Showing posts with label 1971. Show all posts
Showing posts with label 1971. Show all posts

Monday, February 6, 2012

ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। (ছবি পোস্ট)

by ধীবর
ফেব্রুয়ারি আসলেই ভাষা আর ভাষা শহিদদের জন্য আমাদের দরদ উতলে উঠে। আমিও এর ব্যাতিক্রম নই। সেই দোষ আর দায়টুকু স্বীকার করেই, গোল্ডফিস মেমরির অধিকারি স্বজাতির সামনে ছবির মাধ্যমে সেই মহান ইতিহাসকে স্মরণ করছি।


জিন্নাহর সেই কুখ্যাত ঘোষণা "উর্দু একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্থানের রাস্ট্রভাষা।



বাংলাকে রাস্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবিতে পাকিস্থানি পার্লামেন্টে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এম পির প্রস্তাব উত্থাপন।


বাংলাকে রাস্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সাল।


বাহান্নর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবপুর রোডে মিছিল।



এই সেই ঐতিহাসিক আমতলা যেখান থেকে ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষি এই আমতলা ।



ঐতিহাসিক সেই আমতলায় ছাত্রদের মিটিং, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ।


১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল।


ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ।


২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে শহিদদের স্মরণে ঢাকায় গায়েবানা জানাজা।


শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন শহিদ আবুল বরকতের পরিবারের সদস্যরা।



প্রথম শহিদ মিনার। যা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে গুড়িয়ে দেয় পাকিস্থানি বাহিনী।



শহিদ বরকতের কবরে ফুল দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন তার মা বাবা। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সাল।

[অনেক চেস্টা করেও পুলিশের গুলি করা বা শহিদদের ছবি যোগাড় করতে পারিনি। কেউ কি লিংক দিতে পারেন?]

দেশের জন্য ভাষার জন্য আত্মদান করাটা খুব খুবই কঠিন কাজ। সেই কাজটি যারা দেশকে ভালোবেসে করে গিয়েছেন, তাদের উত্তরসুরি হয়ে আমাদের এ কি আচরণ?

যুগের দোহাই পেড়ে খোদ মাতৃভাষাকে অবমাননা করা, বিজাতিয় ভাষা আর সংস্কৃতিকে মাথায় তুলে একদিকে নৃত্য করা, অন্যদিকে ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই পাকা ভাষাপ্রেমিক হয়ে যাওয়া, এই দ্বিমুখিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

ভাষা কি কেবল ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক? বাংলা একাডেমি নামের একখানা শ্বেত হস্তিকায় আতেলের কারখানা আছে বটে। সেখানকার তিনারা এক মাস বই বেচার মেলা নিয়ে যেমনটি ব্যস্ত, তাতে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণায় তার সময় কোথায়?

এ রকম চললে, এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন সিং সাহেবরা দিল্লি থেকে উড়ে এসে বলবেন, হিন্দি একমাত্র হিন্দিই হবে রাস্ট্রভাষা। আমাদের ঘরে ঘরে যেভাবে হিন্দি বাসা বেধেছে, যেখানে শিশু থেকে বুড়ো পর্যন্ত হিন্দি প্রেমে পাগল, সেখানে কোন একজন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এম পির সেই দেশপ্রেমিক সাহসি প্রতিবাদি কন্ঠ পার্লামেন্টে শোনা যাবে না। কোন ভাষাপ্রেমিকদের আমতলায় মিছিল মিটিং করতে দেখা যাবে না। ১৪৪ ধহারা ভঙ্গ করাLinkর মত সৎ সাহসে কোন ছাত্র ছাত্রি বিক্ষোভে উত্তাল হবে না।

যে কাজ পাকিস্থানিরা লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালিকে হত্যা করেও করতে পারেনি, বিনা রক্ত ক্ষয়ে বিনা একটি বুলেট খরচ ব্যাতিরেকেই ইন্ডিয়ানরা সেই কাজ করে ফেলছে।

আপন ইচ্ছায় পরাধীনতার শৃংখলে বন্দি হলে, শিকারির কি দোষ?
original post
read more

Tuesday, January 10, 2012

বিশ্বজনের সহায়তা

by মফিদুল হক


একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধপীড়িত দ্বন্দ্বমুখর বিশ্বে। পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসককুল তখন পাকিস্তান-প্রেমে বিভোর। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চাণক্য ও ম্যাকিয়াভেলির বিশ শতকীয় মিশ্র সংস্করণ—হেনরি কিসিঞ্জার একান্ত গোপন কূটনৈতিক চালে মগ্ন ছিলেন মাও সে-তুংয়ের চীনের সঙ্গে, যারা উঠতে-বসতে গালমন্দ পাড়ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আর তলে তলে ভিন্নতর আঁতাত গড়তে চেয়েছিল তাদেরই সঙ্গে। দুনিয়ার মানুষ তো দূরের কথা, তাবড় তাবড় সাংবাদিকেরাও ঘুণাক্ষরে অনুমান করতে পারেননি কী ঘটছে পর্দার আড়ালে। চীন-মার্কিন দূতিয়ালির দায়িত্ব পালন করছিলেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান।
এই যখন বিশ্ব পরিস্থিতি, তখন বাংলার দারিদ্র্যপীড়িত নিরন্ন জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক রায় নিয়ে আবির্ভূত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রক্তগঙ্গায় সেই আন্দোলনকে ভাসিয়ে দিতে যে ব্রতী হয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান, এর পেছনে মার্কিন সমর্থন ছিল স্বতঃসিদ্ধ। নিক্সন প্রশাসনের অবস্থানের কারণে অন্যান্য পশ্চিমা দেশও নিয়েছিল বশংবদের ভূমিকা। আর তৃতীয় দুনিয়ার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অধিকাংশ ছিল পশ্চিমা প্রভাববলয়ে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘জো হুজুর’ বলা ছাড়া তাদের আর করার বিশেষ কিছু ছিল না। আরব দুনিয়া তো মার্কিনদের করুণানির্ভর, তদুপরি ‘ইসলামি’ পাকিস্তান ভাঙার প্রচেষ্টায় ছিল নাখোশ। বাংলাদেশ আন্দোলনের পক্ষে তাই ছিল একমাত্র ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন গুটিকয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

২.
এমনই চরম বৈরী পটভূমিকায় বাংলাদেশের উজ্জ্বল উদ্ভাসন যে সম্ভব হয়েছিল, তার পেছনে আর কতক কার্যকারণের সঙ্গে সক্রিয় ছিল বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ও সমাজের অগ্রসর সংবেদনশীল অংশের বিপুল সমর্থন। আর তা রাজপথে আছড়ে পড়েছিল বিশাল সমুদ্রতরঙ্গের মতো, একের পর এক সৃষ্টি করছিল অভিঘাত এবং উপচে পড়েছিল শিল্পীর তুলিতে, কণ্ঠে, গানে-কবিতায়, আরও কত না রূপে। একাত্তরে বিশ্বজুড়ে জেগে ওঠা বাংলাদেশ-বন্দনার ছিল যে বিশালতা, তার পরিমাপ করাটাও দুঃসাধ্য, তবে সেই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আমরা অগণিত বিদেশীয় মিত্রের অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান সম্ভব করে তুলতে পারি, যা আমাদের নিজেদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এর একদিকে ছিল বড় মাপের অনেক ঘটনা, যেমন ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, যার ঐতিহাসিক প্রভাব আজও রয়েছে বহমান। আধুনিক সংগীত যে নিছক তরুণের অভিনব বিনোদন আয়োজন নয়, সমাজের কল্যাণব্রতের সঙ্গে তা নিবিড় সম্পৃক্তি রচনা করতে পারে, তা সেবারই প্রথম মহিমান্বিতভাবে প্রকাশ পেল। হালফিল তো ব্যান্ড এইড, আফ্রিকা এইড, হাঙ্গার এইড ইত্যাদি কত ধরনের কনসার্টই না আয়োজিত হচ্ছে, পপতারকা বব গেলডফ শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হলেন। আর একাত্তরে এই নতুন ধারার প্রবর্তক হয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এই একটি সংগীতানুষ্ঠানের বিবরণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ সম্ভব এবং সেটা সংগতও বটে। বব ডিলান যে দীর্ঘদিনের নিভৃতি ঘুচিয়ে সেই প্রথম আবার এলেন জনসমক্ষে, গাইলেন তাঁর বিখ্যাত গান, ‘ধেয়ে আসছে দারুণ বৃষ্টি’—সেসব তো আধুনিক গানের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। আরও ছিলেন কত না তারকা, এরিক ক্ল্যাপটন তো তখন এক উঠতি গায়ক, পরে যিনি অশেষ খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন, ডিজনি চলচ্চিত্রে গেয়েছেন গান। তেমনি বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাসিত কৃষ্ণকায় গায়ক বিলি প্রেস্টনের কথা, ছোটখাটো এই মানুষটির স্টেজ পারফরম্যান্স দেখতে হয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো, বড় কনসার্টে সর্বশেষ গান করেছিলেন ২০০৮ সালে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে নেলসন ম্যান্ডেলার ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এবং চলতি বছর হয়েছেন প্রয়াত।
তবে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আলাদা ছিল না উডস্টক ফেস্টিভাল থেকে, যখন নতুন এক তরুণসমাজের আবির্ভাবে হকচকিত হয়ে পড়েছিল পশ্চিমা দুনিয়া। এই তরুণেরা প্রত্যাখ্যানের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তাদের অগ্রজদের দিকে এবং বিশাল বুক পেতে বরণ করতে চাইছিল বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষদের, আর তাই তো তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে জন্ম দিয়েছিল অমন ব্যাপক আন্দোলনের, সৃষ্টি করেছিল পশ্চিম দুনিয়া কাঁপানো ১৯৬৮।
ফলে একাত্তরে যখন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম শুরু হলো, তখন ক্ষমতাধর পশ্চিমা বিশ্ব ছিল এক অবস্থানে আর পশ্চিমা সমাজ, বিশেষভাবে নবজাগ্রত তরুণেরা, ছিল আরেক অবস্থানে। সে কারণেই বাংলাদেশের সংগ্রামের ন্যায্যতা ও মানবিকতার উপাদান অমন বিপুল আলোড়ন তুলতে পেরেছিল দেশে দেশে, হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল রাজপথে, আন্দোলনে এবং কতভাবেই না তারা প্রকাশ করেছে সংহতি। এই বিশাল আন্দোলনের হদিস গ্রহণ এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হয়ে আছে বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব।

৩.
বাংলাদেশের প্রতি সংহতি আন্দোলনের মোটা দাগের পরিচয় হয়তো আমরা জানি, তবে তারও পরতে পরতে মিশে আছে আরও অনেক ছোট-বড় ঘটনা; তাৎপর্যে যা মোটেই ছোট নয়। এবং এর বাইরে অজানার আড়ালে রয়েছে যেসব ঘটনা বা অবদান, সেসব কথাও তো আমাদের জানতে হবে। স্বল্পজ্ঞাত কিন্তু তাৎপর্যময় দু-একটি ঘটনার উল্লেখ এখানে না করলেই নয়। বাংলাদেশ যে কতভাবে কতজনের কাছে ঋণী, তা বোঝা যাবে আজকের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশন, সেদিনের বোম্বের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল বা ভিটি রেলস্টেশনের সামনে, একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত এক ঘটনায়। স্টেশনের খেটে খাওয়া বুট পালিশ বালকের দল সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের এক দিনের রোজগার তুলে দেবে মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ-সহায়ক সমিতির হাতে। তারা সবাই মিলে তুলেছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ।
বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্রের প্রধান নির্বাহী সকালে জুতা পালিশ করিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন অর্থ সংগ্রহ অভিযানের। বুট পালিশ বালকদের এই পরম ভালোবাসার অর্ঘ্যদানের বার্তা শুনে বিশেষ আলোড়িত হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন গভর্নর আলী ইয়ার জং। হায়দরাবাদের নিজাম-পরিবারের এই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ-আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভারতের অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যা এক ব্যতিক্রম। এক বিকেলে তিনি বুট পালিশ বালকদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মালাবার হিলের শ্বেতপ্রাসাদে, গভর্নরের ভবনে। এভাবে বুট পালিশ বালকদের কাছে গভর্নর পরিশোধ করেছিলেন তাঁর ঋণ, তবে বাংলাদেশের ঋণ শোধ বুঝি এখনো বাকি রয়ে গেছে।

৪.
নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন টিয়ার্স’, বোম্বের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিংস্ অ্যান্ড ফায়ার কনসার্ট’ ইত্যাদি বড় মাপের আয়োজনের কথা জানা হলেও প্রায় অজ্ঞাত রয়ে গেছেন লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা। বাংলাদেশের সংগ্রামী বার্তা পেয়ে বিচলিত এই তরুণ লিখেছিলেন দুটি গান, বন্ধুদের নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছোট এক স্টুডিও থেকে এই গানের ৪৮ আরপিএমের রেকর্ডও বের করেছিলেন। মামুলি একরঙা মোড়কে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাণীসংবলিত করে দীনহীনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল রেকর্ড। একটি গানের কথা ছিল, ‘ইন দ্য নেম অব হিউম্যানিটি/ ডোন্ট অ্যালাউ বাংলাদেশ টু ফাইট অ্যালোন।’ কথা ও সুর যে খুব উঁচুমানের, তা হয়তো বলা যাবে না; কিন্তু অনুভব করা যায় প্রাণের আবেগ। লি ব্রেনান ঝোলায় রেকর্ড নিয়ে গিটার বাজিয়ে এই গান গেয়ে বেড়াতেন শহরের এক পানশালা থেকে আরেক পানশালায়, রেকর্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশের জন্য।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তিনি নিশ্চয়ই হয়েছিলেন আমাদের মতোই উল্লসিত, তারপর কোথায় হারিয়ে গেছেন এই যুবক, তাঁর গানের একটি ছোট্ট রেকর্ড কেবল রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে, সেই গান শোনার অবকাশ বাংলাদেশের কবে হবে কে জানে!

৫.
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বহু ধরনের মানুষ বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁদের একজন ছিলেন জঁ ইউজিন পল কে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই ফরাসি লেখক জীবনে বিবিধ অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিলেন, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও ছিলেন বিচিত্রমুখী। গোড়াতে তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য, তারপর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যোগ দেন কুখ্যাত ওএএসে; যে গোপন বাহিনী মনে করত আলজেরিয়া হচ্ছে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কখনো হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না। আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে বোধোদয় হয় পল কের। তিনি ওএএস ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন বিশ্বপথিক। তবে পুরোনো মতাদর্শের জের একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। স্পেন, লিবিয়া ও বায়াফ্রায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে যান।
একাত্তর সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল। এরপর আঁদ্রে মালরো যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার ব্রত ঘোষণা করেন, তখন গুরুবাক্যে বিশেষ অনুপ্রাণিত বোধ করেন পল কে। ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে ব্যাগে বোমা নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭১১ বিমানটি দখল করতে সমর্থ হন। তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা বৈদ্যুতিক তার জানান দিয়েছিল ভেতরে বহন করা বোমার। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য জরুরি ওষুধ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ওষুধের কার্টন বোঝাই করবার অজুহাতে পুলিশ বিমানে ঢুকে তাঁকে পরাভূত করতে সমর্থ হয়। ব্যাগ খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কতক বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার।
এই ঘটনার পরপরই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই ডামাডোলে হারিয়ে গেল পল কে-র ঘটনা। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা চলেছিল বেশ কিছুকাল। আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আঁদ্রে মালরো স্বয়ং। অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া পল কে আবারও ঘুরে ফিরেছেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। ১৯৮১ সালে তাঁকে দেখা গিয়েছিল হিমালয় এলাকায় তপস্যারত, এরপর কিছুকাল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে আবারও তাঁকে দেখা গেল কলকাতায়, সেখানে জননিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগে কিছুদিন কাটান কারাগারে। ভারত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ১৯৮৫ সালে তিনি যান ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এরপর তাঁর আর খোঁজ মেলেনি।
পল কে ও বাংলাদেশ আলাদা হয়ে গেছে সেই একাত্তরে, আবার কি কখনো হবে তাদের দেখা? কে জানে!
মফিদুল হক: লেখক; মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি।
original postJustify Full
read more

মুক্তিযুদ্ধে ভিনদেশী বন্ধুদের তিনটি অজানা গল্প শুনুন

by কাঊসার রুশো


বাংলাদেশের প্রতি সংহতি আন্দোলনের মোটা দাগের পরিচয় হয়তো আমরা জানি, তবে তারও পরতে পরতে মিশে আছে আরও অনেক ছোট-বড় ঘটনা; তাৎপর্যে যা মোটেই ছোট নয় এমনই তিনটি গল্প নিয়ে এ আয়োজন

১.ভারতের বুট- পালিশ বালকদের একদিনের উপার্জন বাংলার মানুষের জন্য

(ছবিটি সামু ব্লগার এ. এস. এম. রাহাত খান এর সৌজন্যে)

আজকের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশন, সেদিনের বোম্বের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল বা ভিটি রেলস্টেশনের সামনে, একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে স্টেশনের খেটে খাওয়া বুট পালিশ বালকের দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের এক দিনের রোজগার তুলে দেবে মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ-সহায়ক সমিতির হাতে তারা সবাই মিলে তুলেছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্রের প্রধান নির্বাহী সকালে জুতা পালিশ করিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন অর্থ সংগ্রহ অভিযানের বুট পালিশ বালকদের এই পরম ভালোবাসার অর্ঘ্যদানের বার্তা শুনে বিশেষ আলোড়িত হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন গভর্নর আলী ইয়ার জং হায়দরাবাদের নিজাম-পরিবারের এই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ-আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভারতের অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যা এক ব্যতিক্রম এক বিকেলে তিনি বুট পালিশ বালকদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মালাবার হিলের শ্বেতপ্রাসাদে, গভর্নরের ভবনে

২.লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা
নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন টিয়ার্স’, বোম্বের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিংস্ অ্যান্ড ফায়ার কনসার্ট’ ইত্যাদি বড় মাপের আয়োজনের কথা জানা হলেও প্রায় অজ্ঞাত রয়ে গেছেন লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা। বাংলাদেশের সংগ্রামী বার্তা পেয়ে বিচলিত এই তরুণ লিখেছিলেন দুটি গান, বন্ধুদের নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছোট এক স্টুডিও থেকে এই গানের ৪৮ আরপিএমের রেকর্ডও বের করেছিলেন মামুলি একরঙা মোড়কে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাণীসংবলিত করে দীনহীনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল রেকর্ড একটি গানের কথা ছিল, ‘ইন দ্য নেম অব হিউম্যানিটি/ ডোন্ট অ্যালাউ বাংলাদেশ টু ফাইট অ্যালোন।’ কথা ও সুর যে খুব উঁচুমানের, তা হয়তো বলা যাবে না; কিন্তু অনুভব করা যায় প্রাণের আবেগ লি ব্রেনান ঝোলায় রেকর্ড নিয়ে গিটার বাজিয়ে এই গান গেয়ে বেড়াতেন শহরের এক পানশালা থেকে আরেক পানশালায়, রেকর্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশের জন্য
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তিনি নিশ্চয়ই হয়েছিলেন আমাদের মতোই উল্লসিত, তারপর কোথায় হারিয়ে গেছেন এই যুবক, তাঁর গানের একটি ছোট্ট রেকর্ড কেবল রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে

৩.এবং একজন জঁ ইউজিন পল কে
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বহু ধরনের মানুষ বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁদের একজন ছিলেন জঁ ইউজিন পল কে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই ফরাসি লেখক জীবনে বিবিধ অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিলেন, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও ছিলেন বিচিত্রমুখী গোড়াতে তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য, তারপর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যোগ দেন কুখ্যাত ওএএসে; যে গোপন বাহিনী মনে করত আলজেরিয়া হচ্ছে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কখনো হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে বোধোদয় হয় পল কের তিনি ওএএস ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন বিশ্বপথিক তবে পুরোনো মতাদর্শের জের একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেন না স্পেন, লিবিয়া ও বায়াফ্রায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে যান
একাত্তর সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল এরপর আঁদ্রে মালরো যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার ব্রত ঘোষণা করেন, তখন গুরুবাক্যে বিশেষ অনুপ্রাণিত বোধ করেন পল কে ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে ব্যাগে বোমা নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭১১ বিমানটি দখল করতে সমর্থ হন। তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা বৈদ্যুতিক তার জানান দিয়েছিল ভেতরে বহন করা বোমার তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য জরুরি ওষুধ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন কয়েক ঘণ্টা পর ওষুধের কার্টন বোঝাই করবার অজুহাতে পুলিশ বিমানে ঢুকে তাঁকে পরাভূত করতে সমর্থ হয় ব্যাগ খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কতক বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার
এই ঘটনার পরপরই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ সেই ডামাডোলে হারিয়ে গেল পল কে-র ঘটনা অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা চলেছিল বেশ কিছুকাল আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আঁদ্রে মালরো স্বয়ং অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া পল কে আবারও ঘুরে ফিরেছেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে ১৯৮১ সালে তাঁকে দেখা গিয়েছিল হিমালয় এলাকায় তপস্যারত, এরপর কিছুকাল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে আবারও তাঁকে দেখা গেল কলকাতায়, সেখানে জননিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগে কিছুদিন কাটান কারাগারে ভারত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ১৯৮৫ সালে তিনি যান ওয়েস্ট ইন্ডিজে এরপর তাঁর আর খোঁজ মেলেনি
original post
read more

একজন অপ্রচারিত নায়ক

by আমার নাম নাই
আপনারা কি রিয়ার এডমিরাল (অবঃ) মোশারফ হোসেন খান কে চেনেন? না চেনাটাই স্বাভাবিক। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অপ্রচারিত নায়ক। বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেঃ মতিউর রহমানের কথা আমরা সবাই জানি। তিনি পাকিস্তানী যুদ্ধ বিমান নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা কয়জন জানি যে আরেক জন বীর ছিলেন যিনি একটি পুরো সাবমেরিন দখল করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন?

১৯৭১ সালে ফ্রান্সের উপকূলীয় শহর তুলুনে পাকিস্তানের একটি সাবমেরিনে ততকালীন লেঃ কমান্ডার মোশারফ হোসেন সহ বাংলাদেশের মোট ১১ জন নাবিক প্রশিক্ষনরত ছিলেন। লেঃ কমান্ডার মোশারফ হোসেন এবং অপর ৮ জন বাংলাদেশী নাবিক সিদ্ধান্ত নেন সাবমেরিনটি তারা নিয়ন্ত্রনে নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য, তাদের এই দুসাহসী পরিকল্পনার কথা পাকিস্তানীদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। জীবন রক্ষার তাগীদে তাদেরকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পালিয়ে আসতে হয়। কিন্তু তাদের সাথে ১ জন বাংলাদেশী নাবিক পালিয়ে আসতে পারেননি, পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন তিনি। জেনেভায় তারা ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করেন।

ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় তারা ৯ এপ্রিল ১৯৭১ নয়া দিল্লি এসে পৌছান। এখানে এসে লেঃ কমান্ডার মোশারফ হোসেন একটি বিশেষ গোপনীয় (Top Secret) নৌ কমান্ডো প্রশিক্ষন পরিচালনা শুরু করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ জন প্রশিক্ষন শুরু করলেও পরবর্তীতে সর্বমোট ৪৯৯ জনকে প্রশিক্ষন প্রদান করা হয়।

লেঃ কমান্ডার মোশারফ হোসেনের প্রশিক্ষিত এই বাহিনী ১৬ আগষ্ট ১৯৭১ চট্টগ্রাম, মংলা, নারায়রগঞ্জ ও চাঁদপুরে যুগপদ ভাবে পাকস্তানী সরবরাহ জাহাজ সমূহে সফলভাবে মাইন হামলা করে। ঐতিহাসিক এই হামলাটি “অপারেশন জ্যাকপট” নামে পরিচিত।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লেঃ কমান্ডার মোশারফ হোসেন কে বীর উত্তম খেতাবে ভূসীত করা হয়। তিনি বাংলাদেশ নৌ বাহিনীতে দীর্ঘ সময় অবদান রেখে রিয়ার এডমিরাল পদে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বর্তমান সরকার এই বীর মুক্তিযোদ্ধার খেতাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
read more

অপারেশন জ্যাকপট ও একজন নৌকমান্ডো

by অমিয় উজ্‌জ্‌বল

খবরটা শুনে ফজু মিয়ার মেজাজ চরম খারাপ । ‘ঢাকা শহর মেলেটারীরা গোরস্তান বানাইয়া ফালাইছে’। ফজু মিয়া আখাউড়া রেল স্টেশনের কুলি। মাল টানা ছাড়া তার আর কোন কাজ নেই। নেহায়েত নিরীহ এই মানুষটার শরীরে আগুন ধরে গেছে। কেন ধরেছে সে নিজেও জানেনা। শুধু মনে হচ্ছে “শরীল থেইক্কা রক্ত ফুইট্টা বাইরাইতাছে”।
ফজু মিয়া যুদ্ধে যায়। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মেজর শফিউল্লাহর সামনে । নৌ কমান্ড দল গঠন হবে। সুইসাইডাল স্কোয়াড।ফজু মিয়া রাজি।
পেছনের কথাঃ মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আনতর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধানত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান। এরা হলেন
১. মোঃ রহমতউল্লাহ।
২. মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন।
৩. মোঃ শেখ আমানউল্লাহ।
৪. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
৫. মোঃ আহসানউল্লাহ।
৬. মোঃ আবদুর রকিব মিয়া।
৭. মো আবদুর রহমান আবেদ।
৮. মোঃ বদিউল আলম।
তারপর উক্ত ৮জনের সাথে আরো কয়েকজনকে একত্র করে ২০ জনের একটি গেরিলা দল গঠন করে তাদের ভারতে বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। তারপর দেশে আসলে তাদের সাথে কর্নেল ওসমানীর দেখা করানো হয়। তখন ওসমানী নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধানত নেন।
নৌকমান্ডো ফজু মিয়া ঃ ফজু মিয়া নৌ কমান্ডো দলে নাম লেখান। আখাউড়া রেল স্টেশনের মালটানা কুলি ফজুমিয়া এখন নৌ কমান্ডো। তাকে নেওয়া হলো পলাশী, ভাগিরথী নদীর তীরে। প্রতিদিন আঠারো ঘন্টা পানিতে ডুবে ট্রেনিং চলে। আখাওড়া বিলে কত সাঁতরেছে ফজু মিয়া! পাল্লা দিয়ে তিতাস এপার ওপার করেছে। এখন দেশের জন্য তার জল বিহার। ফজু মিয়ার জীবন এখন বাজির তাশ। পেটে লিমপেট মাইন, কোমওে ছুরি, মুখে জয় বাঙলা। “আমরা মরবার লাইগ্গাই তো আইছি” ফজু মিয়া বলে। ভারতীয় প্রশিক্ষকের চোখে পানি চলে আসে “হায়, ভগবান এদেও কি ধাতু দিয়ে গড়েছে”!
ট্রেনিং পর্বঃ নৌ-কমান্ডোদের ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার লেঃ কমান্ডার জি এম মার্টিস। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাব-মেরিনার ছাড়াও আরো ছিলেন মিঃ গুপ্ত, পি কে ভট্টাচার্য, কে সিং, এল সিং, মারাঠি নানা বুজ এবং সমীর কুমার দাশসহ আরো কয়েকজন।
ট্রেনিং শুরু হবার আগেই বাছাইকরা যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ হবে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেকের ছবি সহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।সেখানে লেখা থাকতো যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।


প্রায় টানা দু'মাস ট্রেনিঙের পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়।

অপারশনে জ্যাকপটঃ
প্রশিক্ষণ শেষের দিকে। আক্রমনের পরিকল্পনা সাজানো হতে থাকে। একই সাথে একই সময়ে দুই সমুদ্র বন্দর ও দুই নদী বন্দরে আক্রমন চালানোর পরিকল্পনা হয়। ৬০ জনের ২টি দল এবং ২০ জনের আরো ২টি দল। চারটি দলের চারজন লিডার ঠিক করা হল। টিম লিডারদের অপারেশন পরিচালনার জন্য শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ পদ্ধতি যা টিমের অন্যান্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। দুটি পুরোনো দিনের বাংলা গানকে সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গানদুটি ও তাদের সঙ্কেত হলোঃ-

১. আমি তোমায যত শুনিয়েছিলাম গান,তার বদলে চাইনি প্রতিদান......। এটি হবে প্রথম সঙ্কেত, এর অর্থ হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২য় গান প্রচার হবে। এর মধ্যে আক্রমনের সকল প্রসতুতি সম্পন্ন কর।

২. আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি......। এটি ২য় এবং চূড়ানত সঙ্কেত। অর্থাৎ এরপর যে ভাবেই হোক আক্রমণ করতে হবে।
যাত্রা শুরুঃ পলাশির হরিনা ক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু । পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধানত হয়েছিল, তারা একযোগে পৌছে যাবেন স্ব স্ব এলাকা চট্টগ্রাম,খুলনা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ। তাদেরকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক নৌ-কমান্ডোকে একটি করে লিমপেট মাইন,ছুরি,একজোড়া সাঁতারের ফিন আর কিছু শুকনো খাবার। প্রতি তিন জনের জন্য একটি করে স্টেনগান এবং গ্রুপ লিডারদের একটি করে ট্রানজিস্টার। অপারেশনের দিন ধার্য করা হয়েছিল ১৪ আগস্ট অর্থাৎ পাকিসতানের স্বাধীনতা দিবস। তবে সূদূর পলাশী থেকে গন্তব্যস্থলে পৌছাতে বা পথের নানা প্রতিবন্ধকতা কারণে এসব অভিযান দু'এক দিন বিলম্ব হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে। এ সফল অপারেশনে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ এবং একটি সোমালি জাহাজসহ আরো অনেকগুলো জাহাজ ধ্বংস হয। ১৬ আগস্ট একই সাথে মংলা বন্দরেও অপারেশন হয। এ অপারেশনে তারা বন্দরে অবস্থানরত ২টি মারাঠি, ২টি চীনা, ১টি জাপানী ও ১টি পাকিস্তানি অর্থাৎ মোট ৬টি জাহাজ এবং আরো কিছু নৌযান ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন।১৫ আগস্টের ঐ অপারেশন গুলোতেই প্রায ২৬টি জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয এবং আরো অনেক নৌযান ক্ষতিগ্রস্থ হয। বলা যায় পাকিস্তানীদের কোমর ভেঙ্গে যায়, আত্ম বিশ্বাসে চিড় ধরে। তাছাড়া ধ্বংসের তালিকায় বেশ কয়েকটি বিদেশী জাহাজ থাকায় আন্তজার্তিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা ছড়িয়ে পড়ে।
এবং একজন ডাক্তারঃ এই ঘটনার চল্লিশ বছর পর ডিসেম্বর মাসে এক ডাক্তার যায় নৌ কমান্ডো ফজলুর রহমান ভুঁইয়ার বাড়িতে। বাড়ি বলা যাবে কি? সরকারি খাস জায়গা, একটা পুকুরের বর্ধিত পাড়ে কোন রকম একটা ঘর। ডাক্তার সাহেব ঢাকায় থাকেন। পেপার টেপারেও লেখেন। নাটক টাটক ও করেন। সব মিলিয়ে এক উদ্ভট মানুষ। ডাক্তার একটা ক্যাম কর্ডার নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য একটা ইন্টারভিউ নেবেন। ভিডিও করবেন তার কথা। ফজলুর রহমান কথা বলেন। বলতে বলতে কাঁদেন, কখনো ফোঁসেন। তার সহযোদ্ধাদের কিভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সাবেক এক মন্ত্রী , সেই কাহিনী বললেন। বলতে বলতে দুটো অশ্লীল গালি দেন। ডাক্তার ফজলুর রহমানকে আরো উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন। ডাক্তার চালু মানুষ, তিনি জানেন উত্তেজনা ছাড়া বিষয়টা জমবেনা। “এই যে যুদ্ধ করলেন,কি পাইলেন? দেশ স্বাধীন করলেন অথচ এখন এই বয়সে ও আপনে ঠেলা গাড়ি চালান, পুকুর পাড়ে ভাঙ্গা ঘরে থাকেন”। ফজলুর রহমান , নৌ কমান্ডো, ভাবলেশ হীন।“ বিল্ডিং দেওনের লাইগ্গা তো আর দেশ স্বাধীন করি নাই। আমরা আসিলাম সুইসাইড টিম। মরনের লাইগ্গা যুদ্ধ করছি। বাইচ্চা যে রইছি , স্বাধীন দেশটারে দেখলাম, এইডাইতো বেশী”। ডাক্তার হতবুদ্ধি হন,মানুষটা বলে কি? চোখে পানি চলে আসে, এই ফজলুর রহমানরা কি ধাতু দিয়ে তৈরী কে জানে?
original post
read more

Wednesday, January 4, 2012

এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দিনপঞ্জির পাতা থেকে...

by অদিতি ফাল্গুনী


মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং, ১৯৭১; ছবি. উইকিপিডিয়া

গল্পের লোভে মাঝে মাঝেই আমি এদিক ওদিক ঘুরি। নানা মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করি। মূলতঃ এই গল্প খোঁজার লোভ থেকেই ঢাকার মোহাম্মদপুর কলেজ গেট সংলগ্ন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ গত বছর দশেক ধরে আমার ঘোরাঘুরি। কখনো টানা ঘোরা, আবার কখনো লম্বা সময়ের বিরতিতে যাওয়া। শুধু বিশ্রামাগার নয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বারান্দা বা করিডোরেও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা হয়েছে প্রচুর। ২০০০ সালে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ হুইল চেয়ার বন্দি বীরপ্রতীক মোদাস্বার হোসেন মধুর সাথে আমার পরিচয়। কথায় কথায় দেখলাম স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেটের হিসেবে এই ‘স্বল্পশিক্ষিত’ মানুষটির স্বচ্ছ রাজনৈতিক চিন্তার বিন্যাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, তেমনি রয়েছে ক্ষোভ। কিম্বা, বঙ্গবন্ধুর চেয়েও ‘মুজিব বাহিনী’র কেষ্ট-বিষ্টুদের প্রতিই এই ক্ষোভটা যেন বেশি। মধু, যিনি একাত্তরের যুদ্ধে প্রাক-পঁচিশেই সারাজীবনের মতো চলৎশক্তি হারিয়েছেন, তিনি একদিন আমার হাতে তুলে দিলেন একটি সাদা কাগজের সেলাই করা খাতায় বেশ কিছু পাতা লেখা। মধুর চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের পরবর্তী কয়েক বছরের ইতিহাস।
—————————————————————–
“হঠাৎ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলে উঠলেন, ‘এ্যাটেনশন প্লিজ!’ সকলের দৃষ্টি ও কান চলে যায় রাষ্ট্রপতির দিকে। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা মন দিয়ে শুনুন। আমি শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করব। কমিটিতে পুঁজির দরকার।… প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান সর্বপ্রথম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে তাঁর এক মাসের বেতন দান করেন।… ক্ষোভে-দুঃখে তখন শুধু পাশে বসা বন্ধু নূরুল আমিনের হাতটা চেপে ধরে শরীরের রাগ মেটালাম। রাজাকারের প্রথম সাহায্যে গঠিত হল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি।” / মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক
—————————————————————-
ফটোকপি করলাম। প্রচুর বানান ভুল। কাঁচা হাতের অক্ষর। তবু, মুক্তিযুদ্ধের অনেক না-বলা কথা আছে তাঁর এই লেখায়। তারপর… তারপর মধ্যবিত্ত জীবনের দৌড়, কর্মব্যস্ততা ও মধুকে আমার ভুলে যাওয়া! মধুর ঐ লেখা আমার কাছে ফাইলবন্দিই হয়ে রইলো। প্রায় বছর দশেক পরে গত বছরের শুরুতে আবার যখন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ বিশ্রামাগার’-এ গেলাম, মধুর সহযোদ্ধারা জানালেন মধু মারা গেছেন (এর ভেতর আরো দু/তিন বার গেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়গুলোয় প্রতিবারই গিয়ে শুনেছি যে মধু ক’দিনের জন্য দেশের বাড়ি গেছেন)। মধুর স্ত্রী ছিল জানতাম। তার ছেলে-মেয়ে ক’জন জিজ্ঞাসা করতে গেলে অপর এক হুইল-চেয়ারবন্দি সহযোদ্ধা খুব নির্বিকার ভাবে জানালেন, ‘বিয়া তো করিছিল শেষের দিকি দেশের বাড়ির ঘর দেখা-শুনা করতি আর নিজির কিছু সেবা-যত্নির জন্যি। মাঝে মাঝে দেশের বাড়ি গেলি পর সেবা করার লোক লাগে না? ছেলে-মেয়ে হবি কীভাবে? যুদ্ধে ওর পায়ের মতো পেনিসও উড়ি গিছিল!’ চমকে উঠলাম। মধুর এই কয়েক পাতার অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে মরিয়া হয়ে দেখা করা কিছু তরুণ মুক্তিযোদ্ধার ভেতর জনৈক তরুণের হঠাৎই নিজের হাতে ট্রাউজার ও অন্তর্বাস খুলে হারিয়ে যাওয়া পৌরুষের জন্য হাহাকার করার বেদনার কথা লেখা আছে। বঙ্গবন্ধু তখন দু’হাতে চোখ চাপা দিয়েছিলেন। মধুর হাতে লেখা দিনপঞ্জির পাতায় আবার চোখ বুলাই। হ্যাঁ, যুদ্ধে যে ‘পুরুষত্ব’ হারিয়েছেন সেকথা তিনি নিজেও লিখেছেন।

madhu_4.jpg…….
মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের ডায়েরির একটি পাতা
…….
যাহোক, মধুর মৃত্যুর কথা জেনে ভয়ানক খারাপ লাগলো। এর পরপরই ২০০৯-এর মার্চ থেকে এপ্রিল মাস জুড়ে আমি প্রায় কুড়ি/একুশ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। আলোকচিত্রও তুলি। কিন্তু, প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরাটা হারিয়ে যায়। এর পর আর একটি ডিজিটাল ক্যামেরা কিনে ছবি তুলি। এবার ভাইরাস আক্রমণ। যাহোক, অল্প-স্বল্প কিছু ছবি এখনো আছে। কিন্তু, মধুর ছবিই তো নেই। এই সব আহত বীর যোদ্ধাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি যে সতেরো থেকে পঁচিশের ভেতর হাত, পা, চোখ, কাণ, শিরদাঁড়া তো বটেই… অনেকেই তাদের ‘মেল-অর্গ্যান’ও হারিয়েছেন। এই যে আমি শব্দটি বাংলায় না লিখে ইংরেজিতে লিখলাম, এর কারণ হলো শৈশব থেকে যে ‘রাবীন্দ্রিক’, ‘পিউরিটান’ ও রীতিমতো ‘ভিক্টোরিয়’ শুচিতা-শ্লীলতাবোধে বাঙালী মধ্যবিত্ত বিশেষতঃ বাঙালী মধ্যবিত্ত নারীকে বড় করে তোলা হয়, সেই শিক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে একজন নারী লেখক কিছুতেই খুব কড়া সত্যকেও কড়া করে অনেক সময়ই বলতে পারেন না। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে আপনার-আমার মতো মধ্যবিত্ত অংশগ্রহণ করেছেন খুব কম সংখ্যায়। সমাজের নিম্নবর্গের মানুষই অংশ নিয়েছেন বেশি। ফলে, এই প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ মানুষগুলো… আমি তাদের বিপরীত লিঙ্গের ও বয়সে অনেক ছোট একজন হওয়া সত্ত্বেও… আমাকে ‘মা’ সম্বোধন করেও তারা কোনো রাখ-ঢাক না করেই বলেছেন যুদ্ধে তাদের ‘শিশ্ন’ হারানোর কথা। খুব অকপটভাবে। শ্লীলতা-শুচিতা বোধের কোনো রাখ-ঢাক বা মধ্যবিত্ত ভণিতা ছাড়াই। আমার সো-কল্ড শ্লীলতাবোধ যে অনেক বেশি অশ্লীল, তাও আমি এঁদের কাছ থেকেই শিখলাম। এই ভয়াবহ ইতিহাস শুনতে শুনতে আমার এমনও মনে হয়েছে যে মুক্তিযুদ্ধে শুধুই নারীর আব্রু হারানোর কথা আমরা পড়েছি এতদিন। পুরুষ যে তার ‘পুরুষত্ব’ হারিয়েছে, সেই ইতিহাসও কি ‘পুরুষতন্ত্র’ই আলোতে আসতে দেয় নি এতদিন? কারণ, নারী তো এমন এক ‘বস্তু’ যার নিগ্রহ বা অবমাননা খুব সহজ ও সম্ভব। কিন্তু, পুরুষ যখন ‘পুরুষত্ব’ হারায়, তখন সেই আখ্যান অন্য পুরুষ কি লিখতে পারে না পুরুষের ভাবমূর্তির অবনমনের ভয়ে?

