Showing posts with label সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label সাহিত্য. Show all posts

Thursday, April 12, 2012

বাংলা ভাষার জন্য কোন হুমকি আছে কি?

by মাহবুব আলম

writers.jpg প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের তরুণ ও প্রবীণ সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষার কথ্য ও মান রূপ নিয়ে কী ভাবছেন তা জানতে চেয়ে দুটি প্রশ্ন করা হয়েছিলো। তাদের অভিমতগুলোর শ্রুতিলিখন করেছেন মাহবুব আলম। তাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিলো:

১. বাংলা ভাষা চর্চায় যে মিশ্রণ পরিলক্ষিত হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার অভিমত ও ব্যাখ্যা জানতে চাই।

২. বাংলা ভাষার জন্য কোন হুমকি আছে বলে মনে করেন কিনা? থাকলে তা রক্ষায় কী ভূমিকা নেয়া যেতে পারে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা ভাষার একটা প্রকৃত রূপ বা মান ভাষা রয়েছে। সেই মান ভাষাটা সাহিত্যের ভাষা, শিষ্টাচারের ভাষা, ভদ্র কথপোকথনের ভাষা, লেখাপড়ার ভাষা। সেই মান ভাষার চর্চাটা বাংলাদেশে বর্তমানে অত্যন্ত আতঙ্কিত ও আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। এখন সাধারণ লোকজন কথাবার্তার ব্যাপারে হিন্দি, ইংলিশ ও উর্দু মিশিয়ে কথা বলে, এবং তারা নিজেদের আধুনিক ও স্মার্ট মনে করে। লেখার ক্ষেত্রেও ভুল শুদ্ধ নিরুপন করে না, ভুল লিখলেও সেটা বীরত্ব মনে করে, কারণ তারা ভাল বাংলা জানেনা। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকরা ভাষার বিশুদ্ধ রূপ ব্যবহারে গুরুত্ব দেন না। শিক্ষিত হয়েও অনেকে ভাষার ভুল প্রয়োগ করছেন। তাছাড়া ইংরেজী মাধ্যম স্কুল কিংবা মাদ্রাসাগুলোতেও মান ভাষার চর্চা নেই। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের জন্য এই বাংলা ভাষার ব্যবহার হুমকি স্বরূপ বলে মনে হয়। আবার দেখা যায় যে, ঘরে ঘরে ছোট ছেলেমেয়েরা বা তরুণরা হিন্দি গান, ছবি কার্টুন দেখে হিন্দির চর্চা করছে– এই আক্রমন আমরা রোধ করতে পারছি না। উর্দু যখন বাংলার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল তখন আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি কিন্তু এখন হিন্দির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছি না, কারণ আমাদের যারা শাসক তারা এ বিষয়ে উদাসীন।

এখানে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করছে মিডিয়া। এরকম আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর কখনো হয়নি, পাকিস্তানিরা বিভিন্ন ভাবে উর্দু চাপিয়েছিল, আমরা রোধ করেছি, এখন তো নিজেরাই ভাষার চর্চাকে ব্যাহত করছি। মিডিয়ায় যে ভাষা অর্থাৎ নাটকে বা এফ এম রিডিওতে ব্যবহার হচ্ছে তা ভদ্র সংস্কৃতি নয়, এটা বিকৃতি বা বিচ্যুতি। কিন্তু এই ভুল চর্চারই অনুকরণ ও অনুসরণ হচ্ছে।

আমরা যারা দেশপ্রেমী রয়েছি, বা বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা করছি তাদেরকে এ বিপর্যয় নিয়ে ভাবতে হবে। সবাইকে মিলে এই অপচয় রোধ করতে হবে। সরকার কিংবা নীতিনির্ধারকদের উচিত ভাষার ভুল কিংবা বিকৃত রূপ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা।

এই মিশ্রণটা কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাধ্যমেই বেশী হচ্ছে। যারা তথাকথিত উচ্চশিক্ষা লাভ করছে, তারা প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার সাথে ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছে। পাশাপাশি হিন্দিও অনুপ্রবেশ করছে। একটা ব্যাপার দেখা যায় যে, গ্রামের কৃষকরা কিন্তু এই মিশ্রণটা কম করছে। হয়ত তাদের হাতেই বাংলাভাষার আসল চাবিটা রয়ে যাবে।

তবে ইংরেজীর বেশ একটা প্রয়োজনও রয়েছে, বহিরবিশ্বে কিংবা উন্নত পড়ালেখা বা যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ইংরেজী ভাষার দরকার। যদি এমন একটা ব্যবস্থা করা যায় যে আমরা দ্বিভাষিক হব তবে সেটা হয়ত ভাল হত। আমরা দুটি ভাষারই চর্চা ও ব্যবহার ঠিক মত করতাম। আর হিন্দির প্রসার ঠেকাতে আমাদের নীতি নির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই মুহূর্তে নীতিমালা প্রণয়ন করা খুবই জরুরি যদি আমরা বাংলা ভাষার শুদ্ধ রূপটি টিকিয়ে রাখতে চাই।

আমরা নিজেরাও কিন্তু বাংলাভাষার আসল শুদ্ধ রূপটি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছি। যদি আমরা, দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি ভাষার শুদ্ধ চর্চার জন্য ম্যাগাজিন তৈরি করি, আবৃত্তি চর্চার অনুষ্ঠার তৈরি করি ও প্রচার করি বাংলা ভাষার যে পঞ্চভাস্কর রয়েছেন তাদের সাহিত্যের অংশগুলো চর্চা করি তাহলে বাংলা ভাষার পরিপূর্ণ চর্চা হতে পারে।

তবে এটা খুব একটা বড় হুমকি বলে আমার মনে হয় না, এখনও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই ভাষায় কথা বলছে, ব্যবহার করছে। আর আমাদের ভাষাও খুবই সমৃদ্ধশালী, তাছাড়া এর প্রকৃত শক্তি বা জোয়ার রয়েছে। যদি অসংখ্য মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ এর প্রকৃত রূপ চর্চা করে তবে হয়ত এই ভাষা নতুন সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারে।

হাসান আজিজুল হক
মিশ্রণটা কিন্তু খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ভাষাতে মিশ্রণ থাকবে এবং ভাষায় মিশ্রণ হয়ে আসছে। প্রয়োজন মত ভাষার অ্যাডাপটেশন কিন্তু আগেও ঘটেছে। তবে এখন যা হচ্ছে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইচ্ছে মতন মিশালেই কিন্তু তা মাধুর্য মন্ডিত হয় না। বা গ্রহণযোগ্য হয় না।

মিডিয়ায় তো অদ্ভূত এক মিশেলে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য নয়। এরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মূলত বাংলা ভাষার মুল সম্ভার থেকে সরে আসছে যা হারিয়ে ফেলছে। একজন ফেরিওয়ালাও কিন্তু প্রয়োজনে সুন্দর ভাবে ভাষার ব্যবহার করতে পারে। আমরা কেন পারব না।

আমরা ভাষাকে নিয়ম নীতি দিয়ে আটকাতে পারবো না, বা কোন প্রামাণ্য রূপ বেধে দিতে পারবো না বা সে রকম করলে তা ফলপ্রসু হবে না। আমরা সাবলীল ও সুন্দরভাবে যে ভাষা ব্যবহার করি তাই চর্চা করা উচিত এবং ছড়িয়ে দেয়া উচিত।

মঈনুল আহসান সাবের
এই মিশ্রণ কিছুটা হুমকি তো বটেই। এই মুহূর্তে এর বিপর্যয় হয়ত আমরা বুঝতে পারছিনা তবে পাঁচ-দশ বছর পর আমরা হয়ত এই ভাষা ব্যবহার নিয়ে আতঙ্কিত হব।

আমাদের পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়া এক সময় মূল ভাষা চর্চা করত। আমরা মুখে যে কথা বলি তা কিন্তু মূল ভাষা নয়। পৃথিবীর সবদেশেই একটা প্রচলিত ভাষা থাকে, তার সাথে একটি মূল ভাষা বা মূল স্রোত থাকে। আমরা যেন সবসময় সেই মূল স্রোত থেকে সরে যাবার চেষ্টা করছি। বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে যে কথ্য বা লেখ্য রূপ প্রচলিত রয়েছে তার সাথে আমাদের মৌলিক ভাষার কোন মিল নেই। এটা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নয় বা প্রতিরূপও নয়। আমরা জেনে বা না জেনেই মুল ভাষা থেকে সরে আসছি।

বোধ বা সচেতনা তৈরি করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশ বা সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা ভাষা আসলে কোনটি বা এর প্রকৃত রূপ কী তা জানতে পারবে না। পরিবার এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের মা-বাবাই পারে তাদের সন্তানদের ছেলেবেলা থেকেই অন্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষার প্রকৃত রূপ শেখাতে। শিক্ষক, সুশীল সমাজ, পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মৌলিক ভাষা থেকে এরকম সরে আসা ভবিষ্যতের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না।

ভাষা নিয়ে আমাদের কোন বড় অনুষ্ঠান নেই। অন্যভাষা যে আমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছে তা নিয়ে মিডিয়ায় কোন সংবাদ নেই। তাছাড়া বাংলা ভাষাভিত্তিক অনুষ্ঠান ক্রমশই কমে যাচ্ছে। ভাষাসহ সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত। এবং সেটা সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই উদ্যোগ নিতে পারে।

কামরুল হাসান
বাংলা ভাষা চর্চায় এখন যে মিশ্রন বা প্রচলন চলছে যাকে আমরা বাংলিশ বা হিংলা বলে অভিহিত করতে পারি,তা বাংলা ভাষার জন্য প্রচন্ড ক্ষতিকর। বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন টিভিতে বা এফ এম রেডিওগুলোতে শোনা যায় এক বাক্যে ৫০% অন্য ভাষার শব্দ। যদিও ইংরেজী শব্দের মিশ্রণ আগেও ছিল। কিন্তু এখন কথা বিকৃত রূপ ধারণ করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে টিভি নাটক, সিনেমার মাধ্যমে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীরা যে কথ্য রূপ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে–ঢাকায় এক অদ্ভূত মিশেল যা চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের মানুষের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে। বাংলার প্রচলিত রূপ ব্যবহারে ভাষার যেমন শুদ্ধ চর্চা হয়, তেমনি তা বোধগম্যও হয়ে উঠে। নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে হবে যেন বাংলা ভাষার প্রমিত রূপটি তারা ব্যবহার করে। কারণ মিডিয়াই কিন্তু মানুষের কাছে এক ধরনের ‘রোল মডেল’। কথ্য ভাষায় তো আমাদের বৈচিত্র রয়েছেই। তবে এখন যেটা হচ্ছে সেটা আগ্রাসন বা অনুপ্রবেশ। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

প্রশাসন সচেতনতা তৈরি করতে পারে, অনুষ্ঠান পরিচালনার নীতিমালা তৈরি করতে পারে, যেমন মিশ্রণ রোধ করা বিকৃত বাংলা ব্যবহার থেকে মানুষকে বিরত রাখা।
সাখাওয়াত টিপু, ফরহাদ মজাহার, ব্রাত্য রাইসু ও আরো অনেকে আছেন যারা প্রমিত ভাষাকে মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের ভাষা এবং তারা পূর্ববঙ্গের একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন। এটা এক ধরণের সংকীর্ণতা। মান বা প্রমিত ভাষা যেমন আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে তেমনি ভাষার বিকৃতি রোধ করে।

ভাষারও মিশ্রণ আশঙ্কা হতে পারে, এতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার আবেদন যেমন কমে যাবে তেমনি বাংলাদেশী সংস্কৃতি চর্চাও তার আবেদন হারিয়ে ফেলবে।

মাসুদ খান
ভাষা বহতা নদীর মতো। বহমানতা আর সময়ের সাথে বদলে বদলে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত এর শক্তি ও সম্ভাবনা। ভাষার স্বাভাবিক বিকাশপ্রক্রিয়া সেটাই। জনগোষ্ঠির নিত্য-ব্যবহারের ভাষা হলো এর রসায়নাগার ও পাওয়ার হাউজ। জনগোষ্ঠির যাপিত জীবনের নানা সংগ্রাম, ঘর্ষণ ও মিথস্ক্রিয়ার প্রভাবে নিত্য-ব্যবহারের এই ভাষার ভেতর নিরন্তর ঘটে চলে বিচিত্র ক্রিয়াবিক্রিয়া আর অফুরন্ত ধারায় প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন শব্দ, শব্দবন্ধ, বাগধারা-বাগভঙ্গি, প্রবাদ-প্রবচন… সংকোচন-প্রসারণ হতে থাকে শব্দের অর্থ ও ব্যঞ্জনার, বাক্যের অন্বয়ে ঘটতে থাকে ভাঙচুর ও বিবর্তন। তা ছাড়া, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠির ওপর নানা সময়ে কর্তৃত্ব ও আধিপত্য করতে এসেছে নানা ভাষা ও সংস্কৃতি… আর্য, আরব্য, পারস্য, ইংরেজি, উর্দু… এবং সাম্প্রতিককালে হিন্দি ও ইংরেজি দুটোই। এসেছে কখনো দস্যুর বেশে, কখনো রাজদণ্ড, কখনো তুলাদণ্ড হাতে, কখনো সাধুসন্ত ফকির-দরবেশদের সাথে, কখনো-বা পণ্যবাহিত হয়ে। এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার ভেতরে থেকে জীবন্ত ভাষাস্রোত যা করে তা হলো- ভিনভাষার বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে নিরন্তর সংশ্লেষ, এবং সেগুলির আত্তীকরণ। দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়ায় সে নিজের করে নেয় সেইটুকুই, যেটুকু হয়ে পড়ে অনিবার্য, এবং যেটুকু মেশে, যায়, খাপ খায়। এভাবে বাংলাভাষায় নানা সময়ে এসে মিশেছে/মিশছে বিভিন্ন ভাষার শব্দ, উপসর্গ-অনুসর্গ, কখনো-বা বাগভঙ্গি। বাংলা সেগুলোকে মোলায়েম মসৃণ বানিয়ে, নিজের স্বভাবের অনুগত করে নিয়ে, করেছে আত্তীকৃত। ভাষা নিজেকে করেছে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ। যুগ-যুগ ধরে চলে এ রসায়নপ্রক্রিয়া এবং এটা স্বাভাবিক, বিজ্ঞানসম্মত একটি প্রক্রিয়া। বেশ কিছুকাল অতিবাহিত হবার পর বোঝা যায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠিতে কী-কী আত্তীকৃত হয়েছে, আর কী-কী হয়নি, এবং হলে তা হয়েছেই-বা কোন আকারে, কী প্রকারে।

এসবকিছুই বললাম নিত্য-ব্যবহারের ভাষার ব্যাপারে। মানভাষার বিষয়টি ভিন্ন। মানভাষার সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারে। আর রাষ্ট্রের জন্য দরকারও একটা মান ভাষার। আমরা জানি, নিত্য-ব্যবহারের ভাষা প্রকৃতিগতভাবেই সবসময় সজীব, সপ্রাণ, চলিষ্ণু ও সৃজনমুখর, আর মানভাষা সবসময়ই তার অনুগামী। মানভাষার ওপর এই নিত্য-ব্যবহারের ভাষার অভিক্ষেপ প্রতিনিয়ত পড়তে থাকাটা খুব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে ভাষা কালে-কালে হয়ে পড়ে নীরক্ত, নীরস, খর্খরে, হীনস্বাস্থ্য। কবিতায়, সাহিত্যে এই নিত্য ব্যবহারের ভাষার অভিক্ষেপ পড়ে (এবং পড়া উচিত) সবচেয়ে ব্যাপক ও কার্যকরী রূপে, কারণ কবিতা ও সাহিত্য কাজ করে ভাষার সবচাইতে সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল ও সৃজন-উন্মুখ দিকগুলি নিয়ে।

বৃহত্তর জনগোষ্ঠির (শুধু শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠি নয়) মুখে মুখে বাংলাভাষা এগিয়ে গেছে অনেকদূর, কি শব্দভাণ্ডারে, কি বাগধারা-বাগভঙ্গির ঐশ্বর্যে, কি প্রবাদ-প্রবচনে। এই এগিয়ে-থাকা, আগে-আগে-চলতে-থাকা, পথিকৃৎ মুখের ভাষার নানা ঐশ্বর্যকে, তার বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দ, শব্দবন্ধ, অন্বয়, বাগধারা-বাগভঙ্গি, প্রবাদ-প্রবচনকে তাদের বিচিত্র ব্যঞ্জনা ও অফুরান সম্ভাবনাসহ কাজে লাগানোর বিষয়টি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি মানভাষায়, এবং সাহিত্যিকের ভাষায়, সেগুলির অভিক্ষেপ বা প্রতিফলন যেভাবে যতটা পড়া দরকার ততটা সেভাবে না পড়ে, তবে ভাষা হয়ে পড়বে অনেকটা খর্খরে, একঘেয়ে, স্থিতিস্থাপকতাহীন, বৈচিত্র্যহারা। সেই লক্ষণা দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। এখানে সাহিত্যিকের ভাষা বলতে কবিতা, কথাসাহিত্য বা নাটকের চরিত্রের মুখের ভাষার কথা বলছি না; বলছি খোদ সাহিত্যিকের নিজের ভাষার ব্যাপারে।

কাজল শাহনেওয়াজ
ভাষাতো একটা সচল ব্যাপার। এখানে শব্দ ঢুকবে আবার বেরিয়ে যাবে। তবে যখন অনেক বেশি মিশ্রণ ঘটতে থাকে তখন মনে কিছু করতে হবে, সমস্যাটা ভাষার নয় অন্য কোথাও। হয়ত আমাদের ভাষার নিজস্বতায় এমন এক ছিদ্র রয়েছে যা কৃষ্ণ গহ্বর এর চেয়ে ভয়ঙ্কর রূপে একে গ্রাস করছে। হতে পারে কোন আর্থরাজনৈতিক প্রভাবের রূপ এটি।

দেখুন হিন্দী কিন্তু একটা পণ্য ভাষা। যখন এই ভাষা আমাদের ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয় তখন তা জীবন যাপনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি সেই দেশের অর্থনীতিও আমাদের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

মিডিয়ায় যে কথ্যরূপ প্রচলিত রয়েছে তা আসলে কেউ ইচ্ছে করে করেন বা প্রয়োজনের খাতিরে করেন। প্রয়োজন তো মেটাতেই হবে তবে যদি কেউ ইচ্ছে করে ব্যঙ্গ মনোভাব বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটায় তখন বুঝতে হবে এর পেছন কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। তাছাড়া নাগরিক কল্পনা বলে একটা ব্যাপার রয়েছে যে কারনে ভাষা আধুনিকীকরণের একটা ব্যাপার চলে আসে। তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে, এবং কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে ভাষা ব্যবহার করা চলবে না।

আসলে প্রমিত রূপ একটা থিওরিটিকাল ব্যাপার, সেটা সাধারণের জন্য হয়ত উপযোগী নয়। তবে আমাদের পরিবর্তনে সতর্ক থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে। ভাষাও এক সময় হিতু হয় তখন তার আসল রূপ ফুটে উঠে।

চয়ন খায়রুল হাবিব

উপসংহারমুলক সংগাতে না গিয়ে বলা যেতে পারে যে প্রমিত বা মান ভাষা হচ্ছে সামাজিক অভিব্যাক্তির
এক চলিষ্ণু সমীকরণ! সমাজের বিকাশের সাথে, সমীকৃত মান ভাষার ভার বহন এবং নমনীয়তা দুটোই বাড়তে থাকে।এ-সমীকরনে হৃদস্পন্দনের সাথে বুদ্ধিজাত চাহিদার ভারসাম্য যে সবসময় অনুকুল হয় তা নয়!শাস্রজ্ঞ্বদের উপর সঙ্খুব্ধ মাইকেলের সেই তিব্র নিনাদ, ”রাগে জ্বলি উঠি” এক অর্থে আমাদের সবারই প্রমিত সম্মানের উদ্বোধন!

ভাষা হচ্ছে ভাবের গনিত; যে-গনিত আবার আত্মজাত; প্রমিত হচ্ছে নৈমিত্তিক লেনদেনে সার্বজনিন পেন্সিল-স্কেচ!এই পেন্সিল-স্কেচ বা খসড়াকে ভর করে প্রমিত সামাজিকভাবে বিচিত্রমুখিতো হতেই পারে; আবার যেখানে অচলায়তনের সাথে ব্যাক্তির বিরোধ সেখানে নতুন মাত্রিকতাও আনতে পারে!এই পথ ধরে আমরা পেয়েছি পার্বতি ও চন্দ্রমুখিকে!সনাতনি-সতরঞ্চের দানপাষা উলটে দিচ্ছে এই দুই নারি ভবিষ্যতমুখি প্রমিতের স্বপোলব্ধ উচ্চারনে!আমরা জানছি প্রমিত বা মান ভাষার উথ্যানে, বিকাশে যেমন দরকার হয় সুষমা, ভারসাম্য, ঐক্য, তাল এবং প্রবর্তনা; তেমনি এগুলোর অভাবেই প্রমিতের ছিরিছাদ হয়ে ওঠে বিচ্ছিরি!

বাংলা কথনের, উচ্চারনের এবং লেখনের কিছু চুম্বক ঘটনাক্রম উল্লেখ করা যাক এখানেঃ

ক. বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ… আঞ্চলিক, কথ্য, শুদ্ধ, অশুদ্ধ তর্কের উর্ধ্বে মিথে পরিণত হয়।
খ. রবীন্দ্রনাথ কি কোলকাতার ভাষায় লিখতেন? সন্দেহাতীতভাবে না। অন্যান্য কোলকাতাবাসীর মত ঠাকুরবাড়ির লোকদেরও দন্ত্য স, তালব্য শ, মূর্ধন্য ষ উচ্চারণে সমস্যা ছিল। কবিগুরুকেও নিজের সাহিত্য ভাষাকে কথ্যভাষার অকথ্য উচ্চারণ রীতি থেকে সরিয়ে অন্য আরেকটি মান তৈরি করতে হয়েছিল। মাইকেলও কোলকাতার ভাষায় না লিখে মিশনারি বাংলায় মহাকাব্য লিখতে ব্রতী হন। তবে রবীন্দ্রভাষাই মানভাষা হিশেবে চালু হয়ে যায়।
গ. মুজতবা আলী সিলেটের ভাষায় বা জীবনানন্দ বরিশালের ভাষায় লিখলে ওদের সাহিত্যের কী পরিণতি হতো বলা মুশকিল।
ঘ. কিশোরগঞ্জ থেকে আসা নীরদ চৌধুরী থেকে একই অঞ্চলের পরের সাহিত্যিকদের লেখনভঙ্গির যে বিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে মজার লেখা হতে পারে।
ঙ.মানিকের কুবের মাঝির কথনে চরিত্রের প্রয়োজনে এবং গ্রহণযোগ্যতার দাবিতে স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিকতা আসবে!কিন্তু লেখক যখন সাহিত্যে ঘটনার বর্ণনা দেবে তখন সে বর্ণনা কোন ভাষায় হবে? সে ভাষাটি হবে প্রমিত বাংলা।

শুরুতে ৭ই মার্চের ভাষনের কথা বলে শেষে বললাম যে কুবেরের ভাষা গ্রহনযোগ্যতার নিক্তিতে আঞ্চলিক হলেও সাহিত্যের উত্তমপুরুষ কথা বলবে প্রমিতে!কেন?কারন, প্রমিতের একটা দায়িত্ব হচ্ছে কুবের মাঝিদের সামাজিক উত্তরন!জাতীয় পাখি দোয়েল হতে পারে, কিন্তু হাজার জাতের, হাজার ধরনের পাখপাখালির কিচিরমিচিরকে মেলবন্ধনে বাধতে প্রমিত কাজ করবে রক্ষাকবচ হিশাবে!

