Showing posts with label Interviews. Show all posts
Showing posts with label Interviews. Show all posts

Thursday, April 12, 2012

অক্তাবিও পাসের সাক্ষাৎকার: বৌদ্ধধর্ম আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে

by সামিন সাবাবা

৩১শে মার্চ মেহিকোর মহান কবি ও প্রাবন্ধিক অক্তাবিও পাসের ৯৮ই তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৯০ সালে তিনি সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। দু দফায় তিনি ভারতে আসেন। দ্বিতীয় দফায় তিনি ভারতে মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন ছয় বছরের মত। ১৯৯৮ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটি ১৯৯০ সালে গৃহীত হয়েছিলো প্যারিস রিভিউ পত্রিকার পক্ষ থেকে। পাসের ৯৮ তম জন্মবার্ষিকীতে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত কিছু অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সামিন সাবাবা–বি.স.

octaviopaz.jpg
………
অক্তাবিও পাস
………

প্রশ্ন: অক্তাবিও, সম্ভবত আপনার মনে আছে, আপনি জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে….
অক্তাবিও: খুব ভাল মনে নেই।

প্রশ্নঃ : মেহিকান বিপ্লবের ঠিক মাঝামাঝি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর দিকে। বলা যেতে পারে একটা যুদ্ধ জর্জরিত শতাব্দির মধ্য দিয়ে আপনি জীবন পার করেছেন। বিংশ শতাব্দি নিয়ে আপনার ভালো কিছু বলার আছে কি ?

অক্তাবিও :আমি টিকে আছি, আমার মনে হয় তাই যথেষ্ট। আপনি জানেন ইতিহাস এক জিনিস আর আমাদের জীবন আরেক জিনিস। আমাদের শতাব্দিটা ছিল ভয়ানক, এই সর্বজনীন ইতিহাসের এক অন্যতম দুঃখময় শতাব্দি-কিন্তু আমাদের জীবন প্রায় সবসময়ই কমবেশি একরকম। ব্যক্তিগত জীবন কখনই ঐতিহাসিক নয়। ফরাসি এবং আমেরিকার বিপ্লব অথবা গ্রিক আর পারসিকদের মাঝে যুদ্ধের কালে অথবা যে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ সর্বজনীন ঘটনা মাঝে ইতিহাস বিরামহীনভাবে বদলাতে থাকে। কিন্তু মানুষ বাঁচে, কাজ করে, প্রেমে পড়ে, মারা যায়, অসুস্থ হয়, বন্ধুত্ব পাতায়, আলোকিত মুহূর্ত অথবা দুঃখময়, এবং তার কোনোই সম্পর্ক নেই ইতিহাসের সাথে । থাকলেও খুব কম আছে।

প্রশ্নঃ : তাহলে আমাদের অবস্থান ইতিহাসের ভেতরে এবং বাইরেও?

অক্তাবিত্ত :হ্যাঁ, ইতিহাস আমাদের পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিত এবং তার মাঝে আমাদের বিচরণ। কিন্তু আসল নাটকীয়তা আর কৌতুক হলো আমাদের ভেতরে, এবং তা পঞ্চম শতাব্দি অথবা ভবিষ্যত শতাব্দির যে-কারো জন্যেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। জীবন ঐতিহাসিক নয় বরং প্রকৃতির মত কিছু।

প্রশ্নঃ :The privileges of Sight বইটিতে আপনি এর সাথে আপনার সম্পর্ক সম্বন্ধে বলেছেন “আমি অথবা আমার বন্ধুরা কেউই কখনও টিসিয়ান, ভেলাসকেথ অথবা সেজান দেখেনি, তা সত্তেও আমরা শিল্প দ্বারা পরিবেস্টিত”। সেখানে ‘মিসোআক’ এর কথা বলেছেন, ছেলেবেলায় যেখানে থাকতেন এবং বিংশ শতাব্দির শুরুর দিককার মেহিকান শিল্পের কথাও বলেছেন।
paz-1.jpg
………
কৈশোরে অক্তাবিও পাস
………

অক্তাবিও: ‘মিসোআক’ এখন মেহিকো সিটির একটি বিচ্ছিরি আবাসিক এলাকা, কিন্তু যখন আমি ছোট ছিলাম জায়গাটা একটা ছোট গ্রাম ছিল। কলম্বাস আসার পূর্বের সময়কার একটি পুরোনো গ্রাম, ‘মিসোআক’ নামটা এসেছে দেবতা Mixcoatl এর নাম থেকে, যা হলো Nahuatl ভাষায় ছায়াপথের নাম, এর আরেক অর্থ ”মেঘলা সাপ”, যেন ছায়াপথটা একটা মেঘের তৈরি সাপ। আমাদের একটা ছোট পিরামিড ছিল, ছোটখাটো কিন্তু পিরামিড বটে। আরও ছিলও সপ্তদশ শতাব্দির একটি কনভেন্ট। আমাদের পাড়াটার নাম ছিল সান হুয়ান এবং এর সবচাইতে পুরোনো জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ষোলদশ শতাব্দির একটি প্যারিশ গির্জা, আঠার ও উনিশ শতাব্দির ঘরানার বাড়িঘরও ছিলো, বিশাল বাগানওয়ালা। কারন মেহিকো উনিশ শতাব্দির শেষের দিকে বুর্জোয়া মেহিকানদের জন্য গ্রীষ্মকালীন রিসোর্ট ছিল। আমার পরিবারের একটা গ্রীষ্মনিবাস ছিলো সেখানে। কলম্বাস-পূর্ব এবং উপনিবেশিক, এই দুই ভিন্ন অতীতের ক্ষুদ্র স্মৃতি দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলাম যা তখনও বেশ ভালোভাবেই টিকে ছিল।

প্রশ্ন: আপনি মেহিকোর আতশবাজি সম্পর্কে The privileges of Sight-এ বলেছেন।

অক্তাবিও: আমি আতশবাজির খুব ভক্ত। তারা আমার ছেলেবেলার অংশ। শহরে একটি অংশ ছিল যেখানে কারিগররা সবাই আতশবাজির বিশেষ শিল্পে পারদর্শী ছিল, পুরো মেহিকোতে তাদের খ্যাতি ছিল। তারাই শহরের যত ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ভার্জিন দে গুয়াদালুপে, ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠান এবং বর্ষবরণের জন্য আতসবাজি তৈরি করত। আমার মনে আছে তারা কিভাবে গির্জার দেয়ালগুলোকে অগ্নি-ঝরনায় রূপান্তরিত করত। এটা ছিলো বিষ্ময়কর! মিসোআক এমন এক জীবন দ্বারা প্রণোদিত ছিল যা আজ বড় শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন: আপনাকে মিসোআক-এর জন্য স্মৃতিকাতর মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনি সেই অল্পসংখ্যক মেহিকান লেখকদের মধ্যে একজন, যারা মেহিকো সিটির একদম প্রান কেন্দ্রে বসবাস করেন। মেহিকো সিটি বৈচিত্রময় এবং অচিরেই পৃথিবীর বৃহত্তম শহর হতে চলেছে, কিন্তু, এর দূষণ, আটাআটি, দারিদ্র যেন এক দুঃস্বপ্ন। ওখানে থাকাটা কি আপনার জন্য উদ্দীপনা নাকি বাধা?

অক্তাবিও:মেহিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে থাকা কোনো উদ্দীপনাও নয়, আবার কোনো বাঁধাও না। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। আর চ্যালেঞ্জ এর মোকাবেলা করার একমাত্র উপায় তার মুখোমুখি হওয়া। আমি মেহিকোর অন্য শহরগুলোতে থেকেছি কিন্তু আমার কাছে কোনো কারণে পছন্দের হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে অবাস্তব মনে হয়েছে। এক পর্যায়ে আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা এখন যে আপার্টমেন্টটাতে আছি সেখানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেই। যদি মেহিকোতে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনার মেহিকো সিটিতে থাকতে হবে।

প্রশ্ন :পাস পরিবার সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

অক্তাবিও:আমার বাবা ছিলেন মেহিকান, এবং মা স্পেনীয়, আমাদের সাথে এক ফুপু থাকতেন- উনি ছিলেন একটু পাগলাটে, ফুপুরা যেমন হয়, তিনি ক্যাব্যিকও ছিলেন নিজের অদ্ভুত নিয়মে। আমার দাদা ছিলেন আইনজীবী এবং লেখক, খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক । আমাদের পরিবার একসময়ে তার একটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের উপার্জন দিয়ে চলেছে, মিসোয়াকের বাসাটা তারই ছিল।

প্রশ্ন: আর বই? আমি ভাবছি সেই বোর্হেসের কথা, যিনি বলতেন যে, যিনি তার বাবার গ্রন্থাগার ছেড়ে কখনোই দূরে যাননি।

অক্তাবিও:এইটা একটা কৌতুহল উদ্দীপক সাজুয্য। আমার দাদার একটি খুব সুন্দর গ্রন্থাগার ছিলো, যা ছিল মিসোআক এর বাড়িটার বিশেষ আকর্ষণ। তাতে ৬ থেকে ৭ হাজার বই ছিল, এবং আমারও ছিল পড়ার অগাধ স্বাধীনতা। আমি পড়ুয়া হিসেবে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলাম এবং ছেলেবেলায় নিষিদ্ধ বইও পড়েছি। কারণ কারো খুব একটা খেয়াল ছিলো না আমার পড়ার বস্তুর দিকে। আমি খুব যৌবনেই ভলতেয়ার পড়েছি। হয়তবা তার কারণেই আমি এক পর্যায়ে ধর্মে বিশ্বাস হারিয়েছে। আমি যৌনধর্মী উপন্যাস পড়তাম, ঠিক পর্নোগ্রাফি নয় কিন্তু রগরগে বটে।

প্রশ্ন: আপনি কি শিশুদের জন্য লিখা বই পড়তেন?

অক্তাবিও: অবশ্যই। আমি সালগারি নামের এক ইতালীয় লেখকের অনেক বই পড়েছি। সে মেহিকোতে বেশ জনপ্রিয়। আর ছিলো জুল ভার্ন। আমার এক বিশেষ প্রিয় নায়ক ছিলো আমেরিকার বাফেলো বিল। আমি ও আমার বন্ধুরা কালানুক্রম লঙ্ঘন করার বোধ অথবা বিবেকের নূন্যতম দংশন ছাড়াই আলেক্সান্ডার ডুমার থ্রি মাস্কেটিয়ার্স থেকে কাউবয়দের কাহিনীতে চলে যেতাম।
paz-2.jpeg
………
যৌবনে অক্তাবিও পাস
………
প্রশ্নঃ: আপনার দেখা প্রথম পরাবাস্তব ছবি-যা ছিলো একটি ঘরের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ডালপালার ছবি-আপনি একসময় বলেছিলেন যে তা দেখে আপনার কাছে চরম বাস্তব মনে হয়েছে।

অক্তাবিও: তা সত্য। মিসোআক-এর বাসাটি ধীরে ধীরে চারিদিকে ক্ষয়ে যেতে থাকে। আমরা একটার পর আরেকটা ঘর ত্যাগ করতে বাধ্য হই কারণ ছাদ আর দেয়ালগুলো খসে পড়ছিলো।

প্রশ্ন: ১৯৩০ সালে, যখন আপনি ১৬ তখন ন্যাশনাল প্রিপারেটরি স্কুল এ ভর্তি হন। স্কুলটি কেমন ছিলো? এবং আপনি ওখানে কী কী পড়েছেন?

অক্তাবিও: স্কুলটা সুন্দর ছিল। ওটা তৈরি করা হয়েছিলো সতের শতাব্দির শেষের দিকে, যা হলো মেহিকান স্থাপত্যে“ব্যারোক” চর্চার শীর্ষ সময়। স্কুলটি বেশ বড় ছিল, এবং এর পাথর, থাম আর করিডোরগুলোর মধ্যে আভিজাত্য ছিল। এর একটা নান্দনিক আকর্ষণ ছিল। দ্বিতীয় দশকের সময় সরকার এইখানে অরোস্কো এবং রিভেরাকে দিয়ে দেয়ালচিত্র আঁকিয়েছিলো। (দিয়েগো) রিভেরার আঁকা প্রথম দেয়ালচিত্র ছিল আমার এই স্কুলেই।


প্রশ্ন: আমরা যদি যুদ্ধের সময়কার মেহিকোতে ফিরে যাই, তাহলে আপনার সাথে পাবলো নেরুদার সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে চাইবো, যিনি তখন চিলির কনসাল জেনেরাল হয়ে মেহিকোতে ১৯৪০ সালে এসেছিলেন।

অক্তাবিও: আগেই বলেছি, তিনের দশকে যখন আমি প্রথম আধুনিক কবিতা পড়তে শুরু করি তখন নেরুদার কবিতা আমার কাছে ওহির মতো মনে হয়েছিলো। আমার বই প্রকাশের পরে, নেরুদাকে একটা কপি পাঠিয়েছিলাম। তিনি আমাকে কোনো উত্তর দেননি, কিন্তু স্পেন-এর কনগ্রেস যোগ দেয়ার জন্য তিনিই আমাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। আমি যখন ১৯৩৭ সালে প্যারিস এ পাড়ি দেই, তখন কাউকেই চিনতাম না। কিন্তু ট্রেন থেকে নামতে যাব এমন সময় এক লম্বা লোক আমার দিকে অক্তাবিত্ত পাস! অক্তাবিত্ত পাস! বলতে বলতে দৌড়ে এলেন। তিনি ছিলেন নেরুদা । তিনি বললেন, ওহ, তুমি এত কমবয়সী! এবং আমরা আলিঙ্গন করি। নেরুদা আমাকে একটি হোটেল খুঁজে দেয় এবং আমরা ভাল বন্ধুতে পরিণত হই। যারা আমার কবিতাগুলো প্রথম লক্ষ্য করে সহানুভূতির সাথে পড়েছিলেন তাদের মধ্যে নেরুদা অন্যতম।

প্রশ্ন :তাহলে সমস্যাটা কোথায় ছিলো?

অক্তাবিও: উনি যখন মেহিকোতে প্রথম এলেন, আমি প্রায়ই দেখা করতাম তার সাথে। কিন্তু কিছু সমস্যা ছিল। প্রথমটা হল ব্যক্তিগত। নেরুদা মহৎ কিন্তু প্রভাব খাটাতে পছন্দ করতেন। হতে পারে আমি আমার নিজস্ব স্বাধীনতার ব্যাপারে অতি ইর্ষান্বিত এবং বিপ্লবী। নেরুদা তার নিজস্ব দলবল দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতে ভালবাসতেন, এদের কেউ কেউ বুদ্ধিদীপ্ত হলেও বেশিরভাগই ছিল মাঝারি মাপের মানুষ। দ্বিতীয়টি হল রাজনীতি। নেরুদা দিনে দিনে আরও বেশী স্তালিনপন্থি হচ্ছিলেন, যখন আমার স্তালিনের প্রতি মোহ ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। শেষে লড়াইটা প্রায় হাতাহাতির পর্যায় পৌছল আর আমরা কথা বলা বন্ধ করে দেই। তিনি আমার সম্পর্কে ভয়ংকর বাজে কিছু লেখার পাশাপাশি একটি নোঙরা কবিতাও লিখেছিলেন। আমি তার ব্যাপারে খুব খারাপ কিছু লিখেছিলাম এবং তাতেই শেষ।
pablo-neruda.jpg
………
পাবলো নেরুদা
………
প্রশ্ন: কোন কি মিটমাট হয়েছিল?

অক্তাবিও: আমরা বিশ বছর কথা বলিনি। তবে মাঝে মাঝে একই সময়ে, একই জায়গায় আমরা হাজির হতাম এবং আমি বুঝতাম যে নেরুদা আমাদের উভয়ের বন্ধুদেরকে আমার সাথে দেখা করতে বারণ করতো, কারণ আমি নাকি বিশ্বসঘাতক । তারপর যখন স্তালিনের ত্রাস নিয়ে ক্রুশেভের রিপোর্ট জনসমক্ষে বেরিয়ে এলো, তখন নেরুদার বিশ্বাস চুরমার হয়ে যায়। আমরা দুজনই এক কবিতা উৎসবে লন্ডনে ছিলাম। আমি কিছুদিন আগেই আবার বিয়ে করেছি এবং পাবলোও। আমি আমার স্ত্রী মারিএ হোসের সাথে ছিলাম যখন পাবলোর স্ত্রী মাতিল্দে উররুতিয়ার সাথে আমাদের দেখা হয়। উনি বললেন, আমি যদি ভূল না হই, আপনি অক্তাবিও পাস। উত্তরে আমি বলি, হ্যাঁ, আর আপনি মাতিল্দে। উনি তখন বললেন, আপনি কি পাবলোর সাথে দেখা করতে চান? আমার মনে হয় সে আপনাকে আবার দেখতে পেলে খুব খুশি হবে। আমরা যখন পাবলোর ঘরে যাই, একজন সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলো। উনি বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পাবলো বললেন, My son, এবং আমাকে বুকে টেনে নিলেন। চিলীয় ধরণের আবেগময় প্রকাশ–mijito- এবং সে সেই বলাটা ছিলো খুব আবেগ মেশানো। আমি এতে খুবই আলোড়িত হই, এমন যে আমি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম। আমরা অল্প কিছুক্ষণের জন্য কথা বলতে পেরেছিলাম। কারণ উনি চিলিতে ফেরত যাচ্ছিলেন। তারপর উনি আমাকে একটা বই পাঠিয়েছিলেন, এবং আমিও তাকে একটা পাঠাই, তার কয়েক বছর পরই তিনি মারা যান। ব্যাপারটা দুঃখের ছিল কিন্তু তা আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি শ্রেষ্ঠ ঘটনা- এমন এক মানুষের সাথে বন্ধুত্ব অর্জনের সম্ভাবনা যাকে আমি অনেক পছন্দ করি এবং ভালবাসি।

প্রশ্ন: আপনি ঠিক কোন সময় এশীয় চিন্তাধারার প্রতি তুমুলভাবে আগ্রহী হয়ে উঠলেন?

অক্তাবিও: এটা শুরু হয় ১৯৫২ সালে প্রাচ্যে আমার প্রথম ভ্রমণের সময় । আমি প্রায় এক বছর কাটিয়েছি ভারত ও জাপানে। এই দেশগুলোর দার্শনিক এবং শৈল্পিক চর্চা বোঝার সামান্য কিছু চেষ্টা করেছিলাম। আমি ভারতের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি এবং চিরায়ত ভারতীয় কিছু চিন্তাধারার ওপর পড়াশুনা করেছিলাম। আমার কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চীনা এবং জাপানের কবি এবং দার্শনিকরা । ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৮ সালের মাঝে, আমার দ্বিতীয় ভারত ভ্রমণের সময় আমি বেশ কিছু বড়মাপের দার্শনিক এবং ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছি। বৌদ্ধধর্ম আমাকে দারুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
octaviopaz-3.jpg
………
জীবনের শেষ দিকে অক্তাবিও পাস
………
প্রশ্ন: আপনি কি কখনো ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা ভেবেছেন?

অক্তাবিও: না। বৌদ্ধধর্ম একটি মানসিক এবং আত্মিক চর্চা যা আমাকে অহং এবং তার মরিচিকাগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আধুনিক মানুষ এর সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল তার আহংনিষ্ট প্রকৃতি। আমার মতে বৌদ্ধধর্ম হল অহং এবং বাস্তবতার সমালোচনা। এটি একটি মৌলিক সমালোচনা যা নেতিতে নয় বরং তা গ্রহণ গিয়ে শেষ হয়। ভারতের বিরাট বিরাট বৌদ্ধ মঠগুলি অনেক আবেদনময়ী মূর্তি এবং চিত্রদ্বারা খচিত (হিন্দুগুলোও তাই, তবে এগুলো সম্ভবত আরও পরে হওয়ার কারণে, দেখতে আরো বিচিত্র এবং ‘ব্যারোক’)। মূর্তি এবং চিত্রগুলোতে সবল কিন্তু শান্তিময় এক যৌনতা রয়েছে। একটি ধর্ম এবং দর্শন যা পৃথিবীকে শূন্যতা শেখায় এবং আবেদন ফিরিয়ে দিতে শেখায়, তারই মাঝে শরীর ও প্রাকৃতিক শক্তির উচ্ছলতা আমাকে বিস্মিত করেছে। আমি এই সময় একটা ছোট বই লিখি conjunctions and Disjunctions যার কেন্দ্রীয় বিষয় এটা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্নঃ: ভারতকে আবিস্কার করার পাশাপাশি সেখানে মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজের ভারসাম্য বজায় রাখাটা কি কঠিন ছিলো?

