by মাসুম বিল্লাহ
বুকের মধ্যে ধুক-ধুক। পায়চারীর পরিমান বেড়ে চলেছে। কিছু সময় পরে একজন কাছে এসে ‘এই নিন’ বলে কাপড়ে জড়ানো সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া বাচ্চাটাকে আমার কোলে তুলে দিলে। কি মুশকিল, আমি সাথে সাথে আমার মায়ের কোলে তুলে দিলাম। জ্বী আমি বাবা হয়েছি। মেয়ের বাবা, সুবাইতার বাবা। এর আগেই আমার বউ আমাকে ‘সুবাইতার বাপ’ বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছিলো।
কিন্তু হাসপাতালে থাকাকালীন দুই মহিলা বলাবলি করেছেÑ‘আপা দেখেছেন ওইটুকু একটা ছেলে বাপ হইছে। বউটারও তো খুব বেশি বয়স না।’
সত্যি বলতে আমার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না আমি একটা মেয়ের বাবা হয়েছি। গোপনে বলি, পথে যেতে এখনো সুন্দরী কোন মেয়ের দিকে আড় চোখে তাকাতে ভুলে যাই না। কোন কোন সময় নিজেকে সেই কবেকার স্কুল পালানো ছেলে ভেবে কাতর হই। সংসারের কী সব দায়-দায়িত্ব এখনো আমার কাঁধে এসে ভর করেনি। পাশের রুম থেকে আমার বাপের কথা কানে আসেÑ‘বউমা তোমার স্বামীকে বল, আমি বেঁচে থাকতে থাকতে বাজার-টাজার করা শিখতে, নইলে পরে তো তুমি ঝামেলায় পড়বে।’ জানেন, এখনো না কেউ আমাকে দেখে বিশ্বাসই করতে চায় না যে, ‘আমি বিবাহ করেছি।’ ছেলেদের জন্য বিষয়টা তো সুবিধারই, তাই না?
বউয়ের দিকে তাকিয়ে, সংসারে কর্মপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারি, আমার আর রক্ষা নেইÑআমি বুড়ো হতে চলেছি। সন্তানের বাপ হতে যাচ্ছি। একদিন তো বউ বলেই ফেললোÑ‘এই তুমি দাঁড়ি রেখে দাও, বাবা হতে যাচ্ছ। কিছুদিন পর শ্বশুর হবা।’ বুঝন অবস্থা, আমাকে সবাই মিলে বুড়ো বানিয়ে ছাড়ছে।
মেয়েটা হওয়ার আগে বউ আর আমি পাশাপাশি শুয়েছি কিছুদিন পর মেয়েটা আমাদের মাঝখানে শুয়ে ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। আগে বউ তার একটা হাত আমার গায়ের উপর রেখে দিত। এখন সে হাত দিয়ে মেয়েকে আগলিয়ে রাখে। আমি বেচারা খানিক তফাতে শুয়ে থাকি। থাকাথাকির ব্যাপারটা না হয় নিজেরা মিলে মিলমিশ করে নিলাম কিন্তু ডাকাডাকির ব্যাপারটা কী করব? আগে আমার বউ আমাকে ডাকতÑ‘এই শোন, শুনছ, এদিকে আস।’ এখন ডাকে সুবাইতার আব্বু বলেÑ‘এই সুবাইতার আব্বু, তোমাকে ডাকছে ইত্যাদি।’ নিজের বউয়ের কথা বাদ দিলাম মা-বাবাসহ অন্য আত্মীয়রা বলাবলি করছে-কিরে মেয়ের বাবা? মেয়ের বাপ হইছো, মাশাআল্লাহ।’
এবার ঘর ছেড়ে একটু বাইরে আসি শুরুর দিকে বলেছিলাম না যে, রাস্তায় সুন্দরী কোন মেয়ে দেখলে বাঁকা চোখে একবার তাকাতামই। কোনটাকে তো বেশ ভালই লেগে যেত। মনে ভাবতাম- ‘মেয়ে তুমি কার গো?’ একবার হয়েছে কি শোনেন, একটা মেয়েকে এমন ভালো লেগে গেছে কী বলব ভাই। একদিন সাহসের বড়িটরি খেয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালামÑ‘মেয়ে তুমি কী আমার নাতী-পুতীর নানী হবা?’ ‘বেয়াদব কোথাকার’ মেয়েটা আমাকে বলেছিল। এরপর থেকে এহেনও কর্ম আর করা হয়ে ওঠেনি। ভাগ্যিস তখন ইভটিজিং ছিল না, নইলে চৌদ্দ শিকের ভাত খেতে হত। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি গো।