এখন এই রক্ষাকবচ গড়তে গোষ্ঠির রাজনীতি প্রমিতকে পশ্চাদ্মুখি করে কি না তা দেখা যেতে পারে!দীর্ঘকাল সাধারণ্যের প্রমিত কথনে জীবিকার এবং যাপনের তাগিদেই আরবের, আরাকানের, আর্যাবর্তের ভাষা মিশে গেছে!দূষণ না বলে এগুলোকে সংশ্লেষণ বলা যায়।স্বাভাবিক এই মিশেলে যখন জবরদস্তি চাপানো হয়েছে, তখন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মত যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে!৫২ থেকেই ৭১এ পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বাংলাভাষিদের ধর্মবোধকে হাতিয়ার করে কথনো কখনো আরবি-ফারসি-উর্দু ঢুকিয়ে দিচ্ছে; কখনো ৫০ পরবর্তি মান ভাষার অর্জিত সংহতি নস্যাতের লক্ষ্যে আঞ্চলিক ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে!এদের হাত ধরেই লোকসংস্কৃতির অতিমুল্যায়িত আতিশয্য ঘটে; আর প্রমিতে তৈরি হয় উচ্চারণ সঙ্কটের ঘাটতি বাজেট!

রাজনীতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বাইরে মেধাবাজারের বৈষম্যমূলক বিপনন কিভাবে বাংলা প্রমিতকে বিপর্যস্ত করছে তাও বিবেচনা করা যেতে পারে!সরকারি শিক্ষাব্যাবস্থাতে কথিত আধুনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাক্রম একটা দ্বৈত এবং পরস্পরবিরোধী ব্যাবস্থা হিসাবে চালু আছে এখনো! আবার কথিত আধুনিক ব্যবস্থাতে একদল ডারউইনকে আনছে, আরেকদল বাদ দিচ্ছে!এতে করে ডারউইন নিয়ে না জানার পাশাপাশি নিছক ক্রিয়াপদের ব্যবহার নিয়েও শ্রেণীবৈষম্যকে উৎসাহিত করা হচ্ছে!আবার কথিত প্রাগ্রসরেরা শিক্ষাকে বাজার প্রতিদ্বন্দিতায় ফেলে ভাষাসহ বিভিন্ন প্রায়োগিক দক্ষতাকে ”পুঁজি যার মুল্লুক তার” প্রবর্তনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে!এতে করে প্রমিত ভাষা হয়ে পড়ছে ক্ষমতার অনুষঙ্গ; যেখানে প্রাগ্রসর এবং প্রতিক্রিয়াশীল কাজ করছে সম্পূরক হিশাবে!প্রাগ্রসর শক্তি অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে যে ”রাষ্ট্রভাষা”র কথা এনেছে; প্রতিক্রিয়াজাত ”রাষ্ট্রধর্ম” প্রবর্তনাকে একই জায়গা থেকে দেখলে বাংলাদেশের মান ভাষা দুরবস্থা থেকে গড়াবে দেউলিয়াত্বে!সার্বজনীন ফন্ট প্রণয়ন না করে দুই বাংলার একাডেমি যেমন এই দেউলিয়াপনার সুযোগে বিভিন্ন ফড়িয়া প্রকাশনা এবং কর্পোরেট জচ্চুরির অবকাশ দিচ্ছে; তেমনি ইতিমধ্যে উচ্চারণ সঙ্কটে পড়া কৌমকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মিডিয়া-মামদোদের ভুতুড়ে উচ্চারণের যোয়ালে!

ভুতুড়ে কির্তি থেকে বেরিয়ে চেহারা পাবার তাগিদেই অক্ষরের আন্দোলন!উচ্চারণ যেখানে, বানান সংস্কার সেখানে না পৌঁছালে মান ভাষার সমীকরণ আরো বিভ্রান্তিতে পড়বে! ‘হাজার বছর সংস্কৃতায়নের পর এই সেদিন অর্থাৎ ১৯৩০ অব্দিও (বাঙলাদেশের) কোন মাদ্রাসায় বাংলা হরফ চালু ছিল না! মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য চিটাগাঙ্গে আরবি হরফে বাঙলা বইয়ের প্রতিলিপি তৈরি করা হত।’

উপরের উধৃতি ধার করা আহমেদ শরীফ থেকে!উনি বাংলাকে তার মত করে ”বাঙলা’ লিখতেন!অথচ আহমদ শরীফ’ই প্রামাণ্যভাবে দেখিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষি কিরাত, নিষাদেরা ১৯৭১এর আগে অব্দি হাজার, হাজার বছর কিভাবে নিগৃহীত হয়েছে!আর যখন যট্টুকুও বা গৃহীত হয়েছে তার প্রতিদানে তাকে কতটুকু শ্রমদাশে পরিণত করা হয়েছে!উল্লেখ্য যে উপরের উধৃতিতে আহমদ শরীফ ‘আরবি’তে আরো অনেকের মত ঈকার বসিয়ে দেন নাই।এর প্রত্যুত্তরে আমরা ১৯৩০ দশকের ইংরেজ যাজকিয় তত্বাবধানে তৈরি কোলকাতার বাংলা অভিধান অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবো কি না সে প্রশ্ন তোলার সময় অনেক আগেই এসেছে!

খেয়াল রাখা দরকার যে প্রমিত বা মান ভাষা কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাষা নয়।রাষ্ট্র তার আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কী করে না করে তারা সাথে প্রমিতের ডাইনামিজম সঙ্গতি রক্ষা করলে বাংলাসহ আরো অনেক ভাষাই হারিয়ে যেত!এখন দরকার বৈদিকতা এবং ইসলামিকরনের ভিতরে গুমখুন হওয়া বাংলা ভাষাভাষিসহ এই কৌমের আত্মজ কিন্তু পরাজিত আদিবাসী উচ্চারণগুলার আরো নিবিড় প্রায়োগিক সুরতহাল: নানা উচ্চারণের গাভি(ঈ)রে ভাই একই বরন(ণ) দুধ!

প্রশান্ত মৃধা
আগে দেখতে হবে এই মিশ্রণ ভাষাকে বিপন্ন করেছে কি না রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পারি যে, বাংলা অমিশ্রিত ভাষা নয়। বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন ঘটেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলেই অনেক শব্দ এই ভাষায় ঢুকে গেছে। তবে বর্তমান সময়ে প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে বাংলা ভাষায় যে পরিমাণ শব্দ যাতায়াত করছে তা লক্ষনীয়। বাংলা ভাষার অ্যাডাপ্ট করার কিন্তু চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে; সে প্রয়োজনে শব্দ গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে। তবে দেখতে হবে, এই মিশ্রণ মান্য বা প্রামানণ্য রূপকে ব্যহত করছে কি না। যদি করে তবে তা আশঙ্কাজনক।

মিডিয়ায় যে ভাষা ব্যবহারে ভাষার মূলস্রোতকে দূষিত করছে তার প্রধান দায় নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মকর্তার। তারা নিজেরাও বাক্য প্রয়োগ, শব্দ বানান, ও শব্দ ব্যবহারে মনযোগী নয়, ঠিক তেমনি যারা দেখছে, শুনছে তারাও এসবই শিখছে।

যদি প্রশাসন উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সবাইকে বাধ্য করতো শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চায় তবে হয়ত এ মিশ্রণ ঠেকানো সম্ভব হতো। আমাদের হিন্দি কিংবা ইংরেজী ব্যবহারে এমন বাধ্যবাধকতা নেই যে ব্যবহার বা মিশ্রণ করতে হবে। কারণ আমাদের ১০০% মানুষ বাংলা ভাষা বোঝে এবং এতে অভ্যস্ত। তরুণদের দোষ আমি দেই না। এমন অন্ধ অনুকরণ ও জগাখিচুড়ী মার্কা ভাষার আর্বিভাব ঘটেছে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে।

ভাষা কখনো একদিনেই মারা যায় না তবে এর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় কিছু সময় পর। এই ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও শ্রদ্ধার কমতি নেই কিন্তু এই ভাষা ব্যবহারের জন্য আমরা এর নিয়মগুলোও ঠিকমত শিখিনা। আজ থেকে হয়ত কয়েক বছর পর ছাত্রছাত্রীরা মেধাশূণ্য জাতিগোষ্ঠিতে পরিণত হবে। কারণ যার ভাষাজ্ঞান থাকে না তার কিছুই থাকে না।

আলফ্রেড খোকন
বাংলা ভাষায় যে মিশ্রণ চলছে, তা কিছুটা হলেও ক্ষতিকর এবং এই পরিস্থিতিতে তা সামাল দেয়া কিছুটা হলেও মুশকিল। ভাষা তার প্রক্রিয়াতে শব্দ গ্রহণ করবে আবার বর্জন করবে আবার কিছু শব্দকে বাঁচিয়ে তুলবে–এটাই নিয়ম কিন্তু বর্তমানে ভাষাতে ইংরেজী ও হিন্দির একটা আধিক্য আছে, যে আধিক্যের কারণে ছোট ছোট বাচ্চারাও হিন্দি কার্টুন দেখে হিন্দিতে কথা বলছে যা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও হুমকিস্বরূপ বলে মনে করি। যেমন কলকাতাতে লোকেরা এখন হিন্দি, বাংলা ও ইংলিশ মিলিয়ে একটা ভাষায় তারা কথা বলে। যার প্রভাব এখানেও পড়বে এবং ভাষা বিকৃত হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে আমরা ভাষা নিয়ে যে গর্ব করছি তা আসলে খর্ব হচ্ছে। এবং যদি তারা ঐ ভাষা বা ধরণটা অনুসরণ করে তবে তা খুবই উদ্বিগ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

আসলে ভাষাকে নীতিমালা দিয়ে আটকানো যাবে মনে হয় না। ক্যারিয়ার দিয়ে ভাষাকে আটকানো যাবে। ভাষার একটা সার্বজনীন রীতি থাকা উচিত যা সবাই যেন মেনে চলতে পারে। এক এক প্রতিষ্ঠান একেক নিয়মে রীতি চালু করলে তা হবে বিশৃঙ্খলা। যে কোন একটা রীতি সবাইকে মেনে চলতে হবে। তাছাড়া যে হিন্দি বা ইংরেজী বিষয়গুলো সবাইকে আকৃষ্ট করে তা আমরা বাংলায়ও অনুবাদ করে ব্যবহার করতে পারি।

মিডিয়ায় কথা বলার ধরনে যে মিশ্রণ দেখতে পাই তা আটকানো যেতে পারে এরকম ব্যবস্থা করে যে, যদি মাধ্যম বাংলা হয় তবে পুরোপুরি বাংলায় অনুষ্ঠান করতে হবে।

তাছাড়া বাংলা ভাষার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও মাধ্যমে একে আবারও উজ্জীবিত করা যাবে। নতুবা একটা শংকা কিন্তু রয়েই যায়।

original post

read more

Sunday, April 8, 2012

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

by আহমেদ জী এস
শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)
এক (সম্পূর্ন )

“ …. আমারে যে জাগতে হবে
কি জানি সে আসবে কবে
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে ।”

সেখানে না ছিলো আকাশ, না মাটি । শুধু বৃষ্টি ছিলো । সে আমাকে ধূঁয়ে দিচ্ছিলো । ফুঁড়ছিলো তীরের মতো । আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো । আমার সারাটা জীবন জুড়ে যেন আমি শুধু ভিজে যাচ্ছিলাম । এবং তখনি ধীরে ধীরে শিখছিলাম কি করে ঘৃনা করতে হয় ।
ঘৃনা শব্দটাকে আমার বড় ভয়, বড় অপরিচিত । অথচ তাকে নিয়েই আমাকে এখন চলতে হবে, ফিরতে হবে । আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে যে সে, সিন্দবাদের দৈত্যের মতো ঠিক ঘাড়টাতে চেপে বসে আছে । আমি কি সেখান থেকে আবারো পুরোনো ভালোবাসার ঘরে ফিরে যেতে পারবো ! স্বাভাবিক কোথাও ! যেখানে আমি ছিলাম এতোদিন, নিজের মনে নিজেই ?
বাসের জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক ভাবেই আমার মনে হচ্ছিলো, এধরনের গাল্পিক চিন্তাভাবনা আমাকে মানাচ্ছে কিনা। আমার যা বয়স তাতে সেই বয়সের ঘরে রোমান্টিসিজ্ম এর জন্যে কোনও জায়গা ফাঁকা আছে কিনা ।
বিচিত্র মানুষের মন, নৌকার মতো , বয়েই চলে । কোনও নৌকাই একই ঘাটে নোঙ্গর ফেলে চিরদিন বসে থাকেনা । না নদীতে, না জীবনে ।

শীলা তো আমাকে একটা সুন্দর শায়র পাঠিয়েছিলো এসএমএস করে । লিখেছিলো, “ তোরনা হোতা তো, রিস্তে হম্ না বনাতে / ভরসা না হোতা তো, আপনে দিল কা হিসসা না বনাতে।” শীলা বোধহয় এখন তা ভুলে গেছে যে, এরকম একটি আবেগময় এসএমএস পাঠিয়ে সে তার ঐ মূহুর্তের মনটাকে আমার হাতে কি নির্বিধায় তুলে দিয়েছিলো । সে কি তখন জানতো, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটিই সে করে ফেলেছে ! হয়তো জানবে ও না কোনদিন । আরো অনেক অনেক সুন্দর শায়র সে আমাকে পাঠিয়েছিলো ।
আমি তাকে আমার বয়সের কথা তুলে মুঠোফোনে বলেছিলাম, এভাবে আবেগে ভেসে যেওনা ।
সে হয়তো ভাসতেই চাইছিলো । আমার বয়সের তোয়াক্কা করেনি । কে জানে কেন !
বলেছিলো, “মানুষ ভালোবাসে বয়স দেখে নয় । বারবার আমাকে বয়সের কথা বলবেনা ” ।
সে কি তার রাগ ! আমি মেইলে লিখেছিলাম, “ তোমার মতোন এই এতোটুকু এক মেয়ে এতো শক্তি কোথায় পেলে ?”
উত্তরে লিখেছিলো, “ সে আমার প্রেম ” ।
হ্যা, সেই প্রেম । যে প্রেমে তাজমহলের বীজ লুকানো ছিলো । যে প্রেমে ধংশ হয়েছিলো সুন্দরী ট্রয়নগরী । হ্যা, এই সেই প্রেম, যে প্রেমে পেত্রার্ক তার অদেখা লরাকে কালজয়ী করে গেছে ইতিহাসের পাতায় ।

শীলাও আমার অদেখা । আমি শীলাকে কখনো দেখিনি । এ জীবনে তার দেখা পাবো, এমনটাও মনে হয়না ।

আজকের ইলেক্ট্রনিক জমানায় এই এক সুবিধে, হাতের কাছেই মোবাইল, ডেস্কটপ্-ল্যাপটপ্ আছে, যতো খুশি কথা বলো । এসএমএস করো, অনলাইনে মেইল করে তুলে ধরো নিজেকে । সত্য-মিথ্যে বলে যাও, জানার উপায় নেই । এ যেন এক আলাদা জগৎ । বসন্ত বাতাসের মতো । গিরগিটির মতো রঙ বদলানো শুধু , ক্যামেলিয়ন । আনন্দ যতো তারো চেয়ে বেশী ব্যথা, হৃদয় ভাঙ্গার গল্প । এ আমার অনুমান । কোনও ষ্ট্যাটিষ্টিকস্ নেই ।

ইন্টারনেটের এক সাইটে আমাকে খুঁজে বের করেছিলো শীলা । বন্ধুত্বের জন্যে আমার সাইটে ক্লিক করেছিলো তিন তিনবার । আমার চোখ এড়িয়ে গেছিলো তা । আসলে এড়িয়ে গেছিলো কি ! কিন্তু প্রেমের দেবী ভেনাস যদি কারো দিকে একবার তার তীরটি ছোঁড়েন, তার যে ধরা না পরে উপায় নেই । তাকে যে রক্তাক্ত হতেই হবে ! আমার ভাগ্যদেবতা সেদিন কি হেসেছিলেন ভেনাসের এই পাগলামী কিম্বা তার সেন্স অব প্রোপরশান এর অভাব দেখে ?

মানুষ একটা অদ্ভুত জীব । কতো রঙের মানুষই তো দেখলাম জীবনে । জীবনের ঘাটে ঘাটে হরেক মুখ, হরেক কিসিম । যাকে মনে হয়েছিলো নেহাত গোবেচারা, নিতান্তই হদ্দ, সে ই হয়তো দেখা গেল এক তুখোর পান্ডিত্যের ভারে নুয়ে আছে । আবার যাকে মনে হয় তুখোর কিছু, ওজনদার, দেখা গেল তার ভেতরটা নর্দমায় ভরা – আবর্জনাময় পানা পুকুর । ফাঁকা, ভেতরটা শুধু ফাঁকা । হাযারো কিসিমের মুখের ভেতরে নিজের মুখখানিই বা আলাদা করি কি করে ! কি এক অদৃষ্টের ইঙ্গিতে ক্লিক করে বললাম, হ্যা, ওকে, বন্ধুত্ব হ’তে পারে । শীলা সেদিন ই আমাকে তার মেইল এ্যাড্রেস দিয়েছিলো । দিয়েছিলো তার মুঠোফোনের নম্বর । জোর তাগিদ ছিলো এক্ষনি যেন আমি তার দেয়া নম্বরে কথা বলি । এই সন্ধ্যাশেষের যৌবনে একটা নিষিদ্ধ স্পর্শের ছোঁয়ায় শিহরিত হচ্ছিলাম । একটা তীব্র নেশার ঘোরলাগা দিন যেন গেল আমার । কাম, নাচায়নি এমন মানুষ কোথাও থুঁজে পাওয়া যাবেনা ।

বাসের সামনের সীটগুলোতে শীলার বয়েসী কিম্বা আরো কম বয়সের মেয়েরা বসে আছে । আমার শীলার কথা মনে হলো । এদের কারো সাথেই ওর মিল নেই । শীলার মতো বুদ্ধিমতি মেয়েও সম্ভবতঃ এদের মধ্যে নেই । কী তার অনুভব, পান্ডিত্যের কী গভীরতা তার । এদের কারো সাথে মনে হয় মিলবেনা । আমি অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম একদিন – আচ্ছা , তুমি কে বলোতো ! তোমার এই সবে ত্রিশ পেরুনো বয়সে এতো কিছু তুমি জানলে কি করে একজন বঙ্গললনা হয়ে ?
আর একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার সারাটি দিন কি করে কাটে ।

পেছন থেকে কে এক পুরুষকন্ঠ বললেন, এই যে জানালাটা বন্ধ করুন, দেখছেন না বৃষ্টির ছাট আসছে । রাগ হলেও রাগতে পারা গেলনা । এটা পাবলিক বাস । আমার একার ইচ্ছেটা এখানে অচল । আমিতো ভিজতে চাইছিলাম, একটু ভিজতে চাইছিলাম । লোকে পাগল বলে বলুক, জানালার বাইরে একটা হাত বের করে বৃষ্টির জলও ধরছিলাম । আনমনে অনুভব করছিলাম তার ছোঁয়া । জলের মতো পেলব, কোমল, স্বচ্ছ আর কি আছে? কার আছে তারই মতো বুকের ভেতরে একাধারে উষ্ণ ওম আর শীতলতা, তারই মতো কঠিন বরফ হৃদয় ! নেই । জলের মতো আর কেউ নেই । পেছনে ঘাড়টা ঘুরিয়ে যিনি জানালাটা বন্ধ করতে বলেছিলেন, তার দিকে তাকালাম । শীলার বয়েসী হবে আবার বেশীও হতে পারে । আবেগ নেই বোঝা গেল । জীবনে কোনদিন বৃষ্টির জলে ভেজেনি এমন একটা ভাব তার মুখে, আচরনে । আবেগশূন্য মানুষ দিয়ে পৃথিবীর কিচ্ছু হবেনা । নীল-সবুজ পৃথিবীটা একদিন এদেরই জন্যে হলদে বিবর্ণ হয়ে যাবে । আমি তাকে মনে মনে ক্ষমা করে দিলাম।
বললাম , স্যরি ।
শীলা ওর মতো নয় । শীলার প্রচন্ড আবেগ ছিলো । আমাকে একবার লিখেছিলো – “ সময় হলে পালিয়ে এসো ইচ্ছা ডানায় ভেসে / আমার সঙ্গে যাবে তুমি মোন খারাপের দেশে ? ” । আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো, তক্ষুনি ডানায় ভেসে ভেসে ওর কাছে চলে যাই । হায়, আমি যদি পাখি হতে পারতাম ! কিন্তু আমি যে ওর ঠিকানা জানিনে ।
ও আমাকে ঠিকানা দেয়নি ।

ইলেকট্রনিক প্রেমে কেউ কাউকে সত্যিকার ঠিকানা দেয়না । গভীর গোপন নিষিদ্ধ প্রেমে এটুকু রহস্য না থাকলে বোধহয় জমেনা, আকর্ষন থাকেনা । তবে ইন্টারনেটে চ্যাট করতে করতে ওর একটা ছবি মেইলে পাঠিয়েছিলো প্রথমদিনেই । মিষ্টি, ভরাট একটি মুখ । চোখে তার অসীম মায়া । ভুমধ্যসাগরের মতো গভীর নীলরঙ ছিলো সেখানে । অঁরি মাতিস্‌ এর প্রিয় গাঢ়নীল এর ছোঁয়া । তার ছদ্মনামের সাথে বেশ মিল । রাঙাঠোটে একটুকরো দুষ্ট হাসি ধরা ছিলো সে ছবিতে । আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এ মেয়ের সাথে নিষিদ্ধ প্রেমের খেলাতেও আমি যে বড়ই বেমানান । তাকে দেখে হাযার হাযার টগ্বগে তরুন যে কোনও মূহুর্তে যুদ্ধে যেতে ও রাজী হয়ে যেতে পারতো । আমার যে যুদ্ধে যাবার বয়স নেই ! আমাকে কেন যে ও বেছে নিয়েছে !
“ কুকুরের গলায় মুক্তোর মালা ” ?
নাহ্ , এ উপমাটা আমার এখানে দেয়া ঠিক হয়নি । সাধারন্যে খুব বেশী প্রচলিত । বহু ব্যবহারে মলিন, ত্যানা ত্যানা । শীলার মতো চৌকস একটি মেয়ে যাকে মালা দিয়েছে, তার জন্যে এ উপমাটা বেশ অভদ্র অভদ্র লাগছে । শীলা যদি এই লেখাটি কোনদিন পড়ে তবে দুঃখ পাবে উপমা ভান্ডারে আমার দারিদ্রতা দেখে । একটা ভালো উপমা আমি কোথায় পাবো !

