Wednesday, November 23, 2011

নীল-নীল তুলির আঁচড় আইসল্যাণ্ডের চার আধুনিক কবির কবিতা |

4-poets.jpg আইসল্যান্ডের মানুষেরা প্রবল কবিতাপ্রেমী—শত দুর্যোগেও তাঁরা কবিতার সঙ্গ ছাড়েন না। সেখানে কবিতার রাজত্ব রাজদরবারে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-উপকূলে, ক্ষেতে-খামারে, স্কুলে-কলেজে, সংবাদপত্রে, পত্র-পত্রিকায় ও মানুষের মনে। জাতীয় মর্যাদাহানি, নৈতিক অধঃপতন, শাসকের অত্যাচার-অনাচার, ডেনমার্কের সম্রাটের ঔপনিবেশিক শাসন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, মহামারী, মড়ক, প্লেগ—সব হাসিমুখে মেনে নেন সেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেষপালক ও জেলেরা—সুললিত ছন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। গত দু-তিন বছরে পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক দেশগুলির অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে আইসল্যান্ডে চলেছে চরমতম অর্থনৈতিক সংকট; দেশটি প্রায় দেউলিয়া—বড় বড় তিনটি ব্যাংক ভূপাতিত; কিন্তু থামেনি কবিতার চর্চা। পুরোদমে চলেছে কবিতা পড়া, কবিতা লেখা, কবিতাপত্র ও কবিতাগ্রন্থের প্রকাশ।

১৮০০ থেকে ১৯৫০ সাল—এই দেড়শ বছর আইসল্যাণ্ডের কবিতার ‘রোমান্টিক যুগ’—সেই সময় প্রাচীন মহাকাব্য থেকে আধুনিক গীতিকবিতায় উত্তরণ ঘটে আইসল্যান্ডের এবং ইউরোপের রোমান্টিক কবিদের সমূহ প্রভাব এসে পড়ে। শুধু তাই নয়, উন্মেষ ঘটে দেশটির জাতীয়তাবাদের এবং সেইসঙ্গে স্বাধীনতা-আন্দোলনের। ১৯৪৪ সালে দেশটি স্বাধীন হয় এবং স্ভেইন বিয়র্নসন (১৮৮১-১৯৫২) তার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কবিতার জগতেও রোমান্টিক যুগ শেষ হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা সেই সময়ে। একদিকে এলিয়ট, অডেন ও রিলকের প্রভাবে নব আনন্দে মেতে উঠলেন তরুণ কবিরা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত কবিরাও আইসল্যাণ্ডের প্রাচীন কাব্যরীতি পুরোপুরি ত্যাগ করে প্রাণ সঁপে দিলেন মুক্ত ছন্দের নতুন শৈলীর কবিতায়। সেখানে প্রতিফলিত হলো মানুষের মুখের ভাষা এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি—কোনো বিষয়ই আর ব্রাত্য রইল না কবিতার জগতে।

আইসল্যান্ডের সে চারজন প্রধান কবি এই কাব্যবিপ্লবের অংশীদার (এবং অবশ্যই তাঁদের সতীর্থ ছিলেন আরো অনেকে), তাঁদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তার পর বেরিয়ে পড়েছি তরুণতর কবিদের সন্ধানে। কবিদের বয়স ও প্রতিষ্ঠা না বাড়লে তাঁদের কবিতার অনুবাদ হয় না অন্য ভাষায়; এবং আইসল্যান্ডের কবিতার সন্ধানে আমরা পুরোপুরি ইংরেজি ভাষার ওপরে নির্ভরশীল। ১৯৯৪ সালে লন্ডনের ‘শ্যাড টেমস বুকস’ প্রকাশনা সংস্থা আইসল্যান্ডের প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক পল ভ্যালসনের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন চল্লিশের কম বয়সী আটজন কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সংকলন ‘Brush Strokes of Blue: The Young Poets of Iceland’। সেই সংকলন থেকে চারজন কবির নির্বাচিত কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ।

