনরা সমুদ্রশিলায় পরিণত হয়। এভাবেই গ্রীক পূরাণের একটি চমৎকার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
original post
read more

Friday, August 12, 2011

গ্রীক পুরানের উপাখ্যান- প্রথম থেকে ব্যবচ্ছেদ। (পর্ব-১)

by তন্ময় ফেরদৌস


শুরুর কথা

ভূমধ্যসাগরের পূর্ব প্রান্তে ঈজিয়ান সমুদ্রের তীরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল সভ্যতা, মহান সভ্যতা, যাকে আমরা গ্রীক সভ্যতা বলে জানি। গ্রীস দেশীয় নলেজ, সাইন্স, ক্রিয়েটিভিটি আমাদের চিন্তা জগত কে আলো করে রেখেছে এখনো । সেই গ্রীস দেশের অমর কল্পকথার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য এই পোস্ট। আমি শুরু করবো একেবারেই প্রথমদিককার কাহিনী থেকে,যাতে পাঠকদের সুবিধা হয়।

সৃষ্টির শুরু,আদিম দেবতারা

দেবতারা বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন একথা গ্রীকরা বিশ্বাস করত না। তাদের বিশ্বাস ছিল বরং উলটো। বিশ্বই সৃষ্টি করেছেন দেবতাদের। স্বর্গ ও মর্তের সৃজন হয়েছে আরো আগে। আদিতে ছিল আদি জনক ও জননী। তাদের সন্তানরা হলেন টাইটান(Taitan) আর দেবতারা হলেন তাদের নাতি নাত্নী।
টাইটানদেরর বলা হয় বড় দেবতাকূল। তারা এক অজানা দীর্ঘসময় ধরে বিশ্ব শাষন করেছেন। তাদের আকার ছিল বিশাল,শক্তিমত্তা ছিল অসাধারন,সঙ্খায় ছিল অনেক। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন ছিলেন ক্রনাস(Cronus), লাতিন ভাষায় যার নাম স্যাটার্ন(Saturn)। তিনি টাইটান্দের উপর রাজত্ব করেন অনেক দিন।পরে তার পুত্র জিউস(Zeus) তার সিংহাসন কেড়ে নিয়ে দেবতাদের রাজত্ব শুরু করেন। এই জিউস কেই রোমানরা ডাকে জুপিটার(Jupiter) নামে। অন্যান্য বিক্ষাত টাইটানরা হলেন-
ওশান(Ocean)- নদী।
হাইপেরিওন(hyperion)- সূর্য
নেমসিনি(mnemosyne)- স্মৃতি
থেমিস(themis)- সুবিচার
আয়াপেটুস(iaputes) যার দুই পুত্র হলেন,
প্রমিথিউস(prometheus)- ত্রানকর্তা ও
আটলাস(atlus)- যার কাধের উপর পৃথিবী দাড়িয়ে আছে।
Click This Link

টাইটানদের সরিয়ে যে নতুন দেবতাকুল স্বর্গে রাজত্ব স্থাপন করেন তাদের মাঝে সবচেয়ে পাওয়ারফুল ছিলেন ১২ জন অলিম্পিয় দেবদেবী। অলিম্পিয় বলার সহজ কারন হল তাদের অধিস্তান ছিল অলিম্পাস।

এই দ্বাদশ সঙ্খক অলিম্পিয় গড়ে তোলেন এক দেব পরিবার। তারা হলেন,
জিউস- দেবরাজ

তারা দুই ভাই,পসাইডেন এবং হেডিস।
হেস্টিয়া- জিউসের ভগ্নি
হিরা - জিউসের পত্নী
এরিস- জিউস হিরার পুত্র
জিউসের অন্যান্য সন্তানরা হলেন,
এথিনা, এপোলো, আফ্রদিতি, হার্মিস, আরটেমিস এবং হেফাস্টুস।

original post
read more

লিও টলস্টয় ও এক যুবক

by আগন্তুক

বিখ্যাত রুশ লেখক মিঃ লিও টলস্টয় তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে বসে অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে কি যেন লিখছিলেন। এমন সময় একজন যুবক এসে করজোড়ে নিবেদন করল।

- স্যার, আমি এক অসহায় যুবক। পড়াশুনা করেছি বটে, কিন্তু চাকরির সংস্থান হয়নি। পুঁজির অভাবে কোন কাজ-কারবারও করতে পারছি না। এখন বড় আশা নিয়ে আপনারই আশ্রয়ে থাকতে চাই। দু'বেলা শুধু ডাল-রুটি দেবেন আর দরকারমত এক-ফালি পরনের কাপড়। এর পরিবর্তে যা খেদমত করতে বলবেন তাই করতে রাজি আছি। যুবকের একথা শুনে টলস্টয় বললেনঃ
-তুমি অসহায় যুবক? পুঁজির অভাবে ব্যবসা করতে পারছো না? এই দুটি প্রশ্ন করে যুবকের দিকে তিনি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
- জী হ্যাঁ, আমি সত্যি কথাই বলছি। যুবকের চেহারায় সরলতার ছাপ।
টলস্টয় যুবকের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন-
- আমার একজন ব্যবসায়ী বন্ধু আছেন। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিরাট কারবার তার। আমি একটি সুপারিশপত্রে লিখে দিলে তিনি তোমার দু'টি চোখই বিশ হাজার রুবলে কিনে নিবেন। কি বলো, দেবো সুপারিশপত্র লিখে?
- আমার দুটি চোখ বিক্রি করে ফেলবো? কি যে বলেন স্যার! যুবকটি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো। তখন টলস্টয় বললেন-
- চোখ না হয় নাই বিক্রি করলে, দুটি হাত তো বিক্রি করতে পার। এই দুটি হাতের দামও কম করে হলেও পনের হাজার রুবল হবে।
-হাত দুটি কেটে ফেললে আমি বাঁচবোই বা কি করতে?
যুবকটি তার হাত দুটির দিকে তাকাতে একথা বললো।টলস্টয় তখন বললেনঃ
- ঠিক আছে, চোখ ো হাত বিক্রির দরকার নেই। পাগুলো বিক্রি করে ফেল। আমার বন্ধু পায়ের ব্যবসাও করেন। আশা করি তিনি দশ হাজার রুবল দিয়ে তোমার পা দুটি কিনে নেবেন। তাহলেই তো তোমার পুঁজির সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
যুবকটি একথা শুনে কিছুটা ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বললোঃ
- আপনার মত একজন মহানুভব ব্যক্তির কাছে এসব কথা শুনবো তা কোন দিনই আশা করিনি।
যুবকটি তার এই মনোভাব প্রকাশ করে চলে যেতে উদ্যত হলো।
টলস্টয় বললেনঃ
- দাঁড়াও যুবক। তোমার জন্য আর একটি উত্তম প্রস্তাব আছে। তুমি যদি পুঁজির অধিকারী হতে চাও তাহলে পৃথকভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি না করে, এক লাখ রুবলে তোমার দেহটাই বিক্রি করে ফেলতে পার। আমার ব্যবসায়ী বন্ধু বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে নানা প্রকার ঔষধ তৈরি করেন। আমি মনে করি, তিনি তোমাকে এক লাখ রুবল দিতে অনায়াসে রাজি হবেন। এবার তোমার মতামতটা চট করে বলে ফেল।
- এক লাখ কেন, এক কোটি রুবলেও আমি আমার দেহ বিক্রি করব না।
যুবকটি রাগে কাঁপছিল। টলস্টয় এবার যুবকটির দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেনঃ
- যে ব্যক্তি এক কোটি রুবলেও তার দেহ বিক্রি করতে রাজি নয়, সে কি করে বলতে পারে যে, আমি অসহায়, পুঁজির অভাবে কারবার করতে পারছি না?যুবক, তোমার এই চোখ, এই হাত আর এই পা এবং সুন্দর দেহটি এক একটি মহামূল্যবান পুঁজি। কর্তব্যনিষ্ঠা এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে যদি এগুলো সদ্ব্যবহার কর তাহলেই অচিরেই তোমার অসহায়ত্ব ঘুচে যাবে। এবার বুঝলে তো?
যুবকটি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে টলস্টয়ের চেহারার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেল। এখন তার চেহারাটি কিন্তু আর অসহায়ের মত নয়; বরং সমাজের দশজন বীরের মত, যাদের নিয়ে যেকোনো সমাজ গর্ব করতে পারে।Justify Full
original post
read more

বিবেকানন্দের আসল চেহারা: উৎসর্গ চে গুয়েভারা

by সত্যকথন





বিবেকানন্দ খারাপ না ভাল, তা আসল বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো জোকার নায়েক হলো বিবেকানন্দের ভক্ত। জোকার নায়েক প্রকাশ্য স্টেজে বিবেকানন্দের নাম উচ্চারণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। জোকার নায়েক যে বলে সে নিজে মুসলমান হলেও হিন্দু! কথাটা বিবেকানন্দের বই থেকে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ জোকার নায়েক হলো হিন্দুদের দালাল। ভারতে হিন্দুধর্মের প্রকাশ্য সমালোচনা করে সে হিন্দুদের হাতে দাঙ্গার ইস্যু তুলে দিচ্ছে।