সেই আমি এখন আর নেই, বদলে গেছি। এখন যখন মহাখালীর রাস্তা দিয়ে শাহীন কলেজের পিচ্চি পিচ্চি মেয়েগুলো প্রেমিকদের হাত ধরাধরি করে যেতে দেখি, আবার এখানে সেখানে ওরা গুজুর গুজুর করে কথা বলে তখন ভীষন রাগ লাগে আমার। আরে বাবা তোমাদের তো মাÑবাবারা স্কুলে পড়াশুনার জন্য পাঠিয়েছে তা না করে এসব কী করছ? ইচ্ছে হয় ওদের মা-বাবাকে বলে দিয়ে আসি। এখন আর কোন মেয়েকে আমার আর প্রেমিকা বলে মনে হয় না। যে মেয়েটা এখন আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, ওকে আমার মেয়ে বলেই মনে হল। আর ঐ যে মেয়েটা ছেলেটার হাত ধরে বসা, ঘাড়ে মাথা কাত করে রেখে কথা বলছে, ওর কাছে গিয়ে বলিÑ‘মা-রে এখানে বসে কী করিস, তোর না পড়াশুনা শেষ করে বাসায় ফেরার কথা? চল চল বাসায় চল।’ তারপর বাসায় গিয়ে কড়া কড়া কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেব, আগে বাসায় চলো মামনি (মনে মনে বলি)। হায় বাবা হওয়ার কী জ্বালা, পরের মেয়ের অনিষ্টে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। আহারে মেয়েগুলো না জানি কি বিপদেই পড়ে। এই আশংকায় কাটছে আমার দিন।
আমারও তো একটা মেয়ে হয়েছে। একদিন সে বাইরে বের হবে। একা চলতে শিখবে। হঠাৎ একদিন বিপরীত লিঙ্গের কোন একজনের সাথে সাথে পথ চলবে। তখন আমি কোথায় থাকব? কী করতে পারব? তখন কী আমার সময় হবে, মেয়ে কোথায় যায়, কী করে, তা দেখার?
original post
বুকের মধ্যে ধুক-ধুক। পায়চারীর পরিমান বেড়ে চলেছে। কিছু সময় পরে একজন কাছে এসে ‘এই নিন’ বলে কাপড়ে জড়ানো সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া বাচ্চাটাকে আমার কোলে তুলে দিলে। কি মুশকিল, আমি সাথে সাথে আমার মায়ের কোলে তুলে দিলাম। জ্বী আমি বাবা হয়েছি। মেয়ের বাবা, সুবাইতার বাবা। এর আগেই আমার বউ আমাকে ‘সুবাইতার বাপ’ বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছিলো।
কিন্তু হাসপাতালে থাকাকালীন দুই মহিলা বলাবলি করেছেÑ‘আপা দেখেছেন ওইটুকু একটা ছেলে বাপ হইছে। বউটারও তো খুব বেশি বয়স না।’
সত্যি বলতে আমার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না আমি একটা মেয়ের বাবা হয়েছি। গোপনে বলি, পথে যেতে এখনো সুন্দরী কোন মেয়ের দিকে আড় চোখে তাকাতে ভুলে যাই না। কোন কোন সময় নিজেকে সেই কবেকার স্কুল পালানো ছেলে ভেবে কাতর হই। সংসারের কী সব দায়-দায়িত্ব এখনো আমার কাঁধে এসে ভর করেনি। পাশের রুম থেকে আমার বাপের কথা কানে আসেÑ‘বউমা তোমার স্বামীকে বল, আমি বেঁচে থাকতে থাকতে বাজার-টাজার করা শিখতে, নইলে পরে তো তুমি ঝামেলায় পড়বে।’ জানেন, এখনো না কেউ আমাকে দেখে বিশ্বাসই করতে চায় না যে, ‘আমি বিবাহ করেছি।’ ছেলেদের জন্য বিষয়টা তো সুবিধারই, তাই না?