আমাকে কেন যে ও বেছে নিয়েছে জানতে দেরী হয়নি । শীলা লিখেছিলো, তোমাকে দেখে আমার আর একজনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো । য়্যুনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে প্রেমে পড়েছিলাম তার । একতরফা প্রেম । আমি তাকে বলতে পারিনি কখনো ।
বোঝা গেল আমার ভেতরে শীলা তার প্রথম যৌবনের হারানো প্রেমকে খুঁজে পেতে চাইছে ! আমি এখন কি করবো ? এক গভীর দুখঃবোধে কাতর হবো ? লজ্জাবতী পাতার মতো মিইয়ে যাবো লজ্জায় ? পুরুষমানুষের জিন এর ভেতর বোধহয় হার না মানার সহজাত একটা কোড রয়েছে । ক্রোমোসোমাল ডিফেক্ট ! কারো কম কারো বেশী ।
আমি বলেছিলাম, তোমার ব্যথায় সমব্যথী হওয়া হয়তো চলে কিন্তু আমি তো তোমাকে তোমার হারানো দিনগুলি ফিরিয়ে এনে দিতে পারবোনা ।
ও রেগে গিয়েছিলো খুব । যা গেছে তা যাক, বলেছিলো সে । বর্তমানের আমাকে আর তাকে নিয়েই ভাবতে বলেছিলো । আরো বলেছিলো, আমাকে নাকি সে তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে, তাকে ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া যেখান থেকে আমার নাকি মুক্তি নেই আমৃত্যু।
তীব্র এক সুখের নদী আমার দু’কুল ভাসিয়ে আমার সমস্ত সংস্কারকে ডুবিয়ে একাকার করে দিয়েছিলো । বন্যার জল সরে গেলে শুনেছি, মাটিতে নাকি পলি জমে। ছোটবেলায় বইতেও পড়েছি। সেখানে তরতর করে আবার নাকি জন্ম হয় গাঢ় সবুজ দূর্বাঘাস । আমার অবহেলায় ফেলে রাখা এতোদিনকার চৌচির হয়ে থাকা মাটিতে পলি জমা শুরু হলো বুঝি। সবুজ ঘাসেরা ডালপালা ছড়াতে থাকলো একে একে ।
আমি তাকে মুঠোফোনে বললাম, আমি তোমাকে খুউব ভালোবাসি শীলা ।

ষ্টপেজ এসে গেছে, আমাকে নামতে হবে । সামনেই মেয়েদের আলাদা সীট । এও এক ধরনের তামাশা, উওম্যান লিব এর যুগেও । নারীরা সমানাধিকার চাইবে, আবার পাশাপাশি তাদের জন্যে আলাদা সুযোগ সুবিধার দাবীও জানাবে । এটা যে পরস্পর বিরোধী, এ বোধটুকুও হয়তো তাদের নেই । এই ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে তারা নিজেরাই যে অজান্তে নিজেদের পুরুষের নীচে নামিয়ে আনছে, নিজেদের অপমানিত করছে এটা কি তারা বোঝে ? এখানে পুরুষ তার প্রতিযোগী নয়, অজান্তে নারী নিজেই নিজেদের প্রতিযোগী । এরা না বুঝুক, আমার ক্ষতি কিম্বা কোনও লাভ নেই । আমার এখন এদেরকে ঘৃনা করার দিন ।

এই একটা বাজে অভ্যেস হয়েছে আমার, সারাটা পথের অনেকটা সময় আমি এদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি । কিঁছু একটা খুঁজি হয়তো । শীলার যে ছবিটি আমার কাছে আছে সেই আদলের কাউকে কি আমি খুঁজছি মানুষের ভীড়ে ! একটা দুরাগত আশা, সুউচ্চ আকাশের অসীম থেকে ডানা ঝাপটে পাখীর মতো একটি ছবির মুখ নেমে আসবে একদিন আমারি চোখের অলিন্দে । দু’হাতে সে মুখখানি তুলে, চোখে চোখ রেখে বলবো, এতোদিন কোথায় ছিলে ! আমার বেলা শেষের কুড়িয়ে পাওয়া একটি নীল মুক্তো যেন । কোথায় লুকোবো তাকে, কোনখানে । লোকে বলে নীলা নাকি কারো সয় কারো সয়না । আমার সইবে তো ।

নামতে হলে মেয়েদের পাশ দিয়েই আমাকে যেতে হবে । যেতে যেতে আমি একবার ঘৃনার দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতে চেষ্টা করলাম । এক একটি আপাত নিষ্পাপ মূখ । এইসব মুখের আড়ালে কিম্বা মনের ভেতরে কি নষ্ট চাঁদের মতো কলঙ্ক লুকিয়ে আছে ? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা । এক একজনের এক এক সাজ । মানুষের সাজগোছের বহর থাকে । যা থেকে তাকে চেনা যায় । বোঝা যায় তার রুচি । মুখে কি কিছু লেখা থাকে ?
শীলা আমাকে “বুদ্ধু” বলতো । আমি কি সত্যিসত্যিই বুদ্ধু হয়ে গেছি ! আমি কেন বুঝে উঠতে পারছিনা ? ঘৃনা এলোনা আমার । একজন শীলার জন্যে আমি তাবৎ মেয়েদের কে ঘৃনা করতে পারিনা ।
কিন্তু আমি যে শিখতে চাইছি, কি করে ঘৃনা করতে হয় !

শীলা আমাকে লিখেছিলো, “ ক্যারী অ্যা হার্ট দ্যাট নেভার হেটস্, ক্যারী অ্যা স্মাইল দ্যাট নেভার ফেডস্ , ক্যারী অ্যা টাচ্ দ্যাট নেভার হার্টস্ ” । আমি কি একথা ভুলে যাবো ! এতো ভয়ঙ্কর সুন্দর কথাগুলো সে কেন লিখেছিলো যদি সে নিজেই তা ভুলে যায় ? এতো বড় মিথ্যে দিয়ে সে আমাকে আটকাতে গেল কেন ! ভোরের শিশির বিন্দু যেমন ঘাসের ডগায় রোদের কণক আভা ছড়িয়ে সুন্দর হয়ে ফোঁটে, আবার ঝরে যায় এ ও কি তাই ! ক্ষনেকের ! এই সব সুন্দর সুন্দর কথা কি ছেলে ভোলানো ফাঁদ! আমি সে ফাদেঁ কি ধরা পড়েছিলাম! নইলে আমি কেন তাকে উত্তরে লিখতে গেলাম, “যে হৃদয় আমি ধারন করে আছি তার তল তুমি খুঁজে পাবেনা, আমার মুখের হাসির ব্যপ্তি আকাশের মতো সীমাহীন, কোমল আমার স্পর্শের হাত উষ্ণতা ছড়ায় তাকেই যে অনুভব করার ক্ষমতা রাখে ” । এটা পেয়ে মুঠোফোনের বাটনে তার পদ্মকলি আঙ্গুলের ছোঁয়ায় যে লেখাগুলো ফুটে উঠেছিলো আমার ছোট্ট স্ক্রীনে, তা শুধু আমার প্রশংসা । আর আমার এই লেখা পড়ে সে যে মুগ্ধ, তা জানাতেও দেরী করেনি ।
লিখেছিলো, য়্যু নট অনলি টাচ্ড মাই হার্ট, য়্যু আর ইনসাইড ইট ।

সেদিন বিজলী চলে গেল । হঠাৎ হঠাৎ বিজলী চলে যাওয়া আজকাল একটা ফ্যাশান হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন । সরকারী ফ্যাশান ।সারা বিশ্ব যেখানে “কর্পোরেট” কালচারে অভ্যস্ত সেখানে আমরা “করাপশান” কালচারে আকন্ঠ নিমজ্জিত । নইলে চল্লিশটি বছর পেছনে ফেলে এসেও বিদ্যুতের বেলায় আমরা দু’পা ও এগুতে পারলামনা কেন ? এ ফ্যাসানে অভ্যস্ত হ’য়ে গেছি । ভালো যে আমার এখানে জেনারেটর আছে । অনেক অফিসেই আছে। সে জেনারেটর ও যেন আজ আমার সাথে শত্রুতা করবে বলে ঠিক করে রেখেছে । আমার পিওন এসে বলে গেল, ডিজেল নাকি নেই, ফুরিয়ে গেছে । আনতে গেছে কেউ একজন । শীলার সাথে এখন তাহলে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে কতক্ষন । গত ক’দিনে যোগাযোগ ছিলোনা । শীলাই বলেছিলো, “আমার ননদকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে, যোগাযোগ করতে পারছিনে” ।
মেঘেমেঘে আকাশ ছেয়ে গেলে থাকে বৃষ্টির প্রতীক্ষা । প্রতীক্ষিত বৃষ্টি না এলে কি হয় ? আমি চেয়ে আছি একফোঁটা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ।আকন্ঠ তেষ্টায় আমার বুকের জমিনে হাহাকার । রবীন্দ্রনাথের গান মনে এলো, “ চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে ….” । আমি তাকে লিখলাম, “ হোয়্যার আর য়্যু ?” ছোট্ট করে ।
বৃষ্টি এলো সময়ের অনেক পরে, শীলার এসএমএস হয়ে, “ রাতে কথা হবে ”।
সে রাত আর আসেনি !

একদিন সকালে শীলা লিখলো, “ দিস্ মর্নিং গড ইরেজড্ অল মাই মেমোরী এন্ড আস্কড্, “ ডু য়্যৃ রিমেমবার এ্যানি ওয়ান নাও ?” আই টোল্ড হীম ইয়োর নেম । গড স্মাইলড এন্ড সেড, “সাম ভাইরাস কান্ট বী ডিলিটেড” । এতো সুন্দর করে বলতে পারা ভালোবাসার কথা সে শিখলো কোথায় ! কে তাকে শেখালে এসব ! এগুলোই কি ছিলো শীলাকে ভালোলাগার কারন ! একমাত্র কারন কি ? কে জানে !

আমার একটু আধটু লেখার বাতিক ছিলো একসময়, আছে হয়তো এখোনো ।নইলে এ লেখা লিখতেই বা বসলাম কেন ? সে বীজ এতো বছরের ঘর-সংসার, চাল-ডাল-নুন এর হিসেব কষতে কষতে, অফিস-আদালত আর নাগরিক সুযোগ সুবিধার পেছনে ছুটতে ছুটতে বাসের হ্যান্ডেল ঝোলা হয়ে একবারেই যে মরে যায়নি, তাতেও যে এখনও কচিকচি পাতারা মাথা তুলতে পারে বুঝলাম শীলার কাছে এসে । সাহিত্যের বাতাস একবার যার গায়ে লেগেছে, লোকে বলে; তার ইহকাল-পরকাল গেছে । আমার ইহকাল তো গেছেই, শীলার প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে ভেসে গেছে এতোকালের আবাদি জমিনও । আমার অতীত-বর্তমান আর ভবিষ্যত, প্রতিদিন সকালে শীলার পাঠানো এসএমএস এর পাখনায় ভর করে কোথায় যে হারিয়ে গেল !
দেখলাম, একদিন শীলার কোনও সাড়া না পেলে আমার বুকের ভেতর কেবল একটা ধূ-ধূ মাঠ পরে থাকে। চৈত্রের দামাল বাতাসের ঘুর্নি বয়ে যায় সাই সাই করে । নিকোটিনে ঝাঝরা ফুসফুসে যেন বাতাসের টান ধরে।
নিষিদ্ধ কিছুর গন্ধ পেলে ছেলেবেলায় রক্ত যেমন ছলকে ছলকে ওঠে সবার, আমার ও তেমন হতে শুরু করলো কি ! এ বয়সে এ কোন খেলায় জড়িযে গেলাম আমি ! ফ্রয়েড সাহেব তো তাহলে মিথ্যে বলেননি – মানুষের সব কাজের পেছনেই আছে, কাম ! আসলেই কি !
শীলার ছবিতে তার মুখের হাসি, মুঠোফোনে তার ভাঙা গলার স্বরে আমাকে শুধানো, “ লাঞ্চ করেছ ? বাসায় পৌঁছে ফোন করবে, ঠিকমতো পৌছেছ কিনা, চিন্তায় থাকবো ” এইসব ই কি আমাকে পাগল করার জন্যে! আমি বললাম –
- “ পাগল হতে আমার বাকী কি থাকলো ?”
- “ পাগল আমার ! তুমিই তো পাগল বানিয়েছ আমাকে আগে ” শীলার পরিষ্কার জবাব । “ এতো ভালো আমাকে বেসোনা……… ” ।
-
এ কথা কেন বলেছিলো শীলা !
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

by আহমেদ জী এস
দুই / (সম্পুর্ন একত্রে )

“ না পিনা হারাম হ্যায়, না পিলানা হারাম
পি কে হোস্ মে আনা হারাম হ্যায় ।”

বেশ কাটছিলো দিনগুলি । এক একজনকে এক এক রকমের খেলায় মজিয়ে রেখেছিলাম । খেলছিলাম এক এক রকমের খেলা । নেশার ঘোর যে সর্বনাশা । মাঝখানে ঐ ব্যাপারটা না ঘটলে একটা আত্মতৃপ্তি পাওয়া যেত । কে বুঝেছিলো তখন ! এভাবে ফেঁসে যাবো বুঝতে পারিনি । কেন যে এমন একটা জঘণ্য মিথ্যে দিয়ে শুরু করলাম ব্যাপারটা ! নিজের সত্যিকারের জীবনটাকে ঐ একজনের কাছে মিথ্যে বানিয়ে দিলাম । এটা কি আমার একার দোষ, দোষ তো নভেরা’র ও । ও তখন এই নতুন খেলায় আমাকে ঠেলছিলো বলেই না ! এতো লজ্জা আমি এখোন কোথায় রাখবো । এভাবে হেরে গেলাম, খুব বিশ্রী ভাবে ! পৃথিবীর একজন মাত্র মানুষের কাছে হলেও খুব নোংরা হয়ে গেলাম যে । যাকে ভালোবাসিনি, শুধু অভিনয় করে গেছি, তার জন্যে আমার এতো ভাবনা কিসের ! এতো কষ্ট কেন ! একটা নিষিদ্ধ নেশার ঘোর থেকে কেন যে বেড়ুতে ইচ্ছে করছেনা !

নিজেকে ধরা না দিয়েও বেশ তো চলছিলো প্রেম প্রেম খেলা । ক’জনার সাথে যে এরকম খেলা খেলছিলাম, নিজেরই মনে নেই । ইন্টারনেটে এই এক সুবিধে । হাযারো সাইট রয়েছে বন্ধুত্ব পাতানোর । নিজের একটা প্রোফাইল খোলো, চোখে বা মনে ধাঁধা লাগে এমন একখানা রহস্যজনক ছবি দাও, দেখবে পতঙ্গের মতো প্রজাপতি হাজির । তারপর বাঁধভাঙ্গা প্রেমের জোয়ার । যতোদিন ভালো লাগে চালিয়ে যাও । শ্লীল-অশ্লীল যা কিছু আছে মেইলে বা ছবিতে তা পাঠাতে থাকো । দেখবে, শরীর-মন কেমন কেমন যেন শিরশির করে উঠছে । এ এক ধরনের নিষিদ্ধ খেলা, নেশার মতো । এরপরে একদিন না বলে-কয়ে ডুব দাও । দু’পক্ষই জানে, এরকম খেলা হঠাৎ করেই জ্বলে উঠে আবার হঠাৎ করেই নিভে যায় । দমকা বাতাসের মতো । একটুখানি ঘূর্ণি তোলা, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সবকিছু তারপরেই সুনসান চারদিক । নো হার্ড ফিলিংস্ ।
নভেরা’র পাল্লায় না পড়লে এ জগতটা আমার জানা হতোনা । কেমন যেন একটা নেশায় পেয়ে গেছিলো । আসলে পুরুষগুলো কি বোকা ! নাকি বোকা বোকা ভান করে থাকে ? সট্কেও পরে কেউ কেউ মিথ্যের সত্যটা বুঝতে পেরে । আমিও তো কতজনকে সিক্নীর মতো ঝেড়ে ফেলেছি মজাটা লুটে নিয়ে । কিন্তু এ ভাবে তো কেউ বলেনি আমাকে কোনদিন । আমার নির্জলা মিথ্যেটা বুঝতে পেরেও সট্কে পরেনি বরং আরো বেশী কাছে এসেছে । আরো গভীর করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছে নিজের কাছে । সবার সাথে তো শুরু থেকেই বানানো গপ্পো বলে গেছি । এক একজনের কাছে একেক রকম । এই ফাঁদটা পাততে গিয়েই যতো বিপত্তি । কেন যে অজস্র মিথ্যের মধ্যে আসল নিজেকে কিছুটা মিশেল দিয়ে তাকে কাছে টানলাম ! আসলে সবটাই কি নভেরা’র দোষ, আমার নিজের কি কোনই ভুমিকা ছিলোনা সেখানে ! একটু যেন মন কেমন কেমন করা !

সেদিন গুমোট গরম ছিলো । ইলেক্ট্রিসিটি নেই বলে ঘামছিলাম খুব । আমার আবার ঐ একটি দোষ, গরম সইতে পারিনা একদম । নাক ঘেমে যায় সবার আগে । নাক ঘামলে নাকি ভালোবাসা পাওয়া যায়, সবাই খুব ভালোবাসে । তাই কি ! এইমাত্রই তো একজনের সাথে এই ভালোবাসা-ভালোবাসা খেলাটাই খেলছিলাম, তাকে কি ভালোবাসা বলে ? টোয়েন্টি - টোয়েন্টি ক্রিকেটের মতো খন্ডকালীন খেলা । অথচ দারুন উত্তেজনাময় । দু’জনেই বেশ জানি এটা ফাঁকি । তারপরেও খেলতে হয় । নেশার লাটিম ঘুরতেই থাকে যে । ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল , নইলে ব্যাটাকে আর একটু নাচাতে ইচ্ছে ছিলো । আর তক্ষুনি নভেরা এসে হাজির । নভেরা এলে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায়, টের পাইনা কেউ । ঘর সংসারের কাজ বাক্সবন্দী পড়ে থাকে । কি উচ্ছল, প্রানবন্ত মেয়ে । আমার মাঝে মাঝে ওর মতো হ’তে ইচ্ছে করে । সেদিন নভেরাই বলেছিলো, “শীলা, এতোদিন তো কেবল লালটু আলু আলু মার্কা অল্প বয়েসী ছেলেদের সাথে প্রেম প্রেম খেলেছিস । এবার একজন বেশী বয়সের পুরুষ ধর । দেখবি আলাদা এক মজা । বয়স্ক পুরুষের প্রেম যখন উৎলে ওঠে না, তখন দেখবি তোর দু’কুল ভেসে গেছে। এবার দেখি একা একা তুই কদ্দুর যেতে পারিস সাঁতরে ।”
আমি যে কোথাও যেতে পারিনি । আমি যে ডুবতে বসেছি । এতো লজ্জার পরে তো আমার ডুবে মরার ই কথা ছিলো ।

কেন যে আমি তাকে লিখতে গেলাম, “য়্যু রিমাইন্ড মি অব সামওয়ান ভেরী ক্লোওজ ট্যু মাই হার্ট । আই লভ্ড হিম ইন মাই য়্যুনিভার্সিটি লাইফ বাট দ্যাট ওয়্যজ ওয়ান সাইডেড ওনলি, ফ্রম মাই সাইড ।” তিন তিন বার আমি তাকে তার প্রোফাইলে নক্ করেছি । প্রথমবারে সাড়া না পেয়ে জেদ চেপে গিয়েছিলো । শেষে যখন তার সাড়া মিললো, বুঝলাম জিতে গেছি । সে আমার দেয়া এ্যাড্রেসে লিখেছিলো, “হ্যা, ওকে । বন্ধুত্ব হ’তে পারে”।
আমি তড়িঘড়ি মেইলে তাকে অন্য একটি ম্যাসেঞ্জারের এ্যাড্রেস দিয়ে বললাম, এক্ষুনি চ্যাটে কথা বলো । আমার সেলফোনের নম্বর দিয়েছিলাম, দিয়েছিলাম একটা ছবি । তার বয়স তো আমি জানি ই, বিস্তর ফারাক । তোয়াক্কা করলাম না । প্রথমেই তুমি সম্বোধন । একটু ভয় ছিলো মনে, যদি ধরা পড়ে যাই । আমার ভাঙা স্বর সেদিন কি আরো ভেঙে গেছিলো ! ওপাশ থেকে এক মায়া ঝরা কন্ঠের আকুলতা যেন আমার এই অপূর্ণতাকে ঢেকে দিলো পূর্ণতার সুতো বুনে বুনে ।

সে একটি রাত গেছে আমার । কী মধুর, কী আশ্চর্য্য একটি রাত । সে রাত যেন কোজাগরী পূর্ণিমার রাত । বসন্ত বাতাসের সাই সাই রাত। এরকমের রাত আমার আর কাটেনি কারো সাথে । মরি টেনে নেয়া বাঘিনির মতো আমি তাকে টেনে নিয়েছিলাম, আগলে রেখেছিলাম । বুঝলাম , আমি নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি । কিন্তু ততোক্ষনে ঢিল ছোঁড়া হয়ে গেছে । আমার পাঠানো লম্বা মেসেজটিতে যে কাহিনী আমি তাকে লিখেছি, তা যে তাকে কোনও ভাবে রেখাপাত করেছে কি করেনি, প্রথম রাতের আলাপে তার কনাটুকু রেশ ও আমাকে সে পেতে দেয়নি । তার গভীর সঘন, সহজিয়া বাক্যালাপ তাকে অনন্য করে তুলছিলো । সোজা-সাপ্টা, সাহসী, সংকোচহীন । একদম আলাদা । এরকম মানুষের দেখা আমি পাইনি ।
ন্ .. না তার সাথে আমার দেখা হয়নি ! এরকম একজন মানুষের সাথে আগে কখনও যোগাযোগ হয়নি, এটাই বোঝাতে চাইছি ।
পরের দিন খুব সকালেই তাকে এসএমএস করে লিখলাম, “ এ কাপ অব হট্ কিসেস……” ।
আমিও কি আবেগে ভেসে যাচ্ছিলাম !
নিজেকে সমর্পন করার এ কি তীব্র আকুতি আমার মধ্যে ! যে আমি দিনের পর দিন প্রেম প্রেম খেলা খেলে গেছি অনেকের সাথে অবলীলায়, সে আমার কি হ’লো আজ ! মিথ্যে দিয়ে যার শুরু হয়েছিলো, আমি তাকে সত্যের কাছাকাছি টেনে আনলাম কেন ! আমার কি মতিভ্রম হয়েছে ? এতোদিন তো কেবল নেশাই ধরিয়ে দিয়েছি অনেকের , এবার যে আমি নিজেই নেশার ঘোরে মাতাল । দিকশুন্যহীন এ কোন অথৈ পাথারে এসে পড়লাম আমি ! আমার হোশ ফিরবে তো !