‘মধু’র আত্মজীবনী কিছুটা সংশোধন ও পরিমার্জনা সাপেক্ষে দেওয়া হলো।

সঙ্কলন ও ভূমিকা: অদিতি ফাল্গুনী


বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’ গঠনের মূল ইতিহাস
মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক

১. মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের ইতিবৃত্ত

১৯৭২ ইং সালের ১০ই জানুয়ারী মাতৃভূমি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য কারা বরণ শেষে বাংলার মাটিতে পা রাখার সাথে সাথেই এক শ্রেণীর কুচক্রী রাজনীতিবিদ সহ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বড় ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুর সরলতার সুযোগে তাঁকে কান কথায় ভুলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবার জোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু বাংলার নয়নমণি, স্বাধীন বাংলার স্থপতি ভুল পথে অগ্রসর হননি। বিশাল দেহ ও মনের অধিকারী জাতির পিতা বাঙালী মনে করে পিস কমিটির চেয়ারম্যান, মেম্বার, দালাল, রাজাকার ও আলবদরদের সাধারণ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তবে, তিনি যদি বড় ভাইদের স্বার্থপর কথাগুলো না শুনে রাজাকার আলবদর ও দালালদের নির্যাতন করার কথা শুনতেন, তাঁর হাজার সন্তানের শাহাদাত বরণ ও পঙ্গুত্ব বরণের কথা শুনতেন, তবে কোনদিন তিনি সাধারণ ক্ষমার কথা মুখে উচ্চারণই করতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে পা রাখার পর থেকেই মুজিব বাহিনীর বড় ভাইয়েরা শুধু এটাই তাঁকে বলেছে যে, ‘আপনার নামে বাহিনী তৈরি করে আমরা যুদ্ধ করে বাংলা মা’কে স্বাধীন করেছি।’ ১৯৭২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শুধু মুজিব বাহিনী বলে খ্যাত যোদ্ধাদের কথাই শুনেছেন। অথচ, তাঁর নির্দেশ পেয়ে সর্বপ্রথম বাংলার যে সব কুলি, মজুর, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতীর সন্তান ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেছে, শাহাদাত বরণ করেছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, তাঁদের কথা তাঁর কর্ণ পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। যদি করত তবে তাঁর সেই সব সন্তানেরা কোন দিন বাংলার মানুষের নিকট আবর্জনা হয়ে বেঁচে থাকত না।


যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের রোগ মুক্তি বিশ্রামাগার, কলেজগেট, ঢাকা

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার কিছুদিন পর মোহাম্মদপুরের এক সমাজ সেবক শ্রদ্ধেয় মৃত নজরুল ইসলাম চাচা বঙ্গবন্ধুকে সেই বীরঙ্গনাদের (মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অবস্থানকারী) কথা জানালে চুপিচুপি বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধেয় মৃত নজরুল ইসলামের সাথে বাবর রোডে বীরাঙ্গনাদের দেখতে আসেন। এবং তাদের টাকাসহ জামাকাপড় ও কম্বল প্রদান করেন। প্রতিটি বীরঙ্গনার মাথায় হাত দিয়ে ‘মা’ বলে ডাক দিয়ে তিনি তাঁদের সান্তনা দিয়েছিলেন। বাবর রোড থেকে ফেরার সময় শ্রদ্ধেয় নজরুল চাচা মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটে অবস্থানরত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন যে কলেজ গেটে বেশ কিছু পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করেছন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার বিবরণ নজরুল চাচা বঙ্গবন্ধুকে শোনালেও তিনি তখনকার পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং বর্তমানের ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামগার’-এ যান নি। একটা চিরন্তন সত্য কথা হলো এই যে যোদ্ধা যদি যুদ্ধ করেন তবে তাঁকে শাহাদাত বরণ থেকে শুরু করে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবেই। খাঁটি যোদ্ধাদের মধ্যে অন্ততঃ ১% পার্সেন্ট হলেও যুদ্ধে শাহাদাত বরণ অথবা পঙ্গুত্ত্ব বরণ করবেই। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট পর্যন্ত এখনও কোন শহীদ অথবা পঙ্গু মুজিব বাহিনী খুঁজে পাই নাই। নাই। তাহলে কি এতে করে প্রমাণ হয় না যে মুজিব বাহিনীর ভাইয়েরা কতটুকু যুদ্ধ করেছেন? এবং আদৌ করেছেন কিনা? তার পরেও উক্ত বাহিনীর বড় ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুকে শুধু ‘মুজিব বাহিনী’র ধারণাই দিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সহ আর কোন বাহিনীর কথা তিনি শোনেননি। জানেননি। কিন্তু যখন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও বিশ্রামাগারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা হুইল চেয়ার ক্রাচ নিয়ে পঙ্গু অবস্থায় পিতার সাথে দেখা করার জন্য ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে তাঁর বাসস্থান ও গণভবনে যাতায়াত শুরু করল, তাঁকে সময় সুযোগ বুঝে বিরাক্ত করতে লাগল, তখনি তিনি ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের সম্বন্ধে অবগত হতে লাগলেন।

একদিনের কথা। বঙ্গবন্ধুর গাড়ির চালক ফকিরদ্দীন (আমার সেসময়ের বন্ধু; বর্তমানে ফইক্কা পাগল) একদিন আমাকে গোপনে খবর দিল যে আজ বিকাল ৩:০০ টা হতে ৪:০০ টা নাগাদি বঙ্গবন্ধু গণভবনে নারকেল গাছ লাগাবেন। খবরটা পেয়ে আমি মোদাস্বার হোসেন মধু বীরপ্রতীক, কুমিল্লার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক, নোয়াখালীর নুরুল আমিন বীরপ্রতীক ও সিলেটের মো. আদূর রহমান তাঁর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। রহমান ছাড়া আমরা তিনজনই হুইল চেয়ারে চলাচল করি। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক জান্তা বাহিনীর গুলিতে চির জনমের মত পঙ্গু হয়ে পুরুষত্ত্ব পর্যন্ত হারিয়েছি। আর রহমান? গুলি লেগে তার পুরুষাঙ্গের অংশ বিশেষসহ ১টি অণ্ডকোষ পর্যন্ত উড়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু প্রস্তুতি নিচ্ছেন নারকেল গাছ লাগানোর। এমন মুহূর্তে আমরা ৪ জন এক সাথে গণভবনে প্রবেশ করতে গেলে নূর ইসলাম নামে একজন সাধারণ প্রহরী আমাদের বাধা প্রদান করতে উদ্যত হয়। বন্ধু নূরুল আমিন বীর প্রতীক (মৃত) নূর ইসলামকে লাল চোখে ধমক দিয়ে ওঠে, ‘এ্যাই ব্যাটা তুই কেরে? আমরা আমাদের নেতার সাথে দেখা করব। ভাগ!’

এখনকার মত তখন বঙ্গবন্ধুর মত একজন প্রধানমন্ত্রীর ফটকে কোন ভারী প্রটোকল অথবা হাতে হাতে মোবাইল ছিল না। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর গণভবনে বোধ হয় একটি টেলিফোনই ছিল। আমাদের মতো চারজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে গণভবনের একেবারে ভেতরে দেখে ডাক দিলেন, “ফকির!” বঙ্গবন্ধু তাঁর গাড়ীর চালক ফকিরুদ্দীনকে স্নেহ করে ডাকতেন “ফকির।”

তড়িৎ গতিতে ফকির তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তিনি আমাদের চারজনের দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরা কারারে? এরা কী চায়?’ পাতলা মুখের ফকিরউদ্দীন আমাদের কথা বলার পূর্বেই প্রথমে মৃত নুরুল আমিন বীর প্রতীক তাঁর নাম ঠিকানা, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরসহ সব পরিচয় বঙ্গবন্ধুকে জানায়। বাকি আমরা তিনজনও আমাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তাঁকে দেই। চার জনের মধ্যে আমি মধু, নুরুল আমিন ও নজরুল ইসলাম সহ তিনজনই তাঁকে বলি, ‘আমাদের শরীরে এখনও পাক বাহিনীর বুলেট রয়ে গেছে। ভারতের ডাক্তাররা শরীরের সব গুলি বের করতে পারে নি!’ তিনি নারকেল গাছ লাগাবার কথা ভুলেই গেলেন। ফ্যাল ফ্যাল চোখে কতক্ষণ আমাদের দিকে চেয়ে থেকে ফকিরের দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, ‘ফকির, টেলিফোনটি নিয়ে আয়!’

ফকির দৌড় দিয়ে ঘর থেকে ফোনের তার ছুটিয়ে নিয়ে এলো তাঁর সামনে। তিনি গণভবনের ঘাসের উপর বসে পড়লেন। কাকে যেন টেলিফোনে বললেন I need you now. So please meet me. আমরা বলা শুরু করলাম, ‘আমাদের আরো চিকিৎসা দরকার। আমাদের শরীরের গুলি আপনি বের করে দেন!’ তিনি সেই মুহূর্তে আমাদের মাথায় হাত রেখে বলতে লাগলেন, ‘তোমরা দেশ স্বাধীন করেছ। তোমরা ত’ দেখছ যে দেশের সব কিছু ধ্বংস!’ তাঁর বাকি কথা শেষ করার পূর্বেই সিলেটের রহমান তার প্যান্ট এবং জাঙ্গিয়া খুলে ফেলে একেবারে উলঙ্গ হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘লিডার! আমরা বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা আপনার নির্দেশের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং এমন ভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছি।’

বঙ্গবন্ধু রহমানের দিকে দেখেই দুই চোখ ঢেকে ফেললেন। কেঁদে ফেললেন। অভিমানী ও উত্তেজিত, অল্পবয়সী মুক্তিযোদ্ধা রহমান আবার বলে উঠলো, ‘আপনার নির্দেশে যা হারিয়েছি ফিরিয়ে দিন। কামলা খেটে যাব। চিকিৎসার দরকার নাই।’
মুক্তিযুদ্ধে লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ হারা উত্তেজিত রহমান বঙ্গবন্ধুর সামনে কথাগুলো বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। আমরাও অশ্রু সংবরণ করতে পারি নি। বঙ্গবন্ধু ও ফকির… তাঁদের চোখেও পানি। রহমান ও আমরা তিনজন। ইতোমধ্যে ফকিরুদ্দীন একটি গামলায় করে চানাচুর, মুড়ি, সরষের তেল আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখিয়ে এনেছে। বঙ্গবন্ধু ফকিরকে নির্দেশ দিলেন, ‘গামলাটা ধরে রাখ। ওরা মুড়ি খাক।’ ফকিরুদ্দীন পাথরের মূর্তির মতো গামলা ধরে দঁড়ালো। আমাদের চারজনকে মুড়ি নিতে ইশারা করে তিনিও আমাদের সাথে একই গামলা থেকে মুড়ি নিয়ে খেতে লাগলেন। আমরা চারজন আর বঙ্গবন্ধু… সব মিলিয়ে পাঁচ জন একসাথে মুড়ি খাচ্ছি। দু/তিন বার মুড়ি হাতে নিয়েছি। হঠাৎই দেখি বঙ্গবন্ধু তাঁর স্নেহ ভাজন গাড়িচালক ফকিরুদ্দীকে ধমক মেরে বললেন, ‘কীরে মুড়ি খাওয়া তোর বাবার নিষেধ আছে? তুই খাচ্ছিস না কেন?’ হায়, তাঁর কাছে আহত মুক্তিযোদ্ধা, গাড়ির চালক হতে শুরু করে সবাই ছিল সমান। সেদিন অর্থাৎ ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে তিনি সেভাবেই অনুভব করেছিলেন। ইতোমধ্যে গণভবনে এসে হাজির হলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। আমার গর্বিত জীবনে সেদিন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী আর স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের প্রথম সেনাপতির
কথোপকথন শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। জেনারেল সাহেব এসে প্রধানমন্ত্রীর সামনে সোজা দাঁড়িয়ে মাথা নত করে চোখে চোখ ফেলেছেন। তিনি জেনারেল ওসমানীকে বললেন, ‘জেনারেল, কেমন আছেন? আপনি কি জানেন এরা কারা?’ জেনারেল ওসমানী সিলেটের রহমানকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বিধায় বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রাইম মিনিস্টার। ওরা কলেজের ছাত্র। ওরা আপনারই কথায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আজ ডিসএবল হয়ে পড়েছে।’ একথা শুনে তিনি আরো বেশি অস্থির হয়ে পড়লেন। জেনারেলসহ সবাই এক সাথে মুড়ি খেলাম। বঙ্গবন্ধু সবার মাখায় হাত দিয়ে স্নেহভরে বলতে লাগলেন, ‘আমি তোদের চিকিৎসা করাবো। তোদের শরীরের ভেতরের গুলিও বের করার ব্যবস্থা করবো।’ আমরা তাঁর স্নেহবিজড়িত সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে এলাম গণভবন থেকে। সেদিন আর প্রধানমন্ত্রী গণভবনে নারকেল গাছ লাগাতে পারেননি।

আজও সেই ফকিরুদ্দীন, গার্ড নূর ইসলাম ও আমি সেদিনের ঘটনাসহ পরের অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি। প্রায় একমাস পরে সেপ্টেম্বর ৭২-এর ১৪ তারিখ প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের মহান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনী ওসমানী ও মুক্তিযুদ্ধের চীফ অব স্টাফ জেনারেল এম. এ. রব বীর উত্তমসহ এক আলোচনায় মিলিত হন। এছাড়াও সেদিনের আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একমাত্র জেনারেল ওসমানী ছাড়া প্রত্যেক সেক্টর কমান্ডারকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও প্রত্যেকটি সেক্টরে মেজর, ক্যাপ্টেন, লেফটেন্যান্ট এমনকি সিভিল হতেও মিলিয়ে ৪/৫ অথবা ৫/৬ জন সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তার পর আরো ছিল কোম্পানি কমান্ডার, সেকশন কমান্ডার সহ কত না মুক্তিযোদ্ধা! সবাই মিলিয়েই মুক্তিযুদ্ধ। এই যারা যুদ্ধ করেছে, এদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে আরও একটি বাহিনী ছিল। যার নাম ছিল মুজিব বাহিনী। বিজয় যখন বাঙালীর দোরগোড়ায়, তখন এরা অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস নাগাদ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সহ গোটা দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে পরিত্যক্ত অস্ত্র কুড়িয়ে ‘জয় বাংলা!’ ‘জয় বাংলা!’ বলে দেশে প্রবেশ করে হয়ে যায় মুজিব বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর নামে নাম নেওয়া এই বাহিনী কতটুকু যুদ্ধ করেছেন কি না করেছেন তা’ কোনো ভাবেই বলা সম্ভব নয়। তবে, বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে আহত প্রায় ৫,০০০ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা দেন। এদের মধ্যে একজনও ‘মুজিব বাহিনী’র মুক্তিযোদ্ধা নেই। অথবা, স্বাধীনতার পর এত বছরেও কোনো শহীদ মুজিব বাহিনী পরিবারের কোনো সন্তানকে আমরা দেখতে পাই নাই। এ থেকেই বোঝা যায় যে ‘মুজিব বাহিনী’ দেশের জন্য যুদ্ধ করার পূর্বেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। অথচ ‘মুজিব বাহিনী’র বড় ভাইয়েরা পরিত্যক্ত কিছু অস্ত্র হাতে করে ‘জয় বাংলা’ বলে বাংলাদেশে ঢুকেই হয়ে গেল বড় মুক্তিযোদ্ধা। যাঁরা ছিলেন ছাত্রলীগের বড় ভাই, যাঁরা ছিলেন ছাত্র নেতা… সেই সব বড় ভাইয়েরাও দেশ স্বাধীন হবার পরে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে টানাটানি শুরু করলেন। কুটিল রাজনীতি দিয়ে তাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। বড় ভাইয়েরা কান কথায় বঙ্গবন্ধুকে ভুলাতে চেয়েছিলেন যে তাঁর নামে গঠিত বাহিনীই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। কিন্তু, যখন প্রকৃত আহত মুক্তিযোদ্ধারা পুরাতন গণভবন অথবা ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছেন যে ‘মুজিব বাহিনী’র বাইরেও কত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ছিল! বঙ্গবন্ধু যখন ‘মুজিব বাহিনী’র কোনো যোদ্ধাকে আহত বা পঙ্গু হিসেবে খুঁজে পাননি, তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতিকে আমাদের কথা জিজ্ঞেস করেন। তারপর যখন তিনি দেখলেন যে এই সব কুলি, মজুর, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতীর সন্তান ও স্কুল কলেজের ছাত্ররাই সর্বাগ্রে দেশের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং তারাই আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে বা শহীদ হয়েছে, তখন তিনি সেইসব আহত, পঙ্গু ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভেবে, তাঁদের পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ ভরণ পোষণের কথা ভেবে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গঠন করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাষ্ট।’

মুক্তিযুদ্ধের চীফ অব স্টাফ মরহুম জেনারেল এম. এ. রব বীর উত্তমকে প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে বঙ্গবন্ধু গঠন করেন ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট।’ ট্রাষ্ট গঠনে স্বর্গীয়া ইন্দিরা গান্ধী ৭২ লক্ষ রুপী বাংলাদেশ সরকারকে অনুদান হিসাবে প্রদান করেন। এই ৭২ লক্ষ রুপীসহ মোট ৪ কোটি টাকা মূলধন ও মিসেস আদমজীর কোকো কোলা কোম্পানী, মিসেস মাদানীর গুলিস্তান সিনেমা হল, চু চিন চৌ রেষ্টুরেন্টসহ গোটা গুলিস্তান ভবন, নাজ সিনেমা, ওয়াইজ ঘাটে মুন সিনেমা, নবাবপুরের মডেল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী, হাটখোলায় হরদেও গ্লাস কোম্পানী, ঢাকার পূর্ণিমা ফিলিং ষ্টেশন, মেটাল প্যাকেজেস কোম্পানী, মিমি চকলেট কোম্পানী, সিরকো সোপ এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানী, মিরপুরে বাক্স রাবার কোম্পানী, চট্টগ্রামের ইষ্টার্ন কেমিক্যাল কোম্পানী, হোমেদিয়া ওয়েল কোম্পানী, বাক্সলী পেইন্টস কোম্পানী, আলমাস, দিনার সিনেমাহল সহ মোট পাঁচটি সিনেমা হল ও ১৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ৮৮, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় একটি একতলা বিল্ডিংসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান নিঃশর্ত দান করে সেগুলো চালনার জন্য বঙ্গবন্ধু গঠন করে দেন ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট।’ মুক্তিযুদ্ধের চীফ অব স্টাফ মরহুম জেনারেল এম এ, রব বীর উত্তম ও মুক্তিযুদ্ধে চার নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সি,আর,দত্ত ছাড়া আর কেউই কল্যাণ ট্রাষ্টকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারেন নি। উক্ত দু’জনই শুধুমাত্র সরাসরি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন। বাকি যত জন এসেছেন তারা সবাই এম,ডি, পদে ডেপুটেশনে এসেছেন। দু/তিন বছর থেকে আবার চলে গেছেন। গাড়ি চালক, জি. এম., ডি. জি. এম., এম. ডি. সহ সবাই বিভিন্ন সময়ে ডেপুটেশনে এসেছেন। আবার চলে গেছেন। বাংলাদেশের জীবনে যেমন যেভাবে সরকার বদল হয়েছে ঠিক তেমন ভাবেই কল্যাণ ট্রাষ্টের পরিচালক বা এম, ডি, বদল হয়েছেন। আর দেশকে না চালিয়ে যেমন প্রত্যেকটি সরকার নিজকে চালাতে চেয়েছেন, বিভিন্ন প্রকার আমলার পাল্লায় পড়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’-ও সেভাবেই চলেছে। বুকভরা আশা নিয়ে যাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল, সেই ট্রাস্ট হতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো কল্যাণ আজ পর্যন্ত করা সম্ভব হয় নাই। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা ছিল যে এই ট্রাষ্টের আয় থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভরণ পোষণ হবে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। তাঁদের ছেলে মেয়ের বিয়ে হবে। সকল কল্যাণমূলক কাজ করবে কল্যাণ ট্রাষ্ট। কিন্তু তদন্ত করলে দেখা যাবে, কল্যাণ ট্রাষ্টের আয় থেকে কর্মকর্তারা হজ্ব করে হাজী হয়েছেন। বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। রঙ্গিন টি, ভি, ফ্রিজের মালিক হয়েছেন। কিন্তু যাদের কল্যাণের জন্য ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল, তাদের বাড়িতে রঙিন টি, ভি, কিম্বা ফ্রিজের প্রশ্নই ওঠে না। মীরজাফরী রাজনীতি আর আমলাদের কারণেই যেমন দিন দিন দেশটা ধ্বংস হতে চলেছে, আমাদের ট্রাষ্টও আমলাদের হাতে পড়ে বিলুপ্তপ্রায়।

রাজনৈতিক ভাবে প্রতিটি সরকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করেছেন। এম, পি, থেকে মুক্তিযোদ্ধা বড়ভাইয়েরা পর্যন্ত হুইল চেয়ারে চলাচলকারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ যুদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধাদের ব্যবহার করেছে। করে নিজেরা লাভবান হয়েছে। হয়েছে গাড়ি বাড়ির মালিক। কিন্তু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা? তিন বেলা খাবারও তাঁদের ভাগ্যে জোটে না। একটু মাথা গোঁজার ঠাই পর্যন্ত তাঁদের হচ্ছে না। ২৯ বৎসরের বাংলাদেশে এক এক করে এক ডজনের উপর সরকার অতিবাহিত হয়েছে এর মাঝে অর্ধ ডজন বিচারপতি পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেছেন। কিন্তু দেশমাতৃকার কল্যাণে কেউই সাফল্যব্যঞ্জক উন্নয়নে সক্ষম হন নি। তেমনিভাবে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান স্বয়ং দেশের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়।

যাহোক, আগের কথায় ফিরে আসি। মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী ও পঙ্গুত্ব বরণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চীফ অফ স্টাফ জেনারেল মরহুম এম. এ. রব বীর উত্তম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সি. আর. দত্ত বীর উত্তম… এই দু’জনই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের এই দুই বীর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার আমলে কল্যাণ ট্রাষ্টের আয় থেকেই আহত যোদ্ধাদের ভাতা প্রদান করা হত। কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠনের মূল ইতিহাসের সারাংশ এই দুই চেয়ারম্যানই কিছু কিছু জানতেন। জেনারেল মরহুম এম. এ. রব. বীর উত্তমের মুখে কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের ইতিহাস কিছু কিছু শুনেছি। মরহুম জেনারেল এম. এ. রব বীর উত্তম বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন বলে অনেক কিছুই অবগত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু মাঝে মধ্যে গুরুতর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে অস্থির হয়ে পড়তেন। আমার জানা মতে তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বর্গীয়া শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও মুক্তিযুদ্ধের তথা বাংলাদেশের প্রথম প্রধান সেনাপতি জেনারেল মরহুম আতাউল গনি ওসমানীও ট্রাষ্ট গঠনের কথা জানতেন। হয়ত আরো অনেক ব্যক্তিত্ব এই গঠন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে পারেন যা আমি জানি না। তবে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট আমাদের চোখের সামনে গঠিত হয়েছে বলে ট্রাষ্টের সংবিধানসহ এর জন্ম ইতিহাস আমার জানা।

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল। এদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ হতে শুরু করে অনেকেই জানেন আজকের ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগার’ ১৯৭৩-এর মার্চ মাস হতেই ‘আহত, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে থাকার সময় হতে ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত কোনো দিন বঙ্গবন্ধু কলেজ গেটে অবস্থানরত আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে আসেননি। যাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে জন্মদাতা পিতা-মাতাকে উপেক্ষা করে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে আহত হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছি, পুরুষত্ব হারিয়েছি… কলেজ গেটে অবস্থানরত সেই আমাদের তিনি দেখতে আসেন নি। কতজন আমাদের দেখতে এসে এবং আমাদের অভিমানের কথা শুনে কেঁদে-কেটে, অশ্রু বিসর্জন করে গেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কেন আমাদের দেখতে আসেন নি? এর উত্তর একমাত্র মোহাম্মদপুরের মরহুম নজরুল চাচা এবং আমি জানতাম। আসলে আমাদের মতো আহত যোদ্ধাদের দু/তিন জনকে দেখলেই তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। কেঁদে ফেলতেন। সান্ত্বনার ভাষাও হারিয়ে ফেলতেন। আর, সেসময় কলেজ গেটের এই বিশ্রামাগারে ২২৯ জন বিভিন্ন প্রকারের পঙ্গু ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা–কারো বুকে, পেটে, কোমরে, কলিজায় গুলি। চির জনমের মত পঙ্গু হয়ে গেছে। হাঁটতে পারে না। হুইল চেয়ারে চলাচল। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। কারো শেলের আঘাতে চোখ, নাক নেই। মুখ পোড়া। এক সাথে ২২৯ জন এমনতর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখে সহ্য করতে পারতেন না বলেই বঙ্গবন্ধু ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২ থেকে ১৪ই আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত কলেজ গেটে মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারে আসেননি। আসতে পারেন নি। এমনটাই আমি শ্রদ্ধেয় মৃত নজরুল চাচার মুখে শুনেছি এবং শুনে কেঁদেছি পর্যন্ত।

বাবর রোডে অবস্থানরত একটি তিন তলা লাল রঙের বাড়িতে অবস্থান করতেন এই সোনার দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারীনী বীরাঙ্গনারা। সেখানে তাঁরা কতজন থাকতেন তা’ একমাত্র মরহুম নজরুল চাচা আর বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউই অবগত ছিলেন না। আমরা তাঁদের দূর থেকেই দেখেছি। শুধু একজন বীরাঙ্গনা তাঁর নিজ পরিচয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারে আসতেন এবং গল্প গুজব করে আমাদের সময় দিতেন। আমার মনে আছে যে তিনি বলেছিলেন তিনি বিএ পাশ এবং তাঁর নাম ’ডলি’। আসল নামটি আমি জানতে পারিনি। আমি বরাবর সাক্ষাৎ হলে সালাম করে তাঁকে ’ডলি আপা’ বলে ডাকতাম। ডলি আপা অনেক বার আহত, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা সেন্টারে এসেছেন। এক সাথে চা খেয়েছেন। বলেছেন, ‘তোরা কিন্তু কম দিস নি। আমি নারী। নারীত্ব লুণ্ঠন করে নেওয়ায় আমার যেমন সব শেষ হয়ে গেছে, তেমনিভাবে তোদেরও তো পুরুষত্ব শেষ হয়ে গেছে। আমার চেয়ে তোরা কি কম? আমি ত’ হাঁটতে পারছি। তোরা ত’ আর কোন দিন হাঁটতেও পারবি না!’

আমার সেই ডলি আপা নাকি পরে পুলিশের কমিশন চাকুরী পেয়েছিলেন। কিন্তু আজ এখন ডলি আপা কোথায় আছেন কেমন আছেন জানি না! সেদিনের ডলি আপার কথা টেনে বলতে হয় যে জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে পাক জান্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে যাঁরা সামনাসামনি যুদ্ধ করেছেন, যাঁরা গেরিলা যুদ্ধ করেছেন, তাদের ক্ষতির কোন হিসাব নাই। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করতে যেয়ে পাক জান্তাবাহিনী অথবা তাদের এদেশীয় দোসররা দুই লক্ষাধিক মা বোনের ইজ্জত লুটে নিয়েছে। সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে চির জনমের মত পঙ্গু হয়ে গেছে। শুধু চির জনমের মত হাঁটা চলার শক্তি হারায়নি। বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের মত শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের পুরুষত্ব পর্যন্ত হারিয়েছেন। মোহাম্মদপুরের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব নজরুল ইসলাম (মৃত) চাচার আবেদন আর অনুরোধে বঙ্গবন্ধু মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অবস্থানরত ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মা, বোন, যাঁরা ইজ্জত হারিয়েছিলেন তাঁদের মাত্র ক’জনকে দেখে আর গণভবনে হুইল চেয়ার ও ক্রাচে ভর করা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে অত্যন্ত অস্থির বোধ করেছেন। এবং এর ফলশ্রুতিতে চার কোটি টাকা মূলধন দিয়ে গঠন করেছিলেন ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’। মহান মুক্তিযুদ্ধের চীফ অব স্টাফ মরহুম জেনারেল এম. এ. রব বীর উত্তম সাহেবকে সরাসরি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে বলেছিলেন, ‘আমার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শাহাদাত বরণ ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, একমাত্র তাদেরই ট্রাষ্ট থেকে ভাতা ও ভরণ পোষণ প্রদান করা হবে।’

২.
পিছন ফিরে তাকালে আজ মনে হয় দেশ স্বাধীনের পরপরই একটা গোপন ষড়যন্ত্র অবশ্যই হয়েছিল। এবং যতদূর সম্ভব আমাদের শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরাই সেটা করতে বসেছিলেন। যেমন ষড়যন্ত্র হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের খেতাব নিয়ে। এটা সুস্পষ্ট যে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে কোন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা নেই। এই সাত বীরশ্রেষ্ঠ সেনা, বিমান বা নৌবাহিনীর বিভিন্ন পদে আসীন ছিলেন। অথচ, আমার জানা মতে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমার সাথী মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোহাম্মদ শামসুদ্দীন ও আমি… আমরা দু’জনেই বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের অধীনস্থ ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। শামসুদ্দীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাব-সেক্টরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে একাই ১৮জন পাক সেনা ও ৭/৮ জন রাজাকারকে হত্যা করার পর সাথীদের জীবন রক্ষা করে নিজে সাহাদাত বরণ করেন। অথচ তাঁর বৃদ্ধা মাতা মালেকা খাতুন মাত্র পনেরোশ’ টাকা মাসিক রাষ্টীয় সম্মানী ভাতা ছাড়া আর কিছুই পাননি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শামসুদ্দীন এফ. এফ. বা ফ্রিডম ফাইটার অর্থাৎ সেনাবাহিনীর বাইরে সাধারণ জনতা হতে রিক্রুট বলে তাঁর ভাগ্যে একটি রাষ্ট্রীয় খেতাব জোটে নি। মুক্তিযুদ্ধের বীর শ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবগুলো নিয়ে যেমন একটা টানাটানি ও ষড়যন্ত্র হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে বড় ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুকে নানা রকম কান কথায় ভুলিয়ে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের। অথচ তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে নেতার ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বপ্রথম অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা এই যোদ্ধারাই হয়েছেন শহীদ। হয়েছেন চিরজনমের মত পঙ্গু। হাঁটতে পারলেও বাকি জীবন শুনতে হয়েছে ‘খোঁড়া’ অপবাদ। মুজিব বাহিনীর বড় ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ২/১টা প্রতিরোধ ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়া পাক জান্তাবাহিনীর সাথে সামনা সামনি যুদ্ধ বলতে গেলে করেনই নি। যদি তারা পাক বাহিনীর সাথে সামনা সামনি যুদ্ধ করতেন তবে অবশ্যই ২/৫ জন যুদ্ধাহত মুজিব বাহিনীর সৈন্য থাকতেন। কিন্তু, আমার জানা মতে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টে’র মাধ্যমে রাষ্টীয় সম্মানী ভাতা প্রাপ্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজনও মুজিব বাহিনী নেই। একটি শহীদ পরিবারও শহীদ মুজিব বাহিনীর নেই। তার পরও বড় ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুকে কান কথা বলেছিলেন, ‘আমরাই আপনার নামে বাহিনী মানে মুজিব বাহিনী গঠন করে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি।’ হয়ত তিনি তাঁর প্রিয়ভাজনদের কান কথায় প্রকৃত উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভুলেই যেতেন। কিন্তু, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ও হাসপাতালের সামনে মুক্তিযোদ্ধা রেষ্ট হাউস থেকে যখন হুইল চেয়ারে চলাচলকারী সম্পূর্ণ পঙ্গু, হাত কাটা, পা কাটা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা পুরাতন গণভবন ও বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে ভিড় জমাতে লাগল, কান্নাকাটি করতে লাগল কি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করা শুরু করলো, তখন তিনি একদিন বলা চলে বিরক্ত হয়েই জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী সাহেবকে ডেকে আমাদের পরিচয় জানতে চান। জানতে চান আমরা কেমন করে পঙ্গু হলাম। জেনারেল সাহেব আমাদের অনেককে চিনতেন। রহমান নামের এক সিলেটি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা (যার যুদ্ধ অবস্থায় শেলের স্পিন্টার লেগে লিঙ্গটা উড়ে গেছে)- কে দেখিয়ে বললেন, ‘এরা স্কুল, কলেজে পড়ত। আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে এরাই যুদ্ধ করেছে এবং আহত ও পঙ্গু হয়েছে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভারতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকবাহিনীর সাথে সামনা সামনি লড়াই করে পঙ্গুত্ত্ব বরণ করেছে। অনেক শাহাদাত বরণও করেছেন।’ বঙ্গবন্ধু মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘এদের কে কমান্ড করলো? কার কমান্ডে এরা যুদ্ধ করলো?’ জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী বঙ্গবন্ধুকে জানালেন এই দেশটিকে যুদ্ধের স্বার্থে ১১ ভাগে ভাগ করা হয়। আর বাঙালীর বিচক্ষণ সেনা অফিসারদের এক একটি ভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেনারেলের মুখে বিস্তারিত তথ্য শুনে হতবাক হয়ে গেলেন বাংলাদেশের সেরা মানব। আমাদের মাথায় হাত দিয়ে দোওয়া করলেন। আশ্বাস দিলেন, ‘তোদের চিকিৎসা হবে। তোদের যা দরকার হবে আমি সব ব্যবস্থা করব। তবে কটা দিন তোরা অপেক্ষা কর।’

এভাবেই কল্যাণ ট্রাস্টের শুরু। প্রথম দুই চেয়ারম্যান অর্থাৎ রব সাহেব ও সি,আর,দত্তের সময় কল্যাণ ট্রাষ্টের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান লাভ করেছে। জিয়াউর রহমান সরকারের পর এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এসে অবশ্য আহত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা শতকরা ৫০ ভাগ বৃদ্ধি করে দেন। কিন্তু, কল্যাণ ট্রাষ্ট থেকে চেয়ারম্যান প্রথা উঠিয়ে দিয়ে এস, ডি, প্রথা চালু করেন। চেয়ারম্যান থাকবেন সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধান আর একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিকে ডেপুটেশনে এম,ডি, পদে নিয়োগ করা হবে। ডেপুটেশনে আসা এম, ডি. পরিচালকদের চাকুরীর মেয়াদ হবে দু/তিন বছর। এই এম,ডি,রা কল্যাণ ট্রাষ্টে এসে দেখেন অগাধ সম্পত্তি চারপাশে। ট্রাষ্টের ৫টি লাভজনক সিনেমা হলসহ সব ক’টি প্রতিষ্ঠানই লাভজনক। ট্রাষ্টে ডেপুটেশনে আসা এম,ডি, পরিচালকগণ বেমালুম ভুলে যান এটা কার কল্যাণে ট্রাষ্ট। কাদের কল্যাণে নির্মিত। কর্ম পালনের কথা ভুলে যান। তারা বলেন যে দু/তিন বছরে আর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারদের কি কল্যাণ করা সম্ভব? তাই নিজেরা ট্রাষ্টের টাকায় বিদেশ ঘোরা ও হজ্ব পালন করা শুরু করেন। শুরু করেন বাড়ি নির্মাণ। গাড়ি ক্রয়। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তার পরেও বিলুপ্ত প্রায় ট্রাষ্টের আজো যে সম্পদ রয়েছে, তাও হাজার কোটি টাকার উর্ধে।

৩. যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ বিশ্রামাগার গঠনের ইতিবৃত্ত
দীর্ঘ ন’মাস অনেক লড়াইয়ের ফসল ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালী ঘরে উত্তোলন করে। ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষাধিক মা বোনের সম্ভ্রম ও কয়েকশ’ দামাল সন্তানের অঙ্গহানীর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা লাভের পরপরই বিভিন্ন জেলা থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকাতে এসে উপস্থিত হতে থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল, মহাখালী বক্ষব্যধি হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল অর্থাৎ সবখানেই আহত, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা অথবা পাকবাহিনীর গোলার আঘাতে আহত বাঙালী রোগী। সবাই চিকিৎসার প্রয়োজন মনে করে ঢাকায় উপস্থিত। ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারাও নিজ মাতৃভূমিতে স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করার জন্য ভারতের হাসপাতালের উন্নত চিকিৎসা ত্যাগ করে মাতৃভূমিতে এসে রাজধানীতে ভীড় জমায়। ফলে, প্রতিটি হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের স্থান সংকুলান অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাসপাতালে সাধারণ রোগী চিকিৎসার সাথে সাথে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারাও চিকিৎসায় আসলে প্রতিটি হাসপাতালে স্থান সংকুলান কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা মগবাজারের একটি বাড়িকে ‘শুশ্রুষা’ নাম দিয়ে বসবাস করতে থাকেন।

‘শুশ্রুষা’র মত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে ১/৬ ও ১/৩ গজনবী রোডের ২টি বাড়িতে ৪০/৫০ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মেঝেতে শুয়ে (ফ্লোরিং) দিন কাটাতেন আর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা (ড্রেসিং) করাতেন। ১/৬ ও ১/৩ গজনবী রোড। মোহাম্মদপুরের এই বাড়ি দু’টো বিহারীদের ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল। যা পরবর্তী সময়ে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ১/৬ ও ১/৩ নং বাড়ির লাইনে আরও একটি পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল। যেখানে বরিশালের তদানীন্তন এম,পি, এনায়েতুল্লাহ খান বসবাস করতেন। হাসপাতালে সাধারণ রোগীর সাথে উপুর্যুপরি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা করতে বিছানা-পত্র সহ স্থানের অভাব হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অবস্থানরত ও ১/৬ এবং ১/৩ বাড়িতে অবস্থানরত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে এম, পি, এনায়েতুল্লাহ খানকে অনুরোধ করেন। বলেন, ‘স্যার, আপনার ত’ ঢাকায় আরো বাড়ি আছে। তাই বিহারীদের ফেলে যাওয়া এই বাড়িটি আমাদের বসবাসের জন্য দিয়ে দিলে আমাদের উপকার হত। সেই সাথে হাসপাতালে সাধারণ রোগীদেরও চিকিৎসার সুবিধা হতো।’

এনায়েতুল্লাহ খানকে বাড়ি ছাড়ার অনুরোধ জানালে এনায়েতুল্লাহ খান রাগান্বিত হয়ে ওঠেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের গালিগালাজ দেওয়া শুরু করেন। তার গালাগালি ও চিৎকারে রাস্তার সাধারণ মানুষ থেকে হাসপাতালের ভিতর হতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা এসে হাজির হন কলেজ গেটের ১/১ গজনবী রোড এর বাড়ির সম্মুখে। ততক্ষণে রাগান্বিত এম, পি, এনায়েতুল্লা খান ঘর থেকে তার দু’নলা বন্দুক বের করে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর গুলি চালায়। তার বন্দুকের গুলিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ওলি আহাদ ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। ওলি আহাদকে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই ফাঁকে এনায়েতুল্লা খান পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে প্রথম এসে হাজির হন কাদের সিদ্দিকী। তিনি গোটা ঘটনা শুনে আর ওলি আহাদের লাশ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথায় রাজাকারের বাচ্চা?’ বলে সদর ঘাটের দিকে তাঁর জিপ নিয়ে তড়িৎগতিতে চলে যান। যাবার পূর্বে বলে গেলেন, ‘কোথাও পালাতে পারবেনা হারামীর বাচ্চা। আমি তাকে বের করে ছাড়ব। তোমরা ওর বাড়ির মাল-পত্র বের করে সামনে এক স্থানে গাদা করো। আমি আসছি!’

