Showing posts with label politics. Show all posts
Showing posts with label politics. Show all posts

Tuesday, March 20, 2012

গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র - ১

গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র - ১

গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দর্শন। কি এই গণতন্ত্র, কোথা থেকে এর উদ্ভব, এই দর্শন প্রতিষ্ঠার পিছনে কারা ছিলেন, বিশ্বের অতিত ইতিহাসে গণতন্ত্র কখন কেমন ছিল, কি করে তা রাষ্ট্রযন্ত্রে স্থান পেল, কতটুকু সফল এই রাজনৈতিক মতাদর্শ, এর বিকল্প কিছু আছে কিনা; বিভিন্ন জ্ঞানী, খ্যাতিমান, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও লেখকেরা এই মতাদর্শের পক্ষে ও বিপক্ষে কি বলেছেন বা লিখেছেন এই সম্পর্কে ধারাবাহিক লিখে যাব। আপনাদের গঠনমূলক মতামত কামনা করছি।

প্রথমে উল্লেখ করছি সুখ্যাত ভারতীয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ বইয়ের একটি অংশ:

আমাদের দেশের গ্রামে-গন্ঞ্জে, আধা মফস্বলে আমি ঘুরেছি অনেক। আমি দেখেছি বাধের উপর বসে থাকা বিষন্ন মানুষ, যার কোন কাজ নেই, পেটে ভাত নেই। দেখেছি খরায় বিবর্ণ ফসলের খেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিমর্ষ চাষীকে। বস্তির ধারে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলা করে ধুলোর মধ্যে । শহরের চৌরাস্তায় গাড়িগুলো থামলে শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষে চাইতে আসে জননী। পুরিষের পাত্র মাথায় করে নিয়ে যায় হরিজন। এরা যেন অনন্তকালের স্রোতে এক-একটি বিন্দু। কোনও পরিবর্তন নেই। আমাদের শৈশবে যেমন শিশুকোলে জননীকে ভিক্ষা করতে দেখেছি, আজও তাই দেখছি। গণতন্ত্র এই শিশু ও জননীকে মাথার উপর একটি আচ্ছাদন দিতে পারেনি, দিতে পারেনি একটি সম্মানজনক জীবিকা।কোন শিল্পী হয়তো সেই ভিখারিণীর মর্মন্তুদ ছবি আঁকেন, তার জন্য বাহবা পান, লেখা হয় কবিতা, মন্চস্থ হয় নাটক, তবু চৌরাস্তার মোড়ে শিশু কোলে জননীকে দেখতে পাওয়া যাবেই। ছোটবেলায় রাস্তার মুচিকে ঠিক যে অবস্থায় যে পোষাকে বসে থাকতে দেখতাম, এখনও তারা ঠিক সেরকমই রয়েছে। বাড়িতে ধাঙরেরা আসে খালি পায়ে, নেংটি পড়ে, আমাদের ঠাকুরদারা যেমন দেখেছিলেন আমরাও সেরকমই দেখছি। প্রতিদিন যে মানুষটি আসে তার নামও আমরা জানি না, ওরা সবাই ধাঙর বা মেথর। আফ্রিকার কেনিয়া শহরে আমি জুতো পায়ে মেথর দেখেছি, পরনে প্যান্ট-শার্ট। আমাদের এখানকার যেকোন ধনী কিংবা সাম্যবাদীর বাড়ির মেথরের একই রকম চেহারা। কাশী শহরে ভিখিরির লাইনের মধ্যে এক বৃদ্ধকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম, তার মুখে অজস্র আঁকিবুকি, সামনে হাত পেতে বসে সে ঘুমে ঢুলছে। আমার মনে হয়েছিল ঐ ভিখিরির বয়স আরাই হাজার বছর।গৌতম বুদ্ধ ওকে যেমন দেখেছিলেন, আমরাও সেই অবস্থাতেই দেখছি। কিছুই বদলাতে পারিনি।

এই গণতন্ত্র আমাদের কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে? কোন পথে আসবে সমস্ত মানুষের মুক্তি? নাকি সেই মুক্তি কোন দিনই আসবে না? তার আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী কিংবা মানব সভ্যতা? যদি মানব সভ্যতার বিনাশ হয়ই, তবে তা পরমাণু অস্ত্র বা বিষবাস্পে হবে না। হবে বন্ঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।
original post
read more

Tuesday, January 24, 2012

প্রসঙ্গ বিএসএফ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়া এবং আমার কথা

by রুমি আলম
প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়াঃ হাবিবুর রহমানকে নির্যাতনের ভিডিওচিত্রটি এনডিটিভি ও পশ্চিমবঙ্গের একটি টিভি চ্যানেলসহ নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আমাদের দেশের প্রিন্টিং ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ফেসবুক, ব্লগ, ইউটিউব ইত্যাদি মাধ্যমে শুরু হয় তোলপাড়। অনেকে বিএসএফ যেহেতু কেন্দ্রীর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রনাধীন তাই মনমোহন সরকারকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবার দাবি করেছেন। অনেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ভারত তোষনকে দায়ী করেছেন। অনেকে বুলেটের বদলে বুলেটে জবাব দেবার কথা বলেছেন। সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা পাঠানো এবং এখনই যুদ্ধ ঘোষণার কথাও লিখেছেন। অনেকেই সেই যুদ্ধে শহীদ হয়ে স্বর্গের সুধারস পানের বাসনাও প্রকাশ করেছেন। ভারতীয় পন্য বর্জনের দাবী জানিয়েছেন। কোন একটি সংগঠন সম্ভবত পন্য বর্জনের কর্মসূচীও ঘোষণা করেছেন। অনেকে ব্যঙ্গ করে বিএসএফকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেবার কথা বলেছেন। ভারতীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে বর্জনের দাবী জানিয়েছেন। যতরকম তীব্র ও অশালীন ভাষায় ক্ষোভ ঝাল মিটানো যায় সবই হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমগুলোও সম্পাদকীয় ছেপেছে। সুশীল সমাজও বিভিন্ন টকশো, গোলটেবিল ইত্যাদির আলোচনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন।


প্রতিক্রিয়ার সমালোচনাঃ নির্যাতিত হাবিবুর রহমান চরাচালানের উদ্দেশ্যে ভারতে গমন করেছিল, এটি একটি গোরতর অপরাধ। সেটি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তবে বিএসএফের উচিত ছিল আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করা। তাঁরা সেটি না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে আরও অধিক অন্যায় করেছেন। বিএসএফ শুধু যে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করার মধ্যেই তাদের নৃশংসতা সীমাবদ্ধ রাখে, তা কিন্তু নয়। প্রতিবছর তাদের সীমান্ত এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকও তাদের হাতে হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। সীমান্তে নির্যাতন বন্ধে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানানোর পর সম্প্রতি বিএসএফকে প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র দিয়েছে ভারত সরকার। সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সিমান্তে বিএসএফের নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বেশ সোচ্চার। ভারতীয় গণমাধ্যম সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা প্রশংসনীয়। অনেক সুযোগসন্ধানী চক্র এই ঘটনার সুযোগে স্বাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে উসকে দিতে চাচ্ছে, এটা নিতান্তই মুর্খামি।


যারা যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলছেন, তাঁরা কী একবারও ভেবে দেখেছেন বিশাল ভারতের সাথে এমন অসম যুদ্ধের মানে কি? কিংবা বিজিবির সাথে গোলাগুলিতে শাহ আলম নামের ভারতের এক চোরাকারবারি নিহত হলে তাঁরাও কি এভাবে প্রতিক্রিয়া বা যুদ্ধ ঘোষণার কথা ভেবেছে? আমাদের অনেকেরই যুদ্ধে শহীদ হওয়ার খায়েশ জেগে উঠেছে, তাঁরা একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনার কতজন পূর্বপুরুষ যুদ্ধ করেছেন কিংবা শহীদ হয়েছেন? পন্য বর্জনের যারা ডাক দিয়েছেন, ভালো কথা। স্বদেশী পন্য ব্যবহারে হব ধন্য। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন আপনার হয়ত সামর্থ্য আছে, কিন্তু যে অসহায় দেশপ্রেমিক কৃষক, শ্রমিক বা দিনমজুর তাদের? তাঁরা কি তাহলে অধিক মুল্যে দেশী পেয়াজ কিনবে? নাকি কমমুল্যে ভারতীয় কাপড় কিনে কিছু টাকা বাঁচিয়ে সন্তানের পড়ালেখার জন্য শিক্ষকের বেতন দিবে? জাতি জানে, বিগত জোট সরকারের আমলে যাকে তাকে ব্যাংক লোন দিয়ে কলকারখানা স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়ায় এবং যত্রতত্র ফসলি জমি ক্রয়ের সুবিধা দেওয়ায় চাষাবাদের ভুমি দিন দিন কমেছে। সেই বিষয় নিয়ে আপনারা কেউ কিচ্ছু বলবেন না। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দল যদি এমন ঘোষণা দেয় তবে তাঁদের সাধুবাদ। জানি তাঁরা এটা করবে না। কিন্তু কিছু মানুষ, গোষ্ঠী বা চক্র কে উসকে দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করে ভোটের ফসল ঘরে নিতে চাইবে। আমাদের দেশে ভারতের চ্যানেল অবাধে চলবে কিন্তু আমাদের চ্যানেল সেদেশে চলবে না, এটা মেনে নেওয়া যায়না।


যদিও এই ব্যবস্থার জন্য চারদলীয় জোট সরকার পুরোপুরি দায়ী। কিন্তু কথা হলো সরকারের আইনের জন্য অপেক্ষা করার কী দরকার? প্রত্যেকে নিজেরাই নিজেদের ঘর সামলে নিলেই হয়, তাতে মাসিক কিছু টাকাও বেঁচে যায়। জানি সেটা করতে পারবেন না, কারন আপনাদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবেন আর ঘরে ডিশ লাইন থাকবেনা সেটা কী করে হয়, আর শিলা কি জওয়ানি শিলা, ওলা গান শুনিয়ে মাথা বানাবেন ঢিলা। আর মিডিয়ায় যারা আছেন তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে না লিখে বরং ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণ করুন। যাতে মানুষ স্বদেশী চ্যানেলগুলোই দেখতে আকৃষ্ট হয়। বাংলাদেশে অসংখ্য টিভি ও পত্রিকা থাকার পরেও এই ঘটনাটি কিন্তু ভারতের একটি মিডিয়াই প্রকাশ করেছে, তাহলে প্রশ্ন জাগে আমাদের মিডিয়াগুলো করে কী? তাঁরা কি শুধু মালিক পক্ষের অবৈধ অর্থ রক্ষার কাজেই ব্যস্ত? যারা সরকারের ভারত তোষণের কথা বলে ঝড় তুলছেন তাঁরা একটু মনে করে দেখুন, ’৭১ এ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতই ছিল আমাদের দুর্দিনের পরম স্বজন। তাঁরা শুধু আমাদের আশ্রয় আর খাবারই দেয়নি, যুদ্ধে অংশ নিয়ে অনেকেই শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরন করেছেন। তারপরও বঙ্গবন্ধু ’৭২ এর ২৬ মার্চের মধ্যেই ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে তাদের সৈন্য ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেন।‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিপাগল বাঙালীদের সহযোগিতা করে ভারতীয় সেনারা স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছিল। আবার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ভারতীয় সেনারা দ্রুত বাংলাদেশ ত্যাগ করে তাদের দেশে সেনা ছাউনিতে ফিরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ও বাঙালীকে সম্মান জানিয়েছিল।


এখানেও অনেকেই সমালোচনা করবেন যে, তাঁরা ফিরে যাওয়ার সময় লুটপাট করেছে, পাকিস্তানী বাহিনীর ফেলে যাওয়া সব অস্ত্র নিয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের একটি লেখা পড়লাম। তিনি লিখেছেন, ভারতের যেসব সৈন্যের কাছে তাঁদের কর্তৃপক্ষ কোন অবৈধ জিনিস পেয়েছিল তাদের সকলকেই শাস্তির আওতায় নিয়েছিল। এরকম কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ভারতীয় সেনাদের অনেককেই তিনি বিভিন্ন দ্রব্য(শাড়ী, টিভি/ রেডিও ইত্যাদি)উপহার স্বরুপ দিয়েছিলেন, যা তাঁরা নিতে চাননি। কিন্তু জোর করে গ্রহন করানোর দরুন দোষী স্যবস্ত হলে পরে কাদের সিদ্দিকী নিজে ভারতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিয়ে তাঁদের শাস্তির আওতামুক্ত করেছিলেন। এতেই তাঁদের শৃঙ্খলা সহজে অনুমেয়। তাছাড়া শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম শাসনামলে গঙ্গার পানি চুক্তির কথা ভুলে যাওয়া কী ঠিক? বর্তমান সরকারের সময়ে সাম্প্রতিককালে মনমোহন সিং এর সফরের পরে দুদেশই সহযোগিতার রূপরেখা চুক্তিতে সই করেছেন।


স্থল সীমানাসংক্রান্ত ’৭৪-এর চুক্তির প্রটোকল চুক্তিতে স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরের সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। স্বীমান্ত প্রটোকল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, বাংলাদেশ থেকে নেপাল পর্যন্ত ট্রানজিট ট্রাফিক সহযোগিতা, সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য রক্ষা তথা বাঘ সংরক্ষন নিয়ে দুটি চুক্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও দূরদর্শনের মধ্যে একটি চুক্তি এবং মত্স্যসম্পদ রক্ষা বিষয়ে দুটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশ ফ্যাশন ইনস্টিটিউট টেকনোলজি ও ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজির মধ্যে সহযোগিতা সৃষ্টির চুক্তিসহ মোট ৮টি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের বস্ত্রপণ্য প্রস্তুতকারকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে চরম বিরোধিতা স্বত্বেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৪৭টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চাওয়ায় তৈরি পোশাকের ৪৬টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে ভারত রাজি হয়েছে।ভারত এই সুবিধা দেওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি আয় প্রায় এক শ' কোটি ডলার বৃদ্ধি পাবে। বহুল আলোচিত দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা ছিটমহলবাসীর একমাত্র যাতায়াতের পথ ভারত নিয়ন্ত্রিত তিনবিঘা করিডর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দুইদিনের মধ্যে কার্যকর হলে সেখানে বসবাসরত ১৬ হাজার ছিটমহলবাসীর আনন্দের কথা কী আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত? এমনি অনেক অর্জন আমাদের হয়েছে এবং সেগুলোকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তারপরও অনেকেই সমালোচনা করবেন।


কারন আপনাদের অনেকেরই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাক এটা চান না। দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখাই আপনাদের উদ্দেশ্য। আপনারা ভুলে যান, বেগম জিয়া সার্ক সম্মেলনে দিল্লী গিয়ে গঙ্গার পানি সমস্যা নিয়ে আলোচনার কথা বেমালুম ভুলে যাওয়ার কথা। উলফার সাথে তারেক জিয়ার গোপন সমঝোতায় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রনে দশ ট্রাক অস্ত্র চালানের কথা। সমালোচনার বিপক্ষে আমিও নই। যখন দেখি আমার একজন ভাই গরুচোর ও চোরাচালানের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের সাথে জড়িত এবং ভিন্ন দেশের মানুষ তাকে রক্তাক্ত করেছে, তখন আমার ভিতরেও রক্তক্ষরন হয়। আমার সেই ভাইদের জন্য কিছু না করতে পারার অপরাধবোধ কাজ করে। মানবতাবাদী দেশপ্রেমিক সবসময়ই অন্যায়ের যৌক্তিক সমালোচনা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু বিশেষ মানুষের অধিক দেশপ্রেম প্রকাশ জাতির জন্য অশুভ লক্ষন। কই তাঁদের তো দেখিনা সেনা ক্যু এর কথা ফাঁস হলেও অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রকারীদের সমালোচনা করতে? বরং উল্টো অনেক মিডিয়ায় দেখা গেছে কেন সাংবাদিক সম্মেলন করা হলো এবং ষড়যন্ত্রের কথা কেন দেশবাসীকে জানানো হলো তার তীব্র সমালোচনা করতে।


কিন্তু এটা স্বীকার করেন না যে, অবাধ তথ্য প্রবাহের পথে এটাও একটা মাইলফলক। যেখানে অতীতে সামরিক অভ্যুত্থান সফলভাবে ঘটে গেলেই মানুষ জানতে পারতো, সেখানে সেনাবাহিনী জনগণের কাছে ভিতরের কথা জানিয়ে প্রমান করেছে তাঁরাও এদেশের বিচ্ছিন্ন কোন অংশ নয়।
কিছুদিন আগে ভারতের 'তারা টিভি' নামক একটি দূরদর্শন যন্ত্রে আমাদের প্রিয় পতাকা অবমাননার ছবি আমাদের পত্রিকা/ টিভি চ্যানেল/ ফেসবুক/ ব্লগে ইত্যাদিতে তোলপাড় করেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল এটি প্রায় অর্ধযুগ আগে বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে ঘটেছিল। অথচ এখন এটা নিয়ে হইচই ফেলা দেয়া হলো। সরকারের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করা হলো। ঘটনা যখন ঘটেছিল তখন মহাশয়দের কেউই খোঁজ পেল না। আর এখন দেশপ্রেম উথলে দিল। এসব ঘটনাক্রম দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। উদ্দেশ্যপ্রনোদিত সমালোচকদের মুখোশ উম্মোচন করা সময়ের দাবী।