এইনার মা’র গডমুন্ডসনের জন্ম ১৯৫৪ সালে। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ডাক পিওনের একাকিত্ব’, এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তরুণ-তরুণীরা অনুপ্রাণিত হন কবিতার পঠন ও রচনায়। যুবক-যুবতীদের দুঃখ-বিষাদ থেকে শুরু করে বব ডিলানের রক রঙ্গীত—সবই তাঁর কবিতার বিষয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর তিনি অবশ্য কথাসাহিত্যের দিকে ঝোঁকেন। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সমুদ্রে এক পাথর’, তার পর থেকে তিনি পুরোপুরি গদ্যের গার্হস্থ্যে। এই কাব্যগ্রন্থের দুটি প্রধান কবিতার বাংলা অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো বার্নার্ড স্কাডারের (১৯৫৪-২০০৭) ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে। বার্নার্ড তাঁর জীবনের তিন দশক কাটিয়েছেন আইসল্যান্ডের রিকিয়াভিক শহরে, লেখাপড়া করেছেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অনুবাদকের কাজ করেছেন পত্রিকায় ও প্রকাশনা সংস্থার। এই কবির দুটি উপন্যাস—‘বৃষ্টিবিন্দুর অন্তকথন’ এবং ‘মহাবিশ্বের দেবদূত’-এর ইংরেজি অনুবাদও করেছেন তিনি।

এলিসাবেট ম্যোকুলসডোট্রির (জন্ম ১৯৫৮) আইনারের প্রায় সমবয়সী হলেও কবিতা লেখা শুরু করেছেন অনেক পরে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘এলা স্টিনার যাদুমন্ত্রের পুঁথি’ থেকে তাঁর চারটি কবিতার বাংলা অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো ডেভিড ম্যাকডাফকৃত ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে।

পরবর্তীকালে তাঁর অনুগল্পের সংকলন ‘ফুটবলের গল্প’ (প্রকাশ ২০০১) জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সাম্প্রতিকতম গ্রন্থ আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘তালাচাবি-সারাই মিস্ত্রীর সৎ উপদেশ’ (প্রকাশ ২০০৭); স্থান: ন্যুইয়র্ক, পাত্রী: আইসল্যান্ডের, লেখিকা; পাত্র: কৃষ্ণকায়, মার্কিন, ব্যান্ডের ড্রামবাদক; দুজনের সম্পর্ক, প্রেম ও যৌনতার কাহিনী।

লিন্ডা ভিলহ্যালম্‌স্‌ডোট্টির (জন্ম ১৯৫৮) কম বয়স থেকে পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখে হাত পাকিয়েছেন; ১৯৯০ সালে প্রথম গ্রন্থ ‘সরু সুতোয় দোদুল্যমান’ প্রকাশের আগে থেকেই তিনি কবিতার জগতে সুপরিচিত। প্রথম গ্রন্থ থেকেই তিনি জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা অন্তর্মুখী এবং দার্শনিক ভাবনায় পরিপূর্ণ। আইসল্যান্ডের প্রকৃতি তাঁর কাব্যভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বরফের সন্তান’ থেকে দেশের প্রধান কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি। জাতীয় কবিতা পুরস্কারে ভূষিত গ্রন্থটি। সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘তুষারের প্রজাপতি’-র (প্রকাশ ২০০৬) তিরিশটি কবিতা এখন পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর কবিতাগুলির ইংরেজি অনুবাদক সিগুর্ডার মাগনুস্‌সন ইংরেজি ভাষায় আইসল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করেছেন এবং জেসম জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন আইসল্যান্ডিক ভাষায়।

সংকলনের অন্তিম সদস্য গ্যির্ডির এলিয়াসসন (জন্ম: ১৯৬১) বহুপ্রজ লেখক—প্রতি বছর তাঁর দু-তিনটি করে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়—উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কবিতা অথবা অনুবাদ। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যরচনার সূচনা; প্রথমে ভেবেছিলেন যে, লেখাপড়া শেষ করার পর শিক্ষকতা বা অধ্যাপনা করবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহিত্যকেই পেশা হিসেবে নিলেন। প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘সমাধির দ্বার খুলে যায়’ (প্রকাশ ১৯৮৭) এবং ‘দুটি চাঁদ’ (প্রকাশ ১৯৮৯)। সেখানে তাঁর কবিতা নিরীক্ষামূলক এবং ভাষা অপ্রত্যক্ষ, কিন্তু পরে তিনি শৈলীকে করেছেন সরলতর এবং ভাষা-বিন্যাসকে মুখের কথার কাছাকাছি; যেমন, ‘গ্রীষ্মকালে শীতভ্রমণের পরিকল্পনা’ (প্রকাশ ১৯৯১) এবং ‘ছায়া-উপত্যকার মাটি’ (প্রকাশ ১৯৯২) কাব্যগ্রন্থ দুটিতে। তাঁর এখানে সংকলিত কবিতাগুলি দ্বিতীয় ও চতুর্থ গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত এবং বার্নার্ড স্কাডারের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে।