অক্তাবিও: রাষ্ট্রদূতের কাজ কঠিন ছিলো না। আমার সময় ছিল অনেক, আমি ঘুরতে ও লিখতে পারতাম। আর তা শুধু ভারত নিয়েই নয়, ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলনও আমাকে অভিভূত করে। আমার মনে হয়েছিল যে আমার যুবক বয়সের আশা এবং বিশ্বাসগুলোর আবার পূনর্জন্ম হচ্ছে। আমার কখনো মনে হয়নি যে এসব কিছু সমাজকে বদলে দেবে, কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি এক নতুন সংবেদনশীলতার আবির্ভাবের প্রত্যক্ষদর্শী, যা কোনো একভাবে আমার আগের চিন্তা এবং অনুভূতির সাথে তাল মিলিয়ে যায়।

original post
read more

Sunday, February 26, 2012

কবীর চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ

by বেবী মওদুদ

kc1.jpg
কবীর চৌধুরী (জন্ম. ৯/২/১৯২৩); ছবি: ফিরোজ আহমেদ, অক্টোবর ২০০৯

[কবীর চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি ভিডিওতে গ্রহণ করা হলেও কিছু সম্পাদনা করা হয়েছে। ২১ ও ২২শে অক্টোবর ২০০৯ দুই দফায় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারের ভিডিও মোট তিনটি অংশে পরিবেশিত হলো। বি. স.]

ভিডিও ১

বেবী মওদুদ: প্রিয় পাঠক আমরা আজ এসেছি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্প বোদ্ধা ও অনুবাদক হিসাবে যিনি আমাদের কাছে সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর কাছে। একজন বড় মাপের মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে যে কতখানি পরিশ্রম দরকার, অভিজ্ঞতা ও চর্চা, সাধনা দরকার আমরা সেটা কবীর চৌধুরীর মধ্যে দেখেছি। বয়স হয়েছে তাঁর প্রায় ৮৮ বছর। ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩ সালে তার জন্ম হয়। এখনও এই বয়সে তিনি প্রতিদিন লেখার টেবিলে বসেন এবং বড় ধরনের কাজ করেন অনুবাদের এবং অন্যান্য লেখার। সামনের বই মেলায় তার বোধহয় ১২/১৩টি বই ছাপা হবে। সে বইগুলোর কাজও করছেন। আমরা আজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর পক্ষ থেকে তার বাসায় এসেছি। তার মুখ থেকে শুনবো তার কথা। তার জীবনের কথা শুনবো, তার শিক্ষা জীবনের কথা, শুনবো তার শৈশব-কৈশোরের কথা।

কবীর ভাই, আপনি কেমন আছেন? আপনার সময় কাটে কীভাবে?

কবীর চৌধুরী: লেখা পড়াতে আমার সময় খুব দ্রুত কাটে এবং আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে ১৮ ঘণ্টা দিন হলে ভাল হতো। আমি সকালে সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে পড়ি। মুখহাত ধুয়ে তারপর ছয়টার মধ্যে লিখতে বসি এবং সারাদিনে অন্তুত ৭/৮ ঘণ্টা লেখার কাজ করি। কিছু পড়ার কাজ করি। কাজেই সময় কাটা নিয়ে অনেকেরই বৃদ্ধ বয়সে যে অভিযোগ থাকে, সময় কাটে না, আমার সেটা নাই।

বেবী মওদুদ: আপনি তো বিভিন্ন সভায় যাচ্ছেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, সভায় যাচ্ছি। গতকাল একটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ সভায় গিয়েছিলাম। বাংলার বাইরে থেকে ‘প্রতীচি’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রমথনাথ বিশীর মেয়ে এটা বের করেন। সেই পত্রিকার পাঁচ বছর পূর্তি উপলকে একটা সভা ছিল। সেই সভাতে ছিলাম, তার পরে সেখান থেকে উঠে বাংলা একাডেমিতে আর একটা সভা ছিল, সেখানে গিয়েছি।

বেবী মওদুদ: এখনও তো বই পড়েন। এর মধ্যে পছন্দসই কী কী বই পড়লেন?

কবীর চৌধুরী: আমি নিয়মিত এখনও পড়ি। একটা বই এখন পড়ছি, খুবই চমৎকার লাগছে। বইটির নাম ‘দি হোয়াইট টাইগার’। খুব কৌতূহলোদ্দীপক ব্যঙ্গাত্মক। তবে তার মধ্যে ভারতের দারিদ্র্যের চিত্রও খুব বাস্তবসম্মত ভাবে উঠে এসেছে। আরও পড়ছি তুরস্কের নোবেল বিজয়ী লেখক ওরহান পামুকের ‘স্নো’। অসামান্য একটি উপন্যাস। সেটা পড়া প্রায় শেষ করেছি এবং ঐ একই লেখকের একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ আছে, নাম ‘আদার কালার্স’। আমি ‘আদার কালার্স’ এর বেশ কিছু লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছি। সেটাও সামনের বই মেলায় আসবে। আর ‘স্নো’র বাংলা অনুবাদ ‘তুষার’ এখনও শেষ হয়নি, প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠার বই। এখনও ৪০ পৃষ্ঠার মত বাকি আছে। তাও হয়ে যাবে এবং সেটাও এই বই মেলায় আসবে। এই এখন আমার প্রধান কাজ এবং তার পাশাপাশি প্রবন্ধ লেখা তো হচ্ছেই। যেমন বঙ্গবন্ধুর হত্যার মাস সামনেই ১৫ই আগস্ট। তার উপরে লেখার জন্য অনুরোধ আসছে, লিখছি।

বেবী মওদুদ: আপনার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নিশ্চয়ই মনে আছে কিছু কিছু। অনেকগুলো ভাইবোন ছিলেন আপনারা।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, অনেক কথাই মনে আছে। আমরা ঢাকায় বসবাস শুরু করি ১৯৩৬-এর দিকে। তার আগে ছোটবেলা কেটেছে কয়েকটি জায়গায়: পিরোজপুরে, মানিকগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায়। পিরোজপুরে আমি প্রথম স্কুলে ভর্তি হই। তার আগে পর্যন্ত আমার পড়াশুনা বাসায় বাবার কাছে। স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হই। পিরোজপুরের কথা মনে আছে। আমরা বেশ বড় পরিবারের সদস্য ছিলাম। ভাই বোনদের নিয়ে অনেক গল্প করতাম। মুনীরের অনেক স্মৃতি খুব উজ্জ্বল হয়ে আমার মনে গাঁথা আছে।

বেবী মওদুদ: আপনাদের যে পারিবারিক বন্ধনটা ছিল, অনেক ভাইবোন ছিলেন। আপনার মা-বাবা সবাই মিলে একটা যে সম্পর্ক ছিল…।

কবীর চৌধুরী: আমাদের পারিবারিক সংহতি খুবই মধুর ছিল। আমরা এক সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতাম। বাবা বয়স হয়ে যাওয়ার পরে একটু আগে খেতেন। তখনও আমাদের খাওয়ার সময় তিনি টেবিলে এসে বসতেন এবং আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন। আর মা তো ছিলেন এক অসম্ভব ধৈর্যশীলা স্নেহময়ী মানুষ। তুমি তো বোধহয় দেখেছো তাঁকে, আমার ঠিক খেয়াল নেই।

বেবী মওদুদ: হ্যাঁ, দেখেছি। আপনাদের বাসায় আমি গিয়েছি।

কবীর চৌধুরী: তিনি সকল ছেলেমেয়ের খাবার পরিবেশন করতেন খাওয়ার টেবিলে।

বেবী মওদুদ: আপনার সময় তো তারুণ্যের একটা ধর্ম ছিল। পড়াশুনাটাই মনে হয় আপনার প্রধান কাজ ছিল। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পড়াশুনার আগ্রহটি ওই সময় ছিল। তারপর তো লেখালেখিতে আসলেন। ঐ সময় আপনার বন্ধু বান্ধব কে কে ছিলেন?

কবীর চৌধুরী: আমার স্কুল এবং কলেজ জীবনে খুব ভাল বন্ধু দু’একজন ছিল। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনই প্রয়াত। হিমাংশু দত্ত বলে একটা ছেলে ছিল। ঐ যে প্রথম দিকে ঢাকায় ফটোগ্রাফ স্টুডিও তৈরি করেছিল, মাই স্টুডিও নাম দিয়ে। পুরানা পল্টনের ওদিকে একটা গ্যারেজের মধ্যে কনভার্ট করে নিজেই ডেভলপ করতো, নিজেই ওয়াশ করতো। সেই ছেলেটি মারা গেছে। সে ছিল, আর ইউনিভার্সিটিতে উঠে যে সব বন্ধু-বান্ধব হয়, তাদের মধ্যেও অনেকেই বেঁচে নাই। স্যার এ. এফ রহমানের দুই ছেলে ছিল। একজন একটু উপরে পড়তো, কিন্তু আমার বন্ধু ছিল। আরো একজন ছিল আনোয়ার হোসেন খান নামে। এরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তখন আবদুর রউফ নামে খুব প্রতিভাবান আর একটি ছেলে ছিল। ম্যাট্রিকুলেশনে বোধহয় ফার্স্ট হয়েছিল। সেও মারা গেছে। আমার খুব ঘনিষ্ঠ এবং ভাল বন্ধু ছিল। কলেজে ওঠার পরে আরো দু’ একজন বন্ধু-বান্ধব হয়। একটি বন্ধুত্বের স্মৃতি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এই অর্থে যে ও ছিল নেটিভ ক্রিশ্চান এবং সেই সময়, তোমার তো মনে থাকবে, রেল বিভাগে অনেক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান চাকুরি করতো। এই ছেলেটি ছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের ছেলে। পুরো নাম মনে নাই। ডাকনাম উইলি বলে আমরা ডাকতাম। তো ওর বাড়িতে ও আমাকে আমন্ত্রণ করেছে কয়েকবার। বেচারাম দেউড়ির গলিতে বাসা ছিল।

বেবী মওদুদ: ওই সময় তো অনেক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবার ছিল…।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। তখন ওই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের সঙ্গে। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম তার বোন ১৫/১৬ বছরের মেয়ে, ফ্রক পরে খোলা চুলে ঘোরাঘুরি করছে। ওই অভিজ্ঞতা আমার প্রথম। এর আগে দেখিনি।

বেবী মওদুদ: সাংস্কৃতিক জগতে বা সাহিত্য জগতে কোনো ভাল বন্ধু ছিল কি?

কবীর চৌধুরী: লেখালেখির বন্ধুদের চাইতে ক্রীড়ামোদী বন্ধুদের সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি তখন আমার খেলার বেশ ইচ্ছাও ছিল। আমি সলিমুল্লাহ হলে থাকতাম। হলে ফুটবল টিমে খেলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে টিমে হকি খেলেছি। কাজেই খেলোয়াড়দের সঙ্গেই বেশি সখ্য হয়। লেখকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পরবর্তী সময়ে। যেমন কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা হয়। রশীদ করীমের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে। মোটামুটি শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তখন কারো সঙ্গে গড়ে ওঠেনি।

দুই.


ভিডিও ২

বেবী মওদুদ: তো আপনি লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?

কবীর চৌধুরী: লেখালেখিতে আসি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটু আগে থেকে। তখন আমার নাটকের প্রতি বরাবরই খুব উৎসাহ ছিল এবং প্রথম দিকে আমার লেখা ছোটখাটো প্রবন্ধ। এ ছাড়া নাটক রূপান্তরের কাজে আমি প্রথম আসি।

বেবী মওদুদ: ইংরেজি নাটক থেকে আপনি বাংলায়…।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, এবং আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে আপনার তো কোনো সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম তেমন নেই। কথাটা সত্যি। আমার প্রবন্ধ আছে। কিন্তু যথার্থ সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম নেই। তবে কিছুটা তার কাছাকাছি আছে রূপান্তরিত নাটকগুলোর মধ্যে।

বেবী মওদুদ: আপনি সাধারণত বাংলায় লেখালেখির চর্চা খালি প্রবন্ধেই করেছেন। আর ইংরেজীতে লিখেছেন এবং অনুবাদ করেছেন। বাংলায় এবং ইংরেজীতে যে কাজ করেন এতে কোনো সমস্যা হয় না?

কবীর চৌধুরী: না, আমি কোনো সমস্যা বোধ করি না। আমি ইংরেজী উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা ইত্যাদি বাংলায় অনুবাদ করি। বাংলা লেখাও ইংরেজীতে অনুবাদ করি। শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ শিল্পী সুলতানের উপরে একটা বই, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস, শামসুর রাহমানের কবিতা, মুনীর চৌধুরীর নাটক এবং আরো অনেকের লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি। আর ইংরেজী বই তো বাংলায় অনবরত অনুবাদ করে যাচ্ছি। আমার খুব বেশি অসুবিধা হয় না। অনেকে অসুবিধার সম্মুখীন হন বলে আমাকে বলেছেন। তার একটা কারণ হচ্ছে যে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে শুধু দুই ভাষার জ্ঞান থাকলেই হবে না, দুই সংস্কৃতি সম্পর্কেও একটা জ্ঞান থাকতে হবে। কারণ সেই সংস্কৃতি তো ভাষাকে অনেকখানি চালিত করে। আমি অনুবাদ কাজ করার সময় মূল গ্রন্থটি যে সামাজিক পরিবেশ, সাহিত্যিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক পরিবেশে রচিত তা বুঝবার চেষ্টা করি এবং আমার পড়ালেখা মোটামুটি ব্যাপক থাকায় আমি সে কাজটা করতে পারি। তার ফলেই অনুবাদ ইংরেজী থেকে বাংলায় হোক বা বাংলা থেকে ইংরেজী হোক আমার কাছে তা তেমন সমস্যা হয়ে ওঠে না। বাংলা থেকে ইংরেজীর ব্যাপারে তো সামাজিক পরিবেশ তো জানাই, শুধু ভাষার প্রশ্ন। সেইখানে প্রতিটি ভাষার কিছু নিজস্ব ইডিয়াম আছে। আক্ষরিক অনুবাদ করলে কিছুতেই হবে না। যেহেতু মোটামুটি ইংরেজী এবং বাংলায় একটা কাজ চালাবার মতো জ্ঞান আমার আছে, সে হিসেবে আমি তেমন কোনো অসুবিধা বোধ করি না। তবে সময় দিতে হয়, ভাবতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়।

বেবী মওদুদ: সাধারণত দেখা যায় যারা স্কুলে পড়ে বা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয় প্রায় সবাই ইংরেজীতে খারাপ করে।

কবীর চৌধুরী: সত্যি কথা।

বেবী মওদুদ: আপনি তো ইংরেজীতে ছোটবেলা থেকে নিশ্চয়ই খুব ভাল ছাত্র ছিলেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, আমি ছোটবেলা থেকে ইংরেজীতে ভাল ছাত্র ছিলাম। তার একটা কারণ হচ্ছে বাবা ইংরেজীতে খুব ভাল ছিলেন। উনি আলীগড়ে পড়াশুনা করেছেন। সাহেব অধ্যাপকদের কাছ থেকে। তিনি ইংরেজী এক্সপ্রেশন, শব্দচয়ন, রচনা রীতি খুব ভাল বুঝতেন এবং তিনি আমাদের হাতে কলমে পড়িয়েছেন। তোমাকে একটা মজার কথা বলি, কী ভাবে আমরা শিক্ষালাভ করেছি। আমাদের তখন ইংরেজীতে চিঠি লিখতে হতো। তুমি জানো সে যুগে শিক্ষিত সমাজে সেটারই প্রচলন ছিল। পারিবারিক চিঠিও ইংরেজীতে লিখতে হতো। আমরা বাবাকে যখন চিঠি লিখতাম ইংরেজীতে, তিনি সেই চিঠিটা ফেরত পাঠিয়ে দিতেন লাল গোল দাগ দিয়ে। দেখাতেন কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে। তো এইভাবে আমরা শিখেছি এবং মোটামুটি ভালই ইংরেজী জ্ঞানলাভ করেছি এবং এটা পারিবারিক সূত্রে পরের প্রজন্মেও এসেছে, এই অর্থে যে আমার মেয়ে শাহীন ইংরেজীর অধ্যাপিকা এবং সেও খুব ভাল ইংরেজী জানে এবং এখন ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপারে বহুমুখী কাজ করছে।

বেবী মওদুদ: আমাদের যে ছোট বেলায় ইংরেজী শেখানো হয়, ক্লাস ওয়ান থেকে তো ইংরেজীটা ওই বয়স থেকে কী শেখানো দরকার? না, আরো বড় হয়ে ইংরেজী যার যখন দরকার তখন পড়ালে ভালো হয় ?

কবীর চৌধুরী: এটা নিয়ে দ’ুটি মত আছে। কেউ কেউ মনে করে যে ছোট বেলা থেকে শেখানো ভালো। তারা তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু আমি মনে করি যে এটা অত্যাবশ্যক নয়। কারণ শিক্ষার ব্যাপারটা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষাদান পদ্ধতির উপরে এবং শিক্ষার উপকরণের উপরে। যদি ভাল উপকরণ সরবরাহ করা যায় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি যদি ভাল হয় তাহলে তিন/চার বছরে একটা ভাষা খুব ভালোভাবে শেখা যায়। তা নাহলে কেমন করে আমাদের ছেলেরা মস্কোতে গিয়ে রুশ ভাষা শেখে এবং সেই ভাষায় থিসিস লিখতে পারে।

বেবী মওদুদ: তো ঐ যে ছোট বেলা থেকে ইংরেজী শেখানো হয় ফলে বাংলাটাও ভাল শেখে না, ইংরেজীটাও শেখে না। আবার ধর্ম শিক্ষাও দিতে হয়। ঐ সময় তো প্রাথমিক শিক্ষাটা অন্তত বাংলায় হওয়া উচিৎ।

কবীর চৌধুরী: আমরা এই ব্যাপারটার উপর খুব গুরুত্ব দিই। আমাদের যে নতুন শিক্ষা নীতি ২০০৯ হয়েছে তাতে খুব স্পষ্টভাবে আমরা বলেছি যে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃ ভাষা বাংলা। ইংরেজী ক্লাস থ্রি থেকে শেখানো যেতে পারে। কিন্তু কিছুতেই মাধ্যম হিসাবে নয়। একটা ভাষা হিসাবে তা শেখানো যেতে পারে। আর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি যে ধর্ম শিক্ষা, আনুষ্ঠানিক ধর্ম শিক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে থাকবে না। আনুষ্ঠানিক ধর্ম শিক্ষার বদলে দেয়া হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হবে, যা সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান প্রযোজ্য।

বেবী মওদুদ: মানে নৈতিক শিক্ষাটার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ নৈতিক শিক্ষার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে এবং এটাও আমরা পরামর্শ দিয়েছি যে যখন পাঠ্যপুস্তুক ইত্যাদি লেখা হবে, ক্লাস রুমে শিক্ষাদান করা হবে, তখনই ওই নৈতিক শিক্ষা গল্পের ছলে যেন দেয়া হয়, কাহিনির মাধ্যমে যেন বলা হয়। এইভাবেই আমরা বলেছি।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই এখানে একটা প্রশ্ন করি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনি তো অনেক দিন ধরে অনুবাদ করছেন। সেই ধরেন বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, উনিশ শ’ পঞ্চাশের দিক থেকে আমি অনুবাদ করছি।

বেবী মওদুদ: তবে ঐ সময়ের লেখকদের বই এবং এখনকার লেখদের বইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা কী দেখছেন?