মুসলমানরা পড়াশোনা করে না। তাই আমাদের দেশে প্রচলিত মত বিবেকানন্দ নাকি অসাম্প্রদায়িক! আর জোকার নায়েক যে বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য এটা বোঝার জন্য পড়াশোনা করা দরকার। বিবেকানন্দের বই ঘেঁটে আমি জোকার নায়েক কেন বিবেকানন্দ তথা হিন্দুত্ববাদের সোল এজেন্ট, সেগুলো নির্দিষ্ট করেছি। যেভাবে বিবেকানন্দকে সাম্প্রদায়িক প্রমাণ করেছি জোকার নায়েককেও প্রমাণ করব বিবেকানন্দের রচনা অনুসরণকারী ভাবশিষ্য হিসেবে। )

আমি আমার কলেজ লাইফে নটরডেমের এক কেমিস্ট্রি শিক্ষকের নিকট পড়তাম। তার পড়ানোর যে রুম তার মুখোমুখি দুটি দেয়ালে দুটি পোস্টার। একটিতে হিন্দুদের অবিসংবাদিত অনুসরণীয় বিবেকানন্দ, তার মুখোমুখি উল্টোদিকের দেয়ালে ঝুলতো অরবিন্দ ঘোষের(শ্রী অরবিন্দ) পোস্টার। বিবেকানন্দের পোস্টার বাংলাদেশের যেকোন হিন্দুবাড়িতেই দেখা যাবে, যে কিনা রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা। অরবিন্দ ঘোষের পোস্টার দেখার পর আমি কিছুটা কৌতুহলী হয়ে তার ব্যাপারে জানার চেষ্টা করি। উইকিপিডিয়ায় তার ব্যাপারে বলা আছে যে সে ছিল ব্রিটিশআমলে কংগ্রেসের ডানপন্থী বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী উইংয়ের প্রধান। তার লক্ষ্য ছিল বঙ্কিমের আনন্দমঠ উপন্যাসটির(অপন্যাস) আদর্শে হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনকে উজ্জীবিত করা। বঙ্কিমের আনন্দমঠ উপন্যাসটির মূলমন্ত্র হলো ভারতবর্ষ থেকে সমগ্র মুসলিম জাতিকে নির্মূল করে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, সুতরাং অরবিন্দ ঘোষের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই।

আমার বর্ণমালা ব্লগে
চে গুয়েভারার একটি পোস্টে বিবেকানন্দের প্রশংসায় অনেককিছুই বলা হয়েছে। তার ভূরি ভূরি প্রশংসা আছে ইন্টারনেটেও। তবে আমি ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিগোষ্ঠী বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মাসিক ম্যাগাজিনে বিবেকানন্দের ছবিসহ প্রচ্ছদ দেখেছি। এবং আমি যখন চে গুয়েভারার পোস্টে কমেন্ট করেছিলাম বিবেকানন্দও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত নয়, চেও পাল্টা অযৌক্তিক তর্কে লিপ্ত হয়। যাই হোক, আমি বিবেকানন্দের হিন্দুত্ববাদী চরিত্র সম্পর্কে লিখতে বসেছি। এখানে কেউ সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করলে আমার কিছু করার নেই, কারণ যা বলতে চলেছি তা নির্মম সত্য। আশাকরি মডারেশন বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না।
বিবেকানন্দের সব রচনা আট খন্ডে সংকলিত হয়েছে। তাতে বিবেকানন্দ ইসলাম সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছে তা একসাথে সংকলিত করে একটি ই-বুক আছে জি এম জগতিয়ানির। আমি আট খন্ড থেকে সব উদ্ধৃতি দিতে যাব না। একটি উদ্ধৃতি দিয়েই দেখাব যে বিবেকানন্দ আর সামুর হিন্দুনাস্তিকদের মধ্যে আসলে কোনই পার্থক্য নেই। পুরোটা জানার ইচ্ছা থাকলে

এই হলো বইটির লিংক।

বইটি ইংরেজিতে লেখা। একটি উদ্ধৃতি তাতে আছে এরকম
Mohammed claimed that the Angel Gabriel
came to him in a cave one day and took him on the
heavenly horse, Harak and he visited the heavens.
But with all that, Mohammed spoke some
wonderful truths. If you read the Koran, you find
the most wonderful truths mixed with
superstitions. How will you explain it? That man
was inspired; no doubt, but that inspiration was as
it were, stumbled upon. He was not a trained Yogi,
and did not know the reason of what he was doing.
Think of the good Mohammed did to the world,
and think of the great evil that has been done
through his fanaticism! Think of the millions
massacred through his teachings, mothers bereft
of their children, children made orphans, whole
countries destroyed, millions upon millions or
people killed! (1.184)
* * * *
মিরাজ শরীফের বিরুদ্ধে জঘন্য বক্তব্যধারী এ লাইনগুলো বাংলায় অনুবাদ করার রুচি আমার হচ্ছেনা। কিন্তু একটি কথা সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাই। বিবেকানন্দ তার বক্তব্যে যোগীদের স্বয়ং হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরও উপরে তোলার কোশেশ করেছে(নাউযুবিল্লাহ)। এখন ইন্টারমিডিয়েটের বাংলা বইয়ের প্রথম গল্পটির নাম শকুন্তলা। সেই গল্পে শকুন্তলার জন্মকাহিনী এরকম(অনেকেই জানেন), হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড় ঋষি বিশ্বামিত্র ইন্দ্রত্ব লাভের উদ্দেশ্যে যখন তপস্যার মগ্ন হলো তখন ইন্দ্র ভীত হয়ে অপ্সরা মেনকাকে পাঠালো বিশ্বামিত্রের তপস্যাভঙ্গ করতে। মেনকা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে বিশ্বামিত্রের সামনে উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র ধ্যানভঙ্গ করে মেনকার সাথে মিলিত হয়, এ অবৈধ মিলনের ফসল হলো শকুন্তলা। সবচেয়ে বড় যোগীটার অবস্থাই যদি এরকম হয়, অন্যদের অবস্থা যে তাহলে কি হবে! আর তাদেরই লুলমার্কা ধ্যান নিয়ে বিবেকানন্দের সে কি উচ্ছাস তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
original post


read more

paganism-পৃথিবীর ইতিহাস থেকে এখন প্রায় বিলুপ্ত এক সময়ের প্রবল প্রভাববিস্তারকারী যে ধর্মটি:|:|

by নিয়নের আলো

paganism শব্দটার সাথে ঠিক কখন থেকে পরিচয় মনে নেই।তবে এটুকু বলতে পারি গল্প উপন্যাস বা মুভি যেখানেই শব্দটি সামনে এসেছে একটা অস্পষ্টতা তৈরি করে রেখেছে সবসময়।ঠিক ইতিহাসের লুকায়িত পাতাগুলোর মতই এই paganism কে এখনো লুকোছাপা দেওয়া হয় সব জায়গায়।কিন্তু কেন??আসুন জেনে নিই এই paganism সম্পর্কে
pagan শব্দটি মুলত এসেছে paganus থেকে যার সহজ মানে villeger বা rural. খুব সহজেই আমরা এথেকে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি এই paganism কাদের ধর্ম ছিল বা কারা এই ধর্মের অনুসারী ছিলআসলে পেগানিজম প্রাচীন গ্রিস আর রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটা বিশাল সংখ্যক মানুষের ধর্ম বা বিশ্বাস ছিল যাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামের অধিবাসী

সংক্ষেপে যদি এই পেগানিসমের ইতিহাস বলতে যাই তবে বলতে হবে পেগানিজমের শুরুটা মানব সভ্যতার বেশ আগে থেকেইযতটুকু এখন পর্যন্ত জানা গেছে তাতে ধারনা করা হয় পেগানিজমের শুরুটা stone age বা প্রস্তর যুগ থেকে
পেগানিজমের উপযুক্ত সংজ্ঞা কি হবে টা নিয়ে বেশ খানিকটা মতভেদ আছে ইতিহাসবিদদের মতেতবে একটা বিশাল অংশের মতে পেগানিজম হল judaism, christianity, islam অথবা hinduism এর বাইরে একটা বিশ্বাস যেটা একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে,এবং এই ঈশ্বরের ধারনাটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিকঅর্থাৎ বর্তমান প্রচলিত ধর্মগুলোতে যেরকম ঈশ্বরের একটা স্থায়ী রুপ অথবা সংজ্ঞা পাওয়া যায় পেগানিজমে তা ছিলনা পেগান রা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঈশ্বরের সংজ্ঞা পাল্টাতযেমন ধরেন কোন বছর যদি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হত তখন তারা বৃষ্টিকে দেবতা বানিয়ে পুজা করতঅবশ্য এগুলো পেগানিজমের এক্কেবারের শুরুর কথাআরেকভাবে অবশ্য অনেকেই পেগানিজম কে সংজ্ঞায়িত করেনতাদের কাছে পেগানিজম হল – simply being without any religion.

pagan দের বিশ্বাসঃ প্রথমেই বলেছি পেগান রা একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতঅবশ্য আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মত তাদের স্বর্গ বা নরকের কোন ধারনা ছিলনা বা তারা এগুলতে বিশ্বাস করতনাতবে একটি জায়গায় হিন্দু ধর্মের সাথে বেশ মিল পাওয়া যায় সেটি হল -পুনর্জন্মপেগানরাও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ছিলতাছাড়া পেগানরা পৃথিবীর বেসিক চারটি এলিমেন্টে বিশ্বাস করতএগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু করে বলি-
১। earth: পৃথিবীকে তারা স্ত্রীলিঙ্গ সম্বন্ধীয় ভাবতকারন পৃথিবী উর্বর এবং আমাদের জন্ম পুনর্জন্মের ধারক এই পৃথিবী ঠিক যেমন করে মা সন্তানকে ধারন করে জন্ম দেয়
২। air: বাতাস ছিল তাদের কাছে breath of life.তারা ভাবত বাতাস আমাদের সমস্যা বইয়ে নিয়ে যায় দূরে এবং positive thoughts গুলো আমাদের নিকটবর্তী করে দেয়
৩।fire:আগুনকে তারা সকল শক্তির আঁধার ভাবতআগুনের ধ্বংস এবং গড়ার ক্ষমতা আছে বলে এটি তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল
৪।water:পানি ছিল ঈশ্বরের উপাদানকারন এর রয়েছে শুদ্ধ এবং হিল করার ক্ষমতা

নিচের প্যান্টাকলটি দেখেন।এখানে পেগানিজমের চারটি মুল উপাদানের সাথে মানুষের অস্তিত্তের সম্পর্ক দেখান হয়েছে।আর এইজন্যই পেন্টাকল পেগানিজম মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিম্বল।



এবার আসি কিভাবে পেগান ধর্ম আর তার অনুসারীরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায়??

