Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts
Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts

Thursday, April 12, 2012

সুইডেনের কবি ক্যারিন বোয়ি-এর একগুচ্ছ কবিতা

by অংকুর সাহা এবং সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

সুইডেনের প্রথম সারির কবি ক্যারিন বোয়ি-এর সাথে বাংলাভাষী পাঠকদের পরিচয় তেমন নেই বললেই চলে। বাংলাভাষী প্রবাসী দুই লেখকের আনুকূল্যে ক্যারিন বোয়ি-এর একগুচ্ছ কবিতা এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়ান্টিফোরডটকমের পাঠকদের জন্য। ক্যারিন সম্পর্কে ভাষ্যটি লিখেছেন অংকুর সাহা এবং কবিতাগুলোর ভাষান্তর করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বলা বাহুল্য যে কবিতাগুলো ডেভিড ম্যাকডাফ-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে।

karin-1.jpg

শুদ্ধতায় ক্লিস্ট কবি ক্যারিন বোয়ি (১৯০০-১৯৪১):চল্লিশ বছরের অসমাপ্ত জীবন-চারটি কাব্যগন্থ; মৃত্যুর পরে অপ্রকাশিত কবিতাগুলি নিয়ে আরো একটি; কিছু গদ্যরচনা, ডায়েরি, সাহিত্য-অনুবাদ; গুটিকয়েক আত্ম জৈবনিক উপন্যাস; আরো একটি রাজনীতি-নিবিড়, ভবিষ্যৎসূচক, অপ্রচলিত ভাবনার পর-শিরশির করা উপন্যাস-এই হ’ল ক্যারিন বোয়ির সাহিত্যজীবন। স্কুলের কোমলতা আর বরফকুচির কাঠিন্য তাঁর সাহিত্যে। সুইডেনের বিংশ শতাব্দীর লেখকদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির, কবি হিসেবে অগ্রগন্য, লেখিকা হিসেবে শ্রেষ্ঠতমা। তাঁকে বাদ দিলে স্ক্যান্তিনেভিয়ার কবিতা অসমাপ্ত থেকে যায়। অথচ শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় দীর্ন তাঁর জীবন, ধর্ম ও রাজনীতির টানা-পড়েনে ক্ষতবিক্ষত তিনি; একদিকে কবিতার কামড়ে অস্থির আর অন্যদিকে রয়েছে ছোট ও বড় নারী ও পুরুষের শরীরী প্রেমে বিহ্বল। বিষন্ন, ভাবুক, উন্মনা, দ্বিধাদীর্ণ এক ট্র্যাজিক চরিত্র।

ক্যারিন এর জন্ম ১৯০০ সালের ২৬ অক্টোবর সুইডেনের গোটেবার্গ শহরে। তাঁর পিতৃপক্ষ জার্মান এবং মাতৃপক্ষ সুইডেনের ১৮৪২ সালের হামবুর্গের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরে ঠাকুর্দা এডুয়ার্ড বোয়ি ভাগ্যা্ন্বেষণে বেরোন এবং ইয়োরোপের নানা দেশ ঘুরে ১৮৪৯ সালে সুইডেনের নাগরিকত্ব নেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফ্রিৎস সিভিল এনজিনিয়ারিং এর ডিগ্রি করলেও সফল হন ইনসিওরেনস এর ব্যবসায়ে। তিনি বয়েসে আঠেরো বছরের কনিষ্ঠ। কর্মচারী সিগনে লিলিয়াস্ট্রান্তকে বিবাহ করেন। ক্যারিন তাঁদের প্রথম সন্তান। ফ্রিৎস মানুষটি ছিলেন আবেগপ্রবণ এবং মানসিক স্থায়ীত্বের অভাব ছিলো তাঁর।

১৯০৯ সালে পরিবারটি ছোট শহর গোটেবার্না ছেড়ে রাজধানী স্টকহোমে উঠে আসেন। নতুন পরিবেশে ও নতুন স্কুলে বালিকা ক্যারিনের মানসিক বিকাশ দ্রুততর হয় এবং পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বন্ধুদের সঙ্গে বসে তিনি উপভোগ করতেন আলেকজান্দার ডুমা (১৮০২-১৮৭০) এইচ জি ওয়েলস (১৮৬৬-১৯৪৬), রাডইসার্ড কিপলিং(১৮৬৫-১৯৩৬) ও মরিস মেটারলিংক (১৮৬২-১৯৪৯) এর কথাসাহিত্য। তাঁর প্রথম কৈশোরে এক অজানা দেশের অজানা কবির লেখা অনূদিত হল সুইডিস ভাষায়-সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মোহিত হলেন তিনি। তবে কবিতার চেয়েও আগ্রহ বাড়লো ভারতীয় পুরান, সংস্কৃত ভাষা ও বৌদ্ধ ধর্মে। একই সময় কার্ল গেলারাপ (১৮৫৭-১৯১৯) নামে এক লেখকের “কামানিতা তীর্থে যায়” নামে একটি উপন্যাস পড়লেন যার পটভূমি ভারত। তিনি স্থির করলেন ভারতবর্ষে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়ে ভিক্ষুনী হবেন। ধর্মে অনুরাগ তাঁর থেকে যায় সারা জীবন, তবে বৌদ্ধ ধর্মের বদলে খ্রীষ্টধর্মে। আমূলপ্রোথিত ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরতর আসঙ্গকামনার জট ছাড়াতে কেটে যায় বাকি জীবন। karin-2.jpg

স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে গেলেন সনাতন ও ঐতিহ্যময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ঠিক করেছিলেন শিক্ষিকা হবার জন্যে প্রশিক্ষণ নেবেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময় কাটলো ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় এবং গির্জায় উপাসনায়-নিৎসের দর্শনতত্ত্বের আলোচনার পাশাপাশি স্থান পেল রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরভাবনাও। মানবজাতির অন্তহীন দুঃখ কষ্ট কী অপকৃত হবে ঈশ্বরের শীতল করস্পর্শে ? এই সব ভাবনাচিন্তা মাথার মধ্যে জড়ো হয়েই সদ্য কৈশোর পেরোনো নারীর কবিতা রচনার শুরু। এবং যৌন কামনা বাসনার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই একান্ত উপলদ্ধি-তাঁর মনের মানুষেরা মানব নন, মানবী! ১৯২১ সালে তিনি ৪২টি কবিতা নির্বাচন করে “মেঘদল” নামে গ্রন্থের পান্ডুলিপি বানালেন এবং জমা দিলেন স্টকহোমের এক বিখ্যাত প্রকাশকের আপিসে; সাহস পাবার জন্যে সঙ্গে নিয়ে গেলেন মাকে। ছাপা হ’ল কবির প্রথম কাব্যগন্থ-কবির ভালো রয়্যালটি নেই, তবে ২০০ ক্রোনার পারিশ্রমিক রিভিউও মোটের ওপর ভালোই।

চলতে থাকলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-তাঁর প্রিয় বিষয় গ্রিক ভাষা, প্লোটোর মূল রচনাগুলি পড়তে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী। জীবনযাত্রা এবং আনকোরা সব চিন্তাভাবনার জন্যে ছাত্রী মহলে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়-“টিও” তাঁর আদরের ডাকনাম। তাঁর দ্বিতীয় প্রিয় শিক্ষার বিষয়-নর্ডিক ভাষাগুলি। আইসল্যান্ডিক সাহিত্যের কবিতা-সেখানে যুদ্ধ, মহামারী, প্রেম, বীরত্ব সব কিছুরই বাড়াবাড়ি-কিন্তু তাতেই মোহিত ক্যারিন। তৃতীয় প্রিয় বিষয় ইয়োরোপের সাহিত্যের ইতিহাস-কিন্তু বই ধরে ধরে পড়াতেন অধ্যাপক, তাতে তাঁর কল্পনার পাখা মেলতে অসুবিধে। লেখাপড়া ছাড়া সময় কাটে ফ্রয়েড নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্কে এবং সদ্য গড়ে ওঠা ছাত্র ইউনিয়নেরও নেতৃত্বে দেন কিছু দিন।

কলেজ জীবনে তাঁর দুই প্রনয়ী-একজন পুরুষ, কবি নিল্স্ স্ভানবার্গে; অন্য জন নারী বয়েসে সাত বছরের বড়, ধর্মতত্ত্ব ও কলাবিদ্যার ছাত্রী সেনিতা ন্যাটহর্স্ট। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় কাব্যগন্থ “গোপন ভূমি”-সেখানে তাঁর কবিতার স্থাপত্য দৃঢ়তর, প্রকাশভঙ্গী দ্বিধাহীন, কিন্তু কন্ঠস্বর বিষন্ন ও নিরানন্দ। বিষয় বস্তুতে ফ্রয়েডের প্রভাব লক্ষ্য করার মতো-তিনি মানবচেতনার অতলে যেতে উৎসুক। ঈশ্বর ভাবনা খানিকটা অপসৃত তবে রেশ থেকে গেছে তার আনুষঙ্গিকে পাপবোধের। কবিতাগুলির শৈলিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব আইসল্যান্ডের প্রাচীন সাহিত্যের, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় “এডা”র (Edda)।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে কবি যোগ দিলেন র্ক্লাটে (clarte) নামে এক আর্যবাদী, বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী ও ধর্মবিরোধী ছাত্র সংস্থায়। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন তাঁর মানসিকতায় এবং চিন্তাভাবনায় এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখে। তখন ইয়োরোপ সুখর শান্তির আশায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধতায় দুই মহাযুদ্ধের মধ্যে সেই টালমাটাল সময়। সমকামীতার অপরাধবোধ কাটিয়ে কবি হতে চাইলেন স্বাভাবিক ও প্রথাসিদ্ধ। অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা যা করে থাকেন, তিনিও তার থেকে আলাদা হবেন না। ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্বে ও সংকটে কেউ কেউ হয়ে যান নীরব, কিন্তু ক্যারিন হলেন মুখর-ডায়েরির পাতা ভরে উঠলো টাটকা নতুন কবিতায়। ধর্ম, সমাজ ও নিয়মের নিগঢ় থেকে তিনি মুক্তি পেতে চান। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হল তৃতীয় কাবগ্রন্থ “ভিটেমাটি”।

কবিতাগুলির মৌলিকত্ব এবং অভিনবত্ব দেখে আকৃষ্ট হলেন ক্ষিনল্যান্ডের সুইডিশ ভাষার শীর্ষস্থানীয়া ও অকালমৃতা কবি এডিথ সোডারগ্রান (১৮৯২-১৯২৩) এর প্রিয় বান্ধবী সহচরী হেগার ওলসন (১৮৯৩-১৯৭৮)। তিনি স্থানীয় জনপ্রিয় সংবাদপত্রে লিখলেন ”সুইডিশ কবিতায় নবীনতম কন্ঠস্বর” নামে প্রবন্ধ। তাঁর মতে গ্রন্থটি অসাধারণ শুদ্ধতার কবিতা-ডয়লেশহীন ও আবেগহীন, সব সময় যাত্রার জন্যে প্রস্তুত; তাতে ভেজাল নেই, দ্বিধাদোলাচল ভাব নেই - অনুপ্রানিত, সাহসী কবিতা - “ Swallow – that is perhaps the word for Karin Boye’s poetry . It is not strong like the eagle; its wing beat does not have the breadth and boldness-but neither does it belong to the grey and frittering breed of “sparrows” এই আলোচনা ও প্রশংসা একদিকে যেমন কবিমহলে প্রতিষ্ঠা এনে দিল তাঁকে, অন্যদিকে বাড়ালো তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং সঠিক পথে এগিয়ে চলার সাহস।

১৯২৭ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু; পরের বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি ফিরে এলেলন স্টকহোমে- তারপর নিয়মিত মেলামেশা ও সাহিত্য আলোচনা স্থানীয় কবিদের সঙ্গে। ক্লারটের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় হ’ল এবং এবং তিনি তাদের সংস্থার প্রকাশিত সাহিত্যপত্রটির সম্পাদনার ভার নিলেন। লেসবিয়ান যৌন সম্পর্ক বজায় থাকলো তাঁর তবে সামাজিক সুবিধের জন্যে ১৯২৯ সালে তিনি আইনগত বিবাহ করলেন সতীর্থ বামপন্থী কবি লিয়েফ বিয়র্ককে; তিন বছর সববাস করলেন তাঁর ’কাগজের বৌ’ হিসেবে। এই সময় তার প্রেমিকা ছিলেন বিখ্যাত সুইডিশ কবি গুনার একেলফ (১৯০৭-১৯৬৮) এর পত্নী গুনেল বার্নাস্ট্রম। পরে দুজনেই নিজ নিজ বিবাহবন্ধন ত্যাগ করে এক সঙ্গে ঘর বাঁধেন। স্বামীর প্রতি ক্যারিনের ছিলো আবেগতাড়নার ও তীব্রতার অভাব; অনিয়মিত হলেও যৌনসম্পর্ক ছিলো- কিন্তু মানসিক বন্ধন ছিলো না। উভযোনী সম্পর্কের মানসিক দ্বন্ধে তিনি তীব্র অবসাদ রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৩১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রিয় বন্ধুরা পরামর্শ দেন বার্লিন শহরে গিয়ে মন:সমীক্ষণ (সাইকোঅ্যানালিসিস) এর চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে।

১৯৩২ সালে জানুয়ারি মাসে কবি বার্লিনে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে একজন পুরুষ মন:চিকিৎসক, কিন্তু দুমাসের অসহ্য মানসিক যন্ত্রনার পর কোন সুফল না পেয়ে একজন নারী চিকিৎসকের কাছে যান। তাতে খানিকটা সুরাহা হয়। প্রথম জন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন রুগির সম্পর্কে “-এনার ক্ষেত্রে কোন ভালো ফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইনি আর দশ বছর নিজেকে বাঁচতে দেবেন কিনা বলা মুশকিল।”

মানসিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতে তিনি লেগে থাকেন নিয়মিত গদ্য রচনায়। আত্মজৈবনিক উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বোঝাপড়া করতে চান তাঁর মনের অবচেতনার গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে। সমাজে নারী পুরুষের অবস্থান ও তার জটিল মানসিক আন্ত:সম্পর্ক তাঁর বিষয়বস্তু। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “আস্টার্টে” (Astarte)–গ্রিক পুরাণের উর্বরতা, যৌনতা সামরিক বাহিনীর আরাধ্য দেবীর নামে। প্রভাবময়ী ও শক্তিশালী নারীচরিত্রের উপাসনায় ক্ষীণজীবী দুর্বল পুরুষ চরিত্রেরা। ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয় আত্মজৈবনিক উপন্যাস “প্রতিভার জাগরণ”-নারী পুরুষ সম্পর্কের জটিল সন্দর্ভ। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস “সংকট” এর মূল চরিত্র তিনি নিজে: ধর্ম বিশ্বাস ও তার কঠিন অনুশাসন বনাম যৌবনজ্বালা এবং নারী শরীরের প্রতি তীব্র কামনা। এক সমালোচকের মতে- ’যিশু ও যৌনতার পুতুল খেলা’। চতুর্থ উপন্যাসে (“অতি অল্প” প্রকাশ ১৯৩৬) আবার ফিরে আসেন নারী পুরুষের মানসিক ও যৌন সম্পর্কের বিশদ বিশ্লেষণে। প্রায় এক নি:শ্বাসে লেখা এই চারটি উপন্যাসে ফুরিয়ে যাবার আগে নিজেকে প্রকাশ করবার অন্তহীন স্পৃহা চোখে পড়ে।

বার্লিন বসবাসের সময়টি অসম্ভব ফলপ্রসূ কবির জীবনে। এরিক মেসটারটন (১৯০৩-২০০৪) নামে এক সতীর্থ কবির সঙ্গে যৌথভাবে একটি নতুন আভাঁ-গার্দ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করলেন, টি এস এলিয়ট সম্পাদিত ”ক্রাইটেরিয়ন” পত্রিকার আদর্শ অনুসারী কাগজটির নাম দিলেন “স্পেকট্রাম”। সুইডেনের আধুনিক কবিতার দিশারী এই কাগজটি। সম্পাদকদ্বয় ছাড়াও গুনার একেলফ, হ্যারি মার্চিনসন এবং সুইডেনের অন্যান্য আধুনিক কবিদের রচনা সেখানে প্রকাশিত হতে থাকলো নিয়মিত । ক্যারিন সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করলেন এলিয়টের “পোড়ো জমি” ও অন্যান্য যুগান্তকারী কবিতা - এলিয়টকে অনুসরণ করে তৈরি হল নতুন কবিতা আন্দোলন। এছাড়াও ইয়োরোপের সুররিয়ালিস্ট কবিরাও সেখানে নিয়মিত অনূদিত ও আলোচিত হলেন।

বার্লিনে এসে তাঁর প্রেমযমুনাতেও নতুন জোয়ার দেখা দিল। বয়েসে বারো বছরের ছোট ইহুদি-জার্মান মহিলা মার্গো হেনেল দেখা দিলেন তাঁর নতুন দয়িতা রূপে। তাঁর বাকি জীবন কাটবে এই সহৃদয়া রমনীর সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের কাছে তাঁর পরিচয় দেবেন “আমার স্ত্রী” বলে। ১৯৩৪ সালে এই দম্পতি স্টকহোমে ফিরলেন এবং দু-কামরার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনে ঘর বাঁধলেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হল তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “বৃক্ষটির জন্যে”-সমালোচনা হল ভাল-খারাপ মেশানো অনেকে দেখলেন পুরানো থিমের ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্ত; অন্যেরা ভাবলেন প্রথাসিদ্ধ কবিতাশৈলি ত্যাগ করে মুক্তছন্দে উঠে আসা ঠিক হয় নি; যিশুর অনুষঙ্গ বাদ দেওয়াকে স্বাগত জানালেন অনেকে; কিন্তু তিনি সরে আসছেন বামপন্থা থেকেও– দেখে অনেক অনুরাগী হতাশ। কবির মতে, পুরানো কাব্যভঙ্গী ত্যাগ করলেই কবিতার সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব। জীবিত অবস্থায় এটি কবির অন্তিম কাব্যগ্রন্থ।

১৯৩১ সালে কবি গিয়েছিলেন রাশিয়া ভ্রমণে। স্তালিনের কঠোর অনুশাসনে শাসিত সোভিয়েত দেশ অসহ্য মনে হয়েছিল তাঁর। তখনও জনসমক্ষে আসেনি নিপীড়নের বা তাঁর যৌথ খামারের কুকীর্তিগুলির কথা। কিন্তু তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদী জার্মানির সঙ্গে বলশেভিক রাশিয়ার কোন মৌল তফাৎ খুঁজে পান নি। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে বিষয়টি ঘোরাফেরা করে তাঁর মানসে। নতুন একটি উপন্যাসের রূপ নেয়–“ক্যালোকেন” (”Kallocain”) প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) রচিত ”১৯৮৪” (প্রকাশ ১৯৪৯), অলডাস হাক্সলি (১৮৯৪-১৯৬৩) রচিত ”সাহসী নতুন পৃথিবী” (প্রকাশ ১৯৩২) অথবা ইয়েডগেনি জামিয়াটি (১৮৯৪-১৯৩৭) রচিত “আমার” (রচনা ১৯২১) মতন কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাসের সঙ্গে তা তুলনীয়। রাষ্ট্রীয় রসায়ন কারখানার বিজ্ঞানী লিও ক্যাল একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যেটি খেলে মানুষ আর মিথ্যে কথা বলবে না। ভবিষ্যতের কোন এক যুগে কাহিনীর ঘটনাকাল যখন রাষ্ট্রের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা এবং নিয়মিত মগজ ধোলাই চলে সাধারণ মানুষের। পাঁচশো পাতার বেশি দীর্ঘ এই উপন্যাসটি তাঁর সর্বাধিক পরিচিত রচনা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত।

এই সময়ে তিনি কবিখ্যাতির শীর্ষে এবং উপন্যাসিক হিসেবেও জনপ্রিয় অথচ তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়ছে ব্যক্তিগত জীবন। সংবাদ পেলেন তাঁর কৈশোর বান্ধবী ও প্রেমিকা অনিতা ন্যাটহর্স্ট ত্বকের দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত; ডাক্তারের বিধান অনুযায়ী তাঁর শরীর কুরে কুরে খাবে সেই ব্যাধি। তিনি গেলেন বন্ধুর সেবা করতে। বর্তমান প্রেমিকা ও প্রাক্তন প্রেমিকার দ্বন্দ্বে পীড়িত তাঁর মন। মার্গো মানসিকভাবে পুরোপুরি তাঁর ওপরে নির্ভরশীল। অন্যদিকে মা নিয়মিত চাপ দিয়ে যান সমকামীত্ব ত্যাগ করে “স্বাভাবিক” জীবন যাপনের জন্যে। হতাশা ও বিষাদ অসহ্য হয়ে দাঁড়ালো শেষ পর্যন্ত- তলিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত ১৯৪০ সালের বসন্তে।
karin-4.gif
১৯৪১ সালের ২ শে এপ্রিল তিনি ছিলেন আলিঙসাস শহরে বান্ধবী অনিতার গৃহে; সেদিন তিনি একবস্ত্রে ঘর ছাড়লেন, হাতের মুঠোয় কেবল এক শিশি ঘুমের বড়ি। হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলেন শহর সন্নিহিত অরণ্যে আর ফিরলেন না কোনদিন। পুলিশ চিরুনী তালাশ চালালো, কিন্তু খুঁজে পেল না তাঁকে। কয়েকদিন হয় এক পথচারী সন্ধান দিলেন তাঁর মৃতদেহের। সেদিন এপ্রিল ২৭-শহরের উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলে একটি বড় পাথরের আলিঙ্গনে শায়িতা তিনি - পাথরটি এখন এক পুণ্য মেমোরিয়াল, কবিতা প্রেমীদের তীর্থস্থান। এক মাসের ভেতর আত্মহত্যা করলেন মার্গো ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ করে, খুলে দিলেন গ্যাসের লাইনটি। ওই বছর আগস্ট মাসে আরো দুটি মৃত্যু সুইডেনের মালমো শহরে; প্রেয়সী অনিতার এবং কলকাতায় তাঁর কৈশোরের প্রিয় কবির।

মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি তৈরি করছিলেন নতুন কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। ১৯৪১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল সেই অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি এবং আরো কিছু অগ্রন্থিত কবিতা। “সপ্ত মৃত্যুকল্প পাপ” গ্রন্থটিতে তাঁর শেষ জীবনের মনোবিকলন ও বিষাদের ছাপ স্পষ্ট।

তাঁর প্রথম প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থটি সুইডিশ ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। মার্গারেট আবেনিয়াস রচিত গ্রন্থটির নাম “শুদ্ধতায় আক্রান্ত কবি”- এই নিবন্ধের নামটিও তার অনুসারী। গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। ২০০০ সালে মহাসমারোহে পালিত হয়েছে তাঁর জন্ম শতবর্ষ, সেই উপলক্ষ্যে নতুন তথ্যসমৃদ্ধ আরো একটি জীবনী রচনা করেছেন কামিলা হামারস্ট্রম এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটির নতুন নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে।

খ্যাতনামা ব্রিটিশ অনুবাদক ডেভিড ম্যাকডাফ (১৯৪৫) ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ক্যারিন বোয়ি’র কবিতা সমগ্রের টানা কমপোজে পাঁচটি গ্রন্থ, দীর্ঘ ভূমিকাসহ ১৮৪ পৃষ্ঠা; কবিতার সংখ্যা ১৭৬; প্রকাশ করেছেন ব্রিটেনের রাডেক্স বুকস প্রকাশনা সংস্থা। এই নিবন্ধের অনেক তথ্যই সেই গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।

আমি করতে চাই মোকাবেলা…

অস্ত্র-হাতে বর্মে-ঢাকা এসেছিলাম আমি
গর্জাতে-গর্জাতে
ঢালটা আমার ছিল ঢালাই-করা
ভয়ে ও লজ্জাতে।
ছুঁড়ে ফেলতে চাই এ-তরবারি
বর্শা খরতর।
এমন কঠিন রণসজ্জায় আমি
হ’য়ে গেছি বরফ।
দেখেছি আমি শুকিয়ে-যাওয়া বিচিরা অবশেষে
হয়েছে অঙ্কুরিত।
দেখেছি আমি দীপ্ত শ্যামলতা
ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।
লোহার চেয়ে অনেক শক্তিশালী
প্রাণের সজীবতা,
এই পৃথিবীর গভীর থেকে প্রতিরক্ষাহীন
উঠে এসেছে তা।
ফাগুন জাগে তুহিন মাঘে, যেখানটিতে জ’মে
ছিলাম এতদিন।
আজকে আমি প্রাণ-বাহিনীর করব মোকাবেলা
অস্ত্রশস্ত্রহীন।
(I Want to Meet…)


ইবলিস

আমাকে চালিয়ে নিচ্ছে একটা সাপের চাউনি, কট্টর, নিষ্ঠরু -
বহু দূর থেকে সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ঠায়,
আমার কাছের থেকেও কাছের প্রতিটা কদম পড়ে তার ইচ্ছায়,
তার শাসনের, ত্রাসনের কাছে কয়েদি আমি, সে ক্রূর
জিঞ্জিরে বাঁধে আমার অভিপ্রায়…
দিয়েছে কে এই সাপটিকে তার ভয়াল সু-ঠাম তথা
অতল-আকর্ষণ,
মরহুম-মধুরতা?
কে দিল এমন আতঙ্কে পুরে কসাইয়ের হর্ষ?
কালো ও গোপন সুখের মতন হাতছানি দেয় তো তা!
হয়তো কোথাও আবে-হায়াতের ঝরনাগুলির তীরে
যেখানে সকল ঘোমটারা খুলে যায়,
ইবলিস এসে মুখোমুখি হবে কোনো নয়া চেহারায়।
অরেরে অশুভ, তুই বিধাতারই ছায়া এক শুধু কি রে?
তুই কি রে তার রাতের যমজভাই?
(The Corrupter)

বিশ্ব-হৃদয়

বলো, কোনখানে পুড়ছে বিশ্ব-হৃদয়,
আগুন -ভরা হৃদয় জগতের?
ভারি ও খরখরে, প্রাগৈতিহাসিক কয়লা এর বাসভূমি :
নিকষ আঁধার, নিরেট নিশীথ, কেয়স১।
খোঁজো সেখানে!
কেননা আগুনের সে-ই তো ধর্ম :
দুশমনের লড়াইয়ে বলীয়ান-
নিজেই এক লড়াই, এক গনগনানো লড়াই
আর কোনোই ধর্ম এর নাই।
এবং বিজয়? আঁধার যখন অগ্নিশিখায় লীন?
জয় কি মরণ?
অর্থহীন প্রশ্ন আর অর্থহীন ভয়!
এই বিশ্বের হৃদয় আগুন ,
আগুন শুধু করতে চায় জয়।
(The World’s Heart)

কেয়স (Chaos) : প্রধানতঃ (সক্রেটিস-পূর্ব) গ্রিক কজমোগনিতে সুবিন্যস্ত বিশ্ব সৃষ্টির আগের অবয়বহীন, রূপহীন বস্তু উপাদানের সর্বব্যাপী বিস্তার।

পাথর

ভারি পাথরের আত্মা ঈশ্বর দিলেন আমাদের।
তারপর সমুদ্রতীরে আমরা দাঁড়ালাম,
যেখানে লাফায় রোদ, নাচে ফেনা, রাতে ডানা ম্যালে
সিন্ধুচিল।
খোলামুকচির মতো ছুঁড়লাম পাথরগুলি, মরণ খেলায় যেন। কেননা কিছু তো
তোমার করা-ই লাগবে পাথরের সাথে।
ছেঁচড়ে গেল মাটি তারা অর্ধবৃত্তাকারে, পিছলে পার হ’য়ে গেল
অথৈ পাথার : যেন হাওয়া!
আর কী সুখের ঘুম আমাদের : পাখাদের ছোঁয়ায়, এবং পাখিদের
জলের উপরে ছলচ্ছলাৎ ছোটায়।
(The Stones)

পতনোন্মুখ শুকতারা

‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্,
বেয়াদব শুকতারা!
সানন্দে দেব তোকে আঁধারের বর,
এই দুনিয়ায় প্রিয় তুই সবচেয়ে।’
‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্,
জ্বলন্ত নীল শিখা!
জ্বল ধিকিধিকি, পাতালে তুলতে ঝড়,
কালো স্ফটিকের শহর এক নে বানিয়ে।’
‘পড়্, বললেন প্রভু, ‘তুই খ’শে পড়্!
অশুভের উদ্গাতা,
শিগগিরই ফের খুঁজবি কি তুই ঘর?
আমার বুকের সবচেয়ে কাছে কে এ!’
(The Falling Morning Star)

ঐ প্রহর

কোনো দমবন্ধ গ্রীষ্মরাতের আকাশ
পৌঁছাবে না শাশ্বতের এতটা ভিতরে,
কোনো বিল, কেটে গেলে ভোরের কুয়াশা,
বুকের মুকুরে অত নিস্তব্ধতা দেখাতে পারবে না
যত পেরেছিল ও-প্রহর–

যখন একাকিতার সকল সীমানা মুছে ফেলা হয় আর
চোখগুলি স্বচ্ছ হ’য়ে যায়
আর কণ্ঠস্বরগুলি বাতাসের মতো সাদাসিধা
আর, কোনোকিছু নাই লুকাবার মতো-
তখন আমার ভয় কীসে?
আমি আর হারাব না কখনও তোমাকে।
(That Hour)

রাতের গভীর চেলো

রাতের গভীর এই চেলো
তেপান্তর পার ক’রে ছুঁড়ে দেয় আঁধার রভস।
বস্তুজগতের ঝাপসা ছবিগুলি ক্রমশঃ মিলায়
বহির্জগতের নানা আলোকধারায়।
আদিগন্ত ভাতিমান্ সাগর-জোয়ার
ঢেউয়ের উপরে ঢেউ ভেঙে চলে রাত্রিনীল অনন্ত-অবধি।
তুমি! তুমি! তুমি!
ওজনবিহীন, ভোল-পাল্টানো পদার্থ, তুমি স্পন্দনের স্ফোটমান ফেনা,
উঠে-যাওয়া, গা-গোলানো স্বপ্ন এক আরোও স্বপ্নের,
চোখ-ধাঁধানো সাদা!
আমি এক সিন্ধুচিল, জিরানো, ছড়ানো ডানাটিতে
সৈন্ধব-লবণ তুষ্টি পান করি
যতদূর জানি আমি, তারও পূর্বে আরও,
যতখানি চাই তারও সুদূর পশ্চিমে,
আর পাখা ঘ’ষে যাই ব্রহ্মাণ্ড-হৃৎপিণ্ডে-
চোখ-ধাঁধানো সাদা!
(The Night’s Deep Violoncello)

ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা

রৌদ্রদীপ্ত শীতের বনের মতো ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা।
কীভাবে প্রতিজ্ঞা হবে দৃঢ় আর আমার রাস্তাটা শুনবে কথা?
আমি ব’য়ে চলছিলাম নকশা-কাটা বাটি এক টুংটুং কাচের।

তখন পা-গুলি খুব সতর্ক হ’য়ে গেল, খাবে না হোঁচট।
হাতেরাও হুশিয়ার, তিলেক কাঁপবে না তারা, লাগাবে না চোট।
আর আমি গলা-জল- বল মাগি ঠুনকো এক তৈজসের কাছে।
(A Stillness Expanded)

তুমি বিচি

তুমি বিচি, আর আমি মাটি।
তুমি শোও আমার ভিতর।
তুমি সেই ঈপ্সিত সন্তান,
আমিই তোমার জননী তো।

ও পৃথিবী, ঢালো উষ্ণতা!
ওগো রঙ, দাও সারাৎসার!
অজানা শক্তিটা তত চায়
এ-জীবন যতটা আমার।

এই তপ্ত, মত্ত ঢেউখানি
মানে না কঠিনতম বাঁধ,
চওড়া হ’য়ে চলে এর পথ,
সব ভেঙে বেরয় অবাধ।

তাই এ আহত ক’রে চলে
আমার সজীব দেহভূমি :
বড় হচ্ছে, ভাঙছে এ আমাকে,
ও প্রিয় আমার, এ যে তুমি!
(You Are the Seed)

মানুষের বহুত্ব

সুন্দর- বলিষ্ঠ দেহ, যেটি
শক্ত ঢেউ কেটে ঢোকে জলে,
সুন্দর- শিশুর সুখী ঘুম,
খেলা-শেষে, মায়ের আঁচলে।

সুন্দর- কাজের দিন এক
-দোয়া প’ড়ে ছেঁড়া পরোটায়-
আর সে-প্রহর, ভূত ভাবী
একপাত্তর মদে যে ভোলায়।

দ্যাবাক্ষমা-মাতা ও অসীম
ক্ষমতায় জন্ম আমাদের,
আলো আধাঁরের ঈপ্সা, কেউ
জানে নাই নামটিও এর।

অনেকের মাঝে একজন
আমাদের কব্জা না-করুন,
হলেনই-বা দেবতা সে-নারী,
হলেনই-বা ঐশ্বর্য -অরুণ।

আমাদের ভিতরে বহুত্ব
হাতড়ে হাতড়ে সংহতি খোঁজে।
সংগ্রাহী আতশকাচ, এর
হ’তে আমাদের জন্ম যে।

মানুষের সংগ্রাম মহৎ,
মহৎ উদ্দেশ্যটুকু তার কিন্ত
মহত্তর সে নিজেই
শিকড় শাশ্বত-রাতে যার।

তো দাও, গোপন এক ঘর
গ’ড়ে তাতে জ্বালাব আগুন,
কাল ভোরে বলব, হে অচেনা
দেবতা, এ-বেদিতে জাগুন!
(Man’s Multiplicity)

খারাপ মেয়ের কাছ থেকে

আশা করি তুমি কাটাচ্ছ এক বিচ্ছিরি অসময়।
আশা করি তুমি আমার মতোই জেগে আছ নির্ঘুম,
এই আনন্দে লাফিয়ে উঠেছ এবং পরক্ষণে
উদ্ভ্রান্ত ও শঙ্কিত আর বেদনায় গুমসুম।

আর সহসাই তড়িঘড়ি তুমি চাইবে ঘুমিয়ে যেতে
থামিয়ে দিয়েছ যেন বনব্ন-ঘোরা কোনো লাট্টুকে।
আশা করি, যত সোজা ভেবেছিলে, কাজটি তত কঠিন…
আশা করি যাতে একটা পলকও না পড়ে তোমার চোখে।
(From a Bad Girl)

জলাভূমির পর্যটক

আধাঁর আমার ভূমি।
মুসাফির, কে গো তুমি ভাই?
জলার, জংলার পর্যটক!
অন্ধ হ’য়ে শুয়ে আছে ভূমি।
মুসাফির, কে গো তুমি ভাই?
টের পাই ভ’রে উঠছে পদচিহ্নগুলি
আমার কলজের রক্ত দিয়ে।

চিনতে চাই হাতগুলি তোমার।
তারা কি আগুন যারা জ্বালায়- আমাকে
দাও, বুঝতে দাও।
চিনতে চাই হাতগুলি তোমার।
ঠাণ্ডা পাতার মতো হয় যদি তারা
তাদের বুলিয়ে নাও গাছের জখমে,
মুর্দাটিকে জেগে উঠতে দাও।
(Marsh Wanderer)

চলিষ্ণু

পুরোগামী নয় তৃপ্তির দিবসেরা,
পিপাসার দিন, সে-ই তো সবার সেরা।

মোক্ষ, অর্থ আছে আমাদের পথের,
কিন্তু চলা-ই শ্রমের লক্ষ্য বটে।

আখেরি মোকাম আরাম-ঘুমের রাত,
আগুনের ওম্, গোগ্রাসে-গেলা ভাত।

যেসকল ঠাঁই ঘুমায় কেউ সকৃৎ,
স্বপ্ন গীতল, নিরুপদ্রব নিদ।

গাড়ো, তাঁবু গাড়ো! ঐ জাগে নবদিন।
আমাদের অভিযাত্রা অন্তহীন।
(On the Move)

এ-বিশ্ব সপন এক…

এ-বিশ্ব সপন এক, ঘুমে লীন কোনো দেবতার,
উষসীর শিহরন মুড়ে থাকে যার আত্মাটিকে।
জগৎ ছিল না যবে, তার গতকালের স্মরণ
পিছু ধাওয়া করে তার,
লাগায় চমক।
সে- যার সত্তার অংশ আমরা নই মোটে,
মোলাকাত হ’য়ে যায় রাস্তার মোড়ে তারই সাথে,
সে তার নিশ্বাসে ছাড়ে কী এক আতঙ্ক যেটা নয় আমাদের,
সুদূর সীমার পার থেকে চ’লে আসে,
ভিন্ন কানুনে-বাঁধা অন্য নানা জগতের থেকে।
ঘুমাও, স্বপ্নের সাজা শেষ-হওয়া-তক,
কিংবা, সৃষ্টিকর্তা, তুমি জেগে ওঠো দিনের আলোয়,
আমাদের সত্য ক’রে তোলো!
(The world is dreamt…)

original post


read more

গুন্টার গ্রাসের কবিতা: যে কথা না বললেই নয়

by সলিমুল্লাহ খান

গুন্টার গ্রাসের এই কবিতা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে জার্মানি ও ইসরায়েলে। কবিতাটি ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র ও তার জনগণের প্রতি বিদ্বেষের আগুন উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিককে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। স্বদেশ জার্মানিতেও তুমুল সমালোচিত হয়েছেন গ্রাস। পরমাণু শক্তি অর্জন নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ কবিতা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল-জার্মানি-ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দুনিয়াতেই। জার্মানির স্যুডডয়চে সাইটুং পত্রিকা গত পাঁচই এপ্রিল গ্রাসের কবিতাটি প্রকাশ করে। ‘ Was gesagt wer den muss’ শিরোনামে জার্মান ভাষায় লেখা কবিতাটি ইতোমধ্যেই ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
grass-p.jpg
সলিমুল্লাহ খান কবিতাটি মূল ভাষা থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের আগ্রহ বিবেচনায় তা প্রকাশ করা হল। বি.স.।

যে কথা না বললেই নয়

এতদিন কেন চুপ মেরে আছি, কেন মুখ খুলিনি এত দীর্ঘ দিন
একটা খেলা চলছে–যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মহড়া চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে–
এ খেলার শেষে আমরা বেঁচে যাই তো হবো পাদটীকা।

খেলার নাম অতর্কিতে হামলার অধিকার
হামলাকারী– এখন জনৈক বাচালের ডাকে সমবেত–
ইরানের জনজাতি ধুলায় মিশিয়ে দেবে
কারণ তার সন্দেহ
তার ক্ষমতার বলয়সীমায় পরমাণু বোমা তাতাচ্ছে ইরান।

অথচ অনেক দিন হলো আর একটা দেশের হাতে পরমাণু শক্তি মজুত আছে
আর সে ক্ষমতা বাড়ছেও দিনে দিনে
তার উপর কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, কেননা তা পরিদর্শনের
আওতার বাইরে
সে দেশের নামটা মুখে আনতে কেন রাজি নই আমি?
সারা দুনিয়া খেলছে এই লুকোচুরি খেলা
আমিও মেরেছি চুপ এই লুকোচুরির তলায়
আমার তো মনে হয় এই নিশ্চুপ থাকার চেয়ে
বড় মিথ্যাচার বড় কেলেঙ্কারি আর কিছু নাই
এই মিথ্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করো দেখি তুমি
দেখবে অভিশাপ ভয়াবহ খড়গ আসছে নেমে তোমার মাথায়
তুমি ‘এয়াহুদি বিদ্বেষী’।

আমার দেশ অপরাধী– কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে সে
বহু বহুবার– অপরাধ তার তুলনাবিহীন।
আর আজ ভাগ্যের ফেরে– হয়তো নিছক ব্যবসাজ্ঞানে
অথচ মুখে বলছে ক্ষতিপূরণ হিসাবে– ঘোষণা করেছে
ইসরায়েলকে আরো এক ডুবোজাহাজ বেচবে সে
দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়
জাহাজ থেকে, ছোড়া যাবে সে দেশপানে
যে দেশে প্রমাণ নাই পরমাণু বোমা আছে
শুদ্ধ আছে ভয় আর ভয়ই তো অকাট্য প্রমাণ।
তাই আমাকে বলতে হবে যে কথা না বললেই নয়।

তো এদ্দিন, আজতক, কেন চুপ মেরে আছি আমি?
আছি ভয়ে, ভয় জন্মদাগের
এ দাগ কোনদিন মুছবার নয়
এ দাগের ভয়ে এদ্দিন ইসরায়েলের মুখের উপরে
করতে পারিনি আমি সত্য উচ্চারণ
কারণ তার সনে বাঁধা আছি আমি চিরদিন
থাকতেও চাই বাঁধা হয়ে।

যে কথা বলতে পারিনি তো সে কথা বলছি কেন এখন?
এখন বয়স হয়েছে আমার, ফুরিয়ে এসেছে কলমের কালি
এমনিতেই ভাঙাচোরা বিশ্বশান্তি
আর সে বিশ্বশান্তির পথের কাঁটা
হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েল
এ কথা না বললেই নয়, বড্ড দেরি হয়ে গেছে
বলবার সুযোগ আর নাও থাকতে পারে আর।

আরও এক কারণে বলছি আজ
আমরা জার্মান জাতি, অপরাধভারে নত হয়ে আছি
সামনে আরো এক অপরাধ ঘটতে চলেছে
আর আমরাও হতে চলেছি তার ভাগদার সমান অপরাধী
যে অজুহাতে এতদিন পার পেয়ে গেছি
তাতে দালালি আর হবে না হালাল।

মাপ করবেন, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না আজ
কেননা পশ্চিমা দুনিয়ার ভণ্ডামি দেখতে দেখতে আমি হয়রান
আশা করছি আপনারাও–আরো অনেকেই
মুখে আঁটা কুলুপ খুলে নিরবতা অভিশাপ মুক্ত হবেন
দেখতে পাচ্ছেন এগিয়ে আসছে বিপদ
যে দেশের কারণে হাত জোড় করে সে দেশকে বলুন
বলপ্রয়োগ করবেন না
আর দাবি তুলুন
দুই দেশের সরকারকেই বলা হোক
ইসরায়েলি পরমাণু শক্তি
আর ইরানি পরমাণু ক্ষেত্র
দুইটাই থাক মহাজাতিক সংঘের অবাধ ও স্থায়ী নজরে।

কি ইসরায়েলি কি ফিলিস্তিনি সকলের–
আমাদের সকলের– মায় এই উন্মত্ত ভূখণ্ডের ঘরে ঘরে
যারা করি শত্রুর সঙ্গে করি গলাগলি বসবাস
তাদের সকলের বাঁচবার এ ছাড়া আর পথ নাই।
নাই শুদ্ধ তাদেরই নয়, আমাদের সকলের।

original post


read more

Saturday, January 21, 2012

জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার উত্তরাধুনিক অবস্থা*

by আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি

আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো সবচেয়ে উন্নত সমাজের জ্ঞানের অবস্থা পর্যালোচনা করা। ‘উত্তরাধুনিক’ কথাটা আমি ব্যবহার করবো অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে। শব্দটি মার্কিন মুল্লুকের সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকরা lyotard.jpg……..
জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার (১৯২৪-১৯৯৮)
…….
আকছার ব্যবহার করেন। এটি ব্যবহার করা হয় আমাদের সংস্কৃতির সেসব পরিবর্তন বোঝাতে যেগুলো উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগ থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার মূল-নিয়ন্ত্রক সূত্রগুলো (Game rules) পাল্টে দিয়েছে। আমার লক্ষ্য হলো এ-পরিবর্তনগুলোকে আখ্যান (Narratives) রচনার সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা।

বিজ্ঞানের সঙ্গে আখ্যানের সবসময়ই দ্বন্দ্ব চলছে। বিজ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে অধিকাংশ আখ্যানই রূপকথায় পরিণত হবে। কিন্তু যখন বিজ্ঞান কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুনগুলো উল্লেখ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-থেকে সত্যের খোঁজ করে, তখন নিজের নিয়ম-কানুনগুলোকে (game rules) সে বৈধতা দেয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। ফলে তার অবস্থানকে বৈধতা দেয়ার জন্যে একটি প্রতর্কের (Discourse) জন্ম দেয় যার নাম ‘দর্শন’। ‘আধুনিক’ কথাটাকে আমি ব্যবহার করবো সেইসব বিজ্ঞানকে বোঝাতে, যারা অন্য একটা মেটাডিসকোর্স/‘বড়-গল্পে’র (Metadiscourse) মধ্যে দিয়ে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেয়। মেটাডিসকোর্সগুলো কোনো না কোনো ধরনের মহা-আখ্যানের (Grand Narrative) দোহাই দিয়ে এসব বিজ্ঞানের বৈধতায় মদদ দেয়। যেমন, দ্বান্দ্বিক-যুক্তিবাদ (Dialectics of Reason), শব্দার্থের তাফসীর (Hermeneutics of Meaning), যুক্তিবাদী কিংবা পেশাধারী প্রজার (Working Subject) মুক্তির স্বপ্ন অথবা সম্পদ-সৃষ্টির মহা-আখ্যানগুলোর দোহাই প্রায়ই দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোন বক্তব্য লেখার ক্ষেত্রে প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সত্যাসত্য নিয়ে ঐকমত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন দুজনই যুক্তি-বুদ্ধি সম্পন্ন; এটি হলো একটি এনলাইটেনমেন্টের আখ্যান। যেখানে জ্ঞানের নায়ক কাজ করে একটি সু-নীতি ও সু-রাজনীতির পক্ষে, বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে। উল্লিখিত নমুনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, এমন মহা-আখ্যান যদি ইতিহাস চিন্তায় আরোপিত হয়ে জ্ঞানকে জায়েয করার কাজ করে, তখন সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এগুলোকে অবশ্যই বৈধ হতে হবে। এভাবেই মহা-আখ্যানের কাছে সত্যের মতো ন্যায় বিচারও হাত-পা বাধা।

সোজাভাবে বললে, ‘উত্তরাধুনিকতা’কে এক কথায় মহা-আখ্যানের (Metanarratives) বৈধতার বিষয়ে সন্দেহ বলা চলে। নিঃসন্দেহে এ প্রশ্ন বিজ্ঞানের প্রগতিরই একটি ফল, তবে এ-প্রগতিও কিন্তু নিজেকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করে। বৈধতা প্রতিষ্ঠার মহাবয়ানের কল-কব্জাগুলো (Apparatus) লক্ষণীয়ভাবে অধিবিদ্যক-দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আস্থা রেখেছিলো অনেক আগে থেকেই। আর তখন আখ্যান-কর্ম তার কামলাদের হারাতে শুরু করেছে; মহা সব নায়ক, সংকট, অভিযান, লক্ষ্য–এর সব কিছুকেই। প্রতিটি আখ্যানের ভাষার মেঘমালায় এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে–আখ্যানমূলক অথচ প্রতীকী, বিধানসমেত ও বর্ণনামূলক। যে স্তরগুলো নানান চাহিদাকে সামাল দেয়ার জন্যেই তৈরি হয়েছে। আমরা এগুলোর ছেদবিন্দুতে বসবাস করি। যাই হোক, আমরা ভাষা ও সম্পদের (মেকী) ভারসাম্য রক্ষা করতে চাই না।

এভাবেই ভাবি সমাজ নিউটনীয় নৃবিজ্ঞানের (যেমন কাঠামোবাদ অথবা বিষয়ভিত্তিক তত্ত্ব) চেয়ে বরং ভাষার প্রয়োগতত্ত্বের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। ভাষার নানা খেলার (Game) মধ্যে পরস্পরবিরোধী উপাদান বিদ্যমান। এরাও প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, তবে বিক্ষিপ্তভাবে–স্থানিকতায় বা লোকাল ডিটারমিনিজমের মধ্যে।

সমাজপতিরা কিন্তু সমাজায়নের মেঘগুলোকে দেয়া-পাওয়ার ছকে সামলাতে চান, তারা ভাবেন, তাদের চিন্তা ও যুক্তি সমগ্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এরাই আমাদের জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয়, তাতে ক্ষমতার জাল বিস্তারে সুবিধা হয়। সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও বৈজ্ঞানিক সত্য উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বৈধকরণের রাস্তা কিন্তু একই। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ও সুনিপুণ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা। এ ক্রীড়ার প্রয়োগে খানিকটা সন্ত্রাসেরও প্রয়োজন পড়ে–কঠোর বা নরম, প্রকাশ্যে বা গোপনে। সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার যুক্তি নিঃসন্দেহে নানান দিক থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ, বিশেষ করে আর্থ-সামাজিকতার পরস্পরবিরোধী প্রেক্ষাপটে, যখন সে বেশি বেশি কাজ দাবি করে অথচ সময় দেয় কম।

এ ধরনের অসামঞ্জস্যের মধ্যে আমরা মুক্তি আশা করতে পারি না, যেমনটা মার্কস করেছিলেন। সন্দেহ বলতে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি।

এখনও উত্তরাধুনিক দুনিয়া (Postmodern Condition) নির্মোহ আগন্তুকের মতো সবকিছু বাতিল করার মূঢ়তা দেখায় না, কিংবা অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়ার ব্যাপারেও গোড়া নয়। তাছাড়া মহা-আখ্যানগুলোর পর বৈধতার জন্যে আর খালি জায়গা কই? দৈনন্দিন কার্য-প্রণালী কৃৎকৌশলের ব্যাপার মাত্র, যার সাথে ন্যায্যতা ও সত্যাসত্য বিচারের কোনো যোগ নাই। বৈধতা কি শুধুমাত্র আলাপ-আলোচনার ঐকমত্যের মধ্যেই পাওয়া যাবে; যেমনটা য়ূরগেন হাবেরমাস (Jürgen Habermas) ভাবেন? এমন মতৈক্য ভাষার পরস্পরবিরোধী খেলাকে স্তব্ধ করে দেয়। আর তর্ক ছাড়া কোনো আবিষ্কার আবিষ্কার হয় না। উত্তরাধুনিক জ্ঞান কোনো ক্ষমতাবানের (Authorities) হাতিয়ার নয়। বরং পার্থক্যগুলোকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে, কাজেই ভিন্নতার প্রতি আমাদের সহনশীল হতে বলে। তাই আমাদের মূলনীতি গবেষকদের সমরূপতায় নয় বরং তাদের বিচিত্রতায় নিহিত।

তাহলে প্রশ্ন হলো : সামাজিক বন্ধন কিংবা ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা কি পরস্পর বিরোধী বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সম্ভব? তাহলে এ ধরনের অসামঞ্জস্যের কী হতে পারে?…

উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগে যেসকল চিহ্নের মাধ্যমে বিজ্ঞান-নির্ভর-জ্ঞানের ‘সংকট’ ধরা পড়েছে, সেগুলো কিন্তু তার বুদ্ধির কারণে ধরা পড়েনি বরং কৃৎকৌশল ও পুঁজিতন্ত্রের বিস্তারের কারণেই তা হয়েছে। এটি জ্ঞানের বৈধতার জমিনে অন্তর্গত ক্ষয়কেই প্রকাশ করে। ভাবনামূলক ক্রীড়ার (speculative game) একেবারে অন্দরমহলেই পচন। তার প্রতিটি খোপের ঠাঁস বুনটের জাল উত্তরাধুনিকতা হালকা করে দেয়।

ধ্রুপদী বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রের ভেদরেখা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষেত্রগুলোর সীমানা ভাঙতে শুরু করেছে, সীমানাগুলো একাকার হয়েছে, ফলে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। শিক্ষার প্রাধান্য পরম্পরা (Hierarchy) ভেঙে চোখের সামনে ‘সমতল’ পরিসরকে উন্মুক্ত করে। অথচ প্রতিটি খোপ নিয়তই আবর্তনশীল। পুরোনো ‘জ্ঞানের অনুষদগুলো’ টুকরো টুকরো হয়ে নানান প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লেগে গেছে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাবনামূলক জ্ঞানের বৈধতা হারিয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্লজ্জ গবেষণা (যা ভাবনামূলক-আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত) নিজেকে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের ধারার কাছে সঁপে দিয়েছে। আর শেখানোর ছলে চিন্তাশীল-গবেষক তৈরির বদলে বক্তৃতাবাজ প্রফেসরদের প্রতিকৃতি তৈরি নিশ্চিত করেছে। এ ব্যাপারটিকেই নিৎশে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ও নিন্দা করেছেন।

বৈধকরণের অন্য একটা ক্ষয়িষ্ণু জায়গা হলো, মুক্তির হাতিয়ার প্রশ্নে এনলাইটেনমেন্ট ভাবনামূলক প্রতর্কের (speculative discourse) সাথে বড় কোনো তফাৎ দেখাতে পারেনি। যদিও নানা দিকে সে দৃষ্টি দিয়েছে। সামাজিক, নৈতিক ও রাজনীতির অনুষদগুলোর বিচিত্র সংলাপের ভেতর বিজ্ঞান তার সত্যতার বৈধতা খুঁজে পায়। বৈধতার এ-ধরনের বিন্যাসের ঘূর্ণায়মান বিপদ সম্পর্কে একটু আগেই আমাদের ধারণা হয়েছে যে, সংখ্যা দিয়ে লেখা কোন সমীকরণ ও যুৎসই কোনো বাক্যের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ফলে তারা পরস্পর তুলনাযোগ্য। যদি একটি বাক্য বাস্তব অবস্থাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে আনে সেখানে নিতান্তই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিফলন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন হলে বাড়তি আর কী প্রমাণের দরকার পড়ে?

উদাহরণস্বরূপ, একটা বন্ধ দরজার কথা বলা যায়। যুক্তিমতে ‘কপাট বন্ধ’ ও ‘কপাট খোলা’–এ দু’টি কথার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নাই। বাক্য দুটো স্বতন্ত্র ধারাবিধির মধ্যে পড়ে যার প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন রকমের। এখানে একদিকে তাত্ত্বিক ও অন্যদিকে ব্যবহারিক যুক্তি–এ দুটো ভাগের ফলে বৈধতার বৈজ্ঞানিক প্রতর্ক প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। সরাসরি নয় বরং ঘুরতি পথে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পুরো বিষয়টা নিয়ম-কানুন সমেত ভাষার খেলা। যেমন, এক ঝলকে কান্টের আদিশর্তের (a priori) ধারণা। বাস্তব জীবন-যাপন পরিচালনার জন্য বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো কেরামতি নাই। সুতরাং বিজ্ঞানের নিয়ম-কানুনও অন্য সবার সাথে একই কাতারে দাড়িয়ে আছে।

অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়াটি যদি অল্প-বিস্তর চালানো যায় তবে উত্তরাধুনিকতার সম্ভাবনাময় দুয়ার উন্মুক্ত হয় (যেমনটি হ্বিটগেনস্টাইন তার মতো করেছেন, আর মার্টিন বুবার ও ইমানুয়েল লেভিনাদের মতো চিন্তাশীলরা যা করে গেছেন) । বিজ্ঞান তার ছক কাটা খেলাই খেলছে; অন্য সব ভাষার ক্রীড়াকে বৈধতা দিতে সে অপারগ। অন্তত অন্যের প্রতি নির্দেশমালা তো কিছুতেই তার নিয়ম-কানুনের মধ্যে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো সে তার নিজেকে বৈধতা দানে অক্ষম। যদিও ‘দার্শনিক’ ভাবনাগুলো তা-ই মনে করে।

সমাজের প্রজারা ভাষার ক্রীড়ার ব্যবচ্ছেদের মধ্যে নিজেকে গুলিয়ে ফেলে। সামাজিক বন্ধন মানেই ভাষার কারবার, কিছুতেই একটি মাত্র যোগসূত্রের বিষয় নয়। চাদরটা তৈরিতে কমপক্ষে দুটো (আসলে বাস্তবে অগুনতি) আলাদা ধরনের নিয়ম-কানুনের ভাষা দরকার। হ্বিট্গেনস্টাইনের লেখায় : ‘আমাদের ভাষাকে পুরোনো শহরের মতো দেখায়। যেখানে সাদা-কালো, সরু রাস্তা ও চক্কর রয়েছে। রাস্তার দু’ধার দিয়ে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে কয়েক’শ বছরের চিহ্ন এবং পাশাপাশি নতুন ঝকঝকে প্রশস্ত রাস্তা এবং আবাসিক এলাকাও আছে’। তাহলে সবকিছু সমন্বিতকরণের কিংবা জ্ঞানের মেটাডিসকোর্সের আওতায় এসবের সমন্বয় অসম্ভব। তিনি ‘শহর’কে কর্তা হিসাবে বাক্যটা লিখে উল্টো প্রশ্ন করছেন : ‘কতোটা রাস্তাঘাট দালানকোঠা হলে নগরকে নগর বলা চলে?’

পুরোনো ভাষার গায়ে নতুন শব্দ যোগ হয়ে পুরোনো এলাকা শহরতলীতে রূপ নিচ্ছে : ‘রসায়নের প্রতীক এবং ক্যালকুলাসের অসীম চিহ্নের মতো’। আজ পয়ত্রিশ বছর পর এই তালিকায় যোগ করতে পারি: যন্ত্রের ভাষা, নিয়ম-কানুনের তাত্ত্বিক মেট্রিক্স, সঙ্গীতের নতুন নোট, যুক্তি অনির্দেশক চিহ্ন ব্যবস্থা, জীনতত্ত্বের কোড, উচ্চারণ কাঠামোর গ্রাফ ইত্যাদি।

এ ধরনের খুচরা মন্তব্যে আমাদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। এসব ভাষা নিয়ে কেউ কোনো আওয়াজ দিচ্ছেন না, বলছেন না যে সার্বজনীন মহা-ভাষা (Metalanguage) বলে আসলে কিছুই নেই। নিরপেক্ষ কর্তা-ব্যবস্থা (System-Subject) মুখ থুবড়ে পড়েছে, মুক্তির লক্ষ্যের সাথে বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা সবাই ইতিবাচকতার ফাঁদে আটকে গেছি। শিক্ষার খোপীকরণ ও এলেমদাররা যেখানে নিজেদের বিজ্ঞানী ফলাচ্ছেন, গবেষণার কাজ বাক্সবন্দি হয়ে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়েছে ও এমনভাবে ভাগ হয়ে গেছে যে কোনো একজনের পক্ষে সবগুলোর আত্তীকরণ একেবারেই অসম্ভব।ভাবনামূলক কিংবা মানবিক দর্শনকে বৈধতার কাজ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই দর্শন সংকটের মধ্যে পড়েছে। যখনই সে বৈধতার কাজটা করতে গেছে তখনই তাকে কান ধরে যুক্তিবাদ কিংবা চিন্তার ইতিহাসের ফাঁক-ফোকড় খোঁজার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, ফলে তার আত্মসমর্পণ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

গেল শতাব্দির গোড়া থেকে ভিয়েনা সার্কেল এসব নেতিবাচকতার ফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক ছিলো। শুধু মুজেল, ক্রাউস, হফম্যানস্থাল, লুস, সোয়েনবার্গ ও ব্রোচরাই নন, মাখ আর হ্বিটগেনস্টাইনের মতো দার্শনিকরাও এই কাতারে ছিলেন।১০ তারা তাত্ত্বিক ও শৈল্পিকভাবে অ-বৈধকরণের কাজটিকে যতদূর সম্ভব টেনে নিয়ে গেছেন। এ মুহূর্তে আমরা বলতে পারি (মৃত বৈধতার) শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। তাকে আর কবর থেকে তুলে আনার দরকার কী? হ্বিটগেনস্টাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তিনি ভিয়েনা সার্কেলের তৈরী প্রত্যক্ষবাদের (Positivism) দিকে মুখিয়ে থাকেননি।১১ বরঞ্চ অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন ভাষার নিয়ম-কানুনগুলোর বৈধতা তার ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। উত্তরাধুনিক দুনিয়া এটাই বলতে চাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষেরই অবশ্য আখ্যান-স্মৃতিকাতরতার বাতিক আছে। তার মানে এই নয় যে, তারা কোনো না কোনোভাবে বর্বরতার মধ্যে পড়েন। তাদের নিজস্ব আলাপ-আলোচনা, তর্ক ও চর্চার উপলব্ধিগত জ্ঞান তাদের বাঁচিয়ে দিবে। এখান থেকেই কেবল বৈধতার প্রশ্ন উঠে আসতে পারে। বিজ্ঞান অন্যসব বিশ্বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে ‘শ্মশ্রুমণ্ডিত মুচকি হেসে’ বাস্তবতার খট্খটে জমিন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলেছে।১২

* লেখাটি Jean-Francois Lyotard-এর The Postmordern Condition (University of Minnesota Press, 1984) বইয়ের অংশরূপ।

তথ্যনির্দেশ

১. মহা-আখ্যান (Grand Narrative/Metanarrative) : খৃষ্টবাদ, মার্কসবাদ, হেগেলবাদ–এসবই গল্প। আমরা যেমন বলি ‘তুমি আমাকে দারুণ ‘গল্প’ শোনালে’–অনেকটা এই অর্থে গল্প। যেমন খৃষ্টবাদের ‘গল্প’টি কী? আদম-হাওয়া স্বর্গচ্যুত হলেন ‘পাপ’ করে। অতএব পৃথিবীতে পাঠানো হলো ভালো কাজ করে, অনুশোচনা করে, পাপমোচন পর্ব পার হয়ে শেষমেশ স্বর্গ পুনরুদ্ধার হবে। লিওতার বলছেন, এমনিভাবে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ও একটি ‘গল্প’–সবাই যুক্তি মেনে কাজ-কর্ম করবেন, ফলে সমগ্র বিশ্বে শান্তির সু-বাতাস বইবে। –অনুবাদক।

২. ফ্রেডরিখ নিৎশে (Friedrich Nietzsche), রচনাসমগ্র, ‘অন দি ফিউচার অফ আওয়ার এডুকেশানাল ইন্স্টিটিউশানস’ (‘On the Future of our Educational Institutions’) তৃতীয় খণ্ড, ক্রম ৩৫।

৩. মার্টিন বুভার (Martin Buber), ‘ইখ্ উন্ড ডু’ (Ich und Du) বার্লিন : শকেন ফেরলাগ, ১৯২২ (Berlin: Schocken verlag, 1922) এর ইংরেজী অনুবাদ- রোনাল্ড জি স্মিথ [Ronald G. Smith], ‘আই এন্ড দাও’ (I and Thou) (New York: Charles Scribner’s Son’s,1937)], ইমানুয়েল লেভিনা (Emmanuel Levinas), ‘তোতালিত এ এফিনিত’ (Totalite et Infinite) (The Hagie: Niihoff, 1961) ‘মাখ্তিন বুভার উন্ড ডি এরকেন্টনিসথেওরি’ (‘Martin Buber und die Erkenntnistheorie’) (১৯৫৮), ‘ফিলোসোফেন ডেস্ ২০, ইয়ারহুন্ডার্টস্’ (Philosophen des 20. Jahrhunderts)কোলহামার (Kohlhammer), ১৯৬৩, ফরাসী অনুবাদ, ‘মাখ্তিন বুভার এ লা তেওরি দো লা কনেসন্স’ (‘Martin Buber et la theorie de la connaissance’), ‘নম প্রোপ’ (‘Noms Propres), ‘মতো পেইয়ে: ফাতা মখগানা’ (Montpellier: Fata Morgana), ১৯৭৬.

৪. লাড্ভিগ হ্বিট্গেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein), ‘ফিলোসফিকাল ইনভেস্টিগেশানস’ (‘Philosophical Investigations’), অনুচ্ছেদ ১৮, পৃ: ৮।

৫. প্রাগুক্ত ।

৬. প্রাগুক্ত।

৭. দেখুন, ‘লা তাইলোহিজাসিঁও দো লা হোশ্যাকস’ (‘La taylorisation de la recherche’) ক্রিতিক দো লা সিওন্স (critique de la science) ক্রম ২৬, পৃষ্ঠা-২৯১-৯৩। বিশেষত : ডি জে দো সোলা প্রাইস (D. J. de Solla Price) এর ‘লিটল সাইন্স, বিগ সাইন্স’ (Little Science, Big Science) নিউ ইয়র্ক, কলাম্বিয়া ইউনিভাসিটি প্রেস, ১৯৬৩। বইটিতে জোর দিয়ে লেখক বলেছেন, অল্প সংখ্যক গবেষক নিয়ে তৈরী ছোট্ট অথচ দক্ষ-গবেষকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড় কিন্তু কম-দক্ষ দলটির (দক্ষ/কম-দক্ষের হিসাব পাবলিকেশানের ভিত্তিতে করা) সদস্য সংখ্যা আগের দলটির দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর দক্ষ-দলটির সংখ্যা বেড়েছে, তবে প্রতি ২০ বছর পর। দেখুন, পৃ: ৫৯। প্রাইস বলছেন, একজন ‘নিবেদিত প্রাণ সত্যিকারের বিজ্ঞানী’ সাধারণ মানের বিজ্ঞানীর চেয়ে ১০০ বছর এগিয়ে থাকেন। পৃ. ৫৬।

৮. জে টি দেশান্তি (J. T. Desanti), ‘ছুখ লো হাপোকত্ ত্রাডিসিওনেল দে সিওন্স এ দো লা ফিলোজফি’ (Sur le rapport traditionnel des sciences et de la philosophie) ‘লা ফিলোজফি সিলন্তিউজ উ ক্রিতিক দে ফিলোজফি দো লা সিওন্স’ (La Philosophie silentieuse, ou critique des philosophies de la science) (Paris: Seuil, ১৯৭৫).

৯. মানবিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের পুনঃ শ্রেণিকরণের প্রভাব শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমার মনে হয় না বৈধকরণ-দোষের ফাঁদে ফেলে দর্শনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর বন্ধনের জায়গাগুলো চিহ্নিত না করে কিংবা সংযোগস্থলগুলো খুটিয়ে না দেখে কিংবা নিজেকে নতুন করে না সাজালে কোনোভাবেই এগোতে পারবে না। এ বিষয়ে দেখুন, ‘প্রোজে দ্যাঁ এস্তিতুত পলিতেকনিক দো ফিলোজফি’ (Project d’un institut polytechnique de philosophie ) দোপাক্তমো দো ফিলোজফি, ইউনিভাকছিতি দো পাখি, (VIII) (উইত) (Department de philosophic, University de Paris ) ১৯৭৯.

১০. দেখুন, এ্যালেন জানিক (Allan Janik) ও স্টিফেন টলমিন (Stephan Toulmin) , ‘হ্বিটগেনস্টাইনস ভিয়েনা’ (‘Wittgenstein’s Vienna ’) নিউইয়র্ক ১৯৭৩, এবং জে পিয়েল(J. Piel), সম্পাদিত ‘ভিয়েন দেবু দ্যাঁ সিয়েকেল’, “Vienne début d’un siécle,” ক্রিতিক (Critique) (১৯৭৫), পৃ: ৩৩৯-৪০।

১১. দেখুন, য়ুরগেন হাবেরমাস (Jurgen Habermas), ডগমাটিসমুস, ফারনূনফ্ট উন্ড এন্টশাইডুঙ-ৎসু থেওরি উন্ড প্রাক্সিস ইন ডেয়ার ফেরভিসেনশাফ্টলিখেন সিভিলিজাৎসিওন’ (Dogmatismus. Vernunft und Entscheidung - Z u Theorie und Praxis in der verwissenschaftlichen Zivilisation) ১৯৬৩, ‘থেওরি উন্ড প্রাক্সিস’ (Theorie und Praxis) বেকন প্রেস, বোস্টন, ১৯৭১।

১২. ‘এরিস্টটল ইন এনালিটিক্স’ (c.330 BC), দেকার্ত, (Regulae ad directionem ingenii) ১৬৪১ প্রিনসিপ দো লা ফিলোজফি (Principes de la philosophie) (১৬৪৪). জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) ‘সিস্টেম অফ লজিক’ (System of Logic) (১৮৪৩)

original post

read more

Thursday, November 24, 2011

গোধূলি বেলার খেলা

by আনোয়ার৪৬

মূল গল্পঃ অনিতা দেশাই
অনুবাদঃ দুলাল আল মনসুর

বিকেলের চা-নাস্তার পর্ব শেষ। স্নান সেরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানও হয়ে গেছে সবার। কিন্তু প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে বাইরে খেলতে যাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই। সারা দিন পার হয়ে গেল বাড়ির ভেতরে বন্দি থেকে। বাড়ির ভেতরেও ঠাণ্ডা আবহাওয়ার লেশ মাত্র নেই; সূর্যের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে শুধু। বাচ্চারা সবাই বাইরে যাওয়ার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টায় উদগ্রীব হয়ে আছে; মুখ দেখেই বোঝা যায়, কেমন ফোলা ফোলা রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মা কিছুতেই বাইরের দরজা খুলবেন না। জ্বলন্ত সূর্যের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাড়ির সব কিছু পর্দাঘেরা, অস্থায়ী আবরণে মোড়া। এতে বাচ্চাদের দম বন্ধ অবস্থা আরো বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, বাইরের আলো-বাতাসে বের হতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে : ফুসফুসের মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া তুলো আর নাকের মধ্যে ধুলার আস্তরণ জমে গেছে।
মায়ের কাছে তাদের আবদার, 'প্লিজ, মা, প্লিজ। আমরা বারান্দায়ই খেলব। বারান্দা থেকে এক পা-ও বাইরে যাব না।'
'আমি জানি, তোমরা বাইরে যাবেই। তখন?'
'না, মা, আমরা যাব না'_ওরা এমন করুণ সুরে অনুরোধ জুড়ে দিল যে মা না শুনে পারলেন না। শেষে মা সদর দরজার খিল খুলে দিলেন। অতিরিক্ত পাকা ফলের ভেতর থেকে বিচি যেভাবে ছিটকে বের হয়, তেমনি করে বের হয়ে গেল উল্লাসে চিৎকার করতে করতে। মা ফিরে এলেন। এখন তার গোসল করার সময়। গোসল সেরে ট্যালকম পাউডার আর নতুন শাড়ি পরবেন। নইলে গ্রীষ্মের এই বিকেল-সন্ধ্যা সামলানো কঠিন।
কড়কড়ে গরম আর চোখ ধাঁধানো আলো ছড়ানো বিকেল তাদের সামনে। বারান্দার সাদা দেয়ালে আলো পড়ে ঠিকরে বের হচ্ছে। বারান্দার সামনে ঝুলে আছে সিস রঙের বেলুনের মতো নীলাভ আর গাঢ় লাল বাগান বিলাস। বাইরের বাগানটাকে মনে হচ্ছে পেটানো ব্রোঞ্জের তৈরি বারকোষ_লাল সুরকির মধ্যে পেতে রাখা হয়েছে। পাথুরে মাটিতে যেন অ্যালুমিনিয়াম, দস্তা, তামা ইত্যাদির মিশেল। দিনের এই শুষ্ক সময়ে চারপাশের কোনো কিছুতেই জীবনের লক্ষণ নেই। পাখিগুলো পাকা ফলের মতো গাছের কাগুজে তাঁবুতে ঝুলে আছে। বাগানের জলের ট্যাপের নিচে ভেজা মাটিতে কাঠবিড়ালি মরার মতো পড়ে আছে। বাইরের কুকুরটা বারান্দার মাদুরে মরার মতো পড়ে আছে: লেজ, থাবা আর কান চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে যেন পিপাসার্ত পথিক পানির খোঁজে ব্যস্ত। সাদা মার্বেলের মতো চোখের মণি দুটো লালচে গর্তের মধ্যে এমন আকুতি নিয়ে ঘোরালো কুকুরটা যেন বাচ্চাদের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছে তার প্রতি সদয় আচরণ করার জন্য। বাচ্চাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানোর জন্য লেজ নাড়তে চাইল কুকুরটা। কিন্তু লেজটা কিছুতেই উঠল না। একটুখানি কেঁপে উঠে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল।
বাচ্চাদের হৈচৈয়ে ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে একদল টিয়া পাখি উলাস মাখা প্রাণপ্রাচুর্যে উড়ে বের হয়ে রোদে পোড়া কড়কড়ে আকাশের গায়ে হোঁচট খেল। তারপর সারি বেঁধে মিশে গেল সাদা আকাশের শূন্যে।
বাচ্চারাও হৈহুলোড় জুড়ে দিল। একে অন্যের গায়ে আছড়ে পড়তে পড়তে ধাক্কাধাক্কি-ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে। এখন তাদেরও শুরু করার সময়। কী শুরু করবে? তাদের যে একমাত্র ব্যস্ততা অর্থাৎ খেলা।
'চলো, লুকোচুরি খেলি।'
'চোর হবে কে?'
'তুমি হবে।'
'আমি কেন হবো? তুমি হবে।'
'তুমিই তো সবার বড়!'
'তাতে কী?'
ঠেলাঠেলি আরো বেড়ে গেল। কেউ একজন অন্য কারো লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ে গেল। মিরা মাতৃত্বসুলভ ভূমিকা নিয়ে সবাইকে মোটামুটি দুই দলে ভাগ করে ফেলল। কার যেন জামা ছিঁড়ে গেল ফট করে। চিৎকার-চেঁচামেচি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে অন্য কেউ খেয়ালই করল না কার জামা ছিঁড়ে কাঁধের সঙ্গে ঝুলতে লাগল।
'গোল হয়ে দাঁড়াও, গোল হয়ে দাঁড়াও,' মিরা ঠেলাঠেলি করে মোটামুটি একরকম গোল হয়ে দাঁড়নোর ব্যবস্থা করে দিল সবার জন্য। 'এখন হাততালি দিতে থাক,' মিরার কথামতো সবাই হাততালি দেওয়া শুরু করল সমস্বরে, সমতালে, 'দিপ দিপ দিপ, আমার নীল শিপ,' তারপর একজন একজন করে দল থেকে বাদ পড়ে যেতে লাগল। যার এক হাতের তালু আরেক হাতের তালুতে কিংবা এক হাতের উল্টোপিঠ অন্য হাতের তালুতে পড়ে সেই বাদ। সঙ্গে সঙ্গে সবাই লাফ-ঝাঁপ দিয়ে হৈহৈ করে ওঠে।
তারপর দেখা গেল রঘু চোর হয়েছে। কিন্তু সে এটা মেনে নিতে পারছে না। সে চিৎকার করা শুরু করল, 'মিরা কাই করেছে! অনু কাই করেছে! সবাই কাই করেছে আমার বিরুদ্ধে। আমি মানি না।' কিন্তু ততক্ষণে সবাই তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। তার পরও তার চেষ্টা ওদের থামানো, 'শুধু বারান্দায়, মা বলেছেন বেশি দূরে যাওয়া যাবে না।' কিন্তু তার কথা শোনার মতো কাছাকাছি দূরত্বে কেউ নেই। সবাই পার হয়ে গেছে। রঘু শুধু দেখতে পেল ওদের কেউ কেউ দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে, কেউবা আগাছার ঝোপ, জৈবসারের স্তূপ মাড়িয়ে সামনে দৌড়াচ্ছে। ওদের পায়ের নিচের অংশ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না রঘু। বাগান আর বারান্দা বাগানবিলাসের লালচে ছায়ায় আগের মতোই ফাঁকা হয়ে পড়ে রইল। খুঁড়িয়ে চলা কাঠবিড়ালিটাও হঠাৎ কোথায় যেন চলে গেল। চোখ ধাঁধানো কড়কড়ে আলোয় চারদিক শূন্য হয়ে গেল। রঘু ছাড়া আর কেউ রইল না তার চারপাশে।
পিচ্চি মনু কিছুক্ষণ পর ফিরে এল যেন অদৃশ্য মেঘ থেকে পড়ে গেছে কিংবা কোনো শিকারি পাখির থাবা থেকে নিচে পড়ে গেছে। হলুদ লনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনু আঙুল চুষতে চুষতে কেঁদে ফেলে আর কী। রঘু বারান্দার দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে গুনে যাচ্ছিল 'তিরাশি, পঁচাশি, ঊননব্বই, নব্বই...' রঘুকে দেখে মনু পড়িমরি করে দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে গেল মহাফাঁপরে। এক মনে চায় দক্ষিণ দিকে যাবে, আরেক মনে চায় উত্তরে যাবে। রঘু মনুর সাদা হাফ প্যান্টের নিচের অংশ আর লাল চপ্পলের চটচট শব্দ শুনে মনুকে ধাওয়া করল। রঘুর রক্ত হিম করে দেওয়া সজোর চিৎকারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়তে গিয়ে মনু বাগানে পানি দেওয়ার জন্য রাখা হোস পাইপে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। পাইপের রাবারের গোলাকার অবয়বের ওপর পড়ে থেকেই মনু পরাজয়ের গ্লানিতে কেঁদে ফেলল, 'আমি চোর হব না! তুমি সবাইকে খুঁজে বের করো! সবাইকে এ এ!'
পায়ের আঙুল দিয়ে মনুকে গুঁতো দিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে রঘু বলল, 'ওঠ গাধা! তোকে চোর হতে কে বলেছে? তুই তো মরা!' জিহ্বা দিয়ে ওপরের ঠোঁটে জমে ওঠা ঘামের বিন্দু চাটতে চাটতে রঘু ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল, যাতে মনুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিকার ধরতে পারে। শিকারের উদ্দেশে রঘু জোরসে শিস বাজাতে লাগল, যাতে তার শব্দে ওরা ভয়ে কেঁপে ওঠে।
গ্যারাজের পেছনে উল্টে রাখা একটা ফুলের টবের পেছন থেকে রবি রঘুর শিস বাজানো শুনতে পেল। মনে হলো, এই জায়গাটা লুকিয়ে থাকার জন্য বেশি সুবিধাজনক নয়। রবির একবার মনে হলো, গ্যারাজের পেছনে লুকিয়ে থেকে রঘুর আসার শব্দে একটু একটু করে এদিক-ওদিক এগিয়ে গিয়ে রক্ষা পাবে। কিন্তু রঘুর লোমওলা ফুটবল খেলা পায়ের সঙ্গে নিজের পুঁচকে পায়ের তুলনা করতে গিয়ে মনে আর জোর পেল না। রঘু যখন পায়ের তলায় লতাগুল্ম আর ফার্নের দল মাড়িয়ে এদিক-ওদিক করছিল, রবি ওর পায়ের একাংশ দেখে ফেলল। ভয়ে আর আতঙ্কে ওর দিকে লুকিয়ে এক নজর দেখে নিল রঘুর পা। ধরা পড়ার ভয়ে চুপচাপ রবি নাকে জমা হওয়া একদলা শক্ত পোটা খেয়ে ফেলল।
গ্যারাজের দরজায় বিশাল তালা ঝুলছে। চাবি ড্রাইভারের কাছে। তার ঘরের দেয়ালে ঝোলানো শার্টের তলায় একটা পেরেকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। উঁকি দিয়ে দেখল, ড্রাইভার দড়ি দিয়ে বানানো একটা খাটিয়ায় ঘুমাচ্ছে। পরনে গেঞ্জি আর আন্ডারপ্যান্ট। তার শ্লেষ্মা ভরা নাক ডাকার শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুকের আর নাকের ভেতরের লোম ওঠা-নামা করছে। রবির মনে হলো, যদি চাবি রাখা পেরেকেটা ধরার মতো উচ্চতা তার থাকত! কিন্তু জানে আরো অনেক বছর লাগবে ওই উচ্চতা পর্যন্ত ছোঁয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে। ব্যর্থ মনে সরে গিয়ে রবি ফুলের টবের কাছে বসে পড়ল। আপাতত এই জিনিসটাই তার মাপ অনুযায়ী ঠিক হয়েছে।
গ্যারাজের পেছনে আরেকটা ঘর। সেটাও তালা দেওয়া। চাবি কার কাছে কেউ জানে না। এই ঘরটার দরজা বছরে একবার করে খোলা হয়। মা তখন ভাঙা আসবাবপত্র, অকেজো ফুটো হওয়া বালতি, ছেঁড়া মাদুর ইত্যাদি ফেলে দিয়ে থাকেন। সে সময় ঝাঁটা দিয়ে পিঁপড়ের বাসাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। মাকড়সার জাল আর ইঁদুরের গর্তে ওষুধ ছিটিয়ে দেওয়া হয় যেন হতদরিদ্র কোনো নগর দখল করা হলো। দরজা দুটোর পালাগুলো বেঁকেচুরে গেছে। মরচেপড়া কব্জাগুলো খসে পড়ার উপক্রম হয়েছে, দরজা আর কব্জার মধ্যে বিশাল ফাঁকা তৈরি হয়ে গেছে। ফাঁকার মধ্য দিয়ে ইঁদুর, বিড়াল, কুকুর এমনকি রবিও ঢুকে যেতে পারে অনায়াশে।
রবি আগে কখনো প্রাণী গন্ধে ভরা আসবাবপত্রের শবাগারের এ রকম অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করেনি আগে। কিন্তু রঘুর শিস বাজানো যতই জোরে জোরে বাজতে লাগল এবং লতাগুল্মেও ওপর দিয়ে তার শক্তপোক্ত পায়ের আওয়াজ যতই ভয়াবহ হয়ে উঠল রবি আর দেরি করতে পারল না। দরজার ফাঁক গলিয়ে সুরুত করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। নিজের কৃতিত্বে নিজেই আস্তে করে হেসে উঠল। ভেতর থেকে রবি দেখতে পেল রঘু লতাগুল্ম মাড়িয়ে ফুলের টবের কাছে চলে এল। কিন্তু রবিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে রঘু চিৎকার করে বলে উঠল, 'তোমার শব্দ আমি শুনেছি! আমি আসছি। ধরা পড়ার জন্য প্রস্তুত হও।' গ্যারাজের চারপাশে ঘুরে ঘুরে রঘু কাউকে পেল না। শুধু উল্টে পড়ে থাকা ফুলের টব, হলুদ ধুলো আর দরজার পাশে পিঁপড়ের ঢিবি ছাড়া আর কিছুই পেল না। চিৎকার করতে করতে রঘু উবু হয়ে একটা কাঠি কুড়িয়ে নিয়ে গ্যারাজের দেয়ালের গায়ে বাড়ি মারতে মারতে এগিয়ে যেতে লাগল যেন এই আঘাত তার শিকারের গায়ে লাগছে।
ভয় আর আনন্দে মেশানো অনুভূতিতে রবি কেঁপে কেঁপে উঠল কয়েক বার। ঘরের ভেতরে ভুতুরে অন্ধকার আর কবরের মতো চাপা দম বন্ধ অবস্থা। এ রকম অভিজ্ঞতা রবির আছে : একবার লিনেন কাপড়ের কাভার্ডে বন্দি হয়ে আধ ঘণ্টাখানেক অসহায় অবস্থায় কেঁদেছিল। কিন্তু সে জায়গাটা ছিল বেশ চেনাজানার মতো। মায়ের মাড় দেওয়া কাপড়ের গন্ধে একটা আরামের আবেশ ছিল। কিন্তু এই ছাউনির ভেতর ইঁদুর, পিঁপড়ের ঢিবি, ধুলো আর মাকড়সার জালের পচা গন্ধে ভরা। বলে বোঝানো যায় এমন সব ভয়ভীতির আখড়া যেন একটা। দরজার ফাটল দিয়ে আসা সামান্য আলো ছাড়া জায়গাটা প্রায় অন্ধকার। ভেতরে কোনোরকম আলোর ব্যবস্থা নেই। ছাদটাও খুব নিচু। উচ্চতা কম হলেও রবির একবার মনে হলো, আঙুলের ডগা দিয়ে ছাদটা ছুঁয়ে দেয়। অবশ্য এর জন্য দাঁড়ানোর দরকার হলেও রবি এক চুল নড়ল না। নিচে পাছা ঠেকিয়ে বলের মতো গোল হয়ে বসে পড়ল, যাতে কোনো কিছুর সঙ্গে ছোঁয়া না লাগে। এই অন্ধকারে তাকে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য কত কী-ই তো থাকতে পারে। ঠাণ্ডা পিছলে সাপের মতো...সাপ! বাইরে রঘু দেয়ালের গায়ে জোরসে বাড়ি মারতে মারতে যাচ্ছে। বুঝতে পেরে রবির মনে হলো বাঁচা গেল, তাহলে সাপ নয়।
কিন্তু রঘুও চলে গেল খুব শিগগিরই। গ্যারাজের বাইরে পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলে আর কোনো শব্দই শোনা গেল না। পর মুহূর্তেই রবি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে গেল। কী যেন কাঁধের ওপর সুড়সুড়ি দিল মনে হলো! কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল হাত তুলে দেখার সাহস সঞ্চয় করতে। হয়তো কোনো কীট; হতে পারে মাকড়সা; দেখতে এসেছে তাদের জগতে এ আবার কে এল। হাত দিয়ে থাবা মেরে গলিয়ে দিতে দিতে রবির মনে হলো না জানি আর কত শত কীটপতঙ্গ আছে এই রাজ্যে। তার মতো অচেনা আগন্তুকের আকস্মিক আগমনহেতু জানতে অপেক্ষা করছে হয়তো।
এখন আর কিছুই নেই। মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা_ওইভাবে পিঠের ওপর হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রবি টের পেল পোকাটার গলে যাওয়া শরীরের রস শুকিয়ে তার হাতের সঙ্গে লেগে গেছে। এত দীর্ঘ সময় অনড় দাঁড়িয়ে থেকে পা কাঁপতে শুরু করল। এতক্ষণে ভেতরের জিনিসপত্রগুলো কিছুটা স্পষ্ট দেখার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পুরনো ওয়ার্ডরোব, ভাঙা বালতি, ছেঁড়া বিছানাপত্র তার চারপাশে গাদাগাদি করে রাখা। চোখে পড়ল একটা পুরনো ভাঙা বাথটাব_এনামেলের চকচকে টুকরোগুলো যেন তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। শেষে সে ওই ভাঙা টুকরোর ওপর নিচু হয়ে বসল।
একবার ওখান থেকে বের হয়ে সবার সঙ্গে খেলার মূল স্রোতে মিশে যাওয়ার কথা মনে হলো। রঘুর হাতে ধরা না পড়লে সূর্যালোকের মধ্যে ভাইবোন আর অন্যদের হৈচৈয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারত। বাগানের খোলা চত্বর আর পরিচিত পরিবেশের কথায় মন টানতে লাগল। খুব শিগগিরই সন্ধ্যা নামবে। খেলার সময় শেষ হয়ে যাবে। একটু পরই মা-বাবা লনে বেতের চেয়ারে বসবেন। চারপাশে অন্যান্য বাচ্চারা ছোটাছুটি করবে, নয়তো চুরি করে আনা তুঁতফল কিংবা দাঁত টক করে দেওয়া যমুনফল খাবে কাড়াকাড়ি করে। মালি পানির পাইপের মুখ ট্যাপের মুখে লাগিয়ে বাগানে পানি দেওয়া শুরু করবে। পানির ধারা শূন্যে উঠে তৃষ্ণার্ত শুকনো মাটির বুক, হলুদ ঘাস আর লাল সুরকির পাজর ভিজিয়ে দেবে। ভেজা মাটি থেকে একটা প্রাণ ঠাণ্ডা করা ঘ্রাণ বের হবে। আহ্ কী মধুর সুবাস! রবি ভেতর থেকেই শ্বাস নিতে থাকে। বাথটাব থেকে অর্ধেকখানি ওঠার পরই শুনতে পেল একটা মেয়ের আর্তচিৎকার। রঘু হয়তো ওকে ধরে ফেলেছে। ঘাসের মধ্যে, লতাপাতার মধ্যে ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেল রবি। তার পরই আর্তনাদ আর চিৎকার এবং শেষে ফোঁপানির সুরে নালিশ, 'আমি কোট ছুঁয়ে ফেলেছি!' 'না, তুমি ছুঁতে পারনি!' 'না, আমি ছুঁয়েছি!' 'না, ছুঁতে পারনি!' আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল ওদের ঝগড়ার শব্দ। তারপর আবার নীরবতা।
বাথটাবের ভাঙা চকচকে টুকরোর ওপর বসে মনে হলো, আরেকটু দেরি করা উচিত। যদি সবাই ধরা পড়ে যায় আর শুধু রবি বাদ থেকে যায়, অপরাজেয় অপরাজিত_তাহলে কী মজাটাই না হবে! এ রকম অভিজ্ঞতা খুব একটা নেই তার। একবার এক কাকামণি চকলেটের আস্ত এক টুকরো শুধু রবির একার জন্য এনেছিলেন। আরেকবার লালচে দাড়িওলা কান খাড়া কোচোয়ান তার ঘোড়ার গাড়িতে তোলার মতো প্রশ্রয় দিয়েছিল। বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত রবি গাড়ি চালিয়ে এসেছিল সেবার। লোমশ পায়ের, হেড়ে গলার, ফুটবল চ্যাম্পিয়ন রঘুকে হারিয়ে দিতে পারলে বড়দের আর অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সামনে রবির গৌরবের সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এ রকম মজা যেন শুধু কল্পনায়ই সম্ভব। নিজের বিজয়ের কথা ভেবে রবি লজ্জা মেশানো আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে নিজের হাঁটু চেপে ধরল বুকের সঙ্গে।
ওখানে বসে থেকে রবি বাথটাবের ভাঙা টুকরোর গায়ে পায়ের আঙুল ঘষতে ঘষতে কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার ফাটলের কাছে কান লাগিয়ে শুরুতে চেষ্টা করল খেলার কী খবর। তারপর ফিরে এসে অটল সিদ্ধান্তে বসেই রইল। সে এত সহজে বের হবে না। খেলায় জিততেই হবে। সবার রেকর্ড ভাঙবে সে। চ্যাম্পিয়ন তাকে হতেই হবে।
ছাউনিটার ভেতরে অন্ধকার বেড়ে যাচ্ছে। দরজার বাইরেও আলো নিভে আসছে। আর আবছা আবহে বাইরে ফেসোর মতো ভাঙা ভাঙা সবুজ, নীল, ধূসর পুষ্প রেণুর মতো আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ছে। গোধূলির এই লগ্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, এখনই সন্ধ্যা নেমে আসছে। বাগানে পাইপের মুখ থেকে পানির ধারা পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তৃষ্ণার্ত মাটি পিপাসা মিটিয়ে সেই সবুজ সতেজ ঠাণ্ডা হাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। দরজার ফাটল দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল রবি বাইরে ছাউনিটার এবং গাড়িঘরের ছায়া এখনো বাইরের উঠোনে শুয়ে আছে। তার পরই বাড়ির সাদা দেয়াল চোখে পড়ছে। বাগানবিলাসের ডালে রঙের আভা একটু যেন কমে এসেছে। ডালগুলো এদিক-ওদিক দুলছে। ওখান থেকে চড়ুইয়ের দলের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। ঘরে ফেরা চড়ুইয়ের দল বাগানবিলাসের ডালে আশ্রয় নিয়েছে। ছাউনির ভেতর থেকে লনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আহ্ যদি ওদের কণ্ঠ একবার শোনা যেত! মনে হলো রবি ওদের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে। ওরা হাসছে, গান গাচ্ছে, হৈহল্লা করছে। কিন্তু খেলার কী হলো? খেলা কি শেষ? শেষ হয় কী করে? রবি তো এখনো অপরাজিত!
হঠাৎ মনে হলো অনেক আগেই সে তো ওখান থেকে বের হয়ে বারান্দার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কোট ছুঁয়ে দিতে পারত। খেলায় জিততে হলে এটা ছাড়া উপায় নেই। এ কথাটা রবি ভুলেই গিয়েছিল। তার শুধু মনে ছিল লুকিয়ে থাকার কথা, খোঁজকারীর চোখকে ফাঁকি দেওয়ার কথা। লুকিয়ে থাকার কাজটা সে এতই সফলভাবে করেছে যে বাকি অংশটার কথা তার মনেই নেই। মনে নেই যে কোট ছুঁয়ে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে সে জিতে গেছে।
আর্তনাদের চিৎকার করে রবি দরজার ফাঁক গলে বের হয়ে ছায়াঘেরা উঠোনে বোধহীন পায়ে হাঁটু মুড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। প্রাণ উজাড় করা কান্নাজুড়ে দিয়ে বারান্দা পর্যন্ত পেঁৗছে গেল। সাদা থাম পেরিয়ে খেলার কোট পর্যন্ত যেতে যেতে কান্না আরো বেড়ে গিয়ে রাগ আর ক্ষোভে মিশে গেল। রাগে-অপমানে কণ্ঠ ভেঙে সমস্ত গ্লানি যেন চোখের জলে বের হয়ে এল।
লনে অন্যান্য ছেলে মেয়েরা খেলা থামিয়ে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। বিস্ময়ে গোধূলির আলোয় সবার মুখ যেন লম্বা হয়ে গেছে। চারপাশের গাছপালা অন্ধকারের কালিতে লেপে যাচ্ছে। বিষণ্নতার নীরব পতনে কবরের আবহ চলে আসছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে লম্বা ছায়াগুলো জলের মতো গড়িয়ে পড়ছে। অন্যরা সবাই রবির দিকে তাকিয়ে ভেবে পাচ্ছে না সে কোথা থেকে এল, পশুর মতো হাউমাউ করে কান্নার কারণটাই বা কী। বিরক্তি আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন রবির কাছে, 'কী হচ্ছে রবি! থাম। বোকার মতো কাঁদছ কেন? ব্যথা পেয়েছ?' রবিকে মা দেখছেন দেখে অন্যরা নিজেদের খেলায় ফিরে গেল। ছন্দে ছন্দে হাততালি দিয়ে সুর মেলাতে লাগল সবাই, 'ঘাসগুলো সবুজ, গোলাপগুলো লাল...।'
কিন্তু রবি ওদের খেলা এভাবে চলতে দিতে পারে না। মায়ের হাত থেকে ছুটে মাথাটা নিচু করে এত জোরে দৌড়ে রবি ওদের দলের কাছে পেঁৗছে গেল। 'আমি জিতেছি, আমি জিতেছি' বলে রবি এত জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল যে বড় বড় অশ্রুবিন্দু ছিটকে পড়তে লাগল এদিক-ওদিক। রবি আবারও চিৎকার করে বলতে লাগল, 'রঘু আমায় খুঁজে পায়নি! আমি জিতেছি, আমি জিতেছি!'
রবি কী বলছে, এমনকি রবিটা আদৌ তাদের জগতের কেউ কি না এটা বুঝতেই সময় লেগে গেল অন্যদের। অনেকক্ষণ আগেই রঘু সবাইকে খুঁজে পেয়েছে। ওরা রবিকে ভুলেই গিয়েছিল প্রায়। সে পর্বে রঘুর পরে কে চোর হবে সে নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাটিও হয়েছে। শেষে মা উঠে এসে মিটমাট করে বলে দিলেন অন্য খেলা খেলতে। তারপর অন্য খেলা খেলেছে, তারপর আরেকটা। গাছ থেকে তুঁত পেড়েছে, মালিকে বাগানে পানি দেওয়ার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে জ্বালিয়েছে। শেষে মালি বিরক্ত হয়ে মা-বাবার কাছে নালিশ করে দেবে বলায় ছেড়েছে। মা-বাবা বাগানে এসে চেয়ার নিয়ে বসেছেন। এরপর রঘু, মিরা সবাই এই খেলাটা শুরু করেছে। এতক্ষণ রবির কথা কারো মনেই পড়েনি। চোখের আড়ালে ছিল বলে রবি ওদের মন থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল। পুরোপুরি নেই হয়ে গিয়েছিল।
ধাক্কা দিয়ে রবিকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে রঘু চিৎকার করে বলল, 'বোকার মতো করো না তো!' মিরা তাকে এক কোণায় শক্ত করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, 'হাউ মাউ করে কেঁদো না রবি! যদি খেলতে চাও তো এই লাইনের এক কোণায় দাঁড়াও!'
খেলা আবার শুরু হলো। দুই জোড়া মাথার ওপরে অর্ধচন্দ্রাকারে মিলিত হতে লাগল ছন্দে ছন্দে। সবাই দল বেঁধে গোলাকার চক্রে বিষণ্ন সুরে একতালে গাইতে লাগল :
সবুজ সবুজ ঘাসগুলো
আর গোলাপগুলো লাল,
তোমরা আমায় ভুলো না গো
মনে রেখো চিরকাল!
ওদের হাতের অর্ধচন্দ্রাকারের ছবি গোধূলির আলোয় কেঁপে কেঁপে উঠছে। সবার মাথা বিষণ্নতায় নোয়ানো হচ্ছে আর পাগুলো মুখে উচ্চারিত সুরের তালে তালে মাটিতে পড়ছে। সুর আর তালে বিষণ্নতা আর অসহায়ত্ব এত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে রবি আর পারছে না। রবি আর ওদের তালে তাল মেলাবে না। ওদের এই দাফনের গানে আর নিজেকে জড়াবে না। রবি চেয়েছিল বিজয়, এই বিষণ্নতা চায়নি সে। কিন্তু ওরা তাকে ভুলে গেছে। ওদের সঙ্গে কিছুতেই মেশা যাবে না। তাকে ভুলে যাওয়ার অপমান কী করে সইবে সে? বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে, সামলানো কঠিন। ভেজা ঘাসের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে গেল রবি। আর সশব্দ কান্না নেই। অমর্যাদার গ্লানি বুকের ভেতর চেপে বসেছে পাথরের মতো।(পত্রিকার পাতা থেকে)
original post
read more

Wednesday, November 23, 2011

সংযোজন আরবি কবিতা

by সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রথম কি দ্বিতীয় বর্ষে আমি যখন, আমাদের ইংরেজি বিভাগের এক সিনিয়র ভাই ইকবাল শাইলোর একখানা অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করেন, সপ্ত ঝুলন্ত গীতিকায় রোমান্টিসিজম। ঐ বইটি পড়বার আগে nostalzia-khaled-al-saai.jpg
…….
নস্টালজিয়া, ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক, ২০০৭; শিল্পী: খালেদ আল-সাই (জন্ম. সিরিয়া ১৯৭০)
……..
প্রাক্-ইসলামিক তো বটেই, কোনোরূপ আরবি কবিতারই বিষয়ে আমার কিঞ্চিন্মাত্র জ্ঞান ছিল না। ঐ বইয়েরই কল্যাণে জানতে পারলাম যে ইসলামের অধিষ্ঠানের পূর্বে কাবা শরিফে এক বাৎসরিক মেলা বসত, যাতে কবিতা প্রতিযোগিতাও হ’ত, এবং নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সাতটি কবিতাকে পরের বছরের মেলা পর্যন্ত কাবা-গাত্রে ঝুলিয়ে রাখা হ’ত (যার থেকে সপ্ত “ঝুলন্ত” কবিতা)। ইসলামের আগমনে, বলা বাহুল্য, এই প্রথা বিলুপ্ত হয়, এবং ঐ বাৎসরিক কাবা-গমনও ইসলামি হজ-এ রূপ নেয়। তারপর বেশ কিছুকাল, যাকে বলে সেকুলার সাহিত্য থ মেরে থাকে। কিন্তু যেই-না মক্কা-মদিনার তাঁবু থেকে বাগদাদ-দামেস্কের দরবারে ইসলামের কেন্দ্র স’রে যাওয়া, অমনি আবার আরবি কবিতার উৎসমুখ খুলে যায়, এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও, সেই ফোয়ারা আজও বারিবর্ষণক্লান্ত হয় নি।

lion.jpg……
ক্যালিগ্রাফিক সিংহ, ইসলামের চতুর্থ খলিফা ইমাম আলী ইবনে আবু তালিবের শক্তির প্রতীক
………
“আরব” কথাটা কানে এলেই আমাদের মরম দখল ক’রে বসে মরুবালু, খেজুরগাছ, উট আর বেদুইন। আমরা বেমালুম ভুলে যাই যে আরব জাহানের সিংহভাগ বাসিন্দা প্রথমাবধি ছিলেন নগরবাসী, এমনকি বিশ্বের প্রাচীনতম নগরসভ্যতাগুলির council-of-the-king-of-the.jpg……
কাকরাজার সভা, সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের অরবী অনুবাদ কালিলাহ্‌ ওয়া-দিমনাহ্‌ (Kalilah wa-Dimnah) (১২১০)-র অলংকরণ।
……..
জাতক — যাদের হাতে শুধু যে নগর নির্মাণের সূচনা ঘটেছিল তা-ই নয়, ঘটেছিল নানা শিল্পমাধ্যমেরও বিকাশ (ভারত [সিন্ধু/হরপ্পা], চীন, তুরস্ক [হিত্তি/মিতান্নি], মিসর, আমেরিকার সভ্যতাগুলিও হরেদরে একই সময়ে বিকশিত হ’লেও, সেসব সভ্যতার প্রাচীনতম পর্যায়গুলোর থেকে নিছক কবিতার নিদর্শন বড় বেশি পাওয়া যায় নি)। অপিচ স্মরণ করুন যে আরবি গীতিকবিতা একদা য়ুরোপিয় গীতিকবিতার নবজন্মকেও সম্ভব করেছিল একদিন: হিস্পানি মুরদের দ্বারা, ত্রুবাদুরদের, মিনেস্যেঙ্গারদের পথিকৃৎ-রূপে।

আধুনিক আরবি কবিতাও — যা প্রধানতঃ পাশ্চাত্ত্য নিপীড়নের এক শৈল্পিক প্রতিবাদরূপে বিংশ শতকের প্রথম পাদে বিকশিত হ’তে শুরু করে — মরু-আরব নয়, বরং বাগদাদ দামেস্ক বৈরুত জেরুসালেম কায়রোরই অবদান, আর এর বিষয়ে আমাকে প্রথম অবহিত করেছিলেন আমার দুই কবি-বন্ধু সৈয়দ তারিক এবং সাজ্জাদ শরিফ। সাজ্জাদেরই অনুবাদে সম্ভবতঃ, আদনিসের কবিতা আমি প্রথম পড়েছিলাম।

musicians-persian-654-12.jpg
মিউজিশিয়ানস, পারস্য, ৬৫৪-১২৫৬

লাতিন আমেরিকার কবিতার সঙ্গে আধুনিক আরবি কবিতার একটা বিশেষ মিল আমার নজরে পড়ে। উভয়েরই প্রধান প্রণোদনা রাজনৈতিক — এবং, তা-সত্ত্বেও, তারা অধিকাংশ সময়েই, বাংলাদেশের (ধরা যাক) সত্তরের গরিষ্ঠাংশ কবিতার মতো, চিৎকারসর্বস্ব স্লোগানের ভুসিমালে পর্যবসিত হয় নি। আরবের চামড়ার নীচে তেল নয়, কবিতা প্রবাহিত হয় — এমন কথা কবি নিজার কাব্বানি বলেছিলেন একদা, কবি-বন্ধু রাজু আলাউদ্দিন-এর একটা অনুবাদে দেখেছিলাম যেন। আমি পরে যত পড়েছি আরবি কবিতা, তত এই কথাকে সত্য হ’য়ে উঠতে দেখেছি আমার সংবেদনে। এমনিতে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কবিতার, কবিতা হ’য়ে ওঠাটা প্রায় একটা ডিঙি নৌকায় ক’রে বসফরাস পেরোনোর শামিল… ট্র্যাপিজের মতো প্রায়, একচুল বাঁয়ে হেললে গলাবাজি, আর ডানে হেললে শিল্পবিলাস। কত শত শতাব্দীর অত্যন্তপরিচয় কবিতার সঙ্গে থাকলে এই বিপজ্জনক দড়ির উপর দিয়ে নাচতে-নাচতে বৈতরণি ত’রে যাওয়া যায় তা আমরা অনুমানই করতে পারি শুধু আদনিস বা দারবিশ বা, পক্ষান্তরে, নেরুদার কবিতাকে চোখের সামনে রেখে।

কিন্তু আমার অনুবাদগুলোর থেকে কী পাবেন পাঠক? বলা হয়, কবিতার অনুবাদে যা হারিয়ে যায়, তা-ই কবিতা। আর তা যদি হয় অনুবাদের অনুবাদ? অলমতি বিস্তরেণ।

পুনশ্চ: বন্ধু জুয়েল মাজহার আমাকে নাম-ভুলে-যাওয়া সিনিয়র ভাইয়ের নাম আর বইটার পুরো নাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পরে। তাঁকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

the-phoenix-by-manafi-al-h.jpg
ফিনিক্স, মানাফি আল-হায়াওয়ান, পারস্য, ১৩ শতক

আবু আল-শামাক্‌মাক্‌ (?-৭৯৬)

যদি আমি…

যদি আমি জাহাজ ভাসাই দরিয়ায়
শুকায় ফেনারা যত, ঢেউ জ’মে যায়।

যদি হাতে রেখে দেখি দ্যুতিমান্ মণি
মণিখানি কাচ হয়ে যায় যে তখনই।

যদি পান করি মিঠা ফোরাতের জল,
আমার মুখের মধ্যে লবণ কেবল।

আল্লা আর মালিকের প্রতি আর্জি মম:
আমার বাজেরা ওড়ে মুরগির সম।

আব্বাস ইব্‌ন্‌ আল-আহ্‌নাফ (৭৫০-৮০৯)

নির্‌-‌জনতা

আব্বাস, তোমার জামা আমি যেন হই
বা আমার জামা তুমি, সখা!
অথবা আমরা যেন একই পাত্রে রই
তুমি মদ, আমি জল তথা।
কিংবা হ’য়ে একজোড়া চখি আর চখা
মরুভূতে খুঁজি নির্জনতা –
নির্‌-‌জনতা।

(ইরাক)

আব্দুল্লাহ্ ইব্‌ন্‌ আল-মু’তাজ্ (৮৬১-৯০৮)

বঙ্কিম চন্দ্র

দ্যাখো ও-উঠতে-থাকা বাঁকা চাঁদ, ধরে কী শোভা!
আলো দিয়ে তার নিচ্ছে কেটে তমিস্রা –
রুপালি হাঁসুয়া, ঘাস কেটে চ’লে যায় যেন-বা
কালো প্রেইরির — বুকে খেলে যার সাদা-সাদা নার্গিসরা!

হাফ্‌সা বিন্ত্ আল-হাজ্ (?-১১৮৯)

অসূয়াপরবশ প্রকৃতি

হাসে নি এ-বাগান, আমরা দু’জনায় হেঁটেছি যে-সময় বীথিকায়,
বরং দেখিয়েছে সবুজ অসূয়া সে, হলুদ উষ্মার কাঁচা রঙ!
খুশিতে ঢেউগুলি নদীও ছড়ায় নি, আমরা যবে তার কিনারায়
দু’জনে দাঁড়িয়েছি; ঘুঘুও ঘুঘুঘুঘু ডেকেছে অভিযোগ জানাতেই!
ভেবো না এ-দুনিয়া সুষমা-সম্পুট, এবং দয়ালু সে-ললনা,

সেরেফ তুমি ভালো ব’লেই। ঐ দ্যাখো, কীভাবে আসমান জ্বেলেছে
তারার বাতিগুলো, শুধুই কুনজর রাখতে আমাদের মিলনে!

the-wild-people-at-the-end.jpg
দুনিয়াশেষের বন্য মানুষ, সিরিয়া, ৯৭০-১৫৬৩

ইউসুফ আল-খাল (১৯১৭-১৯৮৭)

যথেষ্ট, বলল রমণী

যথেষ্ট, বলল রমণী।
কষ্ট আমার ঠোঁটে,
বুকে কষ্ট,
আমি কষ্টময়।
যথেষ্ট।
বাতিটা নেভাও, ঘুম যাও,
কালো-কালো দাগে নোংরা প্রভাতের আলো।

আমিও ঘুমাব,
আর সারা দুনিয়াটা আমার সঙ্গে ঘুম যাবে,
কোনো স্বপ্ন
আমাদের জাগাবে না; স্বপ্নের মরণ জাগাবে।

জাগরণ
পুড়ে-ছাই-হ’য়ে-যেতে-থাকা ঘন বন।

(সিরিয়া)

নাজিক আল-মালাইকা (১৯২২-২০০৭)

নওরোজ

আমাদের ঘরে তুমি এসো না, নওরোজ,
ভূতের জগৎ থেকে উঠে-আসা প্রতিধ্বনি আমরা।
আমাদের পরিত্যাগ করেছে মানুষ,
টুটে গেছে রাত ও অতীত।
আমাদের ভুলেছে তকদির।
আশা-আকাঙ্ক্ষায় চিরবঞ্চিত আমাদের আর
নাই কোনো স্মৃতি, কোনো স্বপ্ন:
আমাদের শান্ত মুখ হারিয়েছে রঙ,
হারিয়েছে সমস্ত জলুস।
আমরা সময় থেকে শূন্যে সট্কে যাই,
পরিতাপে কখনও পুড়ি না,
শুধু বাস ক’রে চলি মোলায়েম হাবেলিতে এক।

নওরোজ, এগিয়ে যাও,
আমাদের জাগাবার কোশিশ কোরো না খামখাই:
আমাদের শিরা পাটখড়ি,
রুধিরে বয় না আর ক্রোধ,
কে বলেছে বিস্ফোরিত হ’তে পারে আত্মা?
আমি খুশি হতাম বরং, মারা গেলে
কবরেরা প্রত্যাখ্যান করলে আমাদের।
শুধু যদি সময়েরে তৌল করা যেত
বৎসরের বাটখারার দ্বারা!
শুধু যদি জানা যেত নিজের একটা ঘর থাকার মানে কী!
শুধু যদি পেতাম উন্মাদনায় ভয়!
শুধু যদি দ্বার থেকে দ্বারে ছোটা অসহ্য হ’ত আমাদের!
শুধু যদি পারা যেত মারা যেতে অন্যদের মতো!

(ইরাক)

illustration-from-kalilah-w.jpg
সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের পারস্য অনুবাদ কালিলেহ্‌ ও দেমনেহ্‌ (Kalīleh o Demneh, ১৪২৯)-র অলংকরণ।

আব্দুল ওয়াহাব আল-বায়াতি (১৯২৬-১৯৯৯)

গায়ক ও চাঁদ


খেলতে দেখেছি তাকে কল্‌জে এবং চুনি দিয়ে


মরতে দেখেছি আমি তাকে


রক্তগুঞ্জাফলে রাঙা ফতুয়াটি তার
হৃদয়ে প্রোথিত চাকু
ঊর্ণাজাল
বেড়ে’ আছে তার বাঁশিখানি
আর ও-সবুজ চাঁদ চোখে তার
রাতের এবং গৃহরাজির ছাদের অন্তরালে অস্তে ঢলে
যখন সে শুয়ে আছে ফুটপাতে, নিঃশব্দ মৃত্যুর কোলে।
(ইরাক)

মুঈন বেসেইসো (১৯২৬-)

র‌্যাঁবো-র প্রতি

র‌্যাঁবো যখন ব’নে গেল একজন দাস-ব্যবসায়ী
আর ছুঁড়ে দিল জাল তার
ইথিয়োপিয়ায়,
ধরতে কালো সিংহ,
কালো রাজহাঁস
সে ছেড়ে দিয়েছিল কবিতা-লেখা . . .
কী সৎ ছিল ঐ ছোট্ট ছেলেটি . . .
অথচ কত কবিই
হয়েছে দাস-ব্যবসায়ী,
হয়েছে কুসীদজীবী,
এবং কবিতা-লেখা বন্ধ করে নি;
হয়েছে প্রচার-সংস্থার প্রতিনিধি
আর জাল-ছবির দালাল,
এবং কবিতা-লেখা বন্ধ করে নি।
সুলতানের প্রাসাদে তাদের কবিতাকে করা হয়েছে
দরোজা জানালা
টিপয় ফরাস,
এবং তারা কবিতা-লেখা বন্ধ করে নি . . .
তারা তোষামোদ করেছে,
গ্রহণ করেছে পদক ও খেতাব,

সোনা রুপা আর পাথরের কাপ,
এবং কবিতা-লেখা বন্ধ করে নি . . .
কোটালের মোহর,
কোটালের পদচিহ্ন তাদের কবিতায়,
এবং তারা কবিতা-লেখা বন্ধ করে নি . . .
কী সৎ ছিল র‌্যাঁবো . . .
কী সৎ ছিল ছোট্ট ছেলেটি . . .

লাল বাতি সবুজ বাতি

লাল বাতি
থামো
সবুজ বাতি
যাও
লাল বাতি
সবুজ বাতি
লাল বাতি
সবুজ বাতি
থামো
থামো
যাও
যাও
লাল বাতি
লাল বাতি
কোথায় সবুজ বাতি
গাড়িতে এক পোয়াতি
গাড়িতে বিয়ায়
সেই ছেলে বড় হয়
বড় হ’য়ে প্রেমে পড়ে
গাড়িতেই নিকা করে
আণ্ডাবাচ্চা লয়
খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন পড়ে
গাড়িতেই
তারা তারে ধরে
আর বুট-এ ভরে
তালিকা-ভুক্ত করে
সে শহিদ হয় সেই
গাড়ির কাচের পিছে
গোর দেয় তারা তারে
গাড়ির চাকার নীচে
সড়কেই গাড়ি আছে তাও
সবুজ বাতির ইন্তাজারে
লাল বাতি
থামো
সবুজ বাতি
যাও
লাল বাতি সবুজ বাতি

বুলান্দ্ আল-হায়দারি (১৯২৬-১৯৯৬)

পথের মোড়ে সংলাপ

ঘুমাও নি… বিষণ্ন প্রহরী,
ঘুমাবে কখন?
তোমার লণ্ঠনালোকে বোজো নি চোখের পাতা এক-হাজার সাল,
তুমি, ক্রুশবিদ্ধ তার মেলে-ধরা হাতের পাতায়
কোনোদিন ঘুমাবে না আর?
বিশবারের মতো… আমি ঘুমাবারে চাই,
ঘুম আসে, হায় তবু ঘুমাতে পারি না,
পঞ্চাশবারের মতো
চোখ ভ’রে ঘুম এসেছিল, কিন্তু ঘুমাতে পারি নি,
কেননা বিষণ্ন এই প্রহরীর কাছে
ঘুম একটা ছুরির ফলক।
ঘুমিয়ে পড়তে ভয় লাগে,
স্বপ্নে জেগে উঠতে ভয় লাগে।

ওদের পোড়াতে দাও রোম… ওরা পোড়াক বার্লিন,
চীনের প্রাচীর চুরি ক’রে নিক ওরা।
তোমাকে ঘুমাতে হবে…
বিষণ্ন প্রহরীর এক মুহূর্তের
বিশ্রামের সময় এখন… সে ঘুমায়
ঘুমাই আমিও… আর পোড়ে প্রতি-মুহূর্তে বার্লিন
প্রতিটা প্রহরে চুরি হ’য়ে চলে চীনের প্রাচীর
পলকের মধ্যে এক ড্রাগন জন্মায়।
ঘুমাতে যে ভয় পাই, তার
কারণ: বিষণ্ন এই প্রহরীর কাছে
ঘুম একটা ছুরির ফলক।

(ইরাক)

আদনিস (১৯৩০-)

শহিদ

যখন জ্বলন্ত তার চোখের পাতায় আমি রাত্রি দেখলাম
তার মুখে ছিল না কোনোই গাছ, কিংবা কোনো তারা।

ফুঁসে বেড়ালাম তার মাথার চৌদিকে
দমকা হাওয়ার মতো, তারপর খান্খান্ ভেঙে পড়লাম
একখানা ভাঙাচোরা বাঁশির মতন।

বিংশ শতাব্দীর জন্য একটা আয়না

একটা কফিন, ব’য়ে নিয়ে যাচ্ছে একটা শিশুর কচি মুখ
একখানা বই,
একটা কাকের পেটে হয়েছে যা লেখা
আর বুনো জন্তু এক, একটা ফুলের সাথে আসা

একটা পাথর
উন্মাদের ফুসফুসে যা নিচ্ছে নিশ্বাস:

এ-ই তাই
এ-ই এই বিংশ শতক।

মিনারিকা

‘একদা আজনবি এল এক,’
মিনারিকা কেঁদে কেঁদে গায় –
‘কিনে নিল আমাকে সে, আর
চিমনি এক চড়াল মাথায়।’

হামলা

পাখিরা পুড়ে যায়।
ঘোড়ারা আর মেয়েরা, ফুটপাত,
সব — তিমুর লঙের হাতে রুটির গুঁড়া, হায়!

আগুন-গাছ

কোঁচকানো পাতাদের একটা পরিবার
পড়েছিল ঝর্নার পাশে।
অশ্রুর দেশের বুকে দিয়েছে আঘাত,
প’ড়ে শুনিয়েছে তারা আতশ-কেতাব
ঝোরার পানিকে।

আমার জন্য থেমে থাকে নি আমার পরিবার,
রেখে যায় নি
কোনো চিহ্ন, কোনোই আগুন।

(সিরিয়া)

নিজার কাব্বানি (১৯২৩-১৯৯৮)

মর্ফিন

‘শব্দ’ একটা লাফ-দিয়ে-ছোটা বল
ব্যালকনি থেকে মালিকের ছুঁড়ে-দেওয়া,
কুত্তার মতো জিব-লকলক যত
জনগণ যার পিছনে করছে ধাওয়া।

‘শব্দ’ তুখোড় কলের পুতুল এক
আরব বিশ্বে, যে-কিনা কইতে পারে
সাত-সাতখানি ভাষায় একটা কথা,
আর সে মাথায় লাল এক টুপি পরে।

বিক্রি করে সে স্বর্গ, ও মনোহারী
চুড়ি-বালা-বিছা, চকমকে, সুচতুর –
আয়ত চোখের বাচ্চাও বেচে মেলা,
সাদা খরগোশ, সাদা-সাদা কবুতর।

অতি-ব্যবহৃত খানকি, ‘শব্দ’ এক –
লেখক শুয়েছে তার বিছানায় ঢের,
আরও বেশিদিন শুয়েছে সাংবাদিক,
এবং শুয়েছে ইমামও, মসজিদের –

সাত শতকের পর থেকে এই ‘শব্দ’
এক-শট মর্ফিন,
রাজা বাক্যের জোরে তার প্রজাদের
করছে বাক্যহীন!

‘শব্দ’ আমার দেশে মেয়েদের মতো,
পুরুষের মনোরঞ্জনে যা’দিগকে
সারাটা জীবন থাকতে হচ্ছে রত –
কেতাব আইন হয়েছে যখন থেকে।

(সিরিয়া)

passenger-boat-on-the-tigri.jpg
তাইগ্রিস নদীতে যাত্রীনৌকা, ইরাক, ১২৩৭

সাদি ইউসুফ (১৯৩৪-)

ওড়া

দুপুরবেলায় খ’শে পড়েছিল মেঘ,
বালক হতাম যদি
হাতে তুলে নিয়ে মেঘটাকে
ছুঁড়ে দিতাম বাগানে
একটা বলের মতো…
এবং লাফিয়ে চ’ড়ে বলটিতে নিজে
চেঁচিয়ে বলতাম আমি কুকুরগুলিকে:
ঘেউ ঘেউ কর্‌ তোরা… আমি যাতে উড়ে যেতে পারি।

পরাভব

শুরু আমরা করেছিলাম
দুলকি চালে লাফিয়ে-যাওয়া দু’টি ঘোড়ার মতো
এই দুনিয়ার এস্পার ওস্পার

আর আজকে ঘরের কোণে
গুটিসুটি প’ড়ে-থাকা ছায়ার মতো আহা
আমরা পরাভূত

(ইরাক)

ইসাম মাহ্ফুজ (১৯৩৫-)

উপসংহার

আমার গল্পের উপসংহার
টেবিলে প’ড়ে থাকা
উচ্ছিষ্টের মতো
ঠাণ্ডা।

essay_31.jpg
কনভার্জিং টেরিটোরিস, ক্রমোজেনিক প্রিন্ট, ২০০৪;শিল্পী: লাল্লা ইজায়দি (জন্ম. মরক্কো ১৯৫৬, মার্কিন প্রবাসী)

সালাহ্ নিয়াজি (১৯৩৫-)

বোরকার প্রত্যাবর্তন

কে ঠেসেছে ময়নাটিকে,
সেলাই ক’রে দিয়েছে ভয় তার পালকে?

ঠাস ক’রে তার দরজাটিকে বন্ধ করার মতো
কে ঢেকেছে বোরকাতে ঐ বালিকাকে?

উনসি আল-হাজ (১৯৩৭-)

স্মৃতি

এই
দীর্ঘ
রাত!

আমাকে কবর দিচ্ছে উটপাখিগুলি

মেয়ে প্রজাপতি মেয়ে

একটা মেয়ে স্বপ্ন দেখল সে প্রজাপতি
আর জেগে উঠে
বুঝতে পারল না মোটে
সে ছিল কিনা স্বপ্নে নিজেকে প্রজাপতি-ভাবতে-থাকা বালিকা এক
নাকি
বালিকা-ভাবতে-থাকা প্রজাপতি

শত শত বৎসর পরে
রাতের হাওয়া
(বাছারা আমার)
একটা বালক আর একটা বালিকার
প্রজাপতির মতো চটুলতা
যে-প্রজাপতি স্বপ্ন দেখেছিল সে একটা বালক আর একটা বালিকা
কিংবা
একটা বালক আর একটা বালিকা যারা স্বপ্ন দেখেছিল তারা প্রজাপতি

তার পর হাওয়া হ’ল তুফান
(বাছারা আমার)
বাইরে ছিন্নভিন্ন প’ড়ে থাকল
একটা প্রজাপতি।

the-crows-using-their-wings.jpg
ডানার বাতাসে আগুন বাড়িয়ে শত্রু পেঁচাদের পুড়িয়ে মারছে কাকেরা, সিরিয়া, ১৪ শতক

সামিহ্ আল-কাসিম (১৯৩৯-)

যুদ্ধের পুত্রেরা

বাসর-রাতে তারে
যুদ্ধে নিয়ে গেল তারা।

পাঁচটা সাল হয়রানি।

একদা ফিরে এল লাল
স্ট্রেচারে চ’ড়ে, তার
তিনটা ছেলে তার সাথে
মিলতে গেল বন্দরে।

দেয়ালের ঘড়ি

আমার শহর ধ’সে গেল
দেয়ালে ঘড়িটা তবু ছিল
আমার পাড়াটা ব’সে গেল
দেয়ালে ঘড়িটা তবু ছিল
আমার রাস্তাটা ভাঙা হ’ল
দেয়ালে ঘড়িটা তবু ছিল
চত্বরটা রক্ত-রাঙা হ’ল
দেয়ালে ঘড়িটা তবু ছিল
বাড়িটা চুড়চুড়া হ’ল
দেয়ালে ঘড়িটা তবু ছিল
এবং দেয়ালও গুঁড়া হ’ল
ঘড়িটা তখনও বেজে গেল
টিক টিক টিক

সেনাপতির সম্পত্তি
(এরিয়েল শ্যারন-কে)

সেনাপতির টেবিলে ফুলদানি
ফুলদানিতে পাঁচটা গোলাপ তোলা
তাঁর ট্যাংকের মুখ মোট পাঁচখানি
আর, ট্যাংকের তলায় একটা পাঁচ বছরের ছেলে, একটা গোলাপ

একটা ছেলে, পাঁচটা তারা সেনাপতির কাঁধের অলঙ্কার
পাঁচটা ছেলে, একটা গোলাপ ফুলদানিতে তার
তার ট্যাংকের তলায় পাঁচটা গোলাপ, পাঁচটা ছেলে
ট্যাংকের মুখ শেষ হয় না তাদের গুনতে গেলে

(প্যালেস্টাইন)

মাহ্‌মুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮)

আমি গণহত্যা দেখেছি

আমি গণহত্যা দেখেছি, একখানা
মানচিত্র মেরেছে আমাকে
সরল কথার আমি ছানা
দেখেছি কাঁকর-খোয়া উড়তে ঝাঁকে-ঝাঁকে
দেখেছি নীহারকণা বোমার মতন ঝ’রে পড়তে
মুখের উপরে হায় আমার মনের দরজা বন্ধ করল ওরা
কার্ফিউ কায়েম করল, ব্যারিকেডে রাস্তা ভরল ওরা
আমার হৃদয় বদ্লে গেল সরু একটা গলিতে
বদ্লে গেল পাঁজর পাথরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে

(প্যালেস্টাইন)

original post

read more

মাহ্‌মুদ দারবিশের একটি কবিতা আমি গণহত্যা দেখেছি

by সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

৯ আগস্ট ২০০৮ তারিখে আমেরিকার টেক্সাসে মারা গেলেন প্যালেস্টাইনের কবি মাহ্‌মুদ দারবিশ। ৩০টির বেশি কবিতার আর ৮টি গদ্য গ্রন্থের প্রণেতা এই কবি তাঁর গভীর প্যালেস্টাইন প্রীতির জন্য বিখ্যাত। দারবিশ আরবি ভাষায় লেখালেখি করলেও ইংরেজি, হিব্রু ও ফরাসি ভাষায় বাক্যালাপের দক্ষতা তাঁর ছিল। দারবিশের অনেক কবিতা থেকে গান তৈরি হয়েছে। মৃত্যুর আগে দারবিশ প্যালেস্টাইনে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে গেছেন।

mahmud-darwish.jpg
মাহ্‌মুদ দারবিশ (Mahmoud Darwish, ১৩/৩/১৯৪১ — ৯/৮/২০০৮)

আমি গণহত্যা দেখেছি

আমি গণহত্যা দেখেছি, একখানা
মানচিত্র মেরেছে আমাকে
সরল কথার আমি ছানা
দেখেছি কাঁকর-খোয়া উড়তে ঝাঁকে-ঝাঁকে
দেখেছি নীহারকণা বোমার মতন ঝ’রে পড়তে
মুখের উপরে হায় আমার মনের দরজা বন্ধ করল ওরা
কার্ফিউ কায়েম করল, ব্যারিকেডে রাস্তা ভরল ওরা
আমার হৃদয় বদ্‌লে গেল সরু একটা গলিতে
বদ্‌লে গেল পাঁজর পাথরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে

অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

read more

নীল-নীল তুলির আঁচড় আইসল্যাণ্ডের চার আধুনিক কবির কবিতা |

4-poets.jpg আইসল্যান্ডের মানুষেরা প্রবল কবিতাপ্রেমী—শত দুর্যোগেও তাঁরা কবিতার সঙ্গ ছাড়েন না। সেখানে কবিতার রাজত্ব রাজদরবারে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-উপকূলে, ক্ষেতে-খামারে, স্কুলে-কলেজে, সংবাদপত্রে, পত্র-পত্রিকায় ও মানুষের মনে। জাতীয় মর্যাদাহানি, নৈতিক অধঃপতন, শাসকের অত্যাচার-অনাচার, ডেনমার্কের সম্রাটের ঔপনিবেশিক শাসন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, মহামারী, মড়ক, প্লেগ—সব হাসিমুখে মেনে নেন সেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেষপালক ও জেলেরা—সুললিত ছন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। গত দু-তিন বছরে পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক দেশগুলির অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে আইসল্যান্ডে চলেছে চরমতম অর্থনৈতিক সংকট; দেশটি প্রায় দেউলিয়া—বড় বড় তিনটি ব্যাংক ভূপাতিত; কিন্তু থামেনি কবিতার চর্চা। পুরোদমে চলেছে কবিতা পড়া, কবিতা লেখা, কবিতাপত্র ও কবিতাগ্রন্থের প্রকাশ।

১৮০০ থেকে ১৯৫০ সাল—এই দেড়শ বছর আইসল্যাণ্ডের কবিতার ‘রোমান্টিক যুগ’—সেই সময় প্রাচীন মহাকাব্য থেকে আধুনিক গীতিকবিতায় উত্তরণ ঘটে আইসল্যান্ডের এবং ইউরোপের রোমান্টিক কবিদের সমূহ প্রভাব এসে পড়ে। শুধু তাই নয়, উন্মেষ ঘটে দেশটির জাতীয়তাবাদের এবং সেইসঙ্গে স্বাধীনতা-আন্দোলনের। ১৯৪৪ সালে দেশটি স্বাধীন হয় এবং স্ভেইন বিয়র্নসন (১৮৮১-১৯৫২) তার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কবিতার জগতেও রোমান্টিক যুগ শেষ হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা সেই সময়ে। একদিকে এলিয়ট, অডেন ও রিলকের প্রভাবে নব আনন্দে মেতে উঠলেন তরুণ কবিরা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত কবিরাও আইসল্যাণ্ডের প্রাচীন কাব্যরীতি পুরোপুরি ত্যাগ করে প্রাণ সঁপে দিলেন মুক্ত ছন্দের নতুন শৈলীর কবিতায়। সেখানে প্রতিফলিত হলো মানুষের মুখের ভাষা এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি—কোনো বিষয়ই আর ব্রাত্য রইল না কবিতার জগতে।

আইসল্যান্ডের সে চারজন প্রধান কবি এই কাব্যবিপ্লবের অংশীদার (এবং অবশ্যই তাঁদের সতীর্থ ছিলেন আরো অনেকে), তাঁদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তার পর বেরিয়ে পড়েছি তরুণতর কবিদের সন্ধানে। কবিদের বয়স ও প্রতিষ্ঠা না বাড়লে তাঁদের কবিতার অনুবাদ হয় না অন্য ভাষায়; এবং আইসল্যান্ডের কবিতার সন্ধানে আমরা পুরোপুরি ইংরেজি ভাষার ওপরে নির্ভরশীল। ১৯৯৪ সালে লন্ডনের ‘শ্যাড টেমস বুকস’ প্রকাশনা সংস্থা আইসল্যান্ডের প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক পল ভ্যালসনের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন চল্লিশের কম বয়সী আটজন কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সংকলন ‘Brush Strokes of Blue: The Young Poets of Iceland’। সেই সংকলন থেকে চারজন কবির নির্বাচিত কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ।

এইনার মা’র গডমুন্ডসনের জন্ম ১৯৫৪ সালে। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ডাক পিওনের একাকিত্ব’, এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তরুণ-তরুণীরা অনুপ্রাণিত হন কবিতার পঠন ও রচনায়। যুবক-যুবতীদের দুঃখ-বিষাদ থেকে শুরু করে বব ডিলানের রক রঙ্গীত—সবই তাঁর কবিতার বিষয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর তিনি অবশ্য কথাসাহিত্যের দিকে ঝোঁকেন। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সমুদ্রে এক পাথর’, তার পর থেকে তিনি পুরোপুরি গদ্যের গার্হস্থ্যে। এই কাব্যগ্রন্থের দুটি প্রধান কবিতার বাংলা অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো বার্নার্ড স্কাডারের (১৯৫৪-২০০৭) ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে। বার্নার্ড তাঁর জীবনের তিন দশক কাটিয়েছেন আইসল্যান্ডের রিকিয়াভিক শহরে, লেখাপড়া করেছেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অনুবাদকের কাজ করেছেন পত্রিকায় ও প্রকাশনা সংস্থার। এই কবির দুটি উপন্যাস—‘বৃষ্টিবিন্দুর অন্তকথন’ এবং ‘মহাবিশ্বের দেবদূত’-এর ইংরেজি অনুবাদও করেছেন তিনি।

এলিসাবেট ম্যোকুলসডোট্রির (জন্ম ১৯৫৮) আইনারের প্রায় সমবয়সী হলেও কবিতা লেখা শুরু করেছেন অনেক পরে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘এলা স্টিনার যাদুমন্ত্রের পুঁথি’ থেকে তাঁর চারটি কবিতার বাংলা অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো ডেভিড ম্যাকডাফকৃত ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে।

পরবর্তীকালে তাঁর অনুগল্পের সংকলন ‘ফুটবলের গল্প’ (প্রকাশ ২০০১) জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সাম্প্রতিকতম গ্রন্থ আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘তালাচাবি-সারাই মিস্ত্রীর সৎ উপদেশ’ (প্রকাশ ২০০৭); স্থান: ন্যুইয়র্ক, পাত্রী: আইসল্যান্ডের, লেখিকা; পাত্র: কৃষ্ণকায়, মার্কিন, ব্যান্ডের ড্রামবাদক; দুজনের সম্পর্ক, প্রেম ও যৌনতার কাহিনী।

লিন্ডা ভিলহ্যালম্‌স্‌ডোট্টির (জন্ম ১৯৫৮) কম বয়স থেকে পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখে হাত পাকিয়েছেন; ১৯৯০ সালে প্রথম গ্রন্থ ‘সরু সুতোয় দোদুল্যমান’ প্রকাশের আগে থেকেই তিনি কবিতার জগতে সুপরিচিত। প্রথম গ্রন্থ থেকেই তিনি জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা অন্তর্মুখী এবং দার্শনিক ভাবনায় পরিপূর্ণ। আইসল্যান্ডের প্রকৃতি তাঁর কাব্যভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বরফের সন্তান’ থেকে দেশের প্রধান কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি। জাতীয় কবিতা পুরস্কারে ভূষিত গ্রন্থটি। সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘তুষারের প্রজাপতি’-র (প্রকাশ ২০০৬) তিরিশটি কবিতা এখন পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর কবিতাগুলির ইংরেজি অনুবাদক সিগুর্ডার মাগনুস্‌সন ইংরেজি ভাষায় আইসল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করেছেন এবং জেসম জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন আইসল্যান্ডিক ভাষায়।

সংকলনের অন্তিম সদস্য গ্যির্ডির এলিয়াসসন (জন্ম: ১৯৬১) বহুপ্রজ লেখক—প্রতি বছর তাঁর দু-তিনটি করে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়—উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কবিতা অথবা অনুবাদ। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যরচনার সূচনা; প্রথমে ভেবেছিলেন যে, লেখাপড়া শেষ করার পর শিক্ষকতা বা অধ্যাপনা করবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহিত্যকেই পেশা হিসেবে নিলেন। প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘সমাধির দ্বার খুলে যায়’ (প্রকাশ ১৯৮৭) এবং ‘দুটি চাঁদ’ (প্রকাশ ১৯৮৯)। সেখানে তাঁর কবিতা নিরীক্ষামূলক এবং ভাষা অপ্রত্যক্ষ, কিন্তু পরে তিনি শৈলীকে করেছেন সরলতর এবং ভাষা-বিন্যাসকে মুখের কথার কাছাকাছি; যেমন, ‘গ্রীষ্মকালে শীতভ্রমণের পরিকল্পনা’ (প্রকাশ ১৯৯১) এবং ‘ছায়া-উপত্যকার মাটি’ (প্রকাশ ১৯৯২) কাব্যগ্রন্থ দুটিতে। তাঁর এখানে সংকলিত কবিতাগুলি দ্বিতীয় ও চতুর্থ গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত এবং বার্নার্ড স্কাডারের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে।

বর্তমান কালে গ্যির্ডির কথাসাতিহ্যিক হিসেবেই অধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়। তাঁর ২০০০ সালে প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন ‘হলুদ বাড়ি’ নর্ডিক কাউন্সিল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। তাঁর ‘পাথর বৃক্ষ’ উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ভিক্টোরিয়া ক্রিব; ইংল্যান্ডের ‘কমা প্রেস’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ২০০৮ সালে। তাঁর গদ্যকে বলা হয় ‘ছদ্মবেশী কবিতা’। অনেক সমালোচকের মতে তিনি জাদু বাস্তবতার প্রচলন করেছেন নর্ডিক সাহিত্যে, কিন্তু লেখক নিজে তাঁর গদ্যকে বলেন, ‘মরমী গ্রাম্যতা’ (Mystic Ruralism)। আইসল্যান্ডের তরুণতর কবিদের সন্ধান চলছে। সন্ধান পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে তাঁদের কবিতার অনুবাদ ও আলোচনা করা হবে।

অংকুর সাহা, এপ্রিল ২০১০

আইসল্যান্ডের চার আধুনিক কবির কবিতা

(অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)

এইনার মা’র গড্‌মুন্ড্‌সন

einar_mar_gudmundsson01.jpg
জন্ম: ১৯৫৪

গাথক হোমার

বৃষ্টিভেজা দুপুরবেলায়,

বহুপর্যটিত এক দ্বীপের জাহাজে ভেসে-ভেসে

গাথক হোমার এসে পৌঁছুলেন রেইক্‌য়াভিক।

ঘাট থেকে হেঁটে এসে

ট্যাক্সি নিলেন, যেটি তাঁকে

বর্ষণধূসর যত রাস্তা-বেরাস্তায় নিয়ে চলল দিগ্বিদিক্

থম-মারা বাড়িগুলি ফেলে বাঁকে-বাঁকে।

চৌরাস্তার মোড়ে ঘুরে বসে তাঁর সিটে

ড্রাইভারকে বললেন তিনি চেপে দীর্ঘশ্বাস;

‘হায়, এ কি এমনকি কল্পনা করা যায়

স্যাঁতসেঁতে ম্যাটমেটে এই একঘেয়েমিতে

এমন মশহুর এক কথক-জাতির বসবাস?’

