Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Tuesday, April 10, 2012

ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণ

by আমার মন

ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণ মানে হচ্ছে মানুষের আচরণ যেখানে একজন মানুষ আরেকজনের মাংস ভক্ষণ করে। নিজের স্বজাতিকে চিবিয়ে খাওয়া। অন্য প্রাণীর মাংসের মত। মানুষের মাংস ভক্ষণ।
তবে এর অর্থ বিবর্ধিত করে প্রাণীতত্ত্বে বলা হয়েছে কোন প্রাণীর আচরণ যেখানে সে তার নিজের প্রজাতির মাংস আহার করে এবং এটা তার সহযোগীও হতে পারে। ক্যানিব্যালাইজ শব্দটি যা ক্যানিবালিজম থেকে এসেছে এর মানে হলো সামরিক অংশের পুনোৎপাদন। ক্যানিবালিজিমের চর্চা হয়েছে লিবিয়া ও কঙ্গোতে বেশ কিছু যুদ্ধে। করোওয়াই হলো এমন একটি উপজাতি যারা এখনো বিশ্বাস করে যে নরমাংস ভক্ষণ সংস্কৃতিরই একটি অংশ। কিছু মিলেনেশিয়ান উপজাতিরা এখনো তাদের ধর্মচর্চায় ও যুদ্ধে এই চর্চা করে। ক্যানিবালিজিম বিদেশী প্রভুদের যুক্তিকে শক্ত করে দাসত্বের পক্ষে। আর নিরব নরমদের উপর অন্যরকম,অভিনব ভাবে ধ্বংস করার পদ্ধতি।

ইতিহাস
৭ম শতকে মুসলিম-কোরাইশদের যুদ্ধের সময় ক্যানিবালিজমের ঘটনা ঘটে। ৬২৫ সালে উহুদের যুদ্ধের সময় হামযা ইবনে আবদু মুত্তালিব নিহত হলে তার কলিজা ভক্ষণ করেন কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হার্বের স্ত্রী হাইন্ড বিনতে উটবাহ।পরে তিনি মুসলমান হয়ে যান ও মুয়াইয়াহ মা হন যিনি ইসলামিক উম্মাইয়াদ খেলাফতের প্রতিষ্ঠা করেন। পরে মুয়াইয়াহ একজন অগ্রহণযোগ্য নেতাতে পরিণত হন ও একজন নরমাংসভোজীর জন্ম দেন। জেরুজালেমেও কিছু ঘটনা ঘটে।হাঙ্গেরীর মানুষরা মানুষের মাংস খায় যারা ১০ম শতাব্দীতে মাত্র মূর্তিপূজক থেকে খ্রিস্টানে পরিণত হয়। সেখান দিয়ে ক্রুসেডাররা তাদের পবিতে ভূমি জেরুজালেমের দিকে এগিয়ে যেত।আসলে ইংরেজি শব্দ ওগি যার মানে রাক্ষস তার উৎস কিন্তু এই হাঙ্গেরীর ফরাসী শব্দ হনগি।
বিভিন্ন জংগলে জংলীরা ভ্রমণকারীদের ধরে এনে খেতো,বা মমি করে রাখতো যা তাদের কাছে মহামূল্যবান ওষধ হিসাবে গণ্য হত।

নরমাংস ভক্ষণের কারণ
নরমাংস ভক্ষণের কারণগুলোর মাঝে রয়েছে:-<br /> সাংস্কৃতিক রীতি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা
চরম পরিস্থিতিতে গ্রহণ করা হয় যেমন দুর্ভিক্ষের সময়
মানসিক সমস্যার কারণে বা সামাজিক আচরণের বিচ্যুতির কারণে ।

প্রাথমিকভাবে নরমাংস ভোজের সামাজিক আচরণ ২ প্রকার: প্রথমত, একই সম্প্রদায়ের মানুষের মাংস খাওয়া, অন্যটি হচ্ছে সম্প্রদায়ের মানুষের মাংস খাওয়া। এই অভ্যাসে ২ ধরণের নৈতিক পার্থক্য আছে। একটা হচ্ছে একজনকে হত্যা করা তার মাংস খাওয়ার জন্য ও আরেকটি হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে মৃত মানুষের মাংস খাওয়া।
আর জরুরী অবস্থা বা দূর্ভিক্ষ,মহামারি,অকাল মৃত্যুতে মানুষ অন্য মানুষের মাংস খেতে বাধ্য হয়।

উদাহরণ-
১৯৪৩ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীর প্রায় ১০০০০০ যুদ্ধবন্ধী সেনাকে রাশিয়ার সাইবেরিয়াতে পাঠানোর সময় তারা ক্যানিবালিজমের আশ্রয় নেয়। কারণ তাদের ক্রমাগত কম পরিমাণের খাবার সরবরাহ ও অসুখে আক্রান্ত হওয়া। মাত্র ৫০০০ জন বন্ধী স্ট্যালিনগ্রাডে পৌছতে সক্ষম হয়।ল্যান্স নায়েক হাতাম আলী নামে একজন ভারতীয় যুদ্ধবন্ধী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিউ গিনিতে জাপানী সেনাদের মাংস খাওয়ার কথা বলেন। তারা জীবন্ত মানুষের শরীর থেকে মাংস কেটে নিত ও ঐ ব্যাক্তিকে তারা নালায় ফেলে মারত। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানী সেনা চিচিজিমাতে পাঁচজন আমেরিকান বিমান সেনাকে হত্যা করে খেয়ে ফেলে।

ড্রেঞ্জেল ভারগাস নামের ভেনেজুয়েলার একজন ব্যাক্তি ২ বছরে কমপক্ষে ১০ জন ব্যাক্তিকে খুন করে খেয়ে ফেলেন যাকে ১৯৯৯ সালে আটক করা হয়। জেফরি ডাহমার নামের আমেরিকান একজন ব্যাক্তির বাসায় মানুষের হাড় ও মাংস পাওয়া যায়। তাকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৯১ সালে।
২০০১ সালের মার্চে জার্মানিতে আরমিন মাইভাস ইন্টারনেটে একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ৩০ বছরের সুঠামদেহী জবাইযোগ্য ও আহার হতে চাওয়া মানুষের সন্ধান চাইছিলেন। বার্ন্ড জুর্গেন ব্রান্ডিস নামের একজন এতে সাড়া দেন ও খুন হয়ে যান। পরে আরমিন মাইভাসকে আটক করা হয়। রামেস্টেইন ব্যান্ডের মেইন টেইল ও ব্ল্যাড বাথ ব্যান্ডের ইটেন গান এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত। পিটার ব্রায়ান নামের একজন ব্রিটিশকে ইস্ট লন্ডনে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয় যিনি তার বন্ধুকে খুন করেন ও খেয়ে ফেলেন।
মুসলিম ভ্রমণ কারি ইবনে বতুতা মানুষ খেকো জংলিদের হাতে পরে ছিলেন কিন্তু ভাগ্য গুনে বেঁচে আসেন।

বিপদে পরলে মানুষের দ্বারা সব কিছুই সম্ভব হয়। নিজের শরীরের মাংস খাওয়ার কথাও শুনা যায় বিভিন্ন সময়।
১৮০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতিরা নর্থল্যান্ডে দ্যা বয়েড নামের একটি জাহাজের প্রায় ৬৬ জন যাত্রী ও ক্রুকে খুন করে ও তাদের মাংস খায়।

ভেবে দেখুন আপনি আর আপনার কয়েকজন বন্ধু হারিয়ে গিয়েছেন দুর সাগরে,যেখানে খাবার নেই,নেই কোন প্রাণ আপনারা ছাড়া। একদিন,দুইদিন করে আপনাদের ক্ষুদার জ্বালা বেড়ে তা এখন প্রকট! আপনার সামনেই আপনার প্রিয় বন্ধুটির লাশ পরে আছে যার দেহের মাংস দেখে আপনার মাঝে এক অস্বাভাবিক ইচ্ছা জেগে উঠলো-ক্যানিবালিজম!!!!
original post
read more

রূপকথার এক অভিশপ্ত রানী... সুন্দরী শ্রেষ্ঠা...

by আহমেদ জী এস
রূপকথার এক অভিশপ্ত রানীর গল্পো......

মিশরের ফারাও সম্রাজ্ঞীদের মধ্যে ক্লিওপাত্রার নাম এবং কাহিনী কমবেশী জানিনা এমোন কেউ সম্ভবত আমাদের মধ্যে নেই । মিশরে জন্ম না হলেও ক্লিওপাত্রা মিশরের ফারাওয়ের রানী হয়েছিলেন , হয়েছিলেন কিংবদন্তী । ক্লিওপাত্রা যতো না রূপে তারো চেয়ে বেশী আলোচিত তার ছলনার জন্যে । কিন্তু কিংবদন্তীর আর একজনের কথা হয়তো আমাদের মনেও নেই যিনি রূপে ছিলেন অদ্বিতীয়া, ক্ষমতায় সর্বোচ্য । প্রায় তিন হাযার তিনশত বছর আগে ইতিহাস যেমন তাকে নিঃশব্দে চাপা দিয়েছে মিশরের বালুরাশির নীচে তেমনি সেইজন আমাদের মনের আড়ালেও চাপা পড়ে আছেন আজো । ক্লিওপাত্রার ও হাযার বছর আগে যিনি ছিলেন “লেডি অব অল ওম্যান”, “লেডি অব গ্রেস” , “লেডি অব অল বিউটি” ।

নামটি তার “নেফারতিতি” ।

পৃথিবী জুড়ে যে ফারাও সম্রাজ্ঞীর প্রহেলিকাময় আবক্ষ মুর্তিটি (বাস্ট) তার মরালী গ্রীবা নিয়ে বিখ্যাত “আইকন” হয়ে আছেন আজো, তিনিই “নেফারতিতি” যার শাব্দিক অর্থ “সুন্দরীতমা এসেছেন” ।

মিশরের ফারাও সম্রাজ্ঞীদের মধ্যে, এমোন কি তখনকার মিশরবাসীদের মধ্যেও তার রূপ ছিলো কিংবদন্তীর মতো । যীশুখ্রীষ্টের জন্মেরও ১৩৭০ থেকে ১৩৩০ বছর আগ পর্য্যন্ত নেফারতিতির ইতিহাস খুঁজে পাওয়া গেছে আর ঠিক তার পর থেকেই মিশরের সব ঐতিহাসিক দলিল, দস্তাবেজ থেকে তার নাম মূছে ফেলা হয়েছে । প্রত্নতাত্বিক জিনিষপত্রে তার আর কোনও চিহ্ন রক্ষিত হয়নি যেমন রক্ষিত রয়েছে অন্যান্য ফারাও আর তাদের সম্রাজ্ঞীদের স্মৃতি ।

কেন ? উত্তর খুঁজছে মানুষ ।

রূপকথার দুঃখিনী রানীর মতো, নেফারতিতি গর্ভে ছয় ছয়টি রাজকন্যের জন্ম দিলেও রাজ্যরক্ষায় কোনও উত্তরাধিকারী রাজপুত্রের জন্ম দিতে পারেননি । ফারাও “আখেনাতেন” ভাবলেন নেফারতিতির গর্ভে আর কোনদিন ভবিষ্যত ফারাওয়ের জন্ম হবেনা তাই পরিত্যাজ্য । রাজার ইচ্ছে, তাই রানী পরিত্যক্ত হলেন । ইতিহাসের করাল গর্ভে নেফারতিতি হারিয়ে গেলেন চিরদিনের জন্যে ।
এ হলো নেফারতিতির রহস্যময় নিরবতার পক্ষে একশ্রেনীর প্রত্নত্বাত্তিকদের বিশ্লেষন ।

কেউ কেউ বলেন, বারোটি বছর ১৮তম ফারাও “আখেনাতেন” আর নেফারতিতির গড়ে তোলা বিশাল ফারাও সাম্রাজ্য “এল-আমারনা” (El-Amarna) শাসন করে নেফারতিতির রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যাওয়া সম্ভবত কোনও কঠিন রোগে তার মৃত্যু । ঐ সময় মিশর জুড়ে যে ভয়াবহ প্লেগ হয়েছিলো তাতেই মারা গেছেন নেফারতিতি ।

কেউ বলেন- না ; নেফারতিতি মিশরীয়দের সনাতন ধর্মবিশ্বাস বাতিল করে সূর্য্যদেবতা “রে” (Re)র পুঁজায় “আতেন” নামে যে সূর্য্যচাকতির পুঁজোকে মিশরবাসীদের জন্যে বাধ্যতামূলক করেন তারই বিষ্যোদগার ঘটে নেফারতিতির মৃত্যুর সাথে সাথে তার সমস্ত মূর্তি, স্তম্ভ, প্রাসাদ অর্থাৎ নেফারতিতির বানানো সকল সভ্যতার চিহ্নকে ধংশ করার মধ্যে দিয়ে । এই ধংশযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন পুরোহিতরা কারন “আতেন” কে পেতে হলে ফারাও আর তার স্ত্রীকে (নেফারতিতি) পুঁজো করাও ছিলো বাধ্যতামূলক এটা তারা মেনে নিতে পারেননি । তাই ইতিহাসে নেফারতিতির কোনও উল্লেখ নেই সেই দিন থেকে, যেদিন তার মৃত্যু ঘটে ।

কেউ বলেন, ১৮তম ফারাও “আখেনাতেন” (যিনি বিখ্যাত কিশোর ফারাও রহস্যময় “তুতেনখামেন” এর পিতা) এর প্রতি প্রজারা সন্তুষ্ট ছিলেননা মোটেও । একে তো পুরোনো ধর্মবিশ্বাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার উপর রাজধানী “মেমফিস” থেকে সরিয়ে মরুভুমির মাঝে বালুর শহর “ আমারনা”য় স্থাপন করেন এবং পরে নিজের নামে “আখেনাতেন” রাখেন । তাই “আখেনাতেন” এর মৃত্যুর সাথে সাথে নেফারতিতির ভাগ্যও নির্নিত হয়ে যায় ।“আখেনাতেন” এর সৃষ্ট সকল কিছু মিশরের বালুতে পুঁতে ফেলার পাশাপাশি নেফারতিতিরও সমাধি ঘটে যায় ইতিহাসে ।

যদিও এসব বিশ্লেষনের জন্যে পর্যাপ্ত প্রত্নত্বাত্তিক নিদর্শন নেই তথাপিও যে কিছু কিছু শিলালিপির ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে নেফারতিতির উপরে লেখা , তা বিশ্লেষন থেকেই এত্তো এত্তো কাহিনীর জন্ম হয়েছে । এ নিদর্শনগুলি আপনি দেখতে পাবেন বর্তমানের “ল্যুভর” আর “ব্রুকলিন” জাদুঘরে ।


।। ব্রুকলিন মিউজিয়ম ।।

মাত্র পনের বছর বয়সে নেফারতিতি বিয়ে করেন চতুর্থ অ্যামেনোফিস (Amenophis IV) মতান্তরে “অ্যামেনহোটেপ”( Amenhotep IV) কে যিনি খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৫৩ অব্দে ফারাও হিসাবে মিশরের সিংহাসনে বসেছেন মাত্র আর নিজের নাম পাল্টে রেখেছেন “আখেনাতেন” ।

।। ফারাও আখেনাতেন ।।

বিশেষজ্ঞরা নেফারতিতির জন্ম এবং তার নিজ দেশটি আসলে কোথায় এ ব্যাপারে দ্বিধা বিভক্ত । কারো সন্দেহ, যেহেতু নেফারতিতি শব্দের অর্থ “সুন্দরীতমা এসেছেন” তাই আদপেই তিনি মিশরীয় নন, তিনি এসেছেন ভিন কোনও দেশ থেকে ।আবার কারো মতে তিনি মিশরেরই বিখ্যাত ব্যক্তি “আই” এর কন্যা যিনি পরে ফারাও ও হয়েছিলেন । জন্ম বা বংশ বৃত্তান্ত যা ই থাক তিনি যে সুন্দরী হিসেবে কিংবদন্তী ছিলেন তাতে দ্বিমত ছিলোনা কারো ।
সুন্দরীদের প্রভাব পুরুষকে যে নাচাতে পারে, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । রাজ্যশাসনে ফারাওয়ের পাশাপাশি নেফারতিতিও সমানতালে রাজ্য শাসণ করেছেন । শুধু তা ই নয়, যে নতুন ধর্ম দু’জনে প্রবর্তন করেছেন তার মধ্যমনি ছিলেন নেফারতিতি । দু’জনেই পুঁজিত হতেন দেবতা আর দেবী রূপে ।
প্রত্নতত্ববিদ আর ঈজিপ্টোলজিষ্টরা থেমে নেই এইসব ইতিহাস উদ্ঘাটনে । তারা “কারনাক” আর “ল্যুক্সর” এর মন্দিরগুলিতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এর স্বপক্ষের নিদর্শন ।

খ্রীষ্টপূর্ব ১৪শ শতকে নিজ রাজত্বকালে আখেনাতেন সূর্য্যদেব আতেন এর উদ্দেশ্যে তার রাজ্যে যে অসংখ্য মন্দির গড়ে তুলেছিলেন, প্রতিহিংসার রোষানলে তা সবই ধংশ করা হয়েছিলো তার মৃত্যুর ঠিক পরে পরেই । কারন এগুলো ছিলো মিশরবাসীর পুরোনো ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন । এই সব ভগ্ন মন্দিরের পাথরগুলি আবার পরবর্তী ফারাওরা ব্যবহার করেছেন নতুন নতুন মন্দির নির্মানে । প্রত্নতত্ববিদ আর ঈজিপ্টোলজিষ্টরা এখোন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন সেগুলোকে, যদি কোনও অজানা তথ্য পাওয়া যায় সম্রাজ্ঞী নেফারতিতির ।
ধারনা করা হয়, প্রাচীনকালের কারনাকের মন্দিরের পূর্বদিকে যে বিশাল প্রবেশপথ ছিলো তার পাশের দেয়ালের পাথরের বর্তমান ধংশাবশেষ থেকে ১০০র মতো শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানের পূর্ণচিত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব । এসব ভাঙ্গা ভাঙ্গা চিত্রে নেফারতিতিকে দেখা যায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যমনি হিসেবে । প্রাচীন মিশরে এ জাতীয় আচার অনুষ্ঠানের ক্ষমতা রাখতেন কেবলমাত্র একজন ফারাও অথবা মিশরীয়দের প্রচলিত বিশ্বাস মতে “ওয়াইফ এন্ড কনসোর্ট অব দ্য গড” ।

এই ফ্রেসকোগুলি স্বাক্ষ্য দেয় , নেফারতিতি নিজেকে একজন ‘দেবী’র পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এমোনকি ফারাওয়েরও সমকক্ষ । একযুগের ও বেশী সময় ধরে নেফারতিতিই ছিলেন প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে সুন্দরী আর ক্ষমতাশালী নারী । যা আর কোনও ফারাওদের স্ত্রীর ভাগ্যে জোটেনি ।

কম্পিয়্যুটার এনিমেশন ।

একটি খন্ডিত পাথরের লিপি উদ্ধার হলে দেখা যায়, সেখানে নেফারতিতির নাম রয়েছে । যেখানে তার নামের পাশে উৎকীর্ন রয়েছে “গ্রেট রয়্যাল ওয়াইফ” শব্দটি যা তার সামাজিক মর্যাদা প্রকাশ করছে । এমোন বেশ কিছু পাথর চিত্রে দেখা যায় নেফারতিতি যুদ্ধরথে চড়ে একটি দন্ড উঁচিয়ে আছেন ।
এ থেকে বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন তিনি ছিলেন “সুপ্রীম অথরিটি অব দ্য ষ্টেট” । অন্য চিত্রে তাকে দেখা যায় তরবারী হাতে মিশরের শত্রুদের নিধনে ব্যস্ত ।এছাড়াও রয়েছে সভ্রান্তদের মাঝে স্বর্নপদক বিতরনের চিত্র । সব মিলিয়ে এসকল “ফ্রেসকো” থেকে যে ছবি পাওয়া যায় তা নেফারতিতিকে চিত্রিত করেছে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা মিশর অধীশ্বরী হিসেবে । এ পর্য্যন্ত মিশরের মাটি খুঁড়ে আর কোনও রাজকীয় মহিলার এমোনতর ছবি পাওয়া যায়নি । কিংবদন্তীর ক্লিওপাত্রাকেও এমোন বেশে দেখা যায়নি ।