আসলে সে সময়ে রোমে যখন হঠাৎ করে যখন একটা বিশাল শক্তিরূপে আবির্ভূত হল তখন পেগানিজমের মৃত্যু অনেকটা পাকাপোক্ত হয়ে গেলতখনকার অধিকাংশ রাজা বা সম্রাটরা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করে নিলে সাধারন পেগানদের উপর চূড়ান্তরকম নির্যাতন চালানো হয়এভাবেই একটা বিশাল অংশ মানুষ পেগান থেকে রুপান্তরিত হয় বা তাদের কে মৃত্যু বরন করে নিতে হয়বর্তমান খ্রিষ্টান ধর্মের এত বিশাল অনুসারির পিছনে এইসব আগ্রাসনের ভুমিকা ছিল অনেকখানিআর তাই বর্তমান খ্রিষ্টান ধর্ম অনেকাংশেই পেগান প্রভাব যুক্তএমন অনেক জিনিসই রয়েছে যেগুলো আমরা খ্রিষ্টানদের বলে জানি অথছ সেগুল ছিল পেগানদের থেকে ধার করা-
যেমন যীশুর জন্ম আমরা ২৫ ই ডিসেম্বার বলে জানি কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই মিথ্যাকারন যীশুর জন্ম হয়েছিল এপ্রিলেআর ২৫ ই ডিসেম্বার ছিল পেগানদের উতসবের দিনকিন্তু ইতিহাসে ফাঁদে পড়ে এই দিনের তাৎপর্য এখন ভিন্নরকম

তাছাড়া এখনকার খ্রিস্টানদের ক্রস বলে যে জিনিসকে আমরা চিনি তাও পেগানদের থেকে ধার করা-

এখনকার খ্রিস্টানদের ক্রস

পেগান ক্রস

এখন খ্রিষ্টানদের দুহাত জোর করে প্রার্থনা করার ভঙ্গি টাও পেগানদেরএই রকম হাজারো জিনিশ আছে যেগুলো পেগানিজমের থেকে ধার করা
আসলে তখন পেগানরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিলএই জন্যই তারা অনেক আগ্রাসনের শিকার ছিল এবং পরবর্তীতে তাদের জিনিসগুলো স্রেফ চুরি করা হয়েছে
original post
read more

paganism-পৃথিবীর ইতিহাস থেকে এখন প্রায় বিলুপ্ত এক সময়ের প্রবল প্রভাববিস্তারকারী যে ধর্মটি:|:|

by নিয়নের আলো

paganism শব্দটার সাথে ঠিক কখন থেকে পরিচয় মনে নেই।তবে এটুকু বলতে পারি গল্প উপন্যাস বা মুভি যেখানেই শব্দটি সামনে এসেছে একটা অস্পষ্টতা তৈরি করে রেখেছে সবসময়।ঠিক ইতিহাসের লুকায়িত পাতাগুলোর মতই এই paganism কে এখনো লুকোছাপা দেওয়া হয় সব জায়গায়।কিন্তু কেন??আসুন জেনে নিই এই paganism সম্পর্কে
pagan শব্দটি মুলত এসেছে paganus থেকে যার সহজ মানে villeger বা rural. খুব সহজেই আমরা এথেকে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি এই paganism কাদের ধর্ম ছিল বা কারা এই ধর্মের অনুসারী ছিল।আসলে পেগানিজম প্রাচীন গ্রিস আর রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটা বিশাল সংখ্যক মানুষের ধর্ম বা বিশ্বাস ছিল যাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামের অধিবাসী।

সংক্ষেপে যদি এই পেগানিসমের ইতিহাস বলতে যাই তবে বলতে হবে পেগানিজমের শুরুটা মানব সভ্যতার বেশ আগে থেকেই।যতটুকু এখন পর্যন্ত জানা গেছে তাতে ধারনা করা হয় পেগানিজমের শুরুটা stone age বা প্রস্তর যুগ থেকে।
পেগানিজমের উপযুক্ত সংজ্ঞা কি হবে টা নিয়ে বেশ খানিকটা মতভেদ আছে ইতিহাসবিদদের মতে।তবে একটা বিশাল অংশের মতে পেগানিজম হল judaism, christianity, islam অথবা hinduism এর বাইরে একটা বিশ্বাস যেটা একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে,এবং এই ঈশ্বরের ধারনাটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক।অর্থাৎ বর্তমান প্রচলিত ধর্মগুলোতে যেরকম ঈশ্বরের একটা স্থায়ী রুপ অথবা সংজ্ঞা পাওয়া যায় পেগানিজমে তা ছিলনা। পেগান রা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঈশ্বরের সংজ্ঞা পাল্টাত।যেমন ধরেন কোন বছর যদি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হত তখন তারা বৃষ্টিকে দেবতা বানিয়ে পুজা করত।অবশ্য এগুলো পেগানিজমের এক্কেবারের শুরুর কথা।আরেকভাবে অবশ্য অনেকেই পেগানিজম কে সংজ্ঞায়িত করেন।তাদের কাছে পেগানিজম হল – simply being without any religion.

pagan দের বিশ্বাসঃ প্রথমেই বলেছি পেগান রা একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করত।অবশ্য আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মত তাদের স্বর্গ বা নরকের কোন ধারনা ছিলনা বা তারা এগুলতে বিশ্বাস করতনা।তবে একটি জায়গায় হিন্দু ধর্মের সাথে বেশ মিল পাওয়া যায় সেটি হল -পুনর্জন্ম।পেগানরাও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ছিল।তাছাড়া পেগানরা পৃথিবীর বেসিক চারটি এলিমেন্টে বিশ্বাস করত।এগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু করে বলি-
১। earth: পৃথিবীকে তারা স্ত্রীলিঙ্গ সম্বন্ধীয় ভাবত।কারন পৃথিবী উর্বর এবং আমাদের জন্ম পুনর্জন্মের ধারক এই পৃথিবী ঠিক যেমন করে মা সন্তানকে ধারন করে জন্ম দেয়।
২। air: বাতাস ছিল তাদের কাছে breath of life.তারা ভাবত বাতাস আমাদের সমস্যা বইয়ে নিয়ে যায় দূরে এবং positive thoughts গুলো আমাদের নিকটবর্তী করে দেয়।
৩।fire:আগুনকে তারা সকল শক্তির আঁধার ভাবত।আগুনের ধ্বংস এবং গড়ার ক্ষমতা আছে বলে এটি তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল।
৪।water:পানি ছিল ঈশ্বরের উপাদান।কারন এর রয়েছে শুদ্ধ এবং হিল করার ক্ষমতা।

নিচের প্যান্টাকলটি দেখেন।এখানে পেগানিজমের চারটি মুল উপাদানের সাথে মানুষের অস্তিত্তের সম্পর্ক দেখান হয়েছে।আর এইজন্যই পেন্টাকল পেগানিজম মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিম্বল।



এবার আসি কিভাবে পেগান ধর্ম আর তার অনুসারীরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায়??


আসলে সে সময়ে রোমে যখন হঠাৎ করে যখন একটা বিশাল শক্তিরূপে আবির্ভূত হল তখন পেগানিজমের মৃত্যু অনেকটা পাকাপোক্ত হয়ে গেল।তখনকার অধিকাংশ রাজা বা সম্রাটরা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করে নিলে সাধারন পেগানদের উপর চূড়ান্তরকম নির্যাতন চালানো হয়।এভাবেই একটা বিশাল অংশ মানুষ পেগান থেকে রুপান্তরিত হয় বা তাদের কে মৃত্যু বরন করে নিতে হয়।বর্তমান খ্রিষ্টান ধর্মের এত বিশাল অনুসারির পিছনে এইসব আগ্রাসনের ভুমিকা ছিল অনেকখানি।আর তাই বর্তমান খ্রিষ্টান ধর্ম অনেকাংশেই পেগান প্রভাব যুক্ত।এমন অনেক জিনিসই রয়েছে যেগুলো আমরা খ্রিষ্টানদের বলে জানি অথছ সেগুল ছিল পেগানদের থেকে ধার করা-
যেমন যীশুর জন্ম আমরা ২৫ ই ডিসেম্বার বলে জানি কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই মিথ্যা।কারন যীশুর জন্ম হয়েছিল এপ্রিলে।আর ২৫ ই ডিসেম্বার ছিল পেগানদের উতসবের দিন।কিন্তু ইতিহাসে ফাঁদে পড়ে এই দিনের তাৎপর্য এখন ভিন্নরকম।