তাঁর নির্দেশ পেয়ে শতাধিক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মিলিতভাবে জনসাধারণকে অনুরোধ করে সরিয়ে দিয়ে কলেজ গেটে যেখানে আজ যাত্রী ছাউনি আর সোনালী ব্যাংক, সেখানে খাট, চেয়ার, টেবিল, ওয়াড্রোব, আলমারী, দামী ও সুদৃশ্য সোফা ও শোকেসসহ বিছানা-পত্র সব এক স্থানে স্তূপ করেন। ১৯৭৩ইং সালে এম, পি, এনায়েতুল্লাহ খানের মেয়ের ড্রেসিং টেবিলে তখনকার মূল্যমানের অন্ততঃ দু’লক্ষ টাকার বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য পাওয়া যায়। কাদের সিদ্দিকি ফিরে এসে নির্দেশ দেন, ‘জ্বালিয়ে দাও রাজাকারের বাচ্চার বাড়ির মালপত্র!’

তড়িৎ গতিতে বিহারী কলোনী থেকে পাঁচ সের কেরোসিন তেল এনে ঢেলে দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সবকিছু। ১/১ নম্বর গজনবী রোডের বাড়িটি পরিষ্কার করে সেই বাড়িতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়েন। সিদ্ধান্ত হয় যে যুদ্ধে পক্ষাঘাতগ্রস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের এই বাড়িতে চিকিৎসাধীন রাখা হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিত্বকারী দলের সদস্য ডা. জোয়ারদার অতীব আগ্রহান্বিত হয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সার্জিক্যাল খাট সহ বিছানা পত্র চেয়ে একটি আবেদন রাখেন জাতিসংঘ প্রেরিত হাড় বিশেষজ্ঞ (Bone Specialist) ড. রোনাল্ড জেমস্ গার্ষ্ট এম, ডি, কে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসী ড. রোনাল্ড জেমস গার্ষ্ট এম, ডি, পেশায় একজন ডাক্তার হলেও ছিলেন মাটির মানুষ। ভারি উদার মনের মানুষ ছিলেন সেই বিদেশী। ১৯৭২ সালে শুধুমাত্র যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতে তিনি ঢাকায় আসেন। প্রতিটি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতেন নিজ সন্তানের মত। আদর করতেন, ব্যবহার করতেন বন্ধুর মত। ড. গার্ষ্ট সহধর্মিনী মেরী গার্ষ্টকেও বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। মেরী গার্ষ্টও মা, বোন ও সেবিকার দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতিটি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সাথে। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করে ড. গার্ষ্ট বাংলাদেশ থেকে চলে যান। তবে, বাংলাদেশ সরকারসহ তাঁর ছাত্র ও বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদের অনুরোধে প্রতি বছর একবার করে আসার প্রতিশ্রুতি দেন এবং তিনি সেই মাফিক আসতেন। তিনি এখনও নিজ খরচে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অনেক কঠিন অপারেশন করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ খবর নেন। মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারে সপত্নীক দেখা করেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। ক্যামেরায় তাদের ছবি তোলেন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ও জননী ড. রোনাল্ড জেমস গার্ষ্ট ও মেরী গার্ষ্ট যত দিন বাংলাদেশে থেকেছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অভিভাবক ও সন্তানের সম্পর্কে থেকেছেন। তাঁদের অমূল্য অবদানের প্রতি স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতিরক্ষা সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক উপদেষ্টা আসাদুজ্জামান এম.পি. সাহেবের উপস্থিতিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক তাঁর বক্তৃতার মাধ্যম ড. গার্ষ্টকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানায়। জনাব আসাদুজ্জামান এম, পি, ড. গার্ষ্টকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ড. গার্ষ্ট বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “যত দিন বাঁচব, আমার ছেলেদের দেখাশুনা করতে পারব।’

ফিরে আসি আগের কথায়। সেই ১৯৭২ সালে উদারমনস্ক আর এক বাঙালী চিকিৎসক ডা. জোয়ার্দারের অনুরোধে ২৩০টি সার্জিক্যাল খাট ও বিছানা পত্রসহ অনেক কিছুই ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’কে প্রদান করা হয়। একটি সার্জিক্যাল খাটের মূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ১/১ গজনবী রোড এর বাড়িটিতে ক্লিনিক সিস্টেমে খাট বসিয়ে প্রথমে ১। মোদাস্বার হোসেন মধু ২। মো. নুরুল আমিন, ৩। মো. আনোয়ার হোসেন, ৪। মো. নজরুল ইসলাম, ৫। মো. জাফর আলী, ৬। শ্রী মানিক গোপাল দাস, ৭। শুকুর মাহমুদ, ৮। মো. নূরুজ্জামান, ৯। গোলাম মোস্তফা ১০। মোজ্জামেল হোসেন, ১১। মো. আ: রাজ্জাক, ১২। মো. ইউসুফ আলী, ১৩। মোসলেম উদ্দীন, ১৪। মো. আ: সোবহান, ১৫। শ্রী মানিক চন্দ্র ভৌমিক, ১৬। আ. হান্নানসহ মো ১৮ জন গুরুতর আহত মুক্তিযোদ্ধাকে স্থান করে দেওয়া হল। আরও ছয় জন কয়েকদিন পরে ভর্তি হয়। মোট ২৪ জন পক্ষাঘাতগ্রস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে সর্ব প্রথম স্থান দেওয়া হলো। ১/৩ ও ১/৬ নং ২টি বাড়িতেও গাদাগাদি করে ছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। কারো হাত নেই। কারো পা নেই। কেউ একেবারে অক্ষম। কারো মুখ পোড়া। এসব যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান সুরু করে ১/১, ১/৩ ও ১/৬ নম্বর বাড়িতে। ডা. জোয়ার্দার তার একনিষ্ঠ উদ্যোগে তখনকার রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরী ও ড. গার্ষ্টের সাথে আলোচনা করে, রেডক্রস, ইউনিসেফ, আই, আর, সি, ইউ, এন, ডি, পি, ও ‘সেন্ট্রাল মেলোনাইটে’র মত সাহায্য সংস্থাগুলোকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনকল্পে তাদের সাহায্য সহযোগিতা ও বিভিন্ন প্রকার ভকেশনাল প্রশিক্ষণ দেবার আহ্বান জানান। সাহায্য সংস্থাগুলো সরাসরি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কল্পে এগিয়ে আসার ঘোষণা ব্যক্ত করেন। ড. গার্ষ্ট খাট, বিছানা, ওষুধ পত্র দেওয়ার পরে ১/১ বাড়ির সম্মুখে একটি হল ঘরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁশ, বেত, টাইপ, ঘড়ি, ভিডিও, টেপ, টি,ভি, থেকে সেলাইয়ের কাজ পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়। যুদ্ধাহত সৈনিকরাও আন্তরিকভাবে সকল শিক্ষা গ্রহণ করতে লাগলেন। সেসময় সবাই মিলে আলোচনায় বসে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসস্থলটির একটি নাম রাখা হয়। প্রথম নামকরণ করা হয় ইংরেজীতে ‘Disabled Freedom Fighters’ Vocational Rehabilitation Training Centre’। এর বাংলা হলো ‘পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র।’ তিনটা বাড়িতে গাদাগাদি করে অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বসবাস করে ভকেশনাল শিক্ষা নেন। ১/১ ও ১/৩ বাড়ির মাঝখানে ১/২ নম্বর বাড়িটি ছিল একজন ভদ্রমহিলার। ভদ্রমহিলার ঢাকায় আর ৪/৫টা বাড়ি আছে। একদিন ভদ্রমহিলা দেখেন ১/২ গজনবীর বাড়িতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা গাদাগাদি করে অমানবিক ভাবে বসবাস করছেন। ভদ্রমহিলা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্ট দেখে সাথে সাথে লিডার জাফর চাচাকে বললেন, “এই বাড়িটি আমার। তোমরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা এখন থেকে এখানেও বসবাস করবে। যতদিন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের ছেলে মেয়েরা বসবাস করবেন, এই বাড়িতে আমার কোন দাবি নাই বা থাকবে না।”

এভাবেই সেদিন থেকে ১/১, ১/২, ১/৩, ও ১/৬ ৪টি বাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজকের ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’। ভদ্রমহিলা বাড়িটি দান করে দেবার পর থেকেই ঈদ, পরব বা শবেবরাত সহ বিভিন্ন দিনে ভাল খাবার রান্না করে এনে হুইল চেয়ারে চলাচলকারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ হাতে খাওয়াতেন। মায়ের মত আদর করতেন। কোরবানী ঈদে গরু ছাগল নিয়ে আসতেন। দিয়ে যেতেন বিশ্রামাগারে। ভদ্রমহিলাকে আমরা এত শ্রদ্ধা করতাম যে কোন দিন ভদ্রমহিলার নামটি জিজ্ঞেস করতেও সৎসাহস হয়নি। তবে শুনেছিলাম তাঁর স্বামীর নাম জনাব আবুল কাশেম। গত ৭/৮ বছর তাঁকে দেখি না ঠিকই। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে স্মরণ হয় তাঁকে। জানি না সেই মা আজ আর ইহজগতে আছেন কিনা। তিনি বেঁচে থাকলে আমাদের মাঝে না এসে পারতেন না।

এলো ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫। সাহায্য সংস্থাগুলো তখন আমাদের শিক্ষা ও সর্বপ্রকার সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করে চলে যায়। সাহায্য সংস্থাগুলোর মধ্যে আই, আর, সি, র পরিচালক (Director) মি. মার্শাল বিয়ার হুইল চেয়ারে চলাচলকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতেন। চলে যাবার আগে তিনি হুইল চেয়ারে চলাচলকারী মুক্তিযোদ্ধাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের দেশের মানুষ ভাল না। শেখ মুজিবের মত মানুষকে হত্যা করতে পারে?’ মি. মার্শাল বিয়ার অত্যন্ত মিশুক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অল্প অল্প বাংলা তিনি বলতে পারতেন। এখনও তিনি মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারে আসেন। কিন্তু যাঁদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব বেশি ছিল, সেইসব হুইল চেয়ারধারীদের মধ্যে প্রায় সবাই ইহজগত ত্যাগ করেছেন। মাত্র একজন জীবিত আছেন। তাঁর সাথে গল্প করে কিছু সময় বিশ্রামাগারে কাটিয়ে ফিরে যান মি. মার্শাল বিয়ার।

পঁচাত্তরের ঘটনার পর সাহায্য সংস্থাগুলো চলে গেলে ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’ হতে মাসিক পঁচাত্তর টাকা সম্মানী ভাতা ছাড়া আর কোন সুযোগ সুবিধা ছিল না। ১৯৭৩ থেকে ’৭৫ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত রেডক্রস, আই, আর, সি, বা ইউনিসেফ, ইউ, এন, ডি, পি, কি সেন্ট্রাল মেলোনাইটের মতো সাহায্য সংস্থাগুলো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাপড় বা গুঁড়া দুধ প্রদান সহ নানা সাহায্য সহযোগিতা করতেন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত দেশে কোন সরকার ছিল কি ছিল না, তা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই অবগত ছিলেন না। কারণ, ঐ সময়টায় সরকারী বেসরকারী কোন ভাবেই কেউ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করেননি। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র পরিচালনার ফাঁকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ খবরও নিতেন। জিয়াউর রহমান একদিকে মন্ত্রী পরিষদে কুখ্যাত রাজাকারদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে যেমন পুনর্বাসিত করলেন, আবার অদ্ভুতভাবে হঠাৎ করেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারদের পুনর্বাসনের কিছু পদক্ষেপ হাতে নিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সূত্র ধরে গঠন করলেন একটি কমিটি। জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়ে বিল উত্থাপন করেন যে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা প্রদান করা হবে রাষ্টীয় কোষাগার থেকে। মিরপুর চিড়িয়াখানার সম্মুখে ১৩ একর জমি কল্যাণ ট্রাষ্টকে লীজ প্রদান করেন। ঠিক হয় এই জমিতে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান সমস্যা দূরীকরণে নির্মাণ করা হবে ‘মুক্তিযোদ্ধা পল্লী’। যার নামকরণও করেছিলেন তিনি। ‘মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন’ নামকরণ করে একটি চারতলা ভবনও নির্মিত হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে ভবনে ১৬জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ৫টি শহীদ পরিবারকে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। মোট ২১টি পরিবার কমপ্লেক্স ভবনের ভিতরে স্থানলাভ করে। কমপ্লেক্স ভবনের পেছনে একটি সুদৃশ্য পুকুরও নির্মাণ করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে গঠন করা ‘কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি’র মাধ্যমে সকল প্রকার পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। ‘কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি’ অনেক পরে গঠন করা হয়। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে মাঝে মধ্যেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারে আসতেন। এই নামটিও তাঁরই দেওয়া।

একদিনের ঘটনা: জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি কল্যাণ ট্রাষ্টের কর্মকর্তাকে অবহিত করে দেখতে এসেছেন বিশ্রামাগারে অবস্থানরত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের। এটা তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার ৭/৮ দিন পরের ঘটনা। বিশ্রামাগারে এসে সাইন বোর্ড দেখে বলে উঠলেন, ‘যেহেতু এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে আহত, হুইল চেয়ারে বসে বা ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটেও কাজকর্ম করতে পারে। সেহেতু সাইনবোডটি চেঞ্জ করতে হবে।’ ইতোপূর্বে সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র”। জিয়াউর রহমান ১/১ নম্বর বাড়িতে বসে বলতে লাগলেন, ‘যেহেতু এরা কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গু নয়, সবাই মুক্তিযুদ্ধ করে পঙ্গু… সেহেতু সাইনবোর্ডটি চেঞ্জ করা দরকার। আর সাইনবোর্ডে লিখতে হবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ মুক্তি বিশ্রামাগার।’ যদিও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কারোরই রোগের মুক্তি ঘটেনি, তবুও সেদিন থেকেই সাইনবোর্ডের লেখা পরিবর্তন হয়ে “যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার” লেখা হয়। এবং অদ্যাবধি এই নামেই মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারটি চলছে।

জিয়াউর রহমানের সাথে একটি ব্যক্তিগত ঘটনা ভুলতে পারি না। ১৯৭৯ সালের জুন মাস। রাষ্ট্রপতি আবারো এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা বিশ্রামাগারের ১/১ গজনবী রোডের বাড়িতে। এই বাড়িটিতে শুধু হুইল চেয়ারে চলাচলকারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করতেন। বরাবরই জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিশ্বস্ত এ.ডি. সি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল মাহফুজুর রহমান (মাহফুজ ভাই) থাকতেন। সেদিন তাঁর সাথে ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রীসভার প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রী আতাউদ্দিন খান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী এ্যানি ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী কর্ণেল জাফর ইমাম বীর বিক্রম, যুব ও ক্রিড়া প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেম। এসময় ৮/১০ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তাদের সামনে হুইল চেয়ারে বসা। পাশের বাড়ি থেকে অন্যান্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারাও ৫/১০ জন এসেছেন। হঠাৎ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলে উঠলেন, ‘এ্যাটেনশন প্লিজ!’ সকলের দৃষ্টি ও কান চলে যায় রাষ্ট্রপতির দিকে। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা মন দিয়ে শুনুন। আমি শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করব। কমিটিতে পুঁজির দরকার। পুঁজি সংগ্রহের স্বার্থে আমি আপনাদের কাছে প্রথমে চাঁদা দাবি করছি। আপনারা কে কত চাঁদা দিবেন বলেন?’

সেদিন হুইল চেয়ারে চলাচলকারী একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন সেখানে দু/তিন জন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী থাকা সত্বেও প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান সর্বপ্রথম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে তাঁর এক মাসের বেতন দান করেন। রাজনীতির হারজিত শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। ক্ষোভে-দুঃখে তখন শুধু পাশে বসা বন্ধু নূরুল আমিনের হাতটা চেপে ধরে শরীরের রাগ মেটালাম। রাজাকারের প্রথম সাহায্যে গঠিত হল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি। কী ভণ্ডামি! উপস্থিত সকল মন্ত্রী এক মাসের করে বেতন কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে দান করলেন। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীকে সদস্য সচিব, প্রধানমন্ত্রী, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রী, পুনর্বাসন মন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে সদস্য করে রাষ্ট্রপতি নিজে চেয়ারম্যান হয়ে গঠন করেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি। এই কমিটি প্রতি মাসে একটি আলোচনা সভা করবেন এবং তাতে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের দিক প্রাধান্য পাবে। কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি হল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদনে সদস্য সচিব, ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর সাক্ষরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সেই পরিচয়পত্র দেখিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা সরকারী যানবাহনে বিনা ভাড়ায় চলাচল করতে পারবেন। এ নিয়ম এখনো বলবৎ আছে। বর্তমানে উক্ত পরিচয়পত্রে সাক্ষর দান করেন প্রতিরক্ষা সচিব। রাষ্ট্রপতি তথা কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান প্রতিটি সিনেমা হলের প্রতিটি টিকেটে ১০ পয়সা করে চাঁদাও ধরেন। তদুপরি মিরপুরে চারতলা একটি ভবন নির্মাণ ছাড়া এই কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটি হতে কোন শহীদ পরিবার বা যুদ্ধাহত কোন সৈনিককে একটি টাকাও দেওয়া হয় নি। যদিও এই কমপ্লেক্স ফান্ড কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য ৮৬ কোটি টাকা রক্ষিত ছিল এবং এই টাকা খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আসার দিন পর্যন্ত ছিল, তবু কোন কোন কালো হাতের ছায়ার খপ্পরে পড়ে এর একটি টাকাও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ব্যয় হয় নি। সেই ১২ একর জমিতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারেরা আজ বস্তির মতো কিছু একটা তৈরি করে বসবাস করছে। রাজনীতি আর বক্তৃতায় ‘মুক্তিযোদ্ধা পল্লী’র ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা রূপ লাভ করছে না। তবে, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ নিরাশ নয়। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় অনিবার্য।

original post

read more

Tuesday, December 6, 2011

মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণালি দিনগুলো : সাদেক হোসেন খোকা

by নাঈম আহমেদ
মা’কে এমনকি পরিবারের অন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। মেলাঘরের ট্রেনিং ক্যাম্পে মাঝে-মধ্যেই মায়ের স্নেহাস্পর্শ পাওয়ার তৃষ্ণায় হৃদয়টা হাহাকার করে উঠতো। ট্রেনিং শেষে ঢাকায় অপারেশনের ফাঁকে গোপনে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলাম, অবশ্যই ঝুঁকি নিয়ে রাতের বেলায়। সকালে নিজ হাতে নাশতা বানিয়ে পাশে বসে খাওয়াতে খাওয়াতে মা বললেন, ‘আর যুদ্ধে যেতে পারবে না। কারণ তোমার হাতে কোনো মানুষ খুন হোক তা আমি চাই না।’ ভাবনায় পড়ে গেলাম, মাকে কী করে ম্যানেজ করি? আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, মা আমাকে যেতে হবে। আর আমরা তো যুদ্ধই করছি পাকিস্তানি দখলদারদের মেরে ভয় দেখিয়ে এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে। তিনি যখন দেখলেন আমাকে ফেরানো যাবে না তখন বললেন, ‘আমাকে কথা দাও অন্যায়ভাবে ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে হত্যা করতে পারবে না।’ মায়ের কথায় রাজি হয়ে আবার ফিরে যাই রণাঙ্গনে। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত যেসব স্লোগান জনপ্রিয় হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল, ১৯৭১-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদসহ (বুড়া) বেশ কয়েকজন মিলে প্রথমে আমরা যাই নরসিংদীর শিবপুরে। ওখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর যুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার জন্য আগরতলার উদ্দেশে রওনা দেই। আগরতলায় আমাদের রিসিভ করেন শহীদুল্লাহ খান বাদল। ওখানে পৌঁছে প্রথমে বটতলাস্থ সিপিএম অফিসে গিয়ে মেনন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে চলে যাই দুই নাম্বার সেক্টরে। খালেদ মোশাররফ ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। মেজর হায়দারের (পরে কর্নেল হায়দার) নেতৃত্বে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া চলছিল। দুই নাম্বার সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নাম ছিল ‘মেলাঘর’। মেলাঘরের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বসবাসের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না। পাহাড় আর ঘনজঙ্গলে পূর্ণ ছিল চারিদিক। লাল মাটির উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ একটু বৃষ্টি হলেই বেশ পিচ্ছিল হয়ে পড়তো। সৌচকর্ম সারতে যেতে হতো বনের ভেতরে। এ ক্যাম্পে বেশিরভাগই ছিল ঢাকা শহরের ছেলে, এ রকম পরিবেশে থাকতে তারা অভ্যস্ত ছিল না। আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মরহুম মেসবাহ উদ্দিন সাবু এক সঙ্গে থাকতাম। বনের মধ্যে দুজনে একসঙ্গে গিয়ে দুজন দুদিকে মুখ করে বসতাম। ক্যাম্পে নিয়ম অনুযায়ী রান্নার জন্য লাকড়ি নিজেদেরই জোগাড় করতে হতো। আমাদের দলে নবম-দশম শ্রেণীর কয়েকজন ছাত্রও ছিল। ওরা এসব করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো না, আমরা নিজেদের কাজ করার পাশাপাশি ওদেরটাও করে দিতাম। এ ক্যাম্পে আমাদের দলের ৪০ জনের বাইরেও আরো অনেক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়, তাদের মধ্যে আবু সাইদ খান, শাহাদত চৌধুরী, ফতেহ আলী চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সুলতান উদ্দিন রাজা, আতিকুল্লাহ খান মাসুদ, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, পল্টনের মানিক (পরে শহীদ), গাজী গোলাম দস্তগীর, মিজান উদ্দিন আহমেদ, শহিদুল্লাহ, শিল্পী শাহাবুদ্দিন, মাসুদ, কাজী ভাই, উলফাৎ ও বাকী (পরে শহীদ) অন্যতম। মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরে জাতীয় পার্টি নেতা) নেতৃত্বাধীন সাব সেক্টরে পাঠানো হয়। আমরা গভীর রাতে সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। এখানে দুই সপ্তাহ ট্রেনিংয়ের প্রথমদিন সকালে তিনি আমাদের ৪০ জনকে ২০ জন করে দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে যেতে বললেন। কিন্তু আমরা কোনোভাবেই দুটি গ্রুপ হতে পারছিলাম না। তখন তিনি নির্দেশ দিলেন ফলইন করার (এক লাইনে দাঁড়ানো)। আমি আর আমার বন্ধু জাকির দাঁড়ালাম পরপর যাতে এক গ্রুপে থাকতে পারি। কিন্তু তিনি নির্দেশ দিলেন প্রথম থেকে বিজোড় (১,৩,৫) এক গ্রুপে, জোড় (২,৪,৬) আরেক গ্রুপে। ফলে আমাদের মতো অনেকেই যারা একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন পড়ে যাই ভিন্ন গ্রুপে। আমাদের মন খারাপ হয়েছে লক্ষ্য করে প্রাণবন্ত ক্যাপ্টেন গাফফার বললেন, ‘তোমরা দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করতে এসেছো, এখানে মান-অভিমান-আবেগের কোনো মূল্য নেই।’ তোমাদের ব্যাকগ্রাউন্ড যার যতোই ভালো হোক না কেন, সবাই এখানে সাধারণ সৈনিক। ওখানে ট্রেনিং শেষ করার পর প্রথমদিকে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) বর্ডার এলাকার সাব সেক্টরে কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। এসব যুদ্ধে ক্যাপ্টেন গাফফার সরাসরি অংশ নিতেন এবং শত্রুর বাঙ্কারের কাছাকাছি তিনি চলে যেতেন। তার সাহসিকতা দেখে আমরা দারুণ অনুপ্রাণিত হই। এখানে যুদ্ধ করেই মূলত এসএমজি, এসএলার ও চাইনিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র পরিচালনা ও সরাসরি যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ওখানেই একটি যুদ্ধে প্রবল সাহসিকতা দেখিয়ে শহীদ হন গোপীবাগ এলাকার কৃতীসন্তান ও আমার ঘনিষ্ঠবন্ধু জাকির হোসেন। আমাদের গ্রুপে পুলিশের একজন হাবিলদার ছিলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের মতো তিনি ততোটা যুদ্ধ কৌশল না জানলেও সে বেশ সাহসী ছিলেন, এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারিজম তার মধ্যে কাজ করতো। একদিন তিনি একটি গ্রুপ নিয়ে পাকিস্তানি আর্মির একটা বাঙ্কার রেট করতে যান। তারা ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে এগোচ্ছিল তাতে ধান গাছ নড়ছিল, এটা দেখে গুলি চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের একটি গুলি এসে লাগে মতিঝিল কলোনি এলাকার নবম শ্রেণীর ছাত্র মোস্তাকের হাতে। ও পাশে থাকা জাকিরকে ডেকে বলে, ‘জাকির ভাই আমার গুলি লেগেছে’। ঘাড় উঁচু করে সেদিকে তাকাতেই আরেকটি গুলি এসে জাকিরের কানের নিচে লেগে বেঁধ করে বেরিয়ে যায়। পরে আরো মুক্তিযোদ্ধারা গিয়ে আক্রমণ করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে তার লাশ উদ্ধার করেন এবং বাংলাদেশের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। ট্রেনিং শেষে আমাকে একটি গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার করে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ গ্রুপে আগরতলা থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা যোদ্ধা ছিল ৪০ জন এবং এখানে এসে আরো ২৫ জন রিক্রুট করি। ঢাকায় আসার আগেরদিন মেজর হায়দার গেরিলা যুদ্ধ এবং শক্র এলাকায় অবস্থানকালে কী কী বিষয় অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে সে বিষয়ে একটা ব্রিফিং দেন। স্লিপিং গাউন পরা মেজর হায়দার মোহনীয় ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছিলেন; যা আজো আমার স্মৃতিতে একটা জীবন্ত ঘটনা হিসেবে জায়গা করে আছে। তখন ঢাকার আয়তন এবং জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। আর পাকবাহিনীর দখলদারিত্বের কারণে এ শহরের বহু লোক নিরাপত্তার অভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন, ফলে ঢাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের আগেও কয়েকটি গ্রুপকে গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ অসাবধানতার জন্য পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়েছিলেন। অপারেশন শুরু করার আগে আমরা অগ্রবর্তী গ্রুপগুলোর ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করি। আমার সঙ্গী যারা ছিলেন জনপ্রিয় পপ গায়ক আজম খান, ইকবাল সুফী, আলমাস লস্কর, কাজী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ (বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তা), মোহাম্মদ শফি, খুরশিদ, আব্দুল মতিন, আবু তাহের, মোহাম্মদ বাশার, খন্দকার আবু জায়েদ জিন্নাহ, ফরহাদ জামিল ফুয়াদ, মোহাম্মদ শামসুল হুদা, ড. নিজাম, জাহের, কচিসহ আরো অনেকে। ঢাকার সন্তান হিসেবে এ শহরের প্রতিটি অলিগলি ছিল আমাদের নখদর্পণে। অন্যদিকে পাকিস্তানি দখলদারদেরও কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল ঢাকায়। তখন পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছিল। আমরা সংকল্প করলাম ঢাকায় বড় কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের প্রচারণার অসত্যতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবো। ঢাকায় আসার আগে মেজর হায়দার যে ব্রিফিং দিয়েছিলেন তা যুদ্ধকালীন যথাযথভাবে মেনে চলেছি। একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছি। তাই আমাদের সবগুলো অভিযানই সফলতা পেয়েছিল। গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল মেনে চলেছি, যেমন হিট অ্যান্ড রান, জনগণের মধ্যে থেকে যুদ্ধ করা, শত্রুপক্ষকে সবসময়ই অস্থির রাখা, সাফল্য নিয়ে বেশি উৎফুল্ল না হওয়া, নিজেদের নিরাপত্তার কথা স্মরণে রাখা, যুদ্ধে নিজেরা যতোটা সম্ভব কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শত্রুর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা, প্রমাণাদি একেবারেই সঙ্গে না রাখা, ইত্যাদি। এমন সব জায়গায় আমরা সফল অপারেশন করেছি যে, আজো ভাবলে শরীর শিহরে ওঠে। আমরা অপারেশন টার্গেট নির্ধারণ করতাম প্রচারের গুরুত্ব বিবেচনা করে। যাতে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায় এবং শক্রও আতঙ্কগ্রস্ত হয়। প্রতিটি অপারেশনে আমরা আক্রমণ করেই সরে পড়েছি এবং জনগণের মধ্যে থেকে ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া উপভোগ করেছি। অনেক রোমাঞ্চকর অপারেশনের মধ্য থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের ঘটনা বর্ণনা করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কাছে বিমান বাহিনীর একটি রিক্রুটিং অফিস ছিল। এর সামান্য পূর্বদিকে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। পরিকল্পনা মতো আমি, লস্কর ও সুফি একটি বেবি টেক্সিতে ব্যাগ ভর্তি ২০ পাউন্ড বিস্ফোরকসহ সেখানে যাই। সিদ্ধান্ত ছিল লস্কর ভেন্টিলেটর দিয়ে বিস্ফোরক যথাস্থানে রেখে আসবে, সুফি ও আমি গাড়িতে বসে কভার দেবো। লস্কর বেচারা ছিলেন আমার মতো খাটো, ভেন্টিলেটরের নাগাল পেতে তার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। অবস্থা দেখে সুফি এগিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করে। আমি ব্যাগের মধ্যে স্টেনগান নিয়ে বেবিটেক্সিতে বসেছিলাম, ড্রাইভার বিষয়টি বুঝতে পেরে বিচলিত হয়ে ওঠে। আমি তাকে ধমক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করি। স্কুটার নিয়ে মেডিকেল কলেজের বর্তমান এমার্জেন্সি গেটে আসতেই বিস্ফোরণের পুরো এলাকা ধোয়া ও ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা ওখানেই বেবিটেক্সি ছেড়ে মেডিকেল কলেজের ভেতরে ঢুকে আবার পশ্চিমদিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে বুয়েটের হলে চলে যাই। সে হলেই থাকতো সঙ্গী লস্কর। ওর রুমে ঢুকে দ্রুত কাপড় বদলে ফিরে যাই ঘটনাস্থলের কাছাকাছি। সেখানে পৌঁছে দেখি হুলুস্থূল অবস্থা। জনতার সঙ্গে মিশে দূর থেকে ঘটনা দেখছি। আশপাশের এলাকা আর্মি, মিলিটারি পুলিশ, বিমান সেনা ও পুলিশ ঘিরে ফেলেছে এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তারা আশঙ্কা করছিল আশপাশে কোথাও মাইন পোতা আছে। এ অপারেশনটি মে মাসের শেষের দিকে অথবা জুনের প্রথমে চালিয়েছিলাম। মাওসেতুং বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন মাছ আর জনগণ জল।’ জল ছাড়া মাছ বাঁচতে পারে না। ঢাকার মানুষ আমাদের মাছের জলের মতোই আশ্রয় দিয়েছিলেন, সহায়তা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে (নভেম্বর) আমাদের আরেকটি সফল অপারেশন ছিল বিডিয়ারের গেটে। এ অভিযানে অনেক প্রাণহানী হয়েছিল। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দি ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এখানে সে সময় সার্ভের কাজ করছিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মজিদ সাহেব ছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষ। এ ঠিকাদার ফার্মটির ইঞ্জিনিয়ার মান্নান এবং ইঞ্জিনিয়ার আনিসুল ইসলাম আমাদের সহায়তা করেন। তাদের সহায়তায় দিনমজুর সেজে পিলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাই। দিনমজুরদের যে দলটির সঙ্গে আমি ভেতরে যেতাম সে দলের একজন ছাড়া কেউ আমার আসল পরিচয় জানতো না। একদিন কাদামাটি গায়ে ঝিগাতলার গেট দিয়ে বের হচ্ছি এমন সময় মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসপিএর তৎকালীন নেতা মাহবুবুল হক দোলন আমাকে চিনে ফেলেন, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খোকা না? একী হাল?’ আমার তখন ভয় ও বিব্রতকর অবস্থা। সংক্ষেপে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর দ্রুত মিশে গেলাম জনতার মধ্যে। এভাবে বেশ কয়েকদিন পিলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাই। আমি উত্তেজনা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পিলখানার অভ্যন্তরের সবকিছু দেখে নিচ্ছি। কোথায় কোথায় অবজার্ভেশন পোস্ট আছে পরখ নেই। যদিও আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানার অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটানো। সম্ভব হলে তাদের অস্ত্র ভাণ্ডারের কাছাকাছি। কিন্তু সার্ভের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার ভেতরে বিস্ফোরক নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন গেট এলাকায় আমরা প্রচ- গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন ইপিয়ার বাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিলাম। রাতে পরিচালিত এ হামলার সময় একটি গুলি দেয়ালে লেগে ডিরেকশন চেঞ্জ হয়ে আমার পায়ে এসে লাগে। দুদিন পর একটি ক্লিনিকে গিয়ে ওটা অপারেশন করে তুলতে হয়। ঢাকায় আমরা আরো অনেক বড় ধরনের অপারেশন করি, ঢাকায় যুদ্ধরত অন্যগ্রুপগুলোও তটস্থ করে তুলেছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা দখলদারদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তবুও পাকিস্তানিদের মিথ্যা প্রচারণায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তখন সিনেমা হলগুলোয় শো’য়ের আগে ‘চিত্রে পাকিস্তানি খবর’ শিরোনামে ডকুমেন্টরি দেখানো হতো, এতে হানাদাররা প্রমাণ করতে চাইতো যে সব ঠিকঠাক চলছে। ডিএফপিতে মিথ্যাচারে পূর্ণ এ ডকুমেন্টরিগুলো তৈরি হতো। একদিন বায়তুল মোকাররম মার্কেটের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি সেখানে শুটিং হচ্ছে, মার্কেটে কেনাকাটা করছে নারী-পুরুষ, লোক ভাড়া করে এনে এসব চিত্র ধারণ করা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম ডিএফপি উড়িয়ে দেবো। শান্তিনগরের বর্তমানে সেন্সর বোর্ড অফিস সেটিই ছিল ডিএফপি অফিস। ডিএফপির তখনকার চিফ ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে গিয়ে সহযোদ্ধা নান্টু ভাই পুরো অফিসের হাল হকিকত দেখে আসে। এ ভবন কী পরিমাণ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যাবে সে বিষয় পরামর্শ দিলেন সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল আহমেদ সুফির পিতা প্রকৌশলী এস পি আহমেদ। উল্লেখ্য, যখনই আমাদের প্রয়োজন হয়েছে এস পি আহমেদ তার গাড়ি ও টাকা দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছেন। তার মালিবাগের বাসা মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকার অলিখিত সদর দপ্তর হয়ে উঠেছিল। সুফির বড় বোন মেজদি আমাদের যেন সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। আমি, সুফি ও লস্কর ২০ পাউন্ড বিস্ফোরক ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে ডিএফপির দারোয়ানকে বললাম এক সাহেবের কিছু মালামাল এতে আছে। সেদিন অর্ধবেলা অফিস ছিল বিধায় দারোয়ান ছাড়া অন্য কেউ অফিসে ছিল না। রুমের মধ্যে নিয়ে গিয়ে দারোয়ানকে অস্ত্র দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। তারপর তাকে আসল কথা খুলে বলি, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভবন উড়িয়ে দেবো’। দারোয়ানের পরিবার ওই ভবনেরই তৃতীয় তলায় থাকতো, তাকে স্ত্রী, শিশু সন্তান ও হাঁড়ি-পাতিল সরিয়ে নেয়ার সুযোগ দেই। দারোয়ান জানায়, তার এক ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। বোঝাপড়া হয়ে যাওয়ার পর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বলি, সে যেন শুয়ে থাকে। নিয়ম হলো বিস্ফোরক যতো চাপের মধ্যে থাকবে তার ধ্বংসের ক্ষমতা ততো বাড়বে। সেজন্য টার্গেটকৃত জায়গায় ওটা রেখে দুটি স্টিলের আলমারি দিয়ে চাপা দেই। যাহোক বিস্ফোরণ এতো বিকট হয়েছিল যে, ডিএফপি ভবনের উত্তর দিকের অংশটি উড়ে গিয়েছিল। সেই ভবন সংলগ্ন ১০০ গজের মধ্যে থাকা অন্য বাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ে যায়। অভিযান চালাতে আমরা রিকশায় করে ডিএফপিতে গিয়েছিলাম। দারোয়ান আমাদের তার কাছে থাকা ডিএফপির একটি মাইক্রোবাসের চাবি দেয়, সেটি চালিয়ে দ্রুত কেটে পড়ি। শহীদ মিনার সংলগ্ন মেডিকেলের গেটে গাড়ি রেখে গাঁঢাকা দেই। এ বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী, বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহু প্রচার মাধ্যমে বারবার গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে সে খবর। পাকিস্তানিদের মিথ্যা প্রচারণার স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় বিশ্ববাসী। স্থানীয়ভাবে রিক্রুট বিজু এ অভিযানের পুরো সময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সঠিক দিন তারিখ মনে না পড়লেও রোজার মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন চালিয়েছিলাম তৎকালীন নির্বাচন কমিশন অফিসে। যেসব জাতীয় সংসদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তাঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করে সেগুলোয় উপ-নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল কমিশনে। এটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টোদিকে মোমেনবাগের দুটি ভাড়া করা বাড়িতে। এর একটি বাড়ির মালিক ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. আব্দুল মঈন খানের বাবা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা কাশেম (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) বিস্ফোরণ ঘটাতে আমাদের বিশেষ সহায়তা করেন। তিনদিন সে আমাকে ওই অফিসে নিয়ে যায় তার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখে অপারেশনের পরিকল্পনা করি। অপারেশনের দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল বলে রাস্তাঘাটে লোক কম ছিল, পরিবেশ অপারেশনের অনুকূলে ছিল। আমি, সুফি, লস্কর, হেদায়েত উল্লাহ, নান্টু ও বাশার এ ৬ সহযোদ্ধা তিনজন করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুই ভবনে বিস্ফোরক স্থাপন করি। এখানেও প্রথমেই অস্ত্র দেখিয়ে দারোয়ানদের আয়ত্তে আনি। দারোয়ানদের কুপোকাত করে তাদের সবাইকে ভবন থেকে সরিয়ে দেই। একজন দারোয়ান চিলেকোঠায় ঘুমিয়ে ছিল। ও কারো নজরে পড়েনি। বিস্ফোরণে একটি ভবনের একাংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়, এতে ঘুমিয়ে থাকা দারোয়ানের শরীর ছিন্ন-বিছিন্ন হয় এবং সে মৃত্যুবরণ করে। সফল এ অভিযান শেষে দেখি কাছাকাছি আত্মগোপন করার কোনো জায়গা নেই। তখন আমরা শান্তিবাগের গুলবাগস্থ ওয়াপদা অফিসের কর্মচারীদের একটি মেসে গিয়ে ডাক দেই, তারা দরজা খুলে দিতেই অস্ত্র দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে ফেলি। তাদের বলি, ‘কিছুক্ষণ আগে যে বিস্ফোরণ হয়েছে তা আমরা ঘটিয়েছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা।’ এসব শুনে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনেছে কিন্তু এতো কাছ থেকে দেখতে পেরে তাদের এ অনুভূতি জন্মে। অপরিচিত মেস মেম্বাররা আমাদের মতো অনাহূত মেহমানদের যথেষ্ট সহায়তা ও খাতির-যত্ন করেন। সাফল্যের উত্তেজনার রাতে ঘুম আসছিল না বলে নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলছিলাম। মেসের লোকজন নিষেধ করে বলেন, সামনেই ভূট্টোর পিপলস পার্টির এদেশীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা নূরুজ্জামানের বাসা। সে কোনোভাবে জানতে পারলে ভীষণ সমস্যা হবে; সুতরাং সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত হবে। রাতে ঘুমাতে হবে, মেসের সদস্যদের ওপরে সর্বক্ষণিক খেয়াল রাখা সম্ভব নয় ভেবে আমরা তাদের বলি, আমাদের নিয়ম হলো ‘আপনাদের বেঁধে রাখবো, দুজন অস্ত্র উচিয়ে পাহারা দেবে এবং বাকিরা ঘুমাবে। কিন্তু আপনারা যেহেতু সহযোগিতা করছেন, ধরে নিয়েছি আপনারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ, সেজন্য আমরা আপনাদের বাঁধলাম না। তবে বাইরে আমাদের আরো লোকজন পাহারা দিচ্ছে, আপনারা কিছু করতে চাইলে সমস্যা হবে।’ আসলে বাইরে আমাদের কেউ ছিল না। তাদের ভয়ের মধ্যে রাখার জন্য এটা বলেছিলাম। মেসের লোকজন ছিল সত্যি ভালো। তারা খুব ভোরে আমাদের নাশতা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আসার সময় আমাদের অস্ত্র-শস্ত্র লুকিয়ে আনার জন্য ব্যাগ দিয়ে সহযোগিতা করেন। রাজারবাগ এলাকায় আরেকটি অপারেশনের পরিকল্পনা করি। পুলিশ লাইনের উল্টোদিকের সাধারণ রেস্টুরেন্টে সন্ধ্যায় অনেক পুলিশ চা নাশতা খেতে আসে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঠিক সে রকম একটি সময়ে আক্রমণ করে তাদের ধ্বংস করবো এবং সরুপথ দিয়ে মালিবাগের দিকে চলে যাবো। তিন/চারবার চেষ্টা করে একবারো আলাদাভাবে শুধু পুলিশ সদস্যদের পাইনি। অনেক সাধারণ মানুষও ছিল। বিস্ফোরণ ঘটালে এ নীরিহ মানুষগুলো মারা যাবে তাই এই অপারেশন আর চালানো হয়নি। ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের মেজর হায়দার নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘অপারেশনের সময় যাতে বাঙালি মারা না যায় তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। টাকা পয়সা ও খাবারের প্রয়োজনে চাঁদাবাজি বা কারো ওপর জুলুম করা যাবে না। প্রয়োজনে সরকারি কোষাগার লুট করবে।’ তবে আমাদের সেসব করতে হয়নি সুফির পিতা ছাড়াও আরো কয়েকজন অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। টানটান উত্তেজনার উল্লিখিত অভিযানগুলো ছাড়াও আজম খানের নেতৃত্বে সারুলিয়া অপারেশন ছিল উল্লেখযোগ্য। ডেমরা-সারুলিয়া দিয়ে প্রবেশ করেছে তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন- আজম খান, জিন্নাহ, লাবলু, খুরশিদ, তাহের ও মতিনসহ অনেকে গিয়ে ওখানে এমন ভারী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল যে, ঢাকা শহরের পূর্বাংশ রাতের অন্ধকারেও দিনের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আলোর তীব্রতা এতো বেশি ছিল যে, রাস্তায় সুইয়ের মতো সরু কিছু পড়ে থাকলেও সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বিস্ফোরণ এলাকার মাটি পোড়া ইটের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমরা যখন মেলাঘর ক্যাম্পে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম তখন আজম খান দেশাত্ববোধকসহ অন্যান্য গান গেয়ে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল। সম্ভবত অক্টোবর মাসের ঘটনা; মাদারটেকের ত্রিমোহিনী বাজারে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বাজারের একদিক থেকে মুক্তিবাহিনী অন্যদিকে পাকবাহিনী অসাবধান অবস্থায় মুখোমুখি হয়ে যায়। এ অপারেশনে দারুণ সাহস দেখিয়েছিলেন ইসতিয়াক খান লাভলু ও হেলাল (অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ছোট ভাই)। তাদের তৎপরতার কারণে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরীর ভাই ফতেহ আলী চৌধুরী প্রাণে রক্ষা পান। এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং মুক্তিবাহিনীর শক্ত উপস্থিতি তাদের গোচরীভূত হয়। এ সংঘর্ষের পর পাকবাহিনীর মনে মুক্তিযোদ্ধারা ভয় ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম যে তারা ইচ্ছা করলেই নিরাপদে ঘোরাফিরা করতে পারবে না। ট্রেনিংয়ের সময়ে আমাদের শক্তভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কোনো প্রমাণাদি সঙ্গে রাখা যাবে না। ডায়রি মেইনটেইন করা যাবে না। অন্যসব নির্দেশের মতোই এসবও আমরা যথাযথভাবে মেনে চলেছি তাই কোনো ঘটনারই দিন তারিখ সঠিকভাবে বলতে পারছি না। যুদ্ধের নয় মাসই আমাদের জীবনে প্রতিদিন এক বা একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সেসব বর্ণিল স্মৃতি ফিরে ফিরে মনের আয়নায় ভেসে ওঠে ; স্বল্প পরিসরে সব লেখা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের কথা ভাবলেই নস্টালজিক মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মন শুধু রণাঙ্গনের সাহসী সহযোদ্ধাদের হারানোর কারণেই ভারাক্রান্ত হয় না, তার চেয়েও বেশি হয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনার দুর্দশা দেখে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা স্বপ্ন যাই বলি না কেন সেটা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়, একটি সার্বিক মুক্তিই ছিল এ মহান যুদ্ধের মূল স্প্রিন্ট। সে কারণেই এর নাম হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। মূলত বৃটিশ বেনিয়াদের রেখে যাওয়া সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ গঠনই ছিল স্বপ্ন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এ জাতির একটি সামষ্টিক মুক্তির লক্ষ্য থেকে। তবুও বলবো, জাতীয় মুক্তি না এলেও একটি স্বাধীন দেশ তো আমরা পেয়েছি। যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা দেশকে গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারছি, স্বপ্ন দেখতে পারছি সুন্দর আগামীর