এবার একটু অতীতে ফিরে যাই, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পরে সারাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে এদের কেউ শরিক হয়েছিলেন বলে আমাদের জানা নেই। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরেও আপনাদের দেখিনি এভাবে প্রতিবাদ করতে কিংবা ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা হলেও আপনারা নীরব থেকেছেন। এমন কি ১/১১ এর পরেও শেখ হাসিনাই প্রথম গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবী জানিয়েছিলেন। তখন এইসব মিডিয়া বা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের দেখিনি জনগণের পাশে দাঁড়াতে। তাহলে এখন এত দেশপ্রেমিক হয়ে উঠার কারন কি? কারন আছে নিশ্চয়ই। আর তা হলো, এখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায়, যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রম চলছে। এসব দেখে আপনাদের গাত্রদাহ হয়। সারাদেশে তাই বর্তমান সরকারের ভারত তোষণের ধোয়া তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করাই আপনাদের উদ্দেশ্য, এটা সচেতন মহল ভালো করেই জানে। অতীতেও আপনারা আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদে মসজিদে উলু ধ্বনি বাজবে বলে ধোঁকা দিয়েছেন দীর্ঘদিন, কিন্তু দিয়েও কাজ হয়নি। তাই এখন সুযোগমত জনগণকে ভুল বোঝানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।



বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভারতকে ঘটনার প্রতিকারের দাবী জানানোয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রনে থাকা বিএসএফ কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনায় দায়ী বিএসএফের ১০৫ ব্যাটালিয়নের ৮ জনকে বহিষ্কার করে সংশ্লিষ্ট কমান্ডার কে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ জানিয়েছে। তাহলে আপনাদের এত উদ্ভট প্রতিক্রিয়া কেন? কেউ কেউ সাম্পদায়িকতাকে উসকে দিচ্ছেন কিন্তু কেন? নিজেদের একবার প্রশ্ন করে দেখুন আপনার বাড়িতে কেউ চুরি করতে গেলে আপনি কী ছেড়ে দেবেন? আমাদের প্রায় বিশ হাজার বর্গমাইলের সীমান্ত অঞ্চলে শিক্ষার হার প্রায় শুন্যের কোঠায়, লোভে পড়ে সেখানের গরীব মানুষগুলো বিভিন্ন পন্য ও মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে পড়ে।


আসুন তাদেরকে কিভাবে শিক্ষিত করে তোলা যায়, কিভাবে চুরির মত লজ্জা ও অপমানজনক অপকর্ম থেকে বিরত রাখা যায় সেদিকে মনোযোগ দেই। তানাহলে আপনাদের এই উদ্দেশ্যমুলক সমালোচনাকে বিশ্ববিবেক বলবে চোরের মা’র বড় গলা। তবে জনগন বুঝে, আপনাদের অনেকেরই পূর্ব পুরুষদের খায়েশ বাস্তবায়নে আপনারাও এদেশটাকে পাকিস্তান বানোনোর স্বপ্ন দেখেন, অনেকেই সাম্প্রতিককালে ক্যু সফল না হওয়ায় গাত্রদাহে সরকারের সফলতাকে আড়াল করার জন্য সরকারের ভারত তোষণের বিষ ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতা উসকে খালেদা-নিজামী-তারেক গংদের ক্ষমতায় আরোহনের পথ সুগম করতে চান, অনেকেই চীন-ভারতের দ্বন্ধে চীনা নুন-সোডা খাওয়ার লোভে ভারত বিরোধীতা করেন। কেউ কেউ হয়ত ব্যতিক্রম।তাঁদের যৌক্তিক সমালচনাকে সাধুবাদ। কিন্তু উদ্দেশ্যমুলক সমালচনাকে ধিক্কার। কথা স্পষ্ট, সকলের অতীত দেখে ও পর্যালোচনা সাপেক্ষেই জনগন স্বিদ্ধান্ত নেবে। কারন কথায় আছে, কারো অতীত জানা থাকলে তাঁর ব্যপারে স্বিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ।
original post
read more

ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা

by রুমি আলম
বলা যায় স্বাধীনতার প্রায় দুই যুগ পরে এরশাদের পতনের পর থেকেই দেশে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও অপ্রয়োজনীয়তা বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এইসময়ে ছাত্রসংগঠনের নেতা কর্মীদের সামনে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন সংগ্রামের স্বাভাবিক চরিত্র না থাকায় কিছু কিছু অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা, জিয়াউর রহমান অবৈধ পথে ক্ষমতায় এসেই জাতীয় রাজনীতি এবং ছাত্ররাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা দিয়ে রাজনীতির চিরচেনা সেই ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল নীতির রাজা লালন করাই রাজনীতি এই অহংকারকে ভয়ংকর ও কুতসিত চরিত্রদান করেন। কাকতালীয়ভাবে ’৯১ এর নির্বাচনেও বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের চরিত্রে কালিমা লেপনের যে অপচেষ্টা জিয়াউর রহমান করেছিলেন, তারই হাতে গড়া দলের নেতা কর্মীরা মহাউদ্দ্যমে এবার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যেন জিয়াউর রহমানের সেই অসমাপ্ত কাজই করতে শুরু করেছিলেন। তখনও একবার আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ছাত্রদের হাতে বইখাতা তুলে দিয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছাত্রলীগ তথা ছাত্ররাজনীতিকেই রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যে বিষবাষ্প রাজনীতির মাঠে ছড়ানো হয়েছিল তা সংগঠনকে খুব সহজে স্পর্শ না করতে পারলেও ব্যক্তির পর্যায়ে খুব সহজেই পৌঁছে গিয়েছিল।


এমনই একপর্যায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার কথা বললে তথাকথিত সুশীলের খুব প্রশংসাও কুড়ান। এইধরনের সুশীলেরা কখনই ছাত্ররাজনীতির অতীত ভুমিকা, থাকার প্রয়োজনীয়তা এবং কিভাবে থাকা উচিত সেগুলোর বিষয়ে কোন পরামর্শ দেন না। তাঁদের সোজা কথা ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সুশীলদের একটি অংশ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বা বেসামরিক আমলা, একটি অংশ ব্যবসায়ী, একটি অংশ ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতি করে হালে পানি না পেয়ে এখন এনজিও ব্যক্তিত্ব, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষক। তারা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার জন্য দৃশ্যমান যেসব যুক্তিগুলো দেখান, সেগুলো ছাত্রসংগঠনগুলো একটু সুনজর ও সাংগঠনিক কার্যপরিধি বৃদ্ধি করলেই সমাধান সম্ভব। কিন্তু খেয়াল করবেন, এই সুশীল মশায়রা কখনই সমাধানের কথা বলবেন না। একেবারে বন্ধই করতে হবে। কেন? কারন, পাকিআমল থেকেই সামরিক শাসন আমাদের শোষণ করছে বারবার। স্বাধীনতা পেলেও পাকি আশীর্বাদপুষ্ট জলপাই রঙা বাহিনী বারবার আমাদের ভাগ্যের শিকে ছিড়েছে। রাজনৈতিক দলকে জনগণের সামনে বিবস্ত্ররুপে উপস্থাপন করে বারবার ধোঁকা দিচ্ছে। আর এই তথাকথিত সুশীল ভদ্রলোকেরা সবসময় হাঁটুতে বুদ্ধিওয়ালা জলপাই বাহিনীর মগজে গোবররুপে স্থিত হয়েছে। ফলাফল যা হবার তাই হয়েছে। শেষরক্ষা কারো হয়নি।


আর এই শেষরক্ষা না হওয়ার পিছনে কারন হল ছাত্রনেতা, ছাত্ররাজনীতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও ছাত্ররাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে যারা জাতীয় নেতা হয়েছেন তাঁরাই। এই সুশীলদের সামনে শত্রু তাই ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররাজনীতি থাকলে দেশে দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতা তৈরী হবে, এটা তাঁরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনা।


বাস্তবতা হচ্ছে, কিছুকাল যাবত দেশে যেভাবে ছাত্ররাজনীতি চলছে এভাবে চলা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটা শুধু সুশীলদের কথা না, যারা একসময় ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁরা, এমনকি এদেশের আমজনতাও চায়, পরিবর্তন আসুক। সমস্যা তৈরি হয়েছে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে। মাথায় ব্যথা তাই বলে মাথা ফেলে দিলে চলবে না, চিকিৎসা করে সুস্থ করতে হবে।


ব্রিটিশ ভারতবর্ষে যখন ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তন হয় তখন যেভাবে সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মপরিচালনা করা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরে আগের সংগঠন যেমন প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে আবার জন্ম নেয়া নতুন সংগঠনও ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ মাইলফলক। রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতিগত শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাজপথেও এই সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। জিন্নার নেতৃত্বাধীন যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পকিস্তান স্বাধীন হলো, সেই মুসলিম লীগের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য বিরোধীদল হিসেবে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয় সমগ্র পাকিস্তানেই ছাত্ররাই প্রথম একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। তারপর ধীরে ধীরে অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে এবং কালের আবর্তে অনেকে হারিয়েও গেছে। যেমন ছাত্ররাজনীতি অনেক নেতা তৈরী করলেও সময়ের সাথে অনেকেই পথ চলেন নি বা পারেন নি।


প্রায় এক যুগ ছাত্ররাজনীতির একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছাত্ররাজনীতির কল্যানকর ও গৌরবের বিষয়গুলোর যেমন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি তেমনি ছাত্ররাজনীতির বিপথগামিতায় অনিশ্চিত বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের হতাশায় নিমজ্জিত হই। আর খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলেই মনে করি, ছাত্ররাজনীতির নীতিগত ও কর্মগত পরিবর্তন সময়ের দাবী। ব্যক্তি যদি বিকৃত রুচির পরিচায়ক হন, তাহলে সংগঠনের খুব বেশী কিছু করার নেই। তারপরও কিছু নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ করে রাখলে অনেকাংশেই সুফল আসে। যখন এদেশে ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তন হয়, তখন যেভাবে পরিচালিত হয়েছে এখনো সেভাবেই ঐতিহ্য ধরে রেখে পরিচালিত হতে হবে তার কোন যৌক্তিকতা নেই। বহমান হোক চেতনায় সমুজ্জল ঐতিহ্য, পরিচালনায় আসুক নতুনত্ব। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাববার। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহনযোগ্য হিসেবে ছাত্ররাজনীতিকে উপস্থাপন করার।


ইতিহাস বলে, ছাত্র সংগঠন শুরু থেকে অন্য কোন জাতীয় সংগঠনের অঙ্গসংগঠন ছিলনা। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমানবলে অঙ্গসংগঠন হতে বাধ্য করে। এর পরে বিগত ১/১১ এর পরবর্তী সরকার আবার জাতীয় সংগঠনকে নির্বাচন কমিশনের আইনের ছকে বেঁধে ছাত্রসংগঠনকে অঙ্গরূপে অস্বীকার করতে বাধ্য করে। যা এখনও বহাল আছে। এবং এই আইন বাতিলের প্রয়োজনীয়তা ছাত্রসংগঠনগুলো এখনো অনুভব করেনি। অথবা প্রয়োজন নেই।
‘৭১পূর্ববর্তী সময়ে পড়ালেখার চেয়ে জরুরী ছিল অস্ত্র চালনা শিক্ষা, দেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে জরুরী ছিল স্বাধীন দেশ অর্জন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জরুরী হয়েছে দেশ গঠন এবং সেজন্য উচ্চশিক্ষায় নিজেকে গড়া। আর এই নিজেকে গড়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তার প্রতিবাদ এবং সফলতা অর্জনই এখন ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত। কিন্তু যেহেতু আমাদের জাতীয় রাজনীতির চরিত্রে পরিবর্তন খুব ধীর গতির তাই ছাত্রসংগঠন এর ক্ষেত্রেও রাতারাতি পরিবর্তন অসম্ভব। তদুপরি নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার বিষয়টি ছাত্রসংগঠনের নিজেদেরকেই বুঝতে হবে ও সেইমতো কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এই সংগঠনটিই সবচেয়ে প্রাচীন। তাই এর পর যত ছাত্রসংগঠনের জন্ম হয়েছে কেউ স্বীকার না করলেও সত্যি যে, সকল সংগঠনই কোন না কোনভাবেই ছাত্রলীগকে অনুসরন করেছে। তাই অদুর ভবিষ্যতেও যাতে অন্যান্য সংগঠন ছাত্রলীগকে অনুসরন করে নিজেদের পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারে সেই ঐতিহাসিক ভুমিকায় ছাত্রলীগকেই অবতীর্ণ হতে হবে। নিকট অতীতে ছাত্রদের হাতে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নেতা নির্বাচনের জন্য ২৯ বছর বয়স নির্ধারিত করা হয়েছে। যা সকলের কাছেই গ্রহযোগ্যতা পেয়েছে। ইতিহাসে সাক্ষ্য দেয়, এই সংগঠনটি একসময় প্রতিবছরই সম্মেলনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করত এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলন করতে ব্যর্থ হলে আপনা আপনিই আগের কমিটি ভেঙ্গে যেত এবং যথাযথ গঠনতান্ত্রিক নিয়মে পূর্ব নির্ধারিত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কাছে সম্মেলন আয়োজনের জন্য সর্বময় দ্বায়িত্ব ন্যস্ত হতো। এমন নিয়মের কড়াকড়ি ফিরিয়ে আনা উচিত। বামধারার চর্চারত অনেক সংগঠনই নিয়মিত সম্মেলন করে।


কিন্তু যেহেতু তাঁদের ভাত্রিপ্রতিম মুরুব্বী সংগঠনগুলো এদেশে এখনো জনগণের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্ব পালনে যেতে পারেনি, সমালোচনার গন্ডীতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তাই তাঁদের কর্মকাণ্ডকে জনগন এখনও আপনরুপে গ্রহন করেনি এবং দৃশ্যমানও নয়। দেশে আরও একটি বৃহৎ ছাত্রসংগঠন রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজো পর্যন্ত তাঁদের একটি গঠনতন্ত্র তৈরী করতে পারেনি। যদিও তাঁদের ভাত্রিপ্রতিম সংগঠন বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় একাধিকবার অধিষ্ঠিত হয়েছে। ’৯০ এর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল প্রায় সকল সংগঠনের ভিতরে গ্রুপিং-দ্বন্ধ দারুনভাবে প্রকাশিত থাকায় ছাত্রদল ডাকসুতে জয়লাভ করে এবং স্বাভাবিকভাবেই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের সাথে মিলিত হয়ে আন্দোলনে অংশ নেয়। এছাড়া এই সংগঠনটি ছাত্ররাজনীতিকে কলংক ব্যতিরেকে অন্য কোন উপহার আদৌ দিতে পারেনি। তবে হ্যাঁ, কথা আসতে পারে যে, তাঁদের সংগঠনের নেতারাও এমপি, মন্ত্রী হচ্ছে, জনগন ভোট দেয়। কিন্তু এদেশের সচেতন মহল জানে, এমপি বা মন্ত্রী হলেই দেশপ্রেমিক গনমানুষের নেতা হওয়া যায় না। তাই পরিবর্তনের ধারায় ছাত্রলীগকেই অগ্রনী হিসেবে দেখতে এবং ভবিষ্যতের দেশ পরিচালনার ভার গ্রহন করার জন্য জাতীয় নেতা তৈরি করার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করতে ছাত্রলীগের যেকোন ভুমিকা জনগন সাধুবাদ জানাবে বলেই বিশ্বাস করি।


একসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল চিঠির মাধ্যমে রাস্তাঘাট ছিল দুর্গম এখন মুঠোফোন, ইন্টারনেট এবং রাস্তাঘাটও অনেক উন্নত। আগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ছিল অপ্রতুল এখন প্রতি থানা বা উপজেলায় একাধিকতো বটেই অনেক ইউনিয়নেও কলেজ স্থাপিত হয়েছে। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এবং অনেক পরেও আওয়ামীলীগ বা অন্য কোন সংগঠনের থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যক্রম ছিলনা। সেসময়ে ৬দফা, ’৭০ এর নির্বাচন, ’৬৯ এর ছাত্রগন অভ্যুথান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহনের উদ্দেশে জনগনকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে গ্রামে গঞ্জে সংগঠনের পরিধি বৃদ্ধি করতে হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রয়োজনই সফলতার মাধ্যমে তার বর্তমান চেহারা হারিয়ে নতুন প্রয়োজনরুপে দৃশ্যমান হয়। তেমনি সেসময় যেভাবে সংগঠনের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেগুলোর অনেকগুলোই সফলতার মাধ্যমে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে, কিন্তু বর্তমানে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।


এখন প্রতিটি ওয়ার্ড/ ইউনিয়নে মুরুব্বী সংগঠনের পাশাপাশি যুবসংগঠন, স্বেচ্ছাসেবকসংগঠন, কৃষকসংগঠন এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও শ্রমিকসংগঠনও তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। আরও রয়েছে নানারকম পরিষদ/ফোরাম ও সাংস্কৃতিকসংগঠন। এহেন পরিস্থিতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোকেও ভাবতে হবে ওয়ার্ড/ ইউনিয়ন/পৌরসভা/ থানা/ উপজেলা/ জেলা/ মহানগর প্রভৃতি শাখা থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। মোদ্দাকথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছাত্রসংগঠনের কোন শাখা থাকাটা বর্তমান সময়ে অযৌক্তিক। ছাত্ররাই যেহেতু ছাত্ররাজনীতি করবে ও নেতৃত্ব দিবে তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কারা নেতৃত্ব দিবে? সকলেইতো কোন না কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র তাহলে যে যেখানে পড়ালেখা করে সেখানেই নেতৃত্ব দিবে।