অনলাইনে তার প্রোফাইল পড়ে কারো বন্ধুত্ব পাতানোর কথা নয়, শুধু তার বয়সের কারনে ।বিশেষ করে ইয়াং মেয়েদের তার প্রতি আকর্ষনের কোনও কারন নেই । বিদেশী মেয়েদের কথা আলাদা । ওরা নাকি বয়েসের তোয়াক্কা থোরাই করে । আমাদের বাঙালী মেয়েদের এদিকে সূচীবাই আছে । যদিও প্রোফাইলে দেয়া নিজের ছবিতে অনেক তরুন দেখাচ্ছিলো তাকে । বেশ স্লীম লাগছিলো দেখতে, তরুন কেউ । বয়েস বোঝা যাচ্ছিলো না । অথচ বয়সের ঘরে অন্য অঙ্ক লেখা । ইচ্ছাকৃত ভাবেই বয়স ভাড়িয়েছে ? চেহারাও আহামরি কিছু নয়, প্রথম দর্শনেই ভালোলাগার হয়তো কোনও কারন নেই । আমার কেবল তার প্রোফাইলে লেখা একমাত্র লাইনটা খুব ভালো লেগেছিলো । সচারচর যা কেউ লেখেনা । নিজেকে সবাই খুব উঁচুতে তুলে ধরতে, নিজের গুনগান গাইতেই ব্যস্ত সব সময় । এক একজন যেন স্বয়ং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, চরিত্রে রামচন্দ্র । এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই।
কেবল একটি লাইনে নিজেকে সে তুলে ধরেছে এভাবে, “ আমি যা, আমি তাই ” ।
ক’জনার বুকের সাহস আছে এভাবে লেখার ।আমার ভালো লেগেছিলো, আর তাকে একটু বাজিয়ে দেখতে দারুন ইচ্ছে করছিলো । তিন তিনবার তাকে আমি আমন্ত্রন পাঠিয়েছি সাড়া মেলেনি ।
রাগ করে কিনা ! কোনও তরুনীমেয়ের আহ্বানে সাড়া দিতে কোনও পুরুষের এতো সময় লাগার কথা নয় । আমাকে বাজিয়ে দেখতে চাইছিলো কি ! বরং আমিই তো বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম তাকে ।

সেদিন ও ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না । ইলেক্ট্রিসিটি কখন আসবে বা যাবে এগুলো এখন সম্ভবত সবার জানা ।তাই আগেভাগেই হাতের কাজগুলো গুছিয়ে রেখেছি যাতে রাতের বেলা হাতে কোনও কাজ জমে না থাকে । ইন্টারনেটে যেন বসা যায় । আমার যে না বসলেই নয় । কেউ কিছু মনে করবে ? আমার মতো একটি মেয়ে রাতের বেলা ভদ্রস্থ সময়ের বাইরেও ইন্টারনেটে ঘন্টা কাবার করে দেবে, এতে তো মনে করার অনেক কিছুই থাকে । আমার এখানে মনে করার কেউ নেই । থাকলেও কেয়ার করি না । তারা জানে আমি কি চীজ ।
জানালার পর্দ্দা খানিকটা সরিয়ে সামনের খোলা জায়গাটাতে চোখ রেখে গ্রীল ধরে দাঁড়িয়েছিলাম । অন্ধকার তখোন সবে ঘষামাজা করে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছিলো ধীরেধীরে আরো কৃষ্ণকলি হয়ে উঠবে বলে । আমার মতোই নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছে প্রবল হচ্ছিলো বোধহয় তারও মনের গভীরে কোথাও । প্রতিদিনই এমোন করে নিজেকে মেলে ধরে সাঁঝের অন্ধকার ।
মনটা ভালো লাগছিলো না । ক্লান্তি যেন একটু একটু করে শরীর বেয়ে উঠছিলো । পরিশ্রমের ক্লান্তি, নাকি মনের গ্লানি থেকে উঠে আসা অবসাদ ঘিরে ধরতে চাইছে ! যে খেলাটার নেশা শুরু থেকে এ পর্য্যন্ত তাড়িয়ে তাড়িয়ে রক্তের ভেতর আবেশে নীল হয়ে উঠছিলো তাকে যে এখন আলবিদা বলার সময় হয়ে এলো । একটা কষ্ট । দুঃখ রোমন্থনেরও একটা নিকষ ভালোলাগা আছে । যন্ত্রনা যখন তীব্র যন্ত্রনাময় হতে থাকে তখোন যেন শরীরে কেমন নেশার ঝিম আসতে থাকে । মন তখোনই যেন বলে - আরো আরো । এ যেন হাতের শিরায় ড্রাগ পুশ্ করার মতো । শুধু ঝিম মেরে থাকো । কষ্টের জঠরে জন্ম নেয়া একটা আনন্দ যেন শিরশির করে বইতে থাকে সারা ধমণীতে । একটা আনন্দবোধ হতে থাকে ভেতরে ভেতরে । এ আনন্দ বোধহয় সুখভোগের আনন্দের চেয়েও অনেক তেজী । অন্য রকম চরিত্র এর । ঠিক বোঝানো যায়না তার মাত্রা । যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে গলছে এক একটা ধারা ।
আবার নতুন করে শেষের অভিনয়টুকু করতেও ইচ্ছে করছেনা । কদিন থেকেই আস্তে আস্তে জাল বুনে যাচ্ছিলাম বিচ্ছেদ এর । তাকে লিখেছিলাম কথা বলা যাবেনা, ব্যস্ত থাকতে হবে ক’দিন । সে লেখার পর থেকেই মাঝে মাঝে মনটা উদাস হয়ে যাচ্ছে । এভাবে না হয় ক’দিন চালিয়ে নেয়া যাবে, তারপরে ! শেষের ঘাতক তীরটি কি ধরনের বিষ মাখানো হবে ! কোথায় বিঁধবে তা !
ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা নভেরার গলা শুনতে পাচ্ছি । আমার মেয়েকে ডাকছে । বড় অদ্ভুত মেয়ে । আমি ওর তল খুঁজে পাইনা । কি ঘোরের মাঝে যে থাকে সারাদিন ।
- “শীলা, তুই বারান্দায় কি করছিস রে একা একা ?” নভেরার গলা ।
- “কিস..ছু নারে । বারান্দায় আসবি ?” বলতে বলতে বারান্দা থেকে ঘরের দিকে ফিরে দাঁড়াই ।
মেয়েকে কোলে নিয়ে বরং নভেরাই এগিয়ে আসে ।
- কি রে, কি হয়েছে তোর ? মুখখানা শুকনো দেখাচ্ছে ।
ভালো করে নযর করে দেখে নভেরা । ও যখোন এভাবে তাকায় আমার খুব ভয় করে । যেন ভেতরটা পড়ে নিতে চায় । ভাগ্যিস আলো নেই । গাঢ় হবো হবো অন্ধকারে আমি অন্যদিকে ফিরে কিছু যেন লুকোনোর চেষ্টা করি ।
- ওম..মা, তুই কাঁদছিলি নাকি ?
নভেরার কথায় চমকে উঠি ।চোখ কি জ্বালা করে একটু, শিরশির ! কথা ঘুরাতে চেষ্টা করি –
- বা… রে কাঁদবো কেন ?
- বাজে কথা বলিস না । তোর চোখে জল ।
- অন্ধকারে তুই কি থেকে কি দেখছিস, তুই ই জানিস ।চোখে কি যেন একটা গেল, পোঁকা-টোকা হবে
হয়তো ।তুই একটু দেখতো, কি গেল । বলতে বলতে এগিয়ে আসি নভেরার দিকে । সামিয়া নভেরার কোল থেকে ঝপ করে নেমে আমার গলা ধরে ঝুলে পড়ে । কি হয়েছে, মামনি ? দেখি দেখি । এই আর এক মেয়ে, নভেরার ট্রেনিং পেয়ে পেয়ে পাক্কা বুড়ী হয়ে যাচ্ছে ।আমার বড় আদরের । সামিয়াকে নিয়ে তখনই আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি ।নভেরার জেরা থেকে বাঁচতে চাইছি কি ! অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নভেরা দু’টো হাত বুকের ঢালুর নীচে আড়াআড়ি ফেলে রেখে চুপচাপ আমাকে দেখতে থাকে । পিছন ফিরে দাঁড়াই তবুও অনুভব করি নভেরার ছোট হয়ে আসা চোখদু’টো আমার পিঠে আমুল বিঁধে যাচ্ছে । অস্বস্তি লাগছে খুব । এযাত্রা ওর হাত থেকে নিস্কৃতি পাবো কিনা ভেবে একটু আৎকে উঠতে হয় । আর তখনই নভেরার গলা, শীলা কথা শুনে যা ।
শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেল কি !

নভেরা আমার ছোটবেলার বন্ধু । পাশাপাশি ঠিক নয় এক পাড়াতেই ছিলাম অনেকদিন, স্কুলেও । নভেরা ছাড়াও আরো বন্ধু যে ছিলোনা তা নয় । তবে কেন যে ওকেই বেশী পছন্দ ছিলো আজও বুঝে উঠতে পারিনি । এরকমটা কারো কারো বেলায় হয় মনে হয় । ভালো লেগে যায় কাউকে কোনও কারন ছাড়াই । আবার কোন কারনটা ছেড়ে কোন কারনটা বেশী জোড়ালো তাও খুঁজে পেতে বিড়ম্বনা । মনিকা তো একদিন বলেই বসলো, কি দেখলি নভেরার মধ্যে যে ওকে ছাড়া তোর একদম দিন কাটেনা ? তারপরেই ওর সহজাত মিস্টি গলায় গেয়ে উঠেছিলো, “ আমার দিন কাটেনা । রাত কাটেনা ….” । আর খিলখিল হাসি । নভেরার মধ্যে আসলে কি ছিলো যা আমাকে টানতো ? আজও বুঝে ওঠা হোলনা আমার । তবে ও যে একলহমায় আমার ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারে, এটাতেই আমার যতো ভয় ।

নভেরা যাচ্ছেনা কেন… ?
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া ( উপন্যাসিকা )

(পূর্ব প্রকাশনার পর )
তৃতীয় অধ্যায় / (প্রথম অংশ )

।। পেয়ার কে লিয়ে, চারও পল্ কম নহী থে
কভী হম্ নহী থে, কভী তুম্ নহী থে ।।

কার কথা দিয়ে যে শুরু করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা । অনেকের কথা দিয়েই শুরু করা যায় । সুশান্তকে দিয়ে আরম্ভ করতে পারলে হয়তো ভালো হ’তো । কিন্তু তাহলে যে অনেক পেছন থেকে শুরু করতে হয় । সুশান্ত আমার কে, এ কথা তো উঠবেই । কেমন করেই বা ওর সাথে আমার দেখা আর তার থেকে পরিচয় এসব কথা ঘুরে ফিরে আসবেই । আমি যে আসলে গিয়েছিলাম ডাঃ ওয়াদুদ সাহেবের কাছে এ কথাও আমাকে বলতে হবে । তার’চে নিজের কথা দিয়েই শুরু করা নিরাপদ আর ভালো তো বটেই ।

আমি নভেরা । নভেরা কবির । কবির আমার বাবার নাম । নভেরা শব্দের ঠিক অর্থটি আমার জানা নেই । হাতের কাছে যে অভিধানগুলো আছে তাতে খুঁজে খুঁজে নভেরা শব্দটি পাইনি । কাছাকাছি যা পেয়েছি তার একটি “নবোঢ়া” অর্থাৎ নববধূ বা নতুন বৌ । আর একটি হলো “নভোরজঃ” মানে কুয়াশা । প্রথমটি হতে আমার বয়েই গেছে ! দ্বিতীয়টিই আমার পছন্দ । একটা অস্পষ্ট ভাব আছে তার, কুয়াশা বললেই একটা অস্পষ্টতা, একটা রহস্যময়তা বোঝায় যেন । এই অর্থটি আমার কাছে ভালোলাগার কারন কি, আমি নিজেই নিজের কাছে অস্পষ্ট, তাই ? এটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি । কুলকিনারা পাইনি । তবে ধারে কাছের সবাই বলে আমাকে নাকি ঠিক বোঝা যায়না । কেন বলে বুঝিনা । দিব্যি সবার সাথে জম্পেশ করে মিশছি, আড্ডা দিচ্ছি, মুখ গোমড়া করে রাখিনি কখোনও । আমার প্রচুর বন্ধু । কারো সাথে বন্ধুত্ব বিলোতে আমি কার্পন্য করিনা । পৃথিবীর পথে পথে যেথায় যেটুকু আনন্দ ছড়ানো আছে আমি তা দু’হাত ভরে তুলি । ফাল্গুনে যেমন আমগাছ মুকলে মুকুলে ছেয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে গর্ভবতী হয়ে নুয়ে পড়ে ভারে, আমিও তেমনি অজস্র আনন্দে ছেয়ে তুলি মনের আকাশ । সুখের গর্ভসঞ্চারে টৈ-টুম্বুর থাকি সারাক্ষন । রাতের নির্জনে একাকী নত হই গর্ভসঞ্চারের ভারে । তখোন একটু দুঃখও কি থাকে সেখানে । অনেক কথা একসাথে ভীড় করে আসে যা ভুলে যাওয়া দরকার । ঘটনাগুলো যে নোংরা বা বিচ্ছিরি ধরনের কিছু এমোনটা নয় । আবার তা এমোনও নয় যে ঠেলে সরিয়ে দিলেই সাফ হয়ে গেল জঞ্জাল । আমরা তো জীবনের অজস্র কথার অনেক কিছুই ভুলে যাই । সব কথা কি আমাদের মনে থাকে ! কিছু কিছু হয়তো থাকে যাদের তাড়াতে গেলেও আবার ঘুরে ফিরে চলে আসে না চাইতেও । কে জানে, আমার মনে কি থাকে ! তবে আমার যে একটা অসুখ আছে ! এরকম অসুখ যে আর কারো হয়না এমোন নয় । পঁচিশ বছর বয়সে এসে তাই আমার প্রথম মনে হয়েছিলো, অনেক কথাই আমার ভুলে যাওয়া উচিৎ ।
আমার বয়েস এখোন ত্রিশ ছুঁইছুঁই । এই যাহঃ, বয়েসের কথা বলে ফেললাম । মেয়েদের নাকি বয়েস বলতে নেই । আমার এক দুর সম্পর্কের ফুপু প্রায়ই নসিহৎ করতেন - “ এই মেয়ে, কাউকে তোর বয়স বলেছিস ? খবরদার কাউকে নিজের বয়স বলবিনা কখোনও ।”
- “বয়স বললে কি হয়, ফুপু ? মরে যাবো তাড়াতাড়ি ?”
- “তুই তো বড় ফুঁচকে মেয়ে । এতো কথায় তোর কাজ কি !” বলেছি “বলবিনা, বলবিনা – ব্যাস ।“
মেয়েরা নিজেদের বয়েস কেন বলতে চায়না, আমি বুঝিনা । আমার মধ্যে কোনও লুকোচুরি নেই । আমার ছোটখাটো আকারের মা’টি এজন্যে কেমন একটা ভয়ে ভয়ে থাকেন আমাকে নিয়ে । লোকে বলে আমার মায়ের মুখটি নাকি আমার মুখে বসানো । ভরন্ত মুখ, নাকের ছাঁদ গ্রীকদের মতো, ভুমধ্যসাগরের মতো নীল চোখ, নীচের ঠোটখানা খানিকটা ভারী হলেও মানিয়ে গেছে মুখের জমিনে । আমার তড়বড়ে স্বভাবের কারনে মা আমাকে তেমন পছন্দ করেন না । মেয়েরা থাকবে শান্ত শিষ্ট, এই তার ধারনা । ফলে আমি যা ই করি না কেন একটা দোষ ধরা পরবেই তার কাছে । তবে আমার একটা অসুখ আছে বলেই সম্ভবতঃ আমার বাবা আমার কোনকিছুতেই বাঁধ সাধেন না । বাবাকে আমি এজন্যে বেশী পছন্দ করি । শক্তসমর্থ শরীর তার, বয়েসের তুলনায় অনেক নবীন মনে হয় তাকে । শীলা যে ভদ্রলোকটির সাথে চুটিয়ে প্রেম প্রেম খেলা খেলছে অনেকটা তারই মতো । ওহ হো, শীলার কথা বলা হয়নি আপনাদের ।
শীলা আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, বাসাও ছিলো একই পাড়াতে । সবচেয়ে কাছের । দু’টি ভিন্নবৃন্তের কুসুম হলেও, একপূজারীর হাতে একই থালায় আছি এখোন । হরিহর আত্মা । আমার হেন কিছু নেই যা শীলার অজানা । শীলারও কিছু বাকী নেই আমার জানার । তবে ইদানিং শীলাকে বুঝতে আমার খানিকটা কেমন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে । আমি গেলেই আমার দিকে খুব ঘনঘন তাকিয়ে দেখছে । বাদ দেন, শীলার কথা থাক্ এখোন ।
বলছিলাম বাবার কথা, আর কি প্রসঙ্গ তুললাম । ঐ আমার আর এক দোষ । এক কথা বলতে গিয়ে আর এক কথা বলে ফেলা । আমার বাবা নিয়মিত জগিং করেন । না করে উপায় নেই, ডাক্তার বলেছেন যে । প্রশস্ত কপাল, জুলফিতে শুভ্রতার উঁকিঝুকি আছে, লনের ছাঁটা ঘাসের মতো সাদাকালোয় মেশানো দাঁড়ির কারনে মুখটা ভরাট দেখায় । কালো চোখ, সাদা জমিনে হালকা লাল লাল ছোপ । বয়সের কারন আর কোলেষ্টেরল । আমি মাঝে মাঝে তার মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকি নির্বোধের মতো । কিছু একটা খুঁজতে চেষ্টা করি । যা দেখতে চাই তা পাইনা । বাবা আমাকে দেখলেই হাসি হাসি মুখ করে রাখেন । বলেন – কি রে মা, কিছু বলবি মনে হচ্ছে !
- নাহ, কি বলবো বাবা ।
- তাহলে ওমোন করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন ?
লজ্জা পেয়ে যাই । একথা কি বলা যায়, যা খুঁজছি বা যা তোমার মুখে থাকার কথা; তা নেই কেন ? অথচ আমার মা আবার অন্যরকম । কেমন ভাবে যে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন সারাক্ষন । বয়স হয়ে যাচ্ছে অথচ বিয়ে হচ্ছেনা আমার, এই চিন্তা থেকে হয়তো । পৃথিবীর সব মা’য়েরাই বোধহয় আমার মায়ের মতো । ঘরে আইবুড়ো মেয়ে থাকলেই যতো রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা মুখের মধ্যে ঝুলিয়ে বসে থাকেন, আবার তার উপর সে মেয়ের যদি কোনও না কোনও রোগ থাকে ।
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

(পূর্ব প্রকাশনার পর )
তৃতীয় অধ্যায় / (দ্বিতীয় অংশ)

আমাদের বাড়ীটা অন্য বাড়ীর মতো নয় । খোলামেলা সবাই । একমাত্র ছোট ভাইটি এই তো সেদিন বিয়ে করে আলাদা বাসায় উঠে গেছে । জানাশোনার বিয়ে । জেসমিনের সাথে ওর মেলামেশা অনেকদিনের, খানিকটা লুকিয়ে খানিকটা জানান দিয়ে । প্রেমের জোয়ার নাকি বেশীদিন টেকেনা । বিয়ে হয়ে গেলে নাকি ভাটার টান ধরে । ওদের দেখে এই মূহুর্তে সে রকম আগাম কিছু ভাবা ঠিক নয় । এখোন তো জোয়ারেই ভাসছে দু’জনে । এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই । বাবারও কোনও সংষ্কার নেই, আমার ও । কেবল মা’কে নিয়ে একটু আধটু অসুবিধায় পড়তে হয় । বাঙালী ঘরে জন্ম তো, সব সংস্কার ছাড়তে পারেন না ।
‘পড়েছি তোর বাবার পাল্লায় । আগে জানলে তোর বাবার সাথে বিয়েতে রাজি ই হতাম না । আর তোরা ও হয়েছিস তেমনি । একটু রাখ-ঢাক থাকবেনা তোদের’ মা’য়ের একথা শুনতে শুনতে আমাদের কান পঁচে গেছে অনেককাল আগে । আড়ালে আবডালে মা’য়ের এই মাথাব্যথা কিভাবে সারানো যায় এনিয়ে আমরা দু’টি ভাইবোন অনেক গবেষনা করেছি আর প্রতিটি গবেষনার বিষয় নিয়ে হেসে কুটি কুটি হয়েছি । ‘কিরে তোরা হাসছিস যে বড়’ মায়ের এই বোকা বোকা প্রশ্ন আর চাহনি দেখে আবার আর একপ্রস্থ হেসে নেয়া গেছে ।
“মা, হাসি হলো গিয়ে স্বাস্থ্য ভালো রাখার লেটেস্ট থেরাপী । বই-পুস্তক ঘাটো না তো, জানবে কোত্থেকে ?” আমি আরো হা হা করে হাসতে হাসতে বলি আমার সরল মা’টিকে রাগিয়ে দেয়ার জন্যে ।
“তা হলে তোদের বাবাকে ঘরে বসে বসে হাসতে বলে দে । খামোকা সক্কালবেলা রাস্তাঘাটে দৌড়ানোর দরকার কি ?” মা মুখ ঝামটা মেরে সরে যান সামনে থেকে ।

আমার রাখ-ঢাক নেই । আমার ইচ্ছেগুলোরও সামাজিক ব্যাকরন মেনে চলার ধাত নেই । রাত গভীর, ঘুমুচ্ছে সারা পৃথিবী, ইচ্ছে করলো তো ফুল ভল্যুউমে রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা শুনি… “এই কথাটি মনে রেখ আমি যে গান গেয়ে ছিলেম….” । অথবা শীত-গ্রীষ্ণ যা ই হোক হয়তো কোনও গভীর রাতে ইচ্ছে হলো, স্নান করি । শাওয়ারের কল পুরোটা খুলে দিয়ে নগ্ন শরীরে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকটা সময় । শরীরের কাঠামোয় জুড়ে থাকা হাত দুখানি দেখি, নিটোল । বুদ্ধদেব বসুর “একখানা হাত”এর কথা মনে পড়ে যায় । চোখ তখন শরমে লতানো দেহখানির দিকে দৃষ্টি মেলে । যেখানে যেমন থাকার আছে । কোমল জঙ্ঘার দু’ধারে স্নেহের পলিতে আদ্রতা মাখিয়ে পড়ে থাকা মোমের মতো উরু । মসৃন পেটের সমতল পেড়িয়ে ঈষৎ বাক নিয়ে উঠে যাওয়া স্বপ্নের পাহাড় যেন কুয়াশায় ঢাকা । উপত্যকার সুতীব্র ঢাল বেয়ে শাওয়ারের জলধারার ঝর্ণার মতো বয়ে যাওয়া দেখি । কান পাতলে ঝিরঝিরে শব্দও হয়তো শোনা যায় । মুগ্ধ হয়ে থাকি ।
শরীর….শরীর.. ।

এই শরীরকে নিয়ে আমার বড় ভয় । এই শরীর নিয়ে আর কতোদুর যেতে হবে আমায় ! কতোদুর ! শরীরের সাথে মনটাও যে ঘুড়ির মতো নিঃসীম আকাশে লাট খেতে থাকে । অদৃশ্য কাউকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে - দুরে কোথাও…দুরে…দুরে । আমাকে নিযে যেতে চাও, যাবো । যতোদুর নিযে যাবে, আমি যাবো । আমি বলবোনা, আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ । পথের অনেক চড়াই-উৎরাই থাকে, আমি জানি তাও । কি শেখাবে আমায় তুমি ? ফেলে যেতে চাও আধেক পথে, তাও নেবো মেনে । আরো অযুত মানব-মানবীর মতো আমিও তো এক পথভ্রান্ত । হাটছি সেই অনাদিকাল থেকে ধূসর পৃথিবীর পথে । এ পথের শেষ কোথায়, কোনখানে ?