‘ঠিক এ-জন্যেই,’ বলে ট্যাক্সি-ড্রাইভার,

‘ফোঁটাগুলি যেসময় ভাঙে জানালায়,

ইচ্ছাই করবে না কোনো কেচ্ছা শোনবার।’

জানালায় ফোঁটাগুলি ভাঙে যেসময়

আর উপসাগরে গড়িয়ে-যাওয়া ঘন কুয়াশায়

ঢেকে যায় যুগপৎ পাহাড় ও সাগর,

তখন বিতং করে বলবার মতন কিছু নাই

আছে খালি রাস্তার ছপছপ,

নাই কোনো জাদুকরি গান

কিংবা কোনো কিন্নর ভাস্কর,

কেবলই বিলীয়মান যত পদচ্ছাপ

বৃষ্টি মিলিয়ে যায় যেভাবে বিশাল পারাবারে

কিংবা শূন্যতায়, আর যে-দমকা তুফান

খেউড় গায় আর ঝাপটা মারে…

ধূসর বোরকায়

সময় গুঁড়িয়ে পথ হাঁটে,

কী এক বেমক্কা পাখি ঠায়

স্বপ্নহীন ঝুলে থাকে শহরের ছাদে,

বৃষ্টির হিজাব মেয়েদের

চেপে বসে গলার উপরে,

তারপর পৃথিবীজুড়ে ধীরে, নির্বিবাদে,

একটা জালের মতো রাতের আঁধার ঝরে পড়ে।

নায়ের বাদাম খুলে বেরিয়েছে দরিয়ায় কেউ,

ওখানে সুরেলা এক ঢেউ,

একটা বাড়ি, ঘুমে গুটিসুটি,

স্বপ্নে নিংড়ে-নেওয়া একটা গান,

দুনিয়ার ছোট-ছোট ঢেউয়ের বৃত্তটি

এক কালো সমুদ্রে ছড়ায়

আর ছোটে আলোকের যান

শিখা হয়ে রাস্তায়-রাস্তায়।

–Einar Már Gudmundsson, Homer the Singer of Tales

নীল-নীল তুলির আঁচড়

এবং সাগর…

নিজের শকল দ্যাখে যে-আয়নায় পরওয়ার দেগার

যেমন অন্ধ আর আছড়ে-পড়া ঢেউ আত্মার

উথালপাথাল, আহা, বাজুতে পাঁশুটে স্বপ্ন আর

দু’ঠোঁটে ভিনদেশি বাত তার।

সূর্য যখন ভাসে মহাসাগরের বালুতটে

একটা ঝলকে পুরো দ্বীপটা জ্বলে ওঠে,

বরফের চৌকোগুলি পাহাড়ের চূড়ায়-চূড়ায়,

পেয়ালারা টৈটম্বুর রাতুল সুরায়।

এ এক ক্যানভাস সারা দুনিয়ায় টানা,

তুঙ্গ ক্লিফের ফ্রেমে আঁটা,

নোনা একটা ফোঁটায় ঝলসানো এক আয়না,

চৌধারে কিচমিচ পাখি, পাথরের পাটা।

চেয়ে দ্যাখো, তুলির আঁচড়গুলি ঐ

থিরথির ছড়িয়ে পড়ছে তামাম নিখিলে,

সুরেলা ঢেউয়ের টাটকা নীলে

শব্দেরা ঝাপটায় ডানা মাছের মতোই।

আর ফেনা…

যেন পাকা দাড়ি কোনো বুড়ার অচেনা

যে-বুড়া বেলায় পা-টা রেখেই আবার

মিলায়; আঁধার—ফুলে-ওঠা পারাবার।

জ্যোৎস্নার বিরান ময়দানে

ঢেউ উঠে একটা কালো বেয়ালায় মেঘের চুলের ছড় টানে,

মান্ধাতার আমলের লাঠির হুকুমে ওঠে নাচ

আর এক অতীত স্বপ্ন থেকে আসে কূলঙ্কষ ঢেউয়ের আওয়াজ,

হেরিং মাছের জীর্ণ জেটিটিতে নানা অভিজ্ঞান

কিংবা ধুধু অতীতের উচ্চাসন থামের কাতার…

এই দ্বীপ একটা ভাসমান

বর্ম, যাতে বর্শা-হেন থরে-থরে উঁচোনো পাথর।

এবং সাগর…

এই সে তট থেকে ডাঙায় এল উঠে,

দৌড়ে গিয়ে সোজা ঢুকল গাঁ’য়

ধূসর কুয়াশার জোব্বা-গা’য়,

ছিনিয়ে নিয়ে গেল বাচ্চাদের সব,

তাদের হাত ধ’রে চলল পথে ছুটে

স্বপ্ন বেড়াটার ওপারে ছপছপ

ঈষৎ বীচিময় হলুদ পল্বলে;

বাচ্চাদের সাথে সারা দ্বীপে,

বাজনা বাজে চোখে নীলের কল্লোলে,

পরে সে শুয়ে পড়ে খাড়া ক্লিফের

পিছনে, ঘুম দিল নাক ডেকে,

পাখিরা কিচমিচ চৌদিকে।

* * *

স্বপ্নের ভিতরে যেন জীবনের উষ্ণ প্রস্রবণ

রাতের অতল অন্ধকূপে,

ম্রিয়মাণ বাতাসের মকবরায় আছে আভুবন

তোমার রাস্তারা সব বে-নিশানা কুয়াশায় ডুবে।

ফেলে চলে গেছে, তবু তাদের জুতার সুকতলির

তলে কত ফোয়ারার খুলে যায় খিল,

একেকটা আঁচড় এই ভুবন-তুলির

লেজুড়ের ঘাই-মারা শব্দের নীল।

–Einar Már Gudmundsson, Brush Strokes of Blue

এলিসাবেট য়্যোকুল্স্ডোট্টির

elisabet_j_01.jpg
জন্ম: ১৯৫৮

যে-শিশুটি পেয়েছে ভর্তুকি

এক যে ছিল বাচ্চা, তার বাপ-মা ছিলেন এতই সুবিবেচক, তাঁরা বাচ্চাটিকে নিয়মিত ভর্তুকি দিতেন। অবশ্যই তার গায়ে কোনো পট্টি কিংবা ব্যান্ডেজ কেউ কখনো দ্যাখে নি। বাচ্চাটা ঐ ঘুষগুলিকে খুশিমনেই নিত, তবে আস্তে-আস্তে লোভের শিকার হয়ে পড়েছিল যে সে সেটা আত্ম-নিপীড়নের চিহ্ন হয়ে ফুটে উঠত মুখে। গল্পটা শেষ করতে আমার যোগ করতে হয় যে যখন বড় হয়ে উঠল সে, এই একগুঁয়ে ভুল-ধারণাটা কায়েমি হয়ে গেল মাথায় তার; জীবন তার ধারেই কিছু ধার।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Child Who Received Compensation

সাত ছেলে

ছেলেঘেঁষা মেয়েটি তো একইসাথে অনেক ছেলের প্রেমে পড়ল। পয়লার গলা এত মধুর, মেয়েটা শুতে চাইল তার সাথে; দুসরার চওড়া কাঁধে আঙুল চালাতে তার লোভ হলো খুব; তৃতীয়টি মঞ্চে করত এমন অভিনয় যে তার ফিরে এল জীবনে বিশ্বাস; চৌঠার পূজা আর প্রশংসায় সে তো বাধ্য হয়ে পড়ত আয়নায় তাকাতে; পঞ্চমের চোখ-দু’টি ছিল নক্ষত্রের মতো, ইচ্ছা করত তার সাথে নৌকা বেয়ে যেতে; ষষ্ঠটি যথেষ্ট ছোট ছিল তার চেয়ে আর তখনই সময় আর সুর পাল্টেছিল; কিন্তু সপ্তমই ছিল সকলের সেরা, কেননা কিছুই তার মালুম হতো না আর, খালি টের পেত তার সবগুলি তার বেজে উঠেছে একসাথে আর পাহাড়ের ধার থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সে পাগলাঝোরা। আর তাকে রিং দিতে যখনই গিয়েছে, হায়, ফোনটায় আগুন ধরে গেছে।

Elisabet Jökulsdóttir, The Seven Boys

মাছের কলিজা-খাওয়া মেয়েটি

একটা ছোট্ট মেয়েকে চিনতাম যার রোজকার খাবার ছিল মাছের কলিজা। একটা ফিশবোল-ভরা গোল্ডফিশ ছিল তার, সারাদিন বাসায় থাকত সে তার মাছেদের সাথে। তার বাবা-মাকে নিত্যি আরও মাছ কিনতে হতো, কারণ কাজের থেকে ফিরে রোজই শুনত তারা আজকে একটা, কালকে তিনটা মাছ মরে গেছে। বাবা-মা যখন জানতে চাইত মরা মাছগুলি কোথায়, সে বলত, তাদেরকে গোর দিয়েছে সে বাগানের কোনো গর্তে, কিংবা ছুড়ে ফেলেছে ডাস্টবিনে। তারা অতএব আরও-আরও মাছ কিনে চলল, কেননা বেচারি একা থাকে সারা দিন। কিন্তু একদিন ওর মা যখন ফুলদানিগুলির ফুল বদলে দিচ্ছে, তখন প্রত্যেকটিতে পাওয়া গেল গাদি করে রাখা মরা মাছ। প্রবল জেরার মুখে জানা গেল মেয়েটা মাছগুলি কেটে কলজে বের করে খেত প্রতিদিন অন্তত একখানা। বাবা-মা কারণ জানতে চাওয়ায় মেয়েটি বলল, সে কিছু জানে না। তখন মেন্টাল হসপিটালের ওয়ার্ডে রেখে দিল তারা তাকে, যার একমাত্র কারণ এই-যে, জানত না সে কেন খেত মাছের কলিজা।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Little Girl Who Lived on Fishes’ Hearts

ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ে

ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ের বাপ-মা ছিল, যারা দু’জন চলে গেল নিজের-নিজের পথে। বাচ্চাগুলি পড়ে রইল, পালা করে তাকাল তারা পূর্বে ও পশ্চিমে, দেখল তাদের বাপ-মা মিলিয়ে যাচ্ছে মিলিয়ে যাচ্ছে একটা নীলচে কুহেলিকায়, তার পর উধাও হলো তাদের দূরদৃষ্টিতেও। বাচ্চাগুলি তখন একটা ফন্দি আঁটল, এবং পরে লোকজন তো ভেবেই অবাক, এরা কেন চায় না এদের জানাশোনার পরিধি বাড়াতে! যেখানটাতে ওরা সবাই বাপ-মা-সমেত ছিল আগে, সেখানে এক গাছ গজাল হেঁটমুণ্ড-ঊর্ধ্বপদ, মাটির মধ্যে সেঁধিয়ে ডালপালা। ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ে আজও হামা দিয়ে সেথায় ছেঁটে যাচ্ছে তাদের শিকড়গুলি।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Divorce Children

লিন্ডা ভিলহ্যালম্স্ডোট্টির

linda_v02.jpg
জন্ম: ১৯৫৮

মোনালিসা

প্রথম মোজেইক

সেদিন সকালে একটা রামধনু সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিল

এন্‌গেয়্‌[১]-এর পশ্চিম দিকে

ভিডেয়্‌-এর পশ্চিম দ্বীপের পূর্বে গোত্তা খেয়েছিল

আল্লাহর ওয়াস্তে যদি বৃষ্টি ঝরেই থাকে

ছাই আর বালি আর চুনাপাথরের

কোন কাণ্ড হয়েছিল তার আগের রাতে?

দ্বিতীয় মোজেইক

রাতটি মাথায় চড়ে বসছিল আমার

দু’জন মহিলা মারা গেছিল তৃতীয় মহিলাও

সুবেসাদিকের অক্তে উবে যাচ্ছিল

মাথায় আসছিল খালি তিনটি বিষয়ই

যন্ত্রণায় আতঙ্কে ও অ্যানেসথিসিয়ায়

কুঁকড়ে-যাওয়া মুখ

শেষ নিঃশ্বাসের সাথে

মুখে-ফোটা হাসি

এবং শেষমেশ

মেনে যে নিলাম অর্থ আমি

শান্তি শব্দটির

তৃতীয় মোজেইক

মসৃণ আর সরল চৌহদ্দি আর মণ্ডপে সারি আর কেউ যদি ভারী ব্রঞ্জের দরোজা দিয়ে ঢুকে একাকী দাঁড়ায় একটা খিলানের নিচে আর মাথার উপরে তার একটা গোলাকার গর্ত খোলা থাকে আকাশের দিকে আর চোখ তার দিগন্ত চেনে না, তার ঠোঁট থেকে নিংড়ে বার করা হয় সুললিত ‘ওহ্!’ যেটি বার করতে যুঝেছে সে বছর-বছরব্যাপী কৃচ্ছ্রসাধনায়। পরে সে জবরদস্তি করে বলবে তার চোখে পড়েছিল এক-কণা বালি।

–Linda Vilhjálmsdóttir, Mona Lisa

[১] এন্‌গেয়্‌ আর ভিডেয়্‌ (Engey & Videy) আইসল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে (রেইক্‌য়াভিক-এর কাছে) দুটি ছোট দ্বীপ।

রাতগুলি

বালুকাবেলায় বড্ড ঠাণ্ডা আজকের রাত

যে-মেয়ে নাইতে নেমেছে ভাটার নেমে-যাওয়া জলে

হাঁ হয়ে দেখল পাথরে বসেছে আরেকটা মেয়ে

সোনালি চুলের প্রেমিক ঝাড়ছে কালো চুল থেকে

তার দুটি সরু নাজুক আঙ্গুলে। এবং ভিনাস,

হায় রে ভিনাস পুড়ে যায় ভেজা সমুদ্রজলে।

–Linda Vilhjálmsdóttir, Nights

গ্যির্ডির এলিয়াসসন
gyrdir_eliaasson02.jpg
জন্ম: ১৯৬১

অন্ধতা

সুবেসাদিকের সাথে

জেগে উঠব আমি,

উঠব ছুরিগুলির সকাশে

যে-ছুরিরা

খুলে দেবে আবার আমার

দৃষ্টি, আমি যে-ছুরিগুলিকে

বিছিয়ে রেখেছিলাম ঘাসে,

যে-ঝলমলে ঘাস

গজায় এবং আমি দেখি না যাদের

আমার দরজার

বাইরে। আমি সূর্যকে ঝলসাতে

দিই ফলাগুলির উপর

আর তার পর

তাদের বসিয়ে দিই চোখে

আর চোখ চিরে দেখি

বিশাল আকাশ

ছড়িয়ে রয়েছে একটা

কালো পৃষ্ঠায়

নীল জলরঙের মতন

–Gyrdir Eliasson, Blindness

হূসাফেল[২], গ্রীষ্মের শেষে

বারবিকিউ করছিলাম আমরা বারান্দায় আর ক্যাবিনটা ধোঁয়ায়

ভরে গিয়েছিল। আমি চুপিচুপি রান্না

ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম আর হাঁটতে

শুরু করে দিলাম জমাট-লাভা-পথে ইচ্ছা ছিল

দূরের কুলকুল-করা নদীটার কাছে যাব কিন্তু

লাভাটা বেজায় রুক্ষ পায়ের তলায় তদুপরি

আমার নূতন জুতা এই চোখা-চোখা

পাথরের খোঁচাগুলি সামলাতে পারবে না। আমি বসি

আর দেখতে পাই একটা মাকড়সা লড়িয়ে দিচ্ছে জান

ঊর্ণার বয়নে আর আমার কেবলই টাস্‌কি লাগে

ঐ-তো একরত্তি একটা হালকা-পলকা প্রাণী

কেমন করে এ পারল সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে এই

চরকা তৈরি করে ফেলতে আর ঘাড় তুলে আমি দিব্যি

আকাশ দেখবার ইঞ্চিখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই।

–Gyrdir Eliasson, Husafell in Late Summer

[২] হূসাফেল, দক্ষিণ আইসল্যান্ডের এক লাভা-আকীর্ণ, টুরিস্ট-মোহন স্থান।

ব্র্যুগেল[৩] -এর নানা নমুনা

পাহাড়ের উপরে এক দেহাতি সবুজ-রঙ গির্জা

আর দাঁড়কাকের দঙ্গল

আর এক হারমোনিকা-বাজিয়ে

সারাই করছে তার ঘরের চাল

জানালার হলুদ পালা

বুক চিতিয়ে হাঁটছে মুণ্ডুহীন মুর্গিগুলি

ঘোলা কাচের উপর

শিরিস কাগজ ঘষে চকচকে করছে সন্ধ্যা

পর্বতের খাড়াইগুলিকে

আমার মন

ঝেঁটিয়ে বার করছে যত চিল-চিৎকৃত চিন্তা তার

বাচ্চারা স্কেট করছে জমে-যাওয়া পানিবাঘ ডোবায়

একটা বাঁকা-চাঁদের তলায়

অ্যাকর্ডিয়ন-বাদিকাটি লম্ফের আলোয়

সানগ্লাস পরে

পড়ছে

ছোট্ট পাখিগুলি ঘুমাচ্ছে স্বপ্নহীন

চিমনির ভিতর

–Gyrdir Eliasson, Bruegel Variations

[৩] ষোড়শ শতকের বিশ্ববিখ্যাত ফ্লেমিশ চিত্রশিল্পী পিটার ব্র্যুগেল। তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলির মধ্যে আছে দ্য ফল অব দ্য রেবল এঞ্জেল্জ্দ্য ফল অব ইকারুস

গ্রীষ্মের পড়া

টেবিলে একটা বই, বন্ধ,

অন্ধ হোমারের, টেবিলটা

বারান্দায় আর চড়া রোদ

জেটি থেকে নৌকাগুলি থেকে

নিয়ে আসে মাছ, মোটরের

গোঁ-গোঁ প্রতিধ্বনিত পর্বতে

আচার্যের উঠানে ঘোড়াটা

ঘাস খায় কিন্তু আমি চা

খাচ্ছি তাকিয়ে অন্য দিকে

বইটা আবার খুলে পড়ো

নেমে পড়ো আবছা আর মৃত

বৃত্তের পাতাল-দেশে-দেশে

বোধ করো এই উজ্জ্বলতা

নীলাকাশ মাথার উপর

মাটির উপরে থাকা—আহা!

–Gyrdir Eliasson, Summer Reading

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site