এই সব টুকরো টাকরা লিপি থেকে পাওয়া তথ্যে নেফারতিতির সম্পর্কে গল্পের শেষ নেই ।

অনেক বিশ্লেষকেরাই মনে করেন রোগে শোকে নেফারতিতির মৃত্যু হয়নি । বরং এসব চিন্তাকারীদের ধারনা, ফারাও আখেনাতেন এর মৃত্যুর পরে নেফারতিতি চেষ্টা করে থাকবেন রাজ্যকে ধরে রাখতে । তাই তিনি বিদেশী কাউকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যা উৎকীর্ণ আছে একটি পাথরের শিলালিপিতে । শিলালিপিটি পাঠানো হয়েছিলো “হিতিস” সম্রাটের কাছে । শিলালিপিটিতে ফারাওয়ের মৃত্যু সংবাদ উল্লেখের পাশাপাশি একজন রাজপুত্রকে মিশরে পাঠানোর অনুরোধ ছিলো ।“হিতিস” সম্রাট কথামতো একজন যুবরাজকে পাঠিয়েও নাকি ছিলেন যিনি পথিমধ্যে আততায়ীর হাতে নিহত হন । উদ্ধারকৃত পাথর খন্ডের এই লিপির লেখা কাহিনী বা “থিওরি” নেফারতিতির নামের সাথে যুক্ত করেছেন এ ধরনের গবেষকরা । তাদের ধারনা সত্যিকার নেফারতিতির মমি কোনওদিনই খুঁজে পাওয়া যাবেনা । সম্ভবত তার মরদেহকে মিশরের পুরোহিতরা এমোন সমাধিতে সমাহিত করেছেন যা সহজে খুঁজে পাওয়া হবে দুষ্কর ।

কল্পনার ফানুস শেষমেশ ঠেকেছে উর্দ্ধ আকাশে – ঐতিহাসিক দলিলপত্রে নেফারতিতির অনুপস্থিতির পরপরই আর একজনের নাম পাওয়া গেছে “ সামেনখারে” (Smenkhare) যিনি আখেনাতেন এর সাথে একত্রে রাজ্য শাসন করেছেন । প্রাপ্ত কিছু শিলাচিত্রে আখেনাতেনের পাশাপাশি “সামেনখারে” কে ও দেখা গেছে । অনেকেরই ধারনা “সামেনখারে” আর কেউ নন, পুরুষবেশী “নেফারতিতি” যিনি “হাটসেপসুট”(Hatshepsut) এর মতো দীর্ঘকাল অপেক্ষা করেছেন “ফারাও” হতে । “হাটসেপসুট” ছিলেন তৃতীয় “তুথমোসিস” এর প্রধান মহিষী ।
এ ঘটনা আপনাদেরকে মনে করিয়ে দেবে “লেডী ম্যাকড্যালেন” এর কাহিনী । যীশুখ্রীষ্টের সহচরী, মতান্তরে স্ত্রী হিসাবে যাকে অনেকেই ধারনা করে থাকেন । এ্যাঞ্জেলোর আঁকা বিশ্ববিখ্যাত “লাষ্ট সাপার” তৈলচিত্রের সিরিজের কয়েকটিতে যীশুর ঠিক পেছনেই যে কাপড়ে মাথা ঢাকা পুরুষটিকে বারে বারে দেখা গেছে অনেক গবেষক মনে করেন তিনিই “লেডী ম্যাকড্যালেন” । যীশুর কাছাকাছিই ঘনিষ্ট একজন বন্ধুর বেশে ছিলেন যাতে তিনি আমৃত্যু যীশুর সাথে সাথেই থাকতে পারেন । এ আবার আর এক কাহিনী । ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেলেছি হয়তো ।

তাহলে সুন্দরী নেফারতিতি কি চিরকালই রহস্যময়ী থেকে যাবেন ?
না তা হয়নি ।
নেফারতিতির যে সৌন্দর্য্যের কথা আমরা বলি বা দেখি তার অনেকগুলিই এসেছে “এল-আমারনা” য় প্রাপ্ত ধংশাবশেষ থেকে ।বার্লিনের ঈজিপসিয়ান মিউজিয়ামে ১৯২৪ সাল থেকে প্রদশিত “জেরী’স শো” তে নেফারতিতির যে আবক্ষ (বাস্ট) মূর্তিটি দেখা যায় তা শ্রেষ্ঠ শিল্পের এক অপূর্ব নমুনা ।


৩২০০ বছরের পুরোনো এই মূর্তিটি জার্মান আর্কিওলজিষ্ট Ludwig Borjardt ১৯১২ সালের ৬ই ডিসেম্বর “এল-আমারনা”র ধংশাবশেষ থেকে উদ্ধার করেন । মূর্তিটি ২০ ইঞ্চির বেশী লম্বা নয় । এখোন পর্যন্ত আসলেই মুর্তিটি নেফারতিতির কিনা নিশ্চিত প্রমান করা যায়নি । বিভ্রান্তি রয়েছে এটি নেফারতিতির কন্যা “ইতমোসিস” এর কিনা ।

এককালের সুন্দরী শ্রেষ্ঠা আর মিশরের সর্বোচ্য ক্ষমতার অধিকারী নারীটির রহস্যময়ভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যা্ওয়ার কাহিনী আর তার দেহাবশেষ নিয়ে বিভ্রান্তি কাটেনি আজো ।

।।মমির সামনে ডঃ ফ্লেচার আর নেফারতিতির কম্প্যুটারাইজড ছবি ।।
২০০৩ সালের জুন মাসে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নত্বাত্তিক জোয়ান ফ্লেচার দাবী করে বসলেন, তিনি নেফারতিতির “মমি” খুঁজে পেয়েছেন ।
লুক্সর এর “ভ্যালী আব কিংস” খুঁড়ে ৩৫ নম্বর সিমেট্রির মধ্যে এক কোনে “মমি নম্বর – ৬১০৭২” এর ভেতরে তিনি অন্য এক নারী ও শিশুর মমির পাশে সনাক্ত করেছেন কিংবদন্তীর নেফারতিতিকে । অনেক স্বাক্ষ্য প্রমান হাজির করেছেন । নেফারতিতির মাথার বিখ্যাত নীল রংয়ের ব্যান্ড সহ লম্বা “ফ্লাট টপ” মুকুটটি যা “ক্রাউন অব ওয়র অব আখেনাতেন” এর স্বারক চিহ্ন, পাওয়া গিয়েছিলো মমি নম্বর ৬১০৭২ এর পাশে ফ্লেচারের খনন কালের অনেক আগে, উনিশ শতকে । ফ্রেঞ্চ আর্কিওলজিষ্ট ভিক্টর লোরে উনিশ শতকের শেষের দিকে নাকি এই মমি নম্বর ৬১০৭২ খুঁজে পেয়েছিলেন কিন্তু মমিগুলির শোচনীয় অবস্থা দেখে তা উদ্ধারে আগ্রহী হননি এবং এভাবেই ফ্লেচারের আগ পর্য্যন্ত তা অজানাই থেকে গেছে । ১৮৯৮ সালে এটি খনন করা হয় প্রথম তার পরে পরেই আবার ১৯০৭ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয় ।
ফ্লেচার দাবী করছেন, বার্লিনের ঈজিপসিয়ান মিউজিয়ামে নেফারতিতির যে আবক্ষ (বাস্ট) মূর্তিটি দেখা যায় মাথায় বিখ্যাত “ফ্লাট টপ”মুকুট সহ, সেই মুকুটটি এই মমি নম্বর ৬১০৭২ এর কাছাকাছি জায়গা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিলো এবং এল–আমারনায় প্রাপ্ত দেয়ালচিত্রেও এর স্বাক্ষ্য আছে বলে মমিটি নেফারতিতিরই । এছাড়া বার্লিনের আবক্ষ মূর্তিটির সাথে মমিটির “মরালী গ্রীবা”, চোয়ালের গড়ন ইত্যাদির মিলও রয়েছে । ফ্লেচারের এই “কনক্লুসান” বাতিল করে দিয়েছেন ঈজিপ্টোলজিষ্টরা । তারা দাবী করছেন, যে মমিটির কথা ফ্লেচার বলছেন তা একটি ১৫ বছর বয়েসী কিশোরের এবং ফ্লেচারের থিওরীকে জোড়ালো করার মতো তেমন কোনও প্রমান উনি দেখাতে পারেননি । যা দেখিয়েছেন তা “ইন্যাডিকোয়েট” আর “সারকাম্সটেনশিয়াল এভিডেন্স” মাত্র । অবশ্য যে ডিএনএ টেষ্টের কথা বলা হয়েছে তা কতোখানি গ্রহন যোগ্য তা নিয়ে বিতর্ক আছে । বহুল ভাবে নাড়াচাড়া করা হয়েছে এমোন জিনিষ এবং অতীব লম্বা সময়কাল ধরে মাটির নীচের উষ্ণতাপমাত্রায় থাকা কোনও জিনিষের ডিএনএ টেষ্ট কতোখানি নির্ভরযোগ্য, বিতর্ক তাই নিয়ে ।অবশ্য ১৯১২ সালে প্রকাশিত এক নিবদ্ধে এ্যানাটমীর অধ্যাপক স্যার গ্রাফটন ইলিয়ট স্মিথ এই মমিটিকেই এবং এর সাথে থাকা অপর মমিটিকেও পরীক্ষা করে দুটোই যে তরুনী নারী দেহ তা উল্লেখ করেছিলেন । এও বলেছিলেন যে, খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত এই মমিটি পরীক্ষা করে এটি যে একজন নারীর তা বোঝার জন্যে এ্যানাটমীর পন্ডিত হওয়ার দরকার নেই । এটি প্রকাশিত হয় সেই সময়, যখোন এই মমিটির আইডেন্টিটি নিয়ে তেমন উৎসাহ জন্ম হয়নি খননকারীদের মধ্যে । পরবর্তীকালে রেডিওলজিষ্ট এবং ফিজিক্যাল এ্যান্ত্রোপলজিস্টদের পরীক্ষায়ও একই তথ্য পাওয়া যায় ।এইভাবে মমিটির পরিষ্কার সেক্স আইডেন্টিটি থাকার পরেও সেক্স নির্ণয়ে ডিএনএ টেষ্ট যা “কন্টামিনেশান” এর কারনে নির্ভর যোগ্য নাও হতে পারে সেই টেষ্টের জন্যে বসে থাকা বাহুল্যমাত্র ।
ডঃ জাহি হাওয়াস, মিশরীয় “সুপ্রীম কাউন্সিল অব এ্যান্টিকুইটিস” এর প্রধান ব্যক্তি অবশ্য একবার এই তরুনী নারীর মমিটিকে মধ্যবয়সী মহিলার বলে জানিয়েছিলেন । তার মতে মমিটি সম্রাট তৃতীয় তুথমোসিস এর প্রধানা মহিষী “ম্যারীতার-হাপসেতসুত” এর । আবার হাওয়াস এক ডকুমেন্টারীতে ফ্লেচারের সাথে তাল মিলিয়ে বলেছিলেন, সিমেট্রি নম্বর -৩৫ এ যে মমিটি পাওয়া গেছে তা নেফারতিতির হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী । আবার হালের ২০১০ সালের প্রথমদিকে প্রকাশিত ডিএনএ টেষ্ট এর রিপোর্ট প্রমান করে যে এটি সম্রাট আখেনাতেন এর বোন এর যিনি আবার রহস্যময় ফারাও তুতেনখামেন এর মা “কিয়া” র ।এই রিপোর্টের সহযোগী লেখক আবার ডঃ জাহি হাওয়াস ।

তাই আপনি নেফারতিতিকে খুঁজে পেতে কোনদিকে যে যাবেন এমোন একটি গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে আছেন ।

।। মিশরের কায়রো মিউজিয়মে নেফারতিতি । এই ছবির টুপিটি দেখে কেউ কেউ এটি "তেফনাত" এর বলে দাবী করেন ।।

শুধু এইগুলোই নয় গোলক ধাঁধা আরো আছে । নেফারতিতির উপর কোনও লিখিত সরকারী দলিল পাওয়া যায়নি তার রহস্যময় অর্ন্তধানের পরে । কারন কি ?
নেফারতিতির যে মমিটি পাওয়া গেছে বলে ফ্লেচার দাবী করছেন তাতেও চরম নিষ্ঠুরতার চিহ্ন রয়েছে । মমিটির ডান কানটি এবং একটি হাত নিখোঁজ । কুঠার জাতীয় কোনও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তা দেহচ্যুত হয়েছে ।একটি খন্ডিত হাত আবার আর এক বৃটিশ দল তাদের দ্বিতীয় অভিযানে খুঁজে পেয়েছেন পাশ্ববর্তী কফিন থেকে । এখোন এইসব তথ্য একটি পাজল (puzzle) এর মতো খাঁজে খাঁজে মেলাতে বাকী । ফ্লেচার তাই মেলাতে চাইছেন । মেলাতে চাইছেন নতুন ধর্মের প্রবর্তন করে নেফারতিতি জনগণের যে রোষানলে পড়েছিলেন এই নিষ্ঠুরতা তারই পরিনতি । এবং হয়তো নেফারতিতিকে এই নিষ্ঠুরতা দিয়েই খুন করা হয়েছে এমোন ধারনাও তার । কারন নেফারতিতির মুখেও রয়েছে আঘাতের চিহ্ন । মমি আবিষ্কারের পরবর্তী এক পরীক্ষায় এটি জানা গেছে । সম্ভবত ধারালো কোন চাকু দিয়ে এই নারকীয় কাজটি করা হয়েছে ।

এতো সব করতে গিয়ে ফ্লেচার পড়েছেন বিপদে । তাকে মিশরে প্রত্নতত্ব তল্লাশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । নিষিদ্ধ করেছেন মিশরের “সুপ্রীম কাউন্সিল অব এ্যান্টিকুইটিস” । ডঃ জাহি হাওয়াস বলেছেন, ফ্লেচার তার চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছেন । তিনি বলেছেন, "Dr Fletcher has broken the rules. There are more than 300 foreign expeditions currently working in Egypt, and they all follow the same guidelines. We grant concessions to any scholar affiliate to a scientific or educational institution, and it has long been accepted code of ethics that any discovery made during excavations should first be reported to the SCA. By going first to the press with what might be considered a great discovery, Dr. Fletcher broke the bond made by York University with the Egyptian authorities. And by putting out in the popular media what is considered by most scholars to be an unsound theory, Dr. Fletcher has broken the rules and therefore, at least until we have reviewed the situation with her university, she must be banned from working in Egypt.”

একেকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন এক এক কথা । কারো কথা থেকে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই , আসলে মমিটি কার । রহস্য আরো ঘনীভুত যখোন ধারনা করা হলো, ১৯৩৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে কিশোর তুতেনখামেন ফারাও পদে বহাল হলে তিনিই তার পিতা আখেনাতেন আর তার স্ত্রী নেফারতিতির গড়া সমস্ত সৌধ, মন্দির সহ যাবতীয় স্মৃতি ধ্বংশ করে ফেলেন । কারন ও আছে । কারো কারো ধারনা, নতুন ধর্ম প্রচার কালে নেফারতিতি প্রাচীন ধর্মের মন্দিরগুলো ভাঙ্গার পাশাপাশি “কিয়া” নামের আখেনাতেন এর বোন এর (মতান্তরে স্ত্রী) গড়া স্তম্ভগুলোও ভেঙ্গে ফেলেন ।আর তুতেনখামেন হলেন কিয়ার সন্তান । আর তাই নেফারতিতির মমিটি ফারাওদের সমাধিস্থলে পাওয়া যাবেনা প্রতিহিংসার কারনেই ।তাহলে নেফারতিতি কোথায় ?

।। সূর্য্যদেব "আতেন" এর পূঁজায় নেফারতিতি ।।

রহস্যময় তুতেনখামেন কি নেফারতিতির এই হারিয়ে যাওয়া নাটকের নেপথ্য রূপকার ? হতেও পারে । কারন, এমোন ধারনাও করছেন ঈজিপ্টোলজিষ্টরা যে ,নেফারতিতির পিতা “আই” যিনি তুতেনখামেনের পরে ফারাও হয়েছিলেন তার নেপথ্য হাত ছিলো তুতেনখামেনের রহস্যময় মৃত্যুতে ।

এসব কি তবে রহস্যময় অকাল মৃত্যুর কাছে পরাজিত তুতেনখামেনের অভিশাপ ? নেফারতিতি কি অভিশপ্ত ?? হতে পারে কারন তুতেনখামেন এক রহস্যের নাম …..
original post
read more

