প্রথম পর্ব
বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের তরুণ ও প্রবীণ সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষার কথ্য ও মান রূপ নিয়ে কী ভাবছেন তা জানতে চেয়ে দুটি প্রশ্ন করা হয়েছিলো। তাদের অভিমতগুলোর শ্রুতিলিখন করেছেন মাহবুব আলম। তাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিলো:
১. বাংলা ভাষা চর্চায় যে মিশ্রণ পরিলক্ষিত হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার অভিমত ও ব্যাখ্যা জানতে চাই।
২. বাংলা ভাষার জন্য কোন হুমকি আছে বলে মনে করেন কিনা? থাকলে তা রক্ষায় কী ভূমিকা নেয়া যেতে পারে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা ভাষার একটা প্রকৃত রূপ বা মান ভাষা রয়েছে। সেই মান ভাষাটা সাহিত্যের ভাষা, শিষ্টাচারের ভাষা, ভদ্র কথপোকথনের ভাষা, লেখাপড়ার ভাষা। সেই মান ভাষার চর্চাটা বাংলাদেশে বর্তমানে অত্যন্ত আতঙ্কিত ও আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। এখন সাধারণ লোকজন কথাবার্তার ব্যাপারে হিন্দি, ইংলিশ ও উর্দু মিশিয়ে কথা বলে, এবং তারা নিজেদের আধুনিক ও স্মার্ট মনে করে। লেখার ক্ষেত্রেও ভুল শুদ্ধ নিরুপন করে না, ভুল লিখলেও সেটা বীরত্ব মনে করে, কারণ তারা ভাল বাংলা জানেনা। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকরা ভাষার বিশুদ্ধ রূপ ব্যবহারে গুরুত্ব দেন না। শিক্ষিত হয়েও অনেকে ভাষার ভুল প্রয়োগ করছেন। তাছাড়া ইংরেজী মাধ্যম স্কুল কিংবা মাদ্রাসাগুলোতেও মান ভাষার চর্চা নেই। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের জন্য এই বাংলা ভাষার ব্যবহার হুমকি স্বরূপ বলে মনে হয়। আবার দেখা যায় যে, ঘরে ঘরে ছোট ছেলেমেয়েরা বা তরুণরা হিন্দি গান, ছবি কার্টুন দেখে হিন্দির চর্চা করছে– এই আক্রমন আমরা রোধ করতে পারছি না। উর্দু যখন বাংলার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল তখন আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি কিন্তু এখন হিন্দির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছি না, কারণ আমাদের যারা শাসক তারা এ বিষয়ে উদাসীন।
এখানে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করছে মিডিয়া। এরকম আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর কখনো হয়নি, পাকিস্তানিরা বিভিন্ন ভাবে উর্দু চাপিয়েছিল, আমরা রোধ করেছি, এখন তো নিজেরাই ভাষার চর্চাকে ব্যাহত করছি। মিডিয়ায় যে ভাষা অর্থাৎ নাটকে বা এফ এম রিডিওতে ব্যবহার হচ্ছে তা ভদ্র সংস্কৃতি নয়, এটা বিকৃতি বা বিচ্যুতি। কিন্তু এই ভুল চর্চারই অনুকরণ ও অনুসরণ হচ্ছে।
আমরা যারা দেশপ্রেমী রয়েছি, বা বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা করছি তাদেরকে এ বিপর্যয় নিয়ে ভাবতে হবে। সবাইকে মিলে এই অপচয় রোধ করতে হবে। সরকার কিংবা নীতিনির্ধারকদের উচিত ভাষার ভুল কিংবা বিকৃত রূপ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা।
এই মিশ্রণটা কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাধ্যমেই বেশী হচ্ছে। যারা তথাকথিত উচ্চশিক্ষা লাভ করছে, তারা প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার সাথে ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছে। পাশাপাশি হিন্দিও অনুপ্রবেশ করছে। একটা ব্যাপার দেখা যায় যে, গ্রামের কৃষকরা কিন্তু এই মিশ্রণটা কম করছে। হয়ত তাদের হাতেই বাংলাভাষার আসল চাবিটা রয়ে যাবে।
