সেদিন চেম্বারে ,
অন্যান্য সব দিনের মতই সারাদিনের রোগী দেখা শেষে সন্ধ্যায় বসলাম সব ইনভেস্টিগেশান রিপোর্ট চেক করতে, চমকে গেলাম একটা রক্ত পরিক্ষার রিপোর্ট দেখে, HIV POSITIVE !! যদিও ডাক্তার হিসাবে কোন রিপোর্ট বা অসুখ দেখে চমকে যাওয়া আমার উচিৎ না তবুও HIV POSITIVE দেখলে কার না সংশয় হয় ! সাথে সাথে আবার টেস্ট করাতে দিলাম, এবারেও একই। এবার HIV TEST এর ২য় আর কন্ফার্ম টেস্ট টা করাতে দিলাম, সেখানেও একই পেলাম, অর্থাৎ HIV POSITIVE, AIDS TEST POSITIVE। এসব টেস্ট করাতে এবং রিপোর্ট পেতে আমার কয়েকদিন সময় লাগলো, ইতিমধ্যে আমি ঐ লোকটাকে আবার খবর দিলাম......
আমি সাধারনতঃ রোগী দেখবার সময়ই রোগীর সব HISTORY বা ইতিহাস জেনে নেই আর তারপর রিপোর্ট পাবার পর প্রয়োজনে বাকীটা জানতে চাই, এই লোকটার ক্ষেত্রেও তাই করলাম। জানতে চাইলাম HIV POSITIVE হবার আনুষন্গিক সব ইতিহাস, তাকে রিপোর্ট জানাবার আগেই। কিন্তু অনেকক্ষণ HISTORY নেবার পরেও এমন কোন তথ্য বা কারন পেলামনা যেটা থেকে মেলাতে পারব যে কেন এ অসুখটা তার হলো। কোন ইন্জেকশান ব্যবহার, ড্রাগ নেয়া, রক্ত দেয়া অথবা নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন পুরুষ-নারীর সাথে মেলামেশা .....ইত্যাদি যা যা কারন হতে পারে সবই জিগেস করলাম, কিন্তু সবকিছুরই উত্তর "না" .....বুঝলাম, যে কোন কারনেই হোক সে মিথ্যা বলছে আমাকে, এরপর জানতে চাইলাম তার কি মনে হচ্ছে , কি সমস্যা হতে পারে তার, জবাবে সে বল্ল, সে জানেনা কেন একটানা জ্বরে ভুগছে, সন্দেহ করছে ফ্লু।
আমি এবার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিয়ে রিপোর্ট টা তাকে জানানোর আগে জানতে চাইলাম তার কাছে, সে বাসা থেকে কাওকে খবর দেবে কিনা , কিম্বা কোন খারাপ রিপোর্ট জানবার মত মানসিক শক্তি ঐ মুহুর্তে তার আছে কিনা ! মোট কথা BREAKING BAD NEWS এর সব রকম প্রস্তুতি নিলাম। সাথে এও জানতে চাইলাম HIV, AIDS POSITIVE সম্পর্কে তার কোন ধারনা আছে কিনা আর থাকলে তা কতটুকু । এরপর সেই কঠিন সময়টা এল, যখন তাকে টেস্ট এর রেজাল্ট জানাব। এই ব্যাপারটা যে কত কষ্টের, কত কষ্ট করে যে নিজেকে স্বাভাবিক আর শক্ত রাখতে হয় সেটা একমাত্র যে ডাক্তার সেই মনে হয় বোঝে ! বুঝতে পারছিলাম লোকটার উৎকন্ঠা বাড়ছে , তাই আর দেরী না করে তার মানসিক অবস্থার দিকে মনোযোগী হয়ে আস্তে আস্তে তাকে সব জানালাম। স্বাভাবিক ভাবেই সে সব শুনে ভীষণ রকম কান্না কাটি শুরু করে দিল সে।
আমি তাকে কাঁদতে দিলাম, থামালামনা। অনেকটা সময় নিয়ে সে কাঁদলো। তারপর হটাৎ ওঠে রেগে গিয়ে বল্ল, " আমি বিশ্বাস করিনা, আপনার রিপোর্ট ভুল , আবার টেস্ট করান।" আমি যতই তাকে বল্লাম যে অনেকবার টেস্ট করে কন্ফার্ম হয়েছি কিন্তু সে কিছুতেই আমার কথা শুনবেনা , শুনলোওনা। যাই হোক আমি আবার তার রক্ত নিয়ে টেস্ট করাতে দিলাম। এরপর তাকে পরে একদিন আমার চেম্বারে আসার জন্য তারিখ দিলাম আর সাথে তার বৌ-বাচ্চাকে আনতে বল্লাম টেস্ট করানোর জন্য। সাথে এও জানালাম যে তার বৌ এর কাছ থেকে শারিরীক দিক থেকে তাকে আপাততঃ দূরে থাকতে আর বৌকে তার অসুস্থতার কথা জানাতে, সে যদি নাও পারে তবে আমি জানাব কিন্তু জানাতে হবে। কিন্তু সে তাদেরকে কিছুতেই আনবেনা । আমি অনেক বোঝালাম কারনটা যে কেন তাদের টেস্ট করাতে চাচ্ছি কিন্তু সে তাও রাজী না হয়ে চলে গেল....