নিজেকে আমি অনেক সময় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনে । ভেতরের এক মানুষ বলে, এইদিকে; অন্যজন বলে- হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোনখানে । আমি কি পথ হারিযেছি ! আমাকে যে পথের দিশা ঠিক রাখতে হবে ! কিন্তু আমার যে উপায় নেই ।
তাই দিনগুলো ভরে তুলতে হয় , সুতোর বুনটে বুনটে ভরে তুলতে হয় ফাঁক-ফোকরগুলি । রীফু করতে হয় জীবন । অথচ দিনগুলো ফুরিয়ে যেতে চায়না যেন । কেন ফুরোয় না ! রাতটা শুধু আমার জন্যে প্রতীক্ষায় থাকে কখোন ফিরে আসি তার কাছে । যে রাত চাঁদ দেখেনা কোনওদিন, লক্ষ্য যোজন পেড়িয়ে যে অন্ধকার রাত নক্ষত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসে আমি তার চোখে চোখ রাখি তখোন । নিকষ অন্ধকারে দুরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলে মনে হয়,
“দুর হ্যায় কিনারা/
গহেরী নদীও কি ধারা /
টুটি তেরী নাইয়া/ মাঝি……………”
কেন যে মাঝেমাঝে মোনটা এমোন উদাস হয়ে পড়ে, ভারী হয়ে ওঠে চোখের কোন । এখোন এই ত্রিশের কাছাকাছি বয়সে এসে মনে হলো অনেকের মতো সুশান্তকেও হয়তো আমার ভুলে যাওয়া ভালো । এমোন নয় যে সুশান্ত দেখতে খারাপ বা তার অনেক দোষ । ওর মতো গুনধর যে আর কোনটি নেই কিম্বা ওর মতো গুছিয়ে কথা বলতে পারার ও যে কেউ নেই এটা ভাবাও হয়তো বোকামী । সে যে একজন অসাধারন পুরুষ, এমোনটি আর পাওয়া যাবেনা, তাও নয় । তাই সুশান্তকে ভুলে যাওয়াই ভালো । কিন্তু বলা যতো সহজ, করে ওঠা ততোটা নয় । আশ্চর্য্য, যতোই চেষ্টা করি ভুলে থাকার ততোই সে যেন আমার মনের ভেতরে ঢোকার জন্যে ছটফট করতে থাকে । তখন আমি এই সুন্দর সকাল, ঝকঝকে রোদ্দুরে ভরা দুপুরগুলি হাতে নিয়ে খেলতে থাকি । বেলা গড়িয়ে যায় রাতে, ভোলার বদলে আমি টুকরোটাকরা কথাগুলো, কাছের মুখগুলো নিয়ে আবার নতুন করে খেলা পেতে বসি ।

(চলবে..... অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন)

ধারাবাহিকতা রক্ষার খাতিরে আপনাদের সুবিধার জন্যে তৃতীয় অধ্যায় / (প্রথম অংশ) নীচে দিয়ে দিলুম ..

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)
তৃতীয় অধ্যায় / (প্রথম অংশ )

।। পেয়ার কে লিয়ে, চারও পল্ কম নহী থে
কভী হম্ নহী থে, কভী তুম্ নহী থে ।।

কার কথা দিয়ে যে শুরু করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা । অনেকের কথা দিয়েই শুরু করা যায় । সুশান্তকে দিয়ে আরম্ভ করতে পারলে হয়তো ভালো হ’তো । কিন্তু তাহলে যে অনেক পেছন থেকে শুরু করতে হয় । সুশান্ত আমার কে, এ কথা তো উঠবেই । কেমন করেই বা ওর সাথে আমার দেখা আর তার থেকে পরিচয় এসব কথা ঘুরে ফিরে আসবেই । আমি যে আসলে গিয়েছিলাম ডাঃ ওয়াদুদ সাহেবের কাছে এ কথাও আমাকে বলতে হবে । তার’চে নিজের কথা দিয়েই শুরু করা নিরাপদ আর ভালো তো বটেই ।

আমি নভেরা । নভেরা কবির । কবির আমার বাবার নাম । নভেরা শব্দের ঠিক অর্থটি আমার জানা নেই । হাতের কাছে যে অভিধানগুলো আছে তাতে খুঁজে খুঁজে নভেরা শব্দটি পাইনি । কাছাকাছি যা পেয়েছি তার একটি “নবোঢ়া” অর্থাৎ নববধূ বা নতুন বৌ । আর একটি হলো “নভোরজঃ” মানে কুয়াশা । প্রথমটি হতে আমার বয়েই গেছে ! দ্বিতীয়টিই আমার পছন্দ । একটা অস্পষ্ট ভাব আছে তার, কুয়াশা বললেই একটা অস্পষ্টতা, একটা রহস্যময়তা বোঝায় যেন । এই অর্থটি আমার কাছে ভালোলাগার কারন কি, আমি নিজেই নিজের কাছে অস্পষ্ট, তাই ? এটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি । কুলকিনারা পাইনি । তবে ধারে কাছের সবাই বলে আমাকে নাকি ঠিক বোঝা যায়না । কেন বলে বুঝিনা । দিব্যি সবার সাথে জম্পেশ করে মিশছি, আড্ডা দিচ্ছি, মুখ গোমড়া করে রাখিনি কখোনও । আমার প্রচুর বন্ধু । কারো সাথে বন্ধুত্ব বিলোতে আমি কার্পন্য করিনা । পৃথিবীর পথে পথে যেথায় যেটুকু আনন্দ ছড়ানো আছে আমি তা দু’হাত ভরে তুলি । ফাল্গুনে যেমন আমগাছ মুকলে মুকুলে ছেয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে গর্ভবতী হয়ে নুয়ে পড়ে ভারে, আমিও তেমনি অজস্র আনন্দে ছেয়ে তুলি মনের আকাশ । সুখের গর্ভসঞ্চারে টৈ-টুম্বুর থাকি সারাক্ষন । রাতের নির্জনে একাকী নত হই গর্ভসঞ্চারের ভারে । তখোন একটু দুঃখও কি থাকে সেখানে । অনেক কথা একসাথে ভীড় করে আসে যা ভুলে যাওয়া দরকার । ঘটনাগুলো যে নোংরা বা বিচ্ছিরি ধরনের কিছু এমোনটা নয় । আবার তা এমোনও নয় যে ঠেলে সরিয়ে দিলেই সাফ হয়ে গেল জঞ্জাল । আমরা তো জীবনের অজস্র কথার অনেক কিছুই ভুলে যাই । সব কথা কি আমাদের মনে থাকে ! কিছু কিছু হয়তো থাকে যাদের তাড়াতে গেলেও আবার ঘুরে ফিরে চলে আসে না চাইতেও । কে জানে, আমার মনে কি থাকে ! তবে আমার যে একটা অসুখ আছে ! এরকম অসুখ যে আর কারো হয়না এমোন নয় । পঁচিশ বছর বয়সে এসে তাই আমার প্রথম মনে হয়েছিলো, অনেক কথাই আমার ভুলে যাওয়া উচিৎ ।
আমার বয়েস এখোন ত্রিশ ছুঁইছুঁই । এই যাহঃ, বয়েসের কথা বলে ফেললাম । মেয়েদের নাকি বয়েস বলতে নেই । আমার এক দুর সম্পর্কের ফুপু প্রায়ই নসিহৎ করতেন - “ এই মেয়ে, কাউকে তোর বয়স বলেছিস ? খবরদার কাউকে নিজের বয়স বলবিনা কখোনও ।”
- “বয়স বললে কি হয়, ফুপু ? মরে যাবো তাড়াতাড়ি ?”
- “তুই তো বড় ফুঁচকে মেয়ে । এতো কথায় তোর কাজ কি !” বলেছি “বলবিনা, বলবিনা – ব্যাস ।“
মেয়েরা নিজেদের বয়েস কেন বলতে চায়না, আমি বুঝিনা । আমার মধ্যে কোনও লুকোচুরি নেই । আমার ছোটখাটো আকারের মা’টি এজন্যে কেমন একটা ভয়ে ভয়ে থাকেন আমাকে নিয়ে । লোকে বলে আমার মায়ের মুখটি নাকি আমার মুখে বসানো । ভরন্ত মুখ, নাকের ছাঁদ গ্রীকদের মতো, ভুমধ্যসাগরের মতো নীল চোখ, নীচের ঠোটখানা খানিকটা ভারী হলেও মানিয়ে গেছে মুখের জমিনে । আমার তড়বড়ে স্বভাবের কারনে মা আমাকে তেমন পছন্দ করেন না । মেয়েরা থাকবে শান্ত শিষ্ট, এই তার ধারনা । ফলে আমি যা ই করি না কেন একটা দোষ ধরা পরবেই তার কাছে । তবে আমার একটা অসুখ আছে বলেই সম্ভবতঃ আমার বাবা আমার কোনকিছুতেই বাঁধ সাধেন না । বাবাকে আমি এজন্যে বেশী পছন্দ করি । শক্তসমর্থ শরীর তার, বয়েসের তুলনায় অনেক নবীন মনে হয় তাকে । শীলা যে ভদ্রলোকটির সাথে চুটিয়ে প্রেম প্রেম খেলা খেলছে অনেকটা তারই মতো । ওহ হো, শীলার কথা বলা হয়নি আপনাদের ।
শীলা আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, বাসাও ছিলো একই পাড়াতে । সবচেয়ে কাছের । দু’টি ভিন্নবৃন্তের কুসুম হলেও, একপূজারীর হাতে একই থালায় আছি এখোন । হরিহর আত্মা । আমার হেন কিছু নেই যা শীলার অজানা । শীলারও কিছু বাকী নেই আমার জানার । তবে ইদানিং শীলাকে বুঝতে আমার খানিকটা কেমন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে । আমি গেলেই আমার দিকে খুব ঘনঘন তাকিয়ে দেখছে । বাদ দেন, শীলার কথা থাক্ এখোন ।
বলছিলাম বাবার কথা, আর কি প্রসঙ্গ তুললাম । ঐ আমার আর এক দোষ । এক কথা বলতে গিয়ে আর এক কথা বলে ফেলা । আমার বাবা নিয়মিত জগিং করেন । না করে উপায় নেই, ডাক্তার বলেছেন যে । প্রশস্ত কপাল, জুলফিতে শুভ্রতার উঁকিঝুকি আছে, লনের ছাঁটা ঘাসের মতো সাদাকালোয় মেশানো দাঁড়ির কারনে মুখটা ভরাট দেখায় । কালো চোখ, সাদা জমিনে হালকা লাল লাল ছোপ । বয়সের কারন আর কোলেষ্টেরল । আমি মাঝে মাঝে তার মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকি নির্বোধের মতো । কিছু একটা খুঁজতে চেষ্টা করি । যা দেখতে চাই তা পাইনা । বাবা আমাকে দেখলেই হাসি হাসি মুখ করে রাখেন । বলেন – কি রে মা, কিছু বলবি মনে হচ্ছে !
- নাহ, কি বলবো বাবা ।
- তাহলে ওমোন করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন ?
লজ্জা পেয়ে যাই । একথা কি বলা যায়, যা খুঁজছি বা যা তোমার মুখে থাকার কথা; তা নেই কেন ? অথচ আমার মা আবার অন্যরকম । কেমন ভাবে যে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন সারাক্ষন । বয়স হয়ে যাচ্ছে অথচ বিয়ে হচ্ছেনা আমার, এই চিন্তা থেকে হয়তো । পৃথিবীর সব মা’য়েরাই বোধহয় আমার মায়ের মতো । ঘরে আইবুড়ো মেয়ে থাকলেই যতো রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা মুখের মধ্যে ঝুলিয়ে বসে থাকেন, আবার তার উপর সে মেয়ের যদি কোনও না কোনও রোগ থাকে ।...............
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

by আহমেদ জী এস


(পূর্ব প্রকাশনার পর )
তৃতীয় অধ্যায় / (শেষ অংশ)
গেলকাল আমি শীলাদের ওখানে গিয়েছিলাম । এ রকম কষ্ট হলে আমি শীলার কাছে যাই । শীলা অতি যত্ন নিয়ে আমার কষ্টগুলোকে তুলে আলাদা করে রাখে । এমোন গোপনে যে, আমি তার গন্ধ খুঁজে পাইনা আর । গিয়ে দেখি, ওর মুখখানাও ভারী ভারী । সন্ধ্যে হবো হবো করছে তখোন । পশ্চিমের আকাশটা লাল থেকে কালচে লাল হয়ে যাচ্ছিলো । বড় মধুর কিন্তু কি করুন এক বিষাদ মাখা । ঘরবাড়ী – গাছপালা ডিঙ্গিয়ে সূর্য্যটাকে দেখতে পাচ্ছিলামনা । ডুবে গেছে হয়তো । সবাইকেই একদিন না একদিন ডুব দিতে হয় ! প্রকৃতির নিয়ম ।
আলো ছিলোনা । বারান্দার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়েছিলো শীলা । কি করছে ওখানে শীলা, একা একা অন্ধকারে ! ওর তো এখোন সামিয়ার কাছে থাকার কথা । মেয়েটা মোমের আধো আধো আলোতে ভয়টয় পাবেনা তো !
বাবুনি কই, বলতে বলতে আমি ঘরে ঢুকে গেছি ।
- আমি এখানে মাসী ।
আমিই ওকে শিখিয়েছি আমাকে মাসী ডাকতে । আন্টি বা খালা ডাকটি শুনতে শুনতে আমার ভালো লাগেনা আর । খুবই কমন এবং সাধারন সম্মোধন । মাসী ডাকটির মধ্যে একটা নতুনত্ব আছে । আমাদের সমাজে প্রচলিত নয় বলেই আমি শীলার মেয়েটিকে বলেছি ‘এ্যাই মেয়ে আমাকে মাসী ডাকবি, বুঝলি । আন্টি-ফান্টি নয় ।’ প্রচলিত নীতিফিতির ধার ধারিনা আমি । আমার ধাতে নেই ।
ঘরে ঢুকে দেখি সামিয়া বিছানার উপর বসে আছে তার ঢাউস টেডি-বিয়ারটি নিয়ে । আমাকে দেখতে পেয়েই আকাশের চাঁদ পেয়েছে মনে হলো । আমি ওর গালটা একটু টিপে দিলাম ।
- কি করছো একা একা বাবুনি ?
- খেলছি ।
- ওম্ মা … একা একা খেলছো । ভয় করছে না ? তোমার দিদা কই ?
- দিদা কোথায় জানিনা । জানো মাসী জানো, মা’মনির মনটা নাকি খারাপ!
- কে বললো তোমাকে ?
- মা’মনিই তো বললো । বললো, আমার ধারে কাছে আসবিনা এখোন ।
আচ্ছা তাই.. চলোতো দেখি তোমার মা’মনির মনটা ভালো করে দিয়ে আসি । সামিয়াকে কোলে তুলি ।গলা চড়াই, শীলা তুই বারান্দায় কি করছিস রে একা একা ?
কি যেন একটা জবাব দেয় ও । তারপর ঝাড়া আধঘন্টা জেরায় জেরায় কাবু করে ফেলি শীলাকে । কি অবাক কান্ড, এ কি করে বসে আছে মেয়েটি ! খেলছিলি তো খেলে যা, এমোন করে জড়িয়ে গেলি কেন ! মনের মধ্যে কথাগুলি আকুলি বিকুলি করে উঠলেও মুখে বলা হয়না । বলার মুখ কি আছে আমার ? ওর এরকম দ্বিধাগ্রস্থতার জন্যে আমিও তো কম দায়ী নই । আমিই তো ওকে এই সর্বনাশা খেলা শিখিয়েছি খানিকটা । দোষ আমার আরো অনেক আছে । কারো কোনও কিছুতেই আমি বাগড়া দিতে যাইনা । বরং সবার সব কাজেই, ভালোমন্দ নির্বিশেষে উৎসাহ দিয়ে থাকি । অনেক সময় আমার উৎসাহটা তাদের থেকেও বেশী হয়ে যায় । আমি কি করবো, এ যে আমার স্বভাব !

এখোন আমার কি বলার আছে ওকে । শ্বান্তনা দিতে পারি, সবকিছু ছেড়ে দিতে বলতে পারি । বলতে পারি, ঐ লোকটার সাথে যোগাযোগ না রাখলেই হয় । কি দরকার অহেতুক ঝামেলা পাকানোর । মুঠোফোন বন্ধ করে রাখলেই তো হয় । তা ই বা কি করে বলি, ঐ লোক তো নিজে থেকে প্রথমে ফোন করে না কখোনো । বলতে পারি, মেইলগুলির জন্যে প্রতি-মেইল না করলেই হয় । কিছু কিছু কঠিন সত্য কথা তো শুনতেই হবে । ঐ লোক তো আর ওর সাথে খেলতে বসেনি । যা বলেছে ওধারের লোকটি, একটিও মিথ্যে নয় । বরং আমার তো মনে হয় লোকটি শীলাকে প্রচন্ড ভালোবেসে ফেলেছে যে ভালোবাসার হদিশ আমাদের কারো জানা নেই, পরিচয় নেই । এরকম নিমোর্হ মানুষ ও আছে পৃথিবীতে ! মেইলে তার লেখাগুলো পরিচ্ছন্ন, আবেগ আর কঠিন বাস্তবতার মিশেল দেয়া । শীলাকে হাসি খুশি রাখতে, ওর দিনটাকে রঙিন করে তুলতে কতো বিষয়ের যে অবতারনা, কি আলাদা বিশ্লেষন প্রতিটি বিষয়ের । কবিতা, গান, ছবি কি নেই মানুষটার পাঠানো মেইলে? ক্ষনেক তুখোড় এক প্রেমিকের মতো, ক্ষনেক বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো, কখোনো পিতার মতো আবার কখোনো শিশুর মতো । এমোন মানুষটাকে ঝেড়ে ফেলা হয়তো চলে, প্রতারনা নয় । আজকালকার ইয়াং ছেলেপুলেরা তো এ লোকের ধারে কাছেও ভিড়তে পারবেনা মন আর মানসিকতায়, যতোই তারা আধুনিকতার বড়াই করুক । এরা তো কেবল একটি জিনিষই ভালো বোঝে যা ভাদ্রমাসের কুকুরেরাও বোঝে । এ লোকটির এসব বোধও দেখছি এ্যাঞ্জেলোর ছবির মতো পবিত্র, দ্রুপদী । আমারই তো প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু আমার যে উপায় নেই । আমি যে অন্য কোথাও বাঁধা পড়ে আছি !

এমোন লোককে কষ্ট দিতে নেই । পরিস্কার করে খুলে বলাই হয়তো ভালো ।অকপটে বলে যাওয়া । ভদ্রলোকটির মেইলগুলোর ভেতরে তার যে ছবি দেখেছি তাতে তাকে অকপটে বলা যায় । বন্ধুত্বের, সহমর্মীতার, ভালোবাসার, স্নেহের কোনও কমতি নেই সেখানে । উনি ঠিক ঠিক বুঝবেন শীলাকে । বুঝবেন না ই বা কেন ! তার মেইলে অস্পষ্ট ইঙ্গিতও আছে এমোন কথার । শীলার পাঠানো উত্তাল এসএমএস গুলোর উত্তরে বিশ্লেষন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোনটি উচিৎ আর কোনটি নয় । শীলার উদ্দামতাকে সংযত করে রেখেছেন । শ্লীলতায় বেঁধে রেখেছেন ।
বারে বারেই উনি জানতে চেয়েছেন, “আসলে তুমি কে?” কখোনো বা লিখেছেন, “তুমি যেই হওনা কেন, তুমি আমার বেলা শেষের কুড়িয়ে পাওয়া এক নীল মুক্তো । লোকে বলে নীলা নাকি কারো সয়, কারো সয়না । আমার সইবে তো?” এর চেয়ে পরিস্কার করে আর কি বলা যায় ? সন্দেহ যে থেকেই গেছে শীলা সম্পর্কে ভদ্রলোকটির মনে ! তারপরেও তার ভালোবাসায় কোন ঘাটতি দেখিনি, শৈথিল্য দেখিনি । বরং দিন দিন তা আরো দানা বেঁধে উঠেছে । একটা আলাদা ভুবন গড়ে নিয়েছেন হয়তো শীলার জন্যে যেখানে আর কারো প্রবেশাধিকার নেই । ভদ্রলোকটি কি নিজের জীবনে অসুখী ? নাহ, তাও মনে হয়না । অনেক লেখাতেই তার সাংসারিক টুকরো টাকরা ছবি সুখের ইঙ্গিতই দিয়েছে । নিজের ঘর-গৃহস্থালির কথাও বলে গেছেন । তবে ? আমি জানিনা । প্রেম প্রেম খেলা বুঝতে পেরেও কেউ যে সরে না গিয়ে আরো কাছে আসে এ আমার জানা ছিলোনা । এই প্রথম জানলাম ।
তবুও শীলার যে সামাজিক অবস্থান আর ও পক্ষেরও, তা ব্যাপারটিতে হাওয়া দেয়ার অনুকুল নয় । এমোন সম্পর্কটা টেনেও নেয়া সম্ভব নয় বেশীদিন, অন্তত দু’জনে দু’জনার ধরাছোঁয়ার বাইরে হলেও । এটা সাময়িক হতে পারে লম্বা সময়ের জন্যে কিছুতেই নয় । তবুও এরকম নিষিদ্ধ প্রেমে একটা ভয় থেকেই যায় । জানাজানির ভয় । রাগ করে কেউ যদি সব ফাঁস করে দেয় ? আর আজকাল তো এরকম অন্তরঙ্গ কাহিনী কিম্বা অসতর্ক মুহূর্তের গল্প প্রকাশ করে দিয়ে বাহাদুরী নেয়ার ঘটনা তো ঘটছে অহরহ ।
তাহলে লজ্জা, লজ্জা ।
না শীলার সে রকম ভয় থাকার কোনও কারন নেই, লজ্জারও । আমি জানি, ওকে চিনবেনা কেউ । কেউ আঙ্গুল তুলবেনা ওর দিকে, বলবেনা “এই ই সেই” ।

ঐ লোকটিকে পাঠানো ছবিটি যে আমারই ।
নামের আধেকটাও ......
(চলবে..... অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন)


আপনার সুবিধার্থে এর ঠিক আগের অংশটুকু নীচে দিলুম --
তৃতীয় অধ্যায় / (দ্বিতীয় অংশ)