তবে ইংরেজীর বেশ একটা প্রয়োজনও রয়েছে, বহিরবিশ্বে কিংবা উন্নত পড়ালেখা বা যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ইংরেজী ভাষার দরকার। যদি এমন একটা ব্যবস্থা করা যায় যে আমরা দ্বিভাষিক হব তবে সেটা হয়ত ভাল হত। আমরা দুটি ভাষারই চর্চা ও ব্যবহার ঠিক মত করতাম। আর হিন্দির প্রসার ঠেকাতে আমাদের নীতি নির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই মুহূর্তে নীতিমালা প্রণয়ন করা খুবই জরুরি যদি আমরা বাংলা ভাষার শুদ্ধ রূপটি টিকিয়ে রাখতে চাই।
আমরা নিজেরাও কিন্তু বাংলাভাষার আসল শুদ্ধ রূপটি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছি। যদি আমরা, দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি ভাষার শুদ্ধ চর্চার জন্য ম্যাগাজিন তৈরি করি, আবৃত্তি চর্চার অনুষ্ঠার তৈরি করি ও প্রচার করি বাংলা ভাষার যে পঞ্চভাস্কর রয়েছেন তাদের সাহিত্যের অংশগুলো চর্চা করি তাহলে বাংলা ভাষার পরিপূর্ণ চর্চা হতে পারে।
তবে এটা খুব একটা বড় হুমকি বলে আমার মনে হয় না, এখনও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই ভাষায় কথা বলছে, ব্যবহার করছে। আর আমাদের ভাষাও খুবই সমৃদ্ধশালী, তাছাড়া এর প্রকৃত শক্তি বা জোয়ার রয়েছে। যদি অসংখ্য মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ এর প্রকৃত রূপ চর্চা করে তবে হয়ত এই ভাষা নতুন সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারে।
হাসান আজিজুল হক
মিশ্রণটা কিন্তু খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ভাষাতে মিশ্রণ থাকবে এবং ভাষায় মিশ্রণ হয়ে আসছে। প্রয়োজন মত ভাষার অ্যাডাপটেশন কিন্তু আগেও ঘটেছে। তবে এখন যা হচ্ছে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইচ্ছে মতন মিশালেই কিন্তু তা মাধুর্য মন্ডিত হয় না। বা গ্রহণযোগ্য হয় না।
মিডিয়ায় তো অদ্ভূত এক মিশেলে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য নয়। এরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মূলত বাংলা ভাষার মুল সম্ভার থেকে সরে আসছে যা হারিয়ে ফেলছে। একজন ফেরিওয়ালাও কিন্তু প্রয়োজনে সুন্দর ভাবে ভাষার ব্যবহার করতে পারে। আমরা কেন পারব না।
আমরা ভাষাকে নিয়ম নীতি দিয়ে আটকাতে পারবো না, বা কোন প্রামাণ্য রূপ বেধে দিতে পারবো না বা সে রকম করলে তা ফলপ্রসু হবে না। আমরা সাবলীল ও সুন্দরভাবে যে ভাষা ব্যবহার করি তাই চর্চা করা উচিত এবং ছড়িয়ে দেয়া উচিত।
মঈনুল আহসান সাবের
এই মিশ্রণ কিছুটা হুমকি তো বটেই। এই মুহূর্তে এর বিপর্যয় হয়ত আমরা বুঝতে পারছিনা তবে পাঁচ-দশ বছর পর আমরা হয়ত এই ভাষা ব্যবহার নিয়ে আতঙ্কিত হব।
আমাদের পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়া এক সময় মূল ভাষা চর্চা করত। আমরা মুখে যে কথা বলি তা কিন্তু মূল ভাষা নয়। পৃথিবীর সবদেশেই একটা প্রচলিত ভাষা থাকে, তার সাথে একটি মূল ভাষা বা মূল স্রোত থাকে। আমরা যেন সবসময় সেই মূল স্রোত থেকে সরে যাবার চেষ্টা করছি। বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে যে কথ্য বা লেখ্য রূপ প্রচলিত রয়েছে তার সাথে আমাদের মৌলিক ভাষার কোন মিল নেই। এটা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নয় বা প্রতিরূপও নয়। আমরা জেনে বা না জেনেই মুল ভাষা থেকে সরে আসছি।