কবীর চৌধুরী: বাংলাদেশের কথা যদি বলতে হয়…।

বেবী মওদুদ: না, বাংলাদেশের কথা নয়, আপনি বিদেশের কথাই বলেন।

কবীর চৌধুরী: বিদেশের কথার মধ্যে আমি বলবো, এখনকার অনেক লেখকের লেখাতেই স্বৈরাচার বিরোধী বিষয়গুলো, মানবাধিকারের পক্ষের বিষয়গুলো, এবং স্বৈরশাসকদের অধীনে মুক্তিকামী মানুষ কীভাবে নির্যাতিত হয়েছে এগুলো খুব বেশি উঠে আসছে। যেমন, অতি সম্প্রতি যে নোবেল পুরস্কার পেলেন রুমানিয়ার লেখক, তার লেখাতেও চসেস্কুর আমলে মানুষ কী রকম নির্যাতিত হয়েছে তা উঠে এসেছে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে সব অত্যাচার নির্যাতন চলেছে সেইসব বিষয়ে খুব ভালভাবে লেখকরা লিখছে।

বেবী মওদুদ: তো এই ধরনের বিষয়গুলো তো আগে ছিল না।

কবীর চৌধুরী: আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গদের উপর নির্যাতনের বিষয় নিয়ে কিছু উপন্যাস ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় যে সব নির্যাতন চলছে স্বৈরশাসকদের হাতে, দক্ষিণ আফ্রিকায়, নাইজেরিয়ায়, আরো অনেক জায়গায় তার এত বস্তুনিষ্ঠ এবং শৈল্পিক ভাল লেখা, খুব বেশি আসতে পারেনি ।

বেবী মওদুদ: তো আমরা আশা করি যে, সামনের বইমেলায় আমরা খুব ভাল লেখা কিছু বই পাব। একুশের বইমেলা হয়, আপনি তো নিশ্চয়ই বই মেলায় যান। আপনি বই মেলাটাকে কীভাবে দেখেন।

কবীর চৌধুরী: আমি বই মেলাটাকে ভাল চোখেই দেখি, কেউ কেউ নিন্দা করে এর ব্যবসায়িক দিকটা দেখে। কিন্তু গ্রন্থ প্রকাশকদের দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে, এটার তো একটা ব্যবসায়িক দিক আছেই এবং এই বই মেলার জন্য প্রকাশকরাও অপেক্ষা করে থাকে। পাঠকরা অপেক্ষা করে থাকে। লেখকরাও তাদের বই নিয়ে আসার জন্য ব্যস্ত থাকেন। সেই দিক থেকে আমি বই মেলাটাকে ভালই মনে করি। শুধু আমার মনে হয়, যেটা করার চেষ্টা হচ্ছে, বই মেলার পরিচালক কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী বা বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরোধী কিংবা ধর্মান্ধতার সপক্ষে বই কতজন লিখছেন এবং স্টলে তা কী হারে দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে একটা ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবতে হবে।

তিন.


ভিডিও ৩

বেবী মওদুদ: বই মেলা নিয়ে আমার আর একটা প্রশ্ন আপনার কাছে। আপনিতো এক সময় বাংলা একাডেমীর প্রধান ছিলেন এবং এখন সভাপতি। বাংলা একাডেমী মুলতঃ বই মেলাটা নিয়ে খুব বেশী উৎসাহী। বই মেলা নিয়েই যেন তারা সারা বছর কাজ করে, এটা কেন? তাদেরতো অন্যান্য কাজও করা উচিত।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ বই মেলাটাতে বাংলা একাডেমী অবশ্যই উৎসাহী। তবে বাংলা একাডেমীর যে কাজগুলো আবশ্যিকভাবে করা দরকার, অর্থাৎ গবেষণামূলক কাজ এবং অনুবাদের কাজ এবং উন্নতমানের পাঠ্য পুস্তুকের কাজ এটা বন্ধ হয় নি। কিন্তু এর মধ্যে আশানুরূপ গতি বেগ সঞ্চারিত হয়নি। তার একটা কারণ হচ্ছে অর্থের অপ্রতুলতা। একাডেমী ঠিক ঠিক অর্থ বরাদ্দ সরকারের কাছ থেকে পাচ্ছে না। তোমাকে একটা খবর দিই আমরা অতি সম্প্রতি ঠিক করেছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে অর্থ মন্ত্রীর সাথে বসবো এবং আমরা আমাদের সমস্যার কথাগুলো বলে তার কাছ থেকে বাংলা একাডেমীর জন্য একটা উপযুক্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার অনুরোধ জানাবো।

বেবী মওদুদ: প্রধান মন্ত্রী গত বই মেলায় বলেছিলেন যে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিবেন।
কবীর চৌধুরী: প্রধান মন্ত্রী, আমার যতটুক মনে পড়ে, গবেষণা আর আমাদের সৃষ্টিশীল গ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদের কথা বলেছিলেন। তো আমরা এ দু’টো কাজ বাংলা একাডেমী থেকে করবার চেষ্টা করছি।

বেবী মওদুদ: আপনিতো বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ছিলেন, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিবও ছিলেন। তো আপনি যখন বাংলা একাডেমীতে মহাপরিচালক ছিলেন তখন বাংলা একাডেমী কি আজকের মত এতখানি নিয়ন্ত্রিত ছিল মন্ত্রনালয়ের দ্বারা । এখন একটা গবেষণার বই প্রকাশের অনুমতির জন্যও নাকি মন্ত্রনালয়ে যেতে হয়।

কবীর চৌধুরী: তুমি একটা খুব সংগত প্রশ্ন তুলেছ। বাংলা একাডেমী তখন সরকারী নিয়ম নীতির আওতায় থাকলেও তার বেশ কিছু স্বাধীনতা ছিল, তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো কিছু প্রকল্প তৈরি করতে পারতো এবং আর্থিক সাহায্যও যতটুক সরকার দিতে পারে মোটামুটি আমরা পেয়েছি একসময়। কিন্তু এখন সরকারি নিয়ন্ত্রন অনেক বেড়ে গেছে। এটা বাংলা একাডেমীর মতো একটা স্বায়ত্তস্বাশিত প্রতিষ্ঠানের জন্য আকাক্সিক্ষত নয়। এ বিষয়ে আমরা ঠিক এখনই কাজে লেগে আছি, বাংলা একাডেমী এ্যাক্টকে পরিমার্জিত করার জন্য, এবং আমাদের কাজ অনেকখানি শেষ হয়ে এসেছে। বাংলা একাডেমীর যারা প্রাক্তন পরিচালক ছিলেন, যাদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও আছে এই রকম দুই একজনকে আমরা আমাদের এই কাজে পেয়েছি এবং আমরা সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পরিমার্জিত বাংলা একাডেমী এ্যাক্ট সরকারের কাছে দিব। আমাদের খুবই আশা যে সরকার তাতে খুব বেশী কাট ছাঁট করবেন না।

বেবী মওদুদ: হ্যা সেটাই আমাদের কাছে অবাক লাগে বাংলা একাডেমীতে থেকে যে বই বের হবে সেখানে তা গবেষণার কাজ হবে সেটার জন্যও নাকি মন্ত্রনালয় থেকে অনুমতি নিতে হবে তা কেন ? যেহেতু কার্যনির্বাহী পরিষদই তো অনুমোদন দিতে পারে।

কবীর চৌধুরী: বাংলা একাডেমী একটা স্বয়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠান। আমরা পরিমার্জিত যে এ্যাক্ট অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠাচ্ছি তাতে আমরা এইসব জিনিসগুলোর উপর গরুত্ব দিচ্ছি।

বেবী মওদুদ: তো, রাজনীতির দিকেও তো আপনি আগ্রহী ছিলেন।

কবীর চৌধুর: রাজনীতির দিকে আমি বামপন্থী তথা সাম্যবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই। তাও বহুলাংশে ঘটে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মাদার’ পড়ে ভীষণভাবে উজ্জীবিত হই এবং তার পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসীদের বিরুদ্ধে ওই সমাজতান্ত্রিক শক্তি যেভাবে লড়াই করেছিল তার মধ্যে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক শক্তি রাশিয়ার বিশেষ অনুরাগী হয়ে উঠি আমি। কিন্তু পরবর্তী সময় তাদের স্খলন দেখে খুবই মন খারাপ হয়।

বেবী মওদুদ: আপনিতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ।

বেবী মওদুদ: তারপরে ভারতভাগও দেখেছেন, বাংলাভাগও দেখেছেন, আপনি দাঙ্গা হতেও দেখেছেন। তখনকার কোন স্মৃতি আপনাকে আজও নাড়া দেয়!

কবীর চৌধুরী: দাঙ্গার স্মৃতি খুবই নাড়া দেয়। তখনও পাকিস্তুান হয়নি। সেই সময়ও দাঙ্গা হয়েছে। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আমরা ঢাকায় অনেক দাঙ্গা দেখেছি এবং একটা অদ্ভুত জিনিস তখন লক্ষ করেছি যে কেন দাঙ্গা বাঁধে এবং কেন হঠাৎ থেমে যায়, এ রহস্য যেন বোঝা যেতনা। যার ফলে পরবর্তী সময়ে আমার বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে সাম্প্রদায়িক ইস্যু ছাড়াও দাঙ্গার পেছনে কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের হাত ছিল। জমি দখল, লুটপাট, ব্যবসা অধিকার করে নেয়া—এই সব কারণেই দাঙ্গা ঘটতো। কারণ হঠাৎই আবার দাঙ্গাটা বন্ধ হয়ে যেত।

বেবী মওদুদ: গবেষকদের বইতে আমরা দেখি বা জানি যে দাঙ্গায় শাসক গোষ্ঠিরও একটা হাত ছিল।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, ছিল বিশেষ করে বৃটিশ শাসনের আমলে এখানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলে তাদের অনুকুলেই যেতো।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই, আপনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া করেছেন ইংরেজিতে অনুবাদ খুব ভাল করেন, আপনি কি খুব ভাল ছাত্র ছিলেন ইংরেজিতে ?

কবীর চৌধুরী: মোটামুটি ভাল ছাত্রই ছিলাম বলা যেতে পারে। আমার ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ অবশ্য আমার বাবার কারণেই প্রথম হয়। তিনি আলীগড়ে পড়াশুনা করেছিলেন। ইংরেজির কয়েকজন খুব ভালো অধ্যাপকও ছিল তাঁর। চমৎকার ইংরেজি জানতেন আমার বাবা। তিনি আরবী, ফারসী এসবও জানতেন খুব ভাল। আচকান পায়জামা পরতেন সারা জীবন। তার উৎসাহ উদ্দীপনায় আমরা ইংরেজির প্রতি আকৃষ্ট হই এবং আমি ভাল ছাত্র ছিলাম। এটা আমি নিজেও বলবো, কারণ ইংরেজি অনার্সে আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই। সে বছর মাত্র একজনই ফার্স্ট ক্লাস পায়। আর এম.এ তেও আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই। যদিও তখন পাঁচ জন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। তখন একশোর মধ্যে ষাট পেলেই ফার্স্ট ক্লাস দেয়া হত। আমি কয়েকটি পেপারে ৬৫, ৬৬, ৬৭ পর্যন্তু নাম্বার পেয়েছি। সাধারণত এভারেজে ৬০ পেলেই ফার্স্ট ক্লাস হত, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এভারেজ করতে হয়নি। আমার প্রতি পেপারেই ৬০ এর উপরে নম্বর ছিল। আমি শুনেছে যে এর আগে একমাত্র বুদ্ধদেব বসুই আমার চেয়ে বেশী নম্বর পেয়েছিলেন।

বেবী মওদুদ: তো আপনিতো জানেন যে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা ইংরেজিতে সব সময়ই খারাপ করে, ফেল করে। বেশীরভাগ ফেল করে এস.এস.সি পরীক্ষায়। ইংরেজিটাকে খুব ভয় পায় বলা চলে, আসলে কারণটা কি ?

কবীর চৌধুরী: আমার মনে হয় প্রধান কারণ হচ্ছে ইংরেজি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা খুব দুর্বল। ইংরেজি শিক্ষাদানের মধ্যে প্রধানত শিক্ষক এবং শিক্ষার উপকরণ এইতো, এবং এই দু’টো দিক থেকে ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা খুব উদাসীন।

বেবী মওদুদ: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে দুর্বলতা আছে আপনাদের সময়ে সেটা কেমন ছিল?

কবীর চৌধুরী: এত দুর্বল ছিল না আমাদের সময়ে। এখনতো প্রচুর পিএইচডি শিক্ষক আছে। গ্রাম অঞ্চলে নেই, শহরে আছে। কিন্তু শহরের ছেলেরাও যে খুব ভাল ইংরেজি জানে তা নয়। তারা কিছু কিছু বুলি জানে, কিছু কিছু কলোক্যাল এক্সপ্রেশন তারা জানে। কিন্তু খুব সুন্দর বা ভাল, আকর্ষণিয় ইংরেজি তারা বলতে পারে না। এজন্য ভালো শিক্ষকের পাশাপাশি ভালো উপকরণ তৈরি করতে হবে। তুমি জানো কিনা জানি না, আমার মেয়ে শাহীন, তুমি তাকে চেনো। ও একটেল এবং ডেইলি স্টার পত্রিকার সঙ্গে মিলে সমস্ত দেশে ইংরেজি শিক্ষাদানের জন্য “ইংলিশ ইন স্কুল” নামে একটা প্রকল্প চালাচ্ছে। সেখানে ঐ খবরের কাগজের মাধ্যমে এটা করার চেষ্টা চলছে।

বেবী মওদুদ: তো আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা আছে সেখানে বাচ্চাদের উপরে এতো চাপ ছিল না। ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে এখন কিন্তু প্রচন্ড চাপ দেখা যায়। তার পরও খুব ভাল ইংরেজি জানা ছাত্র পাওয়া খুব কঠিন।

কবীর চৌধুরী: আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে নানা রকম বৈষম্য এবং দুর্বলতা আছে, এগুলো কি করে দূর করা যায় সে সম্পর্কে ২০০৯ সালের শিক্ষা নীতিতে কিছু সুপারিশ মালা আছে।

বেবী মওদুদ: তো আর একটা কথা। বাংলাতে যে তারা খুব ভাল তাও কিন্তু নয়। শুদ্ধ বাংলা বানান তারা লিখতে পারে না। অনেক বি.এ পাস করা ছেলে মেয়েও পারে না, কারণটা কী? এদেরকে কী ভাল শিক্ষা দেওয়া হয় না ? না কি এখন ভালো শিক্ষক নাই।
কবীর চৌধুরী: এসব দুর্বলতা কিছুটা তো আছেই। এখন পড়ার অভ্যাস কম। ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের সামনে ছাত্ররা খুব বেশী সময় থাকে। যারা গ্রহণ করতে পারছে তারা ভাল করছে কিন্তু সাধারণভাবে এর ফল খুব ভাল হচ্ছে না। পড়ার প্রতি আগ্রহটা কমে যাচ্ছে।

কবীর চৌধুরী: তো, আমার আর একটি বিষয় জানতে ইচ্ছে করে যে, শিক্ষার সঙ্গে সাধনা, চর্চা বা সৃজনশীলতার সম্পর্কটা কেমন ।

কবীর চৌধুরী: আমার মনে হয় খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা উচিৎ। কিন্তু বাস্তুবে সব সময়ে থাকে না। তো এটাকে করতে হবে। আমি বলবো প্রাথমিক পর্যায়ের কথা। সে-শিক্ষাকে আনন্দদায়কও করতে হবে। এটা খুব দরকার ছাত্র যদি প্রথম থেকেই শিক্ষাকে ভয় করতে শেখে তাহলে তার শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হবেই। তো আমরা যে ২০০৯ শিক্ষা নীতির কথা বলেছি, তাতে আমরা কিছু কথা বলেছি সুশিক্ষার ব্যাপারে।

বেবী মওদুদ: আপনিতো বিংশ শতাব্দির মানুষ। একবিংশ শতাব্দিতে এসেও আপনার জীবন আচরণ, জীবনযাপন, লেখা পড়া সবকিছুই চলছে আগের মতই। পার্থক্যটা কোথায়, কিছু টের পান?

কবীর চৌধুরী: নেতিবাচক দিক থেকে পার্থক্য হচ্ছে যে শহরের অবস্থা যন্ত্রনাদায়ক। নয়েজ পলিউশন, এয়ার পলিউশন। সব কিছু খুব কষ্টদায়ক। এটা হচ্ছে নেতিবাচক। তবে ইতিবাচক যে কিছু নেই তা নয়। যেমন আগে তথ্যের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হতো বা কষ্ট করে খুঁজতে হতো। যেমন, এই যে রুমানিয়ার লেখক হ্যাটা মুলার নোবেল প্রাইজ পেলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা তার কতগুলো বই আছে, বইয়ের মূল বিষয়বস্তু কী, এসব তথ্য পাচ্ছি। এটা একটা ইতিবাচক দিক। আর যোগাযোগ হচ্ছে অন্যান্য লেখকদের সঙ্গেও । যাদের আমরা সমমনা মনে করি, তিনি বিলেতেই থাকুন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই থাকুন পত্র-পত্রিকা ও ফোনের মাধ্যমে, ই-মেইলের মাধ্যমে, আমরা তাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ রাখতে পারি। এটা একটা সাংস্কৃতিক ঐক্যও সৃষ্টি করছে। যারা প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী তারা সহজেই একে অন্যের খবর রাখতে পারছেন।

বেবী মওদুদ: কিন্তু জীবন আচারণে আপনি কোন সমস্যায় পড়ছেন কি ?

কবীর চৌধুরী: জীবন আচারণে আমি খুব বেশী পার্থক্য দেখি না। মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছু লক্ষ করা যায় পোশাক আশাকের ক্ষেত্রে। সেটা নেতিবাচক নয়। আমি সেটা ইতিবাচকই মনে করি। আজকাল আমাদের তরুণীরা কেন, মাঝবয়সী মেয়েদেরও জিন্স পরে রাস্তায় চলা ফেরা করতে দেখি। শাড়ী পরাটা কিছু কমে যাচ্ছে।

বেবী মওদুদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনতো শাড়ি পরা মেয়ে খুবই কম দেখা যায়।

কবীর চৌধুরী: খুবই কম। প্রায় দেখাই যায় না একদিকে শাড়ী পরা মেয়ে কমে যাচ্ছে আর অন্যদিকে হিজাব পরা মেয়ের সংখ্যা বাড়ছে। এটা একটা বৈপরীত্ব।

বেবী মওদুদ: কেউ কেউ আবার সালোয়ার কামিজও পরে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শাড়ি পরাটা দেখতে ভাল লাগতো।

কবীর চৌধুরী: খুবই ভাল লাগতো এবং শাড়ি তো বাংলার পোশাক। তবে এখন এটা সর্বভারতীয় পোশাক। ভারতের সব নামী দামী অভিনেত্রীকে দেখবে শাড়ী পরছে।

বেবী মওদুদ: পাকিস্তুানেও পরে তারপরে নেপালেও পরে।

কবীর চৌধুরী: শাড়ি একটা খুব রুচিসম্মত সুন্দর জিনিশ। সেটা আমাদের এখানে কমে যাওয়াটা খুব ভাল চোখে আমি দেখি না।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই আপনিতো একজন শিক্ষাবিদ হিসাবে বঙ্গবন্ধু সরকারের শিক্ষাসচিব পদ পেয়েছিলেন। আপনি কত দিন ছিলেন সেখানে?

কবীর চৌধুরী: আমি শিক্ষা সচিব হিসাবে বোধহয় বছর খানেকের মত ছিলাম।

বেবী মওদুদ: এবং আপনি সেখান থেকে ছেড়ে চলে আসেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যা, আমি সেখান থেকে ওই পদ ছেড়ে চলে আসি। আমি যখন ছেড়ে চলে আসতে চাইলাম, বঙ্গবন্ধু খুশি হননি। উনি বললেন যে, আপনি থাকেন আরো কিছু দিন। দেখেন। যখন আমি আমার অসুবিধার কথাগুলো বললাম, তখন তিনি আর একটা প্রস্তাব দিলেন। তাতে বোঝা যায় যে তিনি আমাকে কতটা ভালবাসতেন এবং আমার উপর কতটা বিশ্বাস রাখতেন। তিনি আমাকে বললেন যে ঠিক আছে, শিক্ষা সচিব হিসাবে যদি আপনি থাকতে না চান, তো আপনার কোন রকমের পদবী থাকবে না, এ্যাটাচড টু দি প্রাইম মিনিস্টার—এই ভাবে একজন সচিবের পদমর্যাদায় থাকবেন। আপনাকে আমি যে সব কাজ দেব দায়িত্ব দেব, আপনি সেগুলো দেখবেন। আমি দেখলাম এতো আরো বিপদের কথা। তো আমি অনেক অনুরোধ করলাম যে আপনি আমাকে ছেড়ে দেন। আর একটা ব্যাপারও ছিল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পূর্ণকালীন ফুল প্রফেসরের পদ খালি ছিল। এখন তো ফুল প্রফেসারের পদকে তেমন কিছু গণ্য করা হয় না। তখন একজন ফুল প্রফেসারের খুব মর্যাদা ছিল। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম অনেক নামী দামী অধ্যাপক তখন রিডার হিসাবেই অবসর নিতেন। রিডার মানে আজকের দিনের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। বঙ্গবন্ধুকে আমি আমার অসুবিধার কথা বললে তিনি জানতে চান কি অসুবিধা। যাই হোক, তোমারও হয়তো সেই প্রশ্নই থাকবে যে অসুবিধা কোথায় ছিল।

বেবী মওদুদ: হ্যাঁ। আপনি কি সমস্যাগুলো দেখেছিলেন ? আমরা যে আমলাতান্ত্রিক সমস্যাগুলো দেখি বা শুনি তাই কি ?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, আমি তার কথাই বলছি। যেমন কোন একটা বিশেষ কাজ আমি করতে চাইছি কিন্তু সেই নথি আরো অনেক জায়গায় যাবে এবং সব চাইতে বড় একটা অসুবিধা ছিল অর্থ পাওয়ার সমস্যা। যেমন, আমার একটা প্রধান ইচ্ছা ছিল, শিক্ষা সচিব হিসাবে, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে বৈষম্য, গুনগতমানের তারতম্য কমিয়ে আনা। এই কাজটি করার জন্য আমার নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠিত হয়। সে কমিটির নাম ছিল ‘নাইন মেম্বারস’ কমিটি’ অর্থাৎ নয় সদস্যের কমিটি। তখন আমরা কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করি যাতে করে সরকারি কলেজ-বেসরকারি কলেজের ফারাকটা কমে আসতে পারে। তো, তার জন্য অর্থ একটা প্রধান প্রয়োজনীয় বিষয় ছিল। তখন আমাদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন সাহেব। আমাকে তিনি চিনতেন এবং খুব ভালো জানতেন। আমি তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বললাম। তিনি আমাকে খোলাখুলি বললেন, কবীর সাহেব, আমি আপনার কথা বুঝি কিন্তু আমাদের অর্থের সংগতির কথাটা ভাবতে হবে। একটা নতুন দেশ, আমরা নানা সমস্যার মধ্যে আছি। আপনি যা চাইছেন সে পরিমাণ অর্থতো দেওয়া যাবে না। তো যখন আমি দেখলাম যে আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি কাজ করতে পারছি না, তখন আমি সরে আসি।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই, আপনাদের সময়তো ডা. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন হয়েছিল। নীতি মালাও প্রস্তত হয়েছিল এবং ঘোষিত হয়েছিল। ওটার বাস্তবায়ন তখন হলো না কেন? ওটা হলেতো আপনারা অনেক দুর এগুতে পারতেন ।

কবীর চৌধুরী: হ্যা, অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম। কারণ কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা নীতির মধ্যে আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অনেক কথা ছিল। কিন্তু সেটা কেন এগিয়ে যেতে পারল না?

