Friday, June 17, 2011

গান্ধার শিল্প



আজ থেকে প্রায় ২০০০ হাজার বছর আগে গ্রিক ভাস্কররা স্বেচ্ছায় বৌদ্ধমূর্তি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যে বিরল ঘটনাটি ভারতবর্ষে ‘গান্ধার’ নামে এক অভূতপূর্ব শিল্পরীতির জন্ম দিয়েছিল এবং যে বিস্ময়কর শিল্পরীতির মূলে রয়েছে ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম এবং গ্রিক শিল্পরীতির মিশ্রণ; যে কারণে গান্ধার শিল্পকে ‘গ্রিক-বৌদ্ধ’ শিল্প বলে অবহিত করা হয়। অনেকে এই শিল্পকে আবার ভারতীয় শিল্পে আরোপিত গ্রিক শিল্পরীতির স্থানীয় প্রকাশ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে আবার মনে করেন, গান্ধার শিল্পের ভাস্করের অন্তরটি ছিল ভারতীয় কিন্তু হাত দু’টি ছিল গ্রিক ...


প্রাচীন গান্ধার রাজ্যের মানচিত্র

প্রাচীন ‘গান্ধার’ রাজ্যের অবস্থান ছিল বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডি-এই দুটি প্রদেশে। গ্রিকরা গান্ধারকে বলত ‘গান্ডারীর নগর’। গান্ধারের রাজধানী ছিল তক্ষশিলা । শিক্ষা ও বানিজ্যকেন্দ্র হিসাবে তক্ষশিলা সুপরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি পারস্যের সম্রাট করু বা সাইরাস গান্ধার জয় করেন। পারস্য সম্রাট ডারিয়ুসের বেহিস্তান শিলালিপিতে (খ্রিস্টপূর্ব ৫২০-৫১৮) গান্ধারগন কে আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের প্রজাপুঞ্জের অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রিসের সঙ্গে পারস্যের যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। পারস্যের সৈন্যবাহিনীতে ‘সুতির কাপড় পরা’ ভারতীয় সৈন্যের উল্লেখ করেছেন গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস।



প্রাচীন গান্ধার রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ।

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের শুরুতে আলেকজান্দার ব্যাকট্রিকা এবং বুখারা জয় করে সির দরিয়া অবধি অগ্রসর হন। এর পর হিন্দুকুশ পাহাড়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে মে মাসে সিন্ধু নদের নিকটে পৌঁছেন। গান্ধারের রাজধানী তক্ষশিলা ছিল সিন্ধু নদ ও ঝিলাম নদীর মধ্যবর্তী স্থানে। ঝিলাম নদীকে গ্রিকরা বলত হাইডাসপেস। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গান্ধারের রাজা ছিলেন ট্যাকসিলিস। তিনি আলেকজান্দারের জন্য মূল্যবান উপঢৌকন পাঠান। তাঁর মৃত্যুর পর অম্ভি গান্ধারের রাজা হন। অম্ভি আলেকজান্দারে কে ৬৫ হাতি এবং ৩০০ ষাঁড় উপহার দেন।



গান্ধারের রাজধানী তক্ষশিলা

আলেকজান্দারের ভারত আক্রমনের কিছু কাল পরে চন্দ্রগুপ্ত (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪-৩০০) উত্তর ভারতের মগধে শক্তিশালী মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা করেন । এই বংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন সম্রাট অশোক (খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩-২৩২) । অশোকের মৃত্যুর মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই মৌর্যবংশের পতনের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং সেই পতনের সুযোগে গ্রিকরা ভারতের উত্তরপশ্চিমের বিশাল অংশ জয় করে নেয়ে। অবশ্য এই সব গ্রিক আক্রমনকারীরা ইউরোপের মূলভূখন্ড থেকে আসেনি। মনে থাকার কথা খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের শুরুতে আলেকজান্দার ব্যাকট্রিকা এবং বুখারা জয় করে সির দরিয়া অবধি অগ্রসর হয়েছিলেন। আলেকজান্দার যেখানেই যেতেন গ্রিসের আদলে নগর ও জনবসতি গড়ে তুলতেন। এসব গ্রিক মূলত ব্যাকট্রিয় গ্রিক। গান্ধার শিল্পের বিকাশ হয়েছিল এই ব্যাকট্রিয় গ্রিকদের সময়ে। এর মানে, গান্ধার শিল্পের মূলে ছিল ব্যাকট্রিয় গ্রিকদের শিল্পকৌশল।