বউয়ের দিকে তাকিয়ে, সংসারে কর্মপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারি, আমার আর রক্ষা নেইÑআমি বুড়ো হতে চলেছি। সন্তানের বাপ হতে যাচ্ছি। একদিন তো বউ বলেই ফেললোÑ‘এই তুমি দাঁড়ি রেখে দাও, বাবা হতে যাচ্ছ। কিছুদিন পর শ্বশুর হবা।’ বুঝন অবস্থা, আমাকে সবাই মিলে বুড়ো বানিয়ে ছাড়ছে।
মেয়েটা হওয়ার আগে বউ আর আমি পাশাপাশি শুয়েছি কিছুদিন পর মেয়েটা আমাদের মাঝখানে শুয়ে ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। আগে বউ তার একটা হাত আমার গায়ের উপর রেখে দিত। এখন সে হাত দিয়ে মেয়েকে আগলিয়ে রাখে। আমি বেচারা খানিক তফাতে শুয়ে থাকি। থাকাথাকির ব্যাপারটা না হয় নিজেরা মিলে মিলমিশ করে নিলাম কিন্তু ডাকাডাকির ব্যাপারটা কী করব? আগে আমার বউ আমাকে ডাকতÑ‘এই শোন, শুনছ, এদিকে আস।’ এখন ডাকে সুবাইতার আব্বু বলেÑ‘এই সুবাইতার আব্বু, তোমাকে ডাকছে ইত্যাদি।’ নিজের বউয়ের কথা বাদ দিলাম মা-বাবাসহ অন্য আত্মীয়রা বলাবলি করছে-কিরে মেয়ের বাবা? মেয়ের বাপ হইছো, মাশাআল্লাহ।’
এবার ঘর ছেড়ে একটু বাইরে আসি শুরুর দিকে বলেছিলাম না যে, রাস্তায় সুন্দরী কোন মেয়ে দেখলে বাঁকা চোখে একবার তাকাতামই। কোনটাকে তো বেশ ভালই লেগে যেত। মনে ভাবতাম- ‘মেয়ে তুমি কার গো?’ একবার হয়েছে কি শোনেন, একটা মেয়েকে এমন ভালো লেগে গেছে কী বলব ভাই। একদিন সাহসের বড়িটরি খেয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালামÑ‘মেয়ে তুমি কী আমার নাতী-পুতীর নানী হবা?’ ‘বেয়াদব কোথাকার’ মেয়েটা আমাকে বলেছিল। এরপর থেকে এহেনও কর্ম আর করা হয়ে ওঠেনি। ভাগ্যিস তখন ইভটিজিং ছিল না, নইলে চৌদ্দ শিকের ভাত খেতে হত। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি গো।
সেই আমি এখন আর নেই, বদলে গেছি। এখন যখন মহাখালীর রাস্তা দিয়ে শাহীন কলেজের পিচ্চি পিচ্চি মেয়েগুলো প্রেমিকদের হাত ধরাধরি করে যেতে দেখি, আবার এখানে সেখানে ওরা গুজুর গুজুর করে কথা বলে তখন ভীষন রাগ লাগে আমার। আরে বাবা তোমাদের তো মাÑবাবারা স্কুলে পড়াশুনার জন্য পাঠিয়েছে তা না করে এসব কী করছ? ইচ্ছে হয় ওদের মা-বাবাকে বলে দিয়ে আসি। এখন আর কোন মেয়েকে আমার আর প্রেমিকা বলে মনে হয় না। যে মেয়েটা এখন আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, ওকে আমার মেয়ে বলেই মনে হল। আর ঐ যে মেয়েটা ছেলেটার হাত ধরে বসা, ঘাড়ে মাথা কাত করে রেখে কথা বলছে, ওর কাছে গিয়ে বলিÑ‘মা-রে এখানে বসে কী করিস, তোর না পড়াশুনা শেষ করে বাসায় ফেরার কথা? চল চল বাসায় চল।’ তারপর বাসায় গিয়ে কড়া কড়া কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেব, আগে বাসায় চলো মামনি (মনে মনে বলি)। হায় বাবা হওয়ার কী জ্বালা, পরের মেয়ের অনিষ্টে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। আহারে মেয়েগুলো না জানি কি বিপদেই পড়ে। এই আশংকায় কাটছে আমার দিন।
আমারও তো একটা মেয়ে হয়েছে। একদিন সে বাইরে বের হবে। একা চলতে শিখবে। হঠাৎ একদিন বিপরীত লিঙ্গের কোন একজনের সাথে সাথে পথ চলবে। তখন আমি কোথায় থাকব? কী করতে পারব? তখন কী আমার সময় হবে, মেয়ে কোথায় যায়, কী করে, তা দেখার?
original post


No comments:
Post a Comment