বেবী মওদুদ: ওটাতো ’৭৩/ ’৭৪ সালে হবে বোধহয়।

কবীর চৌধুরী: তার পরেই তো ক্ষমতার রদ বদল হয়ে গেল। ওটা এক রকম কোল্ড স্টোরেজে চলে গেল, কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের সুপারিশগুলি।

বেবী মওদুদ: ওটা থাকলে আমরা মনে হয় অনেকটা এগুতে পারতাম।

কবীর চৌধুরী: হ্যা, নি:সন্দেহে।

বেবী মওদুদ: তো এখন যে শিক্ষা নীতিমালা বেশ দ্রুত ঘোষণা করলেন আপনারা । আপনারা কি ওটার সঙ্গে কিছুটা সংগতি রেখেছেন বলে মনে করেন।

কবীর চৌধুরী: আমরা কুদরত-ই-খুদা কমিশনের যে শিক্ষা নীতি ছিল তার মৌলিক প্রগতিশীল সবগুলি দিক ঠিক রেখেছি। যেমন ধর্ম নিরপেক্ষতার বিষয়টি, যেমন বৈষম্য দূর করার জন্য শিক্ষাকে কাজে লাগানো। কারিগরি এবং বিজ্ঞান শিক্ষার উপরে গুরুত্ব দেওয়া। এগুলো কুদরত-ই-খুদা কমিশনে ছিল এবং আমাদের এই শিক্ষা নীতির মধ্যেও আছে। আমরা বিশেষভাবে জোর দিয়েছি বৈষম্য দূর করার উপর। এবং এটা প্রধান্য পেয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। সে জন্যই আমরা বার বার একমুখী শিক্ষার কথা বলেছি। দু:খের বিষয় এই যে কোন কোন মহল থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিকৃত কথা ছড়ানো হচ্ছে এবং আমাদের রিপোর্টকে নিয়েও হয়তো একটা কিছু গোলমাল কোথাও হয়েছে। কারণ কোন কোন কাগজে আমি দেখেছি বলা হয়েছে সব ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাতেই কতকগুলি কোর সাবজেক্ট থাকবে। কিন্তু সব ধরণের শিক্ষা তো না। প্রাইমারী পর্যায়ে এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাই থাকবে। এই জিনিশটাকে একটু তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে।

বেবী মওদুদ: সরকারি বেসরকারি সবখানে একই রকম থাকবে ?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, একই রকম হতে হবে। তার একটা অর্থ হচ্ছে যে, এখন যেমন ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আছে সেটা থাকবে না। কারণ আমরাতো বলছি যে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হতেই হবে প্রাইমারী পর্যায়ে। মাদ্রাসায় যে আরবীর গুরুত্ব আছে সেটা তারা দিতে পারে, কিন্তু আমাদের এই কোর সাবজেক্টগুলো পড়িয়ে তার পরে।

বেবী মওদুদ: প্রাইমারীতে এটা আপনারা বাধ্যতামূলক করবেন?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। এটার উপরে আমরা জোর দিয়েছি। কিন্তু মিডিয়াতে এটা অন্যভাবে চলে আসছে। তবে এই প্রসঙ্গে আমি বলবো যে, এখনও তো নীতিটা গ্রীহিত হয়নি, চুড়ান্ত হয়নি। মতামত এখনও আসছে। ভিন্ন মত যেগুলো আসছে আমরা সেগুলোও বিবেচনা করবো।

বেবী মওদুদ: পত্রিকায় দেখলাম যে নারী নেত্রীরা বলেছেন, নারী শিক্ষা বলে আলাদা একটা চ্যাপ্টার আছে। তারা বলছেন যে নারী শিক্ষা আলাদা হবে কেন।

কবীর চৌধুরী: নারী শিক্ষা আলাদা একটা চ্যাপ্টার করা হয়েছে কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে নারীরা আলাদা ভাবে শিক্ষিত হবেন। স্কুল কলেজে নারীরা একই রকম শিক্ষা পাবে। কিন্তু নারী শিক্ষার আলাদা একটা চ্যাপ্টার করার অর্থ হচ্ছে তাকে একটু বেশী গুরুত্ব দেয়া। আমরা জানি যে, সংবিধানে যাই বলা হোক না কেন কিংবা আমরা মানবাধিকার সংস্থা থেকে যাই বলি না কেন সত্যিকার অর্থেই নারীরা ডিসক্রিমিনেশনের শিকার হয়। তো সেটা রোধ করার জন্য একটা আলাদা চ্যাপ্টার করে নারীশিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি।

বেবী মওদুদ: তাহলে আপনারা বলছেন যে, কিন্ডারগার্ডেন স্কুলগুলি ও মাদ্রাসা শিক্ষানীতি আওতায় আসবে।

কবীর চৌধুরী: তারা শিক্ষা নীতির আওতায় আসবে এবং তাদেরকে সেটা মানতে হবে। মানতে হওয়ার ব্যাপারে আমরা একটা ভাল সুপারিশ করেছি। সেটা যদি গ্রীহিত হয় তবে আমরা অনেক এগিয়ে যাব। আমরা একটা এডুকেশন ‘ল’ বা আইন করার কথা বলেছি। এটা বিভিন্ন দেশে আছে। থাইল্যান্ডে আছে, আরো কয়েকটি দেশে আছে। এডুকেশন ‘ল’ বলে যদি একটি আইন থাকে এবং সেই আইনের ধারা যদি স্পষ্ট হয়, যা লংঘন করলে শাস্তি দেয়া যাবে। তাহলে অনেক কিছু কার্যকর করতে পারবো।

বেবী মওদুদ: তো আপনি কতখানি আশাবাদী যে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হবে?

কবীর চৌধুরী: আমি আশাবাদী এই বছরের শেষ নাগাদ আমরা কিছু কিছু বাস্তবায়নে যাব। আমি আশাবাদী দ’ুটি কারণে। এক হচ্ছে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহী। নুরুল ইসলাম নাহিদ, তিনি প্রগতিশীল রাজনীতি করেছেন সারাজীবন। তিনি আছেন আর তা ছাড়া আমাদের বর্তমান সরকার, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সরকার, সে সরকারও চাইবে, আমার বিশ্বাস আমাদের এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হোক।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই, আমার আর একটা বিষয় জানতে ইচ্ছে করছে যে, আপনি তো পৃথিবীর অনেক দেশে গিয়েছেন। কোন দেশের শিল্প সাহিত্য সমৃদ্ধ বলে মনে হয়েছে এবং কেন মনে হয়েছে?

কবীর চৌধুরী: একসময় সেই দেশ ছিল সোবিয়েত ইউনিয়ন এবং মস্কো। কারণ যখন আমি ’৭০এর প্রথম দিকে মস্কোতে যাই ’৭২-’৭৩ সালে বেশ কয়েকবার অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের পালাবদল না হওয়া পর্যন্তু। পরে তাদের আগেকার যে সব নীতিমালা ছিল তা পরিবর্তিত হয় একটু স্বৈরাচারের ধাঁচে, পাশ্চাত্য মিশ্রণের নানান কথা বলে। একটা আদর্শবাদ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল একসময় এবং তার প্রতিফলন আমি মস্কোতে দেখেছি। কতবার সেখানে গিয়েছি। সেইজন্য ঐ দেশটাকে খুব আদর্শ একটা দেশ বলে মনে হতো। কয়েকটা কথা বলি, বইপত্র এত সস্তায়, এত সুন্দর বই পাওয়া যেত কল্পনা করা যায় না এবং অজস্র অনুবাদ। শুধু যে তাদের কমিউনিস্ট সাহিত্য বইয়ের দোকানে আসতো তা নয়। পাশ্চাত্যের অনেক ইংরেজী সাহিত্য আমি সেখানে পেয়েছি এবং অনেক অল্প দামে, অবিশ্বাস্য অল্প দামে। রাষ্ট্রীয় সাবসিডি ছিল, সেই কারণে। তুমিতো জান, প্রগতি প্রকাশনার কথা এবং সেসব বাংলায় অনুবাদ করার জন্য কত গুণি লোক সেখানে ছিল। দ্বিজেন শর্মা ছিলেন, ভারতের অনেকে ছিলেন। আর যে কারণে তখন দেশটাকে ভালবাসতাম, সেখানে নিরাপত্তা ছিল। আমার মেয়ে মস্কো রেডিওতে কাজ করেছে একসময়। রাত্র ১২/১টার সময় সে একা বাড়ী ফিরে এসেছে। যেটা পরম বেদনার কথা তা এই যে, এখন সেই নিরাপত্তা সেখানে নেই। মস্কো, আমি শুনেছি, এখন একটা সন্ত্রাসের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ছিনতাই, মারামারি অহরহ ঘটছে। তারা আগের অবস্থা ধরে রাখতে পারেনি। নিজেদের দুর্বলতাও ছিল, প্রশাসনের দুর্বলতাও ছিল। আর বাইরের বাকী সব দুনিয়াতো চেয়েছিল ওটাকে ধ্বংস করতে। এই দু’টো মিলিয়ে এই অবস্থা ঘটেছে।

বেবী মওদুদ: বর্তমান শতাব্দীকে বলা হয় যান্ত্রিক সভ্যতা বা বিজ্ঞান প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ সময়, বলা হয় এখন কম্পিউটার সর্বত্র, এসে গেছে। তাই এ সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ বলা যায়। নাকি মানবিক দিক দিয়ে আমরা এই সময়টাকে শ্রেষ্ঠ সময় বলবো ? কোন দিকটা আপনি মনে করেন।

কবীর চৌধুরী: বিজ্ঞানের অগ্রগতির দিক থেকে এই যুগটা অনেক আকর্ষনীয় এবং উপকারী। মানবিকদিক থেকে বরং তার উল্টো। কারণ এই শতাব্দিতে এসে গুয়েতমালা বন্দিশালার মতো কান্ড দেখতে হচ্ছে। একি আমরা কখনো ভেবেছিলাম ? তারপর কেউ কেউ তালেবানদের পক্ষে কথা বলেন, আমার সঙ্গেও যুক্তি-তর্ক করেন যে কেন তারা তো ইসলামকে অনেক উপরে তুলে আনছে। কিন্তু সন্ত্রাস এবং নৃশংসতার মাধ্যমে কোন ভাল কাজ হতে পারে না। তালেবান শব্দটাতো এখন সমার্থক হয়ে গেছে মৌলবাদী জঙ্গিদের সঙ্গে।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই, আমার আর একটা প্রশ্ন। আমি নিজেও অনেক অনেক সময় চিন্তুাভাবনা করেছি এবং অনেককে জিজ্ঞেসও করেছি, আমরা যাদের বুদ্ধিজীবি বলি, সমাজে কারা হলেন বুদ্ধিজীবী? আপনার মতে বুদ্ধিজীবির সংজ্ঞাটা কী হবে?

কবীর চৌধুরী: এটা একটা বিতর্কমূলক ব্যাপার। সংজ্ঞা দিতে গেলে তবে সাধারণভাবে আমরা যেমন বুঝি।

বেবী মওদুদ: আমরা যখন বার্ট্রান্ড রাসেলের নাম শুনি, রুশোর নাম শুনি—এদের কথা যখন শুনি তো সেই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে আপনার কাছে কি মনে হয়।

কবীর চৌধুরী: সাধারণভাবে বুদ্ধিজীবী বলতে আমরা মনে করি, যারা লেখা পড়ার সঙ্গে যুক্ত। যারা জ্ঞান চর্চার সঙ্গে যুক্ত। অধ্যাপক, বড় মানের লেখক—এদেরকে আমরা বুদ্ধিজীবি বলি। আবার শব্দটার অন্যরকম ব্যাখ্যাও করা যায়, যারা জীবনধারণ করেন বুদ্ধি বিক্রী করে। তবে সেটা সে অর্থেও কিছুটা সত্য। লেখক তো লেখা বিক্রি করেন, অধ্যাপক তার জ্ঞান বিতরণ করে জীবনধারন করেন। তবে ক্ল্যাসিকাল অর্থে বুদ্ধিজীবি যাদের বলি সেই রকম বুদ্ধিজীবি আমাদের দেশে খুব বেশী নেই। তুমি একটু আগে যাদের কথা বললে রুশো, রাসেল, ভলতেয়ার।

বেবী মওদুদ: মানে যিনি বুদ্ধিতে অনেক বড় মাপের হবেন এবং সমাজ, মানুষ ও দেশকে একটা দিক-নির্দেশনা দেবেন ভাল-মন্দ কথাও বলবেন। এটা তিনি উপদেশ আকারে বলতে পারেন, বা তিনি একটা অভিভাবকত্বের দাবি নিয়ে বলতে পারেন।

কবীর চৌধুরী: নিশ্চয়ই। আমাদের এখানে ঠিক সেই রকম কিছু গড়ে ওঠেনি। আমরা কয়েকজনের মধ্যে তার অঙ্কুর দেখেছি। তাদের কথা বলতে পারি। আহমেদ শরীফ ছিলেন, এখন অধ্যাপক সালাহ্ উদ্দিন আছেন, ইতিহাসবিদ, সরদার ফজলুল করিম আছেন, অজয় রায় আছেন ফিজিক্স-এর ।

বেবী মওদুদ: এরপরে আমার আর একটা বিষয় জানার আছে যে, আপনি তো ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক ছিলেন। ঐ সময় ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের সময় ঢাকা শহরের অবস্থা কি ছিল তাতো আমরা সবাই জানি। ঐ সময় বাংলা একাডেমির প্রধান হিসাবে আপনার উপর কি কোন চাপ ছিল? ঐ সময় তো পাকিস্তানি সরকার কুবুদ্ধি নিয়ে চেষ্টা করেছিল এখানকার কবি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিদের একত্রিত করতে ।

কবীর চৌধুরী: আমি তেমন কোন রকম চাপের মুখে ছিলাম না। আমার পক্ষে কাজ করা অত্যন্তু উদ্দীপনাময় হয় কয়েকটা বিশেষ কারণে। ঠিক স্বাধীনতা অর্জনের পরপর একটা প্রচণ্ড প্রাণ আবেগ ছিল। আমরা অনেকগুলো কাজ সেই সময় করি নিজেদের উদ্যোগে। সরকারের কোন নির্দেশ ছিল না। আমার নেতৃত্বেই আমরা কতগুলো কাজে হাত দেই, যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় যে চুক্তিগুলো করবে তার বাংলায় একটা ফরম্যাট হতে পারে। দ্বিভাষিক ইংরেজি এবং বাংলায় পরিভাষা তৈরির একটা বড় প্রকল্প আমরা হাতে নিই।

বেবী মওদুদ: কিছু কাজ কি হয়েছে ?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, কিছু কাজ হয়েছে। তোমার মনে আছে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সহযোগিতায় গোলাপি রংয়ের কতগুলো ছোট ছোট চটি বই তখন বের হয়েছিল। সেই প্রকল্পকে এখন আমরা আবার নতুন করে চালু করার চেষ্টা করছি, বৃহদাকারে।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই আমার জানান ইচ্ছা ছিল ঐ সময় ৭১সালে পাকিস্তুান সরকার, বুদ্ধিজীবি, কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে তাদের সমর্থনে একটা পেপারে তাদের সবার স্বাক্ষর নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার একটা চেষ্টা করেছিল, তো আমরা যতদুর জানি সুফিয়া কামাল এবং আপনি তাতে স্বাক্ষর করেন নাই। অনেকেই করেছিল তো ঐ ধরনের কোন চাপ আপনাকে বা সুফিয়া কামালকে দিয়েছিল বলে আপনার মনে আছে ?

কবীর চৌধুরী: আমরা তো একটা বড় বিবৃতি তৈরি করে ছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, নৃশংসতা যারা করেছে রাজাকার-আলবদরদের বিচার চাই এবং একটা খসড়া বিবৃতির মতো করে আমরা বাংলা একাডেমির সামনে টেবিল পেতে একটা বিরাট ভলিউমের বড় খাতা রাখি। আমার দু:খ হয় যে, সেগুলির আর কোন হদিস পরে আর পাইনি। সেখানে মনে হয় দুই তিন দিনের মধ্যে লক্ষাধিক লোকের সই নেয়া হয়েছে যে, আমরা বিচার চাই, বিচার চাই। তো সেই সময়ের প্রাণাবেগ তা ধরে রাখা যায়নি। সেটা স্বাভাবিকও। পরবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়ে আসে। সরকারি সমর্থনও তখন পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের সঙ্গে বাংলা একাডেমির সম্পর্কটা কী? আমরাতো একটা স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার আমাদের সাহায্য সহযোগিতা দেবেন। এইখানে একটা টানাপোড়নের ব্যাপার আছে। তো এখন আমরা বাংলা একাডেমির এ্যাক্ট সংস্কারের কাজে ব্যস্ত রয়েছি। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমাদের নুতন প্রস্তাবিত এ্যাক্ট মন্ত্রনালয়ে যাবে। এটাতে আমরা স্বেচ্ছাচারিতা নয়, স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দিয়েছি। আমাদের প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা না দিলে বাংলা একাডেমির কাছ থেকে আক্সক্ষাখিত ফল পাওয়া যাবে না।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই আপনিতো যথেষ্ট অনুবাদ করেছেন। কত হবে মনে আছে ?

কবীর চৌধুরী: আমার অনুদিত বই ষাট, সত্তুরটা তো হবেই।

বেবী মওদুদ: সব মিলিয়ে কত বই হবে আপনার ?

কবীর চৌধুরী: আমার সব মিলিয়ে এখন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় দু’শ কিছু কম বা বেশী হতে পারে। এবারকার এই বইমেলায় ১২/১৩ টি বই প্রকাশ পাবে। তার মধ্যে অনুবাদ থাকবে, মৌলিক প্রবন্ধ গ্রন্থও থাকবে। ইংরেজি বা বাংলা দু’ভাষাতেই।

বেবী মওদুদ: অনুবাদ সাহিত্যকেও তো আমরা সাহিত্য হিসাবে গণ্য করতে পারি। এই অনুবাদ সাহিত্য করে আপনার কি অভিজ্ঞতা? আপনি কি মনে করেন এটা পাঠকদের কাছে খুব গুরুত্ব পূর্ণ সাহিত্য?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ আমি মনে করি পাঠকদের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কর্ম। কারণটা তুমি সহজেই বুঝতে পারবে। আমাদের অনেকের পক্ষেইতো খুব বেশী ভাষা শেখা সম্ভব হয় না। বিশ্বের অনেক সেরা সাহিত্য যদি বাংলায় অনূদিত না হয় তাহলে তো আমরা তা থেকে বঞ্চিত হবো। এইখানে আমার একটা ক্ষোভ আছে অবশ্য। ক্ষোভটা হলো যে আমরা তো বেশির ভাগ সময় মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করি না। ইংরেজীর ক্ষেত্রে যা করি। কিন্তু রুশ ফরাশি জার্মান দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা, এই সব ক্ষেত্রে কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য, এইসব ক্ষেত্রে তো আমরা ইংরেজী অনুবাদ থেকে অনুবাদ করি। মূল থেকে করি না। তার মানে হচ্ছে অনুবাদের অনুবাদ। এটা খুব সন্তোষজনক নয়। অপারগ হয়ে করতে হয়। এটা নিরসনের একটা ব্যবস্থা করা দরকার। আমাদের বিদেশি ভাষা ইনস্টিটিউট আছে বটে কিন্তু তার কাজ বা আউটপুট নানা কারণেই অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। খুব বড় করে যদি আমরা বিদেশী ভাষার একটা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে পারি এবং সেখানে যদি বিভিন্ন ভাষা যারা পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন, এই রকম লোক তৈরি করতে পারি, তখন আমাদের এই অনুবাদের অনুবাদ সেটার হাত থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই, আর একটা বিষয় জিজ্ঞেস করি আমাদের দেশের সাহিত্যে এবং পত্র-পত্রিকায় বর্তমানে যে বাংলা চর্চা করি অর্থাৎ যে বাংলাটা এখন চলছে বা পত্র-পত্রিকাতে আপনি দেখেন সেটা কেমন ? এটা কতখানি শুদ্ধ মনে হয় আপনার? পড়ে কি মনে হয় ? ইংরেজী পত্রিকাগুলো বা বাংলা পত্রিকাগুলো কি আন্তর্জাতিক মানের ?