বোধ বা সচেতনা তৈরি করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশ বা সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলা ভাষা আসলে কোনটি বা এর প্রকৃত রূপ কী তা জানতে পারবে না। পরিবার এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের মা-বাবাই পারে তাদের সন্তানদের ছেলেবেলা থেকেই অন্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষার প্রকৃত রূপ শেখাতে। শিক্ষক, সুশীল সমাজ, পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মৌলিক ভাষা থেকে এরকম সরে আসা ভবিষ্যতের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না।
ভাষা নিয়ে আমাদের কোন বড় অনুষ্ঠান নেই। অন্যভাষা যে আমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছে তা নিয়ে মিডিয়ায় কোন সংবাদ নেই। তাছাড়া বাংলা ভাষাভিত্তিক অনুষ্ঠান ক্রমশই কমে যাচ্ছে। ভাষাসহ সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত। এবং সেটা সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই উদ্যোগ নিতে পারে।
কামরুল হাসান
বাংলা ভাষা চর্চায় এখন যে মিশ্রন বা প্রচলন চলছে যাকে আমরা বাংলিশ বা হিংলা বলে অভিহিত করতে পারি,তা বাংলা ভাষার জন্য প্রচন্ড ক্ষতিকর। বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন টিভিতে বা এফ এম রেডিওগুলোতে শোনা যায় এক বাক্যে ৫০% অন্য ভাষার শব্দ। যদিও ইংরেজী শব্দের মিশ্রণ আগেও ছিল। কিন্তু এখন কথা বিকৃত রূপ ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে টিভি নাটক, সিনেমার মাধ্যমে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীরা যে কথ্য রূপ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে–ঢাকায় এক অদ্ভূত মিশেল যা চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের মানুষের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে। বাংলার প্রচলিত রূপ ব্যবহারে ভাষার যেমন শুদ্ধ চর্চা হয়, তেমনি তা বোধগম্যও হয়ে উঠে। নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে হবে যেন বাংলা ভাষার প্রমিত রূপটি তারা ব্যবহার করে। কারণ মিডিয়াই কিন্তু মানুষের কাছে এক ধরনের ‘রোল মডেল’। কথ্য ভাষায় তো আমাদের বৈচিত্র রয়েছেই। তবে এখন যেটা হচ্ছে সেটা আগ্রাসন বা অনুপ্রবেশ। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
প্রশাসন সচেতনতা তৈরি করতে পারে, অনুষ্ঠান পরিচালনার নীতিমালা তৈরি করতে পারে, যেমন মিশ্রণ রোধ করা বিকৃত বাংলা ব্যবহার থেকে মানুষকে বিরত রাখা।
সাখাওয়াত টিপু, ফরহাদ মজাহার, ব্রাত্য রাইসু ও আরো অনেকে আছেন যারা প্রমিত ভাষাকে মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের ভাষা এবং তারা পূর্ববঙ্গের একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন। এটা এক ধরণের সংকীর্ণতা। মান বা প্রমিত ভাষা যেমন আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে তেমনি ভাষার বিকৃতি রোধ করে।
ভাষারও মিশ্রণ আশঙ্কা হতে পারে, এতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার আবেদন যেমন কমে যাবে তেমনি বাংলাদেশী সংস্কৃতি চর্চাও তার আবেদন হারিয়ে ফেলবে।
মাসুদ খান
