কিছুদিন ধরেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে চারিদিকে নানা কথা হচ্ছে। নানা মিডিয়ায় সবাই নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। কোন অংশ কেমন হওয়া উচিত, কোনটা থাকা উচিত আর কোনটা উচিত নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এতকিছু বারবার আলোচনায় আসতে দেখে আমিও আমার মত করে কিছু চিন্তা-ভাবনা করলাম। ভাবলাম সিসিবিতে শেয়ার করি। আর সিসিবিতে এই আলোচনাটা এখনও হয়নি। সেজন্যই লিখতে বসা।
সংবিধানের কোন অংশ কেমন হওয়া উচিত সেসব কথায় যাওয়ার আগেই এব্যাপারে আমার কিছু মত আগে বলে নিই-
- আমার মনে হয়, সংবিধানে অন্য কোন দেশকে অন্ধ অনুকরণ করার মানসিকতা থাকা উচিত না। অমুক অমুক দেশের সংবিধানে এটা আছে, সুতরাং আমাদেরটাতেও থাকতে হবে, এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল, অন্য দেশের সংবিধানগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারি। সেটার সাথে ঐ দেশের সফলতা/ব্যর্থতার সম্পর্ক তলিয়ে দেখতে পারি। তবে আমাদের সংবিধানের খুঁটিনাটি কেমন হবে তা অবস্থানুসারে আমাদেরই ঠিক করতে হবে। একই জিনিস সবখানে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
- আর চারপাশের অবস্থা থেকে আমার মনে হচ্ছে, সবাই সংবিধানের ব্যাপারে নিজের মতটাকে অনেকটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেহেতু আমরা গণতন্ত্রকেই আমাদের প্রধান মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছি, গণতান্ত্রিক রীতি হিসেবে আমাদের উচিত সংখ্যালঘুদের মতকে সম্মান জানিয়ে সংখ্যাগুরুদের মতকেই প্রাধান্য দেওয়া।
এখন আসি একটা একটা করে পয়েন্টে যেগুলো বেশি বেশি আলোচনায় আসছে-
ধর্মনিরপেক্ষতা: ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা ‘Secularism’ একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দ। অ্যাবস্ট্রাক্ট বললাম এই কারণে যে, শব্দটির অর্থ নানাজনের কাছে নানারকম। বিশেষত ডান ও বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। সেজন্য ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং এধরণের অন্যান্য অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দ (যেমন ‘সমাজতন্ত্র’) সংবিধানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এক্ষেত্রে যা করা উচিত বলে আমার মনে হয় তা হল-
– প্রথমে এটা ঠিক করা উচিত যে, শব্দটির ব্যাখ্যা কী? বা আরও স্পষ্টভাবে বললে শব্দটির ঠিক কোন ব্যাখ্যা বা অর্থটি আমরা গ্রহণ করতে যাচ্ছি। এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা অর্থকে নীতি হিসেবে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
– এরপর দেখতে হবে আলোচ্য শব্দটি ছাড়াও অন্য এমন কোন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আছে কিনা যা গৃহীত ব্যাখ্যা বা অর্থকে আরও ভালভাবে বা দ্ব্যর্থ-হীনভাবে প্রকাশ করতে পারে। যদি এমন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ পাওয়া যায়, তাহলে সংবিধানে আলোচ্য মূল শব্দের পরিবর্তে নতুন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করতে হবে। আর না পাওয়া গেলে মূল শব্দটিই ব্যবহার করা হবে। এক্ষেত্রে আগেই বলেছি, অনুকরণের মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে।
– পরবর্তীতে বিভ্রান্তি নিরসনে ব্যবহৃত শব্দের ব্যাখ্যা যে ঐটাই যেটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অন্য কিছু নয়; সেটাও সংবিধানে উল্লেখ করতে হবে।
আবার ধর্মনিরপেক্ষতায় ফেরত আসি। আমরা কেউই চাই না যে, বিশেষ কোন ধর্মের অনুসারী হওয়ার জন্য রাষ্ট্র আমাদেরকে বিশেষ কোন সুবিধা দিক। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ধর্ম পালন করতে পারবেন এটাই আমাদের চাওয়া। এটাই যদি ধর্মনিরপেক্ষতা হয়, তাহলে আমার মনে হয় কোন সমস্যা নেই। তবে যেকোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বা অন্যান্য কারণেও রাষ্ট্রের কাছে বিশেষ কোন চাহিদা থাকতে পারে। সেটা রাষ্ট্র পূরণ করতেই পারে। যেমন এখন বিয়ে-তালাক বা অন্যান্য পারিবারিক বিষয়ে ধর্মভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন আইন আছে। আজকাল ধর্মনিরপেক্ষতার যে অর্থ করা হয়- “রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সংশ্লিষ্টতা থাকবে না”, সেটাকে ব্যবহার করে যদি এসব প্রচলিত নীতিকে কেউ এখন বা পরে সুযোগ মত পরিবর্তন করতে চায়, সেটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব বলছি কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকেই এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি কোনভাবে সংবিধানে ঢুকিয়ে দিয়ে পরে সুযোগ অনুসারে রাষ্ট্রকে বিশেষ একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। বিশেষ কোন মত আসতে হলে জনগণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে আসুক। এমন চোরা পথে যাবার কি প্রয়োজন?
এজন্য আমার মত হল- ধর্মনিরপেক্ষতা বা এধরণের অন্যান্য শব্দ বা আরও উপযোগী শব্দ/শব্দগুচ্ছ অবশ্যই সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সহকারে। আর সেক্ষেত্রে শব্দটি নয়,ব্যাখ্যাটিই হবে মুখ্য।
বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামঃ এই দুটি ইস্যুই বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট, যারা বাংলাদেশে ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু লক্ষ্য করুন, সংবিধানে এই দুটি বিষয় কিন্তু জনগণের দাবী থেকে আসেনি। এসেছে ক্ষমতাসীনদের হাত ধরে। এত বড় জনগোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্টতার পরেও ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ কেন জনগণের দাবী থেকে আসল না? কারণ জনগণ কোন তত্ত্বীয় ধারণার জন্য আন্দোলন করে না, আন্দোলন করে বাস্তব অধিকারের জন্য। আর সংবিধানে এই দুটি অন্তর্ভুক্ত থাকা বাস্তব কোন অধিকার নিশ্চিত করে না, কাগজে-কলমে থাকা একটা স্বীকৃতি দেয় মাত্র। এটা এমন কিছু নয় যে, এর ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠী অন্যান্যদের তুলনায় নাগরিক হিসেবে বেশি সুবিধা পাবে, সবখানে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা থাকবে, তারা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক আর অন্যরা দ্বিতীয় শ্রেণীর ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও অনেকেই সেটাই বুঝাতে চাচ্ছেন। আর তৎকালীন ক্ষমতাসীনেরা যে এই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তা আসলে কীজন্য যেটাও যথেষ্ট প্রশ্ন-সাপেক্ষ।
এখন কথা হল, এই দুটি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা? আমার মনে হয়, প্রশ্নটা এভাবে করলে বেশি সরল হয়ে যায় এবং কিছু বিবেচ্য বিষয় বাদ পড়ে যায়। আমার মতে এখানে পরিস্থিতি হিসেবে প্রশ্নটা কয়েকটি ভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে- (১) দেশের সংবিধান তৈরি হচ্ছে। এই সম্পূর্ণ নতুন সংবিধানে এই দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা? (২) দেশে একটা সংবিধান আছে। সেখানে এই দুটি বিষয় নেই। নতুন করে এই দুটি বিষয় যোগ করা হবে কিনা? (৩) দেশে একটা সংবিধান আছে। সেখানে এই দুটি বিষয় আছে। এখন সংবিধান থেকে এই দুটি বিষয় বাদ দেওয়া হবে কিনা?
আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন, তিনটা পরিস্থিতি একই রকম নয়। বিশেষ করে শেষের পরিস্থিতিটা আগের দুটোর চেয়ে অনেকাংশে ভিন্ন। এখন আমার মতটা বলি। আমার মতে প্রথম দুটি ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তবে না করলে যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় কোন ক্ষতি হয়ে যাবে এমন কিছু নয়। কেউ বলতে পারেন, এধরণের জিনিস সংবিধানে থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হবে। সেক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি, কোন একটা শব্দ মুখ্য নয়, শব্দটির যে ব্যাখ্যা বা নীতি সবাই (বা সংখ্যাগরিষ্ঠ) গ্রহণ করবে সেটিই মুখ্য। আমার মনে হয় না, এমন একটা কাগজে কলমে দেয়া স্বীকৃতি ঐ নীতিবিরোধী হবে।
এখন আসি তৃতীয় পরিস্থিতিতে, যেটা বর্তমানে আমাদের সামনে আছে। অর্থাৎ বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে আছে। এর মাধ্যমে দেশের একটা গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে গেছে। এখন এগুলো বাদ দেয়া উচিত কিনা? এখন আপনারাই বলুন, কাউকে কোন স্বীকৃতি দিয়ে সেটা কি আবার ফিরিয়ে নেয়া উচিত? ফিরিয়ে নিলে সেটা কি পরোক্ষ অপমানের মত দেখায় না? অবশ্য যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তিনি ফিরিয়ে দিলে ভিন্ন কথা। কিন্তু কেউ তো আর এমনি এমনি স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেয় না। ক্ষোভে বা অভিমানে দিতে পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ‘নাইটহুড’ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামনে এমন কোন পরিস্থিতি আছে কি? এখন এই দুটি বিষয় সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার মনে হল, অনাকাঙ্ক্ষিত গোলযোগের রাস্তা করে দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: আমার মনে হয় এখনও বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশের মূল ক্ষমতা আহরণের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নয়। এমনকি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা থাকলেও নয়। সুতরাং যতই নজিরবিহীন এবং অগণতান্ত্রিক হোক না কেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন আছে। তবে দু-এক দশক পর পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।
শেষে একটা কথা বলতে চাই। সেটা হল, সংবিধান একটা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত সেটা কাগুজে একটা দলিল ছাড়া আর কিছুই নয়। সংবিধান পরিবর্তন হয়ে গেলেই আমাদের জীবন রাতারাতি পালটে যাবে না। রাতারাতি তো নয়ই, কয়েক বছর বা দশকেও না। জাতির আসল পরিচয় তার মানসিকতায়, তার মূল্যবোধে। এজন্য আমাদের জাতি হিসেবে নিজেদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আর এই ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি কারও একার কাজ নয়। এতে প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণ।


No comments:
Post a Comment