তাছাড়া এখনকার খ্রিস্টানদের ক্রস বলে যে জিনিসকে আমরা চিনি তাও পেগানদের থেকে ধার করা-

এখনকার খ্রিস্টানদের ক্রস

পেগান ক্রস

এখন খ্রিষ্টানদের দুহাত জোর করে প্রার্থনা করার ভঙ্গি টাও পেগানদের।এই রকম হাজারো জিনিশ আছে যেগুলো পেগানিজমের থেকে ধার করা।
আসলে তখন পেগানরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিল।এই জন্যই তারা অনেক আগ্রাসনের শিকার ছিল এবং পরবর্তীতে তাদের জিনিসগুলো স্রেফ চুরি করা হয়েছে।
original post
read more

Wednesday, August 10, 2011

রাজা যায় রাজা আসে

by স্বপ্রত্যয়

বিপ্লবের জন্মের সময়টার কথা মনে আছে দাদী জেবুন্নেসা খাতুনের। জোছনার বাধ ভাঙ্গা আলো উপচে পড়ছিল গ্রাম জুড়ে। মেঘহীন নিকষ কালো আকাশ ভেদ করে জ্বলজ্বল করে দম্ভ ছড়াচ্ছিল তারকারাজি। দাদী অনেক শখ করে রাখলেন নাম বিল্পব। ছেলে তাহেরকে বললেন, দেখিস তোর ছেলে একদিন দেশে বিপ্লব ঘটাবে। ছড়িয়ে দেবে পরিবারের নাম সারা দেশ জুড়ে। রাজা উজির নাজির এক বাক্যে সম্মান করবে ছেলেকে।

ছেলেবেলা থেকেই আদরের বড়ছেলে বিপ্লব ননীটা আর ছানাটা খেয়েই বড় হতে থাকে। ডানপিটে বিপ্লব হয়ে যায় বন্ধুমহলে একচ্ছত্র অধিপতি। বাবার প্রভাব প্রতিপত্তিও কম বাড়েনা। বাপকা বেটা সিপাইকা ঘোড়া। নিজেদের রাজার আমলে শহর কব্জা করে নেয় স্বপরিবারে। ডন নামে খ্যাতি ছড়াতে থাকে তাহের। আর তার ছেলেরা সহযোগী হয়ে এগিয়ে নিতে থাকে বাবাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে। তাহেরের আরও দুই ছেলে টিপু আর লাবু। তিন ভাইয়ে মিলে চলে রাজার অধীনে থেকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা।

টিপু - বড় ভাই, শুনছেন নাকি ঘটনা?
বিপ্লব - কি হইছে?
টিপু - কি হয়নাই তাই কন। দুইদিনের পোলা কামাল। ঐ রাজার আন্ডারে কাম করেনা! ঐ কামাল! ফাল পাড়তাছে বড্ড বেশী। বাপজানের পিছে লাগছে।
লাবু- বড় ভাই, কথা সত্য। আপনে কইলে ফালাই দেই।
বিপ্লব - কওনের কি আছে! বাপজানের দিকে যে চোখ তুইলা তাকাইব। ফালাই দিবি। আমারে জিগানোর দরকার নাই।
লাবু - তারপরও বড় ভাই! অন্য রাজার জিনিষ ওইটা। যদি আমাগো রাজা আবার বিপদে পড়ে! আপনে একটু চেক করে দেখেন। সমস্যা হইব কিনা রাজার তরফ থেকে।
বিপ্লব - তোরা কি মনে করস! আমি কি ঘুমাই থাকি! সব জানা আছে আমার। চিন্তা নাই। উপর থেকে গ্রিন সিগন্যাল আছে। ফালাই দিয়া আমারে জানাস।

কিছুদিন পরের কথা।

আসর বসেছে বিপ্লব আর তার সাঙ্গপাংগদের। টুয়েন্টি নাইন আর বাংলা মদের মাঝে শুধু হই হুল্লোড়। লাল ছিট দুইটা খাইয়া বিপ্লবের মেজাজ তুঙ্গে। খেলা বাদ দিয়া ধান্দা করতেছে উইঠা ঐ পাড়ার দিকে যাবে কিনা। এমন সময় হুরমুর করে তার ভাই লাবি আর টিপুর আগমন। বলে, বড় ভাই আব্বায় ডাকছে আপনেরে। এমারজেন্সি, চলেন।

ঘরে ফিরে তাহেরের সম্মুখীন হয় তিন ছেলে।

তাহের - তোমরা বস। জরুরী কথা আছে।
বিপ্লব - কি কথা বাপজান।
তাহের - কামালরেতো ফালাইলা। ঠিক আছে। কিন্তু কামালের মামলা নিয়া বড় বেশী নড়াচড়া হইতেছে এইটা খবর রাখো?
বিপ্লব - জী বাপজান। নুরুল ইসলাম উকিল। ওইটারে আমি নিজে গিয়া সাবধান হইতে কইছি। কইলাম বৌ বাচ্চা আছে তোমার, তুমি এত ফাল পাইরো না। তারপরও তার লাফানি কমেনা। কি করুম আর!
তাহের - কি করবা মানে! বান্দির বাচ্চারে ধইরা লইয়া আস। আমি এক্ষণই তার লগে কথা কইতে চাই।
লাবু - বাপজান। এরে ধরলে আরও নড়াচড়া হইতে পারে কিন্তু।
তাহের - চুপ বেটা ভীতু। এই তাহেরের উপর কথা কইব এই শহরে বাপের বেটা কয়টা আছে। যা কইছি তাই কর।

তিন ভাই তৎক্ষণাৎ তাদের দলবল নিয়ে ছুটে নুরুল ইসলামের সন্ধানে। গভীর রাতে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসে নিজেদের বাসায়। বন্ধ রুমে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখে। কিছুক্ষণ পড়ে তাহের আর তার তিন ছেলে ঢুকে ঐ রুমে।

তাহের - নুরল ভাল আছো?
নুরুল ইসলাম - আমাকে ধরে এনেছেন কেন?
তাহের - তুমি নাকি কোর্টে আমার মুখোমুখি হইবা। হাজতে পুরবা আমারে একথা বলছ। তাই জানতে তোমারে একটু তলব করলাম আরকি।
নুরুল ইসলাম - হা বলেছি। আপনি যা করছেন এই শহরে, তা কখনোই শহরবাসী মেনে নিবেনা।
তাহের - শহরবাসীর কথা কও কেরে নুরুল। কও তোমার রাজার সাঙ্গপাংগরা।
নুরুল ইসলাম - আপনি একটা কসাই। আপনার ছেলেগুলা সবাই একেকটা খুনি। আপনাদের শাস্তি অবশ্যই হবে।
বিপ্লব - কি নুরুইল্লা! আমার বাপজানরে এত বড় কথা!

প্রচণ্ড থাবড়া খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে নুরুল ইসলাম মেঝেতে। মুহূর্তেই টের পায় গলা চিরে ধারোলো ছুরির ফলা ভেদ করে যায় কন্ঠ নালী। বুক ফেটে বের হতে চায় একটি কথা। কিন্তু বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পায়না। চোখের কোনে দেখতে পায় রক্তের ধাঁরা বয়ে চলে খরস্রোতা নদীর মত তীব্র গতিতে। অন্ধকার হয়ে যায় সব কিছু ধীরে ধীরে।

তাহের - বিপ্লব এইটা তুই কি করলি! বাসার মধ্যে কামটা না করলেও পারতি।
বিপ্লব - বাপজান, আপনেরে নিয়া কেউ কিছু কইলে আমার দিলে সয়না।
তাহের - লাবু, টিপু তোরা এক কাম কর। এই লাশ যেন পৃথিবীর কেউ না দেখতে পায়। টূকরা টুকরা কইরা গাঙ্গের জলে ভাসায় দে।

নুরুল ইসলামের অন্তর্ধানে শোকাহত হয়ে যায় শহরবাসী। ধিক্কারের কোলাহলে সরব হয়ে ওঠে সর্ব খানে। নিজ রাজার আমলে তাহের গং রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমজনতার পক্ষে কথা বলতে সাংবাদিক ভাইয়েরা এলে গডফাদার তাহের তাদের হাত পা ভেঙ্গে নদীতে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়।

রাজা যায় রাজা আসে। আগের রাজা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মৃত নুরুল ইসলামের রাজা আসে। এতদিন শিকেয় তুলে রাখা বিচার, দ্রুতগতিতে শেষ হয়। দোষীরা শাস্তি পায়। তাহেরের তিন ছেলে নুরুল ইসলাম আর কামাল হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। রাজার পরিবর্তনে বিপ্লব বিপদ বুঝে গাঁ ঢাকা দেয় চিরতরে।

আবারও রাজ্যের পট পরিবর্তনে বিপ্লবের রাজা আসে। নিজের রাজাকে পেয়ে তাহের নতুন করে সমীকরণ আকে। রাজার গ্রিন সিগন্যালে পলাতক বিপ্লব আত্মসমর্পণ করে। ছককষা আবেদনে রাজা তুলে নেন মৃত্যুদন্ডাদেশ।

রাজা আসবে যাবে। গডফাদারেরা হুঙ্কার ছুড়ে ধ্বংসের খেলাতে মেতে উঠবে। কোন এক নুরুল ইসলাম আবারও মারা যাবেন। কিন্তু নুরুল ইসলামদের মৃত্যুক্ষণে যে কথাটা হৃদয়ে আটকে যায়। যে প্রিয় মুখগুলোর চেহারা ভেসে ওঠে মনসপটে। সেই প্রিয় মুখ স্মরণের বানীটি কে পৌঁছে দেবে তার প্রিয় মানুষদের। কে পৌঁছবে তার ছেলেকে বলা কথাটা, "আমার সোনাবাবাটা, তোকে আমি অনেক অনেক ভালবাসিরে।"