বর্তমান বাস্তবতায় উপলব্ধিগত বিষয় হলো, এখন যেহেতু দেশ গঠনই আমাদের সকলের প্রধানতম দ্বায়িত্ব, তাই ন্যুনতম ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। ক্লাস নাইন থেকে ‘রাজনীতি শিক্ষা’ নামক অবাধ্যতামুলক কোন শিক্ষাকার্যক্রম পাঠ্য করা যেতে পারে। তাতে করে আমাদের রাজনীতির মৌল বিষয়গুলো, ঘটনার অববাহিকায় ব্যক্তির ভুমিকা ও রাজনীতির আদর্শিক প্রয়োজনীয়তার মতো মৌলিক সত্যাসত্য উদ্ঘাটনে পাঠক ব্রতী হবে এবং নিজেই স্বিদ্ধান্ত নিতে পারবে।


এতে করে ছাত্রসংসদ চালু করা সম্ভব হবে। নতুন ছাত্রবান্ধব ছাত্রনেতা তৈরী হবে। জাতীয় সংগঠনের নেতারা ছাত্রসংগঠনে পকেটের কর্মীকে নেতা বানানোর জন্য অর্থলগ্নি করবেনা, সাবেক নেতারাও আশীর্বাদপুষ্টকে মদদ দিয়ে অন্যায় কর্মে লিপ্ত করবে না। টেন্ডারবাজিতে ছাত্রনেতা/ কর্মীদের ব্যবহার কমবে। টাকার বিনিময়ে পদ বেচাকেনার পথ রুদ্ধ হবে। নির্মম বাস্তবতা হলো, ছাত্রসংগঠনগুলো তাঁদের বিভিন্ন শাখা কমিটিগুলোকে কখনোই গ্রুপিং এ উসকে দেয় না, এধরনের কুকর্মে সেখানকার স্থানীয় মুরুব্বী সংগঠনের নেতারা ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে থাকেন। সোজা কথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কোন ছাত্র সংগঠন না থাকাই বাঞ্ছনীয়। এমনকি গঠনতন্ত্রের সংশোধনী এনে ছাত্র সংগঠনের কোন নেতা বা কর্মীর জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন প্রার্থীকে সমর্থন করে প্রচার প্রচারনায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা উচিত। যারা যে জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের ভাত্রিপ্রতিম তাঁরা মনোনয়ন নির্ধারিত হলেই কেবল নির্বাচনী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করার সাংগঠনিক বিধান থাকা বাঞ্ছনীয়।


এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দ্বায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মে ছাত্রসংগঠন যেহেতু কোন মুরুব্বী সংগঠনের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়। তাই যেকোন জাতীয় সংগঠন আদর্শিকভাবে তাঁদের অনুসারী ছাত্রসংগঠনের আইনগতভাবে অভিবাবক নয়। তাহলে ছাত্রসংগঠনের কি সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না? অবশ্যই থাকা উচিত। স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো কর্তৃপক্ষই দ্বায়ীত্বশীল অবিভাবক। কিন্তু সংগঠনের চরিত্র যখন জাতীয় রুপ ধারণ করবে তখন অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রনালয় অথবা ইউজিসি কেই দ্বায়িত্ব নিতে হবে। কারন ছাত্রসংগঠনগুলো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও তাঁদের সরকারের সাথে বিভিন্ন দাবীদাওয়া বা প্রয়োজন নিয়ে কথা বলবে।

তাছাড়াও সরকারে উচিত ছাত্ররাজনীতির কথা বলার সীমানা নির্ধারণ। এক্ষেত্রে হয়ত কণ্ঠ রোধের কথা উত্থাপিত হবে। তাহলে কী সবসময় দেশের বা বাইরের যেকোন বিষয়ে যখন তখন সভা-সমাবেশ করে নিজেদের ব্যস্ত রাখবে? মোটকথা এক্ষেত্রেও একটা যুতসই নির্দেশনা ছাত্রসংগঠনগুলোর নিজেদের যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য থাকা প্রয়োজন।


এদেশের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ও সচেতন মহল জানে, কারা কি উদ্দেশ্যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা কলুষিত করার পাঁয়তারা করছে। পূর্ব পাকিস্তান থাকাকালীন সময়ের আইয়ুবের মার্শাল ‘ল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে কিছুকাল আগের তত্বাবধায়কের আড়ালে বাস করা ভয়ংকর ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠন ও ছাত্ররাই সর্ব প্রথম আন্দোলন ও প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সেজন্য সুশীলের আড়ালে বাস করা একধরনের কুশীল ও মিডিয়ার অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুযোগে একশ্রেনীর মিডিয়াও চায়না এদেশে ছাত্ররাজনীতির অমসৃণ পিচঢালা পথ বেয়ে দেশপ্রেমিক জননেতা তৈরী হোক। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা মহাশয়রাও তাঁদের ভবিষ্যতে এমপি, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হওয়ার সুপ্ত বাসনার তাড়নায় তাঁরাও চায়না গনমানুষের ভাগ্য গড়ার যোগ্য কারিগর গড়ে উঠুক।


দুঃখজনক হলেও সত্যি, ’৯০ এর আগে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হতো। কিন্তু জনতার ভোট প্রদানের মাধ্যমে ফিরে আসা গণতন্ত্রের শুরু থেকেই সেটা অন্ধকার গুহায় স্থায়ীত্ব লাভ করেছে এক অদৃশ্য কারনে। যে দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল তাঁরা সেসময় ক্ষমতায়ন না হলে দল হিসেবে তাঁদের অস্তিত্ব এবং বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা আজ ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন উচ্চতায় দেখা যেত। সেই ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলটির অরাজনৈতিক আচরনের কারনে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এদেশে বেড়ে উঠতে পারেনি। অপরদিকে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রভৃতি পেশাজীবী এবং তাঁদের বিভিন্ন সংগঠন সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে।


আরো একটি সংস্থা যারা পাকিস্তান ঘরানায় এখনো এদেশের সকল কিছুতে বামহাত দিয়ে থাকে তাঁদেরও সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকে ছাত্ররাজনীতিকে ধ্বংস ও বিতর্কিত করার লক্ষ্যে। উপরোক্ত সকল অশুভ শক্তির এক অদৃশ্য বন্ধনে অভিনব কায়দায় চলছে ছাত্ররাজনীতিকে ধবংসের নীলনকশা। এবং তারই ধারাবাহিকতায় জনগণের ভাগ্য গড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত মূলধারার জাতীয় রাজনৈতিক দলেও সাবেক ছাত্রনেতাদের প্রভাব ক্রমশ অস্তমিত। এই দুরভিসন্ধির ফাঁদ থেকে দেশকে রক্ষা করার সময়োপযোগী স্বিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনগুলোকেই নিতে হবে।


ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আমাদের জাতীয় জীবনে ’৪৭ এর পর থেকে ছাত্রসংগঠনগুলোই কখনো অহিংস পদ্ধতিগত আন্দোলন-প্রতিবাদ আবার কখনো সশস্ত্র বিপ্লবী ভুমিকায় আবির্ভূত হয়ে জাতীয় রাজনীতিকে কখনো মত ও পথ দেখিয়েছে আবার কখনো নিজেরাই নেতৃত্ব দিয়ে নায়কোচিত বীরের সম্মানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন যা মূলত ’৪৮ থেকেই শুরু হয়েছিল এটার নেতৃত্বের পুরোভাগে ছাত্ররাই ছিল। ’৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতি যখন দ্বিধান্বিত ও অনৈক্যে স্থিত তখন ছাত্রসংগঠনগুলোই নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে জাতীয় রাজনীতিকে পথ দেখিয়েছে।


’৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ‘ল জারী করার পরেও ছাত্রসংগঠনগুলোই প্রথম প্রতিবাদ করেছিল। ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন নিজেদের জাতীয় প্রয়োজনে ছাত্রসংগঠনগুলোই নেতৃত্ব দিয়েছে। ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আওয়ামীলীগের মুসলিম লীগ পন্থীরা যখন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে পাশ মার্ক দেয়নি বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগ নেতাদের উপর আস্থা হারিয়ে ছাত্রসংগঠন তথা ছাত্রলীগকেই দেশব্যপী জনমত গড়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত সফলতার সহিত ছাত্রলীগ জনগণের আস্থা অর্জন করেছিল, যদিও বাম ছাত্রসংগঠনগুলো ৬ দফাকে সিআইএ/’র এর ষড়যন্ত্র বলে কুতসা রটালেও পরবর্তীতে ছাত্রসংগঠনগুলো ৬ দফার সমন্বয়ে তাঁদের ১১ দফা নিয়ে মাঠে নামে এবং যার ধারাবাহিকতায় ’৬৯ এর গনঅভ্যুথান ঘটে। যার পুরো নেতৃত্ব ছাত্রসংগঠনগুলোই দেয়। ’



এর নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতি যখন নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দ্বিধান্বিত তখনো ছাত্রসংগঠনগুলোই নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং সারাদেশব্যপী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রচার প্রচারনায় অংশ নিয়ে জয়লাভ নিশ্চিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি সর্বপ্রথম ছাত্রসংগঠনগুলোই গ্রহন করেছিল। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশেও ’৭৫ পরবর্তী সময়ে পাকি সামরিক কায়দায় রাজনীতিকে কলুষিত করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধেও ছাত্রসংগঠনগুলোই প্রথম প্রতিবাদ করে।


এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যখন মত ও পথের ভিন্নতায় বিভক্ত তখনো ছাত্রসংগঠনগুলোই একতাবদ্ধ হয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথকে ত্বরান্বিত করেছে। ছোট বড় অনেক সফলতা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিকট অতীতে ২০০৮ এর আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা তীব্র প্রতিবাদেও যখন এদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, মিডিয়া এমনকি অনেক রাজনৈতিক দলও উচ্চ কণ্ঠে কথা বলতে পারেন নি, তখন ছাত্রসংগঠনগুলোই সাধারন ছাত্রদের সাথে নিয়ে তথাকথিত সেনাসমর্থিত সরকারে ভিত কাঁপিয়ে দেয় যার ধারাবাহিকতায় আজ আবার গণতন্ত্র পুনর্বহাল হয়েছে।


যে ছাত্ররাজনীতির শত লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রক্তের আলপনায় এত উচ্চ সফলতার অতীত নির্মিত হয়েছে, সেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়া অথবা কলুষিত হওয়া জাতির জীবনে অভিশাপ স্বরুপ। আর সেজন্যই ছাত্র রাজনীতির সকল সফল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অনেক আদিপাঠ নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তাই ছাত্রলীগেরই দ্বায়িত্ব সময়ের সাথে নিজেদের যোগ্যতার পরিশীলিত প্রকাশে সুন্দর আগামী নির্মাণে এবং দেশের নেতৃত্বভার গ্রহনের উপযোগী নেতা তৈরি ও জাতিকে সকল ক্রান্তিকালে পথ দেখানোর ভুমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।


বর্তমানে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহন করে ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান অথবা ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেরাই সময়পোযোগী স্বিদ্ধান্ত গ্রহন করে দুষ্কৃতিকারী দের দুরভিসন্ধিমূলক দেশকে বিরাজনীতিকরনের অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে পারাই হবে সময়ের সাহসী প্রতিবাদ।
original post
read more

Wednesday, November 23, 2011

বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমাঃ ডকুমেন্টস সহ সকল মিথ্যাচারের প্রমাণ

by নিঝুম মজুমদার


জামাতী আর বি এন পি'র এক্ব্রটিভিস্টদের মাধ্যমে বার বলা হচ্ছে যে, বঙ্গবন্ধু রাজাকারদের "এক্ট অফ ক্লেমেন্সি" বা "সাধারন kক্ষমা"র মাধ্যমে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যেই বঙ্গবন্ধুর কথা শুনলে ছাগু-বিম্পি নির্বিশেষে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন, ঠিক এই প্রজাতীরা "সাধারণ ক্ষমার" প্রসঙ্গ এলেই বঙ্গবন্ধুর এই ক্ষমাকে মিথ্যে ও পানি মিশিয়ে চমৎকার করে মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে এক পা পেছান না। সত্যিই কি বঙ্গবন্ধু রাজাকারদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন? যদি দিয়েই থাকেন, তবে কাদের ক্ষমা করেছেন? আসুন সেই বিখ্যাত এক্ট অফ ক্লেমেন্সি'র ডকুমেন্টটি দেখে নেই-

১৯৭৩ সালের ৩০ শে নভেম্বর এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেন বঙ্গবন্ধু।




উপরের এই সাধারন ক্ষমার বাংলা ব্যখ্যাঃ

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫নং ধারার (ক) অনুচ্ছেদে যে বিধান রাখা হয় তাতে সত্যিকার অর্থে কোন যুদ্ধাপরাধী মুক্তি পাওয়ার কথা নয়। কারণ ঘোষণার ৫ নং ধারায় বলা হয়েছে

" যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরোদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরোদ্ধে নিম্নোক্ত ধরা মোতাবেক কোনটি অথবা সবকটি অভিযোগ থাকবে

"(১) ১২১ (বাংলাদেশের বিরোদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা), (২) ১২১ ক (বাংলাদেশের বিরোদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র), (৩) ১২৮ ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা), (৪) ৩০২ (হত্য), (৫) ৩০৪ (হত্যার চেষ্টা), (৬) ৩৬৩ (অপহরণ), (৭) ৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ) (৮) ৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ), (৯) ৩৬৮ (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা), (১০) ৩৭৬ (ধর্ষণ), (১১) ৩৯২ (দস্যুবৃত্তি), (১২) ৩৯৪ (দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত), (১৩) ৩৯৫ (ডাকাতি), (১৪) ৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি), (১৫) ৩৯৭ (হত্যা অথবা মারাত্বক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি), (১৬) ৪৩৫ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধণ), (১৭) ৪৩৬ (বাড়িঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার), (১৮) ফৌজদারী দন্ডবিধির ৪৩৬ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতি সাধন) অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান। এসব অপরাধী কোনভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।"

উল্লেখ্য যে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার পরেও প্রায় ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী কারাগারে বন্দী ছিলেন।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্য করুন, এই সাধারন ক্ষমার ডকুমেন্টস-এ একটি কথা লেখা রয়েছে যে, যদি অপরাধী অনুপস্থিত থাকে তাহলে কি হবে। সেখানে বলা আছে যে সেক্ষেত্রে সেসব অভিযুক্তদের সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন করতে হবে এবং তাদের আত্নসমর্পন করতে হবে, এবং সেই ক্ষেত্রেই তারা সাধারণ ক্ষমার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন যদি না তাদের বিরুদ্ধে উপরে উল্লেখিত অপরাধের অভিযোগ না থাকে।

এখন কথা হলো, ১৯৭১ সালে আমার জানামতে নীচের ৩ জনের নামে মামলা হয়েছিলো দালাল আইনে যারা এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) ১৯৭৩ এর মাধ্যমে অভিযুক্ত হিসেবে কারাগারে বন্দী রয়েছে।

তাদের নাম ও মামলার বিবরণ নীচে দেয়া হোলোঃ

ক) রাজাকার কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পর প্রথম মামলা হয় ১৯৭২ সালে। মামলার নম্বর হচ্ছে- (৫)৭২, জি আর নং- ২৫০ (২) ৭২। মামলা করেন শহীদ বদিউজ্জমানের ভাই হাসানুজ্জামান। উল্লেখ্য যে, কামারুজ্জামান তখন পলাতক আসামী ছিলো।

খ) সাকা চৌধুরীর নামে ১৯৭২ সালে দালাল আইনে চট্রগ্রাম জেলার হাট হাজারী থানায় ১৩/৪/১৯৭২ তারিখে ১৭ নং মামলা দায়ের হয়। রাউজান থানা ৪১(১)৭২ নং এবং ৪৩(১)৭২ নং মামলা দায়ের করা হয়।

গ) পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদার হত্যাকান্ডের একজন অন্যতম আসামী দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেইল্যা। ১৯৭২ সালে তার নামে মামলা ৩০২ ও দালাল আইনের ১১(ক) ধারায়।

ইতিহাস বলে এবং ডকুমেন্টস বলে যে, উক্ত ৩ জন কখনোই সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন করেনি। এবং তারা পলাতক আসামী হিসেবেই ১৯৭৫ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর এই দালাল আইন বাতিল হবার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো।






এক নজরে যুদ্ধপরবর্তী দালালদের বিচারঃ



মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দালালীর জন্য ১৯৭২-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আটক হয় - ৩৭ হাজার ৪ শত ৯১ জন

ট্রাইবুনাল গঠিত হয়- ৭৩ টি ( সারা বাংলাদেশে )

১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত উক্ত ট্রাইবুনাল গুলোতে দায়ের করা মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় মোট ২ হাজার ৮ শত ৪৮ টি মামলা ।

দোষী প্রমাণিত হয় - মোট ৭৫২ জন
মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়ঃ প্রায় ২০ জনেরও বেশী।
মামলায় খালাশ পায় - ২ হাজার ৯৬ জন ।

আইনগত ব্যাবস্থায় দ্রুততা আনার জন্য সে সময় ৭৩ টি ট্রাইবুনালের ব্যাবস্থা করা হলেও প্রতিদিন ৩-৪ টির বেশী মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি এবং মাসে যার পরিমাণ ছিলো ১৩০ টির মত মামলা ।

এবার দেখুন এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার ভিডিওঃ





শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন কিসের ভিত্তিতেঃ

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমা প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে। লক্ষ করি বর্তমান সংবিধানের ৪৯ নং অনুচ্ছেদ (১৯৭২ সালের সংবিধানের ৫৭ নং অনুচ্ছেদ)

" The President shall have power to grant pardons, reprieves and respites and to remit, suspend or commute any sentence passed by any court, tribunal or other authority."