ভাষা বহতা নদীর মতো। বহমানতা আর সময়ের সাথে বদলে বদলে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত এর শক্তি ও সম্ভাবনা। ভাষার স্বাভাবিক বিকাশপ্রক্রিয়া সেটাই। জনগোষ্ঠির নিত্য-ব্যবহারের ভাষা হলো এর রসায়নাগার ও পাওয়ার হাউজ। জনগোষ্ঠির যাপিত জীবনের নানা সংগ্রাম, ঘর্ষণ ও মিথস্ক্রিয়ার প্রভাবে নিত্য-ব্যবহারের এই ভাষার ভেতর নিরন্তর ঘটে চলে বিচিত্র ক্রিয়াবিক্রিয়া আর অফুরন্ত ধারায় প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন শব্দ, শব্দবন্ধ, বাগধারা-বাগভঙ্গি, প্রবাদ-প্রবচন… সংকোচন-প্রসারণ হতে থাকে শব্দের অর্থ ও ব্যঞ্জনার, বাক্যের অন্বয়ে ঘটতে থাকে ভাঙচুর ও বিবর্তন। তা ছাড়া, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠির ওপর নানা সময়ে কর্তৃত্ব ও আধিপত্য করতে এসেছে নানা ভাষা ও সংস্কৃতি… আর্য, আরব্য, পারস্য, ইংরেজি, উর্দু… এবং সাম্প্রতিককালে হিন্দি ও ইংরেজি দুটোই। এসেছে কখনো দস্যুর বেশে, কখনো রাজদণ্ড, কখনো তুলাদণ্ড হাতে, কখনো সাধুসন্ত ফকির-দরবেশদের সাথে, কখনো-বা পণ্যবাহিত হয়ে। এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার ভেতরে থেকে জীবন্ত ভাষাস্রোত যা করে তা হলো- ভিনভাষার বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে নিরন্তর সংশ্লেষ, এবং সেগুলির আত্তীকরণ। দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়ায় সে নিজের করে নেয় সেইটুকুই, যেটুকু হয়ে পড়ে অনিবার্য, এবং যেটুকু মেশে, যায়, খাপ খায়। এভাবে বাংলাভাষায় নানা সময়ে এসে মিশেছে/মিশছে বিভিন্ন ভাষার শব্দ, উপসর্গ-অনুসর্গ, কখনো-বা বাগভঙ্গি। বাংলা সেগুলোকে মোলায়েম মসৃণ বানিয়ে, নিজের স্বভাবের অনুগত করে নিয়ে, করেছে আত্তীকৃত। ভাষা নিজেকে করেছে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ। যুগ-যুগ ধরে চলে এ রসায়নপ্রক্রিয়া এবং এটা স্বাভাবিক, বিজ্ঞানসম্মত একটি প্রক্রিয়া। বেশ কিছুকাল অতিবাহিত হবার পর বোঝা যায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠিতে কী-কী আত্তীকৃত হয়েছে, আর কী-কী হয়নি, এবং হলে তা হয়েছেই-বা কোন আকারে, কী প্রকারে।
এসবকিছুই বললাম নিত্য-ব্যবহারের ভাষার ব্যাপারে। মানভাষার বিষয়টি ভিন্ন। মানভাষার সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারে। আর রাষ্ট্রের জন্য দরকারও একটা মান ভাষার। আমরা জানি, নিত্য-ব্যবহারের ভাষা প্রকৃতিগতভাবেই সবসময় সজীব, সপ্রাণ, চলিষ্ণু ও সৃজনমুখর, আর মানভাষা সবসময়ই তার অনুগামী। মানভাষার ওপর এই নিত্য-ব্যবহারের ভাষার অভিক্ষেপ প্রতিনিয়ত পড়তে থাকাটা খুব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে ভাষা কালে-কালে হয়ে পড়ে নীরক্ত, নীরস, খর্খরে, হীনস্বাস্থ্য। কবিতায়, সাহিত্যে এই নিত্য ব্যবহারের ভাষার অভিক্ষেপ পড়ে (এবং পড়া উচিত) সবচেয়ে ব্যাপক ও কার্যকরী রূপে, কারণ কবিতা ও সাহিত্য কাজ করে ভাষার সবচাইতে সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল ও সৃজন-উন্মুখ দিকগুলি নিয়ে।