এরপর আমি অনেকদিন পর্যন্ত ঐ লোকটার অপেক্ষায় থেকেও আর তাকে পাইনি, ওর ঠিকানায় খবর নিয়ে জানতে পারলাম যে সে আর সেখানে থাকেনা । তখন তার আশেপাশে জানিয়ে রাখলাম যদি কেও তার বৌ-বাচ্চাদের দেখে তাহলে যেন আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়, খুব জরুরী। ঐ পোস্টে চিঠিও পাঠিয়ে রাখলাম। কিন্তু রোগ বিষয়ক কিছু জানালামনা আর আমি যে ডাক্তার তাও কাওকে জানালামনা। মনে মনে ভাবলাম কি জানি কি হলো লোকটার। বেশ খারাপ লাগলো চিন্তা করে যে কোথায়, কেমন আছে, চিকিৎসাও নিলোনা। সবচেয়ে টেনশান শুরু হলো আমার তার বৌ-বাচ্চাদের নিয়ে। তাদের কি অবস্থা কে জানে !!
এর কয়েকমাস পর...... ,
চেম্বারে রোগী দেখছি, হটাৎ এক মহিলা তার বাচ্চা নিয়ে এসে জোড়াজুড়ি শুরু করে দিলো যে সে এখুনি দেখা করতে চায় আমার সাথে, এপয়েন্টমেন্ট করাবেনা, তখনই দেখাবে। অপেক্ষাও করবেনা, আমি ইমার্জেন্সী মনে করে ডাকলাম মহিলাকে। ফুটফুটে সুন্দর পরীর মত ২ বছরের এক মেয়েকে নিয়ে এক অপরুপা মহিলা ঢুকলো আমার ঘরে। পরিচয় নিয়ে জানতে পারলাম ঐ AIDS TEST POSITIVE লোকটার স্ত্রী আর কন্যা তারা। একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলাম লোকটা কোথায়, আসেনি কেন। মহিলা কোন কথার উত্তর না দিয়ে কান্না শুরু করে দিল । আল্টিমেটলী জানতে পারলাম লোকটা আর বেঁচে নাই, কিছুদিন আগেই চলে গেছে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে !!
মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আমার, মহিলাকে আসস্ত করে আস্তে আস্তে জানতে চাইলাম গত কয়েক মাসের ঘটনা, আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বল্ল, সে কিছুই জানেনা, কেন তার স্বামী মারা গেল। সে এটাও জানেনা আমি কেন খবর দিয়েছি তাদের, আরো অবাক হলাম যখন জানলাম, তার স্বামী তাকে কোনদিন বলেনি যে সে কখনো কোন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল !! সে শুধু অবাক হয়ে জানতে চাইল কেন আমি খবর দিয়েছি, তারা অন্য ঠিকানায় থাকে এখন, জানেনা কেন স্বামী হটাৎ বাসা বদলেছে। এমনি একদিন আগের ঠিকানায় গিয়ে জেনেছে যে আমি খোঁজ করছি, তাই আসা।
আমি তাকে আর কিছুই না বলে শুধু বল্লাম, "এসেছেন যখন ডাক্তারের চেম্বারে কিছু পরীক্ষা করে যান কারন সবারই রেগুলার চেক আপ করানো দরকার, তাছাড়া আপনার স্বামীর কিছু শারিরীক সমস্যা ছিল যেটা আপনার মাঝে ছড়াতে পারে তাই টেস্ট করে দেখা দরকার"। আমি এটাও বল্লাম যে এই টেস্ট করানো এবং রোগী দেখার জন্য ওনাদের কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেবোনা আমি। মহিলা কোন ঝামেলা না করে রাজী হয়ে গেল, এরপর মা ও মেয়ে দুজনেরই HIV/AIDS সহ অনেক গুলি TEST করালাম। যথাসময়ে রিপোর্ট গুলি যখন আমার হাতে এল, টেস্ট রিপোর্ট দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম........ দুজনেরই HIV, AIDS POSITIVE আর মা'টা PREGNANT !!!!
একটু সচেতন হলেই হয়ত আমরা এড়াতে পারি নিজদেরকে এসব ঘাতক ব্যধি থেকে। লোকটার মত অনেকেই সামাজিক লোক লজ্জার ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন না নিজেদের এইসব রোগের কথা। যার ফলস্বরুপ তার এই অসচেতনতা তাকে মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত করে জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে চিরতরে, সাথে মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত করেছে তার স্ত্রীকে, কন্যাকে এবং হয়ত আগত শিশুকেও !!
অ: ক: , জীবন চলার পথে কত যে ঘটনা দেখি , জানি আমরা । মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, মানুষের জীবনটা কতই না বিচিত্র ! মেডিক্যাল এর পড়ার সময় অন্য সব শিক্ষার পাশাপাশি যে শিক্ষাটা আমি ভীষণ ভাবে গ্রহন করেছি, তা হলো Medical ethics টাকে মেনে চলা। আর তাই কখনো এই জীবনটা কারো সাথে সেয়ার করিনি, তবে হ্যা, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পরামর্শ নিয়েছি, সাজেশান চেয়েছি আমার সিনিয়ারদের কাছে, কলিগের কাছে । কিন্তু তাও রোগীর ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করে। আমার চিকিৎসা জীবনের বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করার মানসিকতা নিয়ে এই পোষ্ট দিলাম।
original post


No comments:
Post a Comment