অর্থাৎ " কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে কোন দন্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে কোন দন্ড মওকুফ স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।"

সুতরাং বলা যায়, শুধুমাত্র শাস্তি এবং দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার আছে রাষ্ট্রপ্রধানের। কিন্তু যারা শাস্তি কিংবা দন্ড পাননি তাদেরকে কি সাধারণ ক্ষমা করা যাবে?

যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমার নিদর্শন অন্যান্য দেশেঃ

সাধারণ ক্ষমার এমন নিদর্শন কম্বোডিয়া ট্রায়ালের ক্ষেত্রেও দেখা যায় । ১৯৯৬ সালে রাজা নরোদম সিহানুক রেভ্যুলুশনারী ট্রাইবুনালে খেমাররুজ নেতা মানে পলপট সরকারের বিদেশ মন্ত্রী ইয়েং স্যারির দন্ডের মার্জনা ঘোষনা করেন । তবে এই ক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে , কম্বোডিয়ায় দন্ড পাওয়ার পর যুদ্ধাপরাধী স্যারির দন্ড মওকুফ করা হয়েছে কিন্তু ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী ৫৭ নং অনুচ্ছেদে শুধু মাত্র দন্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা ঘোষনার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির থাকলেও , বঙ্গবন্ধু দন্ডিত হননি এমন ব্যাক্তিদের সাধারণ ক্ষমা করেছেন । এই যুক্তিতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষনাটিকেও বাদ করা যেতে পারে অসংবিধানিক সূচিত করে ।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার প্রাক্কালে কিছু জাতীয় ঘটনার দিকে তাকাইঃ




ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন “স্বাধীনতাত্তোর দালালদের বিচার প্রক্রিয়াঃ একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে লিখেন – “যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনে আওয়ামীলীগ সরকারের দূর্বলতার সুযোগে পাকিস্থান আমলই ভালো ছিলো এই প্রচার চালানো হয় এবং এ পর্যায়ে “মুসলিম বাংলা আন্দোলন” বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ-বিরোধী তttৎপরতায় লিপ্ত হয় । ধর্ম ভিত্তিক দলগুলো পিকিংপন্থী দলগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়ে দালালদের মুক্তির দাবী তোলে ।

১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনের প্রাক্কালে দালাল ও স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থন পেতে ন্যাপ (ভাসানী) এবং আতাউর রহমানের জাতীয় লীগসহ আওয়ামী বিরোধী পিকিংপন্থী জোট নির্বাচনের আগেই দালালদের মুক্তি দাবী করে । এ সময় মাওলানা ভাসানী হুমকি দেন যে, ১৯৭২ সালের ৩১ শে ডিসেম্বরের মধ্যে দালাল আইন বাতিল না করলে তিনি দূর্বার আন্দলোন গড়ে তুলবেন”

বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমার পর যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তৎকালীন সময়ে দায়ের করা হয় নি তাদের ছাড়া সবার বিচারই বঙ্গবন্ধু নির্মম ভাবে নিহত হবার আগ পর্যন্তই চলছিলো।

আসুন নীচে তার কয়েকটি প্রমাণ দেখিঃ

১) ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টঃ ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখে,

দুইজন আলবদরের যাবজ্জীবন কারাদন্ড

“ঢাকার ৩য় স্পেশাল ট্রাইবুনাল জজ জনাব এস এম মাহমুদ গত শনিবার হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ করার দায়ে আল বদর মকবুল হোসেন , আয়ুব আলী ও আতিয়ার রহমানকে দোষী সাব্যাস্ত করিয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন । আসামী আতিয়ার রহমান পলাতক বিধায় তাহার গ্রেফতারের দিন হইতে রায় কার্যকরী হইবে” (সংক্ষেপিত)

২) দৈনিক পূর্বদেশের একটি রিপোর্টঃ ১৯৭৪ সালের ২-এপ্রিল

দালালীর দায়ে বরিশালে ১৪ জনের মৃত্যুদন্ড

“বরিশাল জেলার সেশন জজ জনাব আর কে বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতা ও হত্যার অভিযোগে আব্দুল মালেক বেগ সহ আরো ১৪ ব্যাক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছেন । আদালতের কার্যবিধিতে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২২ শে আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অভিযুক্তরা মেহেদীগঞ্জ থানার ভাষাঞ্চর ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের ততকালীন কোষাধ্যক্ষ জবনাব আব্দুল বারী মোল্লার দোকানে চড়াও হয় । তারা আব্দুল বারী মোল্লাকে হত্যা করে ও দোকান লুট করে ।

৩) দৈনিক সংবাদের একটি রিপোর্টঃ ১৯৭৫ সালের ২০ শে এপ্রিল

পাক দালালীর দায়ে দু’জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড

“কুমিল্লা জেলার দায়রা জজ এবং ১ নং বিশেষ আদালতের সভাপতি জনাব কায়সার আলী সম্প্রতি দালালীর দায়ে দু;ব্যাক্তিকে যাবজ্জেবন সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেছেন । মামলার বিবরণে প্রকাশ শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ তদানীন্তন পাকিস্তান আর্মির হাবিলদার এবং ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন । ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বাঙ্গালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি পালিয়ে এসে কিছু কাল বুড়িচং থানার আরাম আনন্দপুরস্থ তার নিজ বাড়ীতে অবস্থান করেন । পরে তিনি ভারতে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের যোগ দেন । কিন্তু দৈহিক অপারগতার দরুণ তিনি আবার নিজ বাড়ীতে ফিরে লুকিয়ে থাকেন । ১৯৭১ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর কথিত বিবাদীদ্বয় কয়েকজন রাজাকার নিয়ে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর লোকেরা রফিক উদ্দিনের বাড়ী ঘেরাও করে এই বাড়ীর আব্দুর রশিদকে তার ঘর থেকে বের করে আনে । পরে বিবাদী দু’জন সহ পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরেরা রফিক উদ্দিনের ঘরের দরজা ভেঙ্গে তাকে বের করে এনে বিবাদী আব্দুল হামিদের সম্মুখে একত্রিত করে উক্ত মামলার সরকার পক্ষের মোট ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় এবং সরাক্র পক্ষের মামলা পরিচালনা করেন সরকারী উকিল কাজী হাচিবুর রহমান । আদালত বিবাদীদেরকে বাংলাদেশ ফৌজদারী দন্ড বিধির ৩৬৪/৩৪ ধারার সাথে রাষ্ট্রপতির আদেশ ৮ এর ১১(এ) মতে দোষী সাব্যাস্ত করেন এবং উপোরোক্ত কারাদন্ডের নির্দেশ দেন” (আসামী দ্বয় হচ্ছেন- আব্দুল হামিদ আজিজুল্লাহ ও আব্দুস সোবাহান । উল্লেক্ষ্য মামলা চলাকালীন সময়ে আব্দুস সোবাহানের মৃত্যু হয় )

উপরের তিনটি পত্রিকার রিপোর্ট দেয়ার মানে হচ্ছে এই , যদি ৩০ শে নভেম্বর ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমাতে সব রাজাকার রা মাফ-ই পেয়ে যেতো , তবে সেই তারিখের পর দুই বছর পর্যন্ত কিভাবে জাজ সাহেব রায় দিলেন বা মামলা চলেছিলো?

কে এই দালাল আইন ১৯৭২ সাল বাদ করে দিয়েছিলেন?

দালাল আইন ১৯৭২, তৎকালীন সামরিক শাসক, রাজাকারদের পেয়ারা দোস্তk জিয়ার নির্দেশে বাতিল করা হয় ১৯৭৫ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর। নীচে তার ডকুমেন্টস সহ প্রমাণ দেয়া হোলো-





সকল তথ্য এবং উপাত্ত সহ সাধারণ ক্ষমাজনিত ঘটনাটি নিয়ে যে মিথ্যাচার জামাত, বি এন পি সহ রাজাকারদের সকল শুভাকাঙ্খীরা করে এসেছে এতটি বছর, তার সকল জবাব আজ দিলাম। আশা করি তাদের মিথ্যের জবাব আমি প্রমাণ সহ দিতে পেরেছি।
original post
read more

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের সাধারন ক্ষমা নিয়ে একজন আইনজীবির মিথ্যাচার এবং প্রকৃত ঘটনা

by এস্কিমো


বাংলাভিশনের এক টক শোতে সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি বলছেন – শেখ মুজিব যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। যারা বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য জানেন তারা কথাটা যে কত বড় মিথ্যাচার তা স্বীকার করবেন। জামায়াতের নেতাদের রক্ষার জন্যে খন্দকার মাহবুব হোসেনের কেন এই মিথ্যাচার?

আসল ঘটনা কি ঘটেছিলো বঙ্গবন্ধুর “সাধারন ক্ষমা”য়?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যখন পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরনপণ সংগ্রামে লিপ্ত – তখন “ জামায়াত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ” একটা সংগঠন হিসাবে নীতিগত কারনে সেই মুক্তির সংগ্রামের শুধু রাজনৈতিক ভাবে বিরোধীতিই করেনি – রাজাকার, আল-বদর, আলশাসম বাহিনী তৈরী করে সক্রিয় ভাবে পাকহানাদারদের হত্যা, ধর্ষন, লটপাট এবং অগ্নিসংযোগে সহায়তা করেছে। দেশের মানুষ যখন মুক্তি আশায় অসহনীয় কঠিন সময় পাড়ি দিচ্ছিল – তখন জামাত একটা সংগঠন হিসাবে তাবেদার মন্ত্রী সভায় গিয়েছে, পাতানো নির্বাচনের অংশগ্রহন করেছে। এর সবই প্রমান মিলে তাদের পত্রিকা “দৈনিক সংগ্রাম”এর ১৯৭১ সালের সংখ্যাগুলোতে।

এরই প্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর জামাতসহ স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতার পরপরই জামাতের অনেক নেতাকর্মী জেলে যায়, অনেকে পালিয়ে বিদেশে অবস্থান নেয়। বিদেশে থাকা জামাত নেতারা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যতদিন না দেশে তাদের জন্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয় – ততদিন তারা বিদেশে বসে বাংলাদেশ বিরোধী কার্যক্রম চালাতে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ১৯৭৫ সালের হত্যাকান্ড পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

তারপর সামরিক শাসক মে: জে: জিয়াউর রহমানের সাথে আঁতাত করে এরা দেশে ফিরে আসে। তখন থেকেই প্রচার শুরু হয় বঙ্গবন্ধু এদের ক্ষমা করে দিয়েছে। এটা একটা বিরাট ভুল ও প্রপাগান্ডা। সাধারন ক্ষমার আওতায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী সাধারন কর্মীদের ক্ষমা করা হয় – যাতে এরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সাধারন ক্ষমার আওতায় সেই ৩৪ হাজার ৬০০ রাজাকার, মুসলিমলীগ কর্মী, জামাত কর্মীদের ক্ষমা করা হলেও তাদের পুরানো বিশ্বাসের রাজনীতি করা অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তাদের সেই অধিকার ফিরে পাবার জন্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

অনেকের কাছে প্রশ্ন যে স্বাধীনতার পরপরই কেন বিচার করা হলো না। এই প্রশ্ন আসার কারন হলো দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসকরা আমাদের ইতিহাস বিকৃতি করেছে এবং অনেক কিছু গোপন করে রেখেছিলো। ফলে একটা প্রজন্মের কাছে অনেক কথাই অষ্পষ্ট থেকেছে। এখানে ষ্পষ্ট করা দরকার যে - স্বাধীনতার পরপরই Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972 (P.O. No. 8 of 1972), এর আওতায় বিচার কাজ শুরু হয় - সেই বিচারের পরিসংখ্যান হলো -

১৯৭২-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আটক হয় - ৩৭ হাজার ৪ শত ৯১ জন

ট্রাইবুনাল গঠিত হয়- ৭৩ টি ( সারা বাংলাদেশে )

১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত উক্ত ট্রাইবুনাল গুলোতে দায়ের করা মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় মোট ২ হাজার ৮ শত ৪৮ টি মামলা ।

দোষী প্রমাণিত হয় - মোট ৭৫২ জন

মামলায় খালাশ পায় - ২ হাজার ৯৬ জন ।

আইনগত ব্যাবস্থায় দ্রুততা আনার জন্য সে সময় ৭৩ টি ট্রাইবুনালের ব্যাবস্থা করা হলেও প্রতিদিন ৩-৪ টির বেশী মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি এবং মাসে যার পরিমাণ ছিলো ১৩০ টির মত মামলা ।

পরে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে সামরিক ফরমানে আইনটি বাতিল করেন - যা ৫ম সংশোধনীর সুবাদে সংবিধানের অংশ হয়ে যায়।

Click This Link

এখানে উল্লেখ্য যে, সাধারন ক্ষমা ঘোষনায় সুস্পষ্ঠ ভাবে উল্লেখ ছিল যে,

“এই আদেশ বলে দন্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা), ৩০৪ ধারা (হত্যার চেষ্টা), ৩৭৬ ধারা (ধর্ষন), ৪৩৫ ধারা (অগ্নিসংযোগ অথবা বিস্ফোরক দ্বারা ক্ষতি সাধন) ৪৩৬ ধারা (বাড়িঘর ধ্বংসের অভিপ্রায়ে অগ্নিসংযোগ বা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্মের চেষ্টা) মোতাবেক অভিযুক্ত বা দন্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না”

এখানে যেমন ঢালাও ভাবে ক্ষমা করা হযনি – তেমনি বঙ্গবন্ধুর নিহত হবার সময়েও অনেক অপরাধীর বিচার চলছিলো। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সামরিক আদেশে সেই বিচার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান নির্বাহী আদেশ দন্ডপ্রাপ্তদের জেল থেকে মুক্তি দেন।

এরপর পঞ্চম সংশোধনীর সুবাদে জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। আজ দেখি বিএনপির নীতিনির্ধারকগন জামায়াতের পক্ষে উকালতি করতে কোর্টে যাচ্ছেন। বিএনপির প্রধান আদালতের রায়ের আগেই জামায়াতের নেতাদের নিষ্পাপ হিসাবে ঘোষনা দিচ্ছেন।

খুবই দুঃখজনক এবং লজ্জার কথা যে স্বাধীন দেশের টিভিতে বসে পরাজিত শক্তির পক্ষে দেশের সর্বোচ্চ আইনজীবি ফোরামের নেতা অবলীলায় মিথ্যাচার করছেন ইতিহাস নিয়ে – যে ইতিহাসের সাথে ৩০ লক্ষ মানব সন্তানের মৃত্যু আর ৩ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম জড়িত।
original post
read more

আমি রাজাকার নইলে এমন কথা বলতে পারতাম না।

by আবিরে রাঙ্গানো
এই পোস্টটি পড়লে আমাকে রাজাকার মনে হতে পারে, সুতরাং পড়ুন আর আমাকে রাজাকার বলে গালি দিন। কারণ আমি রাজাকার।

সরকার এই "যুদ্ধাপরাধীদেরর বিচার" "যুদ্ধাপরাধীদেরর বিচার" করতে করতে আমাদের সাধারণ জনগনের দৃষ্টি ঐদিকেই রেখে দিয়েছেন। এদিকে দেশের উন্নয়নের যে বারোটা বাজছে সেদিকে আমাদের খেয়াল নেই। এমন কোন দিন নেই যুদ্ধাপরাধীর বিচার বা সাঈদী-নিজামী দের নিয়ে ৫০ টি পোস্টের কম দেখি। দেশকে নিয়ে যদি আমরা ৫০ টি পোস্ট দিতাম তাহলে আমাদের লাভ হতো, কারণ তাতে প্রমানিত হতো আমরা উন্নয়নের কথা ভাবি, এবং আমাদের সচেতনতা সেদিকে দরকার। সাঈদী-নিজামীর মত লোককে ফাঁসি দিলে দেশে বিশাল কোন উন্নয়ন কিম্বা লাভ হবে না, আবার বড় কোন ক্ষতিও হবে না। আসল কথা হলো ওনাদেরকে ফাঁসি দিতে সরকারের বড় কোন বাজেট খরচ হবে না, আবার জনগনকে ঐদিকে ব্যাস্ত রাখা যাবে ৫ বছর। যেমনটি আমাদেরকে ব্যাস্ত রেখেছিলো বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর বানানোর নামে। সম্পুর্ণ যুক্তিহীন একটি ইস্যু দিয়ে দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রেখেছিলো সরকার অনেকদিন। অনেক নাটক হলো, অবশেষে সেই বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরের গান থেমেছে। মাননীয় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, রাজাকার কিন্তু ৪/৫ জন নয়, সকলের বিচার করা কিভাবে সম্ভব সেটি ভাবুন? শুধু ৪/৫ জনের বিচার করলে বিচারটি একপেশে হয়ে গেলো না? আরেকটি প্রস্তাব, চিটাগাং এয়ারপোর্টকে বড় করে আন্তর্জাতিক মানের করুন, বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরন করুন সমস্যা নেই। সমুদ্রের কাছে হওয়ায়, আন্তর্জাতিক ট্রান্জিটের জন্য এরচেয়ে ভাল জায়গা আর হয়না। কিন্তু স্বল্প আয়তনের দেশের কয়েকশো বিঘা জমি এভাবে টান দেয়ার কথা ভাববেন না