বুদ্ধের মুখে নারীসুলভ ইউরোপীয় ছাপ।

ব্যাকট্রিয় গ্রিক শাসকরা ইন্দো-গ্রিক নামেও পরিচিত। ইন্দো-গ্রিক শাসকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেনান্দার। সময়কাল: ১১৫-১৯০ খ্রিস্টপূর্ব। মেনান্দার এর জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের শিয়ালকোট। শিয়ালকোটই ছিল মেনান্দার এর রাজধানী। ইনি বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগার্জুনকে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। ইতিহাসে যা ‘মিলিন্দ পঞহো’ নামে পরিচিত। মেনান্দার সন্তুষ্ট হয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করে পৃষ্ঠপোষক হন।
এভাবে ব্যাকট্রিয় গ্রিকদের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের একটা সর্ম্পক আবিস্কৃত হল ।



মানচিত্রে স্কাইথিয়া।

গ্রিকদের পরে শকরা ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আক্রমন করে । মধ্য এশিয়ার যাযাবরদের নাম ছিল স্কাইথিয়। এদেরই এক শাখার নাম শক। এরা ব্যাকট্রিয় গ্রিকদের আধিপত্য ধ্বংস করেই তবে ভারতবর্ষে এসেছিল। শকদের রাজধানী ছিল তক্ষশিলা; তক্ষশিলার প্রথম শক রাজার নাম ছিল মাওয়েস। তিনি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর গোড়ায় সিংহাসনে বসেন। যা হোক। শকরা ব্যাকট্রিয় ইন্দো-গ্রিক প্রবর্তিত গান্ধার শিল্পের পৃষ্টপোষকতা অব্যাহত রেখেছিল।


কুষাণ সাম্রাজ্যের মানচিত্র।

শকদের পরে ভারতবর্ষে আসে কুষাণরা। কনিস্ক (১২৭-১৫১ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন অন্যতম কুষাণ নৃপতি। কনিষ্কর রাজধানী ছিল পুরুষপুর বা (বর্তমান পাকিস্তানের) পেশোয়ার; কনিষ্ক বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেন এবং ধর্মটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন। এসব কারণে গান্ধার শিল্পে গভীর কুষাণ প্রভাব অক্ষুন্ন থাকে । শক কিংবা কুষাণরা বিদেশী হিসেবে ভারতে এলেও বেশি দিন বিদেশী থাকেনি। এরা ক্রমশ ভারতীয় সভ্যতায় মিশে যায়।



আফগানিস্তানের বামিয়ানে বৌদ্ধমূর্তি। আজও গান্ধার শিল্পের ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

ব্যাকট্রিয় গ্রিকদের শিল্পরীতি গ্রহন করেছিল শক ও কুষানরা। যার ফলে গড়ে উঠেছিল গান্ধার শিল্প -যে শিল্পের বিকাশকাল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ। বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধর্ম গান্ধার শিল্পের একমাত্র বিষয়। বুদ্ধ এর আগেও ভারতীয় শিল্পের বিষয় ছিলেন, তবে প্রতীক হিসেবে; তাতে বৌদ্ধমূর্তির কোনও স্থান ছিল না। গান্ধার শিল্প বুদ্ধমূর্তি তৈরি করে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করে ।



গান্ধার শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বুদ্ধকে মুখমন্ডলের অভিব্যাক্তিসহ মানবরূপে দেখানো।