কবীর চৌধুরী: এর রূপটা হচ্ছে মিশ্র। কিছু ভাল বাংলা হচ্ছে না এটাও বলা যাবে না এবং খুব বেশী অশুদ্ধ হচ্ছে তাও বলা যাবে না। এখানে ব্যাকরণ জ্ঞান ভাষার জ্ঞান বানান জ্ঞান এগুলোর একটা বড় ভূমিকা আছে। তো বাংলা একাডেমিতে আমরা একটি প্রকল্প নিয়েছি ভারতের সঙ্গে। তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে হবে। শ্রী পবিত্র সরকারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তুমি কাগজে দেখেছো, আমরা একটি ব্যাকরণের প্রকল্প নিয়েছি। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে হবে।

বেবী মওদুদ: এটা কি কলকাতার বাংলা একাডেমি আর এখানকার বাংলা একাডেমি ?

কবীর চৌধুরী: না। ওদের কাছ থেকে দু’একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে এই প্রকল্প। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসাবে যুক্ত হবে না।

বেবী মওদুদ: মানে, কাজটা আমাদের বাংলা একাডেমী করবে ?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ।

বেবী মওদুদ: তো এটা বাস্তবায়িত কত দিন লাগবে?

কবীর চৌধুরী: এটা মোটে শুরু হয়েছে। আমি আশা করছি এটা হলে পরে আমাদের লেখালেখির মধ্যে যে একটা অবাঞ্ছিত মিশ্রণ ঘটে যায় একটা স্ট্যান্ডার্ডরাইজড কিছু হয় না, সেটা অনেকটা দুর হবে। কারণ ভাষার মেরুদন্ড হচ্ছে ব্যাকরণ।

বেবী মওদুদ: অবশ্যই। তো কবীর ভাই আর একটা বিষয় আপনাকে জিজ্ঞেস করি, আপনার সম্পর্কে আলোচনা হয় তো মানুষের মধ্যে। সমাজের মধ্যে একটা ভ্রান্তি আছে। এখানে কেউ কেউ আছে যে অন্যের পুরোনো বই নিজের নামে ছেপে দায় । এটাও আমি দেখি। কেউ কেউ অন্যের অনুবাদ নিজের নামে ছাপিয়ে দেয়, হয়তো মনে করে যে কেউতো পড়ে নাই। সেই রকম বইয়ের ফ্ল্যাপও আপনি লিখে দিয়েছেন। হয়তো আপনার অজান্তেই সেটা হতে পারে। এর ভিতর জুলফিকার নিউটন নামে একটি ছেলে কাজটি করেছিল এবং সে নিজেও এখন অনুতপ্ত হয়ে নিজেই বলে বেড়ায়। কিন্তু সব বইতো সবার পক্ষে পড়া সম্ভব না। তো আপনার কাছে কেউ পান্ডুলিপি নিয়ে এসেছিল কি?।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ আমার কাছে মাঝে মাঝে অনেকে পা-ুলিপি নিয়ে আসে। তো সেগুলো খুব পরিচিত বা বন্ধুজন না হলে আমি দেখিনা, কারণ সময় হয় না। কিন্তু জুলফিকার নিউটনের কথা আমি শুনেছি। আমি যতটুক দেখেছি ওর বেশ কয়েকটি অনুবাদের বই আমার হাতে এসেছে এবং সেই অনুবাদগুলো দেখে আমার নকল বলে সন্দেহ করবার কোন কারণ ঘটেনি। আর আমি আর একটা কারণেও খুব ইমপ্রেস্ড হয়েছি। তার প্রত্যেকটি অনুবাদ গ্রন্থে খুব বড় ভূমিকা আছে এবং সেই ভূমিকাতে মূল লেখকের জীবন এবং সাহিত্য কর্মের কথা আর অনূদিত উপন্যাসের একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা থাকে। এই কাজটি কিন্তু আমাদের অনুবাদ যারা করেন তারা অনেকে করেন না। প্রথম পৃষ্ঠা খুলে শুধু মূল বইয়ের নাম দেখা যায়, কোনো ভূমিকা নেই, মূল বইয়ের পরিচয় নেই। সেদিক থেকে আমি জুলফিকার নিউটনের কাজকে ভালই দেখি।

বেবী মওদুদ: দেবী প্রসাদের রুপ-রস-সুন্দর বইটি কলকাতায় আছে। মানবেন্দ্রের অনুবাদে মার্কেজের কিছু গল্প আছে। হুবহু মিলে যায়।

কবীর চৌধুরী: আমি জানিনা, যদি করে থাকে তবে খুবই অন্যায় করেছে এবং আমি সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করবো এরকম করেছে কি না। আর আমাকে যদি তুমি বা আর কেউ নিউটনের ওই রকম নকল করা বই, আর যে বই থেকে নকল করেছে সে-বই আমাকে দিয়ে যাও তাহলে আমি মিলিয়ে দেখবো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

বেবী মওদুদ: এটা নিয়ে তরুণ সমাজে কিন্তু একটা বিতর্ক উঠেছে। তো, কবীর ভাই, এর পরে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করবো আপনার পরিবারের কথা। আমাদের মেহের কবীর ভাবী, আপনার স্ত্রী। তিনি তো সেই অবরোধ যুগের সময় লেখা পড়া করেছেন বলা চলে এবং বলা যায় সেই দিনাজপুর থেকে তিনি তার প্রথম দিকের পড়াশুনা করেছেন। পরে কলকাতা গিয়ে পড়াশুনা করেছেন এবং বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করেছেন এবং গবেষণার কাজও করেছেন তিনি।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। এটা আমার জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য আমি বলবো। তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তারপরে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে তাকে পাওয়া। তিনি পড়াশুনা করেছেন কলকাতায়, ফলিত রসায়নে পড়াশুনা করেছেন এবং তার সৌভাগ্য হয়েছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সঙ্গে থাকার। তিনি তখন ক্লাস নিতেন না কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশে তাঁর থাকার ঘর ছিল। তিনি প্রতিদিন আসতেন এবং আমার স্ত্রীকে খুব স্নেহ করতেন। একটি মুসলমান মেয়ে সেই ১৯৪২/৪৩ সালে ফলিত রসায়ন নিয়ে এম. এস. সি. পড়ছে, এটা তাঁকে খুব আনন্দ দিতো।

বেবী মওদুদ: তারপর তিনি আপনাদের বাড়ীর বউ হয়ে আসলেন। আপনারা তো অনেক ভাই-বোন, সেটা একটা বিরাট ব্যাপার ছিল।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, সেটা বিরাট ব্যাপার ছিল। আর আমার তিন কন্যা প্রতিভাবান এবং তার পেছনে তাদের মায়ের ভূমিকাই বেশী। তিনি খুব ভালো ভাবে ওদের গড়ে তুেলছেন। আমার স্ত্রী কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন ১৯৪৩ সালে, তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ স্কলার হিসাবে তিনি কাজ শুরু করেন। বিষয়টি খুব ভাল ছিলো। সালফেট কি করে সারের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে তিনি সেই গবেষণার কাজটা করছিলেন এবং অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার আর সামান্য কাজ করলেই তার পিএইচডি হয়ে যেত। কিন্তু তার পরে দুই বাংলার বিভেদ ও পাকিস্তান হওয়ার পরে তার থিসিস যতটুকু হয়েছিল তার কাগজপত্র হারিয়ে যায়। পরে কাজটা আর শেষ করা হয় নি। তবে যাই হোক, তিনি পরে লেখালেখির জগতে আসেন এবং বেশ কয়েকটি বই অনুবাদ করেছেন। অনেক জায়গায় শিক্ষকতাও করেছেন বিশেষ সাফল্যের সঙ্গে।
বেবী মওদুদ: নিজের স্মৃতি কথাও লিখেছেন।

কবীর চৌধুরী: তুমি পড়েছো সেটা। আর আমার মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলে, তারই উৎসাহে, আমি কিছু হয়তো সাহায্য করেছি, আমার তিন কন্যা উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা নিয়ে বড়ো হয়েছে। বড় মেয়ে শাহীন কবীর ডাক নাম রীনু। তুমি তো জান ও ইংরেজির অধ্যাপক, আমারই মতো এবং প্রচুর কাজ করে। সারা দেশে ইংরেজী শিক্ষাদানের জন্য ও ‘ইংলিশ ফর স্কুলস’ নামে ডেইলী স্টার নামের ইংরেজি সংবাদ পত্রে প্রতি সপ্তাহে একটি পাতা বের করে। সেটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের উপকারেও আসছে। আমার মেজ মেয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী। তাকে ও আমার জামাতা দুজনকেই তুমি চেনো। জামাতা সেলিম জাহান অর্থনীতির অঙ্গণে সুপরিচিত। সে নিউইয়র্কে ইউএনডিপিতে উচ্চপদে কর্মরত। আমার মেয়েও ওই খানে থাকে আর এই মেয়েও ফ্রিল্যান্স গবেষক হিসেবে ইউএনডিপির সঙ্গে কাজ করে। আর ছোট মেয়ে মস্কো থেকে গাইনোকলজিতে পিএইচডি করেছে। বাংলাদেশে ফিরে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরি নেয়। সাত আট মাস পরে সে ঐ চাকুরী ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দিয়ে সে নিজের উদ্যোগে এখন দক্ষিণ বাংলার গ্রামাঞ্চলে ক্লিনিক স্থাপন করেছে। একটা নার্সেস ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করেছে। ঐখানে কাজ করে। এই হলো তিন মেয়ের পরিচয়।

বেবী মওদুদ: তো আপনার কি মূল্যায়ণ আপনার মেয়েদের সম্পর্কে ?

কবীর চৌধুরী: মেয়েদের জন্য আমি গর্ববোধ করিতো বটেই এবং আমি অত্যন্তু সুখী এইদিক থেকে যে ওরা সবসময় আমার সঙ্গে নানা বিষয় আলোচনা করে। বড় মেয়ে তো স্বাভাবিক কারণেই। ইংরেজীর অধ্যাপক আমি। কিন্তু আর দুই মেয়ের ইংরেজীর সঙ্গে যোগ না থাকলেও আমার দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে এবং আমি যে তাদের মতে একজন ভাল মানুষ এই অনুভূতি থেকে আমরা খুব কাছাকাছি আছি।

বেবী মওদুদ: আপনার কাছে আমরা অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর কথা শুনতে চাই। মুনীর চৌধুরীকে আজকের প্রজন্মের অনেকেই দেখে নি। কিন্তু তার কথা অনেকেই জানে, শোনে এবং তার লেখা বইও পড়ে। কিন্তু তিনি তো একাত্তর সালে অন্য কোথা চলেও গেলেন না, এখানেই থেকে গেলেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। এটাতো একটা ট্রাজিক ঘটনা, মুনীরকে হারানো। মুনীরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক এসেছে পশ্চিম বাংলা থেকে। বাংলাদেশের কিছু অনুরাগীজন যারা তার সম্পর্কে চিন্তিত ছিল। ওরা তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন বার বার। ওর ছেলে ভাষণ চলে গিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ও গেল না। ঠিক কেন বলতে পারবো না। কয়েকটি কারণ অবশ্য বোঝা যায়। সে মাকে ছেড়ে যেতে চায়নি নিজের নিরাপত্তার জন্য। আর তখন পর্যন্তু তো বুদ্ধিজীবী নিধন শুরুও হয়নি কাজেই ঐ রকম যে একটা বাস্তব আশঙ্কা সেটাও সে বুঝতে পারে নি। এসব কারণে ও যায়নি। আর তার ক্ষতি অপুরনীয়। তুমি ওর কথা জিজ্ঞেস করলে, আমার স্মৃতি সম্পর্কে। ছোট বেলার অনেক স্মৃতি আছে আমার। আমরা পিঠাপিঠি ভাই ছিলাম। কতো গল্প হতো। ওর তো নাটকের দিকে ঝোঁক ছিল। নতুন নাটক লেখার পরে আমাদের বাড়ীতে চলে আসত। সকলে গোল হয়ে বসতাম। তারপরে নাটক পড়ে শোনাত। আর ও যখন বিদেশে ছিল তার কিছু খুব সুন্দর স্মৃতি আছে। যখন ভাষাতত্ত্ব নিয়ে হার্ভার্ডে পড়াশুনা করছে, সেই সময় আমি এবং আমার স্ত্রী ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে অন্য একটা প্রোগ্রামে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। তখন বোস্টনে ওর বাড়িতে আমরা গিয়েছি। অনেক কথা হয়েছে, গল্প হয়েছে। বোস্টনের চার্লস নদীর পাশ দিয়ে আমরা হেঁটে যেতে যেতে নানা কথা বলেছি। সেই সময় মুনীর ইউজিন ওনীলের ‘লঙ্গ নাইটস জার্নি ইন্টু নাইট’ নাটকটি আমাকে উপহার দিয়েছিল। দিয়ে বলেছিল, একটা অসাধারণ নাটক। কোন একসময় আপনি যদি অনুবাদ করেন তাহলে খুব ভাল হবে। আমি সেটা অনুবাদ করেছি। প্রায় দশ বছর পরে।

বেবী মওদুদ: তো মনীর চৌধুরী একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমি দেখেছি, তখন ঢাকা ইউনিভারসিটির ছাত্রী ছিলাম। স্যারের ক্লাসের লেকচার শোনার জন্য নির্দিষ্ট ছাত্র ছাড়াও অন্যান্য বিভাগের ছাত্ররাও এসে বসে থাকতো।

কবীর চৌধুরী: ওর বাচন ভঙ্গি অসাধারণ ছিল। পরবর্তী সময় ওর ছাত্রদের কেউ কেউ ওর ধারাকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে। যেমন মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল। মুনীরের গলা খুব অসাধাণর সুরেলা বা সুমিষ্ট ছিল না। বরং একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা ছিল। কিন্তু বলার ভঙ্গি এবং বিষয়ের উপর অধিকার অসামান্য ছিল। আর একটি জিনিশ, বাংলার অধ্যাপক, কিন্তু প্রথমে সে ইংরেজীতে এম. এ. করেছিল। চমৎকার ইংরেজী লিখতো ও বলতো। বাংলায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট পেল জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে। তখন তো ভাষা আন্দোলন চলছিলো।

বেবী মওদুদ: তিনি তো ‘কবর’ নাকটটাও জেলে বসে লিখেছিলেন।

কবীর চৌধুরী: তারও ইতিহাস খুব চমৎকার। রনেশদা, অর্থাৎ রণেশ দাশগুপ্ত। তিনিও তখন কারাবন্দি। তিনি মুনীরকে অনুরোধ করেন: ‘ভাষা আন্দোলনের ওপর তুমি একটা নাটক লেখ এবং এমনভাবে লেখ যাতে আমরা কারাগারে থেকে তা অভিনয় করতে পারি।’ সে তো তোমাদের মনে আছে। আধো অন্ধকার। টিম টিমে আলো, একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। চটের কাপড় দিয়ে মঞ্চ সাজানো হয়। কারাগারেই ‘কবর’ অভিনীত হয়েছিল। তার পর থেকে আজ পর্যন্তু বাংলাদেশের সর্বাধিক সংখ্যক অভিনীত নাটকের নাম যদি করা যায় তাহলে সেটা ‘কবর’ই হবে। সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, ঢাকা শহরে, নিয়মিতভাবে কবর অভিনীত হয়। আর মুনীরের রুপান্তর বা অনুবাদের কাজও অসামান্য। ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ শেক্সপিয়ারের অসাধারণ অনুবাদ। গলসওয়ার্থের ‘রুপার কৌটা’ও মুনীর রুপান্তর করেছে। তার প্রতিভা ছিল বহুমুখী। গবেষণামুলক কাজে মীর মোশারফ হোসেনের ওপর তার লেখা এবং ‘তুলনামুলক সাহিত্য’ প্রভৃতি খুব বড়ো মাপের কাজ। আমাদের দেশে তো তখন পর্যন্তু কমপারেটিভ লিটারেচার নিয়ে খুব বেশী লেখা হয় নাই। মুনীরই তার পথিকৃত। তার প্রতিভা ছিল বিভিন্ন মুখী। তার উদ্ভাবিত টাইপ রাইটার, ‘মুনীর অপটিমা’ নামে, তাও ছিল একটি অসামান্য কাজ। মুনীরকে হারাবার ক্ষতি পুরণ হয় নি। হবারও নয়।

বেবী মওদুদ: আপনাদের পরিবারেই শুধু নয় এটা আমাদের সমাজে, আমাদের শিল্পে, আমাদের সাহিত্যে, আমাদের দেশের জন্য খুব বড় ক্ষতি হলো।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, খুব বড় ক্ষতি হলো। আর খুব বড় করে আমাদের বুকে বাজে, সে ওই কাজগুলো করেছে শত প্রতিকূলতার মুখে। আজকে তো খুব অনুকূল অবস্থা ঐ ধরনের কাজ করার জন্য। এই সময় ও আমাদের মধ্যে থাকলে আরো কত কাজ করতে পারতো।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই এইযে বর্তমান সরকার, এ সরকারতো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সরকার, গণতান্ত্রিক সরকার। এই সরকারের কাছে আপনার ব্যক্তিগত কোনো প্রত্যাশা আছে?

কবীর চৌধুরী: আমার প্রত্যাশা তো অনেক এবং আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় কোনরকম খাঁদ নেই। তিনি সত্যিই চান যে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাক। কিন্তু নানা রকম বাধা আছে, নানা রকম প্রতিকুলতা আছে। সেগুলো জয় করতে হবে। একটা পদক্ষেপ নিবেন বলে তিনি কড়া ভাষায় বলেছেন। আমাকে যেটা পীড়া দেয় সেটা হচ্ছে যে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল তাদের অনুগামী যে সব অঙ্গ সংগঠন আছে তাদের ছেলেরা টেন্ডারবাজী চাঁদাবাজী ইত্যাদি করছে।

বেবী মওদুদ: শেখ হাসিনা এসব বন্ধ করতে বলেছেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। তিনি এ বিষয় সচেতন এবং তিনি বলেছেন যে, এটা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। কোন ছাড় দেওয়া হবেনা। আমার আশা তার এই কথা বাস্তবায়িত হবে।

বেবী মওদুদ: এখন অনেক জায়গায় হচ্ছেও।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, কিছু বাস্তবায়িত হচ্ছে। শেখ হাসিনার উদ্যোগের আর একটা দিক আছে যা প্রশংসনীয়। তা হচ্ছে তরুণ নেতাদের সামনে নিয়ে আসা। এই কাজগুলো হচ্ছে। আরেকটা কথা বলি। আগেও অবশ্য এটা ছিল। বৃদ্ধ, বয়স্ক, নিঃস্ব, বিধবা এদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা। এর উপর জোর দিবেন তিনি। এগুলোতে আমরা খুবই আশান্বিত বোধ করছি। আর দুঃখ হয় যে, বিএনপি বা অন্য বিরোধী দলগুলো মনে হয় শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করছে। তাদের কার্যকর সত্যিকার কোন ইতিবাচক প্রোগ্রাম নেই। এটা খুবই দুঃখজনক।

বেবী মওদুদ: কবীর ভাই আর একটি বিষয় জানতে ইচ্ছে করে আপনি কখনো বাজারে গিয়েছেন। বাজার করতে মানে শাক-সব্জি, চাল, ডাল, তেল, নুন ইত্যাদি কিনতে Ñ

কবীর চৌধুরী: না। এদিক দিয়ে আমি ছিলাম খুবই অকেজো।

বেবী মওদুদ: সবচেয়ে কমদামে চাল কখন খেয়েছেন মনে আছে ? বাজারে কি আপনি কোন দিন
যান নি ? মুনীর স্যারতো সাইকেল চালিয়ে নিউমার্কেটে বাজার করতে যেতেন।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ। মুনীর বেশ বাজারে যেত। কিন্তু আমার ঐ অভ্যাস কখনই হয়নি।

বেবী মওদুদ: কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের এই অভ্যাসটা থাকা ভাল। আপনি কি মনে করেন?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, ভালো। ভালো তো বটেই। আমার মনে হয় বাজারে যাওয়া দরকার। কিন্তু কোন কারণে, যাই হোক, আমার সেটা হয়নি। মুনীর উপভোগ করতো বাজারে যাওয়াটা। নুতন কোন জিনিস উঠলে কিনে নিয়ে আসতো। তখন আমরা ধানমন্ডি হাতিরপুলের বাড়ীতে থাকতাম। তার ছেলে ভাষনকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে চলে আসতো।

বেবী মওদুদ: আপনি তো জীবনে অনেক বই পড়েছেন, সংখ্যা হয়তো মনে নেই যে, কত বই পড়েছেন। তো কোন বইটা আপনার বার বার পড়তে ইচ্ছে করে।

কবীর চৌধুরী: বাংলা বইয়ের মধ্যে আমি বলবো ‘গোরা’ আমাকে বার বার পড়তে টানে। বার বার আকর্ষণ করে লেখার ভঙ্গির জন্য এবং সেখানে পরিবেশিত জীবন দর্শনের জন্য। বিশেষ করে আনন্দময়ী চরিত্রের জন্য। এক অসাধারণ চরিত্র। ‘গোরা’ পড়তে বার বার ইচ্ছে করে। আর বিদেশি বইয়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বই একাধিকবার পড়তে ইচ্ছে করে। পাস্তারনাকের ‘ড: জিভাগো’, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ রোমা রঁল্যার ‘জাঁ ক্রিস্তফ’, টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’, ফ্লবেয়ারের ‘মাদাম বোভারি’Ñএতো বার পড়া সত্বেও আবারও পড়তে ইচ্ছে করে। তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক কালের দিকে যদি তাকাই দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়েৎজির একটি বই আছে, ‘লাইফ এ্যান্ড টাইম্্স অব মাইকেল কে’। আমি বাংলায় নাম দিয়েছি ‘অবিস্ম^রণীয় মাইকেল কে’। একটু নাম বদলে দিয়েছি আমি। বইটা একাধিকবার পড়তে ইচ্ছে করে। ওই বইয়ের মূল জিনিস হচ্ছে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষ সহিষ্ণুতা, মনোবল এবং ভালবাসা দ্বারা সব জয় করতে পারে। এইটাই প্রধান। আমি ওটা বাংলায় অনুবাদও করেছি।

বেবী মওদুদ: তাহলেতো এই বইটা নিশ্চয়ই আপনার খুব প্রিয় বই।

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ।

বেবী মওদুদ: তো আপনি আজকের যে প্রজন্ম, নতুন তরুণ যারা আসছে আমাদের ভবিষ্যতে, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

কবীর চৌধুরী: আমি উপদেশ দেওয়ায় বিশ্বাস করি না। তবে তাদের সাথে কথা বলতে ভাল লাগে এবং তাদের সঙ্গে কথা বললে আমি যে কথার উপর জোর দেব তার একটা হচ্ছে যে সততাটা খুব দরকার। পরিশ্রম দরকার। ফাঁকি দিয়ে বড় কিছু পাওয়া যায় না। আমাদের এখানে অনেকেই খুব দ্রুত সাফল্য চায়। কিন্তু পরিশ্রম করতে হবে। ধৈর্য রাখতে হবে এবং সৎ থাকতে হবে।

বেবী মওদুদ: এটা এক নাম্বার ?

কবীর চৌধুরী: হ্যাঁ, এটা খুবই দরকারি। আর পড়াশুনা করতে হবে। একসময় তো তরুণরা বেশ পড়তো। আমাদের সময় যখন আমরা ছিলাম ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি, মনে আছে আমরা কত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। কিন্তু এখন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাদের নিজেদের পড়ার বিষয় ছাড়া আর কোন বিষয়ে তেমন আলোচনা হয় না। হয়তো ফিল্ম-এর কথা কিছু হতে পারে, ইন্টারনেটে দেখে। কিন্তু সিরিয়াস কথাবার্তা বলার জন্য তো পড়াশুনা করতে হবে, গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখাও পড়তে হবে। তুমি গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা বই ক’জন যুবক ক’টা পড়েছে। হাসান আজিজুল হকের বই ক’জন ক’টা পড়েছে ? এগুলোতো পড়া দরকার।

বেবী মওদুদ: তো কবীর ভাই, আপনাকে কষ্ট দিলাম, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সবার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই কৃতজ্ঞতা জানাই যে আপনি আমাদেরকে দীর্ঘ সময় দিয়েছেন। আমাদের সাথে কথা বলেছেন। আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে আপনার কথাগুলো। কারণ আপনার জীবনের যে অভিজ্ঞতা সেটা একটা বিরাট অভিজ্ঞতা এবং সেটা আমাদের কাছেও অত্যন্ত মূল্যবান। আমাদের জীবনে এটা অনুসরণ করা, একটা আদর্শ একটা নীতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া খুব দরকার।

কবীর চৌধুরী: তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমার সঙ্গে তো আমার দীর্ঘ দিনের পরিচয়। তোমার বাবাকে চিনতাম আমি।

বেবী মওদুদ: আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এখানেই শেষ করছি।

read more

Monday, February 20, 2012

গুরুত্বপূর্ন এক সাক্ষাৎকার- ওডেস্কে বাংলাদেশ চতুর্থ: ম্যাট কুপার।

by বোরহান উদদীন



ইন্টারনেটে তথ্যপ্রযুক্তির আউটসোর্সিং কাজ পাওয়ার একটা বড় জায়গা বা অনলাইন মার্কেট প্লেস হলো ওডেস্ক। বিশেষ করে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মুক্ত পেশাজীবী বা ফ্রিল্যান্সার ওডেস্ক থেকে কাজ নেন, সেটা সম্পন্ন করেন এবং গ্রাহককে জমা দেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ই-এশিয়া মেলা উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন ওডেস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট অব অপারেশনস ম্যাট কুপার। ঢাকায় তিনি ই-এশিয়ায় একটি এবং এর প্রাক্কালের বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) আয়োজিত কয়েকটি সেমিনারে বক্তব্য দেন। মার্কিন নাগরিক ম্যাট কুপার অর্থনীতিতে স্নাতক। পরে তিনি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ১৯৯৮ সালে তিনি জেপি মরগানে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০২ সালে নিজে আউটসোর্সিংয়ের কাজ শুরু করেন। ২০০৭ সালে তিনি ওডেস্কে যোগ দেন। ঢাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয় আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ১ ডিসেম্বর বেসিস কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পল্লব মোহাইমেন
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং কাজের সঙ্গে জড়িত বা এ কাজে আগ্রহী, তাঁদের কাছে ওডেস্ক খুব পরিচিত এক নাম। ওডেস্ক সম্পর্কে কিছু বলুন।

ম্যাট কুপার: ওডেস্ক হলো একটি গ্লোবাল মার্কেট প্লেস। ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এর যাত্রা শুরু হয়। ইন্টারনেটভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি পেশাজীবী এবং কাজদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেতুবন্ধ ঘটিয়ে দেয়। অনেক কাজ আছে, যেগুলো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে করা যায় না। যদিও করানো যায় তবে তার খরচ অনেক বেশি পড়ে এবং কখনো কখনো সময়ও বেশি লাগে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তখন ওই কাজগুলো বাইরে থেকে করিয়ে নেয়। এটাই হলো আউটসোর্সিং। যেসব দেশে শ্রমমূল্য অপেক্ষাকৃত কম, সেসব দেশের পেশাজীবীরা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজগুলো করে দেন। ভৌগোলিক কারণেও অনেক সময় অন্য দেশ থেকে কাজ করালে সুবিধা পাওয়া যায়। ওডেস্কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাজগুলো তুলে ধরে। পেশাজীবীরা সেই কাজ করে দেওয়ার জন্য নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেন। পোর্টফোলিও দেখে প্রতিষ্ঠান তখন তাদের কাজটা পেশাজীবীকে দিয়ে দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ জমা দিলে পারিশ্রমিকের অর্থ পাওয়া যায়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে ওডেস্কের ওয়েবসাইটে। ওডেস্ক প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী দুই পক্ষের জন্যই বড় একটা জানালা খুলে দেয়।

কতটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ওডেস্কের মাধ্যমে আউটসোর্স করাচ্ছে, আর কতজন পেশাজীবীই বা কাজ করছেন?
ম্যাট কুপার: দুই লাখ ৫০ হাজার কোম্পানি ওডেস্কে তাদের কাজ দিচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমানে ১৮ লাখ পেশাজীবী ওডেস্কে আউটসোর্সিং কাজের জন্য নিবন্ধিত। অনলাইন মার্কেট প্লেসের যে বাজার আছে, তার ৫৫ শতাংশ এখন ওডেস্কের দখলে।

ওডেস্কের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী?
ম্যাট কুপার: কাজ করার পর পারিশ্রমিক বা অর্থ পাওয়ার গ্যারান্টি আমরা দিই। আবার কোম্পানিকেও এ গ্যারান্টি দিই যে তাদের কাজ নির্ধারিত সময়ে চুক্তিমতোই সম্পন্ন করবেন আমাদের নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সাররা। একজন ফ্রিল্যান্সার কাজ পাওয়ার পর সেই কাজ সাধারণত ৩০, ৬০ ও ৯০ দিনে শেষ করবেন, কোম্পানির সঙ্গে এমন চুক্তি হয়ে থাকে। সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করলেই ফ্রিল্যান্সার তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পারিশ্রমিকের টাকা পেয়ে যান।

এখন কোন কোন দেশ ওডেস্কে কাজের দিক থেকে এগিয়ে আছে?
ম্যাট কুপার: আমাদের সাইটে আউটসোর্সিংয়ের কাজে শীর্ষস্থানে এখন আছে ফিলিপাইন। এর পরই আছে ভারত। তৃতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্র, চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। পঞ্চম স্থানটি পাকিস্তানের দখলে।
তাহলে তো বলতে হয়, ওডেস্কে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো।
ম্যাট কুপার: অবশ্যই। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা খুব ভালো কাজ করছেন, দ্রুত তাঁদের উন্নতি হচ্ছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কাজ পাওয়ার হার উল্লেখ করার মতো কিছু ছিল না। মাত্র দুই বছরে ওডেস্কে বাংলাদেশ শীর্ষ তালিকার চতুর্থ স্থানে উঠে গেছে। এটা খুব বড় ধরনের উন্নতি।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা কী ধরনের কাজ বেশি করেন?
ম্যাট কুপার: সবচেয়ে বেশি যে কাজটি হয়, সেটি হলো সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও)। এর পরই আছে ডেটা এন্ট্রি, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি।

ওডেস্কে কি শুধু তথ্যপ্রযুক্তির আউটসোর্সিং কাজ পাওয়া যায়?
ম্যাট কুপার: না। অন্যান্য কাজও আছে ওডেস্কে। এখানে মোটামুটি ৫৫ শতাংশ কারিগরি কাজ এবং ৪৫ শতাংশ সাধারণ কাজ থাকে।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটা বড় সমস্যা হলো কাজ করে পাওয়া টাকা দেশে নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসা। এ কারণে তাঁদের একটা প্রধান দাবি হলো বাংলাদেশে পেপ্যাল সেবা চালু করা। এ ব্যাপারে আপনি কী ভাবেন?

ম্যাট কুপার: বিদেশ থেকে অনলাইন পেমেন্ট সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের সেবা চালু আছে। এর মধ্যে পেপ্যাল, পেপেইড ইত্যাদি সেবা আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে আছে। এই সেবা থাকলে অর্থ দ্রুত এবং সহজে পাওয়া যায়। পেপ্যাল বাংলাদেশে চালু হলে তা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সুবিধাজনক হবে। আমরা ওডেস্ক থেকে ২০১২ সালের মধ্যে মুঠোফোনে কাজের বিনিময়ে পাওয়া অর্থ পাঠানোর সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এটা হলে অনেক সুবিধা হবে বলে মনে করছি।
নবীন ফ্রিল্যান্সারদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

ম্যাট কুপার: শুরুটা করে দিতে হবে। প্রথমে একজন গ্রাহক, তারপর আরেকজন। এভাবে কাজ বাড়তে থাকবে। আউটসোর্সিংয়ের জন্য অনলাইন যোগাযোগটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পোর্টফোলিওটা ভালো হতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে। একবার কোনো কাজ সময়মতো ও সঠিকভাবে করতে না পারলে পরবর্তী সময়ে ওই ফ্রিল্যান্সারের কাজ পেতে সমস্যা হবে। এ জন্য খুব বেশি স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিটি কাজ করে যেতে হবে।
original post
read more

Wednesday, January 25, 2012

মিয়া মোহম্মদ আদেল এর সাক্ষাৎকার

by তারছিড়া..

মিয়া মোহম্মদ আদেল, তার জন্ম বাগাতীপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের ভিতরভাগ গ্রামে। তিনি জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। আজ তিনি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ আরকানসাস এ ফিজিক্স প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন, পাশাপাশি তিনি নাসা মহাকাশ গবেষণা সাথে জড়িত।




মিয়া মোহম্মদ আদেল, তার জন্ম বাগাতীপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের ভিতরভাগ গ্রামে। তিনি জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। আজ তিনি আমেরকিার ইউনিভার্সিটি অফ আরকানসাস এ ফিজিক্স প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন, পাশাপাশি তিনি নাসা মহাকাশ গবেষণা সাথে জড়িত। সম্প্রতী তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং কথা বলেছেন আমারপুঠিয়া ডট কমের সাথে।

আমার পুঠিয়াঃ আপনার পুরো নাম?


ড. আদেলঃ আমার পুরো নাম মিয়া মোহম্মদ আদেল।



আমার পুঠিয়াঃ আপনার জন্মস্থান?



ড. আদেলঃ আমার জন্ম নাটোরের বাগাতীপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের ভিতরভাগ গ্রামে।





আমার পুঠিয়াঃ আপনার শিক্ষাজীবন?



ড. আদেলঃ ছোটবেলায় আমি পড়াশুনা করতে চাইতাম না, স্কুলে যেতাম না এই জন্য একদিন আমার বাবা আমাকে ভীষণ প্রহার করেছিলেন, তখন থেকে আমি স্কুলে যাই, সেটা ছিল ভিতরভাগ প্রাইমারী স্কুল, সেখানে আমি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশুনা করি। এই স্কুলটা আমার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন্, তিনিই ছিলেন আমার জীবনে পড়াশুনার অনুপ্রেরণা। তারপর আমি ১৯৬০ সালে পুঠিয়া পি.এন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হই। তখন সহির স্যার মাত্র পুঠিয়া পি.এন উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।সে সময় ছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময়, তখন ফাইনাল পরীক্ষা জানুয়ারীতে না হয়ে জুন মাসে অনুষ্ঠিত হত।যার ফলে আমাকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতেই দেড় বছর থাকতে হয়। তখন পুঠিয়া পি.এন উচ্চ বিদ্যালয় ছিল এখন যেখানে ব্যাংক হয়েছে সেখানে।তারপর যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন পুঠিয়া পি.এন উচ্চ বিদ্যালয় স্থানান্তর হয়ে বর্তমানে যে স্থানে আছে চলে আসে, সে সময় স্কুল নির্মাণের ইটগুলো আমরাই ছাত্ররা বহন করি, সবচেয়ে বেশি যে বহন করতে পারত তাকে মিষ্টি খেতে দেওয়া হত। তারপর ১৯৬৬ সালে আমি এস. এস. সি পাশ করি।
তারপর ১৯৬৬ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই রাজশাহী কলেজে।সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করি।তারপর আমি রাজশাহী বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আমার অনার্স পরীক্ষার সাল ছিল ১৯৭১ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে গিয়ে ১৯৭২ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হয়।তারপর সেখানেই এম.এস.সি সর্ম্পূণ করি ১৯৭৪ সালে।





আমার পুঠিয়াঃ আপনার প্রিয় শিক্ষক কে?


ড. আদেলঃ আমার সবসময়ের প্রিয় শিক্ষক হল পুঠিয়া পি. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সহির স্যার।



আমার পুঠিয়াঃ আপনার কর্মজীবন সর্ম্পকে বলুন



ড. আদেলঃ এম.এস.সি পাশ করার পর চলে যাই ঢাকায় চাকুরীর আশায়, সেখানে এটভিক এ্যানার্জী সেন্টারে কাজ শুরু করি। কাজ করারত সময় অনেকই আমাকে হায়ার করার কথা বলত কিন্তু করত না। এদিকে আমি বিভিন্ন বিশ্ব-বিদ্যালয়ে চেষ্টা করছিলাম চাকুরীর জন্য, তখন ঢাকা মোহম্মদপুরে এক বাসায় থেকে টিউশনি করতাম সেটা অনেক কঠিন একটা জীবন ছিল ওখানে ২টা মেয়েকে পড়াতাম। সকালে তাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে তাদের পড়াতে হত আবার বিকেল বেলাতে পড়াতে হত। তারপর একদিন নামাজ পড়ার পর খবর পাই যে আমার বাসায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল চিঠি পাঠিয়েছে সেখানে চাকুরী করার জন্য, তারপর আমি ১৯৭৫ সালে রাজশাহী চলে আসি এবং চাকুরীতে যোগদান করি।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট এ। এখানে আমি সাড়ে তিন বছরের মত চাকুরী করি। তারপর আমি চলে যাই আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুতে ও.এস.সি করার জন্য। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক খারাপ ছিল বলে নিরাপদে ছিলাম না। তাবে সেখানে কাজ করার বিনিময়ে যা পেতাম সেটা পর্যাপ্ত না হওয়ার কারণে পাশাপশি আমাকে প্রাইভেট টিউশনি করতে হত। আর পাশাপশি আমেরিকায় পি.এইচ.ডি করার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতাম। ২ বছর না যেতেই আমি আমেরিকার লুইাজয়ানা ইউনিভাসির্টি, ওয়াহেস্ট ইউনির্ভাসিটি, ও জর্জটাইন ইউনির্ভাসিটি এই ৩ টাতে একসেপ্ট হই। কিন্তু কোনটাতে যাবো এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই। এই জন্য পরমর্শের জন্য যাই আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুতের এক লাইব্রেয়িনের কাছে, তিনি ছিলেন একজন আমেরিকান। তিনি আমাকে লুইজিয়ানা ইউনিভাসির্টিতে যাবার জন্য পরামর্শ দেন। তার কথামত আমি সেখানে যাই। সেখানে পি.এইচ.ডি করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। তবে পি.এইচ.ডি নিয়ে কিছু ঘটনা আছে, সেটা হল যে বিষয়ে পি.এইচ.ডি করা হবে তার উপর একটি রিটেন পরীক্ষা দিতে হয়। যাইহোক, আমি পরীক্ষা দিলাম কিন্তু রেজাল্ট আসল যে আমি ফেল করছি, সেটা দেখে খুব খারাপ লাগল এত পড়াশুনা করলাম তার পরও ফেল করলাম এই জন্য। আমার সাথে এক স্প্যানীশ এক ভদ্রলোক ছিল সে এক পোস্টডগের কাজ করত, পোস্টডগ হল পি.এইচ.ডি শেষ করেছে কিন্তু কিছু জানার জন্য কোন প্রফেসরের অধীনে কাজ করা। তো সে এক প্রফসরের কাছে আমার কথা বলে। তো তিনি আমাকে বলেন যে, আমার পেপারগুলো দেখতে, তো আমি গিয়ে দেখলাম যেখানে আমার পুরো নাম্বার পাওয়ার কথা সেখানে আমি পেয়েছি জিরো।তখন আমি পেপারগুলো নিয়ে পরীক্ষা কমিটির চেয়্যারম্যান এর কাছে গেলাম, তিনি আমাকে পাঠালেন ফিজিক্স বিভাগের প্রধানের কাছে তিনি আমার পেপার দেখে বললেন যে আমি সব ঠিক লিখেছি সব ঠিক আছে। তখন আবার কমিটির মিটিং বসে এবং আমাকে চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে আমি পাস করেছ্ যেটা ছিল ঐ বিশ্ব-বিদ্যলয়ের একটি ইতিহাস।

এরকম আবার ঘটে, একটা ইংরেজী পরীক্ষা দিতে হয় সেটা দেওয়ার পরও আমার রেজাল্ট ফেল আসে। আবার পেপার চেক করে দেখি আমার নাম মোহাম্মদ আর ইরানী একজন ছিল যার নাম মেহেরাব। তো দেখা যায় মোহাম্মদ এর নাম্বার দিয়েছে মেহেরাব কে আর মেহেরাবের নাম্বার দিয়েছে মোহাম্মদকে। আমি যে প্রফেসরের অধীনে পি.এইচ.ডি করছিলাম সে অনেক কড়া ছিল, প্রায় ২৪ ঘন্টা খাটিয়ে নিত। কিন্তু তারপরও অনেক বড় বড় চিঠি দিত প্রগ্রেস ঠিকমত হচ্ছে না, আমি তোমাকে রাখতে পারব না এই ধরনের বার্তাসহ দিয়ে। সেই চিঠি গুলো আমি রেখে দিয়েছি এখনো আমার কাছে আছে। সেখানে ডিগ্রী পেতে হলে একটি রিচার্স করে আর্টিকেল লিখতে হবে, এবং সেটা অরজিনাল একটি বিষয়ের উপর এবং পাবলিশ করতে হবে।কিন্তু আর্টিকেল লিখলাম এবং পাবলিশ করলাম এবং কিছুটা রদবদল করার জন্য প্রফেসরের সাহায্য নিয়ে পুনরায় পাবলিশ করা হল। কিন্তু ২বার পাবলিশ করার পর দেখলাম আর্টিকেল এ আমার নাম সেকেন্ড রাইটার হিসেবে দেয়া হয়েছে। আমার প্রফেসরের কাছে যাই সে নানরকম যুক্তি দেখায়, তারপর ডির্পার্টমেন্টের অন্য প্রফেসরের কাছে যাই কিন্তু তারা অন্যর বিষয়ে নাক গলাতে চায় না। এমন একটা পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়ে যায় যে, তারা বলে আমি ডিগ্রী চাই না ফাইট করতে চাই। শেস পর্যন্ত আমি আর ফাইট না করে ডিগ্রীটাই গ্রহন করেছিলাম।

তারপর বিভিন্ন জায়গায় চাকুরীর চেষ্টা করি, ইউনিভার্সিটি আরকানসাস থেকে একটি চাকুরী পোস্ট ফাকা হওয়ায় কারণে তারা আবেদন আহ্বান করে, আমি আবেদন করে সেখানে এবং চাকুরীতে যোগদান করি ১৯৮৮ সালে। এবং এখন পর্যন্ত সেখানেই আছি।



আমার পুঠিয়াঃ আমরা জানি আপনি মহাকাশ নিয়ে কিছু গবেষণা করেছেন..



ড. আদেলঃ হ্যা আসলে আমার পিএইচডি শেষ করার পর আমি বিরাট অংকের একটি গ্রান্ড পাই, সেটা নিয়ে আমি জাপানী এক গবেষকের সাথে কিছু দিন স্পেস বা মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করি প্রায ৪ বছর। তারপর দেশে আসি বেড়াতে। ঝলমলিয়া নদীতে দেখি পানি শুকিয়ে গেছে, কিন্তু আগে যখন স্কুলে যেতাম মাঝি পার করে দিত এপার ওপার এবং বছরে নয় মাসই এমন করতে হত । এই নদী দিয়ে প্রায় ৫০-৬০ নালা গেছে বিলের ভিতর কত পানি দেখেছি।এই পানিগুলো শুকিয়ে গেছে কিন্তু পানির যে একটি ভূমিকা ছিল সেটা কিন্তু কেউ তলিয়ে দেখছে না। এই বিষয়টা আমার ভিতর একটি চিন্তা তৈরী করে। তারপর থেকে এর উপর একটি গবেষণা শুরু করি আমি, পানির যে একটি ভূমিকা, নদী শুকিয়ে যায়, বিল শুকিয়ে যায়, যখন পানির প্রাচুর্য থাকে তখন আমাদের কি থাকে, কি হয়, আর যখন পানির অভাব হয় তখন কি হয়। ওদিকে মহাকাশের বিষয়ে গবেষণা করছি আর এদিকে পরিবেশের উপর গবেষণা করছি একটা সময় দেখি একটা আরেকটার সাথে জড়িত।তো এভাবেই গবেষণা চলতে থাকে।আর পাশাপশি শিক্ষক হিসেবে তো কাজ করছি।



আমার পুঠিয়াঃ আপনার লেখা বা প্রকাশিত কোন বই আছে?



ড. আদেলঃ কয়েকটা মনে হয় লিখেছিলাম, যখন এখানে পানির উপর গবেষণা করছিলাম তখন এখানে গরম বেশি আর ঐখানে ঠান্ডা বেশি এর উপর লিখেছিলাম একটি বই।নাম ছিল বাংলাদেশের চরমাভাবাপন্ন আবহাওয়া প্রসঙ্গে। তারপর কিছু ম্যানস্ক্রিপ্ট লেখা আছে যেগুলো প্রকাশিত হয় নাই। তবে এবার চেষ্টা করব সবগুলো প্রকাশের।



আমার পুঠিয়াঃ এখন পর্যন্ত আপনার অর্জিত সম্মানান বা পুরস্কার



ড. আদেলঃ ঐখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছিলাম বেস্ট রিচার্স আর বেস্ট গবেষক হিসেবে।ন্যাশনাল একটা এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম ঐখান্। আর ঐখানকার সিটি মেয়র একটি পুরস্কার দিয়েছিল যেটার নাম ছিল “কী অফ দি সিটি”। এরকম আরো অনেকগুলো আছে। আর ভ্যাটিকান সিটি স্টেট এ একবার একটি স্কলারশীপ দিয়েছিল ১৯৮৬ সালে সারা বিশ্বের ১৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে। আমি তাদের ভিতর একজন ছিলাম।



আমার পুঠিয়াঃ আমরা তো জানি আপনি নাসার সাথে জড়িত



ড. আদেলঃ আসলে মূল ব্যাপারটা হল আমি নাসার সাথে সরাসরি জড়িত না, মাহাকাশ নিয়ে আমি গবেষণা করি তাই সবাই একথা বলে।



আমার পুঠিয়াঃ আপনি কি এখনো মহাকাশ গবেষণার সাথে জড়িত



ড. আদেলঃ হ্যা এখনো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমি গবেষণা করছি।এখন এমন হয়ে গেছে ব্যাপারটা মাটির নীচ থেকে মাটির উপর সব বিষয়গুলোই আমার গবেষণার ভিতর চলে এসেছে।




আমার পুঠিয়াঃপুঠিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্যকে নিয়ে তৈরী ওয়েব সাইট আমারপুঠিয়া ডট কম সর্ম্পকে আপনার কি অভিমত



ড. আদেলঃ আসলে যখন আমার ছোট ভাই আমাকে এই ওয়েব সাইটের কথা জানালো, যখন আমি প্রথম দেখলাম তখন আমার খুব ভালো লেগেছে। পুঠিয়া একটি সম্পদ বাংলাদেশের এই সম্পদটাকে এর আগে কেউ এভাবে তুলে ধরে নাই, কিন্তু পুঠিয়ার কিছু ছেলে এই কাজটি করেছে, পুরো পুঠিয়াকে আজ বিশ্ববাসীর দরবারে তুলে ধরেছে সেইজন্য আমি তাদের অভিনন্দন জানাই।



আমার পুঠিয়াঃ পুঠিয়ার উন্নয়ন কিভাবে করা যায় বলে আপনি মনে করেন




ড. আদেলঃ আসলে পুঠিয়ার একটি ইতিহাস আছে, আছে ঐতিহ্য, এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ভিতর অন্যতম। পুঠিয়া ছিল বারো ভূইয়ার এক ভূইয়ার রাজধানী। এখানকার কিছু দালান আজ ধ্বংসের পথে যে বড় বড় দীঘি আছে সেগুলো প্রায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে, আচ খুবই দরকার এসব সম্পদকে রক্ষা করা। আমি আশা করব অতি সত্ত্বর প্রত্নতত্ত্ব আইন মেনে অনতিবিলম্বে পুঠিয়ার এই অমূল্য সম্পদ রক্ষার জন্য সংস্কার শুরু হবে।



আমার পুঠিয়াঃ আপনার এত ব্যাস্ত সময়ের ভিতর কিছু সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ



ড. আদেলঃ আপনাদেরও অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি আশা করব আমারপুঠিয়া ডট কম পুঠিয়ার সম্পদ রক্ষা করার ক্ষেত্রে গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ধন্যবাদ
original post
read more

Wednesday, January 4, 2012

মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের থাকা ও না থাকা

by ব্রাত্য রাইসুঅদিতি ফাল্গুনী

[১৬ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে আর্টস-এ ছাপা হয় অদিতি ফাল্গুনীর ভূমিকাসহ মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক প্রণীত ডায়রি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট’ গঠনের মূল ইতিহাস। এই ডায়রি ছাপা হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ব্যবহারকারী কারো কারো পক্ষ থেকে দাবি ওঠে যে এই নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কখনো ছিল না। তারা এর প্রমাণ স্বরূপ ‘বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা’র লিংক সরবরাহ করেন। সেখানে মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীক নামে কারো ভুক্তি নেই। এ প্রেক্ষিতে ‘বীর প্রতীক’ সংক্রান্ত প্রকৃত অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এ গিয়ে দেখা গেল ‘বিশ্রামাগার’-এর নির্মাণ কাজ চলছে। সংলগ্ন অস্থায়ী অফিসের সামনে ডিসেম্বর ২০১১-র ২৪ তারিখে হুইলচেয়ারে স্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক বীর প্রতীকের সঙ্গে কথা বলেন অদিতি ফাল্গুনী। কিন্তু রাস্তার পাশে শব্দের প্রাবল্য থাকায় কাছেই ১/৬বীর উত্তম নুরুজ্জামান সড়কের ‘রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থানে’র আঙিনায় অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথাবার্তা ধারণ করা হয়। সেখানে মধুর ব্যাপারে কথা বলেন মোঃ গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম বীর প্রতীক, মোঃ সামসুদ্দিন বীর প্রতীক, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শুকুর আলী। এ ছাড়া মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন, আবুল কাশেম ও আবদুস সোবাহান মন্টুও মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের এক সময়ে অস্তিত্বশীল থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন। তারা জানান যে মধু এখন আর নাই–২০০৫ সাল থেকেই নাই। তবে তার স্ত্রী এখনও সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি চাপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকায় বন্দুকের গুলি লেগে আহত হন। পরে ভারতে চিকিৎসা লাভ করেন ১৯৭২ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলের শেষ দিকে ১৯৭৯ সালে ২৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে বীর প্রতীক পদকে ভূষিত হন। তবে তাদের সেই তালিকা কখনো গেজেট ভুক্ত হয় নাই।

আর্টস-এ প্রকাশিত তাঁর ডায়রির লিংক: এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার দিনপঞ্জির পাতা থেকে…।

–বি. স.]

সাক্ষাৎকার গ্রহণ:ব্রাত্য রাইসুঅদিতি ফাল্গুনী


মোদাস্বার হোসেন মধু বীর প্রতীকের বন্ধু ও পরিচিতজনদের ভিডিও সাক্ষাৎকার।

অদিতি ফাল্গুনী: মোদাস্বার হোসেন মধু বেঁচে ছিলেন। তারপরে উনি মারা গেছেন। ওনার একটা ডায়রি ছিল, ডায়রিটা আমি ছাপালাম, ছাপানোর পরে কেউ কেউ বলতেছেন উনি নাকি ছিলেন না–এটা নাকি কল্পনা, এটা নাকি বানোয়াট, তাই কি?

তোজাম্মেল হক: না না না। আমরা আগাগোড়া এখান থেকে আছি, একসঙ্গে ছিলাম। উনি মারা গেলো, মারা যাওয়ার পরে… উনার অনেক কিছু কথা আছে–সেরকম–উনি প্রথমে গুলি লাগা সৈনিক, তারপরে প্যারালাইসিস, উনি যা কিছু বলতো সত্যি বলতো এবং যা ন্যায় বলতো এবং যা জাতির কাজে লাগবে… এবং সেগুলোর কথাই উনি বলতো।

tozammel.jpg……..
তোজাম্মেল হক বীর প্রতীক। জন্ম. সিংগিমারি, পার্বতীপুর, দিনাজপুর। ১৯৭২-এর ৬ জানুয়ারি দিনাজপুর মহারাজা হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে স্বাধীনতা পরবর্তী বিস্ফোরক ও অস্ত্র জমা করার সময়ে আকস্মিক বিস্ফোরণে ৭০০ মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন, আহত হন শতাধিক। তাদের একজন তিনি।
……..

অদিতি ফাল্গুনী: এটা তো অস্থায়ী অফিস? ওই যে আপনাদের যে বিশ্রামাগার…?

তোজাম্মেল হক: বিশ্রামাগার আমাদের স্থায়ী। এখন ভাঙ্গি ফেলাইয়ি অস্থায়ী… অনেকে ভাড়া থাকে, ফ্যামেলি নিয়া থাকে। এখন শেল্টার হইলে আমরা সবাই একত্র হবো।

অদিতি ফাল্গুনী: এইটা কবে নাগাদ মানে পুরাটা আবার ঠিক হবে?

তোজাম্মেল হক: ওই যে ২৪ মাস, দুই বছর টাইম নিছে।

অদিতি ফাল্গুনী: দুই বছর সময় দিছে।

২.
অদিতি ফাল্গুনী: আজ থেকে দশ-এগার বছর আগে আমি প্রথম আসি, এসে আপনাদের দুইজনের একটা ছবিও নিয়েছিলাম? সেটা আর কি পত্রিকাতে ছাপাও হয়েছিল, আমি দেখাই। অনেক আগের পত্রিকা [The Daily Star, 7 December 2000] –এই যে। আপনি আর এই তো মধু, তাই না?

madhu-ds.jpg……..
২০০০ সালে প্রকাশিত অদিতির লেখায় মধু ও গোলাম মোস্তফার ছবি
……..

গোলাম মোস্তফা: হ্যাঁ এই যে, ঠিক আছে। তো এইডা কী হইছে এখন?

অদিতি ফাল্গুনী: এখন ওই ছাপানোর পরে, অনেক দিন পরে আবার দুই বছর আগে এসে আপনাদের অনেকের ইন্টারভিউ নিই, তাই না? তারপরে মধুর একটা ডায়রি খাতাও আমার কাছে ছিল। তো এইগুলো নিয়ে উনার পত্রিকাতে [http://arts.bdnews24.com] একটা লেখা ছাপা হইছে। সেই লেখাটার পরে সবাই বলতেছে মধু নামে কেউ ছিল না। এটা কল্পনা, এটা আমি বানাইয়া লিখছি, আমি টাকা খাইছি…

গোলাম মোস্তফা: মোদাস্বার হোসেন মধু… ঠিকই আছে। এই যে মধু…।

ব্রাত্য রাইসু: এটা চিনেন আপনারা ওনারে?

গোলাম মোস্তফা: আরে চিনা!… আমার সাথে লাখনৌ কমান্ড হসপিটালে… একসাথেই ছিলাম, আহত হইয়া।

ব্রাত্য রাইসু: কত সালে এইটা?

গোলাম মোস্তফা: এইটা বাহাত্তর সালে।

ব্রাত্য রাইসু: হাসপাতালে ছিলেন আপনারা?

গোলাম মোস্তফা: হাসপাতালে ছিলাম। আমি ৬ ডিসেম্বর আহত হই… এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমাদের সাথে ছিলেন। ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে এই মোদাস্বার হোসেন মধু মারা যায়, শহীদ সরোয়ার্দি হাসপাতালে।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা উনি কি বীর প্রতীক ছিলেন? উনারা বলতেছিলেন উনার গেজেটে নাকি নাম নাই?

গোলাম মোস্তফা: গেজেটে নাম নাই। এইটা হলো… জিয়াউর রহমান সাব এখানে ৩৬ জনকে বীর প্রতীক দিছিলেন। ওইখান থিকা তদন্তের পরে ২৪ জন টিঁকছিল। সেই ২৪ জনের একজন হইল মোদাস্বার হোসেন মধু, একজন হল সামসুদ্দিন, একজন তোজাম্মেল, মোজাম্মেল, তারপরে নাসির উদ্দিন কামাল, কেয়াম মিরধা এইরকম আরও আরও অনেকে… ২৪ জন… এদেরকে বীর প্রতীক ঊনাশিতে দেওয়া হইছিল। জিয়াউর রহমান সাব দিয়েছিলেন। তো ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোদাস্বার হোসেন মধু। যদি কেউ বলে যে মধু বানোয়াট তাইলে তাকে আমাদের কাছে আসতে বলবেন।

ব্রাত্য রাইসু: আপনাদের কাছে কোথায় আসতে বলবো?

golam-mustafa.jpg……..
গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম বীর প্রতীক। জন্ম. ঢাকা। হবিগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে সরাইল চান্দুরা ব্রিজে এমএমজির ব্রাশ ফায়ারে ডান হাত, ডান পা ও ডান বুকে আঘাতপ্রাপ্ত হন, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
……..

গোলাম মোস্তফা: বিশ্রামাগারে। এবং আমার নাম্বার দেবেন, আমার ইয়ে দিবেন যে মোদাস্বার হোসেন মধু সে মুক্তিযোদ্ধা ছিল না যদি কেউ এ রকম চ্যালেঞ্জ করে তা আমি চ্যালেঞ্জ করবো সে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিল, হুইল চেয়ার চলাচলকারী।

ব্রাত্য রাইসু: আপনার নাম কী?

গোলাম মোস্তফা: আমার নাম মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম, বীর প্রতীক।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা আপনি কি ফোন নম্বর দিয়া দিবেন আপনার?

গোলাম মোস্তফা: হ্যাঁ, ফোন নম্বর দিয়া দেন।

ব্রাত্য রাইসু: বলেন আপনার নাম্বার।

গোলাম মোস্তফা: আমার নাম্বার হলো 01715 76 9765।

ব্রাত্য রাইসু: যে কেউ আপনাকে ফোন করে এইটা জিজ্ঞেস করতে পারবে?

গোলাম মোস্তফা: হ্যাঁ, আরেকটা নাম্বার আছে–01552 5579 81. যে কোন লোক মোদাস্বার হোসেন মধু সম্বন্ধে যদি কিছু জানতে চায় আমার সাথে কথা বলবে। সে মুক্তিযোদ্ধা, আমি বলবো সে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিল, ২০০৫ পর্যন্ত সে ভাতা পেয়ে গেছে এবং ২০০৫ এর ২৯ শে অক্টোবর সে মারা গেছে। এই শহীদ সরোয়ার্দি হাসপাতালে।


মো: সামসুদ্দিন: এখন তার ওয়াইফ শহীদ পরিবার হিসেবে ভাতা পায়। এখনো পায়।

ব্রাত্য রাইসু: তাই নাকি? তো এখন যে গেজেটে যে নাই এই ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য কী?

গোলাম মোস্তফা: এইটা গেজেট হয় নাই… এই যে চব্বিশজনের যে… তদন্তের পরে চব্বিশজনরে টিঁকাইছিল তাদের গেজেট হয় নাই। আর এটা হলো ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাব দেওয়া হইছিল, পদক দেওয়া হইছিল। সেইটা ’৭৩-এর ১৫ই ডিসেম্বর গেজেট হইছে ৬৭৬ জনের। বীরশ্রেষ্ঠ ৭ জন, বীরউত্তম ৬৮ জন, বীরবিক্রম ১৭৫ জন, বীরপ্রতীক ৪২৬ জন। তার মিধ্যে উনাদের নাম নাই। কারণ ওই গেজেট হইছিল ’৭৩-এ আর উনাদেরকে যে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হইছিল–সামসুদ্দিন, তোজাম্মেল, মধু–এটা ’৭৯তে, জিয়াউর রহমান সাব দিয়েছিলেন।

ব্রাত্য রাইসু: উনাদেরকে দিতে দেরি হইলো কেন?

গোলাম মোস্তফা: কেন হইলো আর কীভাবে দেয় এটাও আমার জানা নাই। কারণ এইটা হলো স্পটে, যুদ্ধ চলাকালীন বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাব। কিন্তু দেশ স্বাধীনের আট বচ্ছর পরে কীভাবে তাদেরকে খেতাব দিছে এইটা আমার জানা নাই। কিন্তু উনারা, মধু, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। যদি কেউ বলে যে মধু মুক্তিযোদ্ধা না তাইলে আমি বলবো তাকে আমার সাথে কথা বলতে।

ব্রাত্য রাইসু: আপনাদের বীর প্রতীক কবে দেওয়া হইলো?

মো: সামসুদ্দিন: জিয়াউর রহমান থাকতে…।

ব্রাত্য রাইসু: ঊনাশি সালে?

মো: সামসুদ্দিন: দিন তারিখ মনে নাই। আমার কাছে তালিকাভুক্ত… সার্টিফিকেট আছে, পদক আছে, সব আছে।

ব্রাত্য রাইসু: আর মধুর সঙ্গে আপনারা কয়জন পাইছিলেন তখন?

মো: সামসুদ্দিন: আমার মনে হয়… আমি জানতাম যে ২৪ জন।

md-shamsuddin.jpg……..
মো: সামসুদ্দিন বীর প্রতীক। জন্ম. বিষ্ণুপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আখাউড়ার আজমপুরে শেল-এর আক্রমণে বাঙ্কার বিধ্বস্ত হলে কোমরে আঘাত প্রাপ্ত হন। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে।
……..

ব্রাত্য রাইসু: ২৪ জন। আচ্ছা, মধুর সঙ্গে আপনার পরিচয় কত সালে হইছিল?

মো: সামসুদ্দিন: সেভেনটি সিক্সে। মধু আমি একই রুমে থাকতাম ওই বিল্ডিং-এ, ১ বাই ১ গজনবী রোডের পশ্চিম পাশের রুমে। আমি, মধু আর মানিক কুমার দাস, একজন হিন্দু আর কি। সে মারা গেছে, মধুও মারা গেছে, আমি বাঁইচ্যা আছি।

ব্রাত্য রাইসু: [অদিতি ফাল্গুনীকে] মধুর ডায়রিটা একটু বের করবেন? [মো: সামসুদ্দিনকে] মধুর হাতের লেখা চিনেন আপনি?

মো: সামসুদ্দিন: দেখলে তো চিনবোই। চিনার কথা।… শোনেন আমিও চাকরি করি নাই, মধুও চাকরি করে নাই।… মোদাস্বার হোসেন মধু… এটা তার হাতের-ই লেখা।

ব্রাত্য রাইসু: তার হাতের লেখা?

মো: সামসুদ্দিন: হ্যাঁ।

ব্রাত্য রাইসু: তো এখন তো ধরেন এই যে বীর প্রতীক আপনাদের দিলো আবার নিলো গিয়া বা…।

মো: সামসুদ্দিন: না নিছে না তো! নেয় নাই, আমার তো এহনও আছে। সার্টিফিকেট আছে, পদক আছে–সব আছে।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা গেজেটে যে নাই এই ব্যাপারে আপনাদের কোনো… আপত্তি করেন নাই আপনারা?

মো: সামসুদ্দিন: এটায় আমার কোনো মন্তব্য নাই। কামলা খাটাইছেন আপনে, তালিকাভুক্ত করার দায়দায়িত্ব আপনার, তালিকা করবেন কি না করবেন–সেটা আপনার ব্যাপার। আমি মুক্তিযোদ্ধা, আবারও বলি আমি ধ্রুবসত্য মুক্তিযোদ্ধা, দেশ এবং জাতির জন্য লড়াই করছি। আমার যুদ্ধকালীন কোম্পানীর কমান্ডার ছিল উপদেষ্টা মতিন। আপা [অদিতি ফাল্গুনীকে] শোনেন, এডভাইজার মতিন আমার যুদ্ধকালীন কোম্পানী কমান্ডার। আমি আখাউড়ার আজমপুরে লড়াই করছি। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ শেলের আঘাতে আহত হইছি।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা। আর মধু কোথায় আহত হইছেন?

মো: সামসুদ্দিন: মধু তো সাত নম্বরে…।


মতিউর রহমান: চাঁপাইনবাবগঞ্জে এটা হচ্ছে… কী বলে একে… সোনা মসজিদ।

ব্রাত্য রাইসু: ওইখানে সে কি শেলের আঘাতে…?

মতিউর রহমান: তা বলতে পারবো না।

গোলাম মোস্তফা: বুলেট লাগছিল।

ব্রাত্য রাইসু: তাইলে মধু বইলা একজন আছে দেখা যাইতেছে আপনাদের কথামতো।

মতিউর রহমান: ডেফিনেটলি আছে। মোদাস্বার হোসেন মধু।

মো: সামসুদ্দিন: মধু নামে ছিল… এহন নাই। এহন তো তার বউ ভাতা পাচ্ছে।

ব্রাত্য রাইসু: হ্যাঁ তাই তো।

মো: সামসুদ্দিন: বুঝছেন, মধু নামক একজন শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ছিল…

ব্রাত্য রাইসু: এবং সরকারের এখান থেকে ভাতাও পাচ্ছেন উনি?

মো: সামসুদ্দিন: এখনও পাচ্ছে।

মতিউর রহমান: আমি একটা তথ্য আপনাদেরকে দিই…

ব্রাত্য রাইসু: আপনি কোথায় ছিলেন?

মতিউর রহমান: আমি ওদের আগের কথাটা বলি। এই যে জিয়াউর রহমানের যে পদক প্রদান এটা কিন্তু যথাযথ কমিটি করে অনুমোদন হইছে।

মো: সামসুদ্দিন: জ্বি জ্বি।

মতিউর রহমান: যথাযথ কমিটি কইরা।

মো: সামসুদ্দিন: “অনুমোদিত হইল–জিয়া” লেখা আছে।

মতিউর রহমান: কমিটির এ্যাপ্রুভাল আছে এবং ফাইনাল এ্যাপ্রুভাল আছে জিয়াউর রহমানের… এটা এই কমিটির রিপোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কল্যাণ বিভাগে আছে।

matiur-rahman.jpg……..
মতিউর রহমান। জন্ম. নূরপুর, যশোর। খোজার হাট বাজারে গ্রেনেডে আঘাত প্রাপ্ত হন। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে।
……..

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা আচ্ছা, তো এইটা মানে, গেজেট থেকে যে বাদ দিলো এটা কি আপনারা জানতে পারছেন?

মতিউর রহমান: গেজেট থেকে বাদ দিছে কি দিছে না, এটা আমরা জানি না।

গোলাম মোস্তফা: গেজেট হইছে ’৭৩-এ। ৬৭৬ জনের গেজেট হইছে ’৭৩-এ।

ব্রাত্য রাইসু: পরবর্তী গেজেটটা আর নাই?

মতিউর রহমান: তবে এইটা, এই গেজেটটা, জিয়াউর রহমানের গেজেট আর সেভেনটি থ্রি’র গেজেট কিন্তু আলাদা, ওইটা জাস্ট আফটার লিবারেশন। আর এইটা ডিউরিং… জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি তখন হইছে… কমিটির মাধ্যমে হইছে।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা। জিয়াউর রহমানের করা জিয়াউর রহমানের জিনিসটা কি কমিটির মাধ্যমে হইছে, এটার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি ওঠে নাই?

মতিউর রহমান: উঠছে কিনা আমি জানি না।

মো: সামসুদ্দিন: না তহন এমন কোনো আপত্তি ওঠে নাই।

ব্রাত্য রাইসু: তখন কেউ কোনো মুক্তিযোদ্ধারা আপত্তি করে নাই?

মো: সামসুদ্দিন: আমি শুনি নাই।

মতিউর রহমান: এটার রেকর্ড ওই মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কল্যাণ বিভাগে আছে।

গোলাম মোস্তফা: এটা হলো–শহীদ আছে, জীবিত আছে, আহত আছে। ’৭৩-এ এই গেজেটটা হইছে, ওইটা ৬৭৬ জনের। ওখানে বীর শ্রেষ্ঠ ৭ জন, বীরউত্তম ৬৮ জন, বীরবিক্রম ১৭৫, বীরপ্রতীক ৪২৬–এই টোটাল ৬৭৬ জন, ’৭৩-এর গেজেটে আছে।

ব্রাত্য রাইসু: এবং ঊন আশি সালে আরেকটা গেজেট হইছিল?

গোলাম মোস্তফা: তা জানি না। ঊনাশি সালে কোনো গেজেট হয় নাই।

ব্রাত্য রাইসু: তাহলে জিয়ার গেজেট কবে হইলো?

গোলাম মোস্তফা: এইটা গেজেট হয় নাই… এইটা একটা কমিটির…

মতিউর রহমান: এইটা একটা কমিটির সিদ্ধান্ত।

ব্রাত্য রাইসু: কোন কমিটি এইটা?

মতিউর রহমান: এইটা জিয়াউর রহমানের আমলে একটা কমিটি হইছিল। এই কমিটি এ্যাপ্রুভ্ড্ বাই প্রেসিডেন্ট।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা মধু যে তার ডায়রিতে লিখছে যে শাহ আজিজুর রহমান আপনাদের কোনো একটা ফান্ডে টাকা দিছিলেন, এইটা কি ঠিক?

মতিউর রহমান: জানি না।

ব্রাত্য রাইসু: শাহ আজিজুর রহমান আসছিল জিয়ার সঙ্গে?

মো: সামসুদ্দিন: মধুর একটা স্মরণীয় কথা আমার মনে আছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্যার সমাধার জন্য জিয়াউর রহমান যখন প্রেসিডেন্ট তখন ষোলজন মন্ত্রীসহ জিয়াউর রহমান আসছিল আমাদের বিশ্রামাগারে। তখন রাত্রিবেলা। এক নম্বর বাড়ি। ১/১ গজনবী রোডের বাড়ি। তহন সেই সাথে, ষোলজনের ভিতরে একজন প্রাইম মিনিস্টার ছিলো শাহ আজিজুর রহমান। সেই শাহ আজিজুর রহমান যখন আসলো, মধু জিয়াকে উদ্দেশ্য কইরা বললো যে, ‘স্যার আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।’ ‘কয়, হ্যাঁ বলেন।’ ‘মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য শাহ আজিজ একটা কথা বলুক এইটা আমরা চাই না। দুইটা শ্বাস ফেলাইবো, ওনাকে আমি বাধ্য হবো এখান থেকে ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিতে।’তহন আমি ওনার পাশে বসা, মধুর পাশে। আর মধুর ডাইন পাশে জিয়াউর রহমান, এর ডাইনে ছিল শাহ আজিজ; কিন্তু দুই ঘণ্টা আমাদের সাথে মিটিং করলো, আমাদের সমস্যা সমাধার জন্য–শাহ আজিজ একটা কথাও বলতে পারে নাই কারণ আমরা মধুর সাথে একজোট, একমত ছিলাম। শাহ আজিজকে কথা বলতে দেই নাই দুই ঘণ্টা ধইরা। বাইর হইয়া গেছে, তারপরে আমাদের সমস্যার সমাধান যা কিছু করণীয় রাষ্ট্রপতি করছে। আমরা বলছি আমাদের পক্ষে শাহ আজিজ কোনো কিছু করুক এটা আমরা চাই না।

ব্রাত্য রাইসু: এটা কত সালের কথা বললেন… সাল মনে নাই?

মো: সামসুদ্দিন: সাল তো মনে নাই। মনে হয় ’৭৯ কিংবা ’৮০ তে হবে। মারা যাওয়ার আগের বছর।

ব্রাত্য রাইসু: জিয়া মারা যাওয়ার আগের বছর?

মো: সামসুদ্দিন: মারা যাওয়ার পরে আর বলব কার সাথে?… যেমন মধুর কথাও আপনারা কেউ বলতেছেন ‘নাই’, ‘মধু নামে কেউ ছিলো না’ আমি জানি, আমি সেভেনটি সিক্সে আইসা তাকে দেখলাম। সে আমার আগে কল্যাণ ট্রাস্টে তালিকাভুক্ত। আর পদকের কথাটা আমাদের মতি ভাই, মতিউর রহমান সাহেব যা বললেন, একেবারেই ধ্রুব সত্য। তা আমরা তো তহন… প্রথম কথা হইলো আমরা মুরুক্ষ; শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজব্যবস্থা কিছুই জানি না। আমাকে বললো, ‘বীরপ্রতীক উপাধি দিলাম, ঠিক আছে?’ আমি বললাম, ‘স্যার ঠিক আছে।’

ব্রাত্য রাইসু: কে বললো এই কথা?

মো: সামসুদ্দিন: জিয়াউর রহমান বললো। কিন্তু এহন তো বুঝি বীরপ্রতীক কী আর বীরবিক্রম কী। তহন সেইটা বুঝতাম না। আর যুদ্ধে যহন যাই, যুদ্ধ যহন করি, তহন আমি এইটা ভাবতাম না–আমি যুদ্ধ করবো, যুদ্ধাহত হবো, বীর বিক্রম বা বীর প্রতীক পদকে বা খেতাবে ভূষিত হবো, আমার কল্যাণের জন্য একটা কল্যাণ ট্রাস্ট থাকবে, আমি অনেক টাকা রাষ্ট্রীয়-সম্মানী ভাতা পাবো এই কথা তখন আমি কল্পনাও করতাম না। এহন যেটা ভাবি। আর এহন যেই বাড়িতে আসছেন সেই বাড়িটা হলো আমি, আমাদের। আঠারোজন মুক্তিযোদ্ধা বসবাস করি। আমি হইলাম প্রথমজন, এভাবে পর্যায়ক্রমে আঠারো জনের… এই বাড়ির মালিক আমরা।… কল্যাণ ট্রাস্ট মালিক না, কিন্তু আমরা মালিক। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা যারা বসবাস করে।

অদিতি ফাল্গুনী: সবাই মিলে এই বাড়িটা কিনেছেন?

মো: সামসুদ্দিন: কিনি নাই… কিনব কেন! কিনবার লাইগা রক্ত…! খালি যা শুধু আবেদন করছি… কিনলে দুইশ কোটি টাকা, কইত্থেকে দিমু। আমাকে মাত্র চব্বিশ হাজার টাকা ভাতা দেয়।

অদিতি ফাল্গুনী: আচ্ছা, আর আপনারা দুইজন… আপনারা কি কথা বলবেন?

ব্রাত্য রাইসু: আপনারা কি কথা বলবেন? মধুর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় ছিলো?

md-shukur-ali.jpg……..
মো: শুকুর আলী। জন্ম. নগাঁও, আসাম। সিলেটের তামাবিলে শেলের ও গুলির আঘাতে আহত হন। জুন মাসের ২১ বা ২২ তারিখে, ১৯৭১ সালে।
……..

মো: শুকুর আলী: আমার সাথে পরিচয় ছিল।

ব্রাত্য রাইসু: তাইলে মধু ভুয়া–আপনারা এইটা বিশ্বাস করেন না?

মো: শুকুর আলী: মধুর সঙ্গে আমার একেবারে…।

মো: সামসুদ্দিন: মধু ভুয়া যে বলে সে পাগল। নাইলে ছাগল। এইরকম কিছু হবে।… মধু ভুয়া এই কথা যে বলে সে পাগল অথবা ছাগল।

মতিউর রহমান: মধু যে মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা–এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই।

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: ভুয়া কেন বলে? কে বলছে ভুয়া?

মো: সামসুদ্দিন: মধু ভুয়া এ কথা আপনারা… আবারো বলি শোনেন, মধু ভুয়া এ কথা যে বলে সে ছাগল অথবা পাগল।

monoara-s.jpg……..
মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন। জন্ম. ভোলা, বরিশাল।
……..

ব্রাত্য রাইসু: [মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিনকে] আপনিও দেখছেন নাকি মধুরে?

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: হ্যাঁ।

ব্রাত্য রাইসু: আপনারা কি টাকা খাইয়া বলতেছেন না তো?

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: মধু একজন সত্যিকারই মুক্তিযোদ্ধা। টাকা খেয়ে বলবো কেন? আমরা একসাথে চলাফেরা করছি না? আমাদের বাসায় আইছে গেছে সবসময়।

ব্রাত্য রাইসু: কেমন লোক ছিলেন উনি?

মতিউর রহমান: কারণ সে একজন স্পষ্টবাদী ছিলেন এটা সত্যি কথা।

মো: সামসুদ্দিন: প্রধানমন্ত্রী ছিলো জিয়াউর রহমান… আরে শাহ আজিজ। শাহ আজিজকে বললো সামনাসামনি… এতটুক দূরে… আমাদের কল্যাণের জন্য শাহ আজিজ বলুক এটা আমরা চাই না। আমরা চাই, যদি এখানে বসে, একটা জোরে শ্বাস ফেলাইব… শ্বাস ফেলাইলে তাকে আমি বাধ্য হবো ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিতে।… মধু এক্কেবারে, এরকম সামনাসামনি, এক গজ দূরে–দুইগজ দূরে।

ব্রাত্য রাইসু: জিয়া কিছু বললো না এইটা শুইনা?

মো: সামসুদ্দিন: মাত্থা খারাপ! জিয়াকেও বাইর কইরা দিতাম আমরা!

ব্রাত্য রাইসু: তাই নাকি?

মো: সামসুদ্দিন: কী মনে করেন? হ্যাঁ। আমরা দেশ এবং জাতির জন্য যুদ্ধ করছি। জিয়াউর রহমানের সময় আমরা ফ্রি স্টাইলে চলাফেরা করছি। যত্ত কিছু বলেন, কেউরে ভয় পাইতাম না, যা খুশি বলতে পারতাম। বাধ্য হইতাম জিয়াকে ওই কথা বলতে কারণ আমাদের প্রতি জিয়া এইরকম ভাব দেখায় নাই কোনোদিন। আমাদেরকে ভালবাসত।

ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা আচ্ছা, আপনার নাম হইলো… কী? আপনার নামটা বলেন?

মো: সামসুদ্দিন: আমি মো: সামসুদ্দিন বীর প্রতীক।


ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা আপনি [মতিউর রহমানকে] কী জানি বলতেছিলেন যে… মধুর এলাকায় গেছিলেন আপনি?

মতিউর রহমান: হ্যাঁ, সে মুক্তিযোদ্ধা এতে কোনোরকম সন্দেহ নাই।

ব্রাত্য রাইসু: আপনি কি তার এলাকায় গেছিলেন?

মতিউর রহমান: আমি তার বাড়িতে পর্যন্ত গেছি।

ব্রাত্য রাইসু: উনার বাড়ি কোথায়?

মতিউর রহমান: উনার বাড়ি হচ্ছে চাপাঁইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানায়।… হুইলচেয়ার হওয়ার পরে সে বিয়ে করছে সেই বউ এখনো আছে। সেই বউ ভাতা পাচ্ছে।

৭.
abul-kashem.jpg……..
আবুল কাশেম। জন্ম. চুয়াডাঙ্গা।
……..

আবুল কাশেম : না মধু ভাইয়ের সমন্ধে কথা বলা এইটা…মানে বিশালই একটা ব্যাপার!

৮.
মতিউর রহমান: …ডাক্তার মাইনউদ্দিন…

ব্রাত্য রাইসু: ডাক্তার মাইনউদ্দিন কে?

মতিউর রহমান: ওই সময় সে সাত নম্বর-এর সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলো। আমি তার সাথেও কথা বলছি। সে এখন জীবিত না। মারা গেছে। মধু মুক্তিযোদ্ধা এতে কোনোরকম সন্দেহ নাই। একজন নির্ভেজাল মুক্তিযোদ্ধা ছিল।


আবদুস সোবাহান মন্টু: আচ্ছা কোন লোকটা কইতে পারে এই কথাটা!…

১০
মতিউর রহমান: হ্যাঁ তবে তার একটা দোষ ছিলো সে হচ্ছে ঠোঁটকাটা ছিলো। ঠোঁটকাটা বোঝেন তো?… সত্য কথা অকপটে বলে দিতো। এইটা হচ্ছে তার দোষ ছিলো।

১১

আবদুস সোবাহান মন্টু: ওর সাহসটা কী আমি খালি চিন্তা করতেছি!

ব্রাত্য রাইসু: কার?

আবদুস সোবাহান মন্টু: ওই যে লোক বলছে… যে আমরা তো আজীবন… আমি তো আসলে প্রথম জীবন থেকে আমি… আমি তো প্রথম জীবনের একবারে উনার… মধু ভাইয়ের।

ব্রাত্য রাইসু: মধু ভাইয়ের প্রথম জীবনের লোক?

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ । এই যে মধু কামড় দিয়া গোস খাইয়া লাইছে, এই যে।

as-mantu.jpg……..
আবদুস সোবাহান মন্টু। জন্ম. গোপালগঞ্জ।
……..

আবদুস সোবাহান মন্টু: খুব রাগী লোক ছিল।

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: রাগের চোটে… রাগের চোটে কামড় মারছিল হাতের মধ্যে।

আবদুস সোবাহান মন্টু: আরে না না, এই সব কী! ছিঃ ছিঃ ছিঃ, আল্লা এইটা টেপ হইতেছে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ।

মিসেস মনোয়ারা সামসুদ্দিন: আল্লা, খারাপ কই নাই তো।

ব্রাত্য রাইসু : আচ্ছা আপনি বললেন যে, মধুরে যে বিশ্বাস করে না…?

আবদুস সোবাহান মন্টু: না, আমি তারে দেখতে চাই যে আসলে সে কে? সে কী চেনে? আমি উনার বাড়িতে
original post
read more
affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site