বর্তমান কালে গ্যির্ডির কথাসাতিহ্যিক হিসেবেই অধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়। তাঁর ২০০০ সালে প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন ‘হলুদ বাড়ি’ নর্ডিক কাউন্সিল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। তাঁর ‘পাথর বৃক্ষ’ উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ভিক্টোরিয়া ক্রিব; ইংল্যান্ডের ‘কমা প্রেস’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ২০০৮ সালে। তাঁর গদ্যকে বলা হয় ‘ছদ্মবেশী কবিতা’। অনেক সমালোচকের মতে তিনি জাদু বাস্তবতার প্রচলন করেছেন নর্ডিক সাহিত্যে, কিন্তু লেখক নিজে তাঁর গদ্যকে বলেন, ‘মরমী গ্রাম্যতা’ (Mystic Ruralism)। আইসল্যান্ডের তরুণতর কবিদের সন্ধান চলছে। সন্ধান পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে তাঁদের কবিতার অনুবাদ ও আলোচনা করা হবে।

অংকুর সাহা, এপ্রিল ২০১০

আইসল্যান্ডের চার আধুনিক কবির কবিতা

(অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)

এইনার মা’র গড্‌মুন্ড্‌সন

einar_mar_gudmundsson01.jpg
জন্ম: ১৯৫৪

গাথক হোমার

বৃষ্টিভেজা দুপুরবেলায়,

বহুপর্যটিত এক দ্বীপের জাহাজে ভেসে-ভেসে

গাথক হোমার এসে পৌঁছুলেন রেইক্‌য়াভিক।

ঘাট থেকে হেঁটে এসে

ট্যাক্সি নিলেন, যেটি তাঁকে

বর্ষণধূসর যত রাস্তা-বেরাস্তায় নিয়ে চলল দিগ্বিদিক্

থম-মারা বাড়িগুলি ফেলে বাঁকে-বাঁকে।

চৌরাস্তার মোড়ে ঘুরে বসে তাঁর সিটে

ড্রাইভারকে বললেন তিনি চেপে দীর্ঘশ্বাস;

‘হায়, এ কি এমনকি কল্পনা করা যায়

স্যাঁতসেঁতে ম্যাটমেটে এই একঘেয়েমিতে

এমন মশহুর এক কথক-জাতির বসবাস?’

‘ঠিক এ-জন্যেই,’ বলে ট্যাক্সি-ড্রাইভার,

‘ফোঁটাগুলি যেসময় ভাঙে জানালায়,

ইচ্ছাই করবে না কোনো কেচ্ছা শোনবার।’