দাদী জেবুন্নেসা থুরথুরে বুড়ী আজ। চিন্তা শক্তির ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। কিন্তু তাও বুঝতে পারে, তার বিপ্লব আজ সত্যিই দেশে বিপ্লব ঘটিয়েছে। রাজা উজির নাজির সত্যিই তার জন্য ব্যাস্ত হয়ে উঠে পড়েছে। স্বয়ং রাজা এসে তাকে জীবন দান করলেন। কত বড় হয়েছে ছেলেটা। জেবুন্নেসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন, এমন বড় হওয়ার স্বপ্নতো তিনি দেখেননি। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আজ আর উনার কিছুই করার নাই।
original post
read more

Tuesday, August 9, 2011

ঈশ্বরের অস্তিত্ব : আমার চিন্তাভাবনা

by বুড়ো শালিক

ইদানিং ব্লগে একটা ব্যাপার খুব আলোচিত, সমালোচিত হচ্ছে। আর তা হলো ঈশ্বর আছে কি নেই তা নিয়ে আস্তিক এবং নাস্তিকদের মধ্যে প্রবল তর্কযুদ্ধ, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে গালি গালাজ। এসব দেখে আমার মনে হলো আমার নিজের ধারণাটাও সবাইকে জানাতে পারি। প্রথমেই সবার উদ্দেশ্যে বলে রাখি, আমি ব্লগিং এ একেবারেই নতুন। নিয়ম কানুন খুব একটা জানিনা। তবুও লিখছি, নতুন করে কোনো বিতর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, শুধু নিজের মতামত বা চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করার জন্য। যদি এই লেখা কারো দৃষ্টিতে পড়ে এবং কেউ এটাকে বিশ্লেষণ করতে চান বা আমার সাথে দ্বিমত বা সহমত পোষণ করতে চান, তাহলে তাকে স্বাগত জনাব। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই ভদ্র ব্যবহার প্রত্যাশা করব। আর হ্যা, যদি কেউ এটা থেকে কোনো রেফারেন্স দিতে চান (যদিও রেফারেন্সের যোগ্য কি না জানিনা), তবে আমার অনুমতি নিয়ে নিলে খুশি হব।

এবার আসি মূল কথায়। আমার ধর্ম বিশ্বাস আপাতত কাউকে জানাতে চাচ্ছিনা। তবে সেটা এই পোস্টের শেষে বলে দিয়েছি। জানাতে চাচ্ছিনা, কারণ আমি চাই না কেউ আমার এই লেখাটি একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়ুক। এখন যদি আমি বলে দেই আমি আস্তিক, বা আমি নাস্তিক, তাহলে লেখাটা অনেক খানি প্রভাবিত হয়ে যাবে, পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে। আস্তিক পাঠকরা আমার লেখাটি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়বেন, আর নাস্তিক পাঠকরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে। ধৈর্য্য ধরে যদি পুরোটা পরেন, তবে লেখকের বিশ্বাস জেনে যাবেন। আর যারা একটু অধৈর্য্য, তাদের জন্য তো স্ক্রল বাটনটা আছেই।

আমার এই লেখাটি শুধুই বিশ্বাস নিয়ে। শরীয়ত, আচার ব্যবহার, বা কোনো নিয়ম কানুন নিয়ে নয়। কাজেই যারা আশা করে আছেন যে আমি শরীয়তের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলব, তারা হতাশ হবেন। কাজেই তাদের মূল্যবান সময় অন্য কাজে ব্যয় করার পরামর্শ রেখে নিচ্ছি।

এই পোস্টে আসলে আমি কিছু শব্দ নিয়ে আলোচনা করব। এগুলো হচ্ছে বিশ্বাস, মানুষ এবং ঈশ্বর।

১. বিশ্বাস:
শুরুতেই আশা যাক বিশ্বাস কাকে বলে। তার আগে আমাদের জানতে হবে ‘প্রমাণ’ কী? জানতে হবে কারণ প্রমাণ আর বিশ্বাস শব্দদুটো ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নাস্তিকদের যখন বিশ্বাস করতে বলা হয়, তখন তারা প্রমাণ চায়, আর আস্তিকদের যখন কেন বিশ্বাস কর জানতে চাওয়া হয়, তখন তারা প্রমাণ দেবার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। ‘প্রমাণ’ হচ্ছে সেই জিনিস, যা কোনো মতবাদকে বা ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন আপনি বললেন, একটা থালায় কিছু পানি নিয়ে রোদে রেখে দিলে একটা সময় পরে তা জলীয়বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। আপনার ক্লাস ৫ পড়ুয়া ছোট ভাই তা ‘বিশ্বাস’ করলো না। তাই সে নিজে একটা পাত্রে কিছু পানি রোদে রেখে দিল এবং দেখল সেটা কিছুক্ষণ পরে আর নেই। সে তখন আপনাকে এসে জিজ্ঞেস করলো, তখন আপনি তাকে পানির স্বতবাষ্পীভবন বুঝিয়ে বললেন, তারপর সে বুঝলো এবং আপনার কথা ‘বিশ্বাস’ করলো। একটু ভুল হলো, বলা উচিত সে আপনার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করলো। আরেকটা উদাহরণ দেই। আপনি কী ‘বিশ্বাস করেন’ যে ২ + ২ = ৪? প্রশ্নটা একটু হাস্যকর হয়ে গেল না? উচিত ছিল বলা, “আপনি কী ‘জানেন’, ২ + ২ = ৪?” কিংবা যদি বলি আপনি কী ‘বিশ্বাস করেন’, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে? এটাও একটা হাস্যকর প্রশ্ন। বলা উচিত ছিল, “আপনি কী ‘জানেন’, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে?” এখানেই হচ্ছে ‘জানা’ আর ‘বিশ্বাস’ করার মধ্যে পার্থক্য। যে জিনিসটা সবার চোখের সামনে ঘটে, তা আমরা জানি, আর যে জিনিসটা আমাদের চোখের সামনে নাই, সেটাই আমরা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করি। আপনি কি বিশ্বাস করেন ২ + ২ = ৪? না। আপনি জানেন ২ + ২ = ৪। আপনি কি বিশ্বাস করেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে? না। আপনি জানেন সূর্য পূর্ব দিকে উঠে। কারণ এটা আপনার কাছে ‘প্রমাণিত’। কাজেই এটা আপনি জানেন। আশা করি ‘জানা’ আর ‘বিশ্বাস’ করার মধ্যে পার্থক্যটা পরিষ্কার হয়েছে। যেটার প্রমাণ আপনার কাছে নেই, সেটাকে মেনে নেয়াকেই বিশ্বাস বলে। তার মানে কি আপনি আগডুম বাগডুম যা খুশি তাই মেনে নিবেন? মোটেই না। কারণ আপনার নিজস্ব কিছু বিচার বিবেচনা আছে আর আপনি সেই বিচার বিবেচনার উপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নিবেন, কোনটা বিশ্বাসের যোগ্য আর কোনটা তা না।

আরেকটু বিজ্ঞানভিত্তিক উদাহরণ দেই। নিউটনের গতি বিষয়ক তিনটা সূত্রের মূলে কিন্তু একটা বিশ্বাস বা ধারণা বা স্বতসিদ্ধ আছে। আর তা হলো বস্তুর ভর স্থির বা ধ্রুবক। ১৬০০ সাল থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মানুষ কিন্তু এটা বিশ্বাস করে এসেছে, কারণ মানুষ তখন পর্যন্ত সেটাকে ভুল প্রমাণ করতে পারেনি। তার পরের ঘটনা অনেকেরই জানা। আইনস্টাইন নামের এক ভুবন বিজয়ী বিজ্ঞানী প্রমাণ করলেন যে বস্তুর ভরও পরিবর্তনশীল। তবে হ্যা, এটা প্রমাণের জন্যও তিনি কিন্তু একটা বিশ্বাসের বা স্বতসিদ্ধের আশ্রয় নিলেন। যারা আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানেন, তারা জানেন যে এই স্বতসিদ্ধটা হচ্ছে “আলোর গতি ধ্রুবক”। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাচ্ছিনা, কারণ সেটা আমার উদ্দেশ্য না। আবার এটা নিয়ে অনেক সূক্ষ গবেষনায় ভিন্ন কিছু ব্যাপারও লক্ষ্য করা গেছে। শুধু এইটুকুই বলবো, এখনো কিন্তু পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি যে আলোর বেগ ধ্রুবক নাকি পরিবর্তনশীল। বিজ্ঞান যা পেরেছে, তা হলো কিছু বাস্তব ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পেরেছে এই স্বতসিদ্ধের মাধ্যমে। অর্থাৎ কিছু নির্দেশনা পাওয়া গেছে যে আলোর বেগ ধ্রুবক, কারণ আপনি যদি এটা মেনে না নেন, তাহলে বাস্তব অনেক ঘটনার ব্যাখ্যাই আপনি দিতে পারবেন না। কাজেই আপনাকে আপাতত স্বীকার করে নিতেই হচ্ছে যে আলোর বেগ ধ্রুবক। হয়তো আরো কয়েকশো বছর পরে নতুন কোনো বিজ্ঞানী নতুন কিছু আবিষ্কার করবেন এই ব্যাপারে, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত আমাদের এই স্বতসিদ্ধ মেনে নিতে হবে।