Sunday, April 8, 2012

EVERIST GALOIS: ভয়াবহ প্রতিভাবান একজন কিশোর গনিতবিদ ।

by নীল ত্রিস্তান
১৯শ শতকের শুরুর দিকের ঘটনা। খুব কড়া শাসনের জন্য বিখ্যাত Lycee de Louis Le Grand স্কুলটির নিয়ন্ত্রন নিয়ে ধর্মযাজক আর রিপাব্লিকদের মধ্যে বেশ টানা পোড়া চলছিল। ছাত্ররা কিছুতেই চায় না স্কুলটি ধর্মযাজকদের হাতে তুলে দেয়া হোক । এই নিয়ে তারা বেশ প্রতিরোধও করতে চাইলো । এই ঘটনায় স্কুলের প্রধানশিক্ষক প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী ছাত্রদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ১৫জনের মত ছাত্রকে বহিস্কার করলো । এমনকি পরদিন এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও শতাধিক ছাত্রকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হল। সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া ১২ বছর বয়সী গ্যালোয়ার মনে এই ঘটনা খুব বাজে ভাবে রাজতন্ত্রের প্রতি ঘৃণার বীজ বুনেছিল।
গ্যালোয়ার জন্ম ২৫অক্টোবর, ১৮১১।তার বয়স যখন ১৪ তখন তার প্রথমবারের মত পরিচয় ঘটে গনিতের সাথে । যেদিন প্রথম ক্লাশে গনিত পড়ানো হয়, তার মধ্যে যেন একটা বিপর্যয় ঘটে যায় । তিনি গনিতে এতই মজে ছিলেন যে, অন্য সব কিছু পড়া একেবারে ছেড়ে দিলেন। সব কিছুতে খুব খারাপ করতে লাগলেন । আগে তেমন খারাপ ছাত্র ছিলেন না, ল্যাটিন ভাষায় দক্ষতার জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেনও , কিন্তু এখন অন্য বিষয় গুলোতে তার পাশ করার বেশ কঠিন হয়ে গেল। গনিত চর্চায় এতই এগিয়েছিলেন ,যে তার হঠাত মনে হওয়া শুরু হল, যে গনিতে তাকে শেখানর মত স্কুলের শিক্ষকদের কাছে আর অবশিষ্ট কিছুই নেয় । ফলে নিজেই নিজের মত বই কিনে গনিত চর্চা শুরু করলেন । কিন্তু এইবার ভিন্ন সমস্যা শুরু হল। গ্যালোয়া যেই পরিমানে গনিত বুঝেন , তত গনিত আসলেও তার শিক্ষকরা বুঝতেন না । ফলে পরিক্ষার খাতায় গ্যালোয়া যা উত্তর করেন তার কিছুই তাদের বোধগম্য হয় না । এবার গ্যালোয়া গনিতেও খারাপ করা শুরু করলেন।
১৮২৮ সালে তিনি École Polytechnique নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন। এটা ছিলো গনিতের জন্য ততকালীন ফ্রান্সের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান । এরই মধ্যে তিনি পড়ে ফেলেছেন Adrien Marie Legendre' এর Éléments de Géométrie, Joseph Louis Lagrangeএর Réflexions sur la résolution algébrique des équations (এটি পরবর্তিতে তাকে একুয়েশন থিওরীতে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে), Leçons sur le calcul des fonctions ইত্যাদি । কিন্তু মৌখিক পরিক্ষায় গিয়ে তিনি পরীক্ষকদের কোন প্রশ্নের উত্তরেই সন্তুষ্ট করতে পারলেন না । আসলে তিনি তাদেরকে উত্তর এমন অল্পকথায় ব্যাখ্যা ছাড়া দিয়েছিলেন যে কেউ তা বুঝতে পারে নি । ফলে তিনি École Polytechnique তে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি অপেক্ষাকৃত নিম্ন র‍্যাংকিং এর বিশ্ববিদ্যালয় l'École préparatoire তে ভর্তি হন সেই বছর।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ গ্যালোয়া তার সমস্ত জিদ যেন ঢেলে দেন গনিতের উপরে । তুমুল উতসাথে মেতে ওঠেন ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত আর পঞ্চঘাত সমীকরনে । ১৮২৯ সালে তার প্রথম গবেষনা পত্র প্রকাশ হয় Annales de mathematiquesএ continuous fraction এর উপরে । অনেক পরিস্রম করে ২ টি রিসার্চ পেপার তৈরি করে জমা দেন Academy of Sciencesএ । তখন Academy of Sciences. এর প্রধান ছিলেন বিখ্যাত গনিতবিদ Augustin Louis Cauchy । তিনি পেপার দুটির নিজেই সুপারিশ করেছিলেন, একই সাথে তিনি গ্যালোয়ার কাছে পেপার দুটি ফেরত পাঠান পুনর্বিন্যাস ও ব্যাখ্যা করে লেখা জন্য ।
বছর ঘুরতেই(১৮২৯) রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গ্যালোয়ার বাবা আত্মহত্যা করেন। পিতার মৃতদেহ সতকার করে গ্যালোয়া প্যারিস ফিরলেন, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তার পেপার দুটি জমা দিলেন একাডেমির সেক্রেটারি স্যার জসেফ ফুরিয়ারে কাছে । কিন্তু সেবার গ্যালোয়া পুরস্কার পান নি । পুরস্কার ঘোষনার কিছু দিন আগে ফুরিয়ার মারা যান এবং তার পেপার যে জমা হয়েছে এমন কোন ডকুমেন্টের অস্তিত্বই ছিল না । ফলে রাজনৈতিক কারনে গ্যলয়ার পেপার গায়েব হয়েছে বলে তার সন্দেহ হল । এই সন্দেহ পুরোপুরি বাস্তবে প্রমানিত হল যখন তার পরে একাধিক গবেষনা পত্র একাডেমি অফ সায়েন্স ফেরত পাঠাল অযৌক্তিক ও অবোধ্য এর খোড়া যুক্তি দেখিয়ে (১৮৩০)। সে বছর গ্যালোয়া মোট ৩টি গবেষনা পত্র প্রকাশ করেন , যার মধ্যে একটি বিখ্যাত Galois theory এর ভিত্তি গরে দেয় , অন্য দুইটি ছিল আধুনিক উপায়ে সমিকরনের মুল নির্নয় সম্পর্কিত এবং নাম্বার থিওরি নিয়ে । শেষক্তটি বেশ গুরুত্ববাহি কারন finite field এর এর ধারনা প্রথম এখানে পাওয়া যায় ।
সে বছর গ্যালোয়া তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টরকে গালিগালাজ করে একটি প্রতিবেদন লেখেন । ডিরেক্টর ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক। সুতরাং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয় । এর পর তিনি যেন পুরোই উচ্ছনে গেলেন । বছর ঘুরতেই(১৮৩১) মদ আর সন্ত্রাস তার নিত্যসঙ্গী। কখনও চাকু হাতে সম্রাটকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন খোলা রাস্তায়, তো পরক্ষনে গ্রেফতার। ছাড়া পেয়ে আবার নিষিদ্ধ ন্যাশ্নাল গার্ডের পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে তার জেল হয়ে যায় । এক মাস পর গ্যালোয়া জেল থেকে ছাড়া পান ।
কিছুদিন পর তার প্রনয়ের খবর চাঊর হয়ে গেল। প্রয়সী স্টাফানি ফেলিসি । স্টাফানি এক বিখ্যাত ডাক্তারের মেয়ে, প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে পেশ্চু ডি’হেরবিনভিল এর বাগদত্তা । পেশ্চু এই ঘটনায় খুব রেগে গেলেন। অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দেন গ্যালোয়াকে ।
ডুয়েলের আগের রাতে(১৮৩২) গ্যালোয়ার হঠাত কি যেন হল। পাগলের মত সারারাত তার থিওরেমগুলো লিখতে থাক্লেন । তার সে রাতের কাজের মধ্যে দিয়ে আলোর মুখ দেখে গ্রুপ থিওরি। সাথে একটি চিঠি লিখেন যে তার যদি পরদিন ডুয়েলে মৃত্যু হয় তাহলে যেন তার কাজগুলোকে ইউরোপের বড় বড় গনিতবিদদের কাছে পৌছে দেয়া হয়।
পরদিন,৩০মে,১৮৩২, ডুয়েলে গ্যালোয়াকে নিখুত নিশানায় ভুলুন্ঠিত করে পেশ্চু । ৩১মে মৃত্যু হয় গ্যালোয়ার । ২ জুন তার শেষ্কৃত্যে এক রহস্যমত কথার অবতারনা করে গ্যালোয়ার বন্ধু শেভ্লিয়ার।তিনি বলেন, গ্যালোয়া নাকি তাকে পাচদিন পুর্বে চিঠিতে লিখছিল,”সব মিথ্যা, স্টেফানির সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।“ কিন্তু তাহলে গ্যালোয়া কেন ডুয়েলে অংশ নেন?এদিকে শহর জুড়ে সবাই বলাবলি করা শুরু করলো স্টেফানি নাকি আসলে পেশ্চুর বাগদত্তা নন !! পুরো ঘটনা কি তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্যালোয়াকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল ? সবই আজও অজানা রয়ে গেছে ।
কিন্তু মাত্র একরাতে গ্যালোয়া যা লিখছিলেন তার মর্ম উদ্ধার করতে গাউস,জ্যাকোবিদের অনেক গলদঘর্ম হতে হয়েছে । গ্যালোয়ার মৃত্যুর ১৪ বছর পর, ১৮৪৬ সালে লিউভিল সেই কাগজগুলো থেকে যে থিওরি উদ্ধার করেন তা তিনি গ্যালোয়ার থিওরি নামে প্রকাশ করেন ।
তার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে গ্যালোয়া থিওরি এবং গ্রুপ থিওরি, যা কিনা Abstrack Algebra এর দুটি প্রধান শাখা
original post
read more

EVERIST GALOIS: ভয়াবহ প্রতিভাবান একজন কিশোর গনিতবিদ ।

by নীল ত্রিস্তান
১৯শ শতকের শুরুর দিকের ঘটনা। খুব কড়া শাসনের জন্য বিখ্যাত Lycee de Louis Le Grand স্কুলটির নিয়ন্ত্রন নিয়ে ধর্মযাজক আর রিপাব্লিকদের মধ্যে বেশ টানা পোড়া চলছিল। ছাত্ররা কিছুতেই চায় না স্কুলটি ধর্মযাজকদের হাতে তুলে দেয়া হোক । এই নিয়ে তারা বেশ প্রতিরোধও করতে চাইলো । এই ঘটনায় স্কুলের প্রধানশিক্ষক প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী ছাত্রদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ১৫জনের মত ছাত্রকে বহিস্কার করলো । এমনকি পরদিন এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও শতাধিক ছাত্রকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হল। সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া ১২ বছর বয়সী গ্যালোয়ার মনে এই ঘটনা খুব বাজে ভাবে রাজতন্ত্রের প্রতি ঘৃণার বীজ বুনেছিল।
গ্যালোয়ার জন্ম ২৫অক্টোবর, ১৮১১।তার বয়স যখন ১৪ তখন তার প্রথমবারের মত পরিচয় ঘটে গনিতের সাথে । যেদিন প্রথম ক্লাশে গনিত পড়ানো হয়, তার মধ্যে যেন একটা বিপর্যয় ঘটে যায় । তিনি গনিতে এতই মজে ছিলেন যে, অন্য সব কিছু পড়া একেবারে ছেড়ে দিলেন। সব কিছুতে খুব খারাপ করতে লাগলেন । আগে তেমন খারাপ ছাত্র ছিলেন না, ল্যাটিন ভাষায় দক্ষতার জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেনও , কিন্তু এখন অন্য বিষয় গুলোতে তার পাশ করার বেশ কঠিন হয়ে গেল। গনিত চর্চায় এতই এগিয়েছিলেন ,যে তার হঠাত মনে হওয়া শুরু হল, যে গনিতে তাকে শেখানর মত স্কুলের শিক্ষকদের কাছে আর অবশিষ্ট কিছুই নেয় । ফলে নিজেই নিজের মত বই কিনে গনিত চর্চা শুরু করলেন । কিন্তু এইবার ভিন্ন সমস্যা শুরু হল। গ্যালোয়া যেই পরিমানে গনিত বুঝেন , তত গনিত আসলেও তার শিক্ষকরা বুঝতেন না । ফলে পরিক্ষার খাতায় গ্যালোয়া যা উত্তর করেন তার কিছুই তাদের বোধগম্য হয় না । এবার গ্যালোয়া গনিতেও খারাপ করা শুরু করলেন।
১৮২৮ সালে তিনি École Polytechnique নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন। এটা ছিলো গনিতের জন্য ততকালীন ফ্রান্সের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান । এরই মধ্যে তিনি পড়ে ফেলেছেন Adrien Marie Legendre' এর Éléments de Géométrie, Joseph Louis Lagrangeএর Réflexions sur la résolution algébrique des équations (এটি পরবর্তিতে তাকে একুয়েশন থিওরীতে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে), Leçons sur le calcul des fonctions ইত্যাদি । কিন্তু মৌখিক পরিক্ষায় গিয়ে তিনি পরীক্ষকদের কোন প্রশ্নের উত্তরেই সন্তুষ্ট করতে পারলেন না । আসলে তিনি তাদেরকে উত্তর এমন অল্পকথায় ব্যাখ্যা ছাড়া দিয়েছিলেন যে কেউ তা বুঝতে পারে নি । ফলে তিনি École Polytechnique তে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি অপেক্ষাকৃত নিম্ন র‍্যাংকিং এর বিশ্ববিদ্যালয় l'École préparatoire তে ভর্তি হন সেই বছর।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ গ্যালোয়া তার সমস্ত জিদ যেন ঢেলে দেন গনিতের উপরে । তুমুল উতসাথে মেতে ওঠেন ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত আর পঞ্চঘাত সমীকরনে । ১৮২৯ সালে তার প্রথম গবেষনা পত্র প্রকাশ হয় Annales de mathematiquesএ continuous fraction এর উপরে । অনেক পরিস্রম করে ২ টি রিসার্চ পেপার তৈরি করে জমা দেন Academy of Sciencesএ । তখন Academy of Sciences. এর প্রধান ছিলেন বিখ্যাত গনিতবিদ Augustin Louis Cauchy । তিনি পেপার দুটির নিজেই সুপারিশ করেছিলেন, একই সাথে তিনি গ্যালোয়ার কাছে পেপার দুটি ফেরত পাঠান পুনর্বিন্যাস ও ব্যাখ্যা করে লেখা জন্য ।
বছর ঘুরতেই(১৮২৯) রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গ্যালোয়ার বাবা আত্মহত্যা করেন। পিতার মৃতদেহ সতকার করে গ্যালোয়া প্যারিস ফিরলেন, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তার পেপার দুটি জমা দিলেন একাডেমির সেক্রেটারি স্যার জসেফ ফুরিয়ারে কাছে । কিন্তু সেবার গ্যালোয়া পুরস্কার পান নি । পুরস্কার ঘোষনার কিছু দিন আগে ফুরিয়ার মারা যান এবং তার পেপার যে জমা হয়েছে এমন কোন ডকুমেন্টের অস্তিত্বই ছিল না । ফলে রাজনৈতিক কারনে গ্যলয়ার পেপার গায়েব হয়েছে বলে তার সন্দেহ হল । এই সন্দেহ পুরোপুরি বাস্তবে প্রমানিত হল যখন তার পরে একাধিক গবেষনা পত্র একাডেমি অফ সায়েন্স ফেরত পাঠাল অযৌক্তিক ও অবোধ্য এর খোড়া যুক্তি দেখিয়ে (১৮৩০)। সে বছর গ্যালোয়া মোট ৩টি গবেষনা পত্র প্রকাশ করেন , যার মধ্যে একটি বিখ্যাত Galois theory এর ভিত্তি গরে দেয় , অন্য দুইটি ছিল আধুনিক উপায়ে সমিকরনের মুল নির্নয় সম্পর্কিত এবং নাম্বার থিওরি নিয়ে । শেষক্তটি বেশ গুরুত্ববাহি কারন finite field এর এর ধারনা প্রথম এখানে পাওয়া যায় ।
সে বছর গ্যালোয়া তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টরকে গালিগালাজ করে একটি প্রতিবেদন লেখেন । ডিরেক্টর ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক। সুতরাং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয় । এর পর তিনি যেন পুরোই উচ্ছনে গেলেন । বছর ঘুরতেই(১৮৩১) মদ আর সন্ত্রাস তার নিত্যসঙ্গী। কখনও চাকু হাতে সম্রাটকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন খোলা রাস্তায়, তো পরক্ষনে গ্রেফতার। ছাড়া পেয়ে আবার নিষিদ্ধ ন্যাশ্নাল গার্ডের পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে তার জেল হয়ে যায় । এক মাস পর গ্যালোয়া জেল থেকে ছাড়া পান ।
কিছুদিন পর তার প্রনয়ের খবর চাঊর হয়ে গেল। প্রয়সী স্টাফানি ফেলিসি । স্টাফানি এক বিখ্যাত ডাক্তারের মেয়ে, প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে পেশ্চু ডি’হেরবিনভিল এর বাগদত্তা । পেশ্চু এই ঘটনায় খুব রেগে গেলেন। অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দেন গ্যালোয়াকে ।
ডুয়েলের আগের রাতে(১৮৩২) গ্যালোয়ার হঠাত কি যেন হল। পাগলের মত সারারাত তার থিওরেমগুলো লিখতে থাক্লেন । তার সে রাতের কাজের মধ্যে দিয়ে আলোর মুখ দেখে গ্রুপ থিওরি। সাথে একটি চিঠি লিখেন যে তার যদি পরদিন ডুয়েলে মৃত্যু হয় তাহলে যেন তার কাজগুলোকে ইউরোপের বড় বড় গনিতবিদদের কাছে পৌছে দেয়া হয়।
পরদিন,৩০মে,১৮৩২, ডুয়েলে গ্যালোয়াকে নিখুত নিশানায় ভুলুন্ঠিত করে পেশ্চু । ৩১মে মৃত্যু হয় গ্যালোয়ার । ২ জুন তার শেষ্কৃত্যে এক রহস্যমত কথার অবতারনা করে গ্যালোয়ার বন্ধু শেভ্লিয়ার।তিনি বলেন, গ্যালোয়া নাকি তাকে পাচদিন পুর্বে চিঠিতে লিখছিল,”সব মিথ্যা, স্টেফানির সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।“ কিন্তু তাহলে গ্যালোয়া কেন ডুয়েলে অংশ নেন?এদিকে শহর জুড়ে সবাই বলাবলি করা শুরু করলো স্টেফানি নাকি আসলে পেশ্চুর বাগদত্তা নন !! পুরো ঘটনা কি তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্যালোয়াকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল ? সবই আজও অজানা রয়ে গেছে ।
কিন্তু মাত্র একরাতে গ্যালোয়া যা লিখছিলেন তার মর্ম উদ্ধার করতে গাউস,জ্যাকোবিদের অনেক গলদঘর্ম হতে হয়েছে । গ্যালোয়ার মৃত্যুর ১৪ বছর পর, ১৮৪৬ সালে লিউভিল সেই কাগজগুলো থেকে যে থিওরি উদ্ধার করেন তা তিনি গ্যালোয়ার থিওরি নামে প্রকাশ করেন ।
তার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে গ্যালোয়া থিওরি এবং গ্রুপ থিওরি, যা কিনা Abstrack Algebra এর দুটি প্রধান শাখা
original post
read more

টাইটানিক (Titanic) ।

আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯১২ সালের ১৪/১৫ই এপ্রিল উত্তর আটলান্টিকে বরফের চাইয়ের আঘাতে খন্ড বিখন্ড হয়ে ডুবে যায় টাইটানিক জাহাজ। জাহাজ ডুবির ইতিহাসে এটিই হল সবচে বিয়োগান্তক ঘটনা। টাইটানিক নিয়ে তৈরী হয়েছে অসংখ্য সিনেমা, লেখা হয়েছে গল্প,নাটক, উপন্যাস। অনেক গান, অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে রেডিও, টেলিভিশনে। । ১৯৯৭ সালে জেমস ক্যামেরুন নির্মিতএবং লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিও অভিনীত “টাইটানিক”(Titanic) ছিল রেকর্ড ভঙ্গকারী চলচ্চিত্র। অপর এক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ছিল ১৯৫০ সালে নির্মিত চলচ্চিত্র “"A Night to Remember”

ইতিহাস-
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিমান ছিল না। জাহাজই ছিলো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র ভরসা। ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জাহাজ ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। ধনী এবং অভিবাসী যাত্রীদের আকৃস্ট করতে জাহাজ কোম্পানী গুলো ছিল সদা তৎপর। প্রধান দুই জাহাজ কোম্পানী ছিল হোয়াইট স্টার(White Star) এবং কুনার্ড( Cunard )। ১৯০৭ সালে কুনার্ড কোম্পানী যখন স্বল্পতম সময়ে আমেরিকা পৌছানোর দ্রুতগতি সম্পন্ন জাহাজ লুইজিতানিয়া (Lusitania )এবং মোউরিতানিয়া ( Mauretania) নামালো চিন্তায় পড়ে গেলেন হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর চেয়ারম্যান ইসমে ( J. Bruce Ismay )। বেলফাস্টের জাহাজ নির্মা্নকারী প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) এর মালিক উইলিয়াম পিরি ( William Pirrie,) এর সাথে পরামর্শ করে তিনটা বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ অলিম্পিক( Olympic ) টাইটানিক (Titanic)এবং ব্রিটানিক(Britannic ) নির্মানের সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। ১৯০৯ সালে কোম্পানির স্থপতি টয়ামস এন্ড্রু (Thomas Andrews ) র নকশায় শুরু হল টাইটানিক জাহাজের নির্মান কাজ। সেই সময়ের সবচে বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিককে গড়ে তোলা হল। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজকে ভাগ করা হয় ১৬টা আলাদা প্রকোষ্ঠে। এক প্রকোষ্ঠ হতে আরেক প্রকোষ্ঠ ছিল আলাদা এবং ১৬ টার মধ্যে ৪ প্রকোষ্ঠে জল ঢুকলেও জাহাজ ভেসে থাকতে অসুবিধা হত না। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন টাইটানিক জাহাজ কোনদিন ও ডুববে না। ৩১শে মে ১৯১১ সালে জলে নামান হল টাইটানিককে। তারপর শুরু হল যন্ত্রপাতি লাগানো, সাজশয্যা। ১৯১২ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে পরীক্ষামুলক সমুদ্র যাত্রা শেষ হওয়ার পর তাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক সুমদ্র ভ্রমন উপযোগী জাহাজ হিসেবে হস্তান্তর করা হল জাহাজ কোম্পানীর কাছে । জাহাজের পুরো নাম হল RMS Titanic (Royal Mail Ship = RMS)