জানালায় ফোঁটাগুলি ভাঙে যেসময়

আর উপসাগরে গড়িয়ে-যাওয়া ঘন কুয়াশায়

ঢেকে যায় যুগপৎ পাহাড় ও সাগর,

তখন বিতং করে বলবার মতন কিছু নাই

আছে খালি রাস্তার ছপছপ,

নাই কোনো জাদুকরি গান

কিংবা কোনো কিন্নর ভাস্কর,

কেবলই বিলীয়মান যত পদচ্ছাপ

বৃষ্টি মিলিয়ে যায় যেভাবে বিশাল পারাবারে

কিংবা শূন্যতায়, আর যে-দমকা তুফান

খেউড় গায় আর ঝাপটা মারে…

ধূসর বোরকায়

সময় গুঁড়িয়ে পথ হাঁটে,

কী এক বেমক্কা পাখি ঠায়

স্বপ্নহীন ঝুলে থাকে শহরের ছাদে,

বৃষ্টির হিজাব মেয়েদের

চেপে বসে গলার উপরে,

তারপর পৃথিবীজুড়ে ধীরে, নির্বিবাদে,

একটা জালের মতো রাতের আঁধার ঝরে পড়ে।

নায়ের বাদাম খুলে বেরিয়েছে দরিয়ায় কেউ,

ওখানে সুরেলা এক ঢেউ,

একটা বাড়ি, ঘুমে গুটিসুটি,

স্বপ্নে নিংড়ে-নেওয়া একটা গান,

দুনিয়ার ছোট-ছোট ঢেউয়ের বৃত্তটি

এক কালো সমুদ্রে ছড়ায়

আর ছোটে আলোকের যান

শিখা হয়ে রাস্তায়-রাস্তায়।

–Einar Már Gudmundsson, Homer the Singer of Tales

নীল-নীল তুলির আঁচড়

এবং সাগর…

নিজের শকল দ্যাখে যে-আয়নায় পরওয়ার দেগার

যেমন অন্ধ আর আছড়ে-পড়া ঢেউ আত্মার

উথালপাথাল, আহা, বাজুতে পাঁশুটে স্বপ্ন আর

দু’ঠোঁটে ভিনদেশি বাত তার।

সূর্য যখন ভাসে মহাসাগরের বালুতটে

একটা ঝলকে পুরো দ্বীপটা জ্বলে ওঠে,

বরফের চৌকোগুলি পাহাড়ের চূড়ায়-চূড়ায়,

পেয়ালারা টৈটম্বুর রাতুল সুরায়।

এ এক ক্যানভাস সারা দুনিয়ায় টানা,

তুঙ্গ ক্লিফের ফ্রেমে আঁটা,

নোনা একটা ফোঁটায় ঝলসানো এক আয়না,

চৌধারে কিচমিচ পাখি, পাথরের পাটা।

চেয়ে দ্যাখো, তুলির আঁচড়গুলি ঐ

থিরথির ছড়িয়ে পড়ছে তামাম নিখিলে,

সুরেলা ঢেউয়ের টাটকা নীলে

শব্দেরা ঝাপটায় ডানা মাছের মতোই।

আর ফেনা…

যেন পাকা দাড়ি কোনো বুড়ার অচেনা

যে-বুড়া বেলায় পা-টা রেখেই আবার

মিলায়; আঁধার—ফুলে-ওঠা পারাবার।

জ্যোৎস্নার বিরান ময়দানে

ঢেউ উঠে একটা কালো বেয়ালায় মেঘের চুলের ছড় টানে,

মান্ধাতার আমলের লাঠির হুকুমে ওঠে নাচ

আর এক অতীত স্বপ্ন থেকে আসে কূলঙ্কষ ঢেউয়ের আওয়াজ,

হেরিং মাছের জীর্ণ জেটিটিতে নানা অভিজ্ঞান

কিংবা ধুধু অতীতের উচ্চাসন থামের কাতার…

এই দ্বীপ একটা ভাসমান

বর্ম, যাতে বর্শা-হেন থরে-থরে উঁচোনো পাথর।

এবং সাগর…

এই সে তট থেকে ডাঙায় এল উঠে,

দৌড়ে গিয়ে সোজা ঢুকল গাঁ’য়

ধূসর কুয়াশার জোব্বা-গা’য়,

ছিনিয়ে নিয়ে গেল বাচ্চাদের সব,

তাদের হাত ধ’রে চলল পথে ছুটে

স্বপ্ন বেড়াটার ওপারে ছপছপ

ঈষৎ বীচিময় হলুদ পল্বলে;