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠির (শুধু শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠি নয়) মুখে মুখে বাংলাভাষা এগিয়ে গেছে অনেকদূর, কি শব্দভাণ্ডারে, কি বাগধারা-বাগভঙ্গির ঐশ্বর্যে, কি প্রবাদ-প্রবচনে। এই এগিয়ে-থাকা, আগে-আগে-চলতে-থাকা, পথিকৃৎ মুখের ভাষার নানা ঐশ্বর্যকে, তার বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দ, শব্দবন্ধ, অন্বয়, বাগধারা-বাগভঙ্গি, প্রবাদ-প্রবচনকে তাদের বিচিত্র ব্যঞ্জনা ও অফুরান সম্ভাবনাসহ কাজে লাগানোর বিষয়টি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি মানভাষায়, এবং সাহিত্যিকের ভাষায়, সেগুলির অভিক্ষেপ বা প্রতিফলন যেভাবে যতটা পড়া দরকার ততটা সেভাবে না পড়ে, তবে ভাষা হয়ে পড়বে অনেকটা খর্খরে, একঘেয়ে, স্থিতিস্থাপকতাহীন, বৈচিত্র্যহারা। সেই লক্ষণা দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। এখানে সাহিত্যিকের ভাষা বলতে কবিতা, কথাসাহিত্য বা নাটকের চরিত্রের মুখের ভাষার কথা বলছি না; বলছি খোদ সাহিত্যিকের নিজের ভাষার ব্যাপারে।
কাজল শাহনেওয়াজ
ভাষাতো একটা সচল ব্যাপার। এখানে শব্দ ঢুকবে আবার বেরিয়ে যাবে। তবে যখন অনেক বেশি মিশ্রণ ঘটতে থাকে তখন মনে কিছু করতে হবে, সমস্যাটা ভাষার নয় অন্য কোথাও। হয়ত আমাদের ভাষার নিজস্বতায় এমন এক ছিদ্র রয়েছে যা কৃষ্ণ গহ্বর এর চেয়ে ভয়ঙ্কর রূপে একে গ্রাস করছে। হতে পারে কোন আর্থরাজনৈতিক প্রভাবের রূপ এটি।
দেখুন হিন্দী কিন্তু একটা পণ্য ভাষা। যখন এই ভাষা আমাদের ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয় তখন তা জীবন যাপনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি সেই দেশের অর্থনীতিও আমাদের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
মিডিয়ায় যে কথ্যরূপ প্রচলিত রয়েছে তা আসলে কেউ ইচ্ছে করে করেন বা প্রয়োজনের খাতিরে করেন। প্রয়োজন তো মেটাতেই হবে তবে যদি কেউ ইচ্ছে করে ব্যঙ্গ মনোভাব বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটায় তখন বুঝতে হবে এর পেছন কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। তাছাড়া নাগরিক কল্পনা বলে একটা ব্যাপার রয়েছে যে কারনে ভাষা আধুনিকীকরণের একটা ব্যাপার চলে আসে। তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে, এবং কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে ভাষা ব্যবহার করা চলবে না।
আসলে প্রমিত রূপ একটা থিওরিটিকাল ব্যাপার, সেটা সাধারণের জন্য হয়ত উপযোগী নয়। তবে আমাদের পরিবর্তনে সতর্ক থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে। ভাষাও এক সময় হিতু হয় তখন তার আসল রূপ ফুটে উঠে।
চয়ন খায়রুল হাবিব
উপসংহারমুলক সংগাতে না গিয়ে বলা যেতে পারে যে প্রমিত বা মান ভাষা হচ্ছে সামাজিক অভিব্যাক্তির
এক চলিষ্ণু সমীকরণ! সমাজের বিকাশের সাথে, সমীকৃত মান ভাষার ভার বহন এবং নমনীয়তা দুটোই বাড়তে থাকে।এ-সমীকরনে হৃদস্পন্দনের সাথে বুদ্ধিজাত চাহিদার ভারসাম্য যে সবসময় অনুকুল হয় তা নয়!শাস্রজ্ঞ্বদের উপর সঙ্খুব্ধ মাইকেলের সেই তিব্র নিনাদ, ”রাগে জ্বলি উঠি” এক অর্থে আমাদের সবারই প্রমিত সম্মানের উদ্বোধন!
ভাষা হচ্ছে ভাবের গনিত; যে-গনিত আবার আত্মজাত; প্রমিত হচ্ছে নৈমিত্তিক লেনদেনে সার্বজনিন পেন্সিল-স্কেচ!এই পেন্সিল-স্কেচ বা খসড়াকে ভর করে প্রমিত সামাজিকভাবে বিচিত্রমুখিতো হতেই পারে; আবার যেখানে অচলায়তনের সাথে ব্যাক্তির বিরোধ সেখানে নতুন মাত্রিকতাও আনতে পারে!এই পথ ধরে আমরা পেয়েছি পার্বতি ও চন্দ্রমুখিকে!সনাতনি-সতরঞ্চের দানপাষা উলটে দিচ্ছে এই দুই নারি ভবিষ্যতমুখি প্রমিতের স্বপোলব্ধ উচ্চারনে!আমরা জানছি প্রমিত বা মান ভাষার উথ্যানে, বিকাশে যেমন দরকার হয় সুষমা, ভারসাম্য, ঐক্য, তাল এবং প্রবর্তনা; তেমনি এগুলোর অভাবেই প্রমিতের ছিরিছাদ হয়ে ওঠে বিচ্ছিরি!
