প্রথাগতভাবে যে সকল তৈজসপত্র মুঠোফোনের জন্য পাওয়া যায় তাদেরকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বৈজ্ঞানিকেরা সাধারণ মুঠোফোনের সাথে একটি যন্ত্র সংযুক্ত করে এর ফ্লুরোসেন্ট (প্রতিপ্রভ) অণুবীক্ষণ কার্যক্ষমতাকে প্রদর্শন করেছেন। এই যন্ত্রটির পেছনে যে সকল বৈজ্ঞানিক রয়েছেন তাদের মতে এর সাহায্যে ম্যালেরিয়া এবং যক্ষার জীবাণু সনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে যেখানে স্বাস্থ্য পরিচর্যা সীমিত অথবা মার্কিন গ্রাম অঞ্চলে।

সেলোস্কোপ (“Cellscope”) বার্কলেতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আলোকবিদ্যা-শ্রেণীর (optics-class) প্রকল্প, যা রক্ত ও থুতুর নমুনার বিবর্ধিত চিত্রের সহজ বিশ্লেষণ করতে পারে, এছাড়া সেলফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ছবিগুলোকে আরো গভীর বিশ্লেষণের জন্য অন্যত্র প্রেরণ করবার ক্ষমতা রাখে।
এই যন্ত্রটি দেখতে অদ্ভুত – একটি নলের (tube) মত বর্ধিতাংশ একটি বেল্ট ক্লিপের সাহায্যে সেল ফোনের সাথে সংযুক্ত – যা একটি সাধারণ অণুবীক্ষণযন্ত্রের ন্যায় কাজ করে, একদল লেন্স ব্যাবহারের মাধ্যমে অণুবীক্ষণযন্ত্রের স্লাইডের উপরে রাখা রক্ত বা থুতুর নমুনাকে বিবর্ধিত করে। যেমন, টিবি সনাক্ত করবার জন্য, থুতুর নমুনাকে অরামিন (auramine) নামক একটি সস্তা রঙ্গের (dye) সঙ্গে চারিত (infused) করা হয়। একটি “উদ্দীপক” ( “excitation”) তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্গত হয় আলোর উৎস হতে – একটি নীল আলো বের হয় এমন ডায়োড (LED) থেকে যা সেল ফোনে সংযুক্ত ডিভাইসের বিপরীত প্রান্ত থেকে নির্গত হয় – এবং থুতুর নমুনাতে মেশানো অরামিন তা শোষন করে নেয়, যা টিবির ব্যাকটেরিয়াকে সবুজাভ আভায় ফুটিয়ে তোলে। পরে স্বয়ংক্রিয় সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে তখন তখনি (in real time) সবুজ ব্যাকটেরিয়াগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব রোগের অবস্থা নির্ণয়ের জন্য অথবা চিত্রগুলো সেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি আলাদা স্থানে প্রেরণ করা যাবে যেখানে ডাক্তাররা একে বিশ্লেষণ করে সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে সমাধান প্রদান করবেন।
“সেলফোন পদ্ধতিটি বিশ্বের সমস্ত অংশের জন্য খুবই মূল্যবান বিশেষ করে যেখানে চিকিৎসার সরঞ্জাম অপ্রতুল”, বলেছেন আয়োডোগান অজক্যান (Aydogan Ozcan), ইউসিএলএ’র বৈদ্যুতিক প্রকৌশল (electrical engineering) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, যিনি এ মুহূর্তে এই পদ্ধটিকে আরো উন্নত করে লেন্স-বিহীন করবার চেষ্টায় রয়েছেন।
এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত গবেষকগণের নেতৃত্ব দিয়েছেন বার্কলের বায়োপ্রকৌশল (bioengineering) বিভাগের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ফ্লেচার, একটি প্লাস ওয়ান (PLoS One) নামক জার্নাল প্রকাশিত প্রবন্ধে তিনি তাঁদের কাজের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করতে গিয়ে জানিয়েছেন, প্রথম দিকে তাঁরা একটি প্রোটোটাইপ ডিভাইসে ব্যবহার করেছিলে সাদা আলো, অথবা উজ্জ্বল-ক্ষেত্র ইমেজিং (bright-field imaging), যার মাধ্যমে রক্ত কোষের দাগকে বিবর্ধিত ছবির তুলে রক্ত ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট আবিষ্কার করবার জন্য। এটি এমন এক পন্থা যার মাধ্যমে সনাক্ত করা সম্ভব অদ্ভুত আকৃতির লাল রক্তকোষে (red blood cell) সিকেল সেল রোগ (sickle cell disease)। ফ্লুরোসেন্ট (প্রতিপ্রভা) রোগ নির্ণয়ের একটি নতুন ক্ষমতা যা বিশেষভাবে দরকারী হয়ে পড়বে যদি এটাকে সস্তা এবং বহনযোগ্য করা যায়।