বাচ্চাদের সাথে সারা দ্বীপে,

বাজনা বাজে চোখে নীলের কল্লোলে,

পরে সে শুয়ে পড়ে খাড়া ক্লিফের

পিছনে, ঘুম দিল নাক ডেকে,

পাখিরা কিচমিচ চৌদিকে।

* * *

স্বপ্নের ভিতরে যেন জীবনের উষ্ণ প্রস্রবণ

রাতের অতল অন্ধকূপে,

ম্রিয়মাণ বাতাসের মকবরায় আছে আভুবন

তোমার রাস্তারা সব বে-নিশানা কুয়াশায় ডুবে।

ফেলে চলে গেছে, তবু তাদের জুতার সুকতলির

তলে কত ফোয়ারার খুলে যায় খিল,

একেকটা আঁচড় এই ভুবন-তুলির

লেজুড়ের ঘাই-মারা শব্দের নীল।

–Einar Már Gudmundsson, Brush Strokes of Blue

এলিসাবেট য়্যোকুল্স্ডোট্টির

elisabet_j_01.jpg
জন্ম: ১৯৫৮

যে-শিশুটি পেয়েছে ভর্তুকি

এক যে ছিল বাচ্চা, তার বাপ-মা ছিলেন এতই সুবিবেচক, তাঁরা বাচ্চাটিকে নিয়মিত ভর্তুকি দিতেন। অবশ্যই তার গায়ে কোনো পট্টি কিংবা ব্যান্ডেজ কেউ কখনো দ্যাখে নি। বাচ্চাটা ঐ ঘুষগুলিকে খুশিমনেই নিত, তবে আস্তে-আস্তে লোভের শিকার হয়ে পড়েছিল যে সে সেটা আত্ম-নিপীড়নের চিহ্ন হয়ে ফুটে উঠত মুখে। গল্পটা শেষ করতে আমার যোগ করতে হয় যে যখন বড় হয়ে উঠল সে, এই একগুঁয়ে ভুল-ধারণাটা কায়েমি হয়ে গেল মাথায় তার; জীবন তার ধারেই কিছু ধার।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Child Who Received Compensation

সাত ছেলে

ছেলেঘেঁষা মেয়েটি তো একইসাথে অনেক ছেলের প্রেমে পড়ল। পয়লার গলা এত মধুর, মেয়েটা শুতে চাইল তার সাথে; দুসরার চওড়া কাঁধে আঙুল চালাতে তার লোভ হলো খুব; তৃতীয়টি মঞ্চে করত এমন অভিনয় যে তার ফিরে এল জীবনে বিশ্বাস; চৌঠার পূজা আর প্রশংসায় সে তো বাধ্য হয়ে পড়ত আয়নায় তাকাতে; পঞ্চমের চোখ-দু’টি ছিল নক্ষত্রের মতো, ইচ্ছা করত তার সাথে নৌকা বেয়ে যেতে; ষষ্ঠটি যথেষ্ট ছোট ছিল তার চেয়ে আর তখনই সময় আর সুর পাল্টেছিল; কিন্তু সপ্তমই ছিল সকলের সেরা, কেননা কিছুই তার মালুম হতো না আর, খালি টের পেত তার সবগুলি তার বেজে উঠেছে একসাথে আর পাহাড়ের ধার থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সে পাগলাঝোরা। আর তাকে রিং দিতে যখনই গিয়েছে, হায়, ফোনটায় আগুন ধরে গেছে।

Elisabet Jökulsdóttir, The Seven Boys

মাছের কলিজা-খাওয়া মেয়েটি

একটা ছোট্ট মেয়েকে চিনতাম যার রোজকার খাবার ছিল মাছের কলিজা। একটা ফিশবোল-ভরা গোল্ডফিশ ছিল তার, সারাদিন বাসায় থাকত সে তার মাছেদের সাথে। তার বাবা-মাকে নিত্যি আরও মাছ কিনতে হতো, কারণ কাজের থেকে ফিরে রোজই শুনত তারা আজকে একটা, কালকে তিনটা মাছ মরে গেছে। বাবা-মা যখন জানতে চাইত মরা মাছগুলি কোথায়, সে বলত, তাদেরকে গোর দিয়েছে সে বাগানের কোনো গর্তে, কিংবা ছুড়ে ফেলেছে ডাস্টবিনে। তারা অতএব আরও-আরও মাছ কিনে চলল, কেননা বেচারি একা থাকে সারা দিন। কিন্তু একদিন ওর মা যখন ফুলদানিগুলির ফুল বদলে দিচ্ছে, তখন প্রত্যেকটিতে পাওয়া গেল গাদি করে রাখা মরা মাছ। প্রবল জেরার মুখে জানা গেল মেয়েটা মাছগুলি কেটে কলজে বের করে খেত প্রতিদিন অন্তত একখানা। বাবা-মা কারণ জানতে চাওয়ায় মেয়েটি বলল, সে কিছু জানে না। তখন মেন্টাল হসপিটালের ওয়ার্ডে রেখে দিল তারা তাকে, যার একমাত্র কারণ এই-যে, জানত না সে কেন খেত মাছের কলিজা।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Little Girl Who Lived on Fishes’ Hearts

ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ে

ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ের বাপ-মা ছিল, যারা দু’জন চলে গেল নিজের-নিজের পথে। বাচ্চাগুলি পড়ে রইল, পালা করে তাকাল তারা পূর্বে ও পশ্চিমে, দেখল তাদের বাপ-মা মিলিয়ে যাচ্ছে মিলিয়ে যাচ্ছে একটা নীলচে কুহেলিকায়, তার পর উধাও হলো তাদের দূরদৃষ্টিতেও। বাচ্চাগুলি তখন একটা ফন্দি আঁটল, এবং পরে লোকজন তো ভেবেই অবাক, এরা কেন চায় না এদের জানাশোনার পরিধি বাড়াতে! যেখানটাতে ওরা সবাই বাপ-মা-সমেত ছিল আগে, সেখানে এক গাছ গজাল হেঁটমুণ্ড-ঊর্ধ্বপদ, মাটির মধ্যে সেঁধিয়ে ডালপালা। ভাঙা-ঘরের ছেলেমেয়ে আজও হামা দিয়ে সেথায় ছেঁটে যাচ্ছে তাদের শিকড়গুলি।

–Elisabet Jökulsdóttir, The Divorce Children

লিন্ডা ভিলহ্যালম্স্ডোট্টির

linda_v02.jpg
জন্ম: ১৯৫৮

মোনালিসা

প্রথম মোজেইক

সেদিন সকালে একটা রামধনু সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিল

এন্‌গেয়্‌[১]-এর পশ্চিম দিকে

ভিডেয়্‌-এর পশ্চিম দ্বীপের পূর্বে গোত্তা খেয়েছিল

আল্লাহর ওয়াস্তে যদি বৃষ্টি ঝরেই থাকে

ছাই আর বালি আর চুনাপাথরের

কোন কাণ্ড হয়েছিল তার আগের রাতে?

দ্বিতীয় মোজেইক

রাতটি মাথায় চড়ে বসছিল আমার

দু’জন মহিলা মারা গেছিল তৃতীয় মহিলাও

সুবেসাদিকের অক্তে উবে যাচ্ছিল

মাথায় আসছিল খালি তিনটি বিষয়ই

যন্ত্রণায় আতঙ্কে ও অ্যানেসথিসিয়ায়

কুঁকড়ে-যাওয়া মুখ

শেষ নিঃশ্বাসের সাথে

মুখে-ফোটা হাসি

এবং শেষমেশ

মেনে যে নিলাম অর্থ আমি

শান্তি শব্দটির

তৃতীয় মোজেইক

মসৃণ আর সরল চৌহদ্দি আর মণ্ডপে সারি আর কেউ যদি ভারী ব্রঞ্জের দরোজা দিয়ে ঢুকে একাকী দাঁড়ায় একটা খিলানের নিচে আর মাথার উপরে তার একটা গোলাকার গর্ত খোলা থাকে আকাশের দিকে আর চোখ তার দিগন্ত চেনে না, তার ঠোঁট থেকে নিংড়ে বার করা হয় সুললিত ‘ওহ্!’ যেটি বার করতে যুঝেছে সে বছর-বছরব্যাপী কৃচ্ছ্রসাধনায়। পরে সে জবরদস্তি করে বলবে তার চোখে পড়েছিল এক-কণা বালি।

–Linda Vilhjálmsdóttir, Mona Lisa

[১] এন্‌গেয়্‌ আর ভিডেয়্‌ (Engey & Videy) আইসল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে (রেইক্‌য়াভিক-এর কাছে) দুটি ছোট দ্বীপ।