অতএব, বিশ্বাসের উপর আমার উপসংহার: ‘বিশ্বাস’ হলো সেই জিনিস, যা আপনাকে কোনো মতবাদ মেনে নিতে সাহায্য করে, যেটা আপনি জানেন না, কিন্তু এসম্পর্কে কিছু ধারণা বা Indication হয়তো আপনি পেতে পারেন। এটা আমার ব্যাখ্যা। আপনি আমার ব্যাখ্যা মেনে নিতে নাও পারেন।

বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা আপাতত এটুকুই। চলুন, এবার তাহলে ‘মানুষ’ নিয়ে কথা বলা যাক।

২. মানুষ:
‘মানুষ’ এর ব্যাখ্যা খুব সহজ, আবার বড়ই জটিল। সহজ ভাবে বলতে গেলে আমি, আপনি আমরা সবাই মানুষ। অনেকে আবার দার্শনিকভাবে অনেক দিক দিয়ে মানুষের সংজ্ঞা দিতে চান। আমি সেসব দিক নিয়ে বলবো না। আমি একটু বিজ্ঞানের দিক দিয়ে বিচার করবো।

আশা করি আমরা সবাই জানি, মাত্রা কী। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এগুলো হচ্ছে মাত্রা। মানুষ সামনে-পিছনে যেতে পারে, ডানে-বামে যেতে পারে, আবার উপর-নিচেও যেতে পারে। কাজেই মানুষ একটি ত্রিমাত্রিক প্রাণী। মাত্রার সংজ্ঞা আরেকটু ভালোভাবে দেয়া যায়: মাত্রা হচ্ছে আপনার সীমা। যেহেতু আপনি তিনটা দিকে যেতে পারেন, কাজেই আপনার মাত্রা তিন। যদি আপনার মাত্রা দুই হত, তাহলে শত চেষ্টা করেও আপনি তৃতীয় দিকে যেতে পারতেন না। ব্যাপারটা আমাদের জন্য চিন্তা করা একটু কষ্টকর, কারণ আমরা ত্রিমাত্রিক, কাজেই আমাদের চিন্তা ভাবনাও ত্রিমাত্রিক। আমরা চাইলেও দ্বিমাত্রিক প্রাণী (যদি আদৌ থেকে থাকে) কিভাবে তৃতীয় মাত্রায় যেতে পারবে না, তা বুঝতে পারবো না। নিজেরা কিভাবে চতুর্মাত্রায় যেতে পারবো না, তা হয়তো বুঝতে পারবো, কিন্তু সে ব্যাপারে পরে আসছি। আপাতত একটা দ্বিমাত্রিক জিনিস নিয়েই আলোচনা করি।

আপনাকে যদি কোনো দ্বিমাত্রিক জিনিসের (অর্থাৎ যার শুধু দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ আছে, উচ্চতা নেই) উদাহরণ দিতে বলা হয়, আপনি হয়তো বলবেন, কাগজ বা এই জাতীয় পাতলা কিছু। কিন্তু সেটা সঠিক না। কাগজ যত পাতলাই হোক, তার কিছু উচ্চতা আছে। দ্বিমাত্রিক জিনিস হলো সেই জিনিস, যার উচ্চতা নাই বা শূন্য। অনেক চিন্তা করে এই ত্রিমাত্রিক পৃথিবীতে একটা মাত্র দ্বিমাত্রিক জিনিসের সন্ধান পেয়েছি, আর তা হলো ছায়া (যদি কেউ আর কোনো দ্বিমাত্রিক জিনিস আছে বলে জেনে থাকেন, জানাবেন দয়া করে)। ছায়া দ্বিমাত্রিক, অর্থাৎ এর সীমা বা মাত্রা দুই। শত চেষ্টা করলেও এটা তৃতীয় মাত্রায় যেতে পারবে না। আপনি কী কখনো একই সাথে দুটি তলে একটি ছায়া দেখেছেন? দেখেননি। কখনো দেখবেন ও না। কারণ এটা সম্ভব না। আপনি হয়তো বলতে পারেন, কেউ যদি দেয়ালের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তার ছায়ার কিছু অংশ পড়ে মাটিতে, আর কিছু অংশও দেয়ালে। আপনার কথা ঠিক, কিন্তু এটা ছায়াকে ত্রিমাত্রিক বানায় না। কারণ, আপাত দৃষ্টিতে ছায়াটিকে দুটি তলে মনে হলেও, ছায়ার একটি নির্দিষ্ট অংশ কিন্তু একটি তলেই আছে, আর তা হলো দেয়াল অথবা মাটি। দেয়াল বা মাটির তলই ছায়ার তল এবং ছায়া কখনোই এর বাইরে যেতে পারবে না। এবার আপনি বলতে পারেন, ছায়ার তো জীবন নেই, ছায়া কিভাবে নিজ থেকে এক তল থেকে আরেক তলে যাবে? তাহলে ধরে নেই, এই পৃথিবীতে কোনো দ্বিমাত্রিক প্রাণী আছে। আপনি যদি এই প্রাণীর সামনে গিয়ে দাঁড়ান, সে কী দেখবে? সে কিন্তু আপনাকে পুরোপুরি দেখবে না। এমনকি সে ধারণাও করতে পারবে না, আপনি কে বা কী? তাহলে সে কী দেখবে? ধরেন, তার অবস্থান আপনার দেহের মাঝ বরাবর (পেটের কাছাকাছি) এবং আপনার সামনে। এবার আপনার পেটের ভিতর দিয়ে দুটো তল (যারা পরস্পরের খুব কাছাকাছি, অর্থাৎ যাদের মধ্যে দুরত্ব খুব কম) কল্পনা করেন, যা আপনার পেটকে ব্যবচ্ছেদ করছে (গা গুলালেও কল্পনা করেন)। আমরা যদি ধরে নেই, ওই দ্বিমাত্রিক প্রাণীটি সেই দুই তলের মাঝখানে অবস্থান করছে, তাহলে সে আপনার দেহের যে অংশটুকু ওই দুই তলের মাঝখানে আছে, সেই অংশটুকুই দেখবে। এখন আপনি হয়তো বলবেন, “একটু আগে আপনিই তো বললেন যে দ্বিমাত্রিক মানে যার কোনো উচ্চতা নাই। তাহলে যদি ওই দুই তলের মাঝখানে কিছু জায়গা থাকে, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তাহলে তো তা আর দ্বিমাত্রিক থাকলোনা, ত্রিমাত্রিক হয়ে গেলো, কারণ ওই অংশের কিছু উচ্চতা অবশ্যই আছে।” খুব ভালো প্রশ্ন। উত্তর হলো, কল্পনার সুবিধার্থে আমরা ধরে নিয়েছিলাম প্রাণীটা এবং আপনার দেহের ওই অংশটুকু প্রায় দ্বিমাত্রিক, যার তৃতীয় মাত্রা, অর্থাৎ উচ্চতা প্রায় নাই বললেই চলে। একটু পরেই আমরা পুরো দ্বিমাত্রিক প্রাণী নিয়ে আলোচনায় যাবো। এখন ধরে নেই, প্রাণীটা আপনার দেহের ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উচ্চতার অংশটুকু দেখছে। যদি আপনার দেহের ওই অংশের প্রস্থ এক ফুট হয়, তাহলে সে দেখবে এক ফুট দৈর্ঘের একটি অনুভূমিক রেখা, যার উচ্চতা খুব কম। এবার আপনি মনে মনে ঘুরে দাঁড়ান, অর্থাৎ এখন প্রাণীটা আপনাকে পাশ থেকে দেখছে। আপনার পেট আর পিঠের মাঝের অংশের দৈর্ঘ্য যদি আধ ফুট হয়, তাহলে এবার প্রাণীটা দেখবে আধ ফুটের একটা রেখা, এবারও উচ্চতা নগন্য। আপনার এই ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা এবার একটু ভিডিওর মতো করে ভাবুন তো, প্রাণীটা কী দেখবে? সে দেখবে, কথা নাই, বার্তা নাই, হঠাৎ করে সেই এক ফুটের রেখাটা আস্তে আস্তে কমে আধ ফুট হয়ে গেলো। আশা করি ব্যাপারটা পরিষ্কার করতে পেরেছি। এবার ধরা যাক, প্রাণীটা পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক। তাহলে সে আপনার দেহের যে অংশটুকু দেখবে, তার আসলে কোনো উচ্চতা নাই বা উচ্চতা শূন্য। এবার একটু চিন্তা করেন তো, সে আসলে কী দেখবে, বা আদৌ কিছু দেখবে কিনা? সে আসলে কিছুই দেখবে না, কারণ যে তলের বা রেখার উচ্চতা শূন্য, তাকে কি দেখা যায়? এবার ধরে নেন, আপনার কাছে একটা ক্ষমতা আছে, যার ফলে আপনি ওই প্রাণীটাকে পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক থেকে কিঞ্চিত ত্রিমাত্রিক বানাতে পারেন, অর্থাৎ আপনি চাইলে সে আপনার খুব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ দেখতে পারবে। অতএব এবার সে আপনাকে একটা রেখা হিসাবে দেখতে পারবে, যার উচ্চতা আসলে খুব কম (প্রথম ক্ষেত্রের ঘটনা)। এবার এই জিনিসটাকে একটু বৃহৎভাবে চিন্তা করি। আমাদের যে ত্রিমাত্রিক জগৎ, তা আসলে অসংখ্য দ্বিমাত্রিক জগতের সমষ্টি। বুঝিয়ে বলি। বইয়ের একটা পাতা প্রায় দ্বিমাত্রিক, কিন্তু যখন ৩০০ পাতা মিলে একটা বই হবে, তখন তা হবে ত্রিমাত্রিক। যদি বইয়ের পাতা পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক (উচ্চতা নাই বা শূন্য) হত, তাহলে এরকম কতগুলো পাতা লাগতো, একটা ত্রিমাত্রিক বই বানাতে? উত্তর: অসীম সংখ্যক। কাজেই আমাদের ত্রিমাত্রিক জগৎ আসলে অসীম সংখ্যক দ্বিমাত্রিক জগতের সমষ্টি (চিন্তার সুবিধার জন্য ধরে নিতে পারেন, কোটি কোটি প্রায় দ্বিমাত্রিক জগতের সমষ্টি)। এবার তাহলে আরেকটু গভীরে যাই। এই যে অসংখ্য দ্বিমাত্রিক জগৎ, সেগুলো আসলে ত্রিমাত্রিক স্পেসে অবস্থানকারী অসংখ্য দ্বিমাত্রিক তল। এই অসংখ্য দ্বিমাত্রিক তলের প্রত্যেকটাতে যদি একটা করে দ্বিমাত্রিক প্রাণী থাকে, তাহলে তারা কী দেখবে? আপনার দেহের যে অংশটুকু তাদের সেই তলে/জগতে থাকবে, শুধু সেই অংশটুকু।