বাংলা কথনের, উচ্চারনের এবং লেখনের কিছু চুম্বক ঘটনাক্রম উল্লেখ করা যাক এখানেঃ
ক. বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ… আঞ্চলিক, কথ্য, শুদ্ধ, অশুদ্ধ তর্কের উর্ধ্বে মিথে পরিণত হয়।
খ. রবীন্দ্রনাথ কি কোলকাতার ভাষায় লিখতেন? সন্দেহাতীতভাবে না। অন্যান্য কোলকাতাবাসীর মত ঠাকুরবাড়ির লোকদেরও দন্ত্য স, তালব্য শ, মূর্ধন্য ষ উচ্চারণে সমস্যা ছিল। কবিগুরুকেও নিজের সাহিত্য ভাষাকে কথ্যভাষার অকথ্য উচ্চারণ রীতি থেকে সরিয়ে অন্য আরেকটি মান তৈরি করতে হয়েছিল। মাইকেলও কোলকাতার ভাষায় না লিখে মিশনারি বাংলায় মহাকাব্য লিখতে ব্রতী হন। তবে রবীন্দ্রভাষাই মানভাষা হিশেবে চালু হয়ে যায়।
গ. মুজতবা আলী সিলেটের ভাষায় বা জীবনানন্দ বরিশালের ভাষায় লিখলে ওদের সাহিত্যের কী পরিণতি হতো বলা মুশকিল।
ঘ. কিশোরগঞ্জ থেকে আসা নীরদ চৌধুরী থেকে একই অঞ্চলের পরের সাহিত্যিকদের লেখনভঙ্গির যে বিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে মজার লেখা হতে পারে।
ঙ.মানিকের কুবের মাঝির কথনে চরিত্রের প্রয়োজনে এবং গ্রহণযোগ্যতার দাবিতে স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিকতা আসবে!কিন্তু লেখক যখন সাহিত্যে ঘটনার বর্ণনা দেবে তখন সে বর্ণনা কোন ভাষায় হবে? সে ভাষাটি হবে প্রমিত বাংলা।
শুরুতে ৭ই মার্চের ভাষনের কথা বলে শেষে বললাম যে কুবেরের ভাষা গ্রহনযোগ্যতার নিক্তিতে আঞ্চলিক হলেও সাহিত্যের উত্তমপুরুষ কথা বলবে প্রমিতে!কেন?কারন, প্রমিতের একটা দায়িত্ব হচ্ছে কুবের মাঝিদের সামাজিক উত্তরন!জাতীয় পাখি দোয়েল হতে পারে, কিন্তু হাজার জাতের, হাজার ধরনের পাখপাখালির কিচিরমিচিরকে মেলবন্ধনে বাধতে প্রমিত কাজ করবে রক্ষাকবচ হিশাবে!
এখন এই রক্ষাকবচ গড়তে গোষ্ঠির রাজনীতি প্রমিতকে পশ্চাদ্মুখি করে কি না তা দেখা যেতে পারে!দীর্ঘকাল সাধারণ্যের প্রমিত কথনে জীবিকার এবং যাপনের তাগিদেই আরবের, আরাকানের, আর্যাবর্তের ভাষা মিশে গেছে!দূষণ না বলে এগুলোকে সংশ্লেষণ বলা যায়।স্বাভাবিক এই মিশেলে যখন জবরদস্তি চাপানো হয়েছে, তখন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মত যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে!৫২ থেকেই ৭১এ পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বাংলাভাষিদের ধর্মবোধকে হাতিয়ার করে কথনো কখনো আরবি-ফারসি-উর্দু ঢুকিয়ে দিচ্ছে; কখনো ৫০ পরবর্তি মান ভাষার অর্জিত সংহতি নস্যাতের লক্ষ্যে আঞ্চলিক ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে!এদের হাত ধরেই লোকসংস্কৃতির অতিমুল্যায়িত আতিশয্য ঘটে; আর প্রমিতে তৈরি হয় উচ্চারণ সঙ্কটের ঘাটতি বাজেট!
রাজনীতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বাইরে মেধাবাজারের বৈষম্যমূলক বিপনন কিভাবে বাংলা প্রমিতকে বিপর্যস্ত করছে তাও বিবেচনা করা যেতে পারে!সরকারি শিক্ষাব্যাবস্থাতে কথিত আধুনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাক্রম একটা দ্বৈত এবং পরস্পরবিরোধী ব্যাবস্থা হিসাবে চালু আছে এখনো! আবার কথিত আধুনিক ব্যবস্থাতে একদল ডারউইনকে আনছে, আরেকদল বাদ দিচ্ছে!এতে করে ডারউইন নিয়ে না জানার পাশাপাশি নিছক ক্রিয়াপদের ব্যবহার নিয়েও শ্রেণীবৈষম্যকে উৎসাহিত করা হচ্ছে!আবার কথিত প্রাগ্রসরেরা শিক্ষাকে বাজার প্রতিদ্বন্দিতায় ফেলে ভাষাসহ বিভিন্ন প্রায়োগিক দক্ষতাকে ”পুঁজি যার মুল্লুক তার” প্রবর্তনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে!এতে করে প্রমিত ভাষা হয়ে পড়ছে ক্ষমতার অনুষঙ্গ; যেখানে প্রাগ্রসর এবং প্রতিক্রিয়াশীল কাজ করছে সম্পূরক হিশাবে!প্রাগ্রসর শক্তি অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে যে ”রাষ্ট্রভাষা”র কথা এনেছে; প্রতিক্রিয়াজাত ”রাষ্ট্রধর্ম” প্রবর্তনাকে একই জায়গা থেকে দেখলে বাংলাদেশের মান ভাষা দুরবস্থা থেকে গড়াবে দেউলিয়াত্বে!সার্বজনীন ফন্ট প্রণয়ন না করে দুই বাংলার একাডেমি যেমন এই দেউলিয়াপনার সুযোগে বিভিন্ন ফড়িয়া প্রকাশনা এবং কর্পোরেট জচ্চুরির অবকাশ দিচ্ছে; তেমনি ইতিমধ্যে উচ্চারণ সঙ্কটে পড়া কৌমকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মিডিয়া-মামদোদের ভুতুড়ে উচ্চারণের যোয়ালে!
ভুতুড়ে কির্তি থেকে বেরিয়ে চেহারা পাবার তাগিদেই অক্ষরের আন্দোলন!উচ্চারণ যেখানে, বানান সংস্কার সেখানে না পৌঁছালে মান ভাষার সমীকরণ আরো বিভ্রান্তিতে পড়বে! ‘হাজার বছর সংস্কৃতায়নের পর এই সেদিন অর্থাৎ ১৯৩০ অব্দিও (বাঙলাদেশের) কোন মাদ্রাসায় বাংলা হরফ চালু ছিল না! মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য চিটাগাঙ্গে আরবি হরফে বাঙলা বইয়ের প্রতিলিপি তৈরি করা হত।’
উপরের উধৃতি ধার করা আহমেদ শরীফ থেকে!উনি বাংলাকে তার মত করে ”বাঙলা’ লিখতেন!অথচ আহমদ শরীফ’ই প্রামাণ্যভাবে দেখিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষি কিরাত, নিষাদেরা ১৯৭১এর আগে অব্দি হাজার, হাজার বছর কিভাবে নিগৃহীত হয়েছে!আর যখন যট্টুকুও বা গৃহীত হয়েছে তার প্রতিদানে তাকে কতটুকু শ্রমদাশে পরিণত করা হয়েছে!উল্লেখ্য যে উপরের উধৃতিতে আহমদ শরীফ ‘আরবি’তে আরো অনেকের মত ঈকার বসিয়ে দেন নাই।এর প্রত্যুত্তরে আমরা ১৯৩০ দশকের ইংরেজ যাজকিয় তত্বাবধানে তৈরি কোলকাতার বাংলা অভিধান অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবো কি না সে প্রশ্ন তোলার সময় অনেক আগেই এসেছে!
খেয়াল রাখা দরকার যে প্রমিত বা মান ভাষা কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাষা নয়।রাষ্ট্র তার আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কী করে না করে তারা সাথে প্রমিতের ডাইনামিজম সঙ্গতি রক্ষা করলে বাংলাসহ আরো অনেক ভাষাই হারিয়ে যেত!এখন দরকার বৈদিকতা এবং ইসলামিকরনের ভিতরে গুমখুন হওয়া বাংলা ভাষাভাষিসহ এই কৌমের আত্মজ কিন্তু পরাজিত আদিবাসী উচ্চারণগুলার আরো নিবিড় প্রায়োগিক সুরতহাল: নানা উচ্চারণের গাভি(ঈ)রে ভাই একই বরন(ণ) দুধ!