টাইটানিক জাহাজের নকশা



ঐ সময়ের বৃহত্তম আরামদায়ক জাহাজ টাইটানিক ছিল ৮৮২.৫ ফুট লম্বা, সবচে চওড়া স্থানে ৯২.৫ ফুট,ধারন ক্ষমতা ছিল ৪৬,৩২৮ টন এবং সম্পুর্ন বোঝাইকৃত অবস্থায় জাহাজের ওজন ৫২,০০০ টনের ও বেশী, জাহাজের সবচে নীচের থেকে মাস্তুলের আগা পর্যন্ত উচ্চতা ছিল ১০৪ ফুট। মোট ১১ টা ডেকের ৯ টি ছিল যাত্রীদের জন্য আর নীচের দুটো ব্যবহৃত হত, ডাক, মালামাল এবং ইঞ্জিন রুম হিসেবে। জাহাজে বেতার যোগাযোগ এবং টেলিগ্রাফের ব্যাবস্থা ছিল। সে যুগের সর্বোচ্চ আরমাদায়ক ব্যাবস্থা ছিল জাহাজে। ১ম শ্রেনীতে ৪১৬, ২য় তে ১৬২ এবং ৩য় শ্রেনীতে ৪৬২- মোট ৮৪০টি কামরা ছিল যাত্রীদের জন্য।

ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দরে ছাড়ার আগ মুহুর্তে টাইটানিক।

টাইটানিকের প্রথম এবং একমাত্র সমুদ্র যাত্রা- ১৯১২ সালের ১০ ই এপ্রিল টাইটানিক জাহাজ রওয়ানা দিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দর থেকে। সেটিই ছিল টাইটানিকের প্রথম এবং একমাত্র সমুদ্র যাত্রা।১০ তারিখ দুপুরে যাত্রা করে প্রথম নোঙ্গর ফেলে ফ্রান্সের শেরবুর্গ বন্দরে। তারপর আইয়ারল্যান্ডের কুইন্সটাউন এবং কুন্সটাউন ছাড়ে ১১ ই এপ্রিল দুপুর ১-৩০ মিনিটে। তখন ক্রু এবং যাত্রী মিলে জাহাজে ২,২০০ জন লোক।

১২, ১৩ তারিখ নিরাপদে কেটে গেলেও ১৪ তারিখে সমুদ্রে ভাসমান বরফ খন্ড সম্পর্কে সতর্ক বার্তা পেতে থাকেন ক্যাপ্টেন স্মিথ। রাত ৯-২০ ক্যাপ্টেন সবাইকে সতর্ক থাকতে বলে বিশ্রামে গেলেন। রাত ১১-৪০ এ বরফের চাই যখন খুব কাছে ফার্স্ট অফিসার মারডক নির্দেশ দিলেন জাহাজ বায়ে ঘুরিয়ে পেছনের দিকে সরে যেতে।কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গেছে ততক্ষনে। মুহুর্তের মধ্যেই বরফের চাই আঘাত হানল। যাত্রীরা অধিকাংশ তখন ঘুমে যারা জেগে ছিলেন তারাও খুব বেশী টের না পেলেও ক্যাপ্টেন ঠিকই বুঝলেন । বরফের আঘাতের পর জাহাজের ১৬ প্রকোষ্ঠের মধ্যে ৬ টাতেই পানি ঢুকছে তখন।ক্যাপ্টেন ১২-১০ মিনিটে লাইফবোট বার করতে এবং চারিদিকে বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর নির্দেশ দিলেন বেতার কর্মীদের। ১২-৪৫ এ প্রথম লাইফ বোট পানিতে নামল। ২-০৫ এ যখন শেষ লাইফবোট জাহাজ ছাড়ল তখন বাকীদের আর কোন আশাই থাকল না। যাত্রীরা ভেসে থাকার মত হাতের কাছে যা কিছু পেল (যেমন ডেক চেয়ার) তাই আকড়ে ধরে বাচতে চাইল। ২-১৮ মিনিটে জাহাজ ভেঙ্গে দুটুকরো হয়ে , ২-২০ মিনিটে পুরো জাহাজ তলিয়ে গেল পানির নীচে।

উদ্ধার তৎপরতা- বিপদ সঙ্কেত পেয়ে প্রথম এগিয়ে আসে জাহাজ কার্পেথিয়া। ৩-৩০ মিনিটে লাইফবোটের যাত্রীদের নজরে আসে কার্পেথিয়া। ৪-১০ এ প্রথম লাইফবোটের যাত্রীরা কার্পেথিয়াতে ওঠেন। পরবর্তী ৪ ঘন্টা যাবত উদ্ধার তৎ পরতা চালিয়ে ৭০৬ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে কার্পেথিয়া। মারা যান ১৫১৭ জন। উদ্ধারকারী জাহাজ কার্পেথিয়া ১৮ই এপ্রিল বেচে যাওয়া যাত্রীদের নিয়ে নিউ ইয়র্ক পৌছে।




টাইটানিকের যাত্রাপথ এবং দূর্ঘটনাস্থল।



টাইটানিক সম্পর্কে কিছু তথ্য-
১) টাইটানিক জাহাজে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফবোট ছিল না। জাহাজে ৬৫ টি লাইফবোট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ দিন ছিল মাত্র ২০ টি । লাইফবোটের মোট ক্ষমতা ছিল ১১৭৮ জন। কিভাবে লাইফবোট ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে মহড়া অনুষ্ঠানের কথা ছিল ১৪ই এপ্রিল সকালে। অজ্ঞাতকারনে ক্যাপ্টেন স্মিথ ঐ দিন মহড়া অনুষ্ঠান বাতিল করেন। মহড়া হলে আরো কিছু জীবন রক্ষা পেত এমন ধারনা করেন অনেকে।
২) অনেকগুলো লাইফবোট যাত্রী বহনক্ষমতা পুর্ন হওয়ার আগেই সমুদ্রে নামিয়ে দেওয়া হয়। লাইফ বোট-১ এ ৪০ জন যাত্রী বহন করার ক্ষমতা থাকলেও ছিল মাত্র ১২ জন , প্রথম জলে নামানো লাইফবোট-৭ এ ৬৫ জন বহন ক্ষমতা থাকলেও ছিলেন মাত্র ২৮ জন।
৩) আশে পাশে বরফের চাইয়ের উপস্থিতি টের পাওয়া সত্বেও জাহাজের গতি কমানো হয় নি।জাহাজ ঘোরানোর চেস্টা শুরু করা হয় শেষ মুহুর্তে কিন্তু সঙ্ঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয় নি।
৪) অনান্য জিনিসের মধ্যে ৩০০০ ব্যাগ ডাক এবং একটা গাড়ী নিয়ে যাচ্ছিল টাইটানিক। ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় ডাক বয়ে নিয়ে যাওয়ার কারনেই এর নাম হয়েছিল RMS Titanic. জাহাজে্র পোস্ট অফিসে পাঁচজন কর্মচারী দিনে ১৩ ঘন্টা করে সপ্তাহের প্রতিদিনই কাজ করতেন। তারা প্রতিদিন ৬০,০০০ চিঠি বাছাই করতেন।
৫) প্রথম শ্রেনীর যাত্রীর স্যুটের টিকিটের ঐ সময় দাম ছিল ৪, ৩০০ ডলার এবং বার্থের টিকিটের দাম ছিল ১৫০ ডলার।
৬) ঐ জাহাজেই সর্বপ্রথম গরম পানির সুইমিং পুলের ব্যাবস্থা রাখা হয়।
৭) যাত্রার সময় জাহাজ এত নতুন ছিল যে অনেক যায়গায় রঙ তখনও শুকায় নি।
8) জাহাজডুবিতে মারা যাওয়া ১৫১৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩০৬ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
জাহাজের ক্রু এবং যাত্রী মিলিয়ে মোট ৭০৬ জন ( ৩১. ৬ % ) রক্ষা পান, বাকিদের সলিল সমাধি ঘটে। যদি সমস্ত লাইফ বোট পুরোপুরি ব্যবহার করা হত তাহলে অর্ধেকের ও বেশী (৫৩. ৪%) যাত্রী রক্ষা পেত।
৯) প্রতিটা কক্ষে বিজলী বাতি এবং গরম রাখার ব্যাবস্থা ছিল, যা ঐ সময়ে বিলাস সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হত।
১০) বেচে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে সবচে বেশী ছিলেন প্রথম শ্রেনীর যাত্রীরা। প্রথম শ্রেনীর ৬১% যাত্রী, ২য় শ্রেনীর ৪২% এবং ৩য় শ্রেনীর ২৪% যাত্রী রক্ষা পান।
১১) নারী এবং শিশুদের সর্ব প্রথম লাইফবোটের অধিকার থাকলেও অনেক পূর্ন বয়স্ক লোক লাইফ বোটে উঠে পড়ে উদ্ধার পান এবং অনেক শিশু ও নারী মারা যান যারা ছিলেন ২য় এবং ৩য় শ্রেনীর যাত্রী। মহিলা যাত্রীদের ৭৫% বেচে গেলেও পুরুষদের মাত্র ২০% রক্ষা পান। বেচে যাওয়াদের মধ্যে দুটো কুকুরও ছিল।
১২) এই সমুদ্র যাত্রার পরপরই ক্যাপটেন স্মিথের অবসর নেওয়ার কথা ছিল।
১৩) টাইটানিক জাহাজ নির্মানে খরচ পড়েছিল তখনকার দিনের ৭৫ লক্ষ ডলার, সময় লেগেছিল ৩ বছর।
১৪) যাত্রার সময় জাহাজে খাবার হিসেবে ছিল ৪০হাজার ডিম, ৭৫ হাজার পাউন্ড মাংশ এবং ১০০০ বোতল মদ।
১৫) মোট ৮৮৫ জন ক্রু ছিলেন জাহাজে। ক্রু বাদে যাত্রীবহন ক্ষমতা ছিল ৩৫৪৭ জন।
১৬) জাহাজের প্রতিদিন জ্বালানী লাগত ৮২৫ টন কয়লা ।
১৭) গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ২৩ নট বা ৪৩ কিলোমিটার।
১৮) টাইটানিক জাহাজের নিজস্ব সংবাদপত্র প্রকাশে্র ব্যবস্থা ছিল। প্রতিদিন প্রকাশিত হত The Atlantic Daily Bulletin পত্রিকা যা খবর, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি প্রকাশের পাশাপাশি ঐ দিনের যাত্রীদের খাবার তালিকা প্রকাশ করত।
১৯) বিজলী বাতি ছিল ১০,০০০ মত।
২০) প্রতিদিন ব্যবহার হত ১৪,০০০ গ্যালন পানীয় জল ।
২১) জাহাজ সম্পূর্ন ডুবে যেতে সময় লেগেছিল ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট । ১৪ই এপ্রিল রাত ১১-৪০মি থেকে- ১৫ই এপ্রিল সকাল ২- ২০ মিনিট ।
২২) জাহাজ ডুবীর সময় সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ছিল -২ ডিগ্রী, ফলে অধিকাংশ যাত্রী কম তাপমাত্রা বা Hypothermia র কারনে মারা যান।
২৩) বরফের চাই আঘাত হানার আগে মোট ৬ বার সতর্ক সঙ্কেত দেওয়া হয়।
২৪) ডুবে যাওয়া জাহাজ টাইটানিকের যাত্রীদের উদ্ধারে প্রথম পৌছে Carpathia জাহাজ । মজার ব্যাপার হল অপর জাহাজ Californian আরো কাছাকাছি থাকলে ও তা যাত্রীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। কারন হল জাহাজের বেতার কর্মী তখন ঘুমাচ্ছিলেন এবং জাহাজের ক্রুরা রাত ১২- ৪৫ মিনিটে আকাশে অদ্ভুত আলো ( টাইটানিক জাহাজের বিপদ সঙ্কেত) সম্পর্কে ক্যপ্টেনকে জানালেও ক্যাপ্টেন তা উপেক্ষা করেন । ক্যালিফোর্নিয়ান জাহাজ ঘটনাস্থলে আসে অনেক পরে।

২৫) ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান অভিযানে ১৯৮৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর Robert Ballard ১২, ৬০০ ফুট গভীরে ডুবে যাওয়া জাহাজ টাইটানিককে সমুদ্র তলে খুজে পান।


সুত্র-
১)http://en.wikipedia.org/wiki/RMS_Titanic ২)http://history1900s.about.com/od/1910s/a/titanicfacts.htm
৩)http://www.titanicfacts.net/the-titanic.html
৪)http://www.britannica.com/titanic/timeline?tocId=9574268
৫)http://www.titanic-facts.com/titanic-facts.html

original post

read more

পেত্রার্ক ও লরা ।। এক অতৃপ্ত অজেয় প্রেম কাহিনী ।।


“ ফর আ ওম্যান হি উড নেভার নো
ফর আ ওম্যান হি ক্যুড নেভার হ্যাভ
হি স্যুড চেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড ফরএভার...”

না সময়, না মৃত্যু তার গভীর প্রণয়ের তেষ্টা মেটাতে পারেনি এতোটুকু ।
এক ধর্মযাজকের হৃদয় মথিত করে সে অতৃপ্ত প্রণয়ের স্রোতস্বিনী সাতশত বছর আগে যে কাব্যধারার জন্ম দিয়েছিলো, তার নাম “চতুর্দশপদী কবিতা” আর আজকের আমাদের মুখে যাকে মানায় “সনেট” হিসেবে । য়্যুরোপীয় রেনেঁসার যুগে যা দাঁপিয়ে বেড়িয়েছে সাহিত্যের পথঘাট ।
আর দু’শ বছর পরের শেক্সপিয়র তাকে যে মাত্রা দিয়েছেন তা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে য়্যুরোপ থেকে ভারতভুমি । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তার মোহ কাটাতে পারেননি ।
চকোলেট আর কার্ডের ব্যবসায়ীরা মিলে মানুষের ভালোবাসা, আবেগ আর রোমান্সকে পুঁজি করে ব্যবসা ফাঁদার চক্রান্ত শুরু করেছিলো যে সময়কালে, তারও বহুকাল আগে মানুষকে ভালোবাসার কথায় মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে কাব্য সমগ্র তার নাম “Rime in vita e morta di Madonna Laura” ।
কবি সেই ধর্মযাজক, লোকে যাকে ডাকে – পেত্রার্ক ।
ফ্রানসেসকো পেত্রার্ক ।
“ডার্ক এজ” ধারনার জন্মদাতা । মানবতাবাদের পিতা । গীতিময় কবিতার অনুকরনীয় আদর্শ । আর পরস্ত্রী কন্টেসা “লরা দ্য নভোস” এর অদেখা “দেবদাস” ।
ভালোবাসার অতৃপ্তি নিয়ে কেটেছে যার জীবন-যৌবন । দয়িতার কোমল মুখখানি হৃদয় কন্দরে অমূল্য মুক্তোর মতো জমা রেখে যিনি ভালোবাসায় কপর্দকহীন থেকে গেছেন আমৃত্যু ।


Statue of Petrarch on the Uffizi Palace, in Florence

কি ছিলো বিধাতার মনে ?
ইতালীর এভিগনন শহরের সেইন্ট ক্লেয়ার গীর্জায় ১৩২৭ সালের ৬ই এপ্রিল এক গুড ফ্রাইডের প্রথম প্রহরে সুতীব্র ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে যে মুখখানি, ঠিক একুশ বছর পরে সেই একই শহরে, এপ্রিলের একই তারিখে, তেমনি এক গুড ফ্রাইডের প্রথম প্রহরে সেই মুখখানিই জনমের মতো তাকে ছেড়ে গেছে । ১৩২৭ সালে সেইন্ট ক্লেয়ার গীর্জার অলটার থেকে প্রার্থনারত মুখ তুলে যে কিশোরীর অলকনন্দা শরীরে তার চোখ আটকে গিয়েছিলো, সেই চোখই আবার ১৩৪৮ সালের এপ্রিলে আটকে গেল একটি শবাধারে । তার একুশ বছর ধরে যক্ষের মতো আগলে রাখা মুক্তোটির নিস্প্রভ - শিথিল দেহে । তার “লরা”, তার গভীর গোপন সাধনার ধন ।
অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারন করেছিলেন, “স্বর্গবাসী হও” ।

লোকে বলে, ১৩২৭ সালের ৬ই এপ্রিল লরাকে দেখা পেত্রার্ক এর জন্যে, সেই প্রথম - সেই শেষ । জীবনে দ্বিতীয় বার আর তাদের দেখা হয়নি । তার কাছের বন্ধু বিদগ্ধ কবি বোকাচ্চিও লরাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন । সব বাজে, লরা বলে কেউ নেই পেত্রার্কের জীবনে । লরা কেবল এক অশরীরির নাম যাকে কবিতাতেই মানায় ।
অনুসন্ধিৎসুরা বলেন, তা কি করে হয় !
যে পেত্রার্ক আইনজ্ঞ পিতার আদেশ শিরোধার্য করে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন আর কঠিন পৃথিবীতে এসে বলেছেন, জীবনের সাত সাতটি বছর আমি নষ্ট করেছি এমোন এক বিষয় নিয়ে যা মানুষকে শেখায় কি করে ‘আইন ও বিচার” বিক্রী করতে হয় । নিজের আত্নাকে বিক্রী করতে পারবেন না বলে, সব ছেড়ে যিনি ধর্মের ললিতবানী ছড়ানোর যে ব্রত নিয়েছিলেন যেখানে কৌমার্য্য ধরে রাখা ছিলো প্রথম শর্ত, সেখানে তার জীবনের সকল কবিতায় বিশেষ এক নারীর বন্দনা কি করে আসে যদি না কোনও নারীকে তিনি কামনা না করেন ?