ঘটনাগুলো মনে হয় একটু পেঁচিয়ে গেলো। একটু summarize করি। মূল ব্যাপারটা হলো, ত্রিমাত্রিক বস্তু বা প্রাণী কী জিনিস, তা দ্বিমাত্রিক প্রাণী কখনোই জানতে পারবে না। তারা শুধু আঁচ করতে পারবে এবং ত্রিমাত্রিক বস্তুটির শুধু সেই অংশই দেখতে পারবে, যা তাদের জগতে বিরাজমান। এমন কি তারা তাদের সীমিত দ্বিমাত্রিক জ্ঞান (যদি থেকে থাকে) দিয়ে বুঝতেও পারবে না, ত্রিমাত্রিক প্রাণীটা আসলে ঠিক কী জিনিস।

একটু আগে বলেছিলাম, আমরা কেন চতুর্মাত্রায় যেতে পারবো না তা পরে আলোচনা করবো। শুরু করা যাক। আলোচনা করছিলাম দ্বিমাত্রিক আর ত্রিমাত্রিক প্রাণী/বস্তু নিয়ে। এবার চলুন ভাবি ত্রিমাত্রিক আর চতুর্মাত্রিক বস্তুর কথা। এতে কল্পনা করতে একটু সুবিধা হবার কথা, কারণ আমরা মানুষরাই ত্রিমাত্রিক প্রাণী!

ধরেন আপনার আশেপাশের জগৎ চতুর্মাত্রিক, যেখানে চতুর্থ মাত্রাটি হচ্ছে ‘সময়’। আপনি নিজে ত্রিমাত্রিক প্রাণী, কাজেই আপনার পক্ষে চতুর্থ মাত্রায় বিচরণ করা অসম্ভব (টাইম মেশিন দিয়ে সময় পরিভ্রমণ আসলে পুরোপুরিই কল্পকাহিনী। এটা logically প্রায় অসম্ভব। বিস্তারিত ব্যাখ্যা অন্য কোনো দিন)। কিন্তু যদি জগৎটা চতুর্মাত্রিক হয়, তাহলে আপনি যে জগৎটা দেখেন, সেটা আসলে আপনার ‘সময়’এ সেই জগতের একটা প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেমন, দ্বিমাত্রিক প্রাণী আপনাকে দেখে না, শুধু আপনার (বা পুরো ত্রিমাত্রিক জগতের) যে অংশটুকু তার তলে/জগতে থাকে, সে অংশটা দেখে, ঠিক তেমনি আপনিও পুরো জগৎ কখনোই দেখতে পারবেন না। শুধু আপনার সময়ের জগৎকে দেখতে পারবেন। এবং আপনি শত চেষ্টা করলেও কখনো অন্য সময়ে যেতে পারবেন না, অর্থাৎ সময় বরাবর ভ্রমণ করতে পারবেন না। ঠিক যেমন, ছায়া শত চেষ্টা করেও এক তল থেকে আরেক তলে যেতে পারেনি। ব্যপারটা কিন্তু আসলে সেরকমই। আমরা কি কখনো পারি, এক সেকেন্ড আগের সময়েও যেতে? কিংবা আধ সেকেন্ড পরে চলে যেতে? পারিনা। এবার ধরেন, চতুর্মাত্রিক জগতে কোনো একটা চতুর্মাত্রিক প্রাণী আছে। তার কোন অংশটুকু আমরা দেখবো? যে অংশটুকু আমাদের জগতে থাকবে, ঠিক সেই অংশটুকু। কারণ চতুর্মাত্রিক প্রাণীটা চতুর্থ মাত্রায়, অর্থাৎ সময় বরাবর ভ্রমণ করতে পারে। কাজেই সে যদি আমাদের সময়ে আসে, তবেই আমরা তাকে দেখবো। যদি সে আমাদের জগৎ থেকে সময় অক্ষে এক মিলিসেকেন্ড আগে বা পরেও থাকে, আমরা কিন্তু তাকে কখনোই দেখবো না। ঠিক যেমন দ্বিমাত্রিক প্রাণীটা শত চেষ্টা করেও উঁকি-ঝুঁকি দিয়েও দেখতে পারেনি, ঠিক তার উপরের তলে কী আছে।

এবার আসা যাক, চতুর্মাত্রিক প্রাণীর সরূপ আসলে কেমন, সে আলোচনায়। আমাদের কাছে যেমন ভিন্ন উচ্চতার অনেক বস্তু একসাথে দৃশ্যমান (যেমন মাটিতে যদি তিনটা লাঠি থাকে, একটা ২ ফুট, একটা ৩ ফুট, একটা ৫ ফুট, সবগুলোই কিন্তু আপনার কাছে দৃশ্যমান হবে), ঠিক তেমনি চতুর্মাত্রিক প্রাণীর কাছে কিন্তু ভিন্ন সময়ের সবকিছু একসাথে দৃশ্যমান। অর্থাৎ তার কাছে স্থান, কাল, পাত্রের কোনো ধারনাই নেই। তার কাছে সবই বর্তমান। আপনি যদি জানালা দিয়ে বাইরে তাকান, তাহলে আপনার দৃষ্টিসীমার মধ্যে যা কিছু পড়া সম্ভব, সেসব যেমন একসাথে আপনার চোখে পড়ে, ঠিক তেমনি চতুর্মাত্রিক প্রাণী যখন সময়ের জানালা দিয়ে আমাদের এই জগতের দিকে তাকায়, তখন তার কাছে সব সময়ের ঘটনা একসাথে চোখে পড়ে। এই প্রাণীটির অবস্থান যদি সর্বস্থানব্যাপী হয় (এটা শুধুই একটা কল্পনা, বিজ্ঞান সব কিছুই কল্পনা করার অধিকার দেয়, প্রমাণ করা পরের ব্যাপার), তাহলে তার কাছে আসলে ঐ চতুর্মাত্রিক জগতের কোনো কিছুই সীমাবদ্ধ হবে না। সে হবে সেই জগতের সর্বস্থানব্যাপী এবং সে হবে সকল সময়ে বিরাজমান। আর আমরা, আমাদের ত্রিমাত্রিক সীমিত জ্ঞান দিয়ে কখনোই সেই প্রাণীকে জানতে বা বুঝতে পারবো না।

কাজেই, মানুষ সম্পর্কে উপসংহার হলো: মানুষ একটি ত্রিমাত্রিক প্রাণী, যে তার এই ত্রিমাত্রিক জগতে সবচেয়ে জ্ঞানী প্রাণী হতে পারে, কিন্তু চতুর্মাত্রিক প্রাণীর কাছে সে অসহায়। চর্তুর্মাত্রিক প্রাণীর শুধু সেই অংশটুকুই সে দেখতে পারবে, যে অংশটুকু তার ত্রিমাত্রিক জগতে থাকবে।

এবার শেষ শব্দটি। আর তা হলো 'ঈশ্বর'।

৩. ঈশ্বর:
এটা সবচেয়ে কঠিন প্রসংগ। ‘ঈশ্বর’ কে বা কী? তার আগে চলুন দেখি, ঈশ্বর (যদি থেকে থাকে) নিজেকে কী বলে দাবি করেন? ঈশ্বর বলেন তিনি সর্বস্থানব্যাপী, তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর এই কথা কিন্তু বড় ধর্মগুলোর সবগুলোতেই পাওয়া যায়। এই কথাগুলো প্রমাণ করে, যদি ঈশ্বর থেকে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই ত্রিমাত্রিক নন, বরং অনেক বেশি মাত্রা সম্পন্ন কেউ। প্রকৃতপক্ষে, তিনি দাবি করেন, তাঁর কোনো সীমা নেই, অর্থাৎ তাঁর কোনো মাত্রা নেই। কাজেই মাত্রার ধারনাগুলোও তার জন্য খাটবে না। তাঁর কথা অনুযায়ী তিনি অসীম, স্থান-কাল-পাত্রের ধারনাটাই তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। কাজেই, তাঁর কাছে সব কিছুই বর্তমান।