আমাদের বাড়ীটা অন্য বাড়ীর মতো নয় । খোলামেলা সবাই । একমাত্র ছোট ভাইটি এই তো সেদিন বিয়ে করে আলাদা বাসায় উঠে গেছে । জানাশোনার বিয়ে । জেসমিনের সাথে ওর মেলামেশা অনেকদিনের, খানিকটা লুকিয়ে খানিকটা জানান দিয়ে । প্রেমের জোয়ার নাকি বেশীদিন টেকেনা । বিয়ে হয়ে গেলে নাকি ভাটার টান ধরে । ওদের দেখে এই মূহুর্তে সে রকম আগাম কিছু ভাবা ঠিক নয় । এখোন তো জোয়ারেই ভাসছে দু’জনে । এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই । বাবারও কোনও সংষ্কার নেই, আমার ও । কেবল মা’কে নিয়ে একটু আধটু অসুবিধায় পড়তে হয় । বাঙালী ঘরে জন্ম তো, সব সংস্কার ছাড়তে পারেন না ।
‘পড়েছি তোর বাবার পাল্লায় । আগে জানলে তোর বাবার সাথে বিয়েতে রাজি ই হতাম না । আর তোরা ও হয়েছিস তেমনি । একটু রাখ-ঢাক থাকবেনা তোদের’ মা’য়ের একথা শুনতে শুনতে আমাদের কান পঁচে গেছে অনেককাল আগে । আড়ালে আবডালে মা’য়ের এই মাথাব্যথা কিভাবে সারানো যায় এনিয়ে আমরা দু’টি ভাইবোন অনেক গবেষনা করেছি আর প্রতিটি গবেষনার বিষয় নিয়ে হেসে কুটি কুটি হয়েছি । ‘কিরে তোরা হাসছিস যে বড়’ মায়ের এই বোকা বোকা প্রশ্ন আর চাহনি দেখে আবার আর একপ্রস্থ হেসে নেয়া গেছে ।
“মা, হাসি হলো গিয়ে স্বাস্থ্য ভালো রাখার লেটেস্ট থেরাপী । বই-পুস্তক ঘাটো না তো, জানবে কোত্থেকে ?” আমি আরো হা হা করে হাসতে হাসতে বলি আমার সরল মা’টিকে রাগিয়ে দেয়ার জন্যে ।
“তা হলে তোদের বাবাকে ঘরে বসে বসে হাসতে বলে দে । খামোকা সক্কালবেলা রাস্তাঘাটে দৌড়ানোর দরকার কি ?” মা মুখ ঝামটা মেরে সরে যান সামনে থেকে ।

আমার রাখ-ঢাক নেই । আমার ইচ্ছেগুলোরও সামাজিক ব্যাকরন মেনে চলার ধাত নেই । রাত গভীর, ঘুমুচ্ছে সারা পৃথিবী, ইচ্ছে করলো তো ফুল ভল্যুউমে রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা শুনি… “এই কথাটি মনে রেখ আমি যে গান গেয়ে ছিলেম….” । অথবা শীত-গ্রীষ্ণ যা ই হোক হয়তো কোনও গভীর রাতে ইচ্ছে হলো, স্নান করি । শাওয়ারের কল পুরোটা খুলে দিয়ে নগ্ন শরীরে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকটা সময় । শরীরের কাঠামোয় জুড়ে থাকা হাত দুখানি দেখি, নিটোল । বুদ্ধদেব বসুর “একখানা হাত”এর কথা মনে পড়ে যায় । চোখ তখন শরমে লতানো দেহখানির দিকে দৃষ্টি মেলে । যেখানে যেমন থাকার আছে । কোমল জঙ্ঘার দু’ধারে স্নেহের পলিতে আদ্রতা মাখিয়ে পড়ে থাকা মোমের মতো উরু । মসৃন পেটের সমতল পেড়িয়ে ঈষৎ বাক নিয়ে উঠে যাওয়া স্বপ্নের পাহাড় যেন কুয়াশায় ঢাকা । উপত্যকার সুতীব্র ঢাল বেয়ে শাওয়ারের জলধারার ঝর্ণার মতো বয়ে যাওয়া দেখি । কান পাতলে ঝিরঝিরে শব্দও হয়তো শোনা যায় । মুগ্ধ হয়ে থাকি ।
শরীর….শরীর.. ।

এই শরীরকে নিয়ে আমার বড় ভয় । এই শরীর নিয়ে আর কতোদুর যেতে হবে আমায় ! কতোদুর ! শরীরের সাথে মনটাও যে ঘুড়ির মতো নিঃসীম আকাশে লাট খেতে থাকে । অদৃশ্য কাউকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে - দুরে কোথাও…দুরে…দুরে । আমাকে নিযে যেতে চাও, যাবো । যতোদুর নিযে যাবে, আমি যাবো । আমি বলবোনা, আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ । পথের অনেক চড়াই-উৎরাই থাকে, আমি জানি তাও । কি শেখাবে আমায় তুমি ? ফেলে যেতে চাও আধেক পথে, তাও নেবো মেনে । আরো অযুত মানব-মানবীর মতো আমিও তো এক পথভ্রান্ত । হাটছি সেই অনাদিকাল থেকে ধূসর পৃথিবীর পথে । এ পথের শেষ কোথায়, কোনখানে ?

নিজেকে আমি অনেক সময় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনে । ভেতরের এক মানুষ বলে, এইদিকে; অন্যজন বলে- হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোনখানে । আমি কি পথ হারিযেছি ! আমাকে যে পথের দিশা ঠিক রাখতে হবে ! কিন্তু আমার যে উপায় নেই ।
তাই দিনগুলো ভরে তুলতে হয় , সুতোর বুনটে বুনটে ভরে তুলতে হয় ফাঁক-ফোকরগুলি । রীফু করতে হয় জীবন । অথচ দিনগুলো ফুরিয়ে যেতে চায়না যেন । কেন ফুরোয় না ! রাতটা শুধু আমার জন্যে প্রতীক্ষায় থাকে কখোন ফিরে আসি তার কাছে । যে রাত চাঁদ দেখেনা কোনওদিন, লক্ষ্য যোজন পেড়িয়ে যে অন্ধকার রাত নক্ষত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসে আমি তার চোখে চোখ রাখি তখোন । নিকষ অন্ধকারে দুরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলে মনে হয়,
“দুর হ্যায় কিনারা/
গহেরী নদীও কি ধারা /
টুটি তেরী নাইয়া/ মাঝি……………”
কেন যে মাঝেমাঝে মোনটা এমোন উদাস হয়ে পড়ে, ভারী হয়ে ওঠে চোখের কোন । এখোন এই ত্রিশের কাছাকাছি বয়সে এসে মনে হলো অনেকের মতো সুশান্তকেও হয়তো আমার ভুলে যাওয়া ভালো । এমোন নয় যে সুশান্ত দেখতে খারাপ বা তার অনেক দোষ । ওর মতো গুনধর যে আর কোনটি নেই কিম্বা ওর মতো গুছিয়ে কথা বলতে পারার ও যে কেউ নেই এটা ভাবাও হয়তো বোকামী । সে যে একজন অসাধারন পুরুষ, এমোনটি আর পাওয়া যাবেনা, তাও নয় । তাই সুশান্তকে ভুলে যাওয়াই ভালো । কিন্তু বলা যতো সহজ, করে ওঠা ততোটা নয় । আশ্চর্য্য, যতোই চেষ্টা করি ভুলে থাকার ততোই সে যেন আমার মনের ভেতরে ঢোকার জন্যে ছটফট করতে থাকে । তখন আমি এই সুন্দর সকাল, ঝকঝকে রোদ্দুরে ভরা দুপুরগুলি হাতে নিয়ে খেলতে থাকি । বেলা গড়িয়ে যায় রাতে, ভোলার বদলে আমি টুকরোটাকরা কথাগুলো, কাছের মুখগুলো নিয়ে আবার নতুন করে খেলা পেতে বসি । ...................
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

by আহমেদ জী এস
চতুর্থ অধ্যায় / (প্রথম অংশ)

“… পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে – সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন …”

আজ সম্ভবত শীলার চলে যাবার কথা । অন্তত এরকম ভাবেই সে বলেছিলো সপ্তাহ দুই আগে । বোঝাপড়া করতে তাকে নাকি যেতে হবে । মাস দুয়েক বা তিন সে দেশে থাকবেনা এমোনটাই আমাকে ধারনা দিয়েছিলো । কিছু ঠিক না হলে আরো দেরী হতে পারে । আর একটা বিহিত হয়ে গেলে সে ফিরে আসবে তাড়াতাড়িই । আমার মুঠোফোনের ওপার থেকে তার দয়াদ্র কন্ঠে এই ক’টা দিন আমার খারাপ লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে আমার গলাটা ধরে এসেছিলো । রাত তখন অনেকটা বুড়িয়ে গেছে । আকাশটা বুঝি অন্ধকার, চাঁদ ছিলোনা আকাশে । আমার বলার কি ই বা ছিলো, আকাশের মতোই চুপচাপ তার কথা শুনে যাওয়া ছাড়া ! দু’তিন মাস শীলার প্রতি সকালের পাঠানো অদ্ভুত শুভেচ্ছা আমার মুঠোফোনে আর দেখতে পাবোনা আমি ,যার প্রতীক্ষায় আমার রাতগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যাচ্ছিলো দিনদিন, এ উপলব্ধি হতে আমার বুকের বাতাস ফুরিয়ে গেল যেন ! উদাসী বাতাস ঝড়া পাতাদের উড়িয়ে নিয়ে গেলে যেমন শুন্য উঠোন পড়ে থাকে তেমনি আমারও বুকের সুখী প্রহরগুলো শীলার অমন কথায় উড়ে গেল দুর থেকে দুরে, রেখে গেল শুধু এক বিরান প্রান্তর ।
বুঝলাম কঞ্চি ঘিরে বেড়ে ওঠা সতেজ সীম লতার মতো একটা অবলম্বন যেন এতোদিনে পেয়ে গেছে সে । আমাকে । তার হঠাৎ করে পাওয়া এই অবলম্বনের সাথে জীবন নোতুন করে জোড়া দিতে নাকি তাকে যেতেই হবে । এ তারই প্রস্তুতি । একটা বোঝাপড়া নাকি তাকে করতে হবে তার প্রবাসে থাকা স্বামীর সাথে । আর কতোদিন সে মুখ বুজে অবহেলা সয়ে যাবে । স্বামী পরনারী আসক্ত, এর চেয়ে একজন স্ত্রীর আর কি পরাজয় আছে । কেবল মেয়েটির মুখ চেয়েই সে সব সহ্য করে গেছে এতোদিন ।
এসব কাহিনী আমার জানা । শীলাই বলেছে আমাকে কোনও একদিন, “এই নিয়ে আমি কি করে যে বেঁচে আছি সে আমিই জানি । আমার যে কি কষ্ট তুমি বুঝবেনা । আজ আমি তোমাকে পেলাম । আমার ভয় কি ? জানি তোমার ঘর-গৃহস্থালী আছে, সমাজ আছে । তবুও আমি কোনও দিন তোমার কাছে আসতে চাইলে, তুমি কি আমাকে নেবেনা ? ফিরিয়ে দেবে ?”
যতো সহজে শীলা বলে গেল, ততো সহজ নয় যে উত্তরটা এটাও তার জানা । নিজে থেকেই দিলো উত্তরটা যেন আমার হয়েই বলা । না, সে কষ্ট আমি তোমাকে দেবোনা । তোমার সংসারে , তোমার জীবনে অশান্তি টেনে আনতে চাইনে আমি । আমি যে তোমাকে ভালোবাসি । এ ক্ষতি আমি কেমন করে করবো তোমার । আমি তোমাকে পাবোনা জানি, তারপরেও মনে হয় তোমাকে যদি আগলে রাখতে পারতাম সারাটি জীবন !
আমি শুধু একবার বলেছিলাম, যাওয়াটা কি খুবই প্রয়োজন ?

শীলা কি করে ভাবলো, আমি বুঝি ভয় পেয়ে যাবো সে আমার কাছে চলে আসবে শুনে ? হায়রে মানুষ ! এতো সহজেই কারো সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে তার সময় লাগেনা । সবাই জানে, এ জাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষের মেকী সম্মান, সামাজিক অবস্থান ঠিক রাখতে হলে মানুষকে বিসর্জনের পথটাই বেছে নিতে হয় । সারাদিন খেটেখুটে মনের মাধুরী মিশিয়ে যে প্রতিমা গড়া হলো, যে প্রতিমার কাছে পুঁজোর অর্ঘ্য তুলে দিলাম দু’হাত ভরে, তাকেই এক নির্মম সকালে এই হাতেই বিসর্জন দিতে হবে অথৈ জলে । মানুষ জানে এটাই নিয়ম । সমাজের টেনে দেয়া দাগ পেরিয়ে দুটি গৃহী নারী-পুরুষের কাছে আসার গল্পের এটাই পরিনতি ! পেরিয়ে চলে যে আসে তাকে যে স্খলনের দাগ নিয়ে চলতে হয় আজীবন, জীবনের ঘাটে ঘাটে দিতে হয় অগ্নিপরীক্ষা । সবাই তা মেনে নিতে পারেনা । তাই কোনও এক পক্ষকে সমস্ত দায় সত্বেও সে দায়কে অস্বীকার করতেই হয় । তার ভালোবাসার চুড়ান্ত পরীক্ষার আভাস পেলেই বা তার ছোঁয়া লাগলেই তাকে নিঃশব্দে সরে পড়তে হয় । এ মানুষের আরেক রূপ । মানুষ বুঝি বহুরূপী এক প্রানী । তার স্নায়ু কোষের পরতে পরতে যে চাল-কূটচালের খেলা চলে নিয়ত তাকে এড়াতে পারেনা কেন সে ! সব মানুষেরই হয় কি ! মানুষের ও যে রকমফের হয়, হয় চেতনা আর নিজাত্মার কাছে দায় স্বীকারের বোধ থেকে জন্ম নেয়া একজন ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ; যে নিজ করতলে তুলে নিতে চায় কুষ্ঠগ্রস্থ মানুষের দায়, একথা অনেকেই জানেনা । হয়তো শীলাও ।

সেদিনের পর থেকেই ডুব । শীলা যেন হারিয়ে গেল দুর সমুদ্রে পাল তোলা নাওয়ের মতো । তার ফেলে যাওয়া তিরতির হয়ে আসা ঢেউগুলোর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখলাম শুধু ।
দুদিন তার সাড়া না পেয়ে আমি তাকে হেমন্তের একখানা গান মেইল করে পাঠিয়েছিলাম – “যাবার আগে কিছু বলে গেলেনা.. নিরবে শুধু…” এই গানখানা ।
শীলা এখোন কোথায় ?

না যাবার আগে শীলা আমাকে কিছু বলে যায়নি । অফিসে বসে কাজ করতে করতে আনমনা হয়ে ভাবছিলাম কতোদিন আমার ম্যাসেঞ্জারটি নিশ্চুপ বসে থাকবে কারো লেখা স্ক্রীনে ফুটে ওঠার অপেক্ষায় ! মুঠোফোন নিরব হয়ে থাকবে কতোদিন ! কতোদিন আমি বাসায় ফিরে যাবো কারো উৎকন্ঠা ছাড়াই ! মন বসছিলো না কাজে । কাগজ কলম টেনে ছবি আঁকছিলাম এলোমেলো । ছঁবি আকা আমার খুব শখের । নিজের মনে নিজেই আঁকি । ফুল্লরা, আমার স্ত্রী ; আমার ছবি বেশ পছন্দ করে । প্রেমের অনুরাগ পর্বে তার মুখের একটি ছবি আমি এঁকেছিলাম নেগেটিভ ফর্মে । এ ছবি নিয়ে তার বন্ধু মহলে দারুন কাড়াকাড়ি । সে থেকেই আমি যা আঁকি তাতেই ফুল্লরা উৎফুল্ল । সমালোচনা যে করেনা তা নয় । মেয়েদের ন্যুড আঁকলেই তার কন্ঠে ঝরে বিরাগ, ছিঃ ছিঃ কি সব অসভ্য জিনিষ আঁকো । রুচি-টুচি সব গেছে ?
সে আমিই ছবি আঁকছিলাম । কার মুখ আঁকছিলাম জানিনে । মুঠোফোনের স্ক্রীন উজ্জল হয়ে উঠলো । মাত্র দুটি অক্ষর ভেসে উঠলো তাতে । শীলার সাংকেতিক নাম । বুকের ভেতর বিষ্ফোরন হলো যেন । একটা বীট মিস হয়ে গেল বোধহয় । শীলা যায়নি তাহলে !
“না গেলাম না” , ওপাড় থেকে ভেসে এলো শীলার গলা । শরীরের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে যেন খেলে গেল বিদ্যুতের ঝলকানি ।
“কেন গেলেনা, কোনও অসুবিধে ?শরীর ঠিক আছে তো ?” উৎকন্ঠা ঝরে পরে আমার গলায় । শীলাকে নিয়ে আমার যে উৎকন্টা্ আমি তা কাকে বোঝাবো !
“গেলাম না, তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করেনি । তোমাকে ছেড়ে আমি কি করে যাই বলো ?”
টিনের ছাতে বৃষ্টির শব্দের মতো ঝমঝম করে সুর বেজে উঠলো আমার রক্তে, আকন্ঠ তৃষ্ণায় শুকিয়ে যাওয়া ধমনীতে বইলো তার স্রোত ।
“আমার জন্যে তুমি গেলেনা ? শীলা, তুমি কি আমাকে পাগল করে দেবে ?”
“পাগল আমার !” আহ্লাদী গলা শীলার, ভাঙা ভাঙা ।

এ নিয়ে এ কথাটি কতোবার বললো শীলা আমাকে ?
গুনে দেখতে হবে ।
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া

শুদ্ধতম পরকীয়া
চতুর্থ অধ্যায় / (প্রথম অংশ)এইখানে ক্লিক করুন -
Click This Link

(পূর্ব প্রকাশনার পর )
চতুর্থ অধ্যায় / (দ্বিতীয় অংশ)

এলানো হাতখানি আমার বুকের উপর পড়ে আছে ফুল্লরার । আজ এ হাতখানিকেই খুব ভারী মনে হলো । যে হাত আমার সকাল বিকেল আর রাতের সঙ্গী ছিলো হঠাৎ হঠাৎ , যে হাত আগলে ছিলো আমার সংসার ভালোয়-মন্দোয় সে হাতখানা আজ ভারী ভারী লাগছে কেন ! আমি কি নষ্ট হয়ে গেছি ! এ কোন অধঃপাতে আমার নেমে যাওয়া ! হালকা আলোয় সে হাতখানার দিকে তাকালাম । প্রথম যেদিন এই হাতখানি ধরেছিলাম তার ছিলো মোমের মতো পেলব দেহখানি । উজ্জল ছিলো তার বর্ণ । আজ এই রাতে তাকে যেন আবার নতুন করে দেখতে হলো । সময়ের দাগ লেগেছে সে হাতে । তন্বী দেহে লেগেছে শিথীলতা, বর্ণ অনুজ্জল কিছুটা । একি তার দোষ নাকি সময়ের । সে হাতের স্পর্শ আগের মতো আমার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বেহালার ছড়ের মতো টেনেটেনে সুর তোলে কি ? কে জানে ! নাকি, আমার অপরাধ যদি কোনও হয়েই থাকে আজ, তার স্বপক্ষে এ আমার অনুচিত অভিযোগ ।
ফুল্লরা আড়মোড়া ভাঙ্গলো, চমকে উঠলাম আমি । ঘুমের অতল থেকে ফুল্লরা আমার ভাবনাগুলোর সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে চৈতন্যে ফিরে এলো যেন !
“তুমি ঘুমাওনি” জড়ানো গলায় তার প্রশ্নটি এতোই আচমকা যে অন্তরাত্মা কেপে উঠলো । ধরা পড়ে গেলাম !
মিনমিন করে বলি – “নাহ, ঘুম কেটে গেছে । এ্যাসিডিটি’র ব্যথাটা আবার চাগিয়ে উঠলো । ঔষধ খাবো ? একটু পানি খেতে পারলে ভালো লাগতো বোধহয় ।”
ধরা পড়া চোরের মতো আত্মপক্ষ সমর্থনের কসরত করতে গিয়ে বুঝলাম, উত্তরের প্রয়োজন ছিলোনা । আবার ঘুমিয়ে গেছে ফুল্লরা । বেশ ভারিক্কি লাগছে দেখতে । দু’দুটো বড় হয়ে যাওয়া সন্তানধারিনীর যেমনটা হওয়া উচিৎ তেমন দেহের কাঠামো । মেদ জমেছে পেটে আর যেখানে জমার সেখানে । পঁচিশ বছর আগের ফুল্লরা আর নেই । যে দেহের ভাজে ভাজে একদিন তুমুল ঢেউয়ের ভেঙ্গে পড়া ছিলো, ছিলো তরী বাওয়া তা আজ ক্ষয়ে যাওয়া পদ্মার মতো চরে ছেয়ে গেছে । নাব্যতা গেছে কমে । এও কি তবে পদ্মার থেকে চোখ সরিয়ে নেয়ার আর একটা কারন আমার ! নিজের স্বপক্ষে কারন জড়ো করতে থাকি ।
ফুল্লরার হাতখানি সরানোর প্রয়োজন ছিলোনা । আড়মোড়া ভাঙ্গতে গিয়ে সেখানি আপনিই সরে গেছে । সাবধানে বিছানা থেকে নামলাম । গলা শুকিয়ে গেছে । জল খেতে হবে । বেডরুমে জলের গ্লাস নেই । আমিই এনে রাখি প্রতিদিন । এটা আমার কাজ । আজ এমোন ভুলটি হলো কেন ?
আজ শীলার সাথে কথা হয়েছে অনেকদিন পরে । “তোমাকে ছেড়ে আমি কি করে যাই বলো ?”
এই কথাটুকুতে যে পৃথিবীর সব মধু লুকোনো । আমি তো ভাসছি সেই থেকে । নতুন ওড়নার মতো মনখানা উড়ছে ফুরফুরে হাওয়ায় । শীলার ছোঁয়া লেগে ভেতরের নিভুনিভু প্রদীপখানি যে তার সব রোশনাই জ্বেলে আমার অন্তরাত্মার গভীরে লুকানো ভালোবাসার ঘর-গেরস্থালী আবারো উদ্ভাসিত করে দিয়ে গেল, সে খবর যে শীলা পেলোনা । সে ভালোবাসা মনে মনে ছড়িয়ে গেল সবখানে । আমার ঘরে, ফুল্লরার কাছে, ছেলেমেয়েদের আঙ্গিনায় । সবাইকে আবার যেন বেশী করে ভালোবাসতে ইচ্ছে হলো । আরো বেশী করে যেন সবাই জড়িয়ে গেল আমার রক্তমাংশে । সত্যিকারের ভালোবাসা বোধহয় এমোন করেই শেকড় প্রোথিত করে দেয় মাটির গহন অবধি !
খুশিতে রাস্তার মোড়ের ফুলওয়ালী মেয়েটির কাছ থেকে একগোছা রজনীগন্ধাও কিনে ফেললাম ফেরার পথে । নির্ভেজাল, কাটাবিহীন, স্নিগ্ধ । গোলাপ কিনিনি কারন তা ভুরভুরে গন্ধে ভরা আর কাটাওয়ালা । চোখ জুড়ানো রঙের অন্য অনেক ফুল আছে, কাটা নেই কিন্তু গন্ধবিহীন । রজনীগন্ধা রাতের নিভৃতচারী, কাটাবিহীন আর রঙহীন সাদা , রঙের ভীড়ে তার জৌলুষ নেই । সাদা সমর্পনের রঙ । আমি শীলাতে সমর্পিত বা শীলা আমাতে । খুচরো কিছু আলাপ ও করলাম ফুলওয়ালীর সাথে । মেয়েটি হয়তো অবাক খানিকটা ।
“ছার, আপনে কারে দেবেন ফুলগুলা ? এত্তোগুলি ফুল কেনলেন” নির্মল প্রশ্ন । উত্তরটা এই মূহুর্তে গুলিয়ে গেলো । অবচেতনে মনে হলো তাইতো, কার জন্যে ফুল কিনলাম ! শীলার জন্যে ? তা কি করে হবে, শীলার ঠিকানা যে আমার জানা নেই । খুব সন্তর্পনে এড়িয়ে গেছে শীলা ঠিকানার প্রশ্নটি । মনটা উদাস হয়ে গেলো মেয়েটির কথায় ।
এই মূহুর্তে কাকে উদ্দেশ্য করে ফুল কিনেছি তা চট্ করে মনে পড়লোনা । অথচ ফুল্লরার জন্যে নেয়া যেতে পারে ভেবেই আমি ফুল কিনেছি, একথাটুকুও মনে এলোনা । আমি জানি ফুল্লরা অবাক হবেনা । তির্যক চোখে আমাকে পড়ে নিতে চাইবে । ইদানীং ও যেন কেমন করে তাকায় আমার দিকে । সেই দিন থেকে যেদিন ফুল্লরা আমাকে গভীর রাত জেগে কম্পিয়্যুটারের সামনে বসে থাকতে দেখেছে । “এই বুড়োকালে এতো রাত জেগে কি করছো কম্পিয়্যুটারে ? দু’দুবার ডাকলাম ঘুমুতে আসতে, খবর নেই ।” শরীরে ঘাম দিয়ে যেন জ্বর এলো । ফুল্লরা এগিয়ে আসছে আমার ঘরের দরজা ঠেলে । একনজর চোখ বুলিয়ে ঘুরে যেতে যেতে ঝাঝালো গলায় বলে গেল – “ভীমরতি, এতো রাত্তিরে কার সাথে চ্যাট করছো ?” সেদিন থেকে, শীলার সাথে যোগাযোগের দ্বিতীয় দিন, ফুল্লরার চাহনি যেন বদলে গেল । সন্দেহ ? সন্দেহ বড়ই সংক্রামক । ভাইরাসের মতো ডরম্যান্ট আর সুযোগ পেলেই ডালপালা ছড়ানোতে জুড়ি নেই ।
ফুলের জন্যে একটা যুৎসই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ঘরে ঢুকতেই জিনিয়া দৌড়ে এলো । পরিপাটি সাজ । বাইরে যাবে কোথাও, এমোন ।
“ওম …মা, বাবা তুমি আজ ফুল কিনে এনেছ ? কি ব্যাপার বাবা , আমাদের তো কারোই জন্মদিন না আজ, তবে ?”
আমতা আমতা করতে থাকি – “না.. এই আসছিলাম হেটে হেটে, পথের মোড়ে ঐ যে ফুলওয়ালীটা আছে না , কি যেন নাম…. ।“ মুখের কথা মুখেই আটকে থাকে ।
জিনিয়া এগিয়ে আসে খুব কাছে, “খুব ভালো হয়েছে বাবা । ফুলগুলো আমাকে দাও, আমি এক বান্ধবীর বার্থ-ডে পার্টিতে যাচ্ছি । গিফট কিনেছি একটা মোটামুটি চলে যায়, সাথে ফুলগুলো হলে দারুন । আগেই ইচ্ছে ছিলো কেনার কিন্তু গিফট কিনতে গিয়ে দেখি অতো পয়সা হবেনা একটা ফুলের বুকে কেনার । দাও দাও । আচ্ছা ঠিক আছে, অর্ধেকটা আমি নিচ্ছি বাকীটা তোমার ।” একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে হাত বাড়ায় জিনিয়া । হাঁপ ছেড়ে বেঁচে যাই যেন । প্রগলভ হয়ে উঠতে চেষ্টা করি, “তাহলে বল একটা টেলিপ্যাথীর ঘটনা ঘটে গেল ? তোর মনের কথা তাহলে আমি পড়তে পারছি ?”
জিনিয়ার মুখটা একটু লাল হয়ে গেল যেন । এমনিতেই সুন্দরী আর ফর্সা মেয়েটি আমার । লালের লালিমা লাগতেই আরো সুন্দর লাগলো । লজ্জা পেয়েছে বোধহয় । বললাম, যেখানে যাচ্ছিস যা । আর সব ফুলগুলিই তোকে দিলাম, নিয়ে যা ।
তবুও সবগুলো নেয়নি জিনিয়া । কয়েকটা ষ্টিক রেখে গেলো পেপসির খালি বোতলে পানি দিয়ে । সেই থেকে যতোবারই চোখ যাচ্ছে ষ্টিকগুলোর দিকে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ছি । একটা অপরাধ বোধ হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়তে চাইছে যেন মনের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে । আর সে কারনেই প্রতিদিনের অভ্যেস, জলের গ্লাস আর জল আনার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি ।
জল আনতে ডাইনিং এ যেতে হবে । যেত যেতে আবার ফুল্লরার দিকে তাকালাম । নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে । গেল কয়েকটা বছর ও এরকমই নিশ্চিন্ত আর নির্লিপ্ত । নিজের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে যেন । আমার প্রতিও ওর টান আগের মতো নেই ।বরং খবরদারী, হম্বি-তম্বী বেড়েছে যেন । সাংসারিক ঝুট ঝামেলা তো প্রতিটি সংসারে থাকেই । কোন সংসারে নেই ! আমার ঘরে আজকাল একটু বেশী বেশী হচ্ছে যেন, অহেতুক । এত্তো রাতে এগুলো নিয়ে আর ভাবতে ভালো লাগছেনা । এ যেন অনুচ্চারিত অনুযোগের পাতা উল্টে উল্টে দেখা ।
জল খেয়ে আবার ফিরে আসতে হয় নিজ ঘেরাটোপে । কিছু শুদ্ধ আর কিছু কিছু ভুল-ভ্রান্তির রেখা টেনে টেনে এ তো আমারই আঁকা দিনপঞ্জীর তৈলচিত্র ।
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)