অনুসন্ধিৎসুদের তোলা আঙ্গুল যে মিথ্যে তা ও বা কি করে বলা যায় যেখানে স্বয়ং পেত্রার্ক লরার মৃত্যুর পরে লেখা “লেটার টু পসটেরেটি” তে তা স্বীকার করেছেন এই বলে, “ আমার ফেলে আসা যৌবন থেকে শুরু করে এখোনও আমি যাতনা সহ্য করে চলেছি এক উদ্দাম, পবিত্র কিন্তু অধরা এক এবং একমাত্র ভালোবাসার । তার অকাল মৃত্যু আমার জীবন তিক্ততায় ভরে দেবে সত্য কিন্তু তা আমার বুকের ভেতরে ধিকিধিকি জ্বলা তুষের আগুনকেও হয়তো নেভাতে সাহায্য করবে । আমি যদি বলতে পারতাম, আমি কখোনই রক্তমাংশে গড়া এক নারীর প্রতি প্রলুব্ধ হইনি তাহলে তা হবে এক চরম মিথ্যে বলা ।”
নিজের অঙ্গীকারে পেত্রার্ক যে অবিচল থাকতে পারেননি এ তারই প্রমান । লরার অশরীরি প্রেম তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বাস্তবের বেলাভুমিতে । পেত্রার্কও যে রক্তমাংশে গড়া একজন মানুষ, এই একতরফা প্রেম তারই বারতা ।
১৩০৪ সালের ২০ শে জুলাই ইতালীর তুসকানী এলাকার আরেজ্জো শহরের গার্ডেন ষ্ট্রীটে সোমবারের এক সকালে পেত্রার্ক নামে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিলো, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সে ই হয়ে উঠেছিলেন য়্যুরোপ রেনেসাঁর প্রবাদ পুরুষ । চিহ্নিত হয়েছেন 'ফাদার অব হিউম্যানিজম' মানবতাবাদের জনক হিসেবে । মাত্র বারো বছর বয়সে শুরু করে য়্যুনিভার্সিটি অব মন্তেপেলিয়র এবং বোলগনায় শেষ করেছেন আইনের পড়া । লেখালেখির শুরুও তখোন থেকে । আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তার আর আইনজ্ঞ হয়ে ওঠা হয়নি । বরং হয়ে উঠেছেন ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন নির্মোহ ধর্মযাজক ।
তিনিই প্রথম ধ্রুপদী সংস্কৃতি আর খ্রীষ্টান ফিলসফির বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার বই “সেক্রেটাম মিয়্যুম” এ তিনি দেখিয়েছেন, অনাধ্যাত্মিকতা (সেক্যুলারিজম)সৃষ্টিকর্তার সাথে বিশুদ্ধ সম্পর্ক নির্মানে সবসময় বাঁধা হয়ে ওঠেনা ।বরং পেত্রার্ক তর্ক টেনেছেন এই বলে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সকল প্রজ্ঞা এবং কার্যকর সৃষ্টিমুখী জ্ঞান দান করেছেন । তাহলে মানুষ কেন শুদ্ধ ও পূর্ণ হয়ে উঠবেনা ? তার এই মন্ত্রই ছিলো য়্যুরোপীয় রেনেসাঁর চালিকা শক্তি ।
“Mont Ventoux” পর্বত আরোহন করে তার উপলব্ধি হয়েছিলো, কেবলমাত্র বাইরে ছড়ানো অসীম প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের চেয়ে নিজের ভেতরের আত্মিক সৌন্দর্য্য অনেক বেশী সুন্দর । এমোন কি “প্যাগান” ফিলসোফারদের সাথেও আর এই উপলব্ধি মিলে যায় ।
রেনেসাঁ পূর্ব য়্যুরোপে চার্চ শাসিত সময়কালকে বুদ্ধিচর্চ্চার অন্ধকার সময় হিসেবে তুলনা করেছেন তিনি । যা থেকে সভ্য মানুষ আজ “ডার্ক এজ” শব্দটির সাথে পরিচিত । তিনি দৃঢ়তার সাথে পুরাতন ধারনা ভেঙ্গে কেবল মানবাত্মার জয়গান গেয়েছেন । যা য়্যুরোপীয় রেনেসাঁকে বুদ্দিদীপ্ত ভাবে ফুলের মতো ফুঁটে উঠতে শিখিয়েছে । তাই ইতিহাস তাকে চিহ্নিত করেছে 'ফাদার অব হিউম্যানিজম' বা মানবতাবাদের জনক হিসেবে ।
বিখ্যাত রোমান জেনারেল “সিপ্পিও আফ্রিকানাস” এর উপর ভিত্তি করে ল্যাটিন ভাষায় লিখিত তার প্রথম বিশাল বই “আফ্রিকা” তাকে এনে দেয় য়্যুরোপ “সেলেব্রিটি”র সম্মান । রোমের পবিত্র “ক্যাপিটল’য়ে স্মরনকালের ইতিহাসের প্রথম বিদগ্ধ কবি “poet laureate” হিসেবে তাকে ১৩৪১ সালের ৮ই এপ্রিল “লরেল” মুকুট পড়ানো হয় । লোকে বলে এই “লরেল” শব্দটি থেকেই পেত্রার্ক “লরা” নামটি আবিষ্কার করেছেন । লরা কোনও রক্তমাংশের মানবী নয় ।
অথচ “Canzoniere ("Songbook") এবং “Rime in vita e morta di Madonna Laura” তার এই বিখ্যাত অনুপমীয় কবিতার বইগুলি সে কথা বলেনা । আবার সন্দেহও ঘোচেনা মানুষের, যেখানে একজন যাজক পেত্রার্ক নিজেই লিখেছেন, “ ঈশ্বরের প্রার্থনা আর উপবাসের পথেই আমার চলা । আমি প্রতিজ্ঞিত যে, কোনও নারী সংশ্রব নয় এমোন কি সামাজিক সৌজন্য বিনিময়ের কারনেও ।”
কোনটি ঠিক ? পেত্রার্কের কথা, না পারিপার্শ্বিক প্রমান সমূহ ?

কে এই লরা ?
পেত্রার্কের জীবনের সঞ্জীবনী সুধা, তার প্রেম ।

বাস্তবের নাকি কল্পনার ?
আসলে পেত্রার্কের “লরা” যে কে, এ নিয়ে রহস্যের জাল বোনাই গেছে শুধু । কেউ বলেন - যে “লরেল” পাতার দ্বারা ইতিহাসের প্রথম বিদগ্ধ কবি হিসেবে তিনি আদৃত হয়েছিলেন, তারই অন্ধমোহে পরেছেন তিনি ।
আবার প্রচুর প্রমান রয়েছে “লরা” নামের এক মানবীর উপস্থিতির । আসলেই লরা বলে কেউ একজন আছেন, যিনি বিবাহিতা, কাউন্ট হিউ দ্য সাদে’র স্ত্রী । পেত্রার্কের জন্মের ৬বছর পরে এভিগনন শহরেরই এক “নাইট” পরিবারে যার জন্ম । মাত্র ১৫ বছর বয়েসে তার পরিনয় ঘটে যায় কাউন্ট হিউ দ্য সাদে’র সাথে । এর ঠিক দু’বছর পরে ১৩২৭ সালের এপ্রিলের ৬ তারিখ এক গুড ফ্রাইডের সোনালী সকালে পেত্রার্ক তার এই অজেয় প্রেমাষ্পদের দেখা পান । তখোন লরা এক সন্তানের জননী । সেইন্ট ক্লেয়ার দ্য এভিগননন গীর্জার চত্বরে প্রার্থনা সভায় লরার রূপ তাকে যে মুগ্ধতার আবেশে নেশাগ্রস্থ করে ফেলেছিলো এক লহমায় তা থেকে পেত্রার্কের রেহাই মেলেনি আমৃত্যু । সেই মুখ তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে আজীবন । অনেকেই বলেন “লভ এ্যাট ফার্ষ্ট সাইট” এবং সেই প্রথম, সেই শেষ । পেত্রার্ক কি তাহলে প্লেটোনিক ভালোবাসার চোরাবালিতে আটকা পড়েছিলেন ? হয়তো । কারন পেত্রার্কের সকল সনেট ছিলো লরাকে ঘিরেই । তার প্রথম দেখা প্রেমের দিনটিকে উদ্দেশ্য করে তিনি সনেট লিখেছেন –

সেদিন ছিলো ম্লান হয়ে যাওয়া দিন
সূর্য্যের ও, অনুকম্পায় স্রষ্টার প্রতি ।
হে আমার প্রিয়ে, আমি ধরা পড়ে গেছি
তোমার চোখে প্রথম দেখেছি যখোন
সেই কণক রঙীন হিরন্ময় আভা,
সূর্য্যও ছিলো যেখানে নতমুখী, ম্লান ।
(লেখক কর্তৃক অনুদিত)
একি শুধুই লরেল পাতার মোহময় কল্পনা ? কোন মানবীর অদ্ভুত হিরন্ময় চোখের চকিত চাহনির কোনও ছায়া পড়েনি সেখানে ?

পড়েছে । কেউ কেউ বলেন, পেত্রার্ক আর লরা প্রায়ই দেখা করতেন গোপনে । আর লরাই তাকে বলেছেন, পেত্রার্ক যেন এমোন কিছু না করেন যাতে তাদের সম্মানহানী হয় ।
তার লেখা "Secretum" এ পেত্রার্ক স্বীকার করেছেন, সঙ্গত কারনেই তিনি লরা কতৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন । কারন লরা এক বিবাহিত নারী, পরস্ত্রী । আর সে কারনেই “তবুও আমার সকল কবিতা তোমাকেই ঘিরে” র মতো লরা্ ঝরেছে পের্ত্রাকের লেখায়, কবিতায় । লরার উপস্থিতি পেত্রার্ককে দিয়েছে স্বর্গীয় আনন্দ । প্লেটোনিক প্রেম ?
কিন্তু সারাবিহীন সে প্রেম তাকে বিদ্ধ করেছে অসহনীয় আর অতৃপ্ত আকাঙ্খার যন্ত্রনায় । নিজের ভেতরে দ্বৈততায় ভুগেছেন তিনি । একদিকে দয়িতের সাথে মিলনে উদগ্রীব সমর্পিত এক প্রেমিক, অন্যদিকে এক অতীন্দ্রিয়বাদী ক্রিশ্চিয়ান, এই দু’য়ের দ্বন্দ পেত্রার্ককে চেনা অসম্ভব করে তুলেছে ।
ভালোবাসা খুঁজতে গিয়ে পেত্রার্ককে অতিক্রম করতে হয়েছে অন্তহীন যন্ত্রনার পথ, একাকী ।
সবকিছু মিলিয়ে কারো কাছেই স্পষ্ট নয়, লরা কি সত্যসত্যিই এই ধরিত্রীর কেউ, নাকি কল্পনায় আঁকা এক দেবীর নাম ।
বাস্তবের যে লরাকে আমরা পেয়েছি তার অকাল প্রয়ান ঘটেছে মাত্র আটত্রিশ বছর বয়েসে । এগারো সন্তানের জননী তখন তিনি । কেউ বলেন, সন্তান জন্মদানের ধকল সইতে সইতে তাকে রাজব্যাধি “যক্ষা”য় পেয়ে বসেছিলো আর তাই ই তাকে খসিয়ে নিয়ে গেছে পেত্রার্কের জীবনের সতেজ বৃক্ষ থেকে । আবার এমোন ধারনাও পোষন করেন কেউ, য়্যুরোপ জুড়ে সে সময়ে যে কালান্তক প্লেগের মহামারী দেখা দিয়েছিলো তার ঢেউয়ে হারিয়ে গেছেন তিনি ।
তার মৃত্যুর কার্য্যকরন আমাদের হয়তো কোনও দোলা দেবেনা । আমাদের যা দোলা দেবে তা হলো লরার সমাধি । কথিত আছে, তার মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পরে এক মানবতাবাদী “Maurice Sceve” এভিগনন শহরে ভ্রমন করতে এসে লরার সমাধি উন্মোচন করে খুঁজে পান একটি সীসার তৈরী বাক্স । যেখানে সযতনে রক্ষিত রয়েছে হৃদয় বিদীর্ণকারী ভঙ্গিমায় রত এক নারীমুর্তি আর তার নীচে পেত্রার্কের লেখা এক ফালি সনেট ।
একি ভালোবাসার প্রত্যুত্তর দিতে অক্ষম এক নারীর অব্যক্ত হাহাকার ? উদ্দাম উল্লাসে ছুটে চলা নদী বাঁধা পেলে যেমন মরে যায় দুঃখে, এ অকাল মৃত্যুও কি তাই ? হয়তো এক অনাগত কাল জবাব দেবে তার........
original post
read more

পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়া একটি দেশ ...

by আহমেদ জী এস
Map of the Republic of Biafra — 1967 – 1970)

“সূর্য্যদয়ের দেশ” গানটি বুকে নিয়ে যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিলো একটি অন্ধকার মহাদেশে একদিন, সে রাষ্ট্র আলোর মুখ দেখতে পায়নি খুব বেশীদিন । আতুর ঘরেই তার মৃত্যু ঘটে গেছে মাত্র আড়াই বছর বয়সেই ।
জাতীয় সঙ্গীত ছিলো তার , ছিলো পতাকায় লাল, সবুজ আর কালোর মাঝে উদিত সূর্য্যের মুখ ।ছিলো নিজস্ব কারেন্সী ।




Biafran Currency (c.1968)


বেঁচে থাকেনি কেন সে !
কারন তার জন্মই যে হয়েছিলো রক্তের স্রোতে ভেসে যেতে ।রাজনীতির পাশা খেলায় সে যে ছিলো দাবার গুটি । কেবল মাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিশ্বরাজনীতি যুগে যুগে বিষমাখা তীরে জগতজুড়ে অসহায় মানুষ মারার যে খেলা চালিয়ে এসেছে , এটি তারই একটি সংস্করন । জাতিস্বত্তা নয়, সংস্কৃতির অটুট বন্ধন নয়, ধর্মের অচ্ছেদ্দ্য বেড়াজাল নয় যেখানে কেবল স্বার্থই প্রধান নিয়ামক । বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম যেখানে পরাভূত নিত্যকাল ।

লেঃ কর্ণেল চুকুইয়েমেকা ওদুমেগেউ ওজুকু , সবে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রক “রেডিও বায়াফ্রা”য় দেয়া ভাষনে যখোন বলেন – “ আমি আগেও যা বলেছি আজ আবার তার পূনরাবৃত্তি করতে চাই, যে যুদ্ধ আমরা শুরু করেছি তা সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরী করে দেয়া একটি যুদ্ধ । এ যুদ্ধ বৃটেন আর রাশিয়ার অশুভ আঁতাতের সরাসরি নির্দেশনায় এবং আমেরিকার মৌন সম্মতিতে মঞ্চায়িত হচ্ছে পর্দার আড়াল থেকে । আমি দেখতে পাচ্ছি , তাদের কাছে মুক্তি আর স্ব-সংকল্পের কথা গায়ের চামড়ার রংয়ের সাথে শর্তাবদ্ধ । আর তাই আমাকে বলতেই হচ্ছে, কালো চামড়াদের জন্যে একটা বায়াফ্রা চাই । আজ যদি একটি বায়াফ্রা শ্বাসরূদ্ধ হয়ে মরে তবে ভবিষ্যতে ‌এ থেকে আরো বায়াফ্রা জন্ম নেবেই।” তখন সবে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রটির পক্ষে-বিপক্ষে যতো তত্ব আর তথ্যের মুখে ছাই পড়ে যায় ।

হ্যাঁ, যে রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডটুকুর কথা বলছি নাম তার “বায়াফ্রা”। কৃষ্ণ আফ্রিকার কৃষ্ণকায় নাইজেরিয়া নামের ফেডারেল দেশটির দক্ষিন-পূর্বাঞ্চল ঘিরে যা উদয় হয়েছিলো সূর্য্যের মতো ।
এর জন্মের ইতিহাস বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম নিয়ে যে ভাবে চিত্রিত হয়ে আছে তা হয়তো আসল সত্য নয় ।

যুক্তরাজ্যের কলোনীর খাতা থেকে নাম খারিজ হয় নাইজেরিয়ার ১৯৬০ সালে । নতুন জন্ম নেয়া অন্যান্য আফ্রিকান দেশগুলোর মতো এর সীমানা জাতিগত ভাবে প্রতিবিম্বিত হয়নি । নানা ধর্মভিত্তিক জাতি আর সম্প্রদায় নিয়ে বিচিত্র সাজ ছিলো এর । তাই উত্তরের মরুভূমি অঞ্চল অধ্যুষিত ছিলো আধা স্বায়ত্ব-শাষিত ফিউডাল মুসলিম রাজ্যগুলি নিয়ে । প্রধানত ক্রীশ্চান এবং সর্বপ্রানবাদী (Animist)গোত্রগুলি অধ্যুষিত করে রেখেছিলো এর দক্ষিন অঞ্চল ।
উত্তরে ছিলো “হাউসা” এবং “ফুলানী” সম্প্রদায়ের বাস, দক্ষিন পশ্চিম ছিলো “ইরুবা”দের দখলে আর “ইগবো” সম্প্রদায় ছড়িয়ে ছিলো দক্ষিন পূবে ।
১৯৬৩-৬৪ সালের নাইজেরিয়ান সেনস্যাস ক্রাইসিস, ১৯৬৪ সালের ফেডারেল ইলেকশান ক্রাইসিস এবং ১৯৬৫ সালের ‌ওয়েষ্টার্ণ নাইজেরিয়ান ইলেকশান ক্রাইসিস সব মিলে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিলে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারীতে সামরিক বাহিনীর হাতে চলে আসে ক্ষমতা । আর সুযোগ বুঝে পুবের ইগবো সম্প্রদায়ের একটি দল নাইজেরিয়ার তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী স্যার আবুবাকর তাফাওয়া বালিউয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী স্যার আমেদু বেল্লু সহ ৩০ জন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার মধ্যে দিয়ে প্রথম সামরিক ক্যু’টি ঘটিয়ে ফেলে ।
১৯৬৬ সালের ১৫ ই জানুয়ারীর দুপরে রেডিও কাদুনা থেকে ক্যুদেঁতা Major Nzeogwu এর কন্ঠে ভেসে আসে -
“In the name of the Supreme Council of the Revolution of the Nigerian Armed Forces, I declare martial law over the Northern Provinces of Nigeria.
The Constitution is suspended and the regional government and elected assemblies are hereby dissolved.”