মনে আছে কি আমাদেরকে যেসব নির্বাচনী ওয়াদা দেয়া হয়েছিলো?? যেসব ওয়াদা পালনে সরকারের কোন টাকা খরচ হবে না সেগুলি পালন করেছে অনেক আগে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় সাধারণ জনগনের যেগুলি দরকার সেদিকে কি নজর দিয়েছে সরকার? বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি অবশ্যই কার্যকর করা জরুরী, কিন্তু সেটি যদি কার্যকর করা নাও হতো আমরা কোন ক্ষতির মাঝে থাকতাম না। অথচ খুনের আসামীদের সরকার সাধারণ ক্ষমা করে দিচ্ছে অহরহ। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসির মত প্রতিটি খুনের যদি সঠিক বিচার হয় তবে অবশ্যই সেটি দেশের জন্য বড় কিছু। এখন বলতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর খুন আর একজন চেয়ারম্যান কিম্বা একজন রিক্সাচালকের খুনের মাঝে ফারাক আছে। এর কোন উত্তর অবশ্য আমার জানা নেই। শেখ হাসিনাকে অনুরোধ, বিচার সবার জন্য সমান করুন, সবার জীবনকে একইভাবে মুল্যায়ন করুন।

আরেকটি প্রসঙ্গ বলা দরকার, যেটি সবাই মেনে নিয়েছে অলরেডি। জিয়া বিমান বন্দরের নাম পরিবর্তন। কত শো কোটি টাকা যেন খরচ হয়েছিলো সেটি করতে, অথচ সেই টাকাটি যদি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যায় করা হতো তাহলে কত কাজের হতো। দেশের মানুষ প্রতিদিন গ্যাস পানি বিদ্যুৎ, একটি সুন্দর সড়কের জন্য হাহাকার করছে ঠিক তার মাঝে আমরা ১৪ শো কোটি টাকা (সম্ভবত) খরচ করে বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করলাম। যেটি ছিলো সম্পুর্ণ অপ্রয়োজনীয়। শেখ হাসিনার কাছে আর্জি, নাম পরিবর্তন করলে দেশের সচেতন জনগন সেটি ভালভাবে নেয় না, এটি বন্ধ করুন।

এখন আমার কাছে ডিজিটাল শব্দটি শুনলে মাথা ঘুরায়। ডিজিটাল কথাটির সাথে অনেক সুন্দর ম্যাচ করে আমার মাথা ঘুরানি। dizzy-টাল dizzy মানেও মাথা ঘুরানি, আবার টাল মানেও পাগলা পাগলা ভাব, এইদিক দিয়ে সরকার ভালভাবেই সফল হয়েছে। কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশ শুনলেই আমার মনে হয় কতগুলো কনফিউজড পাগলের মাথা ঘুরানির দেশ।

শেষ করছি একজন বড়ভাইয়ের কথা দিয়ে। কিছুদিন আগে আমার একটি চাকুরীর ব্যাপারে কথা বলছিলাম। আমরা বিদেশে আছি, আমি উচ্চশিক্ষার জন্য, আর উনি শেষ করে চাকুরী করছেন। দেশে ফেরার অনেক ইচ্ছা আমার। আমি পড়াশুনা শেষে এখানকার একটি কম্পানীতে জয়েন করে কিছুদিন চাকুরী করে দেশে একই কম্পানীতে একটি ভাল পোস্ট নিয়ে যাওয়ার কথা ওনাকে বলছিলাম। উনি বললেন, "আমাকে যদি মাসে ২.৫ লক্ষ টাকা বেতন দেয় তাহলেও বাংলাদেশে যাব না। যদিও বাংলাদেশে ২ লক্ষ টাকা পেলে যা সেভ হবে আমি এখানে ৩.৫ লক্ষ টাকা পেলেও সেটি সেভ হয় না। কারণ এখন আমি বাংলাদেশে গেলে কমফোর্ট ফিল করি না। রাস্তাঘাট বিদ্যুৎ নিরাপত্তা সবকিছু মিলিয়ে কখনো বাংলাদেশে যাব না।" শেখ হাসিনাকে উন্নয়নের একটি সিক্রেট বলি, দেশের উন্নয়নের জন্য মেধাবীদের দেশে নিরাপত্তা দিতে হবে, কাজ দিতে হবে, প্রতি বছর এভাবে মেধা পাচার হলে দেশের উন্নয়ন কখনো সম্ভব না।

একেই বলে ব্রেইন ড্রেইন, দেশের সব মেধাবীরা শুধু আরামদায়ক জিবন যাপনের জন্যই বিদেশে রয়ে যাচ্ছে। কে চায় এসব ভেজালের মাঝে থাকতে? দেশকে পরিবর্তন আমরা কিভাবে করব যদি সরকার আমাদের কথা না ভাবে? আমিও তো মাঝে মাঝে ভাবি ঐ হাসিনা ঐ খালেদা, ৫ বছর তিনি ৫ বছর ইনি, এভাবেই তো চলবে দেশ। জনগন তো ভালবেসে নয় বরং বর্তমান সরকারকে ঘৃণা করেই ভোট দেয় অপজিশন দলে। যেমনটি হবে আগামীবার। তারেকের দুর্নীতি ভুলে হাসিনার হাত থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য খালেদাকে ভোট দিবে শতকরা ৮০ জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দেশের মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করুন, আশে পাশের মোসাহেবদের তোষামদে আসল পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছেন না। অন্ধের মত বলা ঠিক নয় যে দেশের অর্থনীতি ভাল আছে। বিরোধী দলের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে তারা এগুলো নিয়ে কথা বলছে। টাকা নাকি সব আপনাদের হাতে তাই বিরোধী দলের হিংসা হয়। কিন্তু একথার আরেক অর্থ হলো, দেশের টাকা সব আপনাদের পকেটে।
original post
read more

আমি রাজাকার নইলে এমন কথা বলতে পারতাম না।

by আবিরে রাঙ্গানো
এই পোস্টটি পড়লে আমাকে রাজাকার মনে হতে পারে, সুতরাং পড়ুন আর আমাকে রাজাকার বলে গালি দিন। কারণ আমি রাজাকার।

সরকার এই "যুদ্ধাপরাধীদেরর বিচার" "যুদ্ধাপরাধীদেরর বিচার" করতে করতে আমাদের সাধারণ জনগনের দৃষ্টি ঐদিকেই রেখে দিয়েছেন। এদিকে দেশের উন্নয়নের যে বারোটা বাজছে সেদিকে আমাদের খেয়াল নেই। এমন কোন দিন নেই যুদ্ধাপরাধীর বিচার বা সাঈদী-নিজামী দের নিয়ে ৫০ টি পোস্টের কম দেখি। দেশকে নিয়ে যদি আমরা ৫০ টি পোস্ট দিতাম তাহলে আমাদের লাভ হতো, কারণ তাতে প্রমানিত হতো আমরা উন্নয়নের কথা ভাবি, এবং আমাদের সচেতনতা সেদিকে দরকার। সাঈদী-নিজামীর মত লোককে ফাঁসি দিলে দেশে বিশাল কোন উন্নয়ন কিম্বা লাভ হবে না, আবার বড় কোন ক্ষতিও হবে না। আসল কথা হলো ওনাদেরকে ফাঁসি দিতে সরকারের বড় কোন বাজেট খরচ হবে না, আবার জনগনকে ঐদিকে ব্যাস্ত রাখা যাবে ৫ বছর। যেমনটি আমাদেরকে ব্যাস্ত রেখেছিলো বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর বানানোর নামে। সম্পুর্ণ যুক্তিহীন একটি ইস্যু দিয়ে দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রেখেছিলো সরকার অনেকদিন। অনেক নাটক হলো, অবশেষে সেই বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরের গান থেমেছে। মাননীয় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, রাজাকার কিন্তু ৪/৫ জন নয়, সকলের বিচার করা কিভাবে সম্ভব সেটি ভাবুন? শুধু ৪/৫ জনের বিচার করলে বিচারটি একপেশে হয়ে গেলো না? আরেকটি প্রস্তাব, চিটাগাং এয়ারপোর্টকে বড় করে আন্তর্জাতিক মানের করুন, বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরন করুন সমস্যা নেই। সমুদ্রের কাছে হওয়ায়, আন্তর্জাতিক ট্রান্জিটের জন্য এরচেয়ে ভাল জায়গা আর হয়না। কিন্তু স্বল্প আয়তনের দেশের কয়েকশো বিঘা জমি এভাবে টান দেয়ার কথা ভাববেন না

মনে আছে কি আমাদেরকে যেসব নির্বাচনী ওয়াদা দেয়া হয়েছিলো?? যেসব ওয়াদা পালনে সরকারের কোন টাকা খরচ হবে না সেগুলি পালন করেছে অনেক আগে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় সাধারণ জনগনের যেগুলি দরকার সেদিকে কি নজর দিয়েছে সরকার? বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি অবশ্যই কার্যকর করা জরুরী, কিন্তু সেটি যদি কার্যকর করা নাও হতো আমরা কোন ক্ষতির মাঝে থাকতাম না। অথচ খুনের আসামীদের সরকার সাধারণ ক্ষমা করে দিচ্ছে অহরহ। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসির মত প্রতিটি খুনের যদি সঠিক বিচার হয় তবে অবশ্যই সেটি দেশের জন্য বড় কিছু। এখন বলতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর খুন আর একজন চেয়ারম্যান কিম্বা একজন রিক্সাচালকের খুনের মাঝে ফারাক আছে। এর কোন উত্তর অবশ্য আমার জানা নেই। শেখ হাসিনাকে অনুরোধ, বিচার সবার জন্য সমান করুন, সবার জীবনকে একইভাবে মুল্যায়ন করুন।

আরেকটি প্রসঙ্গ বলা দরকার, যেটি সবাই মেনে নিয়েছে অলরেডি। জিয়া বিমান বন্দরের নাম পরিবর্তন। কত শো কোটি টাকা যেন খরচ হয়েছিলো সেটি করতে, অথচ সেই টাকাটি যদি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যায় করা হতো তাহলে কত কাজের হতো। দেশের মানুষ প্রতিদিন গ্যাস পানি বিদ্যুৎ, একটি সুন্দর সড়কের জন্য হাহাকার করছে ঠিক তার মাঝে আমরা ১৪ শো কোটি টাকা (সম্ভবত) খরচ করে বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করলাম। যেটি ছিলো সম্পুর্ণ অপ্রয়োজনীয়। শেখ হাসিনার কাছে আর্জি, নাম পরিবর্তন করলে দেশের সচেতন জনগন সেটি ভালভাবে নেয় না, এটি বন্ধ করুন।

এখন আমার কাছে ডিজিটাল শব্দটি শুনলে মাথা ঘুরায়। ডিজিটাল কথাটির সাথে অনেক সুন্দর ম্যাচ করে আমার মাথা ঘুরানি। dizzy-টাল dizzy মানেও মাথা ঘুরানি, আবার টাল মানেও পাগলা পাগলা ভাব, এইদিক দিয়ে সরকার ভালভাবেই সফল হয়েছে। কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশ শুনলেই আমার মনে হয় কতগুলো কনফিউজড পাগলের মাথা ঘুরানির দেশ।

শেষ করছি একজন বড়ভাইয়ের কথা দিয়ে। কিছুদিন আগে আমার একটি চাকুরীর ব্যাপারে কথা বলছিলাম। আমরা বিদেশে আছি, আমি উচ্চশিক্ষার জন্য, আর উনি শেষ করে চাকুরী করছেন। দেশে ফেরার অনেক ইচ্ছা আমার। আমি পড়াশুনা শেষে এখানকার একটি কম্পানীতে জয়েন করে কিছুদিন চাকুরী করে দেশে একই কম্পানীতে একটি ভাল পোস্ট নিয়ে যাওয়ার কথা ওনাকে বলছিলাম। উনি বললেন, "আমাকে যদি মাসে ২.৫ লক্ষ টাকা বেতন দেয় তাহলেও বাংলাদেশে যাব না। যদিও বাংলাদেশে ২ লক্ষ টাকা পেলে যা সেভ হবে আমি এখানে ৩.৫ লক্ষ টাকা পেলেও সেটি সেভ হয় না। কারণ এখন আমি বাংলাদেশে গেলে কমফোর্ট ফিল করি না। রাস্তাঘাট বিদ্যুৎ নিরাপত্তা সবকিছু মিলিয়ে কখনো বাংলাদেশে যাব না।" শেখ হাসিনাকে উন্নয়নের একটি সিক্রেট বলি, দেশের উন্নয়নের জন্য মেধাবীদের দেশে নিরাপত্তা দিতে হবে, কাজ দিতে হবে, প্রতি বছর এভাবে মেধা পাচার হলে দেশের উন্নয়ন কখনো সম্ভব না।

একেই বলে ব্রেইন ড্রেইন, দেশের সব মেধাবীরা শুধু আরামদায়ক জিবন যাপনের জন্যই বিদেশে রয়ে যাচ্ছে। কে চায় এসব ভেজালের মাঝে থাকতে? দেশকে পরিবর্তন আমরা কিভাবে করব যদি সরকার আমাদের কথা না ভাবে? আমিও তো মাঝে মাঝে ভাবি ঐ হাসিনা ঐ খালেদা, ৫ বছর তিনি ৫ বছর ইনি, এভাবেই তো চলবে দেশ। জনগন তো ভালবেসে নয় বরং বর্তমান সরকারকে ঘৃণা করেই ভোট দেয় অপজিশন দলে। যেমনটি হবে আগামীবার। তারেকের দুর্নীতি ভুলে হাসিনার হাত থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য খালেদাকে ভোট দিবে শতকরা ৮০ জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দেশের মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করুন, আশে পাশের মোসাহেবদের তোষামদে আসল পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছেন না। অন্ধের মত বলা ঠিক নয় যে দেশের অর্থনীতি ভাল আছে। বিরোধী দলের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে তারা এগুলো নিয়ে কথা বলছে। টাকা নাকি সব আপনাদের হাতে তাই বিরোধী দলের হিংসা হয়। কিন্তু একথার আরেক অর্থ হলো, দেশের টাকা সব আপনাদের পকেটে।
original post
read more

Sunday, November 20, 2011

সংবিধান সংশোধনে আমার ভাবনা

by মোঃ গুলশানুর রহমান

কিছুদিন ধরেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে চারিদিকে নানা কথা হচ্ছে। নানা মিডিয়ায় সবাই নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। কোন অংশ কেমন হওয়া উচিত, কোনটা থাকা উচিত আর কোনটা উচিত নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এতকিছু বারবার আলোচনায় আসতে দেখে আমিও আমার মত করে কিছু চিন্তা-ভাবনা করলাম। ভাবলাম সিসিবিতে শেয়ার করি। আর সিসিবিতে এই আলোচনাটা এখনও হয়নি। সেজন্যই লিখতে বসা।

সংবিধানের কোন অংশ কেমন হওয়া উচিত সেসব কথায় যাওয়ার আগেই এব্যাপারে আমার কিছু মত আগে বলে নিই-

- আমার মনে হয়, সংবিধানে অন্য কোন দেশকে অন্ধ অনুকরণ করার মানসিকতা থাকা উচিত না। অমুক অমুক দেশের সংবিধানে এটা আছে, সুতরাং আমাদেরটাতেও থাকতে হবে, এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল, অন্য দেশের সংবিধানগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারি। সেটার সাথে ঐ দেশের সফলতা/ব্যর্থতার সম্পর্ক তলিয়ে দেখতে পারি। তবে আমাদের সংবিধানের খুঁটিনাটি কেমন হবে তা অবস্থানুসারে আমাদেরই ঠিক করতে হবে। একই জিনিস সবখানে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

- আর চারপাশের অবস্থা থেকে আমার মনে হচ্ছে, সবাই সংবিধানের ব্যাপারে নিজের মতটাকে অনেকটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেহেতু আমরা গণতন্ত্রকেই আমাদের প্রধান মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছি, গণতান্ত্রিক রীতি হিসেবে আমাদের উচিত সংখ্যালঘুদের মতকে সম্মান জানিয়ে সংখ্যাগুরুদের মতকেই প্রাধান্য দেওয়া।

এখন আসি একটা একটা করে পয়েন্টে যেগুলো বেশি বেশি আলোচনায় আসছে-

ধর্মনিরপেক্ষতা: ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা ‘Secularism’ একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দ। অ্যাবস্ট্রাক্ট বললাম এই কারণে যে, শব্দটির অর্থ নানাজনের কাছে নানারকম। বিশেষত ডান ও বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। সেজন্য ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং এধরণের অন্যান্য অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দ (যেমন ‘সমাজতন্ত্র’) সংবিধানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এক্ষেত্রে যা করা উচিত বলে আমার মনে হয় তা হল-