(পূর্ব প্রকাশনার পর )
চতুর্থ অধ্যায় / (শেষ অংশ)

পরেরদিন সকালে অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম রোজকার মতো । দু’টো মৃদু মৃদু ধ্বনি ভেসে এলো আমার মুঠোফোন থেকে । যা ভাবছিলাম তাই । এ সময়টাতে একমাত্র শীলা ছাড়া আর আমাকে এসএমএস করার কেউ নেই । শীলা ই । শীলার এসএমএস । লিখেছে, “দ্য বিউটি অব লাইফ ডাজন্ট ডিপেন্ড অন হাউ হ্যাপী য়্যু আর…. বাট হাউ হ্যাপী আদারস ক্যান বি …. বিকজ অব য়্যু .. গুড মর্নিং” ।

শীলার এমোন কথার কি অর্থ করবো আমি ? আমার জন্যেই সে কি সত্যিকারের সুখী ভাবতে শুরু করেছে নিজেকে ? নইলে একথা লিখলো কেন সে ! যে মেয়ে আমাকে বলতে পারে “তোমাকে ছেড়ে আমি কি করে যাই বলো” সে মেয়ে তো এমোনটা লিখতেই পারে ! আমি যে আরো গভীর ভাবে বাঁধা পড়ে গেলাম ওর কাছে । এটাকে কি আমার “পরকীয়া” অর্থেই পরকীয়া ভাবা উচিৎ নাকি আরো গভীর কোনও ভালোবাসার অতল আহ্বান !
সমুদ্রের অতলে আলোহীন নীল জলের ভেতর সাতরঙা প্রবালের যে দ্যুতি খেলা করে যায় সোনালী মাছেদের গা’য়ে; তেমনি কায়াহীন এক ভালোবাসা আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে গেল যেন । আমি যেন শীলা নামের এক অদৃশ্য মেয়ের হৃদয়ের গভীর গোপনে মুখ ডুবিয়ে খুঁজে পেলাম এক দিঘী তৃষ্ণার জল । শীলার মানবী শরীর, তার কায়া ছাড়িয়ে এক অশরীরি শীলা যেন উঠে এলো আমার কাছে । এ অনুভব আমার জপের মালাটি হয়ে থাকুক । আমার সব ।

অফিসে যেন উড়ে এলাম । বড় ইচ্ছে হলো, ওর সাথে কথা বলি । আমি কখনও ওকে আগ বাড়িয়ে ফোন করিনি যদি ওকে কোনও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলি কিম্বা ওর সাংসারিক কাজের ব্যাঘাত ঘটিয়ে ওকে অন্যমনষ্ক করে তুলি এই চিন্তা থেকে । আজও এটা ভেবে বিরত থাকতে হলো । এ এক অন্যরকম ভালোবাসা । তীব্র অথচ মধুর সংযম ভালোবাসাকে গাঢ় রসেই সিক্ত করে , ব্যতিব্যস্ত করে তরল করে ফেলেনা । হাতে কাজ ছিলো বেশ, কাজের মধ্যেই ডুব দিতে হলো । এর মধ্যেই শীলার ফোন, “অফিসে পৌঁছেছ, ব্যস্ত ?”
ভেসে গেলাম । কাব্যিক হয়ে উঠতে ইচ্ছে হলো, বললাম – “যব রাত আঁয়ে তো নিদ আঁয়ে / যব নিদ আঁয়ে তো খাঁব আঁয়ে / যব খাঁব আঁয়ে তো তুম আঁয়ে / আওর যব তুম আঁয়ে তো নাহ নিদ আঁয়ে, নাহ খাঁব আঁয়ে ।।
“তুমি কবি হয়ে উঠলে যে” শীলার গলায় আহ্লাদী আমেজ ।
“কি করবো বলো ? এই যে তুমি এলে, কাজ থাকুক একদিকে পড়ে, পৃথিবী অন্যদিকে । কবি হয়ে ওঠা তো এখোন শুধু আমাকেই মানায় ।”
“তুমি তো আমাকে পাগল করে দেবে……” শীলার কন্ঠে ভেজা বসন্ত খেলা করে যায় ।
কথা হয় অনেকক্ষন । কবিতা থেকে ওর ঘর-গৃহস্থালীতে কথাকে নিয়ে যাই সন্তর্পনে । যাতে শীলা, একজন পরস্ত্রী-একজন মা , না ভেবে বসে নিষিদ্ধ এক খেলায় মেতে আছে সে । এ বোধ থেকে তাকে ফেরাতে চাই আমি, অসীম ভালোবাসায় । আমি জানি, আমার ভালোবাসায় কোনও অশুচি নেই, নিষেধের গন্ধ নেই, প্রচলিত পরকীয়ার শরীর নেই । প্লেটনিক ভালোবাসার মতো তার অবয়ব । কঠিন বটে কিন্তু একেবারেই অসম্ভব নয় । তাই স্বাভাবিক বন্ধুর মতো তার ঘর-সংসারের কথা জিজ্ঞেস করি । কি রান্না করছে সে এখোন, জিজ্ঞেস করি তাও । হাসিতে ভেঙে ভেঙে কথারা এগোয় । পৃথিবীর সব ভালোবাসা উজার করে আমরা দু’জন অন্যরকম এক খেলায় মেতে উঠি ।
শেষমেশ হাল ছাড়ে শীলা – “তুমি কি আমাকে কোনও কাজ করতে দেবেনা, সোনা ? আমার কি তোমার প্রশ্নের জবাব দেয়া ছাড়া আর কোনও কাজ নেই ?” প্রশ্রয়ী শাসন ওর গলায় ঝরে পড়ে বৃষ্টির শব্দের মতো ।
হিমাদ্রী শিখরে সূর্য্যের আলো লেগে যেমন বরফ গলে গলে পড়ে , আমার ভেতর এক কিশোর হৃদয়ও তেমনি করে গলে গিয়ে আদ্র হতে থাকে । কানে বাজে শীলার কথাটিই – “আমার কি আর কোনও কাজ নেই ?” যেন জন্ম-জন্মান্তরের অধিকার নিয়ে আমার চপলতাকে দুষ্টু শাসন করা তার । এ পাওয়াকে আমি কোথায় রাখি !

লাঞ্চ সেরে শীলার সাথে সকালে বলা কথাগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে মুঠোফোনের অডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছিলাম চোখ বুজে । এমোন সময় পি পি করে শব্দ তুলে মুঠোফোনের গান বন্ধ হয়ে গেল । কারো এসএমএস । এই এক ঝামেলা, জিপি অফার অথবা সরকারী মেসেজ , দিন নাই ক্ষন নাই – গভট ইনফর্মেশান… বা জিপি অফার । গানের বাটনে হাত লাগাতে গিয়েই থমকে গেলাম । শীলার মেসেজ । হঠাৎ আবারো শীলা । পড়লাম । শীলার প্রতিটি মেসেজই যেমন হৃদয়ে উন্মাতাল ঝড় তোলে এটিও তাই । এবার ঝড় নয়, তান্ডব –
“ ম্যায়নে হাওয়া কো এক মেসেজ দিয়া / উও হাওয়া ঝুমতি হুয়ি বাদল কি পাস গ্যায়ী / আউর মেরা মেসেজ বাদল কো দে দিয়া / আউর ও বরসনে লাগা / গিরনে ওয়ালী হর বুন্দ সে আওয়াজ আঁয়ি “আই মিস য়্যু” ।।”
আমি এখোন কি করি ! “আই মিস য়্যু” এই কথাটি যেন কাল বোশেখীর তান্ডবের মতো আমার নাজুক হৃদয়খানাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেল । আমার প্রচন্ড ইচ্ছে হলো শীলাকে একবার দুচোখ ভরে দেখি । হায় যদি দেখতে পেতাম ! শুধু লিখলাম, “ তোমার মতোন এই এতোটুকু এক মেয়ে এতো শক্তি কোথায় পেলে ?” উত্তর এসেছিলো ঝটপট, “ সে আমার প্রেম ” ।

আজ ইচ্ছে করেই দেরীতে বাসায় ফিরলাম । ফুল্লরা একবার শুধু জানতে চাইলো দেরীর কারন । পথের গাড়ী-ঘোড়ার জ্যামের কথা বলে এড়াতে চাইলাম । “সে তো প্রতিদিনই থাকে” - ফুল্লরার গলায় কি একটু অবিশ্বাসের ছোঁয়া ! ফুল্লরাও কি আমাকে মিস করছে ? ওর জন্যে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসতে চাইলো একরাশ মমতা-ভালোবাসা । যে ভালোবাসার স্রোতে আমি ভেসে যাচ্ছি তেমন ভালোবাসার স্রোতে ফুল্লরাকেও ভাসিয়ে নিতে ইচ্ছে করলো । বিশুদ্ধ ভালোবাসার স্পর্শ তো এমনি করে ভালোবাসতেই শেখায় । আদর করে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলাম ফুল্লরার তীর্যক দৃষ্টির দিকে চোখ পড়তেই । ভেতরের ধেঁয়ে আসা ভালোবাসা যেন একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল ।
“এককাপ চা দেবে ?” ফুল্লরার দিকে তাকাই । ফুল্লরা মেয়েকে ডাকে, তোর বাবাকে এককাপ চা করে দে তো । জিনিয়া খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে দৌড়ে এলো ।
“বাবা, আর একটু পরেই তো খেতে বসবে, এখোন চা খাওয়ার দরকার কি ? আমি এখোন ব্যস্ত বাবা । তুমি একটু নিজে নিজে করে খাওনা ।” আদুরে ঢঙে বলতে বলতে জিনিয়া নিজ ঘরের দরজার ওপারে । চা খাওয়া একটা অজুহাত মাত্র । ইচ্ছে ছিলো ফুল্লরাকে নিয়ে একটু বসি, ছেলেমেয়েরা থাকলে আরো ভালো । কতো কিছু যে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করে ! দেশের কথা, রাজনীতির কথা, নিজের কথা, অফিসের, বাইরের, ঘরের কথা । সারা বিশ্বে কোথায় কি ঘটেছে তার কথা, মানুষের কথা, কবিতার কথা, সবুজ গা-গ্রামের কথা । ফুল্লরার ভরা যৌবনে, ছেলেমেয়েরা যখোন ছোটো ছোটো ছিলো কত কথাই তো একজোটে বসে করেছি আমরা । ওপানটি বাইস্কোপ এর মতো বাপ-ছেলেমেয়ে পরপর কোমড় জড়িয়ে টেবিল চেয়ার এর চারদিকে ঘুরে ঘুরে গান গেয়েছি – আজ জোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে..... । খুব কি বুড়িয়ে গেছি আমরা এখোন ! অতি বাস্তবতা কি আমাদের ভেতরের নরম মোমের মতো কোমল নান্দনিকতাকে চটের দেয়ালের ওপারে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে ? যেখান থেকে ফাঁক-ফোকড় দিয়ে পিছনের দিনগুলির ছবি ছেঁড়া ছেঁড়া, অস্পষ্ট দেখা যায় ?
গল্পের মতো দিনগুলো ফুরিয়ে গেলো এতো তাড়াতাড়ি ? কি দোষে আমরা নত হয়ে আছি প্রাত্যহিকতার কাছে ?
দিনের রং মুছে গেলে সব পাখি ঘরে আসে । শূন্য একটি নীড় যেন অপেক্ষায় থাকে কারো । একটি গল্পের জন্যে কিশোরী রাত তরুনী হতে থাকে ধীরে ধীরে । আকাশের আঙ্গিনা থেকে নেমে আসে এক “আর্টেমিস” আলোর দেবী । অন্ধকারের মাঝেও যে রাত্রিবাসে নীল সবুজের আলো জ্বেলে বসে থাকে । যার দেখার চোখ আছে শুধু সে ই দেখতে পায় ।
এমোন একটি মরমী সন্ধ্যার জন্যে আর কতো অপেক্ষা মানুষের !
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া (উপন্যাসিকা)


(পূর্ব প্রকাশনার পর )
পঞ্চম অধ্যায় / (প্রথম অংশ)

“… আমি একদিনও না দেখিলাম তারে
আমার বাড়ীর পাশে আরশী নগর
এক পড়শী বসত করে ।”

ঘুম ভাঙতেই দেখি আকাশটা ঝিম মেরে আছে । কাল রাতের আকাশের ছিচকাঁদুনে ভাবের রেশটুকু কাটেনি এখোনো । একটু যেন শীত শীত লাগছে । জানালার বাইরে মরা রোদের আভাস একটু পাওয়া যায় কি যায়না ! যেন ঢুকবে কি ঢুকবে না এমোনটা ভাবছে । এরই মাঝে একটা চড়ুই এসে বসেছে জানালার সামনের কামিনী ফুলগাছটার ভেতরের একটি ডালে । ভিজে গেছে, ডানা ঝাপটে জল ঝড়াতে গিয়ে রোমগুলো খাড়া খাড়া হয়ে আছে । পাখিটার ঝড়ো অবস্থা দেখে মায়া হলো । ওর জোড়টা কই ! এক শালিক দেখলে নাকি দুঃখ আসে । একটি চড়ুই দেখলে কি হয় !
পাশ ফিরে সামিয়ার দিকে তাকালাম, দেখি অকাতরে ঘুমুচ্ছে । আহা বেচারা । বাবার আদর মেলেনা সব সময় । বাবা কাছে থাকেনা সপ্তাহের বেশী দিন । শোয়েব কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়র । ভালো মাইনের চাকুরে । হপ্তা শেষের ছুটিতে যখোন আসে তখোন যেটুকু আদর পায় মেয়েটি সেটুকুই তার জমার খাতায় তলানীতে পড়ে থাকে । বাকীটুকু পোষাতে হয় আমাকেই । মেয়েটি আমাদের দু’জনারই চেহারা পেয়েছে । আমাদের প্রথম সন্তান । গোড়ার দিকে আমাদের দু’জনার ভাব ভালোবাসা ছিলো বলেই হয়তো । সে ভালোবাসা এখোন দুরত্বের কারনে কতোটা মজবুত আছে মাঝেমাঝে ভাবি ।

শিক্ষিত, সুপুরুষ শোয়েবের ঘর করতে এসে প্রথম প্রথম পাখির মতো উড়ে উড়ে গেছি । শ্বাশুড়ী আর দুই ননদ দেবরের সংসার । ছেলে কাছে থেকেও যেন প্রবাসী । আর দশটা সংসারের নিয়ম মতো তাই সংসার চালানোর দায়িত্বটা এসে পড়েছে । নিজের মতো করে সাজিয়েছি সব । ব্যবধানটা বেড়েছে সেখান থেকেই । আমার শিক্ষা সেটাকে একটা সীমার মধ্যে আটকে দিয়েছে । তবু তাই ই খানিকটা ডালপালা ছড়িয়ে পৌছে যায় যেন হাযার মাইল পেরিয়ে । শোয়েবের সাথে এ নিয়ে আমার তেমন কথা হয়না । তবু বুঝতে পারি সুরের তাল যেন খানিকটা ঢীমে হয়েছে । একা একা এ ভার বয়ে চলা মাঝে মাঝে বড় কঠিন মনে হয় ।

বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে হিসেব করলাম, শোয়েবের আসতে আরো দু’দিন বাকী । বেশ কিছু কাজের কথা আছে ওর সাথে । শ্বাশুড়ী ডায়াবেটিসের রোগী । ননদ যূথী আর দেবর পলাশের কলেজ, লেখাপড়া নিয়ে কথা বলতে হবে । কথা বলতে হবে শোয়েবের হাজী লেনের এই পৈত্রিক বাড়ীটি নিয়েও । যতো ঝামেলার কাজ । সবাইকে সামলে, এতো দিক দেখেশুনে রাখতে মাঝে মাঝে একাকী হয়ে পড়ি । একা একা মনে হয় নিজেকে । নভেরা ছিলো বলে বাঁচোয়া । আমি যখোন আইবিএ থেকে মাষ্টার্স করে একটি বিদেশী টেলিকমিয়্যুনিকেশান প্রতিষ্ঠানে চাকরী করি তখোনই নভেরার বাবা আমার সাথে শোয়েবের বিয়ের প্রস্তাবটি আনেন । নভেরাদের বাসার কাছেই বাসা । সেই সুবাদেই আজো নভেরা আমার প্রতিবেশী । আমার বাবা বেঁচে নেই । কেবল আমার মা বড় ভাইয়ের সাথে রাজশাহীতে আছেন এখোন । আত্মীয়রা যে যার মতোন, ধারে কাছে নেই । তাই এই শহরে আমি বড় একা । স্বামী নামের লোকটি অনেকটা থেকেও নেই যেন । শুরুর দিকের জোয়ারের কলধ্বনী এখোন মনে হয় দুরাগত । নদীতে একবার স্রোত থেমে গেলে নদী মরে যেতে চায় কান্নায় । ক্ষীন হয়ে আসে তার ধারা । মজা নদীতে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় শৈবালের দল । পাঁক ধরে, যেন ছানি পড়ে গেছে জলে ।
দরজায় খটখট শব্দ । কেউ ডাকছে হয়তো । শ্বাশুড়ী ! ননদ যুথী ! কে ? মরুক গে । আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরূনী ছোঁয়াতে গিয়ে হঠাৎ চোখ গেল আয়নার চোখে । বেশ ফোলা ফোলা মনে হলো । রাতে কি ঘুম ভালো হয়নি ! নাকি খুব বেশী ঘুমিয়েছি ! ঘুমের কোনও সমস্যার কথা এ মূহুর্তে মনে পড়লোনা । তাহলে কি কোনও স্বপ্নের ভেতর কেঁদেছি !
না, স্বপ্নের ভেতর নয় আর একজনের কান্না শুনেছি কাল সন্ধ্যের আগে আগে । কাল রাতের বৃষ্টির মতো শব্দ ছিলো তার ।