একই বছরের জুলাই মাসে উত্তরের সামরিক ইউনিট আর একটি পাল্টা ক্যু এর জন্ম দেয় । উদ্দেশ্য ফেডারেল নাইজেরিয়াকে একীভূত রাখা । সামরিক কর্মকতাদের মুসলিম অংশটি ক্ষুদ্র “আনগা” সম্প্রদায় থেকে আগত ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বী জেনারেল ইয়াকুবু গোউন কে এই ফেডারেল মিলিটারী গভর্নমেন্ট (এফ এম জি )এর প্রধান ঘোষনা করেন । সেপ্টেম্বরের মধ্যেই উত্তরাঞ্চলে মারা পড়ে প্রায় ত্রিশ হাযার ইগবো এবং পূবের শহরগুলিতে গৃহযুদ্ধের এই ডামাঢোলে আরো মারা পড়ে উত্তরাঞ্চলীয় মুসলিমরা । রক্তের গঙ্গায় ভেসে যায় কৃষ্ণদেশটি ।
গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বেড়ে যেতে পাশ্ববর্তী ঘানার আবুরী শহরে বৈঠকে বসলেন সকল অঞ্চলের সামরিক জান্তা আর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা । বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো একটি শিথিল কনফেডারেশান গড়ে তোলার । নাইজেরিয়ার চারটি অঞ্চলকে ভেঙ্গে ১২ টি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ করা হয় । এতে প্রাকৃতিক সম্পদ বঞ্ছিত উত্তরাঞ্চলীয়রা অসাম্যের শিকার হবেন ভেবে অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন । পশ্চিমাঞ্চলের এক নেতা হুমকি দিলেন , যদি এর পরেও পূর্বাঞ্চল আলাদা হয়ে যায় তবে তারাও আলাদা হয়ে যাবেন । একথায় উত্তরাঞ্চলীয়রা তাদের সাথে তাল মেলালেন ।
কারনটা আর কিছু নয় – অর্থনৈতিক । নাইজেরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলি যা দেশের একমাত্র প্রধান আয়ের উৎস তা সবই দেশের দক্ষিনাঞ্চলে । গৃহযুদ্ধ একদিনে লাগেনা । এর ক্ষেত্র তৈরী হয় দীর্ঘকাল ধরে চলা বঞ্ছনা থেকে ।

ইতিহাসের এই ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের পেছনের কারনগুলি নিয়ে ইতিহাসবিদ আর গবেষকদের কিম্বা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মন্তব্যগুলিতে সত্যটি ঠিক ফুটে ওঠেনি । কেউ একে খ্রীষ্টান-মুসলমানদের দ্বন্দ হিসাবে প্রচারে সচেষ্ট হয়েছেন । দেখা গেছে স্বীকৃতি না দিলেও ইজরায়েল , রোডেশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ফ্রান্স, পর্তুগাল এমোন কি ভ্যাটিকান-সিটি বিদ্রোহী বায়াফ্রানদের সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে প্রচুর । কেবলই রাষ্ট্র নয় - জয়েন্ট চার্চ এইড, হোলি ঘোষ্ট ফাদারস অব আয়ারল্যান্ড, কারিতাস ইন্টার ন্যাশনাল, আমেরিকান ক্যাথলিক রিলিফ সার্ভিস এর মতো সাহায্যকারী খ্রীষ্টান সংস্থাগুলো পিছিয়ে ছিলোনা মোটেও । হতে পারে মানবতার কারনেই এই সাহায্য এসেছে কিন্তু এদের সকলের পরিচিতি অন্য রকম ভাবতে বাধ্য করে অনেকটাই । আর যুদ্ধের প্রোপাগান্ডার পেছনে এটাও একটা কারন ।

ইউএস মেরিন কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজের ছাত্র মেজর আবুবাকার আতোফারাতি নাইজেরিয়ার এই গৃহযুদ্ধের কারন, ষ্ট্রাটেজী এবং এ থেকে শিক্ষা সম্পর্কে তার গবেষনাপত্রে লিখেছেন –
“ফেডারেশান অব নাইজেরিয়া নামে আজকের দিনে আমরা যাকে চিনি তা কিন্তু কোনও কালেই সত্যিকার ভাবে সমশ্রেনীভুক্ত ছিলোনা । এখানে মানুষ-গোত্র-ভাষা আর ধর্ম এতো বেশী ভাবে বিচিত্র আর বিভক্ত ছিলো যে তা সম্ভব ও ছিলোনা । কেবল মাত্র এর প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখতেই এর কলোনিয়াল শাসকেরা এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় বিচিত্রতাকে উড়িয়ে দিয়ে একে একটি ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ করে রাখার কুটনীতিতে অটল ছিলেন । তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে উত্তর আর দক্ষিনকে একীভুত করে ফেললেন ১৯১৪ সালে । অথচ দুই প্রান্তে দুইটি আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুললেন । এর ফলে কেবল মাত্র দেশের নামটি ছাড়া মানুষগুলির ভেতর “কমন” আর কিছু রইলোনা । পরিনামে গেড়ে বসলো বিভক্তি, ঘৃনা, অসুস্থ প্রতিদ্বন্ধিতা আর উৎকট অর্থনৈতিক বৈষাম্য ।
জাতীয়তাবাদের ধারনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উন্মেষ ঘটেছিলো জাতীয় ঐক্যের বদলে জাতি, গোত্র, ভাষার উপর ভিত্তি করে । ফলে কলোনিয়াল প্রভুদের বিরূদ্ধে জনগণের সম্মিলিত ঐক্যের সাধন সম্ভব হয়নি কখনও । অনুন্নত আর অশিক্ষিত ভুখন্ডগুলোর বেলায় যা ঐতিহাসিক সত্য । আর একারনেই রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রভুত্ব আর সামরিক প্রাধান্য কুক্ষিগত করতে একটি অঞ্চল বা গোত্র আর একটির উপর টেক্কা মারার সংগ্রামে মেতে ওঠে যা সময়ের সাথে সাথে বেগবান হতে থাকে । আর শেষমেশ সে সংগ্রাম পর্যবসিত হয় ক্যু, কাউন্টার-ক্যু আর রক্তক্ষয়ি গৃহযুদ্ধে ।
এই সত্যটাই এক এক করে সত্যি হতে শুরু করে নাইজেরিয়ার ভাগ্যে । ১৯৬৭ সালের ৬ই জুলাইতে পুরোমাত্রায় শুরু এই যুদ্ধের । ১৯৬০ সালে অর্জিত স্বাধীনতার পর থেকেই অস্থিরতা, অস্বচ্ছ শান্তির আবহ সব মিলিয়ে দেশটির বাসিন্দাদের মনে যে খটকা জেগে উঠেছিলো তার শেষ পরিনতি এই গৃহযুদ্ধ । যদিও এর বীজ প্রোথিত হয়েছিলো দেশটির জিওগ্রাফি, হিস্ট্রি, কালচার এবং ডেমোগ্রাফির রকমারির কারনে ।”

তার এই বক্তব্যের সাথে অনেক মিল খুঁজে পাবেন আপনি ১৯৬৭ সালে জন্ম হওয়ার পরপরই “গভর্ণমেন্ট অব দ্য রিপাবলিক অব বায়াফ্রা” কর্তৃক প্রকাশিত এক ঘোষনায় । সেখানে প্রকাশিত বক্তব্য এরকম –
“ভয়-ভীতি, তিক্ততা আর ঘৃনা থেকে মুক্ত একটি জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে চোদ্দ মিলিয়ন জনতা তাদের নিয়তিকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন।”
“ আমরা বায়াফ্রানরা দেশের যে কোনও অঞ্চলের লোকদের তুলনায় সর্বাপেক্ষা বেশী মানব আর বস্তু সম্পদ জুগিয়েছিলাম ফেডারেশানটির জাতীয় ঐক্যের জন্যে।”
“১৯১৪ সালে যখোন ব্রিটিশ শাসকেরা উত্তর আর দক্ষিনকে এক করে ফেললেন তখন থেকেই আমরা বায়াফ্রানরা ছড়িয়ে পড়েছি দেশটির সবখানে- উত্তরের ফুলানী-হাউসা আর পশ্চিমের ইরুবা এলাকাতেও । সেখানে আমরা শিল্প আর ব্যবসা-বানিজ্যের নতুন নতুন পথ খুলে দিয়েছি, প্রতিষ্ঠা করেছি উপাসনালয় আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যা আর কোনও গোত্রই এ পর্য্যন্ত দেশের জন্যে করেনি।”
“ বায়াফ্রানদের যোগ্যতা আর তাদের কর্মক্ষমতার সম্ভাবনা তাদের কে পশ্চাদপদ প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা করে রেখেছিলো।”
“ আর এইসব বৈষ্যম্যের কারনেই হিংসা আর শত্রুতা বায়াফ্রানদের পিছু ছাড়েনি ।”
“ আমরা ফুলানী- হাউসা সম্প্রদায়ের উচ্চশ্রেনী যারা উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রনকারী আর ফেডারেল সরকারের উপর প্রভুত্বকারী, তাদের প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা ভাবনার ঘোরতর বিরোধীতা করেছি ।”
View this link
1969, at parade to celebrate the Second Independence Anniversary of Biafra; General Efiong is fourth from left; General Ojukwu, Head of State, is fifth from left.

পূর্ব থেকেই অনুমিত “ইগবো” সম্প্রদায়ের (পরবর্তীতে বায়াফ্রান সরকার ) এই মনোভাবের কারনেই ১৯৬৭ সালের জানুয়ারীতে ঘানার আবুরী শহরে বিবাদমান সকল অঞ্চলের সামরিক জান্তা আর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠকে একটি শিথিল কনফেডারেশান গড়ে তোলার যে সিদ্ধান্ত হয় তার প্রতি সন্দেহ থেকেই যায় পশ্চিম আর উত্তরাঞ্চলের ।
আর সত্য সত্যিই তা ঘটে যায় ১৯৬৭ সালের ৩০ শে মে মাসে । সংখ্যাগরিষ্ঠ ইগবো সম্প্রদায় ফেডারেশান অব নাইজেরিয়ার পূর্ব-মধ্যাঞ্চল, দক্ষিন-পূর্বাঞ্চল আর নদী অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে “বায়াফ্রা” নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষনা দেন । সাথে সাথেই গ্যাবন, হাইতি, আইভরি কোষ্ট, তাঞ্জানিয়া আর জাম্বিয়া একে স্বীকৃতি দিয়ে বসে ।
বহু রক্তক্ষয়ী কান্ডের পরে সে রাষ্ট্রটি ১৯৭০ সালের ১৫ ই জানুয়ারীতে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আবার মুছে যায় ।

পূর্ব নাইজেরিয়ার সামরিক গভর্ণর লেঃ কর্ণেল ওজুকু স্বাধীনতা ঘোষনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন – “Now, therefore, I, Lieutenant-Colonel Chukwuemeka Odumegwu Ojukwu, Military Governor of Eastern Nigeria, by virtue of the authority, and pursuant to the principles, recited above, do hereby solemnly proclaim that the territory and region known as and called Eastern Nigeria together with her continental shelf and territorial waters shall henceforth be an independent sovereign state of the name and title of "The Republic of Biafra”.
নতুন রাষ্ট্র বাযাফ্রার প্রথম রাজধানী ঠিক করা হয় “ইনুগু” শহরকে ঘিরে । স্বাধীনতা ঘোষনার পাঁচ মাসের মাথাতেই ফেডারেল বাহিনীর হাতে শহরটি দখল হয়ে যায় । পরে এক এক করে আবা, উমুহাইয়া আর শেষে ওয়েরী শহরে রাজধানী স্থানান্তর করতে হয় তাদের । জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে নাইজেরীয় সরকার শুরু থেকেই বায়াফ্রার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ফেলেন । আর সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হয় জুলাইতে । প্রথম দিকে বায়াফ্রানরা যুদ্ধে এগিয়ে থাকলেও নাইজেরীয় বাহিনীর বিমান, স্থল এবং জলপথে আক্রমনের মুখে তাদের রাষ্ট্র সীমানা সংকুচিত হয়ে আসে । ১৯৬৮সালের সেপ্টেম্বরে ফেডারেল বাহিনীর “ফাইনাল অফেনসিভ” আক্রমন বায়াফ্রানরা প্রতিহত করে দিলেও দক্ষিনদিক থেকে আর একটি “সাউদার্ণ অফেনসিভ” ঠেকাতে পারেনি তারা । যুদ্ধের খরচ জোগানোর মূল উৎস তেল ক্ষেত্রগুলি তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলে রসদ আর খাদ্যাভাবের মুখে পড়ে যায় শিশু রাষ্ট্রটি । ধারনা করা হয় এর ফলে তীব্র অপুষ্টিতে মারা পড়ে ১ মিলিয়ন মানুষ । খাদ্যের সন্ধানে মানুষ ছুটতে থাকে দিগবিদিক ।

Biafran refugees leaving Owerri; May, 1968.

১৯৬৯ সালের ৩০শে জুন নাইজেরীয় সরকার বায়াফ্রায় পাঠানো রেডক্রসের সব ধরনের সাহায্য বন্ধ করে দেন । দু’সপ্তাহ পরে কেবল মাত্র ঔষধপত্র সহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের অনুমতি দেয়া হয় শুধুমাত্র যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইন এলাকাগুলিতে ।
অবস্থা অনুকুল নয় দেখে ওজুকু অক্টোবর মাসে ইউনাইটেড ন্যাশনস এর কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনেন ।কিন্তু ফেডারেল সরকার তাকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করতে বলেন ।ডিসেম্ভরের মধ্যেই এফ-এম-জি’র “ব্লাক স্কর্পিয়ন” নামে ভূষিত জনপ্রিয় কর্ণেল বেঞ্জামিন আদিকুনলের ৩নং মেরিন কমান্ডো ডিভিশান অবশিষ্ট বায়াফ্রাকে দু’ভাগে ভাগ করে কোনঠাসা করে ফেলে ।
১৯৭০ এর ১৫ ই জানুয়ারীতে সারেন্ডার করার মূহুর্তে বায়াফ্রা এভাবে আকারে বড় রকমের সংকুচিত হয়ে পড়ে আর প্রকট খাদ্যাভাব এর কারনে মানুষ না খেয়ে মারা যেতে থাকে । লেঃ কর্ণেল ওজুকু পালিয়ে যান দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী আইভরি কোষ্টে ।যাওয়ার আগে ওজুকু তার চীফ অব ষ্টাফ জেনারেল ফিলিপ ইফিয়ঙ কে "officer administering the government" হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে রেখে যান পিছনে । ১২ই জানুয়ারী’ ১৯৭০ এর ১২ই জানুয়ারী ইফিয়ঙ যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানান এবং এফ-এম-জি’র কাছে আত্মসমর্পন করেন । বায়াফ্রা আবার নাইজেরিয়ার ভুখন্ডে একীভূত হয়ে যায় ।

22 Jan 1970, Lagos, Nigeria --- Nigerian Federal Leader Major General Yakubu Gowon (wearing peak cap with red band) addresses a press conference in Lagos.


16 Jan 1970, Lagos, Nigeria --- Lagos, Nigeria: Three members of an International Team of Observers reporting in Lagos, right to left, Col. Douglas Cairns of Great Britain; Yngye Berlund of Sweden; and Brig. John Drewery of Canada. As part of an eight-man team that visited the war zones, they said they neither saw nor heard of any evidence of genocide in the eastern Region Nigeria, formerly Biafra.

সারা পৃথিবী জুড়ে বায়াফ্রায় সাধারন মানুষের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ওঠেছিলো সেদিনগুলিতে । মানবতাবাদী সকল শ্রেনী এককন্ঠ হয়ে পড়েছিলেন । তখনকার বাংলাদেশেও বামপন্থী দলগুলো পিছিয়ে ছিলোনা এর সাথে গলা মেলাতে । গণহত্যাকে গণহত্যাই বলতে হয়, বিবেকবান মানুষের কাছে এর কোন ধর্ম নেই, জাত নেই, ভুখন্ড নেই ।

আফ্রিকার বায়াফ্রায় যখোন যুদ্ধ শেষ তখন এশিয়ার দক্ষিন পূবের বাংলাদেশে ঘটে চলেছে এ্কই কাহিনীর পূনরাবৃত্তি । শোষন বজায় রাখা । ধর্মের দোহাই দিয়ে যা হয়েছিলো সেখানে, তা গণহত্যা ।

আমাদের যা শেখার তা হলো, জাতিস্বত্তা নয়, সংস্কৃতির অটুট বন্ধন নয়, ধর্মের অচ্ছেদ্দ্য বেড়াজাল নয় পৃথিবী জুড়ে কেবল স্বার্থই রাজনীতির প্রধান নিয়ামক । বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম যেখানে পরাভূত নিত্যকাল ।
নইলে বায়াফ্রার গণহত্যায় যেখানে খ্রীষ্টান দুনিয়া সোচ্চার হয়েছিলো একসাথে, সেখানে বাংলাদেশের মুসলিম মানুষগুলির হত্যায় একটিও মুসলিম দেশ এগিয়ে আসেনি কেন ?
ইতিহাসবিদরা, গবেষকরা কি বলবেন ?
আপনারাই বা কি ভাবে দেখবেন তাকে ???
original post
read more

পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়া একটি দেশ ...

by আহমেদ জী এস
Map of the Republic of Biafra — 1967 – 1970)

“সূর্য্যদয়ের দেশ” গানটি বুকে নিয়ে যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিলো একটি অন্ধকার মহাদেশে একদিন, সে রাষ্ট্র আলোর মুখ দেখতে পায়নি খুব বেশীদিন । আতুর ঘরেই তার মৃত্যু ঘটে গেছে মাত্র আড়াই বছর বয়সেই ।
জাতীয় সঙ্গীত ছিলো তার , ছিলো পতাকায় লাল, সবুজ আর কালোর মাঝে উদিত সূর্য্যের মুখ ।ছিলো নিজস্ব কারেন্সী ।




Biafran Currency (c.1968)


বেঁচে থাকেনি কেন সে !
কারন তার জন্মই যে হয়েছিলো রক্তের স্রোতে ভেসে যেতে ।রাজনীতির পাশা খেলায় সে যে ছিলো দাবার গুটি । কেবল মাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিশ্বরাজনীতি যুগে যুগে বিষমাখা তীরে জগতজুড়ে অসহায় মানুষ মারার যে খেলা চালিয়ে এসেছে , এটি তারই একটি সংস্করন । জাতিস্বত্তা নয়, সংস্কৃতির অটুট বন্ধন নয়, ধর্মের অচ্ছেদ্দ্য বেড়াজাল নয় যেখানে কেবল স্বার্থই প্রধান নিয়ামক । বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম যেখানে পরাভূত নিত্যকাল ।

লেঃ কর্ণেল চুকুইয়েমেকা ওদুমেগেউ ওজুকু , সবে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রক “রেডিও বায়াফ্রা”য় দেয়া ভাষনে যখোন বলেন – “ আমি আগেও যা বলেছি আজ আবার তার পূনরাবৃত্তি করতে চাই, যে যুদ্ধ আমরা শুরু করেছি তা সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরী করে দেয়া একটি যুদ্ধ । এ যুদ্ধ বৃটেন আর রাশিয়ার অশুভ আঁতাতের সরাসরি নির্দেশনায় এবং আমেরিকার মৌন সম্মতিতে মঞ্চায়িত হচ্ছে পর্দার আড়াল থেকে । আমি দেখতে পাচ্ছি , তাদের কাছে মুক্তি আর স্ব-সংকল্পের কথা গায়ের চামড়ার রংয়ের সাথে শর্তাবদ্ধ । আর তাই আমাকে বলতেই হচ্ছে, কালো চামড়াদের জন্যে একটা বায়াফ্রা চাই । আজ যদি একটি বায়াফ্রা শ্বাসরূদ্ধ হয়ে মরে তবে ভবিষ্যতে ‌এ থেকে আরো বায়াফ্রা জন্ম নেবেই।” তখন সবে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রটির পক্ষে-বিপক্ষে যতো তত্ব আর তথ্যের মুখে ছাই পড়ে যায় ।

হ্যাঁ, যে রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডটুকুর কথা বলছি নাম তার “বায়াফ্রা”। কৃষ্ণ আফ্রিকার কৃষ্ণকায় নাইজেরিয়া নামের ফেডারেল দেশটির দক্ষিন-পূর্বাঞ্চল ঘিরে যা উদয় হয়েছিলো সূর্য্যের মতো ।
এর জন্মের ইতিহাস বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম নিয়ে যে ভাবে চিত্রিত হয়ে আছে তা হয়তো আসল সত্য নয় ।

যুক্তরাজ্যের কলোনীর খাতা থেকে নাম খারিজ হয় নাইজেরিয়ার ১৯৬০ সালে । নতুন জন্ম নেয়া অন্যান্য আফ্রিকান দেশগুলোর মতো এর সীমানা জাতিগত ভাবে প্রতিবিম্বিত হয়নি । নানা ধর্মভিত্তিক জাতি আর সম্প্রদায় নিয়ে বিচিত্র সাজ ছিলো এর । তাই উত্তরের মরুভূমি অঞ্চল অধ্যুষিত ছিলো আধা স্বায়ত্ব-শাষিত ফিউডাল মুসলিম রাজ্যগুলি নিয়ে । প্রধানত ক্রীশ্চান এবং সর্বপ্রানবাদী (Animist)গোত্রগুলি অধ্যুষিত করে রেখেছিলো এর দক্ষিন অঞ্চল ।
উত্তরে ছিলো “হাউসা” এবং “ফুলানী” সম্প্রদায়ের বাস, দক্ষিন পশ্চিম ছিলো “ইরুবা”দের দখলে আর “ইগবো” সম্প্রদায় ছড়িয়ে ছিলো দক্ষিন পূবে ।
১৯৬৩-৬৪ সালের নাইজেরিয়ান সেনস্যাস ক্রাইসিস, ১৯৬৪ সালের ফেডারেল ইলেকশান ক্রাইসিস এবং ১৯৬৫ সালের ‌ওয়েষ্টার্ণ নাইজেরিয়ান ইলেকশান ক্রাইসিস সব মিলে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিলে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারীতে সামরিক বাহিনীর হাতে চলে আসে ক্ষমতা । আর সুযোগ বুঝে পুবের ইগবো সম্প্রদায়ের একটি দল নাইজেরিয়ার তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী স্যার আবুবাকর তাফাওয়া বালিউয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী স্যার আমেদু বেল্লু সহ ৩০ জন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার মধ্যে দিয়ে প্রথম সামরিক ক্যু’টি ঘটিয়ে ফেলে ।
১৯৬৬ সালের ১৫ ই জানুয়ারীর দুপরে রেডিও কাদুনা থেকে ক্যুদেঁতা Major Nzeogwu এর কন্ঠে ভেসে আসে -
“In the name of the Supreme Council of the Revolution of the Nigerian Armed Forces, I declare martial law over the Northern Provinces of Nigeria.
The Constitution is suspended and the regional government and elected assemblies are hereby dissolved.”