প্রতীকের বদলে বুদ্ধমূর্তির উপাসনা মহাযান বৌদ্ধধর্ম অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কুষানরা মহাযান বৌদ্ধধর্মই গ্রহন করেছিল। কাজেই গান্ধার শিল্পের সঙ্গে মহাযান বৌদ্ধধর্মের সম্পর্ক গভীর। কুষাণ যুগে বৌদ্ধমূর্তির ব্যাপক চাহিদা ছিল। বুদ্ধের মূর্তিগুলি গ্রিক ভাস্করেরা নির্মাণ করেছিল বলেই গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর ছাপ ছিল। যে কারণে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপর লিখেছেন ...
In the north-west the hybrid Indian-Greek forms of Gandhara art depicted, almost exclusively, Buddhist themes, in which the mother of the Buddha resembled an Athenian matron and a variety of Apollo-like faces went into the making of a Buddhist scene. (A Hisory of India (Vol.1) page, 128)



গান্ধার শিল্পে গ্রিক ও ভারতীয় শিল্পের মিশেল ঘটলেও আলাদা করে দেখা সম্ভব। যেমন বুদ্ধের মূর্তিতে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর ছাপ থাকলেও মূর্তির চোখ, ঠোঁট ও মুখমন্ডলে সনাতন ভারতীয় ছাপ স্পস্ট। মূর্তির দেহে গ্রিক রীতি স্পস্ট: যেমন কোঁকড়ানো চুল, কিছুটা ঝুলন্ত কান, সিংহ গ্রীবা, উন্নত কাঁধ এবং মাংশপেশীবহুল বাহু। ভারতীয় রীতি হল: ধ্যানী বুদ্ধে অর্ধনিমীলিত চোখ, হাসিমাখা ঠোঁট, প্রশান্ত মুখমন্ডল এ বং ভূমিস্পর্শ মুদ্রা। গান্ধার শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বুদ্ধকে মুখমন্ডলের অভিব্যাক্তিসহ মানবরূপে দেখানো। কখনও টোগা পরে রয়েছেন। টোগা হল রোমান অভিজাতদের পোশাক। কুষাণদের সময়ে রোমের সঙ্গে ভারতের বানিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।



প্রথম প্রথম গান্ধার শিল্পের জন্য ব্ল্যাক ব্যাসল্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রাচীরের গায়ে প্রলেপ এবং ছাঁচ তৈরির জন্য আস্তর ও পোড়ামাটি ব্যবহার করা হয়েছিল। অবশ্য ধাতুর ব্যবহারও হত। মূর্তি তৈরি উপাদান ছিল বেলে পাথর এবং পোড়ামাটি । মূর্তির ওপরে সোনালি রঙের প্রলেপ দেওয়া হত। গোঁফ ও পাগড়ী পরানো হত!



গান্ধার। মানচিত্র।

ভৌগোলিক দিক থেকে গান্ধার শিল্পের উৎপত্তিস্থল ছিল গান্ধার, অর্থাৎ পেশোয়ার এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, অর্থাৎ নগরহর (জালালাবাদ) বামিয়ান, বেগ্রাম, সোয়াট উপত্যকা, ইউসুফজাই এলাকা এবং তক্ষশিলা। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে পারসিক, গ্রিক রোমান শক এবং কুষানেরা একের পর এক আবির্ভব ঘটেছিল। এর ফলে ভারতীয় এবং বৈদেশিক ভাবধারা একীভূত হয়ে এখানে একটি মিশ্র সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছিল। গান্ধার শিল্প সেই মিশ্র সংস্কৃতির অন্যতম ফসল।



গান্ধার।

No comments:

affiliate program

EARN INCOME FROM YOUR WEBSITE

Turn your valuable web site traffic into income. Work online and join our free money making affiliate program. We offer the most pay-per-click rate to help maximize your cash stream.

Join our income making program absolutely free and 100% risk free.

Sign Up...

A steady income generator

Imagine running of a something that never failed to provide you with cash-flow. A earning money program so amazingly profitable that you never had to look for job ever again!Income while you sleep

CASH WHILE YOU SLEEP

Earn $1,000... $2,000... $5,000...

Turn your website visitors into cash!
You get money for every visitor that clicks on our advertizing. Our goal is to enable you to make as much as possible from your site. We pay monthly, either by check, or through PayPal.

Begin collecting steady partner commissions

Our money making program really can make you income on the same day. Start receiving steady partner revenue with almost no effort at all. This is a serious revenue opportunity, the chance for you to build a steady, reliable, long-time profitable business.

Savings Highway Dream Team Member Site Savings Highway Dream Team Member Site