– প্রথমে এটা ঠিক করা উচিত যে, শব্দটির ব্যাখ্যা কী? বা আরও স্পষ্টভাবে বললে শব্দটির ঠিক কোন ব্যাখ্যা বা অর্থটি আমরা গ্রহণ করতে যাচ্ছি। এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা অর্থকে নীতি হিসেবে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

– এরপর দেখতে হবে আলোচ্য শব্দটি ছাড়াও অন্য এমন কোন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আছে কিনা যা গৃহীত ব্যাখ্যা বা অর্থকে আরও ভালভাবে বা দ্ব্যর্থ-হীনভাবে প্রকাশ করতে পারে। যদি এমন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ পাওয়া যায়, তাহলে সংবিধানে আলোচ্য মূল শব্দের পরিবর্তে নতুন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করতে হবে। আর না পাওয়া গেলে মূল শব্দটিই ব্যবহার করা হবে। এক্ষেত্রে আগেই বলেছি, অনুকরণের মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে।

– পরবর্তীতে বিভ্রান্তি নিরসনে ব্যবহৃত শব্দের ব্যাখ্যা যে ঐটাই যেটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অন্য কিছু নয়; সেটাও সংবিধানে উল্লেখ করতে হবে।

আবার ধর্মনিরপেক্ষতায় ফেরত আসি। আমরা কেউই চাই না যে, বিশেষ কোন ধর্মের অনুসারী হওয়ার জন্য রাষ্ট্র আমাদেরকে বিশেষ কোন সুবিধা দিক। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ধর্ম পালন করতে পারবেন এটাই আমাদের চাওয়া। এটাই যদি ধর্মনিরপেক্ষতা হয়, তাহলে আমার মনে হয় কোন সমস্যা নেই। তবে যেকোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বা অন্যান্য কারণেও রাষ্ট্রের কাছে বিশেষ কোন চাহিদা থাকতে পারে। সেটা রাষ্ট্র পূরণ করতেই পারে। যেমন এখন বিয়ে-তালাক বা অন্যান্য পারিবারিক বিষয়ে ধর্মভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন আইন আছে। আজকাল ধর্মনিরপেক্ষতার যে অর্থ করা হয়- “রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সংশ্লিষ্টতা থাকবে না”, সেটাকে ব্যবহার করে যদি এসব প্রচলিত নীতিকে কেউ এখন বা পরে সুযোগ মত পরিবর্তন করতে চায়, সেটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব বলছি কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকেই এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি কোনভাবে সংবিধানে ঢুকিয়ে দিয়ে পরে সুযোগ অনুসারে রাষ্ট্রকে বিশেষ একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। বিশেষ কোন মত আসতে হলে জনগণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে আসুক। এমন চোরা পথে যাবার কি প্রয়োজন?

এজন্য আমার মত হল- ধর্মনিরপেক্ষতা বা এধরণের অন্যান্য শব্দ বা আরও উপযোগী শব্দ/শব্দগুচ্ছ অবশ্যই সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সহকারে। আর সেক্ষেত্রে শব্দটি নয়,ব্যাখ্যাটিই হবে মুখ্য।

বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামঃ এই দুটি ইস্যুই বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট, যারা বাংলাদেশে ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু লক্ষ্য করুন, সংবিধানে এই দুটি বিষয় কিন্তু জনগণের দাবী থেকে আসেনি। এসেছে ক্ষমতাসীনদের হাত ধরে। এত বড় জনগোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্টতার পরেও ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ কেন জনগণের দাবী থেকে আসল না? কারণ জনগণ কোন তত্ত্বীয় ধারণার জন্য আন্দোলন করে না, আন্দোলন করে বাস্তব অধিকারের জন্য। আর সংবিধানে এই দুটি অন্তর্ভুক্ত থাকা বাস্তব কোন অধিকার নিশ্চিত করে না, কাগজে-কলমে থাকা একটা স্বীকৃতি দেয় মাত্র। এটা এমন কিছু নয় যে, এর ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠী অন্যান্যদের তুলনায় নাগরিক হিসেবে বেশি সুবিধা পাবে, সবখানে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা থাকবে, তারা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক আর অন্যরা দ্বিতীয় শ্রেণীর ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও অনেকেই সেটাই বুঝাতে চাচ্ছেন। আর তৎকালীন ক্ষমতাসীনেরা যে এই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তা আসলে কীজন্য যেটাও যথেষ্ট প্রশ্ন-সাপেক্ষ।

এখন কথা হল, এই দুটি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা? আমার মনে হয়, প্রশ্নটা এভাবে করলে বেশি সরল হয়ে যায় এবং কিছু বিবেচ্য বিষয় বাদ পড়ে যায়। আমার মতে এখানে পরিস্থিতি হিসেবে প্রশ্নটা কয়েকটি ভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে- (১) দেশের সংবিধান তৈরি হচ্ছে। এই সম্পূর্ণ নতুন সংবিধানে এই দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা? (২) দেশে একটা সংবিধান আছে। সেখানে এই দুটি বিষয় নেই। নতুন করে এই দুটি বিষয় যোগ করা হবে কিনা? (৩) দেশে একটা সংবিধান আছে। সেখানে এই দুটি বিষয় আছে। এখন সংবিধান থেকে এই দুটি বিষয় বাদ দেওয়া হবে কিনা?

আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন, তিনটা পরিস্থিতি একই রকম নয়। বিশেষ করে শেষের পরিস্থিতিটা আগের দুটোর চেয়ে অনেকাংশে ভিন্ন। এখন আমার মতটা বলি। আমার মতে প্রথম দুটি ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তবে না করলে যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় কোন ক্ষতি হয়ে যাবে এমন কিছু নয়। কেউ বলতে পারেন, এধরণের জিনিস সংবিধানে থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হবে। সেক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি, কোন একটা শব্দ মুখ্য নয়, শব্দটির যে ব্যাখ্যা বা নীতি সবাই (বা সংখ্যাগরিষ্ঠ) গ্রহণ করবে সেটিই মুখ্য। আমার মনে হয় না, এমন একটা কাগজে কলমে দেয়া স্বীকৃতি ঐ নীতিবিরোধী হবে।

এখন আসি তৃতীয় পরিস্থিতিতে, যেটা বর্তমানে আমাদের সামনে আছে। অর্থাৎ বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে আছে। এর মাধ্যমে দেশের একটা গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে গেছে। এখন এগুলো বাদ দেয়া উচিত কিনা? এখন আপনারাই বলুন, কাউকে কোন স্বীকৃতি দিয়ে সেটা কি আবার ফিরিয়ে নেয়া উচিত? ফিরিয়ে নিলে সেটা কি পরোক্ষ অপমানের মত দেখায় না? অবশ্য যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তিনি ফিরিয়ে দিলে ভিন্ন কথা। কিন্তু কেউ তো আর এমনি এমনি স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেয় না। ক্ষোভে বা অভিমানে দিতে পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ‘নাইটহুড’ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামনে এমন কোন পরিস্থিতি আছে কি? এখন এই দুটি বিষয় সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার মনে হল, অনাকাঙ্ক্ষিত গোলযোগের রাস্তা করে দেওয়া।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার: আমার মনে হয় এখনও বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশের মূল ক্ষমতা আহরণের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নয়। এমনকি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা থাকলেও নয়। সুতরাং যতই নজিরবিহীন এবং অগণতান্ত্রিক হোক না কেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন আছে। তবে দু-এক দশক পর পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।

শেষে একটা কথা বলতে চাই। সেটা হল, সংবিধান একটা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত সেটা কাগুজে একটা দলিল ছাড়া আর কিছুই নয়। সংবিধান পরিবর্তন হয়ে গেলেই আমাদের জীবন রাতারাতি পালটে যাবে না। রাতারাতি তো নয়ই, কয়েক বছর বা দশকেও না। জাতির আসল পরিচয় তার মানসিকতায়, তার মূল্যবোধে। এজন্য আমাদের জাতি হিসেবে নিজেদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আর এই ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি কারও একার কাজ নয়। এতে প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণ।

original post

read more

স্বাধীনতা তুমি

by মোঃ গুলশানুর রহমান

না, আমি কোন কবিতা লিখতে বসিনি। কোন গল্প-উপন্যাসও নয়। বা আবেগপ্রবণ দেশপ্রেমের কোন প্রবন্ধও নয়। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির অর্থ খোঁজা। যেই শব্দটির জন্য আমরা এবং পৃথিবীর আরো অনেক মানুষ অনেক বড় বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে, জীবন বিসর্জন দিয়েছে, তার মর্মার্থ কী? আসলে আমি শব্দটিকে বোঝার চেষ্টা করে যা পেয়েছি, সেটাই এখানে সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।

অনেক আগেই প্রশ্নটা মনে এসেছিল- ‘স্বাধীনতা’ আসলে কী? প্রথমে মোটামুটি যে উত্তরটা মনে এসেছিল তা হল- “প্রত্যেক জাতির জন্য আলাদা এক একটা দেশ”। এর মানেই স্বাধীনতা। আর ভিন্ন কোন দেশ বা জাতি যখন একটা জাতিকে শাসন করে, তাহলে সেটা হল পরাধীনতা। খুব সহজ-সরল উত্তর। কিন্তু এতে যেই অস্পষ্টতাটা থেকে যায়, সেটা হল- ‘জাতি’ শব্দটা। এই যেমন আমরা যদি নিজেদের জাতি হিসেবে বাংলাদেশী বলি, তাহলে বলায় যায় এই জাতির সৃষ্টিই হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিতে। তার আগে তো আর ‘বাংলাদেশী’ জাতি ছিল না। সুতরাং ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আলাদা দেশ’ – স্বাধীনতা এই সংজ্ঞা এখানে খাটে না। আবার যদি নিজেদের বাঙালি বলি, তাহলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের বাইরেও অনেক বাঙালি আছেন। শুধু কলকাতা বা পশ্চিম বঙ্গে না, অন্যান্য দেশেও আছেন। এবং তারা সবাই যে অভিবাসী তা কিন্তু না। অনেকেরই বাইরেই জন্ম, সেখানেই বেড়ে ওঠা। (আমি কিন্তু শুধু ভাষার ভিত্তিতে বাঙালি বলছি না, আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তিতে বলছি। আর বাঙালি-বাংলাদেশী বিতর্কও আমার উদ্দেশ্য নয়।) অন্য দেশে থাকা সত্ত্বেও তারা কিন্তু নিজেদের পরাধীন মনে করছেন না। আবার অনেক দেশেই(বিশেষ করে বড় দেশগুলোতে) ভিন্ন ভিন্ন জাতি একই রাষ্ট্রে বাস করছে এবং নিজেদের স্বাধীনও মনে করছে।

আবার অনেক দেশ, হয়ত যারা নিজেরাই অন্যের কাছ থেকে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাদের নিজেদের ভিতরেও নতুন করে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম আর সংঘাত চলছে। যারা সংগ্রাম করছে, তারা নিজেদেরকে বলে ‘স্বাধীনতাকামী’। এক পক্ষের কাছে তারা হিরো। আবার অন্যপক্ষের কাছে তারা নিছক ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী’ ছাড়া আর কিছু নয়। এসব সন্ত্রাসীর হাত থেকে দেশের অখন্ডতা রক্ষার জন্য লড়াই করা হচ্ছে। অর্থাৎ হিরো হয়ে গেল ভিলেন। অর্থাৎ এখানে স্বাধীনতার সংজ্ঞা অনেকটাই আপেক্ষিক। এমনকি জাতিসত্তার সংজ্ঞাও তাই। সেজন্য স্বাধীনতাকে শুধু জাতিসত্তার সাথে মিলানো হলে মনে হয় সঠিক সংজ্ঞাটা পাওয়া যাবে না। তাহলে কী হতে পারে স্বাধীনতার মর্মার্থ?

প্রশ্নটা মনের মধ্যেই রেখে দিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ করেই যেন একটা জবাব পেয়ে গেলাম। ঠিক বইয়ের পাতায় পড়া আক্ষরিক জবাব না, প্রত্যক্ষও না, পরোক্ষ। কিন্তু বেশ সম্পূর্ণ। জবাবটা পেয়েছি অরুন্ধতী রায়ের কাছে থেকে। সবাই উনাকে মূলত লেখিকা(“গড অব দ্য স্মল থিংস”-এর জন্য) হিসেবে চিনলেও অনেকেই জানেন উনি একই সাথে একজন প্রখ্যাত সমাজকর্মী। আর ভারতের বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীর সাথে উনি কাজ করেছেন, তাদের কথা সবার সামনে এনেছেন। কিছুদিন আগের আলোচিত ‘নকশাল’ নামে পরিচিত স্বাধীনতাকামী(বা ভারতে সরকারী ভাষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী) আন্দোলন চলাকালেও তিনি তাদের অনেক কাছে, একেবারে যুদ্ধের ক্যাম্প পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন, যেটা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব। যাই হোক আসল কথায় ফিরে আসি। একবার উনি কাশ্মীরে গিয়েছিলেন। তাদের সাথে কথা বলার সময় উনি একবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারা কেন আজাদী(স্বাধীনতা) চায়। উত্তরটা ছিল অনেকটা এরকম- “ভারতের কাছ থেকে আমাদের ‘ইনসাফ’ পাওয়ার আশা শেষ হয়ে গেছে, তাই আমরা ‘আজাদী’ চাই।” খুব ছোট্ট আর সরল একটা কথা। কিন্তু এর ভিতরেই আমি যেন আমার খুঁজতে থাকা স্বাধীনতার সংজ্ঞাটা পেয়ে গেলাম।

আরও একটু ভাঙার চেষ্টা করি কথাটাকে। ‘ইনসাফ’ অর্থাৎ ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচার তো সবাই চায়। সব বিষয়েই চায়। কিন্তু অনেক সময়ই সবাই পায় না। আমাদের বাংলাদেশের কথাই এখন ধরা যাক। গত কয়েকদিনের ঘটনা মনে করে দেখুন। অনেক অনাচার আর অবিচার মূহুর্তেই চোখের সামনে চলে আসবে। সবাই কিন্তু ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। অনেকের ক্ষেত্রেই “ইনসাফ পাওয়ার আশা শেষ হয়ে গেছে”-ব্যাপারটা সত্য। কিন্তু এতে করেই যে সবাই স্বাধীনতার দাবী করছে, এমনও না। তার মানে এই অবিচারের সাথে স্বাধীনতার সম্পর্কে আরও কিছু অতিরিক্ত শর্ত আছে। আমার মনে হয়েছে- শর্তটা হচ্ছে রেসিজম বা বর্ণবাদ।

স্বাধীনতার দাবী কিন্তু কোন ব্যক্তির একার হয় না, হয় গোষ্ঠীর। একজন ব্যক্তি এককভাবে স্বাধীনতা চায় না। গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা চায়। কখন চায়? যখন ঐ গোষ্ঠীর উপর অবিচার করা হয়। যখন তারা ন্যায়বিচার পায় না। এবং এই অবিচার বিশেষভাবে ঐ গোষ্ঠীর জন্য। তাদের ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক বা অন্য কোন পরিচয়ের জন্য। এজন্য যেকথা বলছিলাম, আমাদের দেশেও অনেকে অবিচারের শিকার। কিন্তু তারা এজন্য স্বাধীনতা চাচ্ছেন না যে, এই অবিচার বা অনাচার কোন গোষ্ঠীর উপর নয় আর এর কারণও বর্ণবাদী মনোভাব নয়। অথবা এমন কিছু হলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা শেষ হয়ে যায়নি। অর্থাৎ বলা যায়, একটা স্বাধীন দেশের মানে হল, সেখানে কারও ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা শেষ হয়ে যায় না।

‘ন্যায়বিচার’ শব্দটাকে আরেকটু বিশ্লেষণ করা যাক। ‘বিচার’ কথাটা কখন আসে? যখন কারও উপর কোন অন্যায় করা হয়। কারও সাথে অন্যায় করার অর্থ হল- তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। সুতরাং মানুষ ন্যায়বিচার চায়, তারও আগের কথা হল সে তার অধিকারের নিশ্চয়তা চায়। সে তার অধিকারের স্বীকৃতি চায়। যখন বৈষম্য করে কোন গোষ্ঠীর অধিকারকে খর্ব করা হয় তখন শুরু হয় সংগ্রাম। প্রথমে অধিকার আদায়ের জন্য। আর যদি সেই আশা একেবারেই শেষ হয়ে যায়, তখন শুরু হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আর আমাদের পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কথাও চিন্তা করে দেখতে পারেন।