একই বছরের জুলাই মাসে উত্তরের সামরিক ইউনিট আর একটি পাল্টা ক্যু এর জন্ম দেয় । উদ্দেশ্য ফেডারেল নাইজেরিয়াকে একীভূত রাখা । সামরিক কর্মকতাদের মুসলিম অংশটি ক্ষুদ্র “আনগা” সম্প্রদায় থেকে আগত ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বী জেনারেল ইয়াকুবু গোউন কে এই ফেডারেল মিলিটারী গভর্নমেন্ট (এফ এম জি )এর প্রধান ঘোষনা করেন । সেপ্টেম্বরের মধ্যেই উত্তরাঞ্চলে মারা পড়ে প্রায় ত্রিশ হাযার ইগবো এবং পূবের শহরগুলিতে গৃহযুদ্ধের এই ডামাঢোলে আরো মারা পড়ে উত্তরাঞ্চলীয় মুসলিমরা । রক্তের গঙ্গায় ভেসে যায় কৃষ্ণদেশটি ।
গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বেড়ে যেতে পাশ্ববর্তী ঘানার আবুরী শহরে বৈঠকে বসলেন সকল অঞ্চলের সামরিক জান্তা আর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা । বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো একটি শিথিল কনফেডারেশান গড়ে তোলার । নাইজেরিয়ার চারটি অঞ্চলকে ভেঙ্গে ১২ টি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ করা হয় । এতে প্রাকৃতিক সম্পদ বঞ্ছিত উত্তরাঞ্চলীয়রা অসাম্যের শিকার হবেন ভেবে অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন । পশ্চিমাঞ্চলের এক নেতা হুমকি দিলেন , যদি এর পরেও পূর্বাঞ্চল আলাদা হয়ে যায় তবে তারাও আলাদা হয়ে যাবেন । একথায় উত্তরাঞ্চলীয়রা তাদের সাথে তাল মেলালেন ।
কারনটা আর কিছু নয় – অর্থনৈতিক । নাইজেরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলি যা দেশের একমাত্র প্রধান আয়ের উৎস তা সবই দেশের দক্ষিনাঞ্চলে । গৃহযুদ্ধ একদিনে লাগেনা । এর ক্ষেত্র তৈরী হয় দীর্ঘকাল ধরে চলা বঞ্ছনা থেকে ।

ইতিহাসের এই ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের পেছনের কারনগুলি নিয়ে ইতিহাসবিদ আর গবেষকদের কিম্বা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মন্তব্যগুলিতে সত্যটি ঠিক ফুটে ওঠেনি । কেউ একে খ্রীষ্টান-মুসলমানদের দ্বন্দ হিসাবে প্রচারে সচেষ্ট হয়েছেন । দেখা গেছে স্বীকৃতি না দিলেও ইজরায়েল , রোডেশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ফ্রান্স, পর্তুগাল এমোন কি ভ্যাটিকান-সিটি বিদ্রোহী বায়াফ্রানদের সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে প্রচুর । কেবলই রাষ্ট্র নয় - জয়েন্ট চার্চ এইড, হোলি ঘোষ্ট ফাদারস অব আয়ারল্যান্ড, কারিতাস ইন্টার ন্যাশনাল, আমেরিকান ক্যাথলিক রিলিফ সার্ভিস এর মতো সাহায্যকারী খ্রীষ্টান সংস্থাগুলো পিছিয়ে ছিলোনা মোটেও । হতে পারে মানবতার কারনেই এই সাহায্য এসেছে কিন্তু এদের সকলের পরিচিতি অন্য রকম ভাবতে বাধ্য করে অনেকটাই । আর যুদ্ধের প্রোপাগান্ডার পেছনে এটাও একটা কারন ।

ইউএস মেরিন কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজের ছাত্র মেজর আবুবাকার আতোফারাতি নাইজেরিয়ার এই গৃহযুদ্ধের কারন, ষ্ট্রাটেজী এবং এ থেকে শিক্ষা সম্পর্কে তার গবেষনাপত্রে লিখেছেন –
“ফেডারেশান অব নাইজেরিয়া নামে আজকের দিনে আমরা যাকে চিনি তা কিন্তু কোনও কালেই সত্যিকার ভাবে সমশ্রেনীভুক্ত ছিলোনা । এখানে মানুষ-গোত্র-ভাষা আর ধর্ম এতো বেশী ভাবে বিচিত্র আর বিভক্ত ছিলো যে তা সম্ভব ও ছিলোনা । কেবল মাত্র এর প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখতেই এর কলোনিয়াল শাসকেরা এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় বিচিত্রতাকে উড়িয়ে দিয়ে একে একটি ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ করে রাখার কুটনীতিতে অটল ছিলেন । তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্যে উত্তর আর দক্ষিনকে একীভুত করে ফেললেন ১৯১৪ সালে । অথচ দুই প্রান্তে দুইটি আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুললেন । এর ফলে কেবল মাত্র দেশের নামটি ছাড়া মানুষগুলির ভেতর “কমন” আর কিছু রইলোনা । পরিনামে গেড়ে বসলো বিভক্তি, ঘৃনা, অসুস্থ প্রতিদ্বন্ধিতা আর উৎকট অর্থনৈতিক বৈষাম্য ।
জাতীয়তাবাদের ধারনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উন্মেষ ঘটেছিলো জাতীয় ঐক্যের বদলে জাতি, গোত্র, ভাষার উপর ভিত্তি করে । ফলে কলোনিয়াল প্রভুদের বিরূদ্ধে জনগণের সম্মিলিত ঐক্যের সাধন সম্ভব হয়নি কখনও । অনুন্নত আর অশিক্ষিত ভুখন্ডগুলোর বেলায় যা ঐতিহাসিক সত্য । আর একারনেই রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রভুত্ব আর সামরিক প্রাধান্য কুক্ষিগত করতে একটি অঞ্চল বা গোত্র আর একটির উপর টেক্কা মারার সংগ্রামে মেতে ওঠে যা সময়ের সাথে সাথে বেগবান হতে থাকে । আর শেষমেশ সে সংগ্রাম পর্যবসিত হয় ক্যু, কাউন্টার-ক্যু আর রক্তক্ষয়ি গৃহযুদ্ধে ।
এই সত্যটাই এক এক করে সত্যি হতে শুরু করে নাইজেরিয়ার ভাগ্যে । ১৯৬৭ সালের ৬ই জুলাইতে পুরোমাত্রায় শুরু এই যুদ্ধের । ১৯৬০ সালে অর্জিত স্বাধীনতার পর থেকেই অস্থিরতা, অস্বচ্ছ শান্তির আবহ সব মিলিয়ে দেশটির বাসিন্দাদের মনে যে খটকা জেগে উঠেছিলো তার শেষ পরিনতি এই গৃহযুদ্ধ । যদিও এর বীজ প্রোথিত হয়েছিলো দেশটির জিওগ্রাফি, হিস্ট্রি, কালচার এবং ডেমোগ্রাফির রকমারির কারনে ।”

তার এই বক্তব্যের সাথে অনেক মিল খুঁজে পাবেন আপনি ১৯৬৭ সালে জন্ম হওয়ার পরপরই “গভর্ণমেন্ট অব দ্য রিপাবলিক অব বায়াফ্রা” কর্তৃক প্রকাশিত এক ঘোষনায় । সেখানে প্রকাশিত বক্তব্য এরকম –
“ভয়-ভীতি, তিক্ততা আর ঘৃনা থেকে মুক্ত একটি জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে চোদ্দ মিলিয়ন জনতা তাদের নিয়তিকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন।”
“ আমরা বায়াফ্রানরা দেশের যে কোনও অঞ্চলের লোকদের তুলনায় সর্বাপেক্ষা বেশী মানব আর বস্তু সম্পদ জুগিয়েছিলাম ফেডারেশানটির জাতীয় ঐক্যের জন্যে।”
“১৯১৪ সালে যখোন ব্রিটিশ শাসকেরা উত্তর আর দক্ষিনকে এক করে ফেললেন তখন থেকেই আমরা বায়াফ্রানরা ছড়িয়ে পড়েছি দেশটির সবখানে- উত্তরের ফুলানী-হাউসা আর পশ্চিমের ইরুবা এলাকাতেও । সেখানে আমরা শিল্প আর ব্যবসা-বানিজ্যের নতুন নতুন পথ খুলে দিয়েছি, প্রতিষ্ঠা করেছি উপাসনালয় আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যা আর কোনও গোত্রই এ পর্য্যন্ত দেশের জন্যে করেনি।”
“ বায়াফ্রানদের যোগ্যতা আর তাদের কর্মক্ষমতার সম্ভাবনা তাদের কে পশ্চাদপদ প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা করে রেখেছিলো।”
“ আর এইসব বৈষ্যম্যের কারনেই হিংসা আর শত্রুতা বায়াফ্রানদের পিছু ছাড়েনি ।”
“ আমরা ফুলানী- হাউসা সম্প্রদায়ের উচ্চশ্রেনী যারা উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রনকারী আর ফেডারেল সরকারের উপর প্রভুত্বকারী, তাদের প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা ভাবনার ঘোরতর বিরোধীতা করেছি ।”
View this link
1969, at parade to celebrate the Second Independence Anniversary of Biafra; General Efiong is fourth from left; General Ojukwu, Head of State, is fifth from left.

পূর্ব থেকেই অনুমিত “ইগবো” সম্প্রদায়ের (পরবর্তীতে বায়াফ্রান সরকার ) এই মনোভাবের কারনেই ১৯৬৭ সালের জানুয়ারীতে ঘানার আবুরী শহরে বিবাদমান সকল অঞ্চলের সামরিক জান্তা আর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠকে একটি শিথিল কনফেডারেশান গড়ে তোলার যে সিদ্ধান্ত হয় তার প্রতি সন্দেহ থেকেই যায় পশ্চিম আর উত্তরাঞ্চলের ।
আর সত্য সত্যিই তা ঘটে যায় ১৯৬৭ সালের ৩০ শে মে মাসে । সংখ্যাগরিষ্ঠ ইগবো সম্প্রদায় ফেডারেশান অব নাইজেরিয়ার পূর্ব-মধ্যাঞ্চল, দক্ষিন-পূর্বাঞ্চল আর নদী অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে “বায়াফ্রা” নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষনা দেন । সাথে সাথেই গ্যাবন, হাইতি, আইভরি কোষ্ট, তাঞ্জানিয়া আর জাম্বিয়া একে স্বীকৃতি দিয়ে বসে ।
বহু রক্তক্ষয়ী কান্ডের পরে সে রাষ্ট্রটি ১৯৭০ সালের ১৫ ই জানুয়ারীতে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আবার মুছে যায় ।

পূর্ব নাইজেরিয়ার সামরিক গভর্ণর লেঃ কর্ণেল ওজুকু স্বাধীনতা ঘোষনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন – “Now, therefore, I, Lieutenant-Colonel Chukwuemeka Odumegwu Ojukwu, Military Governor of Eastern Nigeria, by virtue of the authority, and pursuant to the principles, recited above, do hereby solemnly proclaim that the territory and region known as and called Eastern Nigeria together with her continental shelf and territorial waters shall henceforth be an independent sovereign state of the name and title of "The Republic of Biafra”.
নতুন রাষ্ট্র বাযাফ্রার প্রথম রাজধানী ঠিক করা হয় “ইনুগু” শহরকে ঘিরে । স্বাধীনতা ঘোষনার পাঁচ মাসের মাথাতেই ফেডারেল বাহিনীর হাতে শহরটি দখল হয়ে যায় । পরে এক এক করে আবা, উমুহাইয়া আর শেষে ওয়েরী শহরে রাজধানী স্থানান্তর করতে হয় তাদের । জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে নাইজেরীয় সরকার শুরু থেকেই বায়াফ্রার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ফেলেন । আর সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হয় জুলাইতে । প্রথম দিকে বায়াফ্রানরা যুদ্ধে এগিয়ে থাকলেও নাইজেরীয় বাহিনীর বিমান, স্থল এবং জলপথে আক্রমনের মুখে তাদের রাষ্ট্র সীমানা সংকুচিত হয়ে আসে । ১৯৬৮সালের সেপ্টেম্বরে ফেডারেল বাহিনীর “ফাইনাল অফেনসিভ” আক্রমন বায়াফ্রানরা প্রতিহত করে দিলেও দক্ষিনদিক থেকে আর একটি “সাউদার্ণ অফেনসিভ” ঠেকাতে পারেনি তারা । যুদ্ধের খরচ জোগানোর মূল উৎস তেল ক্ষেত্রগুলি তাদের হাতছাড়া হয়ে গেলে রসদ আর খাদ্যাভাবের মুখে পড়ে যায় শিশু রাষ্ট্রটি । ধারনা করা হয় এর ফলে তীব্র অপুষ্টিতে মারা পড়ে ১ মিলিয়ন মানুষ । খাদ্যের সন্ধানে মানুষ ছুটতে থাকে দিগবিদিক ।

Biafran refugees leaving Owerri; May, 1968.

১৯৬৯ সালের ৩০শে জুন নাইজেরীয় সরকার বায়াফ্রায় পাঠানো রেডক্রসের সব ধরনের সাহায্য বন্ধ করে দেন । দু’সপ্তাহ পরে কেবল মাত্র ঔষধপত্র সহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের অনুমতি দেয়া হয় শুধুমাত্র যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইন এলাকাগুলিতে ।
অবস্থা অনুকুল নয় দেখে ওজুকু অক্টোবর মাসে ইউনাইটেড ন্যাশনস এর কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনেন ।কিন্তু ফেডারেল সরকার তাকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করতে বলেন ।ডিসেম্ভরের মধ্যেই এফ-এম-জি’র “ব্লাক স্কর্পিয়ন” নামে ভূষিত জনপ্রিয় কর্ণেল বেঞ্জামিন আদিকুনলের ৩নং মেরিন কমান্ডো ডিভিশান অবশিষ্ট বায়াফ্রাকে দু’ভাগে ভাগ করে কোনঠাসা করে ফেলে ।
১৯৭০ এর ১৫ ই জানুয়ারীতে সারেন্ডার করার মূহুর্তে বায়াফ্রা এভাবে আকারে বড় রকমের সংকুচিত হয়ে পড়ে আর প্রকট খাদ্যাভাব এর কারনে মানুষ না খেয়ে মারা যেতে থাকে । লেঃ কর্ণেল ওজুকু পালিয়ে যান দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী আইভরি কোষ্টে ।যাওয়ার আগে ওজুকু তার চীফ অব ষ্টাফ জেনারেল ফিলিপ ইফিয়ঙ কে "officer administering the government" হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে রেখে যান পিছনে । ১২ই জানুয়ারী’ ১৯৭০ এর ১২ই জানুয়ারী ইফিয়ঙ যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানান এবং এফ-এম-জি’র কাছে আত্মসমর্পন করেন । বায়াফ্রা আবার নাইজেরিয়ার ভুখন্ডে একীভূত হয়ে যায় ।

22 Jan 1970, Lagos, Nigeria --- Nigerian Federal Leader Major General Yakubu Gowon (wearing peak cap with red band) addresses a press conference in Lagos.


16 Jan 1970, Lagos, Nigeria --- Lagos, Nigeria: Three members of an International Team of Observers reporting in Lagos, right to left, Col. Douglas Cairns of Great Britain; Yngye Berlund of Sweden; and Brig. John Drewery of Canada. As part of an eight-man team that visited the war zones, they said they neither saw nor heard of any evidence of genocide in the eastern Region Nigeria, formerly Biafra.

সারা পৃথিবী জুড়ে বায়াফ্রায় সাধারন মানুষের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ওঠেছিলো সেদিনগুলিতে । মানবতাবাদী সকল শ্রেনী এককন্ঠ হয়ে পড়েছিলেন । তখনকার বাংলাদেশেও বামপন্থী দলগুলো পিছিয়ে ছিলোনা এর সাথে গলা মেলাতে । গণহত্যাকে গণহত্যাই বলতে হয়, বিবেকবান মানুষের কাছে এর কোন ধর্ম নেই, জাত নেই, ভুখন্ড নেই ।

আফ্রিকার বায়াফ্রায় যখোন যুদ্ধ শেষ তখন এশিয়ার দক্ষিন পূবের বাংলাদেশে ঘটে চলেছে এ্কই কাহিনীর পূনরাবৃত্তি । শোষন বজায় রাখা । ধর্মের দোহাই দিয়ে যা হয়েছিলো সেখানে, তা গণহত্যা ।

আমাদের যা শেখার তা হলো, জাতিস্বত্তা নয়, সংস্কৃতির অটুট বন্ধন নয়, ধর্মের অচ্ছেদ্দ্য বেড়াজাল নয় পৃথিবী জুড়ে কেবল স্বার্থই রাজনীতির প্রধান নিয়ামক । বর্ন-গোত্র, ভাষা-ধর্ম যেখানে পরাভূত নিত্যকাল ।
নইলে বায়াফ্রার গণহত্যায় যেখানে খ্রীষ্টান দুনিয়া সোচ্চার হয়েছিলো একসাথে, সেখানে বাংলাদেশের মুসলিম মানুষগুলির হত্যায় একটিও মুসলিম দেশ এগিয়ে আসেনি কেন ?
ইতিহাসবিদরা, গবেষকরা কি বলবেন ?
আপনারাই বা কি ভাবে দেখবেন তাকে ???
original post
read more

Monday, February 6, 2012

ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। (ছবি পোস্ট)

by ধীবর
ফেব্রুয়ারি আসলেই ভাষা আর ভাষা শহিদদের জন্য আমাদের দরদ উতলে উঠে। আমিও এর ব্যাতিক্রম নই। সেই দোষ আর দায়টুকু স্বীকার করেই, গোল্ডফিস মেমরির অধিকারি স্বজাতির সামনে ছবির মাধ্যমে সেই মহান ইতিহাসকে স্মরণ করছি।


জিন্নাহর সেই কুখ্যাত ঘোষণা "উর্দু একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্থানের রাস্ট্রভাষা।



বাংলাকে রাস্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবিতে পাকিস্থানি পার্লামেন্টে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এম পির প্রস্তাব উত্থাপন।


বাংলাকে রাস্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সাল।


বাহান্নর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবপুর রোডে মিছিল।



এই সেই ঐতিহাসিক আমতলা যেখান থেকে ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষি এই আমতলা ।



ঐতিহাসিক সেই আমতলায় ছাত্রদের মিটিং, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ।


১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল।


ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ।


২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে শহিদদের স্মরণে ঢাকায় গায়েবানা জানাজা।


শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন শহিদ আবুল বরকতের পরিবারের সদস্যরা।



প্রথম শহিদ মিনার। যা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে গুড়িয়ে দেয় পাকিস্থানি বাহিনী।



শহিদ বরকতের কবরে ফুল দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন তার মা বাবা। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সাল।

[অনেক চেস্টা করেও পুলিশের গুলি করা বা শহিদদের ছবি যোগাড় করতে পারিনি। কেউ কি লিংক দিতে পারেন?]

দেশের জন্য ভাষার জন্য আত্মদান করাটা খুব খুবই কঠিন কাজ। সেই কাজটি যারা দেশকে ভালোবেসে করে গিয়েছেন, তাদের উত্তরসুরি হয়ে আমাদের এ কি আচরণ?