("১৯৭১ সালে ঢাকা তে যে কয়জন যোদ্ধাদের নাম শুনলে পাকি আর তাদের দোসর রা প্যান্ট নষ্ট করে ফেলত, তাদের নাম গুলো হলো
" খোকা, আজম খান, রাইসুল আসাদ" গুলিস্থানের গ্যানিস সুপার মার্কেট একা উড়িয়ে দিয়েছিলেন যে মানুষটি তার নাম খোকা" এই বিজয়ের মাসে তিনি রক্তাক্ত হলেন)
original post
read more

Saturday, October 22, 2011

পদ্মাপারের কড়চা

by মীর ওয়ালীউজ্জামান

মার্চের শেষ, ১৯৭১। লাগাতার কার্ফিউ চলছে। শিমূল পান্নুভাইয়ের আস্তানা থেকে নড়েনি। এরি মাঝে খবর এসেছে, ওদের ওয়ারির বাড়িতে তালা দিয়ে সবাই নানাবাড়ি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ, কার্ফিউ বিরতি বাদ দিয়ে বাকি সময় তখন ঢাকাবাসী যার যার কন্দরে অন্তরীণ, পাড়ায় পাড়ায় রেইড হচ্ছে। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো ঢাকাবাসীকে ওরা পছন্দমাফিক তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

অপরিসীম আতংক সর্বত্র। যুক্তি, বুদ্ধি কাজ করছে না। শিমূলের অবাক অবাক লাগে, শহরটা অচেনা হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। নিরাপত্তার কোন বোধই যেন আর চেনা নয়। বিশেষ করে ওদের মতো ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষা দিয়ে বসে থাকা তরুণেরা তখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পড়েছে, রাতগুলো দুঃস্বপ্নের দখলে।

সায়েন্স ল্যাবে পান্নুভাইদের সেকশনে, ড. আমিনউদ্দীনের গবেষণাগারে আর কতক্ষণ কাটানো যায় ! মায়ের সঙ্গে কথা হল। ওরা চলে যাবেন যে-কোন দিন। কবে আবার আরিচা-গোয়ালন্দ ফেরি বন্ধ হয়ে যায়, সে শংকাও রয়েছে।

পাকিরা বড় বড় শহরে ওদের অবস্থান শক্ত করে নিয়ে দিন সাতেকের মধ্যে ক্রমশঃ বাইরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আর, চারদিক থেকে তখন অবাঙালি মানুষজন ঢাকায় এসে নামছে, বাঙালিদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছে, এরকম কথাও কানে আসছে। ঢাকা কলেজের প্রধান ফটকের উল্টো ফুটে চিটাগাং রেস্টোর‌্যান্টে চা খেতে বসে শিমূল শুনল, ময়মনসিংহ থেকে আসা বিহারিদের একটি দল নাকি ওয়ারি এলাকার বাড়িঘরে উঠে পড়েছে।

পান্নুভাইয়ের সঙ্গে একদিন সকালে আড়ষ্ট শিমূল কাপ্তানবাজার, ঠাটারিবাজার, বনগ্রাম রোডের অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকা পেরিয়ে অনধিকারীর মতো, অত্যন্ত নিরীহমুখ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছল। সদর খোলা। দরোজার দুটো পাল্লা ভেতরদিকে। উঠোন পেরিয়ে, বারান্দায় চোখ চালিয়ে, অচেনা মানুষজন দেখে শিমূলের সেই রোদেলা সকালেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। পান্নুভাই থমকে দাঁড়িয়ে দেখলেন এবং ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলেন, কি করবে ভাবছো? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা সন্দেহের কারণ হতে পারে। হ্যাঁ, শিমূল আমি ভেতরে যাচ্ছি বলে সে বাড়িতে ঢোকে। অচেনা নারী-পুরুষ-শিশু ওদের বাড়িতে রীতিমতো ঘরকন্না পেতেছে! ও সসঙ্কোচে বারান্দার নিচে উঠোনে দাঁড়িয়ে কোনমতে উচ্চারণ করল, আচ্ছা, ভাই… হাঁ কাহিয়ে, কিসকো চাহিয়ে? সকল অনুমান মুহূর্তে ঘুচল, সেও কেঠো উর্দুতে কথা শুরু করল। মেরা দোস্ত সিমূল ইহাঁ রহতে থে। উওলোগ কিধার গিয়া, মালুম হ্যায় ? হাম তো পারসোই ইধার আয়া, আর্মিকা সাথ। উয়োলোগ বোলা কে হাম ইধার ঠাহার সাক্তে হ্যায়। তো হাম বিবিবাচ্চা লেকে ঘর বাসা লিয়া। আপকা তারিফ? শিমূল হুড়মুড়িয়ে বলে, মেরা এক কেতাব থা মেরা দোস্ত কা পাস, ওহি লেনে আয়ে থে, ব্যস। উয়োলোগকা সামান-উমান কিধার হ্যায়? হ্যায় কুছ? নেহি, নেহি, দেখিয়ে না। আন্দার আইয়ে, মালামাল তো সাব লুটহো গিয়া। এহিঁকা বিহারিওঁনে সব লে গিয়া। ওরা নির্বাক তাকিয়ে দ্যাখে আর শোনে। শিমূলের কান্না পায় দমকে দমকে। ওর অতগুলো নতুন বই, পরীক্ষার পর পড়তে বলে এতদিন ধরে কিনে জমিয়ে রেখেছে। মায়ের অত যতেœর গেরস্থালিসব লুঠ? বিশ্বাস হতে চায়না। বিদ্যুতের ওয়্যারিং পর্যন্ত খুলে নিয়েছে, আব্বা নিজহাতে সারাবাড়ির ওয়্যারিং করেছিলেন। বহুদিন বাদে ছন্নছাড়া শিমূল অস্তিত্বের গভীরে মা-বাবার কথা ভেবে কষ্ট পেল। বেরিয়ে এসে রিকশায় উঠে পান্নুভাই বললেন, চল, চৌগাছি যাব। কবে? মানসিক প্রস্তুতি শিমূলের ইতিমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। চল, অফিসে গিয়ে আমিন সাহেবকে বলি, একটা দরখাস্ত ফেলে চল ঢাকা ছাড়ি।

যথারীতি পরদিন সকালে দু’ভাই দুটো হাত ব্যাগে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে আলির ভরসায় সংসার, বইপত্র রেখে নিউমার্কেট থেকে আরিচার বাসে চাপল। পান্নুভাইয়ের বাসায় শিমূলের বেশ ক’প্রস্থ শার্টপ্যান্ট, পাজামা পাঞ্জাবি ছিল। আলি সেগুলো রাতেই ইস্ত্রি করে ব্যাগে ভরে দিয়েছে। শিমূলের মাথাটা হালকা লাগছে। একেবারে চিন্তাশূন্য। আচ্ছা, হাসানটার কোন খোঁজখবর নেই কদিন। তুমি কি ওর লেইটেস্ট অবস্থান সম্পর্কে কিছু জান? পান্নুভাই ক্যাপস্ট্যান ধরিয়ে টান দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেন। হ্যাঁ, ও শান্তিনগরে শাহজাদ ফরদাউসের পুকুরওলা কটেজে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত শান্ত এলাকা ওটা এখন। ফিরে এসে ভাবছি কাঁঠালবাগানে মেজ মামার বাংলোটা আমরা ভাড়া নেব। দেবেন তো মামা? শিমূলও দেখাদেখি সিগ্রেট ধরিয়ে বলে। তোমাকে মামা রিফিউজ করবেনা বোধহয়। বাড়িটা তো খালি পড়ে রয়েছে কয়েক মাস। বর্তমান অবস্থায় তুমি চাইলে হয়তো দিয়ে দেবেন পান্নুভাইয়ের কন্ঠে নিরাসক্তি।

মামার সঙ্গে পান্নুভাইয়ের সম্পর্ক অনেকদিন যাবতই একটু টানটান। ঐযে পান্নুভাই গ্র্যাজুয়েট হতে অনাগ্রহী আর মামা ভাগ্নেকে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে দেখতে চান দ্বন্দ্বই সেই সাধ-অসাধের দ্বন্দ্বই এর কারণ। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের বেতন থেকে টাকা বাঁচিয়ে অর্থাৎ হুইস্কি সেবনাদি কাট্ করে শিমূলও পান্নুভাইয়ের পরীক্ষার ফিজ জমা দিয়েছে একবার। উনি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় বসেননি। মানিকগঞ্জ বাস্ স্টপে নেমে শিমূল গরম-লাল্চে ভাজা সিঙাড়া কিনল এক ধোঙা। বাসে যেতে যেতে খাবে। কন্ডাকটর এবং নিত্যাযাত্রীদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলাপ জুড়েছেন পান্নুভাই। আরিচা ঘাটের কি অবস্থা। আর্মি এপথে সাভার পেরিয়ে কবে নাগাদ আসতে পারে। ফেরি না পেলে কিভাবে পদ্মা পার হওয়া–এইসব বিষয়ে প্রশ্ন করছে নির্দোষভাবে, জানার জন্য কেবল। ওদের যেহেতু কোন পরিকল্পনা নেই এযাত্রায়–একটি বিষয়ে দু’ভাই একমত হয়েছে গতরাতে পাঁচমিনিট সিরিয়াসলি ভেবে। চৌগাছি যাবার পথে তারা যতগুলি সম্ভব আত্মীয়বন্ধুর বাড়ি ঘুরে যাবে। মোটামুটি ছক যেটা দাঁড়িয়েছে, তা হল–নদী পেরিয়ে রাজবাড়ি, তারপর কালুখালি, সেখান থেকে বালিয়াকান্দি, নাড়–য়া হয়ে গড়াই গাঙ পেরিয়ে চৌগাছি পৌঁছনো হবে।

আরিচা পৌঁছেছিল ওরা দুপুরের পর। বেশ খিদে পেয়েছে তখন। পান্নুভাই খাবারের দোকানগুলো দ্রুত সার্ভে করে নিয়ে সন্দিহান গলায় বললেন, এইসব খাওয়া যাবে? খুউব যাবে। বলে শিমূল ফাঁকা দেখে একটির দিকে এগোল। পান্নুভাই অগত্যা পিছু-পিছু। দুজনেরই ব্যাগকাঁধে। দোকানদার এগিয়ে এলো, আসেন, পদ্মার তাজা ইলিশের ঝোল, খাসির মাংস…লাউঘন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। শিমূল বসে পড়ে লম্বা বেঞ্চে। সিগ্রেট ধরায়। পানি খায় একগ্লাস। তখনকার দিনে যেখানে-সেখানে পানি খাওয়া যেত। এতরকম সংক্রমণের ভয় ছিল না। গরম ইলিশের ঝোল, ধোঁয়াওঠা মোটাচালের ভাত, উচ্ছেভাজার সাথে মাসকলাইয়ের ডাল দাও দুজনকে, শিমূল বলে যায় আর কাঠের পাটাতনের নিচে পদ্মা-যমুনার মিলিত ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে। দোকানের ছেলেটা ঠিকঠাক খাবার সাজিয়ে দিয়ে দাঁড়ায়, কিছু লাগলে বলবেন। অবশ্যই, বলে শিমূল ভাতের থালা টেনে নেয়, আচ্ছা মহাজন সাহেব, ফেরি-টেরি তো কিছু দেখছি না এপারে। আমরা বাড়ি যাবো ক্যাম্বা? কেন, নৌকায় যাবেন, তবে আজ আর হবে না, এই বিকেলে আর এই ঝড়ের মতো বাতাসের মদ্যি আর নৌকো ছাড়বেনানে। কাল সকালে যাবেন। দোকান মালিকের নিশ্চিন্ত উত্তর। মাছটা টাটকা, পান্নুভাই মন দিয়ে খেতে খেতে বলেন। আর রান্নাটাও চমৎকার, বলে শিমূল আবার মহাজনকে জিজ্ঞেস করে থাকবো কোথায়? এখানে তো হোটেল-ফোটেল দেখছি না। কেন? আমার এখানেই থাকবেন, পিছন দিকে রুম আছে। স্মার্ট উত্তর শুনে শিমূল আঁতকে ওঠে, নদীর ওপর? সারারাত ঢেউভাঙা শুনবো? ঘুম হবে না আমার। হবে, হবে, আমরা গুমাই না? নিশ্চিন্ত থাকেন, সকালে উঠাইয়া নাশতা বানাইয়া খাওয়াইয়া নৌকা ধরাইয়া দিমুনে। আর আপনাগো নাক ডাকলেই ব্যাগ আর টাকা পয়সা হাতাইয়া, গলা কাইট্রা, নদীতে জলাঞ্জলি দিমু টাপুস্ আর টুপুস্ শব্দে ছলাৎ ছলাৎ জলে ভাইসা যাইবেন, টেরও পাইবেনা না, পান্নুভাইয়ের নিচুগলার উচ্চারণ। দূর, আপনিও একজন কল্পনাপ্রবণ মহাজন বটেন। এই এগারো বছর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে কি লাভ হল ? শিমূল উচ্চস্বরে হতাশা নিবেদন করে, হাত ধুতে উঠে পড়ে। ফিরে এসে বসতেই পান্নুভাইয়ের প্রশ্নাঘাতমনে হচ্ছে তুমি কুড়িতেই বুড়ো হয়ে গেছ মানবজমিন চষে চষে, নাকি? তা খানিকটা বলতেই পারেন, শিমূল আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে খানিকটা দাবির সুরেই বলে, ছোটবেলা থেকেই যতটা একা-একা ঘোরা ফেরা করতে পেরেছি আর বিশেষ করে, গত চার-পাঁচ বছরে ইউনিভার্সিটি হলে আবাসিক থেকে আর বাউন্ডুলে বন্ধুদের সঙ্গে যখন যেখানে ইচ্ছে সফর করে, দুর্যোগে ত্রাণ বিলিয়ে, কিছু মানুষ তো দেখা হয়েছে। তাহলে, ঢাকা ফিরবে না আপাতত:। তাই তো ঠিক করলে? প্রশ্নই ওঠে না পিছু ফেরার, শিমূল বলে, আর বাধা পেয়ে এখন আরও বেশি যেতে ইচ্ছে করছে পদ্মা পেরিয়ে জানা-অজানায়। ঠিক আছে, ভাইজান। দোকানদারকে বলেন পান্নুভাই, আমাদের ঝোলাঝুলি আপনার খবরদারিতে থাকুক, আমরা ঘুরে ফিরে দেখি চারদিকটা।

আরিচায় কখনো এরকম একবেলা বসে থাকার সুযোগ তো ঘটেনি আগে। শিমূল সাঁতার জানেনা মোটেও। তাই বড় নদী দেখলে ওর শরীর ছ্মছ্ম করে। মনে হয় ওই প্রবল, বিশাল, অস্থির জলসম্ভারের আছে সকল কিছু ভাসিয়ে নেবার, নাকানি চুবানি খাওয়ানোর সুপ্ত পেশল শক্তি। কিন্তু নদনদী বোধ হয় মানুষের অসহায়তা বিষয়ে জেনে গেছে, তাই ওরা প্রায়শই মঙ্গলময় এক বিস্ময়, এক সহায়তাকারীর ভূমিকাই পালন করে কেবল। মনে মনে পদ্মার বিশালতা আর শক্তির সম্মুখে প্রণত হয় সে।

ঘোরাফেরা শেষে, সন্ধ্যের পর বাতি জ্বালা হলে, দু’ভাই বইখাতাকলম নিয়ে দু’টো বেশ্চির দখল নেয়। ডায়রি লেখা, ‘দেশ’ পত্রিকা পড়া আর ফাঁকে ফাঁকে চা খেয়ে গল্পগাছা করে কখন দশটা বেজেছে, ওরা টের পায়নি। এরমাঝে দু’চারজন নিত্যখদ্দের এসে খেয়ে গেছে কোন ফাঁকে। শিমূল ওদের জলে ভাসা শোবার ঘর দেখে এসেছে ইতোমধ্যে। টয়লেট যেমন এলেবেলে ভেবেছিল, তারচেয়ে শক্তর্পেক্তি ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা। ওরা যথারীতি খেয়ে উঠে পেছনের ঘরে চলে যায়। সামনে দোকানমালিক তখনো জেগে বসে আড্ডা দিচ্ছে পাশের দোকানির সঙ্গে হেঁকে-হেঁকে, এদোকান-ওদোকান। কাঠের চৌকিতে চিত হবার পর দোকানের ছেলেটি মশারি টানিয়ে গুঁজে দিল, জিজ্ঞেস করল, সকালে কয়টায় উঠবেন? নাশতা দিমু কহন? যখন উঠি, তখন, কোন তাড়াহুড়ো তো নেই, পান্নুভাই বলেন, নাকি নৌকো ছেড়ে দেবে আমাদের না নিয়েই? আমি কই, স্যার সকাল-সকাল উইট্যা নাস্তাপানি খাইয়া রেডি অইয়া থাকবেন। নৌকা ছাড়বো আমাগো দোকানের পাশ থিকাই। বাত্তিডা নিবাইয়া দিমু? না না, শিমূল বলল, বাততি জ্বলুক। আমি অন্ধকারে ভয় পাই, আর এখানে তো আবার পদ্মা নদীর ছলছলাৎ এই বিছানার নিচেই। থাক্, আলো আমি নিবিয়ে দেব পরে। দরজা টেনে ভেজিয়ে দিয়ে ছেলেটি চলে গেল।

সকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে নাশতা খেয়ে নৌকোয় উঠতে সাড়ে আটটা বাজল। যাত্রী একশোর মতো। মস্তোবড় পাল তোলা হল। হাল ধরে বসে আছে দু’জন। এরতরিয়ে নৌকো কোনাকুনি নদী পাড়ি দেয়ে গোয়ালন্দ পৌঁছে গেল।

নদীর বাতাসে নাশতা হজম, চলো গোয়ালন্দের এগরোল-চা খেয়ে একটা রিকশা নেব, বলে পান্নুভাই ঘাটের খাবার দোকানের ভেতরে ঢুকে যান। শিমূল অনুসরণ করে। প্রস্তাবটি তারও মনমতো বটে। খাওয়া হল ভাল রিকশা পেতে তেমন কষ্ট হল না। শিমূল কেবল একবার হেঁকে জিজ্ঞেস করল, রাজবাড়ি বাড়ি কার? রাজবাড়ির রিকশা কুন্ডা? স্ট্যান্ডের দু’তিন জন সমস্বরে বেজে উঠল, আসেন, রাজবাড়ির গাড়ি এইডে, যাবেন কনে, আমি রাজবাড়ির ইত্যাদি ভরসাবাণী উচ্চারণ করে। মজবুত দেখে বেছে নিয়ে একটিতে শিমূল উঠে বসল। দরদাম করলে না? পান্নুভাই নিচুকন্ঠে জিজ্ঞেস করেন উঠতে উঠতে। কি হবে, দু’পাঁচ টাকা বেশি দেব অথবা ও কম নেবে, এই তো? শিমূল এরিনমোরের র্কৌটো খুলে ইতোমধ্যে বড়োতামাকের বিড়ি ধরিয়েছে। লম্বা টানে ফুসফুস ভরে ধোঁয়া টেনে নিয়ে, দম আটকে মিনিট দুই কাটিয়ে দিল। চারিদিক নিঃশব্দপ্রায়। শুধু প্লাডেল মারার ক্যাঁচকোঁচ। তামাকসেবন শেষ না হতেই শিমূলের বেশ মাতোয়ারা দশা। সে রিকশাওয়ালার সঙ্গে আলাপ জুড়ল। নাম জামাল। স্টেশন রোডে বাড়ি। সেই বিহারি চমচমওয়ালা আছে তো, জামাল? শিমূলের প্রশ্ন শুনে জামাল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ও অবাক হয়েছে। জি স্যর, আপনি বিহারির চমচম খাইছেন ? ক-অ-অ-তো। আউয়াল মামার বাড়ি আলিই তো খাওয়া পড়ে। শিমুলের ঝটিতি জবাব। চেন আউয়াল ডাক্তাররে? আমাগের মামা হন। চিনিনে আবার, জামাল বলে, আমাগের বাড়ির কারো জ্বরজারি হলি তো ওই আউওল ডাক্তারের কাছেই যাই। খুব বালো ডাক্তার। মদ্যি মদ্যি টাকাপয়সাও দিয়ে ওঠা হয় না। হাতে না থাকলি আর কি । কিন্তু ওষুদ ডাক্তার দেবেই। শিমূল, পান্নু দুজনেই মনে মনে প্রীত।

আউয়াল মামাকে ওরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে তো, মনে হচ্ছে, সেই আগের মতোই দিলখোলা, সেবাপরায়ণ আর খেয়ালি রয়ে গেছেন মানুষটা। তবে এসেনশিয়ালি মফস্বলের মানুষ। আবার সফিসটিকেশনও মামাকে ছোঁয়, যখন তাঁর উপন্যাসে উনি এংলো-ইন্ডিয়ান নায়িকা আর মুসলমান যুবকের রোমান্স বিষয়ে কলম চালান। লেখার বাতিক মামার বহুদিনের। শিমূল বাবার কাছে গল্প শুনেছে, দেশভাগের আগে চল্লিশ দশকের শুরুতে, আউয়াল মামা, তার পিঠোপিঠি ছোটভাই ওয়াহাবশিমূলদের মেজ মামা, ছোট ভাই আতর মামা আর শিমূলের বাবা মীর আমজাদ আলী কোলকাতায় পার্ক সার্কাসে বসবাস করতেন। আমজাদ কাজ করতেন বাটা শ্যূ কম্পানিতে, আউয়াল ও আতোয়ার (শিমূলদের আতর মামা) কাশীপুর গানসেল ফ্যাকট্রিতে আর ওয়াহাব ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সে। তিনভাই ও হবু ভগ্নিপতি (আমজাদ যুদ্ধের পরে শিমূলের মা বকুলকে বিয়ে করেন ১৯৪৬ সালে) মিলেমিশে প্রথম দিকে মেস করে থাকতেন। বিয়ে করে একেকজন আলাদা বাসা ভাড়া করে উঠে যান। আমজাদ সবার শেষে বিয়ে করেন। তবে চার পরিবারের মধ্যে দহরম-মহরম ক্রমশ: বেড়েছে বৈ কমেনি।

রাজবাড়ি শহরে পৌঁছে ওরা সামনে পেল সেলিম মামার বাড়ি, আউয়াল মামার বাড়ি পৌঁছনোর আগেই। দেখি কি হয়, বলে শিমূল লাফিয়ে রিকশা থেকে নেমে মামাবাড়ির সদরে করা নাড়ে। এক মহিলা দরজা খুলে দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালেন, অমনি বারান্দায় সেলিম মামার নেয়াপাতি ভূঁড়িটি ভাসছে আর ঢেউ তুলে তুলে ডাকছে, শিমূলের মনে হল। পেছনে না ফিরে, পান্নুভাইকে সে চেঁচিয়ে ডেকে ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, ঠিকই মামার লুঙি ভুঁড়ির নিচে বাঁধা, আর মামা হাসছেন হা হা করে। আয়, আয়, সঙ্গে পান্নু বুঝি, বেশ বেশ, তা বু কেমন আছেন? দুলাভাই? রবুরা সব ভাল তো? অত প্রশ্নের উত্তর দেব কিভাবে? আগে চা-টা খাই, মামা, তারপর ধীরে সুস্থে বলছি, শিমূল মামাকে থামায় আপাতত। ও হ্যাঁ, বুয়া, আমার ভাগ্নেদের চা-নাস্তা দাও জলদি। পান্নু, মামা, এসো, এসো, বোসো, তোমাদের মামী আবার গেছেন ঢাকায়। এই দুর্যোগে ঢাকায়? মামী? কবে গেলেন? কি ভাবে? শিমুলের অনুসন্ধিৎসা হঠাৎ প্রবল হয়। না, না, সে গেছে, মা হবে তো, তাই মাসখানেক আগে আমিই রেখে এসেছি। তোমাদের তা বলে কোন অসুবিধে হবে না, বুয়া চমৎকার রাঁধে। তোমাদের মামী থাকলেও ওই রাঁধতো। সেলিম মামার বরাভয় শিমূলের অস্থিরতা কমাতে মোটেই সহায়ক হয় না। আমরা কি কেবল আপনার বাসায় শুয়ে, বসে আর খেয়ে এবছর কাটিয়ে দেব ভেবেছেন নাকি? পদ্মার এপারে যত আত্মীয়কুটুম রয়েছে আমাদের, মানে ছোটবেলা থেকে যাদের গল্প শুনে এসেছি, এবার ইচ্ছেমতো সব জায়গায় যাব, দেখব, চিনব সকলকে। শিমূল থামে। চায়ের কাপ তুলে চুমুক দেয় আর গরম পেঁয়াজুতে কামড় বসায়। পান্নুভাই চুপচাপ চা খান, সিগ্রেট ধরান। শিমূল প্যাকেট খুলে মামার সামনে এগিয়ে দিলে উনি রীতিমত আহতমুখে বলেন, তুমিও ধরেছো? পরক্ষণেই পান্নুভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ের সুরে বলেন, তোমারই কাজ এটা, বুঝতে পেরেছি। না বাপু, আমি ছেড়ে দিয়েছি। তারপর থেকে ভাত খাওয়া বেড়ে গিয়েছে, দেখছনা ভুঁড়ি? সেলিম মামা ভুঁড়িতে আদর বুলোতে থাকেন। আরও একটা কি যেন বেশি বেশি খাচ্ছেন আপনি শুনেছি, পান্নুভাই মুখ খোলেন। সেটা আবার কি, বাবা, মামা মধুরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন। ঘু-উ-উ-ষ । পান্নুর নির্ঘোষ শুনে মামা ভুড়ি সামলে দ্রুত উঠে টয়লেটে গেলেন।

নেহাৎ তুমি চেঁচিয়ে ডেকে নামালে, নইলে এখানে আমার আসার ইচ্ছে ছিল না, বড়মামার ওখানেই যেতাম সোজা। পান্নুভাইয়ের ভাবলেশহীন মুখাবয়ব দেখেই শিমূল সেটা বুঝতে পারছিল। ঠিক আছে, আজকের দিনটাই তো, কেটে যাবে, কাল সকালে সেলিম মামা অফিসে যাবে, আমরাও বেরোব। মামা টয়লেট থেকে ফিরলে ওরা উঠল, স্নান সারল, খেল, দিনদুপুরে ঘুমোল। উঠে চা খেয়ে মামার ঘরে উঁকি দিয়ে, নিদ্রিত মামাকে রেখে রাস্তায় পা দিল। তাজা বাতাস সেবন ও জোর কদমে হাঁটা হল ঘন্টা আধেক। টুক্ করে একফাঁকে শিমূলের বন্ধু হালিমের বাড়িতে ঢুকে পড়াও গেল। একটু দূরেই আউয়াল মামার বাড়ি।

হালিম সৌখিন ফোটোগ্রাফার। ওদের বসার ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো হালিমের তোলা দারুন সব ল্যান্ডস্কেপ আর পোট্রেট। মুগ্ধ হয়ে দেখছিল ওরা। হালিম এলো, শিমূলের সঙ্গে কোলাকুলি করে পান্নু ভাইয়ের করমর্দন করল। আচ্ছা, হালিম, আউয়াল মামা কি শহরে? নাকি বালিয়াকান্দিতে গেছেন? একটু ডিসক্রিটলি খবর নিবি? শিমূলের অতগুলো প্রশ্নের জবাবে হালিম শুধু বলল, দশ মিনিট সময় দে আমাকে। বলে ভেতরবাড়িতে ঢুকে একটু পর ট্রে হাতে ঢুকল আবার। কাচের বাটিতে মুড়ি আর পানির গ্লাস। তুই আবার মুড়ি-ফুড়ি আনলি কেন? আমরা আধঘন্টা আগেই একদফা জলযোগ সেরে বেরিয়েছি ফুড কন্ট্রোলারের বাড়ি থেকে, শিমূল নিবেদন করল। আরে খা, খা, ভাই আপনি নেন। ওর কথা বাদ। না দেখেই সাত কাহন, বলে হালিম ওদের হাতে মুড়ির বাটি তুলে দিল, সেও নিল।