এবার আসি যদি ঈশ্বর থেকে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে মানুষকে জানাবেন যে তিনি আছেন? বা কীভাবে মানুষকে জানাবেন যে তাঁর উপাসনা করতে হবে? চিন্তা করুন তো, আপনি আপনার সেই দ্বিমাত্রিক বন্ধুদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবেন? আপনি কি সরাসরি তাদের সাথে কথা বলতে পারবেন? প্রশ্নই উঠে না। কারণ তারা আপনার ঐ ত্রিমাত্রিক কথাবার্তা বুঝতেই পারবে না। দ্বিমাত্রিকের প্রসঙ্গে পরে আসেন। ত্রিমাত্রিক একটা পিপড়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন তো দেখি। তবে হ্যা, আপনি যেটা করার চেষ্টা করতে পারেন, তা হলো একটা পিপড়াকে ধরে তাকে অনেক সময় ধরে আপনার কথা বুঝাতে পারেন, যাতে সে তার প্রজাতিকে আপনার কথা পৌঁছে দিতে পারে। আর এটা একটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এবার মনে করেন, আপনার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে। আপনি চাইলে পিপড়ার (কিংবা সেই দ্বিমাত্রিক প্রাণীটির) বুদ্ধিমত্তাকে বাড়িয়ে দিতে পারেন, যাতে আপনার কথা তারা বুঝতে পারে। আপনার তখন ইচ্ছা হলো যে আপনি তা করবেন না। বরং একটি মাত্র পিপড়ার বুদ্ধি বাড়িয়ে তাকে কথাগুলো বুঝাবেন, যাতে সে সেই কথাগুলো অন্য পিপড়ার মাঝে বলতে পারে। কারণ আপনি দেখতে চান যে বাকিরা তার কথা মেনে নেয় কিনা। আপনি তাকে বুঝালেন এবং বললেন, অন্যদের মাঝে আপনার কথাগুলো গিয়ে বলতে। সে তাই করলো। অন্য পিপড়াগুলো তখন কী করবে? এক বাক্যে তার কথা মানে নিবে? অবশ্যই না। কারণ বাকি পিপড়াগুলোর বুদ্ধি তো আপনি বাড়িয়ে দেননি। আপনি দেখতে চাইছেন, বাকিরা তার তথা আপনার কথা মেনে নেয় কিনা। কেউ মানবে কেন? কাজেই আপনি তখন কী করবেন? কিছু Indication রাখবেন। প্রমাণ না। যদি প্রমাণই রেখে দেন যে আপনার কথাগুলো সত্য, তাহলে তো আপনার মূল ইচ্ছাটাই মাটি হবে। যদি পিপড়াদের উপযোগী করে সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়েই দেন, তাহলে তো তারা সবাই আপনার কথা মেনে নিবে, আর আপনি তাদের আর পরীক্ষা করতে পারবেন না।

যদি ঈশ্বর থেকে থাকেন, তাহলে তিনিও ঠিক একই কাজটা করেছেন। তিনি চান আমাদের পরীক্ষা করতে, যে তাঁকে না দেখেই, তিনি আছেন এটার সুস্পষ্ট প্রমাণ না পেয়েই মানুষ তাঁকে ‘বিশ্বাস’ করতে পারে কিনা। খেয়াল করুন, (সব ধর্মেই) তাঁকে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে। কারণ তিনি আছেন এটার সপক্ষে অত্যন্ত সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ (যেমন ২ + ২ = ৪ কিংবা সূর্য পূর্বদিকে উঠে) তিনি নিজেই দেননি। যা দিয়েছেন, তা কিছু তত্ত্ব, কিছু ধারণা, কিছু Indication, কিছু যুক্তি। কার বা কাদের মাধ্যমে দিয়েছেন? কয়েকজন মানুষের মাধ্যমে, যাদের আমরা নবী, অবতার ইত্যাদি বিভিন্ন নামে চিনি। তাদের বুদ্ধিমত্তাকে তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন, যাতে তাঁরা ঈশ্বরের কথা বুঝতে পারেন। আর যখন তাঁরা আমাদের বুঝিয়েছেন, তখন আমরা শুনিনি। তাই ঈশ্বর তাঁদের দিয়েছেন কিছু অলৌকিক ক্ষমতা, যা তাঁদের সাহায্য করেছে, মানুষকে ঈশ্বরের পক্ষে ডাকতে।

ব্যাপারটা এরকম, ঈশ্বর (যদি থেকে থাকেন) তিনি সকল মাত্রার উর্ধ্বে (তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী)। তিনি মাত্রাহীন (সীমাহীন তথা অসীম), তিনি সময়ের বন্ধনে আবদ্ধ নন। তাঁর কাছে সব দৃশ্যমান, সব বর্তমান। তিনি মানুষের কাছে যুগে যুগে মানুষেরই মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচন করে তাঁর কথা প্রচারের জন্য নিয়োজিত করেছেন, যাতে মানুষ তাঁর সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। কারণ তিনি জানতে চান, মানুষ তাঁর স্রষ্টাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া, কিছু তত্ত্ব বা ধারণা বা Indication থেকে মেনে নিতে পারে কিনা, বা ‘বিশ্বাস’ করতে পারে কিনা। যদি তিনি সব প্রমাণ দিয়েই দিতেন, তাহলে তিনি তো আর এটা দেখতেই চাইতেন না যে মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে কিনা, তাইনা? এজন্য অবশ্য তিনি কিছু ভালো জিনিসের লোভ আর খারাপ জিনিসের ভয় দেখিয়েছেন, যাতে মানুষ এসব লোভ বা ভয়ের কারণে হলেও তাঁকে বিশ্বাস করে আর তাঁর কথা মেনে চলে।

আমার কথা শেষ। আবারও বলছি, এগুলো সবই আমার নিজের চিন্তাভাবনা। মেনে নেয়া বা দ্বিমত পোষণ করা একান্তই পাঠকের উপর। তবে যদি কেউ মন্তব্য করেন, তাঁকে অনুরোধ করবো, দয়া করে শালীনতা বজায় রাখতে।

পরিশেষে কথা রাখছি। নিজের বিশ্বাসের ব্যাপারটা দিয়েই শেষ করি। আমি আস্তিক। কিন্তু কোন ধর্মে বিশ্বাস করি, তা বলছিনা। কারণ আমার এই পোস্টটা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নিয়ে না, তা আগেই বলেছি। এটা ছিলো ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে আমার কিছু চিন্তাভাবনা। যদি কখনো সময় পাই, তাহলে বিভিন্ন ধর্ম নিয়েও আলোচনা করবো। অবশ্য তার আগে অনেক পড়াশোনা করে নিতে হবে, কারণ সাম্যুর ব্লগাররা (যারা এই জাতীয় ব্লগ লিখেন বা পড়েন) মনে হয় আমার চেয়ে ধর্ম সম্পর্কে অনেক বেশি গবেষণা করেছেন। এবার আসি কেন আমি আস্তিক, এই প্রসঙ্গে। ছোট একটা যুক্তি। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আমি এমন কিছুই পাইনি, দেখিনি, শুনিনি যা নিজে নিজে তৈরি হয়ে গেছে। কাজেই এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ নিজে নিজে তৈরি হয়ে গেছে, এমনটা আমার মনে হয় না। আর হ্যা, প্রমাণ কোথায় পেলাম যে ঈশ্বর আছেন? অত্যন্ত সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাইনি, পেয়েছি কিছু Indication, যা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে স্রষ্টার উপর বিশ্বাস আনার জন্য যথেষ্ট। নাস্তিকতার পক্ষের যুক্তিগুলো এসব Indication এর কাছে বড়ই ঠুনকো মনে হয়। তার একটা উদাহরণ এই মাত্রই দিলাম। আমি সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ জানার চেষ্টাও করিনা, কারণ সেটা আমি পাবো না বলেই মনে হয়। আমার ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক জ্ঞান দিয়ে আমি সীমাহীন ঈশ্বরের প্রমাণ বের করতে পারবো না, এটাই কি স্বাভাবিক না? ব্যাপারটা একটা প্যারাডক্সের মতো। আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন, স্রষ্টা বা ঈশ্বর আছেন? অনেকেই সেটা করেন বা করতে চান ধর্মগ্রন্থের সাহায্যে, যেটা আসলে প্রমাণের মূল শর্তকেই ব্যাহত করে, কারণ আপনি যদি ঈশ্বরেই বিশ্বাস না করেন, তাহলে ধর্মগ্রন্থ আসলো কোত্থেকে? আবার অন্য কোনোভাবে প্রমাণ করাও প্রায় অসম্ভব, তার কারণ একটু আগেই বলেছি। যদি ঈশ্বর প্রমাণ দিয়েই দিতেন, তাহলে (তাঁর মতে) তিনি আমাদের পরীক্ষা করার জন্য তাঁকে মানতে বলতেন না। আর যদি আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস নাই করেন, তাহলে সৃষ্টিজগতের ব্যাখ্যা কিভাবে দিবেন? বিবর্তনবাদ, বিগ ব্যাং থিওরি কোনো কিছুই এত সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ একটা সিস্টেম ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট না (আমার মতে)। কাজেই, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।” সেটা অবশ্য আরেক বিশাল আলোচনা হতে পারে। আরেকদিন করবো না হয়...

ধৈর্য্য ধরে যারা পরেছেন বা যারা পড়েননি বা যারা মাঝখানে ধৈর্য্য হারিয়ে পড়া বাদ দিয়েছেন, তাদের সবাইকেই ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
original post
read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site