‘ফ্লুরোসেন্ট (প্রতিপ্রভ) অণুবীক্ষণের মাধ্যমে রোগ নির্ধারণ করবার সুবিধা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কঠিন।’ বললেন ইউসিএসএফ (UCSF) এর স্কুল অভ মেডিসিনের বায়োপ্রকৌশলী ও চিকিৎসক উইলবার ল্যাম, যিনি প্রকল্পটিতে ক্লিনিকাল এক্সপার্ট হিসাবে কাজ করছেন। তার মতে, ‘ল্যাব-গ্রেড ফ্লুরোসেন্ট প্রযুক্তি ব্যয়বহুল এবং কাজটি সহজ নয়, এছাড়া এ জন্য প্রয়োজন ডার্ক রুম, মার্কারি আলো এবং প্রয়োজন প্রচুর প্রশিক্ষণের।’ এই সুবিধা উপলব্ধ করা উন্নয়নশীল দেশের অনেক অঞ্চলের পক্ষে সম্ভব নয়, আর ল্যামের মতে সেই সকল জায়গায় টিবির মত সাধারণ রোগ সনাক্ত করবার জন্য সেলস্কোপ ব্যবহার করা যাবে। এই ডিভাইসটি দূরবর্তী এলাকায় স্বাস্থ্য কর্মীদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে প্রতিপ্রভা ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি নাগালের মধ্যে আনা সম্ভবপর হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে টিবি সনাক্তকরণ যন্ত্র হিসাবে এটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ, যে কারো পক্ষে একটি উজ্জ্বল-ক্ষেত্রের পটভূমিতে সবুজাভ দাগ খুজে পাওয়া সম্ভব। যদিও প্রথাগত প্রতিপ্রভা সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাইক্রোস্কোপ স্লাইড উপর থেকে দাগ গণনা করা স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সহজ নয়। আর তাই, বার্কলে গ্রুপ একটি সফ্টওয়্যার তৈরি করেছে যার মাধ্যমে সবুজ দাগগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা করা হয়; যখন তা স্মার্ট ফোনে ইনস্টল করা থাকে, এর মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি হয়ে পড়েছে সহজ এবং দ্রুত।
এছাড়াও যেহেতু একজন টিবি রোগীকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীর সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়, এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে রোগীর অবস্থার চিত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতির বা কোন জটিলতা সৃষ্টির পূর্বেই জানা সম্ভব হয়।
ছবিগুলো প্রেরণ করবার মাধ্যমে টেলেমেডিসিন সুবিধা এবং জিপিএস ট্যাগ যুক্ত থাকায় কোন রোগের প্রারম্ভিক প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা প্রদান করা সম্ভব।
মেডিক্যাল রেকর্ডকে ডিজিটাইজড করবার ক্ষেত্রে ফ্লেচারের গ্রুপ সমস্যায় পড়ে বাংলাদেশ এবং কঙ্গোতে। সেখানে কাগজ-কলমের রেকর্ড সহজেই হারিয়ে যায়। এ সমস্যাও সেল ফোন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, প্রত্যেক ডিজিটাল ইমেযে রোগীর-সনাক্তকরণ তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে। রেকর্ডস তারপর সহজে অনুসন্ধান করা যাবে যখন রোগী আবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ফিরে আসবে তখন।
বিশ্বে যখন চার বিলিয়ন সেল ফোন রয়েছে, অজকানের মতে, অনেক উন্নয়নশীল দেশ, সেল ফোন মাইক্রোস্কোপ এর মাধ্যমে বিদ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে।


No comments:
Post a Comment