রাতগুলি

বালুকাবেলায় বড্ড ঠাণ্ডা আজকের রাত

যে-মেয়ে নাইতে নেমেছে ভাটার নেমে-যাওয়া জলে

হাঁ হয়ে দেখল পাথরে বসেছে আরেকটা মেয়ে

সোনালি চুলের প্রেমিক ঝাড়ছে কালো চুল থেকে

তার দুটি সরু নাজুক আঙ্গুলে। এবং ভিনাস,

হায় রে ভিনাস পুড়ে যায় ভেজা সমুদ্রজলে।

–Linda Vilhjálmsdóttir, Nights

গ্যির্ডির এলিয়াসসন
gyrdir_eliaasson02.jpg
জন্ম: ১৯৬১

অন্ধতা

সুবেসাদিকের সাথে

জেগে উঠব আমি,

উঠব ছুরিগুলির সকাশে

যে-ছুরিরা

খুলে দেবে আবার আমার

দৃষ্টি, আমি যে-ছুরিগুলিকে

বিছিয়ে রেখেছিলাম ঘাসে,

যে-ঝলমলে ঘাস

গজায় এবং আমি দেখি না যাদের

আমার দরজার

বাইরে। আমি সূর্যকে ঝলসাতে

দিই ফলাগুলির উপর

আর তার পর

তাদের বসিয়ে দিই চোখে

আর চোখ চিরে দেখি

বিশাল আকাশ

ছড়িয়ে রয়েছে একটা

কালো পৃষ্ঠায়

নীল জলরঙের মতন

–Gyrdir Eliasson, Blindness

হূসাফেল[২], গ্রীষ্মের শেষে

বারবিকিউ করছিলাম আমরা বারান্দায় আর ক্যাবিনটা ধোঁয়ায়

ভরে গিয়েছিল। আমি চুপিচুপি রান্না

ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম আর হাঁটতে

শুরু করে দিলাম জমাট-লাভা-পথে ইচ্ছা ছিল

দূরের কুলকুল-করা নদীটার কাছে যাব কিন্তু

লাভাটা বেজায় রুক্ষ পায়ের তলায় তদুপরি

আমার নূতন জুতা এই চোখা-চোখা

পাথরের খোঁচাগুলি সামলাতে পারবে না। আমি বসি

আর দেখতে পাই একটা মাকড়সা লড়িয়ে দিচ্ছে জান

ঊর্ণার বয়নে আর আমার কেবলই টাস্‌কি লাগে

ঐ-তো একরত্তি একটা হালকা-পলকা প্রাণী

কেমন করে এ পারল সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে এই

চরকা তৈরি করে ফেলতে আর ঘাড় তুলে আমি দিব্যি

আকাশ দেখবার ইঞ্চিখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই।

–Gyrdir Eliasson, Husafell in Late Summer

[২] হূসাফেল, দক্ষিণ আইসল্যান্ডের এক লাভা-আকীর্ণ, টুরিস্ট-মোহন স্থান।

ব্র্যুগেল[৩] -এর নানা নমুনা

পাহাড়ের উপরে এক দেহাতি সবুজ-রঙ গির্জা

আর দাঁড়কাকের দঙ্গল

আর এক হারমোনিকা-বাজিয়ে

সারাই করছে তার ঘরের চাল

জানালার হলুদ পালা

বুক চিতিয়ে হাঁটছে মুণ্ডুহীন মুর্গিগুলি

ঘোলা কাচের উপর

শিরিস কাগজ ঘষে চকচকে করছে সন্ধ্যা

পর্বতের খাড়াইগুলিকে

আমার মন

ঝেঁটিয়ে বার করছে যত চিল-চিৎকৃত চিন্তা তার

বাচ্চারা স্কেট করছে জমে-যাওয়া পানিবাঘ ডোবায়

একটা বাঁকা-চাঁদের তলায়

অ্যাকর্ডিয়ন-বাদিকাটি লম্ফের আলোয়

সানগ্লাস পরে

পড়ছে

ছোট্ট পাখিগুলি ঘুমাচ্ছে স্বপ্নহীন

চিমনির ভিতর

–Gyrdir Eliasson, Bruegel Variations

[৩] ষোড়শ শতকের বিশ্ববিখ্যাত ফ্লেমিশ চিত্রশিল্পী পিটার ব্র্যুগেল। তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলির মধ্যে আছে দ্য ফল অব দ্য রেবল এঞ্জেল্জ্দ্য ফল অব ইকারুস

গ্রীষ্মের পড়া

টেবিলে একটা বই, বন্ধ,

অন্ধ হোমারের, টেবিলটা

বারান্দায় আর চড়া রোদ

জেটি থেকে নৌকাগুলি থেকে

নিয়ে আসে মাছ, মোটরের

গোঁ-গোঁ প্রতিধ্বনিত পর্বতে

আচার্যের উঠানে ঘোড়াটা

ঘাস খায় কিন্তু আমি চা

খাচ্ছি তাকিয়ে অন্য দিকে

বইটা আবার খুলে পড়ো

নেমে পড়ো আবছা আর মৃত

বৃত্তের পাতাল-দেশে-দেশে

বোধ করো এই উজ্জ্বলতা

নীলাকাশ মাথার উপর

মাটির উপরে থাকা—আহা!

–Gyrdir Eliasson, Summer Reading

original post

No comments:

affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site