শিমূল চামচ চালাতে গিয়ে বুঝল, আটকে যাচ্ছে মুড়ির বাটিতে। মুড়ির নিচে কি রে, হালিম? এহ্ হে যা ভেবেছি, এরকম বটের আঠার মতো খাদ্য দুধকদু না হয়ে যায় না, বলে শিমূল এক চামচ অমৃত-মুড়ি মুখে চালান করে চোখ বুঁজল। এরকম গোলাপজল গন্ধের দুধকদু কেবল মা রাঁধে আর চৌগাছি গেলে খেতে পাই, আহ্। হালিমের মা চা নিয়ে আসেন ওই সময়। কথা না বলে খাও বাবা, আর এক বাটি দেব তোমাকে? খালাম্মার অফার শিমূল সাথে-সাথে লুফে নেয়। বলে, পান্নু ভাইয়ের কথা জানিনা। আমার জন্য তো সারাবাংলায় মায়েরা বসে থাকেন, কখন শিমূল আসবে আর পাত পাড়বে। এই যেমন এখানে জুটছে। প্লিজ রিফিল, খালাম্মা বলে সে শূন্য বাটি এগিয়ে দেয় হালিমের মায়ের দিকে। উনিও ঝটিতি ভেতরে গিয়ে আরো বড় বাটিতে দুধকদু আর মুড়ি এনে সেন্টার টেবিলে রাখেন। চামচ শিমূলের হাতে দিয়ে চলেন, তোমরা যার যেমন ইচ্ছে এবারে এই বাটি থেকে নিয়ে খাও, আমি দেখি। অগত্যা পান্নুভাইও চা শেষ করে আরেক চামচ খাবার মুখস্থ করেন। ইতোমধ্যে কুসুমহালিমের ছোট বোন আউয়াল মামার বাড়ী ঘুরে এসেছে। খবর দিল, ডাক্তার কাকা তার ডিসপেন্সারি পরিদর্শনে বালিয়াকান্দি গেছেন। মেয়ে লিলিও সঙ্গে গেছে। খেতে খেতেই শিমূল মনে মনে ছক কষে। কাল সকালের ট্রেনে কালুখালি যাবে। সেখানে একদিন থেকে বালিয়াকান্দি রওনা হবে।

ভারী নাশতা হয়েছে। অতএব আবার হাঁটতে হবে। নইলে সেলিম মামার রাঁধুনির কেরামতি তো মাঠে মারা যাবে। তা হবার নয়। খালাম্মার পায়ে চুমু খেয়ে শিমূল বিদায় নেয়। হালিমও ওদের সঙ্গী হয়। এদিক-ওদিক আরও ঘন্টাখানেক ঘুরেফিরে ওরা বাড়িমুখো হয়। রাত হচ্ছে। হালিম বুকে বুক মিলিয়ে নির্জন রাস্তায় টিমটিমে হলদে আলোর নিচে হেঁটে চলে একা নতমস্তকে।

শিমূল একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাঝে-মাঝে দেখা হওয়া স্বভাব-ফোটোগ্রাফার বন্ধুর চলন দেখল। তারপর পা চালিয়ে পান্নুভাইয়ের পার্শ্ববর্তী হল। চৈত্রের মাঝামাঝি সময়। পথের পাশে পুকুর-ডোবার ওপরে হালকা কুয়াশার পর্দা নামতে দেখে অবাক পান্নুভাই উদাত্ত গলায় রূপসী বাংলার কবিতা একের পর এক আবৃত্তি করে চলেন।

সেলিম মামা বসে ছিলেন ওদের অপেক্ষায়। ওদের খিদে নেই মোটেও। কিন্তু খেতে বসতে হল। খাচ্ছিস না তোরা যে মোটে। ব্যাপার কি? কোথায় যাওয়া হয়েছিল ? মামার প্রশ্নের উত্তরে শিমূল বলল, হালিমদের পাড়ায়। ওর মা আবার দুধ-কদু খাওয়ালেন জোর করে। একটু বেশিই খেয়েছি আমি। পান্নুভাই খোঁচালেন, না মামা, ও চেয়ে নিয়ে দু’বাটি সাবাড় করেছে। এদিকে যে আপনি ভাত বেড়ে বসে আছেন, সেকথা ভাবলো না একবার। আর আমি দেখেন না মাংস খেলাম কতখানি! যা রেঁধেছে আমাদের মাসী। আহ, বলে ঢেঁকুর তোলেন লম্বা।

খেয়ে, অল্পক্ষণ আড্ডা চলল। সকালে মামা অফিস যাবেন। ওরাও বালিয়াকান্দি রওনা হবে। বিদায় নেয়া থাকল। সকালে উঠে, স্নানাহার সেরে তৈরি হতে সাড়ে ন’টা বাজল। ওরা ঠিক করল, রাজবাড়ি রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকবে। কালুখালি যাবার ট্রেন সামনে এলেই উঠে বসবে। স্টেশনে পৌঁছে শুনল, যে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফমের্, সেটাই ওদিকে যদ্দূর সম্ভব, যাবে। টিকিট কাটতে গেছে শিমূল, টিকিটবাবু ভদ্রলোকটি হাসতে হাসতে বলেন, তখন তো আর কেউ টিকিট কাটে না। স্বাধীন বাংলা কিনা, হা-হা-হ। তবুও আপনার টিকিট চাই? এই নিন কালু খালির দু’টো টিকিট, সেকেন্ড ক্লাসের দিলাম। দাম কিন্তু ইন্টারক্লাসের রেখেছি। হা-হা-হা। শিমূলও হাসতে হাসতে ফিরে, পান্নুভাইকে বলে, চলেন উঠি গাড়িতে। স্বাধীন বাংলায় এসে পড়েছি আমরা।

ট্রেন ছেড়ে দেয়। শিমূলের মনে পড়ে, দশ-বারো বছর আগে যখন প্রতিবছর মা ওদের নিয়ে মামাবাড়ি আসতেন, তখন গোয়ালন্দের পর থেকে সব রেলস্টেশনের নাম মুখস্থ বলতে পারত। বেলগাছি, সূর্যনগর … আবার কালুখালি জংশনে গাড়ি বদলে ব্রাঞ্চ লাইনে রামদিয়ার রামের মট্কা খেতে খেতে যাওয়া হত। ওদিকে কুষ্টিয়া বড়খালার বাড়ি যেতে পাংশা, খোক্সা, মাছপাড়া, কুমারখালি..। খোকসা কিংবা মাছপাড়ায় নেমে ঘোড়গাড়ি চেপে জানিপুর ঘাটে নৌকায় ওঠা হত কোনবার হয়তোনানাভাবে নানাবাড়ি যাওয়া আসা হত সেকালেশিমূলের মায়ের চলনদার অর্থাৎ মামা বা খালু যেভাবে সুবিধে মনে করতেন, সেভাবেই ভ্রমণ করা সঙ্গত ছিল। সব পথই ওদের জন্য সমান উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ বয়ে আনত।

কি ভাবছো অত? পান্নুভাইয়ের প্রশ্নে শিমূল নড়েচড়ে বসে। এই পথের কথাই ভাবছিলাম, ছোটবেলা থেকে তো আমাদের যাওয়া-আসা এপথে। দেখলেই চেনা চেনা মনে হয় সবকিছু। পুরনো মহীরুহ অব্দি। ঠিকই বলেছো তুমি, ওই বড় প্রাচীন গাছগুলো দেখবে ভূমি জরীপ ম্যাপে সেই কবে থেকে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কেউ কেটে না ফেলা পর্যন্ত থাকবে, পান্নুভাই কথা বলতে বলতে সিগ্রেট ধরান। শিমূল জানালায় চিবুক রেখে দূরে তাকিয়ে থাকে। অপু-দুর্গার ট্রেনের সমান্তরালে ছোটা দৃশ্য মনে পড়ে। অপুর কচি মুখ মনশ্চক্ষে দেখে, দুর্গার কথা মনে করলে চোখ ভিজে আসে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে ‘পথের পাঁচালী’ সরকারের তথ্য দপ্তর স্কুলে স্কুলে পর্দা টানিয়ে দেখিয়ে বেড়াত।

শিমূল তখন পাতলা খান লেইনে থাকত। গলির মাথায় নর্থব্র“ক হল রোডে পড়বার আগেই ডানদিকে মুসলিম হাই স্কুলের টানা উঁচু পাঁচিল। বাঁয়ে পাতি রেস্তোঁরা, মুদি দোকান আর র‌্যাশান দোকান। পাড়ার ডানপিটেদের সঙ্গে মিলে এক সন্ধ্যায় স্কুলের পাঁচিল ডিঙিয়ে মাঠে লাফিয়ে পড়ে, অন্ধকারে মিশ্র জনতার সঙ্গে ঘাসের কার্পেটে বসে সত্যজিত রায়ের প্রথম ছবিটি প্রথমবার দেখা ঘটেছিল। অনেকরাতে বাড়ি ফিরে মায়ের পিটুনি খাওয়া নিশ্চিত জেনেও শেষ দৃশ্য অব্দি দেখে ভারাক্রান্ত মনে বন্ধু মিহিরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ফিরেছিল।

কালুখালি। কালুখালি কুলিদের হাঁক শুনে ওরা দু’ভাই ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নামল। নীলু দুলাভাইয়ের বাড়ি স্টেশনের পাশেই। ইন ফ্যাক্ট ওই পরিবারের জমিতেই বৃটিশ আমলে কালুখালি রেল জংশনের যাবতীয় স্থাপনা বসানো হয়েছিল। এদিক-ওদিক রেলপথের বেশ খানিকটাশুদ্ধ সবই চৌধুরিদের জমি ছিল। স্টেশনের একপাশে চৌধুরিদের বসতবাড়ি, অন্যধারে রতনদিয়া বাজার। ওই বাজারও চৌধুরিদের জমির ওপরে। নীলু চৌধুরির দাদা, বাবা সবাই বৃটিশ ভারত এবং ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়িত থেকেছেন, মোটামুটি নামডাকও রয়েছে। শিমূল ওর মায়ের কাছে আশৈশব শুনে এসেছে, জানুখালা এবং পুলিশ অফিসার আলীম খালুর বড় মেয়ে চাঁপা অর্থাৎ পান্নুভাইয়ের সহোদরার বিয়ে হয়েছে রতনদিয়ার চৌধুরিদের ফুটবল খেলোয়াড় ছেলের সঙ্গে। নীলু দুলাভাই অবশ্য ঢাকায় ওদের বাসায় অনেকবার গেছেন, তাই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে।

পান্নুভাইয়ের পিছু পিছু ওভারব্রীজে উঠে, ডানদিকে নেমেই ওরা চৌধুরিবাড়ির ফটকের মুখোমুখি। বাড়ি আর রেলস্টেশনে এত ঘনিষ্ঠ মাখামাখি–শিমুলের খুব মজা লাগল। ভাবল, সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করলেই স্টেশনে চলে যাবে, প্ল্যাটফর্মে সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চে বসে যাত্রীদের আনাগোনা দেখবে, বেশ হবে।

অন্দরে ঢুকে পান্নুভাই একটি ছোট খাটো মহিলার পা ছুঁলেন, দেখাদেখি শিমূলও। পান্নুভাই শিমূলের বিব্রত মুখের পানে তাকিয়ে হাসলেন, এই আমাদের সেই আপা আর তোমাদের ছোটবেলা থেকে শোনা চাঁপাবু’। বুঝতে পেরেছি, তা’ চাঁপাবু’, শিমূল সহজভাবে বলল, বাড়ীর চারদিকেই ঘর দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ব্যাগগুলো কোথায় রাখব, যদি বলেন। হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরা এখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে আর আমি পান্নুকে দুনিয়ার খবর জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি। ঐ যে ওই সব্জে রং দরোজা ঐঘরে তোমরা ওঠ। তারপর তোমার দুলাভাই আসুক, শোবার ব্যবস্থা রাতে দেখা যাবে। কোথায় উনি? পান্নুভাই হাঁটতে হাঁটতে শুধোন। মুক্তিযোদ্ধাদের বন্দুকবাজির ট্রেনিং চলছে স্কুলের মাঠে, ওখানেই সারাদিন ব্যস্ত গত কদিন থেকে, বলে আপা বাড়ির পেছনে রান্নাবাড়ির পানে এগোন। যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়েন, শিমূল, তোমরা কাপড় ছেড়ে গোসল করবে এসো। গোসলের ব্যবস্থা কোথায় শিমূল জানতে চায় আর ভাবে, গোসলখানা নিশ্চয়ই আছে, পুরনো মুসলিম জমিদার’ বাড়ি যখন। গোসলখানা, কূয়ো, পুকুর যেখানে খুশি যাও, আগে। খিড়কি পুকুরটা দেখে এসো একবার। আমাদের বাড়ি যারা বেড়াতে আসে, ওই পুকুর দেখার পর তারা আর বাথরুম খোঁজেনা, বলে মিটি মিটি হেসে বু’ চোখের আড়াল হন।

লুঙি পরে, আরেকটা লুঙি আর গামছা ঘাড়ে ফেলে ওরা বাড়ির পেছনদিকে পা বাড়ায়। রান্নাবাড়ির দালানে কয়েকজন গ্রামীন মহিলা নানা কাজ সারছেন। কলাগাছের সারি পেরোতেই দৃষ্টিনন্দন এক ফুলবাগান, তার মাঝখান দিয়ে হাঁটাপথ। তারপর নারকেলবীথির মধ্যমনি এক টলটলে জলেভরা মাঝারি মাঝারি আকারের পুকুর। পুকুরের চারধার ঘিরে নারকেল গাছের সারি। ঝক্ঝকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নিয়মিত ঝাঁটপাট হয়, বোঝা যায়। উত্তর-দক্ষিণ দুই পাড়ে চওড়া বাঁধানো ঘাট। সিমেন্ট বাঁধানো হেলান দিয়ে বসে আড্ডা দেবার উপযোগী আসন ঘাটের তিনদিকে, মাঝে জলে নামার পথ। শিমূল চমৎকৃত হয়, ঘাটের হেলানো টানা চেয়ারে টানটান শুয়ে পড়ে। এপ্রিলের নীল আকাশ, চিল চক্রাকারে ওড়ে বহু ওপরে। আকাশভরা, সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ, ওর খোলা গলায় রবীন্দ্রনাথের মেসেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পান্নুভাই সিগ্রেট ধরিয়ে বসে চুপচাপ শুনে যান। গান গাইতে গাইতে স্বস্তিতে, আরামে শিমূলের চোখ বুঁজে গিয়েছিল।

হাততালির শব্দে ও চোখ মেলে। দ্যাখে, দুলাভাই ওর শিয়রে দাঁড়িয়ে। হাস্যোজ্জ্বল মুখ, টাওয়ারের মতো দীর্ঘ খাড়া শরীর, পরনে ব্রীচেজ, বুট, সায়েবদের মতো বুশশার্ট, মাথায় ফেল্ট টুপি, হাতে দো’নলা বন্দুক। তড়াক্ করে লাফিয়ে উঠে সে নীলু চৌধুরিকে আগাপাশতলা অবলোকন করে, তারপর মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে, ওয়েল, হান্টার, হোয়াট উড ইউ লাইক টু কিল? হোয়াই, দ্য পাকিস্তানী অকিউপেশান আর্মি? হোয়াট এলস? আড়াল থেকে চাঁপাবু বেরিয়ে আসেন, ঠোঁট বেকিয়ে বলেন, তা’লেই হয়েছে। তোমরা এবার পাকিস্তানীদের ধরে-পাকড়ে ওর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দাও, কেবল দাঁড় করলেই তো হবেনা, যদি দৌড়ে পালায়? হাত পা বেঁধে নারকেল গাছের গোড়ায় পেঁচিয়ে বেঁধে দিলে যদি উনি বন্দুক তাক করেন–এপর্যন্ত বলেই বু’ বাঁধভাঙা হাসিতে নু’য়ে পড়েন। একই সঙ্গে ওরা তিনজন অট্টহাসির কোরাসে বেজে ওঠে। প্রাকৃতিক নৈঃশব্দ ভেঙে খান্‌খান্। চলো এবারে, ওরা গোসল সারবে, বলে বু’ দুলাভাইকে নিয়ে বাড়িমুখো হন।

খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে ওরা উঠে পড়ে। চা খেয়ে পান্নুভাই বোনকে বলেন, আপা, ভাগ্নেরা কোথায় ? কোথায় আবার? টিটো-রিটো ফরিদপুরে। চাচার বাড়ি গেছে। স্কুল বন্ধ যে। আর মিটো-কুটো রতনদিয়া হাইস্কুলের মাঠে ঐ যে বন্দুকছোঁড়ার প্রশিক্ষণ চলছে–ওখানেই আছে নিশ্চয়। বাবার কান্ড দেখতে হবে না? তোমরা যাবে? যাওনা। সঙ্গে লেঠেল দেব একজনা? নাকি চিনে যেতে পারবে? আমরাই পারবো বু’ আবার লেঠেল কেন? গাঁয়ের মানুষ আমাদের ‘নূতনদা এয়েছে রে’ বলে দুয়ো দিক্ আর কি। বলে শিমূল পান্নুভাইয়ের ডানা ধরে টেনে নিয়ে চলে। এত তাড়াহুড়োর কি আছে? চলো যাচ্ছি, আপা আসছি। আপা দরজা ধরে ভাইদের গমনপথের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে থাকেন। নিজের ভাইটা ছোটবেলা থেকেই বারমুখো। আবার ওই বকুলখালার ছেলে শিমূলও নাকি বাউন্ডুলে স্বভাবের। শোনা কথা অবশ্য। এই প্রথম দেখা ওর সাথে। মায়ের কাছে শুনেছেন, বকুলখালা শিমূলের জন্মের আগে আগেই কলকাতা থেকে চৌগাছি বাপের বাড়ি চলে এসেছিলেন। শিমূলের জন্ম ওর নানাবাড়িতেই। বকুলখালা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিমূল নানির স্তনপান করে প্রাণরক্ষা করেছিল জীবনের প্রথম ক’দিন। এমএ দিয়েছে এই কচি বয়সেই। কি চমৎকার গানের গলা। তবে নীলু বলছিলেন, ও বোধকরি দেবব্রত বিশ্বাসের একনিষ্ঠ ভক্ত। সে যাকগে, দু’ভাইয়ের সমঝোতা বেশ।

রেললাইন পেরিয়ে রতনদিয়া বাজার হয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটেই ওরা সামনে দেখল রতনদিয়া আজফার হোসেন চৌধুরি হাইস্কুলের দোতলা দালান। বিল্ডিং-এর মাথায় প্রতিষ্ঠাতার নাম বড় বড় অক্ষরে স্থায়ীভাবে উৎকীর্ণ। সামনে-পেছনে দু’টো মাঠ। ছেলেদের হস্টেল। পুকুর। সব্জি বাগান। হস্টেলের ছেলেরা করেছে। প্রশংসনীয়, শিমূল ভাবে। বাইরে কাউকে না দেখে ওরা একটু ধন্দে পড়ে যায়। ভেতরে ঢুকে সব্জি বাগানে দু’জন ছাত্রকে দেখে শিমূল এগিয়ে যায়। এই যে ভাই, শোন। ডাক শুনে নিড়ানি হাতে একজন উঠে দাঁড়ায়। কাকে চান আপনারা ? নীলু চৌধুরিকে। চেয়ারম্যান সাহেব তো ভেতরে ক্লাস নিচ্ছেন! ওরা একটু বিস্মিত হয়। কীসের ক্লাস? ওই গেরিলা যুদ্ধের বিষয়ে হানাদার পাকিস্তানীরা পদ্মা পেরোতে এলেই আমরা যে কৌশলে তাদের ঠেকাবোতারই ওপর উনি আমাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আমরা দু’জন গতকাল বিকেলে ক্লাস করেছি, তাই আজ বাগানে কাজ করছি। যান্না, ঐ নিচের বড় হলে ঢুকলেই দেখতে পাবেন। ছেলেটি আবার উবু হয়ে বসে নিড়ানি চালাতে থাকে।

শিমূল, পান্নু মুগ্ধ। ওরা ঠিক করে, ক্লাস ডিসটার্ব করা চলবে না। তারচে’ এই মাঠে পায়চারি করা যাক। ব্যায়ামও হবে। সময়টা ভাল কাটবে। ক্লাস শেষ হতে ছাত্রদের সঙ্গে প্রশিক্ষক বেরিয়ে আসেন। সেই শিকারীর পোশাক। হাতে বন্দুক। ওদের সঙ্গে হাঁটলেন মাঠের এমাথা থেকে ওমাথা আরও বারবিশেক। শিমূলদের ঘাম ছুটে গেছে। অতঃপর মার্চ করে বাড়ি ফেরার পালা। রতনদিয়া বাজারের ততক্ষণে ঘুম টুটেছে। আলো জ্বালছে দোকানিরা। নীলু চোধুরি তেলেভাজার দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। চল্বে নাকি শালাবাবুদের আমাদের এই ছোলা, পেঁয়াজু, চপ, ফুলুরির জলযোগ? তোমাদের আপার আবার খুব পছন্দ এসব, বলে শালাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে উনি দোকানিকে বিপুল পরিমাণ ভাজাভুজি তৈরির হুকুম দিলেন, বেশি করে ঠিক বিট লবণ আর গোলমরিচের গুঁড়ো দিতে বললেন, তারপর বললেন, তা’ কত হল তোর? কুটুমগের নয় একদিন আমিই খাওয়ালাম, হুজুর, দোকানি সাহস করে বলে ফেলে দু’হাত কচ্লায়। কুটুম সঙ্গে আছে দেখে তো আরও বেশি করে চাবি রে, বুকা, তা’ না’, কত হল বল্? দেন দু’ডো টাকা। চোপ্, এই নে, বলে দুলাভাই ওকে একটি পাঁচটাকার নোট দেন। ভাংতি নে’ যান, হুজুর। তুই রেখে দে, খুশি হয়ে দেলাম। চল, শালারা।

ওরা রেলসড়ক পেরিয়ে বাড়ি ঢুকে দেখতে পায়, চাঁপাবু’ উঠোনে টেবিল পেতে তেলেভাজা মুড়ি সাজাচ্ছেন। কে, কখন দিয়ে গেল ওগুলো ? শিমূল অবাক। সন্ধ্যে ঘনিয়েছে। চারদিকে বারান্দায় অনেকগুলো হারিকেন আলো দিচ্ছে। উঠোন তাতেই আলোকিত। পরিচারকদের একজন পেট্রোম্যাক্স পাম্প করছে। শিমূল মোড়া টেনে বসতে বসতে বলে, এতগুলো আলো জ্বলছে, আবার হ্যাজাক বাতি কেন ? তোমরা এসেছ যে, তোমার দুলাভাইয়ের হুকুম। ওদিকে পদ্মায় লোক পাঠানো হয়েছে, বু’ তেলেভাজামুড়ির বাটি এগিয়ে দিতে দিতে বলেন। কেন, পদ্মায় কেন ? এই, পাখপাখালি, মাছবিশেষ কিছু যদি মেলে আমার ভাইদের যে বিশেষ খাতির যত্ন হচ্ছেনা! দেশে দুর্দিন চলছে, কী আর করা। কে বলছে এসব কথা, পান্নুভাই সহাস্যে শুধোন। চৌধুরি সাহেব, আবার কে? বু’ খুব উপভোগ করছেন, বোঝা গেল। বাপের বাড়ির লোকজনকে স্বামীর বাড়িতে আপ্যায়নে মেয়েরা স্বভাবত সঙ্কোচবোধ করে থাকে, যা কিনা মৌলিক ভদ্রতাবোধ থেকেই সঞ্চারিত হয়ে থাকে। কাজেই, এ বাড়িতে সেদিন যা ঘটছিল তাতে চাঁপাবু’র প্রীতবোধ করাও স্বাভাবিক।

হারিকেন হাতে ওরা খিড়কি পুকুরের পাড়ে চলে গেল। পান্নুভাই তার বোনকে বল্লেন, খাবার সময় হলে, অর্থাৎ দুলাভাই কাচারির দরবার থেকে ফিরে খেতে চাইলেই আমরা এসে যাব। পুকুর পাড়ে পৌঁছে আলো কমিয়ে দিয়ে ওরা বসল। পা তুলে, আরামসে হেলান দিয়ে শিমূল বড় তামাকের বিড়ি পাকালো গোটা দুই। একটি পকেটে রেখে অন্যটি ধরিয়ে ব্রহ্মতালু ছোঁয়া টান দিল। দম ধরে রইল যতক্ষণ পারল, তারপর দম ছাড়তেই তূষ্ণীভাব এসে গেল। আরো পরে গান ধরল শুয়ে পড়ে, চাঁদের পানে তাকিয়ে। গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা, আমার যা কথা ছিল, হয়ে গেল সারা…। চোখ না খুলেই একের পর আর, গান চলল। মাঝে মাঝে পান্নুভাই আলতো গলা মেলাচ্ছিলেন।

চলো, শিমূল ওঠ, গান গেয়ে তোমার আরো বেশি খিদে পাওয়ার কথা। ওয়াহ্, শালা আমার গান গাইলেই তো পারো। বুঝলাম না দুলাভাই, শিমূল প্রসঙ্গ দীর্ঘায়িত করে, মাঝে-মাঝে তো আসরেও গেয়ে থাকি। আমি বলছিলাম তোমার চাঁপাবু’কে দুপুরে, ওই-যে তোমার ওই দেবব্রত বিশ্বাসী গায়কী আমার খুব ভাল লেগেছে। লেগে থাকলে হবে। কোলকাতায় চলে যাবে, জর্জদাকে পটিয়ে শিষ্য বনে যেতে পার যদি একবার, তোমায় আর কে ঠেকায় ! নীলু চৌধুরী উঠোনে পাতা বড় টেবিলে বসতে বসতে বলেন। তা মন্দ বলেননি, দুলাভাই, পাশ করে মাস্টারি করব, গান করব আর লিখে-লিখে হাত মক্শো করব। শিমূল দোহারের কাজ চালিয়ে যায় মজা করে।

খেতে খেতে মূল গায়েন আবার সূত্র ধরেন, তোমার আরেক বন্ধু তো চিম্ময়ের গানের পুনর্গায়ন করেই দিন কাটাবে বোধ করি। চিংড়ির মুচমুচে মুড়ো চিবোতে চিবোতে শিমূল ধরতাই ধরে নির্ভুল, লতার কথা আর বলবেন না, ও চিম্ময়ের আবেগকম্প্রিত কন্ঠের আবেদন পাশ কাটিয়ে এদিক-সেদিক মিস্এডভেঞ্চারের কথা ভাবতেই পারেনা। পঙ্কজ মল্লিকের গান শুনলে নাকি ওর গা শিউরে ওঠে। কি যে বল, বর্ষার কয়েকটি গান তো পি মল্লিকের কন্ঠে গীত হবার জন্যই রচিত, আমার মনে হয়, রবি ঠাকুরের গানের সহজিয়া শ্রোতা-বোদ্ধা চৌধুরি অকপটে বলেন আর দইয়ের বাটি টেনে নেন হৃষ্টমুখে।

২৫ মার্চের পর কি হল, জাম? রাজবাড়িতে কয়েকঘর বিহারির বাস, সেই হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাগের পর ওরা কোলকাতা থেকে পূর্বে ভাসতে-ভাসতে এখানে এসে ঠেকেছিল। সব ধোপা, নাপিত, জুতো সারাইওয়ালা, মিষ্টি কারিগরবল, এদের ওপর জুলুম করার কোন অর্থ হয়? ওরা কি কখনো নিজেদের পাকিস্তানের শাসক বা মালিক ভাবতে গেছে নাকি? আরে, ওরা যে কাজগুলো করে বাঁচে, ওই কাজ বাঙালি মুসলমান-হিন্দুরা পারে? না করেছে কোনদিন? নীলু চৌধুরির ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ক্রমশঃ। শিমূল ভাবছিল, এই মফস্বলের মানুষজনও আজকাল অমন সুযোগ সন্ধানী মরশুমি শিকারির মতো মতলবী হয়ে উঠেছে? দেশকাল বিষয়ে ও কিছুই জানেনি, শেখেনি এখন। বোঝাই যাচ্ছে।

তারপর? হ্যাঁ, বলছি। একটা সিগ্রেট দাও দেখি তোমার গোল্ডলিফের প্যাকেট থেকে। ধীরে সুস্থে ধোঁয়া টেনে, ছেড়ে চৌধুরি বলেন, চমচম-বিহারিকে বাঁচাতেই তো আমি বন্দুক নিয়ে ট্রেনে চড়ে তখনি চলে গেলাম। গরম বক্তৃতা দিয়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যে ক’ঘর তখনো আক্রান্ত হয়নি। তাদের প্রোকেটশ্যনের ব্যবস্থা করলাম। পাড়ায় সংগ্রাম কমিটি করে দিয়ে এসেছি। তারপর এইতো এখানকার তরুণদের নিয়ে পড়েছি। এবাড়ির মানুষদের ওপর এলাকার লোকজনের বেশ ভরসা করে, মান্যি করে এখনো, সেটা বোঝা যায়। পান্নুভাই দুলাভাইকে উৎসাহিত করেন। হাঃ হাঃ হাঃ, তোমরা গ্রামের মানুষ চেননা। দীর্ঘদিন প্রজন্ম পরস্পরায় পাশাপাশি বাস করলে তবেই মানুষকে চেনা যায়, বুঝলে? এককভাবে দেখলে এদের মানুষ বলেই তুমি গুনবেনা হয়তো, কিন্তু তোমার পেছনে কাটি দেবার বেলায় দেখতে পারে অনেকেই একজোট হয়েছে। ওদের এই গরীবী সলিড্যারিটি কোন সৎকাজে লাগাতে পারলে অনেক কিছু করা সম্ভব। সরকার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে দেশের জমিজমার কন্ট্রোল ঠিকই কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার আগে রাজা-প্রজার যে একটা কাজের সম্পর্ক ছিল, সেটা রিভাইভ করতে, রিনিউ করার কোন প্রক্রিয়া চালু করতে পারেনি। বুঝলে শালারা? চৌধুরি এপর্যন্ত বলে ‘মফিজ’ বলে হাঁক দেন।

মফিজ নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়ালে বলে উঠেন, কাচারি ঘরে শোব আমি, বিছানা রেডি কর। তুই সামনের বারান্দার খোপে শু’বি, বুঝলি? নীরবে মাথা কাত করে মফিজ অদৃশ্য হয়। রাতে একটু সাবধানে ক’টাদিন থাকা ভাল। বলা তো যায়না, কার মাথায় কি চিন্তা, কোন কিফির কাজ করছে। আচ্ছা দুলাভাই, বাড়ির ভেতরে আমাদের রেখে আপনি ওই বাইরের বৈঠক খানায় ঘুমোতে যাবেন কেন? শিমূল বিজলিবাহি বিহীন এই বিশাল, ছড়ানো বাড়ির এককোনে রাত্রিবাসের সম্ভাবনায় রোমাঞ্চিত হচ্ছিল, তবে নেগ্যটিভ্লি। সেকারণেই দুলাভাই এবং তার বন্দুকের নৈকট্য সে চাইছিল খুবই, ভেতরে ভেতরে। কোন চিন্তা নেই, আমি নিজে টর্চ নিয়ে সারাবাড়ি চেক্ করে, সবগুলো দরজায় তালাবন্ধ করে, তারপর বাইরে গিয়ে শোব। কোথাও কিছু হলেই তো ছুটে আসবে এখানে। তাই আজ থেকে আমি কাবারি বাড়িতেই রাত কাটাবো, ঠিক আছে ? চূড়ান্ত এবং তার কারণ ব্যাখ্যা হলে চৌধুরি উঠেলেন, বোল ওয়ালা কাঠের খড়ম পায়ে খটাস্ সটাস্ শব্দ তুলে হেঁটে শোবার ঘরে ঢুকলেন, বন্দুক আর টর্চ হাতে বেরিয়ে এলেন।

পানু, শিমূল, তোমরাও শুয়ে পড়ো এবার। সকালে আমার সঙ্গে হাঁটতে যাবে তো? ডাকব? দুলাভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে পান্নুভাই ম্রিয়মান কন্ঠে জানান, ঠিক আছে, ডাকবেন। আপা, ভেতরবাড়ির কলঘরটা যেন কোথায়? চাঁপাবু’ হাত তুলে দেখান, ঐযে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে। ওঠ যদি, বারান্দায় হারিকেন জ্বলবে, কোন অসুবিধে হবে না। কলঘরেও বাতি ডিম করা থাকবে। যাও তোমরা, শোও গিয়ে, বলে বু’ চটি ফট্ফট্ করতে করতে বলে যান ঐ কলঘরের দিকেই।

ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে শিমূল পানি খেল দু’গ্লাস। তারপর প্যান্ট বদলে লুঙি পড়ে চিৎ হয়ে শুয়ে সিগ্রেট করাল। মস্তবড় ডবল খাট। উঁচু গদির ওপর পাতা বিছানা শিমূলের মনে পড়লো, কেবল পাবনার বাড়িতে এরকম উঁচু বিছানায় শোবার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। দাদির সঙ্গে যখন আট-ন’বছরের ছেলেটি শীতে কাঁপতে কাঁপতে দরজায় হুড়কো তুলে বন্ধ করে, লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে খাটে উঠত। তখন কোন রকমে কেবল লেপের নিচে ঢুকে পড়ার জন্য তার শীতকাতুরে ছোট্ট প্রাণ আঁকুপাকু করতো। এখন মনে পড়তে তার হাসি পেল, হেসে ফেলল। হাসছো যে, আবার কি হল ? পান্নুভাই কাপড় বদলে আরাম কোরারায় গা এলিয়ে দেন। এই খাট দেখে মনে পড়ল, ছোটবেলায় দাদির খাটে উঠতে সিঁড়ি বাইতে হত পা’দানি আরকি বুঝলেন না ? শিমূল ভুলে গেল, পাবনার বাড়িতে পান্নুভাই কুষ্টিয়া থেকে বেশ কয়েকবার যাতাযাত করেছেন, নান্নুভাইয়ের সঙ্গে। কি যে বল তুমি শিমূল। তোমার চে’ আমি ছয় বছরের বড়ো। কাজেই তোমার আগে-আগেই আমার প্রচুর অভিজ্ঞতা হবার কথা। তারমধ্যে ওই পাবনার নানিবাড়ির শোবার ঘরের সিঁড়ি লাগানো খাট দেখার সৌভাগ্যও আমারই আগে ঘটেছিল। রোকন মামা, খোকা মামা কেউ পাবনা থেকে ঢাকায় তোমাদের বাড়ি গেলেই তো তুমি নাকি ওদের সঙ্গে পাবনা যাবার বায়না ধরতে শুনেছি।

হ্যাঁ, সেই সব দিন, মনে হয়, এইতো সেদিন পচাকাকার সঙ্গে পাবনা গেলাম। ফুলবাড়িয়া স্টেশনে রাতে ট্রেনে উঠে, ভোর-ভোর জামালপুর-সরিষাবাড়ি পেরিয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট। যমুনা পারাপারের ফেরি স্টীমারে উঠে ব্রেইক ফাস্ট করা। শিমূলের মন ডুব যমুনায় ডুব দিয়ে কখন ওপারে চলে যায়। সিরাজগঞ্জ ঘাট, বাজার, বাহিরদিয়া ইত্যাদি তিন-চারটে রেলস্টেশন তখন সিরাজগঞ্জ শহর ও শহরতলী এলাকায়। পরে যমুনার ভাঙনে শহর নদীর পাড় থেকে ক্রমশঃ পিছনে সরে গেছে। নদী পেরিয়ে সিরাজগঞ্জে ট্রেনে উঠলেই হকাররা রাখবসাই বা ভুল উচ্চারণে রাভোক্শাই সন্দেশ ফেরি করে বিক্রি করতো। ট্রেন চলতো ঘটাং ঘট্, একে একে ভাঙ্গুরা, চাটমোহর, মুলাডুলি স্টেশন পেরিয়ে যেত। জানালা দিয়ে সবুজ গ্রাম, ঝিল, বিল, টেলিগ্রাফের তারে লেজঝোলা দেখা আর ঝালমুড়ি, চানাচুর এটা-সেটা কুড়মুড়িয়ে সময় কেটে যেত।

এক সময় ঈশ্বরদি জংশনে ট্রেন ঢুকে যেত। শিমূলরা নেমে ওভারব্রীজ থেকে নেমে পাবনার বাসে উঠত। লজ্ঝড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত ফোর্ড এবং সেভ্রলে মোটর কোম্পানির লরি কেটে বিশ্বাস অটো এজিন্সির তৈরি করা বাসের ফ্লিট। পাবনা-ঈশ্বরদি বাসরুটে বিশ্বাসদের একচেটে ব্যবসা ছিল। বাসে তখন ফার্স্ট ক্লাস আসন ছিল ড্রাইভারের পাশে একেবারে সামনে দু’তিনটি এবং তারার এক সারি। তার দরোজা বাসের গায় কেটে আলাদা বসানো। ওই বয়সেও শিমূলের অতিস্বাস্থ্য শরীর ওই ফার্স্টক্লাস খাঁচায় স্বস্তি পেতনা, এটা মনে আছে। এর পেছনে সেকেন্ড ক্লাসের এক খালি খাঁচা, দরোজা আলাদা। অত্যন্ত সংকীর্ণ ওই দুই উঁচু ক্লাসের মধ্যে ওফাৎ ছিল যেটুকু, তা’হল ফার্স্ট ক্লাসে ছেঁড়া, জীর্ণ, পাতলা, অসমতল গদির আস্তরণ আর দ্বিতীয় খাঁচায় গদিবিহীন মসৃণ কাঠের লম্বা বেঞ্চ। তৃতীয় শ্রেণী ছিল তুলনা মূলকভাবে সুপরিসর, যদি না সেখানে সার্ভিসঠাসার মতো অনবরত যাত্রী না ওঠানো হত। কিন্তু সেরকমটি কি হবার জো ছিল ? সেই পঞ্চাশের দশকে শিমূল স্কুলে নিচের ক্লাসের বইয়ে পড়ত, পূর্ব পাকিস্তান অত্যন্ত ঘনবসতির দেশ, যেখানে প্রতি বর্গমাইলে ৭৫০ জনের বাস…।

চাচাদের কারো পাবনা যাওয়ার সুযোগ হলে অবশ্য ভ্রমণসঙ্গীকে পটিয়ে ঈশ্বরদি পাবনার বাসে তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শিমূলের একাধিকবার হয়েছে। তারই মধ্যে দুরন্ত শীতে আর বৃষ্টিতে যখন রাস্তাঘাটে যাত্রী এমনিতেই কম থাকে, সেরকম দিনে ঐ লক্কড়মার্কা বাসের পেছনে হাতপা ছড়িয়ে ঐ আঠারো মাইল দু’ঘন্টায় পাড়ি দেবার দুর্লভ সুযোগও ঘটেছে। সাত-পাঁচ শিবের গীত গাইতে গাইতে কখন ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল…।