যাকে তাড়াতে চাইছি কেন যে বারে বারে সে ই সবকিছু ঠেলেঠুলে মনের দরজা খুলে উঁকি মারে ! এ খেলাটি নিষিদ্ধ বলেই কি ! নিষিদ্ধতার একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে হয়তো । কিন্তু আমার তো সে রকম লাগছেনা , কেমন যেন কষ্টের মতো একটা সুখী ঝরনা তিরতির করে বয়ে গেছে, যাচ্ছে আমার শিরায় শিরায় । কান পাতলেই তার কুলুকুলু কুহকী ধ্বনি শুনতে পাবো বোধহয় । অনেক তীব্র ভালোলাগার চোরকাটাগুলি আমারই অজান্তে একটি একটি করে আমার শাড়ীর আঁচলে ফুটে গেছে যেন । তা বাছতে গেলেই কোথায় যেন স্মৃতির তারে ঘা লাগছে । প্রথম ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার মতো । মনে পড়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর কোনও এক নিভৃত কোনে শুধু একজোড়া চোখ আমার প্রতীক্ষাতেই জেগে আছে । যে আমার কেউ নয় অথচ আমার ভালোমন্দ সকলি ভেবে ভেবে যার সারাদিনমান কাটছে । উৎকন্ঠার সে চোখ যেন আমাকে ঘিরে আছে অনুক্ষন । যে চোখ তৈরী করেছি আমি নিজে ।
কুসুম কোমল লজ্জার একটা অস্বস্তি জড়িয়ে ধরতে চাইলেও আমার যে ভালো লাগেনা, একথা কি করে বলি ! নিজেকে এই একটিমাত্র ক্ষেত্রেই সৌভাগ্যবতী মনে হয় ।
উপায় ছিলোনা । সে দু’চোখেই আমি কাল জল ঝড়িয়েছি । কাল দুপুরে “ হোয়্যার আর য়্যু ?” তার এরকম একটা মেসেজ পেয়ে মনে হলো ঘাতক তীরটি ছোঁড়ার এই ই সময় । দেরী করে ফেললে আমার নিজেকেই কষ্ট দেয়া হবে । সময় লম্বা হলে আমার কষ্টই বাড়বে শুধু । আমি এই খেলার তীব্র পাঁকে আরো গভীর ভাবে গেঁথে যাবো । বাঁশের ঝাড় বাড়তে দিতে নেই । বাড়তে দিলে তাতে অনেক বাঁশী হয়তেো বাজবে কিন্তু অন্ধকার করে দেবে চারদিক ।
মেসেজ করলাম, “ আমাকে এতো ভালো বেসোনা । আমি এখানে দু’দিনের অতিথি।”
পরক্ষনেই তার মেসেজ, ‘ঠিক করে বলো তো কি বলতে চাচ্ছো তুমি ?’ উত্তর দেয়ার আগেই আমার মোবাইল বেজে উঠলো । দেখি সে ।
এই প্রথম নিয়ম ভাঙ্গলো তার, কন্ঠে উৎকন্ঠা, বললো – “আমি একটা মিটিঙয়ে ছিলাম মধ্য থেকে উঠে এসেছি । তুমি জানো কি কথা তুমি বলেছো ? তোমার কথার মানে কি ?” ।
গলা তার কাঁপছে স্পষ্ট বুঝতে পারছি
বললাম, মনটাকে শক্ত করো । আমি মেইল করে জানাচ্ছি সব ।
মেইল করলাম “….. তুমি আমাকে এতো ভালো বেসোনা । আমি এখানে দু’দিনের অতিথি । তুমি মনটাকে শক্ত করো, আমি “সিএমএল” এর রোগী । ইন্টারনেটে দেখে নিও এ রোগটি কি । বেঁচে থাকবো কতোদিন জানিনা । সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র । আমাকে ভুলে যেতে চেষ্টা করো ।”
এতোবড়ো এক মিথ্যে লিখতে আমার হাত কাঁপলোনা একটুও । মানুষ বলে – স্ত্রী চরিত্রম দেবঃ ন জানন্তিঃ” । ভুল বলে কি খুব ! আমি তাকে দেখছিনে কিন্তু দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি সে ‘থ’ হয়ে তার স্ক্রীনটির দিকে তাকিয়ে আছে । চোখমুখে তার আঁধার ঘনিয়ে আসছে একটু একটু করে । গলার কাছে কি যেন একটা উঠছে নামছে । কান্না ! জবাই করা পশুর মতো শব্দহীন এক ছটফটে কান্না ।
যাকগে, আমার কি !
original post
read more

শুদ্ধতম পরকীয়া

by আহমেদ জী এস

পূর্ব প্রকাশনার পর )
পঞ্চম অধ্যায় / ( শেষ অংশ )

যতো সহজ হতে চাইলাম ততো কঠিন হয়ে গেলো সহজ হওয়া । পানি ঠান্ডা হতে হতে কি হয় ! সহজ হতে গিয়ে আমি বরফের মতো কঠিন হয়ে গেলাম । আমি কি তাকে জীবন্ত মেরে ফেললাম ! ছুঁড়ে দেয়া তীর আমার যে ফেরানোর উপায় নেই এমূহুর্তে ।
একটু ব্যথা কোথাও যেন চিনচিন করছে । টেবিল থেকে উঠে যেতে মন চাইলোনা । দিব্যি জানি, একঝাঁক লেখা এসে হাজির হবে । হ’লো ও । আমার রোগের ইতিহাস আদ্যপান্ত জানতে চায় সে । চিকিৎসা কি হচ্ছে, কোথায় এর ভালো চিকিৎসা মিলবে ইত্যাদি মিলিয়ে আকুতি ভরা লম্বা এক মেইল । পড়তে গিয়ে বুকের কোথাও টনটন করে উঠলো । অজান্তে হাতটি বুকের সুডৌল ঢালটি ছুঁয়ে অলস পড়ে থাকা ছোট্ট লকেটটিকে আঁকড়ে ধরে থাকলো । মনে পড়ে গেল এই উদোম বুকের ছবিই আমি তাকে পাঠিয়েছিলাম একবার । লিখেছিলাম, বুকের তিলটি খুঁজে পেলে কিনা বলো । এই মূহুর্তে আমার এসব কথা মনে করা উচিত হলো কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারা গেলোনা । তবুও সে বুকখানিই টনটন করে উঠলো এখোন, খানিকটা কষ্টে খানিকটা নিজের উপর রাগে ।
পরে, পৃথিবীর পথ ছেড়ে সাঁঝের বাতাস যখোন সান্ধ্য মেঘের রঙ খুঁজে খুঁজে ফিরছে ; তার ফোন এলো । চমকে গেলেও বুঝলাম অস্থির হয়ে আছে সে । সরাসরি কথা বলতে চায় ।
- “শীলা, আমাকে ছেড়ে সত্যি সত্যি তুমি চলে যাবে , যেতে পারবে ? প্লীজ, আমাকে ছেড়ে যেওনা ! বলো, যা কিছু বলেছ তা সব মিথ্যে ।”
যেন বহুদুর থেকে তার কন্ঠ ভেসে এলো হিমাদ্রীর শিখর ছুঁয়ে, পৃথিবীর সব শীতলতা নিয়ে । কেঁপে উঠলাম । তার কন্ঠে কান্নার সুর, কেঁদে ফেললো সে – “ প্লীজ...প্লীজ...প্লীজ ডোন্ট লিভ মি....” । বাকীটুকু শুনতে পেলাম না ভালো করে, কান্নার শব্দে হারিয়ে গেছে । চোখে জল এলো আমার ও । মিথ্যের সুতোয় বোনা কাপড়খানি ভিজে গেল জলে । মনে হলো কোনও এক গল্পের ভেতর থেকে আমি উঠে এলাম । হু হু করে কেঁদে ফেললাম আমিও । বোকার মতো কি ? নাকি এও এক ছলনার জাল, আমাকে দিয়ে বুনিয়ে নিয়ে গেল অন্য এক অশুদ্ধ নারী ? সন্ধ্যের বাতাসের আর খোঁজা হলোনা মেঘের রঙ । পৃথিবীর কোনও এক প্রান্তে নতজানু এক পুরুষের সাথে এইমাত্র ঘটে যাওয়া অভিনয় দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল বাতাস । কান্না হয়ে মেঘ যেন মিশে যেতে চাইলো মাটিতে । তাই কি রাত ভর বৃষ্টি ? অভিনয় এতো সুন্দর হয়, জানে কি সে ?
আমাতে সমর্পিত সেই মানুষটির চোখেই আমি কাল জল ঝড়িয়েছি । এখোন একটু একটু অনুশোচনা হচ্ছে । এভাবে তাকে ফেরানোর কথা না বললেও হতো । আসলে আমার নিজেকেই আমি বুঝে উঠতে পারছিনে ঠিক ঠিক । এক একবার তাকে ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছি অন্য সবার মতো আবার পরক্ষনেই সে যে কেন এসে সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ! আমার সকল কাজের ফাঁকগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে যেন বাতাসটুকুর মতো দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমায় বারেবার । কেন ? জানি ফুল থেকে ফল হয়, ফল থেকে বীজ – সে কি তার শুরু না শেষ ? আমি তো শেষ করতেই চেয়েছিলাম । জানিনা শেষ হলো কিনা !
আজ এই সকালে ফোলা ফোলা চোখের দিকে তাকিয়ে গতকালের ছবিগুলো যেন ধারাপাতের নামতাগুলোর মতো মুখস্ত আউড়ে গেলাম আমি । যাক এবার তাহলে ছুটি । দীর্ঘশ্বাস পড়লো একটা আর ঠিক তখনই বিছানার উপরে রাখা মোবাইলে কাঁপন উঠলো । শোয়েবের ফোন ।
- তোমাকে ল্যান্ড ফোনে পাওয়া গেলনা । মূখ ধুচ্ছিলে হয়তো । তাই মোবাইলে রিং দিতে হলো ।
শুনে যাচ্ছিলাম ওপারের কথা । হা-হু করা ছাড়া বেশী কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না । মাথাটাও ধরেছে এই সাথে । দুদিন পরেই তো আসছে শোয়েব । তখন না হয় শোনা যাবে । বলতে যাচ্ছিলাম, দু’দিন পরেই তো আসছো তখন না হয় শুনবো । বলা হলোনা । ওধার থেকে যা বলা হলো তার সারমর্ম এই যে, শোয়েব কাজে আটকে গেছে তাই তার আসা হবেনা । হাপ ছেড়ে বাঁচতে চাইলাম কি ! আমার যা মনের অবস্থা তাতে একটু সময় দরকার আমার ধাতস্থ হতে । এও এক বিড়ম্বনা হয়ে উঠতে পারে । সময় যেমন সবকিছু সারিয়ে তোলে তেমনি আবার আগোছালোও করে দিতে পারে সব । আমার সময় চাইনে । আমি তাহলে আবার জড়িয়ে পড়তে পারি শেষ হয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ এক খেলায় । মানুষের মন পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতো, টলে যেতে কতোক্ষন ! আমার যে শোয়েবকে চাই । ওর অনুপস্থিতিতে আমার হাতে যে খরচ করার চেয়েও বেশী সময় জমে থাকবে । বললাম, “কি এমোন কাজ যে তুমি আসতে পারবেনা ?”

ফোলা চোখের মনঃপুত ব্যাখ্যা পাওয়া দুরূহ হয়ে গেল । তাহলে কি আমি রাতে কোন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঘুমিয়েছি ! নাহ্‌ মিলছেনা । বিভোর ঘুমে চোখ ফোলেনা । তাহলে রাতে আমি কি স্বপ্নে কেঁদেছি ? কিম্বা দুঃস্বপ্নে ঘুমের ভেতর ছটফট করেছি ? মনে পড়ছেনা । স্বপ্নেরা এতো তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায় কেন ? বাইরে বারান্দায় গিয়ে তোয়ালে মেলে দিতেই আবার চোখ গেল কামিনী গাছটায় । একটা নয় এবার দু’টো চড়ুই গা ঘেষে বসে আছে । হঠাৎ হঠাৎ ঠোটে ঠোটে , পাখায় পাখায় আদরের ঝাপটাঝাপটি । শিরশির করে উঠলো শরীর । লালের ছোপ লাগলো কি গালে ? না লাগেনি । লজ্জায় লাল হয় তারাই যারা নিষিদ্ধ কিছুর সামনাসামনি পড়ে যায় অকস্মাৎ যা তার অপরিচিত । আমি যে নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি প্রবল ভাবে আকর্ষিত এ কথা বলা হয়তো ঠিক নয় । আবার আমি এমোনও নই যেখানে নিষিদ্ধতা কাঁটাতারের বেড়া দেয়া সীমানার ওপারের কেউ যেন ।
আহার, নিদ্রা আর মৈথুন ছাড়া মানুষের জীবনে আর কি কিছুই নেই ! মানুষ যেন এই ত্রিরথের চাকায় পিষ্ট অসহায় এক প্রানীর মতো ধুঁকে ধুঁকে চলে । আহার তার ক্ষুধার সবটাই মেটায় সত্য , নিদ্রা আনে প্রশান্তি । কিন্তু শুধু মৈথুন কি মানুষকে তার দেহের সবটুকু সুখ পুষিয়ে দিতে পারে ! তাহলে লোকে যে বলে “ভালোবাসি ভালোবাসি ....” তাহলে সে ভালোবাসা কি ? এর বাইরের কিছু ? দেহজ ক্ষুধার বাইরে অচিনপুরীর কোনও গোপন চোরকুঠরী ? সে মঞ্জিলে পৌঁছুতে কি মৈথুনই একমাত্র মন্ত্র ? অন্ত্যজ প্রানীদের মৈথুনও কি সমগোত্রীয় ? অন্ত্যজ প্রানীদের কি ভালোবাসা বলে কিছু হয় ? ভালোবাসার শেষ কি শুধু দেহের বাঁকে বাঁকে তরী বেয়ে চলা ! নাকি ঢেউ যেমন আছড়ে পরে কূলে তেমনি সে দেহের বাঁক পেরিয়ে স্থিত হতে চায় হৃদয়ের কোনও বেলাভুমিতে ! এই কি তার মঞ্জিল, তার সমর্পন ! দেহের পথ দিয়েই কি মন এর গভীর অরণ্যে যেতে হয় নাকি ভেসে চলতে চলতে মনকে একসময় দেহের আশ্রয়ে থিতু হতে হয় ! কোনটি আগে, দেহ না মন !
ভৎর্সনা করে সে তো আমাকে লিখেছিলো –
“লভ এবং লভমেকিং এক জিনিষ নয় । লভমেকিং করতে লভ লাগেনা । তুমি “লভ”কে শরীরের সাথে গুলিয়ে ফেলেছো । শরীর লভ এর ল্যজিকাল সিকোয়েন্স হলেও হতে পারে, আদি নয় । ভালোবাসায় শরীরটিই শেষ কথা নয় এটুকু বুঝতে চেষ্টা করো শীলা ।” লিখেছিলো আরো অনেক কিছু ।
আমি বুঝতে চাইনি । আমার তখোন শঙ্খলাগা ঘোর । আমি চেয়েছিলাম আরো বেশী করে নিমগ্ন হতে । যুক্তি তুলে ধরে মুঠোফোনে শুধিয়েছি , “ তোমার কি এ ব্যাপারটি খারাপ লাগছে ? সত্যি করে বলতো, বিবাহিত জীবনে সব মানুষই কি তার আদিম জৈবিক চাহিদার সবটুকু আনন্দ আইনে বৈধ এমোন একজনের সাথে মিটিয়ে নিতে পারে, নাকি তা মেটে ? তোমার নিজের কাছে কি মনে হয়না, কিছু অতৃপ্তি থেকে গেলো কোথাও এতোদিনের জীবনে ? আমরা দু’জনেই পরিনত বয়সের । আমি তো জেনেই আমন্ত্রন জানিয়েছি তোমায় । শরীর থেকেই তো আমরা দু’জনে আরো কাছে আসবো, তাইনা ? হোকনা তা দুরাগত ।”
ওপাশে যে একটা ঝড় বইছে আমি তা বুঝতে পারছি ঠিক । আমি তো তাকে নাচাতেই চাইছি অন্য সবার মতো । সে নেচে গেছে বটে আমার তালে তবে আমার ছন্দহারা পায়ের তাল এর অসংগতিও দেখিয়ে দিতে ছাড়েনি । শুধরে দিতে চেয়েছে । এতো শুদ্ধ আর অনেকটা বোকা, এই রকম মানুষটা নিয়ে আমি কি করি ! তার এই ভালোমানুষিটাই কি আমাকে একটু একটু করে গিলে নিচ্ছে অজগরের মতো ! ইথারে কাঁপন তুলে এক দুর দ্বীপবাসির মতো কায়াহীন আলিঙ্গনে তার আমাতে উপগত হওয়ার গন্ধ আমি তীব্র শীৎকারে জানান দিয়েছি । মরি টেনে নেয়া বাঘিনীর মতো আমি তাকে টেনে নিয়ে গেছি গহীন অরন্যের গভীরে । ওপারের থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে আমার ভালো লেগেছে কিনা । পরিতৃপ্তির মৌ মৌ গলায় শুধিয়েছি – “তোমার ?”

কাল রাতে আমার শরীর কি তবে আমার অবচেতনে সেই সুরের ছোঁয়া পেতে উতলা হয়ে ছিলো ! তাই ঘুমের ভেতরেই ছটফট করেছি হয়তো । ভালো ঘুম হয়নি তাই । এতো কাছে টেনে এনেও আমি তার দেখা পাইনি । সে যে আমার অজান্তেই ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ফিরে গেছে ।
আমি নিজেই যে তাকে ঠিকানা দিইনি ।

দরজায় শব্দ হতেই দেথি যুঁথী ।
ভাইয়া টেলিফোন করেছিলো, বলেছি তুমি বাথরুমে । কথা হয়েছে ? যুঁথী দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে দাড়িয়ে থাকে ।
- হ্যা, মোবাইলে হয়েছে । তোমরা কি জানো তোমার ভাই এবার আসতে পারছেনা কাজের চাপে ?
- জানি, আম্মার সাথে কথা হয়েছে । আম্মাকে ফোঁপাতে দেখেছি । কি জানি কেন । বাদ দাও ভাবী, খেতে আসো । নাস্তা রেডী ।
এবাড়ীতে ছয় চেয়ারওয়ালা ডাইনিং টেবল । একমাথার চেয়ারটা খালিই পরে থাকে সপ্তাহের পাঁচদিন । শোয়েবের জন্যে নির্দিষ্ট । কেউ বসেনা ওটাতে । সামিয়া মাঝেমাঝে জেদ ধরলে বসতে দিতে হয় । ওর জায়গাটা শোয়েবের বাম দিকে যাতে সামিয়াকে খাইয়ে দিতে অসুবিধা না হয় । সপ্তাহান্তে বাপ-বেটির এখানেই একাত্ম হওয়ার ফুরসৎ মেলে । আমার জায়গার কোনও ঠিকঠিকানা নেই । এক জায়গায় বসলেই হয় । বাকীরা যে যার মতো বসে পড়ে । কেবল শ্বাশুড়ী একা একা বসে খান , আমাদের খাওয়ার আগে আগে । উনি বলেন, ডায়াবেটিসের রোগীতো, তোমাদের সাথে বসলে অনেক কিছুই খেতে ইচ্ছে করবে । বেশী খাওয়া ডাক্তারের বারন আছে । তাই আমার আলাদা খাওয়াই ভালো ।
কিন্তু আমি জানি এটা ওনার ঢং । আমাকে আর শোয়েবকে একসাথে দেখতে ওনার ভালো লাগেনা । বেশী শিক্ষিত বউ ঘরে আনতে ওনার আপত্তি ছিলো । সে আপত্তি টেকেনি । তাই তার না-পছন্দের তালিকায় আমিও একজন । আমার ডেক্সটপের সামনে বসাটাও যে তার পছন্দ নয় সে ও আমি জানি । কিছু বলতে চাইলেও বলেন না । জানেন, যে শক্ত হাতে সংসারের তরীখানি বইছে তরতর, তাকে অহেতুক চটিয়ে দেয়া বোকামী । তবুও ওর ফোঁপানোর কথাটি মাথায় গেথে রইলো ।
আজ ক’দিন থেকে নাস্তায় ডিম বাদ । মুরগির ফার্মগুলোতে কি নাকি সংক্রমন ঘটেছে । সংক্রমন কোথায় নেই ! দেশজুড়েই তো ভয়াবহ অনৈতিকতার সংক্রমন । সংক্রমন আমার মনেও কি কম ! ‌আমার শ্বাশুড়ীর মনেও তো সন্দেহের চোরাগুপ্তা সংক্রমন । সেটা যুথী আর পলাশের মাঝে সংক্রমিত হলেও অবাক হবোনা । পোলট্রিগুনো বাদ যাবে কেন !
আলুপটলের ভাজি, রুটি আর একগ্লাস দুধ সামনে নিয়ে সামিয়া তাকিয়ে আছে আমার দিকে । মাম্মী, রোজ রোজ ভাজি খেতে ভালো লাগেনা । একই জিনিষ রোজ রোজ কেন করছে সখি বুয়া ! ওকে বলো না অন্য কিছু করতে ।
সখিনা বানু আমাদের বাসার কাজের মেয়ে । আটোসাটো গড়ন । ময়মনসিংয়ের ওদিকে কোথায় যেন বাড়ী । গারো মেয়েদের একটা ধাঁচ আছে কিন্তু গারো নয় । এখানে আসার আগে মোটামুটি শ্যামলা ছিলো গা”য়ের রঙ । এখোন তা বেশ উজ্জল । সাবান, তেল আর প্রতিদিন স্নানের ফল । শাড়িটিও গা’য়ে সুন্দর করে জড়ানো থাকে সারাক্ষন । মা মরা মেয়ে । তাই আদরে সোহাগে মিলিয়ে আমাদের একজন হয়ে উঠেছে । বাইরের কাউকে সংসারের একজন হয়ে উঠতে গুন লাগে , এ গুনটিও তার বেশ । সামিয়ার খেলার সাথী । সামিয়া ওর পুরো নাম বলতে পারেনা নাকি ইচ্ছে করেই ডাকেনা জানিনে । ডাকে সখি ।
“একই জিনিষ রোজ রোজ কেন করছে সখি বুয়া” খট করে কানে বাজলো কি কথাটি ! রোজ রোজ একই জিনিষ ভালো না লাগার কথাটি ! আমার চেয়ে এ কথাটি কে বেশী বোঝে, জানে ! গত রাতের ঘটনার পরে তো এ কথাটা কানে বাজতেই পারে । শুধু ঐ একজনের সাথে কেন যে বারবার ব্যতিক্রম হয়ে যায় । ছেড়ে যেতে চাইলেও পারিনা । কি যেন এক স্রোতের টানে বার বার ভেসে যাই, কূল হাতছাড়া হয়ে যায় । ভাসতে থাকি অথৈ জলে । আমাকে যে কূলে উঠতে হবে !
সেই কূলে ওঠার ইচ্ছে থেকেই তো একটা গল্প ফেঁদেছি । রক্তবীজে সংক্রমনের গল্প । এ থেকে যে তার শীলার নিস্কৃতি নেই । মরনের ওপারে গেলে সে কোথায় রক্তমাংশের শীলাকে খুঁজে পাবে ! শিলাপটে তার আর লেখা হয়ে উঠবেনা কোনদিন । শীলা নামের কেউ একজন অতীত হয়ে যাবে তার কাছে ।
আর আমিও এরপরে একবারও জানবোনা, আমারই গড়ে তোলা আরশী নগরে যে একদিন বসত করতো আজ সে কোথায় - কেমন করেই বা কাটছে তার দিন !
নটে গাছটি মুড়োনোর মতো আমার গল্পও ফুরোবে তখন ।
original post
read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site