পৃথিবীতে যত স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছে, মূলত এই অধিকার আদায়ের জন্যই হয়েছে। তবে কোন মুক্তিযোদ্ধাকে(যেকোন দেশের) যদি জিজ্ঞাসা করেন, কেন যুদ্ধ করেছিলেন? সবাই বলবেন, একটা স্বাধীন দেশের জন্য। হয়ত কেউ বলবেন, একটা নতুন পতাকার জন্য। অত্যাচারী নিপীড়কদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য। কেউই হয়ত সরাসরি অধিকারের কথা বলবেন না। আসলে যেসব জিনিসের কথা বলা হয়, তার সবই ঐ গোষ্ঠী বা জাতির অধিকারের প্রতীক। একটা নাম, একটা পতাকা, একটা মানচিত্র, একজন মানুষ, কিছু স্লোগান, কিছু কবিতা, কিছু গান, কিছু ছবি এবং এমন আরও নানা প্রতীক। এই সবকিছু মানুষের অধিকারেরই প্রকাশ। সবাই মনে করে, ঐ প্রতীকগুলোর জন্যই সংগ্রাম। কিন্তু আসলে মানুষের সংগ্রাম তার অধিকারের জন্য। তার সাথে করা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের জন্য। আর ‘স্বাধীনতা’? ‘স্বাধীনতা’ হয়ত মানুষের অধিকারের চিরন্তন দাবীর এমন সব বিভিন্ন প্রতীকেরই একটা সম্মিলিত আর বিমূর্ত নাম।

original post

read more

Thursday, November 17, 2011

মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী: চরিত্র হননের মহোৎসব হচ্ছে

১৭ নভেম্বর মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের ভূখণ্ডের রাজনীতির ত্রিকালদর্শী এই পুরুষ কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, একজন সমাজ সংস্কারকও ছিলেন।
তিনি ছিলেন গণমানুষের হৃদয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রম ব্রিড। মোহ আর ক্ষমতার রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে নির্মোহ আর ক্ষমতাবিমুখ এই মানুষটি আজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছেন। আর সে লড়াই তিনি করে গেছেন গণমানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে, তাদের পাশে থেকে, তাদের পাশে রেখে।
এমনকি তিনিই একমাত্র নেতা যিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিউক্লিয়াসকে বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন। তিনি রাজধানীর বাইরে থেকেই তার দলীয় নেতৃত্ব দিতে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া শ্রমিক কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যতদিন চলবে মৌলানা ভাসানী ততদিনই সেই সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে থাকবেন।
শুধু তাই নয়, আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্বের সঙ্গেও তার জীবন ও রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের গণমানুষের আত্মার আত্মীয় এই মজলুম জননেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই আমাদের সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রাজনৈতিক ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী ছিলেন অন্য দশজন নেতার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ধারার। তিনি দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাসের আওতার মধ্যেই একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল বাম ঘরানার। সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন তত্ত্বের আলোকে তার মত ও পথ নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, তার মতবাদ যতই বিশুদ্ধ বা অশুদ্ধ হোক না কেন, একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোনও নেতা বংলাদেশের মানুষের নাড়ির স্পন্দন এমনভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।
দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ তার ব্যক্তিগত কারিশমার ভক্ত ও তার রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হলেও ভাসানীর মৃত্যুর পর তার প্রবর্তিত রাজনৈতিক স্রোতধারাটির অপমৃত্যু হয়।
ভাসানীর অনুসারীদের মধ্যে যারা রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন তাদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এদের অনেকেই দলটিতে নেতৃস্থানীয়। তারা মওলানার ভাবাদর্শ পরিত্যাগ করেই বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া সঙ্গত।
কারণ, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা বাহ্যিকভাবে ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে দেখালেও বিএনপিকে সমাজতন্ত্রবিরোধী শক্তি হিসাবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি তিনি ক্ষমতায় এসেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ভাসানীর আদর্শ সমাজতন্ত্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিলেন।
ভাসানী ন্যাপের আদর্শের সাথে বিএনপির আদর্শগত মিল সামান্যই। তবে একথা মানতে কোনও দ্বিধা নেই যে, রাজনীতি সব সময়েই গতিশীল। সুতরাং রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতাদর্শ সঙ্গত কারণেই পরিবর্তনশীল হতে পারে। তাই কেউ যদি ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনুপযোগী মনে করে পরিত্যাগ করেন তাতে দোষের কিছু নেই। বরং সেই অধিকার যে কোন রাজনীতিকেরই রয়েছে। কিন্তু নিজেদের পরিত্যক্ত আদর্শের প্রবক্তাকে নিয়ে যখন কেউ স্মৃতিচারণের উৎসবে মেতে তার রাজনৈতিক চরিত্র হননে লিপ্ত হন তখন প্রশ্ন থেকে যায়। এই বাস্তবতার আলোকেই আজ ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাবেক অনুসারীদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটা–- এ সব কিছু নিয়েই নতুন ভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের বিষয়টি সব সময়েই সংবেদনশীল। এই দিনে মৃত ব্যক্তির জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা সামাজিক শিষ্ঠাচারের অংশ। কিন্তু এই মৃত্যুবার্ষিকী যদি কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হয়ে থাকে তবে তাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও অসংযত আবেগ বহিঃপ্রকাশের নজিরও আমাদের কম নেই। কখনো বা আবার দিনটির আয়োজন এবং আবেদনকে এমনভাবে দলীয়করণ করা হয় যে তাতে মৃত্যুবার্ষিকী পালনের আসল উদ্দেশ্যটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভাসানীর মৃত্যুর পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছে। বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো সব সময়েই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে। ভাসানীকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার জন্য তাদের এ উদ্যোগ আপাত দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুবার্ষিকীর এই স্মরণসভায় যে ভাসানীকে উপস্থাপন করা হয় বা হবে তিনি কোন ভাসানী? তিনি কি সেই ভাসানী যিনি এ দেশের ভূখানাঙ্গা মানুষের জন্য সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন? দুর্ভাগ্যবশত আজ আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা হবে ‘ইসলামী মুল্যবোধের ধারক ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অগ্রণী পুরুষ’ কোনও এক অলীক মওলানা ভাসানীকে। সেই ভাসানীর সাথে আসল ভাসানীর কোনও মিল নেই।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন এবং দলটির নেতাদের ভোগ বিলাসের জীবনের সাথে প্রকৃত মওলানা ভাসানীর জীবন ও দর্শনের মিল অতি সামান্যই।
কাগমারী সম্মেলনে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী যখন পাকিস্তানিদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছিলেন তখন তিনি ‘বাঙালী’ জাতিসত্তার কথা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশী’ জাতির কথা নয়। অথচ তাকে মরণোত্তর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী’ সাজানো হয়েছে।
মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম প্রধান এই নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন স্বাধীনতাযুদ্ধের স্বীকৃত বিরোধীরা। তার স্মৃতির প্রতি এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে! মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতারা ভাসানীর কোন আদর্শকে মূল্যায়ন করেন, আজ সেই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। মওলানার আদর্শকে মাইনাস করে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটার মধ্যে তাই প্রশ্ন থেকে যায় উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে।
ভাসানীর নিজের প্রতিষ্ঠিত দলটি আজ বিলুপ্ত। যদিও ভাসানী ন্যাপ নামে কয়েকটি প্যাড সর্বস্ব দল আজো টিকে আছে। সেই দল উপদলগুলোর সাথে ভাসানী-প্রতিষ্ঠিত দলটির কোনও আদর্শিক সম্পর্ক নেই। এই ব্যক্তিসর্বস্ব সংগঠনগুলো মূলত বিএনপির বি-টিম হিসাবেই কাজ করে। পক্ষান্তরে ভাসানী যে রাজনৈতিক দলটির গঠন প্রক্রিয়ার মূল ভূমিকা রেখেছিলেন সেই আওয়ামী লীগ মাওলানা ভাসানীর স্মৃতি ও তার মৃত্যুবার্ষিকীকে করে চরম উপেক্ষা। সেই সুযোগেই স্বাধীনতা সংগ্রামী সমাজতন্ত্রী মওলানা ভাসানী মরণোত্তর হাইজ্যাক হয়ে গেছেন স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক ও পুঁজিবাদের ধারকদের হাতে। তার নাম আওয়ামী লীগ আর স্মরণ করে না। তবে যখন দেখি তাজউদ্দীনের নামে বাংলাদেশে কোনও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হয়নি আজো, তার নাম বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাচ্ছে ক্রমশ তখন আর ভাসানীর স্মৃতির প্রতি আওয়ামী লীগের নির্লিপ্ততা দেখে অবাক হই না। কেবল একজনের স্মৃতির প্রতিই আওয়ামী লীগের দায়বদ্ধতা, যা এই মহাপুরুষটি নিজে বেঁচে থাকলেও চাইতেন না।
প্রিয় মওলানা ভাসানী! আপনার মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের গণমানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গ্রহণ করুন। কিন্তু আমরা ক্ষমাপ্রার্থীও বটে। আজ আপনার রাজনৈতিক স্রোতধারা বিলুপ্ত। আপনার প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ আপনাকে আজ স্মরণ করবে না। ভাসানী ন্যাপ নামধারী বামুন রাজনীতি ব্যবসায়ীরা আজ পত্রিকায় বিবৃতি দেবেন নিজেদের নাম ছাপা হওয়ার স্বার্থে। আর বিএনপি আপনাকে আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়ক এবং ইসলামী ভাবধারার রাজনীতির’ মহান নেতা হিসাবে। আজ সারাদেশে সভা সমাবেশে আপনার রাজনৈতিক চরিত্র হননের মহোৎসব হবে। আপনি সারাজীবন যাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন তারা এবং তাদের নব্য দোসরেরা আপনার ছবি এবং কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। আমাদের ক্ষমা করবেন প্রিয় মওলানা।


১৭ নভেম্বর মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের ভূখণ্ডের রাজনীতির ত্রিকালদর্শী এই পুরুষ কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, একজন সমাজ সংস্কারকও ছিলেন।
তিনি ছিলেন গণমানুষের হৃদয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রম ব্রিড। মোহ আর ক্ষমতার রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে নির্মোহ আর ক্ষমতাবিমুখ এই মানুষটি আজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছেন। আর সে লড়াই তিনি করে গেছেন গণমানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে, তাদের পাশে থেকে, তাদের পাশে রেখে।
এমনকি তিনিই একমাত্র নেতা যিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিউক্লিয়াসকে বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন। তিনি রাজধানীর বাইরে থেকেই তার দলীয় নেতৃত্ব দিতে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া শ্রমিক কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যতদিন চলবে মৌলানা ভাসানী ততদিনই সেই সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে থাকবেন।
শুধু তাই নয়, আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্বের সঙ্গেও তার জীবন ও রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের গণমানুষের আত্মার আত্মীয় এই মজলুম জননেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই আমাদের সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রাজনৈতিক ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী ছিলেন অন্য দশজন নেতার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ধারার। তিনি দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাসের আওতার মধ্যেই একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল বাম ঘরানার। সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন তত্ত্বের আলোকে তার মত ও পথ নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, তার মতবাদ যতই বিশুদ্ধ বা অশুদ্ধ হোক না কেন, একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোনও নেতা বংলাদেশের মানুষের নাড়ির স্পন্দন এমনভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।
দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ তার ব্যক্তিগত কারিশমার ভক্ত ও তার রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হলেও ভাসানীর মৃত্যুর পর তার প্রবর্তিত রাজনৈতিক স্রোতধারাটির অপমৃত্যু হয়।
ভাসানীর অনুসারীদের মধ্যে যারা রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন তাদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এদের অনেকেই দলটিতে নেতৃস্থানীয়। তারা মওলানার ভাবাদর্শ পরিত্যাগ করেই বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া সঙ্গত।
কারণ, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা বাহ্যিকভাবে ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে দেখালেও বিএনপিকে সমাজতন্ত্রবিরোধী শক্তি হিসাবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি তিনি ক্ষমতায় এসেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ভাসানীর আদর্শ সমাজতন্ত্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিলেন।
ভাসানী ন্যাপের আদর্শের সাথে বিএনপির আদর্শগত মিল সামান্যই। তবে একথা মানতে কোনও দ্বিধা নেই যে, রাজনীতি সব সময়েই গতিশীল। সুতরাং রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতাদর্শ সঙ্গত কারণেই পরিবর্তনশীল হতে পারে। তাই কেউ যদি ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনুপযোগী মনে করে পরিত্যাগ করেন তাতে দোষের কিছু নেই। বরং সেই অধিকার যে কোন রাজনীতিকেরই রয়েছে। কিন্তু নিজেদের পরিত্যক্ত আদর্শের প্রবক্তাকে নিয়ে যখন কেউ স্মৃতিচারণের উৎসবে মেতে তার রাজনৈতিক চরিত্র হননে লিপ্ত হন তখন প্রশ্ন থেকে যায়। এই বাস্তবতার আলোকেই আজ ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাবেক অনুসারীদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটা–- এ সব কিছু নিয়েই নতুন ভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের বিষয়টি সব সময়েই সংবেদনশীল। এই দিনে মৃত ব্যক্তির জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা সামাজিক শিষ্ঠাচারের অংশ। কিন্তু এই মৃত্যুবার্ষিকী যদি কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হয়ে থাকে তবে তাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও অসংযত আবেগ বহিঃপ্রকাশের নজিরও আমাদের কম নেই। কখনো বা আবার দিনটির আয়োজন এবং আবেদনকে এমনভাবে দলীয়করণ করা হয় যে তাতে মৃত্যুবার্ষিকী পালনের আসল উদ্দেশ্যটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভাসানীর মৃত্যুর পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছে। বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো সব সময়েই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে। ভাসানীকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার জন্য তাদের এ উদ্যোগ আপাত দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুবার্ষিকীর এই স্মরণসভায় যে ভাসানীকে উপস্থাপন করা হয় বা হবে তিনি কোন ভাসানী? তিনি কি সেই ভাসানী যিনি এ দেশের ভূখানাঙ্গা মানুষের জন্য সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন? দুর্ভাগ্যবশত আজ আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা হবে ‘ইসলামী মুল্যবোধের ধারক ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অগ্রণী পুরুষ’ কোনও এক অলীক মওলানা ভাসানীকে। সেই ভাসানীর সাথে আসল ভাসানীর কোনও মিল নেই।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন এবং দলটির নেতাদের ভোগ বিলাসের জীবনের সাথে প্রকৃত মওলানা ভাসানীর জীবন ও দর্শনের মিল অতি সামান্যই।
কাগমারী সম্মেলনে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী যখন পাকিস্তানিদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছিলেন তখন তিনি ‘বাঙালী’ জাতিসত্তার কথা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশী’ জাতির কথা নয়। অথচ তাকে মরণোত্তর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী’ সাজানো হয়েছে।
মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম প্রধান এই নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন স্বাধীনতাযুদ্ধের স্বীকৃত বিরোধীরা। তার স্মৃতির প্রতি এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে! মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতারা ভাসানীর কোন আদর্শকে মূল্যায়ন করেন, আজ সেই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। মওলানার আদর্শকে মাইনাস করে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটার মধ্যে তাই প্রশ্ন থেকে যায় উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে।
ভাসানীর নিজের প্রতিষ্ঠিত দলটি আজ বিলুপ্ত। যদিও ভাসানী ন্যাপ নামে কয়েকটি প্যাড সর্বস্ব দল আজো টিকে আছে। সেই দল উপদলগুলোর সাথে ভাসানী-প্রতিষ্ঠিত দলটির কোনও আদর্শিক সম্পর্ক নেই। এই ব্যক্তিসর্বস্ব সংগঠনগুলো মূলত বিএনপির বি-টিম হিসাবেই কাজ করে। পক্ষান্তরে ভাসানী যে রাজনৈতিক দলটির গঠন প্রক্রিয়ার মূল ভূমিকা রেখেছিলেন সেই আওয়ামী লীগ মাওলানা ভাসানীর স্মৃতি ও তার মৃত্যুবার্ষিকীকে করে চরম উপেক্ষা। সেই সুযোগেই স্বাধীনতা সংগ্রামী সমাজতন্ত্রী মওলানা ভাসানী মরণোত্তর হাইজ্যাক হয়ে গেছেন স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক ও পুঁজিবাদের ধারকদের হাতে। তার নাম আওয়ামী লীগ আর স্মরণ করে না। তবে যখন দেখি তাজউদ্দীনের নামে বাংলাদেশে কোনও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হয়নি আজো, তার নাম বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাচ্ছে ক্রমশ তখন আর ভাসানীর স্মৃতির প্রতি আওয়ামী লীগের নির্লিপ্ততা দেখে অবাক হই না। কেবল একজনের স্মৃতির প্রতিই আওয়ামী লীগের দায়বদ্ধতা, যা এই মহাপুরুষটি নিজে বেঁচে থাকলেও চাইতেন না।
প্রিয় মওলানা ভাসানী! আপনার মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের গণমানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গ্রহণ করুন। কিন্তু আমরা ক্ষমাপ্রার্থীও বটে। আজ আপনার রাজনৈতিক স্রোতধারা বিলুপ্ত। আপনার প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ আপনাকে আজ স্মরণ করবে না। ভাসানী ন্যাপ নামধারী বামুন রাজনীতি ব্যবসায়ীরা আজ পত্রিকায় বিবৃতি দেবেন নিজেদের নাম ছাপা হওয়ার স্বার্থে। আর বিএনপি আপনাকে আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়ক এবং ইসলামী ভাবধারার রাজনীতির’ মহান নেতা হিসাবে। আজ সারাদেশে সভা সমাবেশে আপনার রাজনৈতিক চরিত্র হননের মহোৎসব হবে। আপনি সারাজীবন যাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন তারা এবং তাদের নব্য দোসরেরা আপনার ছবি এবং কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। আমাদের ক্ষমা করবেন প্রিয় মওলানা।
original post
read more

১৫ আগষ্ট কিছু না হলে আজই আত্নহত্যা করতেন প্রিয় মুজিবুর রহমান

মুক্তি যুদ্ধের সময় ৩ বাহিনি যুদ্ধ করেছে, আপামর জনগনের মুক্তি বাহিনি, ভারতীয় শান্তি বাহিনি আর কাদেরিয়া বাহিনী। আর এই কাদেরিয়া বাহিনির প্রধান ছিলেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি। যার কারনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান তাকে বঙ্গবীর উপাধি দিয়েছিলেন। ‘বাসাইল-সখীপুর’ আসনের বর্তমান সাংসদ ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শওকত মোমেন শাহজাহান। সেই বঙ্গবীর কে যুদ্ধ অপরাধি বলছেন। এক জন মুক্তি যোদ্ধাকে যুদ্ধ অপরাধী বলাটা আরেকটা যুদ্ধ অপরাধ। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি যদি তৎকালীন পাকিস্থানের ব্যাংক লুট করে যুদ্ধের জন্য খরচ করে থাকে । সেটাতে আপনার কেন গা জ্বলবে। আপনি কি তৎকালীন পাকিস্থান সাপোর্ট করতেন! ! ! ...........................আওয়ামীলীগ এখন যুদ্ধাপরাধী শব্দটি গালি হিসাবে ব্যবহার করছে । হয় আওয়ামী হউন নাইলে যুদ্ধাপরাধী হউন ।
দেখুন তার নমুনা.....ছবি কথা বলে.......