সকালে ঠিকই দুলাভাই ওদের ডেকেছিলেন। কাকভোরে পান্নুভাই ওঠেননি। নীলু চৌধুরির সঙ্গে তাল রেখে হাঁটতে শিমূলের ভাল লাগছিল। খোলা রাস্তায় ঠান্ডা হাওয়া গায়ে জড়িয়ে দু’হাত দুলিয়ে সোজা হেঁটে যাওয়া। অশেষ নির্জনতার সুবাদে গা বাঁচিয়ে চলার সঙ্কোচ নেই। ইচ্ছে করেই শিমূল আধঘন্টা পার করেও থামলো না বা ফেরার কথা ভুলে গেল। প্রথমদিকে একটু ঢিলেঢালা হাঁটা আর গল্প হচ্ছিল। হাঁটার বেগবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গল্প কমতে কমতে বাক্রোধ হয়ে গেল একসময়। ফেরার পথে ওরা গতি কমাল ধীরে, কথা বলতে শুরু করল। ভাল ব্যায়াম হল, এবার চলো ভালোরকম খাওয়া-দাওয়া করবে। শরীরের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিদু’টোই এনশিওর করতে হবে তো? দুলাভাইয়ের কথায় শিমূল হেসে ওঠে, বলে, বেশি খেলে ঘুম পাবে আর আমাদের বেরোনো হবে না আজ। মানে? আজ কোথায় যাচ্ছ তোমরা? দুলাভাইয়ের বলার ভঙ্গিতে শিমূল বুঝল, ভাবীকে এখনি ভুলিয়ে একেবারে পেড়ে না ফেললে এখান থেকে ঠাঁইনাড়া হওয়া যাবেনা। দুলাভাই, ঢাকায় কয়েকটা জরুরি কাজে হাত দিয়েছি তো, পরীক্ষার পরপরই। তাই উঠেপড়ে লাগবার আগে ভাবলাম, দেশেও অশান্তি চলছে, ক’দিন পদ্মার ওপার থেকে ঘুরে আসা যাক্। আর, আপনার বড় শালার তো জরুরি গবেষণার কাজ সম্বৎসর চলছে। ওর এক হপ্তা ছুটির তো আর বাকি নেই বিশেষ। আমরা আজ এখান থেকে বেরিয়ে যশোর যাব। ওখানে এক-দু’দিন থেকে পিআইএ-র ফ্লাইটে সোজা ঢাকা ফেরত যাব। এখানে দেরি করে ফেললে আবার যশোর-ঢাকা টিকিট পাবেনা। আপনি তো বুঝেছেন, চাঁপাবু’কে একটু সামলে নেবেন আপনিই। প্লিজ দুলাভাই, শিমূল কথা বলছিল আর ভেতরে ভেতরে চমৎকৃত হয়ে যাচ্ছিল এই ভেবে যে, এত ফাল্তু যুক্তি সে অত দৃঢ়তার সঙ্গে সহজে দিয়ে যাচ্ছিল কি মসৃণ, আর দুলাভাইও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে শুনছিলেন আর মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন।

তা, থাকবেই না যখন আরও দু’চারদিন, বলছো জরুরি কাজ রেখে এসেছ, তখন তো আট্কাবার মানে হয় না। ঠিক আছে, তোমার বু’কে সামলাবো আমি। এখন গিয়ে চলো গোসল সেরে ফেলি। তারপর গরম গরম চারটে ডাল-ভাত খেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে যাবে’ খন। বাড়ীর সামনে এসে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে শিমূলের মনে পড়লো, গতকাল তো ট্রেন এখানে পৌঁছেছিল দুপুরে, তাহলে তো যাবার সময় হতে এখনো ঢের দেরি। তবুও জানতে ইচ্ছে হলো, আরও আগে কি কোন ট্রেন যাবে খুলনার দিকে? অবশ্যই, দুলাভাই সোৎসাহে বলেন, আটটায় রাজবাড়ি ছেড়ে ঘন্টা দেড়েকে প্রথম ট্রেনটা কালুখালি টাচ্ করে সাড়ে ন’টা থেকে দশটা নাগাদ। তোমার চিন্তা নেই কোন, আমার শালাদের না নিয়ে ট্রেন এখান থেকে নড়বেনা, এই বলে দিলাম। এখন যাবার আগের কাজগুলো সারো, তোমাদের বোন-ভাগ্নেদের সঙ্গে একটু কথাটথা বল, তারপর দেখা যাবে।

ঘরে ঢুকে শিমূল দেখে, পান্নুভাই কাঁথামুড়ি দিয়ে তখনো শুয়ে। ও পান্নুভাই সাতটা বেজে গেছে, আমরা ওদিকে মাইল দশেক টানা হেঁটে ফিরলাম, আর আপনি কেবলি স্বপনো, করিছেন বপনো এখনো তুমুল? ওঠেন, উঠে পড়েন। আমরা আজই যশোর যাব। ওখান থেকে প্লেনে ঢাকা পৌঁছব, অনেক কাজ ফেলে এসেছি কিনা ! পান্নুভাই কাঁথার ঘোমটা সরান এবার, ভালই তো গাইছিলে রবিঠাকুরের গানে ভেজাল মিশিয়ে, থামলে কেন? ট্রেন ক’টায়? ফার্স্ট ট্রেন আর ঘন্টা দুই পরে, শিমূল গামছা ঘাড়ে ফেলে গোসলে যেতে যেতে বলে, আপনি তৈরি না হলে কিন্তু ওই আফটারনুন ট্রেনই কপালে নাচ্ছে। আসলে তো আমরা যাব এক কি দুই স্টেশন, যাব তো সেই বালিয়াকান্দি,
রাস্তায় পড়বে হাট গোপালপুর। গ্রামের পথঘাট আমরা তো কিছুই চিনিনা, জিজ্ঞেস করে করে এগোব। সকাল-সকাল বেরোতে চাই এখন থেকে, এই মায়ার বাঁধন কেটে, শিমূল বলে। গুনগুনিয়ে ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’ গাইতে গাইতে উঠোন পেরিয়ে খিড়কি পুকুরমুখো হল।

পুকুরে দুটো ডুব দিয়ে ফিরে এসে দেখল, উঠোনে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন চাঁপাবু’। দুই ভাগ্নে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে একবার রান্নাবাড়ি যাচ্ছে, আবার ঘুরঘুর করতে করতে উঠোনে দেখে মন অকারণেই প্রসন্ন হয়ে উঠল। একেই বলে নিটোল, সুখী পরিবার। ঘরে ঢুকে চুল আঁচড়ে, মুখে সামান্য কোল্ডক্রীম ঘষে চলে এল আবার উঠোনে। নাদুস-নুদুস ভাগ্নে দু’টোকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। ওরা পালাল। দুলাভাই আগেই গোসল সেরেছেন। বাইরে যাবার পোশাক, অর্থাৎ সেই শিকারীর লেবাস পরে একবারে টেবিলে এলেন। দু’টো লাল আটার রুটি, পাঁচমিশেলি তরকারি তুলে নিলেন প্লেটে। খেতে শুরু করলেন। আর এগুলো কে খাবে ? শিমূলের প্রশ্নে দুলাভাই মুখ তুললেন, বললেন সহাস্যে, আপরুচি খানা পররুচি পহ্নেনা, বুঝেছ ? এবাড়িতে সকাল-দুপুর নানাজাতের, রুচির বিশ-পঁচিশ জন মানুষের পাত পড়ে এখনো, তাই এই রুটি, পরোটা, গরম ভাত, খিচুড়ির সমাহার। আব্বা বেঁচে থাকতে তো বড় বড় তামার ডেগচিতে রান্না হত, কত মানুষ যে খেত আমাদের বাড়িতে। আর সে কত রকমের খানা, আহ্ মনে পড়লে আই কান্ট হেল্প ফিলিং স্যাড। যাবো সেসব কথা, ওইযে বড়শালাবাবু এসে গেছেন। খাও তোমরা, ভাল করে পেট পুরে খাবে, নইলে আজ যাওয়া হবে না।

মানে? শিমূল চম্কে তাকায় প্লেটের খিচুড়িতে ঘি-ভর্তি চামচ ডোবাতে ডোবাতে, বললাম না দুলাভাই…হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমাদের বহু কাজ পড়ে রয়েছে ঢাকায়, সবই বলেছি তোমাদের বোনকে। এরিমধ্যে এক রাউন্ড কাঁদাকাটি হয়েও গেছে। এখন তোমরা যা সহজে করতে পার, সেটি হলসামনে খাবার যা দেয়া হয়েছে, তার যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করো, যদি দেবী তাতে কিঞ্চিৎ হৃষ্ট হন, তাহলে স্থানত্যাগের বাসনা তোমাদের মিটতেও পারে। দুলাভাই বরাভয়ের ভঙ্গিতে ওদের মাথায় ওপরে হাত তুলে নাৎসী স্যালুটের ভঙ্গি করেন। বলেন, আমি স্কুলে ওদের একটু প্যারেড করিয়ে ফিরে আসব, তোমাদের ট্রেনে তুলে দেব। নিশ্চিন্তে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নাও, গল্প করো, লুডো খেল। আমি আসছি, বলে মার্চ করার ভঙ্গিতে সোজা হেঁটে বেরিয়ে গেলেন বন্দুক হাতে।

চাঁপাবু’ এবারে মাঠের দখল নিলেন। কোন বারণ না মেনে ভাইদের পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে কৃত্রিম রোষে বলে উঠলেন, এসব কি শুনছি রাত না পোয়াতেই একি অসৈরণ কান্ড রে ভাই ? পান্নু তোরা নাকি আজ চলে যাবি ? দু’দিন থেকে যা’ না। আর কোনদিন কি তোদের এবাড়িতে পাব? ইত্যাকার বিলাপ আর আত্মকথনের মাঝে ওদের খাবারের প্লেট বোঝাই হয়ে চল্ল। শিমূল এক পর্যায়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার ভয় দেখালে উনি ক্ষান্ত হলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই তালপাতার পাখা হাতে দু’ভাইকে ব্যজনে ব্যাপৃত বলেন। পান্নুভাই নীরবে খেয়ে পাত পরিষ্কার করলেন এক সময়। কিন্তু শিমূল পারল না, বলল, সকালে আমি পেটপুরে খাই সত্যি, তবে এতরকমের খাবার এই পরিমাণে কখনো নয়। চাঁপাবু, আমার প্লেটের খাবার কৌটোয় ভ’রে আমি নিয়ে যাব ঠিকই, খাবার নষ্ট করা আমার সয়না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বু’ টেবিল পরিষ্কার করতে করতেই বলেন, সে যদি চৌধুরী সাহেব তোমাদের শেষ পর্যন্ত যেতে দেন, তখন পথের খাবার তো আমাকে প্যাক করতেই হবে। উনি না বললে তো স্টেশনের কারো সাধ্য নেই যে, ট্রেন ছেড়ে দেবে। অমন আগেও হয়েছে, লোকাল খবর কাগজের দুষ্টু সাংবাদিকেরা সেসংক্রান্ত, খবরও ছেপে দিয়েছে। তারপর? শিমূল সোৎসাহে নীলু চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানতে চায়। কি হবে, উনি সম্পাদকের কান মুলে দিয়েছেন, সম্পাদক রিপোর্টারের, ব্যস। হয়ে গেল।

চৌধুরী ঠিকই ফিরে এলেন যথাসময়ে এবং আসার পথে স্টেশন থেকে সর্বশেষ খবর নিয়ে। দেরি নেই আর শালারা, আজ ট্রেন রাইট টাইমে ছেড়েছে ওদিক থেকে। তোমরা বরং তৈরি হয়ে নাও, দুলাভাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই পান্নুভাই ফুট কাটেন, আমরা তৈরি। তুমি তো শালা এখনো ঘুম থেকেই ওঠোনি, গা ধুয়েছ? পান্নুভাই ধীর উচ্চারণে হতাশভাবে বলেন, আর গোসল। যা একখানা খ্যাঁটন হল নাআপনাদের কর্তা-গিন্নীর জবরদস্তির ফেরে পড়ে গিয়েশিমূল আবার না জানি কোন গাড্ডায় নিয়ে ফ্যালে। সকাল-সকাল বেরোনো দরকার। কপালে যাই থাক, দিনমানে ঘটলেই হয়। কেন, শালাবাবু আমার রাতকানা হলেন কবে থেকে ? দুলাভাই শুধোন শিমূলকে রহস্যভরে। আপনি ঠাট্রা করছেন? শিমূল সিরিয়াস হয়, চোখের ডাক্তার ওয়াদুদ তো জবাব দিয়েছেন। প্রচুর পরিমানে দুধ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খানা এবং পিনা ধারাবাহিকভাবে চালালে ক্রমশ: উনি ফিরে পেতে পারেন হারানো দর্শন। যাব্বাবা, এরমধ্যে দর্শন এলো কোথ্থেকে ? দুলাভাই সমানে দোয়ারকি ধরেন। চাঁপাবু’ প্রথমে শঙ্কিত, কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ কুঞ্চিতভ্রু তাঁর সরলরেখা হয়, সবশেষে নিচিন্তর হাসি হেসে উঠে যান রান্নাঘরের দিকে। শিমূল ডাকে। বু’, বসেননা আমাদের এখানে, আধঘন্টা গল্প গুজব হোক। তোমরা আড্ডা মারো, আমার টিফিন প্যাকিং বাকি এখনো, বলে আবার মুখভার করে বুবু অন্তর্হিত হন।

দর্শন মানে আমি দৃষ্টির ব্যাপারে বলছিলাম। এসব কিছুই আপনাদের আতিথ্যের জুলুম থেকে বাঁচবার জন্য শুধু। হাসি পাচ্ছে তো আপনার, দুলাভাই ? শিমূল গা এলিয়ে বসা পান্নুভাইকে দেখিয়ে বলে, আপনার জ্যেষ্ঠ শ্যালকটি ফাঁসির খাওয়া খেয়ে এখন হাঁসফাঁস করছেন। চৌধুরী বলেন, ট্রেন স্টেশনে ইন্ করলে স্টেশনমাষ্টার লোক পাঠাবেন। আমি নিজে গিয়ে তোমাদের পোটলাপুঁটলি তুলে দিয়ে আসব, ভেবনা। পান্নু ট্রেনে উঠে লম্বা হয়ে শুয়ে একটা ঘুম দেবে।

উঠে দেখবে, খিদেয় শরীর চন্মন্ করছে। আবার খাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠায় পান্নুভাই বিরক্ত হয়ে কথা ঘোরাতে বলেন, দুলাভাই আপনাদের চরদখলের কাজিয়া আজকাল কি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে? একবারে বন্ধ হয়নি, তবে আমাদের ফ্যামিলির সরাসরি ইনভলভ্মেন্ট এখন প্রায় নেই-ই। ঐযে চক্চকে আলকাতরা রঙের দরোজা দেখছ, তালাবন্ধওটা বোঝাই লাঠি-সড়কি-বল্লম আর পুরনো জংধরা তলোয়ার ক’খানা। শিমূল মজা পেয়েছে, পান্নুভাইয়ের উদ্দেশ্য সফল। চৌধুরির গল্পের ঝোলার মুখ আলগা করা গেছে।

পান্নুভাইয়ের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট নিয়ে ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে নীলু চোখ বুঁজলেন, ধীরে-ধীরে উচ্চারণ করলেন, ঐ-যে বললাম লাঠালাঠি কমেছে, সেও প্রায় বছর কুড়ি হয়ে এল। আমাদের চর দখলের মূল বিবাদটা ছিল শিমূলের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে। ওপারে ওদের জোতজমা, পদ্মার এপারে আমাদের। রাক্ষুসী পদ্মা এবছর আমাদের জমি গ্রাস করল তো পরের বছর ওপারে মস্ত চর জাগল, ওরা দখল নিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। আমরা এপার থেকে ভূঁইহারাদের নেতৃত্ব দিয়ে কাজিয়ার জন্য তৈরি হয়ে ওদের চিঠি পাঠাতাম। শিমূলের পরদাদা অর্থাৎ দাদার বাবা মীরজী হুজুর তার দোয়াসুদ্ধ রীতি মাফিক লোক পাঠাতেন এপারে চৌধুরি বাড়িতে। সেই দূত বড় পানশী ভর্তি করে ভেট নিয়ে আমাদের বাড়িতে মেহমানখানায় এসে উঠতো। ঐ ভেটের মহিমা কি আপনার জানা, দুলাভাই? শিমূলের সময়মতো করা প্রশ্নাঘাতে নীলু খুশি হন। ভেট অর্থ প্রীতি উপহারঅন্তত আমরা তখন সেটাই মনে করতাম। শিমূলদের পীরের ফ্যামিলিওর দাদাও গন্দীনশীন ছিলেন বহু বছর। তো সেই মীরজী হুজুর সেকালে সম্বৎসর অঢেল উপহার আর সালামী পেতেন তার মুরীদদের সুবাদে, যা নাকি ওদের বাড়ির মেয়েদের নামাজের ঘরে একপাশে সংগৃহীত থাকতো। মানে চাল-ডাল-সবজি-মিষ্টি সব? শিমূলের বোকা প্রশ্নে চৌধুরী নাখোশ হননা মোটেই।

জবাব দিতে যাবেন, লক্ষ্য করেন, চৌধুরানিও কখন যেন হাতের কাজ সেরে এসে দু’ভাইয়ের মাঝে সমাসীন হয়েছেন। ওদের টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করা, রান্না-সব সাঙ্গ আমারএখন গল্প শুনি খানিক, বলে নিশ্চিন্তমুখে বূ’ লবঙ্গগাঁথা পানের খিলি গোঁজেন। হ্যাঁ, হৃষ্ট চৌধুরি আসরের নতুন শ্রোতার পানে তাকিয়ে শিমূলকে বলেন, শোন, আমি তো আব্বার সঙ্গে তোমাদের বাড়িতে দেছি বিয়ের আগেওকখনো পরের বাড়ি মনে হত নাএত নিবিড় ছিল সেসময়ের মেহমানদারি, বুঝলে? কথার খেই হারাচ্ছেন, দুলাভাই, পান্নু সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। না, হারাইনি, শিমূলের প্রশ্ন ছিল, মুরীদদের ভেট সবই কি নামাজের ঘরে রাখা হত? উত্তর হচ্ছে, না, খাবার-দাবার, শস্যদানা-সব যথাযথ ভাঁড়ারেকেবল মূল্যবান তৈজস, সোনারূপো, টাকাইত্যাদি অন্দরমহলের গর্ভে ঐ সুরক্ষিত কক্ষে রাখা হত। কাজিয়ার কথা কিন্তু এগোচ্ছে না, পান্নুভাই আবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ হচ্ছে তো ঐ ভেটের প্রতিদানে আবার এবাড়ি থেকে যেত মরশুম বুঝে মান রাখার উপযোগী ভেটশীতে হয়তো খাঁচাভর্তি বাঁলিহাস, একমণী পাঙাশ গোটাকতক, বর্ষায় ইলিশের খাঁচা, মাটির বড় মট্কা বোঝাই রাজবাড়ির ক্ষীরের চম্চম্ এইসব আরকি। বেশ ভালোই তো, কাজিয়ার সুযোগটা তাহলে রইল কোথায়, শিমূলের স্বগত সংলাপ। হো হো হেসে নীলু বললেন, কাজিয়া আর ভেট আদান-প্রদান এর সবটাই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য ছিল দু’পক্ষেরই একসে হল জমি বাড়ানো অর্থাৎ প্রভাব, প্রতিপত্তি, দাপটের মাত্রা কেবলই বৃদ্ধি করা। আরে পাগল, ঐ ভেটবাহী দূতের হাত দিয়েই তো কাজিয়ার স্থান, কাল ঠিক করা হত দু’পক্ষের সুবিধা অনুযায়ীযাতে দু’দলই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে লড়াইয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারে। তারপর হারজিত তো থাকবেই খেলতে নামলে এরকম একটা খেলোয়ারি স্পিরিট তখন খুব কাজ করত।

শিমূল, পান্নু হতবাক। চৌধুরী বিষন্ন, দু’চোখ স্মৃতিভারে মেদুর। এই শতাব্দীরই প্রথমার্ধে এই কালুখালি, ওই পদ্মাপারের পাবনায় এরকম অর্থহীন কাজিয়া লড়ত সরল গ্রাম্য মানুষ, দু’চারজন ভূস্বামীর অঙ্গুলি হেলনে, নির্দ্বিধায় প্রাণ দিত কেউ, বাকি জীবনে দু’পায়ে উঠে দাঁড়াত না অনেকেই, তবুও যেত। কাজিয়ার নেশা নাকি ছিল অদম্য। লেঠেল সর্দারদের হাতপা নিশপিশ করত, মারপিট ছাড়া সময় কাটতো না তাদের। ১৯৬০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ হবার পর অনেক প্রাক্তন লেঠেল দুর্বলের জমি কেড়ে নিয়ে নব্য ভূস্বামী বনে গেছে, চৌধুরি জানালেন। শিমূলদের পরিবারের সঙ্গে আপনাদের বিরোধ আপনার বিয়ের পরই মিটে গেছে বলছিলেন, সেটা কতটুকু সত্যি? পুরোপুরি, পান্নুভাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে নীলু বললেন, তোমার আপাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল যে, আত্মীয়ের সঙ্গে জমির দখল নিয়ে বর্বর লড়াই, তাও আবার তোমার ওপর নির্ভরশীল প্রজা-রাইয়তদের প্রাণের ঝুঁকিই সেখানে বেশিসেই ঝগড়ায় কোন গৌরব, বীরত্ব, বাহাদুরিকিছুই নেই। আব্বা বুঝলেন, হজ্ব করে এসে তো ফকিরের জীবন যাপন করেছেন শেষের ক’বছর।

চাঁপাবু’ ওদের তাড়া দিলেন, হাত ধুয়ে এস তোমরা। নাকি এখানেই চিলম্চি আনতে বলব? আনু, তোর মামাদের হাত ধুইয়ে দিবি আয়। উরেব্বাস, বলে দু’হাত ওপরে তুলে শিমূল লাফিয়ে ওঠে, বলে, হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে, এক্ষুনি, আর একরাত্তির এবাড়িতে কাটালে আর দেখতে হবেনা। আর যদি বু’র কথামতো তেরাত্তির পার করি কোনক্রমে, তা’লে চতুর্থ দিবস প্রত্যূষেই নীলু চৌধুরিকে পূর্বপুরুষদের শক্রতার জের ধরে ডুয়েল লড়ার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেও হয়তো দ্বিধা করব না। হাঃ হাঃ হাঃ। কি হল, দুলাভাইয়ের গল্প শুনে এরিমধ্যে সামন্ত সত্তা মাথাচাড়া দিচ্ছে নাকি? চাঁপাবু’র ঠাট্টা গায়ে না মেখে কলঘর থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে টেবিলে বসল। পড়েছ খানদানি যবনের হাতে, পান্নুভাই এপর্যন্ত বলতে না বলতেই শিমূল পছন্দ মাফিক পাদপূরণ করে ঝটিতি, বড়খানা খাবে সাথে। স্বাভাবিকভাবেই সে খাওয়া কেবল নম-নমো করে সারা হল। পেটে স্থানাভাব। খবর এল, ট্রেন এসেছে।

অতঃপর চৌধুরিবাড়ির পাট ওঠানোর পালা। দু’ভাই ওদের বোনের পদচুম্বন করল, ভাগ্নেদের গালে চুমো খেল এবং হাঁটা দিল। সঙ্গ নিলেন নীলু চৌধুরি আর তিন তল্পিবাহক। ওদের হাতে ব্যাগ আর খাবার। সদর পেরিয়ে বাঁক ঘোরার আগে শিমূল ফিরে দেখল একবার। চাঁপাবু’ চোখে আঁচল চাপছেন। ও আর তাকাল না পিছনে। চরৈবেতি চরৈবেতি। কয়লার ইঞ্জিন ফোঁসফোঁস করছে। স্টেশনমাস্টার প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন। যাত্রীরা যে যার মতো উঠে গেছে ট্রেনে। চারদিক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কোন কম্পার্টমেন্টেই তেমন যাত্রীর ভিড় নেই। প্রথম শ্রেণীর কামরা খালি একেবারে। ওরাই শুধু যাত্রী। শিমূল অনুনয়ের সুরে বলে, দুলাভাই, এবার আপনি নেমে যান। মাস্টারমশাই সিগন্যাল না দিলে ওদিকে গার্ডও তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। তথাস্তু, নেমে যাচ্ছি। যশোর পৌঁছে টেলিগ্রাম করে দিও। ঢাকায় পৌঁছে আরেকটা, কেমন? নীলু চৌধুরি নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ান। ট্রেন হুইস্ল বাজিয়ে হূশ-হূশ স্টিম ছেড়ে চাকা গড়িয়ে দেয়। ওরা জানালার পাশে বসে হাত নাড়ে হাসিমুখে।

হ্যাঁ, মনে রাখার মতো মানুষ বটে আপনার ভগ্নিপতিটি, শিমূল বলে আর জুতোর ফিতে খোলে। পান্নুভাই বলেন, যা বলেছ, তুমি লম্বা হচ্ছ কেন ? শোবার প্রেসক্রিপশ্যন তো আমার জন্য। দু’ভাই গলা মিলিয়ে ‘অট্ট অট্ট হাসিল’। কোন্ স্টেশনে নামতে হবে আমাদের? আসলে আমরা যাব কোথায়, ঠিক করেছে? আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, শিমূল বলে, পাংশায় নামি চলেন। পাংশায় কেন? পাংশায় নিরুখালার বর স্যানিটারি ইনস্পেক্টর সাহেবের বাসা। ওখানে বসে হাটগোপালপুর আর বালিয়াকান্দি যাবার সুলুকসন্ধান মোটামুটি জেনে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়া, ব্যস, বলে শিমূল আবার চোখ বোঁজে আর গুনগুন করে সুর ভাঁজে।

পাংশা। পাংশা। কুলিদের হাঁকডাকে ওদের তন্দ্রা টুটে যায়। লাফিয়ে উঠে বসে, জুতো পায়ে গলায়, ঝোলাঝুলি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ে, উবু হয়ে বসে জুতোর ফিতে বাঁধে। টিকিট কালেক্টরকে টিকিট দুটো গছিয়ে দিয়ে ওরা নিচে রাস্তায় নামতে সিঁড়ি ভাঙে। এই যে ভাই, স্যর, আপনাদের তো যশোরের টিকিট। এখানে নামলেন কেন ? কোথায় যাবেন ? টিকিটবাবুর অতগুলো প্রশ্নের জবাবে শিমূল একবার ফিরে তাকায়, চেঁচিয়ে বলে, ঠিক আছে। মোটামুটি পরিচ্ছন্ন দেখে একটি দোকানে ওরা চা খেতে ঢুকল। কড়াইতে মৃদু আঁচে দুধ জ্বাল হচ্ছে। ওপরে মোটা ঘিয়ে রং সর তৈরি হয়েছে। সরের পর্দা ফুটো করে বাষ্প ঠেলে ঠেলে উঠছে বুদ্বুদের আকারে। সরটা ক্রমশই লোভনীয় চেহারা নিচ্ছে। নতুন চা-পাতা দিয়ে কড়া লিকারের চা দাও তো দু’কাপ। পান্নুভাই চায়ের ফরমাশ দিয়ে সিগ্রেট ধরান। কাপ নাই, গিলাসে দেব ? দোকানি ছেলেটি সপ্রশ্ন তাকিয়ে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, দাও।

আরে কাপ আর গিলাস তো একই, নাকি বল ? শিমূল আঞ্চলিক উচ্চারণে আলাপ জোড়ে ছেলেটির সঙ্গে। না, এক না, সায়েবরা গিলাসে অনেক সুমায় খাতি চায় না, তাই আমি আগেই কয়ে দেই। তুমি খুব সৎ ছাওয়াল, বুজতি পারছি। দ্যাও, চা, দ্যাও। পাংশার সেনিটারি ইনিসপেক্টার সাহেবের অফিস-বাসা, এসব কনে, কোনদিক্, কওতো মণি ? ও-ই, ছেলেটি তুলে আঙুল-নির্দেশে দেখায়, যে মসজিদ দেখতেছেন, ওর পিছনে মাট, ওই মাটের ডাইন দিক সেনিটারি অফিসারের বাসা আর অপিশ। সাবাশ ছেলে, শিমূল খুশি হয়ে বলে ওঠে। স্যর, ওই মুটা সর ইট্টু দেব আপনারে, খাবেন বিস্কুট দিয়ে? হেসে উঠে শিমূল ছেলেটির নাম জানতে চায়, তুমার নাম কি মণি ? মোজিবর, বলে সে আবার শুধোয়, দেব বিস্কুটির উপর মুটা করে সর আর চিনি দে?

একশোবার দিবা, দ্যাও, খাই, বলে শিমূল একটি বড়োতামাকের বিড়ি ধরায়। পান্নুভাই তার পকেট রেডিও কানে লাগিয়ে দিয়ে কি যেন শোনেন আর আঙুল দিয়ে হাঁটুতে তাল ঠোকেন। তাকেও সর-বিস্কুট দেবে কিনা, ইশারায় জিজ্ঞেস করাতে উনি বারণ করলেন। মুখে বললেন, তুমি চালিয়ে যাও। পিরিচে টোস্টের ওপর মোটা সরের পরত, তাতে ছড়ানো মোটা দানার লাল চিনি। শিমূল বিস্কিট খেতে খেতে ওই খাবারের সঙ্গে আরেকরকম টোস্ট ‘হিলসা অন টোস্ট’-এর স্বাদ মিলিয়ে দেখছিল। মজিবরের টোস্টের টেইসট অনবদ্য বটে। মজিবরকে যথেষ্ট খুশি করে রেখে ওরা ওদের বোঝা পিঠে ফেলে, হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে থানা পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকের কোয়ার্টার্সের দরজায় পৌঁছে কড়া’নাড়া দিল।

দরজার কপাট মেলে দাঁড়ালেন নিরুখালা। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে হলুদ-মরিচবাটার দাগ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। রক্তবর্ণ, গোল টিপটা অক্ষত। গৌরী নিরুখালা সেই পনের বছর আগের ছিপছিপে টিনএজার নিরুই রয়ে গেছেন। চোখে, ঠোঁটে বিস্ময়ের কুঞ্চন, বক্রতা। এককথায় ইনচ্যান্টিং। পানু, শিমূল, এসো, এসো। ওরা ভেতরে ঢুকলে খালা সদর বন্ধ করে উঠোন পেরিয়ে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের আদলে তৈরি একতলা বাংলোর একপ্রান্তে রান্নাঘরে যেতে যেতে বললেন, তোমরা ব্যাগ রেখে বারান্দায় বস। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। গা ঠান্ডা কর। আমি রান্না সারতে সারতে তোমরা গোসল সেরে নেবে, কেমন? আরে মাসী ওগো, আর দু’মুঠো চাল তুলে দাও হাঁড়িতে, ভাগ্নে দু’জন এলো বাড়িতে, ও মাসী গো, ভাগ্নে দু’জন এলো বাড়িতে…শিমূলের ইমপ্রোভাইজ্ড পল্লীগীতি শুনে নিরুখালা, পান্নুভাই হেসে সারা। তুই শিমূল আর কবে বড় হবি? খালা প্রশ্ন করেন গুয়োমৌরী হাসি মুখে মেখে, তুই না এবার এমএ দিয়েছিস? তোমাদের কাছে আমি সেই পাতলা খান লেইনের শিমূল-ই থেকে যেতে চাই, তুমিও তো আমার সেই আটান্ন সালের বালিকা খালাটিই আছো, গান-টান গাও তো? কড়ায় হাতা নাড়তে নাড়তে নিরু মিষ্টি হাসেন, তোমার খালু গান ভালবাসেন। প্রকৃতিপ্রেমী শান্ত মানুষ, অবসরে সঙ্গীতচর্চা করেন। আমি আগের মতোই গান শুনি, শুনতে শুনতে গাই।

ভালোই চলছে তাহলে তোমার সংসারযাত্রা, বলে শিমূল কেজো গলায় জিজ্ঞেস করে, খালু সাহেবটি কখন ফিরবেন? উনি তো রাজবাড়ি গেছেন গতকাল, অফিসের কাজে। হয়তো কাল ফিরবেন কাজ সেরে। না, মানে, আমরাসত্যি কথা বলতে কি, তোমার এখানে আসার ভাবনা আজ সকালেই মাথায় চাপল, তাই মাছপাড়া না নেমে পাংশা স্টেশনে নেমে পড়া। উদ্দেশ্য, তোমাদের সঙ্গে দেখাও হবে আর পথের হদিস জেনে নেবো একই সঙ্গে। রথদেখা কলাবেচা তোমাদের হবে, তবে রথ ভাল করে না দেখে কলা বেচতে যেতে পারবে না, নিরু খালা বলে উঠলেন, যাও এবারে গোসল সার। তোমাদের হলে আমি ভাত বেড়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকব। নইলে খেতে খেতে বিকেল হবে। যাও, ওঠো।

অতঃপর শিমূল ওগো মুসাফির, বাঁধ গাঠরি’ আপ্তবাক্য শিকেয় তুলে রেখে উঠল। ঘরে ঢুকে দেখল, খাটে পান্নুভাই চিত হয়ে শুয়ে। ফুরফুর করে হাল্কা নাকও ডাকছে। ঘুমোলেন নাকি, ও পান্নুভাই, ওঠেন, নিরুখালার রান্না শেষ। আরেকবার গোসল আমি করব না, আপনি? আমিও না। খালাকে গোসল সেরে আসতে বল, একসঙ্গে খেতে বসব, বলে পান্নুভাই পাশ ফিরে শোন। ও নিরুখালা, তুমি গোসল কর জলদি, তারপর খেতে বসব সবাই, পান্নুভাই বললেন। এই গরমে তোরা গায়ে পানি না ঢেলে খেতে পারবি, নিরুখালার অভিব্যক্তিতে সরল অবিশ্বাস বাক্সময়। আমরা সকালে কালুখালি চৌধুরি-বাড়িতে পুকুরে ডুব দিয়ে অবগাহন স্নান সেরেছি। কাজেই, এখন দেখা যাচ্ছে কেবল তুমিই অস্নাত। রান্না গুছিয়ে রেখে খালা ওঠেন, হ্যাঁ, তোর খালুর পিওনটা এখনি এসে বলবে, চাচীমা, খাবার দ্যান। নিরু নিজের ঘরে ঢোকার আগে গেস্টরুমে উঁকি দেন এহ্, পান্নু তো ঘুমিয়ে কাদা, আমি আসছি, বলে তড়িঘড়ি পাশের ঘরে ঢুকে তোয়ালে-শাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাথরুমের দরজা বন্ধ হলে পান্নুভাইয়ের ঘুম ভাঙে, উঠে বসেন।

পান্নুভাইয়ের কথামতো দু’ভাই মিলে রান্নাঘরের সামনে বারান্দায় মাদুর পেতে কালুখালি থেকে আনা খাবার বের করে সাজিয়ে ফেলে। এখনো লুচি ঈষদুষ্ণ, খাসির ভুনা মাংস সুগন্ধ ছড়ায়, হাঁসের মাংস আর নারকেলের টুকরোয় মাখামাখি, খিচুড়িটা গরম করলে ভাল হয়, আলুর দমে গোলমরিচের গুঁড়ো এখনো দৃশ্যমান। একিরে, শিমূল, তোরা কি হূডিনি আর পিসি সরকার নাকি? এসব পেলি কোথায়? আমি তো শিং মাছের চচ্চড়ি রেঁধেছি উচ্ছে দিয়ে, নিরুখালা এই পর্যন্ত বলে মুখ টিপে হাসেন। শিমূলের ভ্রু কোঁচকানো দেখে মজা পেয়েছেন। আরও রেঁধেছি রে, তোর প্রিয় লালভাত, আলু ভাজা আর পান্নুর জন্য পেঁপের ডালনা, হবে না? খুব হবে, তুমি এসে বসতো আগে, আজ আমরা তোমাকে একটু বেড়ে খাওয়াই, আলুভাজা খেতে ওর তর সইছে না। তিনজনে বসে খুব হৈচৈ করে খেল। এরিমাঝে পিওন এসে হাজির। ওর খাবারটা তুলে রাখা ছিল। অভ্যাসমতো রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে খেতে বসতে যাবে, ওকে নিরুখালা ডাকলেন, তুলসী, শোন এদিকে, মিটসেফ থেকে একটা ধোয়া প্লেট নিয়ে এস। সসঙ্কোচে তুলসী প্লেট সামনে ধরতে খালা দু’রকম মাংস, লুচি, খিচুড়ি তুলে ওর প্লেট ভর্তি করে দিলেন। বললেন, এবারে গিয়ে বসে তোমার যেটা যতটুকু ভাল লাগবে, খাবে আর বাকিটা গুছিয়ে সব ভোলার জন্য নিয়ে যাবে, ঠিক আছে ? ভোলা ওদের অফিসের পোষা কুকুর, খালা বলেন।

খাওয়া শেষে নিরুখালা পানের বাটা নিয়ে ওদের ঘরে এসে খাটে উঠে বসলেন। তুমি পান খাও নাকি? শিমূলের অবাক প্রশ্নে খালা হাসলেন, গজদাঁতের সামান্য আভাস দেখা দিয়ে অদৃশ্য হল। নারে, মাংস-টাংস খেলে মুখশুদ্ধি হিসেবে খাই, তোরা নিবি? দাও, শুধু পান পাতা আর চুনের ছোঁয়া একটু। আমার দরকার নেই, বলে পান্নুভাই…।

জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়েন। পান মুখে দিয়ে খালা জিজ্ঞেস করেন, তোরা চৌধুরী জামাইয়ের বাড়ি থেকে এলি, বুঝলাম। বলছিলি আরও কোথায় কোথায় যেন এদিকে যাবার ইচ্ছে তোদের।…হ্যাঁ, শিমূল বলে, যাব আউয়াল মামার সরকারী ডিসপেন্সারি আর আতর মামার ঠিকানা ছুঁয়ে নাড়–য়া ঘাটে। সেখান থেকে গড়াই পার হয়ে চৌগাছি, নানার বাড়ি। পান্নুভাই আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন বা চোখ বুঁজে নিজের ভাবনায় ডুবে গেছেন।

যাবি কিভাবে? খালা চিন্তিত মুখে বলেন, এখানে থানা অফিসাররা সবাই সাইকেলে ট্যুর করে। আর পেতে পার ঘোড়ার গাড়ি। বাহ্, তাহলে তো বেশ হয়, পান্নুভাই জেগে উঠে জায়গা মতো তার মতামত দেন। এখান থেকে নাড়–য়ার পথে প্রথমে পড়বে আউয়াল ভাইয়ের ডাক্তারখানা, নিরুখালা আবার চিন্তামগ্ন হন, কিন্তু তাকে তো সব সময় বালিয়াকান্দিতে পাবে না। সাতদিন এখানে তো পরের সপ্তাহে রাজবাড়িএই তার রুটিন। ওখান থেকে অল্পদূরেই আতরভাইয়ের স্কুল, থাকেন উনি হাটগোপালপুরে। বেশত’, আমরা তোমার বাসায় রাত কাটিয়ে, সকালে গোসল-নাস্তার পাট চুকিয়ে এখান থেকে বালিয়াকান্দির পথে রওনা হব, শিমূল খালাকে নিশ্চিত করে। নিরু হাসিমুখে মৃদু গলায় রিন্রিন্ বাজেন, তোদের তো আসলে কোন কাজ নেই, তোর খালু এলে তারপর যাস, কেমন? না, খালা, শিমূল একজায়গায় বেশিক্ষণ টিকতে পারেনা, ওর পায়ের তলায় নাকি সর্ষে র্সর্স করে। আর তে’রাত্তির পার করলে তো হাড়ে দুব্বোঘাস গজাবে, তাই কাল সকালেই দেখা যাবে সবার আগে ওই লোটাকম্বল লাঠির মাথায় বেঁধে তৈরি। কথা শেষ করে পান্নুভাই আবার জানালার ধারে সরে গিয়ে সিগ্রেট ধরান।

আয়, শিমূল আমরা পুরনো দিনের গল্পগুলো ঝালাই করি। খালার ডাকে শিমূল উঠে বসে, বালিশ কোলে টেনে নিয়ে তাতে কনুই ভর দিয়ে ‘দ্য থিঙ্কার’ হয়ে বসে বলে, তুমি যে আমাদের সঙ্গে ছাদে আড্ডায় যোগ দিতে, কাজের ফাঁকে সময় পেলেই আর গান গাইতে মনে আছে? নেই আবার? তোমার খালুও জানেন সব কাহিনী। ঐটে বলেছ? ঐযে তবিব খালুর সঙ্গে মুকুল সিনেমায় ‘শেষ পরিচয়’ দেখেছিলাম আমরা? শিমূলের প্রশ্নে খালা নড়েচড়ে বসেন, তোর তো এখনো সবই মনে আছে দেখছি, নিরু ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হাসেন, বলতো শুনি? বলছি। একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নি’ আগে। ধোঁয়া ছেড়ে শিমূল খালার উৎসুক নির্মল হাসিমুখের পানে ফিরল, বলল, আমার বিশেষ করে মনে আছে যে, আমাকে মা যেতে দিতে চাইছিলেন না। তোমার অনুরোধ সত্ত্বেও শেষে বড়খালার আদেশে নিমরাজি হয়েছিলেন বলেই আমার যাওয়া ঘটেছিল শেষ পর্যন্ত। মনে নেই আবার? প্রচুর আলুচিপ্স আর মরিচগুঁড়ো মাখা বাদাম-চানাচুর খাওয়া হয়েছিল সেদিন ঘন্টা তিনেক জুড়ে। আর ইন্টারমিশনে যে আইসক্রিম খেয়েছিলাম আমরা, ভুলে গেছ খালা? নারে, কি ফ্লেভারের ছিল বলতো? শিমূলকে চোখ বুঁজতে দেখে খালা শুধোন হাসিমুখে। পিস্টাচিত্ত, শিমূল চেঁচিয়ে উঠলো, মানে পেস্তা রংয়ের তো বটেই, তাতে আবার পেস্তার টুকরো বেঁধানো ছিল। অপূর্ব স্বাদ। হুঁ-উ-উ। পেস্তার সুগন্ধ আর ক্রিমে মাখামাখি ম’ম’ অবস্থা একেবারে। গিয়েছিলাম কে কে বলবো? তুমি, আমি, খালু আর খুবরূ।

মানে মাহমুদ তো? খুবরূ নামে তো ওকে আর কেউ ডাকিনা আমরা, খালা বলেন সতর্কতার সঙ্গে, আউয়াল ভাইয়ের ঐ ছেলেকে দত্তক নেয়ার পরই তো বড়বু’ ওর ছেলেবেলায় রাখা ডাকনাম খুবরূ ছেঁটে ফেলে পোষাকী নামের লেজটুকু-শুধু ‘মাহমুদ’ ডাকনাম হিসেবে চালু করে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, শিমূল আনমনে বলে, তো কাল আমরা সেই মাহমুদের বাবা আর বড়বোনের অতিথি হতে যাচ্ছি। মানুষের জীবন কি বিচিত্র সব খাতে বয়ে চলে। কোথাকার মানুষ কোথায় ভেসে যায়। বলো ? আচ্ছা, আমরা পাতলা খান লেইনে ফেরত যাই আবার, কেমন? অগ্নিপরীক্ষা, মা ও ছেলে, ছেলে কারএসব ছবির কথা তোমার মনে নেই, নিরুখালা? পুরনো ছবির গানই আমরা বেশি শুনি, খালা বলেন, ঐ যাঃ, গল্পে গল্পে দুপুর আড়াইটের অনুরোধের আসর যে মিস্ করে গেলাম? দাঁড়া, ওঘরে গিয়ে রেডিও চালু করে দিয়ে আসছি। চা খাবি তো? পান্নু? অবশ্যই, খাবে, তুমি চায়ের পানি চাপিয়ে দিয়ে এস, বলে শিমূল উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা জগ থেকে গেলাসে পানি ঢালে, খায়, তারপর চটি ফট্ফটিয়ে টয়লেটে যায়। ও ঘর থেকে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে’ গান ভেসে আসে। কি গমগমে গলা! পান্নুভাই চোখ মেলে বলেন। তাকিয়ে দেখেন, ঘর খালি। গেল কোথায় সব?