প্রশান্ত মৃধা
আগে দেখতে হবে এই মিশ্রণ ভাষাকে বিপন্ন করেছে কি না রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পারি যে, বাংলা অমিশ্রিত ভাষা নয়। বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন ঘটেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলেই অনেক শব্দ এই ভাষায় ঢুকে গেছে। তবে বর্তমান সময়ে প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে বাংলা ভাষায় যে পরিমাণ শব্দ যাতায়াত করছে তা লক্ষনীয়। বাংলা ভাষার অ্যাডাপ্ট করার কিন্তু চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে; সে প্রয়োজনে শব্দ গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে। তবে দেখতে হবে, এই মিশ্রণ মান্য বা প্রামানণ্য রূপকে ব্যহত করছে কি না। যদি করে তবে তা আশঙ্কাজনক।
মিডিয়ায় যে ভাষা ব্যবহারে ভাষার মূলস্রোতকে দূষিত করছে তার প্রধান দায় নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মকর্তার। তারা নিজেরাও বাক্য প্রয়োগ, শব্দ বানান, ও শব্দ ব্যবহারে মনযোগী নয়, ঠিক তেমনি যারা দেখছে, শুনছে তারাও এসবই শিখছে।
যদি প্রশাসন উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সবাইকে বাধ্য করতো শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চায় তবে হয়ত এ মিশ্রণ ঠেকানো সম্ভব হতো। আমাদের হিন্দি কিংবা ইংরেজী ব্যবহারে এমন বাধ্যবাধকতা নেই যে ব্যবহার বা মিশ্রণ করতে হবে। কারণ আমাদের ১০০% মানুষ বাংলা ভাষা বোঝে এবং এতে অভ্যস্ত। তরুণদের দোষ আমি দেই না। এমন অন্ধ অনুকরণ ও জগাখিচুড়ী মার্কা ভাষার আর্বিভাব ঘটেছে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে।
ভাষা কখনো একদিনেই মারা যায় না তবে এর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় কিছু সময় পর। এই ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও শ্রদ্ধার কমতি নেই কিন্তু এই ভাষা ব্যবহারের জন্য আমরা এর নিয়মগুলোও ঠিকমত শিখিনা। আজ থেকে হয়ত কয়েক বছর পর ছাত্রছাত্রীরা মেধাশূণ্য জাতিগোষ্ঠিতে পরিণত হবে। কারণ যার ভাষাজ্ঞান থাকে না তার কিছুই থাকে না।
আলফ্রেড খোকন
বাংলা ভাষায় যে মিশ্রণ চলছে, তা কিছুটা হলেও ক্ষতিকর এবং এই পরিস্থিতিতে তা সামাল দেয়া কিছুটা হলেও মুশকিল। ভাষা তার প্রক্রিয়াতে শব্দ গ্রহণ করবে আবার বর্জন করবে আবার কিছু শব্দকে বাঁচিয়ে তুলবে–এটাই নিয়ম কিন্তু বর্তমানে ভাষাতে ইংরেজী ও হিন্দির একটা আধিক্য আছে, যে আধিক্যের কারণে ছোট ছোট বাচ্চারাও হিন্দি কার্টুন দেখে হিন্দিতে কথা বলছে যা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও হুমকিস্বরূপ বলে মনে করি। যেমন কলকাতাতে লোকেরা এখন হিন্দি, বাংলা ও ইংলিশ মিলিয়ে একটা ভাষায় তারা কথা বলে। যার প্রভাব এখানেও পড়বে এবং ভাষা বিকৃত হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে আমরা ভাষা নিয়ে যে গর্ব করছি তা আসলে খর্ব হচ্ছে। এবং যদি তারা ঐ ভাষা বা ধরণটা অনুসরণ করে তবে তা খুবই উদ্বিগ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
আসলে ভাষাকে নীতিমালা দিয়ে আটকানো যাবে মনে হয় না। ক্যারিয়ার দিয়ে ভাষাকে আটকানো যাবে। ভাষার একটা সার্বজনীন রীতি থাকা উচিত যা সবাই যেন মেনে চলতে পারে। এক এক প্রতিষ্ঠান একেক নিয়মে রীতি চালু করলে তা হবে বিশৃঙ্খলা। যে কোন একটা রীতি সবাইকে মেনে চলতে হবে। তাছাড়া যে হিন্দি বা ইংরেজী বিষয়গুলো সবাইকে আকৃষ্ট করে তা আমরা বাংলায়ও অনুবাদ করে ব্যবহার করতে পারি।
মিডিয়ায় কথা বলার ধরনে যে মিশ্রণ দেখতে পাই তা আটকানো যেতে পারে এরকম ব্যবস্থা করে যে, যদি মাধ্যম বাংলা হয় তবে পুরোপুরি বাংলায় অনুষ্ঠান করতে হবে।
তাছাড়া বাংলা ভাষার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও মাধ্যমে একে আবারও উজ্জীবিত করা যাবে। নতুবা একটা শংকা কিন্তু রয়েই যায়।


No comments:
Post a Comment