আর ঐ দিকে জিয়া খুন করেছে, জিয়ার বউ পতিতা, জিয়া চুরি করেছে, জিয়া ডাকাতি করেছে, জিয়া রাজাকার, জিয়া পাকিস্তানের চর, বাংলাদেশের সকল নষ্টের গোড়া হইছে জিয়া। তাই এখন আমাদের (আওয়ামীলীগের) সাতখুন মাফ। আমরা দিনে দুপুরে ড্রাইভারকে গুলি করে মেরে ফেলবো (এম্পি শাওন)। আমরা খুন করে ফাঁসীর আদেশ বাইচান্স হয়ে গেলেও রাষ্ট্রপতিরে দিয়া মাফ করায়া নিবো (লক্ষীপুরের তাহের)। আমরা গডফাদারদের কে সমর্থন দিবো (শামীম ওসমান)। হেরে গেলে দাত কেলিয়ে ভাইবোনের নির্বাচন বলে কুলাকুলি করবো। আর একটা আইভি যাতে তৈরি না হয় সেজন্য শুরুতেই দাবায়া দেবো (মেয়র লোকমান) । এক একটা খুন করবো আর বলবো জিয়া হইছে আসল খুনি। আমরা ডাকাতি করবো। টাকা পয়সা মাইরা মুইরা সাফ করে ফেলবো আর বলবো বিএনপির দোষ। আমরা ক্ষমতায় আসলেই কেন জানি রিজার্ভে টান পড়ে। আমরা কিন্তু টাকা পাচার করিনা। ওগুলা তো বিএনপি করে।(মৃগয়া অবলম্বনে )

যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিতর্ক থাকার মূল কারণ হল যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রকাশ না করা।

জনগণ ভোট দিয়ে তাদের আসনে বসায় কাদা ছুরাছুরির জন্য ! হায় কোন দেশে আছি !!!!!!!!

original post

read more

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ

by খান মুহাম্মদ

মাইক নিকোলসের সাম্প্রতিক সিনেমা “চার্লি উইলসন্‌স ওয়ার” (২০০৭) দেখে মনে হচ্ছে, বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতি, ইসলামী মৌলবাদের উত্থান এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বুঝতে হলে “সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ” গবেষণার বিকল্প নেই। আমাদের মত ইতিহাসের কেবল আগ্রহী পাঠকদের অবশ্য গভীর গবেষণার সুযোগ কম। আপাতত জেনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। তাই মাইক্রোসফট এনকার্টা বিশ্বকোষের সাহায্য নিয়ে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের ইতিহাস অনুলিখন শুরু করছি। এনকার্টা বেছে নিলাম কারণ,
- এতে আফগানিস্তানে করা যুক্তরাষ্ট্রের ভুলগুলো পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে
- আফগান ইতিহাসের একজন বিশেষজ্ঞ (Barnett R. Rubin) এটা লিখেছেন
- লেখাটা খুব বেশি বড় না

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ হয়েছে “ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্‌স” (USSR) এর সামরিক বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কম্যুনিস্ট-বিরোধী গেরিলাদের মধ্যে। শুরু হয়েছে ১৯৭৯ সালে, শেষ হয়েছে ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে। যুদ্ধের শুরুতে আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৫ লক্ষ। যুদ্ধে আনুমানিক ১০ লক্ষ আফগান প্রাণ হারিয়েছে যার সিংহভাগই ছিল বেসামরিক জনতা। রুশ বিমানগুলো নির্বিচারে আফগানিস্তানের গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য করে দিয়েছে, বৃষ্টির মত বোমাবর্ষণ করেছে সাধারণ মানুষের ওপর।

সোভিয়েত বাহিনী প্রথম আফগানিস্তানে (তদানীন্তন গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তান) প্রবেশ করেছিল ১৯৭৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। এই প্রবেশের পেছনেও অবশ্য কার্যকারণ আছে। সোভিয়েত অনুপ্রবেশের আগে আগে ক্ষমতাসীন “পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান” (পিডিপিএ) দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। দুই গ্রুপের মধ্যে রীতিমত সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে সামরিক বাহিনীর বামপন্থী কর্মকর্তাদের ক্যু-র মাধ্যমেই পিডিপিএ ক্ষমতা দখল করেছিল। পার্টির দুই ভাগের নাম “খালক” (জনতা) ও “পারচাম” (পতাকা)। খালক ছিল কট্টরপন্থীদের দল, অপেক্ষাকৃত মডারেটরা গঠন করেছিল পারচাম।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান কম্যুনিস্টদের খালক অংশের নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করে পারচাম অংশের নেতা বাবরাক কারমালের নেতৃত্বে একটি পুতুল সরকার গঠন করে। বাবরাক সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্বাসন জীবন ত্যাগ করে আফগানিস্তানে ফিরে আসলেই দেশের সব অভ্যন্তরীন কোন্দল দূর হবে বলে আশা করেছিল সোভিয়েতরা। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ এর মাধ্যমেই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব। আফগানিস্তান যেহেতু তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী দেশ ছিল সেহেতু এ অঞ্চলে একটি ব্রিজহেড (অগ্রসর বাহিনী শত্রুপক্ষের যে এলাকা দখল করে পশ্চাৎ বাহিনীকে সামনে এগুনোর সুযোগ করে দেয়) স্থাপনের মাধ্যমে মার্কিনীরা অনায়াসেই সোভিয়েতদের সাথে সরাসরি সীমান্ত সংস্পর্শ তৈরী করতে পারতো। তাছাড়া অতি সম্প্রতি ইরানে ইসলামী বিপ্লবের কারণে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারিয়েছিল। সবারই জানা, খোমেনীর আগে ইরানের ক্ষমতায় আসীন শাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক ছিল। তো, এই নাজুক পরিস্থিতিতে যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র সংকটে ভুগছিল সেটা বোঝার জন্য কেজিবি হওয়া লাগে না। স্নায়ু যুদ্ধের এই ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে তাই প্রথম চালটা চেলেছিল সোভিয়েতরাই।

সোভিয়েত আগ্রাসন যথারীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিদ্রোহী হয়ে ওঠে অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আফগানিস্তানের ইসলামী প্রতিরোধ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য একটি নতুন প্রোগ্রাম হাতে নেয় যা “মুজাহিদিন” নামে সুপরিচিত। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই প্রোগ্রামের অধীনে আফগানিস্তানকে আনুমানিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য দেয়- অস্ত্র-শস্ত্র সহ বিভিন্ন উপায়ে।

আফগান মুজাহিদিনরা মর্টার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে

আফগান মুজাহিদিনরা মর্টার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে

সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল “জেনেভা অ্যাকর্ড” এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অ্যাকর্ডের শর্ত ছিল, ১৯৮৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল সোভিয়েত সৈন্যকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আসলে সোভিয়েত বাহিনী তাদের ১০০,০০০ এরও বেশি সৈন্য নিয়ে কখনই আফগান প্রতিরোধ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এই প্রতিরোধ বাহিনীকে সাহায্য করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, চীন, ইরান, ইসরায়েল (বিশেষতঃ মোসাদ) এবং আরও কিছু দেশ। এছাড়া পারস্য উপসাগরের ধনকুবের ব্যবসায়ীরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।

১৩,০০০ সৈন্য হারানোর পর সোভিয়েত বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়, সোভিয়েত সম্রাজ্যের সংস্কারবাদী নেতা মিখাইল গর্বাচেভ খানিকটা লজ্জার সাথেই তার প্রচণ্ড ব্যয়বহুল ভুলটা শুধরে নেয়ার চেষ্টা শুরু করেন। এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় গর্বাচেভের সিদ্ধান্তের যে একটা বড় ভূমিকা আছে এটা বোঝা যায় এভাবে: জেনেভা অ্যাকর্ডের পরও মার্কিন সরকার অ্যাকর্ডের শর্ত লংঘন করে মুজাহিদদের অস্ত্র সাহায্য দিতে থাকে। কিন্তু এই সাহায্যে ভয় পেয়ে সোভিয়েতরা পিছু হটেনি, পিছু হটেছে নিজেদের ইচ্ছায়। অ্যাকর্ড পরবর্তী এই অস্ত্র সাহায্য উল্টো যে কাজটা করেছে তা হল, চরমপন্থী মুজাহিদ গোষ্ঠী গঠনের ভিত্তি তৈরী করে দিয়েছে। এই সাহায্যের মাধ্যমেই আফগানিস্তানে সবচেয়ে চরমপন্থী মুজাহিদ গ্রুপগুলো বিকশিত হতে শুরু করে, সেই সাথে আরব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের সাহায্য আসার পথটাও কুসুমাস্তীর্ণ হয়। উল্লেখ্য সেই সময় গঠিত এসব ইসলামী মৌলবাদী দলগুলোর মধ্যে “আল-কায়েদা” ও ছিল। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তানের মুজাহিদিন ক্যাম্পেই আল-কায়েদা গঠিত হয়। তাই এ কথা অনায়াসে বলা যায়, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের জয় এবং সোভিয়েত বাহিনীর পশ্চাদপসরণ কোন শান্তি আনেনি বরং এক অভিনব সংঘাতের সূচনা ঘটিয়েছে। এই সংঘাত ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, আদর্শিক ইত্যাদি নানা রূপ ধারণ করে আমাদের আধুনিক জীবনকে গুহামানবদের কাছে হাস্যকর করে তুলছে।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের একটি আউটলাইন তুলে ধরলাম। এতটুকু জানার পর সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে মার্কিনীদের জয়ের রূপকার কংগ্রেসম্যান চার্লস উইলসনের (টম হ্যাংকস অভিনীত) একটা উক্তি খুব মনে পড়ে,

These things happened. They were glorious and they changed the world and then we fucked up the end game.

এটা অবশ্যই আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গী। এটার গুরুত্ব এজন্যই থাকে যে, বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ হুমকি তথা ইসলামী জঙ্গীদের উত্থানের পেছনে তাদের এই “fucking up” এর একটা বড় ভূমিকা ছিল। তাই এটা নিয়ে গভীর ও সমালোচনামূলক গবেষণার কোন বিকল্প নেই।

poster

চার্লি উইলসনস ওয়ার সিনেমায় যে থিমটা বেশ ভাল লাগল সেটা হচ্ছে- মানুষের চরিত্র অন্য মানুষের সাথে অধিকার-কর্তব্যমূলক সম্পর্কের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা ভাল। কে বেশি মদ খায়, কে স্ট্রিপারদের সাথে লীলাখেলায় মাততে বেশি পছন্দ করে, কে ১০১টা মেয়ের সাথে ফস্টিনষ্টি করে বেড়ায় এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কে বেশি মানুষকে ঘৃণা করে, কে অন্যের অধিকার বেশি কেড়ে নেয়। এজন্যই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের (ওম পুরী অভিনীত) চেয়ে আমার চার্লি উইলসনকে বেশি চরিত্রবান মনে হয়েছে, হয়ত সিনেমার মাধ্যমেই এটা আমার মধ্যে বেশি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ চার্লি উইলসনের প্রথমোক্ত দোষ (?) গুলো থাকলেও শেষোক্ত দোষগুলো নেই, অন্যদিকে জিয়াউল হক তার পূর্বপুরুষদের সহিংস উচ্ছেদের জন্য দায়ী। চার্লির এই কথাটা তাই বেশ দাগ কাটে,

You know you’ve pretty much hit rock bottom when you’ve been told you have character flaws by a man who hanged his predecessor by a military coup.

সিনেমায় অবশ্য কাউকেই খারাপভাবে দেখানো হয়নি, একজন মার্কিন পরিচালকের পক্ষে যতটা নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব ততটা বোধহয় মাইক নিকোলস ছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি না।

এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলভাব বোঝার ক্ষেত্রে মুভির বডি ওয়ার্ক খুব কাজে দেবে বলে মনে হল। মূলভাব বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি- একটি দেশ কেন আরেকটি দেশকে সাহায্য করে, কেনইবা চরম দুর্দীনে এক দেশ আরেক দেশকে ত্যাগ করে। এগুলোকে মানবিক দৃষ্টি দিয়ে দেখার উপায় নেই। কারণ রাষ্ট্র মানুষের মত আচরণ করে না। রাষ্ট্র একটা বিশাল যন্ত্র, হয়ত মানুষেরই মত জটিল, কিন্তু তার মনস্তত্ত্ব ঠিক মানুষের মত না। কেবলমাত্র মানবিক কারণেই পুরো একটা রাষ্ট্র আরেকটা রাষ্ট্র রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়বে এটা অমূলক ধারণা। মানবিকতা অবশ্যই একটা মেজর ড্রাইভিং ফোর্স কিন্তু এটা দিয়ে কাজ চলে না। রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু মানুষ থাকে যাদেরকে অনেক দূরের কোন মানবাধিকার লংঘন স্পর্শ করে যায়। কিন্তু একজন মানুষ চাইলেই পুরো রাষ্ট্রের মন পরিবর্তন করতে পারে না। এর পেছনে জড়িয়ে থাকে অনেক মানুষ, একেক জনের একেক ধরণের প্রেজুডিস, একেক ধরণের গোঁড়ামি, এক মানুষ আরেক মানুষের সাথে আমলাতান্ত্রিক সিস্টেম নামক যে নিউরন দিয়ে বাঁধা সেটা তো আর মানুষের মত কাজ করে না।

আমাদের দেশে শুধু না, পৃথিবীর অনেক মুসলমানের মধ্যেই একটি ধারণা খুব পোক্ত থাকে- মার্কিনীদের সাথে লড়াইটা মুসলিমদের এবং এটা আদর্শিক লড়াই। আমি পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকার খেলাকে এভাবে আদর্শায়িত করাটা একেবারেই পছন্দ করি না। কয়েকদিন আগে মুহাম্মাদ হাসনাইন হাইকলের লেখা “ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম” বইটা পড়েও এই কথা মনে হচ্ছিল- বিংশ শতকে কেবল আদর্শের কারণে সংঘাত হয় না। মধ্যযুগের আদর্শিক ধর্মযুদ্ধের দুঃস্বপ্ন হয়ত কেটে যাচ্ছে। মুসলমানদের অনেকে আদর্শ আদর্শ করে লাফাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংঘাতের মূল কারণগুলো বুঝতে পারছে না। আর সমস্যার কারণ না জানলে যে সমাধান করা যায় না এটা তো সবারই জানা। রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই যে এ যুগে অনেক কিছুর সমাধান করা যায় সেটা মধ্যপ্রাচ্য ও উপমাহাদেশের মানুষের বুঝতে যেন আর বেশিদিন না লাগে, এটাই কামনা করি!

ওয়েল মেইড ঐতিহাসিক সিনেমা হিসেবে “চার্লি উইলসনস ওয়ার” টিকে থাকবে। আধুনিক ইতিহাসের পাঠ সিনেমার মাধ্যমে নিতে চাইলে, এটাকে পাঠ্য হিসেবে নেয়ার বিকল্প নেই। তাছাড়া এই রাজনৈতিক পরিবেশেও নিকোলস যে কমেডিক চার্ম তৈরি করেছেন সেটার প্রশংসা করতে হয়। এর অনেকটা অবশ্য বাস্তব চার্লি চরিত্রের কৃতিত্ব, কিছুটা যথারীতি টম হ্যাংকস ও জুলিয়া রবার্টসের কৃতিত্ব। এমি অ্যাডামসের শিশুসুলভ সরলতাটাও বেশ কাজে দিয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র ছিল Gust Avrakotos, ফিলিপ সিমুর হফম্যান এই চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেছেন। মূলত গাস্টই চার্লিকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিলেন। যে অপেক্ষা হয়ত চার্লি এখনও করছেন, কিসের অপেক্ষা কে জানে… কিসের জন্য অপেক্ষা করছি সেটা জানার জন্যই হয়ত অপেক্ষা…

original post

read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site