এইতো, নিরু বলে ওঠেন ঘরে ঢুকে, তোমাদের জন্য চায়ের পানি ফুটতে দিয়ে এলাম। শিমূল এল ধনঞ্জয়ের সঙ্গে গাইতে গাইতে। এখনো সব গানের কথা মনে রাখতে পারিস তুই? আগের মতোই? নিরুখালা চেয়ারে বসে রাইটিং টেবিলে আঙুল ঠুকে তবলা সঙ্গত করতে করতে শুধোন। রেডিওতে ততক্ষণে ‘এক বৈশাখে দেখা হল দু’জনার, জ্যৈষ্ঠতে হল পরিচয়’ গান বাজছে। আসছে আষাঢ় মাস, শিমূল হেসে গলা মিলিয়েছে, মন তাই ভাবছে…মাথা দুলিয়ে শেষতক গেয়ে গেল গায়িকার সঙ্গে। চমৎকার ডুয়েট হ’ল, নিরু হেসে উঠে হাততালি দিলেন। খালা, হাততালি পরে হবে, তুমি না চায়ের পানি চুলোয় চড়িয়ে এসেছিলে? শিমূলের সাবধানবানী শুনে নিরু ওহ্হো, আমি আসছি রে নইলে আবার তোদের চায়ের বদলে গজ খেতে হতে পারে, তাই না? বলে চপলা হরিণীর মতো রান্নাঘরে উড়ে যান যেন। শিমূল ওঘরে ঢুকে রেডিওর টিউনিং নব ঘুরিয়ে কাউন্ট ডাউনে সেট করে রেখে এল। ভল্যুম ও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিরুখালা ট্রেতে তিন কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। শিমূল হাত বাড়িয়ে ট্রেটা নিয়ে সন্তর্পণে বিছানার ওপর নামাল। পান্নুভাই খুশি হয়ে আধশোয়া হলেন, দাও আমারটা দাও, একচামচ চিনি নেড়ে দাও। পান্নুভাইকে চা এগিয়ে দিয়ে শিমূল নিরুখালাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার? আমিও এক চামচ, বলে খালা এসে খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে বসেন পা ঝুলিয়ে। বাচ্চা মেয়ের মতো পা দোলান। সবাই চুপচাপ। চায়ে চুমুক চলছে। এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্কের কন্ঠে গীত রেইনড্রপ্স কিপ ফলিং অন মাই হেড…গানের সুর ভেসে আসে রেডিও অস্ট্রেলিয়া থেকে। উদাস, ঘুম-ঘুম ঘু-ঘু-ঘু-উ-উ-ঘু-উ-উ ডাক ভেসে আসে জানালার বাইরে আমগাছের মগডাল থেকে। এরিমধ্যে সামনের মস্ত মাঠের এখানে-সেখানে ছেলের দল খেলতে এসে গেছে। ওদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ দূর থেকে পাখির কিচিরমিচির যেন। কাউন্টডাউনে এবার বাজছে ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা। শিমূল, তোদের কলেজে যে একটা ব্যান্ড ছিল, কি নাম যেন ? নিরু খালার প্রশ্নে ওর গুন্গুন্ থেমে যায়, বলে, হ্যাঁ, ‘দ্য আয়োলাইট্স’। আমাদের ক্লাসের ইখতিয়ার ওমর বিটল্সদের সব লেইটেস্ট নাম্বার গাইত নটর-ডেইম ডে-তে। এই তো ছ’সাত বছর আগের কথা সব। অথচ কত দূরে সরে গেছে দিনগুলো এরিমধ্যে। নিরুখালা উঠে রান্নাঘরে যান। যেতে যেতে বলেন, শিমূল, তোরা ক্যারম বা লুডো খেললে ওঘর থেকে নিয়ে আয়, আমি মুড়ি ভেজে নিয়ে আসছি। পান্নুভাই বলে ওঠেন, মুড়িভাজার সঙ্গে আমার একটু আদাকুচি চাই।

শিমূল খেলার সরঞ্জাম আনতে বারান্দায় পা দিয়ে শুনল, সদরে কড়া নাড়ছে কেউ। আমি যাচ্ছি, বলে একলাফে উঠোনে নেমে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। তুলসী পিওন, মাথায় রান্নায় খড়ি একবোঝা। বারান্দায় উঠে রান্নাঘরের লাগোয়া ভাঁড়ারে ঢুকে মাথার বোঝা নামায় সে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ায়। চাচীমা, খড়ি নিয়ে আইছি। হ্যাঁ, তুলসী, তুমি মোড়া টেনে বস। চা-মুড়িভাজা দিচ্ছি। শিমূল ঘরে ঢুকে মাদুর চিছিয়ে ক্যারম খেলার জায়গা ঠিক করে বোর্ড-গুটি-বরিক পাউডারের কৌটো নিয়ে এসে গুছিয়ে বসল। কয়েক দানা পাউডার বোর্ডে ফেলে স্ট্রাইকার দিয়ে ঘষে ঘষে বোর্ড পিচ্ছিল করে তুলল। তারপর গুটি সাজিয়ে খেলার জন্য তৈরি হয়ে পান্নুভাইকে ডাকলো, নিরুখালা আসতে আসতে আমরা একটু প্র্যাকটিস করে নিই, আসেন। পান্নুভাই খাট থেকে নেমে এঘর-ওঘর আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ছাইদান নিয়ে এসে বসলেন। শিমূল স্ট্রাইকার এগিয়ে দিল পান্নুভাইয়ের দিকে, আপনার হিট। তথাস্তু, বলে পান্নু গুটির চাকে আঘাত করেন। দুর্বল হিটে চাকের মধু মোটামুটি আগের মতোই জমাট থেকে গেল। সুযোগ পেয়ে শিমূল রিবাউন্ড শট্ নিয়ে চাক ছত্রখান করে দিল। হিটের প্রচন্ড ইমপ্যাক্টে এদিক-ওদিক দিশেহারার মতো ছুটোছুটি করে কালো গুটি একটি ওর বাঁ পকেটে এসে ঢুকলো। পান্নুভাই হতাশভাবে বললেন, হয়ে গেল, তুমি যা একটা কান্ড করলে, আর কি আমি সুযোগ পাব ?

পাবে, পাবে বলতে বলতে নিরু ট্রে নিয়ে এসে বসলেন, শিমূল, এই তোমার ভাজা মুড়ি, ওপরে ছোলার ঘুঘনি ছড়িয়ে দিয়েছি। কাঁচা মরিচ, লেবু, আদাকুচি যে-যার রুচিমতো নিয়ে নাও। ঘুঘনি আর লেবুর রসের মিশ্র সুগন্ধ শিমূলের নাকে পৌঁছতেই ও গোটা দুই কালো গুটি বোর্ডে রেখে স্ট্রাইকার ছেড়ে দিল পান্নুভাইকে। মুড়ির বাটি তুলে তাতে চামচ চালালো, মুখে পুরলো দু’চামচ, চিবিয়ে বুঝতে চাইলো, ওতে আরও কি যোগ করে ভ্যালু এ্যাডিশান করণীয়। তারপর মুড়ির ওপর আদাকুচি আর কাঁচা ঝালের কুচি ছড়িয়ে, উদারভাবে লেবুর রস যোগ করে খাবার গার্নিশিং-এর পাট চোকাল। খালা বলে উঠলেন, তুই খাদক বটিস্রে একজনা। পান্নুভাই ওদিকে লাল গুটি বোর্ডে না থাকার অজুহাতে গোটা দুই সাদা পকেটস্থ করেই ক্ষান্ত হিলেন। শিমূল ধীরেসুস্থে কনফিডেন্টলি কালো গুটি দু’টো পকেটে নামিয়ে দিয়ে পয়েন্টস গুণললাল গুটির দরুন পাঁচ আর বোর্ডে দৃশ্যমান সাত সাদা গুটির সাতমোট বারো পয়েন্ট ওর ঝোলায় জমা হল।

সবাই মুড়ি খাওয়ায় মন দিয়েছে। এত মজার মিশেল দেয়া মুড়িভাজা এক সিটিং-এ সাধারণত জোটে না। চোখের জল, নাকের ঝোলমিলেমিশে একাকার। মুড়ি শেষ করে শিমূল উঠে গিয়ে বারান্দায় ধারে, উবু হয়ে বসে মুখ হাঁ করে লালা ফেলতে লাগল অনর্গল। মিনিট খানেকের মধ্যে জিভের জ্বালা কমে এল। ভেতরে এসে একঢোঁক করে পানি মুখে নিয়ে খানিকক্ষণ রেখে মুখবিবর শীতল হলে গিলে ফেলাএই প্রক্রিয়ায় ক্রমশঃ দেহমনের আক্ষেপ-বিক্ষেপ কমে এল। নতুন করে গুটি সাজিয়ে খেলা শুরু হল। এবারে শিমূল একদিকে এবং পান্নুভাই-নিরুখালা আরেকপক্ষ। অতিরিক্ত শিভ্যালরি দেখাতে ও প্রস্তাব দিল, অনুপস্থিত চতুর্থ খেলোয়ারের দানও সে খেলবে না অর্থাৎ সত্যিই সে দু’জনের বিরুদ্ধে একাই খেলবে। পান্নুভাই কিছু না বললেও নিরুখালার তাতে প্রবল আপত্তি, কেন রে পান্নু, ও যে দেখছি আমাদের খেলোয়ার হিসেবে মিনিমাম সৌজন্যও দেখাচ্ছে না, ওর এত বড়ো সাহস ? সাহসের কি আছে, শিমূল মিটমিট করে হেসে বলে, যদিও তুমি আজকাল কেমন খেলছ, আমি জানিনা, তাও সাহসে ভর করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম। নিরু বলেন, যদি নিলগেম খেয়ে যাস, তাহলে কি হবে? নিল-এ হারলে আর খেলব না আজ, আড্ডা হবে ম্যারাথন। শিমূলের সরল উচ্চারণে তিনজনেই হো-হো হাসল প্রাণ খুলে। আহ্, কি বিশুদ্ধ আনন্দ। জীবন এত ছোট কেনে, ঠাকুরঝি?

শিমূলের উপর্যুপরি কুইপ শুনে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। তোর এতও মনে থাকে রে, শিমূল, হাসতে-হাসতে নিরুখালা সস্নেহে ওর লম্বা চুলে সরু আঙুল চালিয়ে স্ক্যাল্প মাসাজ করে দেন। শিমূল প্রশ্রয়ে খালার কোলে মাথা পেতে শুয়ে পড়ে বলে, ভাল করে আরাম দাও। পান্নুভাই উঠে ক্যারম বোর্ড, গুটি গোছগাছ করে একপাশে সরিয়ে দেন। পায়ে চটি গলিয়ে বারান্দায় যান পায়চারি করতে। পান্নুকে বিয়ে-টিয়ে করতে বল্ এবার, নিরুখালা পরামর্শ দেন। হুম্, শিমূল বলে, আর তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই আমার। বিএ পরীক্ষাটাই দেওয়াতে পারলাম না এই ন’ বছরে। ওর বন্ধুরা সবাই ডিগ্রী, মাস্টার্স করে, চাকরিতে প্রমোশন নিয়ে, সংসারী বনে গেছে, রসেবশে আছে সবাই। আর পান্নু বৈরাগীকে দেখ। আমি ওর সঙ্গে মিশি শুধু একটাই কারণে, বলতো কি সেটা? নিরুখালা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে চেপে যান, বলেন, জানি, দু’জনেই তোরা সেই ছোট্টটি থেকেই বুকওয়ার্ম। আমারই কেবল লেখাপড়া হলনা। শিমূলের ঘুম এসে যাচ্ছিল আরামে, তড়াক্ করে উঠে বসে বলল, এই আফসোস আমি শুনবোনা, খালু সেই কবেকার এমএ পাস দেয়া ভদ্রলোক, সঙ্গীত রসিকও বটেন, তাহলে তোমার বিদ্যার্জন আটকাচ্ছে কোথায়? সেসব কিছুনা, পরিবেশ, পারিবারিক সমর্থন কিছুরই কমতি ছিল না। আসলে আমারই গড়িমসির কারণে নিয়মিত লেখাপড়া আর পরীক্ষায় বসা হয়নি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পান্নুভাই পায়চারি করেই যাচ্ছেন। চলো, আমরা সামনের মাঠে আধঘন্টা দ্রুত হেঁটে আসি, বলে শিমূল উঠে পড়ে। আমি? এই চটি তো ছিঁড়ে যাবেরে জোরে হাঁটলে, খালার কন্ঠ মিয়োনো, শরীরও কেমন এলিয়ে পড়েছে। তোমার জুতো নেই? কাপড়ের জুতো? শিমূলের মুহুর্মুহু প্রশ্নে খালা বিব্রত হয়ে উঠে পাশের ঘরে গিয়ে বাটার ক্যানভাস শূবের করে পরে নেন।

কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিতে বলেন, চল্ দেখি তোর দ্রুত হাঁটা কাকে বলে একবার দেখে আসি। পান্নুর মুখ নিঃশব্দ হাসিতে ভাঙে, আমি আছি, শিমূল, তোমরা ব্যায়াম সেরে এস। দাঁড়া, খালা বলেন, তুলসী বাতিগুলো পরিষ্কার করে রেখে গেছে, জেলে দিয়ে যাই।

হারিকেন জ্বেলে ঘরে, বারান্দায় রেখে ওরা বাইরের মাঠে ঝকঝকে তারাখচিত আকাশের নিচে পাতলা আঁধারে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে লাগল। শিমূল খালার হাত ধরে নিল প্রথমেই, নইলে ওকে হাঁটানো যাবেনা; হাঁটা হবে না ওর। মিনিট দশেক হাঁটতেই বিন্বিনে ঘাস ফুটে উঠল শিমূলের মাথায়, ঘাড়ে, মুখে, হাতে। একটু আস্তে হাঁট্ না, খালার কব্জিতে এটেঁ বসা ওর হাতের তালু ঘেমে চট্চট্ করছে, টের পেল। ছাড়ার পাত্র নয় সে, আধঘন্টা হতে ঢের দেরি। কাজেই, কথা কম, কাজ বেশি আপ্তবাক্য শিরোধার্য করে শিমূল নিরুখালাকে প্রায় তাড়িয়ে নিয়ে চল্ল, মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, আবার ফেরত আসা, আবার…। শিমূলের পরিশ্রম একটু বেশি হচ্ছিল, কিন্তু নিরুখালার হালকা শরীর প্রায় উড্ডীন পরিক্রমা করে চলছিল। অবশেষে পঁচিশ মিনিটের মাথায় ওরা ধীরে ধীরে হাঁটার বেগ কমাতে লাগল। হাত ছেড়ে দিয়ে শিমূল ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম করল মিনিট কয়েক। তারপর ওদের বাসার দরজার সামনে ঘাসের গালিচায় বসে পড়ে জিরোতে লাগল। খালা আঁচলে মুখ মুছে আকাশপানে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, বহুদিন পর হাঁটলাম আজ। হাঁটার মতন হাঁটাই বটে। তোমার কাফ মাসল একটু মাসাজ করো, নইলে দড়কচ্চা মেরে গেলে কষ্ট পাবে পরে, বলে শিমূল নিজের পা মাসাজ করতে লাগল হালকাভাবে।

আগে বলিসনি কেন? এত কষ্ট করে হাঁটা, তারপর এখন আবার মালিশ করো, আমার দ্বারা ও হবেনা, একটু আরাম করে বসতে দে আগে। নিরুখালার কথা শুনে শিমূল হাসে, ওর হাসি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উচ্চগ্রামে ফেটে পড়ে। আরে মালিশ নয়, তোমার হাঁটুর নিচের মাসলে হাত দিয়ে দেখ। দেখবে কেমন দলা-দলা শক্ত হয়ে আছে। ওই মাংসপেশিকে একটু নেড়েনেড়ে ঢিলে করে নেয়াই মাসাজের উদ্দেশ্য। বলে শিমূল শাড়ির ওপর দিয়েই খালার কাফ মাসল আস্তে আস্তে টিপে নরম করে দিতে থাকে। নিরু দু’হাতে পেছনের ঘাসে শরীরের ভর রেখে দু’পা সামনে ছড়িয়ে দেন। মাথা পেছনে হেলানো, আকাশ দেখছেন। ওরা খেয়াল করেনি কখন পান্নুভাই এসে খালার পেছনে দাঁড়িয়েছেন। শিমূলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে সজাগ হতে বলায় ও মুখ ঘুরিয়ে পান্নুভাইকে দেখে বলে, এতক্ষণ খালাকে হাঁটিয়েছি, এখন মাসাজ করে দিচ্ছি, নইলে তো কাল সকালে ঘরের দরোজা খুলতে পারবে না। পান্নুভাই হেসে ফেলেন ঘাসে বসতে বসতে, আস্তে আস্তে হাঁটলেও তো হত, তাইনা? না, শিমূল জেদি গলায় কেটে কেটে বলে, তাহলে এর সবটাই খালা ভুলে যেত দু’দিনে।

আর এখন যে আমাকে হাঁটার নেশা ধরিয়ে দিলি, তার কি হবে? পা গুটিয়ে বসে, দু’হাঁটু জুড়ে, তার ওপর থুতনি রেখে নিরুখালার সকৌতুক প্রশ্ন। কি আবার হবে, প্রতি সন্ধ্যায় মাঠ ফাঁকা হয়ে গেলে তুমি আর খালু হাঁটবে, তারপর বসে জিরোবে, পা মাসাজ করে নেবে একটু, ব্যস, শিমূল থামে না, তারপর ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসবে, খালু দেখেশুনে দেবেন কোথাও আটকে গেলে। জ্ঞানার্জন করবে শরীর চর্চার সাথে, দেখবে অবসাদ, ক্লান্তি সব দূর হয়ে যাবে। তুলসীকে আবার তুমি পড়াবে রোজ আধঘন্টা, একফাঁকে। বিদ্যাদান যত করবে, ততই তোমার বাড়বে, বুঝলে? কে বললো তোকে? নিরুখালার চোখ হাসছে, শিমূল দেখতে পায় আলো-আঁধারি ঐ নির্জন মাঠের প্রান্তে বসে। আমার নানাচৌগাছির বড় কাজী আনসার উদ্দিনের মুখে আরও কতশত ওরকম শুনেছি। আমি মনে মনে ওগুলো আওড়াই মাঝে-মাঝে, আবার প্রয়োগও করি। চল্ এবার, খাওয়াদাওয়া করে আরেক রাউন্ড চা খেয়ে, গল্পগাছা করে শুয়ে পড়বি সকাল-সকাল।

দুপুরে গোসল না করলেও এখন শিমূল ভেজা গামছায় তপ্ত শরীর মুছে আরাম পেল খুব। এরিমাঝে তুলসী এসে গেছে। নিরুখালা পরিষ্কার হয়ে ওকে আগে খেতে দেন। শিমূল-পান্নু ততক্ষণে লুডোর বোর্ড নিয়ে সাপলুডো খেলায় মেতেছে। নিরুখালা রান্নাবান্নার ফাঁকে ফাঁকে এসে ওদের সঙ্গে একটু করে আড্ডা দিয়ে আবার গিয়ে সংসারের কাজ গুছোচ্ছেন। ওরা চা আর কুচো নিমকি পেয়েছে ইতোমধ্যে। ঘরে তোলা ঘিয়ে ভাজা সে নিমকপারার (শিমূলের উর্দুবলা বন্ধুরা কুচো নিমকিকে ওই নামে ডাকতো) স্বাদ শিমূলের পছন্দের মালাই-চা সহযোগে জিভে-দাঁতে নাছোড় লেগে থাকছে। সাপলুডোর আছাড়গুলো শিমূলের মন্দ লাগেনা। সাতানব্বুই থেকে ব্যথাহীন আছাড় খেয়ে তিনে নেমে সে মনে মনে মালাকোচা মেরে আবার ওপরে ওঠার মইয়ে চড়তে মোটেই ক্লান্তিবোধ করে না। তুলসীর খাওয়া শেষ, নিরুখালা এবারে এসে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলেন, আমাকে খেলতে নেবেনা তোমরা? অবশ্যই, পান্নুভাই বলেন, বাড়ির মালিক বলে কথা ! শিমূল ওঘর থেকে চেয়ার এনে নিরুখালার পেছনে নামিয়ে দিল। খালা বোর্ড উল্টে ঘরলুডোর ছক দেখিয়ে বললেন, আমি একাদুই হাত খেলি? আমরা যেহেতু মানুষ তিনজন…নিরুখালাকে থামিয়ে দিয়ে শিমূল বলে ওঠে, বুঝেছি। তোমার ধারণা লুডোতে তুমি হারোনা, অতএব…ঠিক আছে, খেল, তবে ডাইনে-বাঁয়ে করা চলবেনা, বলে রাখছি। খালা হেসে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন।

খেলা চলল। পান্নুভাই অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে চাল দিলেও প্রয়োজনীয় দানগুলো পেয়ে যেতে লাগলেন অনায়াসে এবং সহজেই অল্প সময়ে উনি নিজের তিনটে গুটি বাড়িতে তুলে দিলেন নিরাপদে। একগুটি তো লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাবে, ও নিরু খালা, ধরো, ধরো, ঘিরে ফেল ওকে তোমার আটগুটির ব্যূহজালে, শিমূলের উৎসাহে খালা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পান্নুভাইয়ের একা গুটিকে হত্যা করে কাঁচা করে দিলেন। শিমূলও তার বাইরে থাকা দুই গুটি নিয়ে খাবি খেতে লাগলো। নিরুখালা এদিকে জোড়গুটির ব্যারিকেড তুলে আর উপর্যুপরি মার দিয়ে নিজের পাঁচ-পাঁচটা গুটি বাড়িতে তুলে দিল। বাকি তিনটে আগুপিছু কাছাকাছি রেখে চালাতে লাগল, কখনো প্রয়োজনে দু’টো জোড়া করে ওদের গুটি আটকে মেরে দেন। আসলে ঘরলুডোতে মেয়েদের মাথা ভাল খেলে, শিমূলের বাবাও তাই বলতেন শালীদের সঙ্গে খেলতে বসলে। তাকে হাসতে দেখে নিরু বললেন, হাস্ছিস যে বড়ো, হারু-হারু…সুর করে ওকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা আরকি। শিমূল তাতে দমে যায়না মোটেই। বলে, আর তুমি যে বলেছিলে, রোকনপুরের নূতন সংঘ লাইব্রেরি থেকে কৃষ্ণকান্তের উহল এনে দিতে ? বুঝলেন পান্নুভাই, নিরুখালা তখন কেবল আমদানি হয়ে এসেছেন গড়াইপাড়ের কামারখালি থেকে ঢাকায়। আড়চোখে দেখল, খালার মুখ লাল এবং গম্ভীর, চোখ নিচের বোর্ডে। মা তো আমাকে দিয়ে নূতন সংঘ থেকে বই এনে পড়তেন, খালাও তাই আমাকে…।

হ্যাঁ, পান্নুভাই সাড়া দেন, খালা মানে তোমার মা গুচ্ছের উপন্যাস পড়তেন আমি ঢাকায় বেড়াতে এলে নিচের তলায় নেমে খালার টেবিল খুঁজে পেতে বই ধার করতাম। তুমিও তো গোগ্রাসে গল্প-উপন্যাস গিলতেকখনো চুরি করে। হ্যাঁ, মা যেগুলো পড়তে বারণ করতেন, শিমূল বলে, মা যখন ওপরে খুরূদের বাসায় আড্ডা দিতে যেতেন, সেই ফাঁকে হুড়মুড় করে পাতা ওল্টাতাম কেবল। ছোটদের কেউ ধারেকাছে থাকলে হুঁশিয়ার করে দিতে বলতাম। নীহাররঞ্জনের হসপিটাল, মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব ওইভাবে পড়া হয়েছিল আমার। এখন ভাবলে হাসি পায়। হুঁঃ, এখন তো তুমি ইংরেজি সাহিত্যে দু’টো পাশ দিয়েছ্ োকি দাওনি, তাতেই মনে হচ্ছে, সাপের পাঁচপা দেখেছো, খালা রাগতস্বরে বলে উঠলেন, নারে পান্নু, বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসটার বাঁধানো মলাটে ছাপানো মোটা অক্ষরে উইলের হ্রস্ব-ই অক্ষরের ওপরের অংশ পড়–য়াদের আঙুলের ঘষটানিতে নিশ্চয় মুছে গিয়েছিল, তাই আমি ভুল করে ‘উহল’ বলেছিলাম। তাতে অত লজ্জা দেবার মতো কি ব্যাপার হল, বলতো? আমি দেখছি, তুমি এখনো একইরকম ছেলেমানুষ রয়ে গেছ, খালা, মনে আছে, তুমি কেঁদেকেটে এসে মাকে বলে আমাকে মার খাইয়েছিলে? আমি কিন্তু ভুলিনি, বলে শিমূলও মুখভার করে বলে, আমি আর খেলবো না, হেরে গেছি।

পান্নুভাই দু’হাত উপরে তুলে হতাশভাবে উচ্চারণ করলেন, হা হতোহস্মি! খালা নিঃশব্দে উঠে গেলেন। তুলসী তুই শুয়ে পড় এবার। আমি ওদের খেতে দেব এখন, খালার কন্ঠ শোনা গেল রান্নাঘরের ওদিক থেকে। শিমূল ক্লান্তবোধ করে হঠাৎ। খাটে উঠে চিত হয়ে শবাসনে পড়ে থাকে চুপচাপ কিছুক্ষণ। শুয়ে কেন রে? ওঠ্ জলদি। হার স্বীকার করলেই আমি ছেড়ে দেব ভাবলি কি করে? খালার ডাকাডাকিতে শিমূল উঠে বসে। নিরুখালার হাসিমুখ দেখে ও হেসে ফেলে, স্যরি নিরুখালা, আর ক্ষ্যাপাবো না। তোকে হারানোর আগেই ‘হারু’ বলা ঠিক হয়নি আমারও। খালা বিব্রতমুখ। পান্নুভাই এবারে কথা বলেন, আমার মনে হয় আমিই জিতে গেছি। এখন খেয়েদেয়ে নিই, তারপর দ্বিতীয় পর্বে আবার দেখা যাবেখন। বারান্দায় গিয়ে দেখা গেল, খালা খাবার রেডি করেই ওদের ডাকাতে গিয়েছিলেন। সবাই চুপচাপ বসে খেয়ে নিল। শেষপাতে খালা দু’চামচ করে রাবড়ি দিলেন। ওদের চেটেপুটে খেতে দেখে আরও দিলেন, সেটাও মজা করে খেতে খেতে শিমূল বলে উঠল, হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিঃশব্দ, তারপর বলতো কি ? নিরু হাসতে হাসতে বললেন, পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। কে শিখিয়েছিল বল্। এই যে, পান্নু, গুরু, অলসো নোউন অ্যাজ শামসুল আলম, বলে শিমূল রাবড়ি মাখা আঙুল তুলে পান্নুভাইয়ের কপালে তিলক এঁকে দেয়। শিব্রাম্ চক্কোত্তি দেখলে হ্লাদিত হতেন রাবড়িতিলক বলে কথা !

কাল সকালে উঠে তুলসীকে বলব, আমাদের একটা এক্কাগাড়ী ধরে দাও। সোজা গড়াইপাড়ে নারুয়া চলে যাব, তারপর নদী পেরোলেই নানাবাড়ি চৌগাছি। রাজি? বলে শিমূল পান্নুভাইয়ের সম্মতি চায়। যথা ইচ্ছা তব, আমি সঙ্গে যাব শুধু, ভদ্র। পান্নুভাইয়ের নির্লিপ্ত জবাব শুনে নিরুখালা হাঁড়িকুঁড়ি গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, আচ্ছা পান্নু, অনেক রকম পড়াশুনো করতে করতে শেষে মিসৌউিজিনিস্ট না কি বলে, তাই হয়ে গেলে নাকি তুমি? খালার কন্ঠে বিশুদ্ধ সরল ঔৎসুক্য ছাড়া কোন উপহাস তো বাজেনি আবার? শিমূল সতর্ক হয়েও তেমন কিছু টের পেল না। অতএব, সেও থালায় হাত ধুতে ধুতে, ওটা যেন শুধুই কথার পিঠে কথা ছিল, এমনি ভাব করে লুঙিতে হাত মুছতে মুছতে উঠল। কিন্তু পান্নুভাই স্থাণুবৎ বসে। কেউ কিছু বলছে না দেখে উনি অবশেষে বলতে বাধ্য হলেন, সোজাসুজি বাংলায় জিজ্ঞেস করলে কি আর আমার জবাব দিতে বাধতো? যাক্গে, না, আমি আদৌ তা নই, কারণ ঐ বিশেষ প্রজাতির জীবদের নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার হয়নি এতদিন। এবার থেকে মনোযোগী হবার চেষ্টা করব, কথা দিচ্ছি। আমরা কি আশা করতে পারি, শীগ্গিরই তুমি একটি রমণীরত্নকে উদ্ধার করবে ? খালার প্রশ্ন শুনে আচমন শেষে উঠে পড়তে পড়তে পান্নুভাই মুচকি হাসেন, একটি কেন, বিলম্বে জরিমানা দিতে একাধিকেও যদি অরুচি না ঘটে?

নিরুখালার সঙ্গে শিমূল এঁটো থালাবাটি নিয়ে রান্নাঘরে কলের নিচে রাখে। বেরিয়ে এসে রান্নাঘরের কপাট টেনে শেকল তুলে দেয়। পান্নুর পেটে পেটে এত যে ছিল, দেখলি, আমি খোঁচা দেয়াতে কিভাবে রিঅ্যাকট্ করল? নিরুখালার গলা জড়িয়ে ধরে এগোতে এগোতে শিমূল বলল, আমি কিন্তু অবাক হইনি মোটেও। এধরণের কথা বা সিদ্ধান্ত ঘোষণা খুবই মানবিক, তাই আমাকে ইত্যাকার প্রপঞ্চ মোটেই আন্দোলিত করেনা আজকাল। কিন্তু তুমি ঐযে মিসৌজিনিস্ট বললে আমার গুরুকে, ওই গালমন্দ শিখলে কার কাছে? তুই কি আর সেই ছ্ট্টো শিমূল আছিস যে, আমার গলা ধরে ঝুলবি? আমি তোর শরীরের ভার নিতে পারি ? বলছি ছাড়, পানের বাটা নিয়ে আসছি ওঘরে। শিমূল প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে হেঁটে ঘরে দিয়ে বিছানায় চিত হয়। খালা এসে খাটে উঠে বসেন, পান সেজে মুখে দেন আর শুধু পানে চুন ছুঁইয়ে শিমূলকে দেন, খা, একটু বেশিই খেয়েছিস রাতে, পানের রসটা হজমে সাহায্য করে। ওহ্, তারপর আবার দেলখোস কেবিনের রাবড়ির সঙ্গে তুলনীয় অমৃত। ইস্, শিব্রামবাবুকে যদি তোমার এই রাবড়ি খাওয়াতে পারতাম, শিমূলের অক্ষেপ পান্নুভাইকেও ছোঁয়। টেবিলে বসে উনি ধূমপান সহযোগে কিছু পড়ছিলেন। ঠিকই বলেছ। চক্রব্রতির লেখা পড়ে পড়ে আমরা সেই কবে থেকে মিনিমাগনার ভোজ খেয়ে আসছি, তাইনা?

ওসব কথা থাক্, পান্নুভাই, এখন শোনা যাক নিরু খালা ওরফে আমাদের বেগম রোকেয়া কি করে ঐ মি-মি-মিসৌজিনিস্টের মতো কঠিন তত্ত্বের সন্ধান পেলেন, কোথায় এর উৎস। শিমূলের ইয়ার্কি শুনতে শুনতে খালা ওর মাথায় আলতো চাঁটি মারলেন, বললেন, তোর খালুও যে তোর মতো ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ সেটা জানতে পারলাম উনি যখন আমাকে ওঁর পছন্দের বই থেকে পড়ে শোনাতে আরম্ভ করলেন বছর চারেক আগে। ঠিক বলিনি? বেগম রোকেয়া? নিশ্চয় সংসারের কাজ সেরে রাতে দরজা বন্ধ করে খাটের ওপর হারিকেনের আলোয় তোমাদের বিদ্যাচর্চা হয়ে আসছে? শিমূল প্রশ্ন করা বন্ধ করলে খালা মাথা ঝঁকিয়ে সম্মতি জানান, তুই তো পীরের গুষ্ঠির ছেলে, তাই সবই আগে আগে জেনে যাস, তাই নারে? নিরুখালা বলতে থাকেন। জোনাথন সুইফ্ট নামের এক ইংরেজ লেখকের রচনা গালিভার্স ট্র্যাভেল্সতার আবার অনেকগুলো খন্ড ক্ষুদেদের দেশে, দৈত্যদের দেশে, লাপুটা আর হুইনিমদের দেশে ভ্রমণের কাহিনী। আসলে ওগুলো নাকি রূপক, তার আবার কয়েক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সব ভারী ভারীমানুষের নীচতা, লোভ, প্রভুত্ব করার মোহ এইসব বদগুণের নিন্দা আর মানবেতর প্রাণীদের তুলনামূলক উৎকর্ষ এইসব তত্ত্বই নাকি ওইসব কাহিনীর আড়ালের বক্তব্য। একটানা ভারী ভারী কথা বলে খালা হাঁপাচ্ছিলেন। শিমূল-পান্নু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল।

অবশেষে পান্নুভাই বললেন, সুইফট্ যে নারীবিদ্বেষী ছিলেন ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খালা বললেন, আমি তাও শুনেছি তোমার খালুর মুখেলেখকের জীবনকথা আলোচনার ফাঁকে। এবার সাফাই গাইবার পালা আপনার, শিমূল পান্নুভাইকে খেই ধরিয়ে দেয়। না, আমার তেমন কোন ডিফেন্স নেই। ছোট্ট একটু হৃদয়ঘটিত ব্যাপার যে ছিল, শিমূল জানে ব্যাপারটা, সেটা আসলে অত্যন্ত ঘোলাটে হয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি না, কি করব এগোব, না ভুলে যাব পান্নুভাই হতাশভাবে মাথার লম্বা, কোঁকড়ানো চুল দুই মুঠোয় ধরে ঝাঁকান। নিরুখালা নিরুত্তেজ গলায় বলেন, ও আমি যা বুঝেছি, তোমাকে নতুন করে শুরু করতে হবে। আমরা, মানে আমি আর শিমূল তোমার বন্ধুর মতো, অন্য সম্পর্কের কথা যদি বাদ দাও আমরা তোমার ভাল অবশ্যই চাই এবং সেকারণেই পরামর্শটা দেয়া। পান্নুভাই ওদের দু’জনের মুখে নির্লিপ্তির নিখাদ ছবির পাশাপাশি সমমর্মিতার নরম ও মলিন আলোর খেলা দেখেন। তারপর বলেন, ঠিক আছে, তাহলে কিন্তু আমাদের কাল হাটগোপালপুর হয়ে যেতে হবে।

যাব, শিমূলও গম্ভীর হয়। বলে, আমি সত্যিই মনে করি, কোন বলিষ্ঠ মানুষীর সঙ্গ বেছে নিয়ে তরতাজা জীবনে ফিরে যাওয়াই আপনার জন্য ঠিক কাজ হবে। নিরু খালা একঝলক শুদ্ধহাসি উপহার দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ান, বলেন, শিমূল, মশারিটা কেবল টেনে নামিয়ে একটু গুঁজে নিতে পারবি না? খুউব, তুমি যাও, ঘুমোও। সকাল থেকেই তো আবার লেগে যাবে হেঁশেল ঠেলতে, বলে শিমূূলও নেমে বাথরুমে যায়। ঘুরে এসে দরজা বন্ধ করে মশারি টেনে নামায়, চারধারে ঘুরে ঘুরে গোঁজে, তারপর ঘেরাটোপে ঢোকা আর ঘুমিয়ে পড়া শুধু।

যথারীতি ভোরে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে শিমূল সামনের মাঠে পায়চারি করতে গেল। নিরুখালা রান্নাঘরে ব্যস্ত। তুলসীকে পাঠানো হয়েছে কিছু মাছতরকারি কিনতে আর এক্কাওয়ালার সঙ্গে কথাবার্তা বলে আসতে। মিনিট পয়ঁতাল্লিশ হাঁটতে ঘাম বের হ’ল, তারপর শরীর জুড়িয়ে শীতল হলে ফেরা। স্নান, দাড়ি কামানো সাঙ্গ হতে হতে খালার নাশতা রেডি। বারান্দায় মাদুর পেতে বসা হল। পান্নুভাই চোখমুখে পানি দিয়ে এসে খেতে বসলেন। লাল আটার হাতরুটি, মিশ্র সবজি, ঘিয়ের সুবাস ওড়ানো সুজির মোহনভোগ। চমৎকার, শিমূল বলল। ধরা যাক, স্যরি, খাওয়া যাক খাতা কয় রুটিকা এবার, পান্নুভাই প্রসন্নমুখে পাদপূরণ করেন। তোমরা যে বড় লেখকদের লেখা কবিতা,গানের ইচ্ছেমতো প্যারডি করো, তাতে কোনরকম খারাপবোধ করনা? নিরু খালার সরল প্রশ্নে শিমূল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, ভাবলে বোধহয় খারাপ লাগবে আমারও। পান্নুভাই গম্ভীরভাবে খেয়ে যান। খালা চা তৈরি করে এগিয়ে দেন। তুমি খাচ্ছ না কেন? বলে একটা থালায় শিমূল রুটি, সবজি তুলে খালার হাতে ধরিয়ে দেয়। আমিই তো নিচ্ছিলাম রে, বাপু, বলে নিরু খুশিমুখে খেতে আরম্ভ করেন।

পান্নুভাই স্নানাদি সারতে গেলে শিমূল তার ব্যাগ গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরের সামনে বারান্দায় মোড়া টেনে বসল। আজ তোরা তাহলে আতর ভাইয়ের ওখানে থাকবি মনে হচ্ছে, ডালে বম্ভার দিতে ব্যস্ত নিরুখালা নিচুগলায় বললেন। দেখা যাক্, সেটা নির্ভর করবে আমার বোনটির উপস্থিতি ঘিরে, শিমূল সন্তর্পনে উচ্চারণ করে। কণা না থাকলে আমরা সোজা চৌগাছি চলে যাব গড়াই পেরিয়ে, বুঝলে তো ? হ্যাঁ, পান্নুর নজর ঢাকা থেকে এদিকে ঘুরিয়ে দেয়া গেলে দু’কূলই বাঁচে এখন, খালা দীর্ঘশ্বাস চাপেন। আমার বড়বু’টি যে কি মানুষ, সে তো আমিও জানি বেশ কিছুটা, বলে আঁচলে কপালের ঘাম মোছেন। হ্যাঁ, পাতলা খান লেইনের ৮৩ নম্বর বাড়ির কথাটা ভাব শিমূল উদাসভাবে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে নজর চালিয়ে দেয় সামনের মাঠে এক মিলনমেলাই ছিল বটে ঠিকানাটি, এই তোমার, আমার, পান্নুভাইয়ের কথাই ধরো, ওই বাড়িতেই কিন্তু আমাদের সবারই সেই আমার ছোট্ট বেলায় কাছাকাছি আসা। আমাদের ছাদের সেই ক্লাবঘর ? নিরুখালা বলে উঠলেন কথার মাঝে, যার যখন মন খারাপ হত, তাকে ঐ ছাদের ঘরেই পাওয়া যেত নির্ঘাৎ, তাইনা? হ্যাঁ, মায়েরাও জানতেন, শিমূল বলে আর হাসে, তবে রাতে কিন্তু আমরা কেউ একা ছাদে যেতাম না, কেন বলতো? কেন আবার? ঐযে ‘ফ্যাব্রিক হাউস’ বাড়ির রিনার নানির আত্মা ওই ছাদের ঘরে এসে উঠতো না রাতে? তখন অন্তত ঐরকমই আমরা ভেবে নিয়ে, ভয়ে শিহরিত হতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, বলে শিমূল উঠে সদর দরজা খুলে দেয়।

কি তুলসী, ঘোড়গাড়ি মিলল? পান্নুভাই হাল্কা গলায় জিজ্ঞেস করলেন। পাওয়া গেছে স্যর, আপনাগের কপাল বালো, তুলসী নিশ্চিন্ত করে, নয়টায় আস্ফি। আপনারা রেডি হন। আমরা রেডি, শিমূল বলে। দাঁড়া, আমার এখনো কাজ বাকি, বলে নিরুখালা রান্নাঘরে ঢোকেন শশব্যস্ত হয়ে। বোঝা গেল, কালুখালি থেকে আসা খাবারের পাত্রগুলো এখানে খালি হয়েছিল, আবার ভর্তি হয়ে ওদের কাঁধে চাপবে এবার। আপনমনে হাসতে হাসতে শিমূল টয়লেটে গেল। গাড়ি এসে গেল। হ্রেষারব শুনে শিমূল বেরিয়ে দেখল, ঘোড়াটা মাঝারি মাপের, তবে বেশ তাগড়া, চনমনে দেখাচ্ছে। খালাও এসে বাচ্চাদের মতো ঘোড়া দেখে গেলেন।একেবারে তুলসী ওদের ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলে বেঁধে দিল, খাবার ভর্তি ঝোলাঝুলিও বাঁধা হল একধারে ঝুলিয়ে দিয়ে। এত বাঁধাছাঁদা কিসের, রেখে দাওনা তুলসী অমনি একধারে, আমরা দু’ভাই তো মোট যাত্রী। শিমূলের কথা শুনে তুলসী হেসে বলে, সে আপনি যাত্রা করলিই টের পাবানে বাঁধার কি দরকার। রাস্তা তো আপনার সমান না, খানাখন্দ, খালবিল পারায়ে যাওয়া তো, বাঁধা থাকাই ভাল, নাকি কও গাড়োয়ান? তা তো বটেই, তবে আমিই কি আর উনাগের গায় ব্যাতা দিয়ে চালাবানে গাড়ি? তুইউ যেমন তুলসী। তুরা গাড়িতি উটলি এক নহম, বাবুভেয়েরা উটলি আরেক নহম, বুঝলি? তবে কি, কথায় বলে না, সাবধানের মার নেই।

নিরুখালার সঙ্গে করমর্দন করে ওরা বিদায় নিল। শিমূল আর পান্নু পেছনে পা ঝুলিয়ে বসেছে, গাড়োয়ানের সঙ্গে পিঠোপিঠি। ফলে, ওর সঙ্গে আলাপচারিতায় একটু অসুবিধে যা হচ্ছিল, সেটা হলচেঁচিয়ে কথা বলা। তা শিমূলের ভালই লাগছিল চেঁচিয়ে কথা বলতে, মাঝে মাঝে, পরিবেশের অখন্ড নীরবতা ভেঙে ভেঙে। তুলসীর কথা ঠিক। শিমূল খেয়াল করল, মাঝে মাঝে গাড়ি পথ হারিয়ে খানায় পড়ছিল, বিপজ্জনকভাবে কাত হয়ে যাচ্ছিল, সঙ্গে ওরাও, আবার সোজা হয়ে পথে এসে পড়ছিল। গ্রাম ছাড়িয়ে ওরা একসময় ধূ-ধূ মাঠে নেমে গেল। ওটা নাকি বর্ষাকালে এক দিগন্তবিস্তারী বিলের চেহারা নেয়। ওপথে বড় গাছ বিশেষ নেই। রোদ চড়ার সঙ্গে গরমবোধ হচ্ছিল। ফুলহাতা শার্ট খুলে শিমূল হাওয়াই শার্ট পরে নেয়, আরাম হয় কিছুটা। চারদিকে দেখে আর ছোটবেলায় পড়া বিলের সংজ্ঞা মিলিয়ে সে কিছু কিছু ভৌগোলিক প্রমাণও পেতে লাগল। বিলের এখানে সেখানে কাঁটাবাবলার ঝোপ। কোথাও গত বর্ষার কচুরিপানা শুকিয়ে জড়ো হয়ে আছে। বিলের মাঝখানে এক প্রকান্ড ছত্রধারী কদম গাছের নিচে গাড়োয়ান গাড়ি থামাল। ঘোড়াকে গাড়ির নিচে বাঁধা বিচালি টেনে বের করে চিবুতে দিল। তেমনিভাবে ঝোলানো বালতি খুলে নিয়ে কাছাকাছি এক ডোবা বা ‘কুয়ো’ থেকে তাতে ঘোলাটে পানি ভরে নিয়ে এসে ঘোড়ার সামনে ধরে দিয়ে নিজে বিড়ি ধরাল।

কদমের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে শিমূল-পান্নু ভাবল, পথের খোঁজখবর নিয়ে খালার দেয়া খাবারের কিঞ্চিৎ সদ্ব্যবহার করা বিধেয়। গাড়োয়ান যা বলল, তাতে বোঝা গেল, ওদের কীর্তিমান মামা আতোয়ার মাস্টেরকে এলাকার তাবৎ মানুষই চেনে এবং কিছুটা ছিটেল টাইপের মানুষ বলে সমীহও করে যাকেদূর থেকে। তো, তার বাড়িতে ওদের পৌঁছতে আরও ঘন্টাদুই সময় লাগবে। অতএব খাওয়াদাওয়া সারা গেল। রওনা হয়ে গাড়ির চাকা আরও গড়ালে বিলের ধার দিয়ে চলার পথে হিজলের ছায়া ওদের শরীরে আরাম দিচ্ছিল মাঝে-মাঝে। শিমূলের নানাবাড়ি চৌগাছির পুরনো বাড়ির নিচে ফসলের মাঠ শুরু হওয়ার আগেই প্রকান্ড এক হিজল পুকুর। প্রাচীন জলাশয়ের চারপাড় ঘিরে অত্যন্ত ঘন হিজলের সমারোহের কারণে ওই নামের উৎপত্তি। বছর দশেক আগেও তো বর্ষাশেষে চৌগাছি বেড়াতে গেলে ওরা হিজল পুকুরের পাড়ে দিনে বেশ ক’ঘন্টা কাটিয়ে দিত। ওই পুকুরের জল, কেন জানা নেই, অত্যন্ত পুরুষ্টু কচুরিপানার ঢাকনায় ঢাকা থাকত। ওই হিমশীতল জলে কেউ নামত না। শিমূলরা দু’চারজন দুষ্টু কিশোর দুপুরে স্নানের আগে গামছা পরে সাবধানে কোমরজলে নেমে ঐ কালচে সবুজ ডাঁটো কচুরিপানার দঙ্গল দড়ি দিয়ে ঘিরে হেঁইও-হেঁইও করে পাড়ে টেনে তোলার আগেই ডজন-ডজন কই-শিং লাফিয়ে উঠে পালাতে চাইত। তখন পাড়ে তৎপর ভাইবোনেরা খপ্ করে একেকটা ধরে এলুমিনিয়ামের ঢাকনাও’লা ডেক্চিতে পুরে ফেলত। শিমূলরা পাশের পুকুরে আবাহন স্নান সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ওই মাছের ভাজা অথবা চচ্চড়ি রান্না হয়ে যেত।

পান্নুভাইকে হিজল পুকুরের আরো গল্প শোনাতে শোনাতে বিলের পথ শেষ হয়ে এল। গাড়ি গাঁয়ে ঢুকলো। আইসে গ্যালাম আপনাগের হাট গোপালপুরি। মাস্টের সায়েবের বাড়ি অবশ্য গিরামের ওই মাথায়। আস্তে আস্তে যাই। মধ্যিখানে আবার বাজার পড়বেনে। এই এতখানি পথ আলাম, পাংশা বাজার ছাড়ার পর আরেট্টা গাড়ি কি মনিষ্যি দ্যাখলেন, বলেন? না, সেটা শিমূলও লক্ষ্য করেছে। পুরো পথটাই কেমন পরাবাস্তবিক এক ভূগোলের ক্লাস মনে হয়েছে ওর। কোন ভূতে পাওয়া ফিল্মের দৃশ্যকাব্য যেন। পান্নুভাই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন। ভেতরে বড়রকমের ভাংচুর চলছে, শিমূল বুঝতে পারে। পান্নুভাই, আপনার কোনরকম আপত্তি থাকলে আমরা কিন্তু এঘাট না ছুঁয়েও চলে যেতে পারি অনায়াসে, শিমূল শেষবারের মতো পাশ কাটানোর চেষ্টা করে। পান্নুভাই বাবড়ি চুল ঝাঁকিয়ে বলেন, না, না, যাব যখন বলেছি আমি, চল একূল দেখেই ওকূলে যাই। গুরুর চোখে লালের ছটা দেখে শিমূল ওর কপালে হাত দিয়ে বিস্মিত প্রশ্ন করে, জ্বর এলো কখন আপনার? এতো এহাবারে দ্যাবদাশ উপাখ্যানের চেহারা নিতাছে, ও পারু-উ-উ…শিমূলের এক্টো দেখে পান্নুভাই কষ্টে হাসেন, চল, বাজারে গাড়ি থামিয়ে একটা স্যারিডন খাই চা দিয়ে, মাথাটা ধরেছে বেশ। হুঁ, এতটা পথ রোদ্দূর মাথায় করে আসা, সত্যি-সত্যি জ্বর না এলেই হয় এখন, শিমূল দুঃশ্চিন্তায় পড়ে। গাড়োয়ানকেও চিন্তান্বিত দেখায়। সে বলে, আমার কলিই তো ছই লাগায়ে দিতাম উপরে। গাড়ির নিচেই তো বাঁদা ছিল। যাইক্গে, এহন চা খাইয়ে নেন আগে, বলে সে বাজারের শেষে বটগাছের নিচে গাড়ি থামায়।

শিমূল লাফিয়ে নেমে জায়গায় দাঁড়িয়ে মিনিট খানেক দৌড়ায়। তারপর পাশের চা-দোকানিকে কড়া করে তিন গেলাস চা দিতে বলে। গাড়োয়ান খুশি হয়ে বলে, চা আমিউ খাই মাঝে-মাঝে। আপনাগের মতো টাউনির পেশেন্ডাররাই খাওয়ায়, হেঃ হেঃ। চা খেতে খেতে শিমূল দূরের মাঠে নজর চালিয়ে দেখল, আতর মামার মতোই শশব্যস্ত ভঙ্গিতে ছাতা মাথায় কেউ একজন আসছে গোপাট ধরে। মানুষটা আরো এগিয়ে এলে সে চিনতে পারল, পথিক আতরমামাই বটেন। সম্ভবত স্কুল থেকে ফিরছেন। শিমূল ভাইকে বলে, ঐ যে আসছেন আপনার বকাবাজ মেজমামা। কড়া চায়ের সঙ্গে স্যারিডন খেয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাঙ্গাবোধ করছেন পান্নুভাই, মৃদু হেসে বলেন, আর তোমার গন্ধমামা। সুগন্ধ মামা, শিমূল সংশোধন করে। মাঠের রাস্তা ধরে এগিয়ে এসে আতরমামা ঐ গাছতলাতে ওদের গাড়ী দেখে, ডাইনে না ঘুরে সোজা আসতে থাকেন। ছাতা মুড়ে, চশমার আড়ালে চোখ কুঁচকে ফোকাস ঠিক করে ভাগ্নেদের চিনতে পারেন। মামার উত্তেজনার পারা চড়তে থাকে সঙ্গে সঙ্গে।

আরে শিমূল না, পান্নুওবেশ, বেশ, তা মানিকজোড় এখানে কি করছো, ঘোড়গাড়ি পেলে কোথায়? যাচ্ছ কোথায়? নাকি নিরুদ্দেশে ঘোরাঘুরি শুধু? আপাতত: মামা আপনার ওখানে থানা গাড়ব আজ, এক্ষুনি, শিমূল মামাকে থামায়। তারপর ধীরে ধীরে সব বলছি। চলেন, এখন বাড়ি যাই, পান্নুভাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছে। এই সায়েবদের তুলেছিস কোত্থেকে রে, হারামজাদা, আমাকে চিনিস না তুই ? বলিস নি কেন এতক্ষণ ? মামা এবার গাড়োয়ান বেচারির ওপর চড়াও হন। পাংশার সেনিটারি নেসপেক্টারের বাসাত্তে তুললাম তো ইনাগের সকালে, তারপর ঐ গাজনার বিলে ঠা-ঠা রোদ খাইয়ে এই অবস্থা, তা আমার বল্লিই তো আমি ছই বাইর করে ফিট্ করে দিতাম। ভদ্দরনোক মানুষ তো, উনিউ বোজেন নাই, আমিউ না। যাক্, যাক্, আর সাফাই গাওয়া লাগবে না তোমার, তাড়াতাড়ি গে’ নামা এদের, যা, বলে ভাগ্নেদের ঠেলে গাড়িতে তুলে দিয়ে, নিজে ছাতা খুলে হন্হন্ হেঁটে চলেন বাড়িমুখো। ভাগ্নেরা রা’ কাড়ে না, গাড়িতে উঠতেও বলে না মামাকে, বলে লাভ হবে না কিছু, জানে।

ঐ বটগাছ থেকে জোর পাঁচশ’ কদম যেতেই একটা বাঁক ঘুরে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিক-ওদিক তাকাতেই ছ্যাঁচাবেড়ার গায়ে কাটা দরজায় বাবার অপেক্ষায় কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বোনটি ওদের দেখে খুশিতে হেসে ফেলল, হাত নাড়ল। শিমূলও চেঁচাল, কিরে কণা, ভাল আছিস তো বুন্ডি আমার ? হাঃ হাঃ হাঃ, বলে উদারভাবে প্রাণ খুলে হাসতে লাগল। মামাও পৌঁছে গেছেন। হাঁকডাক শুরু হল। এই কণা, তোর পান্নুভাইকে ধর, ধরে নামা, ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিবি। গাজনার বিলে রোদ তাপিয়ে জ্বর বাধিয়ে এসেছে, কণাও, এবারে সেবা করো মহাপ্রভুরবলে গজগজ করে অকৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ বাড়িতে ঢুকে যান। শিমূল দেখছিল, ঘনসবুজ পরিবেশে চক্চকে স্বাস্থ্যল শ্যামলা বোনটি তার অপার মায়ায় হালকা-পাতলা পান্নুভাইকে প্রায় তুলেই নিয়ে গেল ভেতরে। একটি ছেলে বেরিয়ে এসে ওদের ব্যাগ-বোঁচকা-বুঁচকি নামিয়ে নিল। শিমূল গাড়িভাড়া মিটিয়ে দিল। গাড়োয়ান গাড়ি ঘোরাচ্ছে, এমন সময় কণা আবার বেরিয়ে এসে বলল, শিমূলভাই, গাড়োয়ান এখানে খেয়ে যাবে, আব্বুর হুকুম।

শিমূল ভেতরে-ভেতরে খুশিতে বাগ্বাগ্, কিন্তু শেয়ার করবে কার সাথে ? কোথায় রইল নিরুখালা পড়ে এই মাহেন্দ্রক্ষণে? কণা, মামার জন্য মেসেজ: আমি এখানে ঘাসে বসে আরামে একটু ধূমপান করব। দাঁড়াও, মেসেজ পৌঁছে দিচ্ছি আব্বুকে আর তারপর হেডমাস্টার সাহেবের এক নম্বর বেতটা ‘চাহিবামাত্র হাতে দিয়া দিব’, বলে মুচকি হেসে কণা ভেতরবাড়িতে অদৃশ্য হল। কইছিলাম না আপনারে, মাস্টেরের দয়ার শরীল, দ্যাকলেন, ভরদুপুরি না খাইয়ে যাতি দেলেন না। রোজ এইরম এট্টা কইরে পেসেন্ডার পালিই তো আমার সুক দেইকতো কিডাবলে গাড়োয়ান পাশের পুকুরে হাতমুখ ধুতে যায়। শিমূলও বাড়িতে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দেয়। উঠোনের তিনদিকে ঘোরানো ঘর, একদিকে ছোট্ট সব্জি বাগান। বাগান পেরিয়ে সদর দরজা। শিমূল বারান্দায় উঠে মামার পাশে বসে। বড়োতামাকের ধোঁয়া টেনে সে তখন বেশ রিল্যাক্স্ডতাছাড়া, পান্নুভাইয়ের অসুস্থতা মনে হচ্ছে শাপে বর হয়েই দেখা দিয়েছে। কণা রান্নাঘরে খুট্খাট শব্দ তুলে ওদের খাবার দাবার গুছিয়ে এনে বারান্দার টেবিলে সাজাচ্ছে।

তোর বাবা ভাল আছেন? মামার আচমকা প্রশ্নে শিমূলের আচ্ছন্ন ভাব কেটে যায়। জ্বী, মামা, আব্বা-মা-ভাইবোন সবাই তো চৌগাছি। বলিস কিরে? আমাদের গ্রামে? তোর বাবা তো সেই ’৪৭ সালে বিয়ে করে যাবার পর এই বোধহয় প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এল। যাক, তাও তো আসা হল তার। মামা যেন বেশ স্বস্থ এখবরে। শিমূল খবর দেয়, হ্যাঁ কুটিখালা-খালুও পাবনা থেকে চলে এসেছেন বোধহয়। বড়খালাও কুষ্টিয়া থেকে… তাহলে চৌগাছিতে এখন অনেক মৌমাছির ভিড় বল্? তা তোরাও বুঝি এদিক-সেদিক ঘুরে শেষে ওইমুখো হবি, নাকি ? মামার প্রশ্ন শুনে শিমূল মাথা চুলকায়, পান্নুভাইয়ের তো আবার জ্বর এসে গেল, উনি না গেলে আমি একাই এখান থেকে চৌগাছি যাব, ওখানে ক’দিন থেকে, যশোর হয়ে ঢাকায় ফিরব। কণা টেবিলে ভাত বেড়ে ওদের খেতে ডেকেছে ইতিমধ্যে। চল্, চল্, আরো দেরিতে খেলে আবার চোঁয়া ঢেঁকুর উঠবে, জমে অসুবিধে হবে আমার, মামা উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে খেতে বসেন। শিমূল কণাকে ডাকে, তুইও আমাদের সঙ্গে বসে পড়। কনা মুখ ঝামটা দেয়, ওদিকে তোমার গুরু ঝাম্টা জ্বরে অনাহারে, ভাজা-ভাজা হচ্ছেন, আর আমি বাড়ির মেয়ে আগেভাগে খেয়েদেয়ে বসে থাকি ! আরে আমি ভেবেছি, পান্নুভাই বার্লি-টার্লি কিছু পথ্য পেয়েই বিশ্রামে আছেন, শিমূল জিভ কাটে। সময়টা পেলাম কোথায় বল, তোমাদের খেতে দিয়ে যাই পান্নুভাইকে কিছু খাওয়াই, তারপর আমার খাওয়া।

শিমূল খায় আনমনে আর ভাবে, শরৎবাবুকে দুষে কি হবে। রাজলক্ষ্মীরা সবসময়েই ছিল, আছেসব দেশে, সব সমাজে। কণার মতো চঞ্চলা কিশোরী কি অনায়াসে ভগিনী নিবেদিতার ভূমিকায় মানিয়ে যায় পরিস্থিতির টাল সামলেআশ্চর্য ক্যাপাসিটি ! কণা ব্যস্তভাবে রান্নাঘর থেকে রোগীর ঘরে ছুটোছুটির ফাঁকে বলে গেল, জ্বর মনে হয় বেড়েছে, জাউ খাইয়ে মাথা ধুইয়ে দেব। ওরা চুপচাপ খেয়ে উঠল। মেয়ে বাবার সামনে পানের বাটা রেখে গেল। মামা মন দিয়ে পান সেজে মুখে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ পান চিবিয়ে বলে উঠলেন, কণা মেয়েটার লেখাপড়া হলনা। তোর মামীরা তো মাগুরায়। আমি আজ এখানে তো কাল ওখানে। পাঁচ-পাঁচটা হাইস্কুল গড়ে তুললাম এই জেলায়, কিন্তু নিজের ছেলেপুলের শিক্ষাদীক্ষা ঠিকঠাক হচ্ছে না, বুঝি। কিছু মানুষের তো এরকম হয়, মামা, এতে অত দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। শিমূলের সৎ উচ্চারণ শুনে আতরমামা পানির গ্লাস হাতে উঠে বারান্দার ধারে গিয়ে কুলকুচো করে পানের ছিবড়ে ফেলে দেন। ফিরে এসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলেন, তুই আমার কাজ-কর্মে দোষ দেবার মতো কিছু পাস না? ঠিক করে বলবি। না মামা, তোমার কাজের বিচার আমি করব কোন্ স্পর্ধায়? আমি কি জীবনে একটাও স্কুল বসাতে পারব কোন অজ পাড়াগাঁয়ে? তুমি তো একজন বীর, যোদ্ধা। পাঁচটার মধ্যে তিনটে স্কুলও যদি স্থানীয় মানুষ চালাতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না হয়ে যায়, তাহলে পঞ্চাশ বছর পরে তুমি যখন হয়তো পরপারে, তখন মানুষ তোমাকে প্রণাম জানাবে, আমি নিশ্চিত।

আহ্, আতরমামা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ হাসলেন, তোর কথা শুনে বুকটা ফুলে উঠল। তুইও এরকম কাজের হবি, আমি বলতে পারি। আর যদি তোর মায়ের ইচ্ছে পূরণ করিস, বড় আমলা হোস কখনো, তখনও আমার মতো সংগ্রামী মানুষেরা তোর টেবিলের ওধারে মানুষের জন্য প্রার্থী হয়ে আসবেতাদের ফেরাবি না, যথাসাধ্য করিস, তাহলেই হবে। দেখি, পান্নুভাইয়ের জ্বরের গতি প্রকৃতি কিরকম, বলে শিমূল উঠে রোগীর ঘরে যায়। বেশ বড় ঘর। দু’পাশে দু’টো খাট। পান্নুভাই শুয়ে আছেন চোখ বুঁজে। খাটে আড়াআড়ি শুইয়ে রোগীর মাথায় পানি ঢেলে যাচ্ছে কণানিরলস আর মাঝে-মাঝে কপালে হাতের ভেজা তালু রেখে তাপ কমলো কিনা আঁচ করছে। জ্বর দেখেছো, কণা? কত? ডাগর চোখের মেয়ে মুখ তুলল, মলিন মুখে বললো, দেখেছি। একশো তিন। বল কি? বলে শিমূল ওকে হাত ধরে টেনে মোড়া থেকে তুলে দিল, নিজে মোড়ার দখল নিল, তুমি কিছু খেয়ে এস, আমি মাথায় পানি দিই, আর মামাকে খবরটা বল। ঠিক আছে, কণা বালতিটা তুলে নিল, বলল, পানিটা গরম হয়ে গেছে, বদলে তাজা পানি দিয়ে যাই তোমাকে। সাবাশ, মাই সিস্টার, তোকে অর্ডার অব সেইন্ট নাইটিংগেল না দিলে তাবৎ পুরস্কারের অবমাননা করা হবে, শিমূল চেঁচিয়ে বলে ওঠে।

মামা ঢোকেন পানির বালতি নিয়ে ব্যস্তসমস্ত ভাবে ওর অত জ্বর নাকি রে শিমূল ? শেষে ওই হিটস্ট্রোক নাকি বলিস তোরা, তাই হল নাকি? আমি বলাইবাবুকে কল দিয়েছি, মামা গড়গড়িয়ে রিপোর্ট করেন। বলাইবাবু কি ডাক্তার? নাকি শিমূলের সংশয় মামা উড়িয়ে দেন, খুব হাতযশ, বৃটিশ আমলের ক্যাম্বেল পাশ, আমাদের অসুখ-বিসুখে তো ওই বলাইবাবুই ধন্বন্তরি! শিমূল পান্নুর মাথায় পানি ঢালতে শুরু করে। মামা অস্থিরভাবে পায়চারি করেন। কণা ফিরে এসে চুপ্টি করে খাটের বাজুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। শিমূল একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলে, আমরা এভাবে এসে তোদের কি ঝামেলায় ফেলে দিলাম, না রে কণা? চুপ করো তো, কনা শাসনের গলায় বলে ওঠে, মানুষটাকে সুস্থ হতে দাও আগে, তারপর তোমাদের ভবঘুরে লাইফস্টাইলের এসপার-ওসপার না দেখে এবার ছাড়ছি নে, ভেবেছো কি তোমরা? আতরমামা হস্তক্ষেপ করেন, আচ্ছা, আচ্ছা, আমার পাগলি মাকে আর খেপাস্ নে শিমূল। কেউ কষ্টে থাকলে কনা মার সহ্য হয়না সেটা, ও যা পারে, যতটুকু পারে, ততটুকু করে তবে ওর ক্ষান্তি।

বলাইবাবু এসে ওদিকে হাঁকডাক করছেন, কোথায় কণা মা আমার, তোর বুড়ো ছেলে এসেছে, কোথায় রোগী, কোন্ ঘরে? বলতে বলতেই কণা ছুটে গিয়ে উঠোন থেকে ডাক্তারবাবুর হাত ধরে টেনে এঘরে নিয়ে আসে। ধুতিপাঞ্জাবি পরনে, মাথায় গান্ধী টুপি, হাতে ছাতা আর ‘ডাক্তার’ লেখা ব্যাগ। বাইরের কেউ এসেছে, অনুমান করে পান্নুভাই একবার চোখ মেলে দেখলেন, জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। কণা চামচে করে গ্লুকোজের শরবত মুখে দিল। বলাইবাবু রোগী পরীক্ষা করলেন মন দিয়ে, থার্মোমিটার বগলে স্টেথোস্কোপ বুকে পিঠে লাগিয়ে, হাঁটুতে ছোট্ট হাতুড়ি ঠুকেতারপর শিমূলের মুখের দিকে ডাকিয়ে মামাকে প্রশ্ন করলেন, এরা কারা? কি হয়েছিল? রোগী আমার ভাগ্নে পান্নু আর এ-ও ভাগ্নে, ওর নাম শিমূল। হবে আর কি, পাংশা থেকে চড়া রোদে গাজনার বিল পেরিয়ে এখানে আসতে আসতে গরম লেগে জ্বর এসেছে ওর। জ্বর দেখলাম কমছে ধীরে ধীরে, কমে যাবে আশা করি। কাল সকাল নাগাদ রেমিশন হয়ে যাবে। কিন্তু ওর নাড়ি অত্যন্ত দুর্বল। কণামা বুদ্ধি করে সময়মতো মাথায় পানি ঢালাতে এযাত্রা বেঁচে গেল, মনে করুন। তবে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে কমপক্ষে ৩ দিন, হপ্তাখানেকে পূর্ণশক্তি ফিরে পারে। ছানা, পাতলা দুধ, স্যুপ খাবে, মশলাপাতি একদম না। পারলে একবার সারাশরীর ঠান্ডা স্পঞ্জ করে দাও, মা।

ডাক্তারবাবু বিদায় নিলে, শিমূল আর কণা দুভাইবোনে মিলে পান্নুভাইয়ের শরীর যত্ন করে মুছিয়ে দিল। বারকয়েক পানি বদলে ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে যেন রোগীর শরীরের অতিরিক্ত সব তাপ ওরা ইচ্ছেমতো শুষে নিল। যাদুর মতো জ্বর কমে আটানব্বুই-এ নেমে এল। শিমূল-কণা দুজনেই খুশি। পান্নু চোখ মেলেছেন। চোখের লালিমা কেটে যাচ্ছে। কণা ছানা-স্যূপ তৈরি করতে গেছে নিশ্চিন্তে। পান্নুভাই, শিমূল ষড়যন্ত্রের সুরে বলে, আমি কাল সকালে চৌগাছি চলে যাব। আপনি সাতদিন থেকে শরীর সারিয়ে, মন বাঁধা রেখে, তারপর যেখানে খুশীহয় চৌগাছি, নয় সোজা ঢাকা যাবেন। ঠিক আছে তো? তুমি যা বল, তাই হবে, তাই তো হচ্ছে, দেখ না, অত্যন্ত দুর্বল ক্ষীণকন্ঠে উচ্চারণ করে পান্নু আবার চোখ বুঁজলেন। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি কণাকে সঙ্গ দিইগে। বাহাদুর মেয়ে চটে ! আমার-আপনার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে এমন শক্তপোক্ত দুর্গেশনন্দিনীই চাই।

মামা বারান্দায় বসে হারিকেনের আলোয় পরীক্ষার খাতা দেখছেন। দেখে দেব নাকি মামা দু’চারটে খাতা? শিমূলের প্রস্তাব শুনে হেডমাস্টার মশাই তার খাতার বান্ডিল নিজের কাছে টেনে নেন, আমানত যেন কেউ কেড়ে নিতে চাইছেএমনি সন্ত্রস্ত দেখায় তাকে। না, না, ও একহাতে নম্বর দেয়াই ভাল, বুঝলি? তুই যখন পড়াবি, বুঝতে পারবি, এ বড় দায়িত্বের কাজ, ফাঁকির জায়গা নেই এখানে। পান্নু বুঝি শান্ত হয়েছে ? তুই বরং কণার সঙ্গে গল্প কর গিয়ে, মা আমার এত ভাল আর এত একামামা দীর্ঘশ্বাস চাপেন।

রান্নাঘরটাও বেশ বড়। গ্রামের বাড়িতে আসলে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতে ভালবাসেন। টুল টেনে কণার পাশে বসে শিমূল বোনের আঁচল টেনে ঘাড়-মুখের স্বেদবিন্দু মুছে দেয় পরম মমতায়। কণা চোখ বুঁজে থাকে। সুযোগ পেয়ে শিমূল ওর কপালে চুমকুড়ি খায় আলতো এই কি হচ্ছে, চমকে উঠে চোখ মেলে কণা, শাসায়, শিমূলভাই, তুমি কাল সকালে যে চলে যাবে বললে, বাবাকে বলেছো সেকথা? দেবো আমি আট্কে? আরে না, আমি তো নানাবাড়িই যাচ্ছি, পান্নুভাইয়ের আগ্রহেই তো তোদের মানে তোকে দেখতে আসা। জানিস, পান্নুভাই বলেন, তোকে রাইকমলের কাবেরী বসুর মতো নাকি দেখতেযাহ্, তুমি মিছেমিছি আমাকে স্তোক দিচ্ছ, শ্যামলী মেয়ের গন্ডে রক্তিমাভার ঝলক উনুনের আগুনে উদ্ভাসিত। শিমূল অট্ট অট্ট হাসে আর চাপাস্বরে বলে, এবার তোমার একাকিত্ব ঘুচলো বলে।

ন’টা নাগাদ খেয়ে সবাই শুয়ে পড়ে। স্যূপ আর ছানা-মুড়ি খেয়ে পান্নুভাই বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছেন। পাশের ঘরে কনা আর মামা। রাতে বেচাল কিছু দেখলে আমাকে ডেকে তুলে দেবে, শিমূলভাই, কড়া নির্দেশ জারি করে, ওদের দু’ভাইয়ের বিছানায় মশারি খাটিয়ে দিয়ে কণা নিজেদের ঘরে খিল তুলেছে। টর্চ জেলে, কলঘর ঘুরে এসে খাটের নিচে, আলমারীর কোণে ভাল করে দেখেশুনে দরজা বন্ধ করে শিমূল শুয়ে পড়ল। রাজ্যের ঘুম যেন তেড়ে এসে ওর দু’চোখ জুড়ে দিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

আলসেমি করে ভোরে না উঠে শিমূল সাতটা নাগাদ উঠল। টয়লেট সেরে, স্নানাদি, শেভ ইত্যাদিতে ঘন্টা খানেক পার করে নাশতার টেবিলে মামার সঙ্গে দেখা। গুড মর্নিং, মামা। সুপ্রভাত, মাই ডিয়ার। তুই চলে যাবি শুনে আমি ভোর-ভোর আজ বেরোলাম না। চল্ একসঙ্গেই যাব। আমার ইস্কুল থেকে তো গড়াই নদী দেখা যায় রে, ব্যস, নদী পেরোলেই চৌগাছিআমার জন্মভূমি আর তোর, হ্যাঁ, তোরও জন্মস্থান বটে। তোর ছোটটামানে রবুর জন্মও ওখানে, বাকিরা ঢাকাইয়া। আয়, আমরা নাশতা সেরে নিই, পান্নু যখন ওঠে, তখন খাবে। কণাও ওদের সঙ্গে বসে। আজ মেয়েটি তেমন ছটফট করছে না আর। মুখে চোখে প্রশান্তির কাজল প্রলেপ। শিমূলেরও মন ভাল। নিজেই পান্নুভাই উঠে, দুর্বল পায়ে আস্তে আস্তে বারান্দায় এসে বসলেন। হাই তুলছেন।

যথাসময়ে ব্যাগ কাঁধে শিমূল পান্নুভাই আর কণার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মামার পিছু পিছু হাঁটা দেয়। পান্নুভাই বলেন, তুমি চৌগাছি পৌঁছে ডঃ আমিনউদ্দিনকে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অসুস্থতার সংবাদ দিও। আমি দিন সাতেক পরেই ঢাকায় যাব। অলরাইট, বলে শিমূল গান ধরে, কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে, তুমি ধরায় আসো… পুরো গানটা শুনিয়ে যাও, শিমূলভাই, কণার আবদার শুনে সে সুরে বলে, এই জীবনে আর কি হবে সাধা, ওগো রাধা…। বাইরে থেকে মামার ডাক ভেসে আসে, কইরে, শিমূল, তুই না হয় আজ থেকেই যা। শুধুমুদু আমার স্কুলে যেতে দেরি হোল। শিমূল হেসে, হাত নেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে মামার ছত্রবর্তী হয়ে ছাতাটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। চল্ একেলা, চল্ একেলা, চল্ একেলা।

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site