যুগের দোহাই পেড়ে খোদ মাতৃভাষাকে অবমাননা করা, বিজাতিয় ভাষা আর সংস্কৃতিকে মাথায় তুলে একদিকে নৃত্য করা, অন্যদিকে ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই পাকা ভাষাপ্রেমিক হয়ে যাওয়া, এই দ্বিমুখিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

ভাষা কি কেবল ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক? বাংলা একাডেমি নামের একখানা শ্বেত হস্তিকায় আতেলের কারখানা আছে বটে। সেখানকার তিনারা এক মাস বই বেচার মেলা নিয়ে যেমনটি ব্যস্ত, তাতে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণায় তার সময় কোথায়?

এ রকম চললে, এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন সিং সাহেবরা দিল্লি থেকে উড়ে এসে বলবেন, হিন্দি একমাত্র হিন্দিই হবে রাস্ট্রভাষা। আমাদের ঘরে ঘরে যেভাবে হিন্দি বাসা বেধেছে, যেখানে শিশু থেকে বুড়ো পর্যন্ত হিন্দি প্রেমে পাগল, সেখানে কোন একজন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এম পির সেই দেশপ্রেমিক সাহসি প্রতিবাদি কন্ঠ পার্লামেন্টে শোনা যাবে না। কোন ভাষাপ্রেমিকদের আমতলায় মিছিল মিটিং করতে দেখা যাবে না। ১৪৪ ধহারা ভঙ্গ করাLinkর মত সৎ সাহসে কোন ছাত্র ছাত্রি বিক্ষোভে উত্তাল হবে না।

যে কাজ পাকিস্থানিরা লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালিকে হত্যা করেও করতে পারেনি, বিনা রক্ত ক্ষয়ে বিনা একটি বুলেট খরচ ব্যাতিরেকেই ইন্ডিয়ানরা সেই কাজ করে ফেলছে।

আপন ইচ্ছায় পরাধীনতার শৃংখলে বন্দি হলে, শিকারির কি দোষ?
original post
read more

Tuesday, January 10, 2012

বিশ্বজনের সহায়তা

by মফিদুল হক


একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধপীড়িত দ্বন্দ্বমুখর বিশ্বে। পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসককুল তখন পাকিস্তান-প্রেমে বিভোর। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চাণক্য ও ম্যাকিয়াভেলির বিশ শতকীয় মিশ্র সংস্করণ—হেনরি কিসিঞ্জার একান্ত গোপন কূটনৈতিক চালে মগ্ন ছিলেন মাও সে-তুংয়ের চীনের সঙ্গে, যারা উঠতে-বসতে গালমন্দ পাড়ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আর তলে তলে ভিন্নতর আঁতাত গড়তে চেয়েছিল তাদেরই সঙ্গে। দুনিয়ার মানুষ তো দূরের কথা, তাবড় তাবড় সাংবাদিকেরাও ঘুণাক্ষরে অনুমান করতে পারেননি কী ঘটছে পর্দার আড়ালে। চীন-মার্কিন দূতিয়ালির দায়িত্ব পালন করছিলেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান।
এই যখন বিশ্ব পরিস্থিতি, তখন বাংলার দারিদ্র্যপীড়িত নিরন্ন জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক রায় নিয়ে আবির্ভূত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রক্তগঙ্গায় সেই আন্দোলনকে ভাসিয়ে দিতে যে ব্রতী হয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান, এর পেছনে মার্কিন সমর্থন ছিল স্বতঃসিদ্ধ। নিক্সন প্রশাসনের অবস্থানের কারণে অন্যান্য পশ্চিমা দেশও নিয়েছিল বশংবদের ভূমিকা। আর তৃতীয় দুনিয়ার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অধিকাংশ ছিল পশ্চিমা প্রভাববলয়ে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘জো হুজুর’ বলা ছাড়া তাদের আর করার বিশেষ কিছু ছিল না। আরব দুনিয়া তো মার্কিনদের করুণানির্ভর, তদুপরি ‘ইসলামি’ পাকিস্তান ভাঙার প্রচেষ্টায় ছিল নাখোশ। বাংলাদেশ আন্দোলনের পক্ষে তাই ছিল একমাত্র ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন গুটিকয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

২.
এমনই চরম বৈরী পটভূমিকায় বাংলাদেশের উজ্জ্বল উদ্ভাসন যে সম্ভব হয়েছিল, তার পেছনে আর কতক কার্যকারণের সঙ্গে সক্রিয় ছিল বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ও সমাজের অগ্রসর সংবেদনশীল অংশের বিপুল সমর্থন। আর তা রাজপথে আছড়ে পড়েছিল বিশাল সমুদ্রতরঙ্গের মতো, একের পর এক সৃষ্টি করছিল অভিঘাত এবং উপচে পড়েছিল শিল্পীর তুলিতে, কণ্ঠে, গানে-কবিতায়, আরও কত না রূপে। একাত্তরে বিশ্বজুড়ে জেগে ওঠা বাংলাদেশ-বন্দনার ছিল যে বিশালতা, তার পরিমাপ করাটাও দুঃসাধ্য, তবে সেই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আমরা অগণিত বিদেশীয় মিত্রের অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান সম্ভব করে তুলতে পারি, যা আমাদের নিজেদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এর একদিকে ছিল বড় মাপের অনেক ঘটনা, যেমন ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, যার ঐতিহাসিক প্রভাব আজও রয়েছে বহমান। আধুনিক সংগীত যে নিছক তরুণের অভিনব বিনোদন আয়োজন নয়, সমাজের কল্যাণব্রতের সঙ্গে তা নিবিড় সম্পৃক্তি রচনা করতে পারে, তা সেবারই প্রথম মহিমান্বিতভাবে প্রকাশ পেল। হালফিল তো ব্যান্ড এইড, আফ্রিকা এইড, হাঙ্গার এইড ইত্যাদি কত ধরনের কনসার্টই না আয়োজিত হচ্ছে, পপতারকা বব গেলডফ শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হলেন। আর একাত্তরে এই নতুন ধারার প্রবর্তক হয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এই একটি সংগীতানুষ্ঠানের বিবরণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ সম্ভব এবং সেটা সংগতও বটে। বব ডিলান যে দীর্ঘদিনের নিভৃতি ঘুচিয়ে সেই প্রথম আবার এলেন জনসমক্ষে, গাইলেন তাঁর বিখ্যাত গান, ‘ধেয়ে আসছে দারুণ বৃষ্টি’—সেসব তো আধুনিক গানের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। আরও ছিলেন কত না তারকা, এরিক ক্ল্যাপটন তো তখন এক উঠতি গায়ক, পরে যিনি অশেষ খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন, ডিজনি চলচ্চিত্রে গেয়েছেন গান। তেমনি বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাসিত কৃষ্ণকায় গায়ক বিলি প্রেস্টনের কথা, ছোটখাটো এই মানুষটির স্টেজ পারফরম্যান্স দেখতে হয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো, বড় কনসার্টে সর্বশেষ গান করেছিলেন ২০০৮ সালে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে নেলসন ম্যান্ডেলার ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এবং চলতি বছর হয়েছেন প্রয়াত।
তবে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আলাদা ছিল না উডস্টক ফেস্টিভাল থেকে, যখন নতুন এক তরুণসমাজের আবির্ভাবে হকচকিত হয়ে পড়েছিল পশ্চিমা দুনিয়া। এই তরুণেরা প্রত্যাখ্যানের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তাদের অগ্রজদের দিকে এবং বিশাল বুক পেতে বরণ করতে চাইছিল বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষদের, আর তাই তো তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে জন্ম দিয়েছিল অমন ব্যাপক আন্দোলনের, সৃষ্টি করেছিল পশ্চিম দুনিয়া কাঁপানো ১৯৬৮।
ফলে একাত্তরে যখন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম শুরু হলো, তখন ক্ষমতাধর পশ্চিমা বিশ্ব ছিল এক অবস্থানে আর পশ্চিমা সমাজ, বিশেষভাবে নবজাগ্রত তরুণেরা, ছিল আরেক অবস্থানে। সে কারণেই বাংলাদেশের সংগ্রামের ন্যায্যতা ও মানবিকতার উপাদান অমন বিপুল আলোড়ন তুলতে পেরেছিল দেশে দেশে, হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল রাজপথে, আন্দোলনে এবং কতভাবেই না তারা প্রকাশ করেছে সংহতি। এই বিশাল আন্দোলনের হদিস গ্রহণ এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হয়ে আছে বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব।

৩.
বাংলাদেশের প্রতি সংহতি আন্দোলনের মোটা দাগের পরিচয় হয়তো আমরা জানি, তবে তারও পরতে পরতে মিশে আছে আরও অনেক ছোট-বড় ঘটনা; তাৎপর্যে যা মোটেই ছোট নয়। এবং এর বাইরে অজানার আড়ালে রয়েছে যেসব ঘটনা বা অবদান, সেসব কথাও তো আমাদের জানতে হবে। স্বল্পজ্ঞাত কিন্তু তাৎপর্যময় দু-একটি ঘটনার উল্লেখ এখানে না করলেই নয়। বাংলাদেশ যে কতভাবে কতজনের কাছে ঋণী, তা বোঝা যাবে আজকের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশন, সেদিনের বোম্বের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল বা ভিটি রেলস্টেশনের সামনে, একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত এক ঘটনায়। স্টেশনের খেটে খাওয়া বুট পালিশ বালকের দল সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের এক দিনের রোজগার তুলে দেবে মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ-সহায়ক সমিতির হাতে। তারা সবাই মিলে তুলেছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ।
বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্রের প্রধান নির্বাহী সকালে জুতা পালিশ করিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন অর্থ সংগ্রহ অভিযানের। বুট পালিশ বালকদের এই পরম ভালোবাসার অর্ঘ্যদানের বার্তা শুনে বিশেষ আলোড়িত হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন গভর্নর আলী ইয়ার জং। হায়দরাবাদের নিজাম-পরিবারের এই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ-আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভারতের অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যা এক ব্যতিক্রম। এক বিকেলে তিনি বুট পালিশ বালকদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মালাবার হিলের শ্বেতপ্রাসাদে, গভর্নরের ভবনে। এভাবে বুট পালিশ বালকদের কাছে গভর্নর পরিশোধ করেছিলেন তাঁর ঋণ, তবে বাংলাদেশের ঋণ শোধ বুঝি এখনো বাকি রয়ে গেছে।

৪.
নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন টিয়ার্স’, বোম্বের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিংস্ অ্যান্ড ফায়ার কনসার্ট’ ইত্যাদি বড় মাপের আয়োজনের কথা জানা হলেও প্রায় অজ্ঞাত রয়ে গেছেন লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা। বাংলাদেশের সংগ্রামী বার্তা পেয়ে বিচলিত এই তরুণ লিখেছিলেন দুটি গান, বন্ধুদের নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছোট এক স্টুডিও থেকে এই গানের ৪৮ আরপিএমের রেকর্ডও বের করেছিলেন। মামুলি একরঙা মোড়কে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাণীসংবলিত করে দীনহীনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল রেকর্ড। একটি গানের কথা ছিল, ‘ইন দ্য নেম অব হিউম্যানিটি/ ডোন্ট অ্যালাউ বাংলাদেশ টু ফাইট অ্যালোন।’ কথা ও সুর যে খুব উঁচুমানের, তা হয়তো বলা যাবে না; কিন্তু অনুভব করা যায় প্রাণের আবেগ। লি ব্রেনান ঝোলায় রেকর্ড নিয়ে গিটার বাজিয়ে এই গান গেয়ে বেড়াতেন শহরের এক পানশালা থেকে আরেক পানশালায়, রেকর্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশের জন্য।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তিনি নিশ্চয়ই হয়েছিলেন আমাদের মতোই উল্লসিত, তারপর কোথায় হারিয়ে গেছেন এই যুবক, তাঁর গানের একটি ছোট্ট রেকর্ড কেবল রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে, সেই গান শোনার অবকাশ বাংলাদেশের কবে হবে কে জানে!

৫.
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বহু ধরনের মানুষ বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁদের একজন ছিলেন জঁ ইউজিন পল কে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই ফরাসি লেখক জীবনে বিবিধ অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিলেন, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও ছিলেন বিচিত্রমুখী। গোড়াতে তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য, তারপর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যোগ দেন কুখ্যাত ওএএসে; যে গোপন বাহিনী মনে করত আলজেরিয়া হচ্ছে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কখনো হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না। আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে বোধোদয় হয় পল কের। তিনি ওএএস ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন বিশ্বপথিক। তবে পুরোনো মতাদর্শের জের একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। স্পেন, লিবিয়া ও বায়াফ্রায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে যান।
একাত্তর সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল। এরপর আঁদ্রে মালরো যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার ব্রত ঘোষণা করেন, তখন গুরুবাক্যে বিশেষ অনুপ্রাণিত বোধ করেন পল কে। ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে ব্যাগে বোমা নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭১১ বিমানটি দখল করতে সমর্থ হন। তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা বৈদ্যুতিক তার জানান দিয়েছিল ভেতরে বহন করা বোমার। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য জরুরি ওষুধ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ওষুধের কার্টন বোঝাই করবার অজুহাতে পুলিশ বিমানে ঢুকে তাঁকে পরাভূত করতে সমর্থ হয়। ব্যাগ খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কতক বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার।
এই ঘটনার পরপরই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই ডামাডোলে হারিয়ে গেল পল কে-র ঘটনা। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা চলেছিল বেশ কিছুকাল। আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আঁদ্রে মালরো স্বয়ং। অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া পল কে আবারও ঘুরে ফিরেছেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। ১৯৮১ সালে তাঁকে দেখা গিয়েছিল হিমালয় এলাকায় তপস্যারত, এরপর কিছুকাল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে আবারও তাঁকে দেখা গেল কলকাতায়, সেখানে জননিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগে কিছুদিন কাটান কারাগারে। ভারত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ১৯৮৫ সালে তিনি যান ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এরপর তাঁর আর খোঁজ মেলেনি।
পল কে ও বাংলাদেশ আলাদা হয়ে গেছে সেই একাত্তরে, আবার কি কখনো হবে তাদের দেখা? কে জানে!
মফিদুল হক: লেখক; মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি।
original postJustify Full
read more

মুক্তিযুদ্ধে ভিনদেশী বন্ধুদের তিনটি অজানা গল্প শুনুন

by কাঊসার রুশো


বাংলাদেশের প্রতি সংহতি আন্দোলনের মোটা দাগের পরিচয় হয়তো আমরা জানি, তবে তারও পরতে পরতে মিশে আছে আরও অনেক ছোট-বড় ঘটনা; তাৎপর্যে যা মোটেই ছোট নয় এমনই তিনটি গল্প নিয়ে এ আয়োজন

১.ভারতের বুট- পালিশ বালকদের একদিনের উপার্জন বাংলার মানুষের জন্য

(ছবিটি সামু ব্লগার এ. এস. এম. রাহাত খান এর সৌজন্যে)

আজকের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশন, সেদিনের বোম্বের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল বা ভিটি রেলস্টেশনের সামনে, একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে স্টেশনের খেটে খাওয়া বুট পালিশ বালকের দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের এক দিনের রোজগার তুলে দেবে মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ-সহায়ক সমিতির হাতে তারা সবাই মিলে তুলেছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্রের প্রধান নির্বাহী সকালে জুতা পালিশ করিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন অর্থ সংগ্রহ অভিযানের বুট পালিশ বালকদের এই পরম ভালোবাসার অর্ঘ্যদানের বার্তা শুনে বিশেষ আলোড়িত হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন গভর্নর আলী ইয়ার জং হায়দরাবাদের নিজাম-পরিবারের এই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ-আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভারতের অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যা এক ব্যতিক্রম এক বিকেলে তিনি বুট পালিশ বালকদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মালাবার হিলের শ্বেতপ্রাসাদে, গভর্নরের ভবনে

২.লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা
নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন টিয়ার্স’, বোম্বের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিংস্ অ্যান্ড ফায়ার কনসার্ট’ ইত্যাদি বড় মাপের আয়োজনের কথা জানা হলেও প্রায় অজ্ঞাত রয়ে গেছেন লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা। বাংলাদেশের সংগ্রামী বার্তা পেয়ে বিচলিত এই তরুণ লিখেছিলেন দুটি গান, বন্ধুদের নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছোট এক স্টুডিও থেকে এই গানের ৪৮ আরপিএমের রেকর্ডও বের করেছিলেন মামুলি একরঙা মোড়কে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাণীসংবলিত করে দীনহীনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল রেকর্ড একটি গানের কথা ছিল, ‘ইন দ্য নেম অব হিউম্যানিটি/ ডোন্ট অ্যালাউ বাংলাদেশ টু ফাইট অ্যালোন।’ কথা ও সুর যে খুব উঁচুমানের, তা হয়তো বলা যাবে না; কিন্তু অনুভব করা যায় প্রাণের আবেগ লি ব্রেনান ঝোলায় রেকর্ড নিয়ে গিটার বাজিয়ে এই গান গেয়ে বেড়াতেন শহরের এক পানশালা থেকে আরেক পানশালায়, রেকর্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশের জন্য
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তিনি নিশ্চয়ই হয়েছিলেন আমাদের মতোই উল্লসিত, তারপর কোথায় হারিয়ে গেছেন এই যুবক, তাঁর গানের একটি ছোট্ট রেকর্ড কেবল রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে

৩.এবং একজন জঁ ইউজিন পল কে
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বহু ধরনের মানুষ বিচিত্র ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁদের একজন ছিলেন জঁ ইউজিন পল কে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই ফরাসি লেখক জীবনে বিবিধ অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিলেন, চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও ছিলেন বিচিত্রমুখী গোড়াতে তিনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর সদস্য, তারপর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যোগ দেন কুখ্যাত ওএএসে; যে গোপন বাহিনী মনে করত আলজেরিয়া হচ্ছে ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কখনো হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে বোধোদয় হয় পল কের তিনি ওএএস ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন বিশ্বপথিক তবে পুরোনো মতাদর্শের জের একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেন না স্পেন, লিবিয়া ও বায়াফ্রায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভিড়ে যান
একাত্তর সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল এরপর আঁদ্রে মালরো যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার ব্রত ঘোষণা করেন, তখন গুরুবাক্যে বিশেষ অনুপ্রাণিত বোধ করেন পল কে ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে ব্যাগে বোমা নিয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭১১ বিমানটি দখল করতে সমর্থ হন। তাঁর ব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা বৈদ্যুতিক তার জানান দিয়েছিল ভেতরে বহন করা বোমার তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য জরুরি ওষুধ বহন করে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন কয়েক ঘণ্টা পর ওষুধের কার্টন বোঝাই করবার অজুহাতে পুলিশ বিমানে ঢুকে তাঁকে পরাভূত করতে সমর্থ হয় ব্যাগ খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কতক বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার
এই ঘটনার পরপরই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ সেই ডামাডোলে হারিয়ে গেল পল কে-র ঘটনা অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা চলেছিল বেশ কিছুকাল আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আঁদ্রে মালরো স্বয়ং অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া পল কে আবারও ঘুরে ফিরেছেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে ১৯৮১ সালে তাঁকে দেখা গিয়েছিল হিমালয় এলাকায় তপস্যারত, এরপর কিছুকাল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে আবারও তাঁকে দেখা গেল কলকাতায়, সেখানে জননিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগে কিছুদিন কাটান কারাগারে ভারত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ১৯৮৫ সালে তিনি যান ওয়েস্ট ইন্ডিজে এরপর তাঁর আর খোঁজ মেলেনি
original post
read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site