সুইডেনের প্রথম সারির কবি ক্যারিন বোয়ি-এর সাথে বাংলাভাষী পাঠকদের পরিচয় তেমন নেই বললেই চলে। বাংলাভাষী প্রবাসী দুই লেখকের আনুকূল্যে ক্যারিন বোয়ি-এর একগুচ্ছ কবিতা এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়ান্টিফোরডটকমের পাঠকদের জন্য। ক্যারিন সম্পর্কে ভাষ্যটি লিখেছেন অংকুর সাহা এবং কবিতাগুলোর ভাষান্তর করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বলা বাহুল্য যে কবিতাগুলো ডেভিড ম্যাকডাফ-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে।

শুদ্ধতায় ক্লিস্ট কবি ক্যারিন বোয়ি (১৯০০-১৯৪১):চল্লিশ বছরের অসমাপ্ত জীবন-চারটি কাব্যগন্থ; মৃত্যুর পরে অপ্রকাশিত কবিতাগুলি নিয়ে আরো একটি; কিছু গদ্যরচনা, ডায়েরি, সাহিত্য-অনুবাদ; গুটিকয়েক আত্ম জৈবনিক উপন্যাস; আরো একটি রাজনীতি-নিবিড়, ভবিষ্যৎসূচক, অপ্রচলিত ভাবনার পর-শিরশির করা উপন্যাস-এই হ’ল ক্যারিন বোয়ির সাহিত্যজীবন। স্কুলের কোমলতা আর বরফকুচির কাঠিন্য তাঁর সাহিত্যে। সুইডেনের বিংশ শতাব্দীর লেখকদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির, কবি হিসেবে অগ্রগন্য, লেখিকা হিসেবে শ্রেষ্ঠতমা। তাঁকে বাদ দিলে স্ক্যান্তিনেভিয়ার কবিতা অসমাপ্ত থেকে যায়। অথচ শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় দীর্ন তাঁর জীবন, ধর্ম ও রাজনীতির টানা-পড়েনে ক্ষতবিক্ষত তিনি; একদিকে কবিতার কামড়ে অস্থির আর অন্যদিকে রয়েছে ছোট ও বড় নারী ও পুরুষের শরীরী প্রেমে বিহ্বল। বিষন্ন, ভাবুক, উন্মনা, দ্বিধাদীর্ণ এক ট্র্যাজিক চরিত্র।
ক্যারিন এর জন্ম ১৯০০ সালের ২৬ অক্টোবর সুইডেনের গোটেবার্গ শহরে। তাঁর পিতৃপক্ষ জার্মান এবং মাতৃপক্ষ সুইডেনের ১৮৪২ সালের হামবুর্গের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরে ঠাকুর্দা এডুয়ার্ড বোয়ি ভাগ্যা্ন্বেষণে বেরোন এবং ইয়োরোপের নানা দেশ ঘুরে ১৮৪৯ সালে সুইডেনের নাগরিকত্ব নেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফ্রিৎস সিভিল এনজিনিয়ারিং এর ডিগ্রি করলেও সফল হন ইনসিওরেনস এর ব্যবসায়ে। তিনি বয়েসে আঠেরো বছরের কনিষ্ঠ। কর্মচারী সিগনে লিলিয়াস্ট্রান্তকে বিবাহ করেন। ক্যারিন তাঁদের প্রথম সন্তান। ফ্রিৎস মানুষটি ছিলেন আবেগপ্রবণ এবং মানসিক স্থায়ীত্বের অভাব ছিলো তাঁর।
১৯০৯ সালে পরিবারটি ছোট শহর গোটেবার্না ছেড়ে রাজধানী স্টকহোমে উঠে আসেন। নতুন পরিবেশে ও নতুন স্কুলে বালিকা ক্যারিনের মানসিক বিকাশ দ্রুততর হয় এবং পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বন্ধুদের সঙ্গে বসে তিনি উপভোগ করতেন আলেকজান্দার ডুমা (১৮০২-১৮৭০) এইচ জি ওয়েলস (১৮৬৬-১৯৪৬), রাডইসার্ড কিপলিং(১৮৬৫-১৯৩৬) ও মরিস মেটারলিংক (১৮৬২-১৯৪৯) এর কথাসাহিত্য। তাঁর প্রথম কৈশোরে এক অজানা দেশের অজানা কবির লেখা অনূদিত হল সুইডিস ভাষায়-সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মোহিত হলেন তিনি। তবে কবিতার চেয়েও আগ্রহ বাড়লো ভারতীয় পুরান, সংস্কৃত ভাষা ও বৌদ্ধ ধর্মে। একই সময় কার্ল গেলারাপ (১৮৫৭-১৯১৯) নামে এক লেখকের “কামানিতা তীর্থে যায়” নামে একটি উপন্যাস পড়লেন যার পটভূমি ভারত। তিনি স্থির করলেন ভারতবর্ষে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়ে ভিক্ষুনী হবেন। ধর্মে অনুরাগ তাঁর থেকে যায় সারা জীবন, তবে বৌদ্ধ ধর্মের বদলে খ্রীষ্টধর্মে। আমূলপ্রোথিত ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরতর আসঙ্গকামনার জট ছাড়াতে কেটে যায় বাকি জীবন। 
স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে গেলেন সনাতন ও ঐতিহ্যময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ঠিক করেছিলেন শিক্ষিকা হবার জন্যে প্রশিক্ষণ নেবেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময় কাটলো ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় এবং গির্জায় উপাসনায়-নিৎসের দর্শনতত্ত্বের আলোচনার পাশাপাশি স্থান পেল রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরভাবনাও। মানবজাতির অন্তহীন দুঃখ কষ্ট কী অপকৃত হবে ঈশ্বরের শীতল করস্পর্শে ? এই সব ভাবনাচিন্তা মাথার মধ্যে জড়ো হয়েই সদ্য কৈশোর পেরোনো নারীর কবিতা রচনার শুরু। এবং যৌন কামনা বাসনার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই একান্ত উপলদ্ধি-তাঁর মনের মানুষেরা মানব নন, মানবী! ১৯২১ সালে তিনি ৪২টি কবিতা নির্বাচন করে “মেঘদল” নামে গ্রন্থের পান্ডুলিপি বানালেন এবং জমা দিলেন স্টকহোমের এক বিখ্যাত প্রকাশকের আপিসে; সাহস পাবার জন্যে সঙ্গে নিয়ে গেলেন মাকে। ছাপা হ’ল কবির প্রথম কাব্যগন্থ-কবির ভালো রয়্যালটি নেই, তবে ২০০ ক্রোনার পারিশ্রমিক রিভিউও মোটের ওপর ভালোই।
চলতে থাকলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-তাঁর প্রিয় বিষয় গ্রিক ভাষা, প্লোটোর মূল রচনাগুলি পড়তে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী। জীবনযাত্রা এবং আনকোরা সব চিন্তাভাবনার জন্যে ছাত্রী মহলে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়-“টিও” তাঁর আদরের ডাকনাম। তাঁর দ্বিতীয় প্রিয় শিক্ষার বিষয়-নর্ডিক ভাষাগুলি। আইসল্যান্ডিক সাহিত্যের কবিতা-সেখানে যুদ্ধ, মহামারী, প্রেম, বীরত্ব সব কিছুরই বাড়াবাড়ি-কিন্তু তাতেই মোহিত ক্যারিন। তৃতীয় প্রিয় বিষয় ইয়োরোপের সাহিত্যের ইতিহাস-কিন্তু বই ধরে ধরে পড়াতেন অধ্যাপক, তাতে তাঁর কল্পনার পাখা মেলতে অসুবিধে। লেখাপড়া ছাড়া সময় কাটে ফ্রয়েড নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্কে এবং সদ্য গড়ে ওঠা ছাত্র ইউনিয়নেরও নেতৃত্বে দেন কিছু দিন।
কলেজ জীবনে তাঁর দুই প্রনয়ী-একজন পুরুষ, কবি নিল্স্ স্ভানবার্গে; অন্য জন নারী বয়েসে সাত বছরের বড়, ধর্মতত্ত্ব ও কলাবিদ্যার ছাত্রী সেনিতা ন্যাটহর্স্ট। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় কাব্যগন্থ “গোপন ভূমি”-সেখানে তাঁর কবিতার স্থাপত্য দৃঢ়তর, প্রকাশভঙ্গী দ্বিধাহীন, কিন্তু কন্ঠস্বর বিষন্ন ও নিরানন্দ। বিষয় বস্তুতে ফ্রয়েডের প্রভাব লক্ষ্য করার মতো-তিনি মানবচেতনার অতলে যেতে উৎসুক। ঈশ্বর ভাবনা খানিকটা অপসৃত তবে রেশ থেকে গেছে তার আনুষঙ্গিকে পাপবোধের। কবিতাগুলির শৈলিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব আইসল্যান্ডের প্রাচীন সাহিত্যের, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় “এডা”র (Edda)।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে কবি যোগ দিলেন র্ক্লাটে (clarte) নামে এক আর্যবাদী, বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী ও ধর্মবিরোধী ছাত্র সংস্থায়। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন তাঁর মানসিকতায় এবং চিন্তাভাবনায় এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখে। তখন ইয়োরোপ সুখর শান্তির আশায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধতায় দুই মহাযুদ্ধের মধ্যে সেই টালমাটাল সময়। সমকামীতার অপরাধবোধ কাটিয়ে কবি হতে চাইলেন স্বাভাবিক ও প্রথাসিদ্ধ। অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা যা করে থাকেন, তিনিও তার থেকে আলাদা হবেন না। ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্বে ও সংকটে কেউ কেউ হয়ে যান নীরব, কিন্তু ক্যারিন হলেন মুখর-ডায়েরির পাতা ভরে উঠলো টাটকা নতুন কবিতায়। ধর্ম, সমাজ ও নিয়মের নিগঢ় থেকে তিনি মুক্তি পেতে চান। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হল তৃতীয় কাবগ্রন্থ “ভিটেমাটি”।
কবিতাগুলির মৌলিকত্ব এবং অভিনবত্ব দেখে আকৃষ্ট হলেন ক্ষিনল্যান্ডের সুইডিশ ভাষার শীর্ষস্থানীয়া ও অকালমৃতা কবি এডিথ সোডারগ্রান (১৮৯২-১৯২৩) এর প্রিয় বান্ধবী সহচরী হেগার ওলসন (১৮৯৩-১৯৭৮)। তিনি স্থানীয় জনপ্রিয় সংবাদপত্রে লিখলেন ”সুইডিশ কবিতায় নবীনতম কন্ঠস্বর” নামে প্রবন্ধ। তাঁর মতে গ্রন্থটি অসাধারণ শুদ্ধতার কবিতা-ডয়লেশহীন ও আবেগহীন, সব সময় যাত্রার জন্যে প্রস্তুত; তাতে ভেজাল নেই, দ্বিধাদোলাচল ভাব নেই - অনুপ্রানিত, সাহসী কবিতা - “ Swallow – that is perhaps the word for Karin Boye’s poetry . It is not strong like the eagle; its wing beat does not have the breadth and boldness-but neither does it belong to the grey and frittering breed of “sparrows” এই আলোচনা ও প্রশংসা একদিকে যেমন কবিমহলে প্রতিষ্ঠা এনে দিল তাঁকে, অন্যদিকে বাড়ালো তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং সঠিক পথে এগিয়ে চলার সাহস।
১৯২৭ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু; পরের বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি ফিরে এলেলন স্টকহোমে- তারপর নিয়মিত মেলামেশা ও সাহিত্য আলোচনা স্থানীয় কবিদের সঙ্গে। ক্লারটের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় হ’ল এবং এবং তিনি তাদের সংস্থার প্রকাশিত সাহিত্যপত্রটির সম্পাদনার ভার নিলেন। লেসবিয়ান যৌন সম্পর্ক বজায় থাকলো তাঁর তবে সামাজিক সুবিধের জন্যে ১৯২৯ সালে তিনি আইনগত বিবাহ করলেন সতীর্থ বামপন্থী কবি লিয়েফ বিয়র্ককে; তিন বছর সববাস করলেন তাঁর ’কাগজের বৌ’ হিসেবে। এই সময় তার প্রেমিকা ছিলেন বিখ্যাত সুইডিশ কবি গুনার একেলফ (১৯০৭-১৯৬৮) এর পত্নী গুনেল বার্নাস্ট্রম। পরে দুজনেই নিজ নিজ বিবাহবন্ধন ত্যাগ করে এক সঙ্গে ঘর বাঁধেন। স্বামীর প্রতি ক্যারিনের ছিলো আবেগতাড়নার ও তীব্রতার অভাব; অনিয়মিত হলেও যৌনসম্পর্ক ছিলো- কিন্তু মানসিক বন্ধন ছিলো না। উভযোনী সম্পর্কের মানসিক দ্বন্ধে তিনি তীব্র অবসাদ রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৩১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রিয় বন্ধুরা পরামর্শ দেন বার্লিন শহরে গিয়ে মন:সমীক্ষণ (সাইকোঅ্যানালিসিস) এর চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে।
১৯৩২ সালে জানুয়ারি মাসে কবি বার্লিনে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে একজন পুরুষ মন:চিকিৎসক, কিন্তু দুমাসের অসহ্য মানসিক যন্ত্রনার পর কোন সুফল না পেয়ে একজন নারী চিকিৎসকের কাছে যান। তাতে খানিকটা সুরাহা হয়। প্রথম জন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন রুগির সম্পর্কে “-এনার ক্ষেত্রে কোন ভালো ফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইনি আর দশ বছর নিজেকে বাঁচতে দেবেন কিনা বলা মুশকিল।”
মানসিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতে তিনি লেগে থাকেন নিয়মিত গদ্য রচনায়। আত্মজৈবনিক উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বোঝাপড়া করতে চান তাঁর মনের অবচেতনার গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে। সমাজে নারী পুরুষের অবস্থান ও তার জটিল মানসিক আন্ত:সম্পর্ক তাঁর বিষয়বস্তু। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “আস্টার্টে” (Astarte)–গ্রিক পুরাণের উর্বরতা, যৌনতা সামরিক বাহিনীর আরাধ্য দেবীর নামে। প্রভাবময়ী ও শক্তিশালী নারীচরিত্রের উপাসনায় ক্ষীণজীবী দুর্বল পুরুষ চরিত্রেরা। ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয় আত্মজৈবনিক উপন্যাস “প্রতিভার জাগরণ”-নারী পুরুষ সম্পর্কের জটিল সন্দর্ভ। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস “সংকট” এর মূল চরিত্র তিনি নিজে: ধর্ম বিশ্বাস ও তার কঠিন অনুশাসন বনাম যৌবনজ্বালা এবং নারী শরীরের প্রতি তীব্র কামনা। এক সমালোচকের মতে- ’যিশু ও যৌনতার পুতুল খেলা’। চতুর্থ উপন্যাসে (“অতি অল্প” প্রকাশ ১৯৩৬) আবার ফিরে আসেন নারী পুরুষের মানসিক ও যৌন সম্পর্কের বিশদ বিশ্লেষণে। প্রায় এক নি:শ্বাসে লেখা এই চারটি উপন্যাসে ফুরিয়ে যাবার আগে নিজেকে প্রকাশ করবার অন্তহীন স্পৃহা চোখে পড়ে।
বার্লিন বসবাসের সময়টি অসম্ভব ফলপ্রসূ কবির জীবনে। এরিক মেসটারটন (১৯০৩-২০০৪) নামে এক সতীর্থ কবির সঙ্গে যৌথভাবে একটি নতুন আভাঁ-গার্দ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করলেন, টি এস এলিয়ট সম্পাদিত ”ক্রাইটেরিয়ন” পত্রিকার আদর্শ অনুসারী কাগজটির নাম দিলেন “স্পেকট্রাম”। সুইডেনের আধুনিক কবিতার দিশারী এই কাগজটি। সম্পাদকদ্বয় ছাড়াও গুনার একেলফ, হ্যারি মার্চিনসন এবং সুইডেনের অন্যান্য আধুনিক কবিদের রচনা সেখানে প্রকাশিত হতে থাকলো নিয়মিত । ক্যারিন সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করলেন এলিয়টের “পোড়ো জমি” ও অন্যান্য যুগান্তকারী কবিতা - এলিয়টকে অনুসরণ করে তৈরি হল নতুন কবিতা আন্দোলন। এছাড়াও ইয়োরোপের সুররিয়ালিস্ট কবিরাও সেখানে নিয়মিত অনূদিত ও আলোচিত হলেন।
বার্লিনে এসে তাঁর প্রেমযমুনাতেও নতুন জোয়ার দেখা দিল। বয়েসে বারো বছরের ছোট ইহুদি-জার্মান মহিলা মার্গো হেনেল দেখা দিলেন তাঁর নতুন দয়িতা রূপে। তাঁর বাকি জীবন কাটবে এই সহৃদয়া রমনীর সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের কাছে তাঁর পরিচয় দেবেন “আমার স্ত্রী” বলে। ১৯৩৪ সালে এই দম্পতি স্টকহোমে ফিরলেন এবং দু-কামরার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনে ঘর বাঁধলেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হল তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “বৃক্ষটির জন্যে”-সমালোচনা হল ভাল-খারাপ মেশানো অনেকে দেখলেন পুরানো থিমের ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্ত; অন্যেরা ভাবলেন প্রথাসিদ্ধ কবিতাশৈলি ত্যাগ করে মুক্তছন্দে উঠে আসা ঠিক হয় নি; যিশুর অনুষঙ্গ বাদ দেওয়াকে স্বাগত জানালেন অনেকে; কিন্তু তিনি সরে আসছেন বামপন্থা থেকেও– দেখে অনেক অনুরাগী হতাশ। কবির মতে, পুরানো কাব্যভঙ্গী ত্যাগ করলেই কবিতার সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব। জীবিত অবস্থায় এটি কবির অন্তিম কাব্যগ্রন্থ।
১৯৩১ সালে কবি গিয়েছিলেন রাশিয়া ভ্রমণে। স্তালিনের কঠোর অনুশাসনে শাসিত সোভিয়েত দেশ অসহ্য মনে হয়েছিল তাঁর। তখনও জনসমক্ষে আসেনি নিপীড়নের বা তাঁর যৌথ খামারের কুকীর্তিগুলির কথা। কিন্তু তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদী জার্মানির সঙ্গে বলশেভিক রাশিয়ার কোন মৌল তফাৎ খুঁজে পান নি। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে বিষয়টি ঘোরাফেরা করে তাঁর মানসে। নতুন একটি উপন্যাসের রূপ নেয়–“ক্যালোকেন” (”Kallocain”) প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) রচিত ”১৯৮৪” (প্রকাশ ১৯৪৯), অলডাস হাক্সলি (১৮৯৪-১৯৬৩) রচিত ”সাহসী নতুন পৃথিবী” (প্রকাশ ১৯৩২) অথবা ইয়েডগেনি জামিয়াটি (১৮৯৪-১৯৩৭) রচিত “আমার” (রচনা ১৯২১) মতন কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাসের সঙ্গে তা তুলনীয়। রাষ্ট্রীয় রসায়ন কারখানার বিজ্ঞানী লিও ক্যাল একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যেটি খেলে মানুষ আর মিথ্যে কথা বলবে না। ভবিষ্যতের কোন এক যুগে কাহিনীর ঘটনাকাল যখন রাষ্ট্রের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা এবং নিয়মিত মগজ ধোলাই চলে সাধারণ মানুষের। পাঁচশো পাতার বেশি দীর্ঘ এই উপন্যাসটি তাঁর সর্বাধিক পরিচিত রচনা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত।
এই সময়ে তিনি কবিখ্যাতির শীর্ষে এবং উপন্যাসিক হিসেবেও জনপ্রিয় অথচ তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়ছে ব্যক্তিগত জীবন। সংবাদ পেলেন তাঁর কৈশোর বান্ধবী ও প্রেমিকা অনিতা ন্যাটহর্স্ট ত্বকের দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত; ডাক্তারের বিধান অনুযায়ী তাঁর শরীর কুরে কুরে খাবে সেই ব্যাধি। তিনি গেলেন বন্ধুর সেবা করতে। বর্তমান প্রেমিকা ও প্রাক্তন প্রেমিকার দ্বন্দ্বে পীড়িত তাঁর মন। মার্গো মানসিকভাবে পুরোপুরি তাঁর ওপরে নির্ভরশীল। অন্যদিকে মা নিয়মিত চাপ দিয়ে যান সমকামীত্ব ত্যাগ করে “স্বাভাবিক” জীবন যাপনের জন্যে। হতাশা ও বিষাদ অসহ্য হয়ে দাঁড়ালো শেষ পর্যন্ত- তলিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত ১৯৪০ সালের বসন্তে।
১৯৪১ সালের ২ শে এপ্রিল তিনি ছিলেন আলিঙসাস শহরে বান্ধবী অনিতার গৃহে; সেদিন তিনি একবস্ত্রে ঘর ছাড়লেন, হাতের মুঠোয় কেবল এক শিশি ঘুমের বড়ি। হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলেন শহর সন্নিহিত অরণ্যে আর ফিরলেন না কোনদিন। পুলিশ চিরুনী তালাশ চালালো, কিন্তু খুঁজে পেল না তাঁকে। কয়েকদিন হয় এক পথচারী সন্ধান দিলেন তাঁর মৃতদেহের। সেদিন এপ্রিল ২৭-শহরের উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলে একটি বড় পাথরের আলিঙ্গনে শায়িতা তিনি - পাথরটি এখন এক পুণ্য মেমোরিয়াল, কবিতা প্রেমীদের তীর্থস্থান। এক মাসের ভেতর আত্মহত্যা করলেন মার্গো ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ করে, খুলে দিলেন গ্যাসের লাইনটি। ওই বছর আগস্ট মাসে আরো দুটি মৃত্যু সুইডেনের মালমো শহরে; প্রেয়সী অনিতার এবং কলকাতায় তাঁর কৈশোরের প্রিয় কবির।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি তৈরি করছিলেন নতুন কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। ১৯৪১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল সেই অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি এবং আরো কিছু অগ্রন্থিত কবিতা। “সপ্ত মৃত্যুকল্প পাপ” গ্রন্থটিতে তাঁর শেষ জীবনের মনোবিকলন ও বিষাদের ছাপ স্পষ্ট।
তাঁর প্রথম প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থটি সুইডিশ ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। মার্গারেট আবেনিয়াস রচিত গ্রন্থটির নাম “শুদ্ধতায় আক্রান্ত কবি”- এই নিবন্ধের নামটিও তার অনুসারী। গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। ২০০০ সালে মহাসমারোহে পালিত হয়েছে তাঁর জন্ম শতবর্ষ, সেই উপলক্ষ্যে নতুন তথ্যসমৃদ্ধ আরো একটি জীবনী রচনা করেছেন কামিলা হামারস্ট্রম এবং উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটির নতুন নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে।
খ্যাতনামা ব্রিটিশ অনুবাদক ডেভিড ম্যাকডাফ (১৯৪৫) ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ক্যারিন বোয়ি’র কবিতা সমগ্রের টানা কমপোজে পাঁচটি গ্রন্থ, দীর্ঘ ভূমিকাসহ ১৮৪ পৃষ্ঠা; কবিতার সংখ্যা ১৭৬; প্রকাশ করেছেন ব্রিটেনের রাডেক্স বুকস প্রকাশনা সংস্থা। এই নিবন্ধের অনেক তথ্যই সেই গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
আমি করতে চাই মোকাবেলা…
অস্ত্র-হাতে বর্মে-ঢাকা এসেছিলাম আমি
গর্জাতে-গর্জাতে
ঢালটা আমার ছিল ঢালাই-করা
ভয়ে ও লজ্জাতে।
ছুঁড়ে ফেলতে চাই এ-তরবারি
বর্শা খরতর।
এমন কঠিন রণসজ্জায় আমি
হ’য়ে গেছি বরফ।
দেখেছি আমি শুকিয়ে-যাওয়া বিচিরা অবশেষে
হয়েছে অঙ্কুরিত।
দেখেছি আমি দীপ্ত শ্যামলতা
ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।
লোহার চেয়ে অনেক শক্তিশালী
প্রাণের সজীবতা,
এই পৃথিবীর গভীর থেকে প্রতিরক্ষাহীন
উঠে এসেছে তা।
ফাগুন জাগে তুহিন মাঘে, যেখানটিতে জ’মে
ছিলাম এতদিন।
আজকে আমি প্রাণ-বাহিনীর করব মোকাবেলা
অস্ত্রশস্ত্রহীন।
(I Want to Meet…)
ইবলিস
আমাকে চালিয়ে নিচ্ছে একটা সাপের চাউনি, কট্টর, নিষ্ঠরু -
বহু দূর থেকে সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ঠায়,
আমার কাছের থেকেও কাছের প্রতিটা কদম পড়ে তার ইচ্ছায়,
তার শাসনের, ত্রাসনের কাছে কয়েদি আমি, সে ক্রূর
জিঞ্জিরে বাঁধে আমার অভিপ্রায়…
দিয়েছে কে এই সাপটিকে তার ভয়াল সু-ঠাম তথা
অতল-আকর্ষণ,
মরহুম-মধুরতা?
কে দিল এমন আতঙ্কে পুরে কসাইয়ের হর্ষ?
কালো ও গোপন সুখের মতন হাতছানি দেয় তো তা!
হয়তো কোথাও আবে-হায়াতের ঝরনাগুলির তীরে
যেখানে সকল ঘোমটারা খুলে যায়,
ইবলিস এসে মুখোমুখি হবে কোনো নয়া চেহারায়।
অরেরে অশুভ, তুই বিধাতারই ছায়া এক শুধু কি রে?
তুই কি রে তার রাতের যমজভাই?
(The Corrupter)
বিশ্ব-হৃদয়
বলো, কোনখানে পুড়ছে বিশ্ব-হৃদয়,
আগুন -ভরা হৃদয় জগতের?
ভারি ও খরখরে, প্রাগৈতিহাসিক কয়লা এর বাসভূমি :
নিকষ আঁধার, নিরেট নিশীথ, কেয়স১।
খোঁজো সেখানে!
কেননা আগুনের সে-ই তো ধর্ম :
দুশমনের লড়াইয়ে বলীয়ান-
নিজেই এক লড়াই, এক গনগনানো লড়াই
আর কোনোই ধর্ম এর নাই।
এবং বিজয়? আঁধার যখন অগ্নিশিখায় লীন?
জয় কি মরণ?
অর্থহীন প্রশ্ন আর অর্থহীন ভয়!
এই বিশ্বের হৃদয় আগুন ,
আগুন শুধু করতে চায় জয়।
(The World’s Heart)
১ কেয়স (Chaos) : প্রধানতঃ (সক্রেটিস-পূর্ব) গ্রিক কজমোগনিতে সুবিন্যস্ত বিশ্ব সৃষ্টির আগের অবয়বহীন, রূপহীন বস্তু উপাদানের সর্বব্যাপী বিস্তার।
পাথর
ভারি পাথরের আত্মা ঈশ্বর দিলেন আমাদের।
তারপর সমুদ্রতীরে আমরা দাঁড়ালাম,
যেখানে লাফায় রোদ, নাচে ফেনা, রাতে ডানা ম্যালে
সিন্ধুচিল।
খোলামুকচির মতো ছুঁড়লাম পাথরগুলি, মরণ খেলায় যেন। কেননা কিছু তো
তোমার করা-ই লাগবে পাথরের সাথে।
ছেঁচড়ে গেল মাটি তারা অর্ধবৃত্তাকারে, পিছলে পার হ’য়ে গেল
অথৈ পাথার : যেন হাওয়া!
আর কী সুখের ঘুম আমাদের : পাখাদের ছোঁয়ায়, এবং পাখিদের
জলের উপরে ছলচ্ছলাৎ ছোটায়।
(The Stones)
পতনোন্মুখ শুকতারা
‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্,
বেয়াদব শুকতারা!
সানন্দে দেব তোকে আঁধারের বর,
এই দুনিয়ায় প্রিয় তুই সবচেয়ে।’
‘পড়্,’ বললেন প্রভু ‘তুই খ’শে পড়্,
জ্বলন্ত নীল শিখা!
জ্বল ধিকিধিকি, পাতালে তুলতে ঝড়,
কালো স্ফটিকের শহর এক নে বানিয়ে।’
‘পড়্, বললেন প্রভু, ‘তুই খ’শে পড়্!
অশুভের উদ্গাতা,
শিগগিরই ফের খুঁজবি কি তুই ঘর?
আমার বুকের সবচেয়ে কাছে কে এ!’
(The Falling Morning Star)
ঐ প্রহর
কোনো দমবন্ধ গ্রীষ্মরাতের আকাশ
পৌঁছাবে না শাশ্বতের এতটা ভিতরে,
কোনো বিল, কেটে গেলে ভোরের কুয়াশা,
বুকের মুকুরে অত নিস্তব্ধতা দেখাতে পারবে না
যত পেরেছিল ও-প্রহর–
যখন একাকিতার সকল সীমানা মুছে ফেলা হয় আর
চোখগুলি স্বচ্ছ হ’য়ে যায়
আর কণ্ঠস্বরগুলি বাতাসের মতো সাদাসিধা
আর, কোনোকিছু নাই লুকাবার মতো-
তখন আমার ভয় কীসে?
আমি আর হারাব না কখনও তোমাকে।
(That Hour)
রাতের গভীর চেলো
রাতের গভীর এই চেলো
তেপান্তর পার ক’রে ছুঁড়ে দেয় আঁধার রভস।
বস্তুজগতের ঝাপসা ছবিগুলি ক্রমশঃ মিলায়
বহির্জগতের নানা আলোকধারায়।
আদিগন্ত ভাতিমান্ সাগর-জোয়ার
ঢেউয়ের উপরে ঢেউ ভেঙে চলে রাত্রিনীল অনন্ত-অবধি।
তুমি! তুমি! তুমি!
ওজনবিহীন, ভোল-পাল্টানো পদার্থ, তুমি স্পন্দনের স্ফোটমান ফেনা,
উঠে-যাওয়া, গা-গোলানো স্বপ্ন এক আরোও স্বপ্নের,
চোখ-ধাঁধানো সাদা!
আমি এক সিন্ধুচিল, জিরানো, ছড়ানো ডানাটিতে
সৈন্ধব-লবণ তুষ্টি পান করি
যতদূর জানি আমি, তারও পূর্বে আরও,
যতখানি চাই তারও সুদূর পশ্চিমে,
আর পাখা ঘ’ষে যাই ব্রহ্মাণ্ড-হৃৎপিণ্ডে-
চোখ-ধাঁধানো সাদা!
(The Night’s Deep Violoncello)
ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা
রৌদ্রদীপ্ত শীতের বনের মতো ব্যাপ্ত হ’ল একটা নিস্তব্ধতা।
কীভাবে প্রতিজ্ঞা হবে দৃঢ় আর আমার রাস্তাটা শুনবে কথা?
আমি ব’য়ে চলছিলাম নকশা-কাটা বাটি এক টুংটুং কাচের।
তখন পা-গুলি খুব সতর্ক হ’য়ে গেল, খাবে না হোঁচট।
হাতেরাও হুশিয়ার, তিলেক কাঁপবে না তারা, লাগাবে না চোট।
আর আমি গলা-জল- বল মাগি ঠুনকো এক তৈজসের কাছে।
(A Stillness Expanded)
তুমি বিচি
তুমি বিচি, আর আমি মাটি।
তুমি শোও আমার ভিতর।
তুমি সেই ঈপ্সিত সন্তান,
আমিই তোমার জননী তো।
ও পৃথিবী, ঢালো উষ্ণতা!
ওগো রঙ, দাও সারাৎসার!
অজানা শক্তিটা তত চায়
এ-জীবন যতটা আমার।
এই তপ্ত, মত্ত ঢেউখানি
মানে না কঠিনতম বাঁধ,
চওড়া হ’য়ে চলে এর পথ,
সব ভেঙে বেরয় অবাধ।
তাই এ আহত ক’রে চলে
আমার সজীব দেহভূমি :
বড় হচ্ছে, ভাঙছে এ আমাকে,
ও প্রিয় আমার, এ যে তুমি!
(You Are the Seed)
মানুষের বহুত্ব
সুন্দর- বলিষ্ঠ দেহ, যেটি
শক্ত ঢেউ কেটে ঢোকে জলে,
সুন্দর- শিশুর সুখী ঘুম,
খেলা-শেষে, মায়ের আঁচলে।
সুন্দর- কাজের দিন এক
-দোয়া প’ড়ে ছেঁড়া পরোটায়-
আর সে-প্রহর, ভূত ভাবী
একপাত্তর মদে যে ভোলায়।
দ্যাবাক্ষমা-মাতা ও অসীম
ক্ষমতায় জন্ম আমাদের,
আলো আধাঁরের ঈপ্সা, কেউ
জানে নাই নামটিও এর।
অনেকের মাঝে একজন
আমাদের কব্জা না-করুন,
হলেনই-বা দেবতা সে-নারী,
হলেনই-বা ঐশ্বর্য -অরুণ।
আমাদের ভিতরে বহুত্ব
হাতড়ে হাতড়ে সংহতি খোঁজে।
সংগ্রাহী আতশকাচ, এর
হ’তে আমাদের জন্ম যে।
মানুষের সংগ্রাম মহৎ,
মহৎ উদ্দেশ্যটুকু তার কিন্ত
মহত্তর সে নিজেই
শিকড় শাশ্বত-রাতে যার।
তো দাও, গোপন এক ঘর
গ’ড়ে তাতে জ্বালাব আগুন,
কাল ভোরে বলব, হে অচেনা
দেবতা, এ-বেদিতে জাগুন!
(Man’s Multiplicity)
খারাপ মেয়ের কাছ থেকে
আশা করি তুমি কাটাচ্ছ এক বিচ্ছিরি অসময়।
আশা করি তুমি আমার মতোই জেগে আছ নির্ঘুম,
এই আনন্দে লাফিয়ে উঠেছ এবং পরক্ষণে
উদ্ভ্রান্ত ও শঙ্কিত আর বেদনায় গুমসুম।
আর সহসাই তড়িঘড়ি তুমি চাইবে ঘুমিয়ে যেতে
থামিয়ে দিয়েছ যেন বনব্ন-ঘোরা কোনো লাট্টুকে।
আশা করি, যত সোজা ভেবেছিলে, কাজটি তত কঠিন…
আশা করি যাতে একটা পলকও না পড়ে তোমার চোখে।
(From a Bad Girl)
জলাভূমির পর্যটক
আধাঁর আমার ভূমি।
মুসাফির, কে গো তুমি ভাই?
জলার, জংলার পর্যটক!
অন্ধ হ’য়ে শুয়ে আছে ভূমি।
মুসাফির, কে গো তুমি ভাই?
টের পাই ভ’রে উঠছে পদচিহ্নগুলি
আমার কলজের রক্ত দিয়ে।
চিনতে চাই হাতগুলি তোমার।
তারা কি আগুন যারা জ্বালায়- আমাকে
দাও, বুঝতে দাও।
চিনতে চাই হাতগুলি তোমার।
ঠাণ্ডা পাতার মতো হয় যদি তারা
তাদের বুলিয়ে নাও গাছের জখমে,
মুর্দাটিকে জেগে উঠতে দাও।
(Marsh Wanderer)
চলিষ্ণু
পুরোগামী নয় তৃপ্তির দিবসেরা,
পিপাসার দিন, সে-ই তো সবার সেরা।
মোক্ষ, অর্থ আছে আমাদের পথের,
কিন্তু চলা-ই শ্রমের লক্ষ্য বটে।
আখেরি মোকাম আরাম-ঘুমের রাত,
আগুনের ওম্, গোগ্রাসে-গেলা ভাত।
যেসকল ঠাঁই ঘুমায় কেউ সকৃৎ,
স্বপ্ন গীতল, নিরুপদ্রব নিদ।
গাড়ো, তাঁবু গাড়ো! ঐ জাগে নবদিন।
আমাদের অভিযাত্রা অন্তহীন।
(On the Move)
এ-বিশ্ব সপন এক…
এ-বিশ্ব সপন এক, ঘুমে লীন কোনো দেবতার,
উষসীর শিহরন মুড়ে থাকে যার আত্মাটিকে।
জগৎ ছিল না যবে, তার গতকালের স্মরণ
পিছু ধাওয়া করে তার,
লাগায় চমক।
সে- যার সত্তার অংশ আমরা নই মোটে,
মোলাকাত হ’য়ে যায় রাস্তার মোড়ে তারই সাথে,
সে তার নিশ্বাসে ছাড়ে কী এক আতঙ্ক যেটা নয় আমাদের,
সুদূর সীমার পার থেকে চ’লে আসে,
ভিন্ন কানুনে-বাঁধা অন্য নানা জগতের থেকে।
ঘুমাও, স্বপ্নের সাজা শেষ-হওয়া-তক,
কিংবা, সৃষ্টিকর্তা, তুমি জেগে ওঠো দিনের আলোয়,
আমাদের সত্য ক’রে তোলো!
(The world is dreamt…)

……..

……
……







আইসল্যান্ডের মানুষেরা প্রবল কবিতাপ্রেমী—শত দুর্যোগেও তাঁরা কবিতার সঙ্গ ছাড়েন না। সেখানে কবিতার রাজত্ব রাজদরবারে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-উপকূলে, ক্ষেতে-খামারে, স্কুলে-কলেজে, সংবাদপত্রে, পত্র-পত্রিকায় ও মানুষের মনে। জাতীয় মর্যাদাহানি, নৈতিক অধঃপতন, শাসকের অত্যাচার-অনাচার, ডেনমার্কের সম্রাটের ঔপনিবেশিক শাসন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, মহামারী, মড়ক, প্লেগ—সব হাসিমুখে মেনে নেন সেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেষপালক ও জেলেরা—সুললিত ছন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। গত দু-তিন বছরে পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক দেশগুলির অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে আইসল্যান্ডে চলেছে চরমতম অর্থনৈতিক সংকট; দেশটি প্রায় দেউলিয়া—বড় বড় তিনটি ব্যাংক ভূপাতিত; কিন্তু থামেনি কবিতার চর্চা। পুরোদমে চলেছে কবিতা পড়া, কবিতা লেখা, কবিতাপত্র ও কবিতাগ্